হাদীস মানবো নাকি সুন্নাত

Standard

“সকল সুন্নাতই হাদীস, কিন্তু সব হাদীস সুন্নাত নয়।”

[আর] “সকল হাদীস সমুহের মধ্য থেকে শুধু সুন্নাতেরই অনুসরন করতে হবে।”✨
💫❇💫 বিস্তারিতঃ

আল্লাহ তা’আলা কুরআন শরীফে বলে দিয়েছেন-

فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ

অর্থাৎ তোমরা যদি না জেনে থাক তবে আহলে যিকিরদেরকে জিজ্ঞাসা কর। [কোরআন শরীফ; সুরা নাহল আয়াত-৪৩।]

মুফাসসিরীনে কেরাম বলেন উক্ত আয়াতে আহলে যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য হল উলামায়ে কেরাম। আর উক্ত হুকুম হল সাধারন মানুষের জন্য।

অর্থাৎ সাধারন মানুষ কোন বিষয় না জেনে থাকলে তার দায়িত্ব হল ওলামায়ে কেরামকে জিজ্ঞাসা করে তদ্বানুযায়ী আমল করা। তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা বলেননি যে, তোমরা না জেনে থাকলে কুরআন ও হাদীস গবেষণা করে তদ্বানুযায়ী আমল করবে।
[অথচ] আমাদের মধ্য থেকে কিছু ব্যক্তি এমন আছেন যারা নিজেরাই কুরআন-হাদীস গবেষণা করে আমল করতে চান। যদিও তিনি আলেম নন।
এমন অ-আলেম ব্যক্তিরা দলিল হিসাবে পেশ করেন –

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا الْقُرْآنَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِنْ مُدَّكِرٍ

অর্থ- আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য তবে আছে কি কোন উপদেশ গ্রহনকারী?

[ক্বুরআ’ন শরীফ; সূরা কমার আয়াত -১৭।]

তারা বলে, কুরআন তো খুবই সহজ। যা আল্লাহ তা’আলা নিজেই বলে দিয়েছেন। কাজেই তা গবেষণা করে তদ্বানুযায়ী আমল করাতে অসুবিধা কোথায়?

– [অথচ] আয়াতের অর্থ থেকে যে কেউ অতি সহজেই বুঝতে পারবে যে, কুরআনকে সহজ করা হয়েছে উপদেশ গ্রহণের জন্য; হুকুম আহকামের উপর আমল করার জন্যে সকলের জন্যে সহজ নয়।

অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা কুরআন শরীফে পূর্ববর্তী উম্মতের যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তাদেরকে যে নছীহত করেছেন, আল্লাহ তা’আলার হুকুম পালনার্থে তাদেরকে যে নেয়মত দান করেছেন এবং হুকুম না মানার কারনে যে আযাব দিয়েছেন তা যে কেউ খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবে।

অপর দিকে কুরআন থেকে মাসআলা নিঃসরণ অত্যন্ত কঠিন কাজ। তা কেবল মুজতাহিদের পক্ষেই সম্ভব।

নিন্মের আয়াতটিতে এদিকেই ইশারা করা হয়েছে-

إِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلاً ثَقِيلاً

অর্থাৎঃ অচিরেই আমি আপনার উপর কিছু ভারী কথা অবতীর্ণ করব।

[কুরআন শরীফ; সূরা মুজ্জাম্মিল, আয়াত-৫।]

অনুরূপভাবে হাদীস থেকে হুকুম আহকাম বের করা (Extracting)-ও অত্যন্ত কঠিন কাজ। সাধারন মানুষের জন্যে তা একেবারেই অসম্ভব।

⬅ কেন?

⬅ মুহাদ্দিছীনদের দায়িত্ব শুধু মাত্র হাদীস জমা করে দেওয়া। তারা আমলযোগ্য হাদীস ও আমলবিহীন হাদীসের মেধ্য কোন পার্থক্য করেন না । তাই হাদীসের কিতাবসমূহে সর্ব প্রকার হাদীস বিদ্যমান থাকে।

যেমনঃ-

(১) রহিত হাদীস সমূহ।

(২) মারজুহ তথা অনাগ্রাধিকারপ্রাপ্ত হাদীস ।

(৩) নির্দিষ্ট স্থানের জন্য খাছ হাদীস।

(৪) নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছ হাদীস।

(৫) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাছ হাদীস ।

(৬) মওজু তথা জাল হাদীস।

এছাড়াও বিভিন্ন ধরনের হাদীস থাকে। উপরে উল্লেখিত ১ম, ২য় ও ৬ষ্ট প্রকার কোন অবস্থাতেই আমলযোগ্য নয়। ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম প্রকার ক্ষেত্রবিশেষে আমলযোগ্য হতে পারে। সর্বাবস্থায় নয়।
▆ :—বিষয়টিকে ভালোভাবে স্পষ্ট করার জন্য প্রতিটি প্রকারের একটি করে উদহারন নিম্নে দেওয়া হল।

যথাঃ-

(১) রহিত হাদীসঃ

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا شَرِبَ الْكَلْبُ فِي إِنَاءِ أَحَدِكُمْ فَلْيَغْسِلْهُ سَبْعًا

অর্থাৎঃ হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন কুকুর তোমাদের কারো পাত্রে পানি পান করে, সে যেন উক্ত পাত্র সাত বার ধুয়ে নেয়।

[গ্রন্থ সূত্রঃ বুখারী শরীফ হাদীস নং-১৭২।]
(২) মারজূহ হাদীসঃ

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ عَنْ أَبِيهِ قَالَ سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنِ الْمَاءِ وَمَا يَنُوبُهُ مِنَ الدَّوَابِّ وَالسِّبَاعِ فَقَالَ -صلى الله عليه وسلم- « إِذَا كَانَ الْمَاءُ قُلَّتَيْنِ لَمْ يَحْمِلِ الْخَبَثَ

অর্থাৎঃ হযরত ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ পানি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যা মরুভূমিতে নিচু জায়গায় জমে থাকে এবং যেখানে চতুস্পদ জন্তু ও হিংস্র প্রাণী আসা যাওয়া করে। তিনি বললেন, পানি যখন দুই মটকা পরিমান হয় তখন তা আর নাপাক হয় না।

[গ্রন্থ সূত্রঃ আবূ দাউদ শরীফ হাদীস নং-৬৩।]
(৩) নির্দিষ্ট স্থানের জন্য খাছ হাদীসঃ

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ قيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَتَتَوَضَّأُ مِنْ بِئْرِ بُضَاعَةَ وَهِيَ بِئْرٌ يُطْرَحُ فِيهَا لُحُومُ الْكِلَابِ وَالْحِيَضُ وَالنَّتَنُ فَقَالَ الْمَاءُ طَهُورٌ لَا يُنَجِّسُهُ شَيْءٌ

অর্থাৎঃ আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, আমরা কি বুজাআহ নামক কুয়া থেকে উযূ করব? আর তা এমন একটি কুয়া যেখানে মহিলাদের হায়েযের নেকড়া, মৃত কুকুরসমূহ এবং নাপাক বস্তুসমূহ ফেলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পানি পবিত্র। তাকে কোন বস্তু নাপাক করতে পারে না।

[গ্রন্থ সূত্রঃ নাসাই শরীফ হাদীস নং-৩২৬।]
(৪) নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছঃ

عن أبي هريرة Y أن رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا كان أحدكم في المسجد فوجد ريحا بين أليتيه فلا يخرج حتى يسمع صوتا أو يجد ريحا

অর্থাৎঃ হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ মসজিদে থাকে আর সে তার পায়ু পথে বায়ু অনুভব করে, সে ততক্ষণ পর্যন্ত (উযূর নিয়তে) বাহির হবে না যতক্ষণ না সে শব্দ শুনে বা গন্ধ পায়।

[গ্রন্থ সূত্রঃ তিরমিজী শরীফ হাদীস নং-৭৫।]

হাদীস থেকে বুঝা যায়। কারো বায়ু নির্গমন হওয়া সত্তেও যদি সে শব্দ না শুনে বা গন্ধ না পায় তাহলে তার উযূ ভঙ্গ হবে না। হাদীসটি সম্পূর্ন সহীহ।
(৫) নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাছঃ

عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- أَمَرَ بِقَتْلِ الْكِلاَبِ

অর্থাৎঃ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুকুরকে হত্যা কারার জন্য আদেশ দিয়েছেন।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৩৯৮৮।]
(৬) জাল হাদীসঃ

عن جابر قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من كثرت صلاته بالليل حسن وجهه بالنهار

অর্থাৎঃ হযরত জাবের (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার রাতে (তাহাজ্জুদ) নামাজ বেশি হয় দিনে তার চেহারা উজ্জ্বল হয়।

[গ্রন্থ সূত্রঃ ইবনে মাজাহ হাদীস নং ১৩৩৩।]
❇ ❇ পর্যালোচনাঃ

উপরে উল্লেখিত হাদীসসমূহের মধ্যে :—

⬅ ১ম হাদীসটি তিনবার ধোয়ার হাদীস দ্বারা রহিত হয়ে গিয়েছে।

⬅ ২য় হাদীসের বিপরিতে রয়েছে স্থির পানিতে পেষাব করার নিষেধাজ্ঞার হাদীস। যা দ্বারা উল্লেখিত হাদীসটি মারজূহ হয়েছে।

⬅ ৩য় হাদীসের হুকুমটি বুজাআহ নামক কুপের সাথে খাছ।

⬅ ৪র্থ হাদীসটি ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য খাছ যে ওয়াসওয়াসার রোগে আক্রান্ত।

⬅ ৫ম হাদীসটি ইসলামের প্রথম যুগের জন্য খাছ। যা পরবর্তীতে রহিত হয়ে গিয়েছে।

একারনেই উলামায়ে কেরাম সাধারন মানুষের জন্য কোন আলেমের নেগরানী ও পরামর্শ ব্যতীত হাদীস অধ্যায়ন করা থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। এটা তাদেরকে গোমরাহীর দিকে নিয়ে যেতে পারে।

বিখ্যাত তা‘বে তাবেঈন লাইস বিন সা‘দ বলেছেন-

الحديث مضلة الا للعلماء.

অর্থাৎঃ উলামা ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদীস গোমরাহীর করণ।

সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ বলেছেন-

الحديث مضلة الا للفقهاء.

অর্থঃ ফুকাহা ব্যতীত অন্যদের জন্য হাদীস পথ ভ্রষ্টতার কারন।

[অথচ] আমাদের মধ্য থেকে কিছু ইংরেজি শিক্ষিত আছেন তারা নিজেরাই হাদীস অধ্যয়ন করে তদানুযায়ী আমল করতে চেষ্টা করেন। তারা নিজেদেরকে আহলে হাদীস বলে দাবী করেন।

পূর্বের আলোচনার দ্বারা স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা যে সমুদ্রতুল্য হাদীস ভান্ডারের প্রতিটি হাদীসই উম্মতের জন্য অনুসরনীয় নয়।

যেমন- হাদীস রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১১টি বিবাহ্ করেছেন। একই সাথে তার নয়টি স্ত্রী ছিলেন। এবং তিনি মহর ছাড়া বিবাহ করেছেন। তাহলে কি এগুলো উম্মতের জন্য হালাল হয়ে যাবে? (নাউজুবিল্লাহ!)

বিখ্যাত তাবেঈ ইব্রাহীম নাখঈ বলেছেন-

اني لاسمع الحديث فانظرالي ما يؤخذ به فاخذ به و ادع سائره.

