মাযহাব বিষয়ে সালাফীদের যুক্তি ও তার খন্ডন

Standard

লেখার এই অংশে আমরা সালাফীদের বিভিন্ন যুক্তি [১,২,৩] সম্পর্কে জানবো – কেন তাঁরা মনে করেন মাজহাব বাদ দিয়ে কুরআন আর সহীহ হাদিসের অনুসরণ করতে হবে? একই সাথে আমি সালাফীদের যুক্তিগুলোকে খন্ডন করারও চেষ্টা করব। যুক্তি-খন্ডন করতে যেয়ে আমি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মালিকি মাজহাবের উসুল (“Set of Principles”) কে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করব। কারণ, যুক্তি-খন্ডনের কথাগুলো আমি মূলত: শেইখ হামযা ইউসুফের লেকচার [৪] থেকে নিয়েছি যিনি একজন মালিকি ইমাম।
সালাফী যুক্তি ১: সকল বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে আমাদের কুরআন ও সহীহ হাদিস মানতে হবে। কিন্তু, প্রচলিত মাজহাবগুলোতে আমরা এমন অনেক বিধান দেখি, যেগুলো সহীহ হাদিস বিরোধী। কাজেই মাজহাবের অনুসরণ করা যাবে না।
যুক্তি-খন্ডন: এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের সব ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মানতে হবে। কিন্তু এমন অনেক সুন্নাহ আছে, যা হাদিস আকারে লিপিবদ্ধ হয়নি কিন্তু মদীনার সাহাবাদের মধ্যে সেই সুন্নাহগুলোর প্রচলন ছিল। ইমাম মালিক এই ক্ষেত্রে সহীহ হাদিসের বিপরীতে সাহাবাদের আমলকে প্রাধান্য দিয়েছেন।  যেমন – শুক্রবারে নফল রোযা রাখা যাবে না, এটা সহীহ হাদিস। কিন্তু, ইমাম মালিক মদীনায় তাবেঈ’নদের মধ্যে শুক্রবারে নফল রোযা রাখার প্রচলন দেখেছেন। এই তাবেঈ’নরা সরাসরি সাহাবাদের থেকেই এই আমল শিখেছেন। ইমাম মালিকের মতে, হয়তো পরবর্তীতে “শুক্রবারে নফল রোজা রাখা যাবে না” হাদিসের বিপরীতে “শুক্রবারে নফল রোজা রাখা উচিত” এর হুকুম রাসূলুল্লাহ(সা) দিয়েছিলেন, ফলে আগের হুকুমটি বাতিল (Abrogate) হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ঐ হুকুমটি হাদিস আকারে আমাদের কাছে পৌঁছায়নি, পৌঁছেছে সাহাবাদের আমলের (Practise) মাধ্যমে।  কাজেই, মালিকি মাজহাব অনুসারে শুক্রবারে নফল রোযা রাখা সুন্নাত, যদিও এর বিপরীতে সহিহ হাদিস আছে [৪]! সুতরাং,  চতুর্থ পয়েন্টের  “কুরআন ও হাদিসকে সেভাবে বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবী ও সালাফরা বুঝেছিলেন” – মাজহাবীরা মনে করে এই মূলনীতি সালাফীরা যতটা অনুসরণ করে, তারা তার চেয়েও বেশী অনুসরন করে।
সালাফী যুক্তি ২: মাজহাবগুলো যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন ইমাম বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) ও ইমাম মুসলিমের (মৃত্যু ২৬১ হিজরী) মতো সহীহ হাদিস গ্রন্থগুলো লেখা হয়নি। ফলে, মাজহাবের ইমামরা অনেক সহীহ হাদিস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। অথবা, কোনো হাদিসকে উনারা হয়তো দুর্বল বলে বাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু ঐ হাদিসটি অন্য কোনো সনদে সহীহ ছিল, যা জানা গিয়েছিলো পরবর্তী সময়ে। এই কারণে মাজহাবগুলোতে এমন অনেক মতামত দেখা যায়, যা সহীহ হাদিস বিরোধী।
যুক্তি-খন্ডন: এই যুক্তিটা বিভিন্ন কারণে [৪] দুর্বল। যেমন –
প্রথমত:  হাদিস সংকলন শুরু হয়েছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবিতকালেই। একথা সুপ্রসিদ্ধ যে, আবু হুরাইরা(রা), ইবনে আব্বাস(রা), আমর ইবনুল আস(রা) সহ প্রচুর সাহাবী লিখিত আকারে হাদিস সংরক্ষণ করেছিলেন [১৫]। এই সব কিতাবের হাদিসগুলি পরবর্তী যুগের হাদিসগ্রন্থগুলোর (যেমন – বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ইত্যাদি) মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। তাই, মদীনার সাহাবারা-তাবেঈনরা বুখারী-মুসলিমের হাদিসগুলো জানতেন না, এ কথা অমূলক।
দ্বিতীয়ত: বেশীরভাগ হাদিসের উৎস মূলত মদীনা শহর, আর ইমাম মালিক তাঁর সারাটা জীবন মদীনায় কাটিয়েছেন তাবেঈনদের কাছে পড়াশুনা করে। ইমাম মালিক সরাসরি ৬০০ তাবেঈনের কাছ থেকে হাদিস ও ফিকহ শিখেছেন, আর এই ৬০০ তাবেঈন শিখেছেন সরাসরি সাহাবীদের কাছ থেকে, মদীনায় তখন ১০ হাজার সাহাবী ছিল।  ইমাম মালিক হাদিস শিখেছেন ঐ যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিশাম ইবনে ‘উরওয়া, ইবনে শিহাব আল-যুহরীর মতো বাঘা মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে আহকাম (হালাল-হারাম) সংক্রান্ত হাদিসের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশী নয়। কাজেই, ইমাম মালিক কোনো বিষয়ের আহকাম সংক্রান্ত সহীহ হাদিসগুলো জানতেন না এই সম্ভাবনা খুবই কম।
তৃতীয়ত: যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে ইমাম মালিক ১০%-১৫% সহীহ হাদিস জানতেন না, তবুও আপনি বলতে পারবেন না যে, মালিকি মাজহাব সহীহ হাদিস এর উপর আমল করে না। এর কারণ হলো, আমরা আগেই বলেছি “মাজহাব” বলতে বুঝায় “উসুল” বা Set of Principles, মাজহাব বলতে কোনো নির্দিষ্ট শারঈ’ বিধানকে বুঝায় না। ইমাম মালিকের মৃত্যুর পর থেকে যখনই নতুন কোনো হাদিস পাওয়া গেছে তখনই মালিকি মাজহাবের আলেমরা সেই নতুন হাদিসের আলোকে তাঁদের বিধানে পরিবর্তন এনেছেন, কিন্তু ইমাম মালিকের দেয়া “উসুল” অনুসরণ করেছেন। একই ব্যাপার অন্য মাজহাবগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন – ইমাম আবু হানিফার ছাত্র শাইবানী (মৃত্যু ১৮৯ হিজরী) বহু ক্ষেত্রে নতুন হাদিসের আলোকে ইমাম আবু হানিফার মতের বিরোধী মতামত দিয়েছেন। কিন্তু, তারপরেও ইমাম শাইবানী হানাফী মাজহাবের অনুসারী, কারণ তিনি ইমাম আবু হানিফার “উসুল” অনুসরণ করেছেন। গত ১১০০ বছর ধরে বিভিন্ন মাজহাবের আলেমরা এভাবে করেই নতুন পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে তাঁদের মতামতে পরিবর্তন এনেছেন।
উল্লেখ্য যে, হানাফী মাজহাবের উসুল অনেক অংশেই নেয়া হয়েছে কুফার সাহাবাদের কাছ থেকে [২৮]। আলী(রা) তাঁর খিলাফত মদীনা থেকে কুফায় সরিয়ে নেয়ার পর, বহু সংখ্যক সাহাবী কুফায় চলে আসেন। আলী (রা) সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদকে কুফার কাজী নিযুক্ত করেন। আর কুফার সাহাবীদের উসুলই হানাফী মাজহাবের উসুল।
সালাফী যুক্তি ৩: মাজহাবগুলি তাদের ইমামের মতামত এর বিপরীতে সহীহ হাদিস পাওয়া যাওয়ার পরেও সহীহ হাদিসের অনুসরণ না করে তাদের ইমামের মতামতকে অনুসরণ করে। কিন্তু, সকল মাজহাবের ইমামই কি বলেননি “সহীহ হাদিসই আমার মাজহাব”?
উত্তর: প্রত্যেক ইমামই যথাসাধ্য সহীহ হাদিস অনুসরণ করেছেন এবং সেই মাজহাবের আলেমরাও সবসময় সহীহ হাদিসের ভিত্তিতেই বিধান দিয়েছেন। কিন্তু, আমাদের মনে রাখতে হবে যে সহীহ হাদিসকে সেভাবেই বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছিলেন (৪ নং পয়েন্ট)। এমন বহু সহীহ হাদিস আছে যেগুলো অন্য সহীহ হাদিস বা কুরআনের আয়াত দ্বারা অবলুপ্ত (Abrogate) হয়ে গেছে, আবার এমনও সহীহ হাদিস আছে যেগুলো ১০০% সত্য হওয়ার পরেও সাহাবারা সেগুলির উপর আমল করতেন না, কেন করতেন না সেটা আমাদের অনেক ক্ষেত্রে জানা আছে, অনেক ক্ষেত্রে জানা নেই।
আসুন মালিকি মাজহাব থেকে একটা উদাহরণ দেখা যাক। ইমাম মালিক তার মুওয়াত্তায় নামাজে দাড়িয়ে হাত বুকে রাখতে হবে এই সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু, ইমাম মালিকই তাঁর মাজহাবে হাত ছেড়ে নামাজ পড়তে বলেছেন। কেন? কারণ, ঐ যে – “হাদিস বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা তা বুঝেছিলেন”। ইমাম মালিক মদীনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ তাবেঈ’নদের হাত ছেড়ে নামাজ পড়তে দেখেছেন, তাবেঈনরা এটা দেখেছেন মদীনার সাহাবাদের কাছ থেকে। ইমাম মালিকের এই মতের পক্ষের হাদিসও কিন্তু বুখারী শরীফেই আছে [২৩,২৪,২৫]। বর্ণিত হাদিসটিতে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) একজন সাহাবীকে শিখিয়েছেন কিভাবে নামাজ পড়তে হবে, কিন্তু তিনি তাকে হাত বাঁধার কথা বলেননি।  মালিকি মাজহাবের মতে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কখনো কখনো হাত বেঁধে নামাজ পড়েছেন এটা দেখানোর জন্য যে, ইচ্ছা করলে এভাবেও নামাজ পড়া যায়। উল্লেখ্য, অনেকে বলে থাকে যে, ইমাম মালিক মৃত্যুর আগের শেষ কয়দিন “হাতে ব্যথা থাকার কারণে” হাত না বেঁধে নামাজ পড়তেন – এই কথার কোনও ভিত্তি নেই [৪]।
আবার অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে যে, অনেক সুন্নাহ/হাদিস আছে যা সালাফদের জানা ছিল, কিন্তু সেই সুন্নাহটি সহীহ হাদিস আকারে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে নাই। কারণ, ইমাম বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) বা ইমাম মুসলিম (মৃত্যু ২৬১ হিজরী) যেহেতু মাজহাবের ইমামদের প্রায় ৫০/৬০ বছর পর হাদিস সংগ্রহ শুরু করেছেন, এমন হতেই পারে – যে হাদিসটি ইমাম মালিক বা ইমাম আবু হানিফার কাছে সহীহ ছিল, তা বুখারী-মুসলিমের যুগে আসতে আসতে যইফ (দুর্বল) হয়ে গেছে। কিন্তু, মাজহাবের ইমামরা সেই সুন্নাহ সম্পর্কে সহীহ সনদে অবগত ছিলেন এবং সেই অনুসারে তাদের মাস’আলা দিয়েছেন।
“হাদিসের এ সকল গ্রন্থ সংকলিত হওয়ার পূর্বে যে সব ইমাম অতিক্রান্ত হয়ে গেছেন তাঁরা পরবর্তীদের চেয়ে অনেক বেশী হাদিসের জ্ঞান রাখতেন। কারণ, তাঁদের নিকটে এমন বহু হাদিস ছিল যা আমাদের পর্যন্ত মাজহুল (অজ্ঞাত) বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন) সনদে পৌঁছেছে কিংবা আদৌ পৌঁছেনি”।  (রাফউল মালাম আনিল আয়িম্মাতিল আ’লাম – ইবনে তাইমিয়াহ – পৃষ্ঠা ১৮। [১৯]
সালাফী যুক্তি ৪: সাহাবাদের তো কোনো মাজহাব ছিল না, আপনারা মাজহাব পেলেন কোত্থেকে?
যুক্তি-খন্ডন: আমরা আগেই বলেছি কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে বিধান দেয়ার “উসুল” (Set of Principles) কেই মাজহাব বলে। সাহাবীরাও কিছু “উসুল” অনুসরণ করেই বিধান দিতেন। একথা সুবিদিত যে মদীনার সাহাবাদের “উসুল” (Set of Principles) , কুফার সাহাবাদের “উসুল” (Set of Principles)  থেকে আলাদা ছিল [৪,৭]।
আর আপনি যদি সাহাবাদের পদ্ধতিই অনুসরণ করতে চান তাহলে আমি বলব সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে ইমাম মালিকের মাজহাব অনুসরণ করা। কারণ, ইমাম মালিকের জীবদ্দশায় এই মাজহাবের নাম কিন্তু মালিকি মাজহাব ছিল না, এর নাম ছিল “মাদানী মাজহাব”, কারণ মদীনার সাহাবী ও তাবেঈনরা এই “উসুল” অনুসরণ করতেন। ইমাম মালিক শুধু সেই “উসুল” কে একটা সিস্টেম এর মধ্যে এনে লিপিবদ্ধ করে একে মাজহাব এর রূপ দিয়েছেন।
সালাফী যুক্তি ৫: সব মাজহাব যদি একই কুরআন আর সুন্নাহ এর অনুসরণ করে থাকে, তাহলে এদের বিধানগুলো এত আলাদা কেন?
যুক্তি-খন্ডন: একই কুরআন – সুন্নাহ অনুসরণ করার পরেও বিধান আলাদা হয় আলাদা “উসুল” [৪,৬,১৯] এর কারণে। “উসুল” এর এই পার্থক্যের কিছু উদাহরণ দেখুন –
ইমাম মালিক মুরসাল হাদিস (যে হাদিস সাহাবা নয় বরং তাবেঈ’ থেকে বর্ণিত হয়েছে) গ্রহণ করেছেন, আর ইমাম শাফেঈ’ শুধু নির্দিষ্ট কিছু তাবেঈ’র মুরসাল হাদিস নিয়েছেন।
ইমাম মালিক মদীনার তাবেঈ’দের আমলকে সহীহ হাদিসের বিপরীতে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি হলো – যে মদীনার মাটিতে ১০ হাজার সাহাবা শুয়ে আছেন, সেই মদীনার সাহাবা ও তাবেঈ’দের আমল সহীহ হাদিসের চাইতেও শক্ত দলীল (আবার সেই ৪ নং পয়েন্ট)। কারণ, হাদিস বুঝার ক্ষেত্রে আমাদের চাইতে তাঁদের জ্ঞান নি:সন্দেহে বেশী ছিল।
কিছু মুতাওয়াতির হাদিস (যে হাদিস তার সনদের প্রত্যেক স্তরে বহু মানুষ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে) আছে যেগুলি কুরআনের আয়াতের সাথে আপাত: দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক (Apparently Conflicting)। এই ক্ষেত্রে কি কুরআনের আয়াত নেয়া হবে নাকি হাদিসকে নেয়া হবে – তা নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একেক মাজহাব এক্ষেত্রে একেকটাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
