মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থের “নূর বিষয়ক” অধ্যায়

Standard

[ইমাম অাহমদ শেহাবউদ্দীন আল-কসতলানী (রহ:) প্রণীত ‘আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া’ গ্রন্থের ‘রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর নূর’ অধ্যায় হতে অনূদিত। প্রকাশক: অাস্ সুন্নাহ ফাউন্ডেশন অফ আমেরিকা;  Imam Qastalani’s book ‘al-Mawahib al-Laduniyya’ (‘Light of the Prophet’ chapter); from As-Sunnah Foundation of America; translated by K.S.Hossain]

বঙ্গানুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

উৎসর্গ
আমার পীর ও মোর্শেদ চট্টগ্রাম বোয়ালখালীস্থ আহলা দরবার শরীফের আউলিয়াকুল শিরোমণি হযরতুল আল্লামা শাহ সূফী সৈয়দ এ, জেড, এম, সেহাবউদ্দীন খালেদ সাহেব (রহ:)-এর পুণ্যস্মৃতিতে….।
– অনুবাদক 

ইমাম মোহাম্মদ যুরকানী মালেকী (রহ:) ’আল-মাওয়াহিব’ বইটির ওপর ৮ খণ্ডের একটি ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ইমাম কসতলানী (রহ:) ’আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া’ (যুরকানী রচিত ’শরাহ’ বা ব্যাখ্যা, ৩:১৭৪) গ্রন্থে বলেন:

মহা বরকতময় নাম ‘মোহাম্মদ’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ওই নামের অর্থের সাথে যথাযথভাবে মিলে যায় এবং আল্লাহতা’লা মানুষের দ্বারা তাঁর প্রতি ওই মোবারক নামকরণের আগেই নিজ হতে ওই পবিত্র নাম তাঁর প্রতি আরোপ করেন। এটি তাঁর নবুয়্যতের একটি প্রতীকী-চিহ্ন প্রতিষ্ঠা করে, কারণ তাঁর নাম তাঁরই (নবুয়্যতের) সত্যতাকে নিশ্চিত করে। অতএব, তিনি যে জ্ঞান-প্রজ্ঞা দ্বারা (সবাইকে) হেদায়াত দান করেছেন এবং (সবার জন্যে) কল্যাণ এনেছেন, সে কারণে তিনি এই দুনিয়ায় প্রশংসিত (মাহমূদ)। আর পরকালে শাফায়াত তথা সুপারিশ করার সুউচ্চ মকামে অধিষ্ঠিত হবেন বলেও তিনি প্রশংসিত (মাহমূদ)।

[আল্লাহতা’লা সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নবুয়্যতকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে কীভাবে তাঁকে মহাসম্মানিত করেছেন, তার বর্ণনা; এতে আরও বর্ণিত হয়েছে তাঁর বংশপরিচয়, ঔরস, বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) ও (ছেলেবেলার) শিক্ষাদীক্ষা] 

আশীর্বাদধন্য রূহের সৃষ্টি

আল্লাহতা’লা সৃষ্টিকুলকে অস্তিত্বশীল করার এরাদা (ঐশী ইচ্ছা) পোষণ করার পর তিনি নিজ ‘নূর’ হতে নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করেন। এরপর তিনি মহানবী (দ:)-এর নূর হতে বিশ্বজগত ও আসমান-জমিনের তাবৎ বস্তু সৃষ্টি করেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে তাঁর রেসালাত সম্পর্কে অভিহিত করেন; ওই সময় হযরত আদম (আ:) রূহ এবং দেহের মধ্যবর্তী (ঝুলন্ত) অবস্থায় ছিলেন। হুযূর পূর নূর (দ:) হতেই তখন সমস্ত রূহ অস্তিত্বশীল হন, যার দরুন তিনি সকল সৃষ্টির চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে সাব্যস্ত হন এবং সকল অস্তিত্বশীল বস্তুর উৎসমূলে পরিণত হন।

সহীহ মুসলিম শরীফে নবী করীম (দ:) এরশাদ করেন যে আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই আল্লাহ পাক সৃষ্টিকুলের ভাগ্য (তাকদীর) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। অধিকন্তু, (হাদীসে) আরও বলা হয় যে আল্লাহতা’লার আরশ-কুরসি ছিল পানিতে এবং যিকির তথা উম্মুল কেতাবে যা কিছু লেখা হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ’খাতামুন্ নাবিয়্যিন’ হওয়ার বিষয়টি। হযরত এরবায ইবনে সারিয়্যা (রা:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান, “আল্লাহ বিবৃত করেন যে আমি তখনো আম্বিয়া (আ:)-এর মোহর ছিলাম, যখন আদম (আ:) রূহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন (মানে সৃষ্টি হননি)।”

হযরত মায়সারা আল-দাব্বী (রা:) বলেন যে তিনি মহানবী (দ:)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এয়া রাসূলুল্লাহ (দ:)! আপনি কখন নবী হন?” তিনি জবাবে বলেন, “যখন আদম (আ:) রূহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন।”

সুহায়ল বিন সালেহ আল-হামাদানী (রহ:) বলেন, “আমি (একবার) হযরত ইমাম আবূ জা’ফর মোহাম্মদ ইবনে আলী (রা:)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মহানবী (দ:) কীভাবে অন্যান্য পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর অগ্রবর্তী হতে পারেন, যেখানে তিনি-ই সবার পরে প্রেরিত হয়েছেন?’ হযরত ইমাম (রা:) উত্তরে বলেন যে আল্লাহ পাক যখন বনী আদম তথা আদম-সন্তানদেরকে জড়ো করে তাঁর নিজের সম্পর্কে সাক্ষ্য (‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই?’ প্রশ্নের উত্তর) নিচ্ছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (দ:)-ই সর্বপ্রথমে উত্তর দেন, ‘জ্বি, হ্যাঁ।’ তাই তিনি-ই সকল আম্বিয়া (আ:)-এর পূর্বসূরী, যদিও তাঁকে সবশেষে প্রেরণ করা হয়েছে।”

ইমাম তকীউদ্দীন সুবকী (রহ:) ওপরোল্লিখিত হাদীস (মুসলিম শরীফ) সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে আল্লাহতা’লা যেহেতু দেহের আগে রূহ (আত্মা) সৃষ্টি করেন এবং যেহেতু মহানবী (দ:) কর্তৃক ‘আমি তখনো নবী ছিলাম যখন আদম (আ:) রূহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন’ মর্মে মন্তব্য করা হয়, সেহেতু তাঁর ওই বক্তব্য তাঁর-ই পবিত্র রূহকে, তাঁর-ই বাস্তবতাকে উদ্দেশ্য করে; আর আমাদের মস্তিষ্ক (বিচার-বুদ্ধি) এই সব বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে অপারগ হয়ে পড়ে। কেউই সেসব বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে সক্ষম নয় একমাত্র সেগুলোর স্রষ্টা (খোদাতা’লা) ছাড়া, আর সে সকল পুণ্যাত্মা ছাড়া, যাঁদেরকে আল্লাহ পাক হেদায়াতের নূর দান করেছেন।

অতএব, হযরত আদম (আ:)-এর সৃষ্টিরও আগে আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-এর রূহ মোবারককে নবুওয়্যত দান করেছিলেন; কেননা, তিনি তাঁকে সৃষ্টি করে অগণিত (অফুরন্ত) নেয়ামত দান করেন এবং খোদার আরশে মহানবী (দ:)-এর নাম মোবারকও লেখেন, আর ফেরেশতা ও অন্যান্যদেরকে মহানবী (দ:)-এর প্রতি নিজ মহব্বত ও উচ্চধারণা বা শ্রদ্ধা সম্পর্কে জানিয়ে দেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাস্তবতা তখন থেকেই বিরাজমান, যদিও তাঁর মোবারক জিসম (দেহ) পরবর্তীকালে আবির্ভূত হন। হযরত আল-শি’বী (রা:) বর্ণনা করেন যে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনি কখন থেকে নবী ছিলেন?” হুযূর পূর নূর (দ:) এরশাদ ফরমান, ”যখন আদম (আ:) তাঁর রূহ এবং দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন এবং আমার কাছ থেকে ওয়াদা নেয়া হয়েছিল।” তাই আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মধ্যে তিনি-ই সর্বপ্রথমে সৃষ্ট এবং সর্বশেষে প্রেরিত।

বর্ণিত আছে যে, মহানবী (দ:)-ই হলেন একমাত্র বনী আদম, যাঁকে রূহ ফোঁকার আগে (সর্বপ্রথমে) বেছে নেয়া হয়; কেননা তিনি-ই মনুষ্যজাতির সৃষ্টির কারণ, তিনি-ই তাদের অধিপতি, তাদের অন্তঃসার, তাদের উৎসমূল এবং মাথার মুকুট।

সর্ব-হযরত আলী ইবনে আবি তালেব (ক:) ও ইবনে আব্বাস (রা:) উভয়েই বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আদম (আ:) থেকে আরম্ভ করে সমস্ত নবী-রাসূল প্রেরণের আগে তাঁদের কাছে আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:) সম্পর্কে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, যদি তাঁদের হায়াতে জিন্দেগীতে তাঁরা মহানবী (দ:)-এর সাক্ষাৎ পান, তবে যেন তাঁরা তাঁর প্রতি ঈমান আনেন এবং তাঁকে (সর্বাত্মক) সাহায্য-সমর্থন করেন; আর যেন তাঁরা নিজেদের উম্মতকেও অনুরূপ কর্তব্য পালনের আদেশ দেন।”

বর্ণিত আছে যে আল্লাহ পাক যখন আমাদের মহানবী (দ:)-এর নূর সৃষ্টি করেন, তখন তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-কে অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-এর নূরের দিকে তাকাতে বলেন। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর নূর সবার নূরকে ঢেকে ফেলে (অথবা সবার নূরকে ছাপিয়ে ওঠে) ; এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক তাঁদেরকে কথা বলতে দিলে তাঁরা জিজ্ঞেস করেন, ‘এয়া আল্লাহ, কে আমাদেরকে তাঁর নূর দ্বারা ঢেকে রেখেছেন?’ আল্লাহতা’লা জবাবে বলেন, ‘এটি সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর নূর। যদি তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনো, তবে আমি তোমাদেরকে নবী বানিয়ে দেবো।’ তাঁরা সবাই বলেন, ‘আমরা তাঁর প্রতি এবং তাঁর নবুওয়্যতের প্রতি ঈমান আনলাম।’ অতঃপর আল্লাহ পাক জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কি তোমাদের সাক্ষী হবো?’ তাঁরা উত্তর দেন, ’হ্যাঁ’। আল্লাহ পাক আবার প্রশ্ন করেন, ‘তোমরা কি এই প্রতিশ্রুতি পালনের বাধ্যবাধকতা মেনে নিলে?’ তাঁরা উত্তরে বলেন, ‘আমরা তা মানার ব্যাপারে একমত।’এমতাবস্থায় আল্লাহতা’লা বলেন, ‘তাহলে সাক্ষী হও, আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী হলাম।’ এটি-ই হলো পাক কালামের অর্থ যেখানে আল্লাহতা’লা এরশাদ করেছেন: “এবং স্মরণ করুন! যখন আল্লাহ আম্বিয়াবৃন্দের কাছ থেকে তাদের অঙ্গিকার নিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমত প্রদান করবো, অতঃপর তাশরীফ আনবেন তোমাদের কাছে ওই রাসূল, যিনি তোমাদের কিতাবগুলোর সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং অবশ্যঅবশ্য তাঁকে সাহায্য করবে’।” [আল-কুরআন, ৩:৮১]

ইমাম তকীউদ্দীন সুবকী (রহ:) বলেন, “এই মহান আয়াতে করীমায় মহানবী (দ:)-এর প্রতি পেশকৃত শ্রদ্ধা ও উচ্চ সম্মান একেবারেই স্পষ্ট। এতে আরও ইঙ্গিত আছে যে অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর জীবদ্দশায় মহানবী (দ:)-কে প্রেরণ করা হলে তাঁর রেসালাতের বাণী তাঁদের জন্যে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হতো। অতএব, তাঁর রেসালাত ও রেসালাতের বাণী সাইয়্যেদুনা আদম (আ:) থেকে আরম্ভ করে শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত আগত সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্যে সার্বিক হিসেবে সাব্যস্ত হয় এবং সকল আম্বিয়া (আ:) ও তাঁদের উম্মত-ও মহানবী (দ:)-এর উম্মতের অন্তর্গত বলে গণ্য হন। এ কারণে ‘আমাকে সকল জাতির জন্যে প্রেরণ করা হয়েছে’ মর্মে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীসটি শুধু তাঁর সময়কার ও শেষ বিচার দিবস অবধি আগত মনুষ্যকুলের জন্যে উচ্চারিত হয়নি, বরং এতে অন্তর্ভুক্ত আছেন তাদের পূর্ববর্তীরাও। এ বিষয়টি আরও সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে তাঁর নিম্নবর্ণিত হাদীসকে, যেখানে তিনি এরশাদ ফরমান: ‘আমি তখনো নবী ছিলাম, যখন আদম (আ:) রূহ এবং দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন।’ মহানবী (দ:) যে নবী (আ:)-দের নবী (দ:), সেটি জানা যায় তখনই, যখন দেখতে পাই মে’রাজ রজনীতে সকল আম্বিয়া (আ:) তাঁর ইমামতিতে নামায পড়েছিলেন। পরকালে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠত্ব আরও স্পষ্ট হবে, যখন সকল আম্বিয়া (আ:) তাঁর-ই পতাকাতলে সমবেত হবেন।”

জিসম মোবারকের সৃষ্টি

হযরত কা’আব আল-আহবার (রা:) বলেন, “আল্লাহতা’লা যখন সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করতে চাইলেন, তখন তিনি ফেরেশতা হযরত জিবরীল আমীন (আ:)-কে পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু হতে মাটি আনতে বল্লেন, যেটি হলো ওর সৌন্দর্য ও নূর (জ্যোতি)। অতঃপর হযরত জিবরীল (আ:) জান্নাতুল ফেরদৌস ও রফীকে আ’লার ফেরেশতাদেরকে সাথে নিয়ে (ধরণীতে) নেমে আসেন এবং মহানবী (দ:)-এর মোবারক দেহ সৃষ্টির জন্যে (বর্তমানে) যেখানে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর রওযা শরীফ অবস্থিত, সেখান থেকে এক মুঠাে মাটি নেন। সেই মাটি ছিল ধবধবে সাদা এবং নূরানী তথা আলো বিচ্ছুরণকারী। এরপর ফেরেশতা জিবরীল (আ:) ওই পবিত্র মাটিকে জান্নাতের ‘তাসনিম’ নহরের সেরা সৃষ্ট পানির সাথে মিশিয়ে নেন, যতোক্ষণ পর্যন্ত না তা তীব্র প্রভা বিকীরণকারী সাদা মুক্তোর মতো হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতাবৃন্দ তা বহন করে সুউচ্চ আরশ, পাহাড়-পর্বত ও সাগর-মহা সাগর ঘুরে বেড়ান। এভাবেই ফেরেশতাবৃন্দ ও সকল সৃষ্টি আমাদের আকা ও মওলা মহানবী (দ:) সম্পর্কে জানতে পারেন, যা তাঁরা হযরত আদম (আ:)-কে জানারও আগে জেনেছিলেন।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “মহানবী (দ:)-এর (ওই) মাটির মূল উৎস পৃথিবীর নাভি হতে উৎসারিত, যা মক্কা মোয়াযযমায় কা’বা ঘর যেখানে অবস্থিত, সেখানেই কেন্দ্রীভূত। অতএব, সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম সৃষ্টির উৎসমূলে পরিণত হন, আর সকল সৃষ্টি তাঁর-ই অনুসরণকারী হন।”

’আওয়ারিফুল মা’আরিফ’ গ্রন্থপ্রণেতা (সুলতানুল আরেফীন শায়খ শেহাবউদ্দীন সোহরাওয়ার্দী রহমতুল্লাহে আলাইহে) বলেন যে (হযরত নূহ আলায়হিস্ সালামের যুগের) মহাপ্লাবনের সময় স্রোতের তোড়ে মহানবী (দ:)-এর মৌল সত্তা  মদীনা মোনাওয়ারায় তাঁর বর্তমানকালের রওযা শরীফের কাছে এসে অবস্থান নেন। তাই তিনি মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারা উভয় স্থানের বাসিন্দা হিসেবে পরিণত হন।

বর্ণিত আছে যে আল্লাহ পাক যখন হযরত আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেন, তখন ‍তিনি তাঁকে এ আরজি পেশ করতে অনুপ্রাণিত করেন, “এয়া আল্লাহ! আপনি কেন আমাকে ‘আবূ মোহাম্মদ’ (মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের পিতা) নামে ডেকেছেন?” আল্লাহতা’লা জবাবে বলেন, “ওহে আদম! তোমার মাথা তোলো!” তিনি শির মোবারক তুলে (খোদার) আরশের চাঁদোয়ায় মহানবী (দ:)-এর নূর মোবারক দেখতে পান। হযরত আদম (আ:) আরয করেন, “এই জ্যোতি কিসের?” জবাবে আল্লাহ পাক ফরমান, “এটি তোমারই ঔরসে অনাগত এক নবী (দ:)-এর জ্যোতি। আসমানে (বেহেশ্তে) তাঁর নাম আহমদ (সাল্লাল্লাহু আলােইহে ওয়া সাল্লাম), আর দুনিয়াতে হলো মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আ’লেহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁকে সৃষ্টি না করলে আমি তোমাকে, বা আসমান, অথবা জমিন কিছুই সৃষ্টি করতাম না।”

ইমাম আব্দুর রাযযাক (রহ:) বর্ণনা করেন হযরত জাবের বিন আব্দিল্লাহ (রা:) হতে, যিনি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমার পিতা ও মাতা আপনার জন্যে কুরবান হোন। (অনুগ্রহ করে) আমায় বলুন, আল্লাহতা’লা সর্বপ্রথম বা সর্বাগ্রে কী সৃষ্টি করেন?’ জবাবে মহানবী (দ:) বলেন, ‘ওহে জাবের! নিশ্চয় আল্লাহ পাক সর্বাগ্রে তোমার নবী (দ:)-এর নূর (জ্যোতি)-কে তাঁর নূর হতে সৃষ্টি করেন। ওই নূর আল্লাহতা’লা যেখানে চান, সেখানেই তাঁর কুদরতে ঘুরতে আরম্ভ করেন। সেসময় না ছিল লওহ, না কলম, না বেহেশ্ত, না দোযখ, না ফেরেশ্তাকুল, না আসমান, না জমিন, না সূর্য, না চন্দ্র, না জ্বিন-জাতি, না মনুষ্যকুল। আল্লাহতা’লা যখন সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করতে চাইলেন, তখন তিনি ওই নূরকে চারভাগে বিভক্ত করলেন। অতঃপর প্রথম অংশটি হতে তিনি কলম সৃষ্টি করেন; লওহ সৃষ্টি করেন দ্বিতীয় অংশ থেকে, আর তৃতীয় অংশ থেকে আরশ সৃষ্টি করেন। এরপর তিনি চতুর্থ অংশটিকে আবারও চারভাগে বিভক্ত করেন। ওর প্রথম অংশ দ্বারা তিনি আরশের (আজ্ঞা)-বাহকদের (তথা শীর্ষস্থানীয় ফেরেশতাদের) সৃষ্টি করেন; দ্বিতীয় অংশ দ্বারা কুরসী সৃষ্টি করেন; আর তৃতীয় অংশটি দ্বারা বাকি সকল ফেরেশতাকে সৃষ্টি করেন। অতঃপর তিনি চতুর্থ অংশকে আবারও চারভাগে বিভক্ত করেন: প্রথম অংশটি দ্বারা তিনি সমস্ত আসমান সৃষ্টি করেন; দ্বিতীয় অংশটি দ্বারা সমস্ত জমিন সৃষ্টি করেন; তৃতীয় অংশটি দ্বারা বেহেশ্ত ও দোযখ সৃষ্টি করেন। এরপর আবারও তিনি চতুর্থ অংশটিকে চারভাগে বিভক্ত করেন: প্রথম অংশ থেকে তিনি ঈমানদারদের দর্শনক্ষমতার নূর সৃষ্টি করেন; দ্বিতীয় অংশ থেকে অন্তরের নূর (তথা আল্লাহকে জানার যোগ্যতা) সৃষ্টি করেন; আর তৃতীয় অংশ থেকে মো’মেন (বিশ্বাসী)-দের সুখ-শান্তির নূর (উনস্, অর্থাৎ, ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ কলেমাটি) সৃষ্টি করেন।”

অপর এক বর্ণনা হযরত আলী ইবনে আল-হুসাইন (রহ:), তিনি তাঁর পিতা (রা:) হতে, তিনি তাঁর প্রপিতা (রা:) হতে, তিনি রাসূলুল্লাহ (দ:) হতে রেওয়ায়াত করেন; মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: “আমি ছিলাম এক নূর আমার প্রভু খোদাতা’লার দরবারে, এবং তা হযরত আদম (আ:)-এর সৃষ্টিরও চৌদ্দ হাজার বছর আগে।” বর্ণিত আছে যে আল্লাহতা’লা যখন আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেন, তখন তিনি ওই নূরে মোহাম্মদী (দ:)-কে তাঁর পিঠে স্থাপন করেন; আর সেই নূর তাঁর সম্মুখভাগে এমন আলো বিচ্ছুরণ করতেন যে তাঁর (আদমের) অন্যান্য জ্যোতি তাতে ম্লান হয়ে যেতো। এরপর আল্লাহ পাক সেই নূরকে তাঁরই মহাসম্মানিত আরশে উন্নীত করেন এবং ফেরেশতাদের কাঁধে বহন করান; আর তিনি তাঁদের প্রতি আদম (আ:)-কে সমস্ত আসমান ঘুরিয়ে তাঁরই সৃষ্টি-সাম্রাজ্যের (শ্রেষ্ঠতম) বিস্ময়গুলো দেখাতে আদেশ দেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “হযরত আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করা হয় শুক্রবার অপরাহ্নে। আল্লাহতা’লা অতঃপর ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর বাঁ পাঁজর থেকে তাঁরই স্ত্রী বিবি হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠে মা হাওয়াকে দেখে স্বস্তি বোধ করেন এবং নিজ হাত মোবারক তাঁর দিকে বাড়িয়ে দেন। ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, ‘ওহে আদম (আ:)! থামুন।’ তিনি এমতাবস্থায় প্রশ্ন করেন, ‘কেন, আল্লাহতা’লা কি একে আমার জন্যে সৃষ্টি করেননি?’ ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, ‘আপনার দ্বারা তাঁকে দেনমোহর পরিশোধ না করা পর্যন্ত নয়।’ তিনি আবার প্রশ্ন করেন, ‘তার দেনমোহর কী?’ জবাবে ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, ‘সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি তিনবার সালাত-সালাম (দুরুদ) পাঠ’।” [অপর রেওয়ায়াতে আছে বিশবার]

আরও বর্ণিত আছে যে হযরত আদম (আ:) বেহেশত ত্যাগ করার সময় আরশের পায়ায় এবং বেহেশতের সর্বত্র আল্লাহতা’লার নামের পাশে মহানবী (দ:)-এর নাম মোবারক লিপিবদ্ধ দেখতে পান। তিনি আরয করেন, “হে প্রভু, মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে?” আল্লাহ পাক জবাব দেন, “তিনি তোমার পুত্র, যাঁকে ছাড়া আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না।” অতঃপর হযরত আদম (আ:) ফরিয়াদ করেন, “হে প্রভু, এই পুত্রের অসীলায় (খাতিরে) এই পিতার প্রতি করুণা বর্ষণ করুন।” আল্লাহতা’লা উত্তরে বলেন, “ওহে আদম! আসমান ও জমিনের অধিবাসীদের জন্যে যদি তুমি মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যস্থতায় (অসীলায়) সুপারিশ করতে, আমি তা গ্রহণ বা মঞ্জুর করতাম।”

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী, যিনি এরশাদ ফরমান: “আদম (আ:) কর্তৃক নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর তিনি আরয করেন, ‘এয়া অাল্লাহ! সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর অসীলায় আমায় ক্ষমা করুন।’ আল্লাহতা’লা বলেন, ‘তুমি তাঁকে কীভাবে চেনো, আমি তো এখনো তাঁকে সৃষ্টি করিনি?’ হযরত আদম (আ:) উত্তর দেন, ‘হে প্রভু, এটি এ কারণে যে আপনি যখন আপনার কুদরতী হাতে আমায় সৃষ্টি করেন এবং আমার দেহে আমার রূহ ফোঁকেন, তখন আমি মাথা তুলে আরশের পায়ায় লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (কলেমা) বাক্যটি লিপিবদ্ধ দেখতে পাই। অামি বুঝতে পারি, সৃষ্টিকুলে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কারো নাম-ই আপনি আপনার নামের পাশে যুক্ত করেছেন।’ অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন, ‘ওহে আদম! তুমি সত্য বলেছো। আমার সৃষ্টিকুলে তিনি-ই আমার সবচেয়ে প্রিয়ভাজন। আর যেহেতু তুমি তাঁর-ই অসীলায় আমার কাছে চেয়েছো, সেহেতু তোমাকে ক্ষমা করা হলো। মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যদি না হতেন, তাহলে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না। তিনি তোমারই বংশে পয়গম্বর-মণ্ডলীর সীলমোহর’।”

হযরত সালমান ফারিসী (রা:)-এর এক বর্ণনায় জানা যায়, হযরত জিবরীল আমীন (আ:) অবতীর্ণ হয়ে মহানবী (দ:)-কে বলেন: “আপনার প্রভু খোদাতা’লা বলেন, ‘আমি ইবরাহীম (আ:)-কে আমার খলীল (বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করলে আপনাকেও (হে হাবীব) তা হিসেবেই গ্রহণ করেছি। আপনার চেয়ে আমার এতো কাছের জন হিসেবে আর কাউকেই আমি সৃষ্টি করিনি; উপরন্ত, আমি এই বিশ্বজগতকে এবং এর অধিবাসীদেরকে সৃষ্টি করেছি কেবল আপনার শান-মান এবং আপনি আমার কতো প্রিয় তা জানাবার উদ্দেশ্যেই; আপনি না হলে আমি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করতাম না’।”

হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়ার ঘরে বিশ বারে সর্বমোট চল্লিশজন পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু মা হাওয়ার গর্ভে সাইয়্যেদুনা শীষ (আ:)-এর জন্ম হয় আলাদাভাবে। এর কারণ হলো আমাদের মহানবী (দ:)-এর প্রতি তা’যিম বা শ্রদ্ধা প্রদর্শন, যাঁর নূর মোবারক হযরত আদম (আ:) থেকে শীষ (আ:)-এর মাঝে স্থানান্তরিত হয়েছিল। সাইয়্যেদুনা আদম (আ:)-এর ’বেসাল’ তথা খোদার সাথে পরলোকে মিলনপ্রাপ্তির আগে তিনি শীষ (আ:)-এর জিম্মায় তাঁর (ভবিষ্যত) প্রজন্মকে রেখে যান; আর এরই ধারাবাহিকতায় শীষ (আ:)-ও সন্তানদেরকে আদম (আ:)-এর অসীয়তনামা হস্তান্তর করেন; সেই অসীয়ত হলো, শুধু পুতঃপবিত্র ও নির্মল (আত্মার) নারীর মাঝে ওই নূর হস্তান্তর করা। এই অসীয়ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছিল, যতোক্ষণ না আল্লাহ পাক আব্দুল মোত্তালিব ও তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে এই নূর মঞ্জুর করেন। এভাবেই আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-এর পূর্বপুরুষদের বংশপরম্পরাকে মূর্খদের অবৈধ যৌনাচার থেকে পুতঃপবিত্র রেখেছিলেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি বিবৃত করেন: “মূর্খতাজনিত অবৈধ যৌনাচার আমার বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন)-কে স্পর্শ করেনি। আমার বেলাদত হয়েছে ইসলামী বিবাহ রীতির ফলশ্রুতিতেই।”

হিশাম ইবনে মোহাম্মদ আল-কালবী বর্ণনা করেন তাঁর বাবার ভাষ্য, যিনি বলেন: “আমি রাসূলে খোদা (দ:)-এর  উর্ধ্বতন (বা পূর্ববর্তী) বংশীয় পাঁচ’শ জন মায়ের হিসেব আমার গণনায় পেয়েছি। তাঁদের কারো মাঝেই কোনো অবৈধ যৌনাচারের লেশচিহ্ন মাত্র আমি খুঁজে পাইনি, যেমনটি পাইনি অজ্ঞদের কর্মকাণ্ড।”

সাইয়্যেদুনা হযরত আলী (ক:) বর্ণনা করেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমি বিয়ের ফলশ্রুতিতেই বেলাদত-প্রাপ্ত হয়েছি, অবৈধ যৌনাচার থেকে নয়; আবির্ভূত হয়েছি আদম (আ:) হতে বংশপরম্পরায় আমার পিতামাতার ঘরে। মূর্খতাজনিত অবৈধ যৌনাচারের কোনো কিছুই আমাকে স্পর্শ করেনি।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) রেওয়ায়াত করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমার পিতামাতা কখনোই অবৈধ যৌনাচার করেননি। আল্লাহতা’লা আমাকে পুতঃপবিত্র ঔরস থেকে পুতঃপবিত্র গর্ভে স্থানান্তর করতে থাকেন; যখনই দুটো (বিকল্প) পথ সামনে এসেছে, আমি সেরা পথটি-ই পেয়েছি।”

হযরত আনাস (রা:) বর্ণনা করেন যে হুযূর পাক (দ:) ‘লাকাদ জা’আকুম রাসূলুম্ মিন আনফুসিকুম’- আয়াতটি তেলাওয়াত করেন এবং বলেন: “আমি আমার খানদান, আত্মীয়তা ও পূর্বপুরুষের দিক দিয়ে তোমাদের মাঝে সেরা; হযরত আদম (আ:) হতে আরম্ভ করে আমার পূর্বপুরুষদের কেউই অবৈধ যৌনাচার করেননি।”

সাইয়্যেদাহ আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) মহানবী (দ:) হতে বর্ণনা করেন যে হযরত জিবরীল আমীন (আ:) বলেন, “আমি পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত খুঁজেও মহানবী (দ:)-এর মতো সেরা ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাইনি; আর বনূ হাশিম গোত্রের পুত্রদের মতো কোনো বাবার সন্তানের দেখাও পাইনি আমি।”

সহীহ বোখারী শরীফে হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে আদম সন্তানদের সেরা প্রজন্মে, একের পর এক, যতোক্ষণে আমি না পৌঁছেছি আমার (বর্তমান)-টিতে।”

সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত ওয়াতিলা ইবনে আল-আসকা’ বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান, “আল্লাহ পাক হযরত ইসমাঈল (আ:)-এর পুত্রদের মধ্যে কেনানাকে বেছে নিয়েছেন এবং কেনানা হতে কুরাইশ গোত্রকে পছন্দ করেছেন; অার কুরাইশ গোত্র হতে বনূ হাশিমকে বেছে নিয়েছেন; এবং চূড়ান্তভাবে হাশিমের পুত্রদের মাঝে আমাকেই পছন্দ করেছেন।”

হযরত আব্বাস (রা:) রেওয়ায়াত করেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বাণী, যিনি বলেন: “সৃষ্টিকুলের অস্তিত্ব দেয়ার পর আল্লাহ পাক আমাকে সেরা দলগুলোতে অধিষ্ঠিত করেন; এবং দুটো দলের মধ্যে সেরা দলে (আমি অধিষ্ঠিত হই)। অতঃপর তিনি গোত্রগুলো বেছে নেন এবং সেগুলোর সেরা পরিবারটিতে আমাকে অাবির্ভূত করেন। অতএব, আমার ব্যক্তিত্ব, আত্মা ও স্বভাব সর্বসেরা এবং আমি এগুলোর সেরা উৎস হতে আগত।”

