ইলমে গায়েব

Standard

আস-সালামু ’আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
ওয়া মাগফিরাতুহু …। ইলমে গায়েব মাসয়ালাটি খুবই
সূক্ষ্ম, ঝুঁকিপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। বুঝলে পানির
মতোই সহজ – নইলে, পাথরের চেয়েও
কঠিন ও মাকড়সার জালের চেয়েও জটিল
মনে হবে এবং গোমরাহ হওয়ার সমূহ
সম্ভাবনা থাকবে! বহু আলেমকে দেখেছি, এ
নিয়ে আলোচনা বা বিতর্ক
করতে গিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলেন।
ফলে, নিজেরাতো গোমরাহ হনই –
অনুসারীদেরও গোমরাহ করে ফেলেন;
এমনকি অনেকে না বুঝে কুফরি মন্তব্য
করে কাফেরের খাতায় পর্যন্ত নাম লিখিয়েছেন
(মায়াজাল্লা)। মিঃ আশরাফ আলী থানবী (১৯
আগস্ট ১০৬৩ – ৪ জুলাই ১৯৪৩) তাদেরই একজন।
দেওবন্দীদের
মাঝে সবচেয়ে বেশি (৬৬৬টি) কিতাব লিখেও
উনি ইলমে গায়েবের বিষয়টি না বুঝে,
সায়্যিদুনা রাসূলে পাকের
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আযীমুশ
শানে মারাত্মক ধৃষ্টতা করে বসেন এবং সুস্পষ্ট
কুফরিতে নিমজ্জিত হন! তার চেয়েও বড় কথা,
গোঁড়ামির কারণে সারাজীবনেও উনি সংশোধিত
হন নি। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই এ অজ্ঞতা ও
ভ্রান্তি উনার অনুসারীদের মাঝেও ব্যাপক ও
মারাত্মকভাবে সংক্রামিত হয়! আহমাদ শফী তারই
অন্যতম অনুসারী বা ভাবশিষ্য। উল্লেখ
করা যেতে পারে, সুন্নী ও ওয়াহাবীদের
মাঝে সবচেয়ে বড় আকীদাগত মতভেদ বিরাজ
করছে, এ ইলমে গায়েবের মাসয়ালা নিয়ে।
কেননা, এর সাথে নবীজীর
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাজির-নাযির
হওয়া, মীলাদ ও কিয়াম শরীফ
এবং আওলিয়ায়ে কেরামের
(রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহুম) দূর থেকে বা তাঁদের
ইন্তেকালের পরেও জিন্দা-
মুর্দা মুসলমানদেরকে সাহায্য করার বিষয়টিও
ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ভাইসব! ইলমে গায়েবের আলোচনায় অংশ
নেওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
এবং সেসবের উত্তর সম্পর্কে অবশ্যই
পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। যেমন- (১) ইলম
বা জ্ঞান কতো প্রকার ও
কী কী এবং প্রত্যেক প্রকারের
সংজ্ঞাইবা কী? (২) ইন্দ্রিয়
কাকে বলে এবং কতো প্রকার ও কী কী? (৩)
নাবা, নবুয়ত ও নবী শব্দের অর্থ ও মর্ম
কী কী? (৪) ইলমে গায়েবের
ভান্ডারগুলো কী কী? (৫) আলিমুল গায়েব
শব্দের অর্থ কি এবং আল্লাহুতা’লা ছাড়া আর কেউ
(গায়রুল্লাহ্) আলিমুল গায়েব হতে পারেন কিনা?
(৬) মহান আল্লাহপাক
মহানবীকে (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
ইলমে গায়েব দান করেছেন
কিনা এবং করে থাকলে, কতোটুকু ও কিভাবে দান
করেছেন? দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, বাংলাদেশের
অধিকাংশ আলেমেরই এ প্রশ্নগুলোর উত্তর
সম্পর্কে সুস্পষ্ট, সঠিক ও সন্তোষজনক
ধারণা নেই। ফলে, সুন্নী ও ওয়াহাবীদের
মাঝে দূরত্ব দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।
যাহোক, আমি এবার এগুলোর
ব্যাপারে আলোকপাত করবো এবং এ
বিষয়ে আমার প্রতিপক্ষের প্রতি চ্যালেঞ্জ
থাকবে – গঠনমূলক যুক্তি দিয়ে আমার
বক্তব্যগুলো খন্ডন করার!
প্রথম প্রশ্নের (ইলম বা জ্ঞান কতো প্রকার ও
কী কী এবং প্রত্যেক প্রকারের
সংজ্ঞাইবা কী?) উত্তর হচ্ছে, ইলম বা জ্ঞান দু’
প্রকার। যথা- (১) ইলমে গায়েব বা অতীন্দ্রিয়
জ্ঞান ও (২) ইলমে শাহাদাত বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান।
আমাদের প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে, ইলমে গায়েব;
আর আনুষঙ্গিক বিষয় হলো, ইলমে শাহাদাত।
ইলমে গায়েবের অর্থ কী? অনেকেই
না বুঝে এর বাংলা অর্থ করেছে, অদৃশ্য জ্ঞান।
ফলে, বাংলা ভাষা-ভাষীদের মাঝে ব্যাপক
বিভ্রান্তি জন্ম নিয়েছে। মনে রাখতে হবে,
গায়েবের সকল জ্ঞান অদৃশ্য হলেও সকল
অদৃশ্য জ্ঞান গায়েব নয়। যেমন- আত্মা, আওয়াজ,
গন্ধ, বাতাস, সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা, ঘৃণা, জ্ঞান, বুদ্ধি,
আদর্শ, পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য ইত্যাদি সবই অদৃশ্য,
কিন্তু ইলমে গায়েবের অন্তর্ভুক্ত নয়।
সুতরাং গায়েবের একটি অর্থ অদৃশ্য হলেও
ইলমে গায়েবের বাংলা অর্থ “অদৃশ্য জ্ঞান”
মনে করা সঠিক নয়, বরং বিভ্রান্তিকর। এর সঠিক
বাংলা অর্থ হচ্ছে, অতীন্দ্রিয় জ্ঞান; অর্থাৎ
যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা ইন্দ্রিয়ের গোচরীভূত নয় –
তা-ই হচ্ছে, ইলমে গায়েব। ইমাম ফখরুদ্দীন
রাজী (’আলাইহির রাহমাহ) তাঁর
তাফসীরে কবীরে, ইমাম নাসিরুদ্দীন
বয়দ্ববী (’আলাইহির রাহমাহ) তাঁর
তাফসীরে বয়দ্বভীতে, শাইখ ইসমাঈল
হাক্কী আফেন্দী (’আলাইহির রাহমাহ) তাঁর
তাফসীরে রূহুল বয়ানে ও কাজী সানাউল্লাহ
পানিপথী (’আলাইহির রাহমাহ) তাঁর
তাফসীরে মাযহারীতে প্রমুখ মুফাসসির
সূ্রা আল-বাকারার শুরুতে গায়েবের এ অর্থই
লিখেছেন। সুতরাং এটিই গায়েবের সঠিক অর্থ।
“ইলম” ও “গায়েব” শব্দ দু’টি একটি অপরটির
সাথে আরবি ব্যাকরণের আল-ইদ্বাফার নিয়ম
অনুসারে, “মুদ্বাফ” ও “মুদ্বাফু ইলাইহ” হিসেবে,
অর্থাৎ “ইলমুল গাইব” আকারে কুরআন
মজীদের একটিমাত্র জায়গায়
রয়েছে (সূরা নাজম: ৩৫)।
কখনো কখনো (মোট তিনবার) কুরআন
মজীদে “আনবাউল গাইব” কথাটিও
এসেছে (সূরা আলে ইমরান: ৪৪, সূরা হুদ: ৪৯ ও
সূরা ইউসূফ: ১০২)। “আনবাউ” শব্দটি “নাবা” শব্দের
বহুবচন – যার অর্থ হলো, খবর, বার্তা, সংবাদ
ইত্যাদি। সুতরাং “আনবাউল গায়েব” মানে,
অতীন্দ্রিয় সংবাদাদি। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে,
কুরআন করীমে এ বহুবচন বাচক “আনবাউ
(খবরাদি)” শব্দটি “গায়েব” শব্দের সাথে সম্পৃক্ত
হয়ে (মুদ্বাফ হিসেবে) ব্যবহৃত হলেও
গায়েবের বিপরীত “শাহাদাত” শব্দের সাথেও
কখনো ব্যবহৃত হয় নি। সুতরাং আল-
কুরআনে “আনবাউ” শব্দটি গায়েব বা অতীন্দ্রিয়
বিষয়ের সাথেই সম্পৃক্ত; শাহাদাত বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য
বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। আর
ইলমে গায়েবের বিপরীত হচ্ছে,
ইলমে শাহাদাত। এর অর্থ হচ্ছে, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য
বা ইন্দ্রিয়বদ্ধ জ্ঞান, অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের
মাধ্যমে যে জ্ঞান অর্জিত হয় – তা-ই হচ্ছে,
শাহাদাতের ইলম।
দ্বিতীয় প্রশ্নের (ইন্দ্রিয়
কাকে বলে এবং কতো প্রকার ও কী কী?)
উত্তর হচ্ছে, যেসব অঙ্গ
বা শক্তি দিয়ে পদার্থের বা বাইরের বিষয়ের
উপলব্ধি বা জ্ঞান জন্মে এবং কাজ করা যায় – ওসব
অঙ্গ বা শক্তির প্রতিটিকে ইন্দ্রিয় বলে।
মানুষের ইন্দ্রিয় মোট চোদ্দটি। যথা- চোখ,
কান, নাক, জিহ্বা ও ত্বক (চামড়া) – এ
পাঁচটিকে জ্ঞানেন্দ্রিয়; বাক (কথা), হাত, পা, পায়ু
(মলদ্বার) ও উপস্থ (লিঙ্গ বা যোনি) – এ
পাঁচটিকে কর্মেন্দ্রিয় এবং মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও
চিত্ত – এ চারটিকে অন্তরিন্দ্রিয় বলা হয় (সূত্র:
ব্যবহারিক বাংলা অভিধান – বাংলা একাডেমী)। সুতরাং ঐ
চোদ্দটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যেসব জ্ঞান
অর্জিত হয় – তা কখনোই গায়েবের ইলম নয়,
বরং ওগুলো সবই ইলমে শাহাদাত বা ইন্দ্রিয়লব্ধ
জ্ঞান। আর ঐ চোদ্দটি ইন্দ্রিয় ছাড়া যেসব জ্ঞান
আমরা লাভ করেছি বা করি – সেগুলোই হচ্ছে,
গায়েবের ইলম। যেমন- আল্লাহুতা’লার অস্তিত্ব
ও পরিচিতি, আত্মার স্বরূপ, আরশ, কুরসি, লওহ, কলম,
জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ, হুর, ফেরেশতা ও
জ্বীনের অস্তিত্ব ও পরিচিতি, হাশর-নশর, মিজান,
মাকামে মাহমুদা, সিদরাতুল মুন্তাহা, আলমে আরওয়াহ্
বা আত্মার জগতের বিবরণ, আলমে বারঝাখ
বা কবরের জগতের বর্ণনা, আখেরাতের
জীবনের বিবরণ, বায়তুল মা’মুর, তাকদীর,
পুনরুত্থান, পুলসিরাত, ভবিষ্যতের
বর্ণনা ইত্যাদি সংক্রান্ত সকল জ্ঞানই ইলমে গায়েব
বা অতীন্দ্রিয় জ্ঞান। কেননা, মানুষের
চোদ্দটি ইন্দ্রিয় দিয়ে কোনভাবেই এগুলোর
নাগাল পাওয়া যায় না। আধুনিক বিজ্ঞানও বৈজ্ঞানিক
যন্ত্রপাতি দিয়ে এসব জ্ঞানের কোন সন্ধান পায়
নি; বরং আম্বিয়ায়ে কেরাম (’আলাইহিমুস্ সালাম)
আমাদেরকে এসব অতীন্দ্রিয় বিষয়
জানিয়েছেন। তাই, ওহীও ইলমে গায়েবের
অংশ (সূরা আলে ইমরান: ৪৪ ও সূরা হুদ: ৪৯)।
কেননা, ওহীর জ্ঞানও ইন্দ্রিয়ের
মাধ্যমে হাসিল করা যায় না; যদি যেত – তাহলে,
যে কেউ তার ইন্দ্রিয় ব্যবহার
করে নবী হতে পারতো।
তৃতীয় প্রশ্নের (নাবা, নবুয়ত ও নবী শব্দের
অর্থ ও মর্ম কী কী?) উত্তর হচ্ছে,
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত
আরবী-বাংলা অভিধানের দ্বিতীয় খন্ডের ৯০৪
নং পৃষ্ঠায় “নাবা” শব্দের বাংলা অর্থ
লেখা হয়েছে, খবর, সংবাদ, তথ্য, রিপোর্ট।
৯০৭ নং পৃষ্ঠায় “নবুয়ত” শব্দের বাংলা অর্থ
লেখা হয়েছে, “আল্লাহর পক্ষ
থেকে ঐশী অনুপ্রেরণার মাধ্যমে অদৃশ্য
বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া,
আল্লাহতা’লা এবং তাঁর সাথে সংশ্লিষ্ট
বিষয়াবলী সম্পর্কে তথ্য প্রদান করা, নবীর
পদ। প্রকাশ থাকে যে, ইহা নাবা থেকে নির্গত।”
পরের (৯০৮ নং) পৃষ্ঠায় “নবী” শব্দের
বাংলা অর্থ লেখা হয়েছে, “নবী, রাসূল,
আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ, আল্লাহতা’লা এবং তাঁর
সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী সম্পর্কে তথ্য
প্রদানকারী, আল্লাহর পক্ষ
থেকে ঐশী অনুপ্রেরণার মাধ্যমে অদৃশ্য
বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংবাদ দানকারী, উঁচু ভূমিকেও
নবী বলা হয়।” সুতরাং “নবুয়ত”
নিঃসন্দেহে ইলমে গায়েব বা অতীন্দ্রিয়
জ্ঞানের অংশ এবং নবী শব্দের অর্থ, গায়েব
বা অতীন্দ্রিয় বিষয়ের সংবাদদাতা। নবুয়ত
যদি ইলমে গায়েবের অংশ
না হয়ে ইলমে শাহাদাতের অংশ হতো –
তাহলে, পিথাগোরাস, সক্রেটিস, প্লেটো,
এরিস্টটল, আল-কিন্দী, আল-ফারাবী,
ইবনে সীনা, ওমর খৈয়াম, রজার বেকন,
রেনে ডেকার্টে, লাইবোনিজ, ভলটেয়ার,
ইমানুয়েল কান্ট, হেগেল, হার্বার্ট স্পেন্সার,
নীটসে, বার্গসো, বার্টান্ড রাসেল প্রমুখ
দার্শনিকেরা কিংবা আর্কিমিডিস, জালিনুস, জাবির
ইবনে হাইয়ান, আল-হাজেন, আল-বেরুনী,
কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, এডিসন, জগদীশ
চন্দ্র বসু, আইনস্টাইন, ওপেনহেইমার প্রমুখ
বিজ্ঞানীরা নির্দ্বিধায় নবী হতে পারতেন।
তদুপরি, ইংরেজিতে নবীকে Prophet বলা হয়।
Prophet শব্দটি Prophecy বা Prophesy শব্দ
থেকে এসেছে। Prophecy শব্দটি Noun
বা বিশেষ্য – যা অর্থ হচ্ছে,
ভবিষ্যদ্বাণী এবং Prophesy শব্দটি Verb বা ক্রিয়া –
যার অর্থ হচ্ছে, ভবিষ্যদ্বাণী করা। তাই, Prophet
শব্দের অর্থ হচ্ছে, ভবিষ্যদ্বক্তা।
সুতরাং আম্বিয়ায়ে কেরাম (’আলাইহিমুস্ সালাম)
হচ্ছেন, গায়েবের বা অতীন্দ্রিয় বিষয়ের
সংবাদদাতা। কেননা, যে কোন
সংবাদদাতাকে নবী বলা যায় না। উল্লিখিত দার্শনিক ও
বিজ্ঞানীগণ আমাদেরকে অনেক নতুন নতুন
সংবাদ, তথ্য বা জ্ঞানের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু
তারপরেও তাঁরা কোনভাবেই নবী নন।
চতুর্থ প্রশ্নের (ইলমে গায়েবের
ভান্ডারগুলো কী কী?) উত্তর হচ্ছে,
ইলমে গায়েবের দু’ রকমের ভান্ডার রয়েছে;
যথা- (১) উৎস ও (২) সূত্র। উৎস হচ্ছেন, আল্লাহ
সুবহানাহুতা’লা নিজেই। কেননা, তিনি হচ্ছেন,
অতীন্দ্রিয় পরম সত্তা। তাই,
তিনি ইলমে গায়েবের সার্বিক বা পরম ভান্ডার।
তদুপরি, তাফসীরে ইবনে আব্বাসে সূরা আল-
বাকারার শুরুতে গায়েবের অন্যতম
তাফসীরে লেখা হয়েছে, “গায়েব অর্থ
আল্লাহুতা’লা স্বয়ং।” আর সূত্র হচ্ছে, মহান
আল্লাহপাকের প্রদত্ত বিশেষ বিশেষ ভান্ডার;
যেমন- (ক) সাহেবে কুরআন
সায়্যিদুনা হুজুরে পুরনূর
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম), (খ)
লওহে মাহফুয, (গ) কুরআন মজীদ, (গ) হাদীছ
শরীফ, (ঘ) অন্যান্য নবী (’আলাইহিমুস্ সালাম),
(ঙ) অন্যান্য আসমানি কিতাব, (চ) আওলিয়ায়ে কেরাম
(রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহুম) ইত্যাদি।
ইলমে গায়েব ও ইলমে শাহাদাতের প্রধান
ভান্ডার বা সবচেয়ে বড় সূত্র হচ্ছেন,
সায়্যিদুনা রাসূলে পাক
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁর
সম্পর্কে মহান আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন:
(ওগো আমার পেয়ারা নবী!) আপনার
প্রতি আল্লাহর ফযল (দয়া) ও রহমত
(মেহেরবানী) রয়েছে বলেই,
যারা আপনাকে গোমরাহ্ করতে চাচ্ছিলো –
তারা বরং নিজেদেরকেই গোমরাহ
করবে এবং ওরা আপনার কোন ক্ষতিই
করতে পারবে না। আর আল্লাহ্ আপনার
প্রতি কিতাব ও হেকমত নাযিল করেছেন
এবং আপনি যা জানতেন না –
তা আপনাকে শিখিয়েছেন। কেননা, আপনার
প্রতি আল্লাহর অপরিসীম
করুণা রয়েছে (সূরা নিসা: ১১৩)।
এখানে আল্লাহুতা’লা দ্ব্যর্থহীন ও
শর্তহীনভাবে ইরশাদ করেছেন যে,
“আপনি যা জানতেন না – (আল্লাহুতা’লা)
তা আপনাকে শিখিয়েছেন।”
এতে ইলমে গায়েব ও ইলমে শাহাদাত – উভয়ই
শামিল রয়েছে। এ বিষয়ে ৬নং প্রশ্নের
উত্তরে বিস্তারিত আলোচনা করবো, ইন
শা আল্লাহুতা’লা। তদুপরি,
আল্লাহুতা’লা আরো ঘোষণা করেছেন: আর
তিনি (নবী) গায়েবের ব্যাপারে কৃপণ নন
(সূরা তাকভীর: ২৪)। সুতরাং যদি নবীজীর
(’আলাইহিস্ সলাতু ওয়াস সালাম) কাছে গায়েবের
এলেম না থাকতো – তাহলে, এমন কথা মহান
আল্লাহপাক কখনোই বলতেন না। সর্বোপরি,
নবীজীকে (’আলাইহিস্ সলাতু ওয়াস সালাম)
ইলমে গায়েবের সৃষ্ট উৎসও
বলা যেতে পারে। এ বিষয়েও ৬নং প্রশ্নের
উত্তরে বিস্তারিত আলোকপাত করবো, ইন
শা আল্লাহুতা’লা।
ইলমে গায়েবের অন্যতম ভান্ডার বা সূত্র
হচ্ছে, লওহে মাহফুয। কেননা, প্রথমত, কুরআন
শরীফ লওহে মাহফুযেও সংরক্ষিত
রয়েছে (সূরা বুরূজ: ২১-২২)। দ্বিতীয়ত,
মাফাতিহুল গায়েব বা গায়েবের চাবিগুচ্ছের খবর
লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ রয়েছে (সূরা আন’য়াম:
৫৯)। তৃতীয়ত, ছোট-বড় সব কিছুই
লওহে মাহফুযে রয়েছে (সূরা ক্বামার: ৫৩ ও
সূরা সাবা: ৩)। চতুর্থত, প্রতিটি জিনিস
লওহে মাহফুযে লিখিত ও সংরক্ষিত
রয়েছে (সূরা ইয়াসীন: ১২)। পঞ্চমত, মহান
আল্লাহপাক যখন ফেরেশতাগণকে (’আলাইহিমুস
সালাম) বলেছিলেন যে,
তিনি পৃথিবীতে খলীফা বা প্রতিনিধি সৃষ্টি করবেন
– তখন তাঁরা মানুষ জাতির নেতিবাচক
দিকটি তুলে ধরে তাঁকে নিষেধ করেছিলেন
(সূরা আল-বাকারাহ: ৩০)। মানুষ জাতির এ ভবিষ্যৎ
কর্মফল সম্পর্কে ফেরেশতাগণ এ আংশিক
ধারণা বা জ্ঞান লাভ করেছিলেন, লওহে মাহফুয
থেকেই। ষষ্ঠত, হাদীছ
শরীফে রয়েছে যে,
সায়্যিদুনা হায়াতুন্নবী (’আলাইহিস্ সলাতু ওয়াস সালাম)
পৃথিবীতে তাশরীফ নিয়ে আসার আগে দুষ্ট
জ্বীন
বা শয়তানরা লওহে মাহফুযে উঁকিঝুঁকি মেরে
ভবিষ্যতের জ্ঞান জেনে নিয়ে গণক ও
জ্যোতিষদেরকে তা জানিয়ে দিতো। এভাবেই
হযরত মূসার (’আলাইহিস সালাম)
সম্পর্কে ফেরাউনের গণকরা আগাম খবর
পেয়েছিলো। অবশ্য নূর নবীজীর
(’আলাইহিস্ সলাতু ওয়াস সালাম) দুনিয়াতে তাশরীফ
আনার পরে, এ প্রক্রিয়া বা ধারা (শয়তানদের
লওহে মাহফুযে উঁকিঝুঁকি মারা) বন্ধ হয়ে যায়।
ইলমে গায়েব ও ইলমে শাহাদাতের অন্যতম
ভান্ডার বা প্রধানতম সূত্র হচ্ছে, কুরআন মজীদ।
প্রথমত, লওহে মাহফুযে যা কিছু লিপিবদ্ধ
রয়েছে – আল-কুরআনেও তা লিপিবদ্ধ
রয়েছে। মহান আল্লাহপাক শর্তহীন ও
দ্ব্যর্থহীনভাবে ফরমান: আমি কিতাবে কোন
কিছুই বাদ দেই নি (সূরা আন’য়াম: ৩৮)।
তাফসীরে ইবনে আব্বাসে এ
আয়াতে কারীমার তাফসীরে লিখা আছে,
“লওহে মাহফুযে আমি যা কিছু লিখে রেখেছি –
তার কোন কিছুই বাদ দেই নি; সবই
কুরআনে বর্ণনা করেছি। দ্বিতীয়ত, পবিত্র
কুরআনে প্রতিটি জিনিসেরই (ইলমে গায়েব ও
ইলমে শাহাদাত) স্পষ্ট ও বিস্তারিত বিবরণ ও
ব্যাখ্যা রয়েছে (সূরা ইউসূফ: ১১১ ও সূরা নাহল:
৮৯)।
ইলমে গায়েব ও ইলমে শাহাদাতের অন্যতম
ভান্ডার বা সূত্র হচ্ছে, হাদীছ শরীফ। প্রথমত,
যেহেতু, সায়্যিদুনা নবী করীম
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
ইলমে গায়েব ও ইলমে শাহাদাতের প্রধান
ভান্ডার বা সবচেয়ে বড় সূত্র – সেহেতু, তাঁর
পবিত্র জবান, কাজ, অনুমোদন, আচরণ ও
হাদীছে কুদসি নিঃসন্দেহে গায়েব ও
শাহাদাতের জ্ঞান-ভান্ডার। দ্বিতীয়ত, “নবী”
অর্থ যেমনি গায়েবের খবরদাতা –
ওহী বা প্রত্যাদেশও তেমনি গায়েবের বিষয়
(সূরা আলে ইমরান: ৪৪ ও সূরা হুদ: ৪৯) –
যা গায়েবের উৎস মহান আল্লাহপাকের তরফ
থেকে আসা। আর কুরআন মজীদ ও হাদীছ
শরীফ – উভয়ই ওহী। কুরআন শরীফ
ওহীয়ে মাতলু বা তেলাওয়াৎযোগ্য
ওহী এবং হাদীছ শরীফ
ওহীয়ে গায়রে মাতলু বা অতেলাওয়াৎযোগ্য
ওহী। তৃতীয়ত, হাদীছ শরীফে কিয়ামত
সংঘটিত হওয়ার দিন-তারিখ, কিয়ামতের আলামত, হযরত
ঈসা ও ইমাম মাহদীর (’আলাইহিমাস সালাম) আগমন,
দাজ্জাল ও দাব্বাতুল আরদের আবির্ভাব,
পশ্চিমে সূর্যোদয়, হযরত ইস্রাফীলের
(’আলাইহিস সালাম) শিঙ্গায় ফুৎকার, ফেরেশতা, হুর,
জ্বীন, শয়তান, বেহেশত, দোযখ, পুলসিরাত,
শাফায়াত, আলমে বারঝাখ, হাশর-নশর
ইত্যাদি সংক্রান্ত বহু ভবিষ্যৎবাণী ও
বর্ণনা রয়েছে –
যেগুলো সন্দেহাতীতভাবে ইলমে
গায়েবের অন্তর্গত।
ইলমে গায়েবের অন্যতম ভান্ডার বা সূত্র
হচ্ছেন, অন্যান্য নবী (’আলাইহিমুস সালাম)।
প্রথমত, আল্লাহুতা’লা তাঁর
মনোনীতি রাসূলগণকে (’আলাইহিমুস সালাম)
গায়েব জানিয়েছেন (সূরা আলে ইমরান: ১৭৯ ও
সূরা জ্বীন: ২৬-২৮)। দ্বিতীয়ত, “নবী”
শব্দের অর্থই হচ্ছে, গায়েবের খবরদাতা।
তৃতীয়ত, যেহেতু প্রত্যেক
নবী (’আলাইহিমুস সালাম) আমাদের প্রাণের
চেয়েও প্রিয় নবীজীর
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতি ঈমান
আনতে এবং তাঁকে সাহায্য করতে মহান
আল্লাহপাকের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ
(সূরা আলে ইমরান: ৮১ ও ৮২) – সেহেতু,
তাঁরা প্রত্যেকেই যাঁর যাঁর
উম্মতকে মীলাদুন্নবীর (’আলাইহিস সলাতু
ওয়াস সালাম) সুসংবাদ দিয়ে গেছেন
বা ভবিষ্যৎবাণী (গায়েব) করে গেছেন।
চতুর্থত, আল্লাহুতা’লা হযরত আদমকে (’আলাইহিস
সালাম) প্রতিটি জিনিসের (গায়েব ও শাহাদাতের) নাম
শিখিয়েছেন (সূরা আল-বাকারাহ: ৩১)। পঞ্চমত,
হাদীছ শরীফে রয়েছে, প্রত্যেক
নবী (’আলাইহিমুস সালাম) যাঁর যাঁর
উম্মতকে দজ্জালের ব্যাপারেও সতর্ক
করেছেন বা ভবিষ্যৎবাণী (গায়েব)
