অধিক সংখ্যক পশু জবাই

Standard

অনেকে অধিক সংখ্যক কুরবানীর পশু জবাই নিয়ে আপত্তি করে থাকে। তারা সম্ভবত মুসলিম শরীফের এই হাদীস শরীফ পড়ে নাই। সকলের এ বিষয়টি জানার  জন্য দলীলটা উল্লেখ করা হলো, 
হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বিদায় হজ্জের সময় ৬৩টি উট নিজ হাত মুবারক-এ জবাই করেছেন, এবং বাকি ৩৭ টা হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু জবাই করেন। । এ প্রসঙ্গে হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন-

ثُـمَّ انْصَرَفَ إِلَى الْمَنْحَرِ فَنَحَرَ ثَلاَثًا وَسِتِّينَ بِيَدِهِ ثُـمَّ أَعْطَى عَلِيًّا فَنَحَرَ مَا غَبَرَ وَأَشْرَكَهُ فِى هَدْيِهِ ثُـمَّ أَمَرَ مِنْ كُلِّ بَدَنَةٍ بِبَضْعَةٍ فَجُعِلَتْ فِى قِدْرٍ فَطُبِخَتْ فَأَكَلاَ مِنْ لَـحْمِهَا وَشَرِبَا مِنْ مَرَقِهَا
অর্থ : ‘অতঃপর  হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কুরবানীর স্থানে এসে নিজ হাতে ৬৩টি উট জবাই করেন আর হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাকে বাকী (৩৭) উটগুলো নহর করার দায়িত্ব দেন এবং উনাকে  কুরবানীর মধ্যে শরীক করে নেন। অতঃপর প্রত্যেকটি উট থেকে এক টুকরা করে গোশত পাতিলে একত্রিত করে রান্না করতে বলেন। অতঃপর উভয়েই উক্ত গোশত থেকে আহার করেন এবং সুরুয়া পান করেন।” (মুসলিম শরীফ ২৮৪০, তিরমিযী শরীফ ৮১৫, আবু দাউদ শরীফ ১৯০৫, ইবনে মাজাহ ৩০৭৪,  মিশকাত ২৫৫৫,  আবী শায়বা ১৪৯২৫, সুনানে দারেমী ১৮৫০, সিরাতুন নাবব্যিয়া ইবনে কাছির ৪/২৯৪, সুবহুল হুদা ওয়ার রাশাদ ১১/৯৫)
এ বিষয়ে আরো বলা হয়েছে,

نَّ عَلِيًّا ـ رضى الله عنه ـ حَدَّثَهُ قَالَ أَهْدَى النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مِائَةَ بَدَنَةٍ، فَأَمَرَنِي بِلُحُومِهَا فَقَسَمْتُهَا، ثُمَّ أَمَرَنِي بِجِلاَلِهَا فَقَسَمْتُهَا، ثُمَّ بِجُلُودِهَا فَقَسَمْتُهَا

হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর একশ’ উট পাঠান এবং আমাকে গোশত সম্বন্ধে নির্দেশ দিলেন। আমি তা বন্টন করে দিলাম। এরপর তিনি তার পিঠের আবরণ সম্বন্ধে আমাকে নির্দেশ দিলেন, আমি তা বন্টন করে দিলাম। তারপর তিনি আমাকে চামড়া সম্বন্ধে নির্দেশ দেন, আমি তা বন্টন করে দিলাম। (বুখারী শরীফ – কিতাবুল হজ্জ ১৬১০)
সূতরাং অধিক সংখ্যক কুরবানী করা , মানুষকে খাওয়ানো, নিজে খাওয়া সবই সুন্নত। আর সুন্নতের বিরোধীতা করা ঈমানহানীর কারন।

Advertisements

নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পক্ষ থেকে কুরবানী করা উম্মতের দায়িত্ব

Standard

নবী করীম ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পক্ষ থেকে কুরবানী করা উম্মতের দায়িত্ব:
হাদীছ শরীফে বর্ণিত হয়েছে-
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا شَرِيكٌ، عَنْ أَبِي الْحَسْنَاءِ، عَنِ الْحَكَمِ، عَنْ حَنَشٍ، قَالَ رَأَيْتُ عَلِيًّا يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ فَقُلْتُ مَا هَذَا فَقَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَوْصَانِي أَنْ أُضَحِّيَ عَنْهُ فَأَنَا أُضَحِّي عَنْهُ .

অর্থ : “হযরত হানাশ রহমতুল্লাহি আলাইহি  থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাকে দুটি দুম্বা কুরবানী করতে দেখলাম এবং জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কি? (দুটি কেন?) পবিত্র জবাবে তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাকে ওছিয়ত মুবারক করে গিয়েছেন যে, আমি যেন উনার পবিত্রতম পক্ষ হতে  কুরবানী করি। সুতরাং আমি উনার পক্ষ থেকে (একটি) কুরবানী করতেছি।” (আবূ দাঊদ শরীফ ২৭৯০, তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ, মিরকাত শরীফ)
উম্মত হিসাবে আমাদেরও দায়িত্ব ও কর্তব্য হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পক্ষ থেকে কুনবানী করা। এর মাধ্যম দিয়ে আমরা লাভ করবো অফুরন্ত নিয়ামত।

কুরবানী বিষয়ক মাসআলা মাসাইল বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন- কুরবানীর মাসআলা

​ছাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের সমালোচনা হারাম:

Standard

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী

(বিএ. অনার্স, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর। এম.এ. এম.ফিল. কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর। পিএইচ.ডি গবেষক,চ.বি.)

সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ. খতীব, মুসাফির খানা জামে মসজিদ, নন্দন কানন, চট্টগ্রাম।

بسم الله الرحمن الرحيم. الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين, أما بعد!

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তা’য়ালার জন্য যিনি রব্বুল আলামীন। দুরুদ ও সালাম রসূলুল্লাহ্ সল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি যিনি রহমাতুল্লিল আলামীন, তাঁর পরিবারবর্গ, সাহাবায়ে কিরাম এবং সালেহীন তথা সৎকর্মপরায়নগণের প্রতি যাঁরা হলেন হেদায়তের পূর্ণশিখা।

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমের প্রতি মুহব্বত রাখা, তাঁদের প্রতি সুধারণা পোষণ করা হচ্ছে ঈমানের অঙ্গ। তাঁদের ইত্তেবা বা অনুসরণ করা -ওয়াজিব। আর তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তাঁদেরকে কষ্ট দেয়া, সমালোচনা করা, নাকিছ বা অপূর্ণ বলা সম্পূর্ণ গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা। এটাই আহ্লে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আক্বীদা বা বিশ্বাস। এর বিপরীত আক্বীদা পোষণ করা বৃহত্তর মুসলিম ঐক্যের বিপরীতে অবস্থান গ্রহনের নামান্তর।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের একটি মূলনীতি হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের ব্যাপারে তাদের অন্তর এবং বাক-যন্ত্র পুত-পবিত্র ও সংযত থাকবে, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর প্রতিও তারা আমল করবে, রাফেযী- খারেজীদের ভ্রষ্ট তরীকা থেকে তারা মুক্ত থাকবে। কিতাব ও সুন্নায় সাহাবায়ে কিরামের যে ফযিলত বর্ণনা করা হয়েছে, আহলে সুন্নাত তা মেনে নেয় এবং বিশ্বাস করে যে, তারাই যুগের সর্বোত্তম প্রজন্ম। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بن مسعود رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ يَجِيءُ أَقْوَامٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِينَهُ، وَيَمِينُهُ شَهَادَتَهُ ( ) 

আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার যুগের লোকেরাই সর্বোত্তম ব্যক্তি, অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী। অতঃপর যারা তাদের নিকটবর্তী এরপরে এমন সব ব্যক্তি আসবে যারা কসম করার আগেই সাক্ষ্য দিবে, আবার সাক্ষ্য দেয়ার আগে কসম করে বসবে। ( )।

আল্লাহ তা‘আলা ছাহাবীদের প্রশংসা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের ওপর তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ কর্তৃক তাঁদের স্তুতি ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাঁদের ভূয়সী প্রশংসাই প্রমাণ করে যে তাঁরা হলেন ন্যায়নিষ্ঠ, তাঁরা ছিলেন ভূ-পৃষ্ঠের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তির শ্রেষ্ঠতম সহচর। সর্বোপরি আপন নবীর সঙ্গী ও তাঁর সহযোগী হিসেবে আল্লাহ যাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন তাঁদের তো আর কোনো ন্যায়নিষ্ঠতা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। এর চেয়ে বড় আর কোনো সনদ হতে পারে না। এর চেয়ে পূর্ণতার আর কোনো দলীল হতে পারে না।( )

তাঁদের যাবতীয় অপ্রকাশ্য বিষয় সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত আল্লাহ কর্তৃক ন্যায়নিষ্ঠতার ঘোষণার পর আর কোনো সৃষ্টি কর্তৃক তাঁদেরকে ন্যায়নিষ্ঠ ঘোষণার প্রয়োজন নেই। আর তাঁদের মর্যাদা এমনই প্রশ্নাতীত যে তাঁদের মর্তবা সম্পর্কে যদি আয়াতগুলো নাযিল না করতেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপরোল্লিখিত হাদীসগুলো উচ্চারণ না করতেন, তথাপি তাঁদের হিজরত, জিহাদ, নুছরত, পদ ও প্রতিপত্তি ত্যাগ, পিতা ও পুত্রের বিরুদ্ধে লড়াই, দ্বীনের জন্য অবর্ণনীয় কল্যাণকামিতা এবং ঈমান ও ইয়াকিনের দৃঢ়তা তাঁদের ন্যায়নিষ্ঠতা থেকে বিচ্যুত হওয়া ঠেকাত, তাঁদের পবিত্রতা ও মহানুভবতার পক্ষে সাক্ষী হত। মোদ্দাকথা তাঁরা তো সকল সত্যায়নকারী ও সাফাইকারীর চেয়েই শ্রেষ্ঠ যারা তাঁদের পর এসেছে। এটাই উল্লেখযোগ্য আলেম এবং ফিকহবিদের মত। ( )

হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর একটি উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, 

عبد الله بن مسعود رضي الله عنه : ” مَن كانَ مُسْتَنًّا ، فَلْيَسْتَنَّ بمن قد ماتَ ، فإنَّ الحيَّ لا تُؤمَنُ عليه الفِتْنَةُ ، أولئك أصحابُ محمد صلى الله عليه وسلم، كانوا أفضلَ هذه الأمة : أبرَّها قلوبًا، وأعمقَها علمًا، وأقلَّها تكلُّفًا، اختارهم الله لصحبة نبيِّه ، ولإقامة دِينه ، فاعرِفوا لهم فضلَهم، واتبعُوهم على أثرهم، وتمسَّكوا بما استَطَعْتُم من أخلاقِهم وسيَرِهم ، فإنهم كانوا على الهُدَى المستقيم “. 

“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অনুসরণ করতে চায় তবে সে যেন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছাহাবীগণেরই অনুসরণ করে। কারণ, তাঁরাই ছিলেন এ উম্মতের মধ্যে আত্মার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নেককার, ইলমের দিক থেকে গভীরতর, লৌকিকতার দিক থেকে সল্পতম, আদর্শের দিক থেকে সঠিকতম, অবস্থার দিক থেকে শুদ্ধতম। তাঁরা এমন সম্প্রদায় আল্লাহ যাদেরকে আপন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংস্পর্শধন্য হবার জন্য এবং তাঁর দ্বীন কায়েমের উদ্দেশ্যে বাছাই করে নিয়েছেন। অতএব তোমরা তাঁদের মর্যাদা অনুধাবন করো এবং তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো। কারণ, তাঁরা ছিলেন সীরাতে মুস্তাকীমের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ( )

‘তাঁরা ইলম, ইজতিহাদ, তাকওয়া ও জ্ঞান-বুদ্ধিতে আমাদের ওপরে। তাঁরা আমাদের চেয়ে উত্তম এমন বিষয়ে যে ব্যাপারে ইলম জানা গেছে কিংবা যা ইস্তিমবাত বা উদ্ভাবন করা হয়েছে। তাঁদের রায়গুলো আমাদের কাছে প্রশংসনীয়। আমাদের নিজেদের ব্যাপারেই আমাদের সিদ্ধান্তের চেয়ে তাঁরাই অগ্রাধিকার পাবার হকদার।’ ( )

আর এ সকল ফযীলতের কারনে ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম সম্পর্কে বিখ্যাত ফক্বীহ ছাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের সমালোচনা করা, বিদ্বেষ করা কুফরী: আল্লাহ পাক কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ করেন: إِنَّ الَّذِينَ يُؤْذُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِينًا “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ পাক ও তার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কষ্ট দেয়, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের প্রতি আল্লাহ পাকের অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” [ সূরা আহযাব ৫৭ ]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন: 

حَدَّثَنَا آدَمُ بْنُ أَبِيْ إِيَاسٍ حَدَّثَنَا شُعْبَةُ عَنْ الأَعْمَشِ قَالَ سَمِعْتُ ذَكْوَانَ يُحَدِّثُ عَنْ أَبِيْ سَعِيْدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: لَا تَسُبُّوْا أَصْحَابِيْ فَلَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيْفَهُ. 

“তোমরা আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমকে গালি দিও না। কেননা যদি তোমাদের কেউ উহুদ পাহাড় পরিমান স্বর্ণ আল্লাহ পাকের রাস্তায় দান করে, তবুও ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের এক মুদ (১৪ ছটাক) বা অর্ধ মদ (৭ ছটাক) সমপরিমান গম দান করার ফযীলতের সমপরিমান ফযীলতও অর্জন করতে পারবে না।” ( )

সমগ্র দুনিয়ার সকল মানুষের নেক আমল এক করলেও ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের কয়েক মুহূর্তের আমলের সমান হবে না। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন , لا تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ فَلَمَقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةً خَيْرٌ مِنْ عَمَلِ أَحَدِكُمْ عُمْرَهُ ‘তোমরা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছাহাবীদের গালাগাল করো না। কেননা তাঁদের এক মুহূর্তের (ইবাদতের) মর্যাদা তোমাদের প্রত্যেকের জীবনের আমলের চেয়ে শ্রেষ্ট।’ ( )

এ ব্যাপারে ইবন হাযম রাহিমাহুল্লাহর একটি মূল্যবান বাক্য রয়েছে, তিনি বলেন, ‘আমাদের কাউকে যদি যুগ-যুগান্তর ব্যাপ্ত সুদীর্ঘ হায়াত প্রদান করা হয় আর সে তাতে অব্যাহতভাবে ইবাদত করে যায়, তবুও তা ওই ব্যক্তির সমকক্ষ হতে পারবে না যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক সেকেন্ড বা তার চেয়ে বেশি সময়ের জন্য দেখেছেন।’ ( )

ইবন মুগাফফাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مُغَفَّلٍ الْمُزَنِيِّ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” اللَّهَ اللَّهَ فِي أَصْحَابِي، اللَّهَ اللَّهَ فِي أَصْحَابِي، لَا تَتَّخِذُوهُمْ غَرَضًا بَعْدِي، فَمَنْ أَحَبَّهُمْ فَبِحُبِّي أَحَبَّهُمْ، وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ، فَبِبُغْضِي أَبْغَضَهُمْ، وَمَنْ آذَاهُمْ فَقَدْ آذَانِي، وَمَنْ آذَانِي فَقَدْ آذَى اللَّهَ، وَمَنْ آذَى اللَّهَ فَيُوشِكُ أَنْ يَأْخُذَهُ ” ( ) 

‘আমার ছাহাবীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আল্লাহকে ভয় কর। আমার পরবর্তীকালে তোমরা তাঁদের সমালোচনার নিশানায় পরিণত করো না। কারণ, যে তাদের ভালোবাসবে সে আমার মুহাব্বতেই তাদের ভালোবাসবে। আর যে তাঁদের অপছন্দ করবে সে আমাকে অপছন্দ করার ফলেই তাঁদের অপছন্দ করবে। আর যে তাঁদের কষ্ট দেবে সে আমাকেই কষ্ট দেবে। আর যে আমাকে কষ্ট দেবে সে যেন আল্লাহকেই কষ্ট দিল। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দেবে অচিরেই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।’ ( )

সূতরাং উক্ত দলীল থেকে বোঝা গেল, যারা হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমদের প্রতি বিন্দু মাত্র সমালোচনা করবে, উনাদের বিরুদ্ধে স্বজন প্রীতির অপবাদ দিবে, তারা নিশ্চিত কাফির হয়ে জাহান্নামে যাবে। আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেন: لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ “একমাত্র কাফিররাই তাঁদের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করে। (সূরা ফাতাহ ২৯ )

এ আয়াত শরীফের ব্যাখ্যায় হাদীস শরীফে বর্নিত আছে:

قال الإمامُ مالك ـ رحمه الله ـ: ্রمن أصبحَ في قلبِه غَيْظٌ عَلى أحَدٍ مِن أصْحَابِ رَسُولِ الله – صلى الله عليه وسلم – فقد أصَابَتْه الآية ( )

ইমাম মালেক বলেন, যে ব্যক্তি হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করবে, সে এ আয়াতের হুকুমের আওতায় পড়বে।”( ) হাদীস শরীফে বর্নিত আছে:

أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ -رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ- عَنْ النَّبِيِّ -صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- قَالَ: آيَةُ الْإِيمَانِ حُبُّ الْأَنْصَارِ، وَآيَةُ النِّفَاقِ بُغْضُ الْأَنْصَارِ( )

“হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমের প্রতি বিশেষ করে আনসারগনের প্রতি মুহব্বত ঈমান, আর উনাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করা নিফাক তথা কুফরী।”( ) 

ইমাম আবূ যুর‘আ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, 

قال الإمام أبو زرعة العراقي أحد مشايخ مسلم: ( ):إذا رأيت الرَّجلَ يَنْتَقِصُ أحدًا منْ أصحابِ رسولِ الله -صلى الله عليه وسلَّم- فاعْلَمْ أنَّه زِنْدِيقٌ؛ وذلك أنَّ الرَّسولَ -صلى الله عليه وسلَّم- عندنا حقٌّ، والقرآنُ حقٌّ، وإنَّما أدَّى إلينا هذا القرآنَ والسُّنَنَ أصحابُ رسولِ الله -صلى الله عليه وسلَّم-، وإنَّما يريدون أن يُجَرِّحُوا شهودَنا لِيُبْطِلُوا الكتابَ والسُّنَّةَ، والجَرْحُ بهم أَوْلَى، وهم زَنادِقَة. ( )