হযরত ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আল্লাহতা’লা তাঁর সৃষ্টিকুলকে যাচাই করে আদম সন্তানদেরকে তা থেকে বাছাই করেন; এরপর তিনি আদম সন্তানদেরকে যাচাই করে তাদের মধ্য থেকে আরবদেরকে মনোনীত করেন; অতঃপর তিনি আরবদেরকে যাচাই করে আমাকে তাদের মধ্য হতে পছন্দ করে নেন। অতএব, আমি-ই সব পছন্দের সেরা পছন্দ। সতর্ক হও, আরবদেরকে যে মানুষেরা ভালোবাসে, তা আমার প্রতি ভালোবাসার কারণেই ভালোবাসে; আর যারা আরবদেরকে ঘৃণা করে, তারা আমাকে ঘৃণা করার কারণেই তা করে থাকে।”

জ্ঞাত হওয়া দরকার যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম তাঁর পিতামাতা হতে সরাসরি (জন্ম নেয়া) কোনো ভাই বা বোনের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন না; তিনি ছিলেন তাঁদের একমাত্র সন্তান এবং তাঁর খানদান তাঁরই কাছে এসে শেষ হয়। এভাবে তিনি এক অনন্য খানদানে বেলাদত-প্রাপ্ত হয়েছিলেন যা আল্লাহতা’লা (তাঁরই) নবুয়্যতের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছার জন্যে এরাদা (ঐশী ইচ্ছে) করেছিলেন, যে নব্যুয়ত সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী।

আপনারা যদি মহানবী (দ:)-এর উচ্চ বংশমর্যাদা ও তাঁর পবিত্র বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) সম্পর্কে বিচার-বিশ্লেষণ করেন, তবে আপনারা তাঁর মহাসম্মানিত পূর্বপুরুষদের ব্যাপারে নিশ্চিত হবেন। কেননা, তিনি হচ্ছেন আন্ নবী (দ:), আল-আরবী (দ:), আল-আবতাহী (দ:), আল-হারাআমী (দ:), আল-হাশেমী (দ:), আল-কুরাইশী (দ:), হাশেমী সন্তানদের সেরা, সেরা আরব গোত্রগুলোর মধ্য হতে পছন্দকৃত, সেরা বংশোদ্ভূত, সর্বশ্রেষ্ঠ খানদানে আগত, সেরা বর্ধনশীল শাখা, সবচেয়ে উঁচু স্তম্ভ, সেরা উৎস, সবচেয়ে মজবুত ভিত, সুন্দরতম বাচনভঙ্গির অধিকারী, সবচেয়ে বোধগম্য শব্দচয়নকারী, সর্বশ্রেষ্ঠ নির্ণায়ক মানদণ্ড, সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী, সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গ, পিতামাতার দু’দিক থেকেই সবচেয়ে সম্মানিত আত্মীয়স্বজন, এবং আল্লাহতা’লার জমিনে সবচেয়ে সম্মানিত ভূমি (আরবদেশ) হতে আগত। তাঁর অনেক মোবারক নাম রয়েছে, যার সর্বাগ্রে হলো মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম, যিনি আবদুল্লাহ’র পুত্র। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে রয়েছেন তাঁরই দাদা আবদুল মোত্তালিব, যাঁর নাম শায়বাত আল-হামদ; হাশেমের পুত্র আমর, আবদ মানাআফের পুত্র আল-মুগীরা, কুসাইয়ের পুত্র মোজাম্মী’, কিলাআবের পুত্র হাকীম, মুররার পুত্র, (কুরাইশ গোত্রীয়) কাআবের পুত্র, লু’আইয়ের পুত্র, গালিবের পুত্র, ফিহর-এর পুত্র, যাঁর নাম কুরাইশ, মালেকের পুত্র, আল-নাযহিরের পুত্র, যাঁর নাম কায়েস, কিনানার পুত্র, খুযায়মার পুত্র, মুদরিকার পুত্র, ইলিয়াসের পুত্র, মুদারের পুত্র, নিযারের পুত্র, মাআদ্দ-এর পুত্র, আদনানের পুত্র।

ইবনে দিহিয়া বলেন, “উলেমাবৃন্দ (এ ব্যাপারে) একমত এবং জ্ঞানীদের এই ঐকমত্য একটি প্রামাণ্য দলিল যে মহানবী (দ:) তাঁর পূর্বপুরুষদের নাম আদনান পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন এবং এর ওপরে আর যাননি।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম তাঁর পূর্বপুরুষদের বংশপরম্পরা উল্লেখ করার সময় কখনোই আদনানের পুত্র মা’আদ্দ-এর ওপরে যেতেন না, বরঞ্চ এ কথা বলে শেষ করতেন, “বংশ বর্ণনাকারীরা (উদ্ভববিজ্ঞানীরা) মিথ্যে বলেছে।” এ কথা তিনি দু’বার বা তিনবার বলতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “আদনান ও হযরত ইসমাঈল (আ:)-এর মধ্যে ত্রিশজন পূর্বপুরুষের নাম অজ্ঞাত রয়েছে।”

কাআব আল-আহবার (রহ:) বলেন, “মহানবী (দ:)-এর নূর (জ্যোতি) আবদুল মোত্তালিবের কাছে পৌঁছুবার কালে তিনি পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন; ওই সময় এক রাতে তিনি কা’বা ঘরের বহিঃপ্রাঙ্গনে ঘুমিয়েছিলেন। (সকালে) জেগে উঠলে তাঁর চোখ দুটো কালো সুরমামাখা ও চুল তেলমাখা এবং পরনে সুন্দর জাঁকজমকপূর্ণ জামাকাপড় দেখা যায়। কে এ রকম করেছেন, তা না জানার দরুন তিনি বিস্মিত হন। তাঁর পিতা তাঁকে হাত ধরে দ্রুত কুরাইশ বংশীয় গণকদের কাছে নিয়ে যান। তারা তাঁর পিতাকে বলেন পুত্রকে বিয়ে দিতে। তিনি তা-ই করেন। আবদুল মোত্তালিবের শরীর থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ মেশকের গন্ধ বের হতো, আর তাঁর ললাট হতে উজ্জ্বল প্রভা ছড়াতো নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)। কখনো খরা দেখা দিলে কুরাইশ গোত্র তাঁকে ‘সাবীর’পর্বতে নিয়ে যেতো এবং তাঁরই অসীলায় আল্লাহর দরবারে বৃষ্টি প্রার্থনা করতো। আল্লাহ পাক-ও তাদের প্রার্থনার জবাব দিতেন এবং নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে
ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর খাতিরে বৃষ্টি বর্ষণ করতেন।”

ইয়েমেনী রাজা আবরাহা যখন পবিত্র কা’বা ঘর ধ্বংসের অভিপ্রায়ে মক্কা শরীফ অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং এর খবর কুরাইশ গোত্রের কাছে পৌঁছে, তখন আবদুল মোত্তালিব তাদের বলেন, “সে (বাদশাহ) এই ঘর পর্যন্ত পৌঁছুবে না, কারণ এটি মহান প্রভুর সুরক্ষায় আছে।” মক্কা মোয়াযযমার পথে বাদশাহ আবরাহা কুরাইশ গোত্রের অনেক উট ও ভেড়া লুঠপাট করে; এগুলোর মধ্যে ছিল আবদুল মোত্তালিবের মালিকানাধীন চার’শ মাদী উট। এমতাবস্থায় তিনি সওয়ারি হয়ে অনেক কুরাইশকে সাথে নিয়ে ’সাবীর’ পর্বতে আরোহণ করেন। সেখানে নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর কপালে অর্ধ চন্দ্রাকারে দৃশ্যমান হয় এবং সেটির আলোকোচ্ছ্বটা পবিত্র (কা’বা) ঘরে প্রতিফলিত হয়। আবদুল মোত্তালিব তা দেখার পর বলেন, “ওহে কুরাইশ গোত্র, তোমরা এখন ফিরে যেতে পারো, কেননা কা’বা এখন নিরাপদ। আল্লাহর কসম! এই কিরণ (নূর) যখন আমাকে ঘিরে রেখেছে, তখন কোনো সন্দেহ নেই যে বিজয় আমাদেরই হবে।”

কুরাইশ গোত্রীয় মানুষেরা মক্কায় ফিরে গেলে আবরাহা রাজার প্রেরিত এক ব্যক্তির সাথে তাদের দেখা হয়। আবদুল মোত্তালিবের চেহারা দেখে ওই ব্যক্তি ভাবাবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাঁর জিহ্বা তোতলাতে থাকে; তিনি মুর্ছা যান, আর তাঁর কণ্ঠ থেকে জবেহকৃত বৃষের আওয়াজ বেরুতে থাকে। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি আব্দুল মোত্তালিবের পায়ে পড়ে যান এ কথা বলে, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি সত্যিসত্যি কুরাইশ গোত্রের অধিপতি।”

বর্ণিত আছে যে আবদুল মোত্তালিব যখন বাদশাহ আবরাহার মুখোমুখি হন, ওই সময় বাদশাহর সেনাবাহিনীতে সর্ববৃহৎ সাদা হাঁতিটি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে উট যেভাবে হাঁটু গেড়ে নত হয় ঠিক সেভাবে নত হয়ে যায় এবং সেজদা করে। আল্লাহতা’লা সেই প্রাণিকে বাকশক্তি দেন এবং সে বলে, “ওহে আবদুল মোত্তালিব, আপনার ঔরসে নূর (-এ-মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” রাজা আবরাহার বাহিনী কা’বা ঘর ধ্বংস করার জন্যে অগ্রসর হলে ওই হাঁতি আবারো হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তারা সেটিকে দাঁড় করানোর জন্যে মাথায় বেদম প্রহার করে, কিন্তু সেটি তা করতে অস্বীকার করে। তারা হাঁতিটিকে ইয়েমেনের দিকে মুখ করালে সেটি উঠে দাঁড়ায়। অতঃপর আল্লাহতা’লা বাদশাহর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সমুদ্র হতে এক ঝাঁক পাখি প্রেরণ করেন, যেগুলোর প্রত্যেকটি তিনটি করে পাথর বয়ে আনে: একটি পাথর ঠোঁটে, অপর দুটি দুই পায়ে। এই পাথরগুলো আকৃতিতে ছিল মশুরি ডালের দানার সমান। এগুলো সৈন্যদেরকে আঘাত করামাত্রই তারা মৃত্যুমুখে পতিত হতে থাকে। ফলে সৈন্যরা ভয়ে রণভঙ্গ দেয়। এমতাবস্থায় আবরাহা এক কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তার হস্তাঙ্গুলির ডগা এক এক করে পড়ে যেতে থাকে। আর তার শরীর থেকে রক্ত ও পুঁজ-ও বের হয়। অবশেষে তার হৃদযন্ত্র চৌচির হয়ে সে মারা যায়।

এই ঘটনাটি-ই আল্লাহতা’লা উল্লেখ করেছেন তাঁর পাক কালামে, যেখানে মহানবী (দ:)-কে সম্বোধন করে তিনি এরশাদ ফরমান, “হে মাহবূব! আপনি কি দেখেননি আপনার রব্ব (খোদাতা’লা) ওই হস্তী আরোহী বাহিনীর কী অবস্থা করেছেন?” [সূরা ফীল, ১ম আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]। এই ঘটনা আমাদের সাইয়্যেদুনা হযরতে মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের উচ্চমর্যাদার এবং তাঁর রেসালাত ও তা প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত বহন করে। এতে আরও ফুটে ওঠে তাঁরই উম্মতকে প্রদত্ত সম্মান ও তাঁদের প্রতি (খোদার) হেফাযত (সুরক্ষা), যার দরুন সমস্ত আরব জাতিগোষ্ঠী তাঁদের কাছে সমর্পিত হন এবং তাঁদের মহত্ত্ব ও বিশিষ্টতায় বিশ্বাস স্থাপন করেন। এটি এ কারণেই সম্ভব হয়েছে যে আল্লাহ পাক তাঁদেরকে হেফাযত করেছেন এবং দৃশ্যতঃ অজেয় আবরাহা বাদশাহর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁদেরকে সমর্থন যুগিয়েছেন।

মায়ের গর্ভে প্রিয়নবী (দ:)

আবরাহা’র শ্যেনদৃষ্টি থেকে আল্লাহতা’লা কর্তৃক রক্ষা পাবার পর এক রাতে আবদুল মোত্তালিব কা’বা ঘরের প্রাঙ্গনে ঘুমোবার সময় এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেন। তিনি জেগে ওঠে ভয় পান এবং কুরাইশ গোত্রীয় গণকদের কাছে গিয়ে এর বিবরণ দেন। তারা তাঁকে বলে, “এ স্বপ্ন সত্য হলে আপনার ঔরসে এমন কেউ আসবেন যাঁর প্রতি আসমান ও জমিনের বাসিন্দারা বিশ্বাস স্থাপন করবেন এবং যিনি সুপ্রসিদ্ধি লাভ করবেন।” ওই সময় তিনি ফাতেমা নাম্নী এক মহিলাকে বিয়ে করেন, যাঁর গর্ভে জন্ম নেন আবদুল্লাহ আল-যাবীহ (রা:), যাঁর ইতিহাসও সর্বজনবিদিত।

অনেক বছর পরে আবদুল্লাহ (রা:) নিজ জীবনরক্ষার সদকাহ-স্বরূপ এক’শটি উট কোরবানি করে তাঁর পিতাসহ যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন তাঁরা ফাতেমা নাম্নী এক ইহুদী গণকের সাক্ষাৎ পান। সে কুরাইশ গোত্রের সেরা সুদর্শন যুবক আবদুল্লাহ (রা:)-এর চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনার জন্যে যতোগুলো উট কোরবানি করা হয়েছে, আমি ততোগুলো উট আপনাকে দেবো; তবে শর্ত হলো এই মুহূর্তে আপনাকে আমার সাথে সহবাস করতে হবে।” তার এ কথা বলার কারণ ছিল সে আবদুল্লাহ (রা:)-এর মুখমণ্ডলে নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) দেখতে পেয়েছিল। আর সে এও আশা করেছিল সম্মানিত মহানবী (দ:)-এর মাতা সে-ই হতে পারবে। কিন্তু আবদুল্লাহ (রা:) জবাব দেন:

হারামের মোকাবেলায় কাম্য কেবল মৃত্যু
আর আমি এতে দেখি না কোনো হালাল বা বৈধত্ব
বরঞ্চ এক্ষণে তোমার দ্বারা যা আমা হতে যাচিত
সম্মানী মানুষের তা হতে নিজ সম্মান ও দ্বীন রাখা চাই সুরক্ষিত।

পরের দিন আবদুল মোত্তালিব নিজ পুত্রকে ওয়াহাব ইবনে আবদ মানাআফের সাথে দেখা করিয়ে দেন; ইনি ছিলেন বনূ যোহরা গোত্রপ্রধান, বংশ ও খানদানে তাদের অধিপতি। আবদুল মোত্তালিব পুত্র আবদুল্লাহ (রা:)-কে ওয়াহাবের কন্যা আমিনা (রা:)-এর সাথে বিয়ে দেন; ওই সময় আমিনা (রা:) ছিলেন কুরাইশ গোত্রে বংশ ও পারিবারিক দিক দিয়ে অন্যতম সেরা মহিলা। অতঃপর মিনা দিবসগুলোর মধ্যে কোনো এক সোমবার আবূ তালিবের গিরিপথে তাঁরা দাম্পত্যজীবনের শুভসূচনা করেন এবং মহানবী (দ:) তাঁর মায়ের গর্ভে আসেন।

তৎপরবর্তী দিবসে আবদুল্লাহ (রা:) ঘরের বাইরে বেরুলে ইতিপূর্বে তাঁর কাছে প্রস্তাবকারিনী সেই মহিলার দেখা পান। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, “গতকাল যে প্রস্তাব তুমি আমায় দিয়েছিলে, আজ কেন তা আমায় দিচ্ছ না?” সে প্রত্যুত্তরে বলে, “গতকাল যে জ্যোতি তুমি বহন করেছিলে, তা আজ তোমায় ত্যাগ করেছে। তাই আমার কাছে আজ আর তোমাকে প্রয়োজন নেই। আমি ওই নূর আমার (গর্ভ) মাঝে পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু খোদাতা’লা তা অন্যত্র রাখার এরাদা করেছেন।”

মহানবী (দ:) তাঁর মা আমিনা (রা:)-এর গর্ভে আসার সূচনালগ্ন থেকেই বহু মো’জেযা তথা অলৌকিক বা অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটতে থাকে। সাহল ইবনে আবদিল্লাহ আত্ তুসতরী (রহ:) বলেন, “আল্লাহতা’লা যখন রজব মাসের কোনো এক শুক্রবার রাতে মহানবী (দ:)-কে তাঁর মায়ের গর্ভে পয়দা করেন, তখন তিনি বেহেশতের রক্ষক রিদওয়ানকে সর্বসেরা বেহেশতের দ্বার খুলে দিতে আদেশ করেন। কেউ একজন আসমান ও জমিনে ঘোষণা দেন যে অপ্রকাশ্য নূর যা দ্বারা হেদায়াতকারী পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) গঠিত হবেন, তা এই নির্দিষ্ট রাতেই তাঁর মায়ের গর্ভে আসবেন, যেখানে তাঁর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া পূর্ণতা পাবে। আরও ঘোষিত হয় যে তিনি সুসংবাদ দানকারী এবং সতর্ককারী হিসেবে (পৃথিবীতে) আবির্ভূত হবেন।”

কাআব আল-আহবার (রহ:) থেকে বর্ণিত আছে, মহানবী (দ:) তাঁর মায়ের গর্ভে আসার রাতে আসমানসমূহে এবং জমিনের প্রতিটি প্রান্তে ঘোষণা করা হয় যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে যে অপ্রকাশ্য নূর হতে সৃষ্ট, তা তাঁর মা আমিনা (রা:)-এর গর্ভে আসবেন।

উপরন্তু, ওই দিন পৃথিবীর বুকে যতো মূর্তি ছিল সবই মাথা নিচের দিকে এবং পা ওপরের দিকে উল্টো হয়ে গিয়েছিল। কুরাইশ গোত্র মারাত্মক খরাপীড়িত ও দুর্দশাগ্রস্ত ছিল; কিন্তু এই মহা আশীর্বাদধন্য ঘটনার বদৌলতে ধরণীতল আবারও শষ্যশ্যামল হয়ে ওঠে এবং বৃক্ষতরু ফলবতী হয়; আর আশীর্বাদ ও কল্যাণ (ওই গোত্রের) চারপাশ থেকে তাদের দিকে ধাবমান হয়। এ সব মঙ্গলময় লক্ষণের জন্যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম যে বছর তাঁর মায়ের গর্ভে আসেন, সেটিকে ‘বিজয় ও খুশির বছর’ বলা হয়।

ইবনে এসহাক বর্ণনা করেন যে আমিনা (রা:) সবসময়ই উল্লেখ করতেন মহানবী (দ:) তাঁর গর্ভে থাকাকালীন সময়ে ফেরেশতাবৃন্দ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসার কথা; আর তাঁকে বলা হতো, “এই জাতির অধিপতি আপনার গর্ভে অবস্থান করছেন।” তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন, “আমি কখনোই (মহানবীকে) গর্ভে ধারণ অবস্থায় অনুভব করিনি যে আমি গর্ভবতী। আর আমি অন্যান্য গর্ভবতী নারীদের মতো কোনো অসুবিধা বা খিদেও অনুভব করিনি। আমি শুধু লক্ষ্য করেছি যে আমার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একবার আমি যখন ঘুম আর জাগ্রতাবস্থার মাঝামাঝি ছিলাম, তখন কোনো এক ফেরেশতা এসে আমাকে বলেন, ‘আপনি কি মনুষ্যকুলের অধিপতিকে গর্ভে ধারণ করার অনুভূতি পাচ্ছেন?’ এ কথা বলে তিনি চলে যান। মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আবার এসে আমাকে বলেন: ‘বলুন, আমি তাঁর (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) প্রতি প্রত্যেক বিদ্বেষভাব পোষণকারীর ক্ষতি থেকে তাঁরই সুরক্ষার জন্যে মহান সত্তার মাঝে আশ্রয় প্রার্থনা করি এবং তাঁর নাম রাখি (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)’।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “মহানবী (দ:)-এর দ্বারা তাঁরই মায়ের গর্ভে আসার অলৌকিক ঘটনা (মো’জেযা)-গুলোর একটি হচ্ছে এই যে, ওই রাতে কুরাইশ গোত্রের মালিকানাধীন সমস্ত পশুপাখি মুখ খুলে এ কথা বলেছিল, “কা’বাগৃহের প্রভুর দোহাই, রাসূলুল্লাহ (দ:) (তাঁর মায়ের) গর্ভে এসেছেন। তিনি-ই হলেন সারা জাহানের অধিপতি এবং এর অধিবাসীদের জ্যোতি (নূর)। এমন কোনো রাজার সিংহাসন নেই যা আজ রাতে ওলটপালট না হয়ে গিয়েছে।” পূর্বাঞ্চলের তাবৎ পশুপাখি পশ্চিমাঞ্চলের পশুপাখির কাছে এই খোশখবরী নিয়ে ছুটে গিয়েছে; আর অনুরূপভাবে সাগরজলের অধিবাসীরাও একে অপরকে একইভাবে সম্ভাষণ জানিয়েছে। তাঁর গর্ভে আসার মাসের প্রতিদিনই আসমানে এলান (ঘোষণা) দেয়া হয়েছে এবং জমিনেও এলান দেয়া হয়েছে এভাবে: ‘খুশি উদযাপন করো, (কেননা) আশীর্বাদধন্য ও সৌভাগ্যবান আবূল কাসেম আবির্ভূত হবার সময় সন্নিকটে।”

আরেকটি রেওয়ায়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে ওই রাতে প্রতিটি ঘরই আলোকিত করা হয়েছিল, আর ওই নূর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল; উপরন্তু, সমস্ত প্রাণিজগত-ও কথা বলেছিল।

আবূ যাকারিয়্যা এয়াহইয়া ইবনে আইস্ বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর মায়ের গর্ভে পুরো নয় মাস অবস্থান করেছিলেন, আর (ওই সময়) তাঁর মা কখনোই এমন কোনো ব্যথা বা অসুবিধা অনুভব করেননি যা একজন গর্ভধারিনী মা গর্ভকালীন সময়ে অনুভব করে থাকে। তিনি সবসময়ই বলতেন, ‘এই গর্ভের চেয়ে সহজ আর কোনো গর্ভ আমি প্রত্যক্ষ করিনি, এর চেয়ে আশীর্বাদধন্য গর্ভও আমি দেখিনি’।”

আমিনা (রা:)-এর গর্ভকালের দ্বিতীয় মাসে আবদুল্লাহ (রা:) মদীনা মোনাওয়ারায় তাঁরই বনূ নাজ্জার গোত্রীয় চাচাদের উপস্থিতিতে বেসাল (খোদার সাথে পরলোকে মিলন)-প্রাপ্ত হন। তাঁকে আল-আবওয়া’ নামের স্থানে সমাহিত করা হয়। এ সময় ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, “হে আমাদের প্রভু ও মালিক! আপনার রাসূল (দ:) একজন এয়াতিম হয়ে গিয়েছেন।” জবাবে আল্লাহ পাক বলেন, “আমি-ই হলাম তাঁর রক্ষক ও সাহায্যকারী।”

মহানবী (দ:)-এর ধরাধামে আবির্ভাবে অলৌকিকত্ব

আমর ইবনে কুতায়বা তাঁর জ্ঞানী পিতা (কুতায়বা) থেকে শুনেছেন, তিনি বলেন: “আমিনা (রা:)-এর গর্ভের চূড়ান্ত সময় উপস্থিত হলে আল্লাহতা’লা ফেরেশতাদের আদেশ দেন, ‘আসমানের সব দরজা ও বেহেশতের সব দরজাও খুলে দাও।’ ওই দিন সূর্য তীব্র প্রভা দ্বারা সুসজ্জিত হয়, আর আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-এর ওয়াস্তে ওই বছর পৃথিবীতে সকল নারীর গর্ভে পুত্র সন্তান মঞ্জুর করেন।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে আমিনা সবসময় বলতেন, “আমার গর্ভ যখন ছয় মাস, তখন এক ফেরেশতা আমায় স্বপ্নে দেখা দেন এবং বলেন: ‘ওহে আমিনা, আপনি বিশ্বজগতের সেরা জনকে গর্ভে ধারণ করেছেন। তাঁর বেলাদতের সময় আপনি তাঁর নাম রাখবেন (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) এবং সেই নাম (মোবারক) গোপন রাখবেন।’ প্রসব বেদনা অনুভূত হতে শুরু করলে কেউই জানেননি যে আমি ঘরে একা। আবদুল মোত্তালিব-ও জানতে পারেননি, কেননা তিনি ওই সময় কা’বা ঘর তওয়াফ করছিলেন। আমি একটি প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পাই যা আমাকে ভীতিগ্রস্ত করে। অতঃপর লক্ষ্য করতেই মনে হলো একটি সাদা পাখির ডানা আমার হৃদয়ে (মধুর) পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে, যার দরুন আমার সমস্ত শংকা উবে যায়; আর আমার অনুভূত সমস্ত (প্রসব) বেদনাও প্রশমিত হয়। আমার সামনে দৃশ্যমান হয় এক সাদা রংয়ের শরবত, যা আমি পান করি। এরপর এক তীব্র জ্যোতি আমার প্রতি নিক্ষেপিত হয় এবং আমি কয়েকজন মহিলা দ্বারা নিজেকে পরিবেষ্টিত দেখতে পাই। এঁরা তালগাছের সমান লম্বা ছিলেন, আর এঁদেরকে দেখতে লাগছিল আবদ মানাআফ গোত্রের নারীদের মতোই। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে ভাবলাম, ‘এঁরা কীভাবে আমার সম্পর্কে জানলেন?’ ওই মহিলাবৃন্দ আমাকে বলেন, ‘আমরা হলাম ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া এবং ইমরানের কন্যা মরিয়ম।’ এদিকে আমার (শারীরিক) অবস্থা আরও তীব্র আকার ধারণ করলে ধুপধাপ আওয়াজও বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় আরও ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এই অবস্থায় অামি হঠাৎ দেখতে পাই একখানি সাদা রেশমের ফালি আসমান ও জমিনের মাঝে বিছিয়ে দেয়া হয় এবং কেউ একজন বলেন, ‘তাঁকে লুকিয়ে রাখো যাতে মানুষেরা দেখতে না পায়।’ আমি আকাশে রূপার পানি ঢালার ‘জগ’ হাতে নিয়ে মানুষদেরকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাই। অতঃপর এক ঝাঁক পাখি এসে আমার ঘর ভরে যায়; এগুলোর ঠোঁট ছিল পান্নার, আর ডানা লালমণির। আল্লাহতা’লা এমতাবস্থায় আমার চোখের সামনে থেকে পর্দা উঠিয়ে নেন এবং আমি প্রত্যক্ষ করি সারা পৃথিবীকে, পূর্ব হতে পশ্চিমে, যেখানে তিনটি পতাকা ছিল উড্ডীন: একটি পূর্বদিকে, আরেকটি পশ্চিমদিকে এবং তৃতীয়টি কা’বা গৃহের ওপর। ঠিক সে সময়ই মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হয়। তিনি ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথেই সেজদায় পড়ে যান এবং আসমানের দিকে হাত তুলে বিনীতভাবে দোয়া করেন। অতঃপর আমি দেখতে পাই আসমানের দিক থেকে একটি সাদা মেঘ এসে তাঁকে ঢেকে ফেলে, যার দরুন তিনি আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। একটি কণ্ঠস্বরকে আমি বলতে শুনি, ‘তাঁকে দুনিয়ার সকল প্রান্তে নিয়ে যাও, পূর্ব ও পশ্চিমদিকে, সাগর-মহাসাগরে, যাতে সবাই তাঁকে তাঁর (মোবারক) নামে, বৈশিষ্ট্যে ও আকৃতিতে চিনতে পারে।’ এর পরপরই ওই সাদা মেঘমালা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়।”

আল-খতীব আল-বাগদাদী (রহ:) বর্ণনা করেন আমিনা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “আমার গর্ভে (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত হওয়ার সময় আমি আধ্যাত্মিকতায় উদ্দীপ্ত আলোকোজ্জ্বল একখানি বড় মেঘ দেখতে পাই, যা’তে অনেকগুলো ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, ডানা ঝাপটানোর এবং মানুষের কথাবার্তার আওয়াজ শুনি। ওই মেঘ তাঁকে ঢেকে ফেলে এবং তিনি আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। অতঃপর আমি একটি কণ্ঠস্বরকে বলতে শুনি, ‘(সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-কে সারা পৃথিবীতে ঘোরাও। তাঁকে জ্বিন, ইনসান, ফেরেশতা, বন্য পশুপাখির মতো সমস্ত আত্মাবিশিষ্ট সত্তার কাছে প্রদর্শন করো। তাঁকে দাও আদম (আ:)-এর (দৈহিক) আকৃতি; শীষ নবী (আ:)-এর জ্ঞান; নূহ (আ:)-এর সাহস; ইব্রাহীম (আ:)-এর (মতোই খোদার) নৈকট্য; ইসমাঈল (আ:)-এর জিহ্বা; এসহাক (আ:)-এর (অল্পে) তুষ্টি; সালেহ নবী (আ:)-এর বাগ্মিতা; লুত (আ:)-এর প্রজ্ঞা; এয়াকুব (আ:)-এর (কাছে প্রদত্ত) শুভসংবাদ; মূসা (আ:)-এর শক্তি; আইয়ুব নবী (আ:)-এর ধৈর্য; ইউনূস নবী (আ:)-এর তাবেদারী/আনুগত্য; ইউশা বিন নূন (আ:)-এর দ্বন্দ্বসংঘাত মোকাবেলা করার সামর্থ্য; দাউদ (আ:)-এর প্রতি প্রদত্ত সুরক্ষা; দানিয়েল নবী (আ:)-এর (খোদা)-প্রেম; ইলিয়াস নবী (আ:)-এর উচ্চমর্যাদা; এয়াহইয়া (আ:)-এর নিষ্কলঙ্ক অবস্থা; এবং ঈসা (আ:)-এর কৃচ্ছ্বব্রত। অতঃপর তাঁকে অবগাহন করাও আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর বৈশিষ্ট্যসমূহের মহাসমুদ্রে।’ এরপর ওই মেঘ সরে যায় এবং সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) একটি সবুজ রেশমের টুকরো হাতে পেঁচিয়ে শক্তভাবে ধরেন; আর তা থেকে অনবরত পানি বেরোচ্ছিল। এমতাবস্থায় কেউ একজন বলেন, ‘উত্তম, উত্তম, মহানবী (দ:) সমগ্র জগতকে মুঠোর মধ্যে নিয়েছেন; জগতের সমস্ত সৃষ্টি-ই তাঁর মুঠোর অভ্যন্তরে রয়েছে, কেউই বাদ পড়েনি।’ এমতাবস্থায় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁকে জ্যোৎস্না রাতের পূর্ণচন্দ্রের মতোই (আলোকোজ্জ্বল) দেখাচ্ছিল। তাঁর কাছ থেকে ওই সময় সেরা মেশকের সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল। আর এমনই সময় হঠাৎ সেখানে আবির্ভূত হন তিনজন। একজনের হাতে ছিল রুপার নির্মিত পানি ঢালার ‘জগ’; দ্বিতীয়জনের হাতে পান্নার তৈরি কাপড় কাচার বড় কাঠের পাত্র; আর তৃতীয়জনের হাতে ছিল এক টুকরো সাদা রংয়ের রেশমবস্ত্র, যা তিনি মোড়ানো অবস্থা থেকে খোলেন। এরপর তিনি একটি চোখ ধাঁধানো আংটি বের করে তা ওই ‘জগ’ হতে পানি দ্বারা সাতবার ধোন এবং সেই আংটির সাহায্যে মহানবী (দ:)-এর পিঠে (দুই কাঁধের মাঝে) একটি মোহর বা সীল এঁকে দেন। অতঃপর ওই রেশম দ্বারা তিনি তাঁকে মুড়িয়ে নিজ ডানার নিচে বহন করে এনে আমার কাছে ফেরত দেন।” [সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম]

