হাদীস মানবো নাকি সুন্নাত

Standard

“সকল সুন্নাতই হাদীস, কিন্তু সব হাদীস সুন্নাত নয়।”

[আর] “সকল হাদীস সমুহের মধ্য থেকে শুধু সুন্নাতেরই অনুসরন করতে হবে।”✨
💫❇💫 বিস্তারিতঃ

আল্লাহ তা’আলা কুরআন শরীফে বলে দিয়েছেন-

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ

অর্থাৎ তোমরা যদি না জেনে থাক তবে আহলে যিকিরদেরকে জিজ্ঞাসা কর। [কোরআন শরীফ; সুরা নাহল আয়াত-৪৩।]

মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন উক্ত আয়াতে আহলে যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হল উলামায়ে কেরাম। আর উক্ত হুকুম হল সাধারন মানুষের জন্য।

অর্থাৎ সাধারন মানুষ কোন বিষয় না জেনে থাকলে তার দায়িত্ব হল ওলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করে তদ্বানুযায়ী আমল করা। তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা বলেননি যে, তোমরা না জেনে থাকলে কুরআন ও হাদীস গবেষণা করে তদ্বানুযায়ী আমল করবে।
[অথচ] আমাদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তি এমন আছেন যারা নিজেরাই কুরআন-হাদীস গবেষণা করে আমল করতে চান। যদিও তিনি আলেম নন।
এমন অ-আলেম ব্যক্তিরা দলিল হিসাবে পেশ করেন –

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ

অর্থ- আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য তবে আছে কি কোন উপদেশ গ্রহনকারী?

[ক্বুরআ’ন শরীফ; সূরা কমার আয়াত -১৭।]

তারা বলে, কুরআন তো খুবই সহজ। যা আল্লাহ তা’আলা নিজেই বলে দিয়েছেন। কাজেই তা গবেষণা করে তদ্বানুযায়ী আমল করাতে অসুবিধা কোথায়?

– [অথচ] আয়াতের অর্থ থেকে যে কেউ অতি সহজেই বুঝতে পারবে যে, কুরআনকে সহজ করা হয়েছে উপদেশ গ্রহণের জন্য; হুকুম আহকামের উপর আমল করার জন্যে সকলের জন্যে সহজ নয়।

অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা কুরআন শরীফে পূর্ববর্তী উম্মতের যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তাদেরকে যে নছীহত করেছেন, আল্লাহ তা’আলার হুকুম পালনার্থে তাদেরকে যে নেয়মত দান করেছেন এবং হুকুম না মানার কারনে যে আযাব দিয়েছেন তা যে কেউ খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবে।

অপর দিকে কুরআন থেকে মাসআলা নিঃসরণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। তা কেবল মুজতাহিদের পক্ষেই সম্ভব।

নিন্মের আয়াতটিতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে-

إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلاً ثَقِيلاً

অর্থাৎঃ অচিরেই আমি আপনার উপর কিছু ভারী কথা অবতীর্ণ করব।

[কুরআন শরীফ; সূরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত-৫।]

অনুরূপভাবে হাদীস থেকে হুকুম আহকাম বের করা (Extracting)-ও অত্যন্ত কঠিন কাজ। সাধারন মানুষের জন্যে তা একেবারেই অসম্ভব।

⬅ কেন?

⬅ মুহাদ্দিছীনদের দায়িত্ব শুধু মাত্র হাদীস জমা করে দেওয়া। তারা আমলযোগ্য হাদীস ও আমলবিহীন হাদীসের মেধ্য কোন পার্থক্য করেন না । তাই হাদীসের কিতাবসমূহে সর্ব প্রকার হাদীস বিদ্যমান থাকে।

যেমনঃ-

(১) রহিত হাদীস সমূহ।

(২) মারজুহ তথা অনাগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হাদীস ।

(৩) নির্দিষ্ট স্থানের জন্য খাছ হাদীস।

(৪) নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছ হাদীস।

(৫) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাছ হাদীস ।

(৬) মওজু তথা জাল হাদীস।

এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের হাদীস থাকে। উপরে উল্লেখিত ১ম, ২য় ও ৬ষ্ট প্রকার কোন অবস্থাতেই আমলযোগ্য নয়। ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম প্রকার ক্ষেত্রবিশেষে আমলযোগ্য হতে পারে। সর্বাবস্থায় নয়।
▆ :—বিষয়টিকে ভালোভাবে স্পষ্ট করার জন্য প্রতিটি প্রকারের একটি করে উদহারন নিম্নে দেওয়া হল।

যথাঃ-

(১) রহিত হাদীসঃ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا شَرِبَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْسِلْهُ سَبْعًا

অর্থাৎঃ হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কুকুর তোমাদের কারো পাত্রে পানি পান করে, সে যেন উক্ত পাত্র সাত বার ধুয়ে নেয়।

[গ্রন্থ সূত্রঃ বুখারী শরীফ হাদীস নং-১৭২।]
(২) মারজূহ হাদীসঃ

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنِ الْمَاءِ وَمَا يَنُوبُهُ مِنَ الدَّوَابِّ وَالسِّبَاعِ فَقَالَ -صلى الله عليه وسلم- « إِذَا كَانَ الْمَاءُ قُلَّتَيْنِ لَمْ يَحْمِلِ الْخَبَثَ

অর্থাৎঃ হযরত ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ পানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যা মরুভূমিতে নিচু জায়গায় জমে থাকে এবং যেখানে চতুস্পদ জন্তু ও হিংস্র প্রাণী আসা যাওয়া করে। তিনি বললেন, পানি যখন দুই মটকা পরিমান হয় তখন তা আর নাপাক হয় না।

[গ্রন্থ সূত্রঃ আবূ দাউদ শরীফ হাদীস নং-৬৩।]
(৩) নির্দিষ্ট স্থানের জন্য খাছ হাদীসঃ

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ قيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَتَوَضَّأُ مِنْ بِئْرِ بُضَاعَةَ وَهِيَ بِئْرٌ يُطْرَحُ فِيهَا لُحُومُ الْكِلَابِ وَالْحِيَضُ وَالنَّتَنُ فَقَالَ الْمَاءُ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ

অর্থাৎঃ আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, আমরা কি বুজাআহ নামক কুয়া থেকে উযূ করব? আর তা এমন একটি কুয়া যেখানে মহিলাদের হায়েযের নেকড়া, মৃত কুকুরসমূহ এবং নাপাক বস্তুসমূহ ফেলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পানি পবিত্র। তাকে কোন বস্তু নাপাক করতে পারে না।

[গ্রন্থ সূত্রঃ নাসাই শরীফ হাদীস নং-৩২৬।]
(৪) নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছঃ

عن أبي هريرة Y أن رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا كان أحدكم في المسجد فوجد ريحا بين أليتيه فلا يخرج حتى يسمع صوتا أو يجد ريحا

অর্থাৎঃ হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ মসজিদে থাকে আর সে তার পায়ু পথে বায়ু অনুভব করে, সে ততক্ষণ পর্যন্ত (উযূর নিয়তে) বাহির হবে না যতক্ষণ না সে শব্দ শুনে বা গন্ধ পায়।

[গ্রন্থ সূত্রঃ তিরমিজী শরীফ হাদীস নং-৭৫।]

হাদীস থেকে বুঝা যায়। কারো বায়ু নির্গমন হওয়া সত্তেও যদি সে শব্দ না শুনে বা গন্ধ না পায় তাহলে তার উযূ ভঙ্গ হবে না। হাদীসটি সম্পূর্ন সহীহ।
(৫) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাছঃ

عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- أَمَرَ بِقَتْلِ الْكِلاَبِ

অর্থাৎঃ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরকে হত্যা কারার জন্য আদেশ দিয়েছেন।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৩৯৮৮।]
(৬) জাল হাদীসঃ

عن جابر قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من كثرت صلاته بالليل حسن وجهه بالنهار

অর্থাৎঃ হযরত জাবের (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার রাতে (তাহাজ্জুদ) নামাজ বেশি হয় দিনে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়।

[গ্রন্থ সূত্রঃ ইবনে মাজাহ হাদীস নং ১৩৩৩।]
❇ ❇ পর্যালোচনাঃ

উপরে উল্লেখিত হাদীসসমূহের মধ্যে :—

⬅ ১ম হাদীসটি তিনবার ধোয়ার হাদীস দ্বারা রহিত হয়ে গিয়েছে।

⬅ ২য় হাদীসের বিপরিতে রয়েছে স্থির পানিতে পেষাব করার নিষেধাজ্ঞার হাদীস। যা দ্বারা উল্লেখিত হাদীসটি মারজূহ হয়েছে।

⬅ ৩য় হাদীসের হুকুমটি বুজাআহ নামক কুপের সাথে খাছ।

⬅ ৪র্থ হাদীসটি ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছ যে ওয়াসওয়াসার রোগে আক্রান্ত।

⬅ ৫ম হাদীসটি ইসলামের প্রথম যুগের জন্য খাছ। যা পরবর্তীতে রহিত হয়ে গিয়েছে।

একারনেই উলামায়ে কেরাম সাধারন মানুষের জন্য কোন আলেমের নেগরানী ও পরামর্শ ব্যতীত হাদীস অধ্যায়ন করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এটা তাদেরকে গোমরাহীর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বিখ্যাত তা‘বে তাবেঈন লাইস বিন সা‘দ বলেছেন-

الحديث مضلة الا للعلماء.

অর্থাৎঃ উলামা ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদীস গোমরাহীর করণ।

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেছেন-

الحديث مضلة الا للفقهاء.

অর্থঃ ফুকাহা ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদীস পথ ভ্রষ্টতার কারন।

[অথচ] আমাদের মধ্য থেকে কিছু ইংরেজি শিক্ষিত আছেন তারা নিজেরাই হাদীস অধ্যয়ন করে তদানুযায়ী আমল করতে চেষ্টা করেন। তারা নিজেদেরকে আহলে হাদীস বলে দাবী করেন।

পূর্বের আলোচনার দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা যে সমুদ্রতুল্য হাদীস ভান্ডারের প্রতিটি হাদীসই উম্মতের জন্য অনুসরনীয় নয়।

যেমন- হাদীস রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১১টি বিবাহ্ করেছেন। একই সাথে তার নয়টি স্ত্রী ছিলেন। এবং তিনি মহর ছাড়া বিবাহ করেছেন। তাহলে কি এগুলো উম্মতের জন্য হালাল হয়ে যাবে? (নাউজুবিল্লাহ!)

বিখ্যাত তাবেঈ ইব্রাহীম নাখঈ বলেছেন-

اني لاسمع الحديث فانظرالي ما يؤخذ به فاخذ به و ادع سائره.

অর্থাৎঃ আমি হাদীস শোনার পর তার প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করি। এরপর যেটা গ্রহন করার তা গ্রহন করি। আর অন্যান্য সমস্ত হাদীস ছেড়ে দেই।

ইবনে আবী লাইলা বলেন-

لا يفقه الرجل في الحديث حتي ياخذ منه و يدع.

অর্থাৎঃ কোন ব্যক্তি ততক্ষন পর্যন্ত হাদীসে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না সে কিছু হাদীস গ্রহন করে আর কিছু হাদীস ছেড়ে দেয়।

বিখ্যাত ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব বলেন-

لولا ان الله انقذني بمالك و الليث لضللت.فقيل له كيف ذلك؟ قال:اكثرت من الحديث فحيرني فكنت اعرض ذلك علي مالك و الليث فيقولان لي :خذ هذا و دع هذا.

অর্থাৎঃ যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে ইমাম মালেক ও লাইস বিন সা‘দ দ্বারা হেফাযত না করতেন, আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম। অতপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল তা কিভাবে? তিনি বললেন আমি হাদীস নিয়ে বেশি চর্চা শুরু করেছিলাম ফলে তা আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। অতপর আমি তা মালেক(রহ) ও লাইস (রহ) এর নিকট পেশ করতাম। তারা বলতেন এটা গ্রহন কর আর এটা ত্যাগ কর।

[গ্রন্থ সূত্রঃ আছারুল হাদীসিশ শরীফ পৃঃ ৮১, ৮২।]

তারা এত বড় ব্যক্তি হয়েও যখন এমন কথা বলেছেন, তাহলে সাধারন মানুষের বিষয়টি কেমন হতে পারে।

এই ইবনে ওহাব (রহ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি এক লক্ষ বিশ হাজার হাদীস সংকলন করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি অতিরিক্ত হাদীস চর্চা করার কারনে গোমরাহ হতে গিয়েছিলাম।

এখন প্রশ্ন হল, আমরা হাদীসের উপর কিভাবে আমল করব?

⬅ এর উত্তর হল হাদীস সমূহের মধ্য থেকে যেগুলো উম্মতের জন্য অনুসরনীয় আমরা সেগুলোর উপর আমল করব। আর সেটাকেই সুন্নাত বলে।

হাদীসের বিশল ভান্ডার থেকে সুন্নাত বের করা এটা ফুকাহাদের দায়িত্ব। এটা সাধারন মানুষের জন্য সম্ভব নয়।

⬅ কেন?

⬅ হাদীসের অর্থ ফুকাহয়ে কেরাম গভীরভাবে বুঝতে পারেন।

ইমাম তিরমিজী (রহ) তিরমিজী শরীফে মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার পদ্ধতি বর্ননা করে বলেন-

و كذلك قال الفقهاء و هم اعلم بمعاني الحديث.

অর্থাৎঃ ফুকাহায়ে কেরাম এমনই বলেছেন। আর হাদীসের অর্থ সম্পর্কে তারাই বেশি জানেন।

ইমাম আবু হানিফা তাবেয়ী (রহ) এঁর উস্তাদ হযরত আ‘মাশ (রহ) যিনি অনেক বড় মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি একদা হযরত আবু হানিফা (রহ) কে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন। ঈমাম আবু হানিফা (রহ) মাসআলাটির জবাব দিয়ে দেন। অতপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথা থেকে জবাবটি দিলে? ইমাম সাহেব বললেন, আপনি আমাকে অমুক অমুক থেকে যে হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন সেগুলো থেকে আমি উত্তর দিয়েছি। অতপর আ‘মাশ (রহ) বলেন-

يا معشر الفقهاء! انتم الاطباء و نحن الصيادلة.

অর্থঃ হে ফকীহদের দল, তোমরাই হলে ডাক্তার আর আমরা হলাম ফার্মাসিষ্ট।

অর্থাৎ ফার্মাসিষ্ট (Pharmacist) যেমন তার কাছে অনেক ঔষধ থাকা সত্তেও সে জানে না কোন রোগের জন্য কোন ঔষধ (Medicine)। অনুরূপভাবে মুহাদ্দিসীনে কেরামও তাদের নিকট অনেক হাদীস থাকা সত্ত্বেও তারা তা থেকে মাসআলা বের করতে পারেন না।

– এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হল, হযরত আ‘মাশ (রহ) এত বড় মুহাদ্দিস হওয়া সত্ত্বেও তিনি মওজুদ হাদীস (Collected Hadiths) থেকে মাসআলা ইস্তেমবাত (Extract) করতে পরেননি। তাহলে একজন সাধারন ইংরেজি শিক্ষিত লোকের পক্ষে কিভাবে সম্ভব হতে পারে?