‘যখন তুমি কোনো ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছাহাবীগণের কোনো একজনের মর্যাদাহানী করতে দেখবে তখন বুঝে নেবে যে সে একজন ধর্মদ্রোহী নাস্তিক। আর তা এ কারণে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে সত্য, কুরআন সত্য। আর এ কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছাহাবায়ে কিরাম। নিশ্চয় তারা চায় আমাদের প্রমাণগুলোয় আঘাত করতে। যাতে তারা কিতাব ও সন্নাহকে বাতিল করতে পারে। এরা হলো ধর্মদ্রোহী- নাস্তিক। এদেরকে আঘাত করাই শ্রেয়।’ ( )

হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার বিছাল শরীফের পর একটা মুরতাদ দল বের হবে যারা কিনা ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু উনাদের প্রতি বিদ্বেষ করবে। এদের সম্পর্কে হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্বেই সতর্ক করে ভবিষ্যতবানী করেছেন: 

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِنَّ اللَّهَ اخْتَارَنِي، وَاخْتَارَ أَصْحَابِي، وَإِنَّهُ سَيَجِيءُ قَوْمٌ يَنْتَقِصُونَهُمْ، وَيُعِيبُونَهُمْ، وَيَسُبُّونَهُمْ، فَلا تُجَالِسُوهُمْ، وَلا تُؤَاكِلُوهُمْ، وَلا تُشَارِبُوهُمْ، وَلا تُصَلُّوا مَعَهُمْ، وَلا تُصَلُّوا عَلَيْهِمْ “. ( )

“অতি শীঘ্রই একটি দল বের হবে, যারা আমার ছাহাবী রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগনকে গালি দিবে, উনাদের নাকিছ বা অপূর্ন বলবে। সাবধান ! সাবধান ! তোমরা তাদের মজলিসে বসবে না, তাদের সাথে পানাহার করবে না, তাদের সাথে বিয়ে-শাদীর ব্যবস্থা করবে না। অন্য রেওয়াতে আছে, তাদের পেছনে নামাজ পড়বে না এবং তাদের জন্য দোয়া করবে না।”( )

আরো ইরশাদ হয়েছে: 

عَنْ نَافِعٍ ، عَنِ ابْنِ عُمَرَ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” إِذَا رَأَيْتُمُ الَّذِينَ يَسُبُّونَ أَصْحَابِي فَقُولُوا: لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى شَرِّكُمْ ” ( )

“যখন তোমরা কাউকে আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগনকে গালি দিতে দেখবে, তখন তোমরা বলো, এ নিকৃষ্ট কাজের জন্য তোমাদের প্রতি আল্লাহ পাকের লা’নত বর্ষিত হোক।”( )

হযরত আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” مَنْ سَبَّ أَصْحَابِي فَعَلَيْهِ لَعْنَةُ اللَّهِ، وَالْمَلائِكَةِ، وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ، لا يَقْبَلُ اللَّهُ مِنْهُ صَرْفًا وَلا عَدْلا ” ، قَالَ : الْعَدْلُ: الْفَرَائِضُ , وَالصَّرْفُ: التَّطَوُّعُ . ( )

‘যে ব্যক্তি আমার ছাহাবীকে গাল দেবে তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা সকল মানুষের অভিশাপ। আল্লাহ তার নফল বা ফরয কিছুই কবুল করবেন না।’( )

হযরত আতা ইবন আবী রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে আমার ছাহাবীদের ব্যাপারে আমাকে সুরক্ষা দেবে কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য সুরক্ষাকারী হব। আর ‘যে আমার ছাহাবীকে গাল দেবে তার ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ ( )

বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থ “শিফা”তে বর্নিত আছে: إِذَا ذُكِرَ أَصْحَابِي فَأَمْسِكُوا ،( )“আমার ছাহাবীদের আলোচনাকালে তোমরা সংযত থেকো।” ( )

মহান আল্লাহ ঈমানদারগণকে ছাহাবায়ে কেরাম -এর জন্য দো‘আ প্রার্থনার আদেশ করেছেন এবং সত্যিকার মুমিনগণ তা বাস্তবায়নও করেছেন। কিন্তু কতিপয় লোক কুরআন ও হাদীছ নির্দেশিত এই পথ প্রত্যাখ্যান করে চরম ধৃষ্টতার পরিচয় দিয়েছে। ক্ষমা প্রার্থনার পরিবর্তে তারা তাঁদেরকে দিয়েছে গালি এবং প্রশংসার পরিবর্তে করেছে নিন্দা।

আমাদের আলোচনার এটিই শেষ বিষয়। ছাহাবীগণের মধ্যে যেসব মতানৈক্য হয়েছে, তদ্বিষয়ে আমাদের করণীয় কি? সালাফে ছালেহীনের এক ব্যক্তিকে যখন এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তখন তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, আল্লাহ তা থেকে আমাদের তরবারীকে মুক্ত রেখেছেন। অতএব, আমরা তা থেকে আমাদের যবানকেও মুক্ত রাখব’।( )

আরেকজনকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হ’লে তিনি নিম্নোক্ত আয়াত তেলাওয়াত করেন, تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ ۖ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُم مَّا كَسَبْتُمْ ۖ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ ‘তারা ছিল এক সম্প্রদায়, যারা গত হয়ে গেছে। তারা যা করেছে, তা তাদেরই জন্য। তারা কি করত, সে সম্পর্কে তোমরা জিজ্ঞাসিত হবে না’ ( )

ছাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আমাদের অন্তঃকরণকে নিষ্কলুষ রাখতে হবে। তাঁদের প্রতি হৃদয়ে কোন হিংসা-বিদ্বেষ বা ঘৃণা থাকবে না; থাকবে না কোন প্রকার শত্রুতা। বরং হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান পাবে শুধু ভালবাসা, অনুগ্রহ আর সহানুভূতি।

وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. والحمد لله رب العالمين

ইমাম আযম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি

Standard

*******************************************

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী

খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

بسم الله الرحمن الرحيم. الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين. أما بعد!
অধঃপতনের যুগে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা নিয়ে যে সকল মনীষী পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, পার্থিব লোভ-লালসা ও ক্ষমতার মোহ যাদের ন্যায় ও সত্যের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র পদঙ্খলন ঘটাতে পারেনি; যারা অন্যায় ও অসত্যের নিকট কোনো দিন মাথা নত করেননি, ইসলাম ও মানুষের কল্যাণে সারাটা জীবন যারা পরিশ্রম করে গিয়েছেন, সত্যকে আঁকড়ে থাকার কারণে যারা যালেম সরকার কর্তৃক অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত; এমনকি কারাগারে নির্মমভাবে প্রহৃত হয়েছেন, ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের অন্যতম।
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির জন্ম ও শিক্ষা:
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ৮০ হিজরি মোতাবেক ৭০২ খ্রিষ্টাব্দে কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম হলো নু’মান। পিতার নাম ছাবিত এবং পিতামহের নাম জওতা। তাঁর বাল্যকালের ডাক নাম ছিল আবু হানিফা। তিনি ইমাম আযম নামেও সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর পূর্বপুরুশগণ ইরানের অধিবাসী ছিলেন। পিতামহ জওতা জন্মভূমি পরিত্যাগ করে তৎকালীন আরবের সমৃদ্ধিশালী নগর কুফায় এসে বাসস্থান নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ১৪-১৫ বছর বয়সে একদিন যখন বাজারে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে তৎকালীন বিখ্যাত ইমাম হযরত শা’বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হে বালক, তুমি কি কোথাও লেখাপড়া শিখতে যাচ্ছ? উত্তরে তিনি অতি দুঃখিত স্বরে বললেন, ‘আমি কোথাও লেখাপড়া শিখি না।’ ইমাম শা’বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, ‘আমি যেন তোমার মধ্যে প্রতিভার চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। ভালো আলেমের নিকট তোমার লেখাপড়া শেখা উচিত।’
ইমাম শা’বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির উপদেশ ও অনুপ্রেরণায় ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ইমাম হামদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আতা ইবনে রবিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম জাফর সাদিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মতো তৎকালীন বিখ্যাত আলেমগণের নিকট শিক্ষা লাভ করেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কোরআন, হাদিস, ফিকাহ, ইলমে কালাম, আদব প্রভৃতি বিষয়ে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। জ্ঞান লাভের জন্য তিনি মক্কা, মদিনা, বসরা এবং কুফার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত আলেমগণের নিকট পাগলের ন্যায় ছুটে গিয়েছিলেন।
বিভিন্ন স্থান থেকে হাদিসের অমূল্য রত্ন সংগ্রহ করে স্বীয় জ্ঞানভান্ডার পূর্ণ করেন। উল্লেখ্য যে, তিনি চার সহস্রাধিক আলেমের নিকট শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি বলেন, ইমাম শা’বীর সেই আন্তরিকতাপূর্ণ উপদেশবাণীগুলো আমার অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করল এবং এরপর থেকেই আমি বিপনীকেন্দ্রগুলোতে আসা-যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা কেন্দ্রেও যাতায়াত শুরু করলাম। (মুয়াফেক, আবু যাহরা)
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন তাবেয়ী:
কারো কারো মতে, ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাবেয়ী ছিলেন। সাহাবাগণের যুগ তখন প্রায় শেষ হলেও কয়েকজন সাহাবি জীবিত ছিলেন। ১০২ হিজরিতে তিনি যখন মদিনা গমন করেন তখন মদিনায় দুজন সাহাবি হযরত সোলাইমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত সালেম ইবনে সুলাইমান রাদিয়াল্লাহু আনহু জীবিত ছিলেন এবং ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের দর্শন লাভ করেন। তবে তাবেতাবেয়ী হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই।
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির শিক্ষকগণ প্রায় সবাই ছিলেন তাবেয়ী। ফলে হাদিস সংগ্রহের ব্যাপারে তাঁদের মাত্র একটি মধ্যস্থতা অবলম্বন করতে হতো। তাই তাঁর সংগৃহীত হাদিসসমূহ সম্পূর্ণ ছহীহ বলে প্রমাণিত হয়েছে। সাহাবী আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাত হওয়ার কারনে তিনি একজন তাবেঈ। ইমাম আবু হানীফা অন্যুন আটজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন। তাঁরা হচ্ছেন- ১) হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৯৩ হিজরী) ২) আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৮৭ হিজরী) ৩) সহল ইবনে সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৮৮ হিজরী) ৪) আবু তোফায়ল রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ১১০ হিজরী) ৫) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়দী রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৯৯ হিজরী) ৬) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৯৪ হিজরী) ৭) ওয়াসেনা ইবনুল আসকা রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৮৫ হিজরী) হাদিস শাস্ত্রের
‘আমিরুল মুমেনীন’ রূপে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক স্বরচিত কবিতার এক পংক্তিতে উল্লেখ করেছেন যে, নোমান (আবু হানীফা ) এর পক্ষে গর্ব করার মতো এতটুকুই যথেষ্ট যা তিনি সরাসরি সাহাবীগণের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন।
শিক্ষাদান পদ্ধতিঃ
ইমাম হাম্মাদের যখন ইন্তেকাল হয়, তখন আবু হানীফার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। এ সময় তিনি উস্তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর শিক্ষাকেন্দ্রের পূর্ণদায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম যখন শিক্ষা দান শুরু করেন, তখন শুধুমাত্র ইমাম হাম্মাদের সাগরেদগণই তাতে শরীক হতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাতে কূফার সর্বস্তরের মানুষ, বিশিষ্ট জ্ঞানীগুনী, এমনকি ইমাম সাহেবের উস্তাদগণেরও কেউ কেউ এসে শরীক হতেন। বিখ্যাত তাবেয়ী মাসআব ইবনে কোদাম, ইমাম আমাশ প্রমুখ নিজে আসতেন এবং অন্যদেরকেও দরসে যোগ দিতে উৎসাহিত করতেন।
একমাত্র স্পেন ব্যতীত তখনকার মুসলিম-বিশ্বের এমন কোন অঞ্চল ছিল না, যেখানকার শিক্ষার্থীগণ ইমাম আবু হানীফার দরসে সমবেত হননি। মক্কা-মদীনা, দামেস্ক, ওয়াসেত, মুসেল, জায়িরা, নসীবাইন, রামলা, মিসর, ফিলিস্তিন, ইয়ামান, ইয়ানামা, আহওয়ায, উস্তুর আবাদ, জুরজান, নিশাপুর, সমরকন্দ, বুখারা, কাবুল-হেমস প্রভৃতিসহ বিখ্যাত এমন কোন জনপদ ছিল না যেখান থেকে শিক্ষার্থীগণ এসে ইমাম আবু হানীফার নিকট শিক্ষা লাভ করেননি।
মুসলিম-বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানপিপাসা মিটানোর লক্ষ্যে সমবেত শিক্ষার্থীগণের বিচারেও ইমাম আবু হানীফা ছিলেন তাবেয়ীগণের মধ্যে কুরআন-হাদীস এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী এবং তাকওয়া পরহেজগারীতে অনন্য ব্যক্তিত্ব। ইমাম সাহেবের অনুপম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বদৌলতে সে যুগে এমন কিছু সংখ্যক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, যাঁরা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আকাশে এক একজন জ্যোতিষ্ক হয়ে রয়েছেন। ইমাম সাহেবের সরাসরি সাগরেদগণের মধ্যে ২৮ ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে কাজী (বিচারক) এবং শতাধিক ব্যক্তি মুফতীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসালামের ইতিহাসে এক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এত বিপুল সংখ্যক প্রাজ্ঞা ব্যক্তির আবির্ভাব আর কোথাও দেখা যায় না।
প্রথম আব্বাসী খলীফা আবুল আব্বাস সাফফাহর পূর্ণ শাসন আমল (১৩২-১৩৬ হি:) চারবছর নয় মাস কাল ইমাম আবু হানীফা মক্কা শরীফে স্বেচ্ছা নির্বাসনে কাটান। কারণ, বনী-উমাইয়ার শাসন কর্তৃত্বের পতন ঘটানোর আন্দোলনে ইমাম আবু হানীফার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ইমাম সাহেব উমাইয়্যা বংশের পতনের পর আব্বাসিয়দের শাসন-ব্যবস্থা চাইতেন না। তাঁর মতানুসারী সে যুগের ওলামা-মাশায়েখগণ খোলাফায়ে-রাশেদীনের শাসন-ব্যস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাইতেন। কিন্তু আব্বাসীয়দের প্রথম শাসক আবু আব্বাস অকল্পনীয় নির্মমতার আশ্রয় গ্রহণ করে ওলামা-মাশায়েখগণ এবং ধর্মপ্রাণ জনগনের সে আকাঙ্খা নস্যাত করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে ইমাম সাহেবের পক্ষে কূফায় অবস্থান মোটেও নিরাপদ ছিল না।

শুভাকাঙ্খীদের পরামর্শে ইমাম সাহেব তখন মক্কা শরীফ চলে যান এবং আবুল আব্বাসের মৃত্যুকালে (যিলহজ্জ ১৩৬) পর্যন্ত মক্কাশরীফেই অবস্থান করেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মক্কার পবিত্র মসজিদে ইমাম আবু হানীফা নিয়মিত দরছ দিতেন। হাফেয যাহাবীর বর্ণনা অনুযায়ী তখনকার দিনে ইমাম সাহেবের দরছে যেমন হাদিসের ছাত্রগণ দলে দলে যোগ দিতেন, অনুরূপ বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলেমগণও বিপুল সংখ্যায় সমবেত হতেন।
তাফসির ও হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ অভিজ্ঞতা ও পা-িত্য:
তাফসির ও হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ অভিজ্ঞতা ও পা-িত্য থাকা সত্ত্বেও ফিকাহশাস্ত্রেই তিনি সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করেছেন। তিনি কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে বিবিধ বিষয়ে ইসলামি আইনগুলোকে ব্যাপক ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করেছেন। বর্তমান বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুসলমান হানাফি মাযহাবের অনুসারী। ফিকাহশাস্ত্রে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও অবদানের জন্যই মুসলিম জাতি সত্যের সন্ধান অনায়াসে লাভ করতে পেরেছে। তিনি তাঁর শিক্ষকতা জীবনে পৃথিবীতে হাজার হাজার মুফাচ্ছির, মুহাদ্দিস ও ফকীহ তৈরি করে গিয়েছেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে যারা ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে ইমাম মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম যুফার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি অন্যতম।
ফাতাওয়ার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার অনুসৃত নীতিঃ
যে কোন সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার অনুসৃত নীতি ছিল, প্রথমে কুরআনের শরণাপন্ন হওয়া। কুরআনের পর হাদিস শরীফের আশ্রয় গ্রহণ করা। হাদিসের পর সাহাবায়ে কেরাম গৃহীত নীতির উপর গুরুত্ব দেওয়া। উপরোক্ত তিনটি উৎসের মধ্যে সরাসরি সামাধান পাওয়া না গেলে তিনটি উৎসের আলোকে বিচার-বুদ্ধির (কেয়াসের) প্রয়োগ করতেন। তাঁর সুস্পস্ট বক্তব্য ছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কোন ধরনের হাদিস বা সাহাবীগণের অভিমতের সাথে যদি আমার কোন বক্তব্যকে সাংঘর্ষিক মনে হয়, তবে আমার বক্তব্য অবশ্য পরিত্যাজ্য হবে। হাদিস এবং আছারে সাহাবা দ্বারা যা প্রমাণিত সেটাই আমার মাযহাব। (তাফসীরে মাযহারী, খায়রাতুল-হেসান)
ইবনে হাযম বলেন, আবু হানীফার সকল ছাত্রই এ ব্যাপারে একমত যে, নিতান্ত দূর্বল সনদযুক্ত একখানা হাদিসও তাঁর নিকট কেয়াসের তুলনায় অনেক বেশী মুল্যবান দলিলরূপে বিবেচিত হতো। (খায়রাতুল-হেসান) সম্ভবতঃ এ কারণেই পরবর্তী যুগে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে সব কালজয়ী প্রতিভার জন্ম হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশ ইমাম আবু হানীফার মাযহাব অনুসরণ করেছেন। হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানীর বক্তব্য হচ্ছে- এই ফকীরের উপর প্রকাশিত হয়েছে যে, এলমে-কালামের বিতর্কিত বিষয়গুলি মধ্যে হক হানাফী মাযহাবের দিকে এবং ফেকাহর বিতর্কিত মাসআলাগুলির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হক হানাফী মাযহাবের দিকে এবং খুব কম সংখ্যক মাসআলাই সন্দেহযুক্ত। (মাবদা ও মাআদ)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী হারামাইন শরীফাইনে অবস্থানকালে কাশফযোগে যে সব তথ্য অবগত হয়েছেন, সে সবের আলোকে লিখেছেন- হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে অবগত করেছেন যে, হানাফী মাযহাব একটি সর্বোত্তম তরিকা। ইমাম বুখারীর সময়ে যেসব হাদিস সংকলিত হয়েছে, সেগুলোর তুলনায় আবু হানীফার সিদ্ধান্তগুলি সুন্নতে-নববীর সাথে অনেক বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ। (ফুযুলুল-হারামাইন)
ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন, ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কেবল কারাগারে বসেই ১২ লাখ ৯০ হাজারের অধিক মাসআলা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সুতরাং যারা এ কথা বলতে চায় যে, হানাফী মাযহাব সহীহ হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বা ইমাম আবু হানীফা বহু ক্ষেত্রে হাদিসের প্রতিকূলে অবস্থান গ্রহণ করেছেন, তাদের বক্তব্য যে নিতান্তই উদ্ভট তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বরং হানাফী মাযহাব হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর এমন এক যুক্তিগ্রাহ্য ও সুবিন্যস্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যা সর্বযুগের মানুষের নিকট সমভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।
ইমাম সাহেবর তীক্ষ বুদ্ধি, ধী-শক্তি ও গভীর জ্ঞান:
ইমাম সাহেব যেমন তীক্ষ বুদ্ধি অধিকারী ও ধী- শক্তি সম্পন্ন ছিলেন তেমনি ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী। নিম্নোক্ত কয়েকটি ঘটনা দ্বারা তা অনুমান করা সম্ভব হবে: ‘একদিন ইমাম আবু হানীফা কিরাত ও হাদীস বর্ননায় প্রসিদ্ধ তাবিয়ী হযরত আমাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় কোন একটি মাসআলা সম্পর্কে ইমাম সাহেবের মতামত জিজ্ঞেস করা হল। জবাবে তিনি তার মতাতমত জানালেন। হযরত আমাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি জিজ্ঞেস করলেন- এ দলীল তুমি কোথায় পেয়েছ? জবাবে ইমাম সাহেব বললেন, আপনিই তো আমাদেরকে এ হাদীস শুনিয়েছেন,।