করে গেছেন। ষষ্ঠত, পবিত্র মেরাজের
রজনীতে সায়্যিদুনা শাফীউল মুযনিবীন
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন মহান
আল্লাহপাকের তরফ থেকে পঞ্চাশ ওয়াক্ত
নামাজের তোহফা নিয়ে ফিরছিলেন – তখন,
হযরত মূসা (’আলাইহিস সালাম)
“উম্মতে মুহাম্মাদী এতো নামাজ আদায়
করতে পারবে না” –
মর্মে ভবিষ্যৎবাণী (গায়েব) করেছিলেন
এবং তাঁকে বারবার নামাজ
কমিয়ে আনতে অনুরোধ করেন। সপ্তমত,
আল্লাহুতা’লা হযরত খিজিরকে (’আলাইহিস সালাম)
ইলমে লাদুন্নী দান করেছেন (সূরা আল-কাহাফ:
৬৫)। তাফসীরে তাবারীতে হযরত
ইবনে আব্বাসের (রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহু)
সূত্রে, তাফসীরে বয়দ্বাভী, নাসাফী, খাঝিন
ও তাফসীরে রূহুল বয়ানে এ আয়াতে কারীমার
তাফসীরে লিখা হয়েছে যে,
ইলমে লাদুন্নী মানে ইলমে গায়েব –
যা আল্লাহুতা’লা হযরত খিজিরকে (’আলাইহিস সালাম)
দান করেছেন।
ইলমে গায়েবের অন্যতম ভান্ডার বা সূত্র
হচ্ছে, অন্যান্য আসমানি কিতাব। প্রথমত, পবিত্র
কুরআন আগেকার আসমানি কিতাবগুলোর সমর্থক
(সূরা ইউনূস: ৩৭ ও সূরা ইউসূফ: ১১১)। দ্বিতীয়ত,
আসমানি কিতাব মানেই হচ্ছে, ওহীর সম্ভার।
আর ওহী মানেই হলো, গায়েবের বিষয়
(সূরা আলে ইমরান: ৪৪ ও সূরা হুদ: ৪৯)। তৃতীয়ত,
সেগুলোতে মহান আল্লাহপাকের পরিচিত,
নবীজীর (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম)
আগমনের ভবিষ্যৎবাণী, কবর ও পরকালের
পুরস্কার ও শাস্তি, বেহেশত ও দোযখের
বিবরণ, ফেরেশতাগণের কর্মকান্ড, কিয়ামত ও
হাশর-নশরের বর্ণনা ইত্যাদি ছিলো।
ইলমে গায়েব ও ইলমে শাহাদাতের অন্যতম
ভান্ডার বা সূত্র হচ্ছেন, আওলিয়ায়ে কেরাম
(রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহুম)। প্রথমত, কুরআন
শরীফে পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীনভাবেই
রয়েছে যে, আল্লাহতা’লা তাঁর ওলীদেরকেও
গায়েব জানিয়ে দেন বা দান করেন। যেমন-
তিনি হযরত মরিয়মকে (’আলাইহাস্ সালাম)
জানিয়েছেন (সূরা আলে ইমরান: ৪২, ৪৩, ৪৫-৪৭
ও সূরা মরিয়াম: ২৪-২৬)। অথচ তিনি নবী ছিলেন না,
বরং ওলীয়া ছিলেন। দ্বিতীয়ত,
আওলিয়ায়ে কেরামের কারামত সত্য। আর এ
কারামতকে চোদ্দ ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রমাণ করা যায়
না, বরং বিশ্বাস করতে হয়। তৃতীয়ত, বহু
ওলী কাশফ বা স্বজ্ঞার অধিকারী ছিলেন
এবং তাঁরা ইলহাম লাভ করতেন। আর কাশফ ও ইলহামও
অতীন্দ্রিয় জ্ঞান বা গায়েবের বিষয়। কেননা,
এগুলোকে ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রমাণ বা অনুধাবন
করা যায় না। চতুর্থত, বহু ওলী কাশফুল কুবুরও
ছিলেন – যাঁরা কবরবাসীদের হাল-হাকীকত
জানতে পারতেন। গাউছে পাক ও
খাজা গরীবে নেওয়াজ প্রমুখের
(রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহুম) বিশ্বস্ত
জীবনীগুলো এর সাক্ষ্য বহন করছে;
যেমন- বাহজাতুল আসরার, সিয়ারুল আকতাব, আনিসুল
আরওয়াহ, সিররুল আরিফীন, খাজিনাতুল
আসফিয়া ইত্যাদি।
পঞ্চম প্রশ্নের (আলিমুল গায়েব শব্দের অর্থ
কি এবং আল্লাহুতা’লা ছাড়া আর কেউ (গায়রুল্লাহ্)
আলিমুল গায়েব হতে পারেন কিনা?) উত্তর
হচ্ছে, আলিমুল গায়েব শব্দের অর্থ হলো,
গায়েবজান্তা এবং অন্য কেউ (গায়রুল্লাহ্) আলিমুল
গায়েব হতে পারেন। যারা বলে,
আল্লাহুতা’লা ছাড়া অন্য কেউ আলিমুল গায়েব
হতে পারেন না – তারা “আলিমুল গায়েব” শব্দের
অর্থ, মর্ম ও তাৎপর্য বোঝেন নি,
বরং তারা আলিমুল গায়েবকে মালিকুল গায়েব
হিসেবেই ভুল বুঝেছেন; যদিও মহান
আল্লাহপাক সন্দেহাতীতভাবে মালিকুল গায়েব ও
মালিকুশ শাহাদাত। কিন্তু তাই বলে, আলিমুল
গায়েবের অর্থ কখনোই মালিকুল গায়েব নয়,
বরং এর অর্থ হচ্ছে, গায়েবের আলেম
কিংবা গায়েবজান্তা বা গায়েবজ্ঞাতা তথা অতীন্দ্রিয়
জ্ঞানের অধিকারী। সুতরাং যিনি গায়েবের খবর
জানেন – তিনিই আলিমুল গায়েব। যেমন-
আল্লাহুতা’লা ফরমান: আর আল্লাহ্
ধনী এবং তোমরা (বান্দারা) ফকীর (সূরা মুহাম্মাদ:
৩৮)। কিন্তু তার পরেও ধন-সম্পদের
অধিকারী বান্দাকে নির্দ্বিধায় ধনী বলা যায়।
সুতরাং গণী তথা ধনী শব্দটি যেমনি আল্লাহুতা’
লার একক কোন গুণ নয়, বরং বান্দাও
ধনী হতে পারে – তেমনি, বান্দা আলিমুল
গায়েবও হতে পারে। আরেকটু পরিষ্কার ও সহজ
করে বলছি: ধনী হওয়ার
জন্যে যেমনি আসমান-জমীনের সকল ধন-
ঐশ্বর্যের মালিক হওয়ার দরকার নেই, বরং নেসাব
পরিমাণ তথা আংশিক সম্পদের মালিক হলেই চলে –
তেমনি, আলিমুল গায়েব হওয়ার জন্যেও সকল
গায়েব জানার দরকার নেই, বরং আংশিক জানলেই
যথেষ্ট।
যারা আরবি ব্যাকরণ ভালোভাবে জানেন –
তারা লক্ষ্য করুন, কালামুল্লাহ শরীফে মহান
আল্লাহপাকের আযীমুশ্ শানে “আলিমুল
গায়েব” কথাটি মোট ১৩ (তেরো) বার
এবং “আল্লামুল গুয়ূব” কথাটি মোট চারবার (সূরা আল-
মায়েদা: ১০৯ ও ১১৬, সূরা তাওবা: ৭৮ ও সূরা সাবা: ৪৮)
ব্যবহৃত হয়েছে। এবার আসুন, প্রাসঙ্গিক
শব্দগুলো নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করি। “আলিম”
শব্দটির আক্ষরিক বা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে,
জ্ঞানী বা জান্তা। এটি একটি ইসমু ফায়েল
বা ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য – যা ধর্মীয়
জ্ঞানে অভিজ্ঞ ব্যক্তির ক্ষেত্রেও অহরহ
ব্যবহৃত হয়। আর “আল্লামু” শব্দটি আলিম শব্দের
ইসমু মুবালাগাহ (Hyperbole) – যার আভিধানিক অর্থ
হলো, মহাজ্ঞানী। তেমনি, “গায়েব”
শব্দটি মুফরাদ বা ওয়াহিদ, অর্থাৎ একবচনবাচক
একটি শব্দ। এর বহুবচন হচ্ছে, “গুয়ূব”।
সুতরাং আলিমুল গায়েব-এর আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে,
গায়েবজান্তা; আর আল্লামুল গুয়ূব-এর আভিধানিক
অর্থ হলো, সকল গায়েব
সম্পর্কে মহাজ্ঞানী; অর্থাৎ “আলিমুল গায়েব”
কথাটি সাধারণ অর্থ বোঝাচ্ছে; আর “আল্লামুল
গুয়ূব” কথাটি ব্যাপক অর্থ বোঝাচ্ছে! কিন্তু
কালামে পাকে আল্লাহ্ সুবহানাহুতা’লার আযীমুশ্
শানে এ দু’ রকম কথাই ব্যবহারের উদ্দেশ্য
কী – যেখানে একটি দিয়ে সাধারণ এলেমদার
আর আরেকটি দিয়ে বেশি এলেমদার
বোঝাচ্ছে? আরো স্পষ্ট করে বললে,
মহান আল্লাহপাকের জন্যে যদি শুধু আলিমুল
গায়েব হওয়াই যথেষ্ট হতো – তাহলে, এর
চেয়েও ব্যাপক অর্থবোধক কথা “আল্লামুল
গুয়ূব” কথাটি তাঁর নিজের শানে কুরআন
মজীদে ব্যবহার করার হেতু কী?
আল্লাহুতা’লার জ্ঞান বাড়ে-কমে নাকি (মায়াজাল্লা)?
এর উদ্দেশ্য বা হেতু একটিই। আর তা হচ্ছে,
বান্দার ক্ষেত্রে আলিমুল গায়েব শব্দটি ব্যবহার
করা জায়েজ বলেই মহান আল্লাহপাক
মাঝে মাঝে আলিমুল গায়েবের চেয়েও
ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ (আল্লামুল গুয়ূব)
নিজের জন্যে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু
গোমরাহ ওয়াহাবী সম্প্রদায় আলিমুল গায়েব ও
আল্লামুল গুয়ূবের পার্থক্য ও তাৎপর্য অনুধাবন
করতে অক্ষম! এ পর্যায়ে আমার বক্তব্য খুবই
পরিষ্কার, অর্থাৎ “আল্লামুল গুয়ূব” মহান
আল্লাহপাকের একক বৈশিষ্ট্য বা সিফাত; কিন্তু
আলিমুল গায়েব তাঁর সৃষ্টির ক্ষেত্রেও
প্রযোজ্য হবে পারে। আর তাই,
আম্বিয়ায়ে কেরাম (’আলাইহিমুস সালাম) ও বড় বড়
অলী-আল্লাহগণও আলেমুল গায়েব
বা গায়েবজান্তা। এটিই আমার আকীদাহ।
ষষ্ঠ প্রশ্নের {মহান আল্লাহপাক
মহানবীকে (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
ইলমে গায়েব দান করেছেন
কিনা এবং করে থাকলে, কতোটুকু ও কিভাবে দান
করেছেন?} উত্তর হচ্ছে, আহলে সুন্নত
ওয়াল জামায়াতের অধিকাংশ আলেমের মতে, মহান
আল্লাহপাক অবশ্যই
মহানবীকে (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম)
তাঁর গায়েবের আংশিক এলেম তথা সৃষ্টিকুল
সংক্রান্ত সকল এলেম দান করেছেন। তবে,
কোন কোন আরেফবিল্লাহ্
ওলী বলেছেন: হুজুরে পাক
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহুতা’লার
সকল জ্ঞানে জ্ঞানী; অর্থাৎ
সায়িদুনা নবী করীম
(সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহুতা’লার
সব এলেমই জেনেছেন। আল্লামা শেখ
আবূল হাসান বিকরী, আল্লামা শেখ
উসমাভী (রিদওয়ানুল্লাহিতা’লা ’আলাইহিমা) এবং তাঁদের
অনুসারীবৃন্দ এ মতের অনুসারী; অর্থাৎ
তাঁরা মনে করেন, আল্লাহুতা’লা তাঁর সকল এলেম
হুজুরে পুরনূরকে (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) দান করেছেন। অবশ্য এ বিষয়ে সকল
সুন্নী আলেম ও ওলী একমত যে, মহান
আল্লাহপাক নবীজীকে (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস
সালাম) এক মুহূর্তে নয়,
বরং ধীরে ধীরে গায়েবের এলেম দান
করেছেন। যেমন- তাঁর (নবীজীর)
আযীমুশ শানে কুরআন শরীফ
দুনিয়াতে ধীরে ধীরে বা দীর্ঘ তেইশ
বছরে নাযিল হয়েছে। তাছাড়া, মহান আল্লাহপাক
ফরমান: (ওগো আমার পেয়ারা নবী!) আর
আমি আপনার প্রতি নিজ থেকেই
ওহী হিসেবে একটি রূহ নাযিল করেছি; এর
আগে আপনি জানতেন না যে, কিতাব
কী এবং ঈমান কী; তবে হাঁ,
আমি সেটাকে এমন আলো বানিয়েছি –
যা দিয়ে আমি আমার বান্দাদের মাঝে যাকে চাই –
তাকে হেদায়েত করি। আর আপনিতো সহজ-
সরল পথে হেদায়েত করেনই (সূরা শুরা: ৫২)।
তিনি আরো ফরমান: (ওগো আমার
পেয়ারা নবী!) আপনার অতীতের
চেয়ে ভবিষ্যৎ বেশি সমৃদ্ধ (সূরা দোহা: ৪)।
সুতরাং যতোই সময় গড়িয়েছে – ততোই
তিনি বেশি বেশি করে গায়েবের এলেম হাসিল
করেছেন। এখন মতবিরোধের বিষয়টি (আংশিক,
নাকি পুরো গায়েবের এলেম লাভ করেছেন)
নিয়ে একটু আলোকপাত করবো।
আল্লাহ সুবহানাহুতা’লার এলেম অসীম ও
সত্তাগত; অর্থাৎ তিনি অনাদিকাল থেকেই অসীম
জ্ঞানের অধিকারী এবং তাঁর এ জ্ঞান সত্তাগত,
অর্থাৎ কোথা থেকে বা কারো কাছ
থেকে অর্জিত নয়। কেননা, তিনি সমাদ, অর্থাৎ
অমুখাপেক্ষী বা স্বয়ংসম্পূর্ণ পরম সত্তা।
তিনি কখনো কারো কোন ধার ধারেন
না এবং তিনি তাঁর কর্মকান্ডের
জন্যে কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।
তবে তিনি তাঁর সৃষ্টিকুলের প্রতি পরম করুণাময় ও
অসীম দয়ালু। কুল মাখলুকাতে তাঁর
সবচেয়ে প্রিয়পাত্র হচ্ছেন, সায়্যিদুনা মুহাম্মাদ
মুস্তাফা আহমাদ
মুজতাবা (সল্লাল্লাহুতা’লা ’আলাইহি ওয়া সাল্লাম);
তারপরে, অন্যান্য নবী-রাসূল (’আলাইহিমুস
সালাম); এরপরে তাঁর ওলীগণ (’আলাইহিমুর রাহমাহ)
এবং তারপরে অন্যেরা। তাই, সুন্নী জামায়াতের
সিংহভাগ আলেম মনে করেন, তিনি তাঁর এলেম
থেকে সবচেয়ে বেশি দান করেছেন
সায়্যিদুনা মহানবীকে (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস
সালাম); তারপরে, অন্যান্য নবী-
রাসূলকে (’আলাইহিমুস সালাম); এরপরে তাঁর
ওলীগণকে (’আলাইহিমুর রাহমাহ)
এবং তারপরে অন্যান্যকে। যেমন-
তিনি ঘোষণা করেছেন: তিনি যতোটুকু চান –
ততোটুকু ছাড়া তাঁর জ্ঞান থেকে তারা কোন
কিছুই পায় না (সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৪)। তদুপরি,
তিনি ইরশাদ করেছেন: আর প্রত্যেক জ্ঞানবান
(যিল্ ইলম) ব্যক্তির উপরে একজন
মহাজ্ঞানী (আলীম) রয়েছে (সূরা ইউসূফ:
৭৬)। এ প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস
(রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহু) বলেন: “(জ্ঞানের) এ
ধারাবাহিকতা সবশেষে আল্লাহুতালা পর্যন্ত
পৌঁছেছে। তাঁর জ্ঞান সবার জ্ঞানের
চেয়ে বেশি।”
অন্যদিকে, ঐ আরেফগণের
পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, প্রথমত,
আল্লাহুতা’লা নবীজীকে (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস
সালাম) শুধু ভালোইবাসেন না, বরং তিনি তাঁর হাবীব
বা প্রেমাস্পদও বটেন। তাই,
কালামে পাকে তিনি দ্ব্যর্থহীন ও
শর্তহীনভাবে নিজ থেকে তাঁর হাবীবের
সাথে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়েছেন: আপনার
পালনকর্তা আপনাকে এমনি দেয়া দেবেন যে,
আমি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন (সূরা দোহা: ৫)।
সুতরাং এ পর্যায়ে নবীজী (’আলাইহিস সলাতু
ওয়াস সালাম) আল্লাহুতা’লার সকল এলেম
জেনে নেয়ার দাবি করতেই পারেন। আর তাই,
আয়াতুল কুরসির ঐ (তিনি যতোটুকু চান – ততোটুকু
ছাড়া তাঁর জ্ঞান থেকে তারা কোন কিছুই পায় না)
হুকুম নবীজীর (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালাম)
ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কেননা,
আল্লাহুতা’লা তাঁর নিজের মর্জি মোতাবেক,
সৃষ্টিকুলকে দান করেন। কিন্তু তাঁর
হাবীবকে দান করেন – তাঁরই (নবীজীর)
ইচ্ছা বা সন্তুষ্টি মোতাবেক। দ্বিতীয়ত,
আল্লাহুতা’লা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা
করেছেন: আপনি যা জানতেন না –
তা আপনাকে শিখিয়েছেন (সূরা নিসা: ১১৩)।
এখানে শর্তহীনভাবে সার্বিক এলেমের
(ইলমে গায়েব ও ইলমে শাহাদাত) কথাই
বলা হয়েছে – আংশিক এলেমের কথা বলা হয় নি।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে বড় গায়েব হচ্ছে,
দীদারে এলাহী বা আল্লাহতা’লাকে দেখা।
পবিত্র মীরাজের
রাতে সায়্যিদুনা মহানবী (’আলাইহিস সলাতু ওয়াস
সালাম) পরম গায়েব বা গায়েবের পরম উৎস
আল্লাহ সুবহানাহুতা’লাকে দর্শন করেছেন।
সুতরাং এরপরেও কি তাঁর আর কোন গায়েব
জানা বাকি থাকতে পারে? কেউ যদি বলেন: পারে।
তাহলে, তার প্রতি প্রশ্ন থাকবে, আল্লাহুতা’লার
চেয়েও গায়েব আর কিছু আছে নাকি? থাকলে,
প্রমাণ করুন।
যাহোক, এ হচ্ছে, ইলমে গায়েব
সম্পর্কে সুন্নী জামায়াতের আকীদাহ।
যেহেতু,
ধীরে ধীরে নবীজীকে (’আলাইহিস
সলাতু ওয়াস সালাম) গায়েবের এলেম
জানানো হয়েছে – সেহেতু, তাঁর পূতপবিত্র
দুনিয়াবী জিন্দেগীতে এমনো কোন
কোন ঘটনা সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে –
যেগুলোর এলেম তখনো তাঁর
কাছে পৌঁছে নি,
বরং পরে পৌঁছেছিলো অথবা পৌঁছে থাকলেও –
স্থান-কাল-পাত্রের বিবেচনায়, সেসব এলেম
প্রকাশ করার অনুমতি ছিলো না কিংবা তিনি (নবীজী)
কোন কারণে তা প্রকাশ করতে চান নি। এ
বিষয়টা মেনে নিলে, ইলমে গায়েব
সম্পর্কে অনেক সন্দেহেরই নিরসন
হওয়া সম্ভব। আল্লাহ হাফেয।
বি: দ্র: মা আয়েশা সিদ্দীকার
(রাদ্বিআল্লাহুতা’লা ’আনহা) বিরুদ্ধে যে অপবাদ
রটে ছিলো – এর প্রকৃত
ঘটনা জানা থাকা সত্ত্বেও নবীজী (’আলাইহিস
সলাতু ওয়াস সালাম) নিজের স্ত্রীর
পক্ষে একতরফাভাবে সাফাই না গেয়ে নীরব
থেকে হেকমত অবলম্বন করেছিলেন।
কেননা, সে সময়ে তিনি মা আয়েশার পক্ষ
নিলে অনেকেই, বিশেষ করে, দুর্বল
চিত্তের মুসলিম ও মুনাফিকরা বলে বেড়াতো:
“তিনিতো নিজের স্ত্রীর পক্ষ নেবেনই।
তাঁকেতো তিনি খুবই ভালোবাসেন। আর
ভালোবাসার পাত্র/পাত্রীকে সবাই
ধোয়া তুলসী পাতাই মনে করে বৈকি।” সুতরাং সব
জেনেও, রাহমাতুল্লিল আলামীন (’আলাইহিস
সলাতু ওয়াস সালাম) এ মামলায় চুপ থেকে ওহীর
(সূরা নূর: ১১-২০) জন্যে অপেক্ষা করছিলেন
এবং তিনি চাচ্ছিলেন যে, আল্লাহ
সুবহানাহুতা’লা নিজেই যেন আয়েশার চারিত্রিক
নিষ্কলুষতা ঘোষণা করে এমনি এক অভূতপূর্ব নজির
স্থাপন করেন যে, কেয়ামত পর্যন্ত যারাই
কুরআন মজীদ তিলাওয়াৎ করবেন –
প্রত্যেকেই আয়েশার চরিত্রের
নির্মলতা অধ্যয়ন করবেন। তদুপরি,
আয়েশা সিদ্দীকার মর্যাদাও
আগে থেকে অনেক গুণ বেড়ে যাবে।
সর্বোপরি, কুরআন মজীদ নিজেই কেয়ামত
পর্যন্ত আয়েশার সিদ্দীকার চারিত্রিক পবিত্রতার
জলজ্যান্ত সাক্ষ্য বহন করবে!” আল্লাহুতা’লার
শুকরিয়া! বাস্তবে হয়েছিলোও তাই। আর
তা হবে নাইবা কেন? আল্লাহুতা’লা যে তাঁর
হাবীবের কাছে ওয়াদা করেছেন যে, তাঁর
অতীত থেকে ভবিষ্যৎ সমুজ্জ্বল
এবং তিনি তাঁকে সন্তুষ্ট করবেনই (সূরা দোহা:
৪-৫)।

মহনবী সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অদৃশ্য জ্ঞান বিষয়ক ৮০ টি হাদিস

Standard

সূচি
(১) অদৃশ্য জ্ঞান (এলমে গায়ব) মহান আল্লাহর
অধিকারে
(২) ওই
(৩) মহানবী (দ:)-
এর কতিপয় সাহাবীর ব্যাপারে তাঁর ব্যক্ত এলমে
গায়ব (১)
(৪) ওই
(৫) বর্ণনানুক্রমিক তালিকা: পাঠকবান্ধব হাইপারলিংক
তালিকাসহ
[১]
ইমাম কাজী ইউসুফ নাবহানী (রহ:) বলেন:
প্রথমত আপনাদের জানতে হবে যে এলমে
গায়ব তথা অদৃশ্যজ্ঞান মহান আল্লাহর অধিকারে;
আর মহানবী (দ:) বা অন্যান্যদের মোবারক
জিহ্বায় এর আবির্ভাব ঘটেথাকে তাঁরই তরফ
থেকে হয় ওহী (ঐশী বাণী) মারফত,
নয়তো এলহাম (ঐশী প্রত্যাদেশ) দ্বারা।
হুযূর পূরনূর (দ:) একটি হাদীসে এরশাদ ফরমান,
“আমি আল্লাহর নামে কসম করছি, নিশ্চয় আমি
কিছুই জানি নাকেবল আমার প্রভু যা আমাকে শিক্ষা
দিয়েছেন তা ছাড়া।” [নোট-১: তাবুকের
যুদ্ধের সময় যখন রাসূলুল্লাহ(দ:)-
এর উট হারিয়ে গিয়েছিল, তখন তিনি মানুষদের
কাছে ওর খোঁজ জানতে চান, যার প্রেক্ষিতে
জনৈকমোনাফেক (যায়দ ইবনে আল-লাসিত আল-
কায়নুকাঈ) বলেছিল,
“এই হলেন মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহুআলাইহে ওয়া
সাল্লাম) যাঁর কাছে ওহী এসেছে আসমান
থেকে, অথচ তিনি জানেন না তাঁর উট কোথায়।”
একথার পরিপ্রেক্ষিতে নূরনবী (দ:) আল্লাহর
প্রশংসা করে বলেন,
”অমুক লোক (মোনাফেক) এ কথা বলেছে।
নিশ্চয় আমি কিছুই জানি না শুধু আমার প্রভু খোদাতা’
লা যা আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া।
আর তিনিআমাকে জানিয়েছেন যে ওই উট অমুক
উপত্যকায় একটি গাছের সাথে লাগাম জড়িয়ে গিয়ে
আটকেআছে।” মানুষেরা তখনি ওখানে দৌড়ে
গিয়ে (ওই অবস্থায়) উটটিকে পায়।
এই বর্ণনা দু’জন সাহাবী হযরতমাহমুদ ইবনে
লাবিদ (রা:) ও হযরত উমারা ইবনে হাযেম (রা:)
কর্তৃক প্রদত্ত এবং ‘আল-
মাগাযী’ পুস্তকেইবনে এসহাক কর্তৃক লিপিবদ্ধ
বলে ইবনে হিশাম তাঁর ’সীরাহ’ (৫:২০৩) ও আত
-তাবারী তাঁর ‘তারিখ’ (২:১৮৪)
গ্রন্থগুলোতে বিবৃত করেছেন; এ ছাড়া ইবনে
হাযম নিজ ’আল-
মুহাল্লা’ (১১:২২২) কেতাবে এবংইবনে হাজর তাঁর ‘
ফাতহুল বারী’ (১৩:৩৬৪, ১৯৫৯ সংস্করণ) ও ‘আল-
ইসাবা’ (২:৬১৯) গ্রন্থগুলোতে,আর ইবনে
হিব্বান সনদ ছাড়া স্বরচিত ‘আল-
সিকাত‘ (২:৯৩) পুস্তকে বর্ণনাটি উদ্ধৃত করেন।
উপরন্তু,ইবনে কুতায়বা (রা:)-
কে উদ্ধৃত করে ‘দালাইল আন্ নবুওয়াহ’ (১৩৭ পৃষ্ঠা
) কেতাবে আল-তায়মী এটিবর্ণনা করেন।
ইমাম নাবহানীর উদ্ধৃত অংশটি হযরত উকবা ইবনে
আমির (রা:) হতে আবু আল-শায়খ তাঁর‘আল-
আ’যামা’ (৪:১৪৬৮-১৪৬৯ #৯৬৭১৪) পুস্তকে বর্ণনা
করেন, যা একটি দীর্ঘতর বর্ণনার অংশ এবংযা’তে
অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নিম্নের কথাগুলো:
“তুমি এখানে আমাকে কী জিজ্ঞেস করতে
এসেছ তা তোমার বলারআগেই আমি বলতে পারি
; আর যদি তুমি চাও, তবে তুমি আগে জিজ্ঞেস
করতে পারো, আমি এরপর উত্তরদেবো…….
