সাহাবীর নামাজ

Standard

হযরত তালহা (রা:) প্রতিদিন নবীজীর পেছনে ফজরের নামাজ পড়েন। কিন্তু নামাজে সালাম ফিরানোর সাথে সাথে তিনি মসজিদে না বসে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যান।এভাবে কয়েকদিন চলার পর অন্যান্য সাহাবিরা এটা নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন যে, প্রতিদিন সালাম ফিরিয়েই তালহা চলে যান। অথচ নবীজী ফজরের পর সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে বসে বয়ান করেন।অন্যান্য সব সাহাবিরাও রাসূলের কাছে বসে থাকেন। এক পর্যায়ে এই কথা নবীজীর কানে পৌছালো। নবীজী সাহাবিদের বললেন, আগামিকাল ফজরের নামাজ শেষে তালহা যেন আমার সাথে দেখা করে। পরের দিন নামাজে আসলে তালহাকে একথা জানিয়ে দেয়া হল। ফজরের নামাজ শেষ। তালহা বসে আছেন নবীজীর সাথে দেখা করার জন্য।একপর্যায়ে নবীজী তালহাকে ডাকলেন। নবীজী অতি মোলায়েম কন্ঠে তালহাকে বললেন, তালহা! আমি কি তোমাকে কোন কষ্ট দিয়েছি? আমি কি তোমার কোন হক নষ্ট করেছি?একথা শুনে তালহা কেদে ফেললেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসুল ল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জীবন আপনার জন্য উৎসর্গ হোক। আপনি আমার কোন হক নষ্ট করেননি। নবীজী সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তালহা! তুমি প্রতিদিন নামাজ শেষে আমার কাছে না বসে চলে যাও কেন?তালহা কেদে কেঁদে বললেন, রাসুল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার এবং আমার স্ত্রীর সতর ডাকার জন্য একটি মাত্র জামা আছে। যেটা পরে আমি যখন নামাজ পড়ি আমার স্ত্রী তখন উলংগ থাকেন। স্ত্রী যখন নামাজ পড়েন আমি তখন উলংগ থাকি। এক্ষেত্রে ফজরের নামাজের সময় একটু অসুবিধা হয়ে যায় ইয়া আল্লাহর রাসুল ল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।ফজরের নামাজে আসার সময় আমি আমার স্ত্রীকে একটা গুহায় রেখে আসি। এমতাবস্থায় আমি যদি নামাজ শেষে এখানে বসে থাকি তাহলে তো আমার স্ত্রীর নামাজটা কাজা হয়ে যাবে ইয়া আল্লাহর রাসূল।এজন্য আমি নামাজ শেষে দৌড়ে চলে যাই। তালহার কথা শুনে আল্লাহর রাসুল দরদর করে কেঁদে ফেলেন। নবীজীর দাঁড়ি বেয়ে বেয়ে চোখের পানি পড়তেছে। সাথে সাথে নবীজী তালহাকে জানিয়ে দিলেন, তালহারে! নিশ্চয়ই তুমি জান্নাতে যাবে। আল্লাহু আকবার।

নামায বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ গাইড লাইন পেতে এখানে ক্লিক করুন- নামাযের মাসআলা