অর্থাৎঃ আমি হাদীস শোনার পর তার প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করি। এরপর যেটা গ্রহন করার তা গ্রহন করি। আর অন্যান্য সমস্ত হাদীস ছেড়ে দেই।

ইবনে আবী লাইলা বলেন-

لا يفقه الرجل في الحديث حتي ياخذ منه و يدع.

অর্থাৎঃ কোন ব্যক্তি ততক্ষন পর্যন্ত হাদীসে গভীর জ্ঞান অর্জন করতে পারবে না যতক্ষণ না সে কিছু হাদীস গ্রহন করে আর কিছু হাদীস ছেড়ে দেয়।

বিখ্যাত ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে ওহাব বলেন-

لولا ان الله انقذني بمالك و الليث لضللت.فقيل له كيف ذلك؟ قال:اكثرت من الحديث فحيرني فكنت اعرض ذلك علي مالك و الليث فيقولان لي :خذ هذا و دع هذا.

অর্থাৎঃ যদি আল্লাহ তাআলা আমাকে ইমাম মালেক ও লাইস বিন সা‘দ দ্বারা হেফাযত না করতেন, আমি পথভ্রষ্ট হয়ে যেতাম। অতপর তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল তা কিভাবে? তিনি বললেন আমি হাদীস নিয়ে বেশি চর্চা শুরু করেছিলাম ফলে তা আমাকে বিভ্রান্ত করেছিল। অতপর আমি তা মালেক(রহ) ও লাইস (রহ) এর নিকট পেশ করতাম। তারা বলতেন এটা গ্রহন কর আর এটা ত্যাগ কর।

[গ্রন্থ সূত্রঃ আছারুল হাদীসিশ শরীফ পৃঃ ৮১, ৮২।]

তারা এত বড় ব্যক্তি হয়েও যখন এমন কথা বলেছেন, তাহলে সাধারন মানুষের বিষয়টি কেমন হতে পারে।

এই ইবনে ওহাব (রহ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি এক লক্ষ বিশ হাজার হাদীস সংকলন করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি অতিরিক্ত হাদীস চর্চা করার কারনে গোমরাহ হতে গিয়েছিলাম।

এখন প্রশ্ন হল, আমরা হাদীসের উপর কিভাবে আমল করব?

⬅ এর উত্তর হল হাদীস সমূহের মধ্য থেকে যেগুলো উম্মতের জন্য অনুসরনীয় আমরা সেগুলোর উপর আমল করব। আর সেটাকেই সুন্নাত বলে।

হাদীসের বিশল ভান্ডার থেকে সুন্নাত বের করা এটা ফুকাহাদের দায়িত্ব। এটা সাধারন মানুষের জন্য সম্ভব নয়।

⬅ কেন?

⬅ হাদীসের অর্থ ফুকাহয়ে কেরাম গভীরভাবে বুঝতে পারেন।

ইমাম তিরমিজী (রহ) তিরমিজী শরীফে মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার পদ্ধতি বর্ননা করে বলেন-

و كذلك قال الفقهاء و هم اعلم بمعاني الحديث.

অর্থাৎঃ ফুকাহায়ে কেরাম এমনই বলেছেন। আর হাদীসের অর্থ সম্পর্কে তারাই বেশি জানেন।

ইমাম আবু হানিফা তাবেয়ী (রহ) এঁর উস্তাদ হযরত আ‘মাশ (রহ) যিনি অনেক বড় মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি একদা হযরত আবু হানিফা (রহ) কে একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলেন। ঈমাম আবু হানিফা (রহ) মাসআলাটির জবাব দিয়ে দেন। অতপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথা থেকে জবাবটি দিলে? ইমাম সাহেব বললেন, আপনি আমাকে অমুক অমুক থেকে যে হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন সেগুলো থেকে আমি উত্তর দিয়েছি। অতপর আ‘মাশ (রহ) বলেন-

يا معشر الفقهاء! انتم الاطباء و نحن الصيادلة.

অর্থঃ হে ফকীহদের দল, তোমরাই হলে ডাক্তার আর আমরা হলাম ফার্মাসিষ্ট।

অর্থাৎ ফার্মাসিষ্ট (Pharmacist) যেমন তার কাছে অনেক ঔষধ থাকা সত্তেও সে জানে না কোন রোগের জন্য কোন ঔষধ (Medicine)। অনুরূপভাবে মুহাদ্দিসীনে কেরামও তাদের নিকট অনেক হাদীস থাকা সত্ত্বেও তারা তা থেকে মাসআলা বের করতে পারেন না।

– এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হল, হযরত আ‘মাশ (রহ) এত বড় মুহাদ্দিস হওয়া সত্ত্বেও তিনি মওজুদ হাদীস (Collected Hadiths) থেকে মাসআলা ইস্তেমবাত (Extract) করতে পরেননি। তাহলে একজন সাধারন ইংরেজি শিক্ষিত লোকের পক্ষে কিভাবে সম্ভব হতে পারে?

⬅ তাহলে দেখা গেল, “সকল সুন্নাতই হাদীস, কিন্তু সব হাদীস সুন্নাত নয়।”

আর আমাদেরকে হাদীস সমুহের মধ্য থেকে শুধু সুন্নাতের অনুসরন করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসসমূহে লক্ষ্য করলে দেখা যায় তিনি কোন হাদীসে এটা বলেননি যে, তোমরা আমার হাদীসের অনুসরন করবে।

⬅ [বরং] যেখানেই অনুসরনের কথা বলা হয়েছে সেখানে সুন্নাতে অনুসরনের কথা বলা হয়েছে।
🌺📓 নিম্নে নমুনা স্বরূপ কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল-

(1) 

عَنْ عِرْبَاضِ بْنِ سَارِيَةَ قَالَ صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْفَجْرَ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا فَوَعَظَنَا مَوْعِظَةً بَلِيغَةً ذَرَفَتْ لَهَا الْأَعْيُنُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ قُلْنَا أَوْ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ كَأَنَّ هَذِهِ مَوْعِظَةُ مُوَدِّعٍ فَأَوْصِنَا قَالَ أُوصِيكُمْ بِتَقْوَى اللَّهِ وَالسَّمْعِ وَالطَّاعَةِ وَإِنْ كَانَ عَبْدًا حَبَشِيًّا فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ يَرَى بَعْدِي اخْتِلَافًا كَثِيرًا فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ.

অর্থাৎঃ হযরত ইরবাজ (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,………………রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোদেরকে আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে এবং (আমীরের কথা) শুনতে ও মানতে উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে একজন হাবশী গোলাম হয়। তোমাদের মধ্য থেকে আমার পরে যে বেচে থাকবে সে অচিরেই বিভিন্ন মতবিরোধ দেখতে পাবে। তাই তোমরা আমার সুন্নাত ও হিদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের সুন্নাত ধর। তা মজবূতভাবে আঁকড়ে ধর। এবং তোমরা (দ্বীনের মধ্যে) নতুন জিনিস থেকে বেঁচে থাক। (দ্বীনের মধ্যে) প্রতিটি নতুন জিনিসই বেদআত। আর প্রতিটি বেদআতই ভ্রষ্টতা।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুসনাদে আহমাদ হাদীস নং ১৭১৪৭।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, তোমরা আমার হাদীস ও হিদায়েতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদিনের হাদীস ধর।✘
(2) 

قال أنس بن مالك قال لي رسول الله صلى الله عليه و سلم يا بني إن قدرت أن تصبح وتمسي وليس في قلبك غش لأحد فافعل ثم قال لي يا بني وذلك من سنتي ومن أحيا سنتي فقد أحبني ومن أحبني كان معي في الجنة.

অর্থাৎঃ হযরত আনাস বিন মালেক (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, যে, হে প্রিয় বৎস! যদি তুমি এভাবে সকাল ও সন্ধ্যা করতে পার যে, তোমার অন্তরে কারো জন্য কোন হিংসা নেই, তাহলে তা কর। অতপর তিনি আমাকে বললেন হে প্রিয় বৎস! তা আমার সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। আর যে আমার সুন্নাতকে মহব্বত করল সে আমাকে মহব্বত করল। আর যে আমাকে মহব্বত করল সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে।

[গ্রন্থ সূত্রঃ তিরমিজী শরীফ হাদীস নং ২৬৮৩।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে,  যে আমার হাদীসকে মহব্বত করল সে আমাকে মহব্বত করল……।✘
(3) 

عَنْ مَالِك أَنَّهُ بَلَغَهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ.

অর্থাৎঃ হযরত মালেক (রহ) থেকে বর্ণিত,তার নিকট পৌছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদের মধ্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি। তোমরা যতক্ষন পর্যন্ত তা ধরে রাখবে পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহ তাআলার কিতাব ও তার নবীর সুন্নাত।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুআত্তা মালেক হাদীস নং ৬৮৫।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি যে, তিনি “নবীর হাদীস” রেখে যাচ্ছেন। বরং বলেছেন “নবীর সুন্নাত”।✘
(4) 

عن أبي سعيد الخدري قال Y قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من أكل طيبا وعمل في سنة وأمن الناس بوائقه دخل الجنة .

অর্থাৎঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি হালাল খাবে এবং সুন্নাতের উপর আমল করবে আর মানুষ যার ক্ষতি থেকে নিরাপদে থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।

[গ্রন্থ সূত্রঃ তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ২৫২০।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, হাদীসের উপর আমল করবে; বরং তিনি বলেছেন সুন্নাতের উপর আমল করবে।✘
(5) 

قَالَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَحْدَثَ قَوْمٌ بِدْعَةً إِلَّا رُفِعَ مِثْلُهَا مِنْ السُّنَّةِ فَتَمَسُّكٌ بِسُنَّةٍ خَيْرٌ مِنْ إِحْدَاثِ بِدْعَةٍ.

অর্থাৎঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখনই কোন জাতি কোন বিদআত চালু করে তখন তাদের থেকে সমপরিমান সুন্নাত উঠিয়ে নেওয়া হয়। তাই একটি সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা একটি বেদআত চালু করা থেকে (অনেক) উত্তম।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ১৬৯৭০।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, সমপরিমাণ হাদীস উঠিয়ে নেয়া হয়; বরং তিনি বলেছেন সুন্নাত উঠিয়ে নেয়া হয়।

আবার তিনি এটিও বলেন নি, যে,  একটি হাদীসকে আঁকড়ে ধরা একটি বেদআত চালু করা থেকে (অনেক) উত্তম।✘
(6)

قَالَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ من أحيا سنة من سنتي قد أميتت بعدي فإن له من الأجر مثل من عمل بها من غير أن ينقص من أجورهم شيئا.

অর্থাৎঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতসমূহের মধ্য থেকে এমন সুন্নাতকে জিন্দ করবে যা আমার পরবর্তীতে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে উক্ত সুন্নাতের উপর যাহারা আমল করিবে তাদের সকলের সমপরিমান ছাওয়াব পাবে। অথচ আমল কারীদের ছাওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।

[গ্রন্থ সূত্রঃ তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ২৬৭৭।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, যে ব্যক্তি আমার হাদীস সমূহের মধ্য থেকে এমন হাদীসকে জিন্দ করবে যা আমার পরবর্তীতে মিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল….।✘
(7) 

عَنْ أَنَسٍ أَنَّ نَفَرًا مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- سَأَلُوا أَزْوَاجَ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- عَنْ عَمَلِهِ فِى السِّرِّ فَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ أَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ. وَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ آكُلُ اللَّحْمَ. وَقَالَ بَعْضُهُمْ لاَ أَنَامُ عَلَى فِرَاشٍ. فَحَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ. فَقَالَ « مَا بَالُ أَقْوَامٍ قَالُوا كَذَا وَكَذَا لَكِنِّى أُصَلِّى وَأَنَامُ وَأَصُومُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِى فَلَيْسَ مِنِّى.

