পবিত্র মাহে রমযানের প্রস্তুতি

Standard

বিষয়: পবিত্র মাহে রমযানের প্রস্তুতি
********************************
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আয্হারী

খতিব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম। সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম। #
بسم الله الرحمن الرحيم

সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার যিনি রমযানকে শ্রেষ্ঠ মাস বানিয়েছেন এবং সে সময় ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দিয়েছেন। দুরূদ ও সালাম প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোসÍফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি যাঁর ওসীলায় আমরা এ বরকতময় মাসটি পেয়েছি।
প্রতি বছরের মতো এ বছরও কিছু দিন পরই রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে আসছে মাহে রমযান। মুমিনের আত্মাকে আল্লাহ তাআলা ধুয়ে-মুছে পাক-সাফ করে তার রঙে রঙিন করে তুলবেন। আর যারা খোদাপ্রেমিক তাদেরও অপেক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। তাঁরা শুধুই ভাবছেন, কোন দিন থেকে শুরু হবে রমযান এবং কিভাবে তাঁরা নিজেদেরকে পূত-পবিত্র করে গড়ে তুলবেনমপ এ মাসে। তাঁদের আখলাককে উন্নততর, মহত্তর, পবিত্রতর করে ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ সাধন করবেন। পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টির জন্য গরিবের প্রতি সহমর্মী, ধৈর্যশীল ও সহনশীল হবেন। চারিত্রিক গুণাবলি আরো শাণিত করবেন। সিয়াম সাধনার কঠোর সংযমের সিঁড়ি বেয়ে পরহেজগারির শীর্ষ চূড়ায় আরোহণ করবেন।
এটা মহিমান্বিত মাস, যাতে আল্লাহ পাক রোযা ফরয করেছেন।নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,

عن أبي هُرَيْرَة رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : (( إِذَا دَخَلَ شَهْرُ رَمَضَانَ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتْ الشَّيَاطِينُ) . رواه البخاري في الصوم باب هل يقال رمضان (১৭৬৬) ، والنسائي في الصيام (২০৭৯) و (২০৮১(

“এ মাসে বেহেশ্তের দরজাগুলো খোলা থাকে আর দোজখের দরজাগুলো বন্ধ থাকে এবং শয়তান কে শিকল পরিয়ে রাখা হয়।” (বুখারী-১৭৬৬, নাসায়ী-২০৭৯, ২০৮১)
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন,

فعن أنس بن مالكٍ، قال: دخل رمضان، فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “إِنَّ هَذَا الشَّهْرَ قَدْ حَضَرَكُمْ، وَفِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَهَا فَقَدْ حُرِمَ الخَيْرَ كُلَّهُ، وَلَا يُحْرَمُ خَيْرَهَا إِلَّا مَحْرُومٌ”(ابن ماجه: كتاب الصيام، باب ما جاء في فضل شهر رمضان (১৬৪৪)، انظر: مصباح الزجاجة في زوائد ابن ماجه (২/৬২).

“এখানে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ট রাত রয়েছে। যে ব্যক্তি এর মহিমা কে অস্বীকার করল, মুলত সে বঞ্চিত!” (ইবনু মাযাহ-১৬৪৪)

 

জীবনের যে কোন বিষয়ে সফলতা আনতে চাইলে, অথবা কোন বিষয়ে লক্ষ্য নির্ধারন করলে, তার প্রথম ধাপ হচ্ছে নিজের মন মানসিকতাকে স্থির করা ও গোছানো এবং এর জন্য প্রস্তুতি শুরু করা। মাহে রমযান আগমনের দুই মাস আগে থেকেই রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য প্রস্তুতি শুরু করে দিতেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজবের শুরুতেই নিজে এবং সাহাবায়ে কিরামকে এই দোয়া করার জন্য বলতেন-

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ رَجَبٌ قَالَ: اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ، وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ(روى عبد الله بن الإمام أحمد في “زوائد المسند” (২৩৪৬) والطبراني في “الأوسط” (৩৯৩৯) والبيهقي في “الشعب” (৩৫৩৪) وأبو نعيم في “الحلية” (৬/২৬৯)। )

“আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রামাদান” (হে আল্লাহ! রজব এবং শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় কর এবং আমাদের রমযানের পুণ্যময় মাস অর্জনের সৌভাগ্য দান কর) (ত্ববরানী-৩৯৩৯, বায়হাক্বী-৩৫৩৪, আবু নাঈম: হিলয়া- ৬/২৬৯)

 

রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ ঘোষণার প্রেক্ষিতেই বিশ্বের মুসলমানরা রমযান আসার আগে থেকেই এর জন্য প্রতি বছর প্রস্তুতি শুরু করে দেন। সাহাবায়ে কেরামের পর তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন, মুহাদ্দিসীন, আইম্মায়ে মুজাতাহিদীনসহ সর্বস্তরের মুসলমানগন নিজ নিজ পরিসরে রমযানের প্রস্তুতি নিয়ে সেই ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
মাহে রমযান এমনই এক বরকতময় মাস, যার আগমনে পুলকিত হয়ে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরামদের মোবারকবাদ পেশ করতেন।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের এই মর্মে সুসংবাদ প্রদান করেছেন যে,