যদি কোনও আহাদ হাদিস (যে হাদিসের সনদের  প্রতিটা স্তরে তিনজনের বেশী বর্ণনাকারী পাওয়া যায় না) কুরআনের কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে হানাফী মাজহাব হাদিস সহীহ হওয়া সত্ত্বেও, সেটা না নিয়ে কিয়াস ব্যবহার করে। এটা একটা কারণ যার ফলে আমরা হানাফী মাজহাবে সহীহ হাদিস বিরোধী এত আহকাম (Islamic Ruling) দেখতে পাই।
কোন্‌ হাদিসগুলো ‘আম (General), আর কোন্‌ হাদিসগুলো খাস (Specific/Exception) – এই বিষয়ে ইমামদের মতপার্থক্যের কারণেও ফিকহী পার্থক্য হয়।
অন্যদিকে হাম্বালী ও সালাফীরা হাদিসকে আক্ষরিক ভাবে মেনে চলেন, ফলে আমরা হাদিসের কিতাবগুলিতে যে হাদিসগুলি পাই, সেগুলোর সাথে এই মাজহাবগুলোর সরাসরি মিল সবচেয়ে বেশী।
আবু-বকর(রা) ও উমার(রা) এর মতপার্থক্য [২৯]: “উসুল” এর এই ধরনের পার্থক্য সাহাবাদের সময় থেকেই ছিল, আর তাবেঈনদের মধ্যে তো ছিলই। দুইজন সম্পূর্ন ভিন্ন বিধান এর অনুসারী হয়েও দুইজনেই সঠিক হতে পারে, যদি তাদের নিয়ত হয় আল্লাহর ﷻ হুকুমকে মনে চলা। শ্রেষ্ঠ দুই সাহাবী আবু বকর(রা) ও উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) অসংখ্য বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করতেন, তারপরেও তারা দুইজনেই রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে নিঁখুতভাবে অনুসরণ করেছেন [২৭]। যেমন – আবু বকর(রা) এর খিলাফতকালে সাহাবীদের যে ভাতা দেয়া হতো, তা সকল সাহাবার জন্য সমান অংকের ছিল। আবু বকর(রা) এর যুক্তি ছিল – মহান আল্লাহ ﷻ কুরআনে বলেছেন যে তিনি সকল সাহাবার উপরই সন্তুষ্ট (http://quran.com/9/100) , তাই তাঁরা সবাই সমান ভাতা পাবেন।
অন্যদিকে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) খলীফা হওয়ার পরেই এই নিয়মের পরিবর্তন করলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যারা ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে তা গ্রহন করেছে, তারা যে কষ্ট সহ্য করেছে সেই তুলনায় যারা পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তারা অনেক কম কষ্ট সহ্য করেছে, ফলে তাদের মর্যাদাও কম। কে কত আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে এর ভিত্তিতে তিনি ভাতার স্কেল নির্ধারণ করেন। এখানে আবু বকর(রা) ও উমার(রা) এর মতামত সম্পুর্ণ বিপরীত – কিন্তু তাঁরা দুইজনেরই নিয়ত ছিল রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে  নিঁখুতভাবে অনুসরণ করা। সাহাবাদের জীবন ঘাঁটলে এরকম অগুনতি পরষ্পর-বিরোধী মতামত পাওয়া যায় [২৭]। কিন্তু, যেহেতু তাঁদের প্রত্যেকেরই নিয়ত শুদ্ধ ছিল, কাজেই যিনি যে বিধান অনুসরণ করেছেন, তাঁর জন্য সেটাই শুদ্ধ ছিল।
সালাফী যুক্তি ৬: শাফেঈ’ মাজহাব বলে অজু করে স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকে না, হানাফী মাজহাব বলে অজু থাকে। কিন্তু, দুইটা তো একই সাথে সঠিক হতে পারে না। তার চাইতে যে মতামতটা অধিকতর সঠিক সেটা অনুসরণ করাই কি উচিত না?
যুক্তি-খন্ডন: প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক মাজহাব তাদের “উসুল” (Set of Principles) অনুসারে যেটা সবচেয়ে সঠিক সেটাই বেছে নিয়েছে। “স্ত্রীকে স্পর্শ করলেও অজু থাকে” – হানাফী মাজহাবে এটাই সঠিক। কারণ, আবু দাউদের সহীহ হাদিসে আছে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) অজু করার পর আয়েশা(রা) কে স্পর্শ করা সত্ত্বেও আবার অজু না করেই নামাজ পড়েছেন। অন্যদিকে, শাফেঈ’ মাজহাব এর মতে  “স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকে না ” –  এটাই সঠিক (এই বিষয়ে শাফেঈ মাজহাবের বিস্তারিত প্রমাণের জন্য এই লেখাটি পড়ুন)। কারণ, তাদের মতে সূরা মায়িদার ৬ নং আয়াতে আল্লাহ ﷻ বলেছেন – “স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকবে না” এবং এই আয়াতটি আবু দাউদের হাদিসের উপর প্রাধান্য পাবে, ফলে আবু দাউদের হাদিসের বিধানটি অবলুপ্ত (Abrogate) হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। কাজেই, আপনি যদি বলে থাকেন ইমাম আবু হানিফা এর মতামত এক্ষেত্রে ইমাম শাফেঈ’র মতামতের চেয়ে বেশী সঠিক, তাহলে আপনি আসলে বলছেন যে সেটা আপনার “উসুল” অনুসারে বেশী সঠিক।
সালাফী যুক্তি ৭: আব্বাসীয় শাসন আমলে এরকম ফতোয়া ছিল যে, হানাফীরা শাফেঈদের বিয়ে করতে পারবে না। শুধু তাই না, দামেস্ক ও মক্কায় চার মাজহাবের জন্য চারটি পৃথক মিহরাব ছিল এবং তারা ভিন্ন ভিন্ন জামাতে নামাজ পড়ত। কাজেই, এভাবে করে মাজহাব কি মুসলিম উম্মাহ এর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে নাই?
উত্তর: মাজহাব নিয়ে এ ধরনের বাড়াবাড়ি অতীতে হয়েছে একথা সত্য এবং মাজহাবের নামে মুসলিম উম্মাহর এইরকম বিভক্তি মোটেও কাম্য নয় [৪]। কিন্তু, আপনি যখন জানবেন কেন এরকম করা হয়েছিল, তখন পুরো বিষয়টাকে ভিন্ন দৃষ্টিভংগীতে দেখতে পারবেন।
হানাফী আর শাফেঈ’রা একে অপরকে বিয়ে করতে পারবে না —এই ফতোয়া এই জন্য দেয়া হয়েছিল যে, দুইটি ভিন্ন মাজহাবের বিয়ে সংক্রান্ত বিধি-বিধানগুলো ভিন্ন হওয়ায়, একজন মুফতীর পক্ষে কিছু কিছু ব্যাপারে মতামত (Islamic Ruling) দেয়া কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেমন – এক মাজহাব মনে করে ডিভোর্সের জন্য একবার তালাক বলতে হবে, আর আরেক মাজহাব মনে করে ডিভোর্সের জন্য তিনবার তালাক বলতে হবে।  স্বামী-স্ত্রী দুইজন যদি দুই ভিন্ন মাজহাবের মানুষ হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, কোন্ মাজহাব অনুসারে তাদের মামলা পরিচালনা করা হবে? এই ধরনের ঝামেলা এড়ানোর জন্য তখনকার মুফতিরা “এক মাজহাবের মানুষ অন্য মাজহাবের মানুষকে বিয়ে করতে পারবে না” – জাতীয় উদ্ভট ফতোয়া দিয়েছিল, যেটা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। তাদের উচিত ছিল কিভাবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখা যায় তা নিয়ে চিন্তা করা [৪]।
মক্কায় আর দামেস্কে চার মাজহাবের জন্য চার মিহরাব স্থাপন হলো মাজহাব-সন্ত্রাসের এক চরম উদাহরণ, যা অস্বীকার করার উপায় নাই [৪]। কিন্তু এর দোষ আপনি মাজহাবকে দিতে পারেন না, এর জন্য দোষ দিতে হবে মানুষের চরমপন্থী চিন্তাভাবনাকে। চরমপন্থী চিন্তা-ভাবনা সব সময়ই খারাপ, তা সে মাজহাব নিয়েই হোক, সালাফীবাদ নিয়েই হোক আর নাস্তিকতা নিয়েই হোক। মাজহাবী চরমপন্থার যে উদাহরণ আপনি দিচ্ছেন, সেই একইরকম উদাহরণ নাস্তিকেরা ব্যবহার করে এটা প্রমাণ করার জন্য যে “ধর্ম খারাপ”। কারণ, ধর্মের কারণে আগের শতাব্দীগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। কিন্তু, ভেবে দেখুন আগের শতাব্দীর সেই গণহত্যাগুলোর জন্য কি ধর্ম দায়ী নাকি মানুষের চরমপন্থী চিন্তা-ভাবনা আর অন্য মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা দায়ী?
সালাফী যুক্তি ৮: রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন সেভাবে নামাজ পড় যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখ, তারপরেও মাজহাবীরা সহীহ হাদিসের বিপরীতে নামাজ পড়ে  কেন?
উত্তর: লক্ষ্য করুন – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখ” (বুখারী)। মাজহাবীদের মতে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর মতো করে নামাজ পড়ার দাবী যতটা ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফা করতে পারেন, শাইখুল হাদিস আলবানী ততটুকু করতে পারেন না [৪]। কারণ, ইমাম আবু হানিফা নামাজের মাস’আলা নিয়েছেন মূলত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ এর ছাত্রদের থেকে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ মক্কার প্রথম ১০ জন ইসলাম গ্রহনকারীদের একজন যিনি দীর্ঘ ২০ বছর রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়েছেন। সাহাবারা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে নামাজ পড়তে “দেখেছেন”, আবার তাবেঈ’রা সাহাবাদের নামাজ পড়তে “দেখেছেন”। আপনাকে স্বীকার করতে হবে – কোন কিছু “পড়ে শেখার” চেয়ে উস্তাদের কাছ থেকে সরাসরি “দেখে শিখলে” ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
অন্যদিকে, ইমাম মালিক তাঁর নামাজের মাস’আলাগুলো নিয়েছেন [৪] প্রধানত: আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার(রা) এর ছাত্র ও মুক্তিকৃত দাস নাফি’ (মৃত্যু ১১৭ হিজরী) থেকে, আর নাফি’ নিয়েছেন আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার(রা) থেকে, যিনি সব সাহাবীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে সবচেয়ে অনুকরণ বেশী করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) সেই ধরনের জুতা পড়তেন যা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন, ঠিক একই কাপড় পড়তেন যা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন। তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব যে উনি নামাজ পড়তেন যেভাবে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন না? ইমাম বুখারী নিজে “ইমাম মালিক -> নাফি’ -> আব্দুল্লাহ ইবনে উমার -> রাসূলুল্লাহ(ﷺ)” এর সনদ কে “স্বর্ণালী সনদ” (সিলসিলাতুল যাহাব / The Golden Chain of Narrators) বলে আখ্যায়িত করেছেন।     এখন আপনিই বলেন – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কিভাবে নামাজ পড়েছেন, সেই নামাজ কি ইমাম মালিক বেশী বলতে পারবেন, না ১৪০০ বছর পরের কোনও আলেম সঠিকভাবে বলতে পারবে?
আমাদের মনে রাখতে হবে, কিছু কিছু সুন্নাহ আছে যেগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়নি। সাহাবারা, তাবেঈ’রা  অনেক সুন্নাহই সংরক্ষণ করেছেন তাদের কাজের (Practise) মাধ্যমে। আর মাজহাবের ইমামরা অনেক ক্ষেত্রেই সহীহ হাদিসকে বাদ দিয়ে সালাফদের কাজকে (Practise) প্রাধান্য দিয়েছেন। এর কারণ হলো সেই ৪ নং পয়েন্ট – “হাদিস বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছিলেন”। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় – মালিকি মাজহাবে “রাফ’উল ইয়াদাইন” করা হয় না। যদিও ইমাম মালিক রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস সম্পর্কে জানতেন। ইমাম মালিকের মতামত হচ্ছে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) মাঝে মধ্যে রাফ’উল ইয়াদাইন করে দেখিয়েছেন যে, নামাজের যে কোনো আল্লাহু আকবারের সাথে চাইলে হাত তোলা যায়, এটা মাকরুহ নয়। এই মতামতের পিছনে যুক্তি কি? এর যুক্তি হলো – রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবা আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) নিজেই নামাজে রাফ’উল ইয়াদাইন করতেন না, কাজেই এর থেকে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ(ﷺ)ও সাধারণত রাফ’উল ইয়াদাইন করতেন না। তাই, ইমাম মালিক রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস জানা সত্ত্বেও তার পক্ষে মত দেননি।
আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয় যে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কিন্তু বলেছেন – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে পড়তে দেখ” (বুখারী), তিনি বলেননি – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নিয়ে লেখা হয়েছে”।  উপরে বর্ণিত কারণে – এই “দেখার” ব্যাপারটা কেউ যদি দাবী করতে পারে তবে সেটা ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফারা যতটুকু করতে পারেন, ১৪০০ বছর পরের কেউ ততটুকু করতে পারবে না।