অর্থাৎঃ হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর একদল সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এঁর বিবিদেরকে তাঁর গোপনে আমলের ব্যপারে জিজ্ঞাসা করলেন। অতপর কেউ বললেন, আমি মহিলাদেরকে বিবাহ্ করব না। কেউ বললেন আমি আর গোশত খাব না। কেউ বললেন আমি আর বিছানায় ঘুমাব না। অতপর তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন এবং ছানা পাঠ করলেন। আর বললেন মানুষের কি হল তারা এমন এমন বলে। অথচ আমি নামাজ পড়ি এবং ঘুমাই। রোযা রাখি এবং ছেড়ে দেই। আর আমি মহিলাদেরকে বিবাহ্ করি। যে আমার সুন্নাত থেকে বিমূখ হবে সে আমার দলভূক্ত নয়।

[গ্রন্থ সূত্রঃ মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৩৪৬৯।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে, যে আমার হাদীস থেকে বিমূখ হবে…..।✘
(8) 

عن عبد الله بن عمرو قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم إن لكل عمل شرة وإن لكل شرة فترة فمن كانت شرته إلى سنتي فقد أفلح ومن كانت شرته إلى غيرذلك فقد أهلك.

অর্থাৎঃ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতিটি আমলের একটি উত্থান আছে। আর প্রতিটি উত্থানের বিরতি আছে। সুতরাং যার উত্থান আমার সুন্নাতের দিকে হবে সে সফলকাম। আর যার উত্থান আমার সুন্নাত ব্যতীত অন্য দিকে হবে সে ধবংস হবে।

[গ্রন্থ সূত্রঃ সহীহ ইবনে হিব্বান,হাদীস নং ১১।]

■ লক্ষ্য করুন, তিনি বলেন নি, যে,  যার উত্থান (আমল) আমার হাদীস ব্যতীত অন্য দিকে হবে সে ধবংস হবে।✘

উপরে নমুনা সরূপ কিছু হাদীস উল্লেখ করা হল মাত্র। প্রতিটি হাদীসে সুন্নাতের অনুসরনের কথা বলা হয়েছে। কোথাও হাদীসের অনুসরনের কথা বলা হয়নি। 

[এজন্যই] 🌴🌴🌴 হকের উপর প্রতিষ্ঠিত জামাআতকে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামআহ বলে। আহলুল হাদীস নয়।

আহলুল হাদীস পরিচয়দান একটি গলদ ব্যবহার। 🌴🌴🌴
✨ মোটকথা আমরা সর্বপ্রকার হাদীসের উপর আমলের জন্য আদিষ্ট নই।

[বরং] হাদীসের মধ্য থেকে যা আমাদের জন্য অনুসরনীয় (আর সেটাকেই সুন্নাত বলে) আমরা তার উপরে আমল করার জন্য আদিষ্ট।

আর হাদীস থেকে সুন্নাত বের করা তার দায়িত্ব নয় যে কুরআন পর্যন্ত ছহীহ করে পড়তে পারে না, হাদীসতো অনেক দুরের কথা। বরং তা এমন বিজ্ঞ আলেমের দায়িত্ব যিনি কুরআন ও হাদীসে গভীর পান্ডিত্য রাখেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দ্বীনের সহীহ্ (বাস্তবসম্মত) বুঝ দান করুন। আমিন

Advertisements

লা-মাযহাবীদের শায়েখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এর মৃত্যুঃ শিরক বেদ’আতের আড্ডা

Standard

নুরোধঃ
শেয়ার করবেন পোস্টটি।
____________________________________________________________
হাফিয ইবনু কাসীর (ইবনু তাইমিয়্যাহ এর ছাত্র) ঘটনা উল্লেখ করে বলেন,
ইবনু তাইমিয়্যাহ দিমাশকে ইন্তেকাল করেন। গোসল দেয়ার পূর্বে একদল লোক মৃতদেহের পাশে বসলেন এবং কোর’আন তেলাওয়াত করলেন। (উল্লেখ্য, লা-মাযহাবীরা মৃত ব্যক্তির পাশে কোর’আন তেলাওয়াতকে বেদ’আত বলে থাকে) এবং তারা মৃতদেহ দর্শন করে এবং মৃতদেহ চুম্বন করে বরকত হাসিল করলেন। অতঃপর তারা সেখান থেকে চলে গেলেন। এরপর একদল মহিলা এসে উপস্থিত হলেন। তারাও একইভাবে কোর’আন তেলাওয়াত, দর্শন, এবং চুম্বন করে বরকত হাসিল করলেন এবং চলে গেলেন। (উল্লেখ্য, এগুলো লামাযহাবীদের নিকট চরম বেদ’আত)
অনেক আলোচনা। আগ্রহী ব্যক্তি আরবী এবারত পড়ে নেবেন।
অতঃপর যখন তাঁর জানাযা শেষ হলো, তখন তাঁকে (মাকবারাতুস সুফিয়্যাহ) সুফীদের কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হলো এবং তাঁর ভাই শরফুদ্দীন আব্দুল্লাহ এর পাশে দাফন করা হলো।
(উল্লেখ্য, লা-মাযহাবীরা সুফীদেরকে মুশরিক বলে থাকে। তারমানে তাদের কথা মত, তাদের শায়েখুল ইসলামকে মুশরিকদের কবরস্থানে দাফন করা হলো। শায়খুল ইসলামের শেষ ঠিকানা হলো মুশরিকদের কবরস্থানে!)
ইবনু কাসীর বলছেন,
ইবনু তাইমিয়্যাহ এর ইন্তেকাল উপলক্ষে ১৫ হাজার মহিলা এবং প্রায় ২লক্ষ পুরুষ উপস্থিত হয়েছিল। মহিলারা অনেক কান্নাকাটি ও করেছিল।
এরপর ইবনু কাসীর বলেন,
ইবনু তাইমিয়্যাহকে গোসল দেয়ার পর যে পানি অবশিষ্ট ছিল, একদল লোক তা পান করলো। আরেকদল লোক বরই পাতাগুলো ভাগাভাগি করে নিয়ে গেল যা গোসলের পর অবশিষ্ট রয়েছিল। (অবশ্যই এ কাজ গুলো করা হয়েছিল বরকত হাসিলের নিয়ত করে। আর লা-মাযহাবীরা বলে এটা বেদ’আত, হারাম)
এরপর ইবনু কাসীর বলছেন,
ইবনু তাইমিয়্যাহর মাথায় উকুন ছিল বিধায় তিনি গলায় তাগা ব্যবহার করতেন।
(খাইছে, লা-মাযহাবীরা বলে থাকে, তাবিজ, তাগা ঝুলানো স্পষ্ট শিরক। তারমানে তাদের শায়খুল ইসলাম উকুনের ভয়ে ঐ শিরক কাজ তাঁর জীবনে করলেন! উকুনের যদি এতই ভয়, তো আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন, তাগা ঝুলাবেন কেন, তাই না?)
ইবনু কাসীর বলছেন, ঐ তাগাকে ১৫০ দিরহামে বিক্রয় করা হলো। আর তাঁর মাথায় ব্যবহৃত টুপিটি ৫০০ দিরহামে বিক্রয় করা হলো।
(অবশ্যই যারা কিনেছিলেন, তারা বরকত হাসিলের জন্য এত দাম দিয়ে এগুলো কিনেছিলেন, তাই নয় কি?)
এরপর ইবনু কাসীর বলছেন,
ইবনু তাইমিয়্যাহ এর ইনতেকাল উপলক্ষে অনেক খতম আদায় করা হলো। আর অনেকদিন পর্যন্ত ইবনু তাইমিয়্যাহ এর কবরের পাশে লোকজন দিন রাত (২৪ ঘন্টা) অবস্থান করেছিল। তারা সেখানে ঘুমাতো এবং ভোর করতো।
( হায় আল্লাহ, এ তো দেখি, রীতিমত উরস আর কবরপূজা। তারমানে, অনেকদিন পর্যন্ত ইবনু তাইমিয়্যাহ এর কবরের পূজা অর্চনা করা হলো, তাও আবার দিন রাত একই সমান্তরাল গতিতে! লাগাও এবার ফতোয়া।)
_____________________________________
এ হলো তোমাদের শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এর ঘটনা, লিখেছেন তারই ছাত্র হাফিয ইবনু কাসীর তাঁর আল বিদায়াহ ওয়ান নেহায়াহ নামক কিতাবে।
ব্যাটারা,
তোমরা তো মুখে শিরক আর বেদ’আতের ফতোয়া দিয়ে থাক, এবার কী বলবে? তাই বলি, ধর্ম নিয়ে ব্যাবসা ছাড় আর চুপ থাক, নইলে তোমাদের আরো যা কিছু কুকীর্তি আছে, সব একে একে প্রকাশ করা হবে।