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم : ” أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهْرٌ مُبَارَكٌ فَرَضَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْكُمْ صِيَامَهُ , تُفْتَحُ فِيهِ أَبْوَابُ السَّمَاءِ , وَتُغْلَقُ فِيهِ أَبْوَابُ الْجَحِيمِ , وَتُغَلُّ فِيهِ مَرَدَةُ الشَّيَاطِينِ , لِلَّهِ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ,مَنْ حُرِمَ خَيْرَهَا فَقَدْ حُرِمَ “)رواه النسائي ( ২১০৬ ) وأحمد (৮৭৬৯) صحيح الترغيب ( ৯৯৯( .

“তোমাদের সামনে রমযানের পবিত্র মাস এসেছে, যে মাসে আল্লাহ তোমাদের ওপর রোযা ফরয করেছেন।’ (নাসায়ী-২১০৬. আহমদ-৮৭৬৯)
অন্য এক হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

رجب شهر الله وشعبان شهري ورمضان شهر أمت} السيوطي في الجامع الصغير لأبي الفتح بن أبي الفوارس. رواه الدَّيلمي عن عائشةَ رضي الله عنها، جامع المسانيد والمراسيل(

“রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমযান আমার উম্মতের মাস” (সুয়ূতী: জামে আস সগীর)।
তাই বলা হয়, ‘রজব মাসে শস্য বপন করা হয়, শাবান মাসে খেতে পানি সিঞ্চন করা হয় এবং রমযান মাসে ফসল কর্তন করা হয়।’ সুতরাং এ শ্রেষ্ঠতম মাসে নামায- রোযা পালন তথা আল্লাহর ইবাদত- বন্দেগি করে কাঙ্খিত লক্ষ্যপানে ধাবিত হওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অবশ্য কর্তব্য।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা শাবান মাসের শেষ দিনে সাহাবায়ে কিরামকে লক্ষ্য করে মাহে রমযানের রোযার ফযিলত সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়ে এরশাদ করেন,

فَقَالَ : ” أَيُّهَا النَّاسُ ، إِنَّهُ  قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ جَعَلَ اللَّهُ صِيَامَهُ فَرِيضَةً ، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا ، مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى  فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ ، وَمَنْ أَدَّى فِيهِ فَرِيضَةً كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ ، وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ ، وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ

‘হে মানবগণ! তোমাদের প্রতি একটি মহান মোবারক মাস ছায়া ফেলেছে। এই মাসে সহস্র মাস অপেক্ষা উত্তম একটি রজনী আছে, যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সকল কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল। যে ব্যক্তি এই মাসে কোনো নেক আমল দ্বারা আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য কামনা করে, সে যেন অন্য সময়ে কোনো ফরয আদায় করার মতো কাজ করল। আর এই মাসে যে ব্যক্তি কোনো ফরয আদায় করে, সে যেন অন্য সময়ের ৭০টি ফরয আদায়ের নেকি লাভ করার সমতুল্য কাজ করল। এটি সংযমের মাস আর সংযমের ফল হচ্ছে জান্নাত।’ (বায়হাক্বী-৩৯, ইবনু খোযাইমা-১৮৮৭))
প্রকৃতপক্ষে পবিত্র মাহে রমযান মুসলমানদের জন্য একটি বার্ষিক প্রশিক্ষণ কোর্স, যার মাধ্যমে রোযাদারদের জীবন প্রভাবিত হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِذَا سَلِمَ رَمَضَانٌ سَلِمَتِ السَّنَةُ)  الحلية (৭/১৪০(

“যে ব্যক্তি পবিত্র রমযান মাস ভালোভাবে যাপন করবে, তার সমগ্র বৎসর ভালোভাবে যাপিত হবে।”(হিলয়া-৭/১৪০)।
তিনি আরও বলেন,

لو يعلم العباد مافي رمضان لتمنت أمتي أن يكون رمضان السنة كلها)تنزيه الشريعة للكناني ২ / ১৫৩و كتاب مجمع الزوائد للهيثمي ৩ /১৪১و كتاب الفوائد المجموعة في الأحاديث الموضوعة للشوكاني ১ / ২৫৪ (