⬅ তাহলে দেখা গেল, “সকল সুন্নাতই হাদীস, কিন্তু সব হাদীস সুন্নাত নয়।”

আর আমাদেরকে হাদীস সমুহের মধ্য থেকে শুধু সুন্নাতের অনুসরন করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসসমূহে লক্ষ্য করলে দেখা যায় তিনি কোন হাদীসে এটা বলেননি যে, তোমরা আমার হাদীসের অনুসরন করবে।

⬅ [বরং] যেখানেই অনুসরনের কথা বলা হয়েছে সেখানে সুন্নাতে অনুসরনের কথা বলা হয়েছে।
🌺📓 নিম্নে নমুনা স্বরূপ কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল-

(1) 

عَنْ عِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةَ قَالَ صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْفَجْرَ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا فَوَعَظَنَا مَوْعِظَةً بَلِيغَةً ذَرَفَتْ لَهَا الْأَعْيُنُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ قُلْنَا أَوْ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَأَنَّ هَذِهِ مَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَأَوْصِنَا قَالَ أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ يَرَى بَعْدِي اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ.

অর্থাৎঃ হযরত ইরবাজ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,………………রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোদেরকে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে এবং (আমীরের কথা) শুনতে ও মানতে উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে একজন হাবশী গোলাম হয়। তোমাদের মধ্য থেকে আমার পরে যে বেচে থাকবে সে অচিরেই বিভিন্ন মতবিরোধ দেখতে পাবে। তাই তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাত ধর। তা মজবূতভাবে আঁকড়ে ধর। এবং তোমরা (দ্বীনের মধ্যে) নতুন জিনিস থেকে বেঁচে থাক। (দ্বীনের মধ্যে) প্রতিটি নতুন জিনিসই বেদআত। আর প্রতিটি বেদআতই ভ্রষ্টতা।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুসনাদে আহমাদ হাদীস নং ১৭১৪৭।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, তোমরা আমার হাদীস ও হিদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের হাদীস ধর।✘
(2) 

قال أنس بن مالك قال لي رسول الله صلى الله عليه و سلم يا بني إن قدرت أن تصبح وتمسي وليس في قلبك غش لأحد فافعل ثم قال لي يا بني وذلك من سنتي ومن أحيا سنتي فقد أحبني ومن أحبني كان معي في الجنة.

অর্থাৎঃ হযরত আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, যে, হে প্রিয় বৎস! যদি তুমি এভাবে সকাল ও সন্ধ্যা করতে পার যে, তোমার অন্তরে কারো জন্য কোন হিংসা নেই, তাহলে তা কর। অতপর তিনি আমাকে বললেন হে প্রিয় বৎস! তা আমার সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। আর যে আমার সুন্নাতকে মহব্বত করল সে আমাকে মহব্বত করল। আর যে আমাকে মহব্বত করল সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।

[গ্রন্থ সূত্রঃ তিরমিজী শরীফ হাদীস নং ২৬৮৩।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে,  যে আমার হাদীসকে মহব্বত করল সে আমাকে মহব্বত করল……।✘
(3) 

عَنْ مَالِك أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ.

অর্থাৎঃ হযরত মালেক (রহ) থেকে বর্ণিত,তার নিকট পৌছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের মধ্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা যতক্ষন পর্যন্ত তা ধরে রাখবে পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহ তাআলার কিতাব ও তার নবীর সুন্নাত।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুআত্তা মালেক হাদীস নং ৬৮৫।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি যে, তিনি “নবীর হাদীস” রেখে যাচ্ছেন। বরং বলেছেন “নবীর সুন্নাত”।✘
(4) 

عن أبي سعيد الخدري قال Y قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من أكل طيبا وعمل في سنة وأمن الناس بوائقه دخل الجنة .

অর্থাৎঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি হালাল খাবে এবং সুন্নাতের উপর আমল করবে আর মানুষ যার ক্ষতি থেকে নিরাপদে থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

[গ্রন্থ সূত্রঃ তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ২৫২০।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, হাদীসের উপর আমল করবে; বরং তিনি বলেছেন সুন্নাতের উপর আমল করবে।✘
(5) 

قَالَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَحْدَثَ قَوْمٌ بِدْعَةً إِلَّا رُفِعَ مِثْلُهَا مِنْ السُّنَّةِ فَتَمَسُّكٌ بِسُنَّةٍ خَيْرٌ مِنْ إِحْدَاثِ بِدْعَةٍ.

অর্থাৎঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখনই কোন জাতি কোন বিদআত চালু করে তখন তাদের থেকে সমপরিমান সুন্নাত উঠিয়ে নেওয়া হয়। তাই একটি সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা একটি বেদআত চালু করা থেকে (অনেক) উত্তম।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ১৬৯৭০।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, সমপরিমাণ হাদীস উঠিয়ে নেয়া হয়; বরং তিনি বলেছেন সুন্নাত উঠিয়ে নেয়া হয়।

আবার তিনি এটিও বলেন নি, যে,  একটি হাদীসকে আঁকড়ে ধরা একটি বেদআত চালু করা থেকে (অনেক) উত্তম।✘
(6)

قَالَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ من أحيا سنة من سنتي قد أميتت بعدي فإن له من الأجر مثل من عمل بها من غير أن ينقص من أجورهم شيئا.

অর্থাৎঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতসমূহের মধ্য থেকে এমন সুন্নাতকে জিন্দ করবে যা আমার পরবর্তীতে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে উক্ত সুন্নাতের উপর যাহারা আমল করিবে তাদের সকলের সমপরিমান ছাওয়াব পাবে। অথচ আমল কারীদের ছাওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।

[গ্রন্থ সূত্রঃ তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ২৬৭৭।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, যে ব্যক্তি আমার হাদীস সমূহের মধ্য থেকে এমন হাদীসকে জিন্দ করবে যা আমার পরবর্তীতে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল….।✘
(7) 

عَنْ أَنَسٍ أَنَّ نَفَرًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- سَأَلُوا أَزْوَاجَ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- عَنْ عَمَلِهِ فِى السِّرِّ فَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ أَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ. وَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ آكُلُ اللَّحْمَ. وَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ أَنَامُ عَلَى فِرَاشٍ. فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ. فَقَالَ « مَا بَالُ أَقْوَامٍ قَالُوا كَذَا وَكَذَا لَكِنِّى أُصَلِّى وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِى فَلَيْسَ مِنِّى.

অর্থাৎঃ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর একদল সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর বিবিদেরকে তাঁর গোপনে আমলের ব্যপারে জিজ্ঞাসা করলেন। অতপর কেউ বললেন, আমি মহিলাদেরকে বিবাহ্ করব না। কেউ বললেন আমি আর গোশত খাব না। কেউ বললেন আমি আর বিছানায় ঘুমাব না। অতপর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন এবং ছানা পাঠ করলেন। আর বললেন মানুষের কি হল তারা এমন এমন বলে। অথচ আমি নামাজ পড়ি এবং ঘুমাই। রোযা রাখি এবং ছেড়ে দেই। আর আমি মহিলাদেরকে বিবাহ্ করি। যে আমার সুন্নাত থেকে বিমূখ হবে সে আমার দলভূক্ত নয়।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৩৪৬৯।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, যে আমার হাদীস থেকে বিমূখ হবে…..।✘
(8) 

عن عبد الله بن عمرو قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم إن لكل عمل شرة وإن لكل شرة فترة فمن كانت شرته إلى سنتي فقد أفلح ومن كانت شرته إلى غيرذلك فقد أهلك.

অর্থাৎঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি আমলের একটি উত্থান আছে। আর প্রতিটি উত্থানের বিরতি আছে। সুতরাং যার উত্থান আমার সুন্নাতের দিকে হবে সে সফলকাম। আর যার উত্থান আমার সুন্নাত ব্যতীত অন্য দিকে হবে সে ধবংস হবে।

[গ্রন্থ সূত্রঃ সহীহ ইবনে হিব্বান,হাদীস নং ১১।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে,  যার উত্থান (আমল) আমার হাদীস ব্যতীত অন্য দিকে হবে সে ধবংস হবে।✘

উপরে নমুনা সরূপ কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল মাত্র। প্রতিটি হাদীসে সুন্নাতের অনুসরনের কথা বলা হয়েছে। কোথাও হাদীসের অনুসরনের কথা বলা হয়নি। 

[এজন্যই] 🌴🌴🌴 হকের উপর প্রতিষ্ঠিত জামাআতকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামআহ বলে। আহলুল হাদীস নয়।

আহলুল হাদীস পরিচয়দান একটি গলদ ব্যবহার। 🌴🌴🌴
✨ মোটকথা আমরা সর্বপ্রকার হাদীসের উপর আমলের জন্য আদিষ্ট নই।

[বরং] হাদীসের মধ্য থেকে যা আমাদের জন্য অনুসরনীয় (আর সেটাকেই সুন্নাত বলে) আমরা তার উপরে আমল করার জন্য আদিষ্ট।

আর হাদীস থেকে সুন্নাত বের করা তার দায়িত্ব নয় যে কুরআন পর্যন্ত ছহীহ করে পড়তে পারে না, হাদীসতো অনেক দুরের কথা। বরং তা এমন বিজ্ঞ আলেমের দায়িত্ব যিনি কুরআন ও হাদীসে গভীর পান্ডিত্য রাখেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সহীহ্ (বাস্তবসম্মত) বুঝ দান করুন। আমিন

ইমাম আযম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি

Standard

*******************************************

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী

খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

بسم الله الرحمن الرحيم. الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين. أما بعد!
অধঃপতনের যুগে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা নিয়ে যে সকল মনীষী পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, পার্থিব লোভ-লালসা ও ক্ষমতার মোহ যাদের ন্যায় ও সত্যের আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র পদঙ্খলন ঘটাতে পারেনি; যারা অন্যায় ও অসত্যের নিকট কোনো দিন মাথা নত করেননি, ইসলাম ও মানুষের কল্যাণে সারাটা জীবন যারা পরিশ্রম করে গিয়েছেন, সত্যকে আঁকড়ে থাকার কারণে যারা যালেম সরকার কর্তৃক অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত; এমনকি কারাগারে নির্মমভাবে প্রহৃত হয়েছেন, ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের অন্যতম।
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির জন্ম ও শিক্ষা:
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ৮০ হিজরি মোতাবেক ৭০২ খ্রিষ্টাব্দে কুফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আসল নাম হলো নু’মান। পিতার নাম ছাবিত এবং পিতামহের নাম জওতা। তাঁর বাল্যকালের ডাক নাম ছিল আবু হানিফা। তিনি ইমাম আযম নামেও সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর পূর্বপুরুশগণ ইরানের অধিবাসী ছিলেন। পিতামহ জওতা জন্মভূমি পরিত্যাগ করে তৎকালীন আরবের সমৃদ্ধিশালী নগর কুফায় এসে বাসস্থান নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ১৪-১৫ বছর বয়সে একদিন যখন বাজারে যাচ্ছিলেন, পথিমধ্যে তৎকালীন বিখ্যাত ইমাম হযরত শা’বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, হে বালক, তুমি কি কোথাও লেখাপড়া শিখতে যাচ্ছ? উত্তরে তিনি অতি দুঃখিত স্বরে বললেন, ‘আমি কোথাও লেখাপড়া শিখি না।’ ইমাম শা’বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বললেন, ‘আমি যেন তোমার মধ্যে প্রতিভার চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। ভালো আলেমের নিকট তোমার লেখাপড়া শেখা উচিত।’
ইমাম শা’বী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির উপদেশ ও অনুপ্রেরণায় ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ইমাম হামদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আতা ইবনে রবিয়া রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম জাফর সাদিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মতো তৎকালীন বিখ্যাত আলেমগণের নিকট শিক্ষা লাভ করেন এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কোরআন, হাদিস, ফিকাহ, ইলমে কালাম, আদব প্রভৃতি বিষয়ে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। জ্ঞান লাভের জন্য তিনি মক্কা, মদিনা, বসরা এবং কুফার বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত আলেমগণের নিকট পাগলের ন্যায় ছুটে গিয়েছিলেন।
বিভিন্ন স্থান থেকে হাদিসের অমূল্য রত্ন সংগ্রহ করে স্বীয় জ্ঞানভান্ডার পূর্ণ করেন। উল্লেখ্য যে, তিনি চার সহস্রাধিক আলেমের নিকট শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি বলেন, ইমাম শা’বীর সেই আন্তরিকতাপূর্ণ উপদেশবাণীগুলো আমার অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করল এবং এরপর থেকেই আমি বিপনীকেন্দ্রগুলোতে আসা-যাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা কেন্দ্রেও যাতায়াত শুরু করলাম। (মুয়াফেক, আবু যাহরা)
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন তাবেয়ী:
কারো কারো মতে, ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাবেয়ী ছিলেন। সাহাবাগণের যুগ তখন প্রায় শেষ হলেও কয়েকজন সাহাবি জীবিত ছিলেন। ১০২ হিজরিতে তিনি যখন মদিনা গমন করেন তখন মদিনায় দুজন সাহাবি হযরত সোলাইমান রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত সালেম ইবনে সুলাইমান রাদিয়াল্লাহু আনহু জীবিত ছিলেন এবং ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁদের দর্শন লাভ করেন। তবে তাবেতাবেয়ী হওয়ার ব্যাপারে কোনো মতবিরোধ নেই।
ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির শিক্ষকগণ প্রায় সবাই ছিলেন তাবেয়ী। ফলে হাদিস সংগ্রহের ব্যাপারে তাঁদের মাত্র একটি মধ্যস্থতা অবলম্বন করতে হতো। তাই তাঁর সংগৃহীত হাদিসসমূহ সম্পূর্ণ ছহীহ বলে প্রমাণিত হয়েছে। সাহাবী আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাত হওয়ার কারনে তিনি একজন তাবেঈ। ইমাম আবু হানীফা অন্যুন আটজন সাহাবীর সাক্ষাত লাভ করেছেন। তাঁরা হচ্ছেন- ১) হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৯৩ হিজরী) ২) আব্দুল্লাহ ইবনে আবী আওফা রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৮৭ হিজরী) ৩) সহল ইবনে সাআদ রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৮৮ হিজরী) ৪) আবু তোফায়ল রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ১১০ হিজরী) ৫) আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়দী রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৯৯ হিজরী) ৬) জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৯৪ হিজরী) ৭) ওয়াসেনা ইবনুল আসকা রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৮৫ হিজরী) হাদিস শাস্ত্রের
‘আমিরুল মুমেনীন’ রূপে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক স্বরচিত কবিতার এক পংক্তিতে উল্লেখ করেছেন যে, নোমান (আবু হানীফা ) এর পক্ষে গর্ব করার মতো এতটুকুই যথেষ্ট যা তিনি সরাসরি সাহাবীগণের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন।
শিক্ষাদান পদ্ধতিঃ
ইমাম হাম্মাদের যখন ইন্তেকাল হয়, তখন আবু হানীফার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। এ সময় তিনি উস্তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তাঁর শিক্ষাকেন্দ্রের পূর্ণদায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম যখন শিক্ষা দান শুরু করেন, তখন শুধুমাত্র ইমাম হাম্মাদের সাগরেদগণই তাতে শরীক হতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাতে কূফার সর্বস্তরের মানুষ, বিশিষ্ট জ্ঞানীগুনী, এমনকি ইমাম সাহেবের উস্তাদগণেরও কেউ কেউ এসে শরীক হতেন। বিখ্যাত তাবেয়ী মাসআব ইবনে কোদাম, ইমাম আমাশ প্রমুখ নিজে আসতেন এবং অন্যদেরকেও দরসে যোগ দিতে উৎসাহিত করতেন।
একমাত্র স্পেন ব্যতীত তখনকার মুসলিম-বিশ্বের এমন কোন অঞ্চল ছিল না, যেখানকার শিক্ষার্থীগণ ইমাম আবু হানীফার দরসে সমবেত হননি। মক্কা-মদীনা, দামেস্ক, ওয়াসেত, মুসেল, জায়িরা, নসীবাইন, রামলা, মিসর, ফিলিস্তিন, ইয়ামান, ইয়ানামা, আহওয়ায, উস্তুর আবাদ, জুরজান, নিশাপুর, সমরকন্দ, বুখারা, কাবুল-হেমস প্রভৃতিসহ বিখ্যাত এমন কোন জনপদ ছিল না যেখান থেকে শিক্ষার্থীগণ এসে ইমাম আবু হানীফার নিকট শিক্ষা লাভ করেননি।
মুসলিম-বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানপিপাসা মিটানোর লক্ষ্যে সমবেত শিক্ষার্থীগণের বিচারেও ইমাম আবু হানীফা ছিলেন তাবেয়ীগণের মধ্যে কুরআন-হাদীস এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী এবং তাকওয়া পরহেজগারীতে অনন্য ব্যক্তিত্ব। ইমাম সাহেবের অনুপম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বদৌলতে সে যুগে এমন কিছু সংখ্যক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের সৃষ্টি হয়েছিল, যাঁরা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আকাশে এক একজন জ্যোতিষ্ক হয়ে রয়েছেন। ইমাম সাহেবের সরাসরি সাগরেদগণের মধ্যে ২৮ ব্যক্তি বিভিন্ন সময়ে কাজী (বিচারক) এবং শতাধিক ব্যক্তি মুফতীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসালামের ইতিহাসে এক ব্যক্তির প্রচেষ্টায় এত বিপুল সংখ্যক প্রাজ্ঞা ব্যক্তির আবির্ভাব আর কোথাও দেখা যায় না।
প্রথম আব্বাসী খলীফা আবুল আব্বাস সাফফাহর পূর্ণ শাসন আমল (১৩২-১৩৬ হি:) চারবছর নয় মাস কাল ইমাম আবু হানীফা মক্কা শরীফে স্বেচ্ছা নির্বাসনে কাটান। কারণ, বনী-উমাইয়ার শাসন কর্তৃত্বের পতন ঘটানোর আন্দোলনে ইমাম আবু হানীফার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ইমাম সাহেব উমাইয়্যা বংশের পতনের পর আব্বাসিয়দের শাসন-ব্যবস্থা চাইতেন না। তাঁর মতানুসারী সে যুগের ওলামা-মাশায়েখগণ খোলাফায়ে-রাশেদীনের শাসন-ব্যস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা চাইতেন। কিন্তু আব্বাসীয়দের প্রথম শাসক আবু আব্বাস অকল্পনীয় নির্মমতার আশ্রয় গ্রহণ করে ওলামা-মাশায়েখগণ এবং ধর্মপ্রাণ জনগনের সে আকাঙ্খা নস্যাত করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে ইমাম সাহেবের পক্ষে কূফায় অবস্থান মোটেও নিরাপদ ছিল না।