তওবা ও ইসতিগফার

Standard

তাওবা ও ইস্তিগফার: ========================================= সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী —————————————————————– সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। # —————————————————————————————- তাওবা মানুষের জীবনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য, ইবাদতসমূহের মধ্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তা’য়ালার কাছে ওই মুমিন বান্দা অতি প্রিয়, যে পাপকাজ করার পর মহান আল্লাহর দরবারে তাওবা করে। আর তাওবা করার পাশাপাশি পাপকাজ থেকে ফিরে আসে। পাপকাজ করার পর অনুতপ্ত হয়ে যে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে সে পাপীদের মধ্যে উত্তম। তাওবা শব্দের অর্থ: ——————————————– তাওবা শব্দের অর্থ প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, অনুতাপ করা প্রভৃতি। পরিভাষায়: ইসলামি পরিভাষায় তাওবা বলতে বোঝায় আল্লাহ্র অবাধ্যতা থেকে আল্লাহ্র আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। কোনো পাপকাজ সংঘটিত হওয়ার পর অনুতাপ-অনুশোচনা করে সেই পাপ কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং সেই পাপকাজ ছেড়ে ভালো কাজে ফিরে আসা। কারও কারও মতে:التوبة: مصدر تاب ، الرجوع عن الذنب الندم على فعل الذنب ، وعقد العزم على عدم العودة إليه والتوجه إلى الله طلبا للمغفرة. (‘তাবা (تاب) ক্রিয়া হতে তাওবা (توبة) হলো মাসদার। অর্থ পাপ থেকে ফিরে আসা। কৃতপাপের অনুশোচনা করা। পুনরায় না করার দৃঢ়সংকল্প করা।’ কারও কারও মতে তাওবা অর্থ অনুতাপের সাথে পাপ পরিহার করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ﴾ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা সকলেই আল্লাহর কাছে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’[আন নূর-৩১] পক্ষান্তরে যদি গোনাহটি হাক্কুল ইবাদ সম্পর্কিত হয় তখন এক্ষেত্রে ৪টি শর্ত লক্ষণীয়। উপরিউক্ত তিনটি তো আছে। অপরটি হল, কোনো ভাইয়ের মাল হলে তা আদায় করে দিতে হবে। যদি অপরকে অপবাদ দেয়া হয়, তাহলে তার সেই অপবাদ দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে কিংবা তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। গুনাহ হলো ঘৃণ্য আবর্জনা যা সর্বাবস্থায় বর্জন করা আবশ্যক। গুনাহের এ আবর্জনা আমরা যদিও চোখে দেখি না, তার গন্ধ অনুভব করি না কিন্তু মানুষের অন্তরে এর প্রভাব লক্ষণীয়। মানুষ পাপের পর পাপ করতে থাকে এবং এক সময় তার অন্তর ঢেকে যায়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, كَلاَّ بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَّا كَانُواْ يَكْسِبُونَ‘কখনো নয়, বরং তারা যা অর্জন করত তাই তাদের অন্তরসমূহকে ঢেকে দিয়েছে’ (সূরা আল-মুতাফফিফীন:১৪)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, إِنَّ الْمُؤْمِنَ إِذَا أَذْنَبَ كَانَتْ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فِي قَلْبِهِ، فَإِنْ تَابَ وَنَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ، صُقِلَ قَلْبُهُ، فَإِنْ زَادَ زَادَتْ، فَذَلِكَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَهُ اللَّهُ فِي كِتَابِهِ‘মুমিন বান্দা যখন কোনো গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। আর যদি সে তাওবা করে নেয়, বিরত হয়ে যায়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় তবে তার অন্তর স্বচ্ছ ও মসৃণ হয়ে যায়। আর যদি সে আরো করে তবে দাগ আরো বেড়ে যায়, এটাই হলো অন্তর আচ্ছাদিত হয়ে যাওয়া যার উল্লেখ আল্লাহ তাঁর কিতাবে করেছেন’ (ইবনে মাজাহ, হাসান)। তওবার গুরুত্ব:¡ —————– ইসলামে তওবার গুরুত অপরিসীম। অসংখ্য আয়াত ও হাদীস থেকে এর গুরুত্ব সম্বন্ধে আমরা বুঝতে পারি। আল্লাহ তা‘আলা অপর আয়াতে এরশাদ করেন, ﴿إِنَّمَا ٱلتَّوۡبَةُ عَلَى ٱللَّهِ لِلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلسُّوٓءَ بِجَهَٰلَةٖ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٖ فَأُوْلَٰٓئِكَ يَتُوبُ ٱللَّهُ عَلَيۡهِمۡۗ وَكَانَ ٱللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمٗ ﴾ “আল্লাহ অবশ্যই সেসব লোকের তাওবা কবুল করবেন যারা ভুলবশত মন্দ কাজ করে এবং সত্বর তাওবা করে, ওরা তারাই, যাদের তাওবা আল্লাহ কবূল করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”[আন নিসা-১৭] আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, ﴿أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى ٱللَّهِ وَيَسۡتَغۡفِرُونَهُۥۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ﴾ “তবে কি তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে না ও তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”[আল মায়িদাহ- ৭৪] আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, ﴿أَلَمۡ يَعۡلَمُوٓاْ أَنَّ ٱللَّهَ هُوَ يَقۡبَلُ ٱلتَّوۡبَةَ عَنۡ عِبَادِهِۦ وَيَأۡخُذُ ٱلصَّدَقَٰتِ وَأَنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ ﴾ “তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন এবং সাদাকা গ্রহণ করেন এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।[আত তাওবাহ-১০৪] আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, ﴿ وَهُوَ ٱلَّذِي يَقۡبَلُ ٱلتَّوۡبَةَ عَنۡ عِبَادِهِۦ وَيَعۡفُواْ عَنِ ٱلسَّيِّ‍َٔاتِ وَيَعۡلَمُ مَا تَفۡعَلُونَ﴾ তিনিই তার বান্দাদের তাওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন।”[আশ্ শূরা-২৫] মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ﴿ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلتَّوَّٰبِينَ وَيُحِبُّ ٱلۡمُتَطَهِّرِينَ﴾“মহান আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন।” (সূরা আল বাকারা: ২২২) আল্লাহ আরও এরশাদ করেন, ﴿ وَمَن يَعۡمَلۡ سُوٓءًا أَوۡ يَظۡلِمۡ نَفۡسَهُۥ ثُمَّ يَسۡتَغۡفِرِ ٱللَّهَ يَجِدِ ٱللَّهَ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ﴾ “যে গোনাহ করে কিংবা নিজের অনিষ্ঠ করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও করুণাময় পায়।” (সূরা আন নিসা: ১১০) আল্লাহ আরও এরশাদ করেন, ﴿ نَبِّئۡ عِبَادِيٓ أَنِّيٓ أَنَا ٱلۡغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ . وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ ٱلۡعَذَابُ ٱلۡأَلِيمُ ﴾ “আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন, আমি অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়ালু, আর আমার আযাব হচ্ছে পীড়াদায়ক আযাব।” (সুরা হিজর: ৪৯-৫০) হাদীস শরীফে তাওবা: ———————– তাওবা সম্পর্কে হাদীস শরীফে অনেক বর্ণনা বিদ্যমান যেমন হযরত আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ্রقَالَ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ فِيكَ وَلَا أُبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ، وَلَا أُبَالِي، يَا ابْنَ آدَمَ إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً গ্ধ. “বরকতম আল্লাহ তা‘আলা বলেন: হে আদম সন্তান! যতক্ষণ তুমি আমাকে ডাকতে থাকবে এবং আমার থেকে (ক্ষমা লাভের) আশায় থাকবে, তোমার গুনাহ যত বেশিই হোক, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করি না। হে আদম সন্তান! যদি তোমার গুনাহর স্তুপ আকাশের কিনারা বা মেঘমালা বা আসমান পর্যন্তও পৌঁছে যায়, অতঃপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে কোন পরওয়া করি না। হে আদম সন্তান! যদি তুমি গোটা পৃথিবী ভর্তি গুনাহ্ নিয়েও আমার কাছে আস এবং আমার সাথে কাউকে শরীক না করে থাক, তাহলে আমিও তোমার দিকে পৃথিবী ভর্তি ক্ষমার দৃষ্টি দেব।[ মুহাম্মদ ইবন ‘ঈসা আত-তিরমিযী, জামি‘উত-তিরমিযী (দিমাশক: মাকতাবাতু ইবন হাজর, ১ম সংস্করণ, ১৪২৪ হি./২০০৪ খ্রি.), কিতাবুদ-দাওয়াহ, বাবু ফি ফাযাইলিত-তাওবাহ ওয়াল-ইস্তিগফার, হাদীস নং ৩৫৪০, পৃ. ৯৯৩-৯৯৪।] আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ্রالتائب من الذنب كمن لا ذنب لهগ্ধ. “যে ব্যক্তি পাপ থেকে তাওবা করে সে এমন হয়ে যায়, যেন তার কোন পাপই নেই।”[ইবন মাজাহ: ৪২৫০।] আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ্রكل ابن آدم خطاء وخير الخطائين التوابونগ্ধ“মানুষ মাত্রই পাপী, আর পাপীদের মধ্যে তাওবাকারীরাই উত্তম।[ জামে তিরমিযি, হাদীস নং২৪৯৯।] আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, والذى نفسى بيده لو لم تذنبوا لذهب الله بكم، ولجاء بقوم يذنبون ، فيستغفرون الله ، فيغفرلهم.“সে সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ। তোমরা যদি গোনাহ না করতে তবে আল্লাহ তোমাদেরকে ধ্বংস করে দিতেন। অতঃপর এমন এক জাতি সৃষ্টি করতেন যারা গোনাহ করতো অতঃপর তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং আল্লাহ তা‘আলা তাদের ক্ষমা করতেন।” অনুরূপভাবে আবূ মুসা আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা রাত্রিবেলা তাঁর কুদরতের হস্ত প্রসারিত করেন যাতে দিবাভাগের গোনাহগুলোর তওবা কবুল করেন। ওদিকে দিনের বেলায় কুদরতের হস্ত প্রসারিত করেন যাতে রাতের গোনাহ তওবা গ্রহণ করেন।[ সহীহ মুসলিম: ২৭৪৭।] আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ্রمَا مِنْ عَبْدٍ مُؤْمِنٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا فَيَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ الطُّهُورَ، ثُمَّ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ فَيَسْتَغْفِرُ اللَّهَ إِلَّا غَفَرَ اللَّهُ لَهُ “কোনো বান্দা যখন গোনাহ করে, তারপর সুন্দররূপে উযু করে দু‘রাকাত সালাত পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তার গোনাহ মাফ করে দেন।”[মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং: ৫৭৩৮।] নবী-রাসূলগন সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে সর্বাবস্থায় মুক্ত থাকার পরও আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁরা সর্বদা তাওবা করেন: —————————————————————— রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ্রيا أيها الناس توبوا إلى الله ، فإني أتوب في اليوم إليه مائة مرةগ্ধ “হে মানবম-লী! আল্লাহর নিকট তাওবা কর, আর আমিও দৈনিক একশত বার তাঁর নিকট তাওবা করি।”[সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭০২।] উল্লেখ্য যে, নবী-রাসূলগন সকল প্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে সর্বাবস্থায় মুক্ত, এর পরও আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁদের তাওবার উদ্দেশ্য হল, উম্মতদের শিক্ষা, বিনয় ও ন¤্রতার প্রকাশ এবং আল্লাহর অধিক নৈকট্য অর্জন। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন, ্র لله أشد فرحا بتوبة عبده المؤمنগ্ধ.“আল্লাহ তাঁর মু’মিন বান্দার তাওবার কারণে অধিকতর আনন্দিত হন[সহীহ মুসলিম, হাদীস নং২৭৪৪।]।” আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ্রلله أفرح بتوبة أحدكم من أحدكم بضالته إذا وجدهاগ্ধ. “তোমাদের কেউ তার হারানো মাল পুনঃপ্রাপ্তিতে যতটা আনন্দিত হয়, তোমাদের কারো তাওবায় (ক্ষমা প্রার্থনায়) আল্লাহ তার চেয়ে অধিক আনন্দিত হয়।”[জামে তিরমিযি, হাদীস নং২৪৯৯।] তাওবা-এর প্রকার: ———————————– ইমাম গাযালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাওবাকে চার প্রকারে বিভক্ত করেন: এক. বান্দাহ তাওবা করবে এবং স্বীয় তাওবার উপরে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবিচল থাকবে। অন্যায়, ত্রুটি-বিচ্যুতি যা হয়ে গেছে তার সাধ্যমত ক্ষতিপূরণ করবে এবং পরবর্তী সময় তার মনে মানুষের স্বভাবজাত চাহিদাগত সাধারণ ছোটখাট বিচ্যুতি ব্যতিরেকে কোনো গুনাহ সংঘটনের কল্পনাও উদিত হয় না। এ শ্রেণীর বান্দাহকে “সাবিকুম বিল খায়রাত” নামে অভিহিত করা হয়। এ প্রকারের তাওবাকে বলা হয় আত-তাওবাতুন-নাসূহ “নির্ভেজাল-পরিচ্ছন্ন তাওবা” এবং মন ও প্রবৃত্তির এই অবস্থার নাম হলো “আন নাফসুল মুতমাইন্না”( النفس المطمئنة ) দুই. তাওবাকারী প্রধান ও মৌলিক ইবাদতসমূহ যথাযথ আদায় করতে থাকে এবং বড় ধরনের অশ্লীলতা হতে আত্মরক্ষা করে থাকে। কিন্তু তার অবস্থা এই যে, সে সকল গুনাহ থেকে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারে না যা তার পরিবেশ ও সামাজিক অবস্থানের কারণে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তাকে পেয়ে বসে। সে নিজের প্রবৃত্তিকে তিরস্কার ও ভৎর্সনা করতে থাকে এবং অনুতপ্ত হয়। গুনাহর কার্য সম্পাদনের পর পর পুনঃ এ সংকল্প করে যে, সামাজিক ও পরিবেশগত যেই পরিস্থিতির কারণে তার দ্বারা এ গুনাহ সংঘটিত হলো তা হতে সে দূরে অবস্থান করবে এবং নিজেকে রক্ষা করে চলবে। এই প্রকৃতির প্রবৃত্তিকে “আন-নাফসুল লাওয়ামা” (النفس اللوامة) বলা হয়। তাওবাকারীগণ এই দলভুক্ত সাব্যস্ত হয়ে থাকেন। তিন. তাওবাকারী তাওবার পরে বেশ দীর্ঘদিন তার উপরে অবিচল থাকে। পরে কোনও পাপ তাকে বশীভুত করে ফেলে এবং সে তাতে লিপ্ত হয়। চার. পাপ সংঘটনকারী ব্যক্তি তাওবা করার পর পুনরায় বিভিন্ন পাপ কার্যে নিমগ্ন হয়ে পড়ে। এমনকি তার মনে তার তাওবার চিন্তা উদিত হয় না এবং তার মনে কোনো প্রকার আক্ষেপ, অনুতাপও জাগ্রত হয় না, বরং সে প্রবৃত্তির কু-চাহিদার গোলামে পরিণত হয়। এ ধরনের প্রবৃত্তিকে “আন-নাফসুল আম্মারা বিস সূ” বলা হয়।[ সম্পাদনা পরিষদ, ইসলামী বিশ্বকোষ, ১২শ খন্ড (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৪১৩ হি./১৯৪২ খ্রি.), পৃ. ৮২।] যে কোনো তাওবা যথার্থ হলে আল্লাহ তা‘আলা তা গ্রহণ করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿ وَإِنِّي لَغَفَّارٞ لِّمَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ صَٰلِحٗا ثُمَّ ٱهۡتَدَى ﴾‘এবং যেই ব্যক্তি তাওবা করে ও ঈমান এনে পুণ্য কার্য করে আমি তার পাপের জন্য বড়ই ক্ষমাশীল।’ [ত্বা-হা-৮২] সুতরাং তাওবা কবুল করা শুধু তাঁর মেহেরবানী সূচিত ওয়াদা পূর্ণ করার ব্যাপার। ‘তাওবাতুন নাসূহ: ——————————– এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তওবাতুন নাসূহ বা পরিশুদ্ধ তওবা প্রতিটি গোনাহগারের উপর ফরয। আহলে সুন্নাত ওয়া জামাতের আলেমগণ বলেন: তাওবার শর্ত তিনটি। তাৎক্ষণিকভাবে গোনাহ ছেড়ে দেওয়া, ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা, অতীত কর্মে অনুশোচনা করা। এ জাতীয় তাওবাই মূলত ‘তাওবাতুন নাসূহ’। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ تُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ تَوۡبَةٗ نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمۡ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمۡ سَيِّ‍َٔاتِكُمۡ وَيُدۡخِلَكُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ ﴾ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর বিশুদ্ধ তাওবা; তাহলে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলো মোচন করে দিবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত।”[আত তাহরীম-০৮] হাসান আল-বাসরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন:ندم بالقلب، واستغفار باللسان، وترك بالجوارح، وإضمار أن لا يعود. ‘তাওবায়ে নাসূহ হলো, হৃদয়ে অনুশোচনার জবাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাধ্যমে গোনাহ পরিত্যাগ করা। ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় প্রতিক্ষা করা।’[আল-আদাবুশ-শার‘ঈয়্যাহ, ১ম খন্ড, পৃ. ১১৬।] ইমাম বাগভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু, উবাই রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:[ আল-আদাবুশ-শার‘ঈয়্যাহ, ১ম খন্ড, পৃ. ১১৬।] التوبة النصوح أن يتوب، ثم لا يعود إلى الذنب كما لا يعود اللبن إلى الضرع. ‘তাওবায়ে নাসূহ হলো তাওবা করার পর গোনাহের দিকে প্রত্যাবর্তন না করা। যেমন দুধ স্তনের দিকে ফিরে আসে না’। মুমূর্ষু অবস্থায়: ————————————— এই উম্মতের প্রতি আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামতসমূহের মধ্য থেকে একটি নেয়ামত এই যে, তিনি তওবার দরজা বন্ধ করেন নি। বরং জীবনের প্রতি মুহূর্তেই তওবার প্রতি মানুষকে উৎসাহ দিয়েছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা যাকে অন্তর্দৃষ্টি দান করেছেন তাকে সর্বদা সন্দেহাতীতভাবে তাওবার প্রতি গুরুত্ববহ থাকতে আদেশ করেছেন। তওবার প্রতি আল্লাহ্ তা‘আলার উৎসাহ প্রদানের জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, তিনি তওবাকারীর গোনাহগুলোকে নেকী দ্বারা রূপান্তর করে দেবেন। আল্লাহ বলেন: ﴿ إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ عَمَلٗا صَٰلِحٗا فَأُوْلَٰٓئِكَ يُبَدِّلُ ٱللَّهُ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ حَسَنَٰتٖۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا﴾ “কিন্তু যারা তওবা করেছে এবং ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে, এদের গোনাহগুলোকে আল্লাহ তা‘আলা নেকী দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”[আল ফুরক্বান-৬৯] অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন: ﴿قُلۡ يَٰعِبَادِيَ ٱلَّذِينَ أَسۡرَفُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ لَا تَقۡنَطُواْ مِن رَّحۡمَةِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًاۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلۡغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ ﴾ “আপনি বলে দিন! আত্মার প্রতি যুলুমকারী আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আল্লাহর নেয়ামত হতে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা সকল গোনাহ মোচনকারী। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”[আয যুমার-৫৩] যথাসময়ে তাওবা না করে মুমূর্ষু অবস্থায় তাওবা করলে তা কোনো কাজে আসবে না। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন: ﴿وَلَيۡسَتِ ٱلتَّوۡبَةُ لِلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلسَّيِّ‍َٔاتِ حَتَّىٰٓ إِذَا حَضَرَ أَحَدَهُمُ ٱلۡمَوۡتُ قَالَ إِنِّي تُبۡتُ ٱلۡـَٰٔنَ وَلَا ٱلَّذِينَ يَمُوتُونَ وَهُمۡ كُفَّارٌۚ أُوْلَٰٓئِكَ أَعۡتَدۡنَا لَهُمۡ عَذَابًا أَلِيمٗا﴾ ‘তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা আজীবন মন্দকাজ করে এবং তাদের কারো মৃত্যু উপস্থিত হলে সে বলে, আমি এখন তাওবা করছি এবং তাওবা তাদের জন্যও নয়, যারা মারা যায় কাফির অবস্থায়। এরাই তারা, যাদের জন্য আমি মর্মন্তদ শাস্তির ব্যবস্থা করেছি।’[আন নিসা-১৮] ইমাম গাযালী রাহমাতুল্লাহি আলাইহির মতে প্রত্যেক মু‘মিনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে (على الفور) ও অবিলম্বে এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাওবায় অভ্যস্ত থাকা ওয়াজিব। কেননা কোনও আদম সন্তানই পাপমুক্ত নয়। তার পাপগুলো ঈমানের জন্য বিধ্বংসী উপকরণরূপে সাব্যস্ত। মানুষ হয়ত তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা পাপ সংঘটিত করে কিংবা তার মনঃজগতে পাপের ইচ্ছা জন্ম নেয় কিংবা শয়তানী কুমন্ত্রণা তাকে কখনও না কখনও আল্লাহ তা‘আলার যিকর হতে অমনোযোগী করে ফেলে। এসব হলো নেতিবাচক উৎসের পাপ। এগুলো হতে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হলেও আল্লাহর আহকাম পালন এবং আল্লাহ তা‘আলার সত্ত্বা ও তাঁর গুণাবলী ও ক্রিয়াকর্মের পরিচিতি লাভে অভাব থেকে যেতে পারে। কেননা, কোন মানুষ এ সকল দুর্বলতা ও ত্রুটি হতে মুক্ত ও পবিত্র হওয়া এবং এর কোন একটিও তার মধ্যে না থাকা অকল্পনীয় ও প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। খালিস অন্তঃকরণে তাওবা করলে আল্লাহ তা‘আলা তাওবা কবুল করেন এবং জীবনের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘তুমি যদি এত অধিক পরিমাণ পাপ কাজ করে থাক যে, তা আকাশ সমান উঁচু হয়, এরপর অনুতাপের সাথে ‘তাওবা’ কর, তবুও তোমার তাওবা কবুল হবে, প্রত্যাখ্যাত হবে না।[ তিরমিযী: ৩৫৪০।] গোনাহকে তুচ্ছ মনে না করা: ——————————————————– কেননা গোনাহে ছগীরা যখন তওবা বিনে অনেকগুলো জমে যায় তখন তা ধ্বংস করে দেয়। হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ্র إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ فَإِنَّمَا مَثَلُ مُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ كَقَوْمٍ نَزَلُوا فِي بَطْنِ وَادٍ، فَجَاءَ ذَا بِعُودٍ، وَجَاءَ ذَا بِعُودٍ حَتَّى أَنْضَجُوا خُبْزَتَهُمْ، وَإِنَّ مُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ مَتَى يُؤْخَذْ بِهَا صَاحِبُهَا تُهْلِكْهُগ্ধ.‘সাবধান! গোনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা গোনাহকে তুচ্ছজ্ঞান করা ঠিক তেমন, যেমন কোনো কওম কোনো উপত্যকায় যাত্রাবিরতি করলো। এ সময় ছোট ছোট ভাগ হয়ে লোকেরা কাঠি নিয়ে আসল, ফলে তারা তাদের রুটি পাকাতে পারল। এমনিভাবে গোনাহকে যে তুচ্ছজ্ঞান করে এই গোনাহই এক সময় তাকে ধ্বংস করে ফেলবে।’[মুসনাদ আহমাদ ৫/৩৩১। সহীহুল জামে‘, নাসিরুদ্দিন আলবানী, আল মাকতাবুল ইসলামী, ৩য় প্রকাশ, হাদীস নং: ২৬৮৬।] অন্যত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ্রإياكم ومحقرات الذنوب فإنهن يجتمعن على الرجل حتى يهلكنهগ্ধ.‘তোমরা গোনাহকে তুচ্ছ মনে করো না। কেননা এগুলো একত্রিত হয়ে মানবকে ধ্বংস করে মানুষ গোনাহকে হালকা মনে করতে করতে এক সময় কবিরা গোনাহে লিপ্ত হয়ে যায়। এমনকি কেউ কেউ গোনাহের অনুভূতি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে। একথা স্মরণযোগ্য যে, অনুতাপ হচ্ছে তওবার প্রধান অঙ্গ ও শর্ত। এমনিভাবে গোনাহের প্রতি এ ধরনের উদাসীনতা মানুষকে গোনাহের প্রতি আকর্ষিত ও অভ্যস্ত করে তোলে। এর থেকে তার পরিত্রাণের কোনও সুযোগ থাকে না; যদিও আল্লাহ তা‘আলা এর থেকে পরিত্রাণের ব্যবস্থা রেখেছিলেন তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে। ইমাম আহমদ প্রখ্যাত সাহাবী আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু- থেকে বর্ণনা করেন: ্রإِنَّكُمْ لَتَعْمَلُونَ أَعْمَالًا لَهِيَ أَدَقُّ فِي أَعْيُنِكُمْ مِنَ الشَّعْرِ كُنَّا نَعُدُّهَا عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الْمُوبِقَاتِগ্ধ.“নিশ্চয় তোমরা অচিরেই এমন আমল করবে যা তোমাদের চোখে চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম ও হালকা মনে হবে অথচ রাসূলের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুগে আমরা একে ধ্বংসাত্মক মনে করতাম।”[মুসনাদে আহমাদ ৩/৩।] আর এতে কোন সন্দেহ নাই যে, নানা কারণে ছোট গোনাহ বড় গোনাহে রূপ নেয়। তন্মধ্যে একটি হলো, গোনাহটি বার বার করা ও সর্বদা করতে থাকা। এজন্যই বলা হয়, ‘বারবার করলে সে গোনাহটি আর সগিরা থাকে না। গোনাহ প্রকাশ করা থেকে সতর্ক থাকা: ———————————————————- প্রকাশে গোনাহ করা থেকে সতর্ক থাকা এবং বিগত দিনের কৃত গোনাহ মানুষের কাছে প্রকাশ না করা। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষ্য:্রكُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا المُجَاهِرِينَ، وَإِنَّ مِنَ المُجَاهَرَةِ أَنْ يَعْمَلَ الرَّجُلُ بِاللَّيْلِ عَمَلًا، ثُمَّ يُصْبِحَ وَقَدْ سَتَرَهُ اللَّهُ عَلَيْهِ، فَيَقُولَ: يَا فُلاَنُ، عَمِلْتُ البَارِحَةَ كَذَا وَكَذَا، وَقَدْ بَاتَ يَسْتُرُهُ رَبُّهُ، وَيُصْبِحُ يَكْشِفُ سِتْرَ اللَّهِ عَنْهগ্ধ.‘প্রকাশকারীর গোনাহ ছাড়া আল্লাহ তা‘আলা আমার উম্মতের সবাইকে মাফ করবেন। প্রকাশ করার এক ধরণ হচ্ছে, মানুষ রাতের বেলা কোনো গোনাহ করে বসল, আল্লাহ সেটাকে গোপন করেছে; কিন্তু সে নিজে সেটাকে প্রকাশ করার জন্য বলল, ‘হে অমুক! আমি রাতের বেলা এই এই গোনাহ করেছিলাম।’ অথচ এর মাধ্যমে আল্লাহ সেটা রাতে গোপন করেছে আর সে আল্লাহর গোপন করা বস্তুকে প্রকাশ করে দিয়েছে।’[বুখারী: ৬০৬৯; মুসলিম: ২৯৯০।] তওবা করতে বিলম্ব প্রসঙ্গে সতর্ক থাকা: কেননা আপনি জানেন না কবে মৃত্যুর ডাক এসে পড়বে। মৃত্যু খুবই নিকটতম একটি বিষয়। আচমকাই বিনা নোটিশে এসে পড়বে। মুখে মরণ গোঙানী শুরু হলে তওবা করে কোনও লাভ নেই। রূহ কণ্ঠনালীতে এসে পড়লে তওবা কিসের? আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ্রإِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ العَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْগ্ধ.‘আল্লাহ তা‘আলা মরণগোঙানী শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তওবা কবুল করবেন।’[তিরমিযী: ৩৫৩৭; ইবন মাজাহ: ৪২৫৩। নাসিরুদ্দিন আলবানী, সহীহুল জামে‘, হাদীস নং ৩১৯।] আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওনা: আল্লাহ বলেন: ﴿ قَالَ وَمَن يَقۡنَطُ مِن رَّحۡمَةِ رَبِّهِۦٓ إِلَّا ٱلضَّآلُّونَ﴾‘বিভ্রান্তরাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়।’[আল হিজর-৫৬] আল্লাহ আরো বলেন: ﴿ ۞قُلۡ يَٰعِبَادِيَ ٱلَّذِينَ أَسۡرَفُواْ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ لَا تَقۡنَطُواْ مِن رَّحۡمَةِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًاۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلۡغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ ﴾: ‘বলে দিন! হে আল্লাহর বান্দারা, যারা তোমাদের আত্মার উপর যুলুম করেছ, তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’[আয যুমার-৫৩] তওবার উপকারিতা: তওবা গুনাহকে দূরীভূত করে দেয় ও গুনাহকে নেকীতে রূপান্তরিত করে দেয় এবং তওবাকারীর হৃদয়কে পরিচ্ছন্ন করে, রিযিক ও শক্তি বৃদ্ধি করে দেয়। আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ্রالتائب من الذنب كمن لا ذنب لهগ্ধ “গোনাহ থেকে তওবাকারীর কোন গোনাহই থাকে না।”[৬০] আল্লাহ বলেন, ﴿ إِلَّا مَن تَابَ وَءَامَنَ وَعَمِلَ عَمَلٗا صَٰلِحٗا فَأُوْلَٰٓئِكَ يُبَدِّلُ ٱللَّهُ سَيِّ‍َٔاتِهِمۡ حَسَنَٰتٖۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ﴾ “কিন্তু যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও আমলে সালিহা করে, এদের সকল পাপরাশি নেকীতে রূপান্তর করে দেন আল্লাহ তা‘আলা। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু।”[আল ফুরক্বান-৬৯] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ্রإِنَّ العَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِي قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ، فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ، وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ، وَهُوَ الرَّانُ الَّذِي ذَكَرَ اللَّهُগ্ধ {كَلَّا بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ} “বান্দা যখন কোন গোনাহর কাজ করে তখন তার অন্তরে এক ধরনের কালো দাগ পড়ে যায়। যদি ইস্তেগফার করে তাহলে এই দাগ দূরীভূত করে তার অন্তর সূচালু, ধারালো ও পরিশীলিত হবে। আর এই দাগের কথা কুরআনেই আছে, খবরদার! তাদের অন্তরে দাগ রয়েছে যা তারা কামাই করেছে।”[মুতাফ্ফিফীন-১৪] আল্লাহ তা‘আলা নূহ আলাইহিস সালামের ভাষায় বিধৃত করেন: ﴿ ٱسۡتَغۡفِرُواْ رَبَّكُمۡ إِنَّهُۥ كَانَ غَفَّارٗا يُرۡسِلِ ٱلسَّمَآءَ عَلَيۡكُم مِّدۡرَارٗا وَيُمۡدِدۡكُم بِأَمۡوَٰلٖ وَبَنِينَ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ جَنَّٰتٖ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ أَنۡهَٰرٗا ﴾ “তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অজস্র ধারায় বৃষ্টির নহর ছেড়ে দিবেন। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বাড়িয়ে দেবেন তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।”[নূহ-১০-১২] সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার: —————————————- সাদ্দাদ বিন আউস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন বন্দার জন্য সাইয়্যেদুল ইস্তেগফার হচ্ছে: حَدَّثَنِي شَدَّادُ بْنُ أَوْسٍ رَضِي اللَّهم عَنْهم عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهم عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَيِّدُ الِاسْتِغْفَارِ أَنْ تَقُولَ اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ قَالَ وَمَنْ قَالَهَا مِنَ النَّهَارِ مُوقِنًا بِهَا فَمَاتَ مِنْ يَوْمِهِ قَبْلَ أَنْ يُمْسِيَ فَهُوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ وَمَنْ قَالَهَا مِنَ اللَّيْلِ وَهُوَ مُوقِنٌ بِهَا فَمَاتَ قَبْلَ أَنْ يُصْبِحَ فَهُوَ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ যে ব্যক্তি পূর্ণ বিশ্বাস রেখে দিনের বেলা এটা পাঠ করে, অতঃপর সে দিনেই সে সন্ধার পূর্বে মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি তা পূর্ণ বিশ্বাস রেখে রাতের বেলা এটা পাঠ করে, অতঃপর সে রাতেই সে সকাল হওয়ার পূর্বে মারা যায়, সে জান্নাতবাসী। (বুখারী)