“আমার উম্মত যদি মাহে রমযানের গুরুত্ব বুঝত, তাহলে সারা বছর রমযান কামনা করত।”(মাজমাইয যাওয়ায়েদ-৩/১৪১, আল পাওয়ায়েদ: শাওকানী-১/২৫৪)
‘রামাদান’ শব্দটি আরবি ‘রাম্দ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দহন, প্রজ্বলন, জ্বালানো বা পুড়িয়ে ভস্ম করে ফেলা। রমযান মাসে সিয়াম সাধনা তথা রোযাব্রত পালনের মাধ্যমে মানুষ নিজের সমুদয় জাগতিক কামনা-বাসনা পরিহার করে আত্মসংযম ও কৃচ্ছ্রপূর্ণ জীবন যাপন করে এবং রিপুকে দমন করে আল্লাহর একনিষ্ঠ অনুগত বান্দা হওয়ার সামর্থ্য অর্জন করে।
মাহে রমযান মানুষের অভ্যন্তরীণ যাবতীয় অহংকার, কুপ্রবৃত্তি, নফসের দাসত্ব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় বলে এ মহিমান্বিত মাসের নাম ‘রমাদান’। ইসলামের অনুসারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার বিরাট নিয়ামত রমযান মাস। এর প্রস্তুতি গ্রহণ করা না হলে মাহে রমযানের কোনো মূল্য বা মর্যাদা দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় না।
তাই মাহে রমযানে রোযার প্রস্তুতির জন্য সহিহ-শুদ্ধভাবে আবশ্যকীয় বিধি-বিধান শরিয়তের মাসআলা অনুযায়ী রোযাদারদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকা খুবই দরকার। এ ছাড়া আসন্ন মাহে রমযানের পবিত্রতা রক্ষার্থে ইবাদত- বন্দেগি তথা সাহরী, ইফতার, তারাবিহ, পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, ই’তিকাফ, তাহাজ্জুদ, জিকর-আযকার, তাসবিহ-তাহলিল, দোয়া-ইস্তেগফার, দরূদ শরীফ, যাকাত-ফিতরা, দান- সাদ্কা প্রভৃতি সৃষ্টিকর্তার হক আদায়ের সামগ্রিক পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোযা শুরু হওয়ার আগে তার সাহাবীদেরকে কিভাবে সচেতন করতেন নিম্নের হাদীস হতে আমরা তা উপলব্ধি করতে পারি।

عَنْ سَلْمَانَ  رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ، قَالَ : خَطَبَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي آخِرِ يَوْمٍ مِنْ شَعْبَانَ ، فَقَالَ : ” أَيُّهَا النَّاسُ ، إِنَّهُ  قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ ، فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ جَعَلَ اللَّهُ صِيَامَهُ فَرِيضَةً ، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا ، مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى  فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ ، وَمَنْ أَدَّى فِيهِ فَرِيضَةً كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ ، وَهُوَ شَهْرُ الصَّبْرِ ، وَالصَّبْرُ ثَوَابُهُ الْجَنَّةُ ، وَشَهْرُ الْمُوَاسَاةِ ، وَشَهْرٌ يُزَادُ فِي رِزْقِ الْمُؤْمِنِ فِيهِ ، مَنْ فَطَّرَ فِيهِ صَائِمًا كَانَ لَهُ مَغْفِرَةً لِذُنُوبِهِ وَعِتْقَ رَقَبَتِهِ مِنَ النَّارِ ، وَكَانَ لَهُ مثل أَجْرِهِ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أَجْرِهِ شَيْءٌ ” ، قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، لَيْسَ كُلُّنَا نَجِدُ مَا يُفَطِّرُ الصَّائِمَ ؟ قَالَ : ” يُعْطِي اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ هَذَا الثَّوَابَ مَنْ فَطَّرَ صَائِمًا عَلَى مَذْقَةِ لَبَنٍ أَوْ تَمْرَةٍ أَوْ شَرْبَةِ مَاءٍ ، وَمَنْ أَشْبَعَ صَائِمًا سَقَاهُ اللَّهُ مِنْ حَوْضِي شَرْبَةً لا يَظْمَأُ حَتَّى يَدْخُلَ الْجَنَّةَ ، وَهُوَ شَهْرٌ أَوَّلُهُ رَحْمَةٌ وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ وَآخِرُهُ عِتْقٌ مِنَ النَّارِ  مَنْ خَفَّفَ فِيهِ عَنْ مَمْلُوكِهِ غَفَرَ اللَّهُ لَهُ وَأَعْتَقَهُ مِنَ النَّارِ ، فضائل الأوقات للبيهقي গ্ধ بَابٌ فِي فَضْلِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ … رقم الحديث: ৩৯, هذا الحديث رواه ابن خزيمة بلفظه في صحيحه ৩/১৯১ رقم (১৮৮৭, رواه المحاملي في أماليه (২৯৩) والبيهقي في شعب الإيمان (৭/২১৬) وفي فضائل الأوقات ص ১৪৬ رقم ৩৭ وأبو الشيخ ابن حبان في كتاب ( الثواب ) عزاه له الساعاتي في ( الفتح الرباني ) (৯/২৩৩) وذكره السيوطي في ( الدر المنثور ) وقال : أخرجه العقيلي وضعفه ) والأصبهاني في الترغيب ، وذكره المنقي في ( كنز العمال ) ৮/৪৭৭ ، كلهم عن طريق سعيد بن المسيب عن سلمان الفارسي ، )