শুভাকাঙ্খীদের পরামর্শে ইমাম সাহেব তখন মক্কা শরীফ চলে যান এবং আবুল আব্বাসের মৃত্যুকালে (যিলহজ্জ ১৩৬) পর্যন্ত মক্কাশরীফেই অবস্থান করেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মক্কার পবিত্র মসজিদে ইমাম আবু হানীফা নিয়মিত দরছ দিতেন। হাফেয যাহাবীর বর্ণনা অনুযায়ী তখনকার দিনে ইমাম সাহেবের দরছে যেমন হাদিসের ছাত্রগণ দলে দলে যোগ দিতেন, অনুরূপ বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলেমগণও বিপুল সংখ্যায় সমবেত হতেন।
তাফসির ও হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ অভিজ্ঞতা ও পা-িত্য:
তাফসির ও হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অসাধারণ অভিজ্ঞতা ও পা-িত্য থাকা সত্ত্বেও ফিকাহশাস্ত্রেই তিনি সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করেছেন। তিনি কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াসের ভিত্তিতে বিবিধ বিষয়ে ইসলামি আইনগুলোকে ব্যাপক ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা করেছেন। বর্তমান বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মুসলমান হানাফি মাযহাবের অনুসারী। ফিকাহশাস্ত্রে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও অবদানের জন্যই মুসলিম জাতি সত্যের সন্ধান অনায়াসে লাভ করতে পেরেছে। তিনি তাঁর শিক্ষকতা জীবনে পৃথিবীতে হাজার হাজার মুফাচ্ছির, মুহাদ্দিস ও ফকীহ তৈরি করে গিয়েছেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে যারা ইসলামের ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁদের মধ্যে ইমাম মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ইমাম যুফার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি অন্যতম।
ফাতাওয়ার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার অনুসৃত নীতিঃ
যে কোন সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার অনুসৃত নীতি ছিল, প্রথমে কুরআনের শরণাপন্ন হওয়া। কুরআনের পর হাদিস শরীফের আশ্রয় গ্রহণ করা। হাদিসের পর সাহাবায়ে কেরাম গৃহীত নীতির উপর গুরুত্ব দেওয়া। উপরোক্ত তিনটি উৎসের মধ্যে সরাসরি সামাধান পাওয়া না গেলে তিনটি উৎসের আলোকে বিচার-বুদ্ধির (কেয়াসের) প্রয়োগ করতেন। তাঁর সুস্পস্ট বক্তব্য ছিল, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কোন ধরনের হাদিস বা সাহাবীগণের অভিমতের সাথে যদি আমার কোন বক্তব্যকে সাংঘর্ষিক মনে হয়, তবে আমার বক্তব্য অবশ্য পরিত্যাজ্য হবে। হাদিস এবং আছারে সাহাবা দ্বারা যা প্রমাণিত সেটাই আমার মাযহাব। (তাফসীরে মাযহারী, খায়রাতুল-হেসান)
ইবনে হাযম বলেন, আবু হানীফার সকল ছাত্রই এ ব্যাপারে একমত যে, নিতান্ত দূর্বল সনদযুক্ত একখানা হাদিসও তাঁর নিকট কেয়াসের তুলনায় অনেক বেশী মুল্যবান দলিলরূপে বিবেচিত হতো। (খায়রাতুল-হেসান) সম্ভবতঃ এ কারণেই পরবর্তী যুগে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যে সব কালজয়ী প্রতিভার জন্ম হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশ ইমাম আবু হানীফার মাযহাব অনুসরণ করেছেন। হযরত মোজাদ্দেদ আলফেসানীর বক্তব্য হচ্ছে- এই ফকীরের উপর প্রকাশিত হয়েছে যে, এলমে-কালামের বিতর্কিত বিষয়গুলি মধ্যে হক হানাফী মাযহাবের দিকে এবং ফেকাহর বিতর্কিত মাসআলাগুলির অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হক হানাফী মাযহাবের দিকে এবং খুব কম সংখ্যক মাসআলাই সন্দেহযুক্ত। (মাবদা ও মাআদ)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী হারামাইন শরীফাইনে অবস্থানকালে কাশফযোগে যে সব তথ্য অবগত হয়েছেন, সে সবের আলোকে লিখেছেন- হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে অবগত করেছেন যে, হানাফী মাযহাব একটি সর্বোত্তম তরিকা। ইমাম বুখারীর সময়ে যেসব হাদিস সংকলিত হয়েছে, সেগুলোর তুলনায় আবু হানীফার সিদ্ধান্তগুলি সুন্নতে-নববীর সাথে অনেক বেশী সামঞ্জস্যপূর্ণ। (ফুযুলুল-হারামাইন)
ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন, ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কেবল কারাগারে বসেই ১২ লাখ ৯০ হাজারের অধিক মাসআলা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সুতরাং যারা এ কথা বলতে চায় যে, হানাফী মাযহাব সহীহ হাদীসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বা ইমাম আবু হানীফা বহু ক্ষেত্রে হাদিসের প্রতিকূলে অবস্থান গ্রহণ করেছেন, তাদের বক্তব্য যে নিতান্তই উদ্ভট তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বরং হানাফী মাযহাব হচ্ছে কুরআন-সুন্নাহর এমন এক যুক্তিগ্রাহ্য ও সুবিন্যস্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যা সর্বযুগের মানুষের নিকট সমভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।
ইমাম সাহেবর তীক্ষ বুদ্ধি, ধী-শক্তি ও গভীর জ্ঞান:
ইমাম সাহেব যেমন তীক্ষ বুদ্ধি অধিকারী ও ধী- শক্তি সম্পন্ন ছিলেন তেমনি ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী। নিম্নোক্ত কয়েকটি ঘটনা দ্বারা তা অনুমান করা সম্ভব হবে: ‘একদিন ইমাম আবু হানীফা কিরাত ও হাদীস বর্ননায় প্রসিদ্ধ তাবিয়ী হযরত আমাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির নিকট উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় কোন একটি মাসআলা সম্পর্কে ইমাম সাহেবের মতামত জিজ্ঞেস করা হল। জবাবে তিনি তার মতাতমত জানালেন। হযরত আমাশ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি জিজ্ঞেস করলেন- এ দলীল তুমি কোথায় পেয়েছ? জবাবে ইমাম সাহেব বললেন, আপনিই তো আমাদেরকে এ হাদীস শুনিয়েছেন,।

এভাবে ইমাম সাহেব তারই বর্নণাকৃত আরও চারটি হাদীস শুনালেন। ইমাম আমাশ বললেন- যথেষ্ট হয়েছে, আর শুনাতে হবে না। আমি তোমাকে একশত দিনে যা শুনিয়েছি তুমি এক ঘন্টায় তা শুনিয়ে দিলে। আমার ধারনাও ছিল না যে তুমি এ হাদীসগুলোর উপর আমাল করে থাক। “সত্যিই তোমরা ফকীহরা হলে ডাক্তারতুল্য, আর আমরা হলাম ঔষধের দোকানদার।“ আর তুমি তো উভয় দিকই হাসীল করেছ (আল জাওয়াহের আল মুদিয়াহ, খ- ২, পৃ- ৪৮৪)।

‘ইমাম আবু হানীফা ও তাঁর শাগরিদদেরকে যারা পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হাফিযে হাদীস ফাযল ইবনি মূসা আস সিনানীকে জিজ্ঞাসা করা হল- ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে যারা অপবাদ গেয়ে বেড়ায় তাদের সম্পর্কে আপনার কী ধারণা? তিনি বললেন- আসল ব্যাপার হল ইামাম আবু হানীফা তাদের সামনে এমন তত্ত্ব ও তথ্য পেশ করেছেন যার সবটা তারা বুঝতে সক্ষম হয়নি। আর তিনি তাদের জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখেননি। ফলে তারা ইমাম সাহেবের সাথে হিংসা আরম্ভ করেছেন’। ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ননা করেন-‘হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম আবু হানীফার চেয়ে অধিক জ্ঞানী আমার দৃষ্টিতে পড়েনি। সহীহ হাদীস সম্পর্কে তিনি আমার চেয়ে অধিক দুরদর্শী ছিলেন’।
ইমাম আবু হানীফা কুফা শহরের উলামাদের সংগৃহীত সকল ইলম সংগ্রহ করেছিলেন। যেমন- ইমাম বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির জনৈক উ¯তাদ ইয়াহইয়া ইবনি আদাম তাঁর সহীহ গ্রন্থে বলেন- ‘ইমাম আবু হানীফা নিজ শহরের সকল হাদীস সংগ্রহ করেছেন এবং তার মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেষ জীবনের হাদীসগুলোর প্রতি তার লক্ষ্য ছিল (অর্থাৎ বিভিন্নমুখী হাদীসগুলোর মধ্যে সর্বশেষ হাদীস কোনটি ছিল)। যার দ্বারা অন্যান্যগুলো রহিত সাব্য¯ত করা সহজ হয়।