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, “মহানবী (দ:)-এর যখন বেলাদত হয়, তখন বেহেশতের রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা রিদওয়ান তাঁর কানে কানে বলেন, ‘ওহে (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম), খুশি উদযাপন করুন। কেননা, অন্যান্য পয়গম্বরের যতো জ্ঞান আছে, তার সবই আপনাকে মঞ্জুর করা হয়েছে। অতএব, আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মধ্যে আপনি-ই সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সাহসীও’।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন আমিনা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “আমার গর্ভে মহানবী (দ:)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হলে তাঁর সাথে আবির্ভূত হয় এক জ্যোতি, যা পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে অবস্থিত সমস্ত আকাশ আলোকিত করে। এরপর তিনি মাটিতে নেমে হাতের ওপর ভর দিয়ে এক মুঠো মাটি তুলে নেন এবং শক্তভাবে ধরেন; অতঃপর তিনি আসমানের দিকে তাঁর মস্তক মোবারক উত্তোলন করেন।”

আত্ তাবারানী (রহ:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) যখন মাটিতে নামেন, তখন তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ ছিল এবং তাঁর তর্জনী আল্লাহতা’লার একত্বের সাক্ষ্য দিতে ওপরদিকে ওঠানো ছিল।

উসমান ইবনে আবি-ইল-আস্ বর্ণনা করেন যে তাঁর মাতা ফাতেমা বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদতের সময় আমি দেখতে পাই (আমিনার) ঘর আলোকিত হয়ে গিয়েছিল এবং তারকারাজি এতো কাছে চলে এসেছিল যে আমি মনে করেছিলাম সেগুলো বুঝি আমার ওপরই পড়ে যাবে।”

আল-এরবায ইবনে সারিয়্যা (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমি-ই হলাম আল্লাহতা’লার বান্দা ও আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর সীলমোহর; ঠিক সে সময় হতে আমি তা-ই, যখন আদম (আ:)-এর কায়া মাটি ছিল। আমি এই বিষয়টি তোমাদের কাছে ব্যাখ্যা করবো: আমি-ই আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম (আ:)-এর দোয়ার উত্তর (ফসল); আর ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত শুভসংবাদ; আর আমার মায়ের দেখা স্বপ্নের বিষয়বস্তু। পয়গম্বরবৃন্দের মায়েরা অহরহ-ই (এ ধরনের) স্বপ্ন দেখে থাকেন।” মহানবী (দ:)-এর মা আমিনা (রা:) তাঁর বেলাদতের সময় এমন এক নূর (জ্যোতি) দেখতে পান যার আলোকোচ্ছ্বটায় সিরিয়ার প্রাসাদগুলোও আলোকিত হয়। হুযূর পূর নূর (দ:)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:) তাঁর রচিত কবিতায় এই বিষয়টি-ই উল্লেখ করেন এভাবে –

”(হে নবী) আপনার বেলাদত হয়েছিল যবে
ভুবন ও দিগন্ত আলোকিত হয়েছিল আপনারই নূরের বৈভবে
সেই নূরের আলোয় ও ন্যায়ের পথেই চলেছি আমরা সবে।”

ইবনে সাআদ (রহ:) বর্ণনা করেন যে আমিনা (রা:)-এর গর্ভে যখন মহানবী (দ:)-এর বেলাদত হয়, তখন নবজাতকের শরীরে যে প্রসবোত্তর মল থাকে তা তাঁর মধ্যে ছিল না।

সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও জর্দান (শাম-দেশ)-এর প্রাসাদগুলো আলোকিত হওয়ার যে কথা (বর্ণনায়) এসেছে, সে সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে মহানবী (দ:)-এর নবুওয়্যতের নূর হতে ওই সমস্ত রাজ্য আশীর্বাদধন্য হয়েছে; কেননা, ওগুলো তাঁরই নবুওয়্যতের এলাকাধীন। এ কথা বলা হয়েছে, “ওহে কুরাইশ গোত্র, রেসালাত এখন আর বনী ইসরাঈল বংশের আয়ত্তে নেই। আল্লাহর কসম, মহানবী (দ:) তোমাদেরকে এমন প্রভাব বিস্তারের দিকে পরিচালনা করবেন, যা পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হবে।”

মহানবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনকালীন অলৌকিক ঘটনাবলীর কিছু কিছু ইমাম এয়াকূব ইবনে সুফিয়ান নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে নিজ ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন যে পারস্যরাজ কিসরা (খসরু)-এর প্রাসাদ ওই সময় কেঁপে উঠেছিল এবং সেটির চৌদ্দটি ঝুল-বারান্দা ভেঙ্গে পড়েছিল; তাইবেরিয়াস হৃদের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল; পারস্যের আগুন নিভে গিয়েছিল (যা অসংখ্য বর্ণনামতে এক হাজার বছর যাবত অবিরাম জ্বলেছিল); আর আসমানে প্রহরী ও ধুমকেতুর সংখ্যা বৃদ্ধি দ্বারা নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে শয়তানের দলের আড়ি পাতার বদমাইশিকে প্রতিরোধ করা হয়েছিল।

হযরত ইবনে উমর (রা:) ও অন্যান্যদের বর্ণনানুযায়ী, হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বেলাদত খতনা অবস্থায় হয় এবং তাঁর নাড়িও ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গিয়েছিল। হযরত আনাস (রা:) উদ্ধৃত করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমার মহান প্রভু কর্তৃক আমার প্রতি মঞ্জুরিকৃত উচ্চমর্যাদার একটি হলো, আমার বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) খতনা অবস্থায় হয়েছে এবং কেউই আমার গোপন অঙ্গ দেখেনি।”

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদতের বছর সম্পর্কে (ঐতিহাসিকদের) বিভিন্ন মত রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মত হচ্ছে তিনি ’হস্তীর বছর’ ধরণীতে আগমন করেন। সেটি ছিল আবরাহা বাদশাহ’র হস্তী বাহিনীর ঘটনার পঞ্চাশ দিন পরে পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখের ভোরে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত সোমবার হয়; রেসালাতের দায়িত্বও সোমবার তাঁর প্রতি ন্যস্ত হয়; মক্কা মোয়াযযমা থেকে মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত-ও করেন সোমবার; মদীনায় আগমনও করেন সোমবার; আর কালো পাথর বহনও করেন সোমবার। উপরন্তু, মক্কা বিজয় ও সূরা আল-মায়েদা অবতীর্ণ হবার উভয় দিন-ই ছিল সোমবার।”

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আল-আস্ (রহ:) বর্ণনা করেন, “সিরিয়াবাসীদের এক পুরোহিত বসবাস করতেন মারর্ আল-যাহরান এলাকায়, যাঁর নাম ছিল ইয়াসা। তিনি সবসময় বলতেন, ‘মক্কায় এক নবজাতক শিশুর আবির্ভাবের সময় হয়ে এসেছে, যাঁর কাছে আরব জাতি সমর্পিত হবে; আর অনারব জাতিগোষ্ঠীও যাঁর কর্তৃত্বাধীন হবে। এটি-ই তাঁর (নবুওয়্যতের) জমানা।’ কোনো নবজাতকের জন্মের খবর পেলেই ওই পুরোহিত তার খোঁজখবর নিতেন। সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত (ধরণীতে শুভাগমন) দিবসে আবদুল মোত্তালিব ঘর থেকে বেরিয়ে পুরোহিত ইয়াসা’র সাথে দেখা করতে যান। তিনিও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে বলেন, ‘আপনাকে যে নবজাতকের ব্যাপারে বলেছিলাম, আপনি যেন তাঁর আশীর্বাদধন্য পিতামহ হোন। আমি বলেছিলাম, তাঁর বেলাদত হবে সোমবার, নবুওয়্যত পাবেন সোমবার, বেসাল (পরলোকে খোদার সাথে মিলন)-প্রাপ্তিও হবে সোমবার।’ আবদুল মোত্তালিব জবাবে বলেন, ‘এই রাতে, ভোরে আমার (ঘরে) এক নবজাতক আবির্ভূত হয়েছেন।’ পুরোহিত জিজ্ঞেস করেন, ‘তাঁর নাম কী রেখেছেন?’ তিনি উত্তর দেন, ‘(সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)।’ ইয়াসা বলেন, ‘এই নবজাতক আপনার আত্মীয়ের (বংশের) মধ্যে আবির্ভূত হবেন বলেই আমি আশা করেছিলাম। আমার কাছে এর তিনটি আলামত ছিল: তাঁর তারকা (রাশি) গতকাল উদিত হয়; তাঁর বেলাদত হয় আজ; এবং তাঁর নাম (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)’।” সৌর বছরের সেই দিনটি ছিল ২০শে এপ্রিল এবং বর্ণিত আছে যে তাঁর বেলাদত হয়েছিল রাতে।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বর্ণনা করেন, “মহানবী (দ:)-এর বেলাদত যে রাতে হয়েছিল, ঠিক ওই সময় একজন ইহুদী বণিক মক্কা মোয়াযযমায় অবস্থান করছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে কুরাইশ গোত্র! আজ কি আপনাদের কোনো নবজাতকের আবির্ভাব হয়েছে?’ তাঁরা উত্তর দেন, ‘আমরা জানি না।’ তিনি তখন তাঁদেরকে বলেন, ‘আজ রাতে সর্বশেষ উম্মতের পয়গম্বরের বেলাদত হবে। তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে ঘোড়ার (ঘাড়ে) কেশের মতো কিছু কেশসম্বলিত একটি চিহ্ন থাকবে।’ কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ওই ইহুদীকে সাথে নিয়ে আমিনা (রা:)-এর কাছে যান এবং তাঁর পুত্রকে দেখা যাবে কি না তা তাঁর কাছে জানতে চান। তিনি তাঁদের সামনে নিজ নবজাতক পুত্রকে নিয়ে আসেন এবং তাঁরা তাঁর পৃষ্ঠদেশ হতে কাপড় সরালে সেই চিহ্নটি দৃশ্যমান হয়। এতে ওই ইহুদী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরলে তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার জন্যে আফসোস! আপনার আবার কী হলো?’ তিনি উত্তর দেন, ‘আল্লাহর কসম! বনী ইসরাঈল বংশ হতে নবুওয়্যত অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে’।”

আল-হাকীম (নিশাপুরী) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) মক্কা মোকাররমা’র মোহাম্মদ বিন ইউসূফের ঘরে আবির্ভূত হন। তাঁর দুধ-মায়ের নাম সোয়াইবিয়া, যিনি ছিলেন আবূ লাহাবের বাঁদি এবং যাঁকে হুযূর পাক (দ:)-এর বেলাদতের খোশ-খবরী নিয়ে আসার জন্যে তাঁর মনিব (আবূ লাহাব) মুক্ত করে দিয়েছিল। আবূ লাহাবের মৃত্যুর পরে তাকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তুমি এখন কেমন আছো?’ সে জবাব দেয়, ‘আমি দোযখে (নরকে) আছি। তবে প্রতি সোমবার আমাকে রেহাই দেয়া হয়; সেদিন আমি আমার এই আঙ্গুলগুলো হতে পানি পান করতে পারি।’ এ কথা বলার সময় সে তার দুটো আঙ্গুলের ডগা দেখায়। সে আরও বলে, ‘এই মো’জেযা (অলৌকিকত্ব) এ কারণে যে, মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের সুসংবাদ নিয়ে আসার জন্যে আমি আমার দাসী সোয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম।’

ইবনে আল-জাযেরী বলেন, “অবিশ্বাসী আবূ লাহাব, যাকে আল-কুরআনে ভর্ৎসনা (লা’নত) করা হয়েছে, তাকে যদি মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের খুশি উদযাপনের কারণে পুরস্কৃত করা হয়, তাহলে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর উম্মতের মধ্যে সেসব মুসলমানের কী শান হবে, যাঁরা তাঁর বেলাদতে খুশি উদযাপন করেন এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ সর্বাত্মক উদ্যোগ নেন? আমার জীবনের কসম, মহা করুণাশীল আল্লাহতা’লার তরফ থেকে তাঁদের পুরস্কার হলো আশীর্বাদধন্য বেহেশতে প্রবেশাধিকার, যেখানে (তাঁদের জন্যে) অপেক্ষারত মহান প্রভুর অশেষ রহমত, বরকত ও নেয়ামত।”

ইসলামপন্থী সর্বসাধারণ সবসময়-ই রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমনের (মীলাদুন্নবীর) মাস (রবিউল আউয়াল)-কে ভোজন-আপ্যায়ন, সর্বপ্রকারের দান-সদকাহ, খুশি উদযাপন, বেশি বেশি নেক আমল এবং সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্রাম)-এর বেলাদতের বৃত্তান্ত সযত্নে পাঠ ও অধ্যয়নের মাধ্যমে উদযাপন করে থাকেন। এরই প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহতা’লা-ও ঈমানদারদেরকে এই পবিত্র মাসের অফুরন্ত নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন। মওলিদ নামে পরিচিত মহানবী (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত-দিবসের একটি প্রমাণিত বা প্রতিষ্ঠিত বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, এটি সারা বছরের জন্যে (খোদায়ী) হেফাযত বা সুরক্ষা বয়ে আনে এবং সেই সাথে সকল নেক মকসূদ পূরণেরও শুভবার্তা নিয়ে আসে। রাসূলে পাক (দ:)-এর মওলিদের আশীর্বাদধন্য মাসের রাতগুলোকে যাঁরা উদযাপন করেন, তাঁদের প্রতি আল্লাহতা’লা যেন তাঁর খাস্ রহমত নাযেল করেন, (আমীন)!

অত্যাশ্চর্যজনক ঘটনাবহুল বাল্যকাল

সাইয়্যেদা হালিমা (রা:) বলেন, “আমি বনূ সা’আদ ইবনে বকর গোত্রের আরও কয়েকজন (শিশুদেরকে বুকের দুধ খাওয়ানোর) ধাত্রীসহ নবজাতক শিশুদের খোঁজে মক্কা মোকাররমায় এসেছিলাম। ধাত্রী (পেশার) জন্যে সম্ভাব্য নবজাতক পাওয়ার বেলায় সেই বছরটি খারাপ যাচ্ছিল। আমি ও আমার বাচ্চা একটি গাধীর পিঠে চড়ে মক্কায় আসি; আর আমার স্বামী এমন একটি বয়স্ক উটনীকে টেনে আনেন যার এক ফোঁটা দুধও ছিল না। যাত্রা চলাকালে রাতে আমরা তিনজন ঘুমোতে পারিনি এবং আমার বাচ্চাকে খাওয়ানোর মতো কোনো বুকের দুধও আমি পাইনি।

“আমরা যখন মক্কা শরীফে এসে পৌঁছি, তখন আমাদের দলের প্রত্যেক মহিলাকে মহানবী (দ:)-এর ধাত্রী হওয়ার জন্যে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু তাঁকে বাবা ইন্তেকালপ্রাপ্ত এয়াতীম জানার পর প্রত্যেকেই ওই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। আক্ষরিকভাবে আমার বান্ধবীদের কেউই কোনো নবজাতক ছাড়া মক্কা মোয়াযযমা ত্যাগ করেননি, কিন্তু তারা সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-কে গ্রহণ করতে রাজি হননি। আমি এমতাবস্থায় কোনো নবজাতক শিশু না পেয়ে আমার স্বামীকে বলি যে, কোনো শিশু ছাড়া ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দলে আমি-ই একমাত্র ব্যক্তি হওয়ার ব্যাপারটি আমি পছন্দ করি না। আর তাই আমি ওই নবজাতক শিশুকে নিতে চাই।

“নবজাতক শিশুকে নেয়ার সময় তাঁর পরণে ছিল দুধের চেয়েও সাদা একটি পশমের জামা। মেশকের সুগন্ধ তাঁর গা থেকে ছড়াচ্ছিল। চিৎ হয়ে গভীর ঘুমে অচেতন অবস্থায় তিনি শুয়েছিলেন একখানা সবুজ রংয়ের রেশমী বস্ত্রের ওপর। তাঁর সৌন্দর্য ও মাধুর্য দর্শনে বিমোহিত হয়ে ঘুম না ভাঙ্গানোর বেলায় আমি যত্নশীল হই। সযত্নে কাছে গিয়ে তাঁর বুকের ওপর আমার হাত রাখলে পরে তিনি হেসে চোখ মেলে তাকান। তাঁর নয়নযুগল হতে এমন এক জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়, যা সারা আসমান আলোকিত করে; আর ওই সময় আমি (এই নয়নাভিরাম দৃশ্য) তাকিয়ে দেখছিলাম। তাঁর দু’চোখের মাঝে আমি চুম্বন করি এবং আমার ডানদিকের বুকের দুধ তাঁকে পান করাই, যা তাঁকে পরিতৃপ্ত করে। অতঃপর বাঁ দিকের বুকের দুধ পান করাতে চাইলে তিনি তা ফিরিয়ে দেন। যতোদিন তিনি আমার বুকের দুধ পান করেছিলেন, এভাবেই করেছিলেন। তিনি পরিতৃপ্ত হলে আমি আমার পুত্রকে বাঁ দিকের বুকের দুধ পান করাতাম। তাঁকে আমার তাঁবুতে আনার পরপরই আমার দু’বুকে দুধ এসে গিয়েছিল। আল্লাহতা’লার মহিমায় সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ণ তৃপ্তিসহ দুধ পান করেন, যেমনটি করেছিল তাঁর ভাই-ও। আমার স্বামী আমাদের জন্যে তাঁর সেই উটনীর দুধ আনতে যেয়ে দেখতে পান সেটির স্তন-ও দুধে পরিপূর্ণ! তিনি উটনীর দুধ দোহন করেন এবং আমরা তা তৃপ্তি সহকারে পান করি। আমাদের জীবনে সেটি ছিল এক বিস্ময়কর রাত! আমার স্বামী পরে মন্তব্য করেন, ‘ওহে হালিমা! মনে হচ্ছে তুমি এক পুণ্যাত্মাকে বেছে নিয়েছ। আমরা প্রথম রাতটি আশীর্বাদ ও (ঐশী) দানের মাঝে কাটিয়েছি; আর তাঁকে (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামকে) বেছে নেয়ার পর থেকে আল্লাহতা’লার এই দান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

“রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর মাকে বিদায় জানিয়ে আমি তাঁকে (মহানবীকে) আমার হাতে নিয়ে নিজস্ব গাধীর পিঠে চড়ে বসি। আমার গাধী অন্যান্য সকল সঙ্গির সওয়ারি জন্তুদের পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যায়, যা তাঁরা অবাক হয়ে দেখতে থাকেন। বনূ সা’অাদ গোত্রের বসত এলাকা, যা (আরবের) বিরাণ ভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম, তাতে পৌঁছুলে পরে আমরা দেখতে পাই যে আমাদের ভেড়ীগুলোও দুধে পরিপূর্ণ। আমরা দুধ দোহন করে প্রচুর দুধ পান করি; সেটি এমন-ই এক সময় হয়েছিল, যখন কোনো ওলানেই এক ফোঁটা দুধ-ও পাওয়া যাচ্ছিল না। অন্যান্যরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি আরম্ভ করেন, ‘আবূ সোয়াইবের কন্যার গবাদিপশু যেখানে চরে, সেই চারণভূমিতে পশুর পাল চরাও।’ তবুও তাদের ভেড়ার পাল অভুক্ত ফিরতো, আর আমার পশুর পাল স্তনভর্তি দুধসহ ফিরতো।”

রাসূলে পাক (দ:)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:) বলেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনার নবুওয়্যতের একটি নিদর্শনের আমি সাক্ষী হওয়ার দরুন আপনার ধর্মগ্রহণ করেছিলাম। আমি প্রত্যক্ষ করি যে আপনি (শিশু থাকতে) চাঁদের সাথে মহব্বতের সাথে কথা বলেছিলেন এবং আপনার আঙ্গুল তার দিকে নির্দেশ করেছিলেন। আপনি যেদিকে আঙ্গুল নির্দেশ করেছিলেন, আকাশের সেদিকেই চাঁদ ধাবিত হয়েছিল।” হুযূর পূর নূর (দ:) জবাব দেন, “আমি চাঁদের সাথে কথা বলছিলাম, আর চাঁদ-ও আমার সাথে আলাপ করছিল, যার দরুন আমার কান্না বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেটিকে আরশের নিচে সেজদা করার আওয়াজ-ও আমি শুনতে পেয়েছিলাম।”

’ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে মহানবী (দ:) ধরাধামে শুভাগমনের সাথে সাথেই কথা বলেন। ইবনে সাব’ উল্লেখ করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দোলনায় ফেরেশতাবৃন্দ দোল দেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে হযরত হালিমা (রা:) সবসময় বলতেন যে মহানবী (দ:)-কে প্রথমবার যখন তিনি মাই ছাড়ান (মানে শক্ত খাবারে অভ্যস্ত হতে তা খেতে দেন), তখন তিনি উচ্চারণ করেন, “আল্লাহতা’লা শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ; আর সমস্ত প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য; সূচনা থেকে অন্ত পর্যন্ত তাঁরই পবিত্র মহিমা” (আল্লাহু আকবর কবীরা; ওয়াল্ হামদু লিল্লাহি কাসীরা; ওয়া সোবহানাল্লাহি বুকরাতান্ ওয়া আসীলা)। তিনি বড় হলে পরে বাইরে যেতেন এবং অন্যান্য শিশুদের খেলতে দেখলে তাদের এড়িয়ে চলতেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে নবী করীম (দ:)-এর (পিতামাতার দ্বারা পালিত তাঁর) বোন আল-শায়মা’আ (রা:) প্রত্যক্ষ করেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বাল্যকালেই একটি মেঘ মহানবী (দ:)-কে সবসময় ছায়া দান করতো। তিনি পথ চল্লে সেটিও তাঁর সাথে চলতো, তিনি থামলে সেটিও থেমে যেতো। তিনি অন্য কোনো ছেলের মতো করে বড় হননি। হযরত হালিমা (রা:) বলেন, “আমি তাঁকে মাই ছাড়ানোর পর তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে যাই, যদিও আমরা তাঁকে কাছে রাখার ইচ্ছা পোষণ করছিলাম তাঁর মাঝে সমস্ত আশীর্বাদ দর্শন করে। আমরা তাঁর মায়ের কাছে অনুরোধ জানাই তাঁকে আমাদের কাছে থাকতে দেয়ার জন্যে, যতোক্ষণ না তিনি আরও শক্তিশালী হন। কেননা, আমরা মক্কার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠার ব্যাপারে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম। আমরা বারংবার অনুরোধ করতে থাকি, যার ফলশ্রুতিতে তিনি রাজি হন মহানবী (দ:)-কে আমাদের কাছে ফেরত পাঠাতে।”

প্রারম্ভিক শৈশবকালীন মো’জেযা (অলৌকিকত্ব)

[হালিমা (রা:) আরও বর্ণনা করেন] “আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে সাথে করে ফেরত নিয়ে আসার দুই বা তিন মাস পরে আমরা আমাদের বাড়ির পেছনে নিজস্ব কিছু গবাদি পশুর যত্ন নেয়ার সময় তাঁর দুধ-ভাই (হালিমার ছেলে)
ছুটে আসে এই বলে চিৎকার করতে করতে – ‘আমার কুরাইশ-গোত্রীয় ভাইয়ের কাছে সাদা পোশাক-পরিহিত দু’জন মানুষ আসেন। তাঁরা তাঁকে শুইয়ে তাঁর বক্ষবিদীর্ণ করেন।’ ছেলের বাবা ও আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই। মহানবী (দ:) তখন দাঁড়ানো এবং তাঁর চেহারার রং বদলে গিয়েছে। তাঁর (পালক) বাবা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে পুত্র! কী হয়েছে আপনার?’ সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দেন, ‘সাদা পোশাক পরা দুই ব্যক্তি আমার কাছে আসেন। তাঁরা আমাকে শুইয়ে আমার বক্ষবিদীর্ণ করেন। অতঃপর তাঁরা (শরীরের) ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে ফেলে দেন এবং বক্ষ যেমনটি ছিল ঠিক তেমনটি জোড়া লাগিয়ে দেন।’ আমরা তাঁকে বাড়ি নিয়ে আসি এবং তাঁর (পালক) পিতা বলেন, ‘ওহে হালিমা! আমি আশংকা করি আমাদের এই ছেলের কিছু একটা হয়েছে। আরও খারাপ কিছু হওয়ার আগে চলো তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে ফেরত দিয়ে আসি!’

“আমরা রাসূল (দ:)-কে মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা তাঁকে নেয়ার জন্যে এতো আগ্রহ প্রকাশের পরে কী কারণে আবার ফেরত এনেছো?’ আমরা তাঁকে জানাই যে মহানবী (দ:)-এর খারাপ কিছু হতে পারে ভেবে আমরা শংকিত (তাই নিয়ে এসেছি)। আমিনা (রা:) বলেন, ‘তা হতে পারে না; তোমরা সত্য কথাটি বলো যে আসলে কী হয়েছে।’ তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় থাকার দরুন আমরা আসল ঘটনা খুলে বলি। এমতাবস্থায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি ভয় পেয়েছো যে শয়তান তাঁর ক্ষতি করবে? না, তা কখনোই হতে পারে না। আল্লাহর কসম, শয়তান কোনোক্রমেই তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমার এই ছেলে মহা সম্মানের অধিকারী কেউ হবেন। তোমরা এক্ষণে তাঁকে (আমার কাছে) রেখে যেতে পারো’!”

হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা:) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “আমি বনী সা’আদ ইবনে বকর গোত্রে (দুধ-মায়ের) লালন-পালনে থাকাকালীন একদিন আমার সমবয়সী ছোট ছেলেদের সাথে খেলছিলাম। এমনি সময়ে হঠাৎ তিনজন ব্যক্তি আবির্ভূত হন। তাঁদের কাছে ছিল বরফভর্তি সোনালী রংয়ের একখানা ধোয়াধুয়ি করার পাত্র। তাঁরা আমাকে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে আলাদা করেন, আর আমার বন্ধুরা সবাই বসতীর দিকে দৌড়ে ফেরত যান। ওই তিনজনের মধ্যে একজন আমাকে আলতোভাবে মাটিতে শুইয়ে আমার বুক হতে তলপেটের হাড় পর্যন্ত বিদীর্ণ করেন। আমি তা দেখতে সক্ষম হই এবং আমার এতে কোনো ব্যথা-ই অনুভূত হয়নি। তিনি আমার নাড়িভুঁড়ি বের করে বরফ দ্বারা সেটি ভালভাবে কাচেন এবং আবার যথাস্থানে স্থাপন করেন। দ্বিতীয়জন দাঁড়িয়ে তাঁর সাথীকে সরে যেতে বলেন। অতঃপর তিনি তাঁর হাত ঢুকিয়ে আমার হৃদযন্ত্র বের করে আনেন, যা আমি দেখতে পাই। তিনি তা কেটে ওর ভেতর থেকে একটি কালো বস্তু বের করে ছুড়ে ফেলে দেন এবং তাঁর দুই হাত ডানে ও বামে নাড়তে থাকেন, যেন হাতে কিছু একটা গ্রহণ করছিলেন। অকস্মাৎ তাঁর হাতে চোখ-ধাঁধানো আলোর একখানি আংটি দেখা যায়। তিনি আমার হৃদযন্ত্রের ওপর তা দ্বারা ছাপ বসিয়ে দেন, যার দরুন সেটিও আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এটি-ই নবুওয়্যত ও জ্ঞান-প্রজ্ঞার নূর (জ্যোতি)। অতঃপর তিনি আমার হৃদযন্ত্র যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করেন এবং আমি সেই আংটির শীতল স্পর্শ দীর্ঘ সময় যাবত পাই। তৃতীয়জন এবার তাঁর সহযোগীকে সরে দাঁড়াতে বলেন। তিনি তাঁর হাত আমার বিদীর্ণ বক্ষের ওপর বুলিয়ে দিলে আল্লাহর মর্জিতে তা মুহূর্তে জোড়া লেগে যায় (অর্থাৎ, সেরে ওঠে)। এরপর তিনি সযত্নে আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেন এবং প্রথমজনকে বলেন, ‘তাঁর জাতির দশজনের সাথে তাঁকে মাপুন।’ আমি তাদের চেয়ে ওজনে ভারী প্রমাণিত হই। অতঃপর তিনি আবার বলেন, ‘তাঁর জাতির এক’শ জনের সাথে তাঁকে পরিমাপ করুন।’ আমি তাদের চেয়েও ভারী হই। এবার তিনি বলেন, ‘তাঁকে তাঁর সমগ্র জাতির সাথে মাপলেও তিনি ভারী হবেন।’ তাঁরা সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরেন, কপালে চুমো খান এবং বলেন, ‘ওহে হাবীব (দ:)! আপনার জন্যে যে মঙ্গল ও কল্যাণ অপেক্ষা করছে তা জেনে আপনি খুশি-ই হবেন’।” এই হাদীসে পরিমাপ করার বিষয়টি হলো নৈতিকতা। অতএব, মহানবী (দ:) সবাইকে নৈতিকতা ও সদগুণাবলীতে ছাড়িয়ে গিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর ’সীনা চাক’ (বক্ষ বিদারণ) জিবরাইল আমীন (আ:) কর্তৃক হেরা গুহায় ওহী বহন করে নিয়ে আসার সময় আরেকবার হয়েছিল; এছাড়া মে’রাজের রাতে ঊর্ধ্বগমনের সময়ও আরেকবার বক্ষবিদারণ হয়েছিল তাঁর। আবূ নুয়াইম নিজ ‘আদ্ দালাইল’ পুস্তকে বর্ণনা করেন যে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বিশ বছর বয়সে আরও একবার ’সীনা চাক’ হয়েছিল। তাঁর শৈশবে এটি হওয়ার এবং কালো বস্তু অপসারণের হেকমত বা রহস্য ছিল তাঁকে সমস্ত ছেলেমানুষি বৈশিষ্ট্য হতে মুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্কদের (গুরুগম্ভীর) চিন্তা ও মননে বিভূষিত করা। তাঁর বেড়ে ওঠা তাই নিখূুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। তাঁর দু’কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে মোহরে নবুওয়্যতের সীলমোহর দেয়া হয়, যা থেকে মেশকের সুগন্ধ বের হতো এবং যা দেখতে একখানা তিতিরজাতীয় পাখির ডিমের মতো ছিল।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) ছয় বছর বয়সে উপনীত হলে তাঁর মা আমিনা (রা:) ও উম্মে আয়মান (রা:) তাঁকে এয়াসরিবে (মদীনায়) অবস্থিত ’দারুল তাবে’আ’-তে তাঁরই বনূ আদী’ ইবনে আল-নাজ্জার গোত্রভুক্ত মামাদের বাড়িতে মাসব্যাপী এক সফরে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ওই জায়গায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তিনি স্মরণ করেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট বাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “এখানেই আমি ও আমার মা থেকেছিলাম। বনূ আদী’ ইবনে আল-নাজ্জার গোত্রের মালিকানাধীন হাউজ বা জলাধারে আমি সাঁতার শিখেছিলাম। একদল ইহুদী আমাকে দেখতে ঘনঘন এই স্থানে আসতো।” উম্মে আয়মান (রা:) বলেন, “আমি ইহুদীদের একজনকে বলতে শুনেছি যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম হলেন এই জাতির পয়গম্বর; আর এটি-ই হলো তাঁর হিজরতের স্থান। ইহুদীরা যা বলাবলি করেছিল, তার সবই আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (দ:) ও তাঁর মা মক্কা মোয়াযযমায় ফিরতি যাত্রা আরম্ভ করেন। কিন্তু এয়াসরিবের অদূরে আল-আবূআ’ নামের জায়গায় পৌঁছুলে মা আমিনা (রা:) ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আল-যুহরী (রা:) হযরত আসমা’ বিনতে রাহম (রা:) হতে, তিনি তাঁর মা হতে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “আমি মহানবী (দ:)-এর মা আমিনা (রা:)-এর শেষ অসুখের (মৃত্যুব্যাধির) সময় উপস্থিত ছিলাম। ওই সময় মহানবী (দ:) ছিলেন মাত্র পাঁচ বছরের এক শিশু। তিনি যখন মায়ের শিয়রে বসা, তখন আমিনা (রা:) কিছু কবিতার ছত্র পড়ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-এর মোবারক চেহারার দিকে তাকিয়ে বলেন:‘(পৃথিবীতে) সকল প্রাণি-ই মৃত্যুবরণ করবে; যাবতীয় নতুন বস্তু-ও পুরোনোয় পরিণত হবে; আর প্রতিটি প্রাচুর্য-ও কমে যাবে; আমি মৃত্যুপথযাত্রী হলেও স্মৃতি আমার চিরসাথী হবে; আমি রেখে যাচ্ছি অফুরন্ত কল্যাণ এবং জন্ম দিয়েছি পুতঃপবিত্র সত্তাকে এই ভবে।’ এ কথা বলে তিনি ইন্তেকাল করেন। আমরা তাঁর তিরোধানে জ্বিনদের কাঁন্নার আওয়াজ শুনতে সক্ষম হই।”

বর্ণিত আছে যে হযরত আমিনা (রা:) তাঁর ইন্তেকালের পরে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর রেসালাতের প্রতি শাহাদাত তথা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আত্ তাবারানী (রহ:) হযরত আয়েশা (রা:) হতে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) আল-হাজূন নামের স্থানে পৌঁছুলে তিনি অন্তরে অত্যন্ত বেদনাক্লিষ্ট হন। আল্লাহতা’লার যতোক্ষণ ইচ্ছা, ততোক্ষণ তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। ওখান থেকে ফেরার পর তিনি খুশি হন এবং বলেন, “আমি আমার মহাপরাক্রমশালী ও মহান প্রভুর (খোদাতা’লার) দরবারে আরয করেছিলাম আমার মাকে তাঁর হায়াত (জীবন) ফিরিয়ে দিতে। তিনি তা মঞ্জুর করেন এবং তারপর আবার মাকে ফেরত নিয়ে যান (পরলোকে)।” আস্ সুহায়লী ও আল-খাতীন উভয়ই বর্ণনা করেন হযরত আয়েশা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন যে আল্লাহ পাক হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পিতামাতা দু’জনকেই পুনরায় জীবিত করেন এবং তাঁরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের প্রতি শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান করেন।

আল-কুরতুবী তাঁর ‘আত্ তাযকেরা’ গ্রন্থে বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও সদগুণাবলী তাঁর সারা (যাহেরী/প্রকাশ্য) জিন্দেগী জুড়ে প্রকাশমান ছিল। তাঁর পিতামাতাকে আবার জীবিত করে তাঁর প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারটি মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। ইসলামী বিধানে বা যুক্তিতে এমন কিছু নেই যা এর বিরোধিতা করে।” পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে যে বনী ইসরাঈল বংশের এক ব্যক্তি খুন হওয়ার পর তাকে আবার জীবিত করে খুনী কে ছিল তা জানানো হয়। অধিকন্তু, আমাদের পয়গম্বর ঈসা (আ:) [যীশু খৃষ্ট] মৃতকে জীবিত করতেন। অনুরূপভাবে, আল্লাহতা’লা আমাদের মহানবী (দ:)-এর দ্বারাও কিছু সংখ্যক মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন। তাহলে রাসূল-এ-করীম (দ:) কর্তৃক তাঁর পিতামাতাকে পুনরায় জীবিত করে তাঁর নবুওয়্যতের প্রতি সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি কেন অসম্ভব হবে, যেখানে এটি তাঁরই শান-শওকত ও মহিমা প্রকাশ করছে?

