আ’লা হযরতের জীবনী

Standard

আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু-এর মহান অস্তিত্ব কারো পরিচয়ের মুখাপেক্ষী নয়। তিনি স্বয়ং কামালাত ও ফাযালাতের সূর্য। উদিত সূর্যের খবর যেমনি সর্বজনসহ অন্ধজনও দিতে সক্ষম তেমনি কুত্বুল আওলিয়া, শায়খুল মাশাইখ ও বেলায়ত দানকারী আ’লা হযরত আজীমুল বারাকাত, ইমামে আহ্লে সুন্নাত এর অগনিত দ্বীনী দেখমতের অমর অবদান সূর্যের ন্যায় বিস্তৃত ও জ্ঞাত। বরকতময় নাম আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর শুভ জন্মকালীন নাম “মুহাম্মদ” আর ঐতিহাসিক নাম “আল মুখতার”। কিন্তু আপন দাদাজান মাওলানা রেজা আলী খাঁন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁর নাম নির্ধারণ করেন আহমাদ রেজা। পরবর্তীতে তিনি নিজেই নিজ নামের সাথে “আব্দুল মুস্তফা” সংযোগ করেন। তিনি বংশীয় পর্যায়ে ‘পাঠান’, মাযহাবের দিক থেকে হানাফী, ও ত্বরিকার দিক থেকে ক্বাদেরী ছিলেন। শুভজন্ম তাঁর সৌভাগ্যময় জন্ম সময় ১০ই শাওয়াল-ই মুকাররম, ১২৭২ হিজরী মোতাবেক ১৪ জুন ১৮৫৬ ইংরেজী, রোজ শনিবার যোহরের সময়। আর জন্মস্থান হল ভারতের প্রসিদ্ধ নগরী বেরেলী শরীফে (ইউ.পি)’র জাসুলী মহল্লায়। আ’লা হযরত নিজের জন্ম সন নি¤েœাক্ত আয়াত থেকে বের করেছেন। অর্থাৎ ১২৭২ হিজরীর তত্ত্ব সন্ধানে বর্ণিত আয়াত শরীফ- أولئك كتب في قلوبهم الإيمان وأيدهم بروح منه অর্থঃ তাঁরা হল ওই সব লোক যাদের অন্তরে আল্লাহ তায়ালা ঈমানকে অংকন করে দিয়েছেন এবং নিজ পক্ষ থেকে রুহ্ দ্বারা তাঁদেরকে সাহায্য করেছেন। এ কথা যথার্থ যে, আ’লা হযরত ওই সব খাস বান্দার অন্তর্ভূক্ত, মহান আল্লাহ যাদের অন্তরে ঈমানের নক্শা এঁকে দিয়েছেন তাঁর আপদমস্তক আল্লাহর ইশক ও নবীজির মহাব্বতে ডুবন্ত ছিল। তিনি বলতেন, আল্লাহর শপথ ! “যদি আমার অন্তরকে দু’টুকরো করা হয় তবে দেখা যাবে যে, এক টুকরোর উপর লিখা আছে لااله الا الله (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্) অপর টুকরো’র উপর লিখা আছে محمد رسول الله (মুহাম্মাদুর রাছূলুল্লাহ)। বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের অগণিত লোক, যাঁদের মধ্যে অনেক আলিম, ফাজিল ও মাশাঈখও রয়েছেন যে, ১২৭২ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করতে পারেন, কিন্তু আপনি যদি আ’লা হযরতের জীবনের প্রতি একটু গভীর দৃষ্টিপাত করেন তবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠবেন (১২৭২ হিজরীর) এর অলৌকিক মুকুট আ’লা হযরতের পবিত্র শিরে সত্যিই শোভা পাচ্ছে। বংশীয় পরিচয় আ’লা হযরত শাহ্ ইমাম আহমাদ রেজা খাঁন, তাঁর পিতা হযরত মাওলানা শাহ্ নক্বী আলী খাঁন তাঁর পিতা হযরত মাওলানা শাহ রেজা আলী খাঁন তাঁর পিতা হযরত মাওলানা হাফিজ শাহ্ কাজিম আলী খাঁন, তাঁর পিতা হযরত মাওলানা শাহ্ মুহাম্মদ আজম খাঁন তাঁর পিতা হযরত মাওলানা শাহ্ সা’আদাত ইয়ার খাঁন, তাঁর পিতা হযরত মাওলানা শাহ্ সাঈদ উল্লাহ্ খাঁন (রাহমাতুল্লাহি তা’য়ালা আলাইহিম আজমাঈন) আ’লা হযরতের পূর্ব পুরুষ অর্থাৎ হযরত মাওলানা শাহ্ সাঈদ উল্লাহ খাঁন রাহমাতুল্লাহি আলাইহি রাজ পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি মুঘল শাসনামলে লাহোর পদার্পণ করেন এবং সেখানে তিনি বিভিন্ন সম্মানিত পদে অলংকৃত হন। হযরতের জ্ঞান অর্জন আ’লা হযরত পরিবারে পারিবারিক ঐতিহ্য- রেওয়াজ অনুযায়ী বিছমিল্লাহ্খানী তথা বিছমিল্লাহ শরীফের আনুষ্ঠানিক ছবক হত। বিছমিল্লাহ শরীফের ছবক গ্রহণকালে হযরতের বয়স কত ছিল বিশুদ্ধভাবে বলা মুশকিল, তবে ছবক গ্রহণ সময়ের বয়স এভাবে অনুমান করা যায় যে, তিনি মাত্র চার বৎসর বয়সেই পবিত্র কুরআনের নাজেরা খতম করেছিলেন। হযরতের মুখস্ত শক্তি আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহ তা’য়ালা আনহু এর মুখস্ত শক্তির অবস্থা এমন ছিল যে, একদিকে ওস্তাদ ছবক দেন অপরদিকে তিনি এক দুবার পড়েই কিতাব বন্ধ করে দিতেন। যখন ওস্তাদ ছবক শুনতেন তখন পুংঙ্খানুপুংঙ্খভাবে তা শুনিয়ে দিতেন। ওস্তাদ এ অবস্থা দেখে আশ্চর্য্য হয়ে বলতেন যে, হে “আহমাদ মিয়া” তুমি মানব না জ্বীন যে, আমি পড়াতে দেরী কিন্তু তোমার শুনাতে বিলম্ব হয় না। বস্তুতঃ এ উক্তিটি ওস্তাদের দোয়া স্বরূপই ছিল। একদিন আ’লা হযরত বললেন, অনেকেই না জেনে আবেগ প্রবণ হয়ে আমার নামের সাথে “হাফিজ” শব্দটি যুক্ত করে দেয়, অথচ আমি হাফিজ নই। তবে এটা সম্ভব যে, কোন হাফিজ সাহেব যদি আমাকে কুরআন কারীমের এক রুকু’ করে পড়ে শুনান তাহলে অনুরূপ আমার থেকে মুখস্ত শুনানো সম্ভব হবে। এ সিদ্ধান্ত মোতাবেক মাহে রমজানে একজন হাফিজ সাহেবের সান্নিধ্যে মাত্র ২৩ দিনে ৩০ পাড়া কোরআন শরীফ মুখস্ত করে শুনিয়েছেন। আর হিফজ করার সময়টুকু হিসাব করলে মাত্র ১৫ ঘন্টা হয়। (সুবহানাল্লাহ্!) পাঠ্য জ্ঞানের সমাপ্তী আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু প্রাথমিক উর্দ্দু, ফার্সী ভাষার কিতাবাদী অধ্যয়নের পর আরবী ভাষায় ছরফ-নাহু এর কিতাব সমূহ মীর্যা গোলাম ক্কাদীর রাহমাতুল্লাহি আলায়হি-এর সান্নিধ্যে অধ্যয়ন করেন। অতঃপর নিজ পিতা আলেমকুল সম্রাট হযরত মাওলানা শাহ্ নক্কী আলী খাঁন (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) এর সান্নিধ্যে নি¤েœাক্ত জ্ঞানকোষ সমূহের উপর বিদ্যা অর্জন করেন। (১) ইলমে কুরআন, (২) ইলমে তাফছীর, (৩) ইলমে হাদীছ, (৪) উসূলে হাদীছ, (৫) হানাফী ফিকহের কিতাবাদী, (৬) শাফেঈ ফিক্হের কিতাবাদী, (৭) মালেকী ফিকহের কিতাবাদী, (৮) হাম্বলী ফিকহের কিতাবাদী, (৯) উসূলে ফিক্বহ, (১০) জাদাল-ই মাযহাব, (১১) ইলমে আকাইদ ও কালাম, (১২) ইলমে নাহভ, (১৩) ইলমে ছরফ, (১৪) ইলমে মা’আনী, (১৫) ইলমে বয়ান, (১৬) ইলমে বদী, (১৭) ইলমে মানতিক, (১৮) ইলমে মুনাজারাহ, (১৯) ইলমে কানসাকাহ্ মুদাল্লাসাহ্, (২০) ইবতিদায়ী ইলমে তাকছীর, (২১) ইবতেদায়ী ইলমে হাইয়াত, (২২) ইলমে হিছাব, (২৩) ইলমে হিন্দাসাহ্ প্রভৃতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদী অধ্যয়ন করে ১২৮৬ হিজরীতে পাঠ্য জ্ঞান সমাপ্ত করেন এবং ১৪ বৎসর বয়সেই সমাপ্তী সনদপত্র লাভ করেন। ফতোয়া প্রদান আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু যে দিন সমাপ্তী সনদ লাভ করলেন- সে দিনেই পূর্ব নিয়ম অনুযায়ী দরগাহ্ শরীফে “মায়ের স্তন্যপান সম্পর্কিত একটি মাসআলার সমাধানের জন্যে কোন এক আগন্তুক এসেছিল, আগন্তুকের এ মাসআলাটির উপর আ’লা হযরত চমৎকার একটি ফতোয়া তৈরী করে নিজ পিতার হাতে অর্পণ করলেন। আর তা এতোই সুন্দর ও নিখুঁত ছিল যে, তা দেখে প্রবীণ মুফতীয়ানে কিরামগণও হতবাক হয়ে গেলেন। সেদিন থেকে তাঁর সম্মানিত পিতা তাঁকেই ফতুয়া প্রদানের দায়িত্ব অর্পণ করেন। বাইআত ও খিলাফত আ’লা হযরত রাদ্বিয়ালল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর সম্মানিত পিতা আল্লামা নক্বী আলী খাঁন (রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু) এর সাথে ওলীকুল সম্রাট যুগ শ্রেষ্ঠ কুতুব সৈয়দ আলে রাছুল মারহারাভীর দরবারে হাজির হয়ে ক্বাদেরিয়া সিলসিলার বাইআত গ্রহণ করে ধন্য হন। মুর্শিদে বরহক হযরতের আধ্যাত্মিক জ্ঞানকেও পরিপূর্ণতা দান করে সমস্ত সিলসিলার খিলাফত-বাইআত এর ইজাযত এবং হাদীছ শরীফের সনদ দ্বারা ধন্য করেন। মুর্শিদে মারহারাভী বাইআয়াতের পর উপস্থিত মজলিশকে লক্ষ্য করে ফরমান Ñ “রোজ কিয়ামতে মহান রব আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, তুমি আমার জন্য কি এনেছ? তখন আমি আহমাদ রেজাকে পেশ করব।” খোদা প্রদত্ত জ্ঞানে অবদান আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু পাঠ্য পুস্তক সমূহের অর্জিত জ্ঞান ছাড়াও মহান রবের একান্ত দয়াগুণে ও নবী পাকের কৃপানজরে কোন ওস্তাদের নিকট পড়াশুনা ছাড়াও নিরেট ইলমে লাদুনী বা খোদা প্রদত্ত নুরানী অন্তুর দ্বারাই