এভাবে ইমাম সাহেব তারই বর্নণাকৃত আরও চারটি হাদীস শুনালেন। ইমাম আমাশ বললেন- যথেষ্ট হয়েছে, আর শুনাতে হবে না। আমি তোমাকে একশত দিনে যা শুনিয়েছি তুমি এক ঘন্টায় তা শুনিয়ে দিলে। আমার ধারনাও ছিল না যে তুমি এ হাদীসগুলোর উপর আমাল করে থাক। “সত্যিই তোমরা ফকীহরা হলে ডাক্তারতুল্য, আর আমরা হলাম ঔষধের দোকানদার।“ আর তুমি তো উভয় দিকই হাসীল করেছ (আল জাওয়াহের আল মুদিয়াহ, খ- ২, পৃ- ৪৮৪)।

‘ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর শাগরিদদেরকে যারা পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হাফিযে হাদীস ফাযল ইবনি মূসা আস সিনানীকে জিজ্ঞাসা করা হল- ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে যারা অপবাদ গেয়ে বেড়ায় তাদের সম্পর্কে আপনার কী ধারণা? তিনি বললেন- আসল ব্যাপার হল ইামাম আবু হানীফা তাদের সামনে এমন তত্ত্ব ও তথ্য পেশ করেছেন যার সবটা তারা বুঝতে সক্ষম হয়নি। আর তিনি তাদের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখেননি। ফলে তারা ইমাম সাহেবের সাথে হিংসা আরম্ভ করেছেন’। ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ননা করেন-‘হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম আবু হানীফার চেয়ে অধিক জ্ঞানী আমার দৃষ্টিতে পড়েনি। সহীহ হাদীস সম্পর্কে তিনি আমার চেয়ে অধিক দুরদর্শী ছিলেন’।
ইমাম আবু হানীফা কুফা শহরের উলামাদের সংগৃহীত সকল ইলম সংগ্রহ করেছিলেন। যেমন- ইমাম বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির জনৈক উ¯তাদ ইয়াহইয়া ইবনি আদাম তাঁর সহীহ গ্রন্থে বলেন- ‘ইমাম আবু হানীফা নিজ শহরের সকল হাদীস সংগ্রহ করেছেন এবং তার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ জীবনের হাদীসগুলোর প্রতি তার লক্ষ্য ছিল (অর্থাৎ বিভিন্নমুখী হাদীসগুলোর মধ্যে সর্বশেষ হাদীস কোনটি ছিল)। যার দ্বারা অন্যান্যগুলো রহিত সাব্য¯ত করা সহজ হয়।