গউছে পাকের ছেলেবেলা

Standard

হযরত সায়্যিদুনা আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একটি নাম; যাঁর কারামত জন্মলগ্ন থেকে একে একে বিকশিত হয়েছে। যা কিনা মুসলমানদের উপলব্ধির বিষয়। নিম্নে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় প্রকাশ হওয়া কারামাতসমূহ বর্ণনা করা হল।

       জন্মঃ হযরত সায়্যিদুনা আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ৪৭০হিজরীতে (১০৭৫খ্রিষ্টাব্দ) পবিত্র রমজান মাসের জুমার দিন এই ধরণীতে তাশরীফ আনেন। “মানাকেবে মিরাজিয়া” নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্মকালীন তাঁর চেহারা প্রতিভাত হচ্ছিল যেন চন্দ্রের কিরণ। মনে হয়েছিল সমগ্র ঘর উদ্ভাসিত হয়ে গেছে চাঁদের আলোয়।

তাঁর আব্বাজানের নাম হযরত আবু ছালেহ মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং তাঁর আম্মাজানের নাম হযরত উম্মুল খায়ের ফাতিমা রহমাতুল্লাহি আলাইহা। তাঁরা উভয়ই  ছরকারে মদীনা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বংশধর অর্থাৎ একজন হাসান রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এবং অন্যজন হযরত  হুসাইন রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর পবিত্র বংশধর। এ জন্য “আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খাঁ বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বিখ্যাত “হাদায়েক্বে বখশীশ” কাব্যগ্রন্থে’ সুন্দর বলেছেন –

“আপনি কেন হাসানী এবং হুসাইনী আর মহিউদ্দীন হবেন না?

যেহেতু আপনার বংশধারা দুই সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে।”

হযরত সৈয়্যদ আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি যখন দুনিয়ার বুকে তশরীফ আনেন তখন তাঁর আম্মাজানের বয়স ছিল ষাট। যে বয়সে সাধারণত মহিলাদের গর্ভধারণের ক্ষমতা লোপ পায়। এটাও গাউছে পাকের এক বৈশিষ্ট্যের কারণে যা আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে পেয়েছেন।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মানুষের কাছে মাহবুবে সুবহানী, কুতুবে রাব্বানী, গাউসুল আজম, গাউসুস সাক্বলাঈন, মহিউদ্দীন এবং সায়্যিদুল আউলিয়া হিসেবে পরিচিত। হযরত আল্লামা আবদুর রহমান জামী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন –

“আঁ শাহ্-এ-ছরফরাজ কে গাউসুস সাক্বলাঈন আস্ত”

অর্থাৎ – তিনিই উচ্চ মর্যাদাবান বাদশাহ্ যিনি গাউসুস সাক্বলাঈন নামে জগতে পরিচিত।

মানাকেবে গাউসিয়া নামক কিতাবে শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহ্‌রাওয়ার্দী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন – হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় গায়েব হতে পাঁচটি আজিমুশ্শান কারামত প্রকাশ পেয়েছে।

      (১) যে রাত্রিতে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্ম লাভ করেন ঐ রাতে তাঁর সম্মানিত আব্বাজান আবু ছালেহ মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহি স্বপ্নে দেখলেন যে, সরওয়ারে কায়েনাত, ফখরে মওজুদাত, আহমদ মুজতবা মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে তাঁর ঘরে তশরীফ আনলেন এবং ঐ ঘরে সমস্ত ইমাম ও আউলিয়ায়ে কেরাম উপস্থিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূসা জঙ্গী রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে সম্বোধন করলেন-

“হে আবু ছালেহ! আল্লাহ্ তায়ালা তোমাকে এমন এক সন্তান দান করেছেন যিনি অলিকুল শিরোমনি এবং আমার সন্তান। সে আমার এবং আল্লাহর বন্ধু। অচিরেই তাঁর মর্যাদা অলিদের এবং কুতুবদের মধ্যে এমন হবে যেমন আমার মর্যাদা অন্যান্য নবীদের উপর।”

কবি সুন্দর বলেছেন-

 গাউসে আজম দরমিয়ানে আউলিয়া

চুঁ জনাবে মুস্তফা দর আম্বিয়া।

 অর্থাৎ,নবীগণের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যে ফজিলত, গাউসে পাকেরও অন্যান্য অলিদের উপর সেই ফজিলত।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এই বাণীর দিকে ইঙ্গিত করে আ’লা হযরত বলেন –