image

image

image

image

আল্লাহ কি আরশে না সবখানে

Standard

আল্লাহ কোথায়? শুধু কি আরশে, নাকি সবখানে?
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ إن الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا.
من يهده الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أن محمدا عبده ورسوله
এ বিষয় নিয়ে লেখার কোন ইচ্ছেই আমার ছিলো না। বাধ্য হয়ে লিখতে হচ্ছে। আল্লাহ তা’আলা ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। এটি খুবই সূক্ষ বিষয়। এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে পূর্ববর্তী মনীষীগণ নিষেধ করেছেন। বলা যায় এটি একটি বিদ’আতি আলোচনা। এ বিষয়ে কথা বলা বিদ’আত। এমনটিই আমরা পূর্ববর্তী মুহাক্কিক আলেমগণ থেকে দেখতে পাই। হযরত ইমাম মালিক রহঃ বলেন—
ﺍﻻﺳﺘﻮﺍﺀ ﻣﻌﻠﻮﻡ ﻭﺍﻟﻜﻴﻔﻴﺔ ﻣﺠﻬﻮﻟﺔ، ﻭﺍﻟﺴﺆﺍﻝ ﻋﻨﻪ ﺑﺪﻋﺔ، ﻭﺍﻻﻳﻤﺎﻥ ﺑﻪ ﻭﺍﺟﺐ ،
অর্থাৎ- “আল্লাহ তা’আলার আরশে ইস্তিওয়া এর বিষয়টি জানা যায়, কিন্তু অবস্থা অজানা। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদ’আত। আর এ বিষয়ে ঈমান রাখা ওয়াজিব”।
এজন্য এ বিষয়ে অযথা কথনে লিপ্ত হওয়া কিছুতেই কাম্য নয়। আমিও এ বিষয়ে কোন কথা বলতে চাচ্ছিলাম না। যেহেতু এটি খুবই সঙ্গীন একটি বিষয়। আর আল্লাহ তা’আলা আছেন, তিনি সব কিছু দেখছেন, তিনি আমাদের উপর ক্ষমতাশীল এসব আমাদের মূল ঈমানের বিষয়। তিনি কোন অবস্থায় আছেন? এসব আমাদের ঈমানের মূল বিষয় নয়। তাই এটি নিয়ে অযথা কথোপকথনে লিপ্ত হওয়া কিছুতেই উচিত নয়। খুবই গর্হিত কাজ।
কিন্তু কুরআন শরীফের মুতাশাবিহ তথা অস্পষ্ট আয়াত নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা এসবকে মূল প্রাতিপাদ্য বিষয় বানানো এক শ্রেণীর ফিতনাবাজদের মূল মিশন তা আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনেই জানিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে—
ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏَ ﻣِﻨْﻪُ ﺁﻳَﺎﺕٌ ﻣُّﺤْﻜَﻤَﺎﺕٌ ﻫُﻦَّ ﺃُﻡُّ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏِ ﻭَﺃُﺧَﺮُ ﻣُﺘَﺸَﺎﺑِﻬَﺎﺕٌ ۖ ﻓَﺄَﻣَّﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻓِﻲ ﻗُﻠُﻮﺑِﻬِﻢْ ﺯَﻳْﻎٌ ﻓَﻴَﺘَّﺒِﻌُﻮﻥَ ﻣَﺎ ﺗَﺸَﺎﺑَﻪَ ﻣِﻨْﻪُ ﺍﺑْﺘِﻐَﺎﺀَ ﺍﻟْﻔِﺘْﻨَﺔِ ﻭَﺍﺑْﺘِﻐَﺎﺀَ ﺗَﺄْﻭِﻳﻠِﻪِ ۗ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﻌْﻠَﻢُ ﺗَﺄْﻭِﻳﻠَﻪُ ﺇِﻟَّﺎ ﺍﻟﻠَّﻪُ ۗ ﻭَﺍﻟﺮَّﺍﺳِﺨُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻌِﻠْﻢِ ﻳَﻘُﻮﻟُﻮﻥَ ﺁﻣَﻨَّﺎ ﺑِﻪِ ﻛُﻞٌّ ﻣِّﻦْ ﻋِﻨﺪِ ﺭَﺑِّﻨَﺎ ۗ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﺬَّﻛَّﺮُ ﺇِﻟَّﺎ ﺃُﻭﻟُﻮ ﺍﻟْﺄَﻟْﺒَﺎﺏِ [ ٣ : ٧ ]
অর্থাৎ- তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট,সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে,তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেনঃ আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এ সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। {সূরা আলে ইমরান-৭}
‡‡ আল্লাহ তা’আলা কোথায় আছেন? এটি কুরআনের একটি মুতাশাবিহাত তথা রূপক শব্দের অন্তর্ভূক্ত। তাই আমাদের পূর্ববর্তী মুহাক্কিকগণ এটির ব্যাপারে অতি গবেষণা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। কিন্তু যাদের মনে কূটিলতা আছে তারা ফিতনা বিস্তারের জন্য এসবকেই প্রচারণার মূল টার্গেট বানিয়ে কাজ করে যায়। সেই কূটিল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত প্রচলিত বিদ’আতি ফিরকা কথিত আহলে হাদীস। যাদের কাজই হল মুতাশাবিহ এবং মতভেদপূর্ণ বিষয়কে মানুষের সামনে তুলে ধরে ফিতনা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা।
যেহেতু এ বিষয়ে ফেইজবুকে লিখালিখি হচ্ছে তাই অনেকে আমার কাছে অনুরুধ করেছেন আহলে সুন্নাতের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য। তাই বাধ্য হয়ে এ বিষয়ে কলম ধরলাম। আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল। আমাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিয়ে তাঁর প্রিয়ভাজন হবার পথে অগ্রসর হবার তৌফিক দান করুন। আমীন!
আমরা বিশ্বাস করি-আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু কথিত আহলে হাদীস সম্প্রদায় প্রচার করে থাকে, আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান নয়। তারা দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে সূরা হাদীদের ৩ নং আয়াত। যেখানে ঘোষিত হয়েছে আল্লাহ তায়ালা আরশে সমাসীন।
ওরা কিছু আয়াত দিয়ে আরো অসংখ্য আয়াতকে অস্বীকার করে নাউজুবিল্লাহ! যে সকল আয়াত দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহ তায়ালা আরশসহ সর্বত্র বিরাজমান। কিছু আয়াতকে মানতে গিয়ে আরো ১০/ ১২টি আয়াত অস্বীকার করার মত দুঃসাহস আসলে কথিত আহলে হাদীস নামী ফিতনাবাজ বাতিল ফিরক্বাদেরই মানায়। অসংখ্য আয়াতে কারীমাকে অস্বীকার করে আল্লাহ তা’আলাকে কেবল আরশে সীমাবদ্ধ করার মত দুঃসাহস ওরা দেখাতে পারলেও আমরা পারি না।
আমরা বিশ্বাস করি-আল্লাহ তা’আলার কুরসী আসমান জমিন সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। তিনি স্থান কাল থেকে পবিত্র। আল্লাহর গোটা রাজত্বের সর্বত্র তিনি রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আরশে রয়েছেন একথা আমরা অস্বীকার করি না। তিনি আরশে রয়েছেন। তিনি এছাড়াও সর্বত্র রয়েছেন। তাহলে আমরা সকল আয়াতকেই মানি।
আর ওরা শুধু আরশ সংশ্লিষ্ট কিছু আয়াত মানে, বাকিগুলোকে অস্বিকার করে। কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকা দেহধারী সত্তার বৈশিষ্ট। আল্লাহ তা’আলার মত নিরাকার সত্তার জন্য এটা শোভা পায় না। এই আহলে হাদীস বাতিল ফিরকাটি এতটাই বেয়াদব যে, আল্লাহ তা’আলার দেহ আছে বলে বিশ্বাস করে।
দেহ থাকাতো সৃষ্টির বৈশিষ্ট। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সকল সৃষ্টির স্রষ্টার জন্য দেহ সাব্যস্ত করা এক প্রকার সুষ্পষ্ট শিরক। এই শিরকী আক্বিদা প্রচার করছে ইংরেজ সৃষ্ট কথিত আহলে হাদীস সম্প্রদায়। আল্লাহ তা’আলা আমাদের এই ভয়াবহ মারাত্মক বাতিল ফিরকার হাত থেকে আমাদের দেশের সরলমনা মুসলমানদের হিফাযত করুন।
বক্ষমান প্রবন্ধে আল্লাহ তা’আলা সর্বত্র বিরাজমান নিয়ে একটি দলীল ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করা হল। পরবর্তী প্রবন্ধে আল্লাহ তা’আলা যে দেহ থেকে পবিত্র, আল্লাহ তা’আলার দেহ সাব্যস্ত করা সুষ্পষ্ট শিরকী, এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা প্রকাশ করা হবে ইনশাআল্লাহ!
১- ﺛُﻢَّ ﺍﺳْﺘَﻮَﻯ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻌَﺮْﺵِ অতঃপর তিনি আরশের উপর ক্ষমতাশীল হোন। {সূরা হাদীদ-৩}
২- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺳَﺄَﻟَﻚَ ﻋِﺒَﺎﺩِﻱ ﻋَﻨِّﻲ ﻓَﺈِﻧِّﻲ ﻗَﺮِﻳﺐٌ ﺃُﺟِﻴﺐُ ﺩَﻋْﻮَﺓَ ﺍﻟﺪَّﺍﻉِ ﺇِﺫَﺍ ﺩَﻋَﺎﻥِ } Page: 11 আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। {সূরা বাকারা-১৮৬}
৩- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﻧَﺤﻦُ ﺃَﻗﺮَﺏُ ﺇِﻟَﻴﻪِ ﻣِﻦ ﺣَﺒﻞِ ﺍﻟﻮَﺭِﻳﺪِ { [ ﻕ 16 ] আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী। {সূরা কাফ-১৬}
৪- ﻓَﻠَﻮْﻻ ﺇِﺫَﺍ ﺑَﻠَﻐَﺖِ ﺍﻟْﺤُﻠْﻘُﻮﻡَ ( 83 ) ﻭَﺃَﻧْﺘُﻢْ ﺣِﻴﻨَﺌِﺬٍ ﺗَﻨْﻈُﺮُﻭﻥَ ( 84 ) ﻭَﻧَﺤْﻦُ ﺃَﻗْﺮَﺏُ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦْ ﻻ ﺗُﺒْﺼِﺮُﻭﻥَ ( 85 ) অতঃপর এমন কেন হয়না যে, যখন প্রাণ উষ্ঠাগত হয়। এবং তোমরা তাকিয়ে থাক। এবং তোমাদের চেয়ে আমিই তার বেশি কাছে থাকি। কিন্তু তোমরা দেখতে পাওনা {সূরা ওয়াকিয়া-৮৩,৮৪,৮৫}
৫- { ﻭَﻟﻠَّﻪِ ﺍﻟْﻤَﺸْﺮِﻕُ ﻭَﺍﻟْﻤَﻐْﺮِﺏُ ﻓَﺄَﻳْﻨَﻤَﺎ ﺗُﻮَﻟُّﻮﺍْ ﻓَﺜَﻢَّ ﻭَﺟْﻪُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺍﺳِﻊٌ ﻋَﻠِﻴﻢٌ { [ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ 115 – ] পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও,সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত {সূরা বাকারা-১১৫}
৬- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﻫُﻮَ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺃَﻳْﻨَﻤَﺎ ﻛُﻨﺘُﻢْ { [ ﺍﻟﺤﺪﻳﺪ – 4 ] তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন {সূরা হাদীদ-৪}
৭- ﻭﻗﺎﻝ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻋﻦ ﻧﺒﻴﻪ : ( ﺇِﺫْ ﻳَﻘُﻮﻝُ ﻟِﺼَﺎﺣِﺒِﻪِ ﻻ ﺗَﺤْﺰَﻥْ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻣَﻌَﻨَﺎ ( ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ ﻣﻦ ﺍﻵﻳﺔ 40 যখন তিনি তার সাথীকে বললেন- ভয় পেয়োনা, নিশ্চয় আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন {সূরা হাদীদ-৪০}
৮- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻣَﺎ ﻳَﻜُﻮﻥُ ﻣِﻦ ﻧَّﺠْﻮَﻯ ﺛَﻼﺛَﺔٍ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺭَﺍﺑِﻌُﻬُﻢْ ﻭَﻻ ﺧَﻤْﺴَﺔٍ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺳَﺎﺩِﺳُﻬُﻢْ ﻭَﻻ ﺃَﺩْﻧَﻰ ﻣِﻦ ﺫَﻟِﻚَ ﻭَﻻ ﺃَﻛْﺜَﺮَ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﻣَﻌَﻬُﻢْ ﺃَﻳْﻦَ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﺛُﻢَّ ﻳُﻨَﺒِّﺌُﻬُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﻋَﻤِﻠُﻮﺍ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﺑِﻜُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋَﻠِﻴﻢٌ ( ﺍﻟﻤﺠﺎﺩﻟﺔ – 7 কখনো তিন জনের মাঝে এমন কোন কথা হয়না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন, এবং কখনও পাঁচ জনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন। এমনিভাবে তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি, তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে অবহিত করবেন তারা যা কিছু করত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন {সূরা মুজাদালা-৭}
৯- ﻭَﺳِﻊَ ﻛُﺮْﺳِﻴُّﻪُ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽَ আল্লাহ তায়ালার কুরসী আসমান জমিন ব্যাপৃত {সূরা বাকারা-২৫৫}
