Standard

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী

খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। # ০১৭১৯ ১৯৭৯৭৮
রহমত, ক্ষমা ও দোযখ থেকে মুক্তির বার্তা নিয়ে আগমন করেছে মহামান্বিত মাস ‘‘রমযানুল মুবারাক’’। যে মাসের সম্মানার্থে আল্লাহ তা’লা বেহেস্তের দরজাগুলো উন্মুক্ত করে দেন, দোজখের দ্বারসমূহ বন্ধ করে দেন এবং অভিশপ্ত শয়তানকে বন্ধী করে রাখেন ।
এ মহান মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। আর কুরআন অবতীর্ণ হওয়া মানেই সকল প্রকার কল্যাণের সূচনা হওয়া। আল্লাহ তালা বলেন- “রমযান মাস, যাতে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে, মানব জাতির জন্য হিদায়ত (দিশারী) এবং সৎপথের সুষ্ঠু নিদর্শন ও সত্য-অসত্যের পার্থক্যকারী রূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম (রোযা) পালন করে। আর কেহ অসুস্থ কিংবা সফরে থাকলে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে, আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান এবং যা তোমাদের জন্য কষ্টকর তা চান না এ জন্যই যে, তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করবে। এবং তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করার কারণে তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করবে এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার’’। [সূরা বাক্বারাহ, আয়াত-১৮৫]
মানুষের জীবনের কম বয়সে এবং অল্প সময়ের মধ্যে আল্লাহ তাআলা তার জন্য ভাল কাজের মৌসুম রেখেছেন। তার জন্য স্থান এবং কালের মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন। যে কাল ও স্থানের মাধ্যমে সে তার ত্রুটি বিচ্যুতির ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে। সে সব বিশেষ মৌসুমের মধ্য থেকে অন্যতম একটি মৌসুম হল পবিত্র রমযান মাস। 
এটি একটিমাত্র মাস যাকে কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাই ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ,তবেতাবেয়ীন ও তাঁদের পরবর্তীরা খুবই আগ্রহ নিয়ে এ মাসের আগমনের অপেক্ষায় থাকতেন। মুয়াল্লা বিন ফদল বলেন- ‘‘ছালফে ছালেহীনগণ বৎসররের ছয় মাস ব্যাপী দোয়া করতেন রমযান পর্যন্ত পৌছার জন্য, আর বাকী ছয় মাস দোয়া করতেন রমযান কবুল করার জন্য”।  তাঁরা বলেন- ‘‘মানুষ যদি জানতো রমযানে কি কল্যাণ নিহীত রয়েছে, তাহলে তারা কামনা করতো সারা বৎসর যেন রমযান হয়’’। আর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও রজব মাস যখন প্রবেশ করতো তখন থেকে দোয়া করতেন: “হে আল্লাহ আমাদেরকে বরকত দাও রজব ও শাবান মাসে এবং পৌছিয়ে দাও আমাদেরকে রমযান পর্যন্ত”। 
প্রকৃতপক্ষে পবিত্র মাহে রমযান মুসলমানদের জন্য একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ কোর্স, যার মাধ্যমে রোযাদারদের জীবন প্রভাবিত হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র রমযান মাস ভালোভাবে যাপন করবে, তার সমগ্র বৎসর ভালোভাবে যাপিত হবে।’ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি ঈমান ও নিষ্ঠার সাথে রমযানের রোযারাখবে তার অতীতের সকল গুনাহ  ক্ষমা করা হবে” । [বুখারী]   তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন- “যে ব্যক্তি রমযানে রাত জেগে ইবাদত করবে তথা তারাবীহ আদায় করবে তার অতীতের গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে)। [বুখারী]
এ পবিত্র মাসে এমন এক মহিমান্বিত রাত রয়েছে যে রাতটি ১০০০(এক হাজার) মাসের চেয়েও উত্তম অর্থাৎ ক্বদরের রাত্রি। প্রিয় নবী এরশাদ করেন “যে ব্যক্তি ঈমান ও ইখলাসের সাথে ক্বদরের রাত্রি উদযাপন করেছে তার অতীতের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে”  [হাদিছ]
আর সিয়াম বা রোযা হলো ইসলামের পাচঁটি মূলস্তম্ভের অন্যতম একটি, যা একটি অত্যাবশ্যকীয় তথা ফরয ইবাদত। আল্লাহ তা’লা এরশাদ করেন:- “হে মুমিনগন! তোমাদের উপর রোযা ফরজ করা হয়েছে যেমনিভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা মুত্তকী বা খোদাভীরু হতে পার। সিয়াম নির্দিষ্ট কয়েকদিনের জন্য। তামাদের মধ্যে কেহ অসুস্থ বা সফরে থাকলে, অন্য সময় এ সংখ্যা পূর্ণ করে নিতে হবে। আর যারা অক্ষম তাদের উপর কর্তব্য এর পরিবর্তে ফিদ্য়া- একজন মিসকিনকে খাদ্য দান করবে। যদি কেহ সেচ্ছায় সৎকাজ করে তবে তা তার জন্য অধিকতর কল্যাণকর। আর সিয়াম পালন করাই তোমাদের জন্য অধিকতর কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে!”  [সূরা বাক্বারাহ ,আয়াত-১৮৩-১৮৪]
বুখারী ও সুসলিম শরীফে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: ‘‘মানবজাতির সব আমল তার নিজের জন্যই; প্রত্যেক পূণ্য কাজের ছাওয়াব দশগুণ থেকে শুরু করে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ তালা বলেন- একমাত্র রোযা ব্যতিরেকে, কেননা তা হলো একমাত্র আমারই জন্য এবং আমিই তার প্রতিদান দেব। কারণ সে  (রোযাদার) তার প্রবৃত্তি, খাদ্য ও পানীয় পরিহার করেছে একমাত্র আমারই জন্য। রোযাদারের জন্য দুটি খুশি নির্ধারিত, একটি হলো- তার ইফতারের সময়, আর অন্যটি হলো বেহেস্তে স্বীয় রবের দিদার বা সাক্ষাত লাভের সময়। নিশ্চয় রোযাদারের মুখ থেকে নির্গত গন্ধ [যা পানাহার থেকে বিরত থাকার কারণে সৃষ্টি হয়] আল্লাহ তালার নিকট মেশক আম্বরের চেয়েও অধিক সুগন্ধময় [ বুখারী ও মুসলিম]