 জো অলী কব্‌ল থে ইয়া বা’দ হুয়ে ইয়া হোঙ্গে

ছব আদব রাখতে হ্যাঁয় দিল মে মেরে আক্বা তেরা।

অর্থাৎ, যে সমস্ত অলি গাউসে পাকের আগে এবং পরে হয়েছেন সবাই তাঁদের অন্তরে আমার গাউসে পাকের মুহাব্বত রাখেন।

       (২) গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর জন্মের সময় দেখা গেল তাঁর কাঁধ মোবারকের উপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র কদম শরীফ (অর্থাৎ পদ চিন্‌হু‎) ছিল। যা তাঁর অলীয়ে কামিল হওয়ার সুস্পষ্ট দলিল বহন করে।

      (৩) গাউসে পাকের পিতাকে আল্লাহ্ তায়ালা স্বপ্নে সুসংবাদ দিলেন যে, তোমার যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করবে তিনি সমস্ত অলিদের বাদশাহ্ হবেন। যারা তাঁর বিরোধিতা করবে তারা পথভ্রষ্ট এবং ধর্মহারা হবে।

      (৪) যে রাতে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জন্ম গ্রহণ করেন সে রাতে জিলান শহরের যে সমস্ত মহিলা সন্তান প্রসব করেন তারা সবাই আল্লাহর ইচ্ছায় ছেলে সন্তানের জন্ম দেন এবং পরবর্তীতে সেসব ছেলে সন্তান আল্লাহর অলী হয়েছেন।

     (৫) গাউসে পাকের জন্ম মাস ছিল রমজানুল মোবারক। তিনি সে দিন থেকে রোযা রাখা আরম্ভ করলেন। সেহ্‌রী থেকে ইফতারের পূর্ব সময় পর্যন্ত কিছুই খেতেন না। তাঁর সম্মানিত পিতা বর্ণনা করেন- আমার সন্তান যখন দুনিয়ার মধ্যে তশরীফ আনেন তখন রমজান মাস ছিল। সারা দিন দুধ পান করতেন না। তাঁর জন্মের দ্বিতীয় বৎসরে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় রমজানের চাঁদ দেখা যায়নি। তাই লোকজন আমার ঘরে এসে এ ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তখন আমি তাদেরকে বললাম- আমার আবদুল কাদের আজ দুধ পান করেনি। এরপর তৎকালীন ইমামগণ ঐক্যমতে পৌঁছলেন যে, নিশ্চয়ই আজ রমজানের দিন।

গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু কিছুদিন পর তাঁর প্রিয় পিতাকে হারান। সে সময় তাঁর প্রিয় নানা তাঁর কর্তৃত্বের ভার নেন। তাঁর নানা ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত বুজুর্গ ব্যক্তি। তিনি তাঁর পবিত্র নাতিকে অলিয়ে কামেল করার জন্য দোয়া করলেন।

ছোটবেলা থেকে গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু খেলাধুলা থেকে বিরত থাকতেন। অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জীবন যাপন করতেন। অতিরিক্ত কথাবার্তায় বলতেন না। গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন – আমি যখন অন্যান্য ছেলেদের সাথে খেলা করার ইচ্ছা করতাম তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন অদৃশ্যে থেকে বলতেন – হে আবদুল কাদের! খেলাধুলা থেকে বিরত থাক। – (খোলাছাতুল মফাহির)

বর্ণিত আছে যে, যখন তিনি পড়ার উপযুক্ত হলেন, তখন তাঁকে মক্তবে ভর্তি করানো হয়েছিল কোরআনুল করীম পড়ার জন্য। উস্তাদের সামনে তিনি নম্রতার সাথে বসলেন, উস্তাদ বললেন- পড়ূন! “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম” । তিনি বিসমিল্লাহ্ এর সাথে সূরা বাক্বারার শুরু থেকে পড়তে আরম্ভ করেন। উস্তাদ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কী ব্যাপার? তিনি উত্তর দিলেন হে প্রিয় উস্তাদ, আমিতো এই কোরআন আমার মায়ের মুখে মুখে গর্ভাবস্থায় শিখেছি (সুবহানাল্লাহ্)।

হুজুর গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন- আমি যখন মাদ্রাসায় যেতাম তখন এক ফেরেশতা আমার সাথে থাকতেন এবং আমাকে দিক নির্দেশনা দিতেন।-(কালায়েদে জাওহার)

হুজুর গাউসে পাক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন – এক ফেরেশতা আমার সাথে সাথে চলতে চলতে গন্তব্য স্থানে গিয়ে বলেন- হে লোকেরা আল্লাহর অলীর জন্য জায়গা করে দিন যাতে তিনি বসতে পারেন। অন্যান্য ফেরেশ্তা ঐ ফেরেশতাকে জিজ্ঞেস করলেন তিনি কে? ফেরেশতাটি জবাবে বলেন- তিনি হলেন অলীদের সরদার। –(বাহজাতুল আসরার)

হযরত আবদুল কাদের জিলানী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু জিলানের এক মকতবে অধ্যয়নরত ছিলেন। ইত্যবসরে তাঁর কফিল (অভিবাভক) নানাজান ইহজগৎ ত্যাগ করেন। তখন তাঁর সম্পূর্ণ দায় -দায়িত্ব বর্তায় তাঁর আম্মাজানের উপর। একদিন তিনি রাস্তা দিয়ে হাটছিলেন। হঠাৎ আওয়াজ এল – “মা লিহাজা খুলিক্বতা ওয়ালা বিহাজা উমিরতা” অর্থাৎ হে আবদুল কাদের ! আপনাকে এজন্য সৃজন করা হয়নি।কথা শুনার পর তাঁর অন্তরে আল্লাহর মুহাব্বত যেন সমুদ্রের  ঢেউয়ের মত আঁছড়ে পড়ছিল। এরপর তিনি আল্লাহ্‌কে পাবার জন্য মুরাকাবা, মুশাহাদায় লিপ্ত হয়ে যান এবং নিরবিচ্ছিন্নভাবে শরীয়ত ও তরীক্বতের কাজ করার লক্ষ্যে আত্মনিয়োগ করেন।

প্রবন্ধ সংগৃহীতঃ মাসিক তরজুমান

মজযুব ওলী চিনার উপায়

Standard

মজযুব শব্দটি মূলত আরবী। এর মূলধাতু হল- “জযবা” । জযবা শব্দের অর্থ হচ্ছে- আকর্ষণ। মজযুব শব্দের অর্থে ফিরোজুল লুগাত অভিধানে বলা হয়েছে- যে ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহর ভালবাসায় নিমজ্জিত, আল্লাহর ভালোবাসায় দুনিয়া হতে বিচ্ছিন্ন,আল্লাহর প্রতি আকর্ষিত, পাগল(আল্লাহর প্রেমে), দিওয়ানা সহ ইত্যাদি। মজযুব সাধারণত আউলিয়ায়ে কিরামদেরই একটি বৈশিষ্ট্য। সাধারণভাবে মজযুব হল তাদেরকেই বলে, যারা সর্বদা আল্লাহর প্রেম সাগরে নিমজ্জিত থাকে। যাদের জীবনযাপন সমাজের বাকি আট-দশজনের মত নয়। দুনিয়া হতে যারা নিজেরদেরকে পরিপূর্ণ বিমুখ করে আল্লাহমুখী হয়ে যান। যাদের মাধ্যমে আল্লাহর কুদরত প্রকাশ পায়। বাহ্যিকভাবে তাদের দেখতে মনে হয় শরিয়ত বিবর্জিত। কিন্তু তারা আসলে তা নন। মূলত তারা শরিয়তের চত্বরেই আছেন।

তাসাউফের কিতাব সমূহে এসেছে, আল্লাহর অলীদের মধ্যে দুইটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, ১. সালিক(স্বাভাবিক, যাদের চলাফেরা সমাজের বাকি আট-দশজনের মতই), ২. মজযুব(এরঅর্থ উপরোল্লিখিত হয়েছে) । এখন অলীদের মধ্যে এই দুই বৈশিষ্ট্যের আধিক্যের দিক থেকে অলীদের শ্রেণি আবার দুই ধরনের হয়ে থাকে। ১. মজযুবে সালিক : যার মধ্যে সালিক বৈশিষ্ট্য হতে মজযুব বৈশিষ্ট্য অধিকহারে থাকে। ২.সালিকে মজযুব : যার মধ্যে মজযুব বৈশিষ্ট্য হতে সালিক বৈশিষ্টের আধিক্য বেশি।

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই তাসাউফের সূচনা। তাসাউফ এমন একটি নেয়ামত, যার মাধ্যমেই কেবল আল্লাহকে পরিপূর্ণরুপে চেনা সম্ভব। এবং এই তাসাউফের চর্চা স্বয়ং নবীজীর প্রকাশ্য জিন্দেগী হতেই হয়ে আসছে। যার চর্চাকারী ছিলেন স্বয়ং আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা। তারই ধারবাহিকতায় এটি আউলিয়ায়ে কিরামগণ পর্যন্ত এসে স্থির হয়েছে। অথচ আফসোস, আজ যে যেভাবে পারছে শরিয়তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাসাউফের নামে ভন্ডামি করে যাচ্ছে। আর এতে করে সাধারণ মুসলমানদের অন্তরে তাসাউফ সম্পর্কে এক বিরুপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম নিচ্ছে। অথচ তাসাউফ হচ্ছে শরিয়তেরই একটি নির্যাস। তাই বর্তমানে তাসাউফকে রক্ষার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই তাসাউফের নামে এসব ভন্ডদেরকে প্রতিহত করাটা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