মোটকথা ইমাম আবু হানীফা কুফা শহরের উলামাদের হাসিলকৃত সকল ইলম সংগ্রহ করেছিলেন। এখানেই তিনি ক্ষন্ত হননি বরং তিনি কুফা শহর থেকে সফর করে দীর্ঘ ছয়টি বছর মক্কা- মাদীনা অবস্থান করে সেখানকার সকল শাইখদের নিকট থেকে ইলম হাসিল করেন। আর মক্কা- মাদীনা যেহেতু স্থানীয়, বহিরাগত সকল উলামা, মাশায়েখ, মুহাদ্দিস ও ফকীহদের কেন্দ্রস্থল ছিল, কাজেই এক কথায় বলা চলে যে- মক্কা- মাদীনা ছিল ইলমের মারকায। আর তার মত অসাধারণ ধী- শক্তি সম্পন্ন, কর্মঠ ও মুজতাহিদ ইমামের জন্য দীর্ঘ ছয় বছর যাবত মক্কা- মাদীনার ইলম হাসিল করা নি:সন্দেহে সাধারণ ব্যাপার নয়।
এছাড়া তিনি ৫৫ বার পবিত্র হাজ্বব্রত পালন করেছেন বলে প্রমান পাওয়া যায় (উকূদুল জামান, পৃ- ২২০)। প্রত্যেক সফরেই তিনি মক্কা- মাদীনার স্থানীয় ও বহিরাগত উলামা, মাশায়েখ ও মুহাদ্দিসিনের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। তিনি চার হাজার শাইখ থেকে হাদীস সংগ্রহ করেছেন বলে বিভিন্ন লেখক মšতব্য করেছেন (আস সুন্নাহ, পৃ- ৪১৩, উকূদুল জামান, পৃ- ৬৩, খইরতুল হিসান, পৃ- ২৩।) ইমাম মুহাম্মাদ ইবনি ইউসূফ আস সালেহী ‘উকূদুল জামান গ্রন্থে দীর্ঘ ২৪ পৃষ্ঠায় ইমাম সাহেবের মাশায়েখদের একটা ফিরি¯ত পেশ করেছেন, উকূদুল জামান, পৃ- ৬৩- ৮৭)।
আল্লামা আলী আল কারী, মুহাম্মাদ ইবনি সামায়াহ’র বরাত দিয়ে বলেছেন, ‘আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোতে সত্তর হাজারের উর্দ্ধে হাদীস বর্ননা করেছেন। আর ‘আল আছার’ গ্রন্থটি চল্লিশ হাজার হাদীস থেকে বাছাই করে লিখেছেন’ (আল জাওয়াহিরুল মযিয়াহ, খ- ২, পৃ- ৪৭৩)। ইয়াহইয়া ইবনি নাসর বলেন- ‘একদিন আমি ইমাম আবু হানীফার ঘরে প্রবেশ করি যা কিতাবে ভরপুর ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম এগুলো কী? তিনি বললেন- এগুলো সব হাদীসের কিতাব, এর মধ্যে সামান্য কিছুই আমি বর্ননা করেছি যেগুলো ফলপ্রদ’ (আস সুন্নাহ, পৃ- ৪১৩, উকূদু জাওয়াহিরিল মুনীফাহ, ১, ৩১)।
ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির যদিও অন্যান্য মুহাদ্দীসদের মত হাদীস শিক্ষা দেয়ার জন্য কোন মাজলীস ছিল না, যেমন ইমাম মালিক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি করেছেন (মুআত্তা মালিক)। কিন্তু তাঁর শাগরিদগণ তাঁর বর্ণিত হাদীসগুলো সংগ্রহ করে বিভিন্ন কিতাব ও মুসনাদ সংকলন করেছেন যার সংখ্যা দশের উর্দ্ধে। তার মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলো হল- ইমাম আবু ইউসুফ রচিত ‘কিতাবুল আসার’, ইমাম মুহাম্মাদ রচিত ‘কিতাবুল আসার আল মারফুআহ’ ও ‘আল আসারুল মারফুআহ ওয়াল মাওকুফাহ’, মুসনাদুল হাসান ইবনি যিয়াদ আল লু-লুঈ, মুসনাদে হাম্মাদ ইবনি আবু হানীফা ইত্যাদি।
ইমাম বোখারীর অন্যতম উস্তাদ মক্কী বিন ইব্রাহীম রাহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃতু- ২১৫ হিঃ) যাঁর সনদে ইমাম বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি অধিকাংশ ‘সুলাসিয়্যাত হাদীস’ বর্ণনা করেছেন। এই মক্কী বিন ইব্রাহীম ইমাম আবু হানীফার ছাত্র। তিনি ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে বলেন, “আবু হানীফা তাঁর সময়কালের শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন” (মানাক্বেবে ইমাম আযম রহ. ১/৯৫)
আবার হাফিয মযযী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: মক্কী বিন ইব্রাহীম ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে বলেন, “তিনি তাঁর কালের সবচেয়ে বড় আলিম ছিলেন” (তাহ্যীবুত তাহযীব-এর টিকা- ১০ম খন্ড, ৪৫২পৃ.) ইমাম আবু দাউদ বলেন, নিঃসন্দেহে আবু হানীফা ছিলেন একজন শেষ্ঠ ইমাম। (তাহজীব ১/৪৪৫) জরহ ও তাদিলের (সনদ পর্যালোচনা শাস্ত্র) অন্যতম ইমাম ইয়াহ্ইয়া ইবনে মুঈন (মৃতু- ২৩৩হিঃ) বলেন,“আবু হানীফা ছিলেন হাদীস শাস্ত্রের গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি”- (তাহবীবুত্তাহজীব ৫/৬৩০) আলী ইবনে মাদানী (মৃতু- ২৩৪ হিঃ) বলেন,“আবু হানীফা হাদীস শাস্ত্রে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। তার মধ্যে কোন দোষক্রুটি ছিল না। (জামঈ বয়ানিল ইল্ম ২/১০৮৩)
প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হাফিয ইয়াহ্ইয়া বিন হারুন (মৃতু- ২০৬ হিঃ) বলেন,“আবু হানীফা ছিলেন সমকালীন শ্রেষ্ঠতম জ্ঞানী ও সত্যবাদী” (আহবারে আবু হানীফা ৩৬) আল্লামা হাফিয ইবনে হাজার আসক্বালানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন-“ইমাম আবু হানীফার মুত্যু সংবাদ শুনে ফিক্বাহ ও হাদীস শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, শাফঈ মাযহাবের প্রধানতম সংকলক হযরত ইবনে জরীহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন, “আহ! ইলমের কি এক অফুরন্ত খনি আজ আমাদের হাতছাড়া হলো”। ( তাহযীবুত্তাহযীব খন্ড ১, পৃ: ৪৫০)
একবার হযরত ইয়াহয়া ইবনে মুঈনকে প্রশ্ন করা হলো- হাদীসশাস্ত্রে আবু হানীফা কি আস্থাভাজন ব্যক্তি? সম্ভবতঃ প্রচ্ছন্ন সংশয় আঁচ করতে পেরে দৃপ্তকন্ঠে তিনি উত্তর দিলেন- হ্যাঁ, অবশ্যই তিনি আস্থাভাজন! অবশ্যই তিনি আস্থাভাজন! (মানাকিবুল ইমামমুল আ’যামি লিলমাওয়াফিক- খন্ড:১, পৃষ্ঠা ১৯২) ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, ফিকাহশাস্ত্রের সকল মানুষ আবু হানিফার পরিবারভুক্ত।(আছারুল ফিকহিল ইসলামী, পৃ: ২২৩) হাফেয যাহাবী তার কিতাবে ইমাম আবু হানিফাকে হাফেযে হাদীসের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। (তাযকিরাতুল হুফফায, পৃ: ১৬০) বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ বিন মুবারক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, কোন ব্যক্তি অনুসরনীয় হওয়ার দিক থেকে ইমাম আযম আবু হানিফার চেয়ে অধিক যোগ্য নয়। কেননা আবু হানিফা ইমাম, খোদাভীরু, মুত্তাকী, আলেম ছিলেন। তীক্ষ্ম মেধা ও বুঝ-বুদ্ধি দিয়ে ইলমকে এমনভাবে বিশ্লেষন করেছেন যে ইতিপূর্বে কেউ তা করতে পারে নি।(খাইরাতুল হিসান, লেখক: ইবনে হাজার হায়ছামী শাফেয়ী)
তাঁর খোদাভীরুতা:
তিনি সুদীর্ঘ চল্লিশ বছর পর্যন্ত এশার নামাযের ওযু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। এতে এটাই বোঝা যায় যে, তিনি সারারাত আল্লাহর ইবাদত, ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণায় মগ্ন থাকতেন। কতিপয় কর্মচারীর দ্বারা ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ব্যবসায় যাতে হারাম অর্থ উপার্জিত না হয় সে জন্য তিনি কর্মচারীদের সব সময় সতর্ক করতেন। একবার তিনি দোকানে কর্মচারীদের কিছু কাপড়ের দোষ-ত্রুটি দেখিয়ে বললেন, ‘ক্রেতার নিকট যখন এগুলো বিক্রি করবে তখন কাপড়ের এ দোষগুলো দেখিয়ে দেবে এবং এর মূল্য কম রাখবে।’ কিন্তু পরবর্তী কর্মচারীগণ ভুলক্রমে ক্রেতাকে কাপড়ের দোষত্রুটি না দেখিয়েই বিক্রি করে দেন। এ কথা তিনি শুনতে পেয়ে খুব ব্যথিত হয়ে কর্মচারীদের তিরস্কার করেন এবং বিক্রীত কাপড়ের সমুদয় অর্থ সদকা করে দেন। তাঁর সততার এ রকম শত শত ঘটনা রয়েছে।
তাঁর ইন্তিকাল:
খলীফা মানসুরের সময় ইমাম আবু হানিফাকে প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহনের জন্য আহবান জানানো হয়। ইমাম আবু হানিফা খলীফার প্রস্তাব প্রত্যখ্যান করার পর তাঁকে ত্রিশটি বেত্রাঘাত করা হয়। কারারুদ্ধ করে পানাহারে নানাভাবে কষ্ট দেয়া হয়। তারপর একটা বাড়ীতে নজরবন্দী করে রাখা হয়। সেখানেই ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির ইন্তিকাল হয়। নির্মম নির্যাতনের শিকার ইমাম আবু হানিফা ইন্তিকালের আগে অসিয়ত করে যান যে খলীফা মনসূর জনগনের অর্থ অন্যায়ভাবে দখল করে বাগদাদের যেই এলাকায় শহর নির্মান করেছে সে এলাকায় যেন ইন্তেকালের পর তাঁকে দাফন করা না হয়। কারো কারো মতে তাঁকে বিষ প্রযয়োগে হত্যা করা হয়। ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বিষক্রিয়া বুঝতে পেরে সিজদায় পড়ে যান এবং সিজদা অবস্থায়ই তিনি ১৫০ হিজরিতে এ নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মৃত্যুর সংবাদ বিদ্যুত গতিতে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশের সর্বস্তরের লোকজন মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। কথিত আছে, তাঁর জানাযায় পঞ্চাশ হাজারের অধিক লোক অংশগ্রহণ করেন। তাঁর অসিয়ত অনুযায়ী বিজরান কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. والحمد لله

হানাফী মাযহাবের হাদিস নির্ভরতা সবচেয়ে বেশী

Standard

হানাফী মাযহাবের হাদীস নির্ভরতা সবচেয়ে বেশী- মুফতী আবুল কাশেম মুহাম্মদ ফজলুল হক

ইসলামী শরিয়তের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী ঢালটির নাম ‘হানাফী মাযহাব’। এ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা যিনি, তাঁকে সকল মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফকিহ্ ও মুহাদ্দেসগণ ‘ইমাম আযম’ বলে জানেন ও মানেন। তিনি হলেন ইমাম আবু হানীফা নু’মান বিন সাবিত রাহমাতুল্লাহি আলায়হি। হানাফী মাযহাব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইলমে ফিক্হ’রও গোড়াপত্তন করেছিলেন তিনিই। তাঁর পথ ধরেই ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও আহমদ বিন হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলায়হি আপন আপন মাযহাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একটি গাছের চারটি ঢালে অনেক পাতা। তবে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশী পাতা ঝুলছে ঐ হানাফী ঢালে।
আমাদের সমাজে অনেক বিভ্রান্তির মধ্যে একটি চিহ্ণিত গোষ্ঠী ফিক্হ ও হানাফী মাযহাব নিয়ে পানি ঘোলা করছে। কেউ কেউ ফিকহ্-ফতোয়ার কথা শুনলে আঁতকে উঠেন। ভাবটা এমন যে, ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক একটা কিছুর নাম ‘ফিক্হ’। অনেকে আবার হানাফী মাযহাবের কথা শুনলে বক্র চোখে তাকান। কেউ বলেন, ইমাম আবু হানিফা হাদীস জানতেন না বিধায় হানাফী মাযহাব হাদীস বিরোধী ইত্যাদি অনেক কথা। কিন্তু গভীর গবেষণার চোখে তাকালে দেখা যাবে যে, ইসলামী শরীয়তের চার মাযহাবের মধ্যে কুরআন ও হাদীসের উপর নির্ভরশীলতা যে মাযহাবের সবচেয়ে বেশী-তার নাম ‘হানাফী মাযহাব’। হাজার বছর ধরে নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস ও ফকিহ্গণের গবেষণার নির্যাস তাই প্রমাণ করে। আলোচ্য নিবন্ধে এ কথাই প্রমাণ করার চেষ্টা করব যে, ‘হানাফী মাযহাবের হাদীস নির্ভরতা সবচেয়ে বেশী’।

দৃষ্টিকোণ
হানাফী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা যেহেতু ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি, সেহেতু তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও সঠিকতার উপরই মূলত হানাফী মাযহাবের সঠিকতা ও গভীরতার বিষয়টি নির্ভরশীল। কারণ, আহরিত জ্ঞানের শতভাগ ব্যবহারে তাঁর নিষ্ঠা ও আমানতদারী প্রশ্নাতীত। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করি।

ইমাম আবু হানীফা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি খায়রুল কুরুনের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তিন যুগকে উত্তম যুগ বলেছেন, সাহাবীদের যুগ, তাবেয়ীদের যুগ ও তাবে তাবেয়ীদের যুগ। এই হাদীস দ্বারা বুঝা যায় স্তরভিত্তিক এই তিন যুগের মানুষ জ্ঞানে-গুণে, তাকওয়া, বুযুর্গী এবং আমানতদারীতে নিঃসন্দেহে পরবর্তী যুগের মানুষের চেয়ে অগ্রগামী। যেহেতু ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন এই তিন যুগের দ্বিতীয় (তাবেয়ী) যুগের অন্তর্ভুক্ত, (যে সম্মান অন্য তিন ইমামের নেই) সেহেতু তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাযহাবও উত্তমতা ও সঠিকতার বিবেচনায় অন্যান্য মাযহাবের তুলনায় শ্রেষ্ঠ হবে, এটাই স্বাভাবিক।

ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর জ্ঞান সম্পর্কে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যৎবাণী
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন ‘দ্বীন সুরাইয়া নক্ষত্রের দূরবর্তী উচ্চতায় চলে গেলেও পারস্যের এক ব্যক্তি তা সেখান থেকে পুনরুদ্ধার করবে। হাদিসটি ন্যূনতম দশজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন। অন্য হাদীসে পাওয়া যায়, ইলম সুরাইয়া নক্ষত্রের দূরবর্তী উচ্চতায় চলে গেলেও পারস্যের এক বা একাধিক ব্যক্তি তা সেখান থেকে পুনরুদ্ধার করবে। এই হাদীসটি অসংখ্য মুহাদ্দিসীনে কেরাম আপন আপন কিতাবে বর্ণনা করেছেন। ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও ইবনে হাজর হায়তামী রহমাতুল্লাহি আলায়হিসহ অনেক নির্ভরযোগ্য হাদীসবিশারদ এই হাদীসের দ্বারা ইমাম আযুম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হিকে উদ্দেশ করা হয়েছে মর্মে উল্লেখ করেছেন এখানে উল্লেখ্য যে, পারস্য বলতে অনারব বুঝানো হয়েছে এবং আরো উল্লেখ্য যে, এ হাদীস দ্বারা নবী যুগের পরবর্তী কোন অনারবের ব্যাপারে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছে বিধায় হাদীসটি হযরত সালমান ফারসী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
ইমাম আজম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি সম্পর্কে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এ ভবিষ্যৎবাণী প্রকারান্তরে হানাফী মাযহাবের সত্য নিষ্ঠতার প্রমাণ বহন করে।