মোটকথা ইমাম আবু হানীফা কুফা শহরের উলামাদের হাসিলকৃত সকল ইলম সংগ্রহ করেছিলেন। এখানেই তিনি ক্ষন্ত হননি বরং তিনি কুফা শহর থেকে সফর করে দীর্ঘ ছয়টি বছর মক্কা- মাদীনা অবস্থান করে সেখানকার সকল শাইখদের নিকট থেকে ইলম হাসিল করেন। আর মক্কা- মাদীনা যেহেতু স্থানীয়, বহিরাগত সকল উলামা, মাশায়েখ, মুহাদ্দিস ও ফকীহদের কেন্দ্রস্থল ছিল, কাজেই এক কথায় বলা চলে যে- মক্কা- মাদীনা ছিল ইলমের মারকায। আর তার মত অসাধারণ ধী- শক্তি সম্পন্ন, কর্মঠ ও মুজতাহিদ ইমামের জন্য দীর্ঘ ছয় বছর যাবত মক্কা- মাদীনার ইলম হাসিল করা নি:সন্দেহে সাধারণ ব্যাপার নয়।
এছাড়া তিনি ৫৫ বার পবিত্র হাজ্বব্রত পালন করেছেন বলে প্রমান পাওয়া যায় (উকূদুল জামান, পৃ- ২২০)। প্রত্যেক সফরেই তিনি মক্কা- মাদীনার স্থানীয় ও বহিরাগত উলামা, মাশায়েখ ও মুহাদ্দিসিনের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। তিনি চার হাজার শাইখ থেকে হাদীস সংগ্রহ করেছেন বলে বিভিন্ন লেখক মšতব্য করেছেন (আস সুন্নাহ, পৃ- ৪১৩, উকূদুল জামান, পৃ- ৬৩, খইরতুল হিসান, পৃ- ২৩।) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনি ইউসূফ আস সালেহী ‘উকূদুল জামান গ্রন্থে দীর্ঘ ২৪ পৃষ্ঠায় ইমাম সাহেবের মাশায়েখদের একটা ফিরি¯ত পেশ করেছেন, উকূদুল জামান, পৃ- ৬৩- ৮৭)।
আল্লামা আলী আল কারী, মুহাম্মাদ ইবনি সামায়াহ’র বরাত দিয়ে বলেছেন, ‘আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোতে সত্তর হাজারের উর্দ্ধে হাদীস বর্ননা করেছেন। আর ‘আল আছার’ গ্রন্থটি চল্লিশ হাজার হাদীস থেকে বাছাই করে লিখেছেন’ (আল জাওয়াহিরুল মযিয়াহ, খ- ২, পৃ- ৪৭৩)। ইয়াহইয়া ইবনি নাসর বলেন- ‘একদিন আমি ইমাম আবু হানীফার ঘরে প্রবেশ করি যা কিতাবে ভরপুর ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম এগুলো কী? তিনি বললেন- এগুলো সব হাদীসের কিতাব, এর মধ্যে সামান্য কিছুই আমি বর্ননা করেছি যেগুলো ফলপ্রদ’ (আস সুন্নাহ, পৃ- ৪১৩, উকূদু জাওয়াহিরিল মুনীফাহ, ১, ৩১)।
ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির যদিও অন্যান্য মুহাদ্দীসদের মত হাদীস শিক্ষা দেয়ার জন্য কোন মাজলীস ছিল না, যেমন ইমাম মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি করেছেন (মুআত্তা মালিক)। কিন্তু তাঁর শাগরিদগণ তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলো সংগ্রহ করে বিভিন্ন কিতাব ও মুসনাদ সংকলন করেছেন যার সংখ্যা দশের উর্দ্ধে। তার মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলো হল- ইমাম আবু ইউসুফ রচিত ‘কিতাবুল আসার’, ইমাম মুহাম্মাদ রচিত ‘কিতাবুল আসার আল মারফুআহ’ ও ‘আল আসারুল মারফুআহ ওয়াল মাওকুফাহ’, মুসনাদুল হাসান ইবনি যিয়াদ আল লু-লুঈ, মুসনাদে হাম্মাদ ইবনি আবু হানীফা ইত্যাদি।
ইমাম বোখারীর অন্যতম উস্তাদ মক্কী বিন ইব্রাহীম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃতু- ২১৫ হিঃ) যাঁর সনদে ইমাম বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি অধিকাংশ ‘সুলাসিয়্যাত হাদীস’ বর্ণনা করেছেন। এই মক্কী বিন ইব্রাহীম ইমাম আবু হানীফার ছাত্র। তিনি ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে বলেন, “আবু হানীফা তাঁর সময়কালের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন” (মানাক্বেবে ইমাম আযম রহ. ১/৯৫)
আবার হাফিয মযযী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: মক্কী বিন ইব্রাহীম ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে বলেন, “তিনি তাঁর কালের সবচেয়ে বড় আলিম ছিলেন” (তাহ্যীবুত তাহযীব-এর টিকা- ১০ম খন্ড, ৪৫২পৃ.) ইমাম আবু দাউদ বলেন, নিঃসন্দেহে আবু হানীফা ছিলেন একজন শেষ্ঠ ইমাম। (তাহজীব ১/৪৪৫) জরহ ও তাদিলের (সনদ পর্যালোচনা শাস্ত্র) অন্যতম ইমাম ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুঈন (মৃতু- ২৩৩হিঃ) বলেন,“আবু হানীফা ছিলেন হাদীস শাস্ত্রের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি”- (তাহবীবুত্তাহজীব ৫/৬৩০) আলী ইবনে মাদানী (মৃতু- ২৩৪ হিঃ) বলেন,“আবু হানীফা হাদীস শাস্ত্রে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তার মধ্যে কোন দোষক্রুটি ছিল না। (জামঈ বয়ানিল ইল্ম ২/১০৮৩)
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হাফিয ইয়াহ্ইয়া বিন হারুন (মৃতু- ২০৬ হিঃ) বলেন,“আবু হানীফা ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী ও সত্যবাদী” (আহবারে আবু হানীফা ৩৬) আল্লামা হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-“ইমাম আবু হানীফার মুত্যু সংবাদ শুনে ফিক্বাহ ও হাদীস শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, শাফঈ মাযহাবের প্রধানতম সংকলক হযরত ইবনে জরীহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন, “আহ! ইলমের কি এক অফুরন্ত খনি আজ আমাদের হাতছাড়া হলো”। ( তাহযীবুত্তাহযীব খন্ড ১, পৃ: ৪৫০)
একবার হযরত ইয়াহয়া ইবনে মুঈনকে প্রশ্ন করা হলো- হাদীসশাস্ত্রে আবু হানীফা কি আস্থাভাজন ব্যক্তি? সম্ভবতঃ প্রচ্ছন্ন সংশয় আঁচ করতে পেরে দৃপ্তকন্ঠে তিনি উত্তর দিলেন- হ্যাঁ, অবশ্যই তিনি আস্থাভাজন! অবশ্যই তিনি আস্থাভাজন! (মানাকিবুল ইমামমুল আ’যামি লিলমাওয়াফিক- খন্ড:১, পৃষ্ঠা ১৯২) ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, ফিকাহশাস্ত্রের সকল মানুষ আবু হানিফার পরিবারভুক্ত।(আছারুল ফিকহিল ইসলামী, পৃ: ২২৩) হাফেয যাহাবী তার কিতাবে ইমাম আবু হানিফাকে হাফেযে হাদীসের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। (তাযকিরাতুল হুফফায, পৃ: ১৬০) বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ বিন মুবারক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কোন ব্যক্তি অনুসরনীয় হওয়ার দিক থেকে ইমাম আযম আবু হানিফার চেয়ে অধিক যোগ্য নয়। কেননা আবু হানিফা ইমাম, খোদাভীরু, মুত্তাকী, আলেম ছিলেন। তীক্ষ্ম মেধা ও বুঝ-বুদ্ধি দিয়ে ইলমকে এমনভাবে বিশ্লেষন করেছেন যে ইতিপূর্বে কেউ তা করতে পারে নি।(খাইরাতুল হিসান, লেখক: ইবনে হাজার হায়ছামী শাফেয়ী)
তাঁর খোদাভীরুতা:
তিনি সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর পর্যন্ত এশার নামাযের ওযু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। এতে এটাই বোঝা যায় যে, তিনি সারারাত আল্লাহর ইবাদত, ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণায় মগ্ন থাকতেন। কতিপয় কর্মচারীর দ্বারা ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ব্যবসায় যাতে হারাম অর্থ উপার্জিত না হয় সে জন্য তিনি কর্মচারীদের সব সময় সতর্ক করতেন। একবার তিনি দোকানে কর্মচারীদের কিছু কাপড়ের দোষ-ত্রুটি দেখিয়ে বললেন, ‘ক্রেতার নিকট যখন এগুলো বিক্রি করবে তখন কাপড়ের এ দোষগুলো দেখিয়ে দেবে এবং এর মূল্য কম রাখবে।’ কিন্তু পরবর্তী কর্মচারীগণ ভুলক্রমে ক্রেতাকে কাপড়ের দোষত্রুটি না দেখিয়েই বিক্রি করে দেন। এ কথা তিনি শুনতে পেয়ে খুব ব্যথিত হয়ে কর্মচারীদের তিরস্কার করেন এবং বিক্রীত কাপড়ের সমুদয় অর্থ সদকা করে দেন। তাঁর সততার এ রকম শত শত ঘটনা রয়েছে।
তাঁর ইন্তিকাল:
খলীফা মানসুরের সময় ইমাম আবু হানিফাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহনের জন্য আহবান জানানো হয়। ইমাম আবু হানিফা খলীফার প্রস্তাব প্রত্যখ্যান করার পর তাঁকে ত্রিশটি বেত্রাঘাত করা হয়। কারারুদ্ধ করে পানাহারে নানাভাবে কষ্ট দেয়া হয়। তারপর একটা বাড়ীতে নজরবন্দী করে রাখা হয়। সেখানেই ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তিকাল হয়। নির্মম নির্যাতনের শিকার ইমাম আবু হানিফা ইন্তিকালের আগে অসিয়ত করে যান যে খলীফা মনসূর জনগনের অর্থ অন্যায়ভাবে দখল করে বাগদাদের যেই এলাকায় শহর নির্মান করেছে সে এলাকায় যেন ইন্তেকালের পর তাঁকে দাফন করা না হয়। কারো কারো মতে তাঁকে বিষ প্রযয়োগে হত্যা করা হয়। ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বিষক্রিয়া বুঝতে পেরে সিজদায় পড়ে যান এবং সিজদা অবস্থায়ই তিনি ১৫০ হিজরিতে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মৃত্যুর সংবাদ বিদ্যুত গতিতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের সর্বস্তরের লোকজন মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। কথিত আছে, তাঁর জানাযায় পঞ্চাশ হাজারের অধিক লোক অংশগ্রহণ করেন। তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী বিজরান কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. والحمد لله

Standard

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। #
بسم الله الرحمن الرحيم

সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার যিনি রমযানকে শ্রেষ্ঠ মাস বানিয়েছেন এবং সে সময় ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দিয়েছেন। দুরূদ ও সালাম প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোসÍফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি যাঁর ওসীলায় আমরা এ বরকতময় মাসটি পেয়েছি।
প্রতি বছরের মতো এ বছরও কিছু দিন পরই রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসছে মাহে রমযান। মুমিনের আত্মাকে আল্লাহ তাআলা ধুয়ে-মুছে পাক-সাফ করে তার রঙে রঙিন করে তুলবেন। আর যারা খোদাপ্রেমিক তাদেরও অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। তাঁরা শুধুই ভাবছেন, কোন দিন থেকে শুরু হবে রমযান এবং কিভাবে তাঁরা নিজেদেরকে পূত-পবিত্র করে গড়ে তুলবেনমপ এ মাসে। তাঁদের আখলাককে উন্নততর, মহত্তর, পবিত্রতর করে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ সাধন করবেন। পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টির জন্য গরিবের প্রতি সহমর্মী, ধৈর্যশীল ও সহনশীল হবেন। চারিত্রিক গুণাবলি আরো শাণিত করবেন। সিয়াম সাধনার কঠোর সংযমের সিঁড়ি বেয়ে পরহেজগারির শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করবেন। 
এটা মহিমান্বিত মাস, যাতে আল্লাহ পাক রোযা ফরয করেছেন।নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,

 عن أبي هُرَيْرَة رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : (( إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتْ الشَّيَاطِينُ) . رواه البخاري في الصوم باب هل يقال رمضان (১৭৬৬) ، والنسائي في الصيام (২০৭৯) و (২০৮১( 

“এ মাসে বেহেশ্তের দরজাগুলো খোলা থাকে আর দোজখের দরজাগুলো বন্ধ থাকে এবং শয়তান কে শিকল পরিয়ে রাখা হয়।” (বুখারী-১৭৬৬, নাসায়ী-২০৭৯, ২০৮১) 
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন,

فعن أنس بن مالكٍ، قال: دخل رمضان، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “إِنَّ هَذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ، وَفِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَهَا فَقَدْ حُرِمَ الخَيْرَ كُلَّهُ، وَلَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا مَحْرُومٌ”(ابن ماجه: كتاب الصيام، باب ما جاء في فضل شهر رمضان (১৬৪৪)، انظر: مصباح الزجاجة في زوائد ابن ماجه (২/৬২).

“এখানে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ট রাত রয়েছে। যে ব্যক্তি এর মহিমা কে অস্বীকার করল, মুলত সে বঞ্চিত!” (ইবনু মাযাহ-১৬৪৪)

 

জীবনের যে কোন বিষয়ে সফলতা আনতে চাইলে, অথবা কোন বিষয়ে লক্ষ্য নির্ধারন করলে, তার প্রথম ধাপ হচ্ছে নিজের মন মানসিকতাকে স্থির করা ও গোছানো এবং এর জন্য প্রস্তুতি শুরু করা। মাহে রমযান আগমনের দুই মাস আগে থেকেই রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দিতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজবের শুরুতেই নিজে এবং সাহাবায়ে কিরামকে এই দোয়া করার জন্য বলতেন- 

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ رَجَبٌ قَالَ: اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ، وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ(روى عبد الله بن الإمام أحمد في “زوائد المسند” (২৩৪৬) والطبراني في “الأوسط” (৩৯৩৯) والبيهقي في “الشعب” (৩৫৩৪) وأبو نعيم في “الحلية” (৬/২৬৯)। )

“আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান” (হে আল্লাহ! রজব এবং শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় কর এবং আমাদের রমযানের পুণ্যময় মাস অর্জনের সৌভাগ্য দান কর) (ত্ববরানী-৩৯৩৯, বায়হাক্বী-৩৫৩৪, আবু নাঈম: হিলয়া- ৬/২৬৯)

 

রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ ঘোষণার প্রেক্ষিতেই বিশ্বের মুসলমানরা রমযান আসার আগে থেকেই এর জন্য প্রতি বছর প্রস্তুতি শুরু করে দেন। সাহাবায়ে কেরামের পর তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, মুহাদ্দিসীন, আইম্মায়ে মুজাতাহিদীনসহ সর্বস্তরের মুসলমানগন নিজ নিজ পরিসরে রমযানের প্রস্তুতি নিয়ে সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
মাহে রমযান এমনই এক বরকতময় মাস, যার আগমনে পুলকিত হয়ে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামদের মোবারকবাদ পেশ করতেন। 
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের এই মর্মে সুসংবাদ প্রদান করেছেন যে, 

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم : ” أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ فَرَضَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ , تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ السَّمَاءِ , وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ , وَتُغَلُّ فِيهِ مَرَدَةُ الشَّيَاطِينِ , لِلَّهِ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ,مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ “)رواه النسائي ( ২১০৬ ) وأحمد (৮৭৬৯) صحيح الترغيب ( ৯৯৯( .