অর্থাৎ প্রত্যেক  আমলের ছাওয়াব বৃদ্ধি পেয়ে সাতশত গুণ পর্যন্ত পৌছে কিন্তু রোযার ছাওয়াব অসংখ্য-অগণিত, মহান আল্লাহ তালা তার কুদরাতের হাতেই তার প্রতিদান দেবেন। আল্লাহর মালিকানা যেহেতু অসীম তাই তার দানও অসীম। কেননা রোযা হলো ছবর বা ধৈর্য্য, আর ধৈর্য্যরে প্রতিদান হলো- বেহেশÍ। 
কারণ রোযার  মধ্যে যে ইখলাছ বা নিষ্ঠা বিদ্যমান তা অন্য কোন ইবাদতে পাওয়া যায় না, তাই বলা হয় রোযার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানো নেই। রোযাদার চাইলে সবার অজান্তে কিছু খেয়ে নিতে পারে কিন্তু আল্লাহ তালা দেখছেন এ বিশ্বাসের কারণে সে তা থেকে বিরত থাকে, তাই এ কাজকে আল্লাহ তালা নিজের জন্যই খাচ করে নিয়েছেন, এজন্য দেখা যায় যদি কোন ঈমানদারকে রোযা ভঙ্গ করার জন্য প্রহারও করা হয় তারপরও সে রোযাভাঙ্গতে রাজি হবে না, কেননা তার ঈমান হলো আল্লাহ তা’লা তা পছন্দ করেন না। 
জেনে রাখা দরকার যে, শুধুমাত্র পানাহার ত্যাগের নাম রোযা নয় বরং সকল প্রকার নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকার নাম হলো রোযা এবং সেই সাথে অন্তরকে করতে হবে পরিচ্ছন্ন, তবেই রোযা মুমিনের জীবনে নিয়ে আসবে অফুরন্ত রহমত ও বরকত। তাই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও অনুরূপ কাজ পরিহার করল না, তার খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকার মধ্যে আল্লাহর  কোন প্রয়োজন নেই।  [ বুখারী]  
তাই প্রত্যেক রোযাদারকে সকল প্রকার নিষিদ্ধ – বিশেষত: মিথ্যা. পরনিন্দা, হিংসা, গালাগালি, জুলুম ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে, আর তখনই রোযাদারের আসল ও প্রকৃত প্রতিদানে ধন্য হবে। এ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন: ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রোযা রাখে সে যেন কোনো রকম অশ্লীলতা ও হৈ-হুল্লোড় না করে। কেউ যদি তাকে গালাগাল বা তার সাথে ঝগড়া করে সে যেন বলে¬ আমি রোযাদার’ (বুখারি ও মুসলিম)। 
অতএব রোযাদারকে পানাহারের পাশাপাশি কান, চোখ, জবান, ও হাত-পা কে মিথ্যা ও নিষিদ্ধ কাজ ও কথা থেকে বিরত রাখতে হবে, অন্যথায় তা শুধুমাত্র উপবাস যাপন ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: “কিছু রোযাদার এমনও আছে যার রোযা থেকে তার প্রাপ্য হলো- শুধুমাত্র ক্ষুধা ও পিপাসা  এবং কিছু এমনও আছে যার রাত জাগা থেকে প্রাপ্য হলো একমাত্র অনিদ্রা।” [ইবনে মাজাহ ও আহমদ] 
সে ঐ ব্যাক্তি যে আহার বাদ দিল, কিন্তু গীবতের মাধ্যমে নিজের ভাইয়ের গোস্ত খাওয়া থেকে বিরত হতে পারল না। পান করা থেকে বিরত থাকল কিন্তু মিথ্যা, ধোকা, মানুষের উপর অত্যাচার থেকে বিরত হল না। তাই সিয়ামের অর্থ হচ্ছে তাকওয়ার অনুশীলন, আর তাকওয়ার অনুশীলনই অপরাধমুক্ত সমাজ তৈরির অন্যতম হাতিয়ার। 
রমযান ধৈর্য ও সবরের মাস: এ মাসে ঈমানদার ব্যক্তিগণ সকল আচার-আচরণে যে ধৈর্য ও সবরের এত অধিক অনুশীলন করেন তা অন্য কোন মাসে বা অন্য কোন পর্বে করেন না। এমনিভাবে সিয়াম পালন করে যে ধৈর্যের প্রমাণ দেয়া হয় তা অন্য কোন ইবাদতে পাওয়া যায় না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন “ধৈর্যশীলদের তো বিনা হিসাবে পুরস্কার দেয়া হবে। (সূরা যুমার : ১০)  হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু  বলেন-‘‘রোযা একমাত্র আল্লাহরই জন্য তাই তার প্রতিদান আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা’’ । [তাবরানী] 
রমযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম ও তাঁর সাহাবারা অধিক পরিমাণে শক্তি, সজিবতা এবং ইবাদতের জন্য ধৈর্য ধারণ করার উদ্যম অনুভব করতেন, তাইতো রমযান মাসকে সৎকাজ, ধৈর্য ও দানের মাস বলা হয়। রমযান দুর্বলতা, অলসতা, ঘুমানোর মাস নয়। পূর্বেকার মুসলমানেরা রমযান যাপন করতেন তাদের অন্তর এবং অনুভূতি দিয়ে। রমযান আসলে তারা কষ্ট করতেন। ধৈর্যের সাথে দিন যাপন করতেন। আল্লাহর ভয় এবং পর্যবেক্ষণের কথা তাদের স্মরণ থাকত। তার সিয়াম নষ্ট হয় অথবা ত্রুটিযুক্ত হয় এমন সব কিছু থেকে দুরে থাকতেন। খারাপ কথা বলতেন না, ভাল না বলতে পারলে নীরব থাকতেন। তারা রমযানের রাত্রি যপন করতেন সালাত, কোরআন তেলাওয়াত, আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের অনুসরণ করেই। 
যেহেতু এ মাসের ইবাদত-বন্দেগির সাওয়াব অন্য মাসের ইবাদত-বন্দেগি থেকে কমপক্ষে ৭০ গুণ বেশি। সুতরাং আসুন এখনই আমরা রমযানের পুণ্যময় ইবাদত-বন্দেগির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে নিজের বিগত দিনের পাপতাপ মাফির এ সুবর্ণ সুযোগ গ্রহণ করি। (চলবে ইনশা আল্লাহ)