ইমাম আযম সম্পর্কে সমসাময়িক মুহাদ্দিস ও ফকিহগণের মতামত
ইমাম আযম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক মুহাদ্দিস ও ফকিহগণের যে সকল মতামত ব্যক্ত করেছেন তদ্বারা ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর জ্ঞানের গভীরতা ও হানাফী মাযহাবের সত্য নিষ্ঠতার প্রমাণ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি বর্তমান যুগে ঐ সকল সমালোচকদের যথেষ্ট জবাবও তৈরী হয়, যারা বলে হানাফী মাযহাব হাদীস বিরোধী বা ইমাম আযম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি হাদিস জানতেন না।
ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, কেউ শিখতে চাইলে সে যেন আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও তাঁর ছাত্রদের সাহচর্যে নিজেকে নিবিষ্ট রাখে। কারণ, ইলমে ফিকহ্ এর ক্ষেত্রে সকলেই আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর বংশধর। বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনে মাযার দাদা ওস্তাদ বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দেস ইমাম ইয়াহইয়া বিন সাঈদ কাত্তান রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, আল্লাহর শপথ! শরিয়তের মাসআলার ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানিফা এর রায় থেকে অধিকতর সুন্দর রায় আমরা শুনিনি। আমরা তাঁর প্রায় সব ফতোয়াই গ্রহণ করে নিয়েছি। প্রশ্নাতীতভাবে গ্রহণযোগ্য জগদ্বিখ্যাত আরেকজন মুহাদ্দিস সুফিয়ান বিন ওয়াইনাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, মাগাযী শিখতে হলে মদীনা মুনাওয়ারায়, হজ্জের মাসায়েল শিখতে হলে পবিত্র মক্কায় এবং পুরো ফিকহ্ শিখতে হলে কুফায় ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর শিক্ষালয়ে যেতে হবে।
ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর ওস্তাদ ইমাম ওয়াকী বিন র্যারাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর সামনে একটি জটিল বিষয়ের হাদীস উল্লেখ করা হলে তিনি দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে লাগলেন, অনুতাপ করে ফায়েদা কি! ঐ বৃদ্ধ লোকটি (আবু হানিফা) কোথায়? এই সমস্যার বৃত্ত থেকে তিনিই পারেন আমাদেরকে মুক্ত করতে। তিনি আরও বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর ফিকহ’র দশভাগের এক ভাগও আমাদের ভাগ্যে জুটলে ধন্য হতাম। ইলমে হাদীসের সাগর আব্দুল্লাহ্ বিন মুবারক রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম সুফিয়ান সওরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি, এ তিনজনের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর গবেষণা সর্বাধিক সুন্দর, গভীর মেধা সম্পন্ন এবং ফিকহ’র ক্ষেত্রে অধিকতর সূক্ষ্ম। তিনজন থেকে তিনিই বড় ফকিহ।
ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হিকে এতই মেধা সম্পন্ন পেয়েছি যে, পাথরের খুঁটিকেও যদি তিনি সোনার দাবী করে বসেন তবে অকাট্য দলীল দিয়ে তা প্রমাণও করে ছাড়েন। ইলমে হাদীসে মহাসাগর ইমাম সুফিয়ান সওরী বলেন, জমীনের উপরে সবচেয়ে বড় ফকিহ্ হযরত ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি। ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর ওস্তাদ আবু আসেম রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম আবু হানিফা ও সুফিয়ান সওরীর ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর নগন্য একজন ছাত্র বা গোলামও ইমাম সুফিয়ান সওরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি থেকে অধিক ফিক্হ জানেন। বিশ্ববিখ্যাত এ রকম হাজারও মুহাদ্দিস আছেন যারা ইমাম আযম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র জ্ঞানের গভীরতার স্বীকৃতি দিয়েছেন। হানাফী মাযহাব হাদীস বিরোধী হলে জগদ্বিখ্যাত এ সকল মুহাদ্দিসগণ কখনই এমন স্বীকৃতি দিতেন না। আর হাদীস ছাড়া ফিকহ্ তৈরী হয় না। দুধ থেকে যেমন পনির তৈরী হয়, তেমনি কুরআন-হাদীস থেকে ফিকহ্ উৎসারিত হয়। কাউকে ফকিহ্ হিসেবে মেনে নিয়ে যদি বলা হয় তিনি হাদীস জানেন না- তবে তা সাংঘর্ষিক কথা। আ’মাশ রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস। ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর ওস্তাদ আপন শিষ্যের মেধা ও মননের গভীরতা দেখে দার্শনিক ভঙ্গিতে বলেছিলেন, হে ফকিহ দল, তোমরা হলে অভিজ্ঞ ডাক্তার, আর আমরা মুহাদ্দিসরা ফার্মাসিস্ট। একই কথা ইমাম আওযায়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হিও বলেছেন। ইমাম ইবনে ওয়াহাব রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর উক্তিটি আরও স্পষ্ট, যে মুহাদ্দিস ফিকহের ক্ষেত্রে কোন নির্ভরযোগ্য ইমাম মানে না, সে গুমরাহ। মহান আল্লাহ্ যদি ইমাম মালেক ও লাইস রহমাতুল্লাহি আলায়হিমকে দিয়ে আমাদের রক্ষা না করতেন তবে আমরাও পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম। ফিকহ্ বা ফতোয়ার কথা শুনলেই আঁতকে উঠার কোনই কারণ নেই। ফকিহ্ হওয়া ভাগ্যের বিষয়। হাদীস শরীফে দেখুন, আল্লাহ্ যাঁর মঙ্গল চান, তাঁকে ধর্মের ফকিহ্ বানিয়ে দেন।
অন্য হাদীসে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, এই দ্বীনের ফাউণ্ডেশন হল ইলমে ফিকহ্। পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবার ১২২ নম্বর আয়াতের মর্মানুযায়ী দেখা যায় যে, লাখো মানুষের মাঝে ফকিহ্ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন দু’ একজন। এ কথাগুলো সামনে রাখলেই ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও হানাফি মাযহাব সম্পর্কে সকল সংশয় দূর হয়ে যাবে। সমসাময়িক ও পরবর্তী হাজারও মুহাদ্দিস এবং ওলামায়ে কেরাম যাঁকে উম্মতের শ্রেষ্ঠ ফকিহ্ মেনে নিয়েছেন, মুহাদ্দেসদের গোমরাহ্ হওয়া থেকে বাঁচতে হলে যেখানে ফকিহ্ ইমাম মানা অপরিহার্য, ইলমে ফিক্হ যেখানে আল্লাহ্ তায়ালার বিশেষ নেয়ামত ও দ্বীনের ফাউণ্ডেশন, সেখানে উম্মতের শ্রেষ্ঠতম ফকিহ্ হিসেবে স্বীকার্য ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও হানাফি মাযহাব সম্পর্কে সৌদি আরব ও কুয়েতিদের মদদে বিশ্বে যেভাবে নগ্ন সমালোচনা চালানো হচ্ছে, তা এক কথায় আমাদের ধর্মের জন্য লজ্জা ও যার পর নাই পরিতাপের। হাদীস মুখস্থ করে মুহাদ্দিস হওয়া যায়। কিন্তু ফিকহ্ মুখস্থ করে ফকিহ্ হওয়া যায় না। এটাই তো কারণ, যে লক্ষাধিক সাহাবীর মধ্যে সকলেই কমবেশী হাদীস বর্ণনাকারী। আর ফতোয়াদানকারী সাহাবী মাত্র ১৩০ জনের মত এবং তার মধ্যেও মুজতাহিদ সাহাবী কম বেশ ১০ জন। তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ, হাদীস শুনলেই যে ফিকহে হাদীস বুঝে আসবে তা কিন্তু নয়। অনেক সময় হাদীস শ্রবণকারী তার ঊর্ধ্বতন বর্ণনাকারীর তুলনায় ফিকহে হাদীস বুঝেন। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আল্লাহ্ ঐ ব্যক্তিকে সতেজ রাখুন যে আমার কোন হাদীস শুনে অন্যের কাছে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত তা মুখস্থ রেখেছে। কারণ, অনেক ফিকহ্ বহনকারী ঐ ফিকহকে পৌঁছে দেন যে তার চেয়েও অধিকতর বড় মানের ফকীহ্ তাঁর কাছে এবং অনেকে এমন আছেন যারা ফিকহ্ বহন করে চলেন কিন্তু ফকিহ্ নন। হাদীস বর্ণনাকারী লক্ষাধিক সাহাবীর মধ্যে ফকিহ্ সাহাবী কম হওয়া এবং উম্মতের মধ্যে গুটি কয়েকজন মাত্র ফকিহ্ ও মুজতাহিদ হওয়ার বাস্তব কারণ এটাই। সাহাবীদের পরে উম্মতের গুটিকতেক সম্মানীয় ফকিহদের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

সরাসরি সাহাবীদের কাছ থেকে ইমাম আযম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হির ইলমে হাদীস শিক্ষাগ্রহণ
পূর্বেই বলা হয়েছে ইমাম আযম রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাবেয়ী ছিলেন। চার ইমামের অন্য কারও এ মর্যাদা নেই। সরাসরি অনেক সাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ করে হাদীসের শিক্ষা লাভ করেছেন ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি। যে সকল সাহাবীর সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল তাঁদের মধ্যে হযরত আনাস বিন মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে হারিস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবি আওফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু উল্লেখযোগ্য।
সাহাবীদের সাথে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর সাক্ষাৎ ও শিক্ষা লাভ করাকে অস্বীকার করা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, ইমাম হুসাইন ইবনে আলী সাইমিরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৪৩৬হি.) ইবনে খাল্লেকান রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৬৮১হি.), ইমাম যাহাবী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৭৪৮হি.), ইমাম ইয়াফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৭৬৮হি.) ইবনে হাজর আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৮৫২হি.), ইবনে বাজ্জাজ কিরদারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৮২৭হি.) এর মত বিভিন্ন মাযহাবের অসংখ্য মুহাদ্দিস ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর সাথে সাহাবায়ে কেরামের সাক্ষাৎ ও শিক্ষা লাভের বিষয়টির অকৃত্রিম স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। এছাড়া ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি কর্তৃক সাহাবীদের কাছ থেকে হাদীস রেওয়ায়াত করার বিষয়ে ইমাম আবু নাঈম ফজল ইবনে দুকাইন রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ২১৮হি.), ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মঈন রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ২৩৩হি.), ইমাম আবু হামেদ আরানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৩২১হি.), ইমাম আলী ইবনে মুহাম্মদ রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৩২৪হি.) ইমাম মুহাম্মদ বিন ওমর যায়াবী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৩৫৫হি.), ইমাম আবু নাঈম ইসফাহানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৪৩০হি.), ইমাম বায়হাকী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৪৫৮হি.), ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৪৬৩হি.), ইমাম খাওয়ারিযিমী রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৬৬৫হি.) হাফেজ ইবনে কাসীর রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ৭৭৪হি.) এর মত বিশ্ববিখ্যাত নির্ভরযোগ্য অসংখ্য মুহাদ্দিস স্বীকৃতি প্রদান করে বিভিন্ন কিতাবে তার বিস্তারিত বর্ণনাও দিয়েছেন। সাহাবীদের কাছ থেকে হাদীস বর্ণনাকারী ও শিক্ষা লাভকারী ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি সম্পর্কে যদি বলা হয় যে, তিনি হাদীস জানতেন না বা হানাফী মাযহাব হাদীস বিরোধী তা নিতান্ত অরুচিকর কথা বৈ কি?

পবিত্র মক্কা, মদীনা, কুফা ও বসরার জ্ঞানে সমৃদ্ধ ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি
ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, মুহাদ্দেসীনের সাহচর্যে যাওয়ার জন্য আমি কতবার কুফা এবং বাগদাদে গিয়েছি তার হিসাব নাই। অসংখ্যবারের মত ইমাম বুখারীর কেন কুফা নগরীতে যাওয়া? কারণ একটাই মধুর কাছে মৌমাছির যাওয়া। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদকে আল্লাহ রহম করুন যিনি কুফাকে জ্ঞানে ভরে দিয়েছেন। শুধু ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুই নন। তিনশত আসহাবে হুদাইবিয়া ও সত্তরজন বদরী সাহাবীসহ প্রায় দেড় হাজার সাহাবী হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে শুরু করে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এর খেলাফত আমল পর্যন্ত এই কুফা নগরীতে এসে বসবাস করেছেন এবং এখানেই প্রায় সকলের ইন্তেকাল হয়েছে। তাও আবার হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত হুযাইফা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত আবু মুসা আশয়ারী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত সালমান ফার্সী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত আবু কাতাদাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত বারা ইবনে আযেব রাদ্বিযাল্লাহু তা‘আলা আনহু এর মত বিশিষ্ট সাহাবীগণ। দেড় হাজার সাহাবীদের কাছে পড়ুয়া কত তাবেয়ী ছাত্র তৈরী হয়েছে এখানে এবং তাঁদের হাতে লাখো লাখো তাবে তাবেয়ী। তাই তো অগণিত বার এই পবিত্র নগরী কুফায় এসেছিলেন ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি হাদীসের নেশায়। আর জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত অসংখ্য সাহাবায়ে কেরামের আবাসস্থল এ পবিত্র কুফা নগরীই ইমাম আবু হানিফার জন্মভূমি। মুহাম্মদ ইবনে সিরীন রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন আমি কুফায় চার হাজার ছাত্র পেয়েছি যারা হাদীস অšে¦ষণে ছিলেন এবং চার হাজার পেয়েছি ফকিহ্। হাদীসের ইমাম আফ্ফান বিন মুসলিম রহমাতুল্লাহি আলায়হি (ওফাত ২২০হি.) বলেন, কুফায় এসে আমি চার মাস ছিলাম। এখানে হাদীসের এত ব্যাপক চর্চা ছিল যে, এ চার মাসে আমি চাইলে এক লাখ হাদীস লিখতে পারতাম। তবে পঞ্চাশ হাজারের বেশি লিখিনি। চার মাসের অর্জন যদি পঞ্চাশ হাজার বা একলাখ হয়, তাহলে যে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হির জীবনের সিংহভাগই অতিবাহিত হয়েছে কুফা নগরীতে, তাঁর হাদীসের অর্জন কত বিশাল হবে! অথচ এ যুগের তথা-কথিত পণ্ডিত মশাইরা বলে, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি না কি হাদীস জানতেন না। ইমাম আবু দাউদ রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর ছেলে আব্দুল্লাহ্ বলেন, আমি কুফায় গিয়ে হযরত আবু সাইদ আল আশায রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে দৈনিক এক হাজার অনুপাতে একমাসে ত্রিশ হাজার হাদীস লিপিবদ্ধ করেছি। থাকলো পবিত্র মক্কা ও মদীনা মুনাওয়ারার কথা। ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি পবিত্র মক্কা-মদীনার ইলমও পেয়েছিলেন কি না? মক্কা ও মদীনা শরীফেওতো অনেক সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন। এ প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে আদম এর একটি বর্ণনা উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। তিনি বলেন, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ৫৫ বার পবিত্র হজ্জব্রত পালন করেছেন। প্রতি হজ্জ্বের সফরে কমপক্ষে একমাস করে হলেও প্রায় ৫ বছর তিনি পবিত্র মক্কা নগরী ও মদীনা শরীফে অবস্থান করেছেন। ইমাম আবু দাউদের ছেলে যদি দৈনিক এক হাজার হাদীস সংগ্রহ করতে পারেন সেক্ষেত্রে পবিত্র হারামাইনে গিয়ে ৫ বছর সময়ে ইমাম আযম কত সংখ্যক হাদীস রপ্ত করেছিলেন তা আল্লাহই ভাল জানেন। হজ্জ্বের সফর ছাড়াও অতিরিক্ত আরও ছয় বছর তিনি পবিত্র হারামাইনে অবস্থান করেছিলেন অর্থাৎ সর্বমোট ১০/১২ বছরের বিরাট সময় ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি অতিবাহিত করেছিলেন পবিত্র হারামাইনে। তার বিপরীতে ইমাম বুখারী পবিত্র হারামঈনে ছিলেন মাত্র ছয় বছর। ইলমে হাদীস চর্চার আরেকটি কেন্দ্র ছিল বসরা নগরী। ইমাম বুখারী বলেন, আমি চারবার বসরায় গিয়েছি। তার বিপরীতে ইমাম আবু হানিফার বক্তব্য শুনুন, আমি বিশবার বসরায় গিয়েছি। উক্ত সফরে কখনও একবছর, কখনও তার কম বেশী সেখানে অবস্থান করতাম।

ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরামের ইলমের উত্তরাধিকার
হাদীস বিজ্ঞান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ইমাম আবু হানিফা শীর্ষস্থানীয় সাহাবীদের ইলমের ওয়ারিশ ছিলেন। দুই সনদে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে, দুই সনদে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে, আট সনদে হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে, সাত সনদে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে ইলমে হাদীসের ওয়ারিশ হয়েছেন। এছাড়াও যে সকল তাবেয়ী থেকে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁরাও এক একজন অসংখ্য সাহাবীর দীর্ঘ সোহবত লাভ করে তাঁদের কাছ থেকে হাদীস শিক্ষা লাভ করেছেন এবং সেই সমুদয় ইলম উক্ত তাবেয়ী থেকে ইমাম আবু হানিফা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। যেমন তাবেয়ী আত্বা ইবনে রাবাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি ইমাম আবু হানিফার ওস্তাদ। তিনি নিজেই বলেন, আমি ন্যূনতম ২০০ সাহাবীর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছি। মানে দুইশত সাহাবীর ইলমের আমানত আত্বা ইবনে রাবাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি মারফত ইমাম আবু হানিফার কাছে এসেছে। এভাবে ইমাম শা’বীর কথা না বললেই নয়। সম্মানীয় এ তাবেয়ী নিজেই বলেন, আমি পাঁচশত সাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভার্গ অর্জন করেছি। ইবনে হিব্বান বলেন, দেড়শ সাহাবী থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর এ ইমাম শা’বী হলেন ইমাম আবু হানিফার প্রথম সারির ওস্তাদ। এভাবে প্রবীণ তাবেয়ীদের মারফত ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি হাজার হাজার সাহাবীদের ইলমে হাদীসের জ্ঞান লাভ করে ধন্য হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হযরত ইবরাহিম নখয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত ইকরামা রহমাতুল্লাহি আলায়হি, কাসেম ইবনে আব্দুর রহমান রহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত নাফে রহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত কাতাদাহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইবনে শিহাব জুহরী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, আবু ইসহাক সাবিয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির রহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত হিশাম ইবনে উরওয়াহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম আ’মশ রহমাতুল্লাহি আলায়হি। উল্লেখিত তাবেয়ীগণ সকলেই সাহাবীদের ইলমের আমানতদার ছিলেন যাঁদের কাছ থেকে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ইলমে হাদীসের শিক্ষা লাভ করেছেন। এছাড়াও আহলে বাইতে আতহার থেকে ইমাম বাকের রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম যায়েদ ইবনে আলী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম আব্দুল্লাহ্ ইবনে আলী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম জাফর সাদেক রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান আল মুসান্না রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম হাসান ইবনে যায়েদ রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম হাসান ইবনে মুহাম্মদ এবং ইমাম জাফর ইবনে তাম্মান রহমাতুল্লাহি আলায়হিমের মারফত ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি নবী পরিবারের ইলমের তোহফাও গ্রহণ করেছেন। এ সকল নামী দামী মুহাদ্দিসগণ ছিলেন হাদীসের এক একটি ভাণ্ডার। লেখার কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় ইলমে হাদীসে তাঁদের পাণ্ডিত্যের বিস্তারিত ফিরিস্তি তুলে ধরা সম্ভব হল না। কাজেই ইমাম আবু হানিফার হাদীস চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর।

ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও অনন্য মুহাদ্দিসের শিক্ষক সংখ্যা
যারা ইমাম বুখারী-মুসলিমের সামনে ইমাম আবু হানিফাকে পাত্তা দিতে চান না এবং বলেন- তিনি হাদীস জানতেন না। তাদের অজ্ঞতা দূর করতে নিম্নের তথ্যটি মহৌষধের মত কাজ করবে। লক্ষ করুন, ইমাম মালেকের ওস্তাদ ৯০০ জন, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ‘মুসনাদ’ গ্রন্থের বর্ণনাকারী ২৮০জন, মুসলিম শরীফে ইমাম মুসলিমের বর্ণনাকারী ২২০জন, ইমাম তিরমিযীর ওস্তাদ ২২১ জন, ইমাম আবু দাঊদের ওস্তাদ ৩০০জন, ইমাম নাসায়ীর ওস্তাদ ৪৫০জন, ইমাম বুখারীর ওস্তাদ তাঁর নিজের স্বীকৃতি অনুসারে ১০৮০জন। অথচ তাবেয়ীদের মধ্যে থেকে শুধু ইমাম আবু হানিফার ওস্তাদ ৪০০০জন। প্রতি ওস্তাদের কাছ থেকে গড়ে একটি হাদীস শিখলেও তো ৪০০০ হাদীস শেখা হয়। আর ইমাম আযম আবু হানিফা ও হানাফী মাযহাবের দুশমনরা বলে তিনি নাকি বড় জোর ১৭টি হাদীস জানতেন! হায় আফসোস! তাছাড়া ইমাম বুখারীসহ সিহাহ্ সিত্তাহ্র ইমামদের ওস্তাদদের মধ্যে জঈফ রাভীও ছিল। কিন্তু ইমাম আবু হানিফার ওস্তাদদের মধ্যে কেউ জঈফ ছিলেন না। সকলেই নির্ভরযোগ্য ছিলেন। কারণ, তখন ছিল তাবেয়ী যুগ। জাল হাদীসের ফিতনা তখনও শুরুই হয়নি। এ দিক থেকেও ইমাম আবু হানিফার মর্যাদা আকাশের উচ্চতায়।

ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি
তথ্য মোতাবেক দেখা যায় যে, ইমাম বুখারীর ওস্তাদ কখনও ইমাম আবু হানিফার ছাত্র, কখনও ছাত্রের ছাত্র। এভাবে ইলমে আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ইমাম বুখারীর ভাণ্ডারে এসেছে। ইমাম বুখারী নিজেও বলেছেন, আমার বয়স যখন ষোল, আমি (ইমাম আবু হানিফার ছাত্র) ইবনুল মুবারক ও ওয়াকির কিতাব মুখস্থ করেছি এবং তাদের বক্তব্যগুলো রপ্ত করেছি। ইবনুল মুবারকের কিতাবে কি ছিল, তাঁর নিজের কথাতেই শুনি। তিনি বলেন, আমি ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর কিতাব অনেকবার লিখেছি। কখনও নতুন কিছু যুক্ত হলে তাও লিখে নিতাম। ইমাম আত্বিয়া ইবনে আসবাত্ব বলেন, ইবনুল মুবারক কুফায় আগমন করে ইমাম যুফরের কাছে গিয়ে ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হির কিতাবগুলো ধার নিয়ে তা লিখে নিতেন। অনেক বারই এমনটি হয়েছে। বুঝা গেল, ইমাম আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুবারকের কিতাবগুলো ছিল ইমাম আবু হানিফার ইলমের প্রবাহিত একটা নহর। সেখান থেকে ইমাম বুখারী শীতলতা লাভ করেছেন। এছাড়াও বুখারী শরীফের সবচেয়ে ঐতিহ্যপূর্ণ ও সম্মানের বৈশিষ্ট্যটি হলো সোলাসিয়াত তথা সর্বনিম্ন তিনজন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর প্রাপ্ত ২২টি হাদিস। এটা বুখারী শরীফের অনেক বড় বৈশিষ্ট্য। এ কারণে বুখারী শরীফ সিহাহ্ সিত্তার মধ্যে অনন্য। একথা সবাই জানেন এবং বলেনও। কিন্তু বলেন না তার ভেতরের কথাটি। তা হলো, ঐ ২২টি হাদীসের মধ্যে ২১টি হাদিসের বর্ণনাকারীই ইমাম আবু হানিফার ছাত্র। মূলতঃ সিহাহ্ সিত্তার অধিকাংশ হাদীসের গভীরে অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে বর্ণনাকারীগণ হয় ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর ছাত্র না হয় ওস্তাদ।

ইমাম বুখারী ও মুসলিম, ইমাম আবু হানিফা থেকে হাদীস বর্ণনা না করার কারণ
পাঠক, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি ও হানাফী মাযহাব বিরোধীরা বড় তৃপ্তিসহকারে একটি কথা বলে যে, ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি যদি হাদীসের ইমাম হতেন বা ইলমে হাদীসের নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দেস হতেন তাহলে ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাঁর সনদে কোন হাদীস গ্রহণ করেন নি কেন? তাতেই বুঝা যায় ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি হাদীসের ইমাম ছিলেন না বা হাদীসের নির্ভরযোগ্য পণ্ডিত ছিলেন না। এ কথা বলে বিরোধীরা মনে করে হানাফী মাযহাবের গলা কর্তন করার কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এটা তাদের জন্য স্বর্গ সুখের তৃপ্তি দান করে। পাঠক ধৈর্য ও মনোযোগ সহকারে লেখাটি পড়–ন। তাহলে বিরোধীদের যুক্তির অসারতা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে যাবে।
বিরোধীদের কাছে প্রশ্ন করুন, বুখারী ও মুসলিম শরীফে ইমাম শাফেয়ী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর সূত্রে কোন হাদীস আছে? জবাব হল ‘নাই’। ইমাম মুসলিম ইমাম বুখারীর ছাত্র। সুযোগ পেলে ওস্তাদের কদমবুচিও করতেন। তা সত্ত্বেও মুসলিম শরীফে ইমাম বুখারীর জায়গা নেই। ছাত্র হয়েও ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ্ মুসলিমে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ওস্তাদ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে আব্দুল্লাহ্ ইবনে খালেদ জুহালীর হাদীস গ্রহণ করেননি। অথচ, ইমাম জুহালী স্বর্বজন স্বীকৃত উঁচু মানের একজন হাদীসের ইমাম। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ইলমে হাদীসের মহাসাগর হয়েও বুখারী শরীফে জায়গা পেয়েছেন মাত্র দুইবার। ইমাম আবু জুরআ রাযী রহমাতুল্লাহি আলায়হি আরেক বড় ইমাম, তিনি ইমাম বুখারী, মুসলিম ও তিরমিযীর ওস্তাদ। ইমাম মুসলিম বলেন, আমি সহিহ মুসলিম লিখে হযরত আবু জুরআ রাযী রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর কাছে উপস্থাপন করি। সেখান থেকে তিনি যেগুলো সহিহ বলেছেন তা রেখেছি। আর যেগুলো আপত্তি দিয়েছেন সেগুলো ছেড়ে দিয়েছি। যার কাছে সহিহ মুসলিমকে সহিহ বানাতে দিলেন তাঁর কাছ থেকে উক্ত কিতাবে হাদীস নিলেন মাত্র একটি। ইমাম তিরমিযী ইমাম মুসলিমের ছাত্র। শুধু পাঠশালায়ই নয়, দিনের পর দিন ইমাম মুসলিমের সফরসঙ্গী ছিলেন তিনি। অথচ, তিরমিযী শরীফে ইমাম মুসলিমের সূত্রে হাদীস মাত্র একটি। অনুরূপ ইমাম নাসায়ী ইমাম বুখারীর ঘনিষ্ট ছাত্র হয়েও সুনানে নাসায়ীতে ইমাম বুখারী একবারের বেশী জায়গা দেন নি। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল ছিলেন ইমাম শাফেয়ীর ঘনিষ্ট ছাত্র। মুসনাদে আহমদের প্রায় সাতাশ হাজার হাদীসের মধ্যে ইমাম শাফেয়ীর অংশগ্রহণ মাত্র নয়টি হাদিসে।
ইমাম বুখারী ও মুসলিম ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি থেকে হাদীস বর্ণনা না করা যদি ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর হাদীস না জানার বা জঈফ হওয়ার প্রমাণ হয় তাহলে ইমাম শাফেয়ীও কি হাদীস জানতেন না? সহিহ্ মুসলিমে বর্ণনা না থাকার কারণে ইমাম বুখারীও কি জঈফ? ইমাম জুহালীর ব্যাপারেও কি বলবেন আপনি। এই মানদণ্ডে বুখারী, মুসলিম, আবু দাঊদ, তিরমিযী, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইমাম আবু জুরআ সকলেই জঈফ সাব্যস্ত হবেন? আসলে হানাফী মাযহাব ও ইমাম আবু হানিফা এর প্রতি বিরুদ্ধবাদীদের এটা কালের রটনা। ইমাম আবু হানিফার বিরুদ্ধে যত ষড়যন্ত্র হয়েছে তা অন্য কোন ইমামের ক্ষেত্রে হয়নি। ইমাম বুখারী ইমাম আবু হানিফা থেকে হাদীস গ্রহণ না করার কারণ মূলত ঈমান এর সংজ্ঞার ক্ষেত্রে মতবিরোধ। ইমাম বুখারীর মতে মৌখিক স্বীকৃতি এবং আমল এর নাম ঈমান। আর ইমাম আবু হানিফার মতে অন্তরের বিশ্বাস আর মৌখিক স্বীকৃতির নাম ‘ঈমান’। আর হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে ইমাম বুখারীর মৌলিক কিছু নীতিমালা ছিল। তিনি নিজেই বলেন, আমি সহস্রাধিক মুহাদ্দিস থেকে হাদীস গ্রহণ করেছি। তবে আমি এমন কারও কাছ থেকে হাদীস লিখিনি যারা শুধু মৌখিক স্বীকৃতি ও অন্তরের বিশ্বাসকে ঈমান মনে করে বরং তাদের কাছ থেকেই লিখেছি যারা মৌখিক স্বীকৃতি ও আমলকে ঈমান জ্ঞান করে। এভাবে প্রত্যেক মুহাদ্দিসেরই হাদীস গ্রহণ ও লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে মৌলিক কিছু নীতিমালা থাকে। ঐ নীতিমালার কারণে কারও হাদীস বাদ পড়ে থাকলে তা ঐ মুহাদ্দিস জঈফ হওয়ার দলীল বহন করে না। এ রকম নীতিমালার কারণেই মুসলিম শরীফে ইমাম বুখারী ও ইমাম জুহালীর জায়গা হয়নি। বুখারী ও মুসলিমে ইমাম শাফেয়ীর সনদে কোন হাদীস স্থান লাভ করেনি। এছাড়া ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি এর সময়ে মু’তাজিলা, ক্বদরিয়া ও মুরজিয়ার মত বাতিল ফেরকার শক্ত প্রচারণা ও অবস্থান ছিল। ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাদের বিরুদ্ধে পুরো শক্তি দিয়ে লৌহবর্মের মত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। ইমাম আবু হানিফার মত এত বড় মাফের ইমামের প্রতিরোধে ঐ সকল বাতিল ফেরকাগুলো আহত বাঘের মত প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ইমাম আযমের উপর ‘মরজিয়া’ হওয়ার অপবাদ রটিয়ে দেয় পূর্ন শক্তি নিয়ে। অপবাদের এই রটনায় বিভ্রান্ত হয়েছেন অনেক মুহাদ্দিস এবং সে কারণে ইমাম আবু হানিফাকে অনেকেই উল্লেখ করতে চান নি। এই অপবাদের মূলে গিয়ে যারা ইমাম আজমকে অšে¦ষণ করেছেন তারা ইমাম আবু হানিফাকে খুঁজে পেয়েছেন, ‘সেরাজুল উম্মত’ হিসেবে ‘ইমামূল আয়িম্মা ফিল হাদীস’ হিসেবে, ‘ফকিহুল উম্মত’ হিসেবে। অপবাদের কালো মেঘটা সরে যাওয়ার পর ইমাম আবু হানিফা থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তিরমিযী, নাসায়ী, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুজাইমা, ইবনে মুবারক, আহমদ বিন হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলায়হিম এর মত নামি দামি সব মুহাদ্দিস।