Advertisements

হানাফী মাযহাব

Standard

image

☑️মহানবীর মাযহাব কি?
মহানবী (দ:)সরাসরি আল্লাহর হকুম আহকাম পালন করতেন,সাহাবীরা ৪ ইমামের মাধ্যমে এবং সরাসরি মহানবী কে অনসুরন করতেন।আর আমাদের জন্য রাসুলের মাধ্যমে আল্লাহর হকুম আহকাম পালন, রাসুলের আনুগত্য করা ফরজ,ফকিহ আলেমদের অনুসরন ওয়াজিব .
☑️ সাহাবীদের মাযহাব কি?
সাহাবায়ে কিরাম যারা সরাসরি রাসূল সাঃ এর কাছে ছিলেন তাদের জন্য রাসূল সাঃ এর ব্যাখ্যা অনুসরণ করা ছিল আবশ্যক। এছাড়া কারো ব্যাখ্যা নয়। কিন্তু যেই সকল সাহাবারা ছিলেন নবীজী সাঃ থেকে দূরে তারা সেই স্থানের বিজ্ঞ সাহাবীর মাযহাব তথা মত অনুসরণ করতেন। যেমন ইয়ামেনে হযরত মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ এর মত তথা মাযহাবের অনুসরণ হত। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাঃ কে অনুসরণ করতেন ইরাকের মানুষ। রাসূল সাঃ যখন মুয়াজ বিন জাবাল রাঃ কে ইয়ামানে পাঠাতে মনস্ত করলেন তখন মুয়াজ রাঃ কে জিজ্ঞেস করলেন-“যখন তোমার কাছে বিচারের ভার ন্যস্ত হবে তখন তুমি কিভাবে ফায়সাল করবে?” তখন তিনি বললেন-“আমি ফায়সালা করব কিতাবুল্লাহ দ্বারা”। রাসূল সাঃ বললেন-“যদি কিতাবুল্লাহ এ না পাও?” তিনি বললেন-“তাহলে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নাত দ্বারা ফায়সালা করব”। রাসূল সাঃ বললেন-“যদি রাসূলুল্লাহ এর সুন্নাতে না পাও?” তখন তিনি বললেন-“তাহলে আমি ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করব”। তখন রাসূল সাঃ তাঁর বুকে চাপড় মেরে বললেন-“যাবতীয় প্রশংসা ঐ আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে সেই তৌফিক দিয়েছেন যে ব্যাপারে তাঁর রাসূল সন্তুষ্ট”। {সূনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৩৫৯৪, সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং-১৩২৭, সুনানে দারেমী, হাদিস নং-১৬৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২০৬১}
এই হাদীসে লক্ষ্য করুন-রাসূল সাঃ এর জীবদ্দশায় হযরত মুয়াজ রাঃ বলছেন যে, আমি কুরআন সুন্নাহ এ না পেলে নিজ থেকে ইজতিহাদ করব, আল্লাহর নবী বললেন-“আল হামদুলিল্লাহ”। আর ইয়ামেনের লোকদের উপর হযরত মুয়াজের মত তথা মাযহাব অনুসরণ যে আবশ্যক এটাও কিন্তু হাদীস দ্বারা
☑️ *সাহাবা-এ-কেরাম (রা:)-এর যুগে চারজন ইমাম ছিলেন।
হাফেয ইবনে কাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যা লিখেছে যে সে লিখে, “মক্কা মোযাযযমায় ছিলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:), মদীনা মোনাওয়ারায় হযরত যায়দ বিন সাবেত (রা:), বসরা নগরীতে হযরত আনাস বিন মালেক (রা:) এবং কুফা শহরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:)। তাঁদের বেসালের (পরলোকে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার) পরে তাবেঈনদের মধ্যেও ছিলেন বিখ্যাত চার ইমাম। এরা হলেন মদীনা মোনাওয়ারায় হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়াব (রহ:), মক্কা মোয়াযযমায় হযরত আতা ইবনে রাব’আ (রহ:), ইয়েমেনে হযরত তাউস্ (রহ:) এবং কুফায় হযরত ইবরাহীম (রহ:)। এছাড়াও অনেক ইমাম ছিলেন, তবে ওই চারজনই ছিলেন সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।”
[হাফেয ইবনে কাইয়্যেম কৃত ‘আলা’ম-উল-মোওয়াকিয়ীন’, ১০ পৃষ্ঠা]
☑️ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পারস্যবাসীর এক ভাগ্যবান ব্যক্তির সুসংবাদ দিয়েছেন।
হযরত আবূ হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণনা করেছেন। মহানবী (দ:)ইরশাদ করেন-
-যদি দ্বীন সপ্তর্ষিমণ্ডলস্থ সুরাইয়া সেতারার কাছে গচ্ছিত থাকে তখনও পারস্যবাসীর এক ব্যাক্তি তা অর্জন করে নেবে।৩
মুহাদ্দিসগণ বলেছেন এ হাদীসটি ইমাম আ’যম আবূ হানিফা (রা:) এর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। এতে কোনো আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী শাফেয়ী (রহ:) “তাবয়িযূস সহিফা” কিতাবে এবং ইমাম ইবনে হাজার মক্কী (রহ:) “আল খায়রাতুল হিসান” এর মধ্যে “ইমাম আ’যম আবূ হানিফার (রা:) এর ব্যাপারে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ” শিরোণামে অধ্যায় রচনা করেছেন।
@০৩. মুসলিম শরীফ : আস সহীহ, কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা, باب فضل فارس ৪/১৯৭২, হাদিস : ২৫৪৬।