তুমি এখানে এসেছ আমাকে যুলকারনাইন
সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে।” মহানবী (দ:)-
এর উটএকইভাবে হোদায়বিয়ার অভিযানেও
হারিয়েছিল এবং পাওয়া গিয়েছিল] অতএব, আমাদের
কাছে তাঁর কাছথেকে যা কিছু অদৃশ্য জ্ঞান
হিসেবে এসেছে, তার সবই হলো ঐশী
প্রত্যাদেশ যা তাঁর নবুয়্যতের সত্যতারএকটি
প্রামাণ্য দলিল।
আরেক কথায়, ইমাম আহমদ রেযা খানের
বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মহানবী (দ:)-
এর এলমে গায়ব হচ্ছেআংশিক (’জুয’ই), অসম্পূর্ণ
(গায়র এহাতী), মন্ঞ্জুরীকৃত (আতায়ী), এবং
স্বকীয় নয় (গায়রএসতেকলালী), যা কুরআন
মজীদে সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত হয়েছে নিচে:
“অদৃশ্যের জ্ঞাতা, সুতরাং আপনঅদৃশ্যের ওপর
কাউকে ক্ষমতাবান করেন না আপন মনোনীত
রাসূলগণ ছাড়া” (সূরা জিন, ২৬-২৭আয়াত)।
ইমাম নাবহানী (রহ:) বলেন: মো’
জেযাগুলোর অধিক সংখ্যার কারণে এই অধ্যায়ে
সবগুলো তালিকাবদ্ধকরা অসম্ভব; আর বাস্তবতা
হলো এই যে এগুলোর সবই তাঁর মোবারক
হাতে সংঘটিত হয়েছে, তাঁরঅধিকাংশ হালতে (
অবস্থায়), কেউ তাঁকে প্রশ্ন করুক বা না-ই করুক,
(কিংবা) পরিস্থিতি যা-
ই দাবিকরেছিল (তার পরিপ্রেক্ষিতে)।
এগুলো তাঁর হতবাক করা সর্বাধিক সংখ্যক মো’
জেযা (অলৌকিকত্ব)।
ইমামকাজী আয়ায (রহ:) নিজ ’আশ-
শেফা’ গ্রন্থে বলেন: “মহানবী (দ:)-
এর এলমে গায়ব (অদৃশ্য জ্ঞান) এইসকল মো’
জেযার অন্তর্ভুক্ত যা স্পষ্ট ও নিশ্চিতভাবে
আমাদের জ্ঞাত হয়েছে বিপুল সংখ্যক
বর্ণনাকারীরসাদৃশ্যপূর্ণ অসংখ্য বর্ণনার মানে
দ্বারা।” [নোট-২: ইমাম কাজী আয়ায কৃত ‘শেফা
শরীফ’ (৪১৩-৪১৪পৃষ্ঠা):
“…..গায়বের সাথে তাঁর পরিচয়ের প্রতি
নির্দেশক সাদৃশ্যপূর্ণ মানে’সমূহ।”]
ঈমানদার ও অবিশ্বাসীদের মাঝে গায়েবি
এলমের সাথে রাসূলুল্লাহ (দ:)-
এর পরিচিতি ও তা জানার বিষয়টিএমনই সর্বজনবিদিত এবং
সাধারণভাবে স্বীকৃত ছিল যে তাঁরা একে
অপরকে বলতেন,
“চুপ! আল্লাহরশপথ, তাঁকে জানানোর জন্যে যদি
আমাদের মধ্যে কেউ না-
ও থাকে, তবুও পাথর ও নুড়ি-
ই তাঁকে তাজানিয়ে দেবে।” [নোট-৩: মক্কা
বিজয়ের সময় নবী পাক (দ:) ও হযরত বেলাল (রা
🙂 কাবা শরীফেরঅভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর
‘আত্তাব ইবনে উসায়দ এবং হারিস ইবনে হিশামকে
আবু সুফিয়ান ইবনে হারবএ কথা বলেন।
এই বর্ণনা আল-
কিলাঈ নিজ ‘একতেফা’ (২:২৩০) পুস্তকে উদ্ধৃত
করেন। আল-মাওয়ার্দীতাঁর ‘আলম আল-
নবুওয়া’ (১৬৫ পৃষ্ঠা) কেতাবেও এটি বর্ণনা
করেছেন।] আল-
বুখারী (রহ:) হযরত ইবনেউমর (রা:) হতে
বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“আমরা আমাদের স্ত্রীদের সাথে কথাবার্তা ও
অবকাশকালীনআলাপ থেকে দূরে থাকতাম
পাছে আমাদের ব্যাপারে কোনো ওহী
নাযেল না হয়ে যায় (এই আশংকায়)।
হুযূর পাক (দ:) বেসাল (খোদার সাথে
পরলোকে মিলন)-
প্রাপ্ত হবার পর আমরা আরও খোলাখুলি
আলাপকরতাম।” [নোট-৪: হযরত ইবনে উমর (রা:
) হতে গ্রহণ করে আল-
বুখারী (রহ:), ইবনে মাজাহ (রহ:) ওইমাম আহমদ
ইবনে হাম্বল (রহ:) এটি বর্ণনা করেন।] সাহল
ইবনে সায়াদ আল-সাঈদী থেকে আল-
বায়হাকী বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি যে আমাদের
মধ্যে কেউ কেউনিজের স্ত্রীর সাথে
একই চাদরের নিচে শুয়ে থাকা সত্ত্বেও
কোনো কিছু করা থেকে বিরত ছিলেন এই
ভয়ে যেতাঁদের সম্পর্কে কুরআনের আয়াত
অবতীর্ণ হতে পারে।” [নোট-৫: তাবারানী
নিজ ’আল-
কবীর’ গ্রন্থে(৬:১৯৬ #৫৯৮৫) এটা বর্ণনা
করেন; সহীহ সনদে ইমাম হায়তামীও বর্ণনা
করেন (১০:২৮৪)]
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) বলেন:
আমাদের মাঝে আছেন আল্লাহর নবী, যিনি
কেতাব তেলাওয়াতরত,
যেমন উজ্জ্বল প্রভা ভোরের আকাশকে করে
থাকে আলোকিত,
তিনি আমাদের পথপ্রদর্শন করেছেন অন্ধত্ব থেকে
করে মুক্ত,
আর তাই আমাদের অন্তর নিশ্চিত জানে তিনি যা বলেন তা
ঘটবে সত্য ।।
[নোট-৬:হযরত আবু হুরায়রা (রা:) হতে ইমাম
বুখারী (রহ:) এটি বর্ণনা করেন তাঁর ‘আল-
তারিখ আল-সগীর’ (১:২৩) কেতাবে এবং আত-
তাবারানী নিজ ‘আল-আহাদ আল-
মাসানী’ (৪:৩৮) গ্রন্থে। আল-
কুরতুবী (১৪:১০০) ও ইবনে কাসির (৩:৪৬০)
তাঁদের তাফসীর কেতাবগুলোতে এই বর্ণনা
লিপিবদ্ধকরেছেন।]
আর হযরত হাসান ইবনে সাবেত (রা:) বলেন:
এক নবী যিনি তাঁর চারপাশে প্রত্যক্ষ করেন যা অন্যরা
দেখতে পায় না,
প্রতিটি সমাবেশে যিনি আল্লাহর কেতাব করেন বর্ণনা,
তিনি যদি আগাম বলেন অনাগত কোনো দিনের ঘটনা,
তবে তা সত্য হবে পরদিন নয়তো
তারও পরের দিন, সন্দেহ বিনা ।।
[নোট-৭: হিশাম ইবনে হুবাইশ থেকে গ্রহণ
করে এটি বর্ণনা করেছেন আত-
তাবারানী নিজ ‘আল-
কবীর’ (৪:৪৮-৫০) গ্রন্থে; নিজের সনদকে
সহীহ ঘোষণা করে আল-
হাকিম (৩:৯-১০); ইবনে আবদ আল-বাররতাঁর ’আল-
এসতিয়াব’ (৪:১৯৫৮-১৯৬২) কেতাবে; আল-
তায়মী নিজ ‘দালাইল আল-
নবুওয়াহ’ (পৃষ্ঠা৫৯-৬০) গ্রন্থে; এবং আল-
লালিকাঈ তাঁর শরাহ-এ।
এছাড়া, এটি লিপিবদ্ধ আছে ‘উসূলে এ’তেকাদে
আহলেসুন্নাহ’ (৪:৭৮০) পুস্তকে। আত-
তাবারীর ‘তাফসীর’ (১:৪৪৭-৪৪৮), ইবনে
হিব্বানের ‘আল-সিকাত’ (১:১২৮) ও আল-কিলাঈ-
এর ‘আল-
একতেফা’ (১:৩৪৩) গ্রন্থগুলোতেও এটি বর্ণিত
হয়েছে। আবু মা’আদআল-
খুযযা হতে ইবনে সায়াদ (১:২৩০-২৩২)-
ও এটি বর্ণনা করেন, তবে এটি মুরসাল এবং আবু মা’
আদএকজন তাবেয়ী, যা ইমাম ইবনে হাজর
স্বরচিত ’আল-
এসাবা’ (#১০৫৪৫) গ্রন্থে ব্যক্ত করেছেন।]
‘তাকভিয়াতুল ঈমান’ বইটির লেখক দাবি করেছিল
মহানবী (দ:) পরের দিন কী ঘটবে তা
জানতেন না,কেননা তিনি এক মেয়েকে থামিয়ে
দিয়েছিলেন এ কথা বলে “এই বিষয়টি বাদ দাও”
যখনই সে আবৃত্তিকরেছিল “আমাদের মাঝে
এক নবী (দ:) আছেন যিনি আগামীকাল কী
হবে তা জানেন”; ওই লেখকের এইঅদ্ভূত
দাবিকে ওপরে উল্লেখিত ৪ লাইনের পদ্য
দুটো নাকচ করে দিয়েছে।
[নোট-৮: রুবাইয়্যে বিনতেমুওয়াব্বেয (রা:)
হতে আল-
বুখারী; এবং সুনান ও ইমাম আহমদ বর্ণিত।] হুযূর
পাক (দ:)-
এর ওইমেয়েকে নিষেধ করার মানে এই নয়
যে তিনি গায়ব জানতেন না, বরং এ বিষয়টি সাবেত বা
প্রমাণিত যেআল্লাহ “অদৃশ্যের জ্ঞাতা, সুতরাং
আপন অদৃশ্যের ওপর কাউকে ক্ষমতাবান করেন
না আপন মনোনীতরাসূলগণ ছাড়া” (সূরা জ্বিন, ২৬
-২৭ আয়াত) এবং তিনি রাসূলুল্লাহ (দ:)-
এর কাছে শেষ বিচার দিবস অবধিএবং তারও পরের
ঘটনাগুলোর ভবিষ্যত জ্ঞান প্রকাশ করেছেন।
আসলে নবী পাক (দ:) ওই মেয়েকে এ
কখাবলাতে বাদ সেধেছিলেন এই কারণে যে
এলমে গায়ব তাঁর প্রতি স্বকীয় পর্যায়ে
আরোপ করা হয়েছিল, আরএই স্বকীয়তা
একমাত্র আল্লাহরই।
[নোট-৯: ইমাম ইবনে হাজর (রহ:)-
এর ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে উদ্ধৃততাঁর ব্যাখ্যা
দ্রষ্টব্য] ওই মেয়ে এমনই ছোট ছিল যে তার
নামায পড়ার বয়সও হয় নি।
[নোট-১০: আবুদাউদের ‘সুনান’-
এর ওপর ইবনুল কাইয়েমের হাশিয়া বা টীকা
দ্রষ্টব্য] তার কাছ থেকে এ রকম দাবিকরাটা (ওই
সময়কার) জনপ্রিয় বিশ্বাসের ইঙ্গিতবহ ছিল, যা
নবী (দ:)-এর জন্যে বেমানান হলেও দৈবজ্ঞ,
জ্যোতিষী, গণক গংদের এ মর্মে মিথ্যা দাবির
প্রতিনিধিত্বকারী ছিল যে তারা নিজেদের
ক্ষমতাবলে ভবিষ্যতজানতে পারতো; এরই
পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহতা’লা ঘোষণা করেছেন
: “কোনো আত্মা জানে না যে কাল
কীউপার্জন করবে” (সূরা লোকমান, ৩৪ আয়াত)
। তাই মহানবী (দ:) একটি বর্ণনায় আরও ব্যাখ্যা
করেবলেন, “শুধু আল্লাহ-
ই জানেন আগামীকাল কী ঘটবে।” [নোট-
১১: ইবনে মাজাহ বিশুদ্ধ সনদে] অর্থাৎ,তিনি
স্বকীয় এবং পরিপূর্ণভাবে জানেন।
[২]
ইমাম আহমদ (রহ:) ও আত্ তাবারানী (রহ:) হযরত
আবু যর গিফারী (রা:) হতে বর্ণনা করেন,
তিনিবলেন:
“মহানবী (দ:) যখন আমাদের ছেড়ে যান (
পরলোক গমন করেন), তখন উড়তে সক্ষম
এমন কোনোপাখি ছিল না যার সম্পর্কে তিনি
আমাদের জানান নি।” [নোট-১: এটি বর্ণনা
করেছেন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীহতে
আত্ তাবারানী নিজ আল-
কবীর (২:১৫৫ #১৬৪৭) কেতাবে, যার বরাত ইমাম
ইবনে হাজর হায়তামী(৮:২৬৩-২৬৪); এছাড়াও ইমাম
আহমদ (রহ:), আবু দাউদ (রহ:), আত্ তায়ালিসী,
ইবনে সা’আদ তাঁর’তাবাকাত’ (২:৩৫৪) পুস্তকে,
আল-
বাযযার নিজ ‘মুসনাদ’ (৯:৩৪১ #৩৮৯৭) গ্রন্থে, আত্
তাবারী স্বরচিততাফসীর কেতাবে (৭:১৮৯),
ইবনে আবদ আল-বারর তাঁর ‘আল-
এসতিয়াব’ পুস্তকে (৪:১৬৫৫), ইবনেহিব্বান (১:
২৬৭ #৬৫ এসনাদ সহীহ), এবং আদ্ দারু কুতনী
নিজ ‘এলাল’ কেতাবে (৬:২৯০ #১১৪৮)।
এর উদ্ধৃতি আছে আল্ হায়তামী (রহ:),
‘মাওয়ারিদ আল-যামান’ (৪৭ পৃষ্ঠা) গ্রন্থে।
এটি হযরত আবু আল-
দারদা (রা:) হতে বর্ণনা করেছেন আবু এয়ালা তাঁর ‘
মুসনাদ’ পুস্তকে (৯:৪৬ #৫১০৯ এসনাদ সহীহ)।]
ইমাম মুসলিম (রহ:) হযরত ‘আমর ইবনে আখতাব (
আবু যায়দ) আল-
আনসারী (রা:) হতে বর্ণনা করেন,তিনি বলেন:
“মহানবী (দ:) আমাদের সাথে ফজরের নামায
আদায় করেন; অতঃপর তিনি মিম্বরে
আরোহণকরেন এবং আমাদের উদ্দেশ্যে
বক্তব্য রাখেন, যতোক্ষণ না যোহরের
নামাযের সময় হয়; তিনি মিম্বর হতেঅবতরণ করে
নামায আদায় করেন এবং নামাযশেষে আবার তাতে
উঠে আমাদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন।
ইতোমধ্যে আসরের নামাযের সময় হয় এবং
তিনি মিম্বর হতে অবতরণ করে নামায আদায়
করেন; অতঃপরতিনি নামাযশেষে আবারও মিম্বরে
আরোহণ করেন এবং সূর্যাস্ত পর্যন্ত তাঁর বয়ান
রাখেন।
পুনরুত্থান দিবসপর্যন্ত যা যা ঘটবে, তার সবই তিনি
আমাদের বলেন। আমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি-
ই সবচেয়ে জ্ঞানী যিনি এরঅধিকাংশ মনে
রাখতে পেরেছিলেন।” [নোট-২: ইমাম
মুসলিম ও ইমাম আহমদ বর্ণিত]
আল-
বুখারী ও মুসলিম হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা:)
হতে রওয়ায়াত করেন, তিনি বলেন:
“রাসূলুল্লাহ (দ:) আমদের মাঝে দীর্ঘক্ষণ
দাঁড়িয়ে (কথা বল)-
ছিলেন; আর তিনি ওই সময় থেকে (পৃথিবীর)
শেষ সময় পর্যন্ত যা যা ঘটবে তার
কোনোটাই বাদ দেন নি, সবই আমাদের
বলেছেন।
যাঁরা তা মনে রাখতেপেরেছেন, মনে
রেখেছেন এবং যাঁরা ভুলে গিয়েছেন, তাঁরা
ভুলেই গিয়েছেন।
যাঁরা ওখানে উপস্থিত ছিলেন,তাঁরা সবাই এটা
জানেন।
আমি হয়তো ওর কিছু কিছু ভুলে গিয়ে থাকতে
পারি; কিন্তু যখনই তা ঘটে তখনইআমার মনে
পড়ে যায়, যেমনিভাবে কেউ এমন কোনো
ব্যক্তিকে মনে রাখেন যিনি দূরে কোথাও
ছিলেন,অথচ তিনি ফিরে আসার পরপরই তাঁকে
চেনতে পারেন।” [নোট-৩: হযরত হুযায়ফা (রা:
) হতে ইমামআল-
বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম
আহমদ বর্ণিত; হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:)
হতে ইমাম তিরমিযী ও ইমাম আহমদও বর্ণনা
করেছেন এটি। আল-
বুখারী হযরত উমর (রা:) হতেওঅনুরূপ একটি
বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন।]
ইমাম মুসলিম হযরত হুযায়ফা (রা:)-
এর কথা উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন:
“রাসূলে খোদা (দ:) আমাকেকেয়ামত দিবস
পর্যন্ত যা যা ঘটবে, তার সবই বলেছেন এবং
এমন কোনো কিছু বাকি ছিল না যে
সম্পর্কেআমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি নি; শুধু আমি
এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করি নি মদীনাবাসীর
মদীনা থেকে বের হবারকারণ কী হবে?” [
নোট-৪: হযরত হুযায়ফা (রা:) হতে ইমাম মুসলিম ও
ইমাম আহমদ বর্ণিত যা’তেনিম্নের বাক্যটি সংযুক্ত
– “শেষ মুহূর্ত অবধি”।]
আবু দাউদ (রহ:) হযরত হুযায়ফা (রা:) থেকে আরও
বর্ণনা করেন যে তিনি বলেন:
“আল্লাহর শপথ! আমিজানি না আমার সাথীবৃন্দ (
অন্যান্য সাহাবী) ভুলে গিয়েছেন না ভুলে
যাওয়ার ভান করছেন [নোট-৫:
ফিতনাপ্রতিরোধের বিষয়টি; মোল্লা কারী নিজ ‘
শরহে শেফা’ পুস্তকে বলেন:
‘আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দেয়ারব্যাপারটি],
কিন্তু রাসূলুল্লাহ (দ:) দুনিয়ার শেষ সময় অবধি
যতো ফিতনা সংঘটনকারীর আবির্ভাব হবেতাদের
কারোর নামই বাদ দেন নি; এদের
প্রত্যেকেরই ন্যূনতম তিন’শ অনুসারী হবে।
মহানবী (দ:) তাদেরপ্রত্যেকের নাম, তাদের
বাবার নাম ও গোত্রের নাম আমাদের
জানিয়েছেন।” [নোট-৬: হযরত হুযায়ফা
হতেআবু দাউদ বর্ণিত।]
হযরত আনাস (রা:) হতে আবু এয়ালা সহীহ সনদে
রওয়ায়াত করেন যে তিনি বলেন:
“মহানবী (দ:) না-
রাজি হালতে বের হয়ে এলেন এবং সবার
উদ্দেশ্যে বল্লেন,
‘আজ তোমরা আমাকে কোনো বিষয়ে
জিজ্ঞেসকরবে না, শুধু আমি তোমাদের এই
ব্যাপারে বলবো;’ আর আমরা দৃঢ় প্রত্যয়
পোষণ করছিলাম যেজিবরীল (আ:) তাঁর সাথেই
ছিলেন। এমতাবস্থায় হযরত উমর (রা:) বল্লেন,
‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! এই কিছুদিন আগেও আমরা
অজ্ঞতার যুগে বসবাস করতাম।
আপনার কাছে মাফ চাই, আপনি আমাদের (
অজ্ঞতাপ্রকাশ করে) বে-
ইজ্জতীতে ফেলবেন না।
আমাদের ক্ষমা করুন, আর আল্লাহতা’লাও
আপনাকে ক্ষমাকরুন’।” [নোট-৭: হযরত আনাস (
রা:) হতে আবু্ এয়ালা নিজ ’মুসনাদ’ গ্রন্থে (৬:৩৬০
#৩৬৮৯) বর্ণনাকরেছেন।
আর ইমাম হায়তামীর (৭:১৮৮) মতে, এর
বর্ণনাকারীরা আল-
বুখারী ও মুসলিমেরই বর্ণনাকারী।
এই দুই ইমামের ’সহিহাইনে’ একটি দীর্ঘতর
বর্ণনা সংযুক্ত রয়েছে।
‘আর আল্লাহতা’লাও আপনাকে মাফকরুন’, হযরত
উমর (রা:)-
এর এই বাক্যটি কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা ব্যক্ত করে।
]
হযরত উমর (রা:) থেকে আবু এয়ালা গ্রহণযোগ্য
সনদে রওয়ায়াত করেন; তিনি বলেন:
“আমি রাসূলুল্লাহ(দ:)-কে বলতে শুনেছি,
‘কুরাইশের এই গোত্র (হাই্য) ততোক্ষণ
নিরাপদ থাকবে যতোক্ষণ না তারা ধর্মথেকে
সরে মুরতাদ হয়ে যাবে।’ এক ব্যক্তি উঠে
দাঁড়িয়ে বলে,
‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমি কি জান্নাতেযাবো, না
জাহান্নামে?’ হুযূর পূর নূর (দ:) বলেন,
‘বেহেশ্তে।’ আরেক ব্যক্তি উঠে একই
প্রশ্ন করলে তিনিউত্তর দেন,
‘দোযখে।’ অতঃপর তিনি এরশাদ ফরমান,
‘আমি তোমাদের কিছু না বলা পর্যন্ত
তোমরাআমাকে কিছু বলো না। ভয়-
ভীতির কারণ না হলে তোমরা একে অপরের
দাফন বন্ধ করে দিতে (লাওলাআন লা তাদাফানূ);
আমার অবশ্যই তোমাদেরকে বলা উচিত যে
বিপুল সংখ্যক লোক জাহান্নামে যাবে এবংতারা কারা
তা তোমরা জানবে।
আমাকে যদি এ ব্যাপারে আদেশ দেয়া হয়,
তবে আমি তা নিশ্চয় পালনকরবো’।” [নোট-৮:
হযরত ইবনে উমর (রা:) হতে আবু
এয়ালা এটা বর্ণনা করেছেন তাঁর
‘মুসনাদ’ গ্রন্থে(১০:৬৬ #৫৭০২); এবং দীর্ঘতর
বর্ণনায় লিপিবদ্ধ করেছেন ইবনে আবি হাতিম নিজ
‘এলাল’ পুস্তকে(২:২৫৬ #২২৬২)।]
[৩]
মহানবী (দ -এর কতিপয় সাহাবীর ব্যাপারে
তাঁর ব্যক্ত এলমে গায়ব
হযরত আবু বকর (রা
আল-
বুখারী (রহ:) ও মুসলিম (রহ:) হযরত আয়েশা (রা:)
থেকে বর্ণনা করেন যে হুযূর পূর নূর (দ:)
তাঁকেবলেন:
“তোমার বাবা ও ভাই (আবদুর রহমান)-
কে এখানে ডাকো যাতে আমি কিছু একটা লিখে
দিতেপারি, কেননা, আমি আশংকা করি যে কেউ
হয়তো কোনো দাবি উত্থাপন অথবা
কোনো উচ্চাভিলাষ পোষণকরতে পারে; আর
যাতে (ওই লেখার দরুণ) আল্লাহ ও ঈমানদাররা আবু
বকর (রা:) ছাড়া অন্য কাউকেপ্রত্যাখ্যান করতে
পারেন।” [নোট-১: মহানবী (দ:)-
এর পবিত্র হায়াতে জিন্দেগীর শেষ
দিনগুলোতে ব্যক্তহাদীস।
এটি হযরত আয়েশা (রা:)-
এর কাছ থেকে ইমাম মুসলিম (রহ:), ইমাম আবু
দাউদ (রহ:) ওইমাম আহমদ (রহ:) বর্ণনা
করেছেন।]
আল-
হাকিম সহীহ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে হযরত
ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণনা করেন যে
রাসূলুল্লাহ (দ:)এরশাদ ফরমান:
“জান্নাতের বাসিন্দা এক ব্যক্তি এখনি তোমাদের
সামনে দৃশ্যমান হতে যাচ্ছেন।” অতঃপরহযরত
আবু বকর (রা:) আগমন করেন এবং তাঁদের মাঝে
বসেন।
[নোট-২: হযরত ইবনে মাসউদ (রা:)থেকে
ইমাম তিরমিযী (গরিব হিসেবে) এবং আল-
হাকিম (৩:১৩৬=১৯৯০ সংস্করণ ৩:১৪৬) এটাকে
সহীহসনদ ঘোষণা করে বর্ণনা করেছেন।