‡‡ একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রথমে একটি বিষয় সুনির্দিষ্ট করে নিতে হবে। সেটা হল, আল্লাহ তা’আলার সর্বত্র বিরাজমানতার আয়াতগুলোকে ব্যাখ্যা সহ মানা হবে? না শুধু শাব্দিক অর্থের উপর রাখা হবে? দুই পদ্ধতির যে কোন একটি পদ্ধতি অবশ্যই অবলম্বন করতে হবে।
যদি ব্যাখ্যাসহ মানা হয়, তাহলে সকল আয়াতের ব্যাখ্যাই করতে হবে। এক আয়াতের ব্যাখ্যা আর অন্য আয়াতের শুধু শাব্দিক অর্থ নেয়া যাবে না। আর যদি শুধু শাব্দিক অর্থই গ্রহণ করা হয়, ব্যাখ্যা ছাড়া। তাহলে এ সম্পর্কীয় সকল আয়াতকেই তার শাব্দিক অর্থের উপর রাখতে হবে। কোনটারই ব্যাখ্যা করা যাবে না। সেই হিসেবে যদি ব্যাখ্যা নেয়া হয়, তাহলে সব আয়াতের ব্যাখ্যা নিতে হবে।
তাই আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী। {সূরা কাফ-১৬} তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন {সূরা হাদীদ-৪} ইত্যাদি আয়াতের ব্যাখ্যায় যেমন কথিত আহলে হাদীস ভাইয়েরা বলে থাকেন যে, এর মানে হল আল্লাহ তাআলা ইলম ও ক্ষমতা হিসিবে সবার সাথে আছেন। ঠিকই একই ব্যাখ্যা নিতে হবে অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন [কর্তৃত্বশীল হোন] {সূরা হাদীদ-৩} এ আয়াতের। অর্থাৎ তখন আমরা বলবো, এ আয়াতের ব্যাখ্যা হল আল্লাহ তাআলা ইলম ও ক্ষমতা হিসেবে আরশে সমাসীন।
আর যদি বলা হয়, না আয়াতের শাব্দিক অর্থ গৃহিত হবে। কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য হবে না। তাহলে অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন [কর্তৃত্বশীল হোন] {সূরা হাদীদ-৩} এ আয়াতের শাব্দিক অর্থ হিসেবে যেমন আমরা বলি আল্লাহ তা’আলা আরশে। ঠিক একইভাবে আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশী নিকটবর্তী। {সূরা কাফ-১৬} তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন {সূরা হাদীদ-৪} ইত্যাদি আয়াতের শাব্দিক অর্থ হিসেবে বলতে হবে যে, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। সর্বত্র আছেন। কোন ব্যখ্যা করা যাবে না।
যেমন সূরা হাদীদের ৩ নং আয়াতের কোন ব্যাখ্যা করা হচ্ছে না। আশা করি এ মূলনীতি অনুসরণ করলে আর কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। এক আয়াতের ব্যাখ্যা আরেক আয়াতের শাব্দিক অর্থ মনগড়াভাবে করলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
‡ আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান হলে আকাশের দিকে কেন হাত উঠিয়ে দুআ করা হয়? আদবের জন্য। যদিও আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার শান হল উঁচু, তাই আদব হিসেবে উপরের দিকে হাত উঠিয়ে দুআ করা হয়। যেমন কোন ক্লাশরুমে যদি লাউডস্পীকার ফিট করা হয়। চারিদিক থেকে সেই স্পীকার থেকে শিক্ষকের আওয়াজ আসে। তবুও যদি কোন ছাত্র শিক্ষকের দিকে মুখ না করে অন্যত্র মুখ করে কথা শুনে তাহলে শিক্ষক তাকে ধমক দিবেন। কারণ এটা আদবের খেলাফ। এই জন্য নয় যে, অন্য দিক থেকে আওয়াজ শুনা যায় না। তেমনি আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান থাকা সত্বেও উপরের দিকে মুখ করে দুআ করা হয় আল্লাহ তায়ালা উঁচু, সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই আদব হিসেবে উপরের দিকে হাত তুলে দুআ করা হয়।
‡ জিবরাঈল উপর থেকে নিচে নেমে আসেন মানে কি? এর মানে হল-যেমন পুলিশ এসে কোন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে কারণ বলে যে, উপরের নির্দেশ। এর মানে কি পুলিশ অফিসার উপরে থাকে? না সম্মান ও ক্ষমতার দিক থেকে যিনি উপরে তার নির্দেশ তাই বলা হয় উপরের নির্দেশ? তেমনি আল্লাহ তায়ালা ফরমান নিয়ে যখন জিব্রাঈল আসেন একে যদি বলা হয় উপর থেকে এসেছেন, এর মানেও সম্মানসূচক ও পরাক্রমশালীর কাছ থেকে এসেছেন। তাই বলা হয় উপর থেকে এসেছেন। এই জন্য নয় যে, আল্লাহ তায়ালা কেবল আরশেই থাকেন।
‡ আল্লাহ তায়ালা কি সকল নোংরা স্থানেও আছেন? নাউজুবিল্লাহ! এই উদ্ভট যুক্তি যারা দেয় সেই আহমকদের জিজ্ঞেস করুন। তার কলবে কি দু’একটি কুরাআনের আয়াত কি সংরক্ষিত আছে? যদি বলে আছে। তাহলে বলুন তার মানে সীনায় কুরআনে কারীম বিদ্যমান আছে। কারণ সংরক্ষিত সেই বস্তুই থাকে, যেটা বিদ্যমান থাকে, অবিদ্যমান বস্তু সংরক্ষণ সম্ভব নয়। তো সীনায় যদি কুরআন বিদ্যমান থাকে, সেটা নিয়ে টয়লেটে যাওয়া কিভাবে জায়েজ? কুরআন নিয়েতো টয়লেটে যাওয়া জায়েজ নয়। তখন ওদের আকল থাকলে বলবে-কুরআন বিদ্যমান, কিন্তু দেহ থেকে পবিত্র কুরআন। তেমনি আমরা বলি আল্লাহ তা’আলা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু তিনি দেহ থেকে পবিত্র। সেই হিসেবে সর্বত্র বিরাজমান। সুতরাং কুরআন যেমন সীনায় থাকায় সত্বেও টয়লেটে যেতে কোন সমস্যা নেই। কুরআনে কারীমের বেইজ্জতী হয়না, সীনায় সংরক্ষিত কুরআনের দেহ না থাকার কারণে, তেমনি আল্লাহ তায়ালার দেহ না থাকার কারণে অপবিত্র স্থানে বিদ্যমান থাকাটাও কোন বেইজ্জতীর বিষয় নয়।
‡ স্ববিরোধী বক্তব্য , কথিত আহলে নামধারী আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান নামক একজন একটি প্রবন্ধ লিখেছেন “আল্লাহ তাআলা কোথায় আছেন” নামে। উক্ত প্রবন্ধটির শুরুতে লেখক বলেন—
“কোরআন ও সহিহ হাদীছে আল্লাহ তা’আলার যে সমস্ত সিফাতের কথা বলা হয়েছে তার উপর ঈমান আনা ওয়াজিব। তাঁর সিফাতসমূহের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা, অথবা তার কিছু সিফাতকে যেভাবে আছে সেভাবেই স্বীকার করা আর কিছুকে পরিবর্তন করে বিশ্বাস করা কিছুতেই জায়েয হবে না”।
তিনি দাবি করছেন, কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কোন সিফাত যেভাবে বর্ণিত হুবহু সে অবস্থায়ই বিশ্বাস করতে হবে, পরিবর্তন করে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
কিন্তু আফসোস ও হাস্যকর বিষয় হল তিনি নিজেই প্রবন্ধের শেষ দিকে আল্লাহ তা’আলা সর্বত্র বিরাজমানতার স্পষ্ট প্রমাণবাহী আয়াতকে মূল অর্থ পাল্টে মনগড়া ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে বলেন—
“আল্লাহ তাআলার বাণী: ﻭَﻫُﻮَ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺃَﻳْﻦَ ﻣَﺎ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ( ﺍﻟﺤﺪﻳﺪ 4 ) তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। (সূরা হাদীদ, ৫৭: ৪ আয়াত)। অত্র আয়াতের ব্যখ্যা হল; নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা আমাদের সাথে আছেন দেখার দ্বারা, শ্রবনের দ্বারা, যা বর্ণিত আছে তফসীরে জালালাইন ও ইবনে কাসীরে। এই আয়াতের পূর্বের ও শেষের অংশ এ কথারই ব্যখ্যা প্রদান করে”।
বিজ্ঞ পাঠকগণ! লক্ষ্য করুন! আয়াতে স্পষ্ট বলা হচ্ছে যে, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সাথেই আছেন, যার স্পষ্ট অর্থ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র রয়েছেন। কিন্তু এ স্পষ্ট অর্থবোধক আয়াতকে ব্যাখ্যা ছাড়া হুবহু বিশ্বাস না করে পাল্টে তিনি ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান নন, বরং দেখা ও শ্রবণ শক্তি রয়েছে সর্বত্র। “দেখা ও শ্রবণ দ্বারা বিরাজমান” ব্যাখ্যা করার দ্বারা তিনি তার নিজের ফাতওয়া অনুযায়ীই না জায়েয কাজটি করেছেন। তাই নয় কি?
কারণ তিনিই তো আগে বললেন যে, আল্লাহর সিফাত সম্বলিত আয়াত বা হাদীছকে হুবহু বিশ্বাস করতে হবে, ব্যাখ্যা করা জায়েয নেই। অথচ তিনি নিজেই স্ববিরোধী হয়ে সূরা হাদীদের ৪ নং আয়াতকে “দেখা ও শ্রবণ দ্বারা বিরাজমান” শব্দে ব্যাখ্যা করে না জায়েয কাজ করলেন।
আল্লাহ তা’আলা শুধুই আসমানে আছেন বলাটা আল্লাহ তা’আলার বড়ত্বকে খাট করা। আমরা জানি, কোন বস্তু যখন অন্য বস্তুর উপর থাকে, তখন যে বস্তুর উপর বস্তুটি রাখা হয়, তা বড় থাকে, আর যা রাখা হয় তা হয় ছোট। যেমন-যদি বলা হয় যে, কলমটি টেবিলের উপর আছে, তখন বুঝতে হবে যে, টেবিলটি বড় আর কলমটি ছোট, কারণ, কলম বড় হলে কলমটি টেবিলের উপর থাকতে পারে না। এটাই মুহিত ও মুহাতের পার্থক্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুহীত তথা সর্ব কিছুকে পরিবেষ্টনকারী। তাকে পরিবেষ্টনকারী কিছু নেই।
যদি বলা হয় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শুধু আরশের উপর আছেন, তাহলে আরশ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে মুহীত করে ফেলছে, তথা পরিবেষ্টন করে ফেলছে, তথা আরশ হয়ে যাচ্ছে বড়, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হয়ে যাচ্ছেন ছোট নাউজুবিল্লাহ! যা কেবল নাস্তিকরাই বলতে পারে, কোন মুমিন মুসলমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে এভাবে খাট করতে পারে না। তাই সহীহ আক্বিদা হল-আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান। তিনি যেমন আরশে আছেন, তেমনি জমিন আসমান সর্বত্র বিরাজমান।
‡‡ কথিত আহলে হাদীসদের কাছে আমাদের প্রশ্ন-
১- আল্লাহ তাআলা আরশেই অবস্থান করলে আরশ সৃষ্টির আগে আল্লাহ তাআলা কোথায় ছিলেন?
২- কিয়ামতের সময় সব কিছু যখন ধ্বংস হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তাআলা কোথায় থাকবেন?
৩- আল্লাহ তা’আলা আরশেই অবস্থান করলে মুসা আঃ কে দেখা দেয়ার জন্য তূর পাহাড়ে কেন ডেকে নিলেন?
৪- বিভিন্ন সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, শেষ রাতে আল্লাহ তা’আলা প্রথম আসমানে এসে বান্দাদেরকে ইবাদত করার জন্য আহবান করে থাকেন, যেন বান্দা ইবাদত করে।
এখন প্রশ্ন হল, সারা পৃথিবীতে একই সময়ে শেষ রাত হয় না, এক দেশ থেকে আরেক দেশের সময়ের পার্থক্য রয়েছে। এক ঘন্টা থেকে নিয়ে বার তের ঘন্টা এমনকি বিশ বাইশ ঘন্টাও। তাহলে কি আল্লাহ তা’আলা বাংলাদেশের আসমানে শেষ রাতে একবার আসেন, তারপর তিন ঘন্টা পর আবার সৌদিতে যান, তারপর এভাবে একের পর এক দেশের প্রথম আসমান ঘুরতেই থাকেন? কুরআন ও সহীহ হাদীছের শব্দসহ উক্ত বিষয়ের সমাধান চাই।
‡ যে সকল ভাইয়েরা আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমানতাকে অস্বীকার করে আল্লাহ তা’আলাকে নির্দিষ্ট স্থানে সমাসীন বলে আল্লাহ তা’আলার সত্তার বেয়াদবী করছে ওদের অপপ্রচার থেকে, বাতিল আক্বিদা থেকে আমাদের আল্লাহ তায়ালা রক্ষা করুন। আমীন।
এসব অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের আলোচনা থেকে আমাদের বিরত থাকার মত পরিবেশ সৃষ্টি করে দিন। আমীন!