Advertisements

রমযান মাস ও রোযার ফযিলত-২

Standard

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। #

بسم الله الرحمن الرحيم. نحمده ونصلى ونسلم على رسوله الكريم وعلى آله وصحبه أجمعين.

দান-সদকার মাস:
এ মাসটি ধনী এবং আড়ম্বরপূর্ণ জীবন যাপনকারীদের জন্যও বিরাট সুযোগ। রমযান মানুষের মধ্যে মানবিকতাবোধের উন্মেষ ঘটায়। তাদের কাজ-কর্ম এবং অনুভূতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য, তারা যেন দরিদ্রদের প্রয়োজন ও ব্যথা অনুভব করতে পারে। নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে। আল্লাহ যে পথে ব্যয় করতে সম্পদ দিয়েছেন সে পথে তারা সম্পদ ব্যয় করতে পারে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যারা ক্ষুধার্ত আছে তাদের বাঁচাতে তারা যেন এগিয়ে আসতে পারে। তারা যদি তাদের ক্ষুধার্তদেরকে না খাওয়ায়, বস্ত্রহীনদেরকে বস্ত্র না দেয় আর দুর্বলদেরকে সাহায্য না করে মনে করতে হবে তাদের ঈমান বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে। মহানবীর ভাষায়, ‘সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যরে মাস মাহে রমযান’ (বায়হাকি)।
কেননা ধনী ও বিত্তশালীরা সারা দিন রোযা রেখে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষুধার জ্বালার দহন-বেদনা বুঝতে সক্ষম হন, ফলে তাদের মধ্যে সমাজের বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতার অনুভূতি জাগ্রত হয়। এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানের কথা বলতে গিয়ে প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল ছিলেন। রমযানে যখন তিনি জিবরীলের সাথে সাক্ষাৎ করতেন তখন আরো বেশি দানশীল হয়ে যেতেন, তিনি ছিলেন প্রবাহমান বাতাসের চেয়েও অধিক বদান্য। (বুখারী মুসলিম)
ইমাম শাফেয়ি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে তার উম্মতের জন্য উত্তম কাজ হল রমযান মাসে তারা বেশি করে দান-সদকা করবে। কারণ এ মাসে মানুষের প্রয়োজন বেশি থাকে। অপরদিকে রমযান হল জিহাদের মাস। তাই প্রত্যেকের উচিত অর্থ-সম্পদ দান করার মাধ্যমে জিহাদে অংশ নেয়া ও রমযান মাসে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে অর্থ ব্যয় করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “হে আয়েশা, অভাবগ্রস্ত মানুষকে ফেরত দিয়ো না। একটি খেজুরকে টুকরো টুকরো করে হলেও দান করো। দরিদ্র মানুষকে ভালোবেসে কাছে টানো। কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তোমাকে কাছে টানবেন।
রোযাদারদের ইফতার করানো:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:“যে ব্যক্তি কোন সিয়াম পালনকারীকে (রোযাদারকে) ইফতার করাবে সে সিয়াম পালনকারীর অনুরূপ সওয়াব লাভ করবে, তবে তাতে সিয়াম পালনকারীর সওয়াব বিন্দুমাত্র কমে যাবে না।’ ( আহমদ)  হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন: আমার বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, আমি তাকে ভালবাসি। যখন আমি তাকে ভালবাসি সে আমার কান হয়ে যায় যা দিয়ে সে শোনে। আমার চক্ষু হয়ে যায় যা দিয়ে সে দেখে। হাত হয়ে যায় যা দিয়ে সে ধরে। পা হয়ে যায় যা দিয় সে চলে। (বুখারী)।
মজুদদার অভিশপ্ত:
রমযান মাস এলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রী মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে অত্যধিক মুনাফা লাভের আশায়। এটা অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, “মজুদদার অভিশপ্ত।’ এটি শুধুই অমানবিক নয়, রীতিমত হিংস্রতাও। এ ব্যাপারে হাদিসে এসেছে কঠোর সতর্কতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, “কেউ যদি কৃত্রিম উপায়ে অর্থাৎ খাদ্য গুদামজাত করে সঙ্কট তৈরি করে, আল্লাহ তাকে কুষ্ঠরোগ দেবেন কিংবা একদিন না একদিন তাকে অবশ্যই গরিব বানাবেন।’ অতএব ব্যবসায়ীদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত। দাম বাড়ানোর কারণে যেন কোনো রোযাদার কষ্ট না পান, নিজেরাও যাতে হালাল উপার্জনে রোযা পালন করতে পারেন।
সিয়াম আগুন ও প্রবৃত্তির তাড়না থেকে রক্ষাকারী ঢাল:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “সিয়াম প্রবৃত্তির তাড়না থেকে বাঁচার জন্য ঢাল, এর মাধ্যমে বান্দা আগুন থেকে মুক্তি পায়।(আহমাদ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন: “হে যুবকেরা! যে সামর্থ রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা তা দৃষ্টিকে সংরক্ষণ করে এবং যৌনাঙ্গের হিফাযত করে। যে বিবাহের সামর্থ রাখে না সে যেন সিয়াম পালন করে। কেননা এটি তার জন্য সুরক্ষা। (বুখারী মুসলিম)।
সিয়াম জান্নাতের পথ:
ইমাম নাসাঈ রহ. আবু উমামা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমাকে এমন বিষয়ের নির্দেশ দেন যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাকে প্রতিদান দেবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি অসাল্লাম বলেন:তুমি সিয়াম পালন কর। কেননা এর কোন তুলনা নেই। (নাসাঈ)
জান্নাতে একটি দরজা আছে সেখান দিয়ে শুধু সিয়াম পালনকারী প্রবেশ করবে: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন: জান্নাতে একটি দরজা আছে যার নাম রাইয়ান। কিয়ামত দিবসে সেখান দিয়ে সিয়াম পালনকারী প্রবেশ করবে। সে দরজা দিয়ে অন্য কেহ প্রবেশ করবে না। বলা হবে: সিয়াম পলনকারী কোথায়? তারা দাঁড়াবে, তারা ছাড়া আর কেহ প্রবেশ করবে না। তারা প্রবেশ করার পর দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আর কেহ সে স্থান দিয়ে প্রবেশ করবে না। (বুখারী মুসলিম)।