☑️হানাফী মাযহাব গঠন:
——-ইমাম আবু হানিফা (র ছিলেন তাবয়ী,তিনি সরাসরি সাহাবীদের দেখেছেন,তিনি সরাসিরি সাহাবীদের থেকে
হাদিস রেওয়ায়েত করেন,তিনি ইসলামের ৪ মাযহাবের এক মাযহাবের ইমাম ছিলেন।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত একটি উচ্চাঙ্গের ফিকহ-গবেষণা-বোর্ডকে ‘ফিকহ-মজলিস’ শিরোনামে উল্লেখ করা হল । এই মজলিস সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা অনেকেই করেছেন । ড. মুস্তফা সিবায়ী (রহ.)-এর ‘আসসুন্নাতু ওয়া মাকানাতুহা ফিত্ তাশরীইল ইসলামী’, আবু যাহরা (রহ.)কৃত ‘আবু হানীফা’ ও ড. মুস্তফাকৃত ‘আলআইম্মাতুল আরবায়া’ গ্রন্থে এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে, যার সারকথা এই যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ফিকহ-সংকলনে তার ব্যক্তিগত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উপর নির্ভর করেননি; বরং চল্লিশজন শীর্ষস্থানীয় ফকীহ ও মুহাদ্দিসের সমন্বয়ে একটি মজলিস গঠন করেছিলেন, যেখানে এক এক মাসআলার উপর দীর্ঘ আলোচনা-পর্যালোচনা হত । সবশেষে যে সিদ্ধান্ত দলীলের আলোকে স্থির হত তা লিপিবদ্ধ করা হত । কখনো এক মাসআলাতে তিন দিন পর্যন্ত আলোচনা অব্যাহত থাকত । সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে এতটাই সাবধানতা অবলম্বন করা হত যে, মজলিসের একজন সদস্যও অনুপস্থিত থাকলে তাঁর অপেক্ষা করা হত এবং তাঁর মতামত উপস্থাপিত হওয়ার পরই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হত । সে সময়ের বড় বড় মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকীহ এই ফিকহ-মজলিসের সদস্য ছিলেন ।
তাই একথা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গেই বলা যায় যে, যে ফিকহ পরিপূর্ণভাবে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াসের উপর ভিত্তিশীল এবং যা ইসলামের স্বর্ণযুগে যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের তত্ত্বাবধানে সংকলিত হয়েছে এরপর আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত যার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা দান করেছেন তার স্থায়ীত্ব ও উপযোগিতা প্রশ্নাতীত এবং তা পরবর্তী যুগের লোকদের স্বীকৃতি ও সমর্থনের মুখাপেক্ষী নয় । অতএব কিছু মানুষের অস্বীকৃতি ও বিরোধীতা এর গ্রহণযোগ্যতাকে কিছুমাত্র হ্রাস করবে না ।
সুত্রঃ ইবনে কাছীর,আর বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০ খন্ড,* আবু যাহরা, আবু হানীফা, দারুল ফিকরিল আরাবী, পৃ, 213; আস-সিবায়ী, আস-সুন্নাত ওয়া মাকানাতুহা …., আল-মাকতাবুল ইসলামী, পৃ, 427; ড. মুসতফা, আল-আইম্মাতুল আরাবাআ, দারুল কুতুবিল মিসরিয়া, পৃ, 65

চার মাযহাব যারা মানে না তারা নিজেরাই বিভিন্ন দলে বিভক্ত

Standard

image

যারা বলে চার মাযহাব হারাম। এ চার মাযহাব মুসলমানদেরকে বিভক্ত করছে। সুতরাং চার মাযহাব ছেড়ে দিয়ে কোরাআন হাদিস মানতে হবে।তাদের জন্য এ আলোচনা। দেখুন-
আপনারা বলছেন, চার মাযহাব মুসলমানদেরকে চারভাগে বিভক্ত করছে। কিন্তু আপনার জানা প্রয়োজন নামধারী আহলে হাদিসরা যারা একথা বলে বেড়াচ্ছে, তারাই শত শত ভাগে বিভক্ত।
মজার ভিডিওটি দেখুন,

আপনারা বলছেন, মাযহাব মুসলমানদেরকে বিভক্ত করছে তাদের বিভিন্ন ভিন্নধর্মী পরস্পর বিরোধী ফতোয়ার কারণে।
অথচ দেখুন, আপনারা সউদী আরবের যাদেরকে সহীহ আকীদার আলেম বলে মানেন, আপনারা যাদের ব্যাপারে বলেন যে, তারা সহীহ হাদীস ছাড়া কথা বলেন না। তাদের মধ্যে ও কিন্তু রয়েছে একই রকম পরস্পর বিরোধী ফতোয়া। এখন প্রশ্ন হলো, মাযহাব মানলে যদি বিভক্তি আসে, তবে এই সকল সউদী আলেমদের পরস্পর বিরোধী ফতোয়া দ্বারা কেন বিভক্তি আসবেনা?
এখানে সেরকম কিছু মাস’আলা উল্লেখ করবো-

মাস’আলাঃ১
_____________________
স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্র ব্যবহার
বিন বাযের মাযহাবঃ
খাবার হোক অথবা পান ক রা হোক, বা অন্য কোন কিছুর জন্য হোক, কোন কিছুর জন্যই স্বর্ণ ও রৌপ্যের পাত্র ব্যবহার হারাম।
মাজমু উ ফাতাওয়া- ২৯/১০-৯

আলবানীর মাযহাবঃ
স্বর্ণের পাত্র ব্যবহার হারাম, তবে রৌপ্যের পাত্র খাবার এবং পান ক রা ছাড়া অন্য কাজে ব্যবহার জায়েয।
আছা ছামারুল মুসতাতাব-১/৭

বিন উছাইমিনের মাযহাবঃ
খাবার এবং পান ক রা ছাড়া অন্য যে কোন কাজের জন্য স্বর্ণ এবং রৌপ্যের পাত্র ব্যবহার ক রা জায়েয।
আশ শারহুল মুমাত্তা- ১/৮৬-৮৭
_____________________
ওরে বাপ্পুসরে!
একজন বলে হারাম, আরেকজন বলে জায়েয!!!!!
এমন পরস্পরবিরোধী ফতোয়ায় বিভক্তি নির্মূল হয়ে সুন্দর ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাই না ভাইয়া?

মাস’আলাঃ২
______________________
মোজার উপর মাসেহ করে খোলে ফেললে অযু থাকবে কী না?
বিন বাযের মাযহাবঃ
মোজার উপর মাসেহ করে পরে যদি কেউ তা খুলে ফেলে তবে অযু বাতিল হয়ে যাবে।
মাজমু উ ফাতাওয়া- ২৯/৬৯
আলবানীর মাযহাবঃ
মোজার উপর মাসেহ করে পরে তা খোলে ফেললে অযু বাতিল হবেনা। বিশুদ্ধ থাকবে।
তামামুল মান্নাহ-১১৪-১১৫
_____________________
তাহলে কী বুঝা গেল?
এ অবস্থায় কেউ নামাজে দাড়ালে—
একজনের ফতোয়ায় তার নামাজ হচ্ছেনা। আবার অন্যজনের ফতোয়ায় নামাজ হবে।
ভাবুন, কী অবস্থা!!!
এমন পরস্পরবিরোধী ফতোয়ায় বিভক্তি নির্মূল হয়ে সুন্দর ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাই না ভাইয়া?
মাস’আলাঃ৩
_____________________
জুতার উপর মাসেহ করা
আলবানীর মাযহাবঃ
জুতার উপর মাসেহ ক রা জায়েয। সহীহ হাদীসে আছে।
তামামুল মান্নাহ-১১৩-১১৪

বিন উসাইমিনের মাযহাবঃ
জুতার উপর মাসেহ করা জায়েয নেই।
লিকা আতুল বাবিল মাফতুহ-১/১৮৪
_______________________
বিষয়টি নামাজের সাথে সম্পর্কিত। তো এ অবস্থায় একজনের ফতোয়া নামাজ হবে, আবার অন্যজনের ফতোয়ায় নামাজই হচ্ছে না!!!!
সহীহ আকীদার হুজুরদের এ কেমন পরস্পর বিরোধী ফতোয়া!!!!!
এমন পরস্পরবিরোধী ফতোয়ায় বিভক্তি নির্মূল হয়ে সুন্দর ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাই না ভাইয়া?
মাস’আলাঃ৪
_________________
গুপ্তাঙ্গ স্পর্শ করলে অযু ভঙ্গ হবে কী না?

বিন বাযের মাযহাবঃ
সামনের অথবা পেছনের গুপ্তাঙ্গ হাত দিয়ে স্পর্শ করলে অযু ভেঙ্গে যাবে। সেটা উত্তেজনায় হোক অথবা এমনিই হোক।
আদ দুরূসুল মুহিম্মাহ-৩/২৯৪
আলবানীর মাযহাবঃ
উত্তেজনা বশতঃ স্পর্শ করলে অযু ভেঙ্গে যাবে। অন্যথায় অযু থাকবে।
তামামুল মান্নাহ-১০৩
_____________________
তাহলে কী দাঁড়ালো?
বিন বাযের ফতোয়ায়- অযু করে কেউ যদি এমনিতেই গুপ্তাঙ্গ হাত দিয়ে স্পর্শ করে নামাজে দাড়ালে নামাজ হবে না। আবার আলবানীর ফতোয়া মতে নামাজ হবে।
এ কেমন ঝগড়া? সহীহ আকীদার হুজুরদের?
এমন পরস্পরবিরোধী ফতোয়ায় বিভক্তি নির্মূল হয়ে সুন্দর ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাই না ভাইয়া?
মাস’আলাঃ৫
জুম’আর গোসল করলে কি ফরয গোসল আদায় হয়ে যাবে?
বিন বাযের মাযহাবঃ
জুম’আর দিন গোসল ফরয হলে জুম’আর জন্য দিনে গোসল ক রা হলে ফরয গোসল আদায় হয়ে যাবে। উভয়টির নিয়্যত ক রা হোক কিংবা না হোক। তবে উভয়টির নিয়্যাত ক রা উত্তম।
মাজমু উ ফাতাওয়া- ১২/৪০৬