অনুরূপ বর্ণনায় এর সমর্থন পাওয়া যায় –
(১) হযরত জাবের (রা:) হতেচারটি সহীহ সনদে
ইমাম আহমদ (রহ:); ইমাম তাবারানী – দেখুন আল-
হায়তামী (৯:৫৭-৫৮;৯:১১৬-১১৭); বেশ কয়েকটি
সনদে ’আল-
আওসাত’ পুস্তকে (৭:১১০ #৭০০২; ৮:৪১ #৭৮৯৭);
‘মুসনাদ আল-শামিয়্যীন’ (১:৩৭৫ #৬৫১); ‘আল-
মু’জাম আল-কবীর’ (১০:১৬৭ #১০৩৪৩); আল-
হারিস নিজ ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে (২:৮৮৯ #৯৬১); আল-
তায়ালিসী তাঁর ‘মুসনাদ’ কেতাবে (পৃষ্ঠা ২৩৪ #
১৬৭৪);ইবনে আবি আসিম নিজ ‘আল-
সুন্নাহ’ পুস্তকে (২:৬২৪ #১৪৫৩); ইমাম আহমদ (
রহ:) স্বরচিত‘ফাযাইলুস্ সাহাবা’ বইয়ে (১:২০৯ #২৩৩;
২:৫৭৭ #৯৭৭) এবং আল-মুহিব্বুল তাবারী তাঁর ’আল-
রিয়াদুন্ নাদিরা’ গ্রন্থে (১:৩০১ #১৪৬);
(২) হযরত আবু মাসউদ (রা:) হতে ইমাম তাবারানী
আপন ‘আল-
মু’জামুল কবীর’ কেতাবে (১৭:২৫০ #৬৯৫); এবং (
৩) হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে ইমাম
আহমদইবনে হাম্বল (রহ:) তাঁর ‘ফযাইলুস্ সাহাবা’
গ্রন্থে (১:১০৪ #৭৬)।
শেষোক্ত বই ও তিরমিযীতে আরওবর্ণিত
আছে,
“অতঃপর মহানবী (দ:) ওই একই কথা আবার বলেন
এবং হযরত উমর (রা:) আগমনকরেন; সকল
বর্ণনাকারী এই ক্রমানুসারে হযরত আলী (ক:)-
কে তৃতীয় আগমনকারী বল্লেও
ইমামতাবারানী একটি বর্ণনায় হযরত উসমান (রা:)-
এর নাম উল্লেখ করেছেন, যদিও তাঁর অন্যান্য
সব বর্ণনায়শুধু হযরত আলী (ক:)-
এর নামই এসেছে; দেখুন –
হযরত ইবনে মাসউদ (রা:)-এর সূত্রে ‘আল-
মু’জামুলকবীর’ (১০:১৬৬-১৬৭ #১০৩৪২,
#১০৩৪৪), উম্মে মারসাদ হতে ‘আল-
আহাদ ওয়াল মাসানী (৬:২৩৪#৩৪৬৭) এবং ’আল-
কবীর’ (২৪:৩০১ #৭৬৪); দেখুন –
ইবনে আব্দিল বারর, ’আল-
এস্তিয়াব’ (৪:১৯৫৭#৪২০৯), এবং হযরত জাবের (রা:)
থেকে ইমাম আহমদ (রহ:)-
এর ‘ফযাইলে সাহাবা’ (২:৬০৮#১০৩৮);
শেষোক্ত বইয়ে (১:৪৫৪ #৭৩২) হযরত
ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে একটি বর্ণনায় শুধু
হযরতউসমান (রা:)-
এর নাম উল্লেখিত হয়েছে, দেখুন-‘কানযুল
উম্মাল’ (#৩৬২১১)।
নবী পাক (দ:) বেহেশতীহিসেবে আরও
যাঁদের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁরা হলেন, দশ
জন বেহেশতী সাহাবী; হযরত আবদুল্লাহ
ইবনেসালাম (রা:); বদরের যুদ্ধে
অংশগ্রহণকারী সাহাবাবৃন্দ; সুনির্দিষ্ট কয়েকজন
যেমন হযরত আম্মার ইবনেইয়াসের (রা:);
হোদায়বিয়াতে প্রতিশ্রুতি প্রদানকারীগণ; হযরত
জাফর ইবনে তাইয়ার (রা:); হযরত বেলালইবনে
রাবাহ (রা:); ইসলামের পাঁচ স্তম্ভে কোনো
কিছু যোগ না করার বা তা থেকে কোনো কিছু
বাদ নাদেয়ার অঙ্গীকারকারী এক বেদুঈন; হিংসা
থেকে মুক্ত আনসার সাহাবী; ইমাম হুসাইন
ইবনে আলী (রা:) ওতাঁর ভাই ইমাম হাসান (রা:);
হযরত সাবেত ইবনে কায়েস (রা:); হযরত
মালেক (রা:); হযরত আবু সাঈদখুদরী (রহ:)-
এর সম্মানিত পিতা; হযরত মুআবিয়া (’আল-
ফেরদৌস’ ৫:৪৮২ #৮৮৩০ এবং ‘মিযানুলএ’তেদাল’ ২:
২৪৩, ৪:৩৫৯); হযরত হেলাল হাবাশী (মওলা আল-
মুগিরাহ ইবনে শু’বা হতে ‘আল-
এসাবা’৬:৫৫০ #৮৯৯৬, দেখুন – ‘নওয়াদিরুল উসূল’
#১২৩ এবং ‘হিলইয়াত আল-
আউলিয়া’ ১৯৮৫ সংস্করণ২:৮১, শেষোক্ত বইয়ে
হযরত উয়াইস করনীর নামও উল্লেখিত
হয়েছে); হযরত জারির (’নওয়াদির’
#১২৮); হযরত শারিক ইবনে খুবাশা আল-
নুমাইরী (এসাবা ৩:৩৮৪ #৩৯৮৭); এবং আল-
দাহহাক ইবনেখলীফা আল-
আনসারী (প্রাগুক্ত ’নওয়াদির’ ৩:৪৭৫ #৪১৬৬)।] এ
ঘটনার আগে মহানবী (দ:) ইতোমধ্যেইহযরত
আবু বকর (রা:)-
কে বেহেশতী হবার সুসংবাদ দিয়েছিলেন
যখন তিনি এরশাদ করেছিলেন:
“আবুবকর জান্নাতী, উমরও তাই, উসমানও,
আলীও; তালহা, যুবাইর (ইবনে আওয়াম), আবদুর
রহমান ইবনেআউফ, সা’আদ (ইবনে আবি ওয়াক্কাস
), সাঈদ (ইবনে যায়দ ইবনে আমর) এবং আবু উবায়দা
ইবনেজাররাহ সবাই জান্নাতী।” [নোট-৩:
হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রহ:) ও হযরত
সাঈদ ইবনেযায়দ (রা:) হতে ’সুনান’ ও ইমাম
আহমদে বর্ণিত।]
হযরত আবু বকর (রা ও হযরত উমর (রা
হযরত হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান (রা:) থেকে ইমাম
ইবনে মাজাহ (রহ:) ও আল-
হাকিম বর্ণনা করেন যেরাসূলে খোদা (দ:)
এরশাদ ফরমান:
“আমার (প্রকাশ্য জিন্দেগীর) পরে আসা দু’জন
– আবু বকর ওউমরকে তোমরা তোমাদের
খলীফা হিসেবে মান্য করবে।” [নোট-৪: এটা
একটা দীর্ঘতর হাদীসের অংশ যাহযরত হুযায়ফা (
রা:) থেকে ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেছেন (
হাসান গরিব হিসেবে); ইমাম আহমদ তাঁরকৃত ’মুসনাদ
’ কেতাবে যা আল-
যাইনের মতে সহীহ সনদে (১৬:৬১১ #২৩২৭৯
), এবং ইমাম আহমদের’ফযাইলে সাহাবা’ গ্রন্থেও (
১:১৮৭); বেশ কয়েকটি সহীহ ও নির্ভরযোগ্য
সনদে ইমাম তাহাভী এটা বর্ণনাকরেছেন যা
উদ্ধৃত হয়েছে আল-আরনা’ওত-
এর ‘শরহে মুশকিল আল-
আসার’ পুস্তকে (৩:২৫৬-২৫৭#১২২৪-১২২৬, ৩:
২৫৯ #১২৩৩); ইবনে আবি শায়বা (১২:১১); আল-
হাকিম (৩:৭৫-৭৬=১১৯০সংস্করণ ৩:৭৯-৮০) তিনটি
সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন যা তাঁর দ্বারা এবং
আল-
যাহাবী কর্তৃক নির্ভরযোগ্যবলে সমর্থিত; আর
ওই তিনটি রওয়ায়াতের সমর্থন রয়েছে আল-
বায়হাকীর ’সুনানে কুবরা’ (৮:১৫৩#১৬৩৫২), ’আল-
মাদখাল’ (১২২ পৃষ্ঠা) এবং ‘আল-
এ’তেকাদ’ (৩৪০-৩৪১) গ্রন্থগুলোতে।
ইমাম ইবনেহাজর নিজ ’তালখিস আল-
হাবির’ পুস্তকে (৪:১৯০) এই হাদীসের
সনদগুলোকে নির্ভুল ও
নির্ভরযোগ্যহিসেবে স্বীকৃত বলে
জানিয়েছেন।]
হযরত আবু বকর (রা , হযরত উমর (রা
ও হযরত উসমান (রা
আবু নুয়াইম, আল-
বাযযার, আবু ইয়ালা ও ইবনে আবি খায়সামা হযরত
আনাস (রা:) থেকে বর্ণনা করেন,যিনি বলেন:
“আমি এক ঘের দেয়া বাগানে মহানবী (দ:)-
এর সাহচর্যে ছিলাম।
এমন সময় কেউ একজনএসে ফটকে টোকা
দেন। হুযূর পাক (দ:) বল্লেন,
‘আনাস, ওনাকে প্রবেশ করতে দাও; তাঁকে
বেহেশতেরসুসংবাদ দাও এবং বলো যে তিনি
আমার উত্তরাধিকারী হবেন।’ আর দেখো, ইনি
হযরত আবু বকর (রা:)।
অতঃপর আরেক ব্যক্তি এসে দরজায় টোকা
দিলে রাসূলে আকরাম (দ:) বল্লেন,
’এনাকেও প্রবেশ করতেদাও; তাঁকে
বেহেশতের সুসংবাদ দাও এবং বলো যে আবু
বকরের পরে তিনি-
ই হবেন আমারউত্তরাধিকারী।’ আর দেখো,
ইনি হযরত উমর (রা:)।
এর পর আরও একজন এসে দরজায় কড়া নাড়েন।
এবার নবী করীম (দ:) বল্লেন,
‘একেও প্রবেশ করতে দাও; তাকে
বেহেশতের সুসংবাদ দাও এবং বলো যেসে
উমরের পরে আমার উত্তরাধিকারী হবে;
তাকে আরও জানাবে যে সে শহীদ হবে।’
আর দেখো, ইনিহযরত উসমান (রা:)।” [নোট-৫
: হযরত আনাস (রা:) থেকে আবু এয়ালা তাঁর ‘মু’জাম’
কেতাবে(১:১৭৮), ইবনে আবি আসিম স্বরচিত ‘
আস-
সুন্নাহ’ পুস্তকে (২:৫৫৭), ইবনে আদি নিজ ‘আল-
কামিল’গ্রন্থে (৪:৯১); আর আল-
খতীব তাঁর ‘তারিখে বাগদাদ’ বইয়ে (৯:৩৩৯),
আল-
বাযযার ও ইবনে আসাকিরখুব দুর্বল সনদে এটি
বর্ণনা করেছেন, কেননা, ইবনে হাজর
হায়তামী (রহ:) এর এক রাবী বা বর্ণনাকারীকে‘
মিথ্যাবাদী’ বলেছেন।
তবে এই রওয়ায়াত স্বতন্ত্রভাবে সমর্থিত
হয়েছে।]
হযরত সাফিনা (রা:) থেকে আল-
হাকিম সহীহ হিসেবে ঘোষণা করে বর্ণনা
করেন, এবং আল-
বায়হাকীওতা রওয়ায়াত করেন যে তিনি (সাফিনা)
বলেন:
“মহানবী (দ:) কর্তৃক {মদীনার} মসজিদ
নির্মাণকালেহযরত আবু বকর (রা:) একটি পাথর এনে
সেখানে নামিয়ে রাখেন; অতঃপর হযরত উমর (রা
:)-
ও একটিপাথর এনে রাখেন; এরপর হযরত উসমান (রা
🙂 আরেকটি পাথর এনে সেখানে নামিয়ে
রাখেন।
এমতাবস্থায়রাসূলে পাক (দ:) এরশাদ ফরমান:
‘এঁরাই আমার (বেসালের) পরে শাসন করবেন’।”
[নোট-৬: হযরতসাফিনা (রা:) থেকে আল-
হাকিম (৩:১৩=১৯৯০ সংস্করণের ৩:১৪), নুয়াইম
ইবনে হাম্মাদের ‘ফিতান’পুস্তকে, আল-
বায়হাকী নিজ ’দালাইল’ গ্রন্থে এবং ইবনে
আসাকিরও এটি বর্ণনা করেছেন; হযরত আয়েশা(
রা:) থেকেও বর্ণনা করেন আল-
হাকিম (৩:৯৬-৯৭=১৯৯০ সংস্করণের ৩:১০৩)।] এই
বর্ণনাতে তিনজনখলীফার উত্তরাধিকারের
ক্রমের প্রতি ইশারা আছে –
আল্লাহ তাঁদের প্রতি রাজি হোন! বাস্তবিকই
অন্যান্যকয়েকটি বর্ণনায় স্পষ্টভাবে রাসূলুল্লাহ (দ
:)-
কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল এবং তিনি
উত্তরদিয়েছিলেন,
“এঁরাই হলেন আমার (বেসালের) পরে
উত্তরাধিকারী।” আরেকটি রওয়ায়াতে এসেছে
এভাবে,
“আমার (বেসালের) পরে এঁরাই হবেন শাসক।”
ইমাম আবু যুরা’য়া (আল-ইরাকী) বলেন,
“এর সনদ ক্ষতিথেকে মুক্ত, আর আল-
হাকিম তাঁর ’মুস্তাদরাক’ কেতাবে এটি বর্ণনা
করেছেন এবং এটিকে সহীহবলেছেন।” [
নোট-৭: তবে আল-
বুখারী এই বর্ণনাকে ‘মুনকার’ (ব্যবহারের
অযোগ্য) বলেছেন; দেখুন –
ইবনে আদি কৃত ‘আল-
কামিল’ (২:৪৪০); এ ছাড়াও ‘মুস্তাদরাক’ কেতাবের
হাশিয়া (টীকা)-এ আল-
যাহাবী এটিকে জাল হিসেবে বিবেচনা করেন;
ইবনে কাসির এটিকে ‘গরিব জিদ্দান’ (ভীষণ দুর্বল)
হিসেবেচিহ্নিত করেন নিজ ‘বেদায়া’ পুস্তকে।
আহলে সুন্নাত তথা সুন্নীদের দৃষ্টিভঙ্গি
হলো, মহানবী (দ:) হযরত আবুবকর (রা:)-
কে উত্তরাধিকারী নিয়োগ করেন নি সত্য,
তবে তিনি তাঁকে নামাযে ইমামতী করার নির্দেশ
দিয়েএদিকে ইঙ্গিত করেছেন।]
আল-
বায়হাকী ও আবু নুয়াইম হযরত আবদুল্লাহ ইবনে
আমর ইবনে আল-’আস (রা:) থেকে
বর্ণনাকরেন, যিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (দ:)-
কে বলতে শুনেছি –
‘তোমাদের মধ্যে বারো জন খলীফা
হবেন।
আবু বকর সিদ্দিক আমার (বেসালের) পরে বেশি
দিন (শাসনে) থাকবেন না, অল্প সময় থাকবেন;
কিন্তুআরবদের গুরু নিষ্কলুষ জীবন যাপন
করবেন এবং শাহাদাত বরণ করবেন।’ এমতাবস্থায়
কেউ একজনজিজ্ঞেস করেন,
‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! তিনি কে?’ মহানবী (দ:) জবাব
দেন,
‘উমর ইবনে খাত্তাব।’অতঃপর তিনি হযরত উসমান (রা
:)-এর দিকে ফিরে বলেন,
‘আর তোমার ক্ষেত্রে, তারা (মোনাফেকরা)
বলবে তোমার ওই জামাটি ছুড়ে ফেলে দিতে
যেটা আল্লাহতা’লা তোমার কাছে আমানত
রেখেছেন।
সেইমহান সত্তার শপথ যিনি আমাকে সত্যসহ
পাঠিয়েছেন! অবশ্যঅবশ্যই তুমি তা ছুড়ে
ফেল্লে বেহেশতে প্রবেশকরতে
পারবে না, যতোক্ষণ না সূঁচের ছিদ্র দিয়ে উট
পার হতে পারে’।” [নোট-৮:
এটা বর্ণনা করেছেনহযরত আব্দুল্লাহ ইবনে
আমর ইবনে আস (রা:) হতে আল-
বায়হাকী এবং আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
আওসাত’ (৮:৩১৯ #৮৭৪৯) ও ‘আল-
কবীর’ (১:৫৪ #১২, ১:৯০ #১৪২)
কেতাবগুলোতে। দেখুন – আল-
হায়তামী (৫:১৭৮); এ ছাড়া ভিন্ন এসনাদে (
বর্ণনানুক্রমে) লিপিবদ্ধ হয়েছে ‘আল-
আহাদ ওয়াল মাসানী’পুস্তকে (১:৯৬ #৬৭) যা’তে
হযরত উসমান (রা:)-
এর উল্লেখ নেই; একই ভাবে লেখা আছে
ইবনে আবিআ’সিমের ‘আল-
সুন্নাহ’ গ্রন্থে (২:৫৫৮);
‘আবু বকর সিদ্দিক আমার (বেসালের) পরে বেশি
দিন (শাসনে)থাকবেন না, অল্প সময় থাকবেন’,
এই অংশটিসহ ‘আল-
আহাদ ওয়াল মাসানী’ পুস্তকে (১:৭৩-৭৪ #১৩),
দেখুন –
ইবনে আবি আসিম (২:৫৪৮), ইবনে আল-
জাওযী নিজ ‘সিফাতুস্ সাফওয়া’ গ্রন্থে(১:২৩৫-
২৩৬), আর তাঁর কাছ থেকে আল-
মুহিব্বু আত্ তাবারী ইমাম আয্ যুহরীর বরাতে
মুরসালহিসেবে তাঁর ’আল-রিয়াদ আল-
নাদিরা’ কেতাবে (১:৪০৮ #৩২৯)।
আয্ যাহাবী এটাকে ’সম্পূর্ণ ত্রুটিযুক্ত’ (ওয়াহিন)
বলেছেন তাঁর ’সিয়ার’ গ্রন্থে (৯:১৩৩=আল্
আরনাওত সংস্করণের ১০:৪১১) এবং ‘বাতিল’ (শূন্য)
বলেছেন নিজ ‘মিযান’ পুস্তকে (৪:৪৪৩),
দেখুন –
ইবনে আদি কৃত ‘কামিল’ (৪:২০৭), ইবনেহিব্বান
প্রণীত ‘আল-মাজরুহিন’ (২:৪২), এবং ইবনে আল-
কায়সারানী রচিত ‘তাযকিরাত আল-
মাওদু’আত’ (#১০৩২)।
শুধু নিচের বর্ণনাটি সহীহ যা’তে বলা হয়েছে
:
“ওহে উসমান! আল্লাহতা’লা হয়তোতোমাকে
একটি জামা আমানতস্বরূপ দিতে পারেন।
মোনাফেকরা সেটা অপসারণ করতে বল্লে তা
সরাবেনা।” হযূর পাক (দ:) তিনবার এ কথা
বলেছিলেন।
বিশুদ্ধ রওয়ায়াতে হযরত আয়েশা (রা:) থেকে
এইহাদীস লিপিবদ্ধ করেছেন আত্ তিরমিযী (
হাসান গরিব), ইবনে হিব্বান, ইমাম আহমদ, ইবনে
মাজাহ ওআল-হাকিম।]
ইবনে আসাকির হযরত আনাস (রা:) থেকে বর্ণনা
করেন, যিনি বলেন:
“বণূ মোস্তালাক্ক (গোত্র)-
এরপ্রতিনিধিবর্গ আমাকে অনুরোধ করে যেন
আমি মহানবী (দ:)-
এর খেদমতে এই মর্মে আর্জি পেশ করি
যেআগামী বছর তারা হুযূর (দ:)-
এর সান্নিধ্যে এসে যদি তাঁকে না পায়, তবে তারা
বাধ্যতামূলক যে সদকাহদিতে হয় তা কার কাছে
পেশ করবে।
আমি তাদের এই সওয়াল রাসূলুল্লাহ (দ:)-
এর কাছে উপস্থাপন করি।তিনি প্রত্যুত্তর দেন,
‘আবু বকরের কাছে তা জমা দিতে বলবে।’ আমি
এ কথা ওই গোত্রের প্রতিনিধিদেরকাছে
জানালে তারা বলে, ‘যদি আবু বকর (রা:)-
কেও না পাই?’ এমতাবস্থায় আমি আবারও বিশ্বনবী
(দ:)-এর খেদমতে এই প্রশ্নটি উত্থাপন করি।
তিনি এবার বলেন,
‘তাহলে উমরের কাছে তা জমা দিতে বলো।’
গোত্র প্রতিনিধিদল আবার প্রশ্ন করে,
‘যদি তাঁকেও আমরা না পাই?’ অতঃপর রাসূলে আকরাম
(দ:) এরশাদফরমান,
‘উসমানের কাছে তা জমা দিতে বলো; আর
তাকে তারা যেদিন শহীদ করবে, সেদিন যেন
তারাধ্বংস হয়ে যায়’!” [নোট-৯: এটি বর্ণনা করেন
হযরত আনাস (রা:) থেকে আবু নুয়াইম নিজ ‘
হিলইয়াতআল-
আউলিয়া’ পুস্তকে (১৯৮৫ সালের সংস্করণের ৮:
৩৫৮) এবং ইবনে আসাকির স্বরচিত ‘
তারিখেদামেশ্ক’ কেতাবে (৩৯:১৭৭)। দেখুন –
‘কানযুল উম্মাল’ (#৩৬৩৩৩)।]
বিশুদ্ধ বর্ণনায় আবু এয়ালা হযরত সাহল (রা:) থেকে
লিপিবদ্ধ করেন যে উহুদ পাহাড়ে যখন রাসূলে
খোদা(দ:), হযরত আবু বকর (রা:), হযরত উমর (রা:
) ও হযরত উসমান (রা:) চড়েছিলেন, তখন তা
কেঁপেউঠেছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে মহানবী
(দ:) এরশাদ ফরমান:
“সুদৃঢ় থাকো, ওহে ওহুদ পাহাড়! তোমাতে
আরকেউই চড়ে নি শুধু একজন নবী (দ:),
একজন সিদ্দিক ও দুইজন শহীদ ছাড়া!” এ ঘটনার
পরে হযরতউমর (রা:) ও হযরত উসমান (রা:)
শহীদ হন এবং হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা:)
স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়বেসালপ্রাপ্ত হন।
[নোট-১০: হযরত আনাস (রা:) হতে আল-
বুখারী, আত্ তিরমিযী (হাসান সহীহ), আবুদাউদ,
আন্ নাসায়ী ও ইমাম আহমদ।]
ইমাম বুখারী ও মুসলিম হযরত আবু মূসা আশ’
আরী (রা:) থেকে বর্ণনা করেন যে নবী
করীম (দ:) আরিসকুয়োর (বাগানের)
অভ্যন্তরে অবস্থান করছিলেন এবং কুয়োর
প্রস্তরনির্মিত সীমায় বসেছিলেন; তাঁর
পরণেরজামা পায়ের গোড়ালির ওপরে ওঠানো
ছিল।
“আমি (মূসা আশআরী) নিজ মনে বল্লাম, আজ
আমি-ই হবোমহানবী (দ:)-এর দরজা রক্ষক।
এমতাবস্থায় হযরত আবু বকর (রা:) ওখানে উপস্থিত
হলে আমি তাঁকে‘অপেক্ষা করুন’ বলে হুযূর পূর
নূর (দ:)-কে জানালাম,
‘হযরত আবু বকর (রা:) প্রবেশের
অনুমতিচাইছেন।’ তিনি উত্তরে বল্লেন,
‘তাঁকে (প্রবেশের) অনুমতি ও বেহেশতের
সুসংবাদ দাও।’ অতঃপর হযরতআবু বকর (রা:)
(বাগানে) প্রবেশ করলেন এবং রাসূলুল্লাহ (দ:)-
এর পাশে গিয়ে কুয়োর ধারে বসে পা
দুটোঝুলিয়ে দিলেন।
এরপর হযরত উমর (রা:) ওইখানে এলেন এবং আমি
আবারো আরয করলাম,
‘এবারহযরত উমর (রা:) প্রবেশের অনুমতি
চাচ্ছেন।’ রাসূলে খোদা (দ:) বল্লেন,
‘তাঁকেও অনুমতি ও বেহেশতেরখোশ-
খবরী দাও।’ ফলে তিনিও প্রবেশ করে
মহানবী (দ:) ও হযরত আবু বকর (রা:)-
এর পাশে কুয়োরধারে গিয়ে বসলেন এবং পা
ঝুলিয়ে দিলেন।
এবার এলেন হযরত উসমান (রা:) যার
পরিপ্রেক্ষিতে আমিআবার আরয করলাম,
‘হযরত উসমান (রা:)
(প্রবেশের) অনুমতি চাইছেন।’ মহানবী (দ:)
উত্তর দিলেন,
‘তাকে অনুমতি দাও এবং বলো যে একটি
পরীক্ষাশেষে তার জন্যে বেহেশতের
সুসংবাদ রয়েছে।’ হযরতউসমান প্রবেশ করে
কুয়োর ধারে তাঁদের পাশে বসার কোনো
জায়গা না পেয়ে ওই কুয়োর বিপরীত
কিনারেগিয়ে বসলেন এবং পা ঝুলিয়ে দিলেন।”
সাঈদ ইবনে মুসাইয়েব (রহ:) বলেন,
“আমি এই ঘটনায় তাঁদেররওযা শরীফগুলোর
একটি ইশারা পাই।” [নোট-১২: ইমাম বুখারী ও
মুসলিম রওয়ায়াতকৃত এবং (ইবনেমুসাইয়েবের
মন্তব্য ছাড়া) আত্ তিরমিযী ও ইমাম আহমদও এটি
বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমদ (রহ:)-