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর মতে, সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের সকল পূর্বপুরুষ-ই মুসলমান। এটি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাণী থেকেও প্রমাণিত। তিনি (দ:) বলেন, “আমাকে পুতঃপবিত্র পুরুষদের ঔরস থেকে পুতঃপবিত্র নারীদের গর্ভে স্থানান্তর করা হয়।” আর যেহেতু আল্লাহ পাক বলেছেন, “নিশ্চয় অবিশ্বাসীরা নাজাস তথা অপবিত্র”, তাই আমরা (এ আয়াতের আলোকে) দেখতে পাই যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষদের কেউই অবিশ্বাসী ছিলেন না।

হাফেয শামস আদ্ দীন আদ্ দামেশকী (রহ:) এই বিষয়ে কী সুন্দর লিখেছেন:
 
“আল্লাহ পাক তাঁর নবী (দ:)-এর প্রতি নিজ আশীর্বাদ করেছেন বর্ষণ
এছাড়াও তিনি তাঁর প্রতি ছিলেন সর্বাধিক দয়াবান
তিনি তাঁর মাতা এবং পিতাকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁদের জীবন
যাতে তাঁরা করতে পারেন তাঁর নবুওয়্যতের সাক্ষ্যদান
নিশ্চয় তা ছিল সূক্ষ্ম করুণার এক নিদর্শন
অতএব, এসব অলৌকিকত্বে করো বিশ্বাস স্থাপন
কেননা, আল্লাহতা’লা এগুলোর সংঘটনকারী হিসেবে সামর্থ্যবান
যদিও বা এতে তাঁর সৃষ্টিকুলের শক্তি-সামর্থ্য ম্লান।”

সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের মায়ের ইন্তেকালের পরে উম্মে আয়মান (রা:) তাঁর সেবাযত্নের দায়িত্ব নেন। মহানবী (দ:) তাঁর সম্পর্কে বলতেন, “আমার মায়ের পরে উম্মে আয়মান হলেন আমার (দ্বিতীয়া) মা।” রাসূলুল্লাহ (দ:) আট বছর বয়সে উপনীত হলে তাঁর দাদা ও অভিভাবক আবদুল মোত্তালিব ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল এক’শ দশ বছর (অপর বর্ণনায় এক’শ চল্লিশ বছর)। ইন্তেকালের সময় তাঁরই অনুরোধে মহানবী (দ:)-এর চাচা আবূ তালেব তাঁর অভিভাবক হন। কেননা, তিনি ছিলেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পিতা আবদুল্লাহ’র আপন ভাই।

ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন জালহামা ইবনে উরফাতা হতে; সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ ফরমান: “আমি এক খরার সময় মক্কায় আবির্ভূত হই। কুরাইশ গোত্রের কয়েকজন আবূ তালেবের কাছে এসে আরয করেন, ‘হে আবূ তালেব, এই উপত্যকা অনুর্বর এবং সকল পরিবার আর্তপীড়িত। চলুন, আমরা বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা করি।’ আবূ তালেব (ঘর থেকে) বেরিয়ে আসেন, আর তাঁর সাথে ছিলেন এক বাচ্চা ছেলে, যাঁকে দেখতে লাগছিল মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা সূর্যের মতো। তাঁর আশপাশে ঘিরে ছিল অন্যান্য শিশুর দল। আবূ তালেব তাঁকে কা’বাগৃহের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে দেন। আকাশে ওই সময় মেঘের কোনো লেশচিহ্ন মাত্র ছিল না। কিন্তু যেমনি ওই বালক তাঁর হাত দুটো ওপরে তোলেন, অমনি সবদিক থেকে মেঘ আসা আরম্ভ করে এবং বৃষ্টিও নামে – প্রথমে অল্প, শেষে অঝোর ধারায়। ফলে উপত্যকা এলাকা উর্বর হয়ে ওঠে, আর মক্কা ও বাইরের মরুভুমি অঞ্চলও শস্যশ্যামলতা ফিরে পায়। এই মো’জেযা (অলৌকিক ঘটনা) সম্পর্কে আবূ তালেব (পদ্যাকারে) লেখেন:
 
‘জ্যোতির্ময় চেহারার সেই পবিত্র সত্তার সকাশে
যাঁর খাতিরে বারি বর্ষে
তিনি-ই এয়াতীমবর্গের আশ্রয়স্থল সবশেষে
আর বিধবাদের ভরসার উপলক্ষ নিঃশেষে’।”

                                                                  *সমাপ্ত*

[সৌজন্যে: আস্ সুন্নাহ ফাউন্ডেশন অফ আমেরিকা]

আল্লাহর নুর হতে রসুলে পাক(দঃ) এর সৃষ্টি সম্পর্কিত হাদিসের ব্যাখ্যা

Standard

মূল: শায়খ আহমদ সুকায়রিজ আত্ তিজানী (রহ:)
ইংরেজি ভাষান্তর: ড: জি, এফ, হাদ্দাদ (বৈরুত)
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

শায়খ আহমদ সুকায়রিজ আত্ তিজানী (১৮৭৮-১৯৪৪ খৃষ্টাব্দ) তাঁর প্রণীত ‘আশ্ শাতাহাত আস্ সুকায়রিজিয়্যা’ গ্রন্থের ৫৫-৫৭ পৃষ্ঠায় বলেন:

মুসলমান সর্বসাধারণ যাঁরা মীলাদ উদযাপন করেন, তাঁরা হযরত জাবের (রা:)-এর বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করে থাকেন, যে বর্ণনাটিতে হযরত জাবের (রা:) রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেছিলেন, ‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমার পিতা ও মাতা আপনার জন্যে কুরবান হোন। (অনুগ্রহ করে) আমায় বলুন, আল্লাহতা’লা সর্বপ্রথম বা সর্বাগ্রে কী সৃষ্টি করেন?’ জবাবে মহানবী (দ:) বলেন, ‘ওহে জাবের! নিশ্চয় আল্লাহ পাক সর্বাগ্রে তোমার নবী (দ:)-এর নূর (জ্যোতি)-কে তাঁর নূর হতে সৃষ্টি করেন।’ ইমাম কসতুলানী (রহ:) নিজ ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা’ গ্রন্থে এই হাদীসটি উদ্ধৃত করেন এবং জানান যে এটি মোহাদ্দীস হযরত আবদুর রাযযাক (রহ:)-এর বর্ণিত। এভাবেই আমরা এটি সম্পর্কে জানতে পেরেছি। অনুরূপভাবে, মীলাদুন্নবী (দ:) যাঁরা উদযাপন করেন, তাঁরা ওই বর্ণনাটিও উদ্ধৃত করেন যেখানে বিবৃত হয়েছে, ‘আল্লাহতা’লা তাঁর নিজের এক মুঠি (পরিমাণ) নূর নিয়ে সেটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম), অস্তিত্বশীল হোন! [এই বর্ণনা হাদীসের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া না গেলেও আস্ সুফুরী তাঁর ’নুযহাত আল-মাজালিস্’ পুস্তকের ‘মহানবী (দ:)-এর মীলাদ’ অধ্যায়ে তা বর্ণনা করেন]

আল্লাহতা’লা তাঁর নূর থেকে এক কবজা নূর নেয়ার মানে ওই নূর তাঁর সাথেই সম্বন্ধযুক্ত (’মোযাফ লাহু’); আর ’মিন নূরিহী’ (তাঁর নূর হতে) বাক্যটিতে ’মিন’ (’হতে’) শব্দটি হলো ’লিল বয়ান’ তথা ব্যাখ্যামূলক। ব্যাকরণবিদরা যেভাবে নিরূপণ করেন, সেভাবে ‘মিন’ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করে মহানবী (দ:) যেন বলছেন, ’রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর নূর (প্রকৃতপক্ষে) আল্লাহতা’লারই নূর’ এবং ‘খোদায়ী এক মুঠি (কবজা) হচ্ছে খোদারই নিজস্ব নূর।’ আমাদের সাইয়্যেদ (ছরকার) মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর নূর সকল নূরের উৎস বটে, যা থেকে সেগুলোকে নিজস্ব পর্যায় অনুযায়ী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা হয়েছে। তাই ওই নূর সৃষ্টি করা হয়। কোনো এক আ’রেফ (খোদা-জ্ঞানী) বলেন, ’নূরিহী’ বাক্যটিতে ‘হু’ (তিনি) যমীর (সর্বনাম)-টি ‘তোমার নবী (দ:)-এর নূর’ বাক্যটিতে ‘তোমার নবী (দ:)’-কে উদ্দেশ্য করে। অতএব, এটি এক রকম ‘এসতেখদাম’ তথা দ্ব্যর্থমূলক প্রয়োগ পদ্ধতি  [“এসতেখদাম হলো এমন কোনো শব্দের প্রয়োগ যার দু’টি অর্থ বিদ্যমান; এর মধ্যে খোদ শব্দটি দ্বারাই প্রথম অর্থ বেরিয়ে আসে; আর দ্বিতীয় অর্থটি তার সর্বনাম দ্বারা প্রকাশ পায়। যেমন এরশাদ হয়েছে – ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওই (রমযান) মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই সেটির রোযা পালন করে’ (আল-কুরআন, ২:১৮৫)। এখানে ‘মাস’ বলতে নতুন চাঁদকে বোঝানো হয়েছে, আর ’সেটি’ বলতে (রোযার) ’সময়কাল’কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।” – কারাম আল-বোস্তানী, আল-বয়ান (বৈরুত, মকতাবাত সাদির, তারিখবিহীন), ৮৬-৮৭ পৃষ্ঠা]। মহানবী (দ:) যেন এতে (ওপরোক্ত বাক্যে) বলছেন, ’তোমার নবী (দ:)-এর নূর সৃষ্ট হয়েছে তোমার নবী (দ:)-এর নূর হতেই’; তা এই অর্থে যে ওই নূর হতে মহানবী (দ:)-এর সত্তা মোবারক তথা তাঁর পবিত্র রূহ এবং তাঁরই সমস্ত আহওয়াল বা (আত্মিক) অবস্থাকে সৃষ্টি করা হয়। অতএব,তাঁর নূর দ্বারা তিনি অস্তিত্বশীল হন, এবং তাঁরই নূর হতে সকল সৃষ্টি অস্তিত্ব পায়।

খোদাতা’লার সত্তা মোবারকের নূর (জ্যোতি) প্রসঙ্গে বলা যায়, এটি প্রাক-সূচনালগ্ন থেকে বিদ্যমান, মানে এর কোনো সূচনাকাল নেই। আর মহান আল্লাহতা’লার ’নূর’কে কোনো পদ্ধতিতে বর্ণনা করা যেমন যায় না, তেমনি সেটি কল্পনা করাও যায় না। উপরন্তু, তাঁর ক্ষেত্রে ‘নূর’ শব্দটি ‘মুনাওয়ার’ (আলোকোজ্জ্বলকারী) অর্থে বোঝাবে, যেমনটি উল্লেখিত হয়েছে আল-কুরআন ২৪:৩৫-এর তাফসীরে – “আল্লাহ নূর আসমানসমূহ ও জমিনের” – মানে তিনি হলেন আসমানসমূহ ও দুনিয়াতে নূর (জ্যোতি) বিচ্ছুরণকারী। অতএব, তাঁর পবিত্র সত্তা থেকে কোনো কিছু (সরিয়ে) নেয়া যায় না; আমাদের প্রভুর মহান সত্তা, তাঁর বৈশিষ্ট্যমণ্ডলী, কিংবা তাঁর ক্রিয়া কল্পনারও অতীত! আরেক কথায়, মহানবী (দ:) বলতে চেয়েছেন, ‘আল্লাহ পাক তাঁর সৃষ্টিশীল নূর হতে তোমার নবী (দ:)-এর নূরকে সৃষ্টি করেন এবং ওই (সৃষ্টিশীল) নূর-ই তোমার নবী (দ:)-এর নূর। অতএব, সমস্ত সৃষ্টিজগতে (মহানবী দ:-এর) ওই নূরের আগে কিছুই ছিল না, বরঞ্চ সমগ্র সৃষ্টিজগতেরই উৎপত্তি হয় ওই নূর হতে। সম্ভাবনাময়তার আওতাভুক্ত প্রতিটি বিষয় বা বস্তু-ই ওই নূরের ফলশ্রুতিতে অস্তিত্ব পেয়ে থাকে। আর সৃষ্টিজগতে প্রতিটি অস্তিত্বশীল বস্তু, তা যা-ই হোক না কেন, সবই ওই নূরের দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়।

আমি ওপরের বিষয়টি নিয়ে স্বপ্নে দেখলাম আমাদের সূফী মাশায়েখদের অন্যতম শায়খ আবূ আল-কাসেম মোহাম্মদ ফাতাহ বিন কাসেম আল-কাদেরী (রহ:)-এর সাথে আলাপ করছি। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম সে সব ব্যাপারে যা’তে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হতে সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সূচনা ও তাঁর নূর হতে বিভিন্ন পর্যায়ে অন্যান্য নূরের সৃষ্টি; যে বিবর্তনে রয়েছে শারীরিকভাবে জন্মগ্রহণ থেকে আরম্ভ করে ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে চিরকল্যাণপ্রাপ্তি ও অন্যান্য ফলশ্রুতি, যা হতে পারে মহিমান্বিত বা লজ্জাকর, আশীর্বাদধন্য বা অধঃপতিত, জীবন বা মৃত্যু, প্রাণিকুল, জড় পদার্থ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য বিষয়। ওই স্বপ্নে তিনি আমাকে বলেন:

”নিশ্চয় মহান আল্লাহ পাক যখন বিশ্বজগত সৃষ্টি করেন, তখন সমগ্র আলম (জগত) ও সৃষ্টিকুল যেগুলো অস্তিত্বশীল হবার খোদায়ী এরাদা (ইচ্ছা)-প্রাপ্ত হয়েছিল, সেগুলোকে তাদের নিজ নিজ অস্তিত্বপ্রাপ্তি ও বিলুপ্তির ক্রমানুসারে একটি সর্বব্যাপী মহা-বলয়ের আওতায় সৃষ্টি করা হয় (তাহতা দা’য়েরাত আল-ফালাক আল-মুহীত বিল-কুল্ল); এতে সন্নিবেশিত হয় অন্যান্য বলয়ের স্তর যা শেষ অস্তিত্বশীল বস্তু পর্যন্ত বিস্তৃত, যেমনটি না-কি কোনো গোলক বা রসুনের আকৃতি। ওতে (মহা-বলয়ে) বিরাজমান হয় ছিদ্রসমূহ যা সকল স্তরকে ছেদ করে এমনভাবে, যার দরুন প্রতিটি ছিদ্র দিয়ে আলো বেরিয়ে গোলকের সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গোলকের স্তরগুলো হচ্ছে শতাব্দী, বছর, মাস, দিন, সপ্তাহ ও মিনিট (ক্ষণ), এমন কি চোখের এক পলক চাহনি-ও। আল্লাহতা’লা যখন এরাদা (ইচ্ছে) করেছিলেন তিনি নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হতে সকল বস্তু সৃষ্টি করবেন এবং সেগুলোকে অস্তিত্বশীল করবেন, তখন তিনি নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সৃষ্টি করেন। সেই সর্বব্যাপী মহা-বলয় বা গোলক মুখোমুখি হয় ওই নূরের তাজাল্লী তথা আলোকোচ্ছ্বটার, যে নূর ব্যতিরেকে সেটি আবির্ভূত হতে অক্ষম ছিল। ওই নূর সেই গোলকের ভেতরে আলো বিচ্ছুরণ করে এবং ছিদ্রগুলো দিয়ে গোলকের বাইরে প্রসারিত হয়। অতঃপর আল্লাহ পাক সেই বলয়কে  ‍ঘুরতে আদেশ করেন এবং সেটির অভ্যন্তরভাগের সকল স্তরকেও ঘুরতে আদেশ করেন; এটি এমন-ই এক বিস্ময়কর ব্যবস্থা যা সর্বজ্ঞানী ও অতুলনীয় স্রষ্টার এক মহা-পরিকল্পনা ছাড়া কিছু নয়। অতঃপর ছিদ্রগুলো একে অপরের সাথে ঘাত-প্রতিঘাতরত হয় এবং সেগুলোর মধ্য দিয়ে প্রসারিত আলোও তাতে রত হয়; এমতাবস্থায় হয় আলো ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে ওপরে যা আছে তার সাথে গিয়ে মেশে, নয়তো এর বিপরীতে ছিদ্রটির পাশে যা আগমন করে তার মধ্য দিয়ে আলো বের হতে না পারলে আগত ওই বস্তু-ই ছিদ্রটিকে বন্ধ করে দেয়। শেষোক্ত ক্ষেত্রে সেই ছিদ্র দিয়ে আলো বের হবার পথ-ই বন্ধ হয়ে যায়। যাঁর ওপর ওই নূর কিরণ ছড়ান, তিনি আশীর্বাদধন্য ও আলোকিত, আর যে ব্যক্তি তা (আলোপ্রাপ্তি) থেকে রহিত, সে হতভাগা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। এভাবেই ঈমানদারী ও কুফরীর আবির্ভাব ঘটে; সেই সাথে সেসব বিষয়েরও আবির্ভাব হয়, যেগুলো প্রকাশ্যে বা গোপনে, প্রতিটি যুগে আল্লাহর ইচ্ছায় (কাউকে) ওই দু’টোর (ঈমানদারী বা কুফরীর) যে কোনো একটির দিকে ধাবিত করে। সবাই ওই নূর হতে সেই পরিমাণ-ই গ্রহণ করেন, যতোখানি তাঁদের জন্যে (ঐশীভাবে) বরাদ্দ করা হয়েছে। অতএব, তুমি দেখতেই পাচ্ছো যে সবাই তাঁর (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) কাছ থেকে এসেছেন এবং তাঁর নূর হতে নিজ নিজ নূর গ্রহণ করছেন……।”

আল্লাহর রহমতে এটি এক্ষণে সুস্পষ্ট যে, ‘নূরিহী’ (তাঁর জ্যোতি) বাক্যটিতে ‘হু’ (তাঁর) যমীর (সর্বনাম) দ্বারা নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে ‘এসতেখদাম’ তথা দ্ব্যর্থবোধক অর্থ প্রয়োগ পদ্ধতির সাহায্যে, যেটি ব্যাকরণ বিশেষজ্ঞদের ব্যবহৃত শব্দের এক ধরনের আলঙ্কারিক প্রয়োগ বটে। তবে এ কথা বলা উচিত হবে না যে এখানে ব্যবহৃত ‘নূর’ শব্দটি এবং ‘তোমার নবী (দ:)-এর নূর’ বাক্যটিতে উদ্দেশ্যকৃত প্রথম ’নূর’ একই; এতে ধারণা জন্মাবে যে কোনো বস্তু আপনাআপনি বা নিজ হতেই সৃষ্টি লাভ করতে সক্ষম। (পক্ষান্তরে) আমরা যা বলি তা হলো, ‘মিন নূরিহী’ (‘তাঁর জ্যোতি হতে’) বাক্যটিতে ’মিন’ (’হতে’) শব্দটি বয়ানিয়্যা তথা ব্যাখ্যামূলক, যার মানে “নূরু নাবিইয়্যিকা আল্লাযি হুয়া নূরুহ” (’তোমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নূর, যার মধ্যে তিনি নিজেই নূর’)। এটি নিশ্চয় ”তাব’এদিয়্যা” তথা সমষ্টির অংশ-নির্দেশক শব্দ নয়। আপনারা এ কথাও বলতে পারেন যে ‘তাঁর’ সর্বনামটি সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাককে উদ্দেশ্য করে, যার দরুন ‘নূর’ সৃষ্ট হলেও আল্লাহর সাথে তেমনিভাবে সম্পর্কিত, যেমনটি আল-কুরআনের আয়াতে ঘোষিত হয়েছে – “এ তো আল্লাহর সৃষ্ট” (৩১:১১)। অতএব, এটি আল্লাহ পাকের সাথে ’এযাফত’ তথা সম্বন্ধযুক্ত এবং সৃষ্ট ওই নূর আপনাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এরই নূর, অন্য কিছু নয়।

প্রশ্ন করা হতে পারে, যে কোনো সৃষ্ট বস্তু-ই স্থান ও কাল দ্বারা আবদ্ধ; মানে স্থান-কাল সৃষ্টির জন্যে বাধ্যতামূলক। এতে আগেভাগে ধরে নেয়া হতে পারে যে স্থান-কাল সৃষ্টির সাথে, অথবা তারও আগে বিদ্যমান; যদিও এক্ষেত্রে মহানবী (দ:)-কে সর্বপ্রথম সৃষ্টি করা হয়েছে বলেই বর্ণনা এসেছে। এটি কীভাবে সম্ভব? জবাবে আমরা বলি, স্থান-কাল রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর ছায়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যাঁকে ছাড়া ওগুলো গঠিত হতেই পারতো না। মহানবী (দ:) তাঁর দিব্যদৃষ্টি দ্বারা নিজ ছায়া থেকে সেগুলোর গঠন প্রত্যক্ষ করেন এবং আবর্তমান সর্বব্যাপী বলয়ের মাধ্যমে স্থান-কালের গতি-ও তিনি দর্শন করেন। এভাবেই আমরা উপলব্ধি করি খোদায়ী দয়ার্দ্রতা ও দানশীলতায় ভরা উচ্চ মকামে তাঁর অধিষ্ঠানের (ঐশী) ঘোষণাকে: “হে মাহবূব! আপনি কি আপন রব্ব (প্রভু)-কে দেখেননি, তিনি কীভাবে সম্প্রসারিত করেছেন ছায়াকে? এবং তিনি যদি ইচ্ছে করতেন, তবে সেটিকে স্থির করে দিতেন; অতঃপর আমি সূর্যকে সেটির ওপর দলীল (চালনাকারী) করেছি” (সূরা ফোরকান, ৪৫ আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ’নূরুল এরফান’)। আল্লাহতা’লা এই আয়াতে রাসূলে করীম (দ:)-কে সেসব বিষয় সম্পর্কে বলেছেন যেগুলো তিনি দেহের সাথে রূহ (আত্মা)-এর একত্রিকরণের সময় তাঁর উচ্চ-মকামে অবস্থান করে প্রত্যক্ষ করেছিলেন; আর এই ঘটনা তিনি যখন সম্পূর্ণভাবে রূহ ছিলেন, তখনকার অবস্থা স্মরণ করার জন্যেই উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) অস্তিত্বশীল হওয়ার সাথে সাথে এমন মেধা ও উপলব্ধি-ক্ষমতা প্রাপ্ত হন যে আল্লাহ পাক তাঁকে যা কিছুই প্রদর্শন করেছিলেন, তার সবই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। নিশ্চয় তিনি তখন একেবারে একাকী তাঁর প্রভু খোদাতা’লার সান্নিধ্যে ছিলেন ওই মহান দরবারে, যখন কোনো কিছুরই সৃষ্টি হয়নি – না আদম (আ:)-এর সৃষ্টি, না অন্য কোনো সত্তার, যেমনটি তিনি স্বয়ং একটি হাদীসে ইঙ্গিত করেছেন, “আমি তখনো নবী ছিলাম, যখন আদম (আ:) নিজ রূহ এবং দেহের মধ্যবর্তী অবস্থানে ছিলেন” [হযরত আবূ হোরায়রাহ (রা:) হতে আত্ তিরমিযী (রহ:) কৃত ‘সুনান’ (ফযল আন্ নবী রচিত ’মানাকিব’: হাসান সহীহ গরিব) এবং আত্ তাহাবী প্রণীত ‘শরহে মুশকিল আল-আসা’র’(১৫:২৩১ #৫৯৭৬); হযরত মায়সারাত আল-ফাজর (রা:) হতে ইমাম আহমদ (রহ:) রচিত ’মুসনাদ’ (৩৪:২০২ #২০৫৯৬), আল-হাকীম লিখিত ‘মোসতাদরাক’ (২:৬০৮-৯), আত্ তাবারানী (রহ:) কৃত ‘আল-মো’জাম আল-কবীর’ (২০:৩৫৩ #৮৩৩-৪) এবং অন্যান্য; হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে আত্ তাবারানী (রহ:) প্রণীত ‘আল-মো’জাম আল-আওসাত’ (৪:২৭২ #৪১৭৫) এবং ‘আল-মো’জাম আল-কবীর’ (১২:৯২ #১২৫৭১); এবং হযরত আবূল জাদা’আ (রা:) হতে ইবনে সা’আদ রচিত ‘তাবাকাত’ (১:১২৩)]। ওই সময় মহানবী (দ:) নিজ মহান ছায়ার প্রতি বর্ষিত তাঁরই প্রভুর সমস্ত দান প্রত্যক্ষ করেছিলেন, এবং তার (পবিত্র ছায়ার) সম্প্রসারণ এবং তা হতে সমগ্র সৃষ্টির উৎপত্তি হবার ঘটনার সাক্ষীও তিনি হয়েছিলেন। আল্লাহতা’লা উক্ত আয়াতে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতেই যেন বলেছেন, “হে মাহবূব! আপনি কি আপন রব্ব (প্রভু)-কে দেখেননি, তিনি কীভাবে সম্প্রসারিত করেছেন ছায়াকে?” কেননা, তিনি-ই নিজ প্রভুকে এবং তাঁর দ্বারা সেই ছায়া সম্প্রসারণের ক্রিয়া-পদ্ধতিকে প্রত্যক্ষ করেছেন, যে ছায়া দ্বারা সকল সৃষ্টি গঠিত হয়েছিল। অতএব, আমাদের মহানবী (দ:) উভয় ধরনের (সাক্ষ্য) বহন করছেন, যথা – আল্লাহতা’লা সম্পর্কে সাক্ষ্য এবং সৃষ্টিকুলসম্পর্কিত সাক্ষ্য, এমন এক পর্যায়ে এই দর্শনক্ষমতা তাঁর প্রতি প্রদত্ত হয় যা তিনি ছাড়া আর কেউ প্রত্যক্ষ করেননি। তাঁর নিজস্ব বাস্তবতা তিনি ছাড়া আর কেউই এতো ভালভাবে জানতে সক্ষম হননি। তাই তিনি এরশাদ ফরমান, “লা এয়ারিফুনী হাকীকাতান্ গায়রু রাব্বী”; মানে “আমার প্রভু ছাড়া আমাকে কেউই চেনে না” [’এই বর্ণনা আমি পাইনি’ – ড: হাদ্দাদ]। ইবনে মাশীশ (রহ:)-এর বাণীতে এ কারণে তাঁকে ’সবচেয়ে বড় পর্দা’ অভিহিত করে বলা হয়েছে, ‘সবচেয়ে বড় পর্দাকে আমার আত্মার প্রাণরূপে পরিণত করুন।’

মহানবী (দ:), তাঁর আহলে বায়ত (রা:) ও আসহাবে কেরাম (রা:)-এর প্রতি শান্তি ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক, আমীন।