আলবানী মাযহাবঃ
উভয়টির নিয়ত করলে ও কাজ হবেনা। ফরয গোসল আলাদা করে করতে হবে।
আল হাওয়ী মিন ফাতাওয়াল আলবানী-৪১৪
_________________
তো, আলবানী বলছেন, বিন বাযের ফতোয়া মানলে লোকটার জুম’আর নামাজই আদায় হবে না। কারণ সে এখনো নাপাক রয়ে গেছে। ফরজ গোসল আদায় হয়নি।
কী বলবেন এখন?
এমন পরস্পরবিরোধী ফতোয়ায় বিভক্তি নির্মূল হয়ে সুন্দর মিষ্টি মিষ্টি ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তাই না ভাইয়া?
মাস’আলাঃ৫
____________________
মসজিদে মেহরাব বানানোঃ
বিন বাযের মাযহাবঃ
মসজিদে মেহরাব বানানো বেদ’আত নয়, বরং এটা সালাফে সালিহীনের আমল। তাছাড়া এর মধ্যে অনেক ফায়েদা ও রয়েছে।
ফাতাওয়া নুরুন আলাদ দারব- ২/৭১৬
বিন উসাইমীনের মাযহাবঃ
মসজিদে মেহরাব বানানো সরাসরি সুন্নাহ নয়, তবে মুসতাহাব বলা যাবে। যেহেতু এর পক্ষে শরয়ী দলীল রয়েছে।
তবে বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে, এটা মুবাহ। আদেশ নিষেধ কিছুই করা যাবে না।
আশ শারহুল মুমাত্তা’-২/৩৩২-৩৩৩
আমি অবাক হলাম, বিন উসাইমীনের কিয়াস দেখে। তারা তো বলেন, সহীহ হাদীসের আমল করবেন। কিন্তু এই মাস’আলায় তিনি করলেন কিয়াস।
কীভাবে?
তিনি বললেন,
হাদীসে নিষেধ এসেছে খ্রীস্টানদের মেহরাবের মত মেহরাব না বানাতে। তবে মেহরাব বানাতে গিয়ে তাদের অনুকুরন না করে অন্য পন্থায় বানালে তা মাকরূহ হবেনা।
কেননা মুল কথা হচ্ছে খ্রীস্টানদের সাথে সাদৃশ্য না রাখা। এখন যদি কোনভাবে সাদৃশ্য না হয়, তবে তা মাকরূহ হবে না।
আশ শারহুল মুমাত্তা’-২/৩৩২-৩৩৩

আলবানীর মাযহাবঃ
আলবানী ফতোয়া দিলেন, মসজিদে মাযহাব বানান বিদ’আহ। কিন্তু অবাক, তিনি ঐ দলীল দিলেন, যে দলিল থেকে কিয়াস করে বিন উসাইমীন মুসতাহাব ফতোয়া দিলেন!
এটা ছাড়াও আলবানী অন্য হাদীস দিয়ে দলীল দিয়েছেন,
১/তোমরা মসজিদে মেহরাব বানিওনা। (আলবানীর মতে , সনদ সহীহ)
২/ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদের মেহরাবে নামাজ পড়া পছন্দ করতেন না।
সিলসিলাতুল আহাদীসিদ দায়ীফাহ- ১/৬৪১-৬৪৭
আছ ছামারুল মুসতাতাব-১/৪৭২-৪৭৮
(উল্লেখ্য, এ মাস’আলা নিয়ে আমাদের কোন দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনা করছিনা)
প্রশ্নঃ
______________________
(কথা বলছি তাদের কথার স্টাইলে)
কেন ভাই?
হাদীসে স্পষ্ট বলা হয়ছে খ্রীস্টানদের মত মেহরাব না বানাতে। আলবানী এ স্পষ্ট হাদীস দিয়েই তো বেদ’আত ফতোয়া দিলেন। তো অন্যান্যরা এ বিষয়ে একমত না হয়ে কিয়াস ক রা শুরু করলেন কেন?
সহীহ হাদীস পাওয়া গেছে, তো ব্যাস। মামলা খালাস। এখানে কিয়াস এর কী প্রয়োজন ছিল?
প্রবলেমটা কী?

নামাজে রফে’ইয়াদাইন বারবার হাত উত্তোলন

Standard

নামাজের শুরুতে তাকবীরে তাহরীমার সময় কান পর্যন্ত হাত উঠানো সুন্নাত । নামাযের মধ্যে অন্য সময় রফে’ ইয়াদাইন বা হাত উঠানো জায়েজ নয় (সুন্নাত নয়) । নিম্নে এর দলীল পেশ করা হলোঃ

১. আলকামা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্নিত –

قَالَ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْعُودٍ أَلاَ أُصَلِّى بِكُمْ صَلاَةَ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ فَصَلَّى فَلَمْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ إِلاَّ في أول مَرَّة. أخرجه أبو داود (٧٤٨) والترمذي (٢٥٧) والنسائي (١٠٥٨) وقال الترمذي : حديث حسن وصححه ابن حزم في المحلى ٤/٨٨ وقال أحمد شاكر في تعليقه على الترمذي : هذا الحديث صححه ابن حزم وغيره من الحفاظ وهو حديث صحيح وما قالوا في تعليقه ليس بعلة.

অর্থ: আব্দল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছেন, আমি কি তোমাদেরকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামাযের মত নামায পড়বনা? একথা বলে তিনি নামায পড়লেন, এবং তাতে শুধু প্রথম বারই হাত তুলেছিলেন আর কখনো হাত উঠান নি।

Reference :-
★আবূ দাউদ শরীফ- ৭৪৮,
★তিরমিযী শরীফ-২৫৭,
★নাসায়ী শরীফ-১০৫৮,
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা- ২৪৫৬,
★মুসনাদে আহমদ, ১খ, ৩৮৮পৃ।
★জামউল মাসানীদ

হাদিসের আরো রেফারেন্স সহ মান ও সনদ বিশ্লেষন :-

♦ইমাম তিরমিযি (রহ) একে হাসান বলেছেন।তিনি বলেন,”
‘হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর (রাফয়ে ইয়াদাইন না করা সংক্রান্ত) হাদীস ‘হাসান’ পর্যায়ে উত্তীর্ণ এবং অনেক আহলে ইলম সাহাবা-তাবেয়ীন এই মত পোষন করতেন। ইমাম সুফিয়ান ছাওরী রহ. ও কুফাবাসী ফকীহগণ এই ফতোয়া দিয়েছেন।
(জামে তিরমিযী : ১/৩৫)

♦মুহাদ্দিস আহমদ শাকির এ হাদীস সম্পর্কে বলেন-
“ইবনে হাযম ও অন্যান্য হাফিজুল হাদীস উপরের হাদীসটিকে ‘সহীহ’ বলেছেন।”
(জামে তিরমিযী, তাহক্বীক আহমদ শাকির ২/৪১)

♦আল্লামা ইবনুত তুরকামানী (রহ) বলেন,
“এই হাদীসের সকল রাবী সহীহ মুসলিমের রাবী”
(আল-জাওহারুন নাকী : ২/৭৮)

♦ইবনে মাসউদ (রা) একদল সাহাবীর সামনে হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামায পেশ করেছেন, আর কোন সাহাবী তা অস্বীকার করেননি । বুঝা গেলো, সকলেই তাঁকে সমর্থন করেছেন। যদি হাত উত্তোলন সুন্নাত হতো, তাহলে  সাহাবায়ে কেরাম এর উপর অবশ্যই আপত্তি করতেন। কেননা তাঁরা সকলেই হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলা ইহি ওয়াসাল্লাম)এর নামায দেখেছিলেন ।

♦ ইমাম তিরমীযি বলেন, অনেক ওলামায়ে সাহাবা ও তাবেয়ীন উভয় হাত তুলতেন না। তাদের আমলের দ্বারা এ হাদিছের সর্মথন হলো ।

♦আবূ দাঊদ হযরত সুফয়ান থেকে বর্ণনা করেছেন –
হযরত সুফয়ান এ সনদে বলেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদ্বি.) প্রথমবার হাত তুলেছেন। কোন কোন রাবী বলেন একবারই হাত তুলেছেন।

♦ ইবরাহীম নাখায়ী রহঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে।
রেফারেন্স :-
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ২৪৫৮;
★তাহাবী শরীফ, ১খ, ১১১পৃ;
★মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, ২খ, ৭১পৃ। এটির সনদ সহীহ।

♦ ইমাম  আবু হানিফা (রাদিঃ) যিনি যুগের জলীলুল কদর এবং আযীমুশশান মুজতাহিদ ছিলেন- তিনি এ হাদিসকে কবুল করেছেন এবং এর উপর আমল করেছেন।
★ফতহুল ক্বাদীর
★মিশকাত শরহে মিরকাত)

♦ইমাম মুহাম্মদ ‘কিতাবুল আছারে’ ইমাম আবু হানিফা (রাদি.) হাম্মাদ থেকে তিনি ইবরাহীম নাখঈ থেকে এ ভাবে বর্ণনা করেন-

اِنَّهُ قَالَ لَاتَرْفَعُ الْاَيْدِىْ فِيْ شَىْئٍ مِنْ صَلوتِكَ بَعْدَ الْمَرَّةِ الْاُوْلى

অর্থাৎ, তিনি বলেন, নামাযের মধ্যে প্রথমবার ছাড়া হাত  উত্তোলন করো না।

♦আবূ ইসহাক সাবিয়ী রহঃ উক্ত সনদে বর্ননা করেছেন
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ২৪৬১। এর সনদ অত্যন্ত সহীহ।

২. হযরত বারা ইবনে আযিব রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত:-

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا افتتح الصلاة رفع يديه إلى قريب من أذنيه ثم لا يعود. أخرجه أبو داود (٧٥٢) وابن أبي شيبة (٢٤٥٥) والطحاوي ١/ — وعبد الرزاق في المصنف (٢٥٣٠) والدارقطني (٢٢) فرواه عن البراء ثقتان عدي ين ثابت عند الدارقطني وعبد الرحمن بن أبي ليلى عند غيره وعنهما يزيد بن أبي زياد والحكم بن عتيبة وعيسى والحكم وعيسى ثقتان ويزيد صدوق عند البخاري ومسلم وصحح حديثه الترمذي رقم ( ) وعن يزيد ابن أبي ليلى والسفيانان وشريك و اسرائيل واسماعيل بن زكريا والإمام أبو حنيفة وغيرهم.

অর্থ (সংক্ষেপে) : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায শুরু করার সময় কানের কাছাকাছি হাত তুলতেন। এরপর আর কোথাও হাত তুলতেন না।

Reference :-
★আবূ দাউদ শরীফ-৭৫২,
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা-২৪৫৫,
★তাহাবী শরীফ, ১ম খন্ড
★তানযীমুল আশতাত, ১ম খন্ড (ঊর্দূ), পৃঃ ২৯৩

হাদিসের মান :-

♦বারা ইবনে আযিব (রাদ্বি.) এর হাদিছটি ইমাম তিরমিযী এভাবে বর্ণনা করেছেন- فِى الْبَابِ عَنِ البَرَاءِ

♦ইমাম আবু দাউদ হযরত বারা ইবনে আযিব(রাদ্বি.) থেকে বর্ণনা বরেনঃ

قَالَ رَأيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَفَعَ يَدَيْهِ حِيْنَ اِفْتَتَحَ الصَّلَوةَ ثُمَّ لَمْ يَرْفَعُهُمَا حَتَّى اِنْصَرَفَ

অর্থাৎ,‘তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দেখেছি যখন তিনি নামায আরম্ভ করেছেন, তখন উভয় হাত উত্তোলন করেছেন। পুনরায় নামায থেকে অবসর হওয়ার পূর্বে হাত তোলেননি।

♦দারে কুত্বনী হযরত বারা ইবনে আযিব (রাদ্বি.) থেকে বর্ণনা  করেছেন-
অর্থাৎ, ‘তিনি নবী করীম  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে দেখেছেন, যখন হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নামায শুরু করেন উভয় হাত এ পরিমাণ তুললেন যে, তা কানদ্বয়ের সমান্তরাল হয়ে গেলে। অতঃপর নামায থেকে অবসর হওয়ার পূর্বে আর কোন ক্ষেত্রেই হাত উত্তোলন করেননি ।

৩. হযরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত: –

قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ترفع الأيدي في سبعة مواطن، افتتاح الصلاة واستقبال البيت والصفا والمروة والموقفين وعند الحجر، أخرجه ابن أبي شيبة (٢٤٦٥) موقوفا والطبراني (١٢٠٧٢) مرفوعا.