তথ্যসূত্র.
. মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী, আল সহীহ্, হাদীস নং- ২৫০৮, ৩৪৫০, মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আল সহীহ্, হাদীস নং-২৫৩৫, নাসায়ী, আল সুনান, হাদীস নং-৩৮০৯।
. ড. তাহের আল কাদেরী, ইমাম আবূ হানিফা, ইমামুল আয়িম্মা ফিল হাদীস।
. মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আল সহীহ্, হাদীস নং-২৫৪৬।
. আহমদ বিন হাম্বল, আল মুসনাদ, ২য় খণ্ড, হাদীস নং-২৯৬।
. জালাল উদ্দীন সুয়ূতী, তাবয়ীদুস সহীফা, পৃ. ৩১-৩৩, ইবনে হাজার হাইতামী, আল খায়রাতুল হিসান, পৃ. ২৪।
. খতীব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, খণ্ড নং-১৩, পৃ. ৩৪৬, শামসুদ্দিন যাহাভী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, খণ্ড. ৬, পৃ. ৪০৩।
. খতীব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, খণ্ড. ১৩, পৃ. ৩৪৫, ইমাম মিজ্জি, তাহযিবুল কামাল, খণ্ড.২৯, পৃ.৪৩৩, শামসুদ্দিন যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা, পৃ. ৬, পৃ. ৪০২, জালাল উদ্দিন সুয়ূতী, তাবয়ীদুস্ সহীফা, পৃ.১০৫।
. মাগাযী, জিহাদ বিয়ষক তত্ত্বাবলিকে মাগাযী বলে।
. সাইমিরি, আখবারু আবি হানীফা, পৃ. ৭৫।
. ইবনে বাজ্জাজ, মানাকিবুল ইমামিল আযম, খণ্ড ১. পৃ.৯৭।
. প্রাগুক্ত।
. সাইমিরি, আখবারু আবি হানীফা, পৃ. ৭৫, খতিব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, খণ্ড. ১৩, পৃ. ৩৪৩, ইবনে হাজর হায়তামী, আল খায়রাতুল হিসান, পৃ. ৪৫।
. খতিব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, খণ্ড.১৩, পৃ. ৩৩৮, ইমাম মিজ্জি, তাহজীবুল কামাল, খণ্ড. ২৯, পৃ. ৪২৯, ইবনে হাজর হায়তামী, আল খায়রাতুল হিসান, পৃ. ১২।
. খতিব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, খণ্ড. ১৩, পৃ. ৩৪০।
. খতিব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, খণ্ড. ১৩, পৃ. ৩৪২।
. ইবনে হিব্বান, আল সিক্বাত, হাদীস- ১৪৪৬৫, ইবনে আদী আল কামিল, খণ্ড. ৭, পৃ. ৭।
. ইবনে আবি জায়েদ, আল খিরাওয়ানী, আল জামে, পৃ. ১১৭।
. মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী, আল-সহীহ্, হাদীস-৭১, ২৯, ৪৮, মুসলিম বিন হাজ্জাজ, আল সহীহ্, হাদীস-১০৩৭।
. তাবরানী, আল মু’জামূল আওসাত, হাদীস-৬১৬৬, দারু কুতনী, আল সুনান, হাদীস নং ২৯৪, বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান, হাদীস নং-১৭১২।
. ড. তাহেরুল কাদেরী, ইমাম আবু হানীফা-ইমামূল আয়িম্মা ফিল হাদিস, পৃ. ১২৫, ১৫২।
. তিরমিযী, আল-জামে’, হাদিস-২৬৫৬, আবু দাউদ, আল-সুনান, হাদিস-৩৬৬০, আহমদ বিন হাম্বল, আল-মুসনাদ, হাদিস নং-২১৬৩০, নাসায়ী, আল-সুনান, হাদিস-৭৪৭, ইবনে মাজাহ্ আল সুনান, হাদীস-২৩৫, দারেমী, আল-সুনান, হাদিস-২২৯।
. ড. তাহেরুল কাদেরী, ইমাম আবু হানীফা-ইমামূল আয়িম্মা ফিল হাদিস।
. প্রাগুক্ত।
. ইবনে হাজর আসকালানী, হাদিউস শারী, পৃ. ৪৭৮।
. যায়লানী, নুশবুর রায়া, খণ্ড. ১, পৃ. ৩০।
. ড. তাহেরুল কাদেরী, ইমাম আবু হানীফা-ইমামূল আয়িম্মা ফিল হাদিস।
. ড. তাহেরুল কাদেরী, ইমাম আবু হানীফা-ইমামূল আয়িম্মা ফিল হাদিস।
. ইমাম মিজ্জি, তাহজীবুল কামাল, খণ্ড ১২, পৃ. ৪৩৯, জালাল উদ্দীন সুয়ূতী, তবকাতুল হুফ্ফাজ, খণ্ড ১, পৃ. ২৭।
. খতীব বাগদাদী আল-জামে’, খণ্ড ২, পৃ. ২৪৪।
. খতীব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, পৃ. ৪৬৬, শামসুদ্দিন যাহাভী, সিয়ারু আলামীন নুবালা, খণ্ড ১৩, পৃ. ২২৩।
. মুয়াফ্ফাক্ব, মানাকিবুল ইমাম আল- আজম, খণ্ড ১, পৃ. ২৫৩, যায়লায়ী, নুসবুর রায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৩৬।
. ড. তাহেরুল কাদেরী, ইমাম আবু হানীফা-ইমামূল আয়িম্মা ফিল হাদিস, পৃ. ৩৫৬।
. ইবনে হাজর আসকালানী, হাদীওস সারী, পৃ. ৪৭৮।
. ইবনে হাজর আসকালানী, হাদীওস সারী, পৃ. ৪৭৮।
. মুয়াফ্ফাক্ব, মানাক্বিবুল ইমামাল আযম, খণ্ড ১, পৃ. ২৫৩, যায়লানী, নুসবুর রায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৩৬।
. শামসুদ্দিন যাহাভী, সিয়ারু আলামীন নুবালা, খণ্ড ৫, পৃ. ৮১, ইবনে হাজর আসকালানী, তাহযীবুত তাহজীব, খণ্ড ৭, পৃ. ১৮১, ইমাম মিজ্জি, তাহজিবুল কামাল, খণ্ড ২৪, পৃ. ৭০-৭২।

. মুহাম্মদ বিন ইসমাঈল বুখারী, তারিখে কবীর, খণ্ড ২, পৃ. ৪৫০, শামসুদ্দিন যাহাভী, তাযকীরাতুল হুফ্ফাজ, খণ্ড ১, পৃ. ৮১, ইবনে হাজর আসকালানী, তাহযীবুত্ তাহযীব, খণ্ড ৫, পৃ. ৫৯।
. ইবনে হিব্বান, আল সিক্বাত, খণ্ড ৫, পৃ. ১৮৬।
. শামসুদ্দিন যাহাভী, তাযকিরাতুল হুফ্ফাজ, খণ্ড ১, পৃ. ৭৯
. ড. তাহেরুল কাদেরী, ইমাম আবু হানীফা-ইমামূল আয়িম্মা ফিল হাদিস, পৃ. ৪৩০-৪৭৭।
. যুরকানী, শরহে মুয়াত্তা, খণ্ড ১, পৃ. ২।
. শামসুদ্দিন যাহাভী, সিয়ারু আলামীন নুবালা, খণ্ড ১১, পৃ. ১৮১।
. শামসুদ্দিন যাহাভী, সিয়ারু আলামীন নুবালা, খণ্ড ১২, পৃ. ৫৬১।
. ড. তাহেরুল কাদেরী, ইমাম আবু হানীফা-ইমামূল আয়িম্মা ফিল হাদিস, পৃ. ৫৭০।
. ইবনে হাজর আসকালানী, তাহযীবুত তাহযীব, খণ্ড ৪, পৃ. ১৫১।
. শামসুদ্দিন যাহাভী, সিয়ারু আলামীন নুবালা, খণ্ড ১৪, পৃ. ২৫-২৭।
. ইবনে হাজর আসকালানী, মুকাদ্দামা ফতহুল বারী, পৃ. ৬৪২।
. ইবনে হাজর হায়তামী, আল-খায়রাতুল হিসান, পৃ. ৩৬, খাওয়ারিযমী, জামেউল মাসানিদ, খণ্ড ১, পৃ. ৩২, সালেহী, কিতাবু উকুদুল জিমাল, পৃ. ৬৩।
. খতীব বাগদাদী, তারিখে বাগদাদ, খণ্ড ২, পৃ. ৭, ইবনুল জুওযী, সিফাতু সফওয়া, খণ্ড ২, পৃ. ১৬৯, ইমাম মিজ্জি, তাহযিবুল কামাল, খণ্ড ২৪, পৃ. ৪৩৯, শাসমুদ্দিন যাহাভী, সিয়ারুল আলামীন নুবালা, খণ্ড ১২, পৃ. ৩৩৯, ইবনে হাজর আসকালানী, মুকাদ্দামা, ফতহুল বারী, খণ্ড ১, পৃ. ৪৮৭।
. সাইমিরী, আখবারু আবি হানীফা, পৃ. ১৩৩।
. সাইমিরী, আখবারু আবি হানীফা, পৃ. ১৩৭।
. আবু যাকারিয়া নবভী, শরহে মুসলিম, খণ্ড ১, পৃ. ১৫, শামসুদ্দিন যাহাভী, সিয়ারু আলামীন নুবালা, খণ্ড ১২, পৃ. ৫৬৮, ইবনে হাজার আসকালানী, মুকাদ্দামা ফতহুল বারী, পৃ. ৩৪৭।
. ইবনে হাজর আসকালানী, মুকাদ্দামা ফতহুল বারী, পৃ. ৪৭৯, কুস্তুলানী, ইরাশদুস সারী, খণ্ড ১, পৃ. ৩২, লালকাঈ, উসুলু ই’তেকাদে আহলে সুন্নাহ, খণ্ড ২, পৃ. ৮।

মাযহাব অনুসরণঃএকটি পর্যালোচনা

Standard

মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ

وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَ‌ٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿٥٩﴾
এরশাদ হচ্ছে

ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের আর তোমাদের মধ্যে যারা মতায় অধিষ্ঠিত তাদেরও (নির্দেশ মেনে চলো)। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে সেটাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমীপে উপস্থাপন করো তথা কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে এর সমাধান খুঁজে বের করো (সঠিক সিদ্ধান্ত লাভের আশায়) যদি আল্লাহ্ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হও। এটা উত্তম এবং এর পরিণাম সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। [সূরা নিসা : আয়াত : ৫৯]

আলোকপাত
সুন্নী মুসলিম হিসাবে আমাদের অন্তরে এই বিশ্বাস ও আক্বীদাহ রাখতে হবে যে, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নিবেদিত হয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার একক ও নিরংকুশ আনুগত্যই হলো তাওহীদের মর্মকথা এবং সাথে সাথে রসূলে করীম রাউফুর রহীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আনুগত্যও এ জন্য অত্যাবশ্যক যে, তাঁর প্রতিটি কথন, জীবনের প্রতিটি আচরণ উম্মতের নিকট শরীয়তে ইলাহীয়ার প্রতিবিম্ব হিসেবেই বিবেচিত। এমনকি রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কোন নির্দেশ বাহ্যত কুরআন মজীদের বিপরীত প্রতীয়মান হলেও সেেেত্র ব্যাখ্যা সাপেে তাঁর নির্দেশিত বিষয় তথা হাদীস শরীফই শরীয়তের দলীল হিসেবে গণ্য হবে। হযরত মা ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এর জীবদ্দশায় হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কে ২য় বিবাহের অনুমতি না দেয়া এবং হযরত খুযাইমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর স্যা দুইজন সাীর সা্েযর সমতূল্য ঘোষণা দেয়া ইত্যাদি এরই অন্তর্ভুক্ত। অতএব মুমিন দাবীদার কোন ব্যক্তি কোন গ্রহণযোগ্য ও শরয়ী কারণ ব্যতিরেকে রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত অমান্য করা মূলত নিজের ঈমানকে অস্বীকার করার নামান্তর। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেনÑ
فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُوْنَ حَتّى يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُوْا فِىْ اَنْفُسِهِمْ حَرَجٌ مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا ـ
অর্থ: ‘সুতরাং হে মাহবুব! আপনার প্রতিপালকের শপথ, তারা মু’মিন হবে না যতণ না তারা তাদের পারস্পরিক বিবাদের েেত্র আপনাকে বিচারক মানবে অতঃপর আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অন্তরে সংশয় রাখবে না এবং সমর্পিত চিত্তে গ্রহণ করবে না।’’
এ আয়াতে ঈমানের পূর্ণতা নয় বরং ঈমানকেই অস্বীকার করা হয়েছে। অতএব এ বিষয়ে ভিন্ন মতের কোনও অবকাশ নেই যে, মানুষের ইহ ও পরকালীন মুক্তি ও সাফল্যের জন্য আল্লাহ্তায়ালাও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র যথাযথ আনুগত্যের কোন বিকল্প আছে। নিঃসন্দেহে কোন বিকল্প পথ নেই।
আলোচ্য আয়াতে اولى الامر এর আনুগত্যের কথাও বলা হয়েছে। যার অর্থ ‘আদেশ দাতাগণ’, মতায় অধিষ্ঠিত ইত্যাদি। সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসীরকাকের মতে اولى الامر দ্বারা ‘কোরআন-সুন্নাহ’র জ্ঞানের অধিকারী ফকীহ ও মুজতাহিদগণকেই বুঝানো হয়েছে। উক্ত মতের পে যাদের অবস্থান তাদের মধ্যে হযরত জাবের বিন আবদিল্লাহ, হযরত আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস, হযরত মুজাহিদ, হযরত আতা বিন আবি রিবাহ, হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। কারো কারো মতে উক্ত اولى الامر দ্বারা মুসলিম শাসকবর্গ উদ্দেশ্য।
ইমাম আবু বকর জাস্সাস (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) এর মতেاولى الامر শব্দটির ব্যাপকার্থ ধরা হলে তাফসীরদ্বয়ের মাঝে আর কোন বিরোধ থাকে না। তখন অর্থ দাঁড়াবে প্রশাসনের েেত্র তোমরা প্রশাসকবর্গের এবং আহকাম ও মাসায়েলের েেত্র বিজ্ঞ আলেমগণের কথা মেনে চলো। যদি আমরা তাঁর উক্ত মতের সাথে আরেকটি কথা সংযোজন করি তাহলে اولى الامر এর ব্যাপকার্থকে সীমাবদ্ধতার পরিসরে নিয়ে আসা যায়, আর তা হলো اولى الامر দ্বারা যদি মুসলিম শাসক উদ্দিষ্ট হয় তাহলে কোন সমস্যা নেই। কারণ প্রশাসন, আহকাম ও মাসায়েলের েেত্র শাসকবর্গ সুবিজ্ঞ আলেমগণের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য। সুতরাং শাসকবর্গের আনুগত্য আলেমগণের আনুগত্যের নামান্তর মাত্র।
মোদ্দাকথা হলো, আলোচ্য আয়াতের আলোকে আল্লাহ্ তায়ালা ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আনুগত্য যেমন ফরজ ঠিক তেমনিভাবে সুশাসক বা কোরআন-সুন্নাহ্র যথোপযোগী ব্যাখ্যাদাতা বিজ্ঞ আলেম ও মুজতাহিদগণের আনুগত্যও অপরিহার্য, আর পরিভাষায় এরই নাম হলো তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণ। তাক্বলীদ বা কোন ইমামের মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতার স্বপে উক্ত আলোচ্য আয়াত ছাড়াও পবিত্র কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রত্য ও পরো প্রমাণ রয়েছে।
আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেনÑ

ধর্মজ্ঞান অর্জনের নিমিত্তে প্রত্যেক দল থেকে কেন একটি উপদল বের হয় না, যেন ফিরে এসে স্বজাতিকে সতর্ক করতে পারে এবং যেন স্বজাতিরা সর্তকবাণী শ্রবণ করে সর্তক হতে পারে। [সূরা তাওবা, আয়াত : ১২৩]
উক্ত আয়াতের সারমর্ম হলো উম্মতের মাঝে এমন একটি দল থাকা অপরিহার্য যারা দিবা-রাত্রি কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকবে এবং ইজতিহাদ বঞ্চিত মুসলমানদের মাঝে ইজতিহাদ প্রসূত জ্ঞান বিতরণ করবে সাথে সাথে সর্বসাধারণের করণীয় হলো তাঁদের প্রদর্শিত মত, পথ অনুসরণ করা এবং যাবতীয় অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকা। উক্ত আয়াতের হুকুম ও তাক্বলীদের মাঝে বৈপরীত্য কোথায়? মহান আল্লাহ্ তায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেনÑ

অর্থাৎ তোমরা না জানলে বিজ্ঞজনদের কাছে জিজ্ঞেস করো। [সূরা নাহাল, আয়াত- ৪৩]
উল্লেখিত আয়াত নিঃসন্দেহে তাকলিদ বা মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতা প্রমাণ করছে। আয়াতে বলা হচ্ছে জ্ঞানের দৈন্যের কারণে অনভিজ্ঞ লোকদের উচিত অভিজ্ঞ ও জ্ঞানসমুদ্রে বিচরণকারী ব্যক্তিদের দ্বারস্ত হয়ে তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমল করা।
এভাবে পবিত্র কুরআনে তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণের স্বপে এমন অসংখ্য প্রামান্য তথ্য রয়েছে। অনুরূপ পবিত্র হাদিস শরীফে তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণের স্বপে প্রামান্য তথ্য বিদ্যমান। যেমন- হযরত হুযায়ফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনÑ

অর্থাৎ আমার পরে তোমরা আবু বকর ও ওমর এ দুইজনকে অনুসরণ করে যাবে। [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্, আহমদ]
উল্লেখিত হাদীসেاقتداء শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
ধর্মীয় আনুগত্যের অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন

অর্থ- তোমরা (আমার কর্মপদ্ধতি প্রত্য করার মাধ্যমে)
আমাকে অনুসরণ করে যাও আর তোমাদের পরবর্তীরা তোমাদেরকে অনুসরণ করে যাবে। [বুখারী, মুসলিম]
এভাবে সাহাবায়ে কেরামসহ সিংহভাগ পূর্ববর্তী ইসলামী মনীষীদের অসংখ্য উক্তি তাকলীদ তথা মাযহাব মানার পে প্রমাণ বহন করে।
উল্লেখ্য একজন মুকাল্লিদ (তাক্বলীদকারী) তার অনুসরণের পাত্র কোন মুজতাহিদকে আইন প্রণেতা বা শরীয়তের স্বতন্ত্র উৎস মনে করে না (যেমন আহলে হাদীস বা লা-মাযহাবীদের একটি অংশ মুকাল্লিদ সম্পর্কে তেমনটি মনে করে থাকে) বরং এই বিশ্বাসে তারা মুজতাহিদগণের অনুসরণ করে থাকে যে, কুরআন ও সুন্নাহ্ হলো ইসলামী শরিয়তের প্রধান দু’টি শাশ্বত উৎস এবং এ উৎসদ্বয়ের সুবিশাল ও বিস্তৃত জগতে সে (তাক্বলীদকারী) একজন অসহায় ও আনাড়ি পথিক মাত্র আর অন্যদিকে মুজতাহিদ হলেন সেই সমুদ্রের একজন নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। সেেেত্র তাঁর প্রদত্ত ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তই হলো বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ এবং বাস্তব সত্যের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি মাত্র। সুতরাং মুজতাহিদগণ আইন প্রণেতা নন বরং আইনের ব্যাখ্যাদাতা। আহলে হাদীস বা লামাযহাবীদের ন্যায় যে বা যারা ইমাম আযম আবু হানীফা (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম মালেক (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম শাফেয়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) প্রমুখ ইমামগণকে নিজেদের সাথে তুলনা করার ঘৃণ্য অপচেষ্টায় লিপ্ত, মূলত এহেন চিন্তাধারা তাদের স্থুলবুদ্ধি, হীন মানসিকতা এবং নগ্ন নির্লজ্জতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ ধরনের ব্যক্তি বা সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
আলোচ্য আয়াতের শেষাংশ দ্বারাও অনেকে একটি অগ্রহণযোগ্য ও দুর্বল অভিমত ব্যক্ত করে থাকে। আয়াতাংশটি হলো-
فان تنازعتم فى شئ فردوه الى الله والرسول ان كنتم تؤمنون بالله واليوم الاخر
অর্থাৎ আয়াতের প্রথমাংশে বর্ণিত ‘ঈমানদার’ দ্বারা যে সকল সাধারণ ঈমানদার উদ্দেশ্য। فان تنازعتمদ্বারা ঠিক একই শ্রেণীর ঈমানদার উদ্দিষ্ট। অর্থাৎ তারা আয়াতটির এই অর্থ নেয়, ‘হে ঈমানদারগণ যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে সেটাকে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সমীপে উপস্থাপন করো তথা কুরআন ও হাদীস থেকে এর সমাধান খুঁজে বের করো যদি আল্লাহ্ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হও। এ সম্পর্কে বিজ্ঞজনদের বক্তব্য হলো আলোচ্য আয়াতের প্রথমাংশে সর্বসাধারণকে এবং শেষাংশে ইজতেহাদের যোগ্যতাসম্পন্ন ইমামগণকে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লামা আবু বকর জাস্সাস (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) আহকামুল কুর’আনে ব্যক্ত করেনÑ

অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ তায়ালাاولى الامر তথা মুজতাহিদগণকে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো, কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে সমাধান দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘‘সাধারণ লোক’’ এবং বিজ্ঞ আলেম শ্রেণীভূক্ত নয় এমন ব্যক্তির সে যোগ্যতা নেই। কেননা এ পর্যায়ের ব্যক্তিরা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে সমাধান দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নয়। ‘‘লা মাযহাবীদের’’ কর্ণধার নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁনও ‘ফাতহুল বয়ান’ গ্রন্থে এ কথা অকপটে স্বীকার করেছেন- তিনি বলেন-

মূলত এখানে [فان تنازعتم দ্বারা] মুজতাহিদগণকে স্বতন্ত্রভাবে সম্বোধন করা হয়েছে।
অতএব সাধারণ মুসলমানরা মুজতাহিদগণের ইজতিহাদ প্রসূত মাসায়েল অনুযায়ী আমল করার মাধ্যমেই আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যথাযথ আনুগত্য প্রকাশ করবে।
আশা করি, পাঠক মহল ‘‘তাক্বলীদ’’ বা মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা সংপ্তি প্রামাণ্য তথ্য দ্বারা বুঝতে পেরেছেন।
* তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণ সাধারণত দু’প্রকার,
১.تقليد مطلق তথা মুক্ত তাক্বলীদ
২.تقليد شخصى তথা ব্যক্তি তাক্বলীদ।
পরিভাষায়,تقليد مطلق বা মুক্ত তাক্বলীদ বলতে সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট মুজতাহিদের পরিবর্তে বিভিন্ন মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত অনুসরণকে বুঝায়, تقليد شخصىবা ব্যক্তি তাক্বলীদ বলতে সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করাকে বুঝায়। সাহাবী ও তাবেয়ীগণের যুগে ‘‘মুক্ত তাকলীদ’’ ও ‘‘ব্যক্তি তাকলীদ’’ উভয়েরই প্রচলন ছিল। অবশ্য উভয় প্রকারের ল্য ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তবে পরবর্তীতে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেেিত উম্মাতের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞ আলেম ও ফকীহগণ। সর্বসম্মতভাবে মুক্ত তাকলীদের পরিবর্তে ব্যক্তি তাকলীদের পে রায় দিয়েছেন। কেননা তাঁরা ‘প্রবৃত্তির দাসত্ব’’ নামে এক ভয়ংকর ব্যাধি সর্বসাধারণদের মাঝে প্রত্য করেছিলেন। যে প্রবৃত্তির দাসত্বকে চরিতার্থ করার জন্য শরীয়তকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে তারা সামান্যতম কুণ্ঠিত হলো না, এ ধরণের সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা যখন নিজেদের ঘৃণ্য চাহিদা পূরণে মুক্ত তাকলীদের নামে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল প্রমাণ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ঠিক এহেন মুহুর্তে মুক্ত তাক্বলীদের পরিবর্তে ব্যক্তি তাকলীদের অপরিহার্যতার পে এক বৈপ্লবিক রায় প্রদান করে, বিজ্ঞ মুজতাহিদগণ তাদের এক অনন্য দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাঁদের কবর শরীফকে রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন। আমীন। সুতরাং ব্যক্তি তাকলীদের অপরিহার্যতার ধারাবাহিকতায় আজ পৃথিবী জুড়ে সমাদৃত হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী এই চারটি বরহক্ব মাযহাব বিদ্যমান আছে।
মাযহাবগুলোর রূপকার হলেন যথাক্রমে ইমাম আযম আবু হানীফা নু’মান বিন ছাবিত (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম দারুল হিজরাহ্ হযরত মালেক বিন আনাস (রাহমাতুল্লহি আলাইহি) ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রিছ আশ্শাফেয়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। আমাদের আক্বীদাহ হলো ইমাম চতুষ্টয়সহ সকল ছালেহ ইমাম ও মুজতাহিদ হক্বপন্থীদের অর্ন্তভূক্ত। তবে ইমামুল হারামাইন, আল্লামা শামী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) সহ বিজ্ঞজনদের অভিমত হলো বর্তমানে ছাহাবা, তাবেয়ীগণসহ এমন কোন ইমাম বা মুজতাহিদের তাকলীদ বৈধ নয় যাদের মাযহাব ও ফতোয়া পূর্ণাঙ্গ ও সুবিন্যস্তাকারে আমাদের কাছে নেই। বিশ্লেষণের নিরিখে আমরা বলতে পারি একমাত্র চার ইমামের মাযহাব ও ফতোয়া সুবিন্যস্ত গ্রন্থাবদ্ধ। সুতরাং অনিবার্য কারণবশতঃ উক্ত চার ইমাম ছাড়া অন্য কারো তাক্বলীদ সম্ভব নয়। হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী থেকে যেকোন একটি মাযহাবের অনুসরণ করা ওয়াজিব। মাযহাব না মানা পথভ্রষ্টতা।
মহান আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে তাকলীদের অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা বুঝার তাওফীক দান করুন। লামাযহাবীসহ সকল বাতিলপন্থীর মন্দ আক্বীদাহ্ থেকে আমদের ক্বলবকে পবিত্র রাখুন। কুরআন-সুন্নাহ্র নির্দেশিত সঠিক পথ ও মতে চলার মাধ্যমে দু’জাহানের সাফল্য দান করুন। আমীন, বিহুরমতি সায়্যিদিল মুরসালিন।

নারী ও পুরুষের নামাজের মধ্যে পার্থক্য স্বীকার করেন ইবনে তাইমিয়্যা

Standard

যারা নারী ও পুরুষের মধ্যে সালাতের পার্থক্য অস্বীকার করে, তাদের উদ্দেশ্যে এই ছোট্ট উপহার।
__________________________________________________
দেখুন, আপনাদের প্রধান শায়েখ, আপনাদের শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ নামাজে নারী ও পুরুষের মধ্যকার পার্থক্য স্বীকার করেছেন যা তিনি তার ‘আল মুহাররারু ফিল ফিকহ’ নামক কিতাবে প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেছেন,
নারী পুরুষের মতই সালাত আদায় করবে, কিন্তু রুকু এবং সাজদাতে (পুরুষের মত) অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে ফাঁকা রাখবেনা, এবং সে তারাব্বু অবস্থায় বসবে অথবা উভয় পা কে শরীরের ডান দিকে বের করে এনে ফাঁকা না রেখে উভয় পা কে মিলিয়ে বসবে। আর এটাই সালাতের পূর্ণতার বৈশিষ্ট্য।
(উল্লেখ্য, এভাবেই আমাদের মা ও বোনেরা নামাজ আদায় করে থাকেন যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আর এটাই বিশুদ্ধ)
আপনাদের শায়খুল ইসলামের এমন ফতোয়ার পর ‘নামাজের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই’ এমন কথা বলা বা প্রচার করা সমাজে বিভ্রান্তি ও ফেতনা সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়।
– এসব ফেতনাবাজি বন্ধ করুন আর নিজেদের শায়খুল ইসলামের ফতোয়া অনুসরন করুন। এটাই হবে উত্তম।