-আস্ সুন্নাহ ফাউন্ডেশন অফ আমেরিকা ২০১২         

মহানবী সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নুর

Standard

কুরআন মজীদের ৩টি স্থানে মহানবী (দ:)-কে ’নূর’
হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:
” কাদ জায়াকুম মিনাল্লাহে নূরুন ওয়া কিতাবুম্ মুবীন ” (৫:১৫)।
অর্থ: ”নিশ্চয় তোমাদের কাছে এসেছেন আল্লাহর পক্ষ
থেকে এক নূর (আলো, জ্যোতি) এবং স্পষ্ট কেতাব (আল্
কুরআন)।”
ইমাম কাজী আয়ায (রহ:) বলেন, “মহানবী (দ:)-কে ‘নূর’
বলা হয়েছে তাঁর (নবুয়্যতের) স্বচ্ছতার কারণে এবং এই
বাস্তবতার আলোকে যে তাঁর নবুয়্যতকে প্রকাশ্য
করা হয়েছে; আর এই কারণেও যে তিনি যা নিয়ে এসেছেন
তা দ্বারা ঈমানদার (বিশ্বাসী) ও আল্লাহর আরেফ
(খোদা সম্পর্কে জ্ঞানী)-দের
অন্তরগুলো আলোকিত হয়েছে।”
ইমাম জালালউদ্দীন সৈয়ুতী (রহ:) তাঁর ’তাফসীরে জালালাইন’
গ্রন্থে, ফায়রুযাবাদী ‘তাফসীরে ইবনে আব্বাস’
অবলম্বনে নিজ ‘তানউইরুল মেকবাস’ পুস্তকে (পৃষ্ঠা ৭২),
শায়খুল ইসলাম ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী, যিনি ৬ষ্ঠ শতাব্দীর
মোজাদ্দেদ, তিনি তাঁর ’তাফসীরে কবীর’
কেতাবে (১১:১৮৯), ইমাম কাজী বায়দাবী (রহ:) নিজ
’আনওয়ারুত্ তানযিল’ শীর্ষক বইয়ে, আল বাগাভী তাঁর
‘মা’আলিমুত্ তানযিল’ নামের তাফসীর কেতাবে (২:২৩), ইমাম
শিরবিনী নিজ ‘সিরাজুম মুনীর’ শীর্ষক তাফসীর
গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৩৬০), ‘তাফসীরে আবি সা’উদ’ (৪:৩৬)
প্রণেতা এবং সানাউল্লাহ পানিপথী তাঁর
’তাফসীরে মাযহারী’ (৩:৬৭) কেতাবে বলেন,
“(আয়াতোক্ত) ’নূর’ বলতে মহানবী (দ:)-
কে বোঝানো হয়েছে।”
ইবনে জারির তাবারী তাঁর ‘তাফসীরে জামেউল বয়ান’ (৬:৯২)
পুস্তকে বলেন, “তোমাদের কাছে এসেছেন আল্লাহর
পক্ষ থেকে নূর (আলো) – এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ
বোঝাচ্ছেন বিশ্বনবী (দ:)-কে, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ সত্য
উদ্ভাসিত করেছেন, দ্বীন ইসলামকে প্রকাশ করেছেন,
এবং মূর্তি পূজা নিশ্চিহ্ন করেছেন। অতএব, তিনি ‘নূর’, তাঁর
দ্বারা যারা আলোকিত হয়েছেন তাদের জন্যে এবং সত্য
প্রকাশিত হওয়ার জন্যে।”
আল খাযিন নিজ তাফসীর কেতাবে একইভাবে বলেন,
“(আয়াতে) ’নূর’ বলতে রাসূলে পাক (দ:)-কে উদ্দেশ্য
করা হয়েছে আর অন্য কোনো কারণে নয়, শুধু (এ
কারণে যে) মানুষেরা তাঁর দ্বারা পথপ্রদর্শিত হন,
যেমনিভাবে কেউ আলো দ্বারা অন্ধকারে পথের দিশা পান।’
ইমাম নাসাফী তাঁর ‘তাফসীরে মাদারেক’ (১:২৭৬)
গ্রন্থে এবং আল কাসেমী নিজ ‘মাহাসিন আল্ তা’বিল’ (৬:১৯২১)
পুস্তকে অনুরূপভাবে বলেন, “আয়াতে উল্লেখিত
‘নূর’ (জ্যোতি) হুযূর পূর নূর (দ:)-এর; কেননা, তাঁর দ্বারা-ই
মানুষেরা হেদায়াতপ্রাপ্ত হন। একইভাবে,
তাঁকে ’সিরাজ’ (প্রদীপ)-ও বলা হয়েছে (আয়াতে)।”
ইমাম আহমদ সাবী (রহ:) ‘তাফসীরে জালালাইন’ (১:২৫৮)-এর
ওপর তাঁর কৃত চমৎকার ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থে অনুরূপভাবে বলেন,
“আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছেন এক
নূর (আলো); ওই নূর হলেন মহানবী (দ:)। তাঁকে ‘নূর’
বলা হয়েছে, কারণ তিনি দৃষ্টিশক্তিকে আলোকিত করেন
এবং সেটিকে সঠিক পথপ্রদর্শন করেন; আর এ কারণেও
তা বলা হয়েছে, কেননা বস্তুগত বা আধ্যাত্মিক সকল আলো/
জ্যোতির মূল হলেন তিনি।” আমরা শেষ
বাক্যটি সম্পর্কে পরে আবার আলোচনা করবো,
ইনশাআল্লাহ।
সৈয়দ মাহমুদ আলুসী নিজ “তাফসীরে রুহুল মা’আনী’
শীর্ষক কেতাবে (৬:৯৭) একইভাবে বলেন,
“আয়াতোক্ত ’নূর’ বলতে মহৌজ্জ্বল আলো বুঝিয়েছে,
যা সকল আলোর আলো এবং সকল আম্বিয়া (আ:)-এর
মাঝে সেরা নবী (দ:)।”
ইসমাঈল হাক্কী (রহ:) আলুসীর তাফসীরের ব্যাখ্যামূলক
কেতাব ‘তাফসীরে রূহুল বয়ান’ (২:৩৭০)-এ
অনুরূপভাবে বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষ
থেকে তোমাদের কাছে এসেছেন এক নূর এবং সুস্পষ্ট
একখানা কেতাব; এ কথা বলা হয় যে ’নূর’ বলতে মহানবী (দ:)-
কে বোঝানো হয়েছে, আর ‘কেতাব’ বলতে আল্
কুরআনকে…..মহানবী (দ:)-কে ’নূর’ (আলো)
বলা হয়েছে, কারণ বিস্মৃতির অন্ধকার থেকে আল্লাহ পাক তাঁর
ঐশী ক্ষমতার আলো দ্বারা প্রথম যা সৃ্ষ্টি করেন,
তা হলো হুযূর পূর নূর (দ:)-এর নূর (জ্যোতি),
যেমনিভাবে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান:
‘আল্লাহতা’লা সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেন’।” এই
বর্ণনা নিচে দেয়া আছে।
বিশেষ জ্ঞাতব্য হলো, মু’তাযেলা সম্প্রদায়-ই (সর্বপ্রথম)
দাবি করেছিল যে আলোচ্য আয়াতের (৫:১৫) মধ্যে ‘নূর’
শব্দটি কেবল কুরআনকেই বুঝিয়েছে এবং তা মহানবী (দ:)-
কে উদ্দেশ্য করে নি। আলুসী ওপরে উদ্ধৃত তাঁর
বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় আরও বলেন, “আবু
আলী জুব্বায়ী বলেছিল যে ‘নূর’
বলতে কুরআনকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, কেননা আল্
কুরআন হেদায়াতের ও নিশ্চয়তার পথের দিশা দিয়েছে।
যামাখশারী নিজ ‘তাফসীরে কাশশাফ’ (১:৬০১) পুস্তকে এই
ব্যাখ্যার সাথে একমত হয়েছেন। এ দুটো উৎস
সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে আবদুল আযীয
মুলতানীর ’আল নাবরাস’ কেতাবে (পৃষ্ঠা ২৮-২৯),
যা’তে তিনি লিখেন: “তাফসীরে কাশশাফ
নিজেকে মু’তাযেলা সম্প্রদায়ের
বাবা হিসেবে ঘোষণা করে……বসরা (ইরাক)-এর
মু’তাযেলা সম্প্রদায়ের মুহাম্মদ ইবনে আবদিল ওয়াহহাব
হলো আবু আলী জুব্বায়ী।” মু’তাযেলা এবং বর্তমানকালের
ওহাবী ও ’সালাফী’-দের মধ্যকার সাযুজ্য
তুলে ধরা হয়েছে ইমাম কাওসারীর ‘মাকালাত’ পুস্তকের
বিভিন্ন স্থানে, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন
যে মু’তাযেলীদের মতোই ওহাবীদের
দ্বারা আউলিয়াবৃন্দ (রহ:)-এর (অনিন্দ্য) বৈশিষ্ট্যগুলোর
অস্বীকারের অন্তরালে আম্বিয়া (আ:)-এর (নিখুঁত)
বৈশিষ্ট্যগুলোর অস্বীকার লুক্কায়িত আছে।
আহলে সুন্নাহ (সুন্নী মুসলিম)-এর
মাঝে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাখ্যা আছে যা মহানবী (দ:)-
কে আয়াতোক্ত ’নূর’ এবং ‘কেতাব’ উভয়ের সাথে সম্পৃক্ত
করে। মাহমুদ আলুসী নিজ ‘রূহুল মাআনী’ তাফসীর
কেতাবে (৬:৯৭) বলেন, “আমি এটাকে সীমা অতিক্রম
বলে মনে করি না যে ‘নূর’ (আলো) এবং ‘কেতাবুম্
মুবীন’ (প্রকাশ্য ঐশীগ্রন্থ) বলতে মহানবী (দ:)-কেই
বোঝানো হয়েছে, সংযোজক অব্যয় পদ (ওয়া/এবং)-টি আল
জুব্বায়ী যেভাবে ব্যবহার করেছে ঠিক সেভাবেই ব্যবহার
করে এটা করা যায় (অর্থাৎ, নূর এবং কেতাব
বলতে সে যেভাবে বুঝে নিয়েছিল কুরআনকে)।
এটা নিঃসন্দেহ যে মহানবী (দ:)-কে উদ্দেশ্য করেই সব
বলা হয়েছে। হয়তো আপনারা ‘এবারা’ (অভিব্যক্তি)-এর
দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে গ্রহণ করতে অনিচ্ছুক
হতে পারেন; তাহলে ’ইশারা’ (সূক্ষ্ম ইঙ্গিত)-এর দৃষ্টিকোণ
থেকে তা গৃহীত হোক।”
আল কারী নিজ ’শরহে শিফা’ (১:৫০৫, মক্কা সংস্করণ)
গ্রন্থে বলেন, “এ কথাও বলা হয়েছে যে (আয়াতোক্ত)
‘নূর’ এবং ‘কেতাবুম মুবীন’ উভয়ই মহানবী (দ:)-এর
উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে; কেননা, তিনি যেমন মহৌজ্জ্বল
জ্যোতি এবং সকল আলোর উৎসমূল, তেমনি তিনি হলেন
মহান কেতাব যা সকল গোপন (রহস্য) জড়ো করে প্রকাশ
করে থাকে।” গ্রন্থকার আরও বলেন (১:১১৪,
মদীনা সংস্করণ): “দুটো বিশেষ্যকেই মহানবী (দ:)-এর
বলে দৃঢ়োক্তি করার প্রতি কী আপত্তি থাকতে পারে,
যেহেতু বাস্তবিকই তিনি হলেন সকল আলোর মাঝে তাঁর
উৎকৃষ্ট উপস্থিতির কারণে মহৌজ্জ্বল আলো; আর প্রকাশ্য
কেতাব তিনি-ই, যেহেতু তিনি সমস্ত ভেদের রহস্য একত্রিত
করে সকল (ঐশী) আইন-কানুন, পরিস্থিতি ও বিকল্প (ব্যবস্থা)
স্পষ্ট করেছেন।”
আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান: ”তাঁর (আল্লাহর) আলোর (নূরের)
উপমা হলো এমনই যেমন একটা দীপাধার, যার
মধ্যে রয়েছে প্রদীপ। ওই প্রদীপ একটা ফানুসের
মধ্যে স্থাপিত। ওই ফানুস যেন একটি নক্ষত্র, মুক্তার
মতো উজ্জ্বল হয় বরকতময় বৃক্ষ যায়তুন দ্বারা, যা না প্রাচ্যের,
না প্রতীচ্যের; এর নিকটবর্তী যে, সেটার তেল
প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠবে যদিও আগুন সেটাকে স্পর্শ
না করে; আলোর (নূরের) ওপর আলো (নূর)।” (আল্
কুরআন, ২৪:৩৫)
ইমাম সৈয়ুতী (রহ:) তাঁর ’আল রিয়াদ আল আনিকা’
পুস্তকে বলেন, “হযরত ইবনে জুবায়র (রা:) ও হযরত কাআব
আল আহবার (রা:) বলেছেন: ‘(আয়াতোক্ত) দ্বিতীয় ’নূর’
দ্বারা মহানবী (দ:)-কে বোঝানো হয়েছে;
কেননা আল্লাহর পক্ষ থেকে (আগত) যে জ্ঞানালোক ও
সুস্পষ্ট (প্রমাণ), তিনি-ই তার সংবাদ দানকারী, প্রকাশক ও
জ্ঞাপণকারী।’ কাআব (রা:) বলেন, ‘এর তেল প্রজ্জ্বলিত-প্রায়
হবে, কারণ মহানবী (দ:) মানুষের কাছে পরিচিত-প্রায় হবেন,
এমন কি যদি তিনি নবী হিসেবে নিজেকে দাবি না-ও করেন,
ঠিক যেমনি ওই তেল আগুন ছাড়াই (প্রজ্জ্বলনের)
আলো বিচ্ছুরণ করবে’।”
ইবনে কাসির তার ’তাফসীরে কাসির’
কেতাবে ইবনে আতিয়্যা কর্তৃক বর্ণিত হযরত কাআব আল
আহবার (রা:)-এর উপরোক্ত আয়াতের (ইয়াকাদু যাইতুহা ইউদিই-
ইউ ওয়া লাও লাম তামসাসহু নার) তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন,
“হুযূর পাক (দ:)-এর নবুয়্যত মানুষের কাছে সুস্পষ্ট, এমন
কি যদি তিনি তা ঘোষণা না-ও করেন।”
ইমাম কাজী আয়ায (রহ:) নিজ ’শেফা’
গ্রন্থে (ইংরেজি সংস্করণ, ১৩৫ পৃষ্ঠা) বলেন, ”নিফতাওয়াই
আলোচ্য আয়াত (২৪:৩৫) সম্পর্কে বলেছেন: ‘আল্লাহ
তাঁর নবী (দ:)-এর বেলায় এই মিসাল (উপমা) দিয়েছেন।
তিনি আয়াতে বুঝিয়েছেন যে মহানবী (দ:)-এর প্রতি কুরআন
অবতীর্ণ হবার আগেই তাঁর চেহারা মোবারকে নবুয়্যতের
ছাপ ফুটে উঠেছিল, যেমনিভাবে হযরত ইবনে রাওয়াহা (রা:)
ব্যক্ত করেছিলেন নিজ কবিতায় –
এমন কি আমাদের কাছে যদি (তাঁর নবুয়্যতের) সুস্পষ্ট চিহ্ন না-
ও থাকতো,
তাঁর চেহারা মোবারক-ই আপনাদের সে খবর
বলে দিতো ।। ”
উপরোক্ত আয়াতে উদ্ধৃত ‘মাসালু নূরিহী’, অর্থাৎ, ’আল্লাহর
নূর (জ্যোতি)-এর উপমা’ বলতে মহানবী (দ:)-
কে উদ্দেশ্য হয়েছে বলে যে সকল উলামা অভিমত
ব্যক্ত করেছেন, তাঁদের মধ্যে আছেন ইবনে জারির
তাবারী (তাফসীর ১৮:৯৫), ইমাম কাজী আয়ায
(শেফা শরীফ), আল বাগাবী (মা’আলিমুত্ তানযিল ৫:৬৩), আল
খাযিন-এর হাশিয়ায়, সাঈদ ইবনে হুবাইর ও আল দাহহাক হতে, আল
খাযিন (তাফসীর ৫:৬৩) ইমাম সৈয়ুতী (দুররে মনসুর ৫:৪৯),
যুরকানী (শরহে মাওয়াহিব ৩:১৭১), আল খাফাজী (নাসিম আল
রিয়াদ ১:১১০, ২:৪৪৯) প্রমুখ।
আল নিশাপুরী নিজ ’গারাইব আল কুরআন’ (১৮:৯৩)
পুস্তকে বলেন, “মহানবী (দ:) নূর (আলো)
এবং আলো বিচ্ছুরণকারী প্রদীপ।”
মোল্লা আলী কারী তাঁর ’শরহে শিফা’ বইয়ে বলেন,
“এর সুস্পষ্ট অর্থ হলো, নূর বলতে মহানবী (দ:)-
কে বুঝিয়েছে।”
আল্লাহ পাক এরশাদ ফরমান: “হে অদৃশ্যের সংবাদদাতা (পরিজ্ঞাতা)
(নবী-দ:)! নিশ্চয় আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি ‘উপস্থিত’
‘পর্যবেক্ষণকারী’ (হাযের-নাযের) করে,
সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী হিসেবে; এবং আল্লাহর প্রতি তাঁরই
নির্দেশে আহ্বানকারী ও
আলোকোজ্জ্বলকারী প্রদীপ (ইমাম আহমদ রেযা খান
কৃত তাফসীরে ‘সূর্য’ বলা হয়েছে)-স্বরূপ।” (আল কুরআন
৩৩:৪৫-৬)
ইমাম কাজী বায়দাবী (রহ:) নিজ তাফসীরে লিখেন:
“এটা সূর্য, কেননা আল্লাহ বলেছেন,
‘আমি সূর্যকে একটি প্রদীপ বানিয়েছি;’ অথবা, এটা প্রদীপও
হতে পারে।”
ইবনে কাসির তার তাফসীরে বলেন, “আল্লাহর বাণী:
‘আলোকোজ্জ্বলকারী প্রদীপ’, অর্থাৎ, (হে রাসূল)
আপনি যে সত্য নিয়ে এসেছেন তাতেই আপনার সুউচ্চ
মর্যাদা/মাহাত্ম্য প্রতিফলিত হয়েছে, যেমনিভাবে সূর্যের
উদয় ও কিরণ দ্বারা বোঝা যায় (তার বৈশিষ্ট্য), যা কেউই
অস্বীকার করেন না কেবল একগুঁয়েরা ছাড়া।”
রাগিব আল ইসফাহানী ‘আল মুফরাদাত’ (১:১৪৭) পুস্তকে বলেন,
“সিরাজ (প্রদীপ) শব্দটি যা কিছু আলোক বিচ্ছুরণ করে তার
সবগুলোকেই বোঝায়।”
’শরহে মাওয়াহিব’ (৩:১৭১) গ্রন্থে ইমাম
যুরকানী মালেকী (রহ:) বলেন, “মহানবী (দ:)-
কে প্রদীপ বলা হয়েছে, কারণ এক প্রদীপ থেকে বহু
প্রদীপে আলো জ্বালা হয়, তথাপিও ওই প্রদীপের
আলোয় কোনো কমতি হয় না।”
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা আনসারী (রহ:),
যিনি আরবী কবি ইমরুল কায়েসের পৌত্র, তিনি মহানবী (দ:)
সম্পর্কে নিজ কবিতায় বলেন:
‘এমন কি আমাদের কাছে যদি (তাঁর নবুয়্যতের) সুস্পষ্ট চিহ্ন না-
ও থাকতো,
তাঁর চেহারা মোবারক-ই আপনাদের সে খবর
বলে দিতো ।।’
ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী মক্কী (রহ:) নিজ ‘আল ইসাবা’
পুস্তকে (২:২৯৯) এই বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন এবং বলেন,
“মহানবী (দ:)-এর প্রশংসায় এটি সবচেয়ে সুন্দর পদ্য।”
হযরত ইবনে রাওয়াহা (রা:) সম্পর্কে ইবনে সাইয়্যেদ আল
নাস নিজ ‘মিনাহ আল মায’ (পৃষ্ঠা ১৬৬) বইয়ে বলেন:
ইবনে রাওয়াহা (রা:) মক্কা বিজয়ের আগে ৮ জুমাদা তারিখে ‘মু’তা’
দিবসে শাহাদাৎ বরণ করেন। ওই দিন তিনি অন্যান্য
সেনাপতিদের সাথে সেনাপতিত্ব করছিলেন। কবিদের
একজন হিসেবে তিনি অনেক ভাল কাজ করেন
এবং মহানবী (দ:)-এর প্রতি শত্রুদের অপবাদ খণ্ডন
করে যথোপযুক্ত জবাব দেন। তাঁর এবং তাঁর দুই বন্ধু হযরত
হাসান বিন সাবেত (রা:) ও হযরত কাআব ইবনে যুহাইর (রা:)
সম্পর্কেই নাযেল হয়েছিল কুরআনের আয়াত – ‘শুধু যারা ঈমান
আনে ও সৎকর্ম করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ
করে তারা ব্যতিরেকে।’ (কবিবৃন্দ ২৬:২২৭)
হিশাম ইবনে উরওয়া তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন,
যিনি বলেন: আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:)-এর চেয়ে তৎপর
আমি আর এমন কাউকে দেখিনি। একদিন রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে তাঁর
উদ্দেশ্যে বলতে শুনলাম, “বর্তমানের জন্যে যথাযথ কিছু
কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও, যখন আমি তোমার
দিকে তাকিয়ে আছি।” তৎক্ষণাৎ কবি উঠে দাঁড়ালেন
এবং বল্লেন,
ইন্নী তাফাররাসতু ফীকাল খায়রা আ’রিফুহূ
ওয়াল্লাহু ইয়া’লামু আন্না মা খানানী আল-বাসারু
আন্তা আল-নাবিই-ইয়্যু ওয়া মান ইউহরামু শাফা’আতাহু
ইয়াওমাল হিসাবি লাকাদ আযরা বিহিল কাদারু
ফা-সাব্বাত-আল্লাহু মা আতাকা মিন হাসানিন
তাসবিতা মূসা ওয়া নাসরান কাল্লাযী নুসিরু
অর্থ:
অন্তর্দৃষ্টিতে আমি দেখতে পাচ্ছি আপনার (চূড়ান্ত) ভালাই
এতে আমার নাই কোনো সন্দেহ-ই
আল্লাহ জানেন, এই অন্তর্দৃষ্টি আমার সাথে কভু
বিশ্বাসঘাতকতা করে নাই
নবী আপনি-ই
আর যে রয়েছে আপনার শাফায়াত বিনা-ই
রোজ কেয়ামতে তার ভাগ্য-ললাটে আঁকা হবে বে-
ইজ্জতীর বিড়ম্বনা-ই
আল্লাহ সুদৃঢ় করুন সে সব ভালাই, তিনি আপনাকে দান
করেছেন যা-ই
মূসা (আ:)-এর মতো দৃঢ়তা, আর বিজয় ওই এক-ই ।।
এ কবিতা শুনে মহানবী (দ:) কবিকে বলেন, “আল্লাহ
তোমাকেও দৃঢ় (অটল,অবিচল) করুন, ওহে ইবনে রাওয়াহা!”
হিশাম ইবনে উরওয়া আরও বলেন, বাস্তবিকই আল্লাহ
তাঁকে সবচেয়ে সুদৃঢ় করেছিলেন (ঈমানী চেতনায়)।
তিনি শহীদ হন; তাঁর জন্যে বেহেশ্তের
দরজা খুলে দেয়া হয়, আর তিনি তাতে প্রবেশ করেন।
আল্লাহর একটি সিফাত (গুণ) হলো ‘যুন্ নূর’, যার অর্থ তিনি নূর
(আলো)-এর স্রষ্টা এবং ওই নূর দ্বারা আসমান ও জমিন, আর
সেই সাথে ঈমানদারদের অন্তরও হেদায়াতের
আলো দ্বারা আলোকোজ্জ্বলকারী। ইমাম নববী (রহ:)
নিজ ‘শরহে সহীহ মুসলিম’ গ্রন্থে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর
দোয়া উদ্ধৃত করেন: “এয়া আল্লাহ, আপনি হলেন আসমান ও
জমিনে নূর এবং সমস্ত প্রশংসা-ই আপনার…..” (মুসাফিরদের
নামায-বিষয়ক বই #১৯৯)
উপরোক্ত ‘আপনি হলেন আসমান ও জমিনে নূর’ – এই
বাক্যটির ব্যাখ্যায় উলামায়ে কেরাম বলেন: “আপনি-ই
তাদেরকে (আপনার নূর দ্বারা) আলোকিত করেন এবং আপনি-ই
তাদের নূর তথা আলোর স্রষ্টা।” হযরত আবু উবায়দা (রা:)
বলেন, “এর অর্থ – আপনার নূর দ্বারাই আসমান ও
জমিনে অবস্থানকারী সবাই হেদায়াত লাভ করেন।” আল্লাহর
নাম ’নূর’ সম্পর্কে আল্ খাত্তাবী তাঁর তাফসীরে লিখেন,
“তিনি (আল্লাহ) এমন এক সত্তা যাঁর নূর দ্বারা অন্ধ দেখতে পায়
এবং পথহারা পথের দিশা পায়, যেহেতু তিনি আসমান ও জমিনে নূর
(আলো); আর এটাও সম্ভব যে ‘নূর’ বলতে ‘যুন্ নূর’-
কে বোঝানো হয়েছে। উপরন্তু, এটা সঠিক নয় যে ‘নূর’
আল্লাহতা’লার যাত মোবারকের গুণ (যাতী সিফাত/সত্তাগত
গুণ), কেননা এটা ’সিফাতু ফে’লী’ (গুণবাচক ক্রিয়া); অর্থাৎ,
তিনি নূরের স্রষ্টা।” অন্যান্য উলামা বলেন, “আল্লাহ আসমান ও
জমিনে নূর – এ বাক্যটির অর্থ হলো, তিনি ওগুলোর সূর্য ও চাঁদ
ও তারাসমূহের কর্তা।”
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন
যে মহানবী (দ:) এরশাদ করেছেন: “মহান আল্লাহ
সৃষ্টি জগত (মাখলুকাত)-কে অন্ধকারে (ফী যুলমাতিন) সৃজন
করেন; অতঃপর তাদের প্রতি নিজ নূর মোবারক বিচ্ছুরণ
করেন। যিনি-ই এই ঐশী আলোর স্পর্শে এসেছেন,
তিনি-ই হেদায়াত পেয়েছেন; আর যে সত্তা এর স্পর্শ পায়
নি, সে পথভ্রষ্ট হয়েছে। তাই আমি বলি, (ঐশী) কলম
শুকনো এবং (সব কিছুই) আল্লাহর (ঐশী) ভবিষ্যৎ জ্ঞানের
আওতাধীন।” (আল হাদীস)
ওপরের এই হাদীস ইমাম তিরমিযী (রহ:) সহীহ সনদে তাঁর
‘সুনান’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন (‘হাসান’ হিসেবে)। ইমাম
আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:) নিজ ‘মুসনাদ’ কেতাবের
২টি স্থানে, ইমাম তাবারানী (রহ:) তাঁর হাদীস সংকলনে, হাকিম
(রহ:) নিজ ’মুসতাদরাক’ পুস্তকে এবং ইমাম বায়হাকী (রহ:) তাঁর
‘সুনান আল কুবরা’ কেতাবে এটি বর্ণনা করেছেন। হযরত
ইবনুল আরবী (রহ:) তিরমিযী শরীফের ওপর তাঁর
ব্যাখ্যামূলক ‘আরিদাত আল আহওয়াযী’ গ্রন্থে (১০:১০৮) ইমাম
তিরমিযী (রহ:)-এর বর্ণনার বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করে বলেন,
“এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, প্রত্যেকে ওই নূর
থেকে ততোটুকুই পান যা আম (সাধারণ) ও খাস্ (সুনির্দিষ্ট)-
ভাবে তাঁর জন্যে মন্ঞ্জুর করা হয়েছে…তাঁর
অন্তরে এবং শরীরে।”
উপরোল্লিখিত হাদীস ও হযরত
কাজী ইবনে আরবী (রহ:)-এর ব্যাখ্যা পরিস্ফুট
করে যে ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নূর (জ্যোতি), আর
মহানবী (দ:) হলেন ইমানদারদের মধ্যে প্রথম এবং নূরের
বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হবার বেলায় সর্বাগ্রে, এমন কি ফেরেশতাবৃন্দ
যারা নূরের সৃষ্টি, তাঁদেরও অগ্রে। ঈমানী ঘাটতি যাদের, শুধু
তারাই এ সত্যটি অস্বীকার করতে পারে যে আল্লাহ যখন তাঁর
নূর সৃষ্টিকুলের প্রতি বিচ্ছুরণ করেছিলেন, তখন
মহানবী (দ:)-ই নিশ্চিতভাবে সর্বপ্রথমে ও সর্বাগ্রে ওই
ঐশী জ্যোতির পরশ পেয়েছিলেন, এমন মাত্রায়
তা পেয়েছিলেন যা কোনো ফেরেশতা,
কোনো নবী (আ:) কিংবা কোনো জ্বিন-ই পান নি।
ওপরের
আলোচনা এক্ষণে আলোতে নিয়ে এসেছে ইবনে
তাইমিয়ার আক্ষরিকতার চোরা-গর্তকে, যখন সে তার ‘মজমুয়াত
আল ফাতাওয়া’ নামের তাসাউফ-বিষয়ক প্রবন্ধে (১১:৯৪, ১৮:৩৬৬)
দাবি করে যে মহানবী (দ:) কোনোক্রমেই নূরের
পয়দা হতে পারেন না; কেননা, মানুষ মাটির সৃষ্টি যার মধ্যে রূহ
ফোঁকা হয়েছে; পক্ষান্তরে, ফেরেশতাকুল নূরের সৃষ্টি।
এই মতের সমর্থনে ইবনে তাইমিয়া মুসলিম
শরীফে লিপিবদ্ধ ও হযরত আয়েশা (রা:)-এর বর্ণিত
হাদীসটি উদ্ধৃত করে, যা’তে হুযূর পূর নূর (দ:) এরশাদ ফরমান:
”ফেরেশতাকুলকে নূর (আলো) থেকে সৃষ্টি করা হয়,
জ্বিন জাতিকে ধোঁয়াবিহীন আগুন থেকে, আর আদম (আ:)-
কে তা থেকে যা তোমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে (আল
কুরআনে)।”
কিন্তু মানবকে কখনো-ই নূরের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত
বলে বিবেচনা করা যাবে না, ওপরের হাদীস থেকে এমন
সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার মানে হলো হুবহু ইবলিস
(শয়তান)-এর সেই ভ্রান্ত ধারণার-ই লালন, যখন সে মাটির
চেয়ে ধোঁয়াবিহীন আগুনের শ্রেষ্ঠত্বের
অজুহাতে আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছিল। অধিকন্তু, এই
বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত তিরমিযী শরীফে লিপিবদ্ধ ও হযরত
ইবনে উমর (রা:) বর্ণিত (উপরোক্ত) সহীহ হাদীসের
সাথে একেবারেই অসঙ্গতিপূর্ণ, আর এই বিষয়টির একটি সঠিক ও
সামগ্রিক উপলব্ধির জন্যে প্রয়োজনীয় স্পষ্ট ব্যাখ্যারও
পরিপন্থী।
এ বিষয়ে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি হলো, আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দ আল্লাহর