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সাতটি জায়গায় হাত তুলতে হবে। ১. নামাযের শুরুতে, ২. কাবা শরীফের সামনে আসলে, ৩. সাফা পাহাড়ে উঠলে, ৪. মারওয়া পাহাড়ে উঠলে। ৫. আরাফায় ৬. মুযাদালিফায় ৭. হাজরে আসওয়াদের সামনে।

Reference :-
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা-২৪৬৫ (সাহাবীর বক্তব্যরূপে)।
★তাবারানী, মুজামে কাবীর(রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বক্তব্যরূপে) নং ১২০৭২।
★সুনানে বায়হবাকী, ৫খ, ৭২-৭৩ পৃ।
★ হায়ছামী র. হযরত ইবনে উমর রা. থেকেও মারফূরূপে এটি উল্লেখ করেছেন।(দ্র, ২খ, ২২২ পৃ)

হাদিসের সনদ:-

♦হাকিম ও বায়হাক্বী হযরত আবদুল্লাহ  ইবনে  আব্বাস ও আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বণর্না করেন-

‘হুযুর  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন, সাত জায়গায় হাত উঠাতে হবে- নামায শুরু করার সময়, কা’বার দিকে মুখ করার সময়, সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে, দুইমাওকিফ তথা মিনা ও মুযদালিফায় এবং দু’জুমরা’র সামনে।

♦এ হাদীসটি বাযার হযরত ইবনে ওমর (রাদিঃ) থেকে,

♦হাফিজুল হাদিস ইবনে আবি শায়বাহ হযরত ইবনে আব্বাস (রাদ্বি) থেকে,

♦ইমাম বায়হাকী হযরত ইবনে আব্বাস (রাদ্বি.) থেকে,

♦তাবরানী এবং বুখারী কিতাবুল মুফরাদে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদিঃ) থেকে কিছুটা পার্থক্যের সাথে উল্লেখ করেছেন।

♦কোন কোন রেওয়ায়াতে” দু’ঈদের নামাযেরও উল্লেখ রয়েছে ।

৪. হযরত জাবির ইবনে সামুরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত:-

خَرَجَ عَلَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ مَا لِى أَرَاكُمْ رَافِعِى أَيْدِيكُمْ كَأَنَّهَا أَذْنَابُ خَيْلٍ شُمْسٍ اسْكُنُوا فِى الصَّلاَةِ গ্ধ. أخرجه مسلم (٤٣٠)

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট এসে বললেন, ব্যাপার কি? তোমাদেরকে দেখছি বেয়াড়া ঘোড়ার লেজের মতো করে হাত ওঠাও। নামাযে স্থির থাক।

Reference :-
★মুসলিম শরীফ-হাদীস নং ৪৩০
★আবু দাউদ ১;১০৯
★সুনানে নাসায়ী ১;১১৭

৫. হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেছেনঃ –

رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا أفتتح الصلاة رفع يديه حذو منكبيه وإذا أراد أن يركع وبعد ما يرفع رأسه من الركوع فلا يرفع ولابين السجدتين. أخرجه الحميدي في مسنده من طريق سفيان قال ثنا الزهري قال أخبرني سالم بن عبد الله عن أبيه. وسنده صحيح. ٢/٢٧٧ رقم ٦١٤.

অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি, তিনি যখন নামায শুরু করতেন তখন কাঁধ বরাবর হাত ওঠাতেন। আর যখন রুকু করতে চাইতেন এবং রুকু থেকে উঠতেন, তখন হাত ওঠাতেন না, দুই সেজদার মাঝখানেও না।

Reference :-
★হুমায়দী (ইমাম বুখারীর উস্তাদ) তাঁর মুসনাদে এটি উদ্ধৃত করেছেন। ২খ, ২৭৭ পৃ,(হাদীস নং ৬১৪)। এর সনদ সহীহ।

হাদিসের সনদ বিশ্লেষণ :-

★হাফিজ মুগলতাঈ রহঃ বলেছেন, এর সনদে কোন সমস্যা নেই।
★শায়খ আবেদ সিন্ধী রহঃ বলেছেন, আমার দৃষ্টিতে এটি অবশ্যই সহীহ।
★ইমাম মালিক রহঃ থেকে ইবনুল কাসিম ও ইবনে ওয়াহব রহঃ একবার হাত ওঠানোর যে বর্ণনা পেশ করেছেন, যা আল মুদাওয়ানা’য় বিদ্ধৃত হয়েছে, তা এই বর্ণনার সমর্থন করে। এমনিভাবে হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত পূর্বের হাদীসটি এবং তাঁর আমলও এর সমর্থক।
★ইবনে আবী শায়বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু স্বীয় মুসান্নাফে ও
★তাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু শরহে মাআনিল আছার গ্রন্থে
★ ইমাম মুহাম্মদ রহঃ ও ওনার মুয়াত্তায় হযরত ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর অনুরূপ আমলের কথা উদ্ধৃত করেছেন।
♦বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রহ. উকত সনদ বর্ননা করেছেন
Reference :-
★তাহাবী : ১/১৬৩,
★ইবনে আবী শাইবা : ২/৪১৮ হাদীছ নং ২৪৬৭ [শায়খ আওয়ামা দা.বা. তাহক্বীকৃত নুসখা)
সনদ বিশ্লেষণ :-
♦আল্লামা  তুরকুমানী রহ. বলেছেন, ‘এ বর্ণনার সনদ সহীহ’
(আল-জাওহারুন নাকী)

৬. হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর আমল:

ক) আসিম ইবনে কুলায়ব রহঃ তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেনঃ –

عن عاصم بن كليب عن أبيه أن عليا رضـ كان يرفع يديه في أول تكبيرة من الصلاة ثم لا يرفع بعد. أخرجه ابن أبي شيبة ٢٤٥٧ والطحاوي ١/١١٠ والبيهقي ٢/٨٠ صححه الزيلعي وقال الحافظ في الدراية : رجاله كلهم ثقات وقال العيني : صحيح على شرط مسلم.

অর্থ: হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু নামাযে শুধু প্রথম তাকবীরের সময় হাত তুলতেন। এরপর আর কোথাও তুলতেন না।

Reference :-
★সুনানে বায়হাকী : ২/৮০
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ২৪৫৭;
★তাহাবী শরীফ, ১খ, ১১০পৃ।
★মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ (ঊর্দূ), পৃঃ ৫৫
★তানযীমুল আশতাত, ১ম খন্ড (ঊর্দূ), পৃঃ ২৯৫

সনদ বিশ্লেষণ :-

♦আল্লামা যায়লায়ী রহ. বর্ণনাটিকে ‘সহীহ’ বলেছেন।
♦সহীহ বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যকার আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী রহ. এই বর্ণনার সকল রাবীকে ‘ছিকাহ’ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন।
♦সহীহ বুখারীর অপর ভাষ্যকার আল্লামা আইনী রহ. বলেন, “এ সনদটি সহীহ মুসলিমের সনদের সমমানের।’
(নাসবুর রায়াহ : ১/৪০৬, উমদাতুল কারী :৫/২৭৪, দিরায়াহ : ১/১১৩)

খ) ইমাম বায়হাকি ও ইমাম তাহাবী বর্ননা করেন:-

أَنَّهُ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِى التَّكْبِيْرَةِ الْاُوْلى مِنَ الصَّلوةِ ثُمَّ لَايَرْفَعُ فِى شَىْئٍ مِنْهَا

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নামাযের প্রথম তাকবীরে তার উভয় হাত উত্তোলন করতেন। এরপর আর কোন অবস্থায়ই হাত উঠাতেন না।

Reference :
★ইমাম বায়হাকি : সুনানে বায়হাকি
★ইমাম তাহাবী : তাহাবী

৭. হযরত আসওয়াদ (রা.) বলেছেনঃ –

رأيت عمر بن خطاب رض يرفع يديه في أول تكبيرة ثم لا يعود. أخرجه ابن أبي شيبة (٢٤٦٩) والطحاوي ١/١١١ وصححه الزيلعي وقال الحافظ ابن حجر في الدراية : وهذا رجاله ثقات. وقال المارديني في الجوهر النقي ٢/٧٥: هذا سند صحيح على شرط مسلم.

অর্থ: আমি হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা.কে দেখেছি, তিনি প্রথম তাকবীরের সময় হাত তুলতেন; পরে আর তুলতেন না।

Reference :-
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ২৪৬৯;
★তাহাবী: ১/১৬৪

সনদ বিশ্লেষণ :-

♦আল্লামা যায়লায়ী রহ. এই হাদীসকে ‘সহীহ’ বলেছেন।
♦সহীহ বুখারীর বিখ্যাত ভাষ্যকার আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী রহ. এই বর্ণনার সকল রাবীকে ‘ছিকাহ’ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন।
♦আলজাওহারুন নাকী গ্রন্থে বলা হয়েছে ‘এই হাদীসের সনদ সহীহ মুসলিমের সনদের মতো শক্তিশালী।’
♦ইমাম তাহাবী রহ. বলেন, ‘হযরত ওমর রা. এর আমল এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম রা.-এর কোনরূপ বিরোধিতা না থাকায় প্রমাণ করে যে, সেই সঠিক পদ্ধতি এবং এ পদ্ধতির বিরোধিতা করা কারও জন্য উচিত নয়।’
(তাহাবী : ১/১৬৪)

৮. হযরত আব্বাস ইবনুয যুবায়র রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত: – أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان إذا افتتح الصلاة رفع يديه في أول الصلاة ثم لم يرفعهما في شيئ حتى يفرغ. أخرجه البيهقي في الخلافيات. كما في نصب الراية ١/٤٠٤

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামায শুরু করতেন, তখন শুধু নামাযের শুরুতেই উভয় হাত তুলতেন। এর পর নামায শেষ করা পর্যন্ত আর কোথাও হাত তুলতেননা।

Reference :-
★বায়হাকী তার ‘আল-খিলাফিয়াত’ গ্রন্থে এটি উদ্ধৃত করেছেন।এ হাদীসটির সনদ সম্পর্কে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহঃ বলেছেন, এর বর্ণনাকারীরা সকলেই বিশ্বস্ত।
★বুখারী শরীফের ১ম খণ্ডের টীকা, পৃঃ ১০

৯. আবূ দাঊদ হযরত সুফয়ান থেকে বর্ণনা করেছেন –

حَدَّثَنَا سُفْيَانُ اِسْنَادُهُ بِهَذَا قَالَ رَفَعَ يَدَيْهِ فِىْ اَوَّلِ مَرَّةٍ وَقَالَ بَعْضُهُمْ مَرَّةً وَاحِدَة

অর্থাৎ হযরত সুফয়ান এ সনদে বলেন যে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদ্বি.) প্রথমবার হাত তুলেছেন। কোন কোন রাবী বলেন একবারই হাত তুলেছেন।

১০. ইবরাহীম নাখায়ী রহঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সম্পর্কে বর্ণনা করেনঃ –

أنه كان يرفع يديه في أول ما يفتتح ثم لا يرفعهما . أخرجه ابن أبي شيبة (٢٤٥٨) والطحاوي ١/١١١ وعبد الرزاق ٢/٧١ وإسناده صحيح.

