সূরা ফাতিহার তাফসীর pdf

Standard

image

image

image

image

image

image

image

Advertisements

সূরা নসরের তাফসীর

Standard

بسم الله الرحمن الرحيم
اذا جاء نصر الله والفتح ০ ورايت الناس يدخلون فى دين الله افواجا০ فسبح بحمد ربك واستغفره- انه كان توابا০
তরজমা: (১) যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে। (২) এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন। (৩) তখন আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসা করে পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর নিকট (উম্মতের জন্য) ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি অধিক তওবা কবুলকারী।

নামকরণ ও নাজিল প্রসঙ্গ
সূরা নসর মাদানী, এতে একটি রুকু, তিনটি আয়াত, সতেরটি পদ ও এবং সাতাত্তরটি বর্ণ রয়েছে। (খাজাইনুল ইরফান)
এই সূরার প্রথম আয়াতের অন্তর্গত النصر  (নসর) শব্দের অবলম্বনে ‘সূরাতুন নসর’ নামকরণ করা হয়েছে।
শাহ আব্দুল আজিজ মোহাদ্দিসে দেহলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সূরা নসরকে সূরা তাওদী বা বিদায়ের ঘোষণা দানকারী সূরা বলা হয়ে থাকে। কারণ এ সূরায় হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তেকালের পূর্বাভাষ রয়েছে। (তাফসিরে আজিজী)
উ¤মূল মু’মিনীন হযরত উম্মে হাবিবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, যখন সূরা নসর নাজিল হলো তখন রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি এ বৎসর ইন্তেকাল করবো। (ইহা শুনে) হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ক্রন্দন করতে লাগলেন। হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘হে ফাতেমা! আমার আহলে বায়তের মধ্যে তুমিই সর্বপ্রথম আমার সাথে মিলিত হবে। (অর্থাৎ তুমিই সর্বপ্রথম ইন্তেকাল করবে)
অতঃপর হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর পবিত্র ওষ্ঠ প্রান্তে জান্নাতি হাসি ফুঠে উঠল। (দুররে মনসুর)

হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এই সূরায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার ইন্তেকালের সংবাদ দেয়া হয়েছে। তাঁকে বলা হয়েছে আল্লাহর সাহায্য এলে এবং বিজয় লাভ হলে বুঝতে হবে, তাঁর জীবনকাল পূর্ণ হয়েছে। (বোখারী)
واستغفره  (ওয়াস্তাগফিরহু) এর সবিস্তার আলোচনা
সূরায়ে ‘নসর’ এ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর তা’রীফ ও প্রশংসা এবং তাঁর শাহানশাহী দরবারে ইস্তেগফার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হাবীবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইস্তেগফার করবেন কার জন্য? নিজের গোনাহ মাফের জন্য? না উম্মতের গোনাহ মাফের জন্য?।
নিঃসন্দেহে বলতে হবে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইস্তেগফার করবেন উম্মতের গোনাহ মাফ করানোর জন্য, নিজের গোনাহ মাফের জন্য নয়। কেন না হাবীবে খোদা হচ্ছেন মা’সুম, যার কোন গোনাহ সংঘটিত হয়নি। তিনি গোনাহ থেকে একেবারেই পূতঃপবিত্র।
বদরী সাহাবায়ে কেরাম সূরা ‘নসর’ এর তাফসির প্রসঙ্গে বলেছেন, আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবীবকে সম্বোধন করে তাঁর উম্মতগণকে নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁরা যেন আল্লাহর তা’রীফ ও প্রশংসা এবং আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে নিজের গোনাহ মাফের জন্য ইস্তেগফার করতে থাকেন। এককথায় বুঝে নিতে হবে উম্মতগণ ইস্তেগফার করবেন নিজেদের গোনাহ মাফের জন্য এবং আল্লাহর হাবীব ইস্তেগফার করবেন উম্মতের গোনাহ মাফ করানোর জন্য অর্থাৎ হাবীবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে উম্মতের প থেকে ইস্তেগফার বা গোনাহ মাফ চেয়ে আসছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত চাইতে থাকবেন।
উল্লেখ্য যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের প থেকে আল্লাহর তা’য়ালার দরবারে ইস্তেগফার বা উম্মতের গোনাহ মাফ করানোর জন্য শাফায়াত না করলে আল্লাহ তা’য়ালা গোনাহগার উম্মতের গোনাহ কিছুতেই মাফ করবেন না। কেন না নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন شفيع المذنبين ‘শাফীউল মুজনিবীন’ وسيلة المقربين ‘ওয়াসিলাতুল মুকাররিবীন’।
মোদ্দাকথা হল, সূরা ‘নসর’ এ আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবীবকে উম্মতের প থেকে, তাঁদের (উম্মতের) গোনাহ মাফ করানোর জন্য ইস্তেগফার করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাথে সাথে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবীবকে সম্বোধন করে তাঁর উম্মতগণকে ইস্তেগফার করার নির্দেশও জারি করেছেন।
তাফসিরুল কোরআন বিল কোরআন
জ্ঞাতব্য বিষয় এই যে, তাফসিরুল কোরআনের প্রথমধারা হলো, এক আয়াতে কারীমার তাফসির হবে অন্য আয়াতে কারীমা দ্বারা, ইহাকেই تفسير القران بالقران ‘তাফসিরুল কোরআন বিল কোরআন’ বলা হয়ে থাকে।
সুতরাং واستغفره ‘ওয়াস্তাগফিরহু’ আয়াতে কারীমার তাফসির বা ব্যাখ্যা হবে নিম্নের আয়াতে কারীমার দ্বারা-
ولو انهم اذظلموا انفسهم جاءوك فاستغفروا الله واستغفرلهم الرسول لوجدوا الله توابا رحيما. (سورة نساء ۴۶)
অর্থাৎ ‘এবং যদি কখনো তারা (লোকগণ) নিজেদের আত্মার প্রতি জুলুম বা গোনাহ করে, তখন হে মাহবুব! (তারা) আপনার দরবারে হাজির হয়, অতঃপর আল্লাহর নিকট মা প্রার্থনা করে, আর রাসূল তাদের পে ইস্তেগফার তথা সুপারিশ করেন, তবে অবশ্যই তারা আল্লাহকে অধিক তাওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু হিসেবে পাবে।’
আয়াতে কারীমার সার কথা হল, উম্মত যদি শক্ত গোনাহ করে নবীর দরবারে হাজির হয়ে আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে ইস্তেগফার বা নিজের গোনাহ মাফের জন্য তাওবা করে এবং আল্লাহার হাবীব যদি ঐ উম্মতের গোনাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে ইস্তেগফার বা সুপারিশ করেন, তবে তাঁরা আল্লাহর প থেকে নিশ্চয়ই মা পাবে।
উক্ত আয়াতে কারীমার মধ্যে দুটি লণীয় বিষয় রয়েছে-
একটি হল فاستغفرواالله  ‘ফাস্তাগফারুল্লাহা’ অর্থাৎ গোনাহগার উম্মতগণ নবীর দরবারে হাজির হয়ে আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে নিজেদের গোনাহ মাফের জন্য ইস্তেগফার করে।
দ্বিতীয়টি হল, واستغفرلهم الرسول ‘ওয়াস্তগফারা লাহুমুর রাসূল’ অর্থাৎ ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের গোনাহ মাফ করানোর জন্য ইস্তেগফার বা সুপারিশ করেন।’
উক্ত আয়াতে কারীমা দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল, উম্মতগণ নিজেদের গোনাহ মাফের জন্য ইস্তেগফার করেন এবং নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের গোনাহ মাফ করানোর জন্য আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে ইস্তেগফার বা মা প্রার্থনা করে থাকেন। নিজের গোনাহের জন্য নয়। যা এক আয়াতে কারীমার তাফসির অন্য আয়াতে কারীমা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে গেল। কেন না নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন মা’সুম, যার থেকে কোন গোনাহ সংঘটিত হয় নাই। আল্লাহ তা’য়ালা সর্বণ তাঁর হাবীবকে গোনাহ সংঘটিত হওয়া থেকে পূর্ণ হেফাজত করে রেখেছেন।
ইসলামী সঠিক আকিদা হল الانبياء معصومون ‘আল আম্বিয়াউ মা’সুমুন’ নবীগণ হচ্ছে নিষ্পাপ।
সুতরাং সূরা ‘নসর’ এ واستغفره ‘ওয়াস্তাগফিরহু’ আয়াতে কারীমার সঠিক তাফসির হল, হে আমার হাবীব! আপনি আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে স্বীয় উম্মতের গোনাহ মাফের জন্য, ইস্তেগফার বা মা প্রার্থনা করুন এবং সাথে সাথে আল্লাহ তাঁর হাবীবকে সম্বোধন করে তাঁর উম্মতগণকে তাদের স্বীয় গোনাহ মাফের জন্য ইস্তেগফার করার নির্দেশও জারি করেছেন। এজন্য হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইস্তেগফার বাক্য পাঠ করে উম্মতগণকে ইস্তেগফার করার তা’লিম বা শিা দিয়েছেন।