সিয়াম ও আল-কোরআন কিয়ামত দিবসে সুপারিশকারী:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন: সিয়াম এবং কোরআন বান্দার জন্য কিয়ামত দিবসে সুপারিশকারী হবে, সিয়াম বলবে, হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তির তাড়না থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাত্রের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন, আল্লাহ তাআলা বলবেন: তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আহমদ)  প্রতি বছর রমযান মাসে জিবরাইল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে পূর্ণ কোরআন শোনাতেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও তাকে পূর্ণ কোরআন শোনাতেন। আর জীবনের শেষ রমযানে আল্লাহর রাসূল দু বার পূর্ণ কোরআন তিলাওয়াত করেছেন। সহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত।
সিয়াম গুনাহের ক্ষমা এবং কাফফারা হিসাবে গৃহিত হয়:
কেননা ভাল কাজ অন্যায়কে মুছে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন: যে রমযানে ঈমান এবং এহতেসাবের সাথে সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারী মুসলিম) যে ব্যক্তি রমযান মাস পেয়েও তার পাপসমূহ ক্ষমা করানো থেকে বঞ্চিত হলো আল্লাহর রাসূল তাকে ধিক্কার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: ঐ ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক যার কাছে রমযান মাস এসে চলে গেল অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করা হয়নি। (তিরমিযি)  সত্যিই সে প্রকৃত পক্ষে সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত যে এ মাসেও আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল।
সিয়াম ইহকাল এবং পরকালের সৌভাগ্যের কারণ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন: সিয়াম পালনকারীর দুটি খুশি, প্রথম খুশি যখন সে ইফতার করে, আর এক খুশি যখন সে তার রবের সাথে সাক্ষাৎ করবে। সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মিশক আম্বরের চেয়ে অধিক প্রিয়। (বুখারী মুসলিম)
এ মাসের বরকত:
এ মাসের অন্যতম বরকত হল ভাল কাজের প্রতিদান অনেক বেড়ে যায়। যেমন, রাত্রে দাড়িয়ে নামাজ আদায় করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের রাত্রে দাড়িয়ে নামাজ পড়তে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন: যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে রমযানের রাত্রে দাড়িয়ে নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তাআলা তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারী) মুসলিম)
সিয়াম পালনকারীর জন্য সাহরী খাওয়া উত্তম: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন: সাহরী বরকতের খাবার। তা খাওয়া থেকে বিরত হবে না। কেহ যদি এক ঢোক পানিও পান করে তবুও সে সাহরী খেল। কেননা আল্লাহ তাআলা এবং ফেরেশতাগণ সাহরীতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য দোয়া করতে থাকেন। (আহমাদ)
ইফতার তাড়াতাড়ি করা এবং দোয়া করা:
ইমাম তিরমিযি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: তিন ব্যক্তির দোয়া আল্লাহ তাআলা ফেরৎ দেন না: ন্যায়পরায়ণ শাষক, সিয়াম পালনকারী যখন ইফতার করে ও অত্যাচারিতের দোয়া। (তিরমিযি)
রমযান জাহান্নাম থেকে মুক্তির লাভের মাস:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে ঘোষণা দিতে থাকে যে, হে সৎকর্মের অনুসন্ধানকারী তুমি অগ্রসর হও ! হে অসৎ কাজের অনুসন্ধানকারী তুমি থেমে যাও ! এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।  (তিরমিযি)
এতেকাফ:
ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন।” ( মুসলিম)। এতেকাফ প্রসঙ্গে ইমাম যুহরি বলেন, আশ্চর্যজনক হল মুসলমানরা এতেকাফ পরিত্যাগ করে অথচ রাসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আসার পর থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত কখনো এতেকাফ পরিত্যাগ করেননি।
দোয়া-প্রার্থনা করা:
আল্লাহ রাব্বুল সিয়ামের বিধান বর্ণনা করার পর বলেছেন: “আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে প্রশ্ন করে, আমি তো নিকটেই। প্রার্থনাকারী যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দেই।’ (সূরা আল-বাকারা : ১৮৬)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: রমযান মাসে প্রত্যেক মুসলিমের দোয়া কবুল করা হয়। (মুসনাদ আহমদ)  অন্য হাদিসে এসেছে – আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রমযানের প্রতি রাতে ও দিনে বহু মানুষকে মুক্তি দিয়ে থাকেন এবং প্রতি রাত ও দিবসে মুসলিমের দোয়া-প্রার্থনা কবুল করা হয়। (সহি আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব) তাই সিয়াম পালনকারী আল্লাহর কাছে অধিক পরিমাণে দোয়া-প্রার্থনা করবে।
তওবা করার মাস:
সর্বদা তওবা করা ওয়াজিব। বিশেষ করে এ মাসে তো বটেই। এ মাসে তওবার অনুকূল অবস্থা বিরাজ করে। শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নাম থেকে মানুষকে মুক্তি দেয়া হয়। এ ছাড়া রমযান মাসের সকল ইবাদত বন্দেগি তওবার অনুকুল পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি রমযান মাস পেয়েও তার পাপ ক্ষমা করাতে পারেনি তার নাক ধুলায় ধূসরিত হোক।”  (তিরমিযি) তাই রমযান মাসটাকে তওবা ও ক্ষমা পাওয়ার মাস হিসেবে গ্রহণ করে সে অনুযায়ী আমল করা উচিত।

وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه اجمعين.

রমযান ও রোযা বিষয়ক মাসআলা মাসাইল জানতে এখানে ক্লিক করুন- রমযানরোযার মাসআলা

রামাযানের শেষ দশক ও পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর:

Standard

বিষয়: রামাযানের শেষ দশক ও পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর:

********************************************

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।
بسم الله الرحمن الرحيم
সুপ্রিয় পাঠক ভাই ও বোন, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। দেখতে দেখতে মাহে রামাযান আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নেয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। আমরা এসে পৌঁছেছি শেষ দশকে। কিন্তু কল্যাণের বারি বর্ষণ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বন্ধ হয়ে যায়নি তাওবার দরজা বরং আরও বেশি সুযোগ নিয়ে মাহে রামাযানের শেষ দশক আমাদের মাঝে সমাগত।
* রামাযানের শেষ দশকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রী-পরিবার সহ সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রামাযানের শেষ দশক প্রবেশ করলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোমর বেঁধে নিতেন, নিজে সারা রাত জাগতেন এবং পরিবারকেও জাগাতেন।” (কোমর বাঁধার অর্থ হল: পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে চেষ্টা-সাধনায় লিপ্ত হওয়া।)
* উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাযানের শেষ দশকে (ইবাদত-বন্দেগীতে) যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন অন্য কোন সময় করতেন না।”
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশ দিন এতেকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমযানের শেষ দশ রাতে শবে ক্বদর সন্ধান কর। (বুখারী ও মুসলিম)
পবিত্র লাইলাতুল ক্বদর:

#############

‘লাইলাহ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে রাত বা রজনী। আর ‘ক্বদর’ শব্দের অর্থ হলো মহিমা, মহাত্ম বা সম্মান, এই মহাত্ম ও সম্মানের কারণে একে লাইলাতুল ক্বদর, তথা মহিমান্বিত রাত বলা হয়। যা হাজার মাস (৮৩ বছর ৪ মাস) অপেক্ষা উত্তম। এ রাতটি আমাদের এ উপমহাদেশে ‘শবে ক্বদর’ হিসেবে মশহূর।
ক্বদরের রাত্রের ফযিলত ও মহাত্ম সম্পর্কে কুরআনুল করিমে সূরাতুল ক্বদর নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়েছে। আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন ইরশাদ ফরমান: (১) নিশ্চয়ই আমি একে (পবিত্র কুরআনকে) নাযিল করেছি শবে ক্বদরে। (২) শবে ক্বদর সম্বন্ধে আপনি কি জানেন? (৩) শবে ক্বদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। (৪) এই রাত্রিতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। (৫) এটা নিরাপত্তা যা ফজরের উদয় পযর্ন্ত অব্যাহত থাকে। (সুরা ক্বদর)
শবে ক্বদরের ফযিলত ও মহাত্ম সম্পর্কে কুরআন পাকের এই বর্ণনাই যথেষ্ট।
কদরের অর্থ: নির্ধারণ করা, সময় নির্দিষ্ট করা ও সিদ্ধান্ত করা। অর্থাৎ লায়লাতুল কদর এমন এক রাত যে রাতে আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করেন। তার সময় নির্দিষ্ট করেন এবং হুকুম নাযিল করেন ও প্রত্যেক বস্তুর ভাগ্য নির্ধারণ করেন। মহান আল্লাহ আরও বলেন “ঐ রাতে সকল বিষয়ের সুষ্ঠু ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় আমার নির্দেশক্রমে”-(সূরা দুখান)
* প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে ক্বদরের রাতে ইবাদত করে তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
* প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও এরশাদ করেন: যখন লায়লাতুল কদর আসে, তখন জিবরাঈল অন্যান্য ফেরেশতাগণের সাথে যমীনে নেমে আসেন এবং প্রত্যেক ঐ বান্দাহর জন্যে রহমত ও মাগফেরাতের দোয়া করেন যে দাঁড়িয়ে- বসে আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকে। (বায়হাকী)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন: লোক সকল! তোমাদের মধ্যে এমন এক রাত এসেছে যা হাজার মাস থেকেও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত রইলো সে সকল প্রকার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়ে গেল এবং এ রাত থেকে সে-ই বঞ্চিত থাকে যে প্রকৃতপক্ষে বঞ্চিত।–(ইবনে মাজাহ)
লাইলাতুল কদর নির্ধারণ: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা শবে ক্বদর তালাশ কর। রমযানের শেষ দশকের বে-জোড় রাত্রিতে। (বুখারী)