অর্থ: তিনি নামায শুরু করার সময় হাত তুলতেন। পরে আর কোথাও হাত তুলতেন না।

Reference :-
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ২৪৫৮;
★তাহাবী শরীফ, ১খ, ১১১পৃ;
★মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, ২খ, ৭১পৃ। এটির সনদ সহীহ।

১১. আবূ ইসহাক সাবিয়ী রহঃ বলেন,

كان أصحاب عبد الله رض وأصحاب علي رض لا يرفعون أيديهم إلا في افتتاح الصلاة. قال وكيع: ثم لا يعودون. أخرجه ابن أبي شيبة بسند صحيح جدا (٢٤٦١)

অর্থ: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর শাগরেদগণ এবং হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহু উনার শাগরেদগণ কেবল মাত্র নামাযের শুরুতে হাত ওঠাতেন। ওয়াকী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, এর পর আর হাত ওঠাতেন না।

Reference :-
★মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস নং ২৪৬১। এর সনদ অত্যন্ত সহীহ।

এতএব এতসব দলিলাদ্বিল্লার পরো যদি কেউ উল্টো তর্ক করে না মেনে নিজে গুমরাহ হয় এবং অন্যজনকেও গুমরাহ করে তাহলে এর জন্যে সে নিজে সম্পূর্ণ দায়ি হবে।

১২) বিখ্যাত তাবেয়ী মুজাহিদ রহ. বলেন-

‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর পিছনে নামায পড়েছি। তিনি প্রথম তাকবীর ছাড়া অন্য সময় রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন না।’

Reference :-
★তাহাবী : ১/১৬৩,
★ইবনে আবী শাইবা : ২/৪১৮ হাদীছ নং ২৪৬৭ [শায়খ আওয়ামা দা.বা. তাহক্বীকৃত নুসখা)
সনদ বিশ্লেষণ :-
♦আল্লামা  তুরকুমানী রহ. বলেছেন, ‘এ বর্ণনার সনদ সহীহ’
(আল-জাওহারুন নাকী)

১৩) উস্তাযুল মুহাদ্দিসীন ইমাম মালিক রহ. (জন্ম ৯৩ হিজরীতে)। ইলমের অন্যতম কেন্দ্রভূমি মদীনা মুনাওয়ারায় তাঁর জীবন কেটেছে। সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং হাদীস শরীফের বিশাল ভান্ডার তার সামনে ছিল। তিনি শরীয়তের বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে মদীনাবাসীর কর্মকে বুনিয়াদী বিষয় বলে মনে করতেন।

★ইমাম মালেক (রহ) এর প্রসিদ্ধ সাগরিত আল্লামা ইবনুল কাসিম রহ. রাফয়ে ইয়াদাইন প্রসঙ্গে তাঁর যে সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন তা এই-
“ইমাম মালিক রহ. বলেছেন, “নামাযের সূচনা ছাড়া অন্য তাকবীরের সময়, নামায়ে ঝুঁকার সময় কিংবা সোজা হওয়ার সময় রাফয়ে ইয়াদাইন করার নিয়ম আমার জানা নাই।”

★ইবনুল কাসিম রহ. আরো বলেন,
“ইমাম মলিক নামাযের প্রথম তাকবীর ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে রাফয়ে ইয়াদাইন করার পদ্ধতিকে (দলীলের বিবেচনায়) দুর্বল মনে করতেন।”
(আল-মুদাওয়ানাতুল কুবরা)

১৪) ইমাম তাহাবী সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদ্বি.) এবং আসেম ইবনে কুলাইব(রা) থেকে তিনি আলী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন:

عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَنَّهُ كَانَ يَرْفَعُ يَدَيْهِ فِىْ أَوَّلِ تَكْبِيْرَةٍ ثُمَّ لَايَعُوْد

অর্থাৎ, ‘হুযূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে রেওয়ায়াত করেন যে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রথম তাকবীরে উভয় হাত তুলতেন অতঃপর তা আর কখনো করতেন না।

Reference :-
★মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ (ঊর্দূ), পৃঃ ৫৫
★তানযীমুল আশতাত, ১ম খন্ড (ঊর্দূ), পৃঃ ২৯৫

১৫) বুখারী শরীফের শরাহ ‘আইনী’ গ্রন্থের তৃতীয় খন্ডে লেখা হয়েছে যে,
হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্নিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, আশারায়ে মুবাশশারাহ- যাদেরকে নবী করিম (সঃ) বেহেস্তের সুসংবাদ দিয়েছেন তারা নামায আরম্ভ করার সময় ব্যতীত দুই হাত উঠাতেন না । অর্থাৎ রফে’ ইয়াদাইন করতেন না ।
Reference :-
★শরহে বুখারী ইমাম বদরুদ্দীন আইনী গ্রন্থ, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৭

১৬) হযরত হাম্মাদ ইব্রাহীম নাখয়ী (তাবীঈ) বলেছেন যে, তোমরা নামাযে তাকবীরে উ’লা ছাড়া অন্য কোন সময় হাত উঠাবে না ।
Reference :-
★মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ (ঊর্দূ), পৃঃ ৫৫
★জামিউস মাসানীদ : ১/৩৫৩
★আছারুস সুনান

১৭) হযরত শাহ্‌ ওয়ালিউল্লাহ্‌ মুহাদ্দিস দেহলভী এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র ও পৌত্রগণ যারা এই উপমহাদেশে হাদিস শাস্ত্রের প্রচার ও
প্রসার ঘটিয়েছেন তারা নামাযে রফে’ ইয়াদাইন করেন নাই ।
★হানাফীদের কয়েকটি জরুরী মাসায়েল (লেখকঃ মাওলানা মোঃ আবু বকর সিদ্দীক)

১৮) আল্লামা ইবনে আবদুল বার রহ. রাফয়ে ইয়াদাইন সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের অবস্থান বর্ণনা করেছেন-

“হযরত হাসান রা. সাহাবায়ে কেরামের কর্মনীতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাদের মধ্যে যারা রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন তারা রাফয়ে ইয়াদাইন পরিত্যাগকারীদের উপর আপত্তি করতেন না’।
এ থেকে বোঝা যায়, রাফয়ে ইয়াদাইন জরুরি কিছু নয়।”
Reference :-
আত-তামহীদ : ৯/২২৬

১৯) হযরত আবু বকর রা: ও হযরত উমর রা: সমস্ত নামাযে শুধু তাকবিরে তাহরিমার সময় রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন।
Reference :-
★কিতাবুল মুজমা ইমাম ইসমাঈলী ২য় খন্ড

♦♦রাফউল ইয়াদাইন করা ও না করা এই ২ হাদিসের মধ্যে কোন হাদিসটা বেশি শক্তিশালী,শ্রেষ্ঠ এবং অধিক গ্রহনযোগ্য ?♦♦

♦পরিশেষে আমরা ইমামে আযম আবু হানীফার (রাদ্বি.)ঐ বিতর্ক উপস্থাপন করেছি, যা উভয় হাত উত্তোলন এর ব্যাপারে মক্কা মুয়াযযামায় ইমাম আওযাঈ (রাদ্বি.) এর সাথে হয়েছিল।

২০. ইমাম আবু মুহাম্মদ বোখারী মুহাদ্দিস (রাহ.) হযরত সুফয়ান ইবনে উয়াইনা (রাদ্বি.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে,

একবার হযরত ইমামে আযম (রাদ্বি.) এবং ইমাম আওযাঈ (রাদ্বি) এর সাক্ষাত হলো মক্কা মুয়াযযামার ‘দারুল হানাতীন’ নামক স্থানে। এ দ’জন বুর্যুগের মধ্যে কিছু কথাবার্তা হল। বির্তকটি হুবহু নিম্নে উদ্ধৃত করা হলো।

ইমাম আওযাঈঃ আপনি রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু হতে উঠার সময় উভয় হাত উত্তোলন করেন না কেন?

ইমাম আবু হানিফা : এ জন্যই যে, এ সব জায়গায় উভয় হাত উত্তোলন হুযুর  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দ্বারা প্রমাণিত নয়।

ইমাম আওযাঈ : আপনি এটা কিভাবে বললেন? আমি আপনাকে উভয় হাত তোলার ব্যাপারে সহীহ হাদিস শুনাচ্ছি-

‘আমাকে যুহরী হাদিস বর্ণনা করেছেন

তিনি সালিম থেকে

সালিম নিজ পিতা থেকে

তিনি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু   আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন

যে “রাসুলুল্লাহ  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উভয় হাত তুলতেন, যখন নামায শুরু করতেন এবং রুকুর সময় আর রুকু থেকে উঠার সময়।”

ইমামে আযম : আমার কাছে এর  চেয়ে বেশী শক্তিশালী হাদিস এর বিপরীতে বিদ্যমান।

ইমাম আওযাঈ : আচ্ছা! জলদি পেশ করুন।
ইমামে আযম : নিন। শুনুন ।

* আমার কাছে হযরত হাম্মাদ হাদীস বণর্না করেছেন

তিনি ইব্রাহিম নাখঈ থেকে

তিনি হযরত আলক্বামা এবং আসওয়াদ থেকে

তাঁরা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাদি:) থেকে বর্ণনা করেন

তিনি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে নিজে দেখেছেন,

“নিশ্চিয়ই নবী করীম  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শুধু মাত্র নামাযের শুরুতে উভয় হাত উত্তোলন করতেন। এরপর আর কখনো পুনরাবৃত্তি করতেন না।”

ইমাম আওযাঈ: আমার পেশ কৃত হাদীসের উপর আপনার উপস্থাপিত হাদীসের শ্রেষ্ঠত্ব কি? যার কারণে এটা গ্রহন করলেন, আর আমার পেশকৃত হাদিস ছেড়ে দিলেন।

ইমামে আযম : এ, জন্যই যে,
★‘হাম্মদ’ ‘যুহরী’র চেয়ে বড় আলিম ও ফক্বীহ।
★আর ইব্রাহিম নাখঈ সালিম এর চেয়ে বড় আলিম ও ফক্বীহ।
★আলক্বামা ‘সালিমে’র পিতা অর্থাৎ, ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের’ চেয়ে ইলমের ক্ষেত্রে কম নন।
★‘আসওয়াদ’ অনেক বড় খোদা ভিরু ফক্বীহ এবং উত্তম।
★আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদি.) হলেন ফক্বীহ। কিরাআতের ক্ষেত্রে এবং হুযুর পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  এর সাহচর্যের ক্ষেত্রে হযরত ইবনে ওমর (রাদি.) থেকে অনেক বড় ছিলেন। শৈশব থেকে হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে থাকতেন। সুতরাং আমার হাদিসখানার রাবী আপনার হাদীসের রাবীদের চেয়ে ইলম ও মর্যাদার দিক থেকে শ্রেষ্ঠ। এ জন্যই আমার পেশকৃত হাদীস বেশী শক্তিশালী এবং গ্রহনযোগ্য। ইমাম আওযাঈ নিশ্চুপ হয়ে গেলেন।