দানকৃত নূর ও অন্যান্য নেয়ামতের প্রশ্নে ফেরেশ্তাদের
চেয়েও উন্নত আল্লাহর এক সৃষ্টি, যে খোদায়ী দান ও
নেয়ামত হযরত ইবনুল আরবী আল মালেকী (রহ:)-এর ভাষায়
হতে পারে আম (সার্বিক) বা খাস (বিশেষ), তাঁদের কলব্
(অন্তর) বা জিসম (দেহ) মোবারকে সন্নিবেশিত।
আম্বিয়া (আ:)-এর ফেরেশ্তাপ্রতিম অভ্যন্তরীন সিফাত
বা গুণাবলী সম্পর্কে ইমাম কাজী আয়ায (রহ:) নিজ ‘শেফা’
পুস্তকে (ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ২৭৭-৮)
খোলাসা বর্ণনা দেন নিম্নে:
”নবী-রাসূলবৃন্দ আল্লাহতা’লা ও তাঁর সৃষ্টিকুলের
মাঝে মধ্যস্থতাকারীস্বরূপ। তাঁরা মহান প্রভুর আদেশ-
নিষেধ, সতর্কবাণী ও শাস্তির ভীতি প্রদর্শন
সৃষ্টিকুলকে জানান এবং তাঁর আজ্ঞা, সৃষ্টি, পরাক্রম,
ঐশী ক্ষমতা এবং মালাকুত সম্পর্কে তারা যা জানতো না, তাও
তাদের জানিয়ে থাকেন। তাঁদের বাহ্যিক আকার-আকৃতি ও
শারীরিক গঠন অসুখ-বিসুখ, পরলোক গমন ইত্যাদি অনাবশ্যক
বিষয়ে মানুষের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বলেই দৃশ্যমান।
”কিন্তু তাঁদের রূহ মোবারক ও অভ্যন্তরীন (অদৃশ্য) অঙ্গ-
প্রত্যঙ্গ সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানবিক গুণাবলীর অধিকারী,
যা মহান প্রভুর সাথে সংশ্লিষ্ট এবং যা ফেরেশ্তাপ্রতিম
গুণাবলীর অনুরূপ; আর কোনো পরিবর্তন (অধঃপতন)
কিংবা খারাবির সম্ভাবনা থেকে যা মুক্ত।
সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে মানুষের সাথে সম্পৃক্ত
অক্ষমতা ও (মানবীয়) দুর্বলতা তাঁদের মধ্যে নেই। তাঁদের
অভ্যন্তরীন গুণাবলী যদি তাঁদের বাহ্যিক মানবীয়
আবরণের মতো হতো, তাহলে তাঁরা ফেরেশ্তার কাছ
থেকে ওহী/ঐশী বাণী গ্রহণ করতে পারতেন না,
ফেরেশ্তাদের দেখতেও পেতেন না, তাঁদের
সাথে মেশতে ও সঙ্গে বসতেও পারতেন না,
যেমনিভাবে আমরা সাধারণ মানুষেরা তা করতে পারি না।
”যদি আম্বিয়া (আ:)-এর বাহ্যিক কায়া মানবের
মতো না হয়ে ফেরেশতাদের মতো গুণাবলীসম্পন্ন
হতো, তাহলে তাঁদেরকে যে মর্তের মানুষের
মাঝে পাঠানো হয়েছিল তাদের
সাথে তাঁরা কথা বলতে পারতেন না, যা আল্লাহ
ইতোমধ্যে বলেছেন। অতএব, তাঁদের ‘জিসমানিয়্যাত’
তথা শারীরিক গঠনে তাঁরা মানবের সুরতে দৃশ্যমান, আর রূহ
(আত্মাগত) এবং অভ্যন্তরীন গুণাবলীর
ক্ষেত্রে তাঁরা ফেরেশতাসদৃশ।”
ইমাম কাজী আয়ায (রহ:)-এর (ওপরে উদ্ধৃত) বিশদ ব্যাখ্যার
বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া বুঝতে পারে নি, এ
ব্যাপারটি নিয়ে সন্দেহ আছে। বস্তুতঃ আম্বিয়া (আ:)
ফেরেশতাদের মতো নূরের পয়দা, এ বিষয়টি অস্বীকার
করার পর আম্বিয়া (আ:), বিশেষ করে তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ
খাতামুল আম্বিয়া (দ:)
সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া আহলে সুন্নাতের সর্বজনজ্ঞাত
আকিদা-বিশ্বাসটি-ই ব্যক্ত করে যে তাঁরা ফেরেশতাকুলের
চেয়েও উচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন; সে বলে:
”আল্লাহতা’লা তাঁর কিছু ক্ষমতা ও ঐশী জ্ঞান-
প্রজ্ঞা সৎকর্মশীল নেক বান্দা আম্বিয়া (আ:) ও
আউলিয়া (রহ:)-এর মাধ্যমে প্রকাশ করেন,
যা তিনি ফেরেশতাদের মাধ্যমে করেন না;
কেননা তিনি প্রথমোক্ত দলটিতে সে সব ‍গুণের সম্মিলন
ঘটান যেগুলো তাঁর অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যে ছড়ানো-
ছিটানো আছে। ফলে তিনি মানুষের
কায়া মাটি থেকে সৃষ্টি করেন এবং রূহ ফোঁকেন তাঁর নিজের
থেকে; আর এই কারণেই এটা বলা হয়, ‘মানুষ সৃষ্টিকুলের
প্রতিনিধি এবং সমগ্র বিশ্বজগতের প্রতিকৃতি।’
”আল্লাহর দৃষ্টিতে মহানবী (দ:) হলেন আদম-সন্তানদের
মধ্যে সরদার, সেরা সৃষ্টি, এবং সৃষ্টিকুলের মাঝে মহানতম। এ
কারণেই কেউ কেউ বলেছেন, ‘বিশ্বনবী (দ:)-এর
খাতিরেই আল্লাহ বিশ্বজগত সৃষ্টি করেন’; অথবা ‘মহানবী (দ:)
না হলে আল্লাহ আরশ-কুরসী, লওহ-কলম, আসমান-জমিন, চাঁদ-
সূর্য কিছুই সৃষ্টি করতেন না।’ তবে এটি হুযূর (দ:)-এর হাদীস
নয়……কিন্তু এটিকে সঠিক দৃষ্টিকোণ
থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।” (ইবনে তাইমিয়া)
ইবনে তাইমিয়া এরপর মহানবী (দ:)-এর কারণে আল্লাহ
বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন মর্মে বর্ণনার সপক্ষে তার
দালিলিক প্রমাণ পেশ করে, যা আমরা আমাদের (মূল) বইয়ের
(The 555 beautiful names of the Prophet) ’মোহাম্মদ’ ও
‘আহমদ’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) অধ্যায়ে উদ্ধৃত
করেছি (#১-২)।
সাহাবী হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা:) নিচের
কবিতা নবী করীম (দ:)-এর শানে আবৃত্তি করেন:
আলা আন্না খায়রা আল-নাসি ফী আল-আরদি কুল্লিহীমি
নাবিই-ইউন জালা ’আন্না শুকুকা আল-তারাজ্জুমী
নাবিই-ইউন আতা ওয়া আল-নাসু ফী ’উনজুহিয়্যাতিন
ওয়া ফী সাদাফিন ফী যুলমাতি আল-কুফরি মু’তিমি
ফা আকশা’য়া বি আল-নূরি আল-মুদি’য়ী যালামাহু
ওয়া সা’য়াদাহু ফী আমরিহী কুল্লু মুসলিমি
“মহানবী (দ:) ধরণীর বুকে মানবকুল-শ্রেষ্ঠ এ কথা সত্য
যিনি আমাদের থেকে সন্দেহ-শংকা করেছেন বিদূরিত
তাঁর আবির্ভাব এমনই সময় যখন মানুষ দম্ভের সাগরে ছিল
নিমজ্জিত
আর ছিল অবিশ্বাসের ঘন-কালো রাত্রির অন্ধকারে বিভ্রান্ত
অতঃপর তিনি (তাঁর) উজ্জ্বল আলো দ্বারা অন্ধকার করেন
বিতাড়িত
আর এতে তাঁকে সাহায্য করেন যাঁরা ছিলেন খোদার
প্রতি সমর্পিত ।”
(ভাব অনুবাদ)
ইবনে সাইয়্যেদ আল-নাস এটি বর্ণনা করেন ‘মিনাহ আল-মায’
পুস্তকে (পৃষ্ঠা ১৭৬)।
হযরত আব্বাস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব (রা:) মহানবী (দ:)-
কে বলেন, ”এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমি আপনার প্রশংসা করার
ইচ্ছা পোষণ করি।” হুযূর পাক (দ:) উত্তর দেন, “অগ্রসর
হোন — আল্লাহ আপনার মুখকে রৌপ্যশোভিত করুন!” অতঃপর
হযরত আব্বাস (রা:) বলেন:
“ধরাধামে শুভাগমনের আগে আপনি ছিলেন আশীর্বাদধন্য
(পবিত্র) ছায়া ও ঔরসে – তা এমনই এক সময়ে যখন আদম (আ:)
ও হাওয়া গাছের পাতা দিয়ে আব্রু সম্বরণ করতেন। অতঃপর
আপনি এই বসুন্ধরায় নেমে এলেন মানুষ হিসেবে নয়; এক
টুরো মাংস হিসেবেও নয়; কোনো জমাটবদ্ধ/ঘনীভূত
পিন্ড হিসেবেও নয়; বরং এক ফোঁটার মতো (আকৃতিতে)
যা (নূহ আলাইহিস সালামের) কিস্তিতে আরোহণ করেন যখন
মহাপ্লাবন ঈগল পাখি এবং অন্যান্য মূর্তিকে ধ্বংস করেছিল:
যে ফোঁটা সময়ের পরিক্রমণে পবিত্র ঔরস
থেকে পবিত্র গর্ভে ছিলেন অগ্রসরমান — যতোক্ষণ
না সমস্ত সৃষ্টির রক্ষণাবেক্ষণকারী মহাপ্রভু আপনার সুউচ্চ
মর্যাদাকে করেছেন সুপ্রতিষ্ঠিত খিনদিফ সমান পর্বতের
সর্বোচ্চ শৃঙ্গে। আর তখনি, যখন আপনি এ ধরায় আবির্ভূত
হন, একটি আলো পৃথিবীর ওপরে নিজ রশ্মি বিচ্ছুরণ করে,
যা সারা পৃথিবীর আকাশ আলোকিত করে। আমরা সেই
আলো দ্বারা আলোকিত, আর সেই আলোর উৎসমূল
এবং সেই হেদায়াতের পথসমূহ দ্বারাও (যার জন্যে আমরা)
কৃতজ্ঞ।”
ইবনে সাইয়্যেদ আল-নাস নিজ ‘মিনাহ আল-মায’ (পৃষ্ঠা ১৯২-৩)
পুস্তকে এই বর্ণনা ইমাম তাবারানী (রহ:) ও আল-বাযযার-এর
এসনাদে লিপিবদ্ধ করেন। এ ছাড়া ইবনে কাসির তার
’সীরাতে নববীয়্যা’ (মোস্তফা আবদ্ আল-ওয়াহিদ সংস্করণ
৪:৫১) গ্রন্থে এবং মোল্লা আলী কারী নিজ
‘শরহে শিফা’ (১:৩৬৪) কেতাবে বলেন যে এটি আবু বকর
শাফেয়ী ও ইমাম তাবারানী (রহ:) বর্ণিত এবং ইবনে আব্দিল
বার কৃত ‘আল-ইস্তিয়াব’ ও ইবনে কাইয়েম আল্ জওযিয়া প্রণীত
‘যাদ আল্ মা’আদ’ বইগুলোতে উদ্ধৃত হয়েছে।
সাহাবায়ে কেরাম বহুবার মহানবী (দ:)-কে নূর (জ্যোতি)
বা আলোর উৎস, বিশেষ করে চাঁদ ও সূর্যের
সাথে তুলনা করেছেন। এঁদের মধ্যে প্রধান হলেন তাঁর
কবি হযরত হাসসান বিন সাবিত আনসারী (রহ:); তিনি লিখেন:
”তারাহহালা ‘আন কওমিন ফাদ্দালাত ‘উকুলাহুম
ওয়া হাল্লা ‘আলা কওমিন বি নূরিন মুজাদ্দাদি ।”
”তিনি এমন এক জাতিকে ত্যাগ করেন,
যারা নিজেদের খামখেয়ালিপূর্ণ মস্তিষ্ককে দিয়েছিল তাঁর
চেয়ে বেশি গুরুত্ব,
অতঃপর তিনি অপর এক জাতির ভাগ্যাকাশে উদিত হন,
নিয়ে নতুন আলোর দিগন্ত ।” (ভাব অনুবাদ)
“মাতা ইয়াবদু ফী আল-দাজী আল-বাহিমি জাবিনুহুইয়ালুহু
মিসলা মিসবাহি আল-দুজা আল-মুতাওয়াক্কিদি ।”
অর্থ: মহানবী (দ:)-এর পবিত্র ললাট যখনই আবির্ভূত
হয়েছে ঘন কালো অন্ধকারে
তা অন্ধকার রাতে উজ্জ্বল তারকার মতোই দ্যুতি ছড়িয়েছে ।
ইমাম বায়হাকী (রহ:) তাঁর প্রণীত ‘দালাইল আন্
নবুয়্যত’ (১:২৮০, ৩০২) গ্রন্থে এই
দুটো পংক্তি বর্ণনা করেন। পরবর্তী পংক্তিটি ইবনে আবদিল
বারর নিজ ‘আল ইস্তিয়া’ব’ (১:৩৪১) বইয়ে এবং আল
যুরকানী মালেকী তাঁর ‘শরহে মাওয়াহিব আল্
লাদুন্নিয়া পুস্তকেও বর্ণনা করেন।
হযরত আবু উবায়দা ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আম্মার
ইবনে ইয়াসের (রা:) বর্ণনা করেন: আমি হযরত
রুবাইয়ী বিনতে মু’আওয়ায (রা:)-কে জিজ্ঞেস করি,
“মহানবী (দ:) সম্পর্কে বর্ণনা করুন।” তিনি উত্তর দেন,
“তুমি তাঁকে দেখলে বলতে: সূর্যোদয় হচ্ছে।”
এই বর্ণনা ইমাম বায়হাকী (রহ:) উদ্ধৃত করেছেন তাঁর ‘দালাইল
আন্ নবুয়্যত’ (১:২০০) কেতাবে; আর ইমাম ইবনে হাজর
হায়তামী মক্কী (রহ:) নিজ ‘মজমাউল যাওয়াইদ’ (৮:২৮০)
গ্রন্থে; তাতে তিনি বলেন যে ইমাম তাবারানী (রহ:)-ও
স্বরচিত ‘মু’জাম আল কবীর’ ও ‘আল আওসাত’ পুস্তক
দুটোতে এটা রওয়ায়াত করেছেন এবং এর
বর্ণনাকারীদেরকে নির্ভরযোগ্য
বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
হযরত কাআব ইবনে মালেক (রা:) বলেন, ”আমি হুযূর পূর নূর
(দ:)-কে সালাম দেই, আর তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল
আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি যখনই খুশি হতেন, তাঁর
চেহারা মোবারক এমন উজ্জ্বল হতো যেন
চাঁদের ‍টুকরো।”
আল বুখারী ও মুসলিম শরীফে এই বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে;
ইমাম আহমদ (রহ:)-ও এটা বর্ণনা করেছেন নিজ ‘মুসনাদ’
কেতাবে। ইমাম বায়হাকী (রহ:) তাঁর কৃত ‘দালাইল আন্
নবুয়্যত’ (১:৩০১) কেতাবে সাহাবায়ে কেরাম ও অন্যান্যদের
বাণী বিধৃত করেন যা নিচে দেয়া হলো:
রাসূলুল্লাহ (দ:) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলে তাঁর ফুপু
হযরত ’আতিকা বিনতে আবদিল মুত্তালিব, যদিও ইমাম
বায়হাকী (রহ:) বলেন যে তিনি কুরাইশের ধর্ম
তখনো অনুসরণ করছিলেন, তিনি নিচের
চরণটি আবৃত্তি করেন –
’আয়নাইয়া জুদা বি আল-দুমু’ঈ আল-সাওয়াজিমি
’আলা আল-মুরতাদা কাল-বাদরি মিন আলে হাশেমী
অর্থ: আমার নয়নে অশ্রুধারা প্রবাহিত অনন্যতায় মনোনীত
জনের শ্রদ্ধার্ঘ্যস্বরূপ
যিনি হাশেমী পরিবারের পূর্ণ চন্দ্ররূপ ।।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:) মহানবী (দ:) সম্পর্কে বলেন:
আমিনুন মোস্তফা (দ:) লি আল-খায়রি ইয়াদ’উ
কা দাও’উই আল-বাদরি যাএয়ালাহু আল-যালামু
অর্থ: এক বিশ্বাসভাজন, মনোনীত জন, যিনি কল্যাণের
পথে করেন আহ্বান
যেন অন্ধকার রাতে পূর্ণ চন্দ্রের কিরণ ।।
হযরত উমর (রা:) আবৃত্তি করতেন নিম্নের পংক্তি:
লাও কুনতা মিন শাইয়্যিন সিওয়া বাশারিন
কুনতা আল-মুদিআ’ লি লায়লাত আল-বাদরি
অর্থ: “যদি আপনি হতেন মানবের সুরত-বহির্ভূত
কোনো কিছু ভিন্ন
তবে তা হতো সেই রাতের আলো যা‘তে চাঁদ হয় পূর্ণ
।।”
ইমাম বায়হাকী (রহ:) এই বর্ণনাটি লিপিবদ্ধ করেন নিজ ‘দালাইল
আন্ নবুওয়া’ (১:৩০১-৩০২) গ্রন্থে এবং বলেন যে হযরত উমর
(রা:) উক্ত পংক্তির সাথে আরও যোগ করেছিলেন,
“মহানবী (দ:) এ রকম ছিলেন; তিনি ছাড়া আর কেউই এ রকম
নয়।”
জামি’ ইবনে শাদ্দাদ বলেন: আমাদের গোত্রভুক্ত এক
ব্যক্তিকে তারেক
নামে ডাকা হতো [মোল্লা আলী কারী বলেন,
’ইনি সাহাবী হযরত শিহাব আবু ‘আবদ-আল্লাহ আর-
মুহারিবী (রহ:), যিনি হাদীস বর্ণনা করেন’]। তিনি বর্ণনা করেন
যে মহানবী (দ:)-এর সাথে মদীনায় তাঁর সাক্ষাৎ হয়; হুজূর পাক
(দ:) জিজ্ঞেস করেন, “তোমাদের সাথে এমন কিছু
আছে যা তোমরা বিক্রি করবে?” আমরা জবাবে বলি, এই উট
বিক্রি করবো। রাসূলুল্লাহ (দ:) জিজ্ঞেস করেন, “কতো?”
আমরা বলি, ‘এতো ওয়াসক্ (প্রতি এককে প্রায় ২৪০ দু’ অন্ঞ্জলি-
ভর্তি) খেজুর।’ মহানবী (দ:) উটের লাগাম নিজ হাত
মোবারকে নিয়ে মদীনা চলে গেলেন। তারেক ও তাঁর
সাথী বল্লেন, “আমরা এমন একজনের কাছে (উট)
বিক্রি করলাম যাঁকে আমরা চেনি-ও না।” আমাদের গোত্রের
এক মহিলা বল্লেন, “আমি তোমাদেরকে এই উটের দাম
পাবার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিচ্ছি। তাঁর
চেহারা মোবারককে পূর্ণচন্দ্রের মতো দেখেছি।
তিনি ঠকাবেন না।” পরের দিন সকালে এক ব্যক্তি ওই খেজুর
নিয়ে এলেন এবং বল্লেন, “আমি আল্লাহর রাসূল (দ:)-এর
প্রতিনিধি। তিনি আপনাদের এই খেজুর খেয়ে সুস্বাস্থ্য লাভ
করতে বলেছেন।” অতঃপর আমরা তাই করি।
ইমাম কাজী আয়ায (রহ:) এই ঘটনা তাঁর ‘শেফা শরীফ’
গ্রন্থে (ইংরেজি, পৃষ্ঠা ১৩৫), ইমাম সৈয়ুতী (রহ:) নিজ ‘মানাহিল
আল-সাফা’ (পৃষ্ঠা ১১৪#৫১৫)
কেতাবে এবং মোল্লা আলী কারী তাঁর ‘শরহে শেফা’
পুস্তকে (১:৫২৫) এটা রওয়ায়াত করেন।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন
যে রাসূলে খোদা (দ:) সেজদারত অবস্থায় আরয করেন:
”এয়া আল্লাহ! আপনি আমার কলবে (অন্তরে) নূর (আলো/
জ্যোতি) স্থাপন করুন; আরও স্থাপন করুন আমার শ্রবণশক্তি ও
দৃষ্টিশক্তিতে, আমার ডানে ও বামে, আমার সামনে ও
পেছনে, ওপরে ও নিচে; আমার জন্যে নূর সৃষ্টি করুন।”
অথবা তিনি বলেন, “আমাকে নূর (আলো) করুন।” হযরত
সালামা (রা:) বলেন, “আমি কুরাইব (রা:)-এর দেখা পাই এবং তিনি হযরত
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:)-কে উদ্ধৃত করেন, ‍যিনি বলেন:
“আমি আমার খালা মায়মুনা (রা:)-এর সাথে ছিলাম; এমন সময়
রাসূলুল্লাহ (দ:) সেখানে আসেন এবং ওই হাদীসের বাকি অংশ
ব্যক্ত করেন, যা গুনদার বর্ণনা করেছিলেন, আর
নিঃসন্দেহে এই কথাও যোগ করেন, “আমাকে নূর
(আলো) করুন।”
ইমাম মুসলিম (রহ:) এটি তাঁর সহীহ গ্রন্থের ‘সালাত আল-
মুসাফিরীন’ অধ্যায়ে বর্ণনা করেন। ইমাম আহমদ (রহ:)-ও নিজ
’মুসনাদ’ কেতাবে শক্তিশালী সনদে এটি বর্ণনা করেন,
তবে ওপরে উদ্ধৃত প্রথম রওয়ায়াতের বিপরীত দিক হতে;
যার ফলে হুজূর (দ:)-এর ভাষ্য এ রকম হয়: “আর আমাকে নূর
(আলো) করুন”, অথবা তিনি বলেছিলেন, “আমার জন্যে নূর
সৃষ্টি করুন।” ইমাম ইবনে হাজর (রহ:) তাঁর ‘ফাতহুল বারী’ (১৯৮৯
ইং সংস্করণ, ১১:১৪২) কেতাবে ইবনে আবি আসিমের রচিত
‘কেতাব আল-দু’আ’-এর উদ্ধৃতি দেন যা’তে বিবৃত হয়েছে:
“আর আমাকে মন্ঞ্জুর করুন নূরের ওপর
নূর” (ওয়া হাবলী নূরান ‘আলা নূর)। মহানবী (দ:)-এর শরীর
মোবারকের অন্যান্য অংশের কথা উল্লেখকারী এই
হাদীসের আরও বহু নির্ভরযোগ্য বর্ণনা রয়েছে। ইমাম
ইবনে হাজর বলেন যে ইমাম আবু বকর
ইবনে আরবী (রহ:)-এর হিসেবমতে সমস্ত বর্ণনায় হুজূর
পূর নূর (দ:)-এর নিজের জন্যে প্রার্থিত নূরের সংখ্যা ২৫টি।
এগুলো নিম্নরূপ:
মহানবী (দ:)-এর কলবে নূর
জিহ্বায় নূর
শ্রবণশক্তিতে নূর
দৃষ্টিতে নূর
ডানে, বামে, সামনে, পেছনে, ওপরে এবং নিচে নূর
আত্মাতে নূর
বক্ষে নূর
পেশীতে নূর
মাংসে নূর
রক্তে নূর
চুলে নূর
চামড়ায় নূর
হাড়ে নূর
রওযায় নূর
”আমার জন্যে আলো বৃদ্ধি করুন”
”আমায় অসীম আলো দিন”
”আমায় আলোর ওপর আলো দিন”
”আমায় আলো করুন”।
মহানবী (দ:) সর্বপ্রথম তাঁর মায়ের কাছে দেখা দেন নূর
তথা উজ্জ্বল জ্যোতির আকৃতিতে যা তাঁর মায়ের
সামনে দুনিয়াকে এমনই আলোকিত করে যে তিনি মক্কায়
অবস্থান করে সিরিয়ার প্রাসাদগুলোও স্পষ্ট দেখতে পান:
’এরবাদ ইবনে সারিয়া (রা:) ও আবু এমামা (রা:) বলেন
যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ করেন, “আমি হলাম আমার
পিতা (পূর্বপুরুষ) ইবরাহীম (আ:)-এর দোয়া, এবং আমার ভাই
ঈসা (আ:)-এর দেয়া শুভসংবাদ। যে রাতে ধরাধামে আমার
শুভাগমন হয়, আমার মা এমনই এক নূর দেখতে পেয়েছিলেন
যা দামেশ্কের দূর্গগুলো আলোকিত করেছিল এবং আমার
মা ওই আলোর রৌশনিতে সেগুলো দেখেছিলেন।”
ওপরের এই হাদীস বর্ণনা করেছেন আল্ হাকিম (রহ:) তাঁর
‘মুস্তাদরাক’ পুস্তকে (২:৬১৬-১৭), ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল
(রহ:) নিজ ‘মুসনাদ’ কেতাবে (৪:১৮৪), এবং ইমাম বায়হাকী (রহ:)
স্বরচিত ‘দালাইল আল-নবুওয়া’ গ্রন্থে (১:১১০, ২:৮)। ইবনুল
জওযী এটি উদ্ধৃত করেন ‘আল ওয়াফা’ কেতাবে (পৃষ্ঠা ৯১,
বেদায়াত নাবিই-ইনা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ২১তম অধ্যায়)
এবং ইবনে কাসির ‘মাওলিদে রাসূলিল্লাহ’ ও
’তাফসীরে কাসির’ (৪:৩৬০) গ্রন্থগুলোতে। ইমাম
ইবনে হাজর হায়তামী মক্কী শাফেয়ী (রহ:) এই
বর্ণনা নিজ ‘মজমা’ আল-যাওয়াইদ (৮:২২১) কেতাবে উদ্ধৃত
করে বলেন যে ইমাম তাবারানী (রহ:) এবং ইমাম আহমদ হাম্বল
(রহ:)-ও এটি বর্ণনা করেছেন; আর ইমাম আহমদ (রহ:)-এর সনদ
‘হাসান’ (উত্তম)।
ইবনে ইসহাক তাঁর কৃত প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের ইতিহাস
পুস্তকে ইবনে হিশামের সার-সংক্ষেপমূলক
‘সীরাতে রাসূল-আল্লাহ’ (দারুল উইফাক্ক সংস্করণ, ১/২:১৬৬)
বইয়ের অনুরূপ কিন্তু দীর্ঘ বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন;
ইবনে ইসহাক বলেন:
সাওর ইবনে ইয়াযিদ আমার কাছে বর্ণনা করেন কোনো এক
আলেমের কাছ থেকে প্রাপ্ত হয়ে, যিনি আমার মনে হয়
খালেদ ইবনে মা’দান আল-কালা’ঈ হবেন; বর্ণনামতে একবার
সাহাবীদের একটি ছোট দল হুজূর পূর নূর (দ:)-এর
কাছে আরয করেন, ’এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমাদেরকে আপনার
সম্পর্কে বলুন।’ তিনি উত্তর দেন, ”আমি হলাম আমার
পিতা (পূর্বপুরুষ) ইবরাহীম (আ:)-এর দোয়া, এবং আমার ভাই
ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত শুভসংবাদ; আর সেই নূর যা আমার মা আমার
জন্মকালীন সময়ে দেখেছিলেন তাঁর থেকে বিচ্ছুরিত
হয়ে সিরিয়ার দূর্গগুলোকে আলোকিত করেছিল। আমার
(শৈশবকালীন) যত্ন নিয়েছিল বনু সা’য়াদ ইবনে বকর। আমি যখন
আমার এক ভাইয়ের সাথে আমাদের ঘরের পাশে অবস্থান
করছিলাম, তখন দু’জন ব্যক্তি (ফেরেশতা)
ধবধবে সাদা পোষাকে আমার কাছে আসেন; তাঁদের
হাতে ছিল বরফ (তুষার)-ভর্তি একটি পাত্র। তাঁরা আমার বক্ষ
বিদীর্ণ করেন এবং হৃদযন্ত্র বের করে তা খোলেন, আর
তা থেকে এটি কালো পিণ্ড বের করে ফেলে দেন।
অতঃপর তাঁরা আমার হৃদযন্ত্র ও বক্ষকে ওই বরফ
দ্বারা ধুয়ে পরিষ্কার করেন। এরপর তাঁদের একজন
অপরজনকে বলেন, ‘এঁকে ওনার জাতির দশজনের
সাথে (পাল্লায়) ওজন দাও।’ তা দেয়া হলে আমি ওই দশজনের
চেয়ে ভারি হই। ওই দু’জনের প্রথম জন আবার বলেন, ‘তাঁর
জাতির এক’শ জনের সাথে ওজন দাও।’ তা করা হলে আমি আবারও
ভারি হই। এমতাবস্থায় প্রথম জন আবার বলেন, ‘এক হাজার
জনের সাথে এবার ওজন দাও।’ তা করা হলে এবারও আমি ভারি হই।
অতঃপর তিনি বলেন, ‘তাঁকে ছেড়ে দাও! কেননা, আল্লাহর
শপথ, তুমি যদি তাঁকে তাঁর সমগ্র জাতির সাথে ওজন দিতে, তাও
তিনি ওজনে ভারি হতেন।’ [ইবনে জারির তাবারীর বর্ণনায়
আরও যুক্ত আছে: “তাঁরা এরপর
আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে দু’চোখের
মাঝখানে চুম্বন করেন এবং বলেন, ‘এয়া হাবীব (দ:)! ভয়
পাবেন না; নিশ্চয় আপনি যদি জানতেন সে ভালাই
সম্পর্কে যা আপনার দ্বারা হতে যাচ্ছে,
তাহলে আপনি খুশি (সন্তুষ্ট) হতেন’।”
এই বিবরণ তাবারীর ইতিহাসেও লিপিবদ্ধ আছে। সাওর
ইবনে ইয়াযিদ এবং খালেদ ইবনে মা’দান দু’জনই নির্ভরযোগ্য
বর্ণনাকারী যাঁদের কাছ থেকে ইমাম বুখারী (রহ:) ও অন্যান্য
হাদীসবেত্তা হাদীস গ্রহণ করেছেন।
ইমাম কাজী আয়ায (রহ:) তাঁর প্রণীত ‘শেফা শরীফ’
গ্রন্থে মহানবী (দ:)-এর সুউচ্চ বংশ পরিচয় ও তার শ্রেষ্ঠত্ব-
বিষয়ক অধ্যায়ে বলেন:
“হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন
যে আল্লাহতা’লা হযরত আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করারও ২০০০ বছর
আগে মহানবী (দ:)-এর রূহ মোবারক মহান প্রভুর
হুযূরে (উপস্থিতিতে) নূরের আকৃতিতে অস্তিত্বশীল
ছিলেন। ওই নূর খোদাতা’লার প্রশংসা ও বন্দনা করতেন, আর
ফেরেশতাকুল ওই নূরের প্রশংসা করতেন। আল্লাহতা’লা যখন
হযরত আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেন, তখন তিনি ওই
নূরকে আদম (আ:)-এর পবিত্র কোমরের পেছনের
দিকে বিচ্ছুরণ করেন।”
ইমাম সৈয়ুতী (রহ:) নিজ ‘মানাহিল আল্ সাফা’ (পৃষ্ঠা ৫৩ #১২৮)
পুস্তকে বলেন: “(ওপরের বর্ণনাটি) ইবনে আবি উমর
আল-’আদানী তাঁর ‘মুসনাদ’ কেতাবে উদ্ধৃত করেছেন।”
‘তাখরিজ আহাদীস শরহ আল-মাওয়াকিফ’ (পৃষ্ঠা ৩২ #১২)
গ্রন্থে ইমাম সৈয়ুতী (রহ:) এটি উদ্ধৃত করেন এভাবে:
“আল্লাহতা’লার উপস্থিতিতে কুরাইশ ছিল একটি নূর।” ইবনে আল-
কাততান তাঁর ‘আহকাম’ কেতাবে (১:১২) এই বর্ণনা ভিন্ন
আকারে পেশ করেন, যদিও আবদুল্লাহ আল-গিমারী নিজ