এর ভাষ্যগুলোর একটিতে বিবৃত হয়েছে যে
হযরত উসমান (রা:) তাঁর আসনের দিকে হেঁটে
যাবার সময়পড়ছিলেন – আল্লাহুম্মা সাবরান।]
আত্ তাবারানী ও আল-
বায়হাকী হযরত যায়দ ইবনে আরকাম (রা:)
থেকে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন:
“নবী পাক (দ:) আমাকে বাইরে পাঠালেন এ কথা
বলে, ‘আবু বকর (রা:)-
এর সাথে গিয়ে সাক্ষাৎ করো।
তুমি তাকে পাবে নিজ ঘরে কাপড় মুড়িয়ে পা
গুটিয়ে (মোহতাবইয়ান) বসে থাকতে।
তাঁকে বেহেশতেরসুসংবাদ দেবে।
এরপর পাহাড়ে যাবে যতোক্ষণ না তুমি উমর (রা:)

কে খুঁজে পাও খচ্চরের পিঠে এবং তাঁরদীর্ঘকায়
শরীর দূর থেকে দেখা না যায়।
তাঁকেও বেহেশতের সুসংবাদ দেবে।
অতঃপর উসমানের কাছে যাবে,যাকে তুমি পাবে
বাজারে কেনা-
বেচা করতে; তাকেও বেহেশতের খোশ-
খবরী দেবে যা একটি মহা ক্লেশেরপরে
অর্জিত হবে।’ আমি মহানবী (দ:) যেভাবে
বলেছিলেন ঠিক সেই অবস্থাতে তাঁদের
সবাইকে পাই এবংসংবাদ পৌঁছে দেই।” [নোট-১৩:
আরেকটি বিশদ বর্ণনার অংশ হিসেবে হযরত যায়দ
ইবনে আরকাম থেকেআত্ তাবারানী রওয়ায়াত
করেছেন নিজ ‘আল-
আওসাত’ পুস্তকে (১:২৬৬-২৬৭ #৮৬৮); বায়হাকী
তাঁর‘দালাইল’ কেতাবে এবং আয-
যাহাবী নিজ ‘সিয়ার’ বইয়ে এর দুর্বলতা উল্লেখ
করেন।
যদি এটা সত্য হয়,তবে এই ঘটনা সম্ভবত হযরত
আবু মূসা আশআরী (রহ:)-
এর বর্ণিত ঘটনার আগের।
এর জন্যে দেখুনআল-
হায়তামী (৯:৫৫-৫৬) এবং ইবনে কাসীর, আল-
বেদায়া গ্রন্থের দালাইলুন্ নবুওয়ত অনুচ্ছেদ,
‘মহানবী(দ:)-
এর অদৃশ্য ভবিষ্যত জ্ঞান’ শীর্ষক অধ্যায়’।]
হযরত আবু বকর (রা , হযরত উমর (রা
ও হযরত আলী (ক
আল-
হাকিম সহীহ হিসেবে ঘোষণা করে হযরত
জাবের (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন:
“আমিমহানবী (দ:)-
এর সাথে হেঁটে এক মহিলার বাড়িতে যাই যিনি
আমাদের জন্যে একটি ভেড়া জবাই করেন।
ওই সময় হুযূর পাক (দ:) বলেন,
‘দেখো, বেহেশতীদের মধ্য হতে এক
ব্যক্তি এখন প্রবেশ করবেন।’এমতাবস্থায় হযরত
আবু বকর (রা:) সেখানে প্রবেশ করেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (দ:) আবার এরশাদফরমান,
‘দেখো, বেহেশতীদের মধ্য হতে এক
ব্যক্তি এখন প্রবেশ করবেন।’ এবার হযরত উমর
(রা:)প্রবেশ করেন।
নবী পাক (দ:) আবারও বলেন,
‘দেখো, বেহেশতীদের মধ্য হতে এক
ব্যক্তি এখন প্রবেশকরবেন।
এয়া আল্লাহ, আপনি যদি চান, তবে এ যেন আলী
হয়।’ অতঃপর হযরত আলী (ক:)
প্রবেশকরেন।” [নোট-১৪: ওপরে ২ নং
নোট দেখুন]
হযরত আবু বকর, হযরত উমর, হযরত উসমান ও হযরত
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম
ইমাম আহমদ, আল-
বাযযার ও আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
আওসাত’ কেতাবে হযরত জাবের (রা:)
থেকেবর্ণনা করেন, ‍যিনি বলেন:
“রাসূলে পাক (দ:) হযরত সা’আদ ইবনে আল-
রাবী’ (রা:)-কে দেখতে বের হন।
(সেখানে) তিনি বসেন এবং আমরাও বসে পড়ি।
অতঃপর তিনি বলেন,
‘বেহেশতে বসবাসকারীদের মধ্যহতে এক
ব্যক্তি এখন তোমাদের দৃষ্টিগোচর হবেন।’
এমতাবস্থায় হযরত আবু বকর (রা:) তাশরীফ
আনেন।এরপর মহানবী (দ:) বলেন,
‘বেহেশতে বসবাসকারীদের মধ্য হতে এক
ব্যক্তি এখন তোমাদের দৃষ্টিগোচরহবেন।’
এবার হযরত উমর ফারুক (রা:) এলেন।
তিনি আবার বল্লেন,
‘বেহেশতে বসবাসকারীদের মধ্যহতে এক
ব্যক্তি এখন তোমাদের দৃষ্টিগোচর হবে।’
অতঃপর হযরত উসমান (রা:) এলেন।
মহানবী (দ:)আবারও বল্লেন,
‘বেহেশতে বসবাসকারীদের মধ্য হতে এক
ব্যক্তি এখন তোমাদের দৃষ্টিগোচর হবে।
এয়াআল্লাহ, আপনি চাইলে সে যেন আলী
হয়।’ এমতাবস্থায় হযরত আলী (ক:) সেখানে
এলেন।” [নোট-১৫:হযরত জাবের (রা:)
থেকে আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
আওসাত’ গ্রন্থে (৭:১১০ #৭০০২) যা’তে
হযরতআলী (ক:)-এর উল্লেখ নেই; আল-
হায়তামী (৯:৫৭); হযরত উসমান (রা:)-
এর উল্লেখ ছাড়া ‘মুসনাদআল-
শামিয়্যীন’ পুস্তকে (১:৩৭৫ #৬৫১)। দেখুন –
২ নং নোট।]
হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, তালহা
, যুবায়র রাদিয়াল্লাহু আনহুম
ইমাম মুসলিম হযরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে
বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) হেরা পর্বতে
সর্ব-
হযরতআবু বকর, উমর, উসমান, আলী, তালহা ও
যুবায়র রাদিয়াল্লাহু আনহুমের সাথে অবস্থান
করছিলেন যখনপাথর নড়ে ওঠে।
এমতাবস্থায় হুযূর পাক (দ:) ওর উদ্দেশ্যে
বলেন,
“স্থির হও! তোমার ওপরে আর কেউইনেই
একজন পয়গম্বর, একজন সিদ্দিক, কিংবা শহীদান
ছাড়া।” [নোট-১৬: হযরত আবু হোরায়রা (রা:)
থেকে মুসলিম, আত্ তিরমিযী (সহীহ) ও ইমাম
আহমদ বর্ণিত।] বাস্তবিকই হযরত আবু বকর (রা:)
ছাড়াবাকি সবাই শাহাদাত বরণ করেন –
আল্লাহ তাঁদের সবার প্রতি রাজি হোন।
পাহাড়ের কম্পন আবারও (অন্যসময়ে) হয়েছিল
যখন নবী পাক (দ:) অন্য কয়েকজন সাহাবীসহ
সেখানে গিয়েছিলেন।
[৪]
মহানবী (দ -এর কতিপয় সাহাবীর ব্যাপারে
তাঁর ব্যক্ত এলমে গায়ব
হযরত উমর (রা
ইবনে সা’আদ ও ইবনে আবি শায়বা হযরত আবু
আল-আশহাব (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, যিনি (
মদীনারসন্নিকটে) মুযায়না অঞ্চলের এক ব্যক্তি
হতে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) হযরত
উমর (রা:)-
কে কোনোনির্দিষ্ট জামা পরতে দেখে
তাঁকে জিজ্ঞেস করেন:
“এটা কি নতুন, না ইতোমধ্যেই ধোয়া হয়েছে
?” হযরতউমর (রা:) উত্তর দেন:
“এটা ইতোমধ্যেই ধোয়া হয়েছে।”
এমতাবস্থায় মহানবী (দ:) বলেন, “ওহে উমর!
নতুন কাপড়-
চোপড় পরো, অনিন্দনীয় জীবন যাপন
করো, আর শাহাদাত বরণ করো!” এটি মুরসাল
হাদীস।
[নোট-১: ইবনে আবি শায়বা (৮:৪৫৩, ১০:৪০২) ও
ইবনে সা’আদ (৩:৩২৯) কর্তৃক দুর্বল মুরসাল
সনদেবর্ণিত, কেননা হযরত আবু আল-
আশহাব জা’ফর ইবনে হায়্যান আল-
উতারিদী (রা:) ওই সাহাবীর সাক্ষাতপান নি; তবে
আল-দুলাবী (১:১০৯) আল-বুসিরী (রহ:)-
এর ‘মিসবাহ আল-
যুজাজা’ (৪:৮২) বইয়েরভাষ্যমতে আল-
যুহরীর সূত্রে নির্ভরযোগ্য
বর্ণনাকারীদের মুত্তাসিল সনদে এটি বর্ণনা
করেছেন; এঁদেরসবগুলোই আল-
বুখারী ও মুসলিম ব্যবহার করেছেন যা আল-
হায়তামী (৯:৭৩-৭৪)-
এর ভাষ্য দ্বারাসমর্থিত; এই হাদীস বর্ণনা
করেছেন হযরত ইবনে উমর (রা:) থেকে
ইমাম আহমদ তাঁর ’মুসনাদ’(আরনাওত সংস্করণের ৯:
৪৪০-৪৪২ #৫৬২০) এবং ফযায়েলে সাহাবা (১:২৫৫ #
৩২২-৩২৩) গ্রন্থগুলোতে,ইবনে মাজাহ,
ইবনে হিব্বান (আরনাওত সংস্করণের ১৫:৩২০-
৩২২ #৬৮৯৭), আল-
বাযযার (যাওয়াইদ#২৫০৪), আবু এয়ালা তাঁর ’মুসনাদ’
পুস্তকে (#৫৫৪৫), আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
কবীর’ (১২:২৮৩#১৩১২৭) এবং আদ্ দু’আ (পৃষ্ঠা
১৪৩ #৩৯৯) কেতাব দুটোতে, ইবনে আল-
সুন্নী ও আল-নাসাঈ নিজেদের‘আমল আল-
এয়াওম ওয়াল-
লাইলা’ বইগুলোতে (যথাক্রমে #২৬৯ এবং ১:২৭৫
#৩১১), আবু নুয়াইমতাঁর ‘আখবার আসবাহান’ (১:১৩৯),
আল-
আযদী নিজ জামে’ পুস্তকে (১১:২২৩), আবদ্
ইবনে হুমায়দস্বরচিত ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ২৩৮
#৭২৩), ইবনে আবদ্ আল-বারর নিজ ‘আল-
এস্তিয়াব’ কেতাবে(৩:১১৫৭), আল-
বাগাবী তাঁর ‘শরহে সুন্নাহ’ পুস্তকে (১২:৫০ #
৩১১২), এবং আল-
বায়হাকী নিজ ‘শুয়াব’গ্রন্থে; এঁদের সবাই বর্ণনা
করেছেন হযরত আবদুর রাযযাকের (#২০৩৮২)
মাধ্যমে যাঁর সম্পর্কে কোনোকোনো
ইমাম বলেছেন যে আল-
যুহরীর মাধ্যমে এই হাদীস বর্ণনায় তাঁর ভ্রান্তি
ছিল, যা ইবনে রাজাব নিজ‘শরহে এলাল আল-
তিরমিযী’ পুস্তকে (২:৫৮৫) ব্যাখ্যা করেছেন।
এর ফলশ্রুতিতে আল-
বুখারী এটাকে আত্তিরমিযীর ‘এলাল’ (পৃষ্ঠা ৩৭৩
) পুস্তকে ‘লা শাইয়’ তথা অনির্ভরযোগ্য বলেন;
ইবনে আদি নিজ ’আল-কামিল’ কেতাবে (৫:১৯৪৮)
‘মুনকার’ বলেন; আল-নাসাঈ স্বরচিত ‘আমল আল-
এয়াওম ওয়াল-
লায়লা’যেখানে এয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-
কাত্তান (রহ:)-এর উদ্ধৃতি রয়েছে। দেখুন আল-
বায়হাকী প্রণীত ‘আল-সুনান আল-
কুবরা’ (৬:৮৫ #১০১৪৩) এবং ইবনে আবি হাতিম (যিনি ‘
বাতিল’ বলেছেন) কৃত ’আল-এলাল’ (১:৪৯০)।
আত্ তাবারানী (রহ:) আল-
যুহরীর পরিবর্তে আল-
সাওরীর সূত্রে আরেকটি সনদে এইহাদীস
বর্ণনা করেন নিজ ‘আল-
দোয়া’ পুস্তকে (#৪০০)। দেখুন — আল-
হায়তামী, মাওয়ারিদ আল-যামান
(১:৫৩৬ #২৩৮১) এবং হযরত জাবের (রা:)-
এর সূত্রে একটি দুর্বল সনদে আল-
বাযযার এটি বর্ণনা করেননিজ ‘মুসনাদ’ বইয়ে (
যাওয়াইদ #২৫০৩)।
সংক্ষেপে, ইবনে হিব্বান এটাকে মৌলিক তথা
নির্ভরযোগ্যবিবেচনা করেন; আর ইবনে হাজর
তাঁর ‘নাতাইজ আল-
আফকার’ (১:১৩৭-১৩৮) গ্রন্থে সিদ্ধান্ত নেন
যেএটা কমপক্ষে ‘হাসান’ (বিশুদ্ধ), যেমনিভাবে
ইবনে হিব্বানের ’আল-
আরনাওত’ সংস্করণও তাই মনেকরে।]
ইমাম বুখারী ও মুসলিম রওয়ায়াত করেন যে হযরত
উমর ইবনে আল-
খাত্তাব (রা:) একদিন জিজ্ঞেসকরেন:
“তোমাদের মধ্যে কে কে স্মরণ করতে
পারো রাসূলে পাক (দ:) সেই ফিতনা সম্পর্কে
কী বলেছিলেনযা সাগরের ঢেউয়ের মতো
উত্তাল হবে?” হযরত হুযায়ফা (রা:) বলেন,
“এয়া আমিরাল মোমেনীন, আপনারএ
সম্পর্কে চিন্তা করা লাগবে না।
কেননা, আপনার এবং ওই ফিতনার মাঝে একটি দরজা
আছে যা বন্ধ।”আতঃপর হযরত উমর (রা:) বলেন,
“ওই দরজা কি খোলা হবে, না ভেঙ্গে ফেলা
হবে?” হযরত হুযায়ফা(রা:) উত্তর দেন:
“ভাঙ্গা হবে।” এমতাবস্থায় হযরত উমর (রা:) জবাব
দেন:
“দরজা খুলে দেয়ার চেয়েওটাই বেশি যথাযথ।”
পরবর্তীকালে হযরত হুযায়ফা (রা:)-
কে জিজ্ঞেস করা হয় ওই দরজা বা ফটক কে,আর
তিনি উত্তর দেন, “ওই ফটক-
ই হযরত উমর (রা:)।” তাঁকে মানুষেরা আবারো
জিজ্ঞেস করে,
“তিনিকি এটা জানতেন?” উত্তরে হযরত হুযায়ফা (রা:)
বলেন,
“হাঁ, অবশ্যঅবশ্যই দিনের আগে যেমন
রাতঅতিক্রান্ত হয়,
(তেমনি) আমিও তাঁর সাথে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কখা
বলছিলাম।” [নোট-২: হযরত আবুওয়াইল শাকীক
ইবনে সালামা থেকে ইমাম বুখারী ও মুসলিম
বর্ণনা করেন এটি।]
আত্ তাবারানী হযরত ইবনে উমর (রা:) থেকে
বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) একটি প্রাচীর
ঘেরা বাগানেঅবস্থান করছিলেন, যখন হযরত আবু
বকর (রা:) তাতে প্রবেশের অনুমতি প্রার্থনা
করেন। হুযূর পাক (দ:)এরশাদ করেন,
“তাকে প্রবেশের অনুমতি দাও এবং
বেহেশতপ্রাপ্তির সুসংবাদও প্রদান করো।”
এরপরহযরত উমর ফারুক (রা:) ওই বাগানে
প্রবেশের অনুমতি চাইলে তিনি বলেন,
“তাকে প্রবেশের অনুমতিদিয়ে বেহেশত ও
শাহাদাতের সুসংবাদ প্রদান করো।” অতঃপর হযরত
উসমান (রা:) অনুরূপ অনুমতিচাওয়ার পর তিনি আবার
এরশাদ ফরমান,
“তাকেও প্রবেশের অনুমতি দিয়ে বেহেশত
ও শাহাদাতেরসুসংবাদ প্রদান করো।” [নোট-১১:
হযরত ইবনে উমর (রা:) থেকে দুর্বল সনদে
আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
কবীর’ গ্রন্থে (১২:৩২৭); আল-
হায়তামী (৯:৭৩)।]
আল
বাযযার, আত্ তাবারানী ও আবু নুয়াইম হযরত উসমান
ইবনে মাযউন (রা:) থেকে বর্ণনা করেন,
তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (দ:)-
কে হযরত উমর (রা:) প্রসঙ্গে বলতে শুনেছি,
‘এটা গালক্কু আল-ফিতনা (বিবাদ-বিসম্বাদের বজ্র)।
এই ব্যক্তি (অর্থাৎ, হযরত উমর) যতোক্ষণ
তোমাদের মাঝে জীবিত থাকবেন,
ততোক্ষণ তোমাদের এবং ফিতনার মাঝখানে
একটি দরজা শক্তভাবে বন্ধ থাকবে’।” [নোট-৩:
এই হাদীসবর্ণনা করেছেন আত্ তাবারানী তাঁর
‘আল-কবীর’ গ্রন্থে (৯:৩৮ #৮৩২১), আল-
বাযযার, আল-
ওয়াসিতীনিজ ‘তারিখে ওয়াসিত’ বইয়ে (পৃষ্ঠা ২৪৪-
৪৫), এবং দুর্বল সনদে ইবনে কানী’ তাঁর ‘মু’জাম
আল-সাহাবা’কেতাবে (২:২৫৮ #৭৭৪); দেখুন –
আল-
হায়তামী (৯:৭২); তবে এই রওয়ায়াতের বিশুদ্ধতা
সমর্থিতহয়েছে আত্ তাবারানীর ‘আল-
আওসাত’ পুস্তকে বিধৃত বর্ণনায়, যেখানে
ইবনে হাজর (রহ:)-
এর ‘ফাতহুলবারী’ গ্রন্থে (১৯৫৯ সংস্করণের ৬:
৬০৬) উদ্ধৃত তাঁরই মতানুযায়ী নির্ভরযোগ্য
বর্ণনাকারীদের সূত্রে হযরতআবু যর গিফারী (
রা:) হযরত উমর (রা:)-কে ‘ক্কুফল আল-
ফিতনা’ তথা ’বিবাদের জন্যে তালা’ বলেছেন;আল
-হায়তামী (৯:৭৩) অবশ্য এর ব্যতিক্রমস্বরূপ
সন্দেহ করেন যে হযরত হাসান বসরী (রা:) ও
হযরতআবু যর (রা:)-
এর মধ্যে কোনো বর্ণনাকারীর ছেদ
পড়েছে।
একই বর্ণনা হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতেআদ্
দায়লামী নিজ ’আল-
ফেরদৌস’ কেতাবে (১:৪৩৮ #১৭৮৫) উদ্ধৃত
করেছেন।]
আত্ তাবারানী হযরত আবু যর (রা:) হতে আরও
বর্ণনা করেন যে নবী পাক (দ:) বলেন:
“তোমাদেরকেকোনো ফিতনা-
ই ছুঁতে পারবে না যতোক্ষণ এই ব্যক্তি (উমর
ফারুক) তোমাদের মাঝে আছেন।” [নোট-৪:
ক্কুফল বর্ণনার একই সনদে আত্ তাবারানী এটি
বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘আল-
আওসাত’ পুস্তকে(২:২৬৭-২৬৮ #১৯৪৫)।]
একদিন হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা:) শাম (সিরিয়া)
দেশে মানুষের উদ্দেশ্যে বক্তব্য
রাখছিলেন;এমতাবস্থায় এক লোক তাঁকে বলে,
“ফিতনা আবির্ভূত হয়েছে!” হযরত খালেদ (রা:)
উত্তর দেন, “যতোদিনইবনে আল-
খাত্তাব জীবিত আছেন, ততোদিন নয়।
তা শুধু তাঁর সময়ের পরেই হবে।” [নোট-৫:
ইমামআহমদ, আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
কবীর’ কেতাবে (৪:১১৬ #৩৮৪১), নুয়াইম
ইবনে হাম্মাদ তাঁর ‘আল-
ফিতান’ গ্রন্থে (১:৪৫, ১:২৮১ #৮১৯) বর্ণনা
করেছেন; এঁদের সবাই সনদের মধ্যে কায়স
ইবনে খালেদআল-
বাজালী নামের এক অপরিচিত তাবেঈর সূত্রে এটি
বর্ণনা করেন।
তবে এই নিষ্কলুষ তাবেঈ গ্রহণযোগ্যবিধায়
ইবনে হাজর তাঁর ’ফাতহুল বারী’ বইয়ে (১৯৫৯
সংস্করণের ১৩:১৫) এই এসনাদকে ‘হাসান’ (
নির্ভরযোগ্য) হিসেবে চিহ্নিত করেন।
দেখুন আল-হায়তামী (৭:৩০৭-৩০৮) এবং আল-
মোবারকপুরী প্রণীত‘তোহফাত আল-
আহওয়াযী’ (৬:৩৬৮)।] হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদ
(রা:) নিজ মতামত এভাবে ব্যক্ত করার কথা না;
অতএব, দৃশ্যতঃ তিনি মহানবী (দ:)
থেকে এটা শুনেছিলেন, নতুবা এমন কারো কাছ
থেকে শুনেছিলেন যিনি স্বয়ং মহানবী (দ:)
থেকে শুনেছিলেন।
হযরত উসমান (রা
আত্ তাবারানী হযরত যায়দ ইবনে সাবেত (রা:)
থেকে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন যে
মহানবী (দ:)-কে তিনিবলতে শুনেছেন:
“উসমান আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল যখন একজন
ফেরেশতা আমার সাথে ছিল।
ওইফেরেশতা বল্লো,
‘ইনি একজন শহীদ; তাঁর লোকেরা তাঁকে হত্যা
করবে।
সত্যি, তিনি (মহত্ত্বে) আমাদেরকে(অর্থাৎ,
ফেরেশতাকুলকে) লজ্জায় ফেলে
দিয়েছেন’।” [নোট-৬: হযরত যায়দ (রা:)
থেকে আত্ তাবারানীতাঁর ‘আল-
কবীর’ পুস্তকে (৫:১৫৯) বর্ণনা করেছেন;
তবে যে সনদ তিনি পেশ করেছেন, আল-
হায়তামী(৯:৮২)-
এর ভাষ্যানুযায়ী তাতে রাবী (বর্ণনাকারী)
মোহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল আল-
ওয়াসাউইসী একজনজাল হাদীস পরিবেশক।]
আল-
বায়হাকী হযরত আবু হোরায়রা (রা:) থেকে
একটি বর্ণনা, যেটিকে আল-
হাকিম বিশুদ্ধ বলেছেন, তারওয়ায়াত করেন, যা’
তে হযরত উসমান (রা:) যখন তাঁর ঘরে অবরুদ্ধ
ছিলেন তখন হযরত আবু হোরায়রা(রা:) বলেন:
“আমি মহানবী (দ:)-কে বলতে শুনেছি:
‘একটি ফিতনা-
ফাসাদ (ভবিষ্যতে) হবে।’ আমরাবল্লাম,‘এয়া
রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমরা তখন কী করবো বলে
আপনি হুকুম দেন?’ তিনি হযরত উসমান(রা:)-
এর দিকে ইঙ্গিত করে উত্তর দিলেন,
‘(তোমাদের) খলীফা ও তার বন্ধুদের সাথে
থাকবে’।” [নোট-৭:হযরত আবু হোরায়রা (রা:)
থেকে এটি বর্ণনা করেছেন আল-
হাকিম (৩:৯৯=১৯৯০ সংস্করণের ৩:১০৫;৪:৪৩৪=৪:
৪৮০) এবং আয্ যাহাবী একে বিশুদ্ধ বলেছেন;
এটি আরও বর্ণনা করেন ইবনে আবি শায়বা(১০:
৩৬৩ #৩২০৪৯), আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
আওসাত’গ্রন্থে (৯:১৭৫ #৯৪৫৭), ইবনে আবি
আসিমতাঁর ‘আস্ সুন্নাহ’ বইয়ে (২:৫৮৭ #১২৭৮) এবং
বায়হাকী স্বরচিত ‘আল-
এ’তেকাদ’ কেতাবে (পৃষ্ঠা৩৬৮)।]