নারী ও পুরুষের নামাজের মধ্যে পার্থক্য স্বীকার করেন ইবনে তাইমিয়্যা

Standard

যারা নারী ও পুরুষের মধ্যে সালাতের পার্থক্য অস্বীকার করে, তাদের উদ্দেশ্যে এই ছোট্ট উপহার।
__________________________________________________
দেখুন, আপনাদের প্রধান শায়েখ, আপনাদের শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ নামাজে নারী ও পুরুষের মধ্যকার পার্থক্য স্বীকার করেছেন যা তিনি তার ‘আল মুহাররারু ফিল ফিকহ’ নামক কিতাবে প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেছেন,
নারী পুরুষের মতই সালাত আদায় করবে, কিন্তু রুকু এবং সাজদাতে (পুরুষের মত) অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে ফাঁকা রাখবেনা, এবং সে তারাব্বু অবস্থায় বসবে অথবা উভয় পা কে শরীরের ডান দিকে বের করে এনে ফাঁকা না রেখে উভয় পা কে মিলিয়ে বসবে। আর এটাই সালাতের পূর্ণতার বৈশিষ্ট্য।
(উল্লেখ্য, এভাবেই আমাদের মা ও বোনেরা নামাজ আদায় করে থাকেন যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আর এটাই বিশুদ্ধ)
আপনাদের শায়খুল ইসলামের এমন ফতোয়ার পর ‘নামাজের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই’ এমন কথা বলা বা প্রচার করা সমাজে বিভ্রান্তি ও ফেতনা সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়।
– এসব ফেতনাবাজি বন্ধ করুন আর নিজেদের শায়খুল ইসলামের ফতোয়া অনুসরন করুন। এটাই হবে উত্তম।