নি¤েœাক্ত বিষয়াদীতে দক্ষতা অর্জন করেন এবং সেগুলোতে শায়খ ও ইমাম এর মর্যাদা লাভ করেন। যথা- (১) ক্বিরাত, (২) তাজভীদ, (৩) তাসাওফ, (৪) ছুলুক, (৫) ইলমুল আখলাক, (৬) আছমাউর রিজাল, (৭) ছিয়ার, (৮) ইতিহাস, (৯) অভিধান, (১০) আদব (বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে), (১১) আরিসমাত্বী-কী, (১২) জবর ও মুক্বালাহ, (১৩) হিসাব-ই-সিত্তীনী, (১৪) লগারিথম, (১৫) ইল্মুত্ তাওক্বীত, (১৬) ইলমুল আকর, (১৭) যীজাত, (১৮) মুসাল্লাম-ই-কুরাভী, (১৯) মুসাল্লাস-ই-মুসাত্তাহ্, (২০) হাইআত-ই-জাদীদাহ, (২১) মুরাব্বাআত, (২২) মুন্তাহা ইলমে জুফার, (২৩) ইলমে যাইচাহ্, (২৪) ইলমে ফারাইজ, (২৫) আরবী কবিতা, (২৬) ফার্সী কবিতা, (২৭) হিন্দি কবিতা, (২৮) আরবী গদ্য, (২৯) ফার্সী গদ্য, (৩০) হিন্দী গদ্য, (৩১) পান্ডুলিপি, (৩২) নাস্তাালীক লিপি, (৩৩) মুন্তাহা ইলমে হিসাব, (৩৪) মুন্তাহা ইলমে হাইআত, (৩৫) মুন্তাহা ইলমে হিন্দাসাহ্, (৩৬) মুন্তাহা ইলমে তকছীর ও (৩৭) কুরআন শরীফ লিখন পদ্ধতিসহ প্রভৃতি। এছাড়াও হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের ফযীলতসহ জীবন চরিত আক্বাইদের বিষয়ে কিতাব লিখেছেন ৬৩টি। হাদীস ও উসুলে হাদীসের উপর লিখেছেন Ñ ১৩টি। ইলমে কালাম ও মুনাযারাহ্ বিষয়ে লিখেছেন ৩৫টি। ফিক্বহ ও উসুলে ফিক্বহ বিষয়ে লিখেছেন ৫৯টি এবং বিভিন্ন বাতিল পন্থীদের ভ্রান্ত মতবাদ খন্ডনে ৪০০টিরও অধিক সংখ্যক কিতাব লিখে নবী পাকের বিরুদ্ধাচরণ কারীদের জবান বন্ধ করে দিয়েছেন। এতো সংখ্যক লেখনীর জ্ঞানগত অবদান ছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে পবিত্র কোরআনের অনুবাদ “তরজমায়ে কুরআন কানজুল ঈমান” এ অনুবাদটি অন্যান্য অনুবাদগুলোর মধ্যে অনন্য স্থানের দাবীদার কানজুল ঈমানের অনুবাদ ও অন্যান্য অনুবাদগুলোর মধ্যেকার বাস্তব পার্থক্য নিরূপণের জন্যে কানজুল ঈমানে “কোরআন মজিদের ভুল অনুবাদগুলো চিহ্নিত করণ” অধ্যায় তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে পরিস্কার হয়ে যায় যে, কানজুল ঈমান এক বিস্ময়কর খোদাপ্রদত্ত জ্ঞানসম্বলীত অনুবাদ গ্রন্থ। এতদভিন্নও তাঁর বিখ্যাত ফিক্বহ শাস্ত্রের বিশাল গ্রন্থ ফাতাওয়ায়ে রেজভীয়া, যা প্রতিটি মাসআলার হাওলাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ ধর্মী অনন্য গ্রন্থ। গ্রন্থটি ১২ খন্ডে সমাপ্ত বর্তমানে আরবী ফার্সীর উদ্ধৃতিগুলোর উর্দু অনুবাদসহ ৩০ খন্ডে প্রকাশ হয়েছে। যুগের জলিলুল ক্বদর মুজাদ্দিদ হুজুর আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু এর পবিত্র জীবনের ইতিহাস লক্ষ্য করলে পরিস্কার বুঝা যায় যে, মহান আল্লাহ এ বিশেষ বান্দাহ্কে তাঁর দ্বীনের হিফাজতের জন্যেই সৃষ্টি করেছেন। নবী করিম রাউফুর রাহীম এরশাদ ফরমান, ان امة بعيث لهذه الامة على رأس كل مأة سنة من يجدد لها دينها অর্থাৎ প্রতি একশত বৎসরের শেষপ্রান্তে মহান রব এ উম্মতের জন্যে অবশ্যই মুজাদ্দিদ প্রেরণ করবেন, যে উম্মতের জন্যে আল্লাহর দ্বীনকে সঠিক রাখবে। (আবু দাউদ শরীফ) সেই নির্মম সময়ে যখন কিছু সংখ্যক সার্থান্বেষী ধর্মগুরু দ্বীনকে নিজ ব্যাখ্যায় পরিবর্তন করতে লাগলো সেই সময় তিনি মুসলিম উম্মাহকে শরীয়তের বিলোপ্ত বিধানাবলী স্বরণ করিয়ে দেন, নূরে খোদা মুহাম্মদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লামা’র মৃত সুন্নাতকে জিন্দা করেন, বিশেষ ইলম (জ্ঞান) ও ধৈর্য্য সাধনায় সত্যের বাণী ঘোষনা করে মিথ্যা ও এর অনুসারীদের চিহ্নিত ও নির্মূল করেন এবং সত্যের পতাকাকে উজ্জীবিত করেন, তিনিই হলেন ১৪ শত শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, আ’লা হযরত, আজীমুল বারাকাত, মাওলানা, আলহাজ্ব, হাফিজ, ক্বারী শাহ্ মুহাম্মদ আহমাদ রেজা বেরলভী সুন্নী হানাফী ক্বাদেরী বারকাতী রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু। হিজরী ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে যখন তদানীন্তন ইংরেজ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সমগ্র উপমহাদেশে নাস্তিকতা এবং ওহাবী-দেওবন্দী প্রভৃতি মতবাদের বিষাক্ত হাওয়া প্রভাহিত হচ্ছিল এবং বিশ্ব তাদের ভ্রান্ত আকিদা দ্বারা দূষিত হয়েছিল, আর চতুর্দিকে ইলহাদ ও বে-দ্বীনীর ঘন্টা বাজতেছিল তখনই এমন একজন আশিকে রাসূলের আবির্ভাব ঘটলো যিনি বাতিলের অমাবশ্যা অন্ধকারে সত্যের আলো জ্বালিয়ে দিলেন। যার কলম নবীপাকের প্রতি বেয়াদবী প্রদর্শনকারীদের উপর আল্লাহর গজবের অগ্নিমালা রূপে পতিত হয়ে তাদের ভ্রান্ত আকিদাগুলোকে জ্বালিয়ে দিল, যিনি মুসলমানদেরকে ইংরেজ ও হিন্দুদের গোলামীর শৃংখল থেকে মুক্ত হবার তালিম দিলেন। সর্বোপরি যার সম্মুখে আরবীয় ও অনারবীয়, হেরম শরীফ ও হেরম শরীফের বাইরের বিজ্ঞ থেকে বিজ্ঞতর আলিমগণও একান্ত শ্রদ্ধাবনত হয়েছেন এবং যার সারাটি জীবন আক্বা ও মাওলা মুহাম্মদ মোস্তফা ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লামা’র মহান গোলামীতে কুরবান করেছেন। তিনিই মহান মুজাদ্দিদ আ’লা হযরত। বিধর্মী ইংরেজদের প্রতি ঘৃণা আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ইংরেজদের ধর্মাচার, তাদের শিক্ষানীতি ও তাদের কাছারীর প্রতি যথেষ্ঠ ঘৃনা পোষণ করতেন। এমনকি তিনি তৎকালীন ইংরেজ সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর ফটো সম্বলিত পোষ্ট কার্ড ও খামকে উল্টো করেই ঠিকানা লিখতেন, যাতে রাণী ভিক্টোরিয়া সপ্তম এওর্য়াড এবং পঞ্চম জর্জের মাথা নিচু হয়ে থাকে। তিনি বলতেন, আহমাদ রেজার জুতোও ইংজেদের কাছারীতে যাবে না। বিরুদ্ধচারীরা অনেক চেষ্টা করেছে, মামলা দায়ের করেছে যেন যে কোন প্রকারে হোক তাঁকে কাছারীতে হাজির হতে হয়; কিন্তু প্রতিটি মামলায় হযরতকে অদৃশ্য সাহায্য হিফাজত করেছে, পক্ষান্তরে শত্র“দের ভাগ্যে জুটেছে বেদনাদায়ক অপমান। হজ্জে বায়তুল্লাহ্ আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু ১৩২৩ হিজরী মোতাবেক ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয়বার বায়তুল্লাহ শরীফ হজ্জ এবং হারামাইন-শরীফাঈন এর যিয়ারত করেন। এ সফরে হিযাজবাসী ওলামা কেরাম তাঁর সম্মানে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানান। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ হুস্সামুল হারামাইন, আদ্দৌলাতুল মক্কীয়াহ, ক্বিফলুল ফক্বীহ প্রভৃতি কিতাবসমূহ পর্যালোচনা করলে পাওয়া যায়। মক্কা মুয়ায্যমায় তাঁকে সংবর্ধনা দেয়ার প্রত্যক্ষ দৃশ্য শেখ ইসমাঈল রাহমাতুল্লাহ আলাইহি নিজেই এভাবে বর্ণনা করেছেন যে- “দলে দলে মক্কাবাসী ওলামা কিরাম তাঁর নিকট সমবেত হন। তাঁদের অনেকেই তাঁর নিকট ‘ইজাযতের সনদ’ (খিলাফত) প্রদানের জন্যে অনুরোধ করেন। তাছাড়া অন্যান্য ওলামা ও বুযর্গ ব্যক্তিবর্গও তাঁর নিকট আসতে আরম্ভ করেন। এভাবে অনেককেই মক্কায় ইজাযত প্রদান করেন আর অনেককে বেরেলী শরীফ ফিরে এসে তথা থেকে ইজাযতের সনদ প্রেরণের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।” অতঃপর আ’লা হযরত প্রিয়নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লামা’র স্মৃতি বিজড়িত মদীনা মুনাওয়ারায় তাশরীফ নেন। সেখানেও তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা ও সম্মান প্রদর্শন করা হয়। এ সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী হযরত মাওলানা আবদুল করিম মুহাজিরে মক্কী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) বর্ণনা করেন যে- “আমি কয়েক বছর ধরে মদীনা মুনাওয়ারায় অবস্থান করে আসছি। হিন্দুস্থান থেকে অসংখ্য জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিগণ হজ্জে আসেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই আলিম, বুযুর্গ ও পরহেজগার ছিলেন। আমি যা লক্ষ্য করেছি তাঁরা মদীনা শহরের অলিগলিতে ইচ্ছা মাফিক ঘুরে বেড়াতেন, কেউ তাঁদের দিকে ফিরেও তাকাত না; কিন্তু আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর শান ছিল আশ্চর্যমন্ডিত। তাঁর আগমনের সংবাদ শুনে সেখানকার বুযর্গানে দ্বীন, ওলামা কিরাম দলে দলে তাঁর সাথে সাক্ষাত লাভের জন্য আসতে আরম্ভ করেন এবং তাঁর সম্মানে যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন।” মদীনা পাকে সেখানকার অনেকেই হযরতের নিকট থেকে ইজাযত বা খিলাফত লাভ করেন। অনেককে মৌখিক ইজাযত দান করেন, অনেককে স্বস্থান বেরেলী শরীফ আসার পর সনদ প্রেরণ করেন। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ মহান আশেকে রাসূলের প্রসিদ্ধি শুধু উপমহাদেশেই নয় বরং সমগ্র আরব আজমেও তাঁর পরিচিতি। তৎকালীন সময়ই বিদ্যমান ছিল। জ্ঞানজগতে আ’লা হযরতের অবস্থান ও প্রতিপক্ষের অভিমত আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর কলমের এমন শান ছিল যে, তিনি কম বেশি পঞ্চাশটি বিষয়ের উপর কয়েকশত বড় বড় কিতাব রচনা করেছেন এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন প্রস্রবন জারী করে দিয়েছেন যার থেকে আজও দুনিয়া তৃপ্তির সাথে উপকার গ্রহণ করছে। পক্ষের লোকতো পক্ষেরই, মুখালিফিনরাও স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে যে, মাওলানা আহমাদ রেজা খাঁন সাহেব কলম সম্রাট ছিলেন। যে বিষয়ের উপর কলম ধরেছেন দ্বিতীয় কারোও কলম ধরার সাহস হয়নি। তাই এ মহান হাস্তী সম্পর্কে পক্ষের লোক তো আছেই, প্রতিপক্ষের কতিপয় পরিচিত মনীষীর অভিমত নি¤েœ উপস্থাপন করা হল। মাওলানা আশরাফ আলী থানভী সাহেব বলেন- ১. আমার যদি সুযোগ হতো, তাহলে আমি মৌলভী আহমাদ রেজা খাঁন বেরলভীর পিছনে নামাজ পড়ে নিতাম। (উসওয়ায়ে আকাবির- পৃঃ ১৮) ২. তিনি আরো বলেন- “তাঁর সাথে আমাদের বিরোধিতার কারণ বাস্তবিক পক্ষে ‘হুব্বে রাসূল’ (নবীপাকের ভালবাসা)-ই। তিনি আমাদেরকে হুজুর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লামের প্রতি বেয়াদবী প্রদর্শনকারী (গোস্তাখে রাসূল) মনে করতেন। (আশরাফুস্ সাওয়ানিহ্, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৯) ৩. যখন আ’লা হযরত ইহধাম ত্যাগ করেছেন, তখন কোন একজন মাওলানা আশরাফ আলী থানভীকে সংবাদ দিলে শুনামাত্রই তিনি আ’লা হযরতের জন্য মাগফেরাত কামনা করেন। জনৈক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, মাওলানা আহমদ রেজা খাঁনতো আপনাকে কাফের মনে করতেন। অথচ আপনি তাঁর মাগফিরাত কামনা করছেন। তিনি বলেন, আহমাদ রেযা আমাকে এজন্যই কাফের মনে করতেন, যেহেতু আমি তাঁর দৃষ্টিতে গোস্তাখে রাসূল ছিলাম। তিনি একথা জানার পরও যদি কাফের না বলেন, তিনি নিজে কাফের হয়ে যাবেন। (দৈনিক রাওয়ালপিন্ডি, ১লা নভেম্বর ১৯৮১) আবুল আ’লা মওদুদী সাহেব বলেন- মাওলানা আহমাদ রেজা খাঁন মরহুম মগফুর আমার দৃষ্টিতে একজন অসাধারণ জ্ঞানী ও দূরদর্শীতার অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি মুসলিম মিল্লাতের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। যদিও তাঁর সাথে আমার কতিপয় বিষয়ে বিরোধ রয়েছে তবুও আমি তাঁর প্রভূতঃ দ্বীনি খেদমতকে স্বীকার করি। (আল মিযান, পৃঃ ১৬, সন- ১৯৭৬ মুম্বাই ও মাকালাতে ইয়াওমে রেজা, ২য় খন্ড, পৃঃ ৫৪০) মাওলানা আহমদ আলী সাহারানপুরীর ছেলে মাওলানা খলীলুর রহমান এর বক্তব্য- ১৩০৩ হিজরী সনে মাদ্রাসাতুল হাদীস, পীলীভেত এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত জলসায় সাহারানপুর, লাহোর, কানপুর, জৌনপুর, রামপুর এবং বদায়ুনের আলেমগণের উপস্থিতিতে মুহাদ্দীস-ই সুরতীর একান্ত ইচ্ছাক্রমে আ’লা হযরত হাদীস শাস্ত্রের উপর অনবরত তিন ঘন্টা যাবৎ সারগর্ভ ও সপ্রমাণ বক্তব্য রাখলেন। জলসায় উপস্থিত ওলামা কেরাম তাঁর বক্তব্য অবাকচিত্তে শ্রবণ করলেন এবং উচ্ছসিত প্রশংসা করলেন। মাওলানা আহমদ আলী সাহরানপুরীর পুত্র মাওলানা খলীলুর রহমান বক্তব্য শেষ হলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আ’লা হযরতের হাতে চুম্বন করলেন। আর বললেন, যদি এ মুহূর্তে আমার সম্মানিত পিতা থাকতেন তবে তিনি আপনার জ্ঞান সমুদ্রের মুক্তমনে প্রশংসা করতেন। আর তখন তাঁর এটা উচিতই ছিল। উল্লেখ্য, মুহাদ্দিস সুরতী ও মাওলানা মুহাম্মদ আলী মুঙ্গরী নদওয়াতুল ওলামা, লক্ষৌ এর প্রতিষ্ঠাতা তাঁর মন্তব্যের প্রতি সমর্থন জানালেন। (মাক্কালা-ই-মাহমুদ আহমদ ক্বাদেরী প্রণেতা, তাযকিরাই ওলামাই আহলে সুন্নাত মাহনামাই আশরাফিয়া মুবারকপুর, ১৯৭৭) বিদায়নামা বেসাল শরীফের দুই দিন পূর্বে আ’লা হযরত কিবলা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তার এনে শিরা দেখতে বললেন। ডাক্তার সাহেব শিরা (নাড়ী) খুঁজে পেলেন না। জিজ্ঞেস করলেন কী অবস্থা? ডাক্তার সাহেব বললেন, দুর্বলতার কারণে তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে হযরত জিজ্ঞাসা করলেন আজকের দিনটি কোন দিন? বলা হল, বুধবার। আ’লা হযরত বললেন, জুমআ আগামী পরশু দিন। বেশ কিছু পরে জবান মোবারক থেকে শুনা গেল حسبنا الله ونعم الوكيل (হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল) কালেমাটি পড়ছেন। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রিতে পরিবারবর্গ সকলে জাগ্রত থাকার ইচ্ছা করলেন। তখন তিনি তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বললেন রাত্রে জাগ্রত থাকার প্রয়োজন নেই। তাঁরা বললেন, যদি হঠাৎ কোন বিশেষ প্রয়োজন হয়ে যায়। তা শুনে হযরত কিবলা বললেন, আল্লাহ্ চাহে তো আজ ঐ রাত নয় যা তোমরা চিন্তা করছ, তোমরা সকলে ঘুমিয়ে পড়। রাত্রি অতিবাহিত হল। ভোরবেলা তিনি বললেন, আজ শুক্রবার। আবার বললেন গত জুমায় ছিলাম চেয়ারের উপর, আজ থাকব খাটিয়ার উপর। অতঃপর আবার বললেন, আমার কারণে জুমআর নামাজে যেন দেরী করা না হয়। অতঃপর সফরের (মৃত্যুর) জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করলেন। জমি-জমা সম্পর্কিত ওয়াক্ফনামা পরিপূর্ণ করলেন। সম্পত্তির চার ভাগের একভাগ আলাদা করে রাখলেন। বাকী উত্তরাধিকার শরয়ী কানুন মোতাবেক আওলাদদের জন্য রেখে দিলেন। অতঃপর নি¤েœাক্ত অসীয়তনামা বললেন- ১। অন্তিম মুহূর্তের সময় কার্ড, খাম, রূপিয়া, পয়সা বা এমন কোন বস্তু যেন দেওয়ালে বা সামনে না থাকে, যাতে কোন ছবি থাকে। ২। অপবিত্র অবস্থায় কোন লোক বা ঋতুস্রাবওয়ালা কোন মহিলা যেন না আসে। ৩। কোন কুকুর এখানে আসতে দিবে না। ৪। সূরা ইয়া-সীন এবং সূরা রাদ আওয়াজ দিয়ে পড়তে থাকবে। ৫। কালিমায়ে তৈয়্যেবাহ্ আওয়াজ করে সীনায় দম আসা পর্যন্ত পড়তে থাকবে। ৬। কেহ যেন উঁচু আওয়াজে কথা না বলে। ৭। কোন কান্নাকাটি করা ছোট বাচ্চা এখানে আসতে দিওনা। ৮। অন্তিম সময়ে আমার এবং তোমাদের জন্য দোয়ায়ে খায়র করতে থাক। ৯। কোন খারাপ কথা জবান থেকে যেন বের না হয়, যেন ফেরেশতারা আমিন না বলে ফেলে। ১০। অন্তিম সময় বরফের অথবা খুব ঠান্ডা পানি পান করাবে। ১১। রূহ কব্য হওয়ার পর ‘বিসমিল্লাহি ওয়া আ’লা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহ’ বলে নরম হাতে চোখগুলো বন্ধ করে দিবে এবং এটি পড়েই হাত এবং পা সোজা করে দিবে। ১২। গোসল এবং অন্যান্য কাজগুলো সুন্নাত মোতাবেক সম্পাদন করবে। ১৩। জানাযায় যেন শরয়ী কারণ ছাড়া দেরী না করা হয়। ১৪। জানাযা উঠানোর সময় সাবধান কোন আওয়াজ যেন না হয়। ১৫। জানাযার সামনে আমার প্রশংসামূলক কোন শের কখনো যেন গাওয়া না হয়। ১৬। কাফনের উপর যেন কোন পশমী চাদর না দেওয়া হয়। ১৭। এমনিভাবে কোন কাজ যেন খেলাফে সুন্নাত না হয়। ১৮। কবরে খুব ধীরে ধীরে নামাবে, ডান করটে (পার্শ্বে) ঐ দোয়াটি পড়েই শুয়ায়ে দিবে এবং পরে নরম মাটি দিয়ে ভরাট করে দিবে। ১৯। কবর তৈরিতে বিলম্ব হলে কবর তৈরি করা পর্যন্ত এই দোয়াটি পড়বে- “সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদু লিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহুম্মা ছাব্বিত উবাইদাকা হাজা বিল ক্বাওলিছ্ ছাবিতি বিজাহি নাবিয়্যিকা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।” ২০। কোন শস্য বা ফলমূল কবরের উপর নিয়ে যাবে না। এগুলোকে বন্টন করে দিবে। যেন কবরস্থানে শুরগোল না হয় এবং কবরের অসম্মান না হয়। ২১। দাফনের পরে মাথার দিকে الم থেকে مفلحون পর্যন্ত এবং পায়ের দিকে أمن الرسول থেকে এ সূরার শেষ পর্যন্ত পড়বে। ২২। দাফনের পর (মাওলানা শাহ) হামিদ রেজা খাঁন সাহেব সাতবার উঁচূ আওয়াজে আযান দিবে। ২৩। পরিবারভুক্ত ব্যক্তিরা আমার সামনাসামনি (মুখের নিকট) তিনবার তালকীন করবে। ২৪। দেড় ঘন্টা পর্যন্ত আমার মুখোমুখি দরূদ শরীফ এরূপ আওয়াজে পড়তে থাকবে যেন আমি শুনতে পাই। পরে আমাকে দয়াময় আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে চলে আসবে। আমার দু’জন প্রিয়ভাজন বা বন্ধু মনোনীত করে তিন রাত তিন দিন পূর্ণ প্রহরার সাথে আমার মুখের দিকে কুরআন মাজীদ এবং দরূদ শরীফ আওয়াজ করে একটানা পড়তে থাকবে। আল্লাহ চাহে তো ঐ নতুন স্থানে আমার মন বসে যাবে। ২৫। আরও অসিয়ত করেছেন যে, গরীব-মিসকীনদেরকে ফাতেহা করে যেন পালা করে খাবার খাওয়ানো হয়। তবে সুন্নাতের খেলাফ যেন না হয়। ওফাত শরীফ আ’লা হযরত রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু এর ওফাত শরীফ হয়েছিল ২৫ সফর ১৩৪০ হিজরী মোতাবেক ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দ, জুমআ বার (শুক্রবার) বেলা ২টা ৩৮ মিনিটে বেরেলী শরীফে। দিনের ২টা বাজার আর ৪ মিনিট বাকী ছিল। তথন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন,সময় কত? কেউ আরয করল ২টা বাজার ৪ মিনিট বাকী। বললেন, ঘড়ি রেখে দাও। ফটো সরিয়ে দাও। সকলে চিন্তামগ্ন এখানে তাসবীর তথা ফটো (কোথায়)! আবার তিনি নিজে থেকেই বললেন, এ রূপিয়া, পয়সা, কার্ড, খাম। অল্প কিছুক্ষণ চুপ থেকে হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত হামিদ রেজা খাঁন সাহেবকে বললেন যে, ওযু করে কুরআন শরীফ লও। এখনো তিনি ফিরে আসেননি। এদিকে হুজুর মুফতীয়ে আযম হিন্দ মোস্তফা রেযা খাঁন সাহেবকে বললেন, এখন বসে কি করছ? সূরা ইয়াসীন ও সূরা রা’দ শরীফ তিলাওয়াত কর। হুজুর মুফতীয়ে আযম হিন্দ তিলাওয়াত শুরু করলেন। এখন পবিত্র হায়াতের আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকী। তখন আ’লা হযরত কিবলা এমন মনোযোগের সহিত তিলাওয়াত শুনতে ছিলেন, যে আয়াত স্পষ্টভাবে শুনেননি তা তিনি নিজেই তেলাওয়াত করে শুনিয়ে দিতেন। সাইয়্যেদ মাহমুদ জান সাহেব আসলেন। হযরত কিবলা দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন সাইয়্যেদ সাহেবের সাথে মুসাফাহা করলেন। সফরের দোয়াগুলো পড়লেন, এমনকি অন্যান্য বারের তুলনায় বেশী পড়লেন। অতঃপর কালিমায়ে তায়্যিবাহ পড়লেন। শেষ নিঃশ্বাস যখন বক্ষে এসে পড়ল পবিত্র ওষ্ঠদ্বয়ের স্পন্দন এবং যিকরে পাস আনফাস করার মাত্রা শেষ হয়ে আসছে। হঠাৎ চেহারা মোবারকের উপর নূরের একটি আলোকরশ্মি চমকে উঠল, যাতে প্রতিফলন ছিল যেমনিভাবে আয়নার উপর পতিত চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়। এ আলোকরশ্মি অদৃশ্য হতেই সেই নূরানী রূহ পবিত্র শরীর থেকে উড়ে গিয়েছিল। র্বাগাহে রেসালাতে তাঁর মর্যাদা হুজুর কারীম রাউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে আ’লা হযরতের গ্রহণযোগ্যতা কেমন ছিল, তা নি¤েœাক্ত ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয়। মাওলানা আব্দুল আযীয মুরাদাবাদী যিনি দারুল উলুম আশরাফিয়া, আযমগড়-এর শিক্ষক ছিলেন তিনি আজমীর শরীফ দরগাহর সাজ্জাদানশীন দিওয়ান সাইয়্যেদ আলে রাসূল সাহেবের সম্মানিত চাচা হতে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন ১২ রবিউস্সানি, ১৩৪০ হিজরী। একজন সিরিয়াবাসী বুযুর্গ দিল্লীতে তাশরীফ আনলেন। তাঁর আগমনের সংবাদ শুনে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। বড়ই শান-শওকতপূর্ণ বুযর্গ ছিলেন তিনি। মন-মানসিকতায় স্বাবলিলতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। মুসলমানগণ ওই আরবীয় বুযর্গের খিদমত করার নিমিত্তে নযরানা পেশকরতে লাগল। কিন্তু তিনি তা ক্ববুল করতে অস্বীকার করছিলেন, আর বলতে লাগলেন, আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে আমি আর্থিকভাবে সচ্ছল। এ সবের প্রয়োজন নেই। এটা সত্যি আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে, তিনি দীর্ঘদিন যাবত সফর করছেন অথচ কোন অভাববোধ করছেন না। আরয করলেন, এখানে তাশরীফ আনার কারণ কী? তিনি বললেন, উদ্দেশ্য তো বড়ই উঁচুমানের ছিল। কিন্তু হাসিল হলো না, আফসোস! ঘটনা হচ্ছে এ যে, ২৫ সফর ১৩৪০ হিজরী আমার সৌভাগ্য জেগে উঠল। স্বপ্নে আমার নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যিয়ারত নসীব হল। দেখলাম, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাশরীফ রাখলেন। সাহাবায়ে কেরাম মহান দরবারে উপস্থিত আছেন; কিন্তু মজলিসে নিরবতা বিরাজ করছিল। মনে হচ্ছিল কারো জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। আমি রাসূলে পাকের দরবারে আরয করলাম, আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক! কার জন্য অপেক্ষা? এরশাদ ফরমালেন, আহমাদ রেযার জন্য এ অপেক্ষা। আরয করলাম, কে সে ? এরশাদ হলো, হিন্দুস্থানের বেরিলীর বাসিন্দা। স্বপ্ন ভাঙার পর খোঁজ নিলাম। জানতে পারলাম, মাওলানা শাহ আহমাদ রেযা খুবই উঁচু মানের একজন আলেম। তিনি জীবিত আছেন। তাই সাক্ষাতের দারুন আগ্রহ নিয়ে বেরেলী শরীফ পৌঁছেছি। এসে জানতে পারলাম যে, তাঁর ইন্তেকাল হয়ে গেছে। আর ওই ২৫ সফরই তার মৃত্যুকালের তারিখ ছিল। তাঁর সাথে সাক্ষাতের অদম্য আগ্রহে এ দীর্ঘ সফর করলাম কিন্তু আফসোস! সাক্ষাত করতে পারলাম না। এ মহান মনীষী ইন্তেকালের ৪ মাস বাইশ দিন পূর্বে কুরআন মাজীদের নি¤œবর্ণিত আয়াত দ্বারা নিজের ওফাতের তারিখ নির্বাচন করেন ১৩৪০ হিজরী। আয়াতটি হল- ويطاف عليهم بانية من فضة و اكواب অর্থাৎ জান্নাতে লোকেরা পূণ্যবানদের চতুপার্শ্বে রৌপ্য প্লেইট এবং গ্লাস নিয়ে প্রদক্ষিণ করবে। গোসল শরীফ, কাফন ও নামাযে জানাযা হযরত কিবলার কবর শরীফ খনন করেন সৈয়্যদ আযহার আলী সাহেব। সদরুশ শরীয়ত মুফতী আমজাদ আলী সাহেব অসয়ীত অনুযায়ী গোসল দিলেন। হাফেজ আমির হোসেন সাহেব মুরাদাবাদী তাঁর সহযোগী ছিলেন। মাওলানা সৈয়্যদ সোলায়মান আশরাফ ছাহেব, সৈয়দ মাহমুদ জান সাহেব, সৈয়্যদ মমতাজ আলী সাহেব ও জনাব মাওলানা মুহাম্মদ রেযা খাঁন ছাহেব প্রমুখ পানি ঢেলে ধৌত করার দায়িত্ব পালন করেন। জনাব হাকিম রেযা খাঁন সাহেব, জনাব লিয়াকত আলী খাঁন সাহেব রেজভী এবং মুন্সী ফেদা ইয়ারখাঁন রেজভী সাহেব পানি সরবরাহ করেন। মুফতীয়ে আযম হিন্দ মোস্তফা রেযা খাঁন ছাহেব অসীয়ত মোতাবেক দোয়া দরূদসমূহ উপস্থিত লোকদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। হুজ্জাতুল ইসলাম শাহ্ হামেদ রেযা খাঁন ছাহেব কপালের সিজদা স্থানে কাপুর লাগিয়ে দেন। ছদরুল আফাযিল সৈয়দ নঈম উদ্দীন মুরাদাবাদী সাহেব কাফন শরীফ বিছালেন। গোসল কাফনের পর দর্শনের সুযোগ দেয়া হয়। অতঃপর ঈদগাহে বিশাল জানাযা সম্পাদন করেন বাহারে শরীয়ত গ্রন্থ প্রণেতা মুফতী আমজাদ আলী রেজভী সাহেব (রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম)। মাজার শরীফ বেরেলী শরীফ শহরের সওদাগরাঁ মহল্লায় দারুল উলূম মানজারুল ইসলাম এর উত্তর পাশে এক আলীশান দালানের অভ্যন্তরে তাঁর মাজার শরীফ। তাঁর ওরস শরীফ; যা শরীয়তেরই প্রতিচ্ছবি, প্রতি বছর ২৫শে সফর অনুষ্ঠিত হয়। তাতে সারা ইসলামী বিশ্বের চতুর্দিক থেকে প্রসিদ্ধ ওলামা, খতীব ও পীর মাশায়েখ শরীক হয়ে ধন্য হয়ে থাকেন।