‘এরশাদ আত্ তালেব’ পুস্তকে একে বানোয়াট
বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন:
”আলী ইবনে হুসাইন (রহ:) তাঁর পিতা ইমাম হসাইন (রা:) হতে,
তিনি তাঁর পিতা হযরত আলী (ক:) হতে বর্ণনা করেন যে হুযূর
পাক (দ:) এরশাদ ফরমান, ‘আল্লাহতা’লা হযরত আদম (আ:)-
কে সৃষ্টি করার চৌদ্দ হাজার বছর আগে আমি ছিলাম মহান প্রভুর
উপস্থিতিতে একটি নূর (আলো)’।”
অনুরূপ বর্ণনাসমূহ লিপিবদ্ধ আছে ইমাম আহমদ (রহ:)-এর
‘ফযায়েলে সাহাবা’ (২:৬৬৩ #১১৩০), ইমাম যাহাবী (রহ:)-এর
‘মিযান আল-এ’তেদাল’ (১:২৩৫), এবং ইবনে জারির তাবারীর
’আল-রিয়াদ আল-নাদিরা’ (২:১৬৪, ৩:১৫৪) বইগুলোতে। ওপরের
বর্ণনার সাথে সম্পৃক্ত হলো নিচের বর্ণনাগুলো:
হযরত ’আমর ইবনে ’আবাসা (রা:) রওয়ায়াত করেন
যে মহানবী (দ:) এরশাদ করেছেন, “নিশ্চয় আল্লাহতা’লা তাঁর
বান্দাদের সৃষ্টি করার দু’হাজার বছর আগে তাদের রূহ
ফুঁকেছিলেন। অতঃপর তাদের
মধ্যে যারা একে অপরকে চেনতে পেরেছিল,
তারা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ হয়; যারা চেনতে পারে নি,
তারা দূরে সরে থাকে।”
ইমাম সৈয়ুতী (রহ:) নিজ ‘তাখরিজ আহাদীস শরহ আল-
মাওয়াকিফ’ (পৃষ্ঠা ৩১ #১০) গ্রন্থে বলেন যে এই
বর্ণনা ইবনে মানদাহ উদ্ধৃত করেছিলেন, যদিও ইমাম
ইবনে হাজর হায়তামী মক্কী (রহ:) এটিকে ভীষণ দুর্বল
হিসেবে চিহ্নিত করেন।
“যিনি (আল্লাহ) দেখেন আপনাকে (রাসূল-দ:) যখন
আপনি দণ্ডায়মান হন (নামাযে, দোয়ায়
কিংবা কোনো স্থানে); এবং নামাযীদের মধ্যে আপনার
পরিদর্শনার্থে ভ্রমণকেও” (সূরা শুয়ারা, ২১৮-৯ আয়াত) – আল
কুরআনের এই আয়াতের মধ্যে ‘তাক্কাল্লুবাক’ (আপনার
পরিদর্শনার্থে ভ্রমণ) শব্দটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে:
“আপনার পূর্বপুরুষদের ঔরসে আপনার (পৃথিবীতে)
শুভাগমন।” এটা হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)
থেকে বর্ণনা করেছেন আল-হাকিম নিজ ‘আল-
মুস্তাদরাক’ (২:৩৩৮) কেতাবে এবং এই ব্যাখ্যা সমর্থন
করেছেন ইবনে মারদাওয়াঈ, আল-রাযী, ইমাম সৈয়ুতী ও
অন্যান্য জ্ঞান বিশারদ।
আল-শেহরেস্তানী স্বরচিত ‘আল-মিলাল ওয়ান্ নিহাল’
কেতাবে (২:২৩৮) বলেন: “মহানবী (দ:)-এর নূর হযরত
ইবরাহীম (আ:) থেকে হযরত ইসমাঈল (আ:) পর্যন্ত
পৌঁছেছিল। এরপর তাঁর আওলাদে পাকের মাধ্যমে আবদুল
মুত্তালিবের কাছে আসে……আর এই নূরের
বরকতে (আশীর্বাদে) আল্লাহতা’লা বাদশাহ আবরাহার অনিষ্ট
দূর করে দেন” (ওয়া বি-বারাকাতি যালিক আল-নূর দাফা’ আল্লাহু
তা’লা শাররা আবরাহা)।
ইমাম সৈয়ুতী (রহ:) তাঁর অনেক বইয়ে ওপরের এই
বর্ণনা উদ্ধৃত করেন; উদাহরণস্বরূপ, ‘মাসালিক আল-
হুনাফা’ (পৃষ্ঠা ৪০-১), ’আল-দুরূজ আল-মুনিফা’ (পৃষ্ঠা ১৬) এবং ‘আল-
তা’যিম ওয়া আল-মিন্না’ (পৃষ্ঠা ৫৫)। মহানবী (দ:)-এর বাবা-
মা যে সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামাবৃন্দ কর্তৃক
বেহেশতী হিসেবে বিবেচিত, তার ভিত্তি প্রমাণ করতেই
তিনি এ বইগুলো রচনা করেন।
আল-যুহরী বর্ণনা করেন: ‘আবদুল্লাহ ইবনে আবদিল
মোত্তালিব ছিলেন কুরাইশ বংশীয় পুরুষদের
মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন। একদিন তিনি কোথাও বের
হলে তাঁকে কুরাইশ বংশের এক দল রমনী দেখতে পান।
তাদের একজন বলেন, “ওহে কুরাইশ নারীকুল! তোমাদের
মধ্যে কে এই যুবককে বিয়ে করবে এবং ফলশ্রুতিতে তাঁর
দু’চোখের মাঝখানে অবস্থিত নূর (জ্যোতি) লাভ করবে?”
সত্যি তাঁর দু’চোখের মাঝখানে আলো প্রভা ছড়াচ্ছিল।
অতঃপর আমেনা বিনতে ওয়াহব ইবনে আবদিল মানাফ
ইবনে যুহরার সাথে তাঁর বিয়ে হয়; তাঁদের ঘরেই
মহানবী (দ:)-এর আবির্ভাব হয়।
আল-বায়হাকী (রহ:) এটি বর্ণনা করেন তাঁর ‘দালাইল আন্ নবুওয়া’
পুস্তকে (১:৮৭); তাবারী নিজ ‘তারিখ’ (২:২৪৩) কেতাবে;
ইবনুল জওযী স্বরচিত ‘’আল-ওয়াফা’ বইয়ে (পৃষ্ঠা ৮২-৩,
আবওয়াবে বেদাএয়াতি নাবিই-ইনা ১৬ নং অধ্যায়)। ইবনে হিশামও
অনুরূপ একটা বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেন, তবে ওর সনদ
নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে (গুইলওমে অনুবাদ, পৃষ্ঠা ৬৮-৯
দেখুন)।
এ মর্মে অভিযোগ করা হয় যে, বনূ আসাদ গোত্রের এক
নারী, যিনি ওয়ারাকা ইবনে নাওফালের বোন, তিনি আবদুল্লাহর
কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন; কিন্তু আবদুল্লাহ
আমেনা বিনতে ওয়াহবকে বিয়ে করেন। অতঃপর
তিনি আমেনার সঙ্গ ত্যাগ করে বিয়ের প্রস্তাবকারিনী ওই
মহিলার কাছে যান এবং তাকে জিজ্ঞেস করেন কেন তিনি একদিন
আগে বিয়ের প্রস্তাব দেননি। এর প্রত্যুত্তরে ওই
মহিলা তাঁকে বলেন, যে জ্যোতি তিনি আগের দিন
দেখেছিলেন, তা আবদুল্লাহকে ত্যাগ করেছে; আর তাই
তাঁকে ওই মহিলার এখন কোনো প্রয়োজন নেই।
মহিলা তাঁকে বলেন, “তুমি যখন আমাকে অতিক্রম করছিলে,
তখন তোমার দু’চোখের মাঝখানে একটি নূরের সাদা ঝলক
ছিল। আমি তোমার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু
তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করে আমেনাকে বিয়ে করলে; ওই
নূর আমেনা নিয়ে গিয়েছে।”
বর্ণিত আছে যে, হযরত জাবের ইবনে আব্দিল্লাহ (রা:) হুযূর
পাক (দ:)-এর কাছে আরয করেন: “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনার
জন্যে আমার পিতা-মাতা কুরবান হোন। আল্লাহ সবার
আগে কী/কাকে সৃষ্টি করেছিলেন তা আমাদের বলুন।”
মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: ”ওহে জাবের! আল্লাহ
সর্বপ্রথম তাঁর নূর হতে তোমাদের নবী (দ:)-এর নূর
সৃষ্টি করেছিলেন, আর ওই নূর তাঁর কুদরতের মাঝে অবস্থান
করেন ততোক্ষণ, যতোক্ষণ মহান প্রভু ইচ্ছা করেন; ওই
সময়ে অস্তিত্ব না ছিল লওহের, না ছিল কলমের,
না বেহেশতের, না দোযখের, না জাহান্নামের,
না ফেরেশতার, না আসমানের, না জমিনের। আর যখন
আল্লাহতা’লা তামাম মাখলুকাত সৃষ্টি করার ইচ্ছা করলেন, তখন
তিনি ওই নূরকে চারভাগে বিভক্ত করলেন:
প্রথমটি দ্বারা বানালেন কলম; দ্বিতীয়টি দ্বারা লওহ;
তৃতীয়টি দ্বারা আরশ; এবং চতুর্থটি দ্বারা বাকি সব কিছু।”
উলামায়ে ইসলামের মাঝে এই বর্ণনার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ
বিভিন্ন রকমের। তাঁদের বক্তব্য নিম্নে দেয়া হলো:
ভারতীয় হাদীসবেত্তা আবদূল হক
দেহেলভী (ইনতেকাল ১০৫২ হিজরী) এই বর্ণনা লিপিবদ্ধ
করেন নিজ পারসিক ‘মাদারিজুন্ নবুওয়াত’ পুস্তকে (২:২,
মাকতাবা আল-নূরিয়্যা সংস্করণ, সাখোর) এবং বলেন
যে এটা সহীহ (বিশুদ্ধ)।
অপর ভারতীয় আলেম আবদুল হাই লৌক্ষ্মভী স্বরচিত ‘আল-
আসার আল-মারফু’আ ফী আল-আখবার আল-
মওদু’আ’ (পৃষ্ঠা ৩৩-৪, লাহোর সংস্করণ) গ্রন্থে এর
উদ্ধৃতি দেন এবং বলেন, “নূরে মোহাম্মদীর শ্রেষ্ঠত্ব
প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আবদ আল-রাযযাক (রহ:)-এর বর্ণনায়,
যা’তে এর পাশাপাশি রয়েছে সমগ্র সৃষ্টিকুলের ওপরে ওর
সুস্পষ্ট অগ্রাধিকার।”
’আল মাওয়াহিব আল লাদুন্নিয়া’ (১:৫৫) গ্রন্থে লিপিবদ্ধ ইমাম
কসতলানী (রহ:)-এর ভাষ্যানুযায়ী হযরত আবদ্ আল-রাযযাক
(বেসাল-২১১ হিজরী) তাঁর রচিত ‘মুসান্নাফ’ কেতাবে ওপরের
ঘটনাটি বর্ণনা করেন; ইমাম যুরকানী মালেকীও
এটি বর্ণনা করেন নিজ ‘শরহে মাওয়াহিব’ পুস্তকে (মাতবা’আ
আল-’আমিরা, কায়রো সংস্করণের ১:৫৬)। হযরত ‘আবদ্ আল-
রাযযাক (রহ:)-এর রওয়ায়াতের বিশ্বাসযোগ্যতার
ব্যাপারে কোনো সন্দেহ-ই নেই। ইমাম বুখারী (রহ:)
তাঁর কাছ থেকে ১২০টি এবং ইমাম মুসলিম (রহ:) ৪০০টি বর্ণনা গ্রহণ
করেছেন।
আহমদ আবেদীন শামী (বেসাল-১৩২০ হিজরী),
যিনি হানাফী আলেম ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ:)-
এর ছেলে, তিনি ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী মক্কী (রহ:)-
এর কৃত ‘আন-নি’মাত আল-কুবরা ‘আলাল ’আলম
ফী মওলিদে সাইয়্যেদে ওয়ালাদে আদম’ পুস্তকের
ব্যাখ্যামূলক বইয়ে এই হাদীসটি দলিল হিসেবে পেশ
করেন। ইমাম ইউসুফ নাবহানী (রহ:) তাঁর ‘জওয়াহির আল-বিহার’
কেতাবে (৩:৩৫৪) এর উদ্ধৃতি দেন।
ইমাম কসতলানী (রহ:)-এর ‘মাওয়াহিব’
থেকে পুরো হাদীসখানা উদ্ধৃত করেন ইসমাঈল
ইবনে মুহাম্মদ আজলুনী (ইন্তেকাল-১১৬২ হিজরী) নিজ
’কাশফ আল-খাফা’ গ্রন্থে (মাকতাবাত আল-গাযযালী, বৈরুত
সংস্করণের ১:২৬৫)।
সাইয়্যেদ মাহমুদ আলুসী তাঁর কৃত ‘তাফসীরে রুহুল
মাআনী’ (বৈরুত সংস্করণের ১৭:১০৫) কেতাবে বলেন, “সবার
প্রতি বিশ্বনবী (দ:)-এর রহমত (খোদায়ী করুণা) হওয়ার
বিষয়টি সম্পৃক্ত রয়েছে এই বাস্তবতার সাথে যে, তিনি-ই
সৃষ্টির প্রাক্ লগ্ন থেকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের
জন্যে ঐশী করুণাধারার মাধ্যম/মধ্যস্থতাকারী (ওয়াসিতাত্
আল-ফায়দ আল-এলাহী ‘আলাল মুমকিনাত্ ‘আলা হাসাব আল-
কাওয়াবিল); আর এ কারণেই তাঁর নূর (জ্যোতি)-
কে সর্বপ্রথমে সৃষ্টি করা হয়, যেমনিভাবে বর্ণিত
হয়েছে হাদীসে, ‘ওহে জাবের, আল্লাহ সর্বপ্রথম
তোমাদের নবী (দ:)-এর নূরকে সৃষ্টি করেন’; আরও
এরশাদ হয়েছে, ’আল্লাহ দাতা, আমি বণ্টনকারী’ (আল-কাসেম
#২৬১ দেখুন)। সূফীবৃন্দ, আল্লাহ তাঁদের ভেদের
রহস্যের পবিত্রতা দিন, এই অধ্যায় সম্পর্কে অনেক কিছূ
বলেছেন।” আলুসী ‘রুহুল মাআনী’ (৮:৭১) পুস্তকের
অন্য আরেকটি এবারতে হযরত জাবের (রা:)-এর হাদীসটি দলিল
হিসেবে পেশ করেন।
সাইয়েদ আবুল হাসান আহমদ ইবনে আবদিল্লাহ (বেসাল-৩য়
হিজরী শতক) নিজ ‘আল-আনওয়ার ফী মওলিদ আন্
নবী মোহাম্মদ ‘আলাইহে আল-সালাত আল-সালাম’
কেতাবে (নাজাফ সংস্করণের ৫ পৃষ্ঠায়) হযরত আলী (ক:)
থেকে নিম্নের হাদীসটি বর্ণনা করেন; নবী পাক (দ:)
এরশাদ ফরমান: “আল্লাহ (অনন্তকালে) ছিলেন এবং তাঁর
সাথে কেউ ছিল না; তিনি সর্বপ্রথম তাঁর মাহবুবের নূর
সৃষ্টি করেন; এর ৪০০০ বছরের মধ্যে না সৃষ্টি করা হয়েছিল
পানি, না আরশ, না কুরসী, না লওহ, না কলম, না বেহেশত,
না দোযখ, না পর্দা, না মেঘমালা, না আদম, না হাওয়া।”
ইমাম যুরকানী মালেকী (রহ:)-এর ‘শরহে মাওয়াহিব’ (মাতবা’আ
আল-আমিরা কায়রো সংস্করণের ১:৫৬) এবং দিয়ারবকরীর ’তারিখ
আল-খামিস’ (১:২০) বইগুলোর ভাষ্যানুযায়ী ইমাম
বায়হাকী (বেসাল-৪৫৮ হিজরী) ভিন্ন শব্দচয়ন
দ্বারা এটি বর্ণনা করেন নিজ ‘দালাইল আন-নবুওয়া’ গ্রন্থে।
হুসাইন ইবনে মোহাম্মদ দিয়ারবকরী (বেসাল-৯৬৬ হিজরী)
তাঁর ১০০০ পৃষ্ঠাব্যাপী ‘তারিখে আল-খামিস ফী আহওয়াল
আনফাসি নাফিস’ শীর্ষক ইতিহাসগ্রন্থে বলেন: “আল্লাহর
প্রতি সমস্ত প্রশংসা, যিনি সব কিছুর আগে মহানবী (দ:)-এর নূর
পয়দা করেন।” ‘হাদীসটি যে কেউ পড়লেই নিশ্চিত হবেন
যে এটি মিথ্যা’ – আল-গোমারীর এহেন অতিরন্ঞ্জিত
মন্তব্যকে এই বক্তব্যটি নাকচ করে দেয়। অতঃপর
দিয়ারবকরী হাদীসখানা দলিল হিসেবে পেশ করেন
(মু’আসসাসাত শা’বান সংখ্যা, বৈরুত সংস্করণের ১:১৯)।
মোহাম্মদ ইবনে আহমদ ফাসী (ইন্তেকাল-১০৫২ হিজরী)
তাঁর ‘মাতালি আল-মাসাররাত’ পুস্তকে (মাতবা’আ আল-
তাযিয়্যা সংস্করণের ২১০, ২২১ পৃষ্ঠায়) এই হাদীস দলিল
হিসেরে উদ্ধৃত করেন এবং বলেন: “এই বর্ণনাগুলো সকল
সৃষ্টির ওপরে হুযূর পাক (দ:)-এর শ্রেষ্ঠত্ব (আওয়ালিয়্যা) ও
অগ্রাধিকার সাব্যস্ত করে, আর এও প্রতিভাত
করে যে তিনি তাদের কারণ (সাবাব)।
আব্দুল্লাহ গুমারী নিজ ‘এরশাদ আত্ তালেব আল্ নাজিব
ইলা মা ফী আল-মাওলিদ আন্ নাবাউয়ী মিন আল-আকাযিব’ (দারুল
ফুরকান সংস্করণের ৯-১২ পৃষ্ঠা) পুস্তকে ইমাম সৈয়ুতী (রহ:)-
এর বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করেন যে উপরোক্ত
হাদীসের কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ নেই;
তিনি বলেন, “এতে ইমাম সৈয়ুতীর পক্ষ থেকে চরম
শিথিলতা দৃশ্যমান হয়, যা থেকে তাঁকে আমি ঊর্ধ্বে ভাবতাম।
প্রথমতঃ এই হাদীস আবদুর রাযযাকের ‘মুসান্নাফ’
কেতাবে উপস্থিত নেই, অন্যান্য হাদীসের বইপত্রেও
নেই। দ্বিতীয়তঃ এই হাদীসের কোনো এসনাদ
(বর্ণনাকারীদের পরম্পরা) নেই। তৃতীয়তঃ তিনি হাদীসের
বাকি অংশ উল্লেখ করেন নি। দিয়ারবকরীর ‘তারিখ’ গ্রন্থে এ
কথা বলা হয়েছে এবং যে কেউ হাদীসটি পড়লেই নিশ্চিত
হবেন যে এটি মহানবী (দ:) সম্পর্কে একটি মিথ্যা।” আল-
গোমারীর এই অতিরন্ঞ্জিত সিদ্ধান্ত যে নাকচ তা এই
বাস্তবতা দ্বারা প্রতিভাত হয় যে দিয়ারবকরী নিজেই
এটিকে মিথ্যা হিসেবে বিবেচনা করেন নি যখন তিনি তাঁর
বইয়ের প্রারম্ভে হাদীসটি উদ্ধৃত করেন।
শায়খ আবদুল কাদের জিলানী (বেসাল-৫৬১ হিজরী) তাঁর
‘সিররুল আসরার ফী মা ইয়াহতাজু ইলাইহ আল-আবরার’ (লাহোর
সংস্করণের পৃষ্ঠা ১২-১৪) কেতাবে এর উদ্ধৃতি দেন।
আলী ইবনে বুরহান আল-দ্বীন আল-
হালাবী (ইনতেকাল-১০৪৪ হিজরী) নিজ
‘সীরাহ’ (মাকতাবা ইসলামিয়্যা বৈরুত সংস্করণের ১:৩১)
পুস্তকে এ হাদীস দলিল হিসেবে পেশ করেন এবং এরপর
বলেন, “(সৃষ্টিতে) যা কিছু অস্তিত্বশীল, মহানবী (দ:)
যে সবার মূল এ হাদীস তাই প্রমাণ করে; আর আল্লাহ-ই
সবচেয়ে ভাল জানেন।”
ইসমাইল হাক্কী (ইন্তেকাল-১১৩৭ হিজরী) তাঁর
‘তাফসীরে রুহুল বয়ান’ শীর্ষক কেতাবে এই
হাদীসকে দলিল হিসেবে পেশ করেন এবং বলেন:
“জেনে রাখুন, ওহে জ্ঞানী-গুণীজন, আল্লাহ সর্বপ্রথম
যে বস্তু সৃষ্টি করেন, তা আপনাদের মহানবী (দ:)-এর
নূর………আর তিনিই হলেন সকল সৃষ্টির অস্তিত্বশীল হবার
কারণ এবং তাদের সবার প্রতি আল্লাহতা’লার পক্ষ
থেকে করুণা……..আর তিনি না হলে ওপরের ও নিচের
জগতসমূহ সৃষ্টি করা হতো না।” ইমাম ইউসুফ নাবহানী এই
হাদীসের উদ্ধৃতি দেন নিজ ‘জওয়াহির আল-বিহার’
গ্রন্থে (১১২৫ পৃষ্ঠা)।
ইমাম ইবনে হাজর হায়তামী (বেসাল-১১৩৭ হিজরী) স্বরচিত
‘ফাতাওয়ায়ে হাদীসিয়্যা’ পুস্তকে (বাবা কায়রো সংস্করণের
২৪৭ পৃষ্ঠা) বলেন যে হযরত আব্দুর রাযযাক এ হাদীস
বর্ণনা করেছেন; তিনি এটি মহানবী (দ:)-এর মওলিদ-বিষয়ক নিজ
কাব্যগ্রন্থ ‘আন-নি’মাতুল কুবরা’-এর ৩য় পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত করেন।
মোহাম্মদ ইবনে আল-হাজ্জ আল-
আবদারী (ইন্তেকাল-৭৩৬ হিজরী) নিজ ‘আল-মাদখাল’
কেতাবে (দারুল কিতাব আল-আরবী বৈরুত সংস্করণের ২:৩৪)
আল-খতিব আবু আল-রাবি’ মুহাম্মদ ইবনে আল-লায়েস
প্রণীত ‘শেফা আস্ সুদূর’ গ্রন্থ হতে এর উদ্ধৃতি দেন,
যা’তে আল-লায়েস বলেন, “আল্লাহ সর্বপ্রথম
যা সৃষ্টি করেন তা মহানবী (দ:)-এর নূর; আর ওই নূর অস্তিত্ব
পেয়েই আল্লাহর প্রতি সেজদা করেন। আল্লাহ ওই
নূরকে চার ভাগে বিভক্ত করেন এবং ওর প্রথম অংশ দ্বারা আরশ,
দ্বিতীয়টি দ্বারা কলম, তৃতীয়টি দ্বারা লওহ এবং চতুর্থটি খণ্ডিত
করে বাকি সৃষ্টি জগতকে অস্তিত্ব দেন। অতএব, আরশের
নূর সৃষ্ট হয়েছে রাসূলে পাক (দ:)-এর নূর থেকে; কলমের
নূরও তাঁর নূর থেকে; লওহের নূরও তাঁর নূর থেকে; দিনের
আলো, জ্ঞানের আলো, সূর্য ও চাঁদের আলো,
এবং দৃষ্টিশক্তি ও দূরদৃষ্টি সবই তাঁর নূর
হতে সৃষ্টি করা হয়েছে।”
ভারত উপমহাদেশের ওহাবী-প্রভাবিত
দেওবন্দী মতবাদের গুরুদের অন্যতম শাহ মোহাম্মদ
ইসমাঈল দেহেলভী নিজ ‘এক রওযাহ’ শীর্ষক চটি পুস্তিকায়
(মালটা সংস্করণের ১১ পৃষ্ঠা) লিখেছে: “বর্ণনার
ইশারা অনুযায়ী, ‘আল্লাহ সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেন আমার
(হুযূরের) নূর’।”
সোলায়মান জামাল (ইনতেকাল-১২০৪ হিজরী) ইমাম
বুসিরী (রহ:)-এর ওপর কৃত তাঁর ব্যাখ্যামূলক কেতাব ‘আল-
ফুতুহাত আল-আহমদিয়্যা বি আল-মিনাহ আল-
মোহাম্মদিয়্যা’ (হেজাযী কায়রো সংস্করণের ৬ পৃষ্ঠা)-এ
এই হাদীস দলিল হিসেবে উদ্ধৃত করেন।
ভারত উপমহাদেশের দেওবন্দী ওহাবী গুরুদের অন্যতম
রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী তার কৃত ‘ফতোওয়ায়ে রশীদিয়্যা’
পুস্তকে (করাচী সংস্করণের ১৫৭ পৃষ্ঠায়) লিখেছে যে এই
হাদীস “নির্ভরযোগ্য সংকলনগুলোতে পাওয়া যায় নি,
তবে শায়খ আবদুল হক্ক দেহেলভী এর কিছু প্রামাণ্য
ভিত্তি থাকায় একে উদ্ধৃত করেছেন।” আসলে শায়খ আবদুল
হক্ক দেহেলেভী (রহ:) শুধু এর উদ্ধৃতি-ই দেন নি,
তিনি আরও বলেছেন যে এই হাদীস সহীহ (নির্ভুল)।
আবদুল করীম জিলি নিজ ‘নামুস আল-আ’যম ওয়া আল-কামুস আল-
আকদাম ফী মা’রেফত কদর আল-বানী সাল্লাল্লাহু
আলাইহে ওয়া সাল্লাম’ গ্রন্থে এই হাদীসের উদ্ধৃতি দেন।
ইমাম নাবহানী (রহ:)-ও এটি বর্ণনা করেন তাঁর ‘জওয়াহির আল-
বিহার’ কেতাবে।
উমর ইবনে আহমদ খারপুতী (ইনতেকাল-১২৯৯ হিজরী)
ইমাম বুসিরী (রহ:)-এর ওপর কৃত নিজ ব্যাখ্যামূলক ‘শরহে কাসিদাত
আল-বুরদা’ বইয়ে (করাচী সংস্করণের ৭৩ পৃষ্ঠায়) এর
উদ্ধৃতি দেন।
শায়খ মোহাম্মদ ইবনে আলাউয়ী মালেকী আল-
হাসানী (রহ:) মোল্লা আলী কারীর মীলাদ-বিষয়ক
পুস্তকের ওপর লেখা নিজ ব্যাখ্যামূলক ‘হাশিয়াত আল-মাওলিদ
আল-রাওয়ী ফী আল-মাওলিদ আল-নববী’ (পৃষ্ঠা ৪০)
শীর্ষক কেতাবে বলেন, “হযরত জাবের (রা:)-এর সনদ
প্রশ্নাতীত, তবে উলামা-এ-কেরাম এই হাদীসের মূল
অংশের স্বাতন্ত্র্যের কারণে এতে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ
করেছেন। ইমাম বায়হাকী (রহ:) কিছু ভিন্নতাসহ এই হাদীস
বর্ণনা করেন।” অতঃপর শায়খ আলাউয়ী মালেকী (রহ:) এ
রকম বেশ কিছু বর্ণনা পেশ করে মহানবী (দ:)-এর নূর হওয়ার
বিষয়টি প্রমাণ করেন।
ইমাম ইউসুফ ইবনে ইসমাঈল নাবহানী (রহ:) তাঁর প্রণীত
‘আল-আনওয়ার আল-মোহাম্মদিয়্যা (পৃষ্ঠা ১৩), ‘জওয়াহির আল-
বিহার’ (বাবা কায়রো সংস্করণ, ১১২৫ বা ৪:২২০ পৃষ্ঠা) এবং ‘হুজ্জাত-
আল্লাহ আলাল আলামীন’ (২৮ পৃষ্ঠা) বইগুলোতে এ
হাদীসের উদ্ধৃতি দেন।
মওলানা আবদুল গনী নাবলুসী (বেসাল-১১৪৩ হিজরী) নিজ
‘হাদিকাতুন্ নদীয়া’ (মাকতাবা আল-নূরীয়্যা, ফয়সালাবাদ সংস্করণের
২:৩৭৫) কেতাবে বলেন, “মহানবী (দ:) সবার
জন্যে সর্বজনীন সরদার; আর কেনই বা হবেন না – যখন
সমস্ত সৃষ্টি-ই তাঁর নূর থেকে সৃষ্ট, যা (আলোচ্য) সহীহ
হাদীসে বিবৃত হয়েছে।”
হযরত নিযামউদ্দীন ইবনে হাসান নিশাপুরী (বেসাল-৭২৮
হিজরী) স্বরচিত ‘গারাইব আল-কুরআন’ শীর্ষক
তাফসীরগ্রন্থে (কায়রোর বাবা সংস্করণের ৮:৬৬)
“এবং আমি আদিষ্ট হয়েছি যেন আমি-ই সর্বপ্রথম
আত্মসমর্পণ করি (অর্থাৎ, প্রথম মুসলমান হই)” – কুরআন
মজীদের এই আয়াতের (৩৯:১২) ব্যাখ্যাকালে হাদীসটির
উদ্ধৃতি দেন।
মোল্লা আলী ইবনে সুলতান আল-কারী (ইনতেকাল-১০১৪
হিজরী) নিজ ‘আল-মাওলিদ আল-রাওয়ী ফী আল-মাওলিদ আল-
নববী’ (পৃষ্ঠা ৪০) পুস্তকে পুরো হাদীসটি বর্ণনা করেন; এ
বইটি শায়খ সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আলাউয়ী আল-
মালেকী সম্পাদনা করেছেন।
ইমাম আহমদ ইবনে মোহাম্মদ কসতলানী (বেসাল-৯২৩
হিজরী) তাঁর প্রণীত ‘আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া’
গ্রন্থে এই হাদীস বর্ণনা করেন (ইমাম
যুরকানী মালেকীর ব্যাখ্যাসম্বলিত কেতাবের ১:৫৫)।
শায়খ ইউসুফ আল-সাইয়্যেদ হাশিম আল-রেফাঈ’ তাঁর কৃত
‘আদিল্লাত আহল আস-সুন্নাহ ওয়াল জামা’আ আল-মুসাম্মা আল-রাদ্দ
আল-মোহকাম আল-মানী’ শীর্ষক পুস্তকে (২২ পৃষ্ঠায়)
এর হাওয়ালা দেন এবং বলেন, “আবদুর রাযযাক
এটি বর্ণনা করেছেন।”
ইমাম সৈয়ুতী (রহ:) নিজ ‘আল-হাওল লি আল-ফাতাউয়ী’
কেতাবে সূরা মুদাসসির ব্যাখ্যাকালে বলেন, “এর
কোনো নির্ভরযোগ্য সনদ নেই”; তাঁর ‘তাখরিজ আহাদিস
শরহ আল-মাওয়াকিফ’ গ্রন্থে তিনি আরও বলেন, “আমি এই
শব্দচয়নে বর্ণনাটি পাই নি।”
ভারত উপমহাদেশের দেওবন্দী ওহাবীদের
নেতা আশরাফ আলী থানভী স্বরচিত ‘নশরুত্
তৈয়ব’ (উর্দুতে লাহোর সংস্করণের ৬ এবং ২১৫ পৃষ্ঠা)
পুস্তকে এই হাদীস আবদুর রাযযাকের
সূত্রে বর্ণনা করে এবং এটাকে নির্ভরযোগ্য বলে।
ইমাম যুরকানী মালেকী নিজ ‘শরহে মাওয়াহিব’
কেতাবে (মাতবা’আ আল-আমিরা, কায়রো সংস্করণের ১:৫৬)
এই হাদীসের উদ্ধৃতি দেন এবং একে আবদুর রাযযাকের
‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে বর্ণিত বলে জানান।
ভারত উপমহাদেশের দেওবন্দী ওহাবীদের
নেতা এহসান এলাহী যাহির, যাকে লাহোরের সুন্নীভিত্তিক
বেরেলভী সিলসিলা শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে,
সে তার ‘হাদিয়্যাত আল-মাহদী’ (শিয়ালকোট সংস্করণের ৫৬
পৃষ্ঠা) বইয়ে বলে: “আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি আরম্ভ করেন ’আল-
নূর আল-মোহাম্মদিয়া’ তথা মহানবী (দ:)-এর নূর দ্বারা; অতঃপর
তিনি আরশ সৃষ্টি করেন পানির ওপর; এরপর বাতাস
এবং একে একে ’নূন’, ’কলম’, লওহ এবং মস্তিষ্ক সৃষ্টি করেন।
অতএব, মহানবী (দ:)-এর নূর আসমান ও জমিনে যা কিছু বিরাজমান
তা সৃষ্টিতে মৌলিক উপাদান বলে সাব্যস্ত হয়…..আর
হাদীসে আমাদের কাছে যা বিবৃত হয়েছে,
তাতে (বোঝা যায়) আল্লাহতা’লা প্রথমে কলম সৃষ্টি করেন;
আরও প্রথমে সৃষ্টি করেন মস্তিষ্ক; এর
দ্বারা যা বোঝানো হয়েছে তা হলো আপেক্ষিক
বা তুলনামূলক শ্রেষ্ঠত্ব।”
মহানবী (দ:)-এর প্রতি এবং তাঁর পরিবার ও সাথীদের প্রতিও
শান্তি ও খোদায়ী আশীর্বাদ বর্ষিত হোক।
— ড: জি, এফ, হাদ্দাদ