সাহাবায়ে কেরামগণের তাফসির
সূরা ‘নসর’ এর তাফসির প্রসঙ্গে হাফিজুল হাদিস আবুল কাশিম সোলায়মান ইবনে আহমদ আত্তাবরানী রাদিয়াল্লাহু আনহু (ওফাত ৩৬০ হিজরি) তদীয় ‘আল মু’জামাল কবীর উরফে তাবরানী’ শরীফের ১০ম জিলদের ২৬৪ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-
۱۰۶۱۷ – حدثنا على بن عبد العزيز ثنا عارم ابو النعمان ثنا ابوعوانة عن ابى بشر عن سعيد بن جبير عن ابن عباس قال : كان عمر يدخلنى مع اشياخ بدر. فقال بعضهم : لم تدخل هذا الفتى معنا ولنا ابناء مثله؟ فقال: انه ممن قد علمتم قال: فدعاهم ذات يوم ودعانى. ومارايته دعانى يومئذ الاليريهم منى. فقال: ما تقولون (اذاجاء نصر الله والفتح ورايت الناس يدخلون فى دين الله افواجا) حتى ختم السورة. فقال بعضهم: امرنا ان نحمد الله ونستغفره اذا نصرنا وفتح علينا. وقال بعضهم: لاندرى ولم يقل بعضهم شيئا.
فقال لى: ياابن عباس كذالك تقول؟ قلت لا . قال فما تقول؟ قلت: هو اجل رسول الله صلى الله عليه وسلم علمه الله اذا جاء نصرالله والفتح فتح مكة. فذلك علامة اجلك فسبح بحمد ربك واستغفره انه كان توابا. فقال عمر: مااعلم منها الاما تعلم.
অর্থাৎ হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন- হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বদরের বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবায়ে কেরামগণের সাথে গণ্য করলে, এ ব্যাপারে একদল সাহাবায়ে কেরাম বলেন, আমাদের সাথে এ যুবককে কেন শামিল করা হল, এ ধরনের যুবকতো আমাদের ছেলেদের মধ্যে গণ্য। এতদ শ্রবণে হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এমন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন যার সম্মন্ধে আপানারা অবগত আছেন।
হাদিসশরীফ বর্ণনাকারী হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে ও বদরী সাহাবায়ে কেরামগণকে আহ্বান করলেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে দেখানোর জন্য সাহাবায়ে কেরামগণকে এভাবে আহ্বান করতে আমি আর কোনদিন দেখিনি।
অতঃপর হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু
اذا جاء نصر الله والفتح. ورايت الناس يدخلون فى دين الله افواجا.
সূরায়ে ‘নসর’-এ সম্পূর্ণ সূরার তাফসির বা ভাবার্থ সম্পর্কে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামগণকে, তাঁদের অভিমত পেশ করতে বললেন। উত্তরে কতিপয় সাহাবায়ে কেরাম সূরা ‘নসর’ এর শেষাংশের তাফসির পেশ করে বললেন-
وامرنا ان نحمد الله ونستغفره اذا امرنا وفتح علينا.
অর্থাৎ ‘আল্লাহ তা’য়ালা সূরায়ে নসর নাজিল করে  আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন আল্লাহ তা’য়ালার তা’রিফ ও প্রশংসা করি এবং তাঁর শাহানশাহী দরবারে ইস্তেগফার বা মা প্রার্থনা করতে থাকি, যখন আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে সাহায্য ও ফতেহ বা বিজয়ী করবেন।
আর একাংশ সাহাবায়ে কেরাম বললেন لاندرى ‘লা নাদরী’ অর্থাৎ আমরা সূরায়ে নসরের তাফসির সম্বন্ধে অবগত নই। অপরদিকে কিছুসংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম কিছুই বললেন না বরং নীরব ভূমিকা পালন করলেন।
সাহাবায়ে কেরামগণের এ অভিমতসমূহ শ্রবণ করার পর হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বললেন, হে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু- كذالك تقول؟ ‘কাযালিকা তাকুলু’ আপনার অভিমত হুবহু এভাবে? উত্তরে তিনি (ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন না, আমার অভিমত হুবহু এভাবে নয়) হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন- ما تقول؟ ‘মা তাকুলু’ তবে তোমার অভিমত কী? উত্তরে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- اذاجاء نصر الله والفتح আয়াতে কারীমা দ্বারা মুরাদ হল ‘ফতেহ মক্কা বা মক্কা বিজয়’ এতে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবীবকে ইঙ্গিত দিয়ে শিা দিয়েছেন, তাঁর আজল বা জাহেরি সূরত মোবারকে দুনিয়াতে অবস্থান করার সময় শেষ।
فسبح بحمد ربك واستغفره انه  كان توابا.
এ আয়াতে কারীমার কোন মুরাদ বা ভাবার্থ তিনি (ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু ব্যক্ত করলেন না) । (যেহেতু এ আয়াতে কারীমার তাফসির বা ভাবার্থ একদল সাহাবায়ে কেরাম পূর্বেই এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন আল্লাহ তা’য়ালার তা’রীফ ও প্রশংসা করি এবং তাঁর শাহানশাহী দরবারে গোনাহ মাফের জন্য ইস্তেগফার বা মা প্রার্থনা করতে থাকি। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তাফসিরকারী সাহাবায়ে কেরামদের উল্লেখিত তাফসিরকে প্রত্যাখ্যান করলেনই না বরং সমর্থনই করলেন। যেহেতু তাফসিরকৃত আয়াতের পুনরাবৃত্তি করেননি।
সর্বশেষ হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, সূরায়ে নসরের তাফসির বা ভাবার্থ আপনি যা জানেন, আমিও তা জানি।
উপরোক্ত হাদীসশরীফের আলোকে চারটি বিষয় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল-
১। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু তুলনামূলক কমবয়সী হলেও তাফসিরবিষয়ক জ্ঞানে বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবীদের চেয়েও পরিপ ছিলেন।
২।  সূরায়ে ‘নসর’ এর শেষাংশ فسبح بحمد ربك واستغفره  এ আয়াতে কারীমার তাফসির বদরী একদল সাহাবায়ে কেরাম এভাবে করলেন-
امرنا ان نحمد الله ونستغفره اذا امرنا وفتح علينا.
অর্থাৎ ‘আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে (উম্মতে মুহাম্মদীকে) নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন আল্লাহ তা’য়ালার তা’রিফ ও প্রশংসা এবং আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে নিজেদের গোনাহ মাফের জন্য ইস্তেগফার বা মা প্রার্থনা করতে থাকি, যখন আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে সাহায্য ও বিজয় দান করেছেন।
অপর একদল সাহাবায়ে কেরাম কিছুই বললেন না বরং চুপ রইলেন, السكوت تدل على الرضا ‘আস সুকুতু তাদুল্লু আলার রেজা’ মৌনতা সম্মতির লণ। এ হিসেবে তাঁরা উপরের তাফসিরকে প্রত্যাখ্যান না করে সমর্থনই করলেন।
অন্য একদল সাহাবায়ে কেরাম لاندرى ‘লা নাদরী’ আমরা জানি না বলে নম্্রতা প্রদর্শন করলেন। এ সকল সাহাবায়ে কেরামগণও প্রথমোক্ত তাফসিরকারী সাহাবায়ে কেরামদের তাফসিরের বিরোধিতা করেননি। বিরোধিতা না করাই তাঁদের সমর্থন ছিল বলে স্পষ্ট হয়।
এতে বদরী সাহাবায়ে কেরামদের ঐকমতে প্রমাণিত হল, আল্লাহর কালাম فسبح بحمد ربك واستغفره  এ আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবীবকে প্রত্য সম্বোধন করে পরোভাবে উম্মতে মুহাম্মদী মুরাদ নিয়েছেন। অর্থাৎ উম্মতগণ ইস্তেগফার করবেন নিজেদের গোনাহ মাফের জন্য এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইস্তেগফার করবেন উম্মতের গোনাহ মাফ করানোর জন্য।
সুতরাং মাহবুবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোনাহ সংঘটিত হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একথাই স্পষ্ট প্রমাণিত হল।
৩। একদল বদরী সাহাবায়ে কেরাম فسبح بحمد ربك واستغفره  এ আয়াতে কারীমার তাফসির করলেন ‘আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে আল্লাহর তা’রিফ ও প্রশংসা এবং আল্লাহর দরবারে আমাদের গোনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
অতঃপর হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, তুমি কি অনুরূপ বলবে? তিনি উত্তরে বললেন, না। হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- ماذا تقول তুমি যেহেতু না বল, তা হলে এসম্পর্কে তোমার অভিমত কী? উত্তরে ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- اذا جاء نصر الله والفتح এ আয়াতে কারীমা দ্বারা মুসলমানদের মক্কা বিজয় বা ফতেহ মক্কাকেই বুঝানো হয়েছে।
তদুপরি আল্লাহর হাবীব এ ধরাধামে বাহ্যিক সুরত মোবারকে থাকবেন না, তাঁর আজল শেষ। আল্লাহ তা’য়ালা এ শিাই তাঁর হাবীবকে দিয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূরা ‘নসর’ এর প্রথমাংশের তাফসির করে সূরা ‘নসর’ এর পূর্ণাঙ্গ তাফসির সমাপ্ত করে দিলেন।
৪। হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু উপরের তাফসিরসমূহের কোন তাফসিরকে প্রত্যাখ্যান করলেন না, বরং বললেন হে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু সূরা ‘নসর’ এর তাফসির তুমি যেভাবে বুঝেছ, আমিও ঠিক তেমনি বুঝেছি।
বদরী সাহাবায়ে কেরামগণের উপরোক্ত তাফসির থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল, নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোনাহ সংঘটিত হওয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। ইহাই হল تفسير القران باقوال الصحابة  সাহাবায়ে কেরামদের তাফসির।
তাফসিরে কোরআন হাদীসের আলোকে
নূরনবী মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে,  সর্বপ্রকার গোনাহ- খাতা, ভুল-ভ্রান্তি থেকে পূতঃপবিত্র, সে প্রসঙ্গে আল্লাহর হাবীব নিজেই এরশাদ করেছেন, সহীহ বোখারীশরীফের  প্রথম জিলদের সপ্তম পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে।
নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অমীয়বাণী-
ان اتقاكم واعلمكم بالله انا.
অর্থাৎ ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের থেকে অধিক পরহেজগার বা তাকওয়ার েেত্র তোমাদের সকলের ঊর্ধ্বে এবং তোমাদের সকলের চাইতে আমি আল্লাহ সম্পর্কে বেশি অবগত।’
اتقا ‘আতকা’ শব্দটি ইসমে তাফজিল। এর অর্থ হচ্ছে, সর্বস্তরের তাকওয়ার চেয়েও সর্বোচ্চ তাকওয়া বা অধিক পরহেজগারী অর্জনকারী।
তাকওয়ার ভাবার্থ ও স্তর সম্পর্কে ‘তাফসিরে বায়জাভী’ শরীফ এর প্রথম জিলদের ৩৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-
والمتقى … له ثلث مراتب (۱) الاولى التوقى عن العذاب المخلد بالتتبرى عن الشرك وعليه قوله تعالى والزمهم كلمة التقوى (۲) الثانية التجنب عن كل ما يوثم من فعل اوترك حتى الصغائر عند قوم وهو المتعارف باسم التقوى فى الشرع وهو المعنى بقوله تعالى ولو ان اهل القرى امنوا واتقوا (۳) والثالث ان يتنزه عما يشغل سره عن الحق ويتبتل اليه بشر اشره وهو التقوى الحقيقى المطلوب بقوله واتقوا الله حق تقاته.
অর্থাৎ ‘তাকওয়া’ এর ভাবার্থ ও স্তর সম্পর্কে ‘তাফসিরে বায়জাভী’ শরীফে মুত্তকীগণের তিনটি স্তর রয়েছে-
১। প্রথম স্তর- শিরক ও কুফুরী পরিত্যাগ করে চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে বেঁচে থাকা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী- والزمهم كلمة التقوى (সূরা ফাতাহ-২৬)
অনুবাদ: তাকওয়া বা খোদভীরুতার বাণী তাদের উপর অপরিহার্য করেছেন।
২। দ্বিতীয় স্তর- প্রত্যেক গোনাহের কাজ থেকে বেঁচে থাকা অথবা গোনাহ ত্যাগ করা, এমনকি এক সম্প্রদায়ের মতে সগিরা বা ছোট গোনাহ পরিত্যাগ করা। শরিয়তের পরিভাষায় ইহাকে তাকওয়া বলে প্রচলিত। আল্লাহর বাণী-     ولو ان اهل القرى امنوا واتقوا (সূরা আরাফ ৯৬)
অনুবাদ: এবং যদি ঐ সব জনপদগুলোর অধিবাসীগণ ঈমান আনতো এবং তাকওয়া বা ভয় করতো।
৩। তৃতীয় স্তর- হক থেকে বিচ্যুত এরূপ মনের কু-ধারণা থেকে পরিপূর্ণভাবে মুক্ত থাকা এবং সব মন্দ কাজের ধারণা ত্যাগ করাকে নিজেদের উপর অপরিহার্য করে নেওয়া। ইহাই তাকওয়ায়ে হাকিকী বা প্রকৃত তাকওয়ার মর্ম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহর বাণী-واتقوا الله حق تقاته  (আল ইমরান ১০১)
অনুবাদ: আল্লাহকে ভয় করো যেমনিভাবে তাঁকে ভয় করা অপরিহার্য।
জ্ঞাতব্য বিষয় এই যে, যাঁরা গোনাহে কবিরা ও সগিরা পরিত্যাগ করেন, এমনকি সর্বপ্রকার গোনাহের ধারণা থেকেও পূর্ণভাবে মুক্ত থাকেন এবং যাবতীয় মন্দ কাজের খেয়াল বা ধারণা পরিত্যাগ করে নিজেদের উপর অপরিহার্য করে নেন, তাঁরাই হলেন হাকিকী বা প্রকৃত তাকওয়ার অধিকারী বা উচ্চস্তরের মুত্তাকী।
উল্লেখ্য যে, আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এরশাদ করেছেন اتقاكم  ‘আত্বক্বাকুম’ অর্থাৎ আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের (সাহাবায়ে কেরামগণসহ) সবার চাইতে সর্বস্তরের তাকওয়ার ঊর্ধ্বে।
মোদ্দাকথা হল আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোনাহে কবিরা ও গোনাহে সগিরা এবং সর্বপ্রকার গোনাহ থেকে একেবারেই মুক্ত, এমনকি মুস্তাহাব বা খেলাফে আউলা কার্যক্রম থেকেও  সম্পূর্ণ মুক্ত।
এককথায় আল্লাহর হাবীবের মহান সত্ত্বা প্রথম থেকে এমন পবিত্র এবং সুসজ্জিত ছিল যে, কোন প্রকার দোষ ত্র“টির হস্ত তাঁর ইজ্জত ও বুজিুর্গির আঁচল স্পর্শ করতে পারে নাই। আল্লাহর হাবীব সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিষ্পাপ।
সুতরাং হাদীসশরীফের আলোকে সূরা ‘নসর’ এ বর্ণিত واستغفره ‘ওয়াস্তাগফিরহু’ আয়াতে কারীমার তাফসির বা  মুরাদ হল, আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাকে উম্মতের গোনাহ মাফ করানোর জন্য ইস্তেগফার করার নির্দেশ দিয়েছেন, এবং তাঁর উম্মতগণকে নিজেদের গোনাহ মাফের জন্য আল্লাহ তা’য়ালার শাহানশাহী দরবারে ইস্তেগফার করারও নির্দেশজারি করেছেন। এ হলো تفسير القران بالحديث ‘তাফসিরুল কোরআন বিল হাদীস’ হাদীসশরীফের আলোকে আয়াতে কোরআনের তাফসির।
মুফাসসিরে কোরআন বা তাফসিরকারকগণের অভিমত
১। তেরশত শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আল্লামা আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘তাফসিরে আজিজী’ শরীফে লিখেছেন-
واستغفره یعنی آمر زش طلب کون ازوی (اور گناہ بخشوااس سے) 
অর্থাৎ ‘আল্লাহর নিকট থেকে গোনাহ মাফ করায়ে নিন’ তারপর তিনি বলেন-
وايں اشارت بآنست کھ چوں عارف بمرتبہ تکمیل رسید وازہر گونہ مردم تابع اوشدندواستعدادت آنہا درنقصان وکمال وتفاوت فاحش داردلا جرم اور امیباید کہ براۓ تکمیل ناقصاں طلب آمرزش نمایدتا آہمہ نقصانات اصلیہ استعداد باتباع اوروز حشرمنجر بکمال استقلالے اوگردد ہمیست حقیقت شفاعت-
অর্থাৎ ‘ইহা এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, যখন আরিফ বা আল্লাহর মা’রিফত প্রাপ্ত ব্যক্তি পূর্ণতার স্তরে উপনীত হন এবং বিভিন্ন স্তরের লোক তাঁর অধিনস্ত হয়ে পরে তাঁদের (অধিনস্ত লোকদের) যোগ্যতার ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য দেখা দেয়, কেউতো পূর্ণতা লাভ করতে সম হয় আবার কেউতো নুকসান বা ত্রুটির মধ্যে থেকে যায়। এমতাবস্থায় আরিফে কামিলের জন্য বিশেষ প্রয়োজন, ত্রুটিপূর্ণ ব্যক্তিদেরকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছানোর নিমিত্তে আল্লাহর দরবারে তাদের ত্র“টি মার জন্য প্রার্থনা করা । যেন তারা তাঁর অধিনস্ত হবার কারণে কিয়ামতের দিন স্বয়ং পরিপূর্ণতা লাভ করতে সম হয়। ইহা হলো শাফায়াতের মূলতত্ত্ব।’
ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর প্রদত্ত উদাহরণে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, আল্লাহ তা’য়ালা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উম্মতের প থেকে আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে শাফায়াত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সুতরাং ইস্তেগফারের অর্থ হবে আল্লাহর নিকট উম্মতের জন্য শাফায়াত করা।
২। অনুরূপ নবম শতকের মুজাদ্দিদ আল্লামা জালালউদ্দিন সূয়ুতী রাদিয়াল্লাহু আনহু লিখেছেন-والاستغفارلهم من السيئات  অর্থাৎ ‘আল্লাহর হাবীব উম্মতের প থেকে আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে গোনাহের মাফী চাচ্ছেন। (আলহাবী লিল ফাতাওয়া)
৩। আল্লামা কাযী মোহাম্মদ সানাউল্লাহ পানিপথী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘তাফসিরে মাজহারী’ নামক গ্রন্থে واستغفره  ‘ওয়াস্তগফিরহু’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন- اوالمعنى استغفر لامتك অর্থাৎ ‘আপনি আপনার উম্মতের জন্য মা প্রার্থনা করুন।’
৪। আল্লামা সৈয়দ মাহমুদ আলুছী বাগদাদী হানাফী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘তাফসিরে রুহুল মা’য়ানী’ নামক কিতাবের সূরা নসরেরواستغفره  ‘ওয়াস্তাগফিরহু’ আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় লিখেছেন-
قيل لتعليم امته صلى الله عليه وسلم وقيل هو استغفار لامته عليه الصلوة والسلام اى استغفره لامتك.
অর্থাৎ ‘কোন কোন মুফাসসিরে কোরআন বলেছেন, উম্মতকে শিা দেওয়ার জন্য রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইস্তেগফার করতে বলা হয়েছে। আর কোন কোন তাফসিরকারকগণ বলেছেন, সেই ইস্তেগফার হচ্ছে তাঁর উম্মতের জন্য অর্থাৎ হে আমার হাবীব! আপনার উম্মতের গোনাহ মাফের জন্য মা প্রার্থনা করুন।
৫। আল্লামা আবু আব্দিল্লাহ মোহাম্মদ বিন আহমদ আনসারী কুরতুবী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় তাফসিরে কুরতুবী নামক কিতাবে واستغفره ‘ওয়াস্তাগফিরহু’ আয়াতে কারীমার তাফসিরে লিখেছেন-
وقيل ذلك تنبيه لامته لكيلا يامنوا ويتركوا الاستغفار وقيل واستغفره اى استغفره لامتك
অর্থাৎ ‘কোন কোন মুফাসসিরে কোরআন বলেছেন- উম্মতের ইস্তেগফার করার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। যাতে ইস্তেগফার করা থেকে তারা (উম্মতগণ) উদাসীন ও বিরত না থাকেন। (উম্মত যেন অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার বা আল্লাহর দরবারে তাওবা করতে থাকে)’
আর কোন কোন মুফাসসিরে কোরআন বলেছেন- واستغفره ‘ওয়াস্তাগফিরহু’ অর্থাৎ আপনার উম্মতের জন্য মা প্রার্থনা করুন।
৬। আল্লামা আলাউদ্দিন আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম বাগদাদী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর লিখিত সুপ্রসিদ্ধ তাফসির ‘তাফসিরে খাজিন’ নামক কিতাব যা ১০ই রমজানুল মোবারক ৭২৫ হিজরি সনে লিখা সমাপ্ত হয়েছে। উক্ত তাফসিরে ‘তাফসিরে খাজিন’ গ্রন্থে সূরা ‘নসর’ এর واستغفره  ‘ওয়াস্তাগফিরহু’ আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় লিখেছেন-
قيل المراد منه الاستغفار لذنوب امته وهذا ظاهر لان الله تعالى امر بذلك قوله واستغفر لذنوبك وللمومنين والمؤمنات والله سبحانه وتعالى اعلم.
অর্থাৎ ‘একদল তাফসির কারকগণ বলেছেন- এর দ্বারা মুরাদ বা মর্ম হচ্ছে, উম্মতের গোনাহের জন্য মা প্রার্থনা করা। আল্লামা খাজিন বলেন- এ ব্যাখ্যাই হচ্ছে স্পষ্ট। কেন না এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর বাণীতে ইরশাদ করেছেন-
واستغفر لذنبك وللمومنين والمومنات (سورة محمد الايت نمبر ۱۹)
অর্থাৎ ‘আপনার খাস উম্মত আম উম্মত মু’মিন নরনারীর জন্য মা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা সর্বজ্ঞ।’ (সূরা মুহাম্মদ আয়াত ১৯)
সূরায়ে মুহাম্মদ এর ১৯ নং আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় উক্ত তাফসিরে খাজিন সপ্তম জুজ ২৬৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-
قيل فى معنى الاية استغفر لذنبك اى لذنوب اهل بيتك (وللمومنين والمومنات) يعنى من غير اهل بيته وهذا اكرام من الله عز وجل لهذه الامة حيث امر نبيه صلى الله عليه وسلم ان يستغفر لذنوبهم وهو الشفيع المجاب فيهم.
অর্থাৎ ‘একদল তাফসিরকারক এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন-واستغفر لذنبك  ‘ওয়াস্তাগফির লিজানবিকা’  এ আয়াতে কারীমার মুরাদ হচ্ছে, আপনি আহলে বায়ত তথা নবী পরিবারের সদস্যবর্গের গোনাহ ও অন্যান্য সকল মু’মিন মুসলমান নরনারীর গোনাহ মাফের জন্য আল্লাহর শাহানশাহী দরবারে মা প্রার্থনা করুন। এখানে আল্লাহ তা’য়ালার প থেকে এ উম্মতে মোহাম্মদীর মর্যাদা এ জন্য প্রদান করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বীয় উম্মতের গোনাহ মাফের জন্য ইস্তেগফারের হুকুম দিয়েছেন এবং এ ইস্তেগফার হচ্ছে নবীর শাফায়াত যা উম্মতের ব্যাপারে মকবুল বা গৃহীত।’
আহলে বায়ত কারা
প্রসঙ্গক্রমে পবিত্র আহলে বায়ত সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করার প্রয়োজন মনে করছি। এজন্য যে, আহলে বায়ত কারা ও তাঁদের ফজিলত বা মর্যাদা কী? এ বিষয়ের উপর একটি নাতিদীর্ঘ বর্ণনা পেশ করা হল।
সূরা আহযাব ৩৩ নং আয়াতে এরশাদ হচ্ছে-
انما يريد الله ليذهب عنهم الرجس اهل البيت ويطهركم تطهيرا.
অর্থাৎ ‘হে নবীর আহলে বায়ত! আল্লাহ তা’য়ালা এটাই চান যে, তোমাদেরকে প্রতিটি অপবিত্রতা থেকে দূরে রাখেন এবং তোমাদেরকে খ্বুই পাকপবিত্র করেন।’
সহীহ মুসলিমশরীফের ২য় জিলদের ২৮৩ পৃষ্ঠায় হযরত আয়েশা সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে একখানা হাদীসশরীফ বর্ণিত আছে। একদা আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকাল বেলা কারুকার্য খচিত একখানা চাদর মোবারক পরিহিত অবস্থায় বের হলেন, এমতাবস্থায় হযরত হাসান বিন আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু আগমন করলে তাঁকে চাদর মোবারকের ভিতরে প্রবেশ করালেন, অতঃপর হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেই চাদর মোবারকের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। এরপর হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু আগমন করলে ক্রমান্বয়ে আল্লাহর হাবীব তাঁদেরকে চাদর মোবারকের ভেতরে প্রবেশ করালেন। এরপর মাহবুবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াতে কারীমা তেলাওয়াত করলেন-
انما يريد الله ليذهب عنهم الرجس اهل البيت ويطهركم تطهيرا.
উল্লেখ যে, আয়াত মর্মে বুঝা গেল পাক এবং হাদীস মর্মে পাওয়া গেল পাঁচজন-
১। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ২। হযরত হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহু। ৩। হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু । ৪। হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা। ৫। হযরত আলী মুরতাজা রাদিয়াল্লাহু আনহু। এজন্যই এ পাঁচজনকে বলা হয় পাকপাঞ্জাতন এবং তারাও আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত।
পারিভাষিক অর্থে আহলে বায়ত বলতে ঘরের অধিবাসীদেরকে বলা হয়ে থাকে। আহলে বায়তে নবী এর অর্থ নবীর ঘরের অধিবাসীগণ। আবার ঘরের অধিবাসী হবার তিনটি সুরত রয়েছে। একটি হচ্ছে নবীর ঘরে জন্ম হওয়া এবং নবীর ঘরেই থাকা। যেমন আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চার পুত্র, তৈয়ব, তাহের, কাশেম ও ইব্রাহিম রাদিয়াল্লাহু আনহুম। দ্বিতীয় সূরত হচ্ছে, নবীঘরে জন্ম হয়েছে কিন্তু পরবর্তীতে অন্যের ঘরে থাকেন, যেমন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চার কন্যা- যয়নব, কুলসুম, রোকেয়া এবং ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না, এরা আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘরেই জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু বিবাহের পর নিজ নিজ শ্বশুরবাড়িতে চলে গেছেন। হযরত জয়নব আবুল আসের ঘরে। রোকেয়া ও কুলসুম হযরত উসমান ইবনে আফফানের ঘরে এবং হযরত ফাতেমাতুয যুহরা রাদিয়াল্লাহু আনহা হযরত আলী কাররামাহুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ঘরে ছিলেন।
উপরোক্ত দু’প্রকারের আহলে বায়তকে জন্মগত আহলে বায়ত বলা হয়ে থাকে। তৃতীয় সুরত হচ্ছে, অন্যত্র জন্মগ্রহণ করেছেন কিন্তু পরে নবীর ঘরে রয়েছেন যেমন হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিতা স্ত্রীগণ। যাদের জন্ম নিজেদের মা বাবার ঘরে হয়েছেন কিন্তু আল্লাহর হাবীবের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবার পর তাঁর ঘরেই রয়েছেন। এদেরকে আহলে বায়তে সুকুন বা অবস্থানগত আহলে বায়ত বলা হয়ে থাকে। এ তিন প্রকারের অধিবাসী হচ্ছেন আহলে বায়তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমাদের বাংলা ভাষায়, স্ত্রী ও ছেলে-মেয়ে সবাইকে ঘরের বাসিন্দা বলা হয়।
সুতরাং এটাই সঠিক যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সকল ছেলে-মেয়ে ও সম্মানিত স্ত্রীগণ মাহবুবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত।
তদুপরি আল্লাহর রাসূলের যুগের পরে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হযরত আকিল রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত জা’ফর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এর আল বা বংশধরগণও আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসিরে খাজিন, তাফসিরে কবির ইত্যাদি)
আল্লামা ফখরুদ্দিন রাজী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘তাফসিরে কবির’ নামক কিতাবের ২৫শ জুজের ২১০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-
ليدخل فيه نساء اهل بيته ورجالهم واختلفت الاقوال فى اهل البيت والاولى ان يقال اولاده وازواجه والحسن والحسين منهم وعلى منهم لانه كان من اهل بيته بسبب معاشرته ببنت النبى عليه السلام وملازمته للنبى.
অর্থাৎ ‘আহলে বায়তের মধ্যে পুরুষ ও মহিলা উভয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। (আহলে বায়ত কারা?) এ সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত রয়েছে, তন্মধ্যে অধিক গ্রহণযোগ্য মতামত হল, রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আওলাদ ও আল্লাহর হাবীবের সম্মানিতা বিবিগণ। হযরত হাসান ও হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সকলেই আহলে বায়তের মধ্যে শামিল রয়েছেন এবং হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন, কেন না তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার কারণে এবং আল্লাহর হাবীবের একান্ত সংশ্লিষ্টতার দরুন তিনিও আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত।
অনুরূপ ‘তাফসিরে খাযিন’ নামক কিতাবের ৫ম খণ্ড ২১৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-
وقال زيدبن ارقم اهل البيت من حرم الصدقة بعده ال على وال عقيل وال جعفر وال عباس.
অর্থাৎ ‘বিশিষ্ট সাহাবী হযরত যায়েদ বিন আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- আহলে বায়ত হচ্ছেন তারাই রাসূলেপাকের যামানার পরেও যাদের উপর সদকাহ (যাকাত, ফিতরা ও কাফফারা ইত্যাদি) গ্রহণ করা নিষিদ্ধ। তারা হচ্ছেন হযরত আলী, হযরত আকিল, হযরত জা’ফর ও হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম এর বংশধর।’
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে,  আহলে বায়ত তথা রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিবিগণ ও তাঁর আওলাদগণ, বিশেষ করে হযরত ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা, ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু।
তদুপরি আলে আলী, আলে আকিল, আলে জা’ফর ও আলে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু, অর্থাৎ হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আকিল রাদিয়াল্লাহু আনহু হযরত জা’ফর রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বংশধরগণও আহলে বায়তের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
মিশকাতশরীফের ৫৭৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে-
عن ابى ذر انه قال وهو اخذ بباب الكعبة سمعت النبى صلى الله عليه وسلم يقول ال الاان مثل اهل بيتى فيكم مثل سفينة نوح من ركبها نجا ومن تخلف عنها هلك (رواه احمد)
অর্থাৎ ‘হযরত আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চয় তিনি কা’বা শরীফের দরজায় ধরে বলেন, আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর! নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আমার আহলে বায়তের উদাহরণ হল, হযরত নূহ আলাইহিস সালাম এর নৌকার ন্যায়। যে ব্যক্তি উহাতে আরোহণ করবে সে নাজাত পাবে এবং যে পিছনে পড়ে থাকবে সে ধ্বংস হবে। (আহমদ)
এজন্যই হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘তাঈদে আহলে সুন্নাত’ নামক কিতাবখানার ইতি টেনেছেন নিম্নোক্ত দোয়া সম্বলিত কবিতা দিয়ে-
الہی بحق بنی فاطمہ
کہ بر قول ایماں کنی خاتمہ
اگردعوتم ردکنی ورقبول
من ودست و دامان ال رسول
অর্থ: ১) হে আল্লাহ! হযরত ফাতেমা এর সন্তানগণের ওসিলায় ঈমানের সঙ্গে আমার খাতেমা বিল খায়ের নসিব করুন। (ঈমানের সাথে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার তাওফিক দান করুন)
২)। আপনার দয়া গুণে যদি আমার দোয়া কবুল হয়ে যায় (আলহামদুলিল্লাহ) অথবা আমার নিজ দুর্বলতার দরুণ যদি আপনার দরবারে দোয়া কবুল নাও হয় তবুও আমি আলে রাসূলের দামন কখনো ছাড়বো না।’
আহলে বায়ত হচ্ছে আল্লাহর হাবীবের খাস লোক এজন্যইতো চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আলা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খাঁন বেরলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘কানযুল ঈমান ফি তরজমাতিল কোরআন’ নামক গ্রন্থে সূরা মোহাম্মদ এর ১৯নং আয়াতের যে অনুবাদ করেছেন নিম্নে তা প্রদত্ত হল-
فاعلم انه لا اله الا الله واستغفر لذنبك وللمؤمنين والمؤمنات.
ترجمہ: توجان لو کہ اللھ کے سواکسی کی بندگی نہیں اور اے محبوب اپنے خاصوں اور عام مسلمان مردوں اور عورتوں کے گنانہوں کی معافی منگو-
অনুবাদ: ‘সুতরাং জেনে রাখুন যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত নেই এবং হে মাহবুব! আপন খাস লোকদের এবং সাধারণ মুসলমান পুরুষ ও নারীদের গোনাহসমূহের মা প্রার্থনা করুন।’
ইসমতে আম্বিয়া সম্পর্কে আকাঈদী আলোচনা
আমাদের নবী সায়্যিদুল মুরসালিন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের েেত্র তাঁর ইসমত বা নিষ্পাপ থাকা সর্বাধিক পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ তাঁর পবিত্র সত্ত্বাতো প্রথম থেকেই এমনিভাবে পবিত্র ও সুসজ্জিত ছিল যে, কোন প্রকারের দোষত্র“টি, ভুলভ্রান্তি থেকে একেবারেই মুক্ত ও পবিত্র।