“তোমাদের সামনে রমযানের পবিত্র মাস এসেছে, যে মাসে আল্লাহ তোমাদের ওপর রোযা ফরয করেছেন।’ (নাসায়ী-২১০৬. আহমদ-৮৭৬৯) 
অন্য এক হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

رجب شهر الله وشعبان شهري ورمضان شهر أمت} السيوطي في الجامع الصغير لأبي الفتح بن أبي الفوارس. رواه الدَّيلمي عن عائشةَ رضي الله عنها، جامع المسانيد والمراسيل(

“রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমযান আমার উম্মতের মাস” (সুয়ূতী: জামে আস সগীর)। 
তাই বলা হয়, ‘রজব মাসে শস্য বপন করা হয়, শাবান মাসে খেতে পানি সিঞ্চন করা হয় এবং রমযান মাসে ফসল কর্তন করা হয়।’ সুতরাং এ শ্রেষ্ঠতম মাসে নামায- রোযা পালন তথা আল্লাহর ইবাদত- বন্দেগি করে কাঙ্খিত লক্ষ্যপানে ধাবিত হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা শাবান মাসের শেষ দিনে সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করে মাহে রমযানের রোযার ফযিলত সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে এরশাদ করেন, 

فَقَالَ : ” أَيُّهَا النَّاسُ ، إِنَّهُ  قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ جَعَلَ اللَّهُ صِيَامَهُ فَرِيضَةً ، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا ، مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى  فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ ، وَمَنْ أَدَّى فِيهِ فَرِيضَةً كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ ، وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ ، وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ

‘হে মানবগণ! তোমাদের প্রতি একটি মহান মোবারক মাস ছায়া ফেলেছে। এই মাসে সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম একটি রজনী আছে, যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। যে ব্যক্তি এই মাসে কোনো নেক আমল দ্বারা আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য কামনা করে, সে যেন অন্য সময়ে কোনো ফরয আদায় করার মতো কাজ করল। আর এই মাসে যে ব্যক্তি কোনো ফরয আদায় করে, সে যেন অন্য সময়ের ৭০টি ফরয আদায়ের নেকি লাভ করার সমতুল্য কাজ করল। এটি সংযমের মাস আর সংযমের ফল হচ্ছে জান্নাত।’ (বায়হাক্বী-৩৯, ইবনু খোযাইমা-১৮৮৭))
প্রকৃতপক্ষে পবিত্র মাহে রমযান মুসলমানদের জন্য একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ কোর্স, যার মাধ্যমে রোযাদারদের জীবন প্রভাবিত হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

 إِذَا سَلِمَ رَمَضَانٌ سَلِمَتِ السَّنَةُ)  الحلية (৭/১৪০(

“যে ব্যক্তি পবিত্র রমযান মাস ভালোভাবে যাপন করবে, তার সমগ্র বৎসর ভালোভাবে যাপিত হবে।”(হিলয়া-৭/১৪০)। 
তিনি আরও বলেন, 

 لو يعلم العباد مافي رمضان لتمنت أمتي أن يكون رمضان السنة كلها)تنزيه الشريعة للكناني ২ / ১৫৩و كتاب مجمع الزوائد للهيثمي ৩ /১৪১و كتاب الفوائد المجموعة في الأحاديث الموضوعة للشوكاني ১ / ২৫৪ (

“আমার উম্মত যদি মাহে রমযানের গুরুত্ব বুঝত, তাহলে সারা বছর রমযান কামনা করত।”(মাজমাইয যাওয়ায়েদ-৩/১৪১, আল পাওয়ায়েদ: শাওকানী-১/২৫৪)
‘রামাদান’ শব্দটি আরবি ‘রাম্দ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দহন, প্রজ্বলন, জ্বালানো বা পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলা। রমযান মাসে সিয়াম সাধনা তথা রোযাব্রত পালনের মাধ্যমে মানুষ নিজের সমুদয় জাগতিক কামনা-বাসনা পরিহার করে আত্মসংযম ও কৃচ্ছ্রপূর্ণ জীবন যাপন করে এবং রিপুকে দমন করে আল্লাহর একনিষ্ঠ অনুগত বান্দা হওয়ার সামর্থ্য অর্জন করে। 
মাহে রমযান মানুষের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় অহংকার, কুপ্রবৃত্তি, নফসের দাসত্ব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় বলে এ মহিমান্বিত মাসের নাম ‘রমাদান’। ইসলামের অনুসারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার বিরাট নিয়ামত রমযান মাস। এর প্রস্তুতি গ্রহণ করা না হলে মাহে রমযানের কোনো মূল্য বা মর্যাদা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় না।
তাই মাহে রমযানে রোযার প্রস্তুতির জন্য সহিহ-শুদ্ধভাবে আবশ্যকীয় বিধি-বিধান শরিয়তের মাসআলা অনুযায়ী রোযাদারদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা খুবই দরকার। এ ছাড়া আসন্ন মাহে রমযানের পবিত্রতা রক্ষার্থে ইবাদত- বন্দেগি তথা সাহরী, ইফতার, তারাবিহ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, ই’তিকাফ, তাহাজ্জুদ, জিকর-আযকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-ইস্তেগফার, দরূদ শরীফ, যাকাত-ফিতরা, দান- সাদ্কা প্রভৃতি সৃষ্টিকর্তার হক আদায়ের সামগ্রিক পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া উচিত। 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা শুরু হওয়ার আগে তার সাহাবীদেরকে কিভাবে সচেতন করতেন নিম্নের হাদীস হতে আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি। 

عَنْ سَلْمَانَ  رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ : خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي آخِرِ يَوْمٍ مِنْ شَعْبَانَ ، فَقَالَ : ” أَيُّهَا النَّاسُ ، إِنَّهُ  قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ جَعَلَ اللَّهُ صِيَامَهُ فَرِيضَةً ، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا ، مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى  فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ ، وَمَنْ أَدَّى فِيهِ فَرِيضَةً كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ ، وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ ، وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ ، وَشَهْرُ الْمُوَاسَاةِ ، وَشَهْرٌ يُزَادُ فِي رِزْقِ الْمُؤْمِنِ فِيهِ ، مَنْ فَطَّرَ فِيهِ صَائِمًا كَانَ لَهُ مَغْفِرَةً لِذُنُوبِهِ وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ ، وَكَانَ لَهُ مثل أَجْرِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَجْرِهِ شَيْءٌ ” ، قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، لَيْسَ كُلُّنَا نَجِدُ مَا يُفَطِّرُ الصَّائِمَ ؟ قَالَ : ” يُعْطِي اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ هَذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا عَلَى مَذْقَةِ لَبَنٍ أَوْ تَمْرَةٍ أَوْ شَرْبَةِ مَاءٍ ، وَمَنْ أَشْبَعَ صَائِمًا سَقَاهُ اللَّهُ مِنْ حَوْضِي شَرْبَةً لا يَظْمَأُ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ ، وَهُوَ شَهْرٌ أَوَّلُهُ رَحْمَةٌ وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ وَآخِرُهُ عِتْقٌ مِنَ النَّارِ  مَنْ خَفَّفَ فِيهِ عَنْ مَمْلُوكِهِ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَأَعْتَقَهُ مِنَ النَّارِ ، فضائل الأوقات للبيهقي গ্ধ بَابٌ فِي فَضْلِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ … رقم الحديث: ৩৯, هذا الحديث رواه ابن خزيمة بلفظه في صحيحه ৩/১৯১ رقم (১৮৮৭, رواه المحاملي في أماليه (২৯৩) والبيهقي في شعب الإيمان (৭/২১৬) وفي فضائل الأوقات ص ১৪৬ رقم ৩৭ وأبو الشيخ ابن حبان في كتاب ( الثواب ) عزاه له الساعاتي في ( الفتح الرباني ) (৯/২৩৩) وذكره السيوطي في ( الدر المنثور ) وقال : أخرجه العقيلي وضعفه ) والأصبهاني في الترغيب ، وذكره المنقي في ( كنز العمال ) ৮/৪৭৭ ، كلهم عن طريق سعيد بن المسيب عن سلمان الفارسي ، )

হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, শা’বান মাসের শেষ দিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে খুতবা শুনালেন, যাতে  তিনি এরশাদ করেছেন, ‘হে জনগণ! তোমাদের নিকট একটি মহান ও পবিত্র মাস আসছে, যার মধ্যে এমন একটি রাত্র রয়েছে যা হাজার রাত্র হতেও উত্তম। যে মাসের দিনগুলোতে আল্লাহ রোযাকে ফরয করেছেন এবং রাত্রিতে নামাযকে (তারাবীহকে) নফল করেছেন (উম্মতের জন্য সুন্নত)। যে ব্যক্তি ঐ মাসে কোন একটি সদাভ্যাস ( বা সৎকাজ) করে তা ছওয়াবের দিক দিয়ে অন্য মাসের একটি ফরয কাজের সমতুল্য হয়ে থাকে। আর একটি ফরয আদায় করলে, তা অন্য মাসের ৭০টি ফরয আদায়ের সমতুল্য ছওয়াবের হয়ে থাকে। এটা হল ধৈর্যের মাস। আর ধৈর্য অবলম্বনের প্রতিদান হচ্ছে বেহেশ্ত। এটা পরোপকার ও সহানুভূতির মাস এবং এটা এমন একটি মাস যাতে ঈমানদারগণের রুযী বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। এ মাসে যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করায়, তার বিনিময়ে তার সমস্ত গুণাহ মাফ হয়ে যায় এবং সে জাহান্নাম হতে মুক্ত হয়। তাছাড়া সে উক্ত রোযাদার ব্যক্তির তুল্য ছওয়ারও পাবে। এতে অবশ্য উক্ত রোযাদারের ছওয়াবে একটুও কমতি করা হবে না। আমরা বললাম ইয়া রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইকা ওয়াসাল্লাম! আমাদের এমন কিছু সংস্থান নাই যা দ্বারা আমরা রোযাদারকে ইফতার করাতে পারি। তদুত্তরে হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘এই ছাওয়াব আল্লাহতায়ালা ঐ ব্যক্তিকেও প্রদান করবেন, যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে এক ঢোক দুধ বা একটি খোরমা কিংবা সুমিষ্ট পানি দ্বারা ইফতার করাবে। আর যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবে, আল্লাহ তাকে আমার ‘হাউজ কাওছার’ হতে এমনভাবে পর্যাপ্ত করে পান করাবেন যে, বেহেশতে না যাওয়া অবধি তার আর পিপাসা লাগবে না। আর ঐ মাসের প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক ক্ষমার ও তৃতীয় দশক জাহান্নাম হতে মুক্তির জন্য নির্ধারিত। যে ব্যক্তি ঐ মাসে স্বীয় চাকরের ওপর কার্যভার লাঘব করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম হতে আযাদ করে দেন। (বাযহাক্বী-৩৯, ইবনু খোযাইমা-১৮৮৭)
প্রিয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

্রإِذَا كَانَ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ وَمَرَدَةُ الْجِنِّ ،وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ فَلَمْ يُفْتَحْ مِنْهَا بَابٌ،  وَفُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ،  وَيُنَادِى مُنَادٍ:  يَا بَاغِىَ الْخَيْرِ أَقْبِلْ ، وَيَا بَاغِىَ الشَّرِّ أَقْصِرْ .وللهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ)رواه الترمذي  واللفظ له (৬৮২) وقال:غريب، وابن خزيمة في صحيحه بنحوه (১৮৮৩)،  وابن حبان (৮/২২১) وقال الشيخ شعيب في التحقيق (إسناده قوي) ،  والحاكم في المستدرك (১৫৩২) وقال: (حديث صحيح على شرط الشيخين.(

রামাযান মাসের প্রথম রাত্রি সমাগত হতেই শয়তান ও দুষ্টমতি জ্বিনগুলো শৃঙ্খলিত হয় এবং জাহান্নামের দ্বারগুলো রুদ্ধ করে দেয়া হয়, একটি দরজাও মুক্ত থাকে না। আর বেহেশতের দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয়, তার একটাও বন্ধ থাকে না। আর কোন একজন গায়েবী আহ্বানকারী উচ্চঃস্বরে বলতে থাকেন যে, ‘হে পুণ্যার্থীগন অগ্রসর হও! হে পাপাত্মার দল পিছিয়ে যাও! এই সময় আল্লাহর পক্ষ হতে বহু দোযখী মুক্তিপ্রাপ্ত হয়। এমনি করে প্রত্যেক রাত্রিতেই আহ্বান করা হয়। ( তিরমিযী-৬৮২, ইবনু খোযাইমা-১৮৮৩, ইবনু হিব্বান-৮/২২১, হাকেম-১৫৩২)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ” رواه البخاري ৩৮ ومسلم ৭৬০

‘যে ব্যক্তি রামাযান মাসে ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রোযা রাখে, তার অতীত গোণাহ মাফ হয়ে যায়। 
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 

“مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ” (البخاري: كتاب صلاة التراويح، باب فضل من قام رمضان، (১৯০৫)، عن أبي هريرة رضي الله عنه، ومسلم: كتاب صلاة المسافرين وقصرها، باب الترغيب في قيام رمضان وهو التراويح، (৭৫৯).

আর যে ব্যক্তি এই মাসে ঈমানসহ ছওয়াবের আশায় রাত জেগে (তারাবীহ) নামায পড়ে, তার অতীত সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (বুখারী-১৯০৫, মুসলিম-৭৫৯)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ” )رواه البخاري في كتاب الصوم – باب من صام رمضان إيماناً واحتساباً ونية برقم (১৮০২)، ومسلم في كتاب صلاة المسافرين وقصرها – باب الترغيب في قيام رمضان وهو التراويح برقم (৭৬০(

যে ব্যক্তি ক্বদর রাতে ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রাত জাগরণ করে নামায পড়ে, তারও অতীত সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ (বুখারী-১৮০২, মুসলিম-৭৬১)
হযরত নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

عن أَبي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قال : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( قَالَ اللَّهُ : كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلا الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ يَدَعُ طَعَامَهُ وَشَهْوَتَهُ مِنْ أَجْلِي) روى البخاري (১৭৬১) ومسلم (১৯৪৬)(

‘মানুষের প্রত্যেক সৎকর্মের ছওয়াব দশ হতে সাতশত গুণ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। তবে আল্লাহ বলেন, ‘কেবল রোযা ব্যতীত। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য সুতরাং তার পুরস্কার আমিই আমার কুদরতের স্বহস্তে প্রদান করব। যেহেতু রোযাদার স্বীয় কামপ্রবৃত্তিকে দমন ও পানাহার পরিহার করে থাকে কেবলমাত্র আমারই জন্য।’ (বুখারি-১৭৬১, মুসলিম-১৯৪৬)   
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 

لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا : إِذَا أَفْطَرَ فَـرِحَ ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِه

‘রোযাদারের জন্য দুইটি আনন্দ। একটি ইফ্তার কালে এবং অপরটি আল্লাহর সাথে দীদারকালে।’(বুখারি-১৭৬১, মুসলিম-১৯৪৬)   

তিনি আরো বলেন, 

وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْك .

‘রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশ্ক হতেও অধিক সুগন্ধময়।(বুখারি-১৭৬১, মুসলিম-১৯৪৬)    

তিনি বলেন, 

وَالصِّيَامُ جُنَّـةٌ ، وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلا يَرْفـثْ ، وَلا يَصْخَبْ ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ : إِنِّي امْرُؤٌ صَائِم .

(রোযাদারগণের পক্ষে) রোযা হচ্ছে ঢালস্বরূপ।’ (বুখারি শরিফ)   সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউই রোযা অবস্থায় নির্লজ্জ কথা বলবে না এবং বাজে বকবে না। যদি কেউ রোযাদারকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করতে আসে, তবে সে যেন বলে দেয় যে, আমি রোযাদার। (বুখারি-১৭৬১, মুসলিম-১৯৪৬)   
হযরত নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْل فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ ) . روى البخاري (১৯০৩১৮০৪-) (৬০৫৭)

‘যে ব্যক্তি রোযা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ হতে বিরত রইল না, তার উপবাসে আল্লাহর কিছুই যায় আসে না।’((বুখারি-১৮০৪, ১৯০৩, ৬০৫৭)   
তিনি সাবধান করে বলেন, 

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , قَالَ :  ” رُبَّ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ حَظٌّ مِنْ صَوْمِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَالْعَطَشُ ، وَرُبَّ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ حَظٌّ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ وَالنَّصَبُ ”

رواه ابن ماجه في سننه (১৬৯০) عن عمرو بن رافع والنسائي في الكبرى (২/২৩৯/رقم৩২৫০) ورواه النسائي في الكبرى (২/২৩৯/رقم৩২৫১) ورواه أحمد في مسنده (২/৪৪১) 

‘বহু রোযাদার এমনও রয়েছে, যে ক্ষুধায়-পিপাসায় কষ্ট পাওয়া ব্যতীত তাদের রোযা রাখায় আর কোন ফল নেই। এমনিভাবে বহু রাতজাগা নামাযী রয়েছে, যাদের রাত জাগরণ ব্যতীত অন্য কোন লাভ হয় না।’ হযরত নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন বলেন, যে রোযাদারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকল না, তার শুধু পানাহার হতে বিরত থাকায় কোন লাভ নেই।’ (ইবনু মাযা-১৬৯০, নাসায়ী- ৩২৫০, আহমদ-২/৪৪১(
আমরা যখন এ মাসের গুরুত্ব অনুভব করলাম তখন আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল কীভাবে এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো যায় সে প্রচেষ্টা চালানো। হেদায়াতের আলোকবর্তিকা আল-কোরআনও নাযিল হয়েছে এ মাসে ।   (চলবে ইনশা আল্লাহ)