আল্লাহ তাআলা সর্ব প্রথম নবী পাক সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নুর মোবরক সৃষ্টি করেছেন

Standard

আমাদের প্রিয় নবীজী হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নূর এ মুজাস্সাম। সর্ব
প্রথম আল্লাহ পাক উনার নূর মুবারক সৃষ্টি করেন। এ
প্রসঙ্গে সহীহ হাদীস শরীফে বর্নিত আছে। হাদীস
শরীফখানা বর্ননা করেন ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম
রহমাতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের উস্তাদের উস্তাদ।
ইমাম আহমদ বিন হাম্মল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার
উস্তাদ,ইমামে আযম আবু
হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার ছাত্র, বিখ্যাত
মুহাদ্দিস , তাবে তাবেয়ী, হাফিজে হাদীস,
আল্লামা আব্দুর রাজ্জাক রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার
বিখ্যাত হাদীস শরীফ গ্রন্থ “মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক”
১ম খন্ড ৯৯ পৃষ্ঠায় ১৮ নং হাদীস শরীফে।
ইমাম হযরত আব্দুর রাজ্জাক
রহমাতুল্লাহি আলাইহি উক্ত হাদীস শরীফ বর্ননা করেন
হযরত মা’মার বিন রশীদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে,
তিনি বর্ননা করেন মুহম্মদ বিন মুনকদার
রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে, তিনি বর্ণনা করেন
বিখ্যাত ছাহাবী জাবির বিন আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু
আনহু থেকে। হাদীস শরীফ – ﻋﻦ ﺟﺎﺑﺮ ﺭﺻﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﻗﺎﻝ ﻗﻠﺖ ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ
ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﺑﺎﺑﻲ ﺍﻧﺖ ﻭ ﺍﻣﻲ ﺍﺧﺒﺮﻧﻲ ﻋﻦ ﺍﻭﻝ ﺷﻴﻲﺀ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻲ ﻗﺒﻞ ﺍﻻﺷﻴﺎﺀ
ﻗﺎﻝ ﻳﺎ ﺟﺎﺑﺮ ﺍﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻲ ﻗﺪ ﺧﻠﻖ ﻗﺒﻞ ﺍﻻﺷﻴﺎﺀ ﻧﻮﺭ ﻧﺒﻴﻚ ﻣﻦ ﻧﻮﺭﻩ ﻓﺠﻌﻞ ﺫﺍﻟﻚ ﺍﻟﻨﻮﺭ ﻳﺪﻭﺭ
ﺑﺎﻟﻘﺪﺭﺓ ﺣﻴﺚ ﺷﺎﺀ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻲ ﻭﻟﻢ ﻳﻜﻦ ﻓﻲ ﺫﺍﻟﻚ ﺍﻟﻮﻗﺖ ﻟﻮﺡ ﻭﻻ ﻗﻠﻢ ﻭﻻ ﺟﺘﺔ ﻭﻻ ﻧﺎﺭ ﻭﻻ ﻣﻠﻚ
ﻭﻻ ﺳﻤﺎﺀ ﻭﻻ ﺍﺭﺽ ﻭﻻ ﺷﻤﺲ ﻭﻻ ﻗﻤﺮ ﻭﻻ ﺟﻨﻲ ﻭﻻ ﺍﻧﺴﻲ .… ﺍﻟﻲ ﺍﺧﺮ
অর্থ: হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্নিত,
তিনি বলেন, আমি হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বললাম, ইয়া রসূলাল্লাহ
ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমার
পিতা মাতা আপনার জন্য কুরবানি হোক,
আপনি আমাকে জানিয়ে দিন যে, আল্লাহ পাক সর্ব
প্রথম কোন জিনিস সৃষ্টি করেছেন? তিনি বলেন,
হে জাবির রদ্বিয়াল্লাহু আনহু! নিশ্চয়ই আল্লাহ পাক
সর্ব প্রথম সব কিছুর পূর্বে আপনার নবীর নূর মুবারক
সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর সেই নূর মুবারক আল্লাহ পাক
উনার ইচ্ছা অনুযায়ী কুদরতের মাঝে ঘুরছিলো।আর
সে সময় লওহো, ক্বলম, জান্নাত, জাহান্নাম, ফেরেশতা,
আসমান, জমিন, চন্দ্র, সূর্য, মানুষ ও জ্বিন কিছুই
ছিলো না। “
দলীল সমুহ —
(১) মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাক ১/৯৯, হাদীস ১৮
(২) দালায়েলুন নবুওয়াত ১৩/৬৩
(৩) মাওয়াহেবুল্লাদুন্নিয়া ১/৯
(৪) মাদারেজুন নবুওয়াত ২/২
(৫) যুরকানী ১/৪৬
(৬) রুহুল মায়ানী ১৭/১০৫
(৭) সিরাতে হলবীয়া ১/৩০
(৮) মাতালেউল মাসাররাত ২৬৫ পৃ
(৯) ফতোয়ায়ে হাদীসিয়া ১৮৯ পৃ
(১০) নি’ মাতুল কুবরা ২ পৃ
(১১) হাদ্বীকায়ে নদীয়া ২/৩৭৫
(১২) দাইলামী শরীফ ২/১৯১
(১৩) মকতুবাত শরীফ ৩ খন্ড ১০০ নং মকতুব
(১৪) মওজুয়াতুল কবীর ৮৩ পৃ
(১৫) ইনছানুল উয়ুন ১/২৯
(১৬) নূরে মুহম্মদী ৪৭ পৃ
(১৭) আল আনোয়ার ফি মাওলিদিন নবী ৫ পৃ
(১৮) আফদ্বালুল ক্বোরা
(১৯) তারীখুল খমীস ১/২০
(২০) নুজহাতুল মাজালিস ১ খন্ড
(২১) দুররুল মুনাজ্জাম ৩২ পৃ
(২২) কাশফুল খফা ১/৩১১
(২৩) তারিখ আননূর ১/৮
(২৪) আনোয়ারে মুহম্মদীয়া ১/৭৮
(২৫) আল মাওয়ারিদে রাবী ফী মাওলীদিন নবী ৪০
পৃষ্ঠা ।
(২৬) তাওয়ারীখে মুহম্মদ
(২৭) আনফাসে রহীমিয়া
(২৮) মা’ য়ারিফে মুহম্মদী
(২৯) মজমুয়ায়ে ফতোয়া ২/২৬০
(৩০) নশরুতত্বীব ৫ পৃ
(৩১) আপকা মাসায়েল আওর উনকা হাল ৩/৮৩
(৩২) শিহাবুছ ছাকিব ৫০
(৩৩) মুনছিবে ইছমত ১৬ পৃ
(৩৪) রেসালায়ে নূর ২ পৃ
(৩৫) হাদীয়াতুল মাহদী ৫৬পৃ
(৩৬) দেওবন্দী আজিজুল হক অনুবাদ কৃত বুখারী শরীফ ৫/৩
আমাদের সমাজের অনেক দেওবন্দী/ খারেজী/ওহাবী/
লা মাযহাবী/ তাবলীগি ইত্যাদি বাতিল ফির্কা এই
হাদীস শরীফকে নিজেদের সার্থ চরিতার্থ করার জন্য
জাল/দুর্বল বলে থাক। আসুন আমরা সত্যতার
মাপকাঠিতে হাদীস শরীফটির সনদ যাচাই করে দেখি।
যিনি এ হাদীস শরীফ বর্ননা করেছেন তিনি হচ্ছেন
হাফিজে হাদীস,ইমাম আব্দুর রাজ্জাক
রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ইমাম আব্দুর রাজ্জাক
রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হলেন মুসলিম উম্মাহের
সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দীস ইমাম
বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর দাদা উস্তাদ।
যদি বিতর্কের খাতিরে ধরেই নেই আব্দুর রাজ্জাক
রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর কিতাবে দুর্বল হাদীস
উল্লেখ করেছেন তাহলে বলতে হয় বুখারী শারীফেও
দুর্বল হাদীস আছে যেহেতু ইমাম
বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি হাদীস শাস্ত্রের
জ্ঞান লাভ করেছেন আব্দুর রাজ্জাক
রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর কাছ থেকে। কিন্তু
বুখারী শারীফে দুর্বল হাদীস আছে সেটা কেউই বলেন
না। তাই “হাদীসটি দুর্বল/জাল” কথাটি ভুল প্রমাণীত
হল।
হাদীসের সনদটি নিম্নরূপ :
হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু

মুহাম্মাদ বিন মুঙ্কদার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি

মা’মার বিন রাশীদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি

আব্দুর রাজ্জাক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।
সুবহানাল্লাহ্ !!!
এবার দেখা যাক বর্নিত হাদীস শরীফ উনার রাবীদের
সম্পর্কে মুহাদ্দীসগণের মন্তব্য : হাফিজে হাদীস,
তাবে তাবেয়ীন ইমাম আব্দুর রাজ্জাক
রহমাতুল্লাহি আলাইহি : আহমাদ ইবন সালীহ
রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “আমি একবার আহমাদ
বিন হাম্বল
রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনকে জিজ্ঞাসা করলাম,
আপনি হাদীস শাস্ত্রে আব্দুর রাজ্জাক
রহমতুল্লাহি আলাইহি থেকে নির্ভরযোগ্য আর
কাউকে পেয়েছেন? আহমাদ বিন হাম্বল
রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, না”।
দলীল-
√ তাহজিবুত তাহজিব লি হাফিয ইবনে হাজর
আসক্বলানী ২/৩৩১
হাদীস শরীফ উনার অপর রাবী মা’মার বিন রাশীদ
রহমাতুল্লাহি আলাইহি :
উনার সম্পর্কে আহমাদ বিন হাম্বল
রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, আমি বাসরার সকল হাদীস
শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞের থেকে মুসান্নাফ আব্দুর
রাজ্জাকে মা’মার বিন রাশীদ এর
সূত্রে পাওয়া হাদীসগুলো পছন্দ করি। ইবন হাজর
আসকলানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনাকে প্রখর
স্বরনশক্তি সম্পন্ন এবং নির্ভরযোগ্য বলেন।
দলীল-
√ তাহজিবুত তাহজিব ১/৫০৫
√ আসমাউর রেজাল।
উক্ত মা’মার বিন রাশীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার
সূত্রে বর্ণিত বুখারী শারীফের হাদীস সংখ্যা প্রায়
২২৫ এবং মুসলিম শারীফে বর্ণিত হাদীস সংখ্যা প্রায়
৩০০ টি।
সুবহানাল্লাহ্ !
হাদীসটির আরেক রাবী হলেন মুহাম্মাদ বিন মুকদার
রহমাতুল্লাহি আলাইহি : ইমাম
হুমায়দি রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মুকদার
রহমতুল্লাহি আলাইহি একজন হাফিজ,ইমাম জারাহ
তাদীলের ইমাম ইবন মা’ঈন
রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উনি নির্ভরযোগ্য।
দলীল-
√ তাহজিবুত তাহজিব ০৯/১১০৪৮
√ আসমাউর রেজাল ।
হযরত মুনকদার রহমাতুল্লাহি আলাইহি থেকে বর্ণিত
হাদীসের সংখ্যা বুখারী শারীফে ৩০টি এবং মুসলিম
শারীফে ২২টি। সুবহানাল্লাহ্ !! আর মূল
বর্ননাকারী হলেন হযরত জাবির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু
একজন সুপ্রসিদ্ধ সাহাবী। বুখারী ও মুসলিম শারীফের
উনার থেকে বর্ণিত অনেক হাদীস আছে।
সুতরাং বুঝা গেল। হাদীসটির সকল রাবীই নির্ভরযোগ্য
এবং উনাদের সূত্রে বুখারী ও মুসলিম শারীফেও হাদীস
বর্ণিত আছে। সুতরাং বলা যায়, ইমাম বুখারী ও মুসলিম
রহমাতুল্লাহি আলাইহিম উভয়ের হাদীস
শর্তানুসারে হাদীসটি সহীহ। সুবহানাল্লাহ্ !!
এখন অনেকে মূল কিতাব দেখতে চাইতে পারেন। তাদের
সুবিধার জন্য মূল কিতাবের স্ক্যান
কপি নিম্মে দেয়া হলো — নিচের
লিঙ্কে গিয়ে মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাকের মূল
আরবী কিতাব দেখুন—->>> http://wajahat-
hussain.blogspot.com/2011/12/hadeeth-e-nur-of-jabir-bin-
abdullah.html আলহামদুলিল্লাহ ! আমরা পরিস্কার
এবং বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে হাদীস শরীফটির
গ্রহনযোগ্যতা জানতে পারলাম। এবার আসুন
আমরা দেখি উক্ত হাদীস শরীফ সম্পর্কে মুহাদ্দিস
এবং হাদীস শরীফ বিশারদগন কি বলেছেন।
উক্ত বিশুদ্ধ হাদীস শরীফ খানা নিজ কিতাবে সহীহ
বলে উল্লেখ করেছেন বিখ্যাত মুহাদ্দিস
আল্লামা বায়হাক্বী রহমাতুল্লাহি আলাইহি। ইমাম
বায়হাক্কী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে বলা হয় – ”
ইমাম বায়হাক্কী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন স্বীয়
যুগের হাদীস শরীফ এবং ফিক্বাহ শাস্ত্রের
অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তিত্ব। উম্মত যাদের মাধ্যমে খুব
উপকৃত হয়েছে এবং হাফিজে হাদীস এমন সাত
ব্যক্তি ছিলেন তাদের যাদের গ্রন্থ সবচাইতে উৎকৃষ্ট
বলে স্বীকৃত। সেই সাত জনের একজন হলেন, ইমাম
বায়হাক্বী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ।”
দলীল-
√ আসমাউর রেজাল-বাবু আইম্মাতুল হাদীস।
এই জগৎবিখ্যত মুহাদ্দিস ইমাম,
আল্লামা বায়হাক্বী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার
কিতাবে বর্ননা করেন–
ﺍﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻲ ﺧﻠﻖ ﻗﺒﻞ ﺍﻻﺷﻴﺎﺀ ﻧﻮﺭ ﻧﺒﻴﻚ
“….. নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক সর্ব প্রথম উনার
নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার “নূর”
মুবারক সৃষ্টি করেন।”
দলীল-
√ দালায়েলুন নবুওয়াত লিল বায়হাক্বী ১৩ তম খন্ড ৬৩
পৃষ্ঠা।
বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস, যিনি এই উপমহাদেশে হাদীস
শরীফের ব্যাপক প্রচার প্রসার করেছেন, সু দীর্ঘ সময়
মদীনা শরীফে যিনি ইলিম চর্চা করেছেন।
যিনি প্রতিদিন হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাক্ষাত লাভ করতেন,
ইমামুল মুহাদ্দিসীন শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস
দেহলবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তিনি উক্ত
হাদীসে জাবির রদ্বিয়াল্লাহু আনহু বা নূর সংক্রান্ত
হাদীস শরীফকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি উনার কিতাবে লিখেন – ﺩﺭﺣﺪﻳﺚ ﺻﺤﻴﺢ ﻭﺍﺭﺩ ﺷﺪ ﻛﻪ ﺍﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ
ﺍﻟﻠﻪ ﻧﻮﺭﻱ
অর্থ: “সহীহ হাদীস শরীফে” বর্নিত হয়েছে যে, হুজুর
পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
মহান আল্লাহ পাক সর্ব প্রথম আমার নূর মুবারক
সৃষ্টি করেন!”
দলীল-
√ মাদারেজুন নবুওয়াত ২য় খন্ড ২ পৃষ্ঠা।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস, আরেফ বিল্লাহ,
সাইয়্যিদিনা আব্দুল
গনী নাবেলসী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উক্ত হাদীস
শরীফকে সরাসরি সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন – ﻗﺪ ﺧﻠﻖ ﻛﻞ ﺷﻴﻲ ﻣﻦ ﻧﻮﺭﻩ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻛﻤﺎ ﻭﺭﺩ ﺑﻪ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ
ﺍﻟﺼﺤﻴﺢ
অর্থ: নিশ্চয়ই প্রত্যেক জনিস হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক
থেকে সৃষ্টি হয়েছে, যেমন এ ব্যাপারে ‘সহীহ’ হাদীস
শরীফ বর্নিত রয়েছে।”
দলীল-
√ হাদীক্বায়ে নদীয়া- দ্বিতীয় অধ্যায়-৬০ তম
অনুচ্ছেদ-২য় খন্ড ৩৭৫ পৃষ্ঠা।
ইমামুল মুফাসরিরীন, মুফতীয়ে বাগদাদ, হযরত
আলূসী বাগদাদী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উক্ত হাদীস
শরীফকে নির্ভরযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।
তিনি উনার কিতাবে লিখেন – ﻭﻟﺬﺍ ﻛﺎﻥ ﻧﻮﺭﻩ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ
ﺍﻭﻝ ﺍﻟﻤﺨﻠﻮﻗﺎﺕ ﻓﻔﻲ ﺍﻟﺨﺒﺮ ﺍﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻲ ﻧﻮﺭ ﻧﺒﻴﻚ ﻳﺎﺟﺎﺑﺮ
অর্থ : সকল মাখলুকাতের মধ্যে সর্বপ্রথম সৃষ্টি হলো,
নূরে মুহম্মদী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যেমন-
হাদীস শরীফে বর্নিত আছে, হে জাবির রদ্বিয়াল্লাহু
আনহু! আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম আপনার নবী ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক সৃষ্টি করেছেন।”
দলীল-
√ রুহুল মায়ানী ১৭ তম খন্ড ১০৫ পৃষ্ঠা।
বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন,আল্লামা ইমাম মুহম্মদ মাহদ
ইবনে আহমদ ফার্সী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উক্ত
হাদীস শরীফকে সহীহ বলে নিজের কিতাব
মুবারকে উল্লেখ করেছেন। তিনি বর্ননা করেন – ﺍﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ
ﺍﻟﻠﻪ ﻧﻮﺭﻩ ﻭﻣﻦ ﻧﻮﺭﻱ ﺧﻠﻖ ﻛﻞ ﺵﺀﻱ
অর্থ : মহান আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম আমার নূর মুবারক
সৃষ্টি করেন এবং আমার নূর মুবারক থেকে সবকিছু
সৃষ্টি করেন।”
দলীল-
√ মাতালেউল মাসাররাত ২৬৫ পৃষ্ঠা ।
উক্ত হাদীস শরীফের সমর্থনে বিখ্যাত মুহাদ্দিস,
ছহীবে মেরকাত, ইমামুল মুহাদ্দিসীন
মুল্লা আলী কারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন –
ﻭﺍﻣﺎﻧﻮﺭﻩ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻓﻬﻮ ﻓﻲ ﻏﺎﻳﺎﺓ ﻣﻦ ﺍﻟﻈﻬﻮﺭ ﺷﺮﻗﺎ ﻭ ﻏﺮﺑﺎ ﻭﺍﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ
ﻧﻮﺭﻩ ﻭﺳﻤﺎﻩ ﻓﻲ ﻛﺘﺎﺑﻪ ﻧﻮﺭﺍ
অর্থ: হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
উনার নূর মুবারক পূর্ব ও পশ্চিমে পূর্নরুপে প্রকাশ
পেয়েছে। আর মহান আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম উনার নূর
মুবারক সৃষ্টি করেন। তাই নিজ কিতাব কালামুল্লাহ
শরীফে উনার নাম মুবারক রাখেন ‘নূর’।”
দলীল-
√ আল মওযুআতুল কবীর ৮৩ পৃষ্ঠা।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস, আল্লামা আবুল হাসান বিন
আব্দিল্লাহ আল বিকরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন
— ﻗﺎﻝ ﻋﻠﻲ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﻛﺎﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﻻ ﺷﻲﺀ ﻣﻌﻪ ﻓﺎﻭﻝ ﻣﺎ ﺧﻠﻖ ﻧﻮﺭ ﺣﺒﻴﺒﻪ ﻗﺒﻞ ﺍﻥ ﻳﺨﻠﻖ
ﺍﻟﻤﺎﺀ ﻭﺍﻟﻌﺮﺵ ﻭﺍﻟﻜﺮﺳﻲ ﻭﺍﻟﻠﻮﺡ ﻭﺍﻟﻘﻠﻢ ﻭﺍﻟﺠﻨﺔ ﻭﺍﻧﺎﺭ ﻭﺍﻟﺤﺠﺎﺏ
অর্থ: হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আলাইহিস
সালাম বলেন, শুধুমাত্র আল্লাহ পাক ছিলেন, তখন অন্য
কোন অস্তিত্ব ছিলো না। অতঃপর
তিনি পানি,আরশ,কুরসী, লওহো,ক্বলম,জান্নাত,
জাহান্নাম ও পর্দা সমূহ ইত্যাদি সৃষ্টি করার
পূর্বে উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
উনার নূর মুবারক সৃষ্টি করেন।”
দলীল-
√ আল আনওয়ার ফী মাওলিদিন নাবিয়্যিল মুহম্মদ
ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৫ পৃষ্ঠা।
বিখ্যাত তাফসির কারক,ইমামুল মুফাসসিরীন,
আল্লামা ইসমাঈল
হাক্কী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-
ﺍﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻲ ﺧﻠﻖ ﺟﻤﻴﻊ ﺍﻻﺷﻴﺎﺀ ﻣﻦ ﻧﻮﺭ ﻣﺤﻤﺪ ﺻﻠﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭﻟﻢ ﻳﻨﻘﺺ ﻣﻦ ﻧﻮﺭﻩ
ﺳﻲﺀ
অর্থ: এ ব্যাপারে সকলেই একমত যে, নিশ্চয়ই মহান
আল্লাহ পাক সকল মাখলুকাত “নূরে মুহম্মদী” ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সৃষ্টি করেছেন। অথচ
“নূরে মুহম্মদী” ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
হতে কিঞ্চিত পরিমানও কমে নাই।”
দলীল-
√ তাফসীরে রুহুল বয়ান ৭ম খন্ড ১৯৭-১৯৮ পৃষ্ঠা।
হযরত জাবির বিন আব্দুল্লাহ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু
হতে বর্নিত হাদীস শরীফ খানা অত্যন্ত সহীহ। আর
সহীহ বলেই সকল জগৎ বিখ্যাত মুহাদ্দিসগন উনাদের
কিতাবে উক্ত হাদীস শরীফ খানা বলিষ্ঠ
ভাবে বর্ননা করেছেন। আমরা উপরে কিছু ইমামদের
মতামত উল্লেখ করেছি। এছাড়াও আরো যারা উক্ত
হাদীস শরীফকে বিশুদ্ধ বলে নিজেদের
কিতাবে উল্লেখ করেছেন তাদের কথা উল্লেখ
করা হলো–
→ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকারক, হাফিজে হাদীস
আল্লামা কুস্তালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার
“মাওয়াহেবুল লাদুন্নিয়া” কিতাবের ১ম খন্ড ৯ পৃষ্ঠা।
→ হাফিজে হাদীস,আল্লামা যুরকানী রহমাতুল্লাহি
আলাইহি উনার “যুরকানী আলা শরহে মাওয়াহেব”
কিতাবের ১ম খন্ড ৪৬ পৃষ্ঠা।
→ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হাজর
হায়তামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার
“ফতোয়ায়ে হাদীসিয়া” কিতাবে ১৮৯ পৃষ্ঠা ।
→ মুহাদ্দিস আলী ইবনে ইব্রাহীম
রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার “সিরাতুল হলবীয়”
কিতাবে ১ম খন্ড ৩০ পৃষ্ঠা।
→ হাফিজে হাদীস, হযরত ইবনে হাজার
মক্কী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার “আফদ্বালুল কোরা”
কিতাবে।
→ বিশিষ্ট আলেম, শায়খুল আল্লামা, হযরত দিয়ার
বাকরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার “তারীখুল
খামীস” কিতাব সহ শতশত কিতাবে উক্ত হাদীস শরীফ
খানা বর্ননা করা হয়েছে ।
প্রত্যকেই উক্ত হাদীস শরীফ এর উপর আস্থা স্থাপন
করেছেন বিনা দ্বিধায়। সুবহানাল্লাহ্ !! যেটা উছুলের
কিতাবে বলা হয়েছে – ﻓﺎﻥ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻳﺘﻘﻮﻱ ﺑﺘﻠﻘﻲ ﺍﻻﺀﻣﺔ ﺑﺎﻟﻘﺒﻮﻝ ﻛﻤﺎ ﺍﺷﺮ ﺍﻟﻴﻪ
ﺍﻻﻣﺎﻡ ﺍﻟﺘﺮ ﻣﺬﻱ ﻓﻲ ﺟﺎﻣﻌﻪ ﻭﺻﺮﺡ ﺑﻪ ﻋﻠﻤﺎﺀﻧﺎ ﻓﻲ ﺍﻻﺻﻮﻝ
অর্থ: কোন হাদীস শরীফকে ইমামগন নিঃসংকোচে কবুল
করে নেয়াই উক্ত হাদীস শরীফ
খানা শক্তিশালী বা সহীহ হওয়ার প্রমান। ইমাম
তিরমিযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার “জামে”
তে এদিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন আর আলেমগন তা উছুলের
কিতাবে সুস্পষ্ট ভাবে বর্ননা করেছেন।”
সূতরাং এরপরও যারা বলবে, উক্ত হাদীস শরীফ
খানা সহীহ নয়, তারা হাদীস শরীফের উছুল
সম্পর্কে নেহায়েত অজ্ঞ। উক্ত হাদীস শরীফ
খানা হাফিজে হাদীস ইমাম আব্দুর রাজ্জাক
রহমাতুল্লাহি আলাইহি উনার কিতাব “মুসনাদে আব্দুর
রাজ্জাক” কিতাবে সহীহ সনদে বর্ননা করেছেন
এবং পৃথিবীর সকল ইমাম,মুহাদ্দিস গন উক্ত হাদীস
শরীফের প্রতি আস্থা স্থাপন করে স্ব স্ব
কিতাবে উল্লেখ করেছেন। সূতরাং প্রমান হলো উক্ত
হাদীস শরীফ খানা সর্বোচ্চ মানের সহীহ একটি হাদীস
শরীফ।
এখন মজার ব্যাপার দেখুন, যেসকল
ওহাবী দেওবন্দীরা উক্ত হাদীস শরীফ
নিয়ে আপত্তি করে তাদের অন্যতম গুরু আশরাফ
আলী থানবী নিজেই উক্ত হাদীস শরীফকে তার কিতাব
“নশরুত তীব” উল্লেখ করেছে। এবার দেখুন থানবী তার এই
কিতাবে কি লিখেছে — থানবী এই কিতাবে প্রথম
যে অধ্যায় রচনা করেছে তার নাম দিয়েছে ”
নূরে মুহম্মদীর বিবরন”।
যাইহোক, এখানে প্রথমেই যা লিখেছে তা হলো- ” আব্দুর
রাজ্জাক তাঁর সনদসহ হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ
থেকে বর্ননা করেছেন যে, আমি আরজ করলাম :
ইয়া রসূল্লাল্লাহ আমার পিতা মাতা আপনার জন্য
কোরবান হউক, আমাকে এই খবর দিন যে, আল্লাহ পাক
সর্ব প্রথম কোন বস্তুটি সৃষ্টি করেছেন?
প্রিয়নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ
করলেন, হে জাবির রদ্বিয়াল্লাহু আনহু! আল্লাহ পাক
সবকিছুর পূর্বে আপনার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ
হাদীসে জাবির বর্ণনা করেছে দেওবন্দী আশরাফ
আলী থানবী নিজ কিতাবে। মজার
কথা হলো থানবী মুসনাদে আব্দুর রাজ্জাকে হাদীসের
সনদ খুজে পেল আর বর্তমানে তারই
অনুসারী ওহাবী দেওবন্দীরা সনদ খুজে পায় না। কত
হাস্যকর লজ্জাজনক বিষয় নিজেরাই চিন্তা করুন। শুধু
তাই নয়, আশরাফ আলী থানবী উক্ত “নশরুত্বীব”
কিতাবের প্রথম অধ্যায়ে “নূরে মুহম্মদীর বিবরন” শীর্ষক
বর্ননায় আরো একটি হাদীস শরীফ উল্লেখ করেছে –
ইমাম জয়নুল আবেদীন আলাইহিস সালাম উনার
পিতা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম
থেকে এবং তিনি হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু
থেকে বর্ননা করেন যে, হুজুর ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমি আদম
আলাইহিস সালাম উনার জন্মের ১৪ হাজার বছর
পূর্বে আমার পরওয়ারদিগারের দরবারে একটি “নূর”
ছিলাম।” সুবহানাল্লাহ্ !!!
দেওবন্দী/কাওমীরা হুজুর পাক ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বপ্রথম নূর হিসাবে সৃষ্টি এই
হাদীস অস্বীকার করলে কি হবে এদের একমাত্র
অবিভাবক ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ আবার এই হাদীস
স্বীকার করে ফতোয়া দেয়। সবাই দেখুন ভারতের
দেওবন্দীরা আশরাফ আলি থানভি সাহেবের কিতাব
থেকেই তাদের ওয়েবসাইটে ফতোয়া বিভাগে দলীল
দিচ্ছে–> Question: 3126 >Is the Prophet peace be upon him’s
nur the first thing to be created? Also, was it created before
Adam alayhis salam’s? Answer: 3126 Jan 29,2008 (Fatwa:
903/876=D)
Hazrat Hakimul Ummah, Maulana Ashraf Ali Thanwi has
mentioned a Hadith in his book ﻧﺸﺮ ﺍﻟﻄﯿﺐ ﻓﯽ ﺫﮐﺮ ﺍﻟﻨﺒﯽ ﺍﻟﺤﺒﯿﺐ ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ
ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ with reference of Ahkam bin Al- Qattan that Hazrat Ali
bin Al- Hussain (Zainul Abdeen) narrated from his father Hazrat
Hussain ( ﺭﺿﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻨﮧ ) and he narrated from his father (Hazrat
Ali ﺭﺿﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻨﮧ ) that the Prophet ( ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ ) said: ?I was a
noor (light) in front of my Lord some forty thousand years
before the birth of Hazrat Adam ( ﻋﻠﯿﮧ ﺍﻟﺴﻼﻡ )?. There are some
more traditions which prove that the noor of the Prophet ( ﺻﻠﯽ
ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ ) was created in the earliest time, some traditions
say that his noor was created before the Tablet, the Pen, earth,
sky and even before all creatures. Allah (Subhana Wa Ta’ala)
knows Best Darul Ifta, Darul Uloom Deoband. ভারতের দারুল
উলুম দেওবন্দের ফতোয়ার ওয়েবসাইটের লিঙ্ক – ->>>
http://darulifta-deoband.org/showuserview.do?
function=answerView&all=en&id=3126
আবার উক্ত হাদীসে জাবির রদ্বিয়াল্লাহু আনহু
দেওবন্দীদের আরেক মৌলবী দেওবন্দীদের মৃত শায়খুল
হদস আজিজুল হক তার বুখারী শরীফের অনুবাদে ৫ম খন্ড
৩ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছে।
অর্থাৎ বিরোধিতা কারীদের কিতাবেও উক্ত হাদীস
শরীফ খানা নির্ভরযোগ্য
হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন
হচ্ছে বর্তমানে দুই পয়সার
বাজাইরা ওহাবী মৌলবীরা উক্ত হাদীস শরীফের
বিরোধিতা করে কেন ?????
যাইহোক, উপরোক্ত আলোচনা থেকে দিবালোকের মত
প্রমান হলো, আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম হুজুর পাক
ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নূর মুবারক
সৃষ্টি করেছেন। এবং সেই নূর মুবারক থেকে সবকিছু
সৃষ্টি করেন। এটাই হলো আহলে সুন্নত ওয়াল
জামায়াতের আক্বীদা, এবং এর বিপরীত
আক্বীদা পোষন করা কুফরী। আল্লাহ পাক আমাদের সত্য
বোঝার তৌফিক দান করুন। আমীন !!