মাযহাব বিষয়ে সালাফীদের যুক্তি ও তার খন্ডন

Standard

লেখার এই অংশে আমরা সালাফীদের বিভিন্ন যুক্তি [১,২,৩] সম্পর্কে জানবো – কেন তাঁরা মনে করেন মাজহাব বাদ দিয়ে কুরআন আর সহীহ হাদিসের অনুসরণ করতে হবে? একই সাথে আমি সালাফীদের যুক্তিগুলোকে খন্ডন করারও চেষ্টা করব। যুক্তি-খন্ডন করতে যেয়ে আমি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মালিকি মাজহাবের উসুল (“Set of Principles”) কে উদাহরণ হিসাবে ব্যবহার করব। কারণ, যুক্তি-খন্ডনের কথাগুলো আমি মূলত: শেইখ হামযা ইউসুফের লেকচার [৪] থেকে নিয়েছি যিনি একজন মালিকি ইমাম।
সালাফী যুক্তি ১: সকল বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে আমাদের কুরআন ও সহীহ হাদিস মানতে হবে। কিন্তু, প্রচলিত মাজহাবগুলোতে আমরা এমন অনেক বিধান দেখি, যেগুলো সহীহ হাদিস বিরোধী। কাজেই মাজহাবের অনুসরণ করা যাবে না।
যুক্তি-খন্ডন: এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের সব ব্যাপারে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ মানতে হবে। কিন্তু এমন অনেক সুন্নাহ আছে, যা হাদিস আকারে লিপিবদ্ধ হয়নি কিন্তু মদীনার সাহাবাদের মধ্যে সেই সুন্নাহগুলোর প্রচলন ছিল। ইমাম মালিক এই ক্ষেত্রে সহীহ হাদিসের বিপরীতে সাহাবাদের আমলকে প্রাধান্য দিয়েছেন।  যেমন – শুক্রবারে নফল রোযা রাখা যাবে না, এটা সহীহ হাদিস। কিন্তু, ইমাম মালিক মদীনায় তাবেঈ’নদের মধ্যে শুক্রবারে নফল রোযা রাখার প্রচলন দেখেছেন। এই তাবেঈ’নরা সরাসরি সাহাবাদের থেকেই এই আমল শিখেছেন। ইমাম মালিকের মতে, হয়তো পরবর্তীতে “শুক্রবারে নফল রোজা রাখা যাবে না” হাদিসের বিপরীতে “শুক্রবারে নফল রোজা রাখা উচিত” এর হুকুম রাসূলুল্লাহ(সা) দিয়েছিলেন, ফলে আগের হুকুমটি বাতিল (Abrogate) হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ঐ হুকুমটি হাদিস আকারে আমাদের কাছে পৌঁছায়নি, পৌঁছেছে সাহাবাদের আমলের (Practise) মাধ্যমে।  কাজেই, মালিকি মাজহাব অনুসারে শুক্রবারে নফল রোযা রাখা সুন্নাত, যদিও এর বিপরীতে সহিহ হাদিস আছে [৪]! সুতরাং,  চতুর্থ পয়েন্টের  “কুরআন ও হাদিসকে সেভাবে বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবী ও সালাফরা বুঝেছিলেন” – মাজহাবীরা মনে করে এই মূলনীতি সালাফীরা যতটা অনুসরণ করে, তারা তার চেয়েও বেশী অনুসরন করে।
সালাফী যুক্তি ২: মাজহাবগুলো যখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন ইমাম বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) ও ইমাম মুসলিমের (মৃত্যু ২৬১ হিজরী) মতো সহীহ হাদিস গ্রন্থগুলো লেখা হয়নি। ফলে, মাজহাবের ইমামরা অনেক সহীহ হাদিস সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। অথবা, কোনো হাদিসকে উনারা হয়তো দুর্বল বলে বাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু ঐ হাদিসটি অন্য কোনো সনদে সহীহ ছিল, যা জানা গিয়েছিলো পরবর্তী সময়ে। এই কারণে মাজহাবগুলোতে এমন অনেক মতামত দেখা যায়, যা সহীহ হাদিস বিরোধী।
যুক্তি-খন্ডন: এই যুক্তিটা বিভিন্ন কারণে [৪] দুর্বল। যেমন –
প্রথমত:  হাদিস সংকলন শুরু হয়েছিলো রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর জীবিতকালেই। একথা সুপ্রসিদ্ধ যে, আবু হুরাইরা(রা), ইবনে আব্বাস(রা), আমর ইবনুল আস(রা) সহ প্রচুর সাহাবী লিখিত আকারে হাদিস সংরক্ষণ করেছিলেন [১৫]। এই সব কিতাবের হাদিসগুলি পরবর্তী যুগের হাদিসগ্রন্থগুলোর (যেমন – বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ইত্যাদি) মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। তাই, মদীনার সাহাবারা-তাবেঈনরা বুখারী-মুসলিমের হাদিসগুলো জানতেন না, এ কথা অমূলক।
দ্বিতীয়ত: বেশীরভাগ হাদিসের উৎস মূলত মদীনা শহর, আর ইমাম মালিক তাঁর সারাটা জীবন মদীনায় কাটিয়েছেন তাবেঈনদের কাছে পড়াশুনা করে। ইমাম মালিক সরাসরি ৬০০ তাবেঈনের কাছ থেকে হাদিস ও ফিকহ শিখেছেন, আর এই ৬০০ তাবেঈন শিখেছেন সরাসরি সাহাবীদের কাছ থেকে, মদীনায় তখন ১০ হাজার সাহাবী ছিল।  ইমাম মালিক হাদিস শিখেছেন ঐ যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হিশাম ইবনে ‘উরওয়া, ইবনে শিহাব আল-যুহরীর মতো বাঘা মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে যে আহকাম (হালাল-হারাম) সংক্রান্ত হাদিসের সংখ্যা কিন্তু খুব বেশী নয়। কাজেই, ইমাম মালিক কোনো বিষয়ের আহকাম সংক্রান্ত সহীহ হাদিসগুলো জানতেন না এই সম্ভাবনা খুবই কম।
তৃতীয়ত: যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেই যে ইমাম মালিক ১০%-১৫% সহীহ হাদিস জানতেন না, তবুও আপনি বলতে পারবেন না যে, মালিকি মাজহাব সহীহ হাদিস এর উপর আমল করে না। এর কারণ হলো, আমরা আগেই বলেছি “মাজহাব” বলতে বুঝায় “উসুল” বা Set of Principles, মাজহাব বলতে কোনো নির্দিষ্ট শারঈ’ বিধানকে বুঝায় না। ইমাম মালিকের মৃত্যুর পর থেকে যখনই নতুন কোনো হাদিস পাওয়া গেছে তখনই মালিকি মাজহাবের আলেমরা সেই নতুন হাদিসের আলোকে তাঁদের বিধানে পরিবর্তন এনেছেন, কিন্তু ইমাম মালিকের দেয়া “উসুল” অনুসরণ করেছেন। একই ব্যাপার অন্য মাজহাবগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যেমন – ইমাম আবু হানিফার ছাত্র শাইবানী (মৃত্যু ১৮৯ হিজরী) বহু ক্ষেত্রে নতুন হাদিসের আলোকে ইমাম আবু হানিফার মতের বিরোধী মতামত দিয়েছেন। কিন্তু, তারপরেও ইমাম শাইবানী হানাফী মাজহাবের অনুসারী, কারণ তিনি ইমাম আবু হানিফার “উসুল” অনুসরণ করেছেন। গত ১১০০ বছর ধরে বিভিন্ন মাজহাবের আলেমরা এভাবে করেই নতুন পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে তাঁদের মতামতে পরিবর্তন এনেছেন।
উল্লেখ্য যে, হানাফী মাজহাবের উসুল অনেক অংশেই নেয়া হয়েছে কুফার সাহাবাদের কাছ থেকে [২৮]। আলী(রা) তাঁর খিলাফত মদীনা থেকে কুফায় সরিয়ে নেয়ার পর, বহু সংখ্যক সাহাবী কুফায় চলে আসেন। আলী (রা) সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদকে কুফার কাজী নিযুক্ত করেন। আর কুফার সাহাবীদের উসুলই হানাফী মাজহাবের উসুল।
সালাফী যুক্তি ৩: মাজহাবগুলি তাদের ইমামের মতামত এর বিপরীতে সহীহ হাদিস পাওয়া যাওয়ার পরেও সহীহ হাদিসের অনুসরণ না করে তাদের ইমামের মতামতকে অনুসরণ করে। কিন্তু, সকল মাজহাবের ইমামই কি বলেননি “সহীহ হাদিসই আমার মাজহাব”?
উত্তর: প্রত্যেক ইমামই যথাসাধ্য সহীহ হাদিস অনুসরণ করেছেন এবং সেই মাজহাবের আলেমরাও সবসময় সহীহ হাদিসের ভিত্তিতেই বিধান দিয়েছেন। কিন্তু, আমাদের মনে রাখতে হবে যে সহীহ হাদিসকে সেভাবেই বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছিলেন (৪ নং পয়েন্ট)। এমন বহু সহীহ হাদিস আছে যেগুলো অন্য সহীহ হাদিস বা কুরআনের আয়াত দ্বারা অবলুপ্ত (Abrogate) হয়ে গেছে, আবার এমনও সহীহ হাদিস আছে যেগুলো ১০০% সত্য হওয়ার পরেও সাহাবারা সেগুলির উপর আমল করতেন না, কেন করতেন না সেটা আমাদের অনেক ক্ষেত্রে জানা আছে, অনেক ক্ষেত্রে জানা নেই।
আসুন মালিকি মাজহাব থেকে একটা উদাহরণ দেখা যাক। ইমাম মালিক তার মুওয়াত্তায় নামাজে দাড়িয়ে হাত বুকে রাখতে হবে এই সংক্রান্ত হাদিস বর্ণনা করেছেন। কিন্তু, ইমাম মালিকই তাঁর মাজহাবে হাত ছেড়ে নামাজ পড়তে বলেছেন। কেন? কারণ, ঐ যে – “হাদিস বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা তা বুঝেছিলেন”। ইমাম মালিক মদীনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ তাবেঈ’নদের হাত ছেড়ে নামাজ পড়তে দেখেছেন, তাবেঈনরা এটা দেখেছেন মদীনার সাহাবাদের কাছ থেকে। ইমাম মালিকের এই মতের পক্ষের হাদিসও কিন্তু বুখারী শরীফেই আছে [২৩,২৪,২৫]। বর্ণিত হাদিসটিতে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) একজন সাহাবীকে শিখিয়েছেন কিভাবে নামাজ পড়তে হবে, কিন্তু তিনি তাকে হাত বাঁধার কথা বলেননি।  মালিকি মাজহাবের মতে, রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কখনো কখনো হাত বেঁধে নামাজ পড়েছেন এটা দেখানোর জন্য যে, ইচ্ছা করলে এভাবেও নামাজ পড়া যায়। উল্লেখ্য, অনেকে বলে থাকে যে, ইমাম মালিক মৃত্যুর আগের শেষ কয়দিন “হাতে ব্যথা থাকার কারণে” হাত না বেঁধে নামাজ পড়তেন – এই কথার কোনও ভিত্তি নেই [৪]।
আবার অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয়েছে যে, অনেক সুন্নাহ/হাদিস আছে যা সালাফদের জানা ছিল, কিন্তু সেই সুন্নাহটি সহীহ হাদিস আকারে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে নাই। কারণ, ইমাম বুখারী (মৃত্যু ২৫৬ হিজরী) বা ইমাম মুসলিম (মৃত্যু ২৬১ হিজরী) যেহেতু মাজহাবের ইমামদের প্রায় ৫০/৬০ বছর পর হাদিস সংগ্রহ শুরু করেছেন, এমন হতেই পারে – যে হাদিসটি ইমাম মালিক বা ইমাম আবু হানিফার কাছে সহীহ ছিল, তা বুখারী-মুসলিমের যুগে আসতে আসতে যইফ (দুর্বল) হয়ে গেছে। কিন্তু, মাজহাবের ইমামরা সেই সুন্নাহ সম্পর্কে সহীহ সনদে অবগত ছিলেন এবং সেই অনুসারে তাদের মাস’আলা দিয়েছেন।
“হাদিসের এ সকল গ্রন্থ সংকলিত হওয়ার পূর্বে যে সব ইমাম অতিক্রান্ত হয়ে গেছেন তাঁরা পরবর্তীদের চেয়ে অনেক বেশী হাদিসের জ্ঞান রাখতেন। কারণ, তাঁদের নিকটে এমন বহু হাদিস ছিল যা আমাদের পর্যন্ত মাজহুল (অজ্ঞাত) বা মুনকাতি’ (বিচ্ছিন) সনদে পৌঁছেছে কিংবা আদৌ পৌঁছেনি”।  (রাফউল মালাম আনিল আয়িম্মাতিল আ’লাম – ইবনে তাইমিয়াহ – পৃষ্ঠা ১৮। [১৯]
সালাফী যুক্তি ৪: সাহাবাদের তো কোনো মাজহাব ছিল না, আপনারা মাজহাব পেলেন কোত্থেকে?
যুক্তি-খন্ডন: আমরা আগেই বলেছি কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে বিধান দেয়ার “উসুল” (Set of Principles) কেই মাজহাব বলে। সাহাবীরাও কিছু “উসুল” অনুসরণ করেই বিধান দিতেন। একথা সুবিদিত যে মদীনার সাহাবাদের “উসুল” (Set of Principles) , কুফার সাহাবাদের “উসুল” (Set of Principles)  থেকে আলাদা ছিল [৪,৭]।
আর আপনি যদি সাহাবাদের পদ্ধতিই অনুসরণ করতে চান তাহলে আমি বলব সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে ইমাম মালিকের মাজহাব অনুসরণ করা। কারণ, ইমাম মালিকের জীবদ্দশায় এই মাজহাবের নাম কিন্তু মালিকি মাজহাব ছিল না, এর নাম ছিল “মাদানী মাজহাব”, কারণ মদীনার সাহাবী ও তাবেঈনরা এই “উসুল” অনুসরণ করতেন। ইমাম মালিক শুধু সেই “উসুল” কে একটা সিস্টেম এর মধ্যে এনে লিপিবদ্ধ করে একে মাজহাব এর রূপ দিয়েছেন।
সালাফী যুক্তি ৫: সব মাজহাব যদি একই কুরআন আর সুন্নাহ এর অনুসরণ করে থাকে, তাহলে এদের বিধানগুলো এত আলাদা কেন?
যুক্তি-খন্ডন: একই কুরআন – সুন্নাহ অনুসরণ করার পরেও বিধান আলাদা হয় আলাদা “উসুল” [৪,৬,১৯] এর কারণে। “উসুল” এর এই পার্থক্যের কিছু উদাহরণ দেখুন –
ইমাম মালিক মুরসাল হাদিস (যে হাদিস সাহাবা নয় বরং তাবেঈ’ থেকে বর্ণিত হয়েছে) গ্রহণ করেছেন, আর ইমাম শাফেঈ’ শুধু নির্দিষ্ট কিছু তাবেঈ’র মুরসাল হাদিস নিয়েছেন।
ইমাম মালিক মদীনার তাবেঈ’দের আমলকে সহীহ হাদিসের বিপরীতে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি হলো – যে মদীনার মাটিতে ১০ হাজার সাহাবা শুয়ে আছেন, সেই মদীনার সাহাবা ও তাবেঈ’দের আমল সহীহ হাদিসের চাইতেও শক্ত দলীল (আবার সেই ৪ নং পয়েন্ট)। কারণ, হাদিস বুঝার ক্ষেত্রে আমাদের চাইতে তাঁদের জ্ঞান নি:সন্দেহে বেশী ছিল।
কিছু মুতাওয়াতির হাদিস (যে হাদিস তার সনদের প্রত্যেক স্তরে বহু মানুষ দ্বারা বর্ণিত হয়েছে) আছে যেগুলি কুরআনের আয়াতের সাথে আপাত: দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক (Apparently Conflicting)। এই ক্ষেত্রে কি কুরআনের আয়াত নেয়া হবে নাকি হাদিসকে নেয়া হবে – তা নিয়ে মাজহাবগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। একেক মাজহাব এক্ষেত্রে একেকটাকে প্রাধান্য দিয়েছে।