আল্লামা শেখ আব্দুল হক মোহাদ্দিসে দেহলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘মাদারিজুন নবুওয়াত’ নামক কিতাবের ১ম খণ্ড ১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেন-
خصوصا سید انبیاء وافضل رسل صلوۃ وسلامہ علیہ وعلیہم کہ عصمت اواتم واکمل ورتبہ اواعلی وارفع است وہرکہ بجناب وی چیزی بہ بندد وپسند دوبخلاف ادب دم زند ساقط است درہموۃ درک اسفل ضلالت ازانجا کہ خبر نداردووی ازاول پاک واراستہ وپراستہ امدہ است کہ دست ہیچ عیب ونقص رابد امان عزت وجلال
اومجال وصول نیست بیت-
بہ تعلیم وادب اور اچہ حاجت
کہ اوخودز اعازآمد مؤدب
অর্থাৎ ‘বিশেষ করে আমাদের প্রিয়নবী সায়্যিদুল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের েেত্র তাঁর ইসমত বা গোনাহ থেকে পাক থাকা সর্বাধিক পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ এবং তাঁর মর্যাদা অধিকতর উন্নত।
যে ব্যক্তি আল্লাহর হাবীবের শানে আদবের পরিপন্থী নিজের মনগড়া মতে কোন মন্তব্য করবে নিঃসন্দেহে সে পরিত্যাজ্য হবে। নিশ্চয় সে মূর্খতার নিম্নতম অন্ধকারে গভীরতম গহবরে নিমজ্জিত রয়েছে।
হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সত্ত্বা প্রথম থেকেই এমন পবিত্র এবং সুসজ্জিত ছিল যে, কোন রকম দোষত্র“টির হস্ত তাঁর ইজ্জত ও বুুজুর্গির আঁচল স্পর্শ করতে পারেনি। যেমন কবি বলেছেন- তা’লিম ও আদব গ্রহণ করাতো তাঁর কোন প্রয়োজন নেই। কেন না তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আদবশীল হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন।’
আল্লামা মোল্লা জিউন রাদিয়াল্লাহু আনহু ‘তাফসিরাতে আহমদীয়া’ নামক কিতাবের ২৮ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-
فالحق انه لاخلاف لاحد فى ان نبينا عليه السلام لم يرتكب صغيرة ولاكبيرة طرفة عين قبل الوحى وبعده كماذكره ابوحنيفة رحمة الله فى الفقه الاكبر.
অর্থাৎ ‘এ কথাই সত্য যে, নিশ্চয় আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী প্রাপ্তির পূর্বে ও পরে এক মুহূর্তের জন্যও সগিরা কবিরা গোনাহ করেননি এতে কারো দ্বিমত নেই। যেমন ইমাম আ’জম আবু হানিফা রাদিয়াল্লাহু আনহু ফিকহে আকবরে উল্লেখ করেছেন।’
প্রখ্যাত মুফাসসির আল্লামা ইসমাইল হাক্বী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘তাফসিরে রুহুল বয়ান’ ৮ম খণ্ড ৩৪৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-
فان اهل الوصول اجتعوا على ان الرسل عليهم السلام كانوا مؤمنين قبل الوحى معصومون من الكبائر ومن الصغائر الموجبت النفرة الناس عنهم قبل البعثة وبعدها.
অর্থাৎ ‘নিঃসন্দেহে উসূলবিদগণ (ইসলামী আইন বিশারদগণ) এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন যে, রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাম ওহী প্রাপ্তির পূর্বে ও পরে ঈমানদার ছিলেন এবং কবিরা ও সগিরা গোনাহ থেকে নিষ্পাপ ও পবিত্র ছিলেন।
আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু নিম্ন লিখিত আয়াতখানাকে তদীয় মাদারিজুন নবুওয়াত’ কিতাবের ১ম জিলদের ১০৬ পৃষ্ঠায় আয়াতে মুবহাম ও মুতাশাবিহাত আয়াত হিসেবে উল্লেখ করেন  এবং এর বিশদ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন। আয়াতখানা এই-
ليغفرلك الله ما تقدم من ذنبك وما تاخر (سورة فتح)
উক্ত আয়াতে কারীমার শাব্দিক বা জাহেরী অর্থ হল এই- যাতে আল্লাহ তা’য়ালা আপনার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গোনাহ মা করে দেন। এই শাব্দিক অর্থের উপর ভিত্তি করেই অনেকে আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গোনাহগার সাব্যস্ত করতে অপচেষ্টা করে থাকেন। অথচ এই আয়াতখানা আয়াতে মুবহাম ও মুতাশাবিহাতের পর্যায়ভুক্ত। এই আয়াতের শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করা যাবে না। বরং শাব্দিক অর্থ পরিবর্তন করে তাবেলী অর্থ গ্রহণ করতে হবে। হক্বানী উলামায়ে কেরামগণ উক্ত আয়াতে কারীমার কয়েকটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। নিম্নে তা প্রদত্ত হল-
১। আল্লামা শেখ আব্দুল হক মোহাদ্দিসে দেহলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু মাদারিজুন নবুয়ত নামক কিতাবে উক্ত আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন-
وبعضے محقیقین گفتہ اند کہ مغفرت اینجا کنایہ است ازعصمت پس معنی لیغفر لک اللہ ماتقدم من ذنبک وماتاخر لیعصمک اللہ فیما تقدم عمرک وفیما تاخر منہ وایں قول درغایت حسن وقبول است (مدارج النبوۃ ۹۳)
অর্থাৎ ‘অনেক মুহাক্বেক উলামায়ে কেরামগণ বলেন, এখানে মাগফিরাত দ্বারা ইসমত বা পবিত্রতা বুঝানো হয়েছে, সুতরাং আয়াতে কারীমার অর্থ হল, যাতে আল্লাহ তা’য়ালা আপনাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গোনাহ থেকে পবিত্র রাখেন।
২। আল্লামা কাজী আয়াজ রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘শিফা’ শরীফের দ্বিতীয় জিলদের ১৫৭ পৃষ্ঠায় ذنبك শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন-
المراد بذلك امته صلى الله عليه وسلم.
অর্থাৎ ‘আপনার গোনাহ বলতে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মতের গোনাহ বুঝানো হয়েছে। আল্লামা শেখ আব্দুল হক মোহাদ্দিসে দেহলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ ব্যাখ্যাই অতি উত্তম ও গ্রহণীয়।
৩। আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় শরহে শিফাশরীফের চতুর্থ জিলদের ১৭৫ পৃষ্ঠায় অত্র আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-
اى بخطابه لك ومن ذنبك (امته صلى الله عليه وسلم) على حذف مضاف.
অর্থাৎ لك ও ذنبك শব্দদ্বয়ের দ্বারা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতকে সম্বোধন করা হয়েছে। কেন না এখানে মুযাফকে বিলুপ্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ মূলে ছিল-من ذنب امتك আপনার উম্মতের গোনাহ।
৪। আল্লামা ইসমাইল হাক্বী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘তাফসিরে রুহুল বয়ান’ নামক কিতাবে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন-
ان المراد بالمغفرة الحفظ والعصمة ازلا وابدا فيكون المعنى ليحفظك الله ويعصمك من المذنب المتقدم المتأخر.
অর্থাৎ ‘এখানে মাগফিরাত দ্বারা মুরাদ নেওয়া হয়েছে সদা সর্বদায় হেফাযত ও ইসমত। অতএব অর্থ হবে যাতে আপানাকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী গোনাহ সংঘটিত হওয়া থেকে আল্লাহপাক সর্বণ হেফাজত ও বাঁচিয়ে রেখেছেন।
৫। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আলা হযরত আল্লামা ইমাম আহমদ রেজাখাঁন বেরলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু তদীয় ‘কানযুল ঈমান ফি তরজমাতিল কোরআন’ এর মধ্যে উপরিলিখিত মুফাসসিরীনে কেরাম ও তাফসির গ্রন্থসমূহের আলোকে অত্র আয়াতে কারীমার অতি চমৎকার তরজমা করেছেন-
تاکہ اللہ تمہارے سبب سے گناہ بخشے تمہارے اگلوں کے اور تمہارے پچلوں کے-
অর্থ: যাতে আল্লাহ আপনার কারণে পাপ মা করে দেন আপনার পূর্ববর্তীদের ও আপনার পরবর্তীদের।
সহীহ বোখারীশরীফ জিলদে আউয়াল সপ্তম পৃষ্ঠায় রয়েছে-
عن عائشة قالت كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا امرهم من الاعمال بما يطيقون قالوا انا لسنا كهيأتك يارسول الله ان الله قد غفرلك ما تقدم من ذنبك وما تأخر فيغضب حتى يعرف الغضب فى وجهه ثم يقول ان اتقاكم واعلمكم بالله انا.
অর্থাৎ ‘উ¤মূল মো’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবায়ে কেরামগণকে ঐ সব আমল করার নির্দেশ প্রদান করতেন যা তারা সর্বদা আমল করতে সম হতেন। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমরাতো আপনার মতো নই, নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা আপনার পূর্বাপর গোনাহ থেকে আপনাকে পবিত্র ও পূর্ণ হেফাজত করে রেখেছেন অর্থাৎ আপনি হচ্ছেন মা’সুম বা নিষ্পাপ। এতে রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হলেন এমনকি তাঁর চেহারা মোবারকে রাগের নিদর্শন প্রকাশ পেয়েছিল।
অতঃপর রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে আত্বকা অর্থাৎ সবচেয়ে অধিক খোদাভীরু, পরহেজগার এবং আমি আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের চেয়ে অধিক অবগত।’
উক্ত হাদীসশরীফ দ্বারা এ কথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, সাহাবায়ে কেরামের আকিদা ছিল, রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মতো নন। এজন্যই তো সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর হাবীবের দরবারে আরজি পেশ করলেন-انا لسناكهيئتك يا رسول الله  ইয়া রাসূলাল্লাহ! নিশ্চয় আমরা আপনার মতো নই। অন্য এক হাদীসশরীফে হুজুর পুরনুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই এরশাদ করেছেন- لست كاحد منكم অর্থাৎ আমি তোমাদের কারো মত নই। এমনকি সাউমে বিসাল সংক্রান্ত হাদীসে মাহবুবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক সাহাবীর জিজ্ঞাসার জবাবে এরশাদ করেছেন-ايكم مثلى  তোমাদের মধ্যে আমার মতো কে আছো? অর্থাৎ কেহই নাই। (সহীহ বোখারীশরীফ ১ম জিল্দ ২৬৩)
উপরোক্ত হাদীসসমূহের আলোকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হল যে, নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কারো মত নন। মাহবুবে খোদাকে আমাদের মতো আকিদা পোষণ করা, আল্লাহর হাবীব ও সাহাবায়ে কেরামের আকিদার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
উপরন্তু কাফিররা সম্মানিত নবীগণকে আমাদের মতো মানুষ বলতো, সূরায়ে ইয়াসিন ১৫নং আয়াত তার স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে- قالوا ما انتم الابشر مثلنا  আল্লাহপাক বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফিররা নবীগণকে বলতো- তোমরাতো আমাদের মতো মানুষ।
অপরদিকে সূরায়ে কাহাফের ১১০নং আয়াত দ্বারা অনেক বাতিলপন্থী লোক নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‘আমাদের মতো মানুষ’ প্রমাণ করার অপচেষ্টা করে থাকে। অথচ এই আয়াতখানার সঠিক তাফসির হল এই-قل انما انا بشر مثلكم يوحى الى  অর্থাৎ আপনি বলুন, (বাহ্যিক আকৃতিতে তো) আমি তোমাদের মতো মানুষ আমার নিকট ওহী আসে। (সূরা কাহাফ- ১১০, সূরা হা-মীম সিজদা-৬)
উপরোক্ত আয়াতে কারীমার তাফসির বা ব্যাখ্যায় ‘মু’য়ালিমুত তানজিল’ নামক তাফসির গ্রন্থের জিলদে সানী ২৭৬ পৃষ্ঠায় ও তাফসিরে খাজিন নামক কিতাবের জুজে রাবে ১৯৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-
قال ابن عباس علم الله تعالى رسوله صلى الله عليه وسلم التواضع لئلايزهى على خلقه فامره الله ان يقر فيقول انا ادمى مثلكم الا انى خصصت بالوحى واكرمنى الله به.
অর্থাৎ ‘রাইসূল মুফাসসিরীন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এ আয়াতে কারীমায় আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাওয়াযু বা বিনয় প্রকাশের শিা দিয়েছেন, যেন সৃষ্টিজগতের উপর তাঁর অহংকার প্রকাশ না পায়। সুতরাং আল্লাহ তা’য়ালা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিনয় প্রকাশের নিমিত্তে এ কথার স্বীকারোক্তির হুকুম প্রদান করেছেন। ফলে আল্লাহর হাবীব তাঁর নির্দেশ মোতাবেক বিনয় প্রকাশ করে বলেছেন, আমি তোমাদের ন্যায় মানুষ কিন্তু ওহী তথা নবুওয়াত রিসালাত দ্বারা আমাকে বিশেষত্ব প্রদান করা হয়েছে এবং উহা দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালা আমাকে সম্মানিত করেছেন।
উল্লেখ্য যে, যেসব শব্দাবলী আম্বিয়ায়ে কেরাম বা সম্মানিত নবীগণকে আল্লাহ তা’য়ালা তাওয়াজু বা বিনয় প্রকাশের নিমিত্তে স্বীকারোক্তির নির্দেশ প্রদান করেছেন, ঐসব শব্দাবলী উম্মতের জন্য নবীগণের শানে প্রয়োগ করা মারাত্মক বেয়াদবি।
দেখুন, কোরআনে কারীমে উল্লেখ্য রয়েছে, হযরত আদম আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা’য়ালার শাহানশাহী দরাবারে আরজি পেশ করেছিলেন-ربنا ظلمنا انفسنا   হে আমার প্রতিপালক! আমি নিজের উপর জুলুম করেছি এবং হযরত ইউনুস আলাইহিস সালাম দোয়া করেছিলেন-انى كنت من الظالمين   নিশ্চয় আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি।
এখন যদি কোন ব্যক্তি হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে জালিম বা পথভ্রষ্ট বলে আখ্যায়িত করে বসে, তাহলে ইহা হবে নবীর শানে শক্ত বেয়াদবি এবং সাথে সাথে ঐ ব্যক্তি ঈমানহারা হয়ে যাবে।
হাদীসশরীফে বর্ণিত আল্লাহর হাবীবের অমীয়বাণী-ان اتقاكم واعلمكم بالله انا  নিশ্চয় আমি তোমাদের থেকে অধিক পরহেজগার এবং তোমাদের সকলের চেয়ে আল্লাহ সম্পর্কে বেশি অবগত। اتقا  শব্দটি ‘ইসমে তাফজিল’ এর অর্থ অধিক তাকওয়া অর্জনকারী।
শরীয়তের পরিভাষায় ‘তাকওয়া’ শব্দের অর্থ হল নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ পরিহার করে নিজেকে গোনাহ থেকে মুক্ত রাখা। তাকওয়ার স্তর অনেক। যথা-
১। সাধারণ লোকের তাকওয়া। তা হচ্ছে ঈমান এনে কুফর থেকে বিরত থাকা।
২। মধ্যমস্তরের লোকের তাকওয়া তা হচ্ছে আল্লাহর আদেশ নিষেধ মেনে চলা।
৩। বিশেষ ব্যক্তিদের তাকওয়া। তা হচ্ছে ঐসমস্ত জিনিস পরিহার করা যেগুলো আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন করে। (তাফসিরে জুমাল)
আলা হযরত ইমাম আহমদ রেজাখাঁন বেরলভী রাদিয়াল্লাহু আনহু উল্লেখ করেছেন- তাকওয়া ৭ প্রকার। যথা-
১। কুফর থেকে বিরত থাকা। এটা আল্লাহর ফজলে প্রত্যেক মুসলমানের মধ্যেই রয়েছে।
২। ভ্রান্ত আকাইদ ও মতবাদ থেকে বেঁচে থাকা। এটা প্রত্যেক সুন্নিদের মধ্যেই অর্জিত রয়েছে।
৩। প্রত্যেক কবিরা গোনাহ থেকে বিরত থাকা।
৪। সগিরা বা ছোট খাটো গোনাহ থেকেও বিরত থাকা।
৫। শুবহাত বা সন্দেহযুক্ত বন্তু থেকে দূরে থাকা।
৬। শাহওয়াত বা রিপুর প্রবৃত্তি থেকে বেঁচে থাকা।
৭। অন্যের প্রতি ইলতেফাত বা দৃষ্টিপাত না করা, ইহা বিশেষ ব্যক্তিবর্গের পর্যায়।
উপরোক্ত হাদীসশরীফে আল্লাহর হাবীব নিজেই এরশাদ করেছেন ان اتقاك  ‘ইন্না আত্বকাকুম’ নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া অর্জনকারী।
মোদ্দকথা হল আল্লাহর হাবীবের মহান সত্ত্বা প্রথম থেকেই এমন পবিত্র এবং সুসজ্জিত ছিল যে, কোন প্রকার দোষত্র“টির হস্ত তাঁর বুজুর্গির আঁচল স্পর্শ করতে পারেনি। আল্লাহর হাবীব সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিষ্পাপ।
ইহাই আহলে স্ন্নুাত ওয়াল জামায়াতের তথা- সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, মুহাদ্দিসীন, মুফাসসিরীন ও আউলিয়ায়ে কেরামদের আকিদা বা প্রগাঢ় বিশ্বাস।