আলা হযরত  رحمة الله عليه  এর জীবনী আরো জানুন এখানে- ইমাম আহমদ রেজা 

Advertisements

গউছে পাকের ছেলেবেলা

Standard

হযরত সায়্যিদুনা আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একটি নাম; যাঁর কারামত জন্মলগ্ন থেকে একে একে বিকশিত হয়েছে। যা কিনা মুসলমানদের উপলব্ধির বিষয়। নিম্নে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় প্রকাশ হওয়া কারামাতসমূহ বর্ণনা করা হল।

       জন্মঃ হযরত সায়্যিদুনা আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ৪৭০হিজরীতে (১০৭৫খ্রিষ্টাব্দ) পবিত্র রমজান মাসের জুমার দিন এই ধরণীতে তাশরীফ আনেন। “মানাকেবে মিরাজিয়া” নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্মকালীন তাঁর চেহারা প্রতিভাত হচ্ছিল যেন চন্দ্রের কিরণ। মনে হয়েছিল সমগ্র ঘর উদ্ভাসিত হয়ে গেছে চাঁদের আলোয়।

তাঁর আব্বাজানের নাম হযরত আবু ছালেহ মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং তাঁর আম্মাজানের নাম হযরত উম্মুল খায়ের ফাতিমা রহমাতুল্লাহি আলাইহা। তাঁরা উভয়ই  ছরকারে মদীনা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশধর অর্থাৎ একজন হাসান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং অন্যজন হযরত  হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর পবিত্র বংশধর। এ জন্য “আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খাঁ বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত “হাদায়েক্বে বখশীশ” কাব্যগ্রন্থে’ সুন্দর বলেছেন –

“আপনি কেন হাসানী এবং হুসাইনী আর মহিউদ্দীন হবেন না?

যেহেতু আপনার বংশধারা দুই সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে।”

হযরত সৈয়্যদ আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি যখন দুনিয়ার বুকে তশরীফ আনেন তখন তাঁর আম্মাজানের বয়স ছিল ষাট। যে বয়সে সাধারণত মহিলাদের গর্ভধারণের ক্ষমতা লোপ পায়। এটাও গাউছে পাকের এক বৈশিষ্ট্যের কারণে যা আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে পেয়েছেন।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মানুষের কাছে মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রাব্বানী, গাউসুল আজম, গাউসুস সাক্বলাঈন, মহিউদ্দীন এবং সায়্যিদুল আউলিয়া হিসেবে পরিচিত। হযরত আল্লামা আবদুর রহমান জামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন –

“আঁ শাহ্-এ-ছরফরাজ কে গাউসুস সাক্বলাঈন আস্ত”

অর্থাৎ – তিনিই উচ্চ মর্যাদাবান বাদশাহ্ যিনি গাউসুস সাক্বলাঈন নামে জগতে পরিচিত।

মানাকেবে গাউসিয়া নামক কিতাবে শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন – হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় গায়েব হতে পাঁচটি আজিমুশ্শান কারামত প্রকাশ পেয়েছে।

      (১) যে রাত্রিতে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্ম লাভ করেন ঐ রাতে তাঁর সম্মানিত আব্বাজান আবু ছালেহ মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহি স্বপ্নে দেখলেন যে, সরওয়ারে কায়েনাত, ফখরে মওজুদাত, আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে তাঁর ঘরে তশরীফ আনলেন এবং ঐ ঘরে সমস্ত ইমাম ও আউলিয়ায়ে কেরাম উপস্থিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সম্বোধন করলেন-

“হে আবু ছালেহ! আল্লাহ্ তায়ালা তোমাকে এমন এক সন্তান দান করেছেন যিনি অলিকুল শিরোমনি এবং আমার সন্তান। সে আমার এবং আল্লাহর বন্ধু। অচিরেই তাঁর মর্যাদা অলিদের এবং কুতুবদের মধ্যে এমন হবে যেমন আমার মর্যাদা অন্যান্য নবীদের উপর।”

কবি সুন্দর বলেছেন-

 গাউসে আজম দরমিয়ানে আউলিয়া

চুঁ জনাবে মুস্তফা দর আম্বিয়া।

 অর্থাৎ,নবীগণের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে ফজিলত, গাউসে পাকেরও অন্যান্য অলিদের উপর সেই ফজিলত।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বাণীর দিকে ইঙ্গিত করে আ’লা হযরত বলেন –

 জো অলী কব্‌ল থে ইয়া বা’দ হুয়ে ইয়া হোঙ্গে

ছব আদব রাখতে হ্যাঁয় দিল মে মেরে আক্বা তেরা।

অর্থাৎ, যে সমস্ত অলি গাউসে পাকের আগে এবং পরে হয়েছেন সবাই তাঁদের অন্তরে আমার গাউসে পাকের মুহাব্বত রাখেন।

       (২) গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় দেখা গেল তাঁর কাঁধ মোবারকের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র কদম শরীফ (অর্থাৎ পদ চিন্‌হু‎) ছিল। যা তাঁর অলীয়ে কামিল হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল বহন করে।

      (৩) গাউসে পাকের পিতাকে আল্লাহ্ তায়ালা স্বপ্নে সুসংবাদ দিলেন যে, তোমার যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে তিনি সমস্ত অলিদের বাদশাহ্ হবেন। যারা তাঁর বিরোধিতা করবে তারা পথভ্রষ্ট এবং ধর্মহারা হবে।

      (৪) যে রাতে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্ম গ্রহণ করেন সে রাতে জিলান শহরের যে সমস্ত মহিলা সন্তান প্রসব করেন তারা সবাই আল্লাহর ইচ্ছায় ছেলে সন্তানের জন্ম দেন এবং পরবর্তীতে সেসব ছেলে সন্তান আল্লাহর অলী হয়েছেন।

     (৫) গাউসে পাকের জন্ম মাস ছিল রমজানুল মোবারক। তিনি সে দিন থেকে রোযা রাখা আরম্ভ করলেন। সেহ্‌রী থেকে ইফতারের পূর্ব সময় পর্যন্ত কিছুই খেতেন না। তাঁর সম্মানিত পিতা বর্ণনা করেন- আমার সন্তান যখন দুনিয়ার মধ্যে তশরীফ আনেন তখন রমজান মাস ছিল। সারা দিন দুধ পান করতেন না। তাঁর জন্মের দ্বিতীয় বৎসরে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় রমজানের চাঁদ দেখা যায়নি। তাই লোকজন আমার ঘরে এসে এ ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তখন আমি তাদেরকে বললাম- আমার আবদুল কাদের আজ দুধ পান করেনি। এরপর তৎকালীন ইমামগণ ঐক্যমতে পৌঁছলেন যে, নিশ্চয়ই আজ রমজানের দিন।

গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কিছুদিন পর তাঁর প্রিয় পিতাকে হারান। সে সময় তাঁর প্রিয় নানা তাঁর কর্তৃত্বের ভার নেন। তাঁর নানা ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত বুজুর্গ ব্যক্তি। তিনি তাঁর পবিত্র নাতিকে অলিয়ে কামেল করার জন্য দোয়া করলেন।

ছোটবেলা থেকে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু খেলাধুলা থেকে বিরত থাকতেন। অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জীবন যাপন করতেন। অতিরিক্ত কথাবার্তায় বলতেন না। গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন – আমি যখন অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলা করার ইচ্ছা করতাম তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন অদৃশ্যে থেকে বলতেন – হে আবদুল কাদের! খেলাধুলা থেকে বিরত থাক। – (খোলাছাতুল মফাহির)

বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি পড়ার উপযুক্ত হলেন, তখন তাঁকে মক্তবে ভর্তি করানো হয়েছিল কোরআনুল করীম পড়ার জন্য। উস্তাদের সামনে তিনি নম্রতার সাথে বসলেন, উস্তাদ বললেন- পড়ূন! “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম” । তিনি বিসমিল্লাহ্ এর সাথে সূরা বাক্বারার শুরু থেকে পড়তে আরম্ভ করেন। উস্তাদ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কী ব্যাপার? তিনি উত্তর দিলেন হে প্রিয় উস্তাদ, আমিতো এই কোরআন আমার মায়ের মুখে মুখে গর্ভাবস্থায় শিখেছি (সুবহানাল্লাহ্)।

হুজুর গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন- আমি যখন মাদ্রাসায় যেতাম তখন এক ফেরেশতা আমার সাথে থাকতেন এবং আমাকে দিক নির্দেশনা দিতেন।-(কালায়েদে জাওহার)

হুজুর গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন – এক ফেরেশতা আমার সাথে সাথে চলতে চলতে গন্তব্য স্থানে গিয়ে বলেন- হে লোকেরা আল্লাহর অলীর জন্য জায়গা করে দিন যাতে তিনি বসতে পারেন। অন্যান্য ফেরেশ্তা ঐ ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কে? ফেরেশতাটি জবাবে বলেন- তিনি হলেন অলীদের সরদার। –(বাহজাতুল আসরার)

হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জিলানের এক মকতবে অধ্যয়নরত ছিলেন। ইত্যবসরে তাঁর কফিল (অভিবাভক) নানাজান ইহজগৎ ত্যাগ করেন। তখন তাঁর সম্পূর্ণ দায় -দায়িত্ব বর্তায় তাঁর আম্মাজানের উপর। একদিন তিনি রাস্তা দিয়ে হাটছিলেন। হঠাৎ আওয়াজ এল – “মা লিহাজা খুলিক্বতা ওয়ালা বিহাজা উমিরতা” অর্থাৎ হে আবদুল কাদের ! আপনাকে এজন্য সৃজন করা হয়নি।কথা শুনার পর তাঁর অন্তরে আল্লাহর মুহাব্বত যেন সমুদ্রের  ঢেউয়ের মত আঁছড়ে পড়ছিল। এরপর তিনি আল্লাহ্‌কে পাবার জন্য মুরাকাবা, মুশাহাদায় লিপ্ত হয়ে যান এবং নিরবিচ্ছিন্নভাবে শরীয়ত ও তরীক্বতের কাজ করার লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করেন।