ইবনে মাজাহ, আল-হাকিম বিশুদ্ধ হিসেবে, আল
বায়হাকী ও আবু নুয়াইম হযরত আয়েশাহ (রা:)
থেকেবর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“রাসূলুল্লাহ (দ:) হযরত উসমান (রা:)-
কে ডেকে একান্তে আলাপ করেন, যারদরুণ
তাঁর চেহারায় পরিবর্তন আসে।
(পরবর্তীকালে) ঘরে অবরুদ্ধ হবার দিন আমরা
তাঁকে জিজ্ঞেস করি,
‘আপনি কি এর বিরুদ্ধে লড়বেন না?’ খলীফা
বল্লেন,‘না! রাসূলে পাক (দ:) আমার কাছ থেকে
ওয়াদা নিয়েছেন (যেন আমার শাহাদাতের সময়
আমি না লড়ি); আমি ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) ওয়াফা (পূরণ)
করবো’।” [নোট-৮: হযরত উসমান (রা:)
এর মুক্ত করে দেয়া গোলাম হযরত আবু সাহলা (
রা:) থেকে বর্ণনা করেনআত্ তিরমিযী (হাসান
সহীহ গরিব), ইমাম আহমদ তাঁর ‘মুসনাদ’ ও ’
ফযাইলে সাহাবা’ পুস্তকে (১:৪৯৪),ইবনে মাজাহ,
ইবনেহিব্বান, আলহাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ৩:১০৬
), ইবনে সা’আদ (৩:৬৬), আবুএয়ালা নিজ ‘মুসনাদ’
গ্রন্থে (৮:২৩৪), এবং সহীহ সনদে আল-
বাযযার (২:৬০)।]
ইবনে আদি ও ইবনে আসাকির হযরত আনাস (রা:)
থেকে বর্ণনা করেন, ‍যিনি বলেন:
“মহানবী (দ:)বলেন,’ওহে উসমান! আমার (
বেসালের) পরে তোমার কাছে খেলাফতের
ভার ন্যস্ত করা হবে, কিন্তুমোনাফেকরা চাইবে
যেন তুমি তা ত্যাগ করো,
তুমি ত্যাগ করো না, বরং রোযা রেখো যাতে
তুমি আমারসাথে (ওই রোযা) ভাঙ্গতে পারো’।”
[নোট-৯: হযরত আনাস (রা:) থেকে ইবনে
আসাকির নিজ ‘তারিখেদামেশক’ (৩৯:২৯০), ইবনে
আদি তাঁর ‘আল-
কামিল’ (৩:২৭); এবং আয্ যাহাবী স্বরচিত ’মিযান’
গ্রন্থে(২:৪২৪) যা’তে দুর্বল সনদ আবু আল-
রাহহাল খালেদ ইবনে মোহাম্মদ আল-
আনসারী, যিনি এর একমাত্রবর্ণনাকারীও।]
আল-হাকিম বিশুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করে হযরত
মুররাহ ইবনে কাআব (রা:) থেকে বর্ণনা করেন
এবং ইবনে মাজাহ-ও তাঁর থেকে রওয়ায়াত করেন,
তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (দ:)-
কে একটি পরীক্ষার কথা বলতে শুনেছি যখন
এক ব্যক্তি তাঁর জুব্বা পরে পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।
তিনি এরশাদ করেন, ‘এই ব্যক্তি ওই সময় সঠিক পথ
অনুসরণ করবে।’ আমি ওই
ব্যক্তিকে দেখতে গেলাম এবং দেখলাম
তিনি হযরত উসমান (রা:)।” [নোট-১০: হযরত
কা‘আব ইবনে মুররা আল-বাহযী (রা:)
থেকে আত্ তাবারানী (হাসান সহীহ), দুর্বল
সনদে ইবনে মাজাহ, বেশ কিছু বিশুদ্ধ
সনদে ইমাম আহমদ তাঁর ’মুসনাদ’ ও
‘ফযায়েলে সাহাবা’ কেতাবে (১:৪৫০), আল-হাকিম
(১৯৯০ সংস্করণের ৩:১০৯, ৪:৪৭৯ সহীহ),
তিনটি সনদে ইবনে আবি শায়বা (৬:৩৬০
#৩২০২৫-৩২০২৬, ৭:৪৪২ #৩৭০৯০), আত্
তাবারানী নিজ ‘আল-কবীর’
গ্রন্থে (১৯:১৬১-১৬২ #৩৫৯, #৩৬২, ২০:৩১৫
#৭৫০), এবং নুয়াইম ইবনে হাম্মাদ স্বরচিত ‘আল-
ফিতান’ পুস্তকে (১:১৭৪ #৪৬১)।]
আল-হাকিম হযরত আব্বাস (রা:)
থেকে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন
যে মহানবী (দ:) তাঁদেরকে বলেছিলেন
হযরত উসমান (রা:)-এর রক্তের ফোঁটা কুরআন
মজীদের “হে মাহবুব! অদূর
ভবিষ্যতে আল্লাহই তাদের দিক থেকে আপনার
জন্যে যথেষ্ট হবেন” (২:১৩৭) আয়াতটির ওপর
পড়বে; আর তাই ঘটেছিল। [নোট-১১: হযরত
ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে আল-হাকিম বর্ণিত
(৩:১০৩=১৯৯০ সংস্করণের ৩:১১০), আল-যুবায়র
ইবনে আবদিল্লাহর দাদী হতে আত্
তাবারী নিজ ‘তারিখ’ কেতাবে (২:৬৭১),
‘উমরা বিনতে আবদ্ আল-রহমান
হতে ইবনে আবি হাতিম তাঁর ‘আল-জারহ ওয়াল
তা’দিল’পুস্তকে (৪:১৭৯ #৭৮০), এবং ওয়াসসাব
হতে ইবনে সাআদ (৩:৭২)।]
মুহাদ্দীস আল-সিলাফী হযরত হুযায়ফা (রা:)
থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “ফিতনার
আরম্ভ হযরত উসমান (রা:)-কে শহীদ করার
মাধ্যমে এবং শেষ হবে মসীহ-
বিরোধী (অর্থাৎ, দাজ্জাল)-এর আবির্ভাব দ্বারা।
[নোট-১২: হযরত হুযায়ফা (রা:)
থেকে দু’টি বর্ণনানুক্রমে ইবনে আবি শায়বা (৭:
২৬৪ #৩৫৯১৯-৩৫৯২০)।] সেই মহান সত্তার শপথ,
যাঁর হাতে আমার প্রাণ! হযরত উসমান (রা:)-এর
হত্যাকারীদের প্রতি কেউই এক
সরষে দানা পরিমাণ মহব্বত অন্তরে লালন
করে মৃত্যুবরণ করবে না; তবে হ্যাঁ,
সে দাজ্জালের দেখা যদি তার জীবনে পায়,
তাহলে সে তাকে অনুসরণ করবে,
নতুবা সে তার কবরে দাজ্জালকে বিশ্বাস
করবে।” এটা স্পষ্ট যে হযরত হুযায়ফা (রা:)
মহানবী (দ:)-এর কাছ থেকে এ
কথা শুনেছিলেন, কেননা এ ধরনের
কথা মতামতের ভিত্তিতে বলা যায় না।
আত্ তাবারানী সহীহ সনদে হযরত (আবু)
মাসউদ (রা:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“আমরা কোনো জ্বেহাদে  মহানবী (দ:)-
এর সাথে ছিলাম যখন মুসলমানদের খাদ্য সংকট
দেখা দেয়। আমি তাঁদের মুখমন্ডলে হতাশার
ছাপ দেখতে পাই, আর এর
বিপরীতে মোনাফেকদের চেহারায়
দেখি আনন্দ। এই পরিস্থিতি দেখে রাসূলুল্লাহ
(দ:) বলেন, ‘আমি আল্লাহর নামে কসম
করে বলছি, আল্লাহ তোমাদের জন্যে খাবার
ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত সূর্য অস্তমিত হবে না।’
হযরত উসমান (রা:) আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ:)-এর
ইচ্ছা নিশ্চিত জেনে চৌদ্দটি সওয়ার-ভর্তি খাবার
এনে ওর মধ্যে নয়টি মহানবী (দ:)-এর
খেদমতে পেশ করেন। মুসলমানদের
চেহারায় খুশির ভাব ফুটে ওঠে,
পক্ষান্তরে মোনাফেকদের মুখ ভার
হয়ে যায়। আমি দেখতে পাই মহানবী (দ:)
(দোয়ায়) হাত তোলেন যতোক্ষণ না তাঁর
বগলের সাদা অংশ দেখা যায়; তিনি হযরত উসমান
(রা:)-এর জন্যে এমন দোয়া করেন,
যা আমি ইতিপূর্বে আর কারো জন্যেই
তাঁকে করতে দেখি নি।” [নোট-১৩: হযরত
ইবনে মাসউদ (রা:) থেকে নয়, বরং হযরত আবু
মাসউদ (রা:) থেকে ইমাম আহমদ তাঁর
‘ফযায়েলে সাহাবা’ কেতাবে (১:২৩৪ #২৮৭),
এবং আত্ তাবারানী দুর্বল সনদে সাঈদ
ইবনে মোহাম্মদ আল-ওয়াররাক হতে নিজ ‘আল-
কবীর’(১৭:২৪৯-২৫০ #৬৯৪) ও ‘আল-
আওসাত’ (৭:১৯৫-১৯৬ #৭২৫৫)
গ্রন্থগুলোতে বর্ণিত; যদিও আল-
হায়তামী (৯:৮৫-৯৬=৯:১১৩-১১৫ #১৪৫২৩,
#১৪৫৬০) ইমাম তাবারানী (রহ:)-এর
সনদকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।]
আল-বায়হাকী হযরত উরওয়া (রা:) থেকে রওয়ায়াত
করেন যে মহানবী (দ:) যখন হুদায়বিযায় উপস্থিত
হন, তখন তিনি হযরত উসমান (রা:)-কে কুরাইশদের
কাছে পাঠান এ কথা বলে, “তাদেরকে বলো,
আমরা যুদ্ধ করতে আসি নি, শুধু ওমরাহ হজ্জ্ব ও
ইসলামের দিকে দাওয়াত দিতে এসেছি।”
তিনি আরও আদেশ করেন যেন হযরত উসমান
(রা:) মক্কাবাসী ঈমানদার নর-
নারীদেরকে আসন্ন বিজয়ের খোশ-
খবরী দেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায়
সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে তাঁদের ধর্ম-
বিশ্বাস যে আর উপহাসের বিষয় হবে না, তাও
জানাতে। হযরত উসমান (রা:) কুরাইশদের
কাছে হুযূর পাক (দ:)-এর বার্তা পৌঁছে দেন, কিন্তু
তারা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং যুদ্ধ করার
ঘোষণা দেয়। এমতাবস্থায় রাসূলে খোদা (দ:)
সকল মুসলমানকে সমবেত করেন
এবং আনুগত্যের শপথ নেন। এই সময় কেউ
একজন উচ্চস্বরে বলেন, ”দেখো, নিশ্চয়
জিবরীল আমীন এখানে মহানবী (দ:)-এর
কাছে অবতীর্ণ হয়েছেন।” মুসলমানগণও
তখন নবী পাক (দ:)-কে ছেড়ে না যাবার
অঙ্গীকার করেন। আল্লাহর মহিমায়
এতে মূর্তি পূজারীরা ভয় পেয়ে যায় এবং এর দরুণ
তারা ইতিপূর্বে যতো মুসলমানকে বন্দি করেছিল
, তাঁদের সবাইকে ছেড়ে দেয়, আর
সন্ধি স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। হযরত উসমান
(রা:)-এর প্রত্যাবর্তনের আগে হোদায়বিয়ায়
অবস্থানকালে মুসলমানগণ বলাবলি করতে থাকেন
যে তিনি কাবায় পৌঁছে তওয়াফ করেছেন;
এমতাবস্থায় হুযূর পূর নূর (দ:) বলেন,
“আমরা অবরুদ্ধ থাকাকালীন
আমি মনে করি না উসমান (কাবাকে) তওয়াফ
করবে।”
তিনি ফিরে এলে পরে মানুষেরা তাঁকে বলেন,
“আপনি কাবার তাওয়াফ করেছেন।” হযরত উসমান
(রা:) উত্তর দেন: “এই চিন্তা মাথা থেকে দূর
করে দাও! সেই মহান সত্তার শপথ, যাঁর
হাতে আমার প্রাণ! মহানবী (দ:)-কে হুদায়বিয়ায়
রেখে আমি ওখানে এক বছরের
জন্যে বসতি স্থাপন করলেও মহানবী (দ:)-এর
আগে আমি কাবাকে তাওয়াফ করতাম না। কুরাইশ
গোত্র আমাকে তা করতে আমন্ত্রণ
জানিয়েছিল, কিন্তু আমি তা ফিরিয়ে দেই।” অতঃপর
মুসলমানগণ বলেন, “রাসূলুল্লাহ (দ:)-ই আমাদের
মাঝে আল্লাহকে সবচেয়ে ভাল জানেন
এবং তিনি-ই সর্বোত্তম মতের
অধিকারী।” [নোট-১৪: হযরত ‘উরওয়া (রা:)
থেকে এটি বর্ণনা করেন ইবনে আসাকির নিজ
‘তারিখে দিমাশ্ক’ গ্রন্থে (৩৯:৭৬-৭৮), আল-
বায়হাকী তাঁর ‘আস্ সুনান আল-কুবরা’
পুস্তকে (৯:২১৮-২২১), এবং ইবনে আবি শায়বা; এ
ছাড়া আংশিকভাবে ইবনে সা’আদ (২:৯৭)। দেখুন –
ইবনে কাসীরের তাফসীর (৪:১৮৭), কানয
(#৩০১৫২), এবং ‘আওন আল-মা’বুদ (৭:২৮৯)।]
হযরত আলী (ক
হযরত আবু রাফি’ (রা:)-এর স্ত্রী হযরত সালমা (রা:)
থেকে আত্ তাবারানী বর্ণনা করেন,
যিনি বলেন: “আমি (এখনো)
নিজেকে মহানবী (দ:)-এর
হুযূরে (উপস্থিতিতে) দেখতে পাচ্ছি যখন
তিনি বলেন, ‘বেহেশতী এক
ব্যক্তি এক্ষণে তোমাদের সামনে উপস্থিত
হবে।’ আর দেখো! আমি কারো পদশব্দ
শুনতে পাই, অতঃপর হযরত আলী (ক:)
(মজলিশে) হাজির হন।” [নোট-১৫: হযরত
রাফি’ (রা:)-এর স্ত্রী হযরত সালমা (রা:)
থেকে আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
কবীর’পুস্তকে (২৪:৩০১)। দেখুন আল-
হায়তামী (৯:১৫৬-১৫৭ #১৪৬৯৩)।]
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) থেকে আল-হাকিম
ও আল-বায়হাকী বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“আমরা একবার রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর সাথে ছিলাম;
এমন সময় তাঁর স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে যায়।
হযরত আলী (ক:)
তা সারাতে পেছনে পড়ে থাকেন। এমতাবস্থায়
নবী পাক (দ:) কিছু দূর হাঁটার পর এরশাদ ফরমান,
‘সত্য হলো, তোমাদের মাঝে কেউ একজন
কুরআন মজীদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ (তাফসীর)
নিয়ে জেহাদ (কঠিন সাধনা, সংগ্রাম) করবে,
যেমনিভাবে আমি সংগ্রাম করেছি এর নাযেল
(অবতীর্ণ) হওয়া নিয়ে।’ হযরত আবু বকর (রা:)
জিজ্ঞেস করেন, ‘সেই ব্যক্তি কি আমি?’ হুযূর
পূর নূর (দ:) উত্তরে ’না’ বলেন। অতঃপর হযরত
উমর (রা:) জিজ্ঞেস করেন, ‘তাহলে কি আমি?’
রাসূলে করীম (দ:) এরশাদ ফরমান, ‘না, ওই
স্যান্ডেল মেরামতকারী (খাসিফ আন-
না’আল)।’ [নোট-১৬: হযরত আবু সাঈদ আল-
খুদরী (রা:) হতে সহীহ সনদে ইমাম আহমদ
বর্ণিত, যা বিবৃত করেছেন আল-
হায়তামী (৯:১৩৩); ‘আল-আরনাওত’ (১৫:৩৮৫
#৬৯৩৭)-এর বর্ণনানুযায়ী সহীহ
সনদে ইবনে হিব্বান-ও; এটাকে সহীহ
বলেছেন আল-হাকিম (৩:১২২), আর আয্
যাহাবী নিজ ‘তালখিস আল-’এলাল আল-
মুতানাহিয়া কেতাবে (পৃষ্ঠা ১৮) বলেন: “এই
হাদীসের সনদ ভাল।” এই হাদীস আরও
বর্ণনা করেছেন আল-বাগাবী তাঁর ‘শারহ আল-
সুন্নাহ’ গ্রন্থে (১০:২৩৩), আবু এয়ালা স্বরচিত
‘মুসনাদ’ বইয়ে (#১০৮৬), সাঈদ ইবনে মনসুর তাঁর
‘সুনান’ পুস্তকে, ইবনে আবি শায়বা (১২:৬৪), আবু
নুয়াইম নিজ ‘হিলইয়া’ কেতাবে, এবং আল-
বায়হাকী তাঁর ‘দালাইল আন্ নুবুওয়া’
গ্রন্থে (৬:৪৩৫) ও ‘শুয়াবুল ঈমান’ পুস্তকে।]
আবু ইয়ালা ও আল-হাকিম নির্ভরযোগ্য রওয়ায়াত
হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করে হযরত
ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণনা করেন
যে মহানবী (দ:) হযরত আলী (ক:)-
কে বলেন: “বাস্তবিকই তুমি আমার (বেসালের)
পরে কঠিন সংগ্রাম/সাধনায় লিপ্ত হবে।”
তিনি জিজ্ঞেস করেন, “আমার
ধর্মকে নিরাপদে রেখে?” বিশ্বনবী (দ:)
এরশাদ করেন, “হ্যাঁ।” [নোট-১৭: হযরত
ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে আল-হাকিম
(৩:১৪০=৩:১৫১) এবং ‘মুরসাল’
হিসেবে ইবনে আবি শায়বা (৬:৩৭২ #৩২১১৭)।]
হযরত আলী (ক:) থেকে আত্
তাবারানী বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “হযূর পূর
নূর (দ:) আমার কাছ থেকে ওয়াদা নিয়েছেন
যে আমাকে বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক/ধোকাবাজ ও
ধর্মচ্যুত (আল-নাকিসীন ওয়াল-ক্কাসিতীন ওয়াল-
মারিক্কীন)-দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে।
[নোট-১৮: হযরত আলী (ক:) হতে হযরত
আলী ইবনে রাবেয়া (রা:) এবং তাঁর কাছ
থেকে আল-বাযযার, আর আবু ইয়ালা (১:৩৯৭
#৫১৯)-এর সনদে রয়েছেন আল-রাবী’
ইবনে সাহল যিনি দুর্বল। দেখুন – ইবনে হাজর
রচিত ‘লিসান আল-মিযান’ (২:৪৪৬ #১৮২৭);
তবে ইবনে হাজর এর অর্থকে সত্য
হিসেবে বিবেচনা করেন। একে হযরত আম্মার
ইবনে এয়াসের (রা:)-এর বর্ণিত বলেও উদ্ধৃত
করেন আবু এয়ালা (৩:১৯৪ #১৬২৩)।]
আল-হুমায়দী, আল-হাকিম এবং অন্যান্য
হাদীসবেত্তা হযরত আবুল আসওয়াদ (আল-
দুয়ালী) রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন,
তিনি বলেন: “হযরত আলী (ক:)
রেকাবে (অশ্বে পা রাখার স্থানে) পা রাখামাত্র
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা:)
এসে তাঁকে বলেন, ‘ইরাকবাসীদের
কাছে যাবেন না! যদি যান, তাহলে তরবারির
আঘাতসমূহ আপনার ওপর পড়বে।’ হযরত
আলী (ক:) উত্তর দেন, ‘আল্লাহর নামে শপথ
করে বলছি, আপনার এ কথা বলার
আগে মহানবী (দ:)-ও একই
কথা বলেছেন’।” [নোট-১৯: হযরত
আলী (ক:) হতে হযরত আবুল আসওয়াদ (রা:)
হতে আল-হুমায়দী তাঁর ’মুসনাদ’ গ্রন্থে (১:৩০
#৫৩), আল-বাযযার (২:২৯৫-২৯৬ #৭১৮), আবু
ইয়ালা (১:৩৮১ #৪৯১), আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
আহাদ’ পুস্তকে (১:১৪৪ #১৭২), ইবনে হিব্বান
(১৫:১২৭ #৬৭৩৩), এবং আল-হাকিম (৩:১৪০=১৯৯০
সংস্করণের ৩:১৫১); এঁদের সবার
এসনাদে শিয়াপন্থী আবদুল মালিক ইবনে আ’য়ান
থাকায় আয্ যাহাবী এটাকে দুর্বল বলেছেন,
তবে একে শক্তিশালী বিবেচনা করেছেন
আল-হায়তামী (৯:১৩৮)
এবং ’হাসান’ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন আল-
আরনাওত; অপর দিকে জিয়া আল-
মাকদেসী একে বিশুদ্ধ রওয়ায়াত বলে মত
প্রকাশ করেন তাঁর প্রণীত ‘আল-মুখতারা’
গ্রন্থে (২:১২৮-১২৯ #৪৯৮)।]
আবু নুয়াইম হযরত আলী (ক:)
থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ
(দ:) আমাকে বল্লেন, ‘(ভবিষ্যতে) অনেক
ফিতনা-ফাসাদ হবে এবং তোমার
লোকেরা তোমার সাথে দ্বিমত পোষণ
করবে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম,
‘আপনি আমাকে (ওই সময়) কী করার নির্দেশ
দেন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘কেতাব (কুরআন
মজীদ) অনুযায়ী শাসন করো’।” [নোট-২০:
হযরত আলী (ক:) হতে দুর্বল
বর্ণনাকারী শিয়াপন্থী আল-হারিস
ইবনে আব্দিল্লাহ আল-আ’ওয়ার বর্ণিত এবং আত্
তাবারানী কৃত ‘আল-আওসাত’ গ্রন্থে (২:২৯-৩০
#১১৩২) ও আল-সগীর পুস্তকে (২:১৭৪ #৯৭৮)
উদ্ধৃত যার মধ্যে শেষোক্ত কেতাবের
এসনাদে রয়েছেন আতা’ ইবনে মুসলিম আল-
খাফফাফ যিনি আল-উকায়লী প্রণীত আল-
দু’আফা বইয়ের (৩:৪০৫ #১১৪৩)
ভাষ্যানুযায়ী দুর্বল রাবী।] আল-বায়হাকী হযরত
আলী (ক:) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“(হযরত) ফাতেমা (রা:)-এর পাণি গ্রহণের প্রস্তাব
দেয়া হয় মহানবী (দ:)-এর কাছে (কিন্তু
তিনি তা নাকচ করেন); এমতাবস্থায় আমার এক
দাসী (যাকে পরবর্তীকালে মুক্ত করা হয়)
আমাকে বলে, ‘আপনি কি শুনেছেন হযরত
ফাতেমা (রা:)-এর বিয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল?
তাহলে এ ব্যাপারে (পাণি গ্রহণের প্রস্তাব নিয়ে)
মহানবী (দ:)-এর সাথে দেখা করায়
আপনাকে বাধা দিচ্ছে কী?’ আমি নবী পাক (দ:)-
এর সাথে দেখা করতে গেলাম, আর তাঁর
চেহারা মোবারক ওই সময় সৌম্য ভাবময় ছিল।
আমি তাঁর সামনে দাঁড়াতেই ভয়ে স্থির
হয়ে গেলাম। আল্লাহর শপথ, আমি একটি কথাও
বলতে পারলাম না। রাসূলুল্লাহ (দ:) ফরমালেন,
‘কী কারণে তোমার এখানে আসা, বলো?’