সাহাবীদের মধ্যে অনেককেই স্বপ্ন দেখান হল, শবে ক্বদর (রমযানের) শেষ সাত রাতের মধ্যে।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন: “আমি দেখছি, তোমাদের সবার স্বপ্ন একি রকম- শেষ ৭ রাতেই সীমাবদ্ধ। তাই যে তা অনুসন্ধান করে, সে যেন শেষ ৭ রাতে তা খোঁজ করে দেখে। (বুখারী ও মুসলীম)

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন: “তোমরা তালাশ করবে তাকে রমযানের শেষ দশে- মাসের নয় দিন বাকি থাকতে, সাতদিন বাকি থাকতে, পাঁচ দিন বাকি থাকতে। (বুখারী)
উল্লেখিত হাদীসগুলো থেকে জানা যায় যে, রমযান মাসের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাত গুলোর মধ্যে কোনো একটি অর্থাৎ ২১শে, ২৩শে, ২৫শে, ২৭শে, অথবা ২৯শে রাত।
ইমামে আ’যম আবূ হানীফা (র) সহ অসংখ্য ইমামদের মত হলো: অধিকতর সম্ভাবনার দিক দিয়ে রমযান মাসের সাতাশ তারিখ। তবে সুন্নত হলো পবিত্র রমাদ্বান শরীফ-এর শেষ দশকের প্রত্যেক বেজোড় রাতেই শবে ক্বদর তালাশ করা। আলাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতকে গোপন রেখেছেন আমাদের উপর রহম করে। তিনি দেখতে চান এর বরকত ও ফযিলত লাভের জন্য কে কত প্রচেষ্টা চালাতে পারে।
মহিমান্বিত রজনীর নিদর্শনসমূহ:

#################

১. কদরের রাত্রি তিমিরাচ্ছন্ন হবে না।

২. নাতিশীতোষ্ণ হবে। (না গরম না শীত এমন)

৩. মৃদু বায়ু প্রবাহিত হবে।

৪. উক্ত রাতে মু’মিনগণ ইবাদত করে অন্যান্য রাত অপেক্ষা অধিক তৃপ্তি বোধ করবে।

৫. হয়তো বা আল্লাহ তা’আলা কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে তা স্বপ্নে দেখাবেন। (দেখুন : ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমদ)

৬. ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে। (বুখারী)

৭. সকালে হালকা আলোক রশ্নিসহ সূর্যোদয় হবে, পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায়। (মুসলিম) অবশ্য এ আলামতটি কদরের রাত অতিক্রান্ত হওয়ার পর সকাল বেলায় জানা যাবে। এর হেকমত হল লায়লাতুল কদর অনুসন্ধানে বান্দাদেরকে অধিক পরিশ্রমী করে তোলা, এবং যারা এ রাতের ফযীলত পাওয়ার জন্য পরিশ্রম করেছে তাদেরকে আনন্দিত করা।
কদরের রাতের দুআ:

##########
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি ক্বদরের রাত খুঁজে পাই, তাহলে আমি ওই রাতে কী বলবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, তুমি বলবে- “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী” অর্থ: হে আল্লাহ তুমি অবশ্যই ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা পছন্দ করো, তাই আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিযী)
শবে ক্বদর দুআ কবুলের অন্যতম রাত্রি। এই রাত্রিতে বান্দা আল্লাহর কাছে যা আরজি করে আল্লাহ পাক তাকে তাই দিয়ে থাকেন প্রয়োজন অনুসারে। বান্দার সকল দ’ুআই এ রাত্রিতে আল্লাহ পাক কবুল করে থাকেন। কেননা আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন: “তোমরা আমার নিকট দ’ুআ করো আমি তোমাদের দ’ুআ কবুল করবো।”(পবিত্র কুরআন)
তাই প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর দায়িত্ব-কর্তব্য হচ্ছে, রমাদ্বান শরীফ-এর শেষ দশ দিনের প্রতি বিজোড় রাত্রিতে জাগ্রত থেকে লাইলাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদর তালাশ করা। রাত্রিতে জাগ্রত থেকে বেশি বেশি তওবা ইস্তিগফার করে, ইবাদত-বন্দেগীতে কাটানো এবং সকল মুসলমানের জন্য দু’আ করা। যার মনে যতো আরজি রয়েছে তা আল্লাহর দরবারে পেশ করা। কেননা হাদীছ শরীফ-এ রয়েছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট চায় না বা দু’আ করেনা আল্লাহ পাক তার উপর অসন্তুষ্ট হন।”
কাজেই সকলের উচিত আল্লাহ পাক এবং তাঁর হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সন্তুষ্টির জন্য, ইসলামের উপর, ঈমানের উপর ইস্তিক্বামত তথা অটল থাকার জন্য, দুনিয়া এবং আখিরাতের সবর্প্রকার কল্যাণের জন্য অন্তর থেকে দু’আ করা। অবশ্যই আল্লাহ পাক তাকে এই মহিমান্বিত রাত্রির সম্মানার্থে তা দান করবেনই করবেন। এটা আল্লাহর ওয়াদা।
লাইলাতুল ক্বদর-এর নামায: লাইলাতুল ক্বদর-এ সুনির্দিষ্ট কোন নামায নেই, লাইলাতুল ক্বদর-এ সুন্নত-নফল অনেক নামায ও আমলই করা যায়। তবে বিশেষভাবে কয়েকটি আমল করা উচিত। তা হলো: লাইলাতুল ক্বদর-এর নিয়তে ৪/৬/৮/১২ রাকাআত নামায পড়া। দুরূদ শরীফ পাঠ করা। ছলাতুত তাসবীহ’র নামায আদায় করা। যিকির-আযকার করা। কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করা। তাহাজ্জুদের নামায পড়া। বেশি বেশি তওবা ইস্তিগফার এবং মুনাজাত করা। আল্লাহ পাকর কাছে কান্নাকাটি করা। মীলাদ শরীফ পাঠ করত: দু’আ-মুনাজাত করা, ইত্যাদি।
আসুন, আমরা আল্লাহর দেয়া উপহার গুলো দুহাত ভরে কুড়িয়ে রামাযানকে আরও অর্থ বহ করে তুলি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