প্রবন্ধ সংগৃহীতঃ মাসিক তরজুমান

মজযুব ওলী চিনার উপায়

Standard

মজযুব শব্দটি মূলত আরবী। এর মূলধাতু হল- “জযবা” । জযবা শব্দের অর্থ হচ্ছে- আকর্ষণ। মজযুব শব্দের অর্থে ফিরোজুল লুগাত অভিধানে বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহর ভালবাসায় নিমজ্জিত, আল্লাহর ভালোবাসায় দুনিয়া হতে বিচ্ছিন্ন,আল্লাহর প্রতি আকর্ষিত, পাগল(আল্লাহর প্রেমে), দিওয়ানা সহ ইত্যাদি। মজযুব সাধারণত আউলিয়ায়ে কিরামদেরই একটি বৈশিষ্ট্য। সাধারণভাবে মজযুব হল তাদেরকেই বলে, যারা সর্বদা আল্লাহর প্রেম সাগরে নিমজ্জিত থাকে। যাদের জীবনযাপন সমাজের বাকি আট-দশজনের মত নয়। দুনিয়া হতে যারা নিজেরদেরকে পরিপূর্ণ বিমুখ করে আল্লাহমুখী হয়ে যান। যাদের মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত প্রকাশ পায়। বাহ্যিকভাবে তাদের দেখতে মনে হয় শরিয়ত বিবর্জিত। কিন্তু তারা আসলে তা নন। মূলত তারা শরিয়তের চত্বরেই আছেন।

তাসাউফের কিতাব সমূহে এসেছে, আল্লাহর অলীদের মধ্যে দুইটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, ১. সালিক(স্বাভাবিক, যাদের চলাফেরা সমাজের বাকি আট-দশজনের মতই), ২. মজযুব(এরঅর্থ উপরোল্লিখিত হয়েছে) । এখন অলীদের মধ্যে এই দুই বৈশিষ্ট্যের আধিক্যের দিক থেকে অলীদের শ্রেণি আবার দুই ধরনের হয়ে থাকে। ১. মজযুবে সালিক : যার মধ্যে সালিক বৈশিষ্ট্য হতে মজযুব বৈশিষ্ট্য অধিকহারে থাকে। ২.সালিকে মজযুব : যার মধ্যে মজযুব বৈশিষ্ট্য হতে সালিক বৈশিষ্টের আধিক্য বেশি।

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই তাসাউফের সূচনা। তাসাউফ এমন একটি নেয়ামত, যার মাধ্যমেই কেবল আল্লাহকে পরিপূর্ণরুপে চেনা সম্ভব। এবং এই তাসাউফের চর্চা স্বয়ং নবীজীর প্রকাশ্য জিন্দেগী হতেই হয়ে আসছে। যার চর্চাকারী ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা। তারই ধারবাহিকতায় এটি আউলিয়ায়ে কিরামগণ পর্যন্ত এসে স্থির হয়েছে। অথচ আফসোস, আজ যে যেভাবে পারছে শরিয়তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাসাউফের নামে ভন্ডামি করে যাচ্ছে। আর এতে করে সাধারণ মুসলমানদের অন্তরে তাসাউফ সম্পর্কে এক বিরুপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম নিচ্ছে। অথচ তাসাউফ হচ্ছে শরিয়তেরই একটি নির্যাস। তাই বর্তমানে তাসাউফকে রক্ষার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই তাসাউফের নামে এসব ভন্ডদেরকে প্রতিহত করাটা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

সুতরাং বুঝা গেল মজযুব এবং সালিক ব্যতীত আল্লাহর অলী কল্পনাই করা যায় না। কারো মধ্যে সালিক অবস্থাটা মজযুব অবস্থাটা থেকে অধিক থাকে, আর কারো মধ্যে তার বিপরীত। অর্থাৎ কমবেশি দুটি অবস্থায়ই বিদ্যমান থাকে। আমাদের নিকট দৃশ্যায়ন সেটাই হয়, যেটার আধিক্য তার মধ্যে বেশি। এখন আসছি মূল প্রসঙ্গে। বর্তমান সময়ে আমাদের তাসাউফ সম্পর্কে বিশ্বাসকে পুঁজি করে একশ্রেণীর লোকেরা নিজেদেরকে মজযুব দাবি করে। অথচ প্রকৃত মজযুব ব্যক্তি কখনো কাউকে বলে না যে, সে মজযুব। বলবেই বা কেমনে, আল্লাহর প্রেমে সে এতটাই বিভোর যে, সে যে মজযুব কি না, এটাই সে জানে না । অন্যদিকে স্ব-ঘোষিত মজযুব নিজ ইচ্ছায় হাতে চুরি, চুলে জটা, নাভি পর্যন্ত দাঁড়ি সহ সমগ্র শরীর লাল কাপর দ্বারা আবৃত রেখে নিজেকে মজযুব জাহির করা শুরু করে। অথচ প্রকৃত মজযুবরা কখনোই তা নিজ ইচ্ছায় করেন না, যা কিছু করেন, সবই আল্লাহর হুকুমেই করেন। এসব ভন্ড মজযুবদের খোজ নিলে দেখা যায়, তারা স্ত্রী-সন্তান লালন-পালন সহ আবার তারা স্ত্রী সম্ভোগও করে। হাট-বাজার সহ দুনিয়াবি যাবতীয় কার্যাদিও তারা সম্পাদন করে। অথচ প্রকৃত মজ্জুব যারা, তারা দুনিয়া হতে একেবারেই বিমুখ, স্ত্রী-সন্তান সহ পরিবার পরিজন সবাইকে ভুলে এক এলাহির প্রেমে সর্বদা পাগলপারা থাকেন। অপরদিকে এসকল তথাকথিত মজযুব’রা নামায-রোযার কথা আসলেই নিজেকে মারেফাতী ঘোষণা দিয়ে মারেফাত নামক পবিত্র বস্তুকে অপব্যাখ্যার দ্বারা শরিয়ত কে নাস্তানাবুদ করার অপকৌশলে লিপ্ত হয়। অথচ শরিয়তবিহীন মারেফাত একেবারেই নিস্প্রাণ। তাই এখন আমরা চতুর্দশ শতাব্দীর মহান মুজাদ্দিদ, আ’লা হাযরাত, আযিমুল বারকাত, ইমাম শাহ আহমাদ রাযা খাঁ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র জবান মুবারক থেকে জেনে নিব “মজযুব অলী” চেনার উপায়।

আলা হযরত বলছেন, হযরত মূসা সোহাগ রহমাতুল্লাহি আলাইহি মসজিদে গেলেন এবং খুতবা শ্রবণ করলেন। খুতবা শেষে জামা’আতের প্রস্তুতি শুরু হল। ইমাম সাহেব এর “আল্লাহু আকবার” তাকবীর শুনতে না শুনতেই হযরত মূসা সোহাগ রহমাতুল্লাহি আলাইহি’র অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল। তিনি বলতে লাগলেন- “আল্লাহু আকবার আমার স্বামী, তিনি চিরঞ্জীব এবং কখনোই মরবেন না। তিনিই আমাকে বিধবা করে দেন।” এতটুকু বলতে না বলতেই তৎক্ষণাৎ তাঁর আপাদমস্তক লাল পোষাক দ্বারা আবৃত হয়ে গেল এবং হাতে চুড়ি দেখা গেল। (আফসোস) অন্ধ অনুসরনের কারণে উনার মাজার শরিফ সংলগ্ন কতেক ব্যক্তিকে দেখা যায় যে, তারা চুল বড় রাখে এবং হাতের মধ্যে চুড়ি জাতীয় অলংকার পরিধান করে। এটা গোমরাহী। হযরত মুসা সোহাগ রহমাতুল্লাহি আলাইহি হক্ব ছিলেন; অথচ তার এসব অনুসারীরা গুনাহগার। (এটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, মজযুব ব্যক্তির অনুসরণ শরিয়তে জায়েয নেই। তথাপি তিনি মজযুব হয়েছেন, কারো অনুসরণ করে না, আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই তার মত মজযুব সেজে স্বেচ্ছায় ঘুরে বেড়িয়ে তার অনুসরণ করাটা গোমরাহী- মহিউদ্দীন )
(সূত্র: মালফুযাতে আ’লা হাযরাত, দ্বিতীয় খন্ড)

সুতরাং এর দ্বারা এটাই বুঝা গেল যে, কোন প্রকৃত মজযুব কখনোই শরীয়তের মোকাবেলা করবেনা। শরিয়তকে একবাক্যে-এক কথায় নতশিরে কুর্নিশ জানাবে। অথচ বর্তমানে স্বঘোষিত মজযুব’রা শরিয়তের কোন তোয়াক্কা-ই করে না। নিজেদেরকে মারেফাতী আখ্যা দিয়ে যাচ্ছেতাই করে বেড়াচ্ছে। এরা মনগড়াভাবে এ কথাও বলে বেড়ায় যে, তরিকতে প্রবেশ করলে শরিয়তের কোনই প্রয়োজন নাই।নাউজুবিল্লাহ। অথচ তারা কি দেখাতে পারবে যে, কোন প্রকৃত মজযুব অলী কখনো এরকম ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা বলে গিয়েছেন? ইনশা’আল্লাহ, কিয়ামত পর্যন্ত তারা এই কথা প্রমাণ করতে পারবে না। তাই আমি মনে করি এরা মজযুব বেশে মজযুব অলীর দুশমন। তাসাউফে বিশ্বাসী মানুষদের সরলতার সুযোগ নিয়েই তারা মূলত এই অপকর্মগুলো করে থাকে। শুধু তাই নয়, এদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না বিভিন্ন পবিত্র মাজার শরীফ সমূহ। অথচ মাজারে আরামরত আল্লাহর অলী তাঁর জীবদ্দশাতে কখনোই এরকম উপদেশ দেননি এবং এই জীবনযাপনকে সমর্থনও করেননি।

এই অভাগারা পবিত্র মাজার সমূহে অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে সাধারণ মুসলমানদেরকেও দিনকে দিন মাজার বিমুখী করে ফেলছে। আর এ সুযোগে নবী-অলী বিরোধী লোকেরা সাধারণ মানুষদেরকে এসব দেখিয়ে অলী বিদ্বেষী করে তোলার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা’র রহমত এবং ফুয়ুজাত প্রাপ্তির অন্যতম স্থান হচ্ছে এসকল পবিত্র মাজার সমূহ। তাই আমাদেরকে অবশ্যই এসব ভন্ডদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। মাজার সমূহকে এদের হীন আগ্রাসন হতে রক্ষা করতে হবে। মানুষের অন্তরে তাসাউফের নামে এ সকল ভন্ডদের বিরুদ্ধে চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে। আর যদি তা আমরা না করি, তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো আর আমাদের মত তাসাউফকে আকড়িয়ে ধরার সেই সৌভাগ্য কখনো হাসিল করবেনা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এবং সকল আউলিয়ায়ে কিরামের উসিলায় যাবতীয় কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত মতবাদ হতে সংরক্ষিত রাখুন। আমিন

পীরকে বাবা বলা যাবে কিনা?