সুতরাং বুঝা গেল মজযুব এবং সালিক ব্যতীত আল্লাহর অলী কল্পনাই করা যায় না। কারো মধ্যে সালিক অবস্থাটা মজযুব অবস্থাটা থেকে অধিক থাকে, আর কারো মধ্যে তার বিপরীত। অর্থাৎ কমবেশি দুটি অবস্থায়ই বিদ্যমান থাকে। আমাদের নিকট দৃশ্যায়ন সেটাই হয়, যেটার আধিক্য তার মধ্যে বেশি। এখন আসছি মূল প্রসঙ্গে। বর্তমান সময়ে আমাদের তাসাউফ সম্পর্কে বিশ্বাসকে পুঁজি করে একশ্রেণীর লোকেরা নিজেদেরকে মজযুব দাবি করে। অথচ প্রকৃত মজযুব ব্যক্তি কখনো কাউকে বলে না যে, সে মজযুব। বলবেই বা কেমনে, আল্লাহর প্রেমে সে এতটাই বিভোর যে, সে যে মজযুব কি না, এটাই সে জানে না । অন্যদিকে স্ব-ঘোষিত মজযুব নিজ ইচ্ছায় হাতে চুরি, চুলে জটা, নাভি পর্যন্ত দাঁড়ি সহ সমগ্র শরীর লাল কাপর দ্বারা আবৃত রেখে নিজেকে মজযুব জাহির করা শুরু করে। অথচ প্রকৃত মজযুবরা কখনোই তা নিজ ইচ্ছায় করেন না, যা কিছু করেন, সবই আল্লাহর হুকুমেই করেন। এসব ভন্ড মজযুবদের খোজ নিলে দেখা যায়, তারা স্ত্রী-সন্তান লালন-পালন সহ আবার তারা স্ত্রী সম্ভোগও করে। হাট-বাজার সহ দুনিয়াবি যাবতীয় কার্যাদিও তারা সম্পাদন করে। অথচ প্রকৃত মজ্জুব যারা, তারা দুনিয়া হতে একেবারেই বিমুখ, স্ত্রী-সন্তান সহ পরিবার পরিজন সবাইকে ভুলে এক এলাহির প্রেমে সর্বদা পাগলপারা থাকেন। অপরদিকে এসকল তথাকথিত মজযুব’রা নামায-রোযার কথা আসলেই নিজেকে মারেফাতী ঘোষণা দিয়ে মারেফাত নামক পবিত্র বস্তুকে অপব্যাখ্যার দ্বারা শরিয়ত কে নাস্তানাবুদ করার অপকৌশলে লিপ্ত হয়। অথচ শরিয়তবিহীন মারেফাত একেবারেই নিস্প্রাণ। তাই এখন আমরা চতুর্দশ শতাব্দীর মহান মুজাদ্দিদ, আ’লা হাযরাত, আযিমুল বারকাত, ইমাম শাহ আহমাদ রাযা খাঁ রাদিয়াল্লাহু আনহু’র জবান মুবারক থেকে জেনে নিব “মজযুব অলী” চেনার উপায়।

আলা হযরত বলছেন, হযরত মূসা সোহাগ রহমাতুল্লাহি আলাইহি মসজিদে গেলেন এবং খুতবা শ্রবণ করলেন। খুতবা শেষে জামা’আতের প্রস্তুতি শুরু হল। ইমাম সাহেব এর “আল্লাহু আকবার” তাকবীর শুনতে না শুনতেই হযরত মূসা সোহাগ রহমাতুল্লাহি আলাইহি’র অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল। তিনি বলতে লাগলেন- “আল্লাহু আকবার আমার স্বামী, তিনি চিরঞ্জীব এবং কখনোই মরবেন না। তিনিই আমাকে বিধবা করে দেন।” এতটুকু বলতে না বলতেই তৎক্ষণাৎ তাঁর আপাদমস্তক লাল পোষাক দ্বারা আবৃত হয়ে গেল এবং হাতে চুড়ি দেখা গেল। (আফসোস) অন্ধ অনুসরনের কারণে উনার মাজার শরিফ সংলগ্ন কতেক ব্যক্তিকে দেখা যায় যে, তারা চুল বড় রাখে এবং হাতের মধ্যে চুড়ি জাতীয় অলংকার পরিধান করে। এটা গোমরাহী। হযরত মুসা সোহাগ রহমাতুল্লাহি আলাইহি হক্ব ছিলেন; অথচ তার এসব অনুসারীরা গুনাহগার। (এটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, মজযুব ব্যক্তির অনুসরণ শরিয়তে জায়েয নেই। তথাপি তিনি মজযুব হয়েছেন, কারো অনুসরণ করে না, আল্লাহর পক্ষ থেকে। তাই তার মত মজযুব সেজে স্বেচ্ছায় ঘুরে বেড়িয়ে তার অনুসরণ করাটা গোমরাহী- মহিউদ্দীন )
(সূত্র: মালফুযাতে আ’লা হাযরাত, দ্বিতীয় খন্ড)

সুতরাং এর দ্বারা এটাই বুঝা গেল যে, কোন প্রকৃত মজযুব কখনোই শরীয়তের মোকাবেলা করবেনা। শরিয়তকে একবাক্যে-এক কথায় নতশিরে কুর্নিশ জানাবে। অথচ বর্তমানে স্বঘোষিত মজযুব’রা শরিয়তের কোন তোয়াক্কা-ই করে না। নিজেদেরকে মারেফাতী আখ্যা দিয়ে যাচ্ছেতাই করে বেড়াচ্ছে। এরা মনগড়াভাবে এ কথাও বলে বেড়ায় যে, তরিকতে প্রবেশ করলে শরিয়তের কোনই প্রয়োজন নাই।নাউজুবিল্লাহ। অথচ তারা কি দেখাতে পারবে যে, কোন প্রকৃত মজযুব অলী কখনো এরকম ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা বলে গিয়েছেন? ইনশা’আল্লাহ, কিয়ামত পর্যন্ত তারা এই কথা প্রমাণ করতে পারবে না। তাই আমি মনে করি এরা মজযুব বেশে মজযুব অলীর দুশমন। তাসাউফে বিশ্বাসী মানুষদের সরলতার সুযোগ নিয়েই তারা মূলত এই অপকর্মগুলো করে থাকে। শুধু তাই নয়, এদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না বিভিন্ন পবিত্র মাজার শরীফ সমূহ। অথচ মাজারে আরামরত আল্লাহর অলী তাঁর জীবদ্দশাতে কখনোই এরকম উপদেশ দেননি এবং এই জীবনযাপনকে সমর্থনও করেননি।

এই অভাগারা পবিত্র মাজার সমূহে অবস্থান নেওয়ার মাধ্যমে সাধারণ মুসলমানদেরকেও দিনকে দিন মাজার বিমুখী করে ফেলছে। আর এ সুযোগে নবী-অলী বিরোধী লোকেরা সাধারণ মানুষদেরকে এসব দেখিয়ে অলী বিদ্বেষী করে তোলার হীন স্বার্থ চরিতার্থ করে চলেছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা’র রহমত এবং ফুয়ুজাত প্রাপ্তির অন্যতম স্থান হচ্ছে এসকল পবিত্র মাজার সমূহ। তাই আমাদেরকে অবশ্যই এসব ভন্ডদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। মাজার সমূহকে এদের হীন আগ্রাসন হতে রক্ষা করতে হবে। মানুষের অন্তরে তাসাউফের নামে এ সকল ভন্ডদের বিরুদ্ধে চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে। আর যদি তা আমরা না করি, তবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো আর আমাদের মত তাসাউফকে আকড়িয়ে ধরার সেই সৌভাগ্য কখনো হাসিল করবেনা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা এবং সকল আউলিয়ায়ে কিরামের উসিলায় যাবতীয় কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত মতবাদ হতে সংরক্ষিত রাখুন। আমিন

ইমাম বোখারী ও বোখারী শরীফ

Standard

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী
—————————————————————–

সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। #

بسم الله الرحمن الرحيم

কাল প্রবাহে একটি বিস্ময়ের নাম। স্মৃতির প্রখরতা, জ্ঞানের গভীরতা, চিন্তার বিশালতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, অটুট সততা আর বিশাল পর্বত সম হিম্মতের এক মূর্ত প্রতীক এই মহাপুরুষ। তিনি ইলমে হাদীসের এক বিজয়ী সম্রাট। তার সংকলিত হাদীসের মহামূল্যবান সংকলন সহীহুল বুখারী বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে আল্লাহর কিতাব মহা গ্রন্থ আল কুরআনের পরেই যার অবস্থান। কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম উম্মাহ তার সাধনার কাছে ঋণী।
নাম, জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ

——————————————————————————

তিনি হচ্ছেন সমকালীন মুহাদ্দিছদের ইমাম হাফেয আবু আব্দুল্লাহ্ মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল বিন ইবরাহীম বিন মুগীরা বিন বারদিযবাহ আলজু’ফী। তাঁকে আমীরুল মুমিনীন ফীল হাদীছও বলা হয়। ১৯৪ হিঃ সালের ১৩ই শাওয়াল জুমআর রাত্রিতে তিনি বুখারায় (বর্তমানে উজবেকিস্তান) জন্ম গ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা ইসমা’ঈল (রঃ) একজন মুহাদ্দিস ও বুজুর্গ ব্যাক্তি ছিলেন। ইমাম মালিক, হাম্মাদ ইবন যায়েদ ও আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারাক (রঃ) প্রমূখ প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসের কাছে তিনি হাদিস শিক্ষা লাভ করেন। তিনি জীবনে কখনো হারাম বা সন্দেহজনক অর্থ উপার্জন করেননি। তার জীবিকা নির্বাহের উপায় ছিল ব্যবসাবাণিজ্য। তার আর্থিক অবস্থা ছিল সচ্ছল।
শৈশব কাল ও জ্ঞান অর্জনঃ

——————————————————————————

শিশুকালেই তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। পিতার মৃত্যুর পর মাতার তত্বাবধানে তিনি প্রতিপালিত হন। দশ বছর বয়সে উপনীত হয়ে তিনি জ্ঞান চর্চার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কুরআন মুখস্ত করেন।
শৈশব কালে মক্তবে লেখাপড়া করার সময়ই আল্লাহ্ তাঁর অন্তরে হাদীছ মুখস্ত ও তা সংরক্ষণ করার প্রতি আগ্রহ ও ভালবাসা সৃষ্টি করে দেন। ১৬ বছর বয়সেই হাদীছের প্রসিদ্ধ কিতাবগুলো পাঠ সমাপ্ত করেন।
অন্ধত্ব থেকে মুক্তি:

———————————————————————–

তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি ছোট থাকতেই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এতে তাঁর মাতা আল্লাহর কাছে খুব ক্রন্দন করলেন এবং স্বীয় সন্তানের দৃষ্টি শক্তি ফেরত দেয়ার জন্য তাঁর কাছে অবিরাম দুআ করে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ এক দিন তাঁর মা স্বপ্নে দেখলেন যে আল্লাহর নবী হযরত ইবরাহীম আলাহিসসালাম তাঁকে লক্ষ্য করে বলছেনঃ ওহে! তোমার সন্তানের দৃষ্টি শক্তি ফেরত চেয়ে আল্লাহর দরবারে তোমার ক্রন্দনের কারণে তিনি তোমার সন্তানের দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।
তখন তিনি প্রকৃত ঘটনা যাচাই করার জন্য স্বীয় সন্তানের কাছে গিয়ে দেখেন সত্যিই তাঁর সন্তান সম্পূর্ণ দৃষ্টি শক্তি ফেরত পেয়েছে। এরপর তিনি চাঁদের আলোতে লিখতে-পড়তে পারতেন। উল্লেখ্য, মদীনায় অবস্থানকালে চাঁদের আলোতেই তিনি ‘তারীখে কবীর’ নামক বৃহৎ কিতাবটি লিখেন।
ইমাম বুখারীর স্মরণ শক্তির প্রখরতাঃ

—————————————————————————

তিনি বাল্যকাল থেকেই প্রখর স্মৃতিশক্তি ও মেধার অধিকারী ছিলেন। বলা হয় যে তিনি সনদসহ ছয় লক্ষ হাদীছের হাফেয ছিলেন। আলেমগণ তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করেছেন,যে কোন কিতাবে একবার দৃষ্টি দিয়েই তিনি তা মুখস্ত করে নিতেন।
মাত্র ছয় বছর বয়সেই তিনি কুরআন মজীদ হিফজ করে ফেলেন এবং দশ বছর বয়সে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। দশ বছর বয়সে তিনি হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য বুখারার শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম দাখিলী (রঃ)-এর হাদিস শিক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করেন।

সে যুগের নিয়মানুসারে তার সহপাঠীরা খাতা কলম নিয়ে উস্তাদ থেকে শ্রুত হাদীস লিখে নিতেন, কিন্তু ইমাম বুখারী (রঃ) খাতা কলম কিছুই সঙ্গে নিতেন না। তিনি মনোযোগের সাথে উস্তাদের বর্ণিত হাদীস শুনতেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বয়সে সকলের থেকে ছোট ছিলেন। সহপাঠীরা তাঁকে এই বলে ভৎসনা করত যে, খাতা কলম ছাড়া তুমি অনর্থক কেন এসে বস? একদিন বিরক্ত হয়ে তিনি বললেনঃ তোমাদের লিখিত খাতা নিয়ে এস। এতদিন তোমরা যা লিখেছ তা আমি মুখস্থ শুনিয়ে দেই। কথামতো তারা খাতা নিয়ে বসল আর এত দিন শ্রুত কয়েক হাজার হাদীস ইমাম বুখারী (রঃ) হুবহু ধারাবাহিক শুনিয়ে দিলেন। কথাও কোন ভুল করলেন না। বরং তাঁদের লেখার ভূল-ত্রুতি হয়েছিল, তারা তা সংশোধন করে নিল। বিস্ময়ে তারাও হতবাক হয়ে গেল। এই ঘটনার পর ইমাম বুখারী (রঃ) এর প্রখর স্মৃতিশক্তির কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
১৮ বছর বয়সে তিনি হজ্জ পালনের জন্য মক্কায় গমণ করেন। মক্কায় অবস্থান করে তিনি ইলমে হাদীছের চর্চা শুরু করেন। অতঃপর তিনি এই উদ্দেশ্যে অন্যান্য দেশ ভ্রমণ করেন এবং এক হাজারেরও অধিক সংখ্যক মুহাদ্দিছের নিকট তেকে হাদীছ সংগ্রহ করেন।
জ্ঞান অর্জনের জন্য সারা রাত জেগে তিনি অত্যন্ত কঠিন পরিশ্রম করতেন। ইমাম বুখারী বলেনঃ আমার অন্তরে এক লক্ষ সহীহ হাদীছ ও দুই লক্ষ দঈফ হাদীছ মুখস্ত রয়েছে। সহীহ বুখারীর অন্যতম ভাষ্যকার কুস্তুলানীর বক্তব্য অনুযায়ী তিনি ছয় লক্ষ হাদীছের হাফেয ছিলেন। মুহাদ্দিছ ইবনে খুযায়মা (রঃ) বলেনঃ পৃথিবীতে ইমাম বুখারী অপেক্ষা অধিক অভিজ্ঞ এবং হাদীছের হাফেয আর কেউ জন্ম গ্রহণ করেননি।কেউ কেউ বলেনঃ খোরাসানের যমীনে ইমাম বুখারীর মত আর কেউ জন্ম গ্রহণ করেননি।
হাদীছ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দেশ ভ্রমণঃ

—————————————————————-

হাদীছ সংগ্রহের জন্য ইমাম বুখারী অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। সে সময় যে সমস্ত দেশে বিজ্ঞ মুহাদ্দিছগণ বসবাস করতেন তার প্রায় সবগুলোতেই তিনি ভ্রমণ করেছেন এবং তাদের নিকট থেকে হাদীছ সংগ্রহ করেছেন। খোরাসানের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও তিনি যে সমস্ত দেশে ভ্রমণ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে মক্কা, মদীনা, ইরাক, হিজাজ, সিরিয়া, মিশর এবং আরও অনেক শহর।
ইমাম বুখারীর উস্তাদ ও ছাত্রগণঃ

—————————————————————–

ইমাম বুখারী (রঃ) থেকে অসংখ্য মুহাদ্দিছ সহীহ বুখারী বর্ণনা করেছেন। খতীব বাগদাদী (রঃ) বুখারীর অন্যতম রাবী ফিরাবরির বরাত দিয়ে বলেন যে, তার সাথে প্রায় সত্তর হাজার লোক ইমাম বুখারী থেকে সরাসরি সহীহ বুখারী পড়েছেন। তাদের মধ্যে আমি ছাড়া আর কেউ বর্তমানে জীবিত নেই। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিজী, ইমাম নাসাঈ। তিনি যাদের কাছে হাদীছ শুনেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল, ইসহাক বিন রাহওয়াই এবং আরও অনেকেই। তিনি আটবার বাগদাদে আগমণ করেছেন। প্রতিবারই তিনি আহমাদ বিন হাম্বালের সাথে দেখা করেছেন।
একাধারে তিনি অনন্য ধীশক্তি, তত্ত্ব অনুধাবনশক্তি, ইজতেহাদ-ক্ষমতা, বর্ণনাশক্তি, উপকারিতা, প্রচ- খোদাভীতি, যুহ্দ, তাকওয়া, বিশ্লেষণশক্তি, উন্নত মানসিকতা, তীক্ষè দৃষ্টি, নানান পা-িত্য, কারামাত ও অলৌকতার অধিকারী ছিলেন। ইমাম ফারবরী রহ. থেকে বর্ণিত আছে যে, ইমাম বুখারী রহ. বলেছেন- আমি “সহীহ বুখারী” তে এমন একটি হাদীসও লিখিনি যা লিপিবদ্ধ করার পূর্বে আমি গোসল করিনি ও দুই রাকাআত নামায আদায় করিনি।
ইমাম ইসমাঈলী রহ.বর্ণনা করেন, ইমাম বুখারী বহ.বলেছেন- আমি এই কিতাবে যে সকল হাদীস উল্লেখ করেছি তার সবগুলোই সহীহ। কিন্তু আমি যে পরিমাণ সহীহ হাদীস বর্ণনা করেছি তার থেকে অধিক পরিমাণ সহীহ হাদীস লিখতে গিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। এতে উল্লেখ করিনি।
হাকেম আবূ আব্দুল্লাহ তার সরচিত গ্রন্থ “তারীখে নিসাপুর”-এ আহমদ ইবনে হামদূন থেকে সনদসহ বর্ণনা করে বলেন- একদা মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ রহ. বুখারী রহ. এর নিকট আসলেন এবং তিনি স্বীয় উস্তাদের দু’চোখের মাঝে চুমু খেলেন। আর বললেন- হে উস্তাদগণের উস্তাদ! হে মুহাদ্দিসীনে কেরামের সরদার! হে অসুস্থ হাদীসসমূহের চিকিৎসক! আপনি আমাকে সুযোগ দিন, আমি আপনার পদদয় চুম্বন করি।
সহীহ বুখারী সংকলনের কারণঃ

——————————————————

ইমাম বখারীর পূর্বে শুধু সহীহ হাদীছসমূহ একত্রিত করে কেউ কোন গ্রন্থ রচনা করেন নি। সহীহ বুখারী সংকলনের পূর্বে আলেমগণ সহীহ ও দঈফ হাদীছগুলোকে এক সাথেই লিখতেন। কিন্তু ইমাম বুখারীই সর্বপ্রথম দঈফ হাদীছ থেকে সহীহ হাদীছগুলোকে আলাদা করে লেখার কাজে অগ্রসর হন। তিনি তাঁর বিশিষ্ট উস্তাদ ইসহাক বিন রাহওয়াই হতেও এই মহৎ কাজের অনুপ্রেরণা লাভ করেন।
তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করা হয় যে, তিনি একবার স্বপ্নে দেখলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র শরীর মুবারকে মাছি বসছে। আর ইমাম বুখারী হাতে পাখা নিয়ে তাঁর পবিত্র শরীর থেকে মাছিগুলো তাড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি এই স্বপ্নের কথা সেই যুগের একাধিক আলেমের কাছে প্রকাশ করলে সকলেই বললেন যে, তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীছের সাথে যে সমস্ত জাল ও বানায়োট হাদীছ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে তা থেকে সহীহ হাদীছগুলো আলাদা করবে। আলেমদের ব্যাখা শুনে সহীহ হাদীছ সম্বলিত একটি কিতাব রচনার প্রতি তাঁর আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
সহীহ বুখারী সংকলনে সতর্কতা:

——————————————————–

কিতাবটি রচনার জন্য তিনি মদীনা মুনাওয়ারাকে নির্বাচন করলেন। মসজিদে নববীতে বসে তিনি তা লেখা শুরু করেন এবং একটানা ১৬ বছর এই কাজে দিন রাত পরিশ্রম করেন। সুক্ষ যাচাই-বাছাই ছাড়াও প্রতিটি হাদীস সংকলনের আগে ইমাম বুখারী গোসল করে দুই রাকআত নামায পড়েছেন, ইস্তেখারা করেছেন এবং সরাসরি রাসুলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট থেকে হাদিসটির সত্যতা যাচাই করে নিতেন।