হযরত সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, শা’বান মাসের শেষ দিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে খুতবা শুনালেন, যাতে  তিনি এরশাদ করেছেন, ‘হে জনগণ! তোমাদের নিকট একটি মহান ও পবিত্র মাস আসছে, যার মধ্যে এমন একটি রাত্র রয়েছে যা হাজার রাত্র হতেও উত্তম। যে মাসের দিনগুলোতে আল্লাহ রোযাকে ফরয করেছেন এবং রাত্রিতে নামাযকে (তারাবীহকে) নফল করেছেন (উম্মতের জন্য সুন্নত)। যে ব্যক্তি ঐ মাসে কোন একটি সদাভ্যাস ( বা সৎকাজ) করে তা ছওয়াবের দিক দিয়ে অন্য মাসের একটি ফরয কাজের সমতুল্য হয়ে থাকে। আর একটি ফরয আদায় করলে, তা অন্য মাসের ৭০টি ফরয আদায়ের সমতুল্য ছওয়াবের হয়ে থাকে। এটা হল ধৈর্যের মাস। আর ধৈর্য অবলম্বনের প্রতিদান হচ্ছে বেহেশ্ত। এটা পরোপকার ও সহানুভূতির মাস এবং এটা এমন একটি মাস যাতে ঈমানদারগণের রুযী বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। এ মাসে যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে ইফতার করায়, তার বিনিময়ে তার সমস্ত গুণাহ মাফ হয়ে যায় এবং সে জাহান্নাম হতে মুক্ত হয়। তাছাড়া সে উক্ত রোযাদার ব্যক্তির তুল্য ছওয়ারও পাবে। এতে অবশ্য উক্ত রোযাদারের ছওয়াবে একটুও কমতি করা হবে না। আমরা বললাম ইয়া রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইকা ওয়াসাল্লাম! আমাদের এমন কিছু সংস্থান নাই যা দ্বারা আমরা রোযাদারকে ইফতার করাতে পারি। তদুত্তরে হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘এই ছাওয়াব আল্লাহতায়ালা ঐ ব্যক্তিকেও প্রদান করবেন, যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে এক ঢোক দুধ বা একটি খোরমা কিংবা সুমিষ্ট পানি দ্বারা ইফতার করাবে। আর যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে পরিতৃপ্ত করে খাওয়াবে, আল্লাহ তাকে আমার ‘হাউজ কাওছার’ হতে এমনভাবে পর্যাপ্ত করে পান করাবেন যে, বেহেশতে না যাওয়া অবধি তার আর পিপাসা লাগবে না। আর ঐ মাসের প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক ক্ষমার ও তৃতীয় দশক জাহান্নাম হতে মুক্তির জন্য নির্ধারিত। যে ব্যক্তি ঐ মাসে স্বীয় চাকরের ওপর কার্যভার লাঘব করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম হতে আযাদ করে দেন। (বাযহাক্বী-৩৯, ইবনু খোযাইমা-১৮৮৭)
প্রিয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

্রإِذَا كَانَ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّيَاطِينُ وَمَرَدَةُ الْجِنِّ ،وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ فَلَمْ يُفْتَحْ مِنْهَا بَابٌ،  وَفُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ،  وَيُنَادِى مُنَادٍ:  يَا بَاغِىَ الْخَيْرِ أَقْبِلْ ، وَيَا بَاغِىَ الشَّرِّ أَقْصِرْ .وللهِ عُتَقَاءُ مِنَ النَّارِ وَذَلِكَ كُلَّ لَيْلَةٍ)رواه الترمذي  واللفظ له (৬৮২) وقال:غريب، وابن خزيمة في صحيحه بنحوه (১৮৮৩)،  وابن حبان (৮/২২১) وقال الشيخ شعيب في التحقيق (إسناده قوي) ،  والحاكم في المستدرك (১৫৩২) وقال: (حديث صحيح على شرط الشيخين.(

রামাযান মাসের প্রথম রাত্রি সমাগত হতেই শয়তান ও দুষ্টমতি জ্বিনগুলো শৃঙ্খলিত হয় এবং জাহান্নামের দ্বারগুলো রুদ্ধ করে দেয়া হয়, একটি দরজাও মুক্ত থাকে না। আর বেহেশতের দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয়, তার একটাও বন্ধ থাকে না। আর কোন একজন গায়েবী আহ্বানকারী উচ্চঃস্বরে বলতে থাকেন যে, ‘হে পুণ্যার্থীগন অগ্রসর হও! হে পাপাত্মার দল পিছিয়ে যাও! এই সময় আল্লাহর পক্ষ হতে বহু দোযখী মুক্তিপ্রাপ্ত হয়। এমনি করে প্রত্যেক রাত্রিতেই আহ্বান করা হয়। ( তিরমিযী-৬৮২, ইবনু খোযাইমা-১৮৮৩, ইবনু হিব্বান-৮/২২১, হাকেম-১৫৩২)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ” رواه البخاري ৩৮ ومسلم ৭৬০