যদি কোনও আহাদ হাদিস (যে হাদিসের সনদের  প্রতিটা স্তরে তিনজনের বেশী বর্ণনাকারী পাওয়া যায় না) কুরআনের কোনো প্রতিষ্ঠিত নীতির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তাহলে হানাফী মাজহাব হাদিস সহীহ হওয়া সত্ত্বেও, সেটা না নিয়ে কিয়াস ব্যবহার করে। এটা একটা কারণ যার ফলে আমরা হানাফী মাজহাবে সহীহ হাদিস বিরোধী এত আহকাম (Islamic Ruling) দেখতে পাই।
কোন্‌ হাদিসগুলো ‘আম (General), আর কোন্‌ হাদিসগুলো খাস (Specific/Exception) – এই বিষয়ে ইমামদের মতপার্থক্যের কারণেও ফিকহী পার্থক্য হয়।
অন্যদিকে হাম্বালী ও সালাফীরা হাদিসকে আক্ষরিক ভাবে মেনে চলেন, ফলে আমরা হাদিসের কিতাবগুলিতে যে হাদিসগুলি পাই, সেগুলোর সাথে এই মাজহাবগুলোর সরাসরি মিল সবচেয়ে বেশী।
আবু-বকর(রা) ও উমার(রা) এর মতপার্থক্য [২৯]: “উসুল” এর এই ধরনের পার্থক্য সাহাবাদের সময় থেকেই ছিল, আর তাবেঈনদের মধ্যে তো ছিলই। দুইজন সম্পূর্ন ভিন্ন বিধান এর অনুসারী হয়েও দুইজনেই সঠিক হতে পারে, যদি তাদের নিয়ত হয় আল্লাহর ﷻ হুকুমকে মনে চলা। শ্রেষ্ঠ দুই সাহাবী আবু বকর(রা) ও উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) অসংখ্য বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করতেন, তারপরেও তারা দুইজনেই রাসূলুল্লাহ(ﷺ)-কে নিঁখুতভাবে অনুসরণ করেছেন [২৭]। যেমন – আবু বকর(রা) এর খিলাফতকালে সাহাবীদের যে ভাতা দেয়া হতো, তা সকল সাহাবার জন্য সমান অংকের ছিল। আবু বকর(রা) এর যুক্তি ছিল – মহান আল্লাহ ﷻ কুরআনে বলেছেন যে তিনি সকল সাহাবার উপরই সন্তুষ্ট (http://quran.com/9/100) , তাই তাঁরা সবাই সমান ভাতা পাবেন।
অন্যদিকে, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) খলীফা হওয়ার পরেই এই নিয়মের পরিবর্তন করলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যারা ইসলাম প্রচারের প্রথম দিকে তা গ্রহন করেছে, তারা যে কষ্ট সহ্য করেছে সেই তুলনায় যারা পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তারা অনেক কম কষ্ট সহ্য করেছে, ফলে তাদের মর্যাদাও কম। কে কত আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে এর ভিত্তিতে তিনি ভাতার স্কেল নির্ধারণ করেন। এখানে আবু বকর(রা) ও উমার(রা) এর মতামত সম্পুর্ণ বিপরীত – কিন্তু তাঁরা দুইজনেরই নিয়ত ছিল রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে  নিঁখুতভাবে অনুসরণ করা। সাহাবাদের জীবন ঘাঁটলে এরকম অগুনতি পরষ্পর-বিরোধী মতামত পাওয়া যায় [২৭]। কিন্তু, যেহেতু তাঁদের প্রত্যেকেরই নিয়ত শুদ্ধ ছিল, কাজেই যিনি যে বিধান অনুসরণ করেছেন, তাঁর জন্য সেটাই শুদ্ধ ছিল।
সালাফী যুক্তি ৬: শাফেঈ’ মাজহাব বলে অজু করে স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকে না, হানাফী মাজহাব বলে অজু থাকে। কিন্তু, দুইটা তো একই সাথে সঠিক হতে পারে না। তার চাইতে যে মতামতটা অধিকতর সঠিক সেটা অনুসরণ করাই কি উচিত না?
যুক্তি-খন্ডন: প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেক মাজহাব তাদের “উসুল” (Set of Principles) অনুসারে যেটা সবচেয়ে সঠিক সেটাই বেছে নিয়েছে। “স্ত্রীকে স্পর্শ করলেও অজু থাকে” – হানাফী মাজহাবে এটাই সঠিক। কারণ, আবু দাউদের সহীহ হাদিসে আছে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) অজু করার পর আয়েশা(রা) কে স্পর্শ করা সত্ত্বেও আবার অজু না করেই নামাজ পড়েছেন। অন্যদিকে, শাফেঈ’ মাজহাব এর মতে  “স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকে না ” –  এটাই সঠিক (এই বিষয়ে শাফেঈ মাজহাবের বিস্তারিত প্রমাণের জন্য এই লেখাটি পড়ুন)। কারণ, তাদের মতে সূরা মায়িদার ৬ নং আয়াতে আল্লাহ ﷻ বলেছেন – “স্ত্রীকে স্পর্শ করলে অজু থাকবে না” এবং এই আয়াতটি আবু দাউদের হাদিসের উপর প্রাধান্য পাবে, ফলে আবু দাউদের হাদিসের বিধানটি অবলুপ্ত (Abrogate) হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে। কাজেই, আপনি যদি বলে থাকেন ইমাম আবু হানিফা এর মতামত এক্ষেত্রে ইমাম শাফেঈ’র মতামতের চেয়ে বেশী সঠিক, তাহলে আপনি আসলে বলছেন যে সেটা আপনার “উসুল” অনুসারে বেশী সঠিক।
সালাফী যুক্তি ৭: আব্বাসীয় শাসন আমলে এরকম ফতোয়া ছিল যে, হানাফীরা শাফেঈদের বিয়ে করতে পারবে না। শুধু তাই না, দামেস্ক ও মক্কায় চার মাজহাবের জন্য চারটি পৃথক মিহরাব ছিল এবং তারা ভিন্ন ভিন্ন জামাতে নামাজ পড়ত। কাজেই, এভাবে করে মাজহাব কি মুসলিম উম্মাহ এর মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে নাই?
উত্তর: মাজহাব নিয়ে এ ধরনের বাড়াবাড়ি অতীতে হয়েছে একথা সত্য এবং মাজহাবের নামে মুসলিম উম্মাহর এইরকম বিভক্তি মোটেও কাম্য নয় [৪]। কিন্তু, আপনি যখন জানবেন কেন এরকম করা হয়েছিল, তখন পুরো বিষয়টাকে ভিন্ন দৃষ্টিভংগীতে দেখতে পারবেন।
হানাফী আর শাফেঈ’রা একে অপরকে বিয়ে করতে পারবে না —এই ফতোয়া এই জন্য দেয়া হয়েছিল যে, দুইটি ভিন্ন মাজহাবের বিয়ে সংক্রান্ত বিধি-বিধানগুলো ভিন্ন হওয়ায়, একজন মুফতীর পক্ষে কিছু কিছু ব্যাপারে মতামত (Islamic Ruling) দেয়া কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যেমন – এক মাজহাব মনে করে ডিভোর্সের জন্য একবার তালাক বলতে হবে, আর আরেক মাজহাব মনে করে ডিভোর্সের জন্য তিনবার তালাক বলতে হবে।  স্বামী-স্ত্রী দুইজন যদি দুই ভিন্ন মাজহাবের মানুষ হয়, তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় যে, কোন্ মাজহাব অনুসারে তাদের মামলা পরিচালনা করা হবে? এই ধরনের ঝামেলা এড়ানোর জন্য তখনকার মুফতিরা “এক মাজহাবের মানুষ অন্য মাজহাবের মানুষকে বিয়ে করতে পারবে না” – জাতীয় উদ্ভট ফতোয়া দিয়েছিল, যেটা ছিল সম্পূর্ণ ভুল। তাদের উচিত ছিল কিভাবে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখা যায় তা নিয়ে চিন্তা করা [৪]।
মক্কায় আর দামেস্কে চার মাজহাবের জন্য চার মিহরাব স্থাপন হলো মাজহাব-সন্ত্রাসের এক চরম উদাহরণ, যা অস্বীকার করার উপায় নাই [৪]। কিন্তু এর দোষ আপনি মাজহাবকে দিতে পারেন না, এর জন্য দোষ দিতে হবে মানুষের চরমপন্থী চিন্তাভাবনাকে। চরমপন্থী চিন্তা-ভাবনা সব সময়ই খারাপ, তা সে মাজহাব নিয়েই হোক, সালাফীবাদ নিয়েই হোক আর নাস্তিকতা নিয়েই হোক। মাজহাবী চরমপন্থার যে উদাহরণ আপনি দিচ্ছেন, সেই একইরকম উদাহরণ নাস্তিকেরা ব্যবহার করে এটা প্রমাণ করার জন্য যে “ধর্ম খারাপ”। কারণ, ধর্মের কারণে আগের শতাব্দীগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা গেছে। কিন্তু, ভেবে দেখুন আগের শতাব্দীর সেই গণহত্যাগুলোর জন্য কি ধর্ম দায়ী নাকি মানুষের চরমপন্থী চিন্তা-ভাবনা আর অন্য মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা দায়ী?
সালাফী যুক্তি ৮: রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন সেভাবে নামাজ পড় যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখ, তারপরেও মাজহাবীরা সহীহ হাদিসের বিপরীতে নামাজ পড়ে  কেন?
উত্তর: লক্ষ্য করুন – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) বলেছেন – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নামাজ পড়তে দেখ” (বুখারী)। মাজহাবীদের মতে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর মতো করে নামাজ পড়ার দাবী যতটা ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফা করতে পারেন, শাইখুল হাদিস আলবানী ততটুকু করতে পারেন না [৪]। কারণ, ইমাম আবু হানিফা নামাজের মাস’আলা নিয়েছেন মূলত আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ এর ছাত্রদের থেকে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাস’উদ মক্কার প্রথম ১০ জন ইসলাম গ্রহনকারীদের একজন যিনি দীর্ঘ ২০ বছর রাসূলুল্লাহ(ﷺ) এর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নামাজ পড়েছেন। সাহাবারা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে নামাজ পড়তে “দেখেছেন”, আবার তাবেঈ’রা সাহাবাদের নামাজ পড়তে “দেখেছেন”। আপনাকে স্বীকার করতে হবে – কোন কিছু “পড়ে শেখার” চেয়ে উস্তাদের কাছ থেকে সরাসরি “দেখে শিখলে” ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
অন্যদিকে, ইমাম মালিক তাঁর নামাজের মাস’আলাগুলো নিয়েছেন [৪] প্রধানত: আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার(রা) এর ছাত্র ও মুক্তিকৃত দাস নাফি’ (মৃত্যু ১১৭ হিজরী) থেকে, আর নাফি’ নিয়েছেন আব্দুল্লাহ ইবনে ‘উমার(রা) থেকে, যিনি সব সাহাবীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কে সবচেয়ে অনুকরণ বেশী করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) সেই ধরনের জুতা পড়তেন যা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন, ঠিক একই কাপড় পড়তেন যা রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন। তাহলে এটা কিভাবে সম্ভব যে উনি নামাজ পড়তেন যেভাবে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) পড়তেন না? ইমাম বুখারী নিজে “ইমাম মালিক -> নাফি’ -> আব্দুল্লাহ ইবনে উমার -> রাসূলুল্লাহ(ﷺ)” এর সনদ কে “স্বর্ণালী সনদ” (সিলসিলাতুল যাহাব / The Golden Chain of Narrators) বলে আখ্যায়িত করেছেন।     এখন আপনিই বলেন – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কিভাবে নামাজ পড়েছেন, সেই নামাজ কি ইমাম মালিক বেশী বলতে পারবেন, না ১৪০০ বছর পরের কোনও আলেম সঠিকভাবে বলতে পারবে?
আমাদের মনে রাখতে হবে, কিছু কিছু সুন্নাহ আছে যেগুলো লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়নি। সাহাবারা, তাবেঈ’রা  অনেক সুন্নাহই সংরক্ষণ করেছেন তাদের কাজের (Practise) মাধ্যমে। আর মাজহাবের ইমামরা অনেক ক্ষেত্রেই সহীহ হাদিসকে বাদ দিয়ে সালাফদের কাজকে (Practise) প্রাধান্য দিয়েছেন। এর কারণ হলো সেই ৪ নং পয়েন্ট – “হাদিস বুঝতে হবে যেভাবে সাহাবারা বুঝেছিলেন”। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় – মালিকি মাজহাবে “রাফ’উল ইয়াদাইন” করা হয় না। যদিও ইমাম মালিক রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস সম্পর্কে জানতেন। ইমাম মালিকের মতামত হচ্ছে রাসূলুল্লাহ(ﷺ) মাঝে মধ্যে রাফ’উল ইয়াদাইন করে দেখিয়েছেন যে, নামাজের যে কোনো আল্লাহু আকবারের সাথে চাইলে হাত তোলা যায়, এটা মাকরুহ নয়। এই মতামতের পিছনে যুক্তি কি? এর যুক্তি হলো – রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবা আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) নিজেই নামাজে রাফ’উল ইয়াদাইন করতেন না, কাজেই এর থেকে বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ(ﷺ)ও সাধারণত রাফ’উল ইয়াদাইন করতেন না। তাই, ইমাম মালিক রাফ’উল ইয়াদাইনের হাদিস জানা সত্ত্বেও তার পক্ষে মত দেননি।
আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয় যে – রাসূলুল্লাহ(ﷺ) কিন্তু বলেছেন – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে পড়তে দেখ” (বুখারী), তিনি বলেননি – “সেভাবে নামাজ পড়ো যেভাবে আমাকে নিয়ে লেখা হয়েছে”।  উপরে বর্ণিত কারণে – এই “দেখার” ব্যাপারটা কেউ যদি দাবী করতে পারে তবে সেটা ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানিফারা যতটুকু করতে পারেন, ১৪০০ বছর পরের কেউ ততটুকু করতে পারবে না।