সূরা ফাতিহার তাফসীর

Standard

image

নামকরণ
পবিত্র কোরআন শরীফের ১১৪খানা সূরার মধ্যে সর্ব প্রথম সূরা হচ্ছে “আল ফাতিহা”। অর্থ হলো আরম্ভ বা শুরু। যেহেতু কোরআন শরীফ এ সূরা দ্বারা আরম্ভ হয়েছে সেজন্য তাঁকে “ফাতিহাতুল কিতাব” বলা হয়। এ সূরার আরেকটি নাম “আলহামদু শরীফ”। সূরায়ে ফাতেহার আরেকটি নাম হচ্ছে “উম্মুল কোরআন” বা কোরআনের জননী (মা)। পুরো কোরআন শরীফের সারবস্তু সূরায়ে ফাতিহায় নিহীত বা পুরো কোরআন শরীফ হলো সূরায়ে ফাতিহার ব্যাখ্যা। তাই এ সূরাকে কোরআনের মা বলা হয়েছে। এ সূরার আরেকটি নাম হলো “সাবউ মছানী”। অর্থাৎ এ সূরাটিতে রয়েছে অনুপম সাতটি বাণী বা আয়াত। মাছানি বলা হয় এ কারণে যে, সূরাটি একবার মক্কায় ও একবার মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে। অধিকতর বিশুদ্ধমতে, মক্কা শরীফেই এ সূরাটি অবতীর্ণ হয়।
আল্লামা ইবনে জরীর (রাঃ) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, হযরত রাসূলে কারীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, সূরা ফাতিহা অর্থাৎ আলহামদু শরীফ হচ্ছে, উম্মুল কোরান, ফাতিহাতুল কিতাব, সাবউমাছানি। এ সূরার আরেকটি নাম হচ্ছে “সূরায়ে কাঞ্জ” (ভান্ডার)। হযরত আলী (রাঃ) হতে ইসহাক ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, এ সূরাটি আরশের নিম্নস্থিত ভান্ডার থেকে অবতীর্ণ হয়েছে।

ফজীলত
সূরা ফাতিহাকে হাদীছ শরীফে “সূরায়ে শিফা” বলা হয়েছে। সূরা ফাতিহা হলো সকল রুগের প্রতিষেধক (কুরতুবী)। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আমার জীবনাধিপতি ওঁই সত্ত্বার শপথ, সূরা ফাতিহার মতো কোন সূরা তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল অথবা কোন আসমানি কিতাবে নেই। এটা সেই অনুপম ও অনন্য বাণী সপ্তক যা আল্লাহ পাক আমাকেই দান করেছেন। হযরত জাবের (রাঃ) থেকেবর্ণিত , রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, হে জাবের! আমি কি বলবো কোরআনের সর্বোত্তম সূরা কোনটি ? হযরত জাবের বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এরশাদ করুন,হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ”সূরা ফাতিহা”। ইমাম বুখারী (রাঃ) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বলেছেন, সূরা ফাতিহা কোরআনের দুই তৃতিয়াংশ।
হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহার সাতটি আয়াত আমল করবে তাঁর জন্য জাহান্নামের সাতটি দরজা বন্ধ থাকবে। শয়তান চারবার চীৎকার করে কেঁদেছিলো। ১) আদম (আঃ) কে সিজদা না দেয়ায় আল্লাহ তাকে লা’নত দেন তখন ২) জান্নাত থেকে আজাজীলকে বের করে দেয়ার সময় ৩) ঈদ-ই মীলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিন ও ৪) সূরা ফাতিহা নাযীলের দিন। (বেদায়া ওয়ান নেহায়া)

মাহাত্ত্ব
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হয়, পাঠ করা ওয়াজিব। আল্লাহ পাক ছালাত বা নামাজ ফরজ করেছেন, কোরআন শরীফে ৮২বার নামাজের কথা বলেছেন, কিন্তু একবারও সূরা ফাতিহা পড়ার কথা বলেন নি, বরং বলেছেন, “ফা আকরাউ মা তাইয়াস সারা মিনাল কোরআন” নামাজে কোরআনের যে কোন যায়গা হতে পাঠ কর। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, لا صلوة الا بفتحة الكتاب “লা ছালাতা ইল্লা বে ফাতিহাতিল কিতাব” অর্থাৎ সূরা ফাতিহা পাঠ না করা ব্যতীত নামাজ নাই। নামাজ হলো আল্লাহ্’র ইবাদত আর নামাজের নিয়ম কানুন শিখায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবীজি বলেন, “ছাল্লু কামা রায়াইতুমুনি উছাল্লি” অর্থাৎ তুমরা ছালাত আদায় করো যেমনি ভাবে আমাকে আদায় করতে দেখো। কয় ওয়াক্ত নামাজে কয় রাকাত নামাজ, প্রতি রাকাতে কয় রুকু, কয় সিজদা তা আল্লাহ পাক কোরআনে বলেননি, বলেছেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আসসালাতু মিফতাহুল জান্নাহ” অর্থাৎ জান্নাতের চাবি হলো নামাজ। আর আল্লাহ পাক নামাজের চাবি দান করেছেন নবীজির হাতে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রাকাত নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব করে দিয়েছেন। প্রমাণিত হলো ইসলামের শরীয়তের বিধানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যোগ-বিয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে। সুবাহানআল্লাহ!
(তাফসীরে জালালাইন, মাযহারী, নঈমী, বেদায়া ওয়ান নেহায়া ইত্যাদি)।
মাসআলাঃ-
প্রতি ওয়াক্ত প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব। ইমাম ও একাকী নামাজ আদায় কারীর জন্য নিজ মূখে উচ্চারণ করে এবং মুক্তাদীর জন্য হুকুমী (পরোক্ষ ভাবে) বা ইমামের সাথে মনে মনে শ্রবণ বা পাঠ করা। সহহী হাদীছ শরীফে আছে- قرأة امام له قرأة (ক্বিরআতুল ইমামে লাহু ক্বিরআতুন) অর্থাৎ ইমামের পাঠ করাই মুক্তাদীর পাঠ করা। কোরআন শরীফে মুক্তাদীকে নীরব থাকার এবং ইমামের ক্বিরাত শ্রবণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ পাক এরশাদ করেন-
ازا قرىء القران فاستمعوا له وانصتوا (ইজা ক্বুরেয়াল কোরআনু ফাসতামে’উ লাহু ওয়ান চিতু) অর্থাৎ যখন কোরআন শরীফ তালাওয়াত করা হয় তখন তোমরা তা মনযোগ সহকারে শ্রবন করো এবং নিশ্চুপ থাকো। মুসলীম শরীফের হাদীছে আছে- ازا قرأ فانصتوا (ইজা ক্বারাআ ফানচিতু) অর্থাৎ ইমাম যখন ক্বিরাত পাঠ করেন তখন তোমরা চুপ থাকো। এটাই হানাফী মাযহাবের অভিমত।
জানাজার নামাজে দো’আ স্মরণ না থাকলে ‘সূরা ফাতিহা’ দো’আর নিয়তে পাঠ করা জায়েয; কিন্তু ক্বিরাতের নিয়তে জায়েয নয়। (কানযুল ঈমান,আলমগীরী ইত্যাদি)
সূরা ফাতিহা ‘কোরআনের মা’ প্রতি রাকাত নামাজে পাঠ করা ওয়াজিব করা হয়েছে, এই সাত আয়াতের সূরা ফাতিহা’র মধ্যে কি রয়েছে? সূরা ফাতিহা নামাজে আমরা পড়ি ঠিক কিন্তু এর হাকীকত অর্থ আমরা বুঝিনা, বুঝতে চাইনা বা একদল ভূল বুঝাচ্ছেন। বিভিন্ন তাফসীরের আলোকে সূরা ফাতিহার ৭টি আয়াতের এক একটি আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করবো, ইনশা’আল্লাহ। যদিও হযরত আলী (রাঃ) বলেন, সূরা ফাতিহার ৭টি আয়াতের ব্যাখ্যা যদি করি ৭০টি উঠ লাগবে তা বহন করতে। সূবাহান আল্লাহ!

জ্ঞাতব্য
এ সূরাটি মক্কা ও মদীনা দুই পূণ্যময় স্থানে অবতীর্ণ হয়েছে। অধিকাংশের মতে মক্কা শরীফে অবতীর্ণ হয়েছে। সূরা ফাতিহায় ৭টি আয়াত, ২৭টি পদ ও ১৪০টি বর্ণ রয়েছে। কোন আয়াত ‘নাসেখ’ (রহিতকারী) ওমানসূখ ( রহিতকৃত) নয়।

ইসতি’আযাহ বা তাআব্বুজঃ- اعوز بالله من الشيطان الرجيم (আ’উজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম) অর্থঃ আল্লাহ’র নিকট পানাহ চাই বিতাড়িত শয়তান হতে।
মাসআলাঃ- কোরআন তেলওয়াতের পূর্বে ‘আউজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম’
পাঠ করা সূন্নত। (তাফসীরে খাযেন)
২য়তঃ কোরআন শরীফ পাঠের পূর্বে ‘আউজুবিল্লাহ’ পাঠ করা ইজমায়ে উম্মত দ্বারা সুন্নাত বলে স্বীকৃত হয়েছে।

মাসআলা
নামজের মধ্যে ইমাম কিংবা একাকী নামাজ আদায় কারীর জন্য ‘সানা’ (সূবহানাকা—-) পাঠ করার পর নীরবে ‘আউজুবিল্লাহ’ পাঠ করা সুন্নাত। (শামী)
আল্লাহ পাক এরশাদ করেন- فازا قرأت القران فاسعز بالله من الشيطان الرجيم
(ফাইজা ক্বারাআতাল কোরআনা ফাসতাইজু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম) অর্থাৎ যখন কোরআন পাঠ শুরু করো তখন আল্লাহ’র নিকট বিতাড়িত শয়তান থেকে পানাহ চাও। অতএব প্রমাণীত হলো কোরআন তেলওয়াতের সময় ‘আউজুবিল্লাহ পাঠ করা আল্লাহ’র হুকুম। কোরআন পাঠ ব্যতীত অন্যান্য কাজে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা সুন্নাত, ‘আ’উজুবিল্লাহ’ নয়। কোরআন তেলওয়াত কালে উভয়টি পাঠ করা সুন্নাত। (আলমগীরি)
তাসমীয়াহঃ- بسم الله الرحمن الرحيم (বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম) পাঠ করা।
অর্থঃ- আল্লাহ’র নামে শুরু যিনি পরম দয়ালু করুণাময়।

জ্ঞাতব্য
প্রকাশ থাকে যে, بسم الله الرحمن الرحيم কোরআনের আয়াতের আংশ। সূরায়ে নমলের একটি আয়াত বা অংশ। সূরা ‘তাওবা’ ব্যতীত প্রত্যেক সূরার প্রারম্ভেبسم الله الرحمن الرحيم লিখা বা পাঠ করা হয়। তাসমীয়াহ সূরা ফাতিহার অংশ, না অন্যান্য সকল সূরারই অংশ এতে ইমাম, মোজতাহিদ ও তাফসীরবিদগণের মতানৈক্য রয়েছে। ইমামে আ’জম আবু হানীফা (রাঃ) বলেছেন, بسم الله الرحمن الرحيم সূরা নমল ব্যতীত অন্য কোন সূরার অংশ নয়। তবে এটি এমন একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ আয়াত যা প্রতিটি সূরার প্রথমে লিখা এবং দু’টি সূরার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। ইমাম হাকেম, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রাঃ) এর নীতিমালা অনুস্মরণে বিশুদ্ধ হাদীছ রুপে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম প্রথম দু’টি সূরার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ণে অসুবিধার সম্মূখীন হতেন, তখন ‘বিসমিল্লাহ’ অবতীর্ণ হয়। (মাযহারী)