‘যে ব্যক্তি রামাযান মাসে ঈমানের সাথে ও ছওয়াবের আশায় রোযা রাখে, তার অতীত গোণাহ মাফ হয়ে যায়।
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

“مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ” (البخاري: كتاب صلاة التراويح، باب فضل من قام رمضان، (১৯০৫)، عن أبي هريرة رضي الله عنه، ومسلم: كتاب صلاة المسافرين وقصرها، باب الترغيب في قيام رمضان وهو التراويح، (৭৫৯).

আর যে ব্যক্তি এই মাসে ঈমানসহ ছওয়াবের আশায় রাত জেগে (তারাবীহ) নামায পড়ে, তার অতীত সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (বুখারী-১৯০৫, মুসলিম-৭৫৯)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ” )رواه البخاري في كتاب الصوم – باب من صام رمضان إيماناً واحتساباً ونية برقم (১৮০২)، ومسلم في كتاب صلاة المسافرين وقصرها – باب الترغيب في قيام رمضان وهو التراويح برقم (৭৬০(

যে ব্যক্তি ক্বদর রাতে ঈমানের সাথে ছওয়াবের আশায় রাত জাগরণ করে নামায পড়ে, তারও অতীত সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ (বুখারী-১৮০২, মুসলিম-৭৬১)
হযরত নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

عن أَبي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قال : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( قَالَ اللَّهُ : كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلا الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ يَدَعُ طَعَامَهُ وَشَهْوَتَهُ مِنْ أَجْلِي) روى البخاري (১৭৬১) ومسلم (১৯৪৬)(

‘মানুষের প্রত্যেক সৎকর্মের ছওয়াব দশ হতে সাতশত গুণ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। তবে আল্লাহ বলেন, ‘কেবল রোযা ব্যতীত। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য সুতরাং তার পুরস্কার আমিই আমার কুদরতের স্বহস্তে প্রদান করব। যেহেতু রোযাদার স্বীয় কামপ্রবৃত্তিকে দমন ও পানাহার পরিহার করে থাকে কেবলমাত্র আমারই জন্য।’ (বুখারি-১৭৬১, মুসলিম-১৯৪৬)
হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ يَفْرَحُهُمَا : إِذَا أَفْطَرَ فَـرِحَ ، وَإِذَا لَقِيَ رَبَّهُ فَرِحَ بِصَوْمِه

‘রোযাদারের জন্য দুইটি আনন্দ। একটি ইফ্তার কালে এবং অপরটি আল্লাহর সাথে দীদারকালে।’(বুখারি-১৭৬১, মুসলিম-১৯৪৬)

তিনি আরো বলেন,

وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَخُلُوفُ فَمِ الصَّائِمِ أَطْيَبُ عِنْدَ اللهِ مِنْ رِيحِ الْمِسْك .

‘রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশ্ক হতেও অধিক সুগন্ধময়।(বুখারি-১৭৬১, মুসলিম-১৯৪৬)

তিনি বলেন,

وَالصِّيَامُ جُنَّـةٌ ، وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلا يَرْفـثْ ، وَلا يَصْخَبْ ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ : إِنِّي امْرُؤٌ صَائِم .

(রোযাদারগণের পক্ষে) রোযা হচ্ছে ঢালস্বরূপ।’ (বুখারি শরিফ)   সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউই রোযা অবস্থায় নির্লজ্জ কথা বলবে না এবং বাজে বকবে না। যদি কেউ রোযাদারকে গালি দেয় অথবা তার সাথে লড়াই করতে আসে, তবে সে যেন বলে দেয় যে, আমি রোযাদার। (বুখারি-১৭৬১, মুসলিম-১৯৪৬)
হযরত নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُّورِ وَالْعَمَلَ بِهِ وَالْجَهْل فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ ) . روى البخاري (১৯০৩১৮০৪-) (৬০৫৭)

‘যে ব্যক্তি রোযা অবস্থায় মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কাজ হতে বিরত রইল না, তার উপবাসে আল্লাহর কিছুই যায় আসে না।’((বুখারি-১৮০৪, ১৯০৩, ৬০৫৭)
তিনি সাবধান করে বলেন,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ , قَالَ :  ” رُبَّ صَائِمٍ لَيْسَ لَهُ حَظٌّ مِنْ صَوْمِهِ إِلَّا الْجُوعُ وَالْعَطَشُ ، وَرُبَّ قَائِمٍ لَيْسَ لَهُ حَظٌّ مِنْ قِيَامِهِ إِلَّا السَّهَرُ وَالنَّصَبُ ”