আমি চুপ রইলাম। অতঃপর তিনি বল্লেন,
‘হয়তো তুমি ফাতেমার পাণি গ্রহণের প্রস্তাব
নিয়ে এসেছ?’ আমি বল্লাম, জ্বি।” [নোট-২১:
হযরত আলী (ক:) থেকে বর্ণনা করেছেন
আল-বায়হাকী তাঁর ‘আল-সুনান আল-কুবরা’
কেতাবে (৭:২৩৪ #১৪১২৯) এবং আল-দুলাবী নিজ
‘আল-যুররিয়্যা আল-তাহেরা’ পুস্তকে (পৃষ্ঠা ৬৪),
যা ’কানয’ গ্রন্থে (#৩৭৭৫৪) বিবৃত হয়েছে।]
আল-হাকিম নির্ভরযোগ্য রওয়ায়াত
হিসেবে এবং আবু নুয়াইম হযরত আম্মার
ইবনে ইয়াসের (রা:) থেকে বর্ণনা করেন
যে রাসূলে করীম (দ:) হযরত আলী (ক:)-
কে বলেন: “মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড়
অপরাধী হলো সে-ই, যে ব্যক্তি তোমার
এখানে (কপালের পাশে দেখিয়ে বলেন)
আঘাত করবে, যতোক্ষণ
না রক্তে এটা (দাড়ি দেখিয়ে বলেন)
ভিজে যায়।” [নোট-২২: এই রওয়ায়াত এসেছে –
(১) হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা:)
হতে বিশুদ্ধ সনদে, যা বিবৃত হয়েছে ইমাম
সৈয়ুতী কৃত ‘তারিখ আল-খুলাফা’
গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১৭৩), ইমাম আহমদ প্রণীত
’মুসনাদ’ কেতাবে, আন-নাসাঈ লিখিত ‘আল-সুনান
আল-কুবরা’ পুস্তকে (৫:১৫৩ #৮৫৩৮), আবু
নুয়াইমের রচিত ‘দালাইল আন-নুবুওয়া’
বইয়ে (পৃষ্ঠা ৫৫২-৫৫৩ #৪৯০), এবং আল-হাকিম
(৩:১৪০-১৪১), আর এ ছাড়াও সনদের মধ্যে একজন
বর্ণনাকারীর অনুপস্থিতিতে হযরত আম্মার (রা:)
হতে তাবেঈ আল-বাযযার (৪:২৫৪ #১৪২৪); (২)
হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা:) হতে আবু নুয়াইম
নিজ ‘দালাইল’ পুস্তকে (পৃষ্ঠা ৫৫৩ #৪৯১) – দেখুন
আস-সৈয়ুতীর ‘খাসাইসুল কুবরা’ (২:৪২০); (৩)
হযরত আলী (ক:)
হতে শিয়াপন্থী সালাবা ইবনে ইয়াযিদ আল-
হিম্মানী রওয়ায়াতকৃত
এবংলিপিবদ্ধ রয়েছে ইবনে সা’আদ (৩:৩৪),
ইবনে আবি হাতিম, আবু নুয়াইম কৃত
’দালাইল’ (পৃষ্ঠা ৫৫২ #৪৮৯), ইবনে আবদিল বারর
প্রণীত ‘আল-এস্তিয়াব’ (৩:৬০), এবং আল-
নুয়াইরী লিখিত ‘নিহায়াত আল-আরব’ (২০:২১১); (৪)
হযরত আলী (ক:) হতে সুহাইব, যা লিপিবদ্ধ
আছে আত্ তাবারানীর ‘আল-কবীর’
গ্রন্থে (৮:৩৮-৩৯ #৭৩১১), ইবনে আবদিল বারর-
এর ’আল-এস্তিয়াব’ পুস্তকে (৩:১১২৫),
ইবনে আসাকির, আল-রুয়ানী, ইবনে মারদুইয়াহ,
এবং আবু ইয়ালা (১:৩৭৭ #৪৮৫)। দেখুন –
’কানয’ (#৩৬৫৬৩, #৩৬৫৭৭-৮, #৩৬৫৮৭), ইবনুল
জাওযীর ‘সিফাতুস্ সাফওয়া’ (১:৩৩২), এবং আল-
হায়তামী (৯:১৩৬); (৫) হযরত আলী (ক:)
হতে হাইয়ান আল-আসাদী, যা লিপিবদ্ধ
আছে আল-হাকিমে (৩:১৪২); এবং (৬) মওকুফ
বর্ণনা – হযরত আলী (ক:) হতে যায়দ
ইবনে ওয়াহব, যা লিপিবদ্ধ করেছেন আল-হাকিম
(৩:১৪৩) ও ইবনে আবি আসিম নিজ ‘আল-যুহদ’
কেতাবে (পৃষ্ঠা ১৩২)। আল-তালিদী এই
বর্ণনা তাঁর ‘তাহযিব আল-খাসাইস’
পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করেন নি।]
আবু নুয়াইম অনুরূপ বর্ণনা করেছেন জাবের
ইবনে সামুরা ও সুহাইব থেকে। আল-হাকিম
রওয়ায়াত করেন হযরত আনাস (রা:)-এর কথা,
তিনি বলেন: “আমি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর
সাথে অসুস্থ হযরত আলী (ক:)-
কে দেখতে যাই, যিনি শয্যাশায়ী ছিলেন; এই
সময় হযরত আবু বকর (রা:) ও হযরত উমর (রা:)-ও
তাঁকে দেখতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
তাঁদের একজন অপরজনকে বলছিলেন, “আমার
মনে হয় না তিনি বাঁচবেন।” এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ
(দ:) এরশাদ ফরমান: “নিশ্চয় সে শাহাদাত
ছাড়া মারা যাবে না এবং তার অন্তর যতোক্ষণ
না তিক্ত হবে ততোক্ষণ সে মৃত্যুবরণ
করবে না।” [নোট-২৩: আল-হাকিম
(৩:১৩৯=১৯৯০ সংস্করণের ৩:১৫৫); অবশ্য এই
বর্ণনাকে আয্ যাহাবী ‘সম্পূর্ণ
ত্রুটিযুক্ত’ (ওয়াহিন) বলেছেন।]
আল-হাকিম বর্ণনা করেন হযরত সাওর
ইবনে মিজযা’আ (রা:) থেকে, তিনি বলেন:
“উটের (যুদ্ধের) দিবসে আমি হযরত তালহা (রা:)-
এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, আর ওই সময়
তিনি (মাটিতে শায়িত অবস্থায়) প্রায় ইন্তেকাল করার
পর্যায়ে ছিলেন। তিনি আমাকে বল্লেন,
‘তুমি কোন্ পক্ষ?’ আমি উত্তর দিলাম,
‘ঈমানদারদের খলীফার বন্ধুদের দলে।’
তিনি বল্লেন, ‘তোমার হাত বাড়িয়ে দাও
যাতে আমি তোমার কাছে আনুগত্যের শপথ
নিতে পারি।’ আমি আমার হাত বাড়িয়ে দিলাম
এবং তিনি আমার প্রতি আনুগত্যের শপথ নিলেন।
এর পরপরই তিনি ইন্তেকাল করলেন, আর আমিও
হযরত আলী (ক:)-এর কাছে ফেরত
গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বল্লাম। তিনি বল্লেন,
‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ! রাসূলুল্লাহ (দ:) সত্য
বলেছিলেন এই
মর্মে যে আল্লাহতা’লা তালহাকে আমার প্রতি দৃঢ়
আনুগত্যের শপথ গ্রহণ
ছাড়া বেহেশতে নেবেন না’।” [নোট-২৪:
আল-হাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ৩:৪২১);
তবে ইবনে হাজর তাঁর ’আল-আতরাফ’ (এতরাফ
আল-মুসনাদ আল-মু’তালী বি আতরাফ আল-মুসনাদ
আল-হাম্বলী) পুস্তকে এটাকে ‘অত্যন্ত দুর্বল
সনদ’ বলেছেন যা বিবৃত
হয়েছে ‘কানয’পুস্তকে (#৩১৬৪৬)।]
আল-বায়হাকী রওয়ায়াত করেন ইবনে এসহাকের
মাধ্যমে, তিনি বলেন: “এয়াযিদ ইবনে সুফিয়ান
আমার কাছে বর্ণনা করেন মোহাম্মদ
ইবনে কাআব হতে এই মর্মে যে, হুদায়বিয়ার
সন্ধিতে রাসূলে করীম (দ:)-এর কাতেব
বা লেখক ছিলেন হযরত আলী (ক:); হুযূর পাক
(দ:) তাঁকে বলেন, ‘লেখো,
এগুলো মোহাম্মদ ইবনে আবদিল্লাহ (দ:) ও
সোহায়ল ইবনে উমরের মধ্যকার সন্ধির
শর্তাবলী।’ হযরত
আলী এটা লিখতে রাজি হলেন না। তিনি ’আল্লাহর
প্রেরিত রাসূল’ বাক্যটি ছাড়া এই সন্ধিপত্র
লিখতে সম্মত ছিলেন না। এমতাবস্থায় নবী পাক
(দ:) তাঁকে বলেন, ‘এটা লেখো,
কেননা নিশ্চয় তুমি অনুরূপ কিছু ভোগ
করবে এবং অন্যায় আচরণের শিকার
হবে’।” [নোট-২৫: আল-বায়হাকীর ‘দালাইল’
গ্রন্থে উদ্ধৃত
যা ‘মাগাযী’পুস্তকে ইবনে এসহাকের বর্ণনার
অনুসরণে লিপিবদ্ধ; দেখুন – আস্ সৈয়ুতী কৃত
‘খাসাইসে কুবরা’ (১:১৮৮),
’সীরাতে হালাবিয়্যা’ (২:৭০৭), এবং আল-খুযাঈ
প্রণীত ‘তাখরিজাত আল-দেলালাত’ (১৯৯৫
সংস্করণের ১৭৮ পৃষ্ঠা=১৯৮৫ সংস্করণের ১৮৮
পৃষ্ঠা)।] আর এটাই ঘটেছিল সিফফিন যুদ্ধের
পরে হযরত আলী (ক:) ও হযরত
মোআবিয়া (রা:)-এর মধ্যকার সন্ধির সময়। ইমাম
আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ তাঁর ’মুসনাদ’ গ্রন্থের
পরিশিষ্টে এবং এর পাশাপাশি আল-বাযযার, আবু এয়ালা ও
আল-হাকিম হযরত আলী (ক:)
থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“মহানবী (দ:) আমাকে বলেন, ‘তোমার
সাথে হযরত ঈসা (আ:)-এর এক সাদৃশ্য আছে;
ইহুদীরা তাঁকে এতো ঘৃণা করেছিল যে তারা তাঁর
মাকে অপবাদ দিয়েছিল; আর
খৃষ্টানরা এতো ভালোবেসেছে যে তারা
তাঁকে এমন মর্যাদার আসনে আসীন
করেছে যা তাঁর নয়’।” [নোট-২৬: আবু মরইয়াম
এবং আবু আল-বখতারী কিংবা আবদুল্লাহ
ইবনে সালামা – এই দু’জনের কোনো একজন
থেকে আবদুল্লাহ ইবনে আহমদ নিজ ‘আল-
সুন্নাহ’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ২৩৩-২৩৪ #১২৬৬-১২৬৮),
আল-হারিস ইবনে আব্দিল্লাহ
হতে ইবনে আব্দিল বারর তাঁর ‘আল-এস্তিয়াব’
কেতাবে (৩:৩৭), আল-নুওয়াইরী স্বরচিত
‘নিহায়াত আল-আরব’ পুস্তকে (২০:৫) এবং আবু আল-
হাদিদ কৃত ‘শরহে নাজহ আল-বালাগা’ (১:৩৭২)।]
হযরত আলী (ক:) বলেন: “আমার
ব্যাপারে (আকিদাগত কারণে) দুই ধরনের লোক
ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে – আমার প্রতি বিদ্বেষভাব
পোষণকারী যারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা রটায়;
দ্বিতীয়ত যারা অতি ভক্তিসহ আমার মাত্রাতিরিক্ত
প্রশংসা করে।” [নোট-২৭:
এটা বর্ণনা করেছেন হযরত আলী (ক:)
হতে আবু এয়ালা তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে (১:৪০৬
#৫৩৪) এবং ইমাম আহমদও দুইটি দুর্বল সনদে নিজ
‘মুসনাদ’ কেতাবে – যাকে চিরাচরিত উদারতায় ‘হাসান’
বলেছেন শায়খ আহমদ শাকির (২:১৬৭-১৬৮
#১৩৭৭-১৩৭৮); আল-হাকিম (৩:১২৩)-ও এর
সনদকে সহীহ বলেছেন, তবে আয্
যাহাবী এর দুর্বলতার প্রতি ইঙ্গিত করেন
এতে আল-হাকাম ইবনে আব্দিল মালিক থাকার
কারণে; একই মত পোষণ করেন ইবনুল
জাওযী নিজ ‘আল-এলাল আল-মুতানাহিয়া’
পুস্তকে (১:২২৭ #৩৫৭)। আল-হায়তামী স্বরচিত
‘মজমাউল যাওয়াইদ’ গ্রন্থে (৯:১৩৩) একই
কারণে ওপরের সকল এসনাদের দুর্বলতার
প্রতি ইঙ্গিত করেন, তবে তিনি উল্লেখ করেন
যে আল-বাযযার এটা বর্ণনা করেছেন তাঁর ‘মুসনাদ’
গ্রন্থে। অনুরূপ দুর্বল সনদে এটা বর্ণনা করেন
আল-বায়হাকী নিজ ‘আল-সুনান আল-কুবরা’
পুস্তকে (৫:১৩৭ #৮৪৮৮) এবং ইমাম আহমদ তাঁর
‘ফযাইলে সাহাবা’ কেতাবে (২:৬৩৯ #১০৮৭,
২:৭১৩ #১২২১, ২:৭১৩ #১২২২)।]
আত্ তাবারানী ও আবু নুয়াইম হযরত জাবের
ইবনে সামুরা (রা:) থেকে বর্ণনা করেন,
তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ (দ:) হযরত আলী (ক:)-
কে বলেন, ‘তোমাকে নেতৃত্ব ও
খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করা হবে; আর নিশ্চয়
এটা (হযরত আলী ক:-এর দাড়ি মোবারক) ওর
(সে’র মোবারকের) দ্বারা লাল রংয়ে রঙ্গীন
হবে’।” [নোট-২৮: হযরত জাবের
ইবনে সামুরা (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন
আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-কবীর’ (২:২৪৭ #২০৩৮)
ও ’আল-আওসাত’ (৭:২১৮ #৭৩১৮)
গ্রন্থগুলোতে; তবে আল-হায়তামী (৯:১৩৬)
অভিমত পোষণ করেন যে উভয়ের সনদ খুবই
দুর্বল। শেষাংশের জন্যে ’নোট-২২’
দেখুন।]
আল-বুখারী ও মুসলিম হযরত
সালামা (ইবনে আমির) ইবনে আল-আকওয়া (রহ:)-
এর কথা উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ
(দ:) খায়বারে অবস্থানকালে হযরত আলী (ক:)
চোখের পীড়ার কারণে সেখানে তাঁর
সাথে যেতে পারেন নি। তিনি বলেন,
‘আমি কীভাবে পেছনে পড়ে থাকি এবং হুযূর
পাক (দ:)-এর সাথে না যাই?’ তাই
তিনি বেরিয়ে পড়েন এবং মহানবী (দ:)-এর
সাথে গিয়ে যোগ দেন। খায়বারের যুদ্ধের
আগের রাতে রাসূলে খোদা (দ:) বলেন,
‘আমি শপথ করে বলছি যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল
(দ:) ভালোবাসেন এমন কাউকে আগামীকাল
আমি পতাকা প্রদান করবো, যার ওসীলায় আল্লাহ
বিজয় দান করবেন।’ আর দেখো!
অপ্রত্যাশিতভাবে হযরত আলী (ক:) আমাদের
মাঝে আগমন করেন। সবাই বলেন, ‘এই
তো আলী!’ এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (দ:)
তাঁকে পতাকা হস্তান্তর করেন এবং আল্লাহ তাঁর
মাধ্যমে বিজয় মন্ঞ্জুর করেন।” [নোট-২৯:
সর্ব-হযরত সালামা ইবনে আল-আকওয়া’ (রা:), সাহল
ইবনে সা’আদ (রা:) ও আবু হোরায়রা (রা:)
থেকে আল-বুখারী, মুসলিম ও ইমাম আহমদ]
(আল-বুখারী এবং) মুসলিম এটা হযরত
সালামা ইবনে আল-আকওয়া’ [নোট-৩০:
প্রকৃতপক্ষে সাহল ইবনে সা’আদ] হতে ভিন্ন
শব্দ চয়নে বর্ণনা করেন, যা ওপরের বিবরণের
সাথে যুক্ত: ”অতঃপর রাসূলে খোদা (দ:) হযরত
আলী (ক:)-এর চোখে তাঁর পবিত্র থুথু
মোবারক নিক্ষেপ করেন এবং তিনি সুস্থ
হয়ে ওঠেন।” আল-হারিস ও আবু নুয়াইম
আরেকটি ভিন্ন বর্ণনায় হযরত সালামা (রা:)-
কে উদ্ধৃত করেন: “এমতাবস্থায় হযরত
আলী (ক:) পতাকা নিয়ে দুর্গের ঠিক
নিচে (মাটিতে) পুঁতে দেন, যা দেখে জনৈক
ইহুদী দুর্গের সর্বোচ্চ স্থান
থেকে নিচে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে,
‘আপনি কে?’ তিনি উত্তর দেন, ‘আলী।’
ইহুদী বলে, ‘মূসা (আ:)-এর প্রতি অবতীর্ণ
ঐশী গ্রন্থের শপথ, আপনারা বিজয়ী হবেন
(’উলুতুম)।’ আল্লাহতা’লা বিজয় দান না করা পর্যন্ত
হযরত আলী (ক:) আর পিছু হটেন
নি।” [নোট-৩১: হযরত সালামা হতে ইবনে হিশাম
কৃত ‘সীরাহ’ (৪:৩০৫-৩০৬) এবং ইবনে হিব্বান
প্রণীত ‘আল-সিক্কাত’ (২:১৩)।] আবু নুয়াইম
বলেন,
“এতে ইশারা রয়েছে যে ইহুদীরা তাদের
(ঐশী) কেতাবের বদৌলতে আগাম
জানে কাকে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই
করতে পাঠানো হবে এবং বিজয় মন্ঞ্জুর
করা হবে।” এই বর্ণনা সর্ব-হযরত ইবনে উমর
(রা:), ইবনে আব্বাস (রা:), সা’আদ
ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা:), আবু হোরায়ারা (রা:),
আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা:), এমরান ইবনে হুসাইন
(রা:), জাবের (রা:) এবং আবু লায়লা আল-
আনসারী (রা:)-এর কাছ থেকেও এসেছে।
সবগুলোই আবু নুয়াইম রওয়ায়াত করেছেন, আর
তাতে মহানবী (দ:) কর্তৃক হযরত আলী (ক:)-
এর চোখ মোবারকে পবিত্র থুথু নিক্ষেপ ও
চোখ ভাল হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিবৃত হয়েছে।
[নোট-৩২: সম্ভবত আবু নুয়াইমের ‘মা’রেফাত
আল-সাহাবা ওয়া ফাদলিহিম’ শীর্ষক পুস্তকে।]
হযরত বুরায়দা (রা:) থেকে আল-বায়হাকী ও আবু
নুয়াইম বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) বলেন:
“আমি শপথ করে বলছি, কাল আমি যার
হাতে পতাকা দেবো সে আল্লাহকে
ভালোবাসে এবং তাঁর রাসূল (দ:)-কেও, আর
সে তা (নিজ) ক্ষমতাবলে নেবে।” এ
কথা তিনি এমন সময় বলেন, যখন হযরত
আলী (ক:) সেখানে ছিলেন না। কুরাইশ
গোত্র পতাকার জন্যে প্রতিযোগিতা আরম্ভ
করে; ঠিক তখনি হযরত আলী (ক:) চোখের
পীড়া নিয়ে উটের
পিঠে চড়ে সেখানে উপস্থিত হন। রাসূলুল্লাহ
(দ:) তাঁকে বলেন, “কাছে এসো।”
তিনি এলে তাঁর পবিত্র চোখে হুযূর পাক (দ:) নিজ
থুথু মোবারক নিক্ষেপ করেন এবং তাঁর
হাতে পতাকা দেন। হযরত আলী (ক:) বেসাল
হওয়া অবধি আর কখনোই তাঁর পবিত্র চোখ
পীড়িত হয় নি। [নোট-৩৩: এই বর্ণনা আত্
তাবারীর নিজ ‘তারিখ’ গ্রন্থে (২:১৩৭)।]
ইমাম আহমদ, আবু এয়ালা, আল-বায়হাকী ও আবু
নুয়াইম বর্ণনা করেন হযরত আলী (ক:) হতে,
যিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ (দ:) আমার
দু’চোখে যে দিন খাইবারে থুথু নিক্ষেপ
করেন, সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত
ওতে আর কোনো রকম পীড়া বা জ্বালা-
পোড়া অনুভব করি নি।” [নোট-৩৪: আত্
তাবারানী, সাঈদ ইবনে মানসুর,
ইবনে আবি শায়বা এবং আত্
তাবারী যিনি এটাকে বিশুদ্ধ বলেছেন তিনিও
বর্ণনা করেন; ইমাম আহমদ ও আবু এয়ালার বর্ণনায়
শক্তিশালী ‘রাবী’দের এসনাদ বিদ্যমান
বলে মত দিয়েছেন আল-হায়তামী ও
ইবনে কাসীর নিজ ‘আল-বেদায়া’ পুস্তকে,
এবং আল-বায়হাকী তাঁর ‘দালাইল’ কেতাবে; দেখুন
– কানয (#৩৫৪৬৭-৩৫৪৬৮)। অপর এক বর্ণনায়
হযরত আবু লায়লা (রা:) হযরত আলী (ক:)-
কে জিজ্ঞেস করেন কেন তিনি গ্রীষ্মের
বস্ত্র শীতে এবং শীতের বস্ত্র
গ্রীষ্মে পরেন। তিনি উত্তরে বলেন,
“খায়বরের দিবসে আমার চোখ দুটো যখন
পীড়াগ্রস্ত ছিল, তখন হুযূর পাক (দ:)
আমাকে তলব করেন। আমি তাঁকে বলি,
‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমার চক্ষু
পীড়া দেখা দিয়েছে।’ তিনি আমার চোখে ফুঁ
দিয়ে দোয়া করেন, ‘এয়া আল্লাহ! তার (আলীর)
কাছ থেকে ঠান্ডা ও গরম অপসারণ করুন।’ ওই দিন
থেকে আমি আর শীত বা গরম অনুভব করি নি।”
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি লায়লা (রা:)
হতে দুর্বল সনদে ইমাম আহমদ ও ইবনে মাজাহ
এটা বর্ণনা করেছেন।]
ইবনে এসহাক বর্ণনা করেন হযরত আম্মার
ইবনে এয়াসের (রা:) হতে, যিনি বলেন:
“আল-’উশায়রা সফরে আমি ও হযরত আলী (ক:)
এক সাথে ছিলাম। যখন নবী পাক (দ:) সওয়ার
থেকে অবতরণ করেন, তখন আমরা বনূ মিদলাজ
গোত্রের মানুষদেরকে দেখি তাদের
একটি ঝর্ণা ও খেজুর বাগানে (খামারের)
কাজে ব্যস্ত। হযরত
আলী ইবনে আবি তালেব (ক:)
আমাকে বলেন, ‘ওহে আবু আল-এয়াকযান!
আমরা এই লোকদেরকে তাদের
কাজে দেখতে গেলে কেমন হয়?’
আমি তাঁকে বলি, ‘আপনার যা মর্জি হয়।’ এমতাবস্থায়
আমরা তাদের কাজ দেখতে যাই এবং বেশ কিছু
সময় সেখানে অতিবাহিত করি। এরপর আমাদের
(সম্ভবত সফরজনিত ক্লান্তির কারণে) ঘুম পায়
এবং আমরা দু’জন কিছু দূরে নিম্নভূমিতে অবস্থিত
একটি বালিয়াড়ি পেয়ে সেখানে ঘুমিয়ে পড়ি।
আল্লাহর শপথ! আমাদের আর কেউ ঘুম
থেকে ওঠান নি স্বয়ং মহানবী (দ:) ছাড়া, ‍যিনি তাঁর
কদম মোবারক দ্বারা আমাদের (স্পর্শ করে)
জাগান। আমরা বালি দ্বারা আবৃত হয়ে গিয়েছিলাম। ওই
দিন মহানবী (দ:) হযরত
আলী ইবনে আবি তালেব (ক:)-
কে বালি দ্বারা আবৃত দেখে বলেন, ‘ওহে আবু
তোরাব (বালির মানুষ)!
আমি কি তোমাকে সবচেয়ে বদমায়েশ দু’জন
ব্যক্তি সম্পর্কে বলবো না?’ আমরা বল্লাম,
‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! অনুগ্রহ করে আমাদের
বলুন।’ তিনি উত্তর দেন, ‘সামুদ গোত্রের
সেই ফর্সা লোকটি যার দ্বারা মাদী উটের হাঁটুর
পেছনের দিকের পেশিতন্তু
কাটা পড়ে সেটা খোঁড়া হয়ে গিয়েছিল; আর
ওহে আলী, দ্বিতীয় লোকটি হবে তোমার
এখানে আঘাতকারী।’ এ কথা বলার সময় তিনি হযরত
আলী (ক:)-এর কপালের এক পাশে তাঁর পবিত্র
হাত রাখেন এবং এরপর হযরত আলী (ক:)-এর
দাড়ি মোবারকে হাত রেখে আরও বলেন,
‘যতোক্ষণ না এটা (রক্তে)
ভিজে যায়’।” [নোট-৩৫: হযরত আম্মার (রা:)
থেকে এটা বর্ণনা করেন ইবনে হিশাম (৩:১৪৪),
ইমাম আহমদ নিজ ’মুসনাদ’ (৩০:২৫৬-২৬৭ #১৮৩২১,
#১৮৩২৬ হাসান লি-গায়রিহ) ও ‘ফযায়েলে সাহাবা’
পুস্তকে (২:৬৮৭), আল-বাযযার (#১৪১৭), আল-
বুখারী তাঁর ‘আল-তারিখ আল-সগীর’
কেতাবে (১:৭১), আত্ তাহাবী স্বরচিত ‘শরহ
মুশকিল আল-আসার’ (#৮১১), আদ্ দুলাবী তাঁর
‘আল-আসমা’ওয়াল কুনা’ গ্রন্থে (২:১৬৩), আত্
তাবারী নিজ ‘তারিখ’ কেতাবে (২:১৪), আবু নুয়াইম
তাঁর ‘হিলইয়া’ (১:১৪১) ও ‘মা’আরিফাত আস্ সাহাবা’
পুস্তকে (#৬৭৫), আল-হাকিম (৩:১৪১=১৯৯০
সংস্করণের ৩:১৫১), আল-বায়হাকী স্বরচিত
‘দালাইল আন্ নুবুওয়া’ গ্রন্থে (৩:১২-১৩),
এবং অন্যান্যরা; দেখুন – আল-হায়তামী ৯:১৩৬)।]
পরবর্তীকালে রাসূলুল্লাহ (দ:)
যেভাবে বর্ণনা করেছিলেন, ঠিক সেভাবেই
আল্লাহতা’লার ইচ্ছায় হযরত আলী (ক:)-এর শাহাদাত
হয় শেষ জমানার সবচেয়ে বদমায়েশ লোক
আবদুর রহমান ইবনে মুলজাম আল-মুরাদীর দ্বারা।
আল-বায়হাকী হযরত আলী (ক:)
হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: “ ‍হুযূর পূর নূর
(দ:) আমাকে বলেন, ‘আমার (বেসালের)
পরে তোমার ঔরসে এক পুত্র সন্তান
জন্মগ্রহণ করবে যাকে আমি আমার নাম ও
কুনইয়া (বংশীয় ধারার নাম) প্রদান করলাম’।”
এটা তিনি মোহাম্মদ ইবনে আল-হানাফিয়্যার
দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিলেন। [নোট-৩৬:
অর্থাৎ, মোহাম্মদ
ইবনে আলী ইবনে আবি তালেব।
এটা বর্ণনা করেছেন ইবনে সা’আদ (৫:৯২),
ইবনে আসাকির, এবং আল-বায়হাকী নিজ ‘দালাইল’
পুস্তকে; তবে ইবনে আল-জওযীর
মতে এর সনদ দুর্বল; দেখুন – ‘কানযুল
‘উম্মাল’ (#৩৪৩৩০, #৩৭৮৫৪, #৩৭৮৫৮)।]
হযরত ফাতেমা (রা
মহানবী (দ:)-এর সীরাতে হযরত
ইবনে আব্বাস (রা:)-কে উদ্ধৃত করা হয়েছে,
তিনি বলেন: “সূরা নসরের ’যখন আল্লাহর সাহায্য
ও বিজয় আসবে’ – আয়াতটি নাযেল হলো, তখন
রাসূলুল্লাহ (দ:) হযরত মা ফাতেমা (রা:)-কে তলব
করেন এবং তাঁকে বলেন, ’আমার জানাযা এইমাত্র
ঘোষিত হয়েছে।’ এ কথা শুনে মা ফাতেমা (রা:)
কান্নাকাটি করেন। এমতাবস্থায় হুযূর পূর নূর (দ:)
তাঁকে বলেন, ’কেঁদো না, কেননা তুমি-
ইসর্বপ্রথম আমাকে অনুসরণ
করবে (পরলোকে)।’ এ
কথা শুনে মা ফাতেমা (রা:) হাসেন। নবী পাক
(দ:)-এর কতিপয় স্ত্রী তাঁকে এ অবস্থায়
দেখে জিজ্ঞেস করেন, ’ওহে ফাতেমা (রা:)!