Standard

প্রথম প্রশ্নের উত্তর ঃ 

‘বাবা’ এই শব্দটা কেবল মাত্র জন্মদাতা বাবার জন্য খাস নয়। বাবা বলে কাউকে ডাকলেই তার মানে সে জন্মদাতা বাবা তা নয় এর উদাহরণ আমরা আসে পাশে ও নিজের পরিবারে লক্ষ্য করতে পারি। আমার ছোট শিশু বাচ্চাদের স্নেহ ভালো দিয়ে ‘বাবা শোনো’ ‘বাবা এসো’ ইত্যাদি বলি অতএব এখানে শিশুদের ক্ষেত্রে আমরা ‘বাবা’ শব্দটি স্নেহ ভালোবাসার উদ্দেশ্যে ব্যাবহার করছি। আমরা চাচা কাকা নিজের জন্মদাতা বাবার নিজের ও দূর সম্পর্কের ভাইদেরকে আমরা ‘বড় বাবা,ছোট বাবা,মেজো বাবা’ ইত্যাদি ভাবে ডেকে থাকি ।এখানে আমরা ‘বাবা’ শব্দটি কাকা বা চাচা এই অর্থে ব্যাবহার করছি । এই সব ক্ষেত্রে যখন আমরা পরিবার ও সমাজে ‘বাবা’ শব্দটি ব্যবহার করছি তখন তাতে কোন দোষ ওহাবী দেওবন্দী নবী ওলির দূশমনরা দেখতে পাইনা যখন কোন আল্লাহর ওলির ক্ষেত্রে যেমন ‘খাজা বাবা’ ‘দাতা বাবা’ ‘পীরবাবা’ ইত্যাদি ব্যাবহার করা হয় তখন আর তাদের সহ্য হয়না তখন হয়ে যায় দোষ ?
আমি প্রথমেই কুর’আন শরীফের একটি আয়াত দিয়ে পোস্ট শুরু করেছি সেটি হলো  পারা ১৭,সূরা আল- হজ্ব-আয়াত-৭৮ এখানে আল্লাহ এব্রাহিম আলাইহিস সাল্লামকে মুসলমানঅদের বা জাতির পিতা বলে ঘোষণা করেছেন, কিন্তু তিনিও তো আমাদের জন্মদাতা বাবা না তবুও কেন আল্লাহ ইব্রাহিম আলাইহিস সাল্লাম কে জাতির বাবা বলে ঘোষণা করেছেন ? 

Quote from the Holy Qur’an: Al-Ahzaab (33:6)


النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ ۖ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ ۗ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَىٰ بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ إِلَّا أَنْ تَفْعَلُوا إِلَىٰ أَوْلِيَائِكُمْ مَعْرُوفًا ۚ كَانَ ذَٰلِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُورًا


এই নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও অধিক অন্তরঙ্গ, আর তাঁর পত্নীগণ হচ্ছেন তাদের মাতা। আর গর্ভজাত সম্পর্কধারীরা — তারা আল্লাহ্‌র বিধানে একে অন্যে অধিকতর নিকটবর্তী মুমিনদের ও মুহাজিরদের চাইতে, তবে তোমরা যেন তোমাদের বন্ধুবর্গের প্রতি সদাচার করো। এমনটাই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে।



উল্লেখিত আয়াতে এখন প্রশ্ন জাগে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম) ’র পবিত্র স্ত্রীগণ যদি মুমিন মুসলমানের মাতা হন,তাহলে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম) কি? নিঃসন্দেহে এ প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়,নবী পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম) তা হলে বাবা। এই রকম হাদিস শরীফেও আমরা অনেক লক্ষ্য করি।


باب فِي ذَرَارِيِّ الْمُشْرِكِينَ 

حَدَّثَنَا مُوسَى بْنُ إِسْمَاعِيلَ، حَدَّثَنَا حَمَّادٌ، عَنْ ثَابِتٍ، عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَجُلاً، قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيْنَ أَبِي قَالَ ‏”‏ أَبُوكَ فِي النَّارِ ‏”‏ ‏.‏ فَلَمَّا قَفَّى قَالَ ‏”‏ إِنَّ أَبِي وَأَبَاكَ فِي النَّارِ ‏”‏ ‏.‏


পরিচ্ছদঃ ১৮. মুশরিকদের সন্তান-সন্ততি সম্পর্কে।

৪৬৪৩. মূসা ইবন ইসমাঈল রহমাতুল্লাহ আলাইহি ………. আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করেঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা কোথায়? তিনি বলেনঃ তোমার পিতা জাহান্নামে। যখন সে চলে যাচ্ছিল, তখন তিনি বলেনঃ আমার ও তোমার পিতা জাহান্নামে।

সূনান আবু দাউদ (ইফাঃ)

হাদিস নম্বরঃ [4643]

অধ্যায়ঃ ৩৫/ সুন্নাহ (كتاب السنة)

উপরিউক্ত হাদিসে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার পিতা বলতে আবু লাহাবকে বলেছেন।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় নবী আলাইহিস সাল্লাম, চাচা ,কাকা, ছোট, স্নেহাশিষ ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমারা ‘বাবা’ শব্দটি ব্যাবহার করতে পারি। তবে আমরা কেন আল্লাহর ওলিদের ক্ষেত্রে বা পীর মাশায়েখদের ক্ষেত্রে যাদের কাছ থেকে আমরা শরীয়ত ও মারিফতের জ্ঞান লাভ করি তাদের সম্মানে বাবা শব্দটি ব্যাবহার করতে পারবো না ?
যেখানে আল্লাহ ওলি দের সমন্ধে বলেছেন 
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন,
” আলা ইন্না আওলিয়া আল্লাহি লা খাওফুন আ ’লাইহিম ওয়া লাহুম ইয়াহ্ঝানুন। আল্লাযীনা আ ’মানূ ওয়া কানূ ইয়াত্তাকানূন।” অর্থ- “জেনে রাখ নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলিদের কোন ভয় নাই এবং তাহারা দুঃখিতও হবে না। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে। সূরা ইউনুস ১০: ৬২- ৬৩।
”নিশ্চয়ই তোমাদের ওলি হলেন আল্লাহ এবং তাঁর রসুল আর ঈমানদার লোকেরা- যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দিয়ে দেয়, এবং আল্লাহর প্রতি অনুগত বাধ্যগত থাকে। যারা ওলি মানে আল্লাহকে এবং আল্লাহর রসুলকে আর ঈমানদার লোকদেরকে, তারাই আল্লাহর দল এবং আল্লাহর দলই থাকবে বিজয়ী”। (সূরা আল মায়িদা,আয়াত-৫৫-৫৬)”
অবশ্যই “পীরবাবা” ‘খাজা বাবা’ ‘দাতা বাবা’ বলা জায়েয রয়েছে।

দ্বিতয় প্রশ্নের উত্তর ঃ
বাবা থাকতে পীর ধরা বা পীরের হাতে বায়াত হওয়া কেমন ? এর উত্তর আমাদের জানতে আমাদেরকে আগেই জানতে হবে পীর ধরা বা পীরের হাতে বায়াত  হওয়ার কারণ কি?
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে
ইরশাদ করেছেন-
ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁَﻣَﻨُﻮﺍ ﺍﺗَّﻘُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﻛُﻮﻧُﻮﺍ ﻣَﻊَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ
অনুবাদ-হে মুমিনরা! আল্লাহকে ভয় কর,
আর
সৎকর্মপরায়নশীলদের সাথে থাক।
{সূরা তাওবা-১১৯)
এ আয়াতে কারীমায় সুষ্পষ্টভাবে
বুযুর্গদের
সাহচর্যে থাকার নির্দেশ দেয়া
হয়েছে।
ﺍﻫْﺪِﻧَﺎ ﺍﻟﺼِّﺮَﺍﻁَ ﺍﻟْﻤُﺴْﺘَﻘِﻴﻢَ ﺻِﺮَﺍﻁَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻤْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ
অনুবাদ- আমাদের সরল সঠিক পথ
[সীরাতে মুস্তাকিম] দেখাও। তোমার
নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দাদের পথ। {সূরা
ফাতিহা-৬,৭}
সূরায়ে ফাতিহায় মহান রাব্বুল
আলামীন তাঁর
নিয়ামাতপ্রাপ্ত বান্দারা যে পথে
চলেছেন
সেটাকে সাব্যস্ত করেছেন সীরাতে
মুস্তাকিম।
আর তার নিয়ামত প্রাপ্ত বান্দা
হলেন-
ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻢَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺼِّﺪِّﻳﻘِﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺸُّﻬَﺪَﺍﺀِ
ﻭَﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴﻦَ
অনুবাদ-যাদের উপর আল্লাহ তাআলা
নিয়ামত
দিয়েছেন, তারা হল নবীগণ,
সিদ্দীকগণ,
শহীদগণ, ও নেককার বান্দাগণ। {সূরা
নিসা-৬৯}
এ দু’আয়াত একথাই প্রমাণ করছে যে,
নিয়ামতপ্রাপ্ত
বান্দা হলেন নবীগণ, সিদ্দীকগণ,
শহীদগণ,
আর নেককারগণ, আর তাদের পথই সরল
সঠিক
তথা সীরাতে মুস্তাকিম। অর্থাৎ
তাদের অনুসরণ
করলেই সীরাতে মুস্তাকিমের উপর
চলা হয়ে যাবে।
যেহেতু আমরা নবী দেখিনি,
দেখিনি সিদ্দীকগণও, দেখিনি
শহীদদের। তাই
আমাদের সাধারণ মানুষদের কুরআন
সুন্নাহ
থেকে বের করে সীরাতে
মুস্তাকিমের উপর
চলার চেয়ে একজন পূর্ণ
শরীয়তপন্থী হক্কানী বুযুর্গের অনুসরণ
করার
দ্বারা সীরাতে মুস্তাকিমের উপর
চলাটা হবে সবচেয়ে সহজ। আর একজন
শরীয়ত
সম্পর্কে প্রাজ্ঞ আল্লাহ ওয়ালা
ব্যক্তির সাহচর্য
গ্রহণ করার নামই হল পীর মুরিদী।
রাসূলে কারীম ﷺ একাধিক
স্থানে নেককার
ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ করার প্রতি
গুরুত্বারোপ
করেছেন। যেমন-
ﻋﻦ ﺃﺑﻲ ﻣﻮﺳﻰ ﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ﻋﻦ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ
ﻗﺎﻝ
‏( ﻣﺜﻞ ﺍﻟﺠﻠﻴﺲ ﺍﻟﺼﺎﻟﺢ ﻭﺍﻟﺴﻮﺀ ﻛﺤﺎﻣﻞ ﺍﻟﻤﺴﻚ ﻭﻧﺎﻓﺦ ﺍﻟﻜﻴﺮ
ﻓﺤﺎﻣﻞ ﺍﻟﻤﺴﻚ
ﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﻳﺤﺬﻳﻚ ﻭﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﺗﺒﺘﺎﻉ ﻣﻨﻪ ﻭﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﺗﺠﺪ ﻣﻨﻪ ﺭﻳﺤﺎ ﻃﻴﺒﺔ
ﻭﻧﺎﻓﺦ ﺍﻟﻜﻴﺮ
ﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﻳﺤﺮﻕ ﺛﻴﺎﺑﻚ ﻭﺇﻣﺎ ﺃﻥ ﺗﺠﺪ ﺭﻳﺤﺎ ﺧﺒﻴﺜﺔ )
অনুবাদ- হযরত আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে
বর্ণিত। রাসূল ﷺ
ইরশাদ করেছেন-সৎসঙ্গ আর অসৎ সঙ্গের
উদাহরণ হচ্ছে মেশক বহনকারী আর
আগুনের
পাত্রে ফুঁকদানকারীর মত। মেশক
বহনকারী হয়
তোমাকে কিছু দান করবে কিংবা
তুমি নিজে কিছু
খরীদ করবে। আর যে ব্যক্তি আগুনের
পাত্রে ফুঁক দেয় সে হয়তো তোমার
কাপড়
জ্বালিয়ে দিবে, অথবা ধোঁয়ার গন্ধ
ছাড়া তুমি আর
কিছুই পাবে না।
{সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫২১৪, সহীহ
মুসলিম,
হাদীস নং-৬৮৬০, মুসনাদুল বাজ্জার,
হাদীস নং-৩১৯০,
সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৮৩১,
সহীহ
ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৬১,
মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদীস
নং-৪২৯৫,
মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৯৬৬০,
মুসনাদুল
হুমায়দী, হাদীস নং-৭৭০, মুসনাদুশ
শামীন, হাদীস
নং-২৬২২, মুসনাদুশ শিহাব, হাদীস
নং-১৩৭৭,
মুসনাদে তায়ালিসী, হাদীস নং-৫১৫}
এছাড়াও অনেক হাদীস নেককার ও
বুযুর্গ
ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণের প্রতি
তাগিদ বহন
করে। আর সবচে’ বড় কথা হল-বর্তমান
সময়ে অধিকাংশ মানুষই দ্বীন বিমুখ।
যারাও
দ্বীনমুখী, তাদের অধিকাংশই কুরআন
হাদীসের
আরবী ইবারতই সঠিকভাবে পড়তে
জানে না, এর
অর্থ জানবেতো দূরে থাক। আর যারাও
বাংলা বা অনুবাদ পড়ে বুঝে, তাদের
অধিকাংশই আয়াত
বা হাদীসের পূর্বাপর হুকুম, বা এ
বিধানের
প্রেক্ষাপট, বিধানটি কোন সময়ের
জন্য, কাদের
জন্য ইত্যাদী বিষয়ে সম্যক অবহিত
হতে পারে না। তাই বর্তমান সময়ে
একজন সাধারণ
মানুষের পক্ষে কুরআন সুন্নাহ
থেকে নিজে বের করে আল্লাহ
তাআলার উদ্দিষ্ট
সীরাতে মুস্তাকিমে চলা বান্দার
জন্য কষ্টসাধ্য। তাই
আল্লাহ তাআলা সহজ পথ বাতলে
দিলেন একজন
বুযুর্গের পথ অনুসরণ করবে,
তো সীরাতে মুস্তাকিমেরই অনুসরণ
হয়ে যাবে।