رواه ابن ماجه في سننه (১৬৯০) عن عمرو بن رافع والنسائي في الكبرى (২/২৩৯/رقم৩২৫০) ورواه النسائي في الكبرى (২/২৩৯/رقم৩২৫১) ورواه أحمد في مسنده (২/৪৪১)

‘বহু রোযাদার এমনও রয়েছে, যে ক্ষুধায়-পিপাসায় কষ্ট পাওয়া ব্যতীত তাদের রোযা রাখায় আর কোন ফল নেই। এমনিভাবে বহু রাতজাগা নামাযী রয়েছে, যাদের রাত জাগরণ ব্যতীত অন্য কোন লাভ হয় না।’ হযরত নবীয়ে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন বলেন, যে রোযাদারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে বিরত থাকল না, তার শুধু পানাহার হতে বিরত থাকায় কোন লাভ নেই।’ (ইবনু মাযা-১৬৯০, নাসায়ী- ৩২৫০, আহমদ-২/৪৪১(
আমরা যখন এ মাসের গুরুত্ব অনুভব করলাম তখন আমাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল কীভাবে এ মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানো যায় সে প্রচেষ্টা চালানো। হেদায়াতের আলোকবর্তিকা আল-কোরআনও নাযিল হয়েছে এ মাসে ।   (চলবে ইনশা আল্লাহ)

রমযান বিষয়ক আরো পড়ুন- রমযানরোযার মাসআলা

​ছাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এর ফযীলত

Standard

ছাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম এর ফযীলত

########################################
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী

(বিএ. অনার্স, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর। এম.এ. এম.ফিল. কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর। পিএইচ.ডি গবেষক,চ.বি.)

সহকারী অধ্যাপক, সাদার্ন  বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ. খতীব, মুসাফির খানা জামে মসজিদ, নন্দন কানন, চট্টগ্রাম।
بسم الله الرحمن الرحيم. الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين, أما بعد!
ছাহাবায়ে কেরাম হেদায়াতের নক্ষত্র, তাকওয়ার পূর্ণচন্দ্র, দীপ্তিমান তারকা, সুদীপ্ত পূর্ণিমা; রাতের দরবেশ, দিনের অশ্বারোহী; যাঁরা আপন আঁখি যুগলকে সজ্জিত করেছেন মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূরের সুরমায়; ইসলাম নিয়ে যারা ছুটে গেছেন পূর্বে ও পশ্চিমে, যার বদৌলতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছে ভূভাগের প্রতিটি দেশে এবং প্রতিটি প্রান্তে। তাঁরা ছিলেন আনসার, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে করেছেন নুসরাত ও সাহায্য। তাঁরা ছিলেন মুহাজির, যারা কেবলই আল্লাহর জন্য করেছেন হিজরত, বিসর্জন দিয়েছেন নিজেদের দেশ ও সহায়সম্পদ।
আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু কত সুন্দরই না বলেছেন। তিনি বলেন, 

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ مَسْعُودٍ , رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ , قَالَ : ” إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ نَظَرَ فِي قُلُوبِ الْعِبَادِ فَوَجَدَ قَلْبَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْرَ قُلُوبِ الْعِبَادِ ، فَاصْطَفَاهُ لِنَفْسِهِ , وَابْتَعَثَهُ بِرِسَالَتِهِ ، ثُمَّ نَظَرَ فِي قُلُوبِ الْعِبَادِ بَعْدَ قَلْبِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ فَوَجَدَ قُلُوبَ أَصْحَابِهِ خَيْرَ قُلُوبِ الْعِبَادِ بَعْدَ قَلْبِهِ ، فَجَعَلَهُمْ وُزَرَاءَ نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يُقَاتِلُونَ عَلَى دِينِهِ ، فَمَا رَآهُ الْمُسْلِمُونَ حَسَنًا فَهُوَ عِنْدَ اللَّه حَسَنٌ ، وَمَا رَآهُ الْمُسْلِمُونَ سَيِّئًا فَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ سَيِّئٌ ” . 