আমরা তোমাকে প্রথমে কাঁদতে তার পর
হাসতে দেখলাম কেন?’ তিনি উত্তর দেন,
’মহানবী (দ:) আমাকে বলেছিলেন যে তাঁর
জানাযা এইমাত্র ঘোষিত হয়েছে, তাই
আমি কেঁদেছিলাম। অতঃপর তিনি আমাকে বলেন
যে আমি-ই তাঁকে সর্বপ্রথম অনুসরণ
করবো (পরলোকে); এ
কারণে আমি হেসেছি’।” [নোট-৩৭: বিশুদ্ধ
সনদে হযরত আব্বাস (রা:)
থেকে এটা বর্ণনা করেছেন আদ্ দারিমী, আত্
তাবারানী নিজ ‘আল-আওসাত’ কেতাবে (১:২৭১
#৮৮৩), এবং আংশিকভাবে আল-বুখারী ও ইমাম
আহমদ; হযরত ইবনে উমর (রা:) থেকেও
অনুরূপ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন আল-বাযযার ও
আল-বায়হাকী; দেখুন – ইবনে কাসীর কৃত
তাফসীর (৪:৫৬২)।] নির্ভরযোগ্য রওয়ায়াতসমূহ
অনুযায়ী মা ফাতেমা (রা:) এই ঘটনার ছয় মাস পরই
বেসালপ্রাপ্ত হন।
ইমাম হাসান (রা
হযরত আবু বাকরাহ (রা:) থেকে আল-
বুখারী বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“মহানবী (দ:) হযরত হাসান (রা:)
সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমার এই পুত্র (নাতি)
মানুষদের সাইয়্যেদ (সরদার)
এবং আল্লাহতা’লা হয়তো তার
মাধ্যমে মুসলমানদের দুটো বড় দলকে আবার
একতাবদ্ধ করবেন’।” [নোট-৩৮: হযরত আবু
বাকরাহ (রা:) থেকে চারটি সনদে ইমাম
বুখারী এটা বর্ণনা করেছেন; এছাড়া আত্
তিরমিযী (হাসান সহীহ), আন্ নাসাঈ, আবু
দাউদের রওয়ায়াতের পাশাপাশি ইমাম আহমদও তাঁর
নিজস্ব চারটি সনদে এটা বর্ণনা করেন।] হুযূর
করীম (দ:) যেভাবে বলেছিলেন ঠিক হুবহু
সেভাবেই ঘটনাটি ঘটে। হযরত আলী (ক:)-
কে যখন শহীদ করা হয়, তখন মানুষেরা হযরত
হাসান (রা:)-এর প্রতি আমৃত্যু আনুগত্যের শপথ
গ্রহণ করেন। তাঁদের সংখ্যা চল্লিশ হাজারেরও
বেশি ছিল এবং তাঁরা তাঁর পিতা হযরত আলী (ক:)-এর
চেয়েও তাঁর প্রতি বেশি অনুগত ছিলেন।
তিনি সাত মাস যাবত ইরাক, খুরাসান ও
ট্রান্সঅক্সিয়ানা অঞ্চলের খলীফা ছিলেন;
এরপর হযরত মোয়াবিয়া (রা:) তাঁর বিরুদ্ধে সৈন্য
সমাবেশ করেন। আল-আম্বরে উভয় পক্ষ
মুখোমুখি হলে ইমাম হাসান (রা:) এবং হযরত
মোয়াবিয়াও উপলব্ধি করেন
যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মুসলমানদের ব্যাপক
প্রাণহানি ঘটাবে। উভয় দলের
মধ্যস্থতাকারীরা একটি শান্তি-চুক্তির পক্ষে কাজ
করেন এবং তাতে উপণীত হন। এরই
ফলে আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলমানগণ
ভ্রাতিঘাতী যুদ্ধ এড়াতে সক্ষম হন
এবং আল্লাহতা’লা তাঁর প্রিয়নবী (দ:)-এর
বাণী সত্যে পরিণত করেন – “আমার এই
নাতি মানুষদের সাইয়্যেদ এবং তার
মাধ্যমে হয়তো আল্লাহতা’লা মুসলমানদের
দুটো বড় দলকে আবার একতাবদ্ধ
করবেন।” [মহানবী (দ:) সেজদারত অবস্থায়
শিশু হযরত হাসান (রা:) তাঁর পিঠে লাফিয়ে ওঠার
বিশুদ্ধ রওয়ায়াতের অংশ এটা, যা আবু বাকরাহ (রা:)
থেকে ইমাম আহমদ বর্ণিত (৩৪:৯৮-৯৯ #২০৪৪৮
হাদীস সহীহ); আর অন্যান্যদের বর্ণনায়
হযরত হাসান বসরী (রা:)-এর কথা যুক্ত হয়েছে,
তিনি বলেন: আল্লাহর শপথ, আল্লাহর শপথ, তাঁর
শাসনের সময় এক শিস্তি বা আঙ্গুঠ পরিমাণ রক্তও
ঝরে নি।” অপর এক বর্ণনার শব্দচয়ন ছিল:
“এবং আল্লাহতা’লা হয়তো মুসলমানদের
দুটো বড় দলকে একতাবদ্ধ করার
ক্ষেত্রে তাকে ব্যবহার
করতে পারেন।” [নোট-৪০: কিছু মানুষ যখন
হযরত হাসান (রা:)-কে শান্তি স্থাপনের
কারণে কটাক্ষ করে বলেছিল
‘ওহে ঈমানদারদের জন্যে অপমানের পাত্র’,
তখন তিনি তাদেরকে উত্তরে বলেন:
“আগুনের চেয়ে অপমান শ্রেয়”; তিনি আরও
বলেন, “আমি তাদেরকে অপমানিত করি নি,
বরং রাজ্য বিস্তারের অভিপ্রায়ে তাদের রক্ত
ঝরানোকে ঘৃণা করেছি।” এটা বর্ণনা করেছেন
ইবনে আব্দিল বারর তাঁর ‘আল-এস্তিয়াব’ গ্রন্থে।]
ইমাম হুসাইন (রা
আল-হাকিম ও আল-বায়হাকী বর্ণনা করেন হযরত
উম্মে আল-ফযল বিনতে আল-হারিস (রা:) হতে,
তিনি বলেন: “একদিন আমি হযরত রাসূলে আকরাম
(দ:)-কে দেখতে গেলাম, আমার
কোলে ছিলেন ইমাম হুসাইন (রা:)।
আমি মহানবী (দ:)-এর দিকে আবার
ফিরে তাকাতেই দেখি তাঁর চোখ অশ্রু সজল।
তিনি বল্লেন, ‘জিবরাইল আমীন
এসে আমাকে বলেছেন যে আমার
উম্মতের (কিছু লোক) আমার এই
নাতিকে শহীদ করবে, আর তিনি ওর
সমাধিস্থলের এক মুঠোভর্তি লাল
মাটি নিয়ে এসেছেন’।” [নোট-৪১: হযরত
উম্মে আল-ফযল থেকে বর্ণনা করেন আল-
হাকিম (৩:১৭৬-১৭৭=১৯৯০ সংস্করণের ৩:১৯৪),
যিনি আল-বুখারী ও মুসলিমের
মানদন্ডে একে বিশুদ্ধ বলেছেন; তবে আয্
যাহাবী বলেন: “বরঞ্চ এটা যয়ীফ মুনক্কাতী,
(কেননা) শাদ্দাদ হযরত উম্মে আল-ফযলের
সাক্ষাৎ পাননি; অপর দিকে মোহাম্মদ
ইবনে মুস’আব (আল-কিরকিসানী) দুর্বল
(বর্ণনাকারী)।” তবে আয্ যাহাবী ‘সিয়্যার’
পুস্তকে (আরনাওত সংস্করণের ৩:২৮৯) অনুরূপ
একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করে বলেন যে ওর এসনাদ
’হাসান’ (নির্ভরযোগ্য/বিশুদ্ধ)।]
ইবনে রুয়াহা, আল-বায়হাকী ও আবু নুয়াইম হযরত
উম্মে সালামা (রা:) থেকে বর্ণনা করেন
যে রাসূলুল্লাহ (দ:) একদিন ঘুমিয়ে পড়েন এবং ঘুম
থেকে জেগে ওঠেন নিষ্ক্রিয় ভাব নিয়ে; তাঁর
হাত ভর্তি ছিল এক মুঠো লাল মাটি দ্বারা যা তিনি এদিক-
ওদিক নাড়াচাড়া করছিলেন। তিনি তাঁকে জিজ্ঞেস
করেন, ‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! এই মাটি কিসের?’
মহানবী (দ:) উত্তর দেন, ‘জিবরাইল আমীন
আমাকে জানিয়েছেন যে এই বাচ্চা (ইমাম হুসাইন)
ইরাক রাজ্যে শহীদ হবে, আর এই মাটি তার
সমাধিস্থলের।’ [নোট-৪২: হযরত
উম্মে সালামা (রা:) থেকে এটা বর্ণনা করেন
ইবনে আবি আসিম তাঁর ‘আল-আহাদ ওয়াল মাসানী’
কেতাবে (১:৩১০ #৪২৯), আত্ তাবারানী নিজ
‘আল-কবীর’ পুস্তকে (৩:১০৯, ২৩:৩০৮),
এবং আল-হাকিম (১৯৯০ সংস্করণের ৪:৪৪০)
মূসা ইবনে ইয়াকুব আল-জামি’-এর
সূত্রে নির্ভরযোগ্য সনদে; অপর
বর্ণনা এসেছে হযরত আয়েশা (রা:) হতে আত্
তাবারানী কৃত ’আল-কবীর’ গ্রন্থে (৩:১০৭
#২৮১৫)। হযরত আয়েশা (রা:) বা উম্মে সালামা (রা:)
থেকে আরও বর্ণনা করেন ইমাম আহমদ তাঁর
‘মুসনাদ’ ও ‘ফযায়েলে সাহাবা’ বইগুলোতে,
তবে এক্ষেত্রে সনদ খুব দুর্বল।]
আবু নুয়াইম বর্ণনা করেন হযরত
উম্মে সালামা থেকে, যিনি বলেন: “ইমাম হাসান ও
ইমাম হুসাইন আমার ঘরে খেলছিলেন, এমন সময়
জিবরাইল আমীন অবতীর্ণ হন এবং বলেন,
‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! নিশ্চয় আপনার উম্মতের
(কতিপয় লোক) আপনার এই নাতিকে (ইমাম
হুসাইনের দিকে দেখিয়ে) শহীদ করবে।’
তিনি ইমামের সমাধিস্থলের কিছু মাটিও
এনে দেন। হুযূর পাক (দ:) তা শুঁকেন এবং বলেন,
‘এতে কষ্ট ও ক্লেশ-যন্ত্রণার গন্ধ রয়েছে।’
অতঃপর আরও বলেন, ‘এই মাটি যখন রক্তে পরিণত
হবে, তখন বুঝবে আমার নাতি শহীদ
হয়েছে।’ অতএব আমি ওই
মাটি একটি বয়ামে রেখে দেই।” [নোট-৪৩:
এটা বর্ণনা করেন আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-
কবীর’ পুস্তকে (৩:১০৮ #২৮১৭), আল-
মিযযী তাঁর ‘তাহযিব আল-কামাল’
কেতাবে (৬:৪০৯), এবং ইবনে হাজর স্বরচিত
‘তাহযিব আত্ তাহযিব’ গ্রন্থে (২:৩০০-৩০১) যাঁর
এসনাদে দুর্বল বা প্রত্যাখ্যাত
রাফেযী শিয়া ’আমর ইবনে সাবিত ইবনে হুরমুয
আল-বাকরী বিদ্যমান। দেখুন – আল-
হায়তামী (৯:১৮৯)।]
ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন মোহাম্মদ
ইবনে ’আমর [নোট-৪৪: ইমাম নাবহানীর
বইয়ে ‘উমর’ লেখা হয়েছে,
যা ‘তারিখে দিমাশ্ক’ ও ‘কানযুল উম্মাল’
কেতাবগুলো থেকে সংশোধিত] ইবনে হাসান
(রা:) হতে, তিনি বলেন: “আমরা ইমাম হুসাইন (রা:)-
এর সাথে কারবালার (পাশে) নদীতে ছিলাম
[নোট-৪৫: কুফা নগরীর চব্বিশ মাইল উত্তর
পশ্চিমে] যখন তিনি শিমার ইবনে যি আল-
জাওশানের দিকে তাকান এবং বলেন, ‘আল্লাহ ও
তাঁর রাসূল (দ:) সঠিক বলেছেন! রাসূলুল্লাহ (দ:)
বলেন,
“আমি দেখতে পাচ্ছি একটা ফোটা ফোটা
দাগবিশিষ্ট কুকুর আমার ঘরের মানুষদের রক্তের
ওপর লালা ঝরাচ্ছে”।’ শিমার
কুষ্ঠরোগী ছিল।” [নোট-৪৬:
এটা বর্ণনা করেন ইবনে আসাকির ‘তারিখে দিমাশ্ক’
গ্রন্থে (২৩:১৯০); দেখুন – ’কানয’ (#৩৭৭১৭)
এবং আল-বেদায়া।]
ইবনে আল-সাকান, আল-বাগাবী ও আবু নুয়াইম
বর্ণনা করেন হযরত আনাস ইবনে আল-হারিস (রা:)
থেকে, তিনি বলেন: “আমি মহানবী (দ:)-
কে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয় আমার এই
নাতি (হুসাইনকে ইশারা করে) কারবালা নামের এক
জায়গায় শহীদ হবে। তোমাদের কেউ
ওখানে তখন উপস্থিত থাকলে তাকে সাহায্য
করো।’ অতঃপর হযরত আনাস ইবনে আল-হারিস
(রা:) কারবালা যান এবং ইমাম হুসাইন (রা:)-এর
সাথে শাহাদাত বরণ করেন।” [নোট-৪৭: হযরত
সোহায়ম থেকে বর্ণিত, হযরত আনাস
ইবনে মালিক (রা:) থেকেও বর্ণিত আবু
নুয়াইমের ‘দালাইল’ গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ৫৫৪ #৪৯৩)
এবং আল-বাগাবী ও ইবনে আল-সাকান তাঁদের
সাহাবা-এ-কেরাম সংকলনে। দেখুন – ইবনে হাজর
কৃত ’এসাবা’ (১:১২১), আল-বুখারী প্রণীত ‘আল-
তারিখ আল-কবীর’ (২:৩০ #১৫৮৩); ‘আল-
এস্তিয়াব’ (১:১১২); ‘আল-খাসাইস আল-
কুবরা’ (২:৪৫১)।]
আত্ তাবারানী বর্ণনা করেন হযরত আয়েশা (রা:)
থেকে এই মর্মে যে হযরত রাসূলে করীম
(দ:) এরশাদ ফরমান: “জিবরাইল আমীন
আমাকে বলেছেন আমার নাতি হুসাইন আমার
(বেসালের) পরে আল-তাফফ রাজ্যে (সিরিয়া ও
ইরাকের মাঝে) শহীদ হবে, আর
তিনি আমাকে এই মাটি এনে দিয়ে বলেছেন
যে এতে হুসাইনের সমাধিস্থল
হবে।” [নোট-৪৮: হযরত আয়েশা (রা:)
থেকে এটা বর্ণনা করেন আত্ তাবারানী তাঁর
‘আল-কবীর’ (৩:১০৭ #২৮১৪) ও ’আল-
আওসাত’ (৬:২৪৯ #৬৩১৬) গ্রন্থগুলোতে, যার
এসনাদ দুর্বল বলেছেন আল-হায়তামী (৮:২৮৮,
৯:১৮৮); দেখুন – আস্ সৈয়ুতী রচিত ‘যেয়াদাত
আল-জামে’ আস্ সগীর’ (#১৪৭) এবং কানয
(#৩৪২৯৯)। সামগ্রিকভাবে এটা হাসান (বিশুদ্ধ),
কেননা এই বর্ণনা ও উম্মে সালামা (রা:)-এর
বর্ণনা একে অপরকে সমর্থন দেয়।] ইমাম
আহমদ ও ইবনে সা’আদ এটা হযরত আলী (ক:)
থেকে বর্ণনা করেন নিম্নের প্রকাশভঙ্গিতে:
“আমি অনুভব করি হুসাইন ফোরাত নদীর
তীরে শহীদ হবে।” [নোট-৪৯: হযরত
আলী (ক:) থেকে এটা বর্ণনা করেছেন ইমাম
আহমদ, আবু ইয়ালা (#৩৬৩), ইবনে আবি আসিম
নিজ ‘আল-আহাদ ওয়াল মাসানী’ পুস্তকে (১:৩০৮
#৪২৭), ইবনে আবি শায়বা (৭:৪৮৭ #৩৭৩৬৭), আল-
বাযযার (৩:১০১ #৮৮৪), আত্ তাবারানী তাঁর ‘আল-
কবীর’ কেতাবে (৩:১০৫ #২৮১১), আল-
মিযযী নিজ ‘’তাহযিব আল-কামাল’ গ্রন্থে (৬:৪০৭),
এবং ইবনে হাজর স্বরচিত ’তাহযিব আল-তাহযিব’
বইয়ে (২:৩০০); আল-আরনাওত কৃত
‘মুসনাদ’ (২:৭৭-৭৮ #৬৪৮) ও আল-
মুনাওয়ী (১:২০৪-২০৫)-এর ভাষ্যানুযায়ী ওপরের
সবার এসনাদ দুর্বল, তবে আল-হায়তামী (৯:১৮৭)
ও আল-মাকদেসীর প্রণীত ‘আল-মুখতারা’
কেতাবে প্রদত্ত ভাষ্য এর বিপরীত।
পক্ষান্তরে আয্ যাহাবী দ্বিতীয়
আরেকটি সনদ পেশ করেছেন
যা প্রথমটিকে সমর্থন যোগায়। এই বর্ণনায়
আছে ইমাম হুসাইন (রা:)-এর
অনুপস্থিতিতে তাঁকে হযরত আলী (ক:)-এর
সম্ভাষণ: “সাবরান আবা আবদ-আল্লাহ!” দেখুন –
ইবনে তাইমিয়া রচিত ‘মিনহাজ’ (কুরতুবা সংস্করণের
৩:৩৬৭-৩৬৮) এবং আয্ যাহাবী প্রণীত
‘সিয়্যার’ (রেসালা সংস্করণের ৩:২৮৮=ফিকর
সংস্করণের ৪:৪০৭-৪০৮)।]
আল-বাগাবী তাঁর ‘মু’জাম’ পুস্তকে হযরত আনাস
ইবনে মালিক (রা:) থেকে রওয়ায়াত করেন,
তিনি বলেন: “বৃষ্টির ফেরেশতা (মিকাইল)
মহানবী (দ:)-এর সাথে দেখা করার জন্যে মহান
প্রভুর দরবারে আরয করেন এবং অনুমতি পান।
তিনি দিনের এমন সময়ে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর
ঘরে আসেন যখন
তিনি সাধারণতঃ মা উম্মে সালামা (রা:)-এর
সাথে থাকেন। হুযূর পূর নূর (দ:) বলেন,
‘উম্মে সালামা, দরজা বন্ধ রাখো এবং কাউকেই
ঢুকতে দেবে না।’ তিনি দরজা বন্ধ করার
জন্যে ওর কাছে যাওয়ামাত্র ইমাম হুসাইন (রা:)
ছুটে এসে ঘরে প্রবেশ করেন
এবং মহানবী (দ:)-এর কাছে যান,
যিনি নাতিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খান। এমতাবস্থায়
ফেরেশতা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন,
‘আপনি কি তাঁকে খুব আদর করেন?’ রাসূলে পাক
(দ:) জবাবে ’হ্যাঁ’ বলেন। ফেরেশতা বলেন,
‘নিশ্চয় আপনার উম্মতের কতিপয় লোক
তাঁকে শহীদ করবে; আর আপনি যদি চান,
তবে আমি আপনাকে দেখাতে পারি তাঁকে
কোথায় শহীদ করা হবে।’ তিনি মহানবী (দ:)-
কে সেই জায়গা প্রদর্শন করেন এবং সেখান
থেকে কিছু লালচে মাটি এনে তাঁকে দেন। এই
মাটি উম্মে সালামা (রা:) তাঁর চাদরের
মধ্যে রাখেন।” সাবিত আল-বনানী (রহ:)
যিনি এটা হযরত আনাস (রা:)
থেকে বর্ণনা করেছিলেন, তিনি বলেন,
“আমাদের বিবেচনায় এই জায়গাটি ছিল
কারবালা।” [নোট-৫০: হযরত আনাস (রা:)
থেকে এটা বর্ণনা করেন ইমাম আহমদ, আবু
এয়ালা (৬:১২৯ #৩৪০২), আল-বাযযার (#২৬৪২), আত্
তাবারানী নিজ ‘আল-কবীর’ গ্রন্থে (৩:১০৬
#২৮১৩), ইবনে হিব্বান (১৫:১৪২ #৬৭৪২ হাদীস
হাসান), আবু নুয়াইম তাঁর ‘দালাইল’
কেতাবে (পৃষ্ঠা ৫৫৩ #৪৯২), আল-
বায়হাকী স্বরচিত ‘দালাইল’ পুস্তকে (৬:৪৬৯),
এবং আল-মিযযী নিজ ‘তাহযিব আল-কামাল’
গ্রন্থে (৬:৪০৮)। দেখুন – কানয (#৩৭৬৭২),
আল-হায়তামী (৯:১৮৭-১৯০), আয্ যাহাবী নিজ
‘সিয়্যার’ কেতাবে (৩:২৮৮-২৮৯=ফিকর
সংস্করণের ৪:৪০৮), এবং আস্ সৈয়ুতী কৃত ‘খাসাইস
আল-কুবরা’ (২:৪৫০)।]
মোল্লা আল-মওসিলীর বর্ণনায় হযরত
উম্মে সালামা (রা:) বলেন: “মহানবী (দ:) আমার
কাছে এক মুঠো লাল মাটি হস্তান্তর
করে বলেন, ‘সে (হুসাইন) যেখানে শহীদ
হবে এটা সেই জায়গার মাটি। এটা যখন
রক্তে পরিণত হবে, তখন
জানবে যে তাকে শহীদ করা হয়েছে’।”
হযরত উম্মে সালামা (রা:) বলেন, “ওই মাটি আমার
কাছে থাকা একটি বয়ামে আমি রাখি, আর সেই
ভয়াবহ দিনের আশংকায় থাকি যেদিন
তা রক্তে পরিণত হবে।” [নোট-৫১: এই রওয়ায়াত
করেছেন আত্ তাবারানী নিজ ‘আল-কবীর’
গ্রন্থে (৩:১০৮ #২৮১৭), আল-মিযযী তাঁর ‘তাহযিব
আল-কামাল’ পুস্তকে (৬:৪০৯), এবং ইবনে হাজর
স্বরচিত ‘তাহযিব আত্ তাহযিব’
কেতাবে (২:৩০০-৩০১)
যা’তে রাফেযী শিয়া ‘আমর ইবনে সাবিত
ইবনে হুরমুয আল-বাকরী সনদের
মধ্যে আছে; এই লোক দুর্বল বা বর্জনীয়।
দেখুন – আল-হায়তামী (৯:১৮৯)।] মহানবী (দ:)
যেভাবে বলেছিলেন, ঠিক সেভাবেই ইমাম
হুসাইন (রা:)-এর শাহাদাত হয় কুফা নগরীর
কাছে ইরাকের কারবালায়, যে জায়গাটি আত্ তাফফ
নামেও পরিচিত। এই হাদীসে তাঁর
আরেকটি বিস্ময়কর মো’জেযা হলো এই যে,
হযরত উম্মে সালামা (রা:) ইমাম হুসাইন (রা:)-এর
শাহাদাতের পরও জীবিত থাকবেন
তা এতে প্রকাশিত হয়েছিল; আর বাস্তবে তাই
ঘটেছিল।
ওয়া সাল্লাল্লাহু আ’লা সাইয়্যেদিনা মুহাম্মাদিন
ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামা তাসলিমা।