ঈদের রাতের ফযীলত 

Standard

********************
বছরে পাঁচ রাতে দোয়া বিশেষভাবে কবুল হয়। তার মধ্যে দু’ঈদের দু’রাত। এ রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত-বন্দেগী, তাসবীহ পাঠ, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, দুরূদ শরীফ ও যিকির-আযকার করে রাত অতিবাহিত করা অতি উত্তম। 
হাদীছ শরীফে রয়েছে, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদতে মশগুল থাকবে, যেদিন অন্য সমস্ত দিল মরে যাবে সেদিন তার দিল মরবে না।”

 এর অর্থ হলো- ক্বিয়ামতের দিন অন্যান্য দিল পেরেশানীতে থাকলেও দু’ঈদের রাতে জাগরণকারী ব্যক্তির দিল শান্তিতে থাকবে। (তবারানী শরীফ)
নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি দুই ঈদের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত করবে,সে ব্যক্তি কিয়ামতের দিন ভয়ংকর আতংক ভাব থেকে বেঁচে থাকবে।” 
অন্য এক হাদীস শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “ঈদের রাতে উম্মতে মুহাম্মদীকে ক্ষমা করা হয়। কারণ, কর্মচারীদেরকে কাজ থেকে ফারিগ হওয়ার পর ভাতা দেয়া হয়।”

নফজ রোজা 

Standard

বিষয়: শাওয়াল মাসরে ছয় রোজা ও অন্য নফল রোজা

       ৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

 