‘আল্লাহ বান্দাদের অন্তরের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরকে সর্বোত্তম দেখতে পান। ফলে তিনি তাঁকে নিজের (বিশেষ ভালোবাসা ও অনুগ্রহের) জন্য নির্বাচন করেন। তাঁকে তাঁর রিসালাত সমেত প্রেরণ করেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরের পর তিনি নযর দেন বান্দাদের অন্তরে। এ দফায় তিনি তাঁর ছাহাবীগণের অন্তরকেই সকল বান্দার অন্তরের মধ্যে সর্বোত্তম দেখতে পান। ফলে তিনি তাঁদেরকে তাঁর নবীর সাহায্যকারী বানিয়ে দেন। যারা তাঁর দীনের জন্য লড়াই করেন। অতএব মুসলিমরা (সাহাবীগণ) যে জিনিসকে সুন্দর ও ভালো মনে করে, তা আল্লাহর কাছেও পছন্দনীয় বিবেচিত হয়। আর যা তাঁদের কাছে মন্দ বিবেচিত হয় তা তাঁর কাছেও মন্দ হিসেবে গৃহীত হয়।’(- মুসনাদ আহমদ : ৩৬০০; মুসনাদ বাযযার : ১৮১৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর তাঁরাই বহন করেছেন ইসলামের ঝা-া। ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। আল্লাহ তাঁদের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলিমকে সম্মানিত করেছেন। এ কারণেই আমরা বিচারের দিন পর্যন্ত তাঁদের নিকট ঋণী। কবি বলেন, ‘ইসলামের সম্মান তো তাঁদের ছায়াতেই; আর মর্যাদা তো তাই, যা তাঁরা নির্মাণ করে সুদৃঢ় করেছেন!’

তাঁরাই সুন্নাহ সম্পর্কে বেশি জানতেন, কুরআনও সবচে ভালো বুঝতেন তাঁরাই। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের কাছে কুরআনের অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন, এর অস্পষ্ট বিষয় তাঁদের সামনে স্পষ্ট করেছেন এবং এর কঠিন বিষয় তাঁদের জন্য সহজ করে বলেছেন। তাঁরাই এ কুরআনের তাফসীর সম্পর্কে সবচে বেশি জ্ঞাত। কারণ, তাঁরা কুরআন নাযিলের প্রেক্ষাপট তথা সময় ও অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছেন(ড. মুহাম্মদ আবূ শাহবা, আল-ইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাওযূআত ফী কুতুবিত তাফসীর, পৃষ্ঠা : ৫২)
ইমাম শাফেয়ী রহ. তাঁর ‘আর-রিসালা’ গ্রন্থে ছাহাবীগণের কথা আলোচনা করেন। তাঁদের যথাযোগ্য প্রশংসা করেন। অতপর তিনি বলেন,

قَالَ الشَّافِعِيُّ:أَثْنَى اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى عَلَى أَصْحَابِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْه وَسَلَّمَ فِي الْقُرْآنِ وَالتَّوْرَاةِ وَالْإِنْجيلِ وَسِيقَ لَهُمْ عَلَى لِسَانِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيه وَسَلَّمَ مِنَ الْفَضْلِ مَا لَيْسَ لِأحَدٍ بَعْدَهُمْ فَرَحِمَهُمُ اللهُ وَهَنَّأَهُمْ بِمَا آتَاهُمْ مِنْ ذَلِكَ بِبُلُوغِ أعْلَى مَنَازِلِ الصِّدِّيقِينَ وَالشّهداءِ وَالصَّالِحِينَ فَهُمْ أَدَّوْا إلْيَنَا سُنَنَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْه وَسَلَّمَ وَشَاهَدُوهُ وَالْوَحْيُ يَنْزِلُ عَلَيه فَعَلِمُوا مَا أَرَادَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيه وَسَلَّمَ عَامًّا وَخَاصًّا وَعَزْمًا وَإِرْشَادًا وَعَرَفُوا مِنْ سُنَّتِهِ مَا عَرَفْنَا وَجَهْلِنَا، وَهُمْ فَوْقَنَا فِي كُلِّ عِلْمٍ وَاجْتِهَادٍ وَوَرَعٍ وَعَقْلٍ وَأَمْرٍ اُسْتُدْرِكَ بِهِ عِلْمٌ وَاسْتُنْبِطَ بِهِ، وآراؤهم لَنَا أَحْمَدُ وَأَوْلَى بِنَا مِنْ آرائنا عندَنَا لِأَنْفَسُنَا وَاللهُ أعْلَمُ.               

) مناقب الشافعي للبيهقي ج১ ص ৪৪২ و درء تعارض العقل والنقل لابن تيمية ج৫ ص৭৩ و منهاج السنة النبوية في نقض كلام الشيعة القدرية لابن تيمية ج ৬ ص৮১ و مجموع الفتاوى لابن تيمية ج৪ ص১৫৮ واعلام الموقعين عن رب العالمين لابن القيم ج ১ص৬৩(

 