মাসাআলা
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” কোরআন শরীফেরই আয়াত, তবে সুরা ফাতিহার অংশ নয়। এ জন্য তেলয়াতের সময় উচ্চরবে তা পাঠ করা হয়না। বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীছে বর্ণিত আছে, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হযরত আবু বকর সিদ্দীক ও হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা ‘আল হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন’ থেকেই নামাজে ক্বিরাত পড়া শুরু করতেন। অর্থাৎ সূরা ফাতিহার সাথে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ উচ্চ রবে পাঠ করতেন না (মনে মনে পড়তেন)।
কোরআন তেলওয়াত ও প্রত্যেক নেক কাজ বিসমিল্লাহ’র সাথে আরম্ভ করার আদেশঃ-
আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগে লোকদের প্রথা ছিল, তারা তাদের প্রত্যেক কাজ দেব-দেবীদের নামে শুরু করতো। এ প্রথা রহিত করার জন্য হযরত জিব্রাঈল (আঃ) পবিত্র কোরআনের সর্ব প্রথম যে আয়াত নিয়ে এসেছিলেন , তাতে আল্লাহ’র নামে আরম্ভ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ’র প্রেরিত প্রথম ওহী- اقرأ باسم ربك (ইকরা বিসমে রাব্বিকা) অর্থাৎ পাঠ করুন আপনার প্রভূ’র নামে।
কোন কোন বর্ণনায় পাওয়া যায়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও প্রথমে কোন কাজ আরম্ভ করতে বলতেন- باسمك اللهم (বিসমিকা আল্লাহুম্মা) এবং কোন কিছু লিখতে হলেও একথা লিখতেন। কিন্তু بسم الله الرحمن الرحيم অবতীর্ণ হওয়ার পর সর্বকালের জন্য ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বলে সকল নেক কাজ আরম্ভ করার নিয়ম প্রবর্তিত হয়। (কুরতুবী, রুহুল মা’আনী)

মাসআলা
১) কোরআন শরীফের ‘সূরা তাওবা’ ব্যতীত প্রত্যেক সূরা ‘বিসমিল্লাহ’ এর সাথে আরম্ভ করতে হয়। ২) ‘খতম তারাবীহ’র নামাজে’ একবার উচ্চ রবে ‘বিসমিল্লাহ’ অবশ্যই পড়তে হবে। যাতে একটা আয়াত বাদ না পরে। ৩) প্রত্যেক ‘মুবাহ’ বা বৈধ কাজ ‘বিসমিল্লাহ’ বলে আরম্ভ করা মুস্তাহাব। ‘নাজায়েয’ বা অবৈধ কাজের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ পড়া নিষেধ। ৪) কোরআন শরীফের বিভিন্ন স্থানে নির্দেশ রয়েছে, প্রত্যেক কাজ বিসমিল্লাহ বলে আরম্ভ করা। ৫) হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়য়াসাল্লাম এরশাদ করেন, “যে কাজ বিসমিল্লাহ ব্যতীত আরম্ভ করা হয়, তাতে কোন বরকত থাকেনা। ৬) অন্য হাদীছে এরশাদ হয়েছে, ঘরের দরজা বন্ধ করতে, বাতি নেভাতে ও পাত্র আবৃত করতে বিসমিল্লাহ বলবে। কোন কিছু খেতে, পান করতে, অজু করতে, সওয়ারীতে আরোহণ করতে এবং তা থেকে অবতরণ কালেও বিসমিল্লাহ বলার নির্দেশ কোরআন-হাদীছে বার বার এসেছে। (কুরতুবী)

বিসমিল্লাহ’র তাফসীর
‘বিসমিল্লাহ’ অর্থ আমি আল্লাহ’র নামে আরম্ভ করছি। ‘বিসমি’ শব্ধটি গঠিত হয়েছে ‘বা’ এবং ‘ইসিম’ শব্দ দু’টি দিয়ে। অতি ব্যবহারের ফলে ইসিমের ‘আলিফ’ অক্ষরটি লুপ্ত হয়েছে। ‘ইসিম’ শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে ‘সামু’ থেকে। ‘বা’ অক্ষরটি সঙ্গী ও সাহায্য কামনা অথবা বরকত অর্জনের জন্য ব্যবহ্রত হয়েছে। আল্লাহ পাকের জিকির দ্বারা সাহায্য কামনা করা হয়ে থাকে। ‘বা’ অব্যয়টি ‘আররাহীম’ শব্দের পরে লুপ্ত একটি ক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ ‘আকরাউ’ বা আমি পড়ি। যেমন ‘বিসমিল্লাহি মাজরেহা ওয়া মুরসাহা’ বাক্যটিতে দেখা যায়। বিশুদ্ধ অভিমত হচ্ছে-প্রারম্ভে ‘বিসমিল্লাহ’ উল্লেখ থাকাই বাঞ্ছনীয়। আব্দুল কাদীর (রঃ) তাঁর ‘হাবী আরবাইন’ গ্রন্থে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে কাজ বিসমিল্লাহ’র সাথে শুরু না হয় সে কাজ অসমাপ্ত থাকে। অর্থাৎ সহজ কথায় এ রকম বলা কর্তব্য যে, আল্লাহ’র নামে আমি পাঠ আরম্ভ করলাম।
আল্লাহঃ- একক ও অবিনশ্বর মহান সৃষ্টিকর্তার জাতি নাম ‘আল্লাহ’। কেহ কেহ আল্লাহ নামটি ‘ইসমে আজম’ বলেছেন। কারো কারো অভিমত হচ্ছে ‘আল্লাহ’ শব্ধটি একটি মৌল শব্দ। কিন্তু প্রকৃত কথা হচ্ছে ‘আল্লাহ’ শব্ধটির উৎপত্তি ঘটেছে ‘ইলাহ’ (উপাস্য) শব্ধটি থেকে। ইলাহ শব্দের ‘হামজা’র স্থলে ‘আলিফ’ ও ‘লাম’ যুক্ত করা হয়েছে। আর এমন সংযুক্ত করা হয়েছে জরুরী ভিত্তিতে, যার দারুন ‘আল্লাহ’ শব্দটি সিদ্ধ। পরিশেষে বলা যায় ‘আল্লাহ’ শব্দটি ঐ চিরস্থায়ী সত্তার মহিমান্বিত নাম, যা সকল প্রকার অপরিচ্ছন্নতা ও অপূর্ণতা থেকে পবিত্র। এজন্যই নামটি স্বমহিমায় ভাস্বর। তাই একত্ব প্রকাশের পবিত্র বাক্যটি হচ্ছে- লাইলাহা ইল্লাল্লাহ।
আর রাহমানির রাহীমঃ- ‘রহমান’ ও ‘রাহীম’ শব্দ দু’টির অর্থ- দাতা ও দয়ালু। দু’টি শব্ধই উৎপন্ন হয়েছে ‘রহমত’ শব্দটি থেকে। রহমত অর্থ আন্তরিক নম্রতা। যার পরিণতি হচ্ছে কল্যাণ ও অনুগ্রহ।
কোন কোন তাফসীর কারকের মতে- ‘রহমান’ ও ‘রহীম’ শব্দ দু’টি সম অর্থ জ্ঞাপক। বিশেষণের আধিক্য বুঝাতে শব্দ দু’টি একত্রে ব্যবহ্রত হয়েছে। প্রকৃত কথা হলো- ‘রহীম’ শব্দটির তুলনায় ‘রহমান’ শব্দটি ব্যপক আর্থ বোধক। সহজ ভাবে বলতে গেলে এ দুনিয়াতে আল্লাহ ‘রহমান’ অর্থাৎ তাঁর দয়া-দান ব্যপক- জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রসারিত। কিন্তু আখেরাতে তিনি ‘রহীম’ অর্থাৎ পরকালে তাঁর দয়া-দান শুধু পূণ্যবানদের জন্য।
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বাক্যটিতে ১৯টি আক্ষর রয়েছে। প্রতি অক্ষরে ১০টি নেকী তাই একবার ‘বিসমিল্লাহির রাহমানীর রাহীম’ পাঠ করলে একশত নব্বই নেকী আমল নামায় যোগ হবে।
(তাফসীরে ইবনে আব্বাস, তাফসীরে রুহুল মা’আনী, তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে নঈমি, খাজাইনুল ইরফান, বুখারী, মুসলিম, কুরতুবী ইত্যাদি)
তাফসীরঃ- – الحمد لله رب ٍالعلمين
আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন।
অর্থঃ- সকল প্রশংসা আল্লাহ’র প্রতি, যিনি সমস্ত সৃষ্টি জগতের প্রতিপালক।
ব্যাখ্যাঃ- “ আলহামদুলিল্লাহ”এখানে তিনটি শব্দ, ‘আল’ ‘হামদু’ লিল্লাহ’।আল- আলীফ+ লাম, আলীফ-লাম এখানে দুই অর্থে ব্যবহ্রত হতে পারে, ১) আলীফ লামে ‘এস্তেগরাকী ২) আলীফ লমে ‘অহুদী। (তাফসীরে রুহুল বয়ান) হামদ এর পূর্বে ‘আলীফ-লামেএস্তেগরাকী’ হলে অর্থ হবে, সব সময়-সর্বাবস্থায় যাবতীয় প্রসংসা বা গুণকীর্তন আল্লাহ’র জন্য। পার্থিব সৌন্দয্যের মৌখিক প্রকাশের নাম ‘হামদ’। সে সৌন্দয্যের সাথে নে’য়ামত বা অনুগ্রহ রাজী সম্পৃক্ত থাকুক বা না থাকুক। ‘হামদ’ শব্দটি ‘মাদাহ’ শব্দটির সঙ্গে সাধারণভাবে তুলনা মূলক সম্পরক ধারী। পার্থিব কিংবা অপার্থিব সৌন্দরয্য প্রশংসিত হলে, ঐ প্রশংসাকে ‘মাদহা’ বলে। ‘হামদ’ এর সাথে ‘আল’ যুক্ত হয়ে সুনির্দিষ্ট শব্দটি গঠিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে- এই সুনির্দিষ্ট অবস্থাটি কি? একটিতো জাতি বাচক বিশেষণ যা সর্ব জন বিদিত। আর অপরটি হচ্ছে সামষ্টিক প্রকাশ। সমষ্টি গত ভাবে সকল প্রশংসাইতো আল্লাহ পাকের জন্যে। তিনি তাঁর বন্দাগণের কারয্য সমূহের স্রষ্ঠা। আল্লাহ পাক বলেন, ‘হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা যা কিছু নে’য়ামত পেয়েছো, সে সমস্ত আল্লাহ’র দিক থেকেই এসেছে’। এতে এরকম ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহ পাক জীবিত, ক্ষমতাশালী, অভিপ্রায়কারী ও শক্তির মালিক। এ কারণে তিনি সকল প্রশংসার অধিকারী।
এরপরের শব্দটি হলো- ‘লিল্লাহ’। ‘লিল্লাহ’ শব্দের অর্থ শুধু আল্লাহ’র জন্য। ‘লি’ আল্লাহ শব্দটি কে সুনির্দিষ্ট করেছে। আরবী ভাষারীতি অনুযায়ী ‘আলহামদুলিল্লাহ’ একটি পূর্ণ বাক্য- যার অর্থ হলো, সমস্ত প্রশংসা কেবলই আল্লাহ’র। এ বাক্যটির মাধ্যমে বান্দাদেরকে প্রশস্তি প্রকাশের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। আর বাক্যের উহ্য অংশটিসহ পূর্ণ বাক্যটি হবে এ রকম- ‘কুল আলহামদুলিল্লাহ’ অর্থাৎ হে মানব মন্ডলী! বলো, সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহ’র জন্যে। (তাফসীরে মাযহারী)
প্রকাশ থাকে যে, আল্লাহ পাক কোরআন শরীফের শুরুতে নিজের প্রশংশা দিয়ে শুরু করেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ’। আল্লাহ এমনই এক পবিত্র স্বত্তা যার কোন আ’য়িব নেই বা অপ্রশংসা নেই। যাবতীয় দুষ-ত্রুটি থেকে তিনি মুক্ত। অতএব দেওবন্দী-কওমীদের কথা, ‘আল্লাহ মিথ্যা বলতে পারেন, তবে বলেন না’ (নাউজুবিল্লাহ) একটি কুফুরী মতবাদ। একথাটি আল্লাহ পাকের শানের খেলাফ। নাস্তিক- মুরতাদরাই একথা বলতে পারে।

মাসাআলা
প্রতিটি কাজে ‘বিসমিল্লাহ’র’ মতো ‘হামদ’ বা আল্লাহ’র প্রশংসার মাধ্যমে আরম্ভ করা।
‘হামদ’ কখনো ওয়াজিব; যেমন জুম’আর খোতবায়। কখনো মুস্তাহাব; যেমন বিবাহের খোতবায়, দোয়ায়, প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ কাজের প্রারম্ভে এবং প্রত্যেক পানাহারের পর। কখনো সূন্নাতে মুয়াক্কাদাহ; যেমন হাঁচি আসার পর।(তাহতাবী শরিফ)