بسم الله الرحمن الرحيم

শাওয়াল মাসের ছয় রোজা:
মাহে রমজানের পরবর্তী চন্দ্র মাস মাহে শাওয়াল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখার প্রতি উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখবে অতপর শাওয়ালে ছয়টি রোজা পালন করবে সে যেন পুরো বছর রোজা রাখল৷ (মুসলিম ১১৬৪)
উপরোক্ত হাদিস প্রসঙ্গে আন নাসাঈ তার ‘সুবুল উস সালাম’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন, যদি রমজানের ৩০টি রোজার সঙ্গে শাওয়ালের ছয়টি রোজা যুক্ত হয়, তাহলে মোট রোজার সংখ্যা হয় ৩৬টি। শরিয়া অনুযায়ী, প্রতিটি পুণ্যের জন্য ১০ গুণ পুরস্কারের কথা উল্লেখ রয়েছে। তাহলে ৩৬টি রোজা ১০ গুণ পুরস্কারে পরিণত করলে তা ৩৬০টি রোজার সমতুল্য হবে। অর্থাৎ সারা বছরের রোজার সমতুল্য হবে। 
অপর রেওয়ায়েতে আছে,, রমজানের রোজা দশ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ছয় রোজা দু’মাসের রোজার সমান৷ সুতরাং এ হলো এক বছরের রোজা৷
শাওয়াল মাসের ছয় রোজার  উপকারিতা: 
মহান শরিয়ত প্রণেতা ফরজের আগে-পরে নফল প্রবর্তন করেছেন যেমন- ফরজ সালাতের আগে-পরের সুন্নত গুলো এবং রমজানের আগে শাবানের রোজা আর পরে শাওয়ালের রোজা৷ এই নফলসমূহ ফরজের ত্রুটি গুলোর ক্ষতি পূরণ করে৷ কারণ রোজাদার অনর্থক বাক্যালাপ, কুদৃষ্টি প্রভৃতি কাজ থেকে সম্পূর্ণ বাঁচতে পারে না যা তার রোজার পুণ্যকে কমিয়ে দেয়৷
রমজানের কাজা রোজা ও শাওয়ালের ছয় রোজা একসাথে এক নিয়তে আদায় করা:
যে ব্যক্তি আরাফা দিবসে রোজা রাখল অথবা আশুরা দিবসে রোজা রাখল, এমতাবস্থায় যে তার উপর রমজানের কাজা রোজা রয়েছে, তাহলে তার রমজানের কাজা আদায় হয়ে যাবে এবং একই সাথে আরাফা দিবস বা আশুরা দিবসে রোজা রাখার ছাওয়াবও পেয়ে যাবে। এটা হল কেবল সাধারণ নফল রোজার ক্ষেত্রে যার সাথে রমজানের কোনো যুগসূত্র নেই। অবশ্য শাওয়ালের ছয় রোজার বিষয়টি ভিন্ন। শাওয়ালের ছয় রোজা রমজানের সাথে যোগসূত্রে বাঁধা। 
এ কারণে রমজানের কাজা রোজা থাকলে তা আদায় করার পরই শাওয়ালের ছয় রোজা আদায় করা যাবে। 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ( যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালের রোজা রাখল সে যেন পুরা বছরই রোজা রাখল।) যে ব্যক্তির উপর রমজানের কাজা রোজা রয়েছে তাকে রমজানের রোজা আদায়কারী বলা হবে না যতক্ষণ না তার দায়িত্বে থাকা কাজা রোজা সে পূর্ণ করে নেবে। তাছাড়া ফরজ আদায়ের দায়িত্ব পালন নফল আদায়ের চেয়ে অধিক গুরুত্ব রাখে৷ 
শাওয়ালের ছয় রোজায় কি ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি?
শাওয়ালের রোজা ধারাবাহিকভাবে একসাথে রাখা জরুরি নয়, তবে ধারাবাহিকভাবে একসাথে মাসের শুরুতেই আদায় করা মুস্তাহাব। একসাথে বা ভিন্ন-ভিন্ন উভয় ভাবেই আদায় করা যায়। যত দ্রুত রাখা যায় ততোই কল্যাণ। তবে দ্রুত আদায় না করলেও কোনো সমস্যা নেই। সে হিসেবে যদি মাসের মাঝখানে অথবা শেষে আদায় করে নেয়া যায় তবুও কোনো অসুবিধা হবে না। 
রমজান ব্যতীত বছরের অন্য নফল রোজা:
রমজানের রোজা ফরজ রোজা। রমজান ব্যতীত অন্য আরো রোজা আছে যেগুলো সুন্নত। আয়েশা রাদিয়াল্বলাহু তাআলা আনহা বলেন, রমজান ব্যতীত অন্য কোন মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে পূর্ণ মাস রোজা পালন করতে দেখিনি। আর শাবান মাস ব্যতীত অন্য মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজা পালন করতে দেখিনি। ( বোখারি) 
এ হাদিস দ্বারা বুঝা যায় যে রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক পরিমাণে নফল রোজা পালন করতেন। তিনি কি কি ধরনের নফল রোজা পালন করতেন তা নিম্নে আলোচনা করা হল:
আরাফা দিবসের রোজা: 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আরাফা দিবসের (জিলহজ মাসের নবম তারিখে) রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন: ‘আরাফা দিবসের রোজা সম্পর্কে আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তা বিগত এক বছর ও আগত এক বছরের পাপের কাফফারা হবে।’ (মুসলিম) তবে যারা হজ পালন অস্থায় থাকরে তারা এ দিন রোজা রাখবে না।
মহররম মাসের রোজা: 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন: ‘রমজান মাসের পর সবোর্ত্তম রোজা হল আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা। আর ফরজ নামাজের পর সবোর্ত্তম নামাজ হল রাতের নামাজ।’ (মুসলিম)
শাবান মাসের রোজা: 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজা পালন করতেন। এর কারণ সম্পর্কে উসামা বিন যায়েদ রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! নফল রোজার ব্যাপারে আমি তো শাবান মাস ব্যতীত অন্য কোন মাসে আপনাকে এত বেশি রোজা পালন করতে দেখি না। তিনি বললেন: ‘শাবান’ রজব ও রমজানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস যাতে মানুষ রোজা সম্পর্কে উদাসীন থাকে।
প্রতি মাসে তিন দিন রোজা রাখা: 
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তিনটি বিষয়ের উপদেশ দিয়েছেন : প্রত্যেক মাসে তিন দিন(‘আইয়ামুল বিজ’- চান্দ্র মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখ।) রোজা রাখা, দ্বি-প্রহরের আগে দু’রাকাত নামাজ আদায় করা ও নিদ্রার আগে বিতিরের নামাজ আদায় করা। (বোখারি)
এ তিনটি রোজা আদায় করলে পূর্ণ বছর নফল রোজা আদায়ের সওয়াব লাভের কথা এসেছে। একটি নেক আমলের সওয়াব কমপক্ষে দশগুণ দেয়া হয়। তিন দিনের রোজার সওয়াব দশগুণ করলে ত্রিশ দিন হয়। যেমন আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে:
প্রত্যেক মাসে তিনটি রোজা ও এক রমজানের পর পরবর্তী রমজানে রোজা পালন পূর্ণ বছর রোজা পালনের সমান। মুসলিম)
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুমা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসাফির ও মুকিম কোন অবস্থাতেই এ রোজা ত্যাগ করতেন না। ( নাসায়ি)
সোমবার ও বৃহস্পতিবারের রোজা: 
সপ্তাহে দু’দিন সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা পালন সুন্নত। হাদিসে এসেছে—আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে সোমবারে সিয়াম পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন এ দিনে আমার জন্ম হয়েছে এবং এ দিনে আমার উপর কোরআন নাজিল শুরু হয়েছে। ( মুসলিম) 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেন , ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। কাজেই আমি পছন্দ করি যখন আমার আমল পেশ করা হবে তখন আমি রোজা অবস্থায় থাকব।’ (মুসলিম ও তিরমিজি)
একদিন পর পর রোজা পালন: 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—‘আল্লাহর কাছে (নফল রোজার মধ্যে) সবচেয়ে প্রিয় রোজা হল দাউদ (আ)-এর রোজা । তিনি একদিন রোজা রাখতেন ও একদিন ভঙ্গ করতেন।’ ( মুসলিম)
আশুরার রোজা: 
আবু কাতাদা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে আশুরার রোজা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হল, তিনি বললেন : ‘তা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা।’ ( মুসলিম, তিরমিজি) 
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : ‘তোমরা আশুরা দিবসে রোজা পালন করো ও এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিরোধিতা করো। তোমরা আশুরার একদিন পূর্বে (নবম ও দশম তারিখে এ পদ্ধতি অতি উত্তম।) অথবা একদিন পরে(দশম ও একাদশ দিবসে) রোজা পালন করবে। (আহমদ) শুধু মহররম মাসের দশম তারিখে রোজা রাখা মাকরূহ। কারণ এটা ইহুদিদের আমলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ

وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه اجمعين.