পীর হওয়ার জন্য শর্ত রয়েছে ১। সুন্নী ও সঠিক আক্বিদা হওয়া দরকার ,২।এতোটা জ্ঞান থাকা দরকার যে হাদিস কুর’আন ও কিতাব থেকে মাস’আলা মাসায়েল বের করে দিতে পারে,৩।ফাসিক না হওয়া ,৪। পীরের সিলসিলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সাল্লাম পর্যন্ত পৌছানো নাতো ফায়েজ পৌছাবে না।


উপরিউক্ত গুনাবলী যদি জন্মদাতা বাবা মধ্যে থাকে তাহলে সেখানে আপনি পীরের হাতে বায়াত না হলেও হবে কিন্তু যদিও সে পীরের হাতে বায়াত গ্রহণ করে তাতে ক্ষতি নাই।কেননা যত শিক্ষক থাকে সে ততো ইলম অর্জন করতে পারবে।

আল্লাহ আমাদের সকলকে বুঝার তৌফিক দান করুক । আমীন সুম্মামীন। ওয়া আখিরুদাওয়ানা আনিল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

ওলীগণের পাশে কবর দিলে উপকার পাওয়া যায়

Standard

আহলে হাদিস নাসিরুদ্দিন আলবানী তার আহাদিসুস দ্বঈফাহ গ্রন্থের ১/৫০১ পৃঃ,হাদিস নংঃ৬১৩ এ বলেন যে, মৃত ব্যক্তিকে কোন নেককার ওলী, হক্কানী আলেমের পাশে কবরস্থ করলে কোন উপকার নেই।অনুরুপভাবে জুনায়েদ বাবুনগরী তার প্রচলিত জাল হাদিস বইয়ের ১৯৬ পৃষ্ঠায় এর সমালোচনা করেন।
জবাবঃ

হাদিস নং:১
“হযরত আবু হুরায়রা(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন,তোমরা মৃত ব্যক্তিদেরকে (যথাসম্ভব) নেক বান্দাদের মাঝে দাফন করবে, নিশ্চয় মৃত ব্যক্তিগণ খারাপ প্রতিবেশী দ্বারা কষ্ট অনুভব করে।যেরুপ জীবিতগণ খারাপ প্রতিবেশী দ্বারা কষ্ট পেয়ে থাকে।ইমাম সৈয়ুতি হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন- হাদিসটি সনদে দুর্বল।( শরহুস সুদুরঃ১৩পৃঃ)
★দায়লামীঃ ফিরদাউসঃ১/১০২পৃঃ,হাদিসঃ৩৩৭;দারুল কুতুব,ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন

★ইমাম সৈয়ুতিঃশরহুস সুদুর-১৩পৃঃ, আদ্দুরুল মুনতাসিরাহঃ১/৬৬পৃঃ,জামেউল হাদিসঃ২/১০৫পৃ: হাদিসঃ৯৯২,

★ আবু নঈম ইস্পাহানীঃহুলিয়াতুল আউলিয়াঃ৬/৩৫৪পৃঃ,দারুল কুতুব আরাবি,বৈরুত

★ ইমাম নাবহানীঃফতহুল কবীরঃ১/৫৯পৃঃ,হাদিসঃ৫০৮

★ইমাম সাখাভীঃমাকাসিদুল হাসানাঃ৫১পৃঃহাদিসঃ ৪৭

★ইমাম আযলূনীঃকাশফুল খাফাঃ১/৬৪পৃঃ,হাদিসঃ১৬৯

★ইমাম সৈয়ুতিঃজামেউস সগীরঃ১/৩০পৃঃ,হাদিসঃ৩১৮

★ ইমাম আসকালানীঃলিসানুল মিযানঃ৩/৯৯পৃঃ

★মুত্তাকী হিন্দীঃকানযুল উম্মালঃ১৫/৫৯৯পৃঃ, হাদিসঃ৪২৩৭১

★ ইবনে আসাকীরঃতারিখে দামেস্কঃ৫৮/৩৭৭-৩৭৮পৃঃহাদিসঃ৭৪৭৩

★ হিব্বানঃমাজরুহীনঃ১/২৯১পৃঃহাদিসঃ৩২৫

★ আলবানী দ্বঈফুল জামেঃহাদিসঃ২৬৩
ইমাম সৈয়ুতি তার জামেউস সগীর গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন, আমি এই গ্রন্থকে জাল হাদিস থেকে হিফাজত করেছি।(জামেউস সগীরঃ১/৫পৃঃ)

তাই হাদিসটি কোন মতেই জাল হতে পরে না।

অপরদিকে আল্লামা আযলুনী বলেন যে,ইমাম মানাবী উক্ত হাদিস প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন-

” নিশ্চয় উক্ত ঘটনাটি বিভিন্ন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় , এটার ভিত্তি আছে( কাশফুল খাফাঃ১/৬৪)

হাদিস নং:২

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্নিত তিনি নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হতে বর্ননা করেন,রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এরশাদ করেন, যখন তোমাদের কেউ মৃত্যুবরণ করে,তাকে সুন্দর কাফন পরিধান করাও এবং তার অসিয়ত দ্রুততার সাথে পুর্ণ কর।তার কবর গভীরভাবে খনন কর এবং তাকে খারাপ প্রতিবেশী থেকে দূরে রাখ।বলা হল,হে আল্লাহর রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! নেক প্রতিবেশী পরকালে কি উপকারে আসবে? ইরশাদ করেন, দুনিয়ায় কি নেক প্রতিবেশী উপকার করতে পারে? তারা বললেন, হ্যাঁ পারে।রাসুল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ঐ রকমই নেক প্রতিবেশী পরকালেও উপকার করবে।
★ ইমাম সৈয়ুতিঃশরহুস সুদুরঃ১৩৪পৃঃ

★আযলুনীঃকাশফুল খাফাঃ১/৬৪পৃঃ,হাদিসঃ১৬৯

★ ইমাম সাখাভীঃমাকাসিদুল হাসানাঃ৫১পৃঃ,হাদিসঃ৪৭
হাদিস নং:৩

“হযরত আবদুল্লাহ ইবনে না’ফে আল মুজনী(রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, মদীনাতে এক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল সেখানে তাকে দাফন করা হয়।অতঃপর কোন এক ব্যক্তি তাকে স্বপ্নে দেখল।সে জান্নামের আযাবে রয়েছে।এতে সে চিন্তায় ডুবে গেল।অতঃপর সাত বা আট দিনপর তাকে আবার দেখানো হল, সে জান্নাতের নেয়ামতের মধ্যে আছে।তখন সে তাকে(স্বপ্নে এ বিষয়) জিজ্ঞাসা করলে সে জবাবে জানায়, আমাদের নিকট একজন নেক বান্দাকে দাফন করা হয়েছে।সে তার চল্লিশজন পড়শীর ব্যাপারে সুপারিশ করেছেন।আমি তাদের ঐ চল্লিশজনের মধ্যে একজন ছিলাম।( আল্লাহ তার সুপারিশ কবুল করে আমাদের জান্নাত দান করেছেন)
★ইমাম সৈয়ুতিঃশরহুস সুদুরঃ১৩৫পৃঃ

★ ইমাম সৈয়ুতিঃআনবীয়ুল আযকিয়া ফী হায়াতিল আম্বিয়া

★ ইমাম আবিদ দুনিয়াঃ আল কুবুরঃ১/১২৮ পৃঃ,হাদিসঃ১৩৯
আল্লামা আযলুনী ও ইমাম সৈয়ুতি হযরত আলী সহ একাধিক সনদে তাদের গ্রন্থে আরও অনেক হাদিস উল্লেখ করেছেন।