জ্ঞাতব্য
‘আলহামদুলিল্লাহ’ কোরআনের শুরুতে বলারকারণএওহতেপারেযে, হযরতআদম (আঃ) প্রথমসৃষ্টিহওয়ারপরহাঁচিআসে, তখনতিনিবলেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’। এ কারণে আল্লাহ পাক কোরআনের শুরুতে এবাক্যটি এনেছেন। কারণ এটি আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রথম জিকির বা কথা বা আল্লাহ’র প্রশংসা। আর একারণে আমাদের উপরও এ হুকুম হাঁচি আসলে ‘ আলহামদুলিল্লাহ’ বলা, আর শ্রবনকারী উত্তরে বলবে ‘ইয়ারহামু কুমুল্লাহ’। তাছাড়া ‘ আলহামদুলিল্লাহ’ এর মধ্যে ৮টি অক্ষর এবং জান্নাত ও ৮টি। বিশুদ্ধ অন্তরে যে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়বে জান্নাতের ৮টি দরজা তার জন্য খোলা থাকবে। এটাও বুঝানো হয়েছে পবিত্র কোরআন শরিফ পাঠকারী শুরুতেই জান্নাতের খোশ খবরী নিয়ে কোরআন শরিফ তেলাওয়াত আরম্ভ করবে।
(তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে রুহুল বয়ান, তাফসীরে নঈমী, খাজাইনুল ইরফান, তাহতাবী শরিফ ইত্যাদি)
رب العلمن “রাব্বিল আ’লামীন”ঃ- “আলহামদুলিল্লাহ” এর পরেই আল্লাহ পাকের গুন বাচক নাম ‘রাব্বুল আ’লামীন’ উল্লেখ করা হয়েছে। আরবী ভাষায় ‘রাব্বুন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘মালিক, সর্দার ও পালন কর্তা’। এ তিনটি অর্থই এখানে প্রযোজ্য।
লালন-পালন বলতে বুঝায়, কোন জীবকে তার সমস্ত মঙ্গলামঙ্গলের প্রতি লক্ষ্য রেখে ধীরে ধীরে বা পর্যায় ক্রমে সামনে এগিয়ে নিয়ে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দেয়।
‘রব’ শব্দের আরেকটি অর্থ ‘স্বত্বাধিকারী’। যেমন বলা হয়, রব্বিদ দার’-গৃহের স্বত্বাধিকারী। ‘রব’ শব্দটি ‘তরবিয়ত’ অর্থেও ব্যবহ্রত হতে পারে। কোন কিছুকে ক্রম-পরিণতির দিকে পৌছানোর নাম ‘তরবিয়ত’। ‘রব’ শব্দটি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো বেলায় প্রযোজ্য হতে পারে না। আর বিশ্ব জগত সমূহের উন্মেষ, স্থিতি ও স্থায়িত্ব রবের মূকাপেক্ষী। প্রাকাশ থাকে যে, কোরাআনের শুরুতে আল্লাহ’র গুণ বাচক নামের মধ্যে ‘রব’ শব্দটি উল্লেখ করেছেন। কারণ আখিরাতের প্রথম মঞ্জিল ‘কবরে’ প্রথম প্রশ্ন করা হবে, ‘মার রাব্বুকা’ বা তুমার রব বা প্রভূকে? উত্তরে বলতে হবে ‘ রাব্বি আল্লাহ’ বা আমার প্রভূ বা প্রতিপালক আল্লাহ। এ শিক্ষাটুকু কোরআনের শুরুতে আল্লহপাক দিচ্ছেন।
আ’লামীনঃ- আরবী ‘আলম’ শব্দের বহু বচন ‘আলামীন’। যার অর্থ সমস্ত মাখলুকাত বা সৃষ্টি জগত। আল্লাহ পাক নিজের শানে বলেছেন ‘রাব্বিল আ’লামীন’ বা সমস্ত সৃষ্টি জগতের প্রভূ, আর ছাহেবে কোরআন আল্লাহ’র হাবীবের (সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম) শানে বলেছেন, ‘রাহমাতাল্লীল আ’লামীন’ অর্থাৎ সমস্ত সৃষ্টি জগতের ‘রহমত’। আল্লাহ- রব আর নবী-রাহমত। জগতের রয়েছে বহু স্তর বিন্যাস। তাই এখানে ‘আলামীন’ বহু বচনের ব্যবহারই সঙ্গত হয়েছে। তন্মধ্যে পৃথিবী ১টি আলম। বিশ্ব সমূহের তুলনায় পৃথিবী যেন সুবিস্তীর্ণ প্রান্তরে একটি তস্তুরী বা প্লেইট। হযরত কা’ব আহরার (রাঃ) বলেছেন, আলম সমূহের সংখ্যা এবং আল্লাহ পাকের সৈন্য সংখ্যা আল্লাহ পাক ছাড়া অন্য কারো জানা নাই। কেহ কেহ বলেছেন, জ্ঞান সম্পন্ন সৃষ্টি কুলের নাম ‘আলম’। যেমন মানুষ, ফেরেশতা ও জ্বীন। অন্যান্য সৃষ্টি এদের অধীন।

– الرحمن الرحيم
(আর রাহমানির রাহিম)
(তিনি) পরম দাতা ও দয়ালু

‘রাব্বুল আ’লামীনের’ কারণ স্বরূপ ‘আর রাহমানির রাহীম’ উল্লেখিত হয়েছে। অর্থাৎ কেন তিনি বিশ্ব সমূহের প্রভূ? উত্তর হলো- এ কারণে যে, তিনি রহমান ও রহীম। রাহমান ও রাহীম শব্দ দু’টি সমার্থবোধক হলেও গুনগত দিক থেকে পার্থক্য বিদ্যমান, যেমন এ দুনিয়াতে আল্লাহ পাক ‘রহমান’, এর ব্যপকতা রয়েছে। অর্থাৎ পাপি-তাপী, ভালো-মন্দ নির্বিশেষে সবার প্রাতি তিনি দয়ালু, তাই তিনি এ দুনিয়ার জন্য ‘রাহমান’। কিন্তু পরকালে তিনি ‘রহীম’, অর্থাৎ শুধু নেককারদের দয়া করবেন।
প্রকাশ থাকে যে, মহান রাব্বুল আ’লামীনের জাতী নাম দু’টি ‘ আল্লাহ’ ও ‘রহমান’। যেমন সূরায়ে বণী-ইসরাঈলের ১১০নং আয়াতে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন, ”কুল উদওল্লাহা আওয়িদউর রহমান” অর্থাৎ (হে হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম!) আপনি বলুন! তোমরা ‘আল্লাহ’ নামে ডাকো অথবা ‘রাহমান’ নামে ডাকো।
তাছারা এও হতে পারে যে, ‘হামদ’ বা প্রশংসা এর সাথে রহমত জড়িত। যে আল্লাহ’র প্রশংসা করবে সে অবশ্যই আল্লাহ’র রহমত লাভ করবে। হযরতআদম (আঃ) পয়দা হওয়ার পর পরই হাঁচি দিয়ে বলেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’ সাথে সাথে ফিরিশতারা জবাবে বলেন ‘ইয়ার হামু কাল্লাহ’।
ملك يوم الدين
মালিকি ইয়াউ মিদ্দিন
বিচার বা প্রতিফল দিবসের মালিক
মালিকঃ- এ শব্দটি দু’ রকম ক্বিরাতে পড়া যায়। মালিক ও মা-লিক। ‘মালিক’ ও ‘মা-লিক’ এর অর্থ একই। যেমন, ‘ফারিহীন’ ও ‘ফা-রিহীন’, ‘হাজিরীন’ ও ‘হা-জিরীন’। প্রকৃত কথা হচ্ছে, সত্ত্বাধিকারী হিসেবে ব্যবহ্রত ‘মা-লিক’ শব্দটি ‘মালিক’ শব্দ থেকে গঠিত হয়েছে। আরবী ভাষায় প্রবাদ রয়েছে ‘মা-লিকুদ্দার’ অর্থ ‘রাব্বুদ্দার’ অর্থাৎ ঘরের সত্ত্বাধিকারী। ‘মালিক’ শব্দের অর্থ রাজা বা সম্রাট- যা গঠিত হয়েছে ‘মূলুক’ শব্দটি থেকে। ‘মালিক’ ও ‘মা-লিক’ এ দু’ রকম উচ্চারণই আল্লাহ পাকের বিশেষণ রূপে সুবিদিত। কেউ বলেছেন, মালিক অথবা মা-লিক তিনিই, যিনি অনস্তিত্বকে অস্তিত্ব দান করতে সক্ষম। তাই এ শব্দ দু’টিকে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য ব্যবহার করা বৈধ নয়।
ইয়াউ মিদ্দিনঃ- অর্থ প্রতিফল দিবস। ঐ দিবসকে প্রতিফল দিবস বলে, যে দিন পুরুস্কার ও তিরস্কার কার্যকর হবে। ‘কামাতুদিনু তুদান’ শব্দটি গঠিত হয়েছে ‘দ্বীন’ শব্দ হতে। এর অর্থ হচ্ছে, যেমন কর্ম তেমন ফল। ‘দ্বীন’ শব্দের অর্থই সলাম ও আনুগত্যও হতে পারে। কেননা ঐ সময় ইসলাম ও আনুগত্য ব্যতীত অন্য কিছুই ফলদায়ক হবে না।
প্রতিফল দিবসের স্বরূপ ও তার প্রয়োজনীয়তাঃ-
প্রথমতঃ প্রতিদান দিবস কাকে বলে এবং এর স্বরূপ কি? দ্বিতীয়তঃ সমগ্র সৃষ্টির উপর প্রতিদান দিবসে যেমনি ভাবে আল্লাহ তা’য়ালার একক অধিকার থাকবে, অনুরূপ ভাবে আজও সকল কিছুর উপর তাঁরইতো একক অধিকার রয়েছে; সুতরাং প্রতিফল দিবসের বৈশিষ্ট্য কোথায়?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, প্রতিদান-দিবস ঐদিনকেই বলা হয়, যে দিন আল্লাহ তা’আলা ভাল-মন্দ সকল কাজ-কর্মের প্রতিদান দিবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। রোজে- জাযা শব্দ দ্বারা বোঝানু হয়েছে যে, এ দুনিয়া ভাল-মন্দ কাজ-কর্মের প্রকৃত ফলাফল পাওয়ার স্থান নয়; বরং এটি হলো কর্মস্থল; কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের জায়গা। যথার্থ প্রতিদান ও পুরুস্কার গ্রহণের স্থান এটি নয়। এতে একথাও বুঝা যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে কারও অর্থ- সম্পদের আধিক্য ও সূখ-শান্তির ব্যপকতা দেখে বলা যাবেনা যে, এ ব্যক্তি আল্লাহ’র দরবারে মাকবুল।
এ জন্যই নবীগণ আলাইহিমুস সালাম এ দুনিয়ার জীবনে সর্বাপেক্ষা বেশী বিপদাপদে পতিত হয়েছেন এবং তারপর আউলিয়াগণ অধিক বিপদে পতিত হন। কিন্তু দেখা গেছে বিপদের তীব্রতা যতই কঠিন হউক না কেন, দৃঢ় পদে তাঁরা তা সহ্য করেছেন। এমনকি আনন্দ চিত্তে তাঁরা তা মাথা পেতে নিয়েছেন। মোটকথা, দুনিয়ার আরাম আয়াশকে সত্যবাদিতা ও সঠিকতা এবং বিপদাপদকে খারাপ কাজের নিদর্শন বলা যায় না।
অবশ্য কখনো কোন কোন কর্মের সামান্য ফলা ফল দুনিয়াতে ও প্রকাশ করা হয় বটে, তবে তা সে কাজের পূর্ণ বদলা হতে পারে না। এগুলো সাময়িক ভাবে সতর্ক করার জন্য একটু নিদর্শন মাত্র।

اياك نعبد و اياك نستعين
ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন
(হে করুণা নিধান দয়াময়)
আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি
রাব্বিল আ’লামীন, আর রাহমানির রাহীম, মালিকি ইয়াউ মিদ্দিন এ সকল বর্ণনার মাধ্যমে বুঝা যায় যে, আল্লাহ পাক সমস্ত স্তব-স্তুতির অধিকারী। তাই তিনি ব্যতীত উপাসনা লাভের যোগ্য কে?
ইয়্যাকা না’বুদু (আমরা তোমারই ইবাদত করি)- এ বাক্যটির ভূমিকা স্বরূপ প্রথমেই আল্লাহ তা’আলার গুণাবলীর উল্লেখ করা হয়েছে। প্রমাণ করা হয়েছে আল্লাহ তা’আলার একত্ব, পরাক্রম এবং দয়া দাক্ষিণ্যকে। এভাবেই প্রমাণিত হয়েছে সৃষ্টির সঙ্গে স্রষ্টার পার্থক্য। অর্থাৎ সৃষ্টি মাত্রই স্রষ্টার উপাসনা-বন্দেগী করবে। বান্দা এবার উচ্চারণ করুক ‘ ইয়্যাকা না’বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতাঈন’ অর্থাৎ (হে দয়াময়) আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
আরবী ভাষায় বাক ভঙ্গির বিভিন্ন রূপান্তর রীতি সিদ্ধ। ‘প্রথম’ থেকে ‘মধ্যম’ পুরুষ এর কম বাক ভঙ্গি আরবী ভাষায় সুপ্রচল। এ রকম রূপান্তরশীল বাক ভঙ্গির উদ্দ্যশ্য হচ্ছে, শ্রোতার অন্তরে উৎসাহ-উদ্দীপনা সঞ্চার করা। ইবাদত বা উপাসনা হচ্ছে চরম অসহায়ত্ব ও চুড়ান্ত পর্যায়ে বিনয়-নম্রতার নাম।
‘ন’বুদু’ ও ‘নাসতাঈন’ শব্দ দু’টিতে উত্তম পুরুষের বহুবচন ‘আমরা’ ব্যবহ্রত হয়েছে। এতে করে পাঠকের সঙ্গে তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ সম অংশীদার হন। এ বর্ণনা ভঙ্গিটি হচ্ছে দলবদ্ধ উপাসনার প্রতি ইঙ্গিত।আরবী ব্যকরণ অনুযায়ী ‘ইয়্যাকা’ শব্দটি ক্রিয়া ও কতৃপদের পরে আসার কথা। কিন্তু এখানে পূর্বেই উল্লেখিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ পাকের মহিমা, উপাস্য হওয়া এবং সাহায্য দাতা হওয়ার বিষয়টিকে সুনির্দিষ্ট করা।
মাসা’আলাঃ- ‘না’বুদু’ বহু বচন ক্রিয়া পদ ইবাদতকে জামা’আত সহকারে বা দল বদ্ধ ভাবে আদায় করার বৈধতাও প্রমাণিত হয়। একথাও বুঝা যায় যে, সাধারণ মুসলমানের ইবাদত আল্লাহ’র প্রিয় বান্দাদের ইবাদতের সাথে মিলে কবূলিয়াতের মর্যাদা লাভ করে। আর এতে শিরক বাতিল হয়েছে। কারণ আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারোর জন্য ইবাদত হতে পারে না।
প্রকাশ থাকে যে, ওহাবী পন্থীরা এ আয়াতে কারীমা দ্বারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়া ‘শিরক’ বলে থাকে। যেহেতু এখানে বলা হয়েছে, ‘আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি’।
এর জবাব হচ্ছে, এখানে সাহায্য বলতে যথার্থ বা প্রকৃত সাহায্যের কথা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ মূলতঃ তোমাকেই প্রকৃত সাহায্যকারী হিসেবে বিশ্বাস করি। এখন রইলো বান্দার কাছ হতে সাহায্য চাওয়ার ব্যাপারটি। বান্দার কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া হয় তাদেরকে ফয়জে ইলাহী লাভের মাধ্যম রূপে বিশ্বাস করে। যেমন কোরআনে আছে, ‘ইনিলহুকমু ইল্লা লিল্লাহি’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম করার অধিকার নাই। অন্যত্র আছে- ‘লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়ামা ফিল আরদ’ অর্থাৎ আসমান-জমিনে যা কিছু আছে সব কিছু আল্লাহ’রই। তারপরও আমরা সরকার বা শাসক বর্গের হুকুম মান্য করি। নিজেদের জিনিসের উপর মালিকানা দাবী করি। অতএব বুঝা যায় যে, উপরোক্ত আয়াত দ্বয়ে হুকুম ও মালিকানা বলতে, প্রকৃত হুকুম ও মালিকানাকে বুঝানো হয়েছে। বান্দাদের বেলায় কিন্তু হুকুম ও মালিকানা আল্লাহ প্রদত্ত।
তাছাড়া উক্ত আয়াতে যে ইবাদত ও সাহায্য প্রার্থনার বিষয়টি একত্রে সন্নিবেশিত হয়েছে, এ দু’য়ের মধ্যে সম্পর্ক কি তা নির্ণয় করতে হবে। এ দু’টি বিষয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে তাহলো, আল্লাহকে প্রকৃত সাহায্যের উৎস মনে করে সাহায্য প্রার্থনা করা ও ইবাদতের একটি অংশ। পুজারীগণ মূর্তি-পূজার সময় সাহায্যের আবেদন সম্বলিত শব্দাবলী উচ্চারন করে থাকে। যেমন, ‘মা-কালী’ তোমার দোহাই ইত্যাদি। এ উদ্দেশ্যেই ইবাদত ও সাহায্য প্রার্থনা কথা দু’টির একত্রে সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। আয়াতের লক্ষ যদি এই হয়ে থাকে যে, আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো কাছ থেকে যেকোন ধরনের সাহায্য প্রার্থনাই ‘শিরক’ তাহলে পৃথিবীর বুকে কেহ মুসলমান থাকতে পারেনা। কারণ এখনো মসজিদ-মাদ্রাসার চাঁদার জন্য ধনাঢ্য ব্যক্তি বর্গের সাহায্য ভিক্ষা চাওয়া হয়। মানুষ তার জন্ম লগ্ন থেকে কবরস্থ হওয়া পর্যন্ত, এমনকি কিয়ামত পর্যন্ত বান্দাদের সাহায্যের মুখাপেক্ষী। ধাত্রির সাহায্যে জন্ম গ্রহণ করা, পিতা-মাতার মাধ্যমে লালিত-পালিত হওয়া, শিক্ষকের সাহায্যে জ্ঞান অর্জন করা, মৃত্যুর পর আত্মীয় স্বজন দ্বারা কবর খনন, কাফন-দাফন হওয়া ইত্যাদি কাজ গুলো অন্যের সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। তাহলে আমরা কোন মুখে বলতে পারি যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো মুখাপেক্ষী নই? তাহলে বুঝা গেলো প্রকৃত সাহায্য আল্লাহ’রই কিন্তু অন্যের সাহায্য হলো উসীলা।