তাই তাঁর অন্তরে যদি হাদীছটি সম্পর্কে কোন প্রকার সন্দেহ জাগতো তাহলে সে হাদীছটি শর্ত মোতাবেক সহীহ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সহীহ বুখারীতে লিখতেন না, যতক্ষননা নবিজীর ইশারা আসত। এরূপ কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের ফলে অন্যান্য হাদীসগ্রন্থের তুলনায় সারা মুসলিম জাহানে বুখারী শরীফ হাদীসগ্রন্থ হিসেবে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছে।
সমকালীন মুহাদ্দিছ ও হাদীছ বিশেষজ্ঞ পন্ডিতমন্ডলী এই মহাগ্রন্থের চুলচেরা বিশ্লেষণ, বিচার-বিবেচনা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলোচনা-সমালোচনা এবং পর্যালোচনা করেছেন। সমগ্র উম্মত সর্বসম্মতভাবে এই গ্রন্থটিকে আল্লাহর কিতাবের পর সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও নির্ভুল বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। বুখারী শরীফে সর্বমোট সাত হাজার তিনশত সাতানব্বইটি হাদীস সংকলিত হয়েছে।
মু’আল্লাক ও মুতাবা’আত যোগ করলে এর সংখ্যা পৌছায় নয় হাজার বিরাশিতে। বুখারী শরীফ সংকলনের পর থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর সকল দেশের সকল শ্রেণীর মুসলিম মনীষীগণ যেভাবে এর প্রতি গুরুত্বারোপ করে আসছেন আল্লাহ্র কালাম কুরআন মজীদ ছাড়া আর কোন গ্রন্থের প্রতি এরূপ ঝুঁকে পড়েন নি।
একমাত্র ইমাম বুখারী (রঃ) থেকে নব্বই হাজারেরও অধিক সংখ্যক লোক এ গ্রন্থের হাদীস শ্রবণ করেছে। তারপর প্রত্যেক যুগেই অসংখ্য হাদীস শিক্ষার্থী এ অধ্যয়ন করে আসছে। এ গ্রন্থের ভাষ্য পুস্তকের সংখ্যাও অগণিত। এ সব এর মধ্যে হাফিয ইবন হাজার আসকালানী (র) (জ. ৭৬২ হি. মৃ. ৮৫৫ হি. )-এর ফাতহুল বারী, ইমাম বদরুদ্দিন আইনী (র.) এর ‘উমদাতুল-কারী ও আল্লামা শিহাবুদ্দীন আহমদ কাসতালানী (রঃ) (জ. ৮৫১ হি. মৃ. ৯২৩ হি. )-এর ‘ইরশাদুস-সারী’ সমধিক প্রসিদ্ধ। এঁরা তিনজনই মিসরের অধিবাসী ছিলেন।

তাঁর এবাদত-বন্দেী ও পরহেজগারীতাঃ হাদীছ চর্চায় সদা ব্যস্ত থাকলেও এবাদত বন্দেগীতে তিনি মোটেও পিছিয়ে ছিলেন না।
তিনি প্রতি বছর রামাযান মাসের প্রতিদিনের বেলায় একবার কুরআন খতম করতেন। আবার তারাবীর নামাযের পর প্রতি রাত্রিতে একবার খতম করতেন। একবার নফল সালাত আদায় কালে তাঁকে এক বিচ্ছু ষোল সতেরো বার দংশন করে, কিন্তু তিনি যে সুরা পাঠ করছিলেন তা সমাপ্ত না করে সালাত শেষ করেন নি।
ইমাম বুখারীর সততা জনশ্রুতিতে পরিণত হয়েছিল। প্রসঙ্গত, আবূ হাফস (রঃ) একবার তাঁর কাছে বহু মূল্যবান পণ্যদ্রব্য পাঠান। এক ব্যাবসায়ী তা পাঁচ হাজার দিরহাম মুনাফা দিয়ে খরিদ করতে চাইলে তিনি বললেনঃ তুমি আজ চলে যাও, আমি চিন্তা করে দেখি। পরের দিন সকালে আরেক দল ব্যাবসায়ী এসে দশ হাজার দিরহাম মুনাফা দিতে চাইলে তিনি বললেনঃ গতরাতে আমি একদল ব্যাবসায়ীকে দিবার নিয়্যাত করে ফলেছি; কাজেই আমি আমার নিয়্যাতের খেলাফ করতে চাই না। পরে তিনি তা পূর্বোক্ত ব্যবসায়ীকে পাঁচ হাজার দিরহামের মুনাফায় দিয়ে দিলেন। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেনঃ আমি জীবনে কোন দিন কারো গীবত শিকায়াত করিনি।
ইমাম বুখারীর শেষ জীবন ও কঠিন পরীক্ষাঃ

———————————————————————

ইমাম বুখারীর শেষ জীবন খুব সুখ-শান্তিতে অতিবাহিত হয়নি। বুখারার তৎকালীন আমীরের সাথে তাঁর মতবিরোধ হয়েছিল। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, যুগ শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ হিসাবে যখন ইমাম বুখারীর সুনাম ও সুখ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল তখন বুখারার আমীর স্বীয় সন্তানদেরকে সহীহ বুখারী পড়ানোর জন্য ইমামের কাছে প্রস্তাব করলো। আমীর আরও প্রস্তাব করলো যে, তার সন্তানদের পড়ানোর জন্য ইমাম বুখারীকে রাজ দরবারে আসতে হবে।

কারণ সাধারণ জনগণের সাথে মসজিদে বসে আমীরের ছেলেদের পক্ষে সহীহ বুখারী পড়া সম্ভব নয়। ইমাম বুখারী তাঁর মসজিদ ও সাধারণ লোকদেরকে ছেঢ়ে দিয়ে রাজ দরবারে গিয়ে আলাদাভাবে আমীরের ছেলেদেরকে বুখারী পড়ানোতে ইলমে হাদীছের জন্য বিরাট অবমাননাকর ভেবে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি পরিস্কার জানিয়ে দিলেন যে, আমি কখনও হাদীছের ইলমকে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারবো না এবং এই মহান রত্মকে আমীর-উমারাদের দারস্থ করতে পারবো না।

আমীর যদি সত্যিকার অর্থে ইলমে হাদীছের প্রতি অনুরাগী হন, তাহলে তিনি যেন তাঁর সন্তানদেরসহ আমার বাড়িতে ও মসজিদে উপস্থিত হন। এতে আমীর ইমামের প্রতি রাগান্বিত হয়ে তাঁকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করলেন এবং ইমামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার জন্য দুনিয়া পূজারী কিছু আলেম ঠিক করলেন। আমীরের আদেশ এবং ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষিতে তিনি জন্মভূমি বুখারা ত্যাগ করে নিশাপুরে চলে যান। নিশাপুরেও অনুরূপ দুঃখজনক ঘটনা ঘটলে পরিশেষে সমরকন্দের খরতঙ্গ নামক স্থানে চলে যান।
ইমাম বুখারীর ইন্তিকাল:

————————————–

ইমাম বুখারী শেষ বয়সে অনুরূপ ফিতনা ও অবাঞ্চিত ঘটনাবলীতে পার্থিব জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। একদা তিনি তাহাজ্জুদের নামাযের আল্লাহর নিকট এ বলে আবেদন জানান যে, “হে আল্লাহ্! এ সুবিশাল পৃথিবী আমার জন্য একান্তই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। অতএব আপনি আমাকে আপনার নিকট তুলে নিন। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ইলমে হাদীছের এই খাদেম দুনিয়া থেকে চির বিদায় গ্রহণ করেন।
ইমাম বুখারী ১৯৪ হিজরীর ১৩ই শাওআল জুমু’আর দিন সালাতের কিছু পরে বুখারায় জন্ম গ্রহণ করেন এবং ২৫৬ হিজরীর ১লা শাওয়াল শনিবার ঈদের রাতে ইশার সালাতের সময় সমরকন্দের নিকট খারতাংগ পল্লীতে ইনতিকাল করেন। ঈদের দিন যোহরের নামাযের পর তাঁর জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়। তার বয়স হয়েছিল ১৩ দিন কম বাষট্টি বছর।
খারতাংগ পল্লীতেই তাঁকে দাফন করা হয়।দাফনের পর তাঁর কবর থেকে সুগন্ধি বিচ্ছুরিত হতে থাকে। লোকে দলে দলে তাঁর কবরের মাটি নিতে থাকে। কোনভাবে তা নিবৃত করতে না পেরে শিশা ঢালাই করে দিয়ে তাঁর কবর রক্ষা করা হয়।
বুখারী শরীফের মুকবুলিয়াত:

———————————————-

আল্লাহ্র দরবারে বুখারী শরীফের মুকবুলিয়াত আলামত হিসেবে উল্লেখযোগ্য যে, আলেমগণ ও বুজুর্গানে দীন বিভিন্ন সময়ে কঠিন সমস্যায় ও বিপদাপদে বুখারী শরীফ খতম করে দু’আ করে ফল লাভ করে আসছেন বলে। ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ূতী (র) ‘তাদরিবুর রাবী নামক কিতাবে লিখেন: যে কোন বিপদে বুখারী পাঠ করা হলে ঐ বিপদ দূরীভুত হয় এবং কোন জাহাজে আরোহন করা গেলে তা কখনও ডুবে যায়না।( ‘তাদরিবুর রাবী-১/৯৬).
ইমাম ইবনে কাছীর(র) বলেন: বুখারী শরীফ খতম করে দু’আ করলে বারী বর্ষিত হয়, এটা পরীক্ষিত।ইমাম সৈয়দ আছিল বলেন:“ বিভিন্ন সময়ে কঠিন সমস্যায় ও বিপদাপদে আমি নিজের জন্য এবং অন্যের জন্য ১২০ (একশত বিশ) বার বুখারী শরীফ খতম করেছি, আর প্রতিবারই আমার উদ্দেশ্য পূরন হয়েছে।”( মিরকাত-১/৩০)