Reference :
★মিশকাত শরহে মিরকাত
★ফতহুল কাদির

♦♦অনেক ইমামগন এই রাফে ইয়াদাইন সম্পর্কিত হাদিস রহিত হয়ে গিয়েছে বলে মত দিয়েছেন ♦♦

১) বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত মুজাহিদ (রহ) হতে বর্নিত আছে- তিনি বলেছেন যে, আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) এর পশ্চাতে নামায পড়েছি । তিন শুধু প্রথম তাকবীরে তাহরীমার সময় নামাযের মধ্যে হাত উঠিয়েছেন । ইমাম তাহাবী বলেন যে, এই আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) ই রাসূল (সঃ) কে প্রথম রফে’ ইয়াদাইন করতে দেখেছিলেন । কিন্তু (পরে কারনবশত রাসূল (সঃ) এর ইন্তিকালের পর হজরত ইবনে উমর রফে’ ইয়াদাইন পরিত্যাগ করেছিলেন । এর দ্বারা বুঝা যায় যে, রাসূল (সঃ) এর এই আমলটি মনসূখ বা রহিত হয়ে গেছে । এই জন্যেই হযরত ইবনে উমর পরবর্তী সময়ে এই আমল পরিত্যাগ করেছিলেন ।
Reference :-
★আনোয়ারুল মুকাল্লেদীণ, ইফাবা, পৃঃ ৫৫
★তাহাবী : ১/১৬৩,
★ইবনে আবী শাইবা : ২/৪১৮ হাদীছ নং ২৪৬৭ [শায়খ আওয়ামা দা.বা. তাহক্বীকৃত নুসখা)

২) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছিলেন- যে দশজন সাহাবীর বেহেশতী হওয়ার সংবাদ দেয়া হয়েছে, তারা নামায আরম্ভকালে একবার মাত্র রফে’ ইয়াদাইন ব্যতীত তাঁদের হাত উঠাতেন না ।
ইমাম তাহাবী ও আইনী প্রমাণ করেছেন যে, আবূ হুমায়দের রফে’ ইয়াদাইনের হাদীস কয়েকটি কারনে যয়ীফ সাব্যস্ত হয়েছে । সেই দশজন সাহাবা আবূ হুমায়দের সাক্ষাতে ছিলেন, কিন্তু তাঁদের রফে’ ইয়াদাইনের কথা প্রমাণিত হয় না । ইমাম বুখারী যে ১৭জন সাহাবার রফে’ ইয়াদাইনের হাদীস বর্ননা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত উমর, হযরত আলী, ইবনে উমার, আবূ সাইদ ইবনে যুবাইর রফে’ ইয়াদাইন ত্যাগ করেছিলেন। ইমাম তাহাবী হযরত আনাস ও হযরত আবূ হুরায়রায় হাদীস যয়ীফ সাব্যস্ত করেছেন । আল্লামা জায়লাঈ হজর আবূ সাইদ, হযরত ইবনে আব্বাস, হযরত ইবনে যোবায়ের ও হযরত আবূ হুরায়রার হাদিসকে যয়ীফ বলেছেন । সুতরাং ইমাম বুখারীর রফে’ ইয়ায়াদাইনের হাদীস গ্রহণযোগ্য নয় ।
Reference :-
★সাইফুল মুকাল্লেদীন, প্রণেতা মাওঃ ইব্রাহীম মহব্বতপুরী, পৃঃ ৩৫
★নিহায়া
★কিফায়া

৩) ইমাম আযম আবূ হানীফা (রহঃ) এর মতে রফে’ ইয়াদাইনের হাদীস মনসুখ (রহিত) হয়েছে । এটা হযরত আবুদল্লাহ ইবনে মাসঊদ, হজরত বারা ইবনে আযেব, হযরত জাবের ইবনে সামরা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবায়ে কিরামের মত । হজরত উমর, হযরত আলী ও হযরত ইবনে উমর (রাঃ) উক্ত রফে’ ইয়াদাইন ত্যাগ করেছিলেন । কূফাবাসী মুহাদ্দিস, শ্রেষ্ঠ ইমাম সুফিয়ান সওরী, ইবরাহীম নাখয়ী, ইবনে আবী লাইলা, আলকামা, আসওয়াদ, শা’বী, আবূ ইসহাক, খায়ছমা, মুগীরা প্রমুখ মহাবিদ্বান গণের এই অভিমত।
Reference :-
★ কামিউল মুবতাদেয়ীন ফী রদ্দে ছিয়ানাতুল মু’মিনীন ,
৩য় খন্ড, প্রণেতা : মাওলানা রুহুল আমীন বসিরহাটী

৪)  ‘তানযীমুল আশ্‌তাত’ নামক গ্রন্থে বিশ্ববিখ্যাত দারুল উলূম দেওবন্দ মাদ্রাসার শায়খুল হাদীস ফখরুল মুহাদ্দেসীন হযরত মাওলানা ফখরুদ্দীন মূরাদাবাদী উল্লেখ করেছেন যে,
১ম যুগে মুসলমানদের রাজধানী ছিল মদিনায় । তখন সেখানে অনেক অনেক সাহাবায়ে কিরাম ও তাব্যীনে এযাম অবস্থান করতেন । মদীনাবাসীদের আমল দেখে ইমাম মালেক (রহঃ) শেষ জীবনে রফে ইয়াদাইন ত্যাগ করেছিলেন । পরে যখন মদিনা হতে কুফায় রাজধানী স্থানান্তরিত হয়ে গেল, তখন লোকেরা সাহাবা ও তাবেঈগনের আমল দেখে রফে’ ইয়াদাইন করা ত্যাগ করেছিলেন । সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, তৎকালীন মদিনা ও কুফাবাসীগন রফে’ ইয়াদাইন করতেন না ।
Reference :-
তানযীমুল আশতাত, ১ম খন্ড (ঊর্দূ), পৃঃ ২৯৬

৫) ইমাম তাহাবী হযরত মুগিরাহ (রাদিঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আমি  ইবরাহীম নাখঈ (রাদ্বি) এর কাছে  আরজ করলাম যে, হযরত ওয়াইল (রাদি) হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে দেখেছেন যে, তিনি নামাযের প্রারম্ভে রুকুর সময় এবং রুকূ থেকে উঠার সময় হাত উত্তোলন করতেন। তখন  তিনি (ইবরাহীম নাখঈ ) উত্তর দিলেন-

اِنْ كَانَ وَائِلَّ رَاهُ مَرَّةً يَفْعَلُ ذلِكَ فَقَدْ رَاهُ عَبْدُ اللهِ خَمْسِيْنَ مَرَّةً لَا يَفْعَلُ ذلِكَ

অর্থাৎ ‘যদি হযরত ওয়াইল (রা:) হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে একবার হাত উত্তোলন করতে দেখেন, তো হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাদ্বি.) হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে পঞ্চাশ বার হাত উত্তোলন না করতে দেখেছেন।

৬) বোখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার বদরুদ্দীন আইনী (রাদ্বি.) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাদ্বি.) থেকে বর্ণনা করেন-
তিনি এক ব্যাক্তিকে রুকূতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে মাথা তোলার সময় উভয় হাত তুলতে দেখলেন। অতঃপর তাকে বললেন এরূপ করো না, কেননা  এমন  কাজ যা হুযুর  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রথমে করেছিলেন এরপর ছেড়ে দিয়েছেন ।
এ হাদিছ  থেকে বুঝা গেল যে,  রুকুর আগে ও পরে উভয় হাত উত্তোলন করা ‘মানসুখ’ তথা রহিত। যে সব সাহাবী থেকে কিংবা হুযুর  (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে উভয় হাত উত্তোলন প্রমানিত।

অতএব, বিস্তারিত বর্ননা দ্বারা বুঝা গেল রাসুল (সা) কখনো রাফউল ইয়াদাইন করেছিলেন আর সেটা পরবর্তীতে অসংখ্য সহীহ হাদিস দ্বারা মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে।

বুকের হাত বাঁধার হাদিসটা কি সহীহ!!!

Standard

image

️✔️ বুকের উপর হাত বাঁধা সংক্রান্ত আবু দাউদের হাদীসটি কি সহীহ?সুনানে আবু দাউদ (ইফাঃ), ২/ সালাত (নামায) ৭৫৯। আবূ তাওবা তাউস (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযরত অবস্হায় ডান হাত বাম হাতের উপর স্হাপন করে তা নিজের বুকের উপর বেঁধে রাখতেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ – আলবানীحَدَّثَنَا أَبُو تَوْبَةَ، حَدَّثَنَا الْهَيْثَمُ،
– يَعْنِي ابْنَ حُمَيْدٍ – عَنْ ثَوْرٍ، عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ مُوسَى، عَنْ طَاوُسٍ، قَالَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَضَعُ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى يَدِهِ الْيُسْرَى ثُمَّ يَشُدُّ بَيْنَهُمَا عَلَى صَدْرِهِ وَهُوَ فِي الصَّلاَةِ . صحيح (الألباني) حكمএটি মুরসাল হাদীস। কারণ এটি বর্ণনা করেছেন একজন তাবেয়ী। তিনি কোন সাহাবী থেকে শুনেছেন তা তিনি বলেননি। তাই এ হাদীসের সনদ রাসূল সাঃ পর্যন্ত পৌঁছেনি। যে হাদীসের সনদ রাসূল (দঃ) পর্যন্ত পৌঁছেনি। সেটি দিয়ে কথিত আহলে হাদীস ভাইয়েরা কি করে দলীল পেশ করেন?তাছাড়া এ হাদীসে সুলাইমান বিন মুসা নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছেন। তার সম্পর্কে
(১) ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেছেন عنده مناكير তথা তার কাছে আপত্তিকর বর্ণনা রয়েছে।{আলকাশিফলিযযাহাবী}
(২) ইমাম নাসায়ী (রহঃ) বলেছেন, ليس بالقوى فى الحديث তথা তিনি হাদীসে মজবুত নন। {আলকাশিফ লিযযাহাবী}
(৩) আলী ইবনুল মাদিনী (রহঃ) বলেছেন مطعون عليه তথা সমালোচিত ও অভিযুক্ত রাবী।
(৪) আস সাজী (রহঃ) বলেছেন, عنده مناكير তথা তার কাছে আপত্তিকর বর্ণনা আছে।
(৫) হাকেম আবু আহমাদ (রহঃ) বলেছেন, فى حديثه بعض المناكير তথা তার হাদীসে কিছু কিছু আপত্তিকর বিষয়আছে।
(৬) ইবনুল জারূদ তাকে তার “যুআফা” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। মানে তার মতে সুলাইমান একজন দুর্বল রাবী।
(৭) আলবানী  বলেছেন, صدوق فى حديثه بعض لين তিনি সত্যবাদী তবে তার হাদীসে কিছু দূর্বলতা রয়েছে। {আসলু সিফাতিস সালাহ২/৫২৮}যে হাদীস একদিকে মারফূ তথা রাসূল (দঃ) পর্যন্ত সূত্রবদ্ধ নয়। অপরদিকে এমন একজন রাবী রয়েছেন, যাকে মুহাদ্দিসীনে কেরাম, এমনকি আহলে হাদীস ভ্রান্ত মতবাদের শায়েখ আলবানীও তার মাঝে দুর্বলতা আছে বলে স্বীকার করেছেন, সেই হাদীস কি করে কথিত আহলে হাদীস ভাইয়েরা দলীল হিসেবে উপস্থাপন করলেন?এটি আমাদের কিছুতেই বোধগম্য নয়।