اهدنا الصراط المستقيم
ইহদিনাস সিরা-তালমুস্তাকীম
অর্থাৎ (হেআল্লাহ্!) আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।
সোজা রাস্তা, যাতে কোন আঁকা-বাকা নেই। এ সরল পথই মানুষের চরম আর্তি এবং প্রাপ্তি। তাই পৃথক বাক্যের মাধ্যমে এ প্রার্থনাটি পেশ করা হয়েছে। হেদায়েতের প্রকৃত অর্থ হলো- বিনম্র পথ প্রদর্শন। কেবল কল্যাণ ও পূণ্য বুঝাতেই ‘হেদায়েত’ শব্দটি ব্যবহ্রত হয়। ‘আমাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করো’ এ প্রার্থনাটি হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে উচ্চারিত তাঁর সকল উম্মতের প্রার্থনা। তাঁর হেদায়েত প্রাপ্তিতো পূর্বেই সুনিশ্চিত ছিলো। এ প্রার্থনাটি উচ্চারনের মাধ্যমে তিনি তাঁর উম্মতকে হেদায়েত প্রাপ্তির নিয়ম শিক্ষা দিয়েছেন। অবশ্য হেদায়েত প্রাপ্তদের জন্যও এ প্রার্থনাটি জরুরী। প্রকৃত বিশ্বাসীদের অন্তরে অধিকতর হেদায়েত প্রাপ্তির কামনা চির বহ্নি মান। আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের এটাই মতাদর্শ যে, আল্লাহ পাকের করুণা ও হেদায়েত অন্তহীন। (তাফসীরে মাযহারি)
‘আমাদেরকে সরল পথ দেখাও’- আল্লাহ্ তা’আলার সত্তা ও গুণাবলীর পরিচয়ের পর ইবাদত, তারপর প্রার্থনা শিক্ষা দিচ্ছেন। এ থেকে এ মাস’আলা জানা যায় যে, বান্দাদের ইবাদতের পর দোয়ায় মগ্ন হওয়া উচিৎ। হাদিছ শরীফেও নামাজের পর দোয়া বা প্রার্থনার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। (তাবরানী ফিল কবীর ও বায়হাকী)
‘সিরাতাল মুস্তাকীম’ দ্বারা ‘ইসলাম’ বা ‘কোরআন শরীফ’ কিংবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পূত-পবিত্র চরিত্র, অথবা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পরিবার-পরিজন (আহলে বায়ত) ও সাহাবায়ে কিরাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম এর কথাই বুঝানো হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, ‘সিরাতুল মূস্তাকীম’ হলো, আহলে সুন্নাতেরই অনুসৃত পথ; যারা আহলে বায়ত, সাহাবা-ই কিরাম, কোরআন ও সুন্নাহ এবং ‘বৃহত্তমজামাত’ সবাইকে মান্য করে। (খাজাইনুল ইরফান)
‘মুস্তাকীম’ অর্থ সমতল বা সরল। প্রকৃত অর্থ হলো সত্য পথ। কেউ কেউ অর্থ করেছেন ‘ইসলাম’। হজরত আবুল আলিয়া এবং ইমাম হাসান (রাঃ) বলেছেন, সিরাতুল মুস্তাকীম হচ্ছে হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর প্রধান সহচর হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা এর পথ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমার পরে আমার আদর্শ এবং খোলফায়ে রাশেদীনের আদর্শকে দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ধর। তিনি আরো নির্দেশ করেছেন, আমার পরে আবু বকর ও ওমরের (রাঃ) অনুসারী হইও। (তাফসীরে মাযহারী, তাফসীরে নঈমী,খাজাইনুল ইরফান ইত্যাদি)

صراط الذين انعمت عليهم
সিরা-তাল্লাযীনা আন’আমতা আ’লাইহীম-
অর্থাৎ তাঁদের পথ যারা আপনার নে’আমত বা অনুগ্রহ লাভ করেছে।
এ আয়াতে কারীমা ‘সিরাতাল মুস্তাকীমের’ ব্যাখ্যা। যারা আপনার অনুগ্রহ বা দয়া পেয়েছে তাঁদের পথই সোজা-সরল রাস্তা। এতে করে এ কথাটিও প্রমাণিত হয়েছে যে, ঐ সমস্ত প্রিয়জন লোকের পথ যাদের মুস্তাকীম হওয়ার বিষয়টি সুস্বীকৃত। এর অর্থ দাঁড়াবে এরকম- হে আল্লাহ্! আমাদেরকে ঐ সমস্ত লোকের পথানুগামী করো, যাঁদের কে তুমি করুণা সিক্ত করেছো। ঐ করুণা সিক্ত লোকেরাই ঈমান ও আনুগত্যের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত। আর করুণা সিক্ত বা অনুগ্রহ প্রাপ্ত প্রিয় ভাজন কারা আল্লাহ পাকই সূরা নিসা’র ৬৯নং আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন- “আল্লাজিনা আন’আমাল্লাহু আলাইহিম মিনা ন্নাবীয়্যিনা ওয়াস সিদ্দীকিনা ওয়াশ শোহাদায়ে ওয়াস সালেহীন” অর্থাৎ নে’আমত প্রাপ্তরা হলেন নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও সালেহীনগণ। আল্লাহ’র দরবারে মকবুল উপরোক্ত লোকদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর নবীগণের। অতঃপর নবীগণের উম্মতের মধ্যে যারা সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী, তাঁরা হলেন ‘সিদ্দীক’ যাদের মধ্যে রূহানী কামালিয়াত ও পরিপূর্ণতা রয়েছে, সাধারন ভাষায় তাঁদেরকে ‘আউলিয়া’ বলা হয়। আর যারা দ্বীনের প্রয়োজনে স্বীয় জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করেছেন, তাঁদেরকে বলা হয় শহীদ। আর সালেহীন হলো সৎকর্ম পরায়নশীল তাঁরাও আউলিয়া শ্রেনী ভূক্ত।
অতএব, বুজুরগানে দ্বীন বা আউলিয়ায়ে কিরাম যে সকল আমল করেছেন বা যে পথে চলেছেন তা-ই ‘সিরাতাল মুস্তাকীম’।এছাড়াএটাওপ্রমাণিতহলোহযরতআবুবকরসিদ্দীক (রাঃ) এর খেলাফত হক্ব বা সঠিক। কেননা সিদ্দীকিনদের মধ্যে সর্বোচ্চ হলেন আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)। ( দৈনিক নামাজের প্রতি রাকা’আতে আমরা সূরা ফাতিহা ওয়াজিব হিসেবে পাঠ করি, আর নবী-অলী’র পথ অনুস্মরণ করার জন্য ফরিয়াদ করি, কিন্তু বাস্তবে তা কয়জনে মানি?)
তাফসীরে জালালাইন, মাযহারী, কবীর, নঈমী, খাজাইনুল ইরফান, মা’আরেফুল কোরআন ইত্যাদি।

غير المغضوب عليهيم ولا الضالين
গাইরিল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দ্বাল্লিন (আমিন)-
অর্থাৎ যারা আপনার অভিসম্পাত গ্রস্ত বা গজব গ্রস্ত তাঁদের পথে নয়, তাদের পথেও নয় যারা পথহারা হয়েছে।
এ বাক্যটি ‘আন’আমতা আলাইহিম’ বাক্যের ব্যাখ্যা বোধক। এ বাক্যে ও হেদায়েত রয়েছে। অর্থাৎ যাঁদেরকে আল্লাহ তা’আলা তাঁর করুণা দানে ধন্য করেছেন, তারাই আল্লাহ’র গজব ও পথভ্রষ্ঠতা থেকে মুক্ত বা সুরক্ষিত।
প্রতি শোধ স্পৃহার উল্লাস ও উদ্দীপনার নাম গজব। কিন্তু এর সম্পর্ক যখন আল্লাহ’র সঙ্গে করা হয়, তখন তাঁর মর্ম হবে গজবের পরিণাম বা পরিসমাপ্তি। ‘আযাব’ এবং ‘দালালাহ’ শব্দ দু’টি হেদায়েতের পথের বিপরীত অর্থ বোধক শব্দ অর্থাৎ যে পথ আল্লাহ পর্যন্ত পৌছায়, ঐ পথের প্রতি বিমূখতাই দালালাহ বা পথভ্রষ্ঠতা। হযরত আদি বিন হাতেম (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যাদের প্রতি গজব অবতীর্ণ হয়েছে তারা ‘ইহুদী’, আর যারা পথভ্রষ্ঠ তারা ‘খৃষ্টান’। এ হাদীছটি ইমাম আহমদ তাঁর মুসনাদে এবং ইবনে হাব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে লিপি বদ্ধ করেছেন। তিরমীজি স্বীকার করেছেন হাদিছটি হাসান।
তাফসীরে মাযহারী লেখক বলেন, ‘গাইরীল মাগদুবি আলাইহিম ওয়ালাদ দ্বাল্লিন’ অর্থাৎ গজব গ্রস্ত ও পথভ্রষ্ঠ- এ শব্দ দু’টিতে সাধারন ভাবে সকল সত্য প্রত্যাখ্যানকারী, অবাধ্য এবং বেদাতী সম্প্রদায় শামীল রায়েছে।
মাস’আলা- সত্য-সন্ধানীদের জন্য, আল্লাহ’র দুশমন থেকে দূরে থাকা এবং রীতি-নীতি থেকে বিরত থাকা একান্ত আবশ্যক। তিরমীজি শরীফের হাদিছ দ্বারা জানা যায়, ‘মাগদুবি আলাইহিম’ যারা ‘ইহুদী’ এবং ‘দোয়াল্লিন’ দ্বারা ‘খ্রিষ্টানদের’ কথা বুঝানো হয়েছে।
মাস’আলা- ‘দোয়াদ’ ও ‘যোয়া’ এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোন কোন বৈশিষ্ঠ্যে অক্ষর দু’টির মিল থাকা, উভয়কে এক করতে পারে না।কাজেই ‘মাগদুবি’ এর মধ্যে ‘যোয়া’ সহকারে পাঠ করা যদি ইচ্ছা কৃত হয়, তাহলে তা হবে কোরআন শরীফের বিকৃতি সাধন ও কুফর নতুবা নাজায়েয।
মাস’আলা- যে ব্যক্তি ‘দোয়াদের’ স্থলে ‘যোয়া’ পড়ে সে ব্যাক্তির ইমামত জায়েয নয়।
আমিন- এর অর্থ হলো ‘এরূপকরো’ অথবা ‘কবুল করো’।
মাস’আলা- ‘আমিন’ এটা কোরআনের শব্দ নয়। সূরা ফাতিহা পাঠান্তে নামজে ও নামাজের বাইরে ‘আমীন’ বলা সূন্নাত। আমাদের হানাফী মাযহাবে নামাজে নীরবে আমিন বলতে হয়।
‘সূরা আল ফাতিহার’ আয়াত সাতটির তাফসীর শেষহয়েছে। এখন সমগ্র সূরার সার মর্ম হচ্ছে এ দোয়া- ‘হে আল্লাহ্! আমাদিগকে সরল পথ দান করুন। কেননা সরল পথের সন্ধান লাভ করাই সবচাইতে বড় জ্ঞান ও সর্বাপেক্ষা বড় কামিয়াবী। বস্তুতঃ সরল পথের সন্ধানে ব্যর্থ হয়েই দুনিয়ার বিভিন্ন জাতি ধ্বংস হয়েছে। অন্যথায় অ-মুসলমানদের মধ্যেও সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভ করা এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথ অনুস্মরন করার আগ্রহ-আকুতির অভাব নেই। এ জন্যই কোরআন শরীফে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় পদ্ধতিতেই সিরাতে মুস্তাকীমের পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। আর সূরায়ে ফাতিহাতে নবী-অলী’র পথকেই ‘সিরাতুল মুস্তাকীম’ বলা হয়েছে। সূরা ফতিহাকে ‘উম্মূল কোরআন’ বলা হয়। যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা বুঝতে পারলো সে গোটা কোরআন শরীফ ও ইসলামকে বুঝতে পারলো। সমাপ্ত।

(তাফসীরে রুহুল বয়ান, মাযহারী, জালালাইন, কবীর, খাজাইনুল ইরফান, মা’রেফুল কোরআন, তিরমীজি শরিফ ইত্যাদি)