‘তাঁরা ইলম, ইজতিহাদ, তাকওয়া ও জ্ঞান-বুদ্ধিতে আমাদের ওপরে। তাঁরা আমাদের চেয়ে উত্তম এমন বিষয়ে যে ব্যাপারে ইলম জানা গেছে কিংবা যা ইস্তিমবাত বা উদ্ভাবন করা হয়েছে। তাঁদের  রায়গুলো আমাদের কাছে প্রশংসনীয়। আমাদের নিজেদের ব্যাপারেই আমাদের সিদ্ধান্তের চেয়ে তাঁরাই অগ্রাধিকার পাবার হকদার।’ (মুকাদ্দাম ইবনু সালাহ, ড. নূরুদ্দীন ‘ঈতর সম্পাদনা, বৈরুত, প্রকাশকাল : ২০০০ ইং, পৃষ্ঠা : ২৯৭)
আমাদের উপর তাদের বহু অনুগ্রহ রয়েছে। আমাদের পূর্বেই তারা ইসলামের এ নিয়ামত প্রাপ্ত হয়েছেন এবং আমাদের কাছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি প্রেরিত বাণী পৌঁছিয়ে দিয়েছেন ও তন্মধ্যে যা অস্পষ্ট ছিল তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ; তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন এবং তাদেরকে সন্তুষ্ট করুন।
ছাহাবা কারা? বুখারী রহ. তাঁর সহীহ গ্রন্থে ছাহাবীর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে: ‘মুসলিমদের মধ্যে যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ লাভ করেছেন অথবা তাঁকে দেখেছেন তিনিই ছাহাবী।’ অর্থাৎ ছাহাবী হলেন, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঈমানসহ দেখেছেন এবং ইসলাম নিয়েই ইন্তিকাল করে গেছেন। 
‘ছাহাবী’র সংজ্ঞায় এ ব্যাপকতা মূলত ছোহবত বা সাহচর্যের মর্যাদা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদার মহত্ত্বের প্রতি লক্ষ্য করে। কেননা নবুওতের নূর দর্শন মুমিনের অন্তরে একটি সংক্রামক শক্তি সঞ্চার করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতে মৃত্যু অবধি এ নূরের প্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হয় দর্শকের ইবাদত-বন্দেগীতে এবং তার জীবনযাপন প্রণালীতে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি বাণীতে আমরা এর সাক্ষ্য পাই। আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدَّرِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” طُوبَى لِمَنْ رَآنِي وَآمَنَ بيِ ، وَطُوبَى ثُمَّ طُوبَى ثُمَّ طُوبَى لِمنْ آمَنَ بِي وَلَمْ يَرَنيِ ” ) الأمالي المطلقة لابن حجر গ্ধ طوبى لمن رآني وآمن بي ، وطوبى ثم طوبى ثم طوبى لمن .. رقم الحديث: ৪৩ مسند أحمد وابن حبان والحاكم والبخاري في التاريخ وهو حديث صحيح(

‘সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য যে আমাকে দেখেছে এবং আমার প্রতি ঈমান এনেছে। আর সুসংবাদ ওই ব্যক্তির জন্য যে আমার প্রতি ঈমান এনেছে অথচ আমাকে দেখেনি।’ এ কথা তিনি সাতবার বললেন। (মুসনাদ আহমাদ : ২২৪৮৯)

এ সংজ্ঞা মতে ছাহাবীরা ছোহবত বা সাহচর্যের সৌভাগ্য এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দর্শনের মর্যাদায় অভিষিক্ত। আর তা এ কারণে যে, নেককারদের ছোহবতেরই যেখানে এক বিরাট প্রভাব বিদ্যমান, সেখানে সকল নেককারের সরদার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছোহবতের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব কেমন হবে তা বলাই বাহুল্য। অতএব যখন কোনো মুসলিম তাঁর দর্শন লাভে ধন্য হয়, হোক তা ক্ষণিকের জন্যে, তার আত্মা ঈমানের দৃঢ়তায় টইটুম্বুর হয়ে যায়। কারণ, সে ইসলামে দীক্ষিত হবার মাধ্যমে স্বীয় আত্মাকে ‘গ্রহণ’ তথা কবুলের জন্য প্রস্তুতই রেখেছিল। ফলে যখন সে ওই মহান নূরের মুখোমুখী হয়, তখন তার কায়া ও আত্মায় এর প্রভাব ভাস্কর হয়ে ওঠে।’(তাকিউদ্দীন সুবুকী, কিতাবুল ইবহাজ ফী শারহিল মিনহাজ : ১/১২)
ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,

عَنْ نُسَيْرِ بْنِ ذُعْلُوقٍ ، قَالَ : سَمِعْتُ ابْنَ عُمَرَ ، يَقُولُ : ” لا تَسُبُّوا أَصْحَابَ مُحَمَّدٍ فَلَمَقَامُ أَحَدِهِمْ سَاعَةً خَيْرٌ مِنْ عِبَادَةِ أَحَدِكُمْ أَرْبَعِينَ سَنَةً “( فضائل الصحابة لأحمد بن حنبل গ্ধ فَضَائِلُ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ … رقم الحديث: ১৫২৯(

‘তোমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছাহাবীদের গালাগাল করো না। কেননা তাদের এক মুহূর্তের (ইবাদতের) মর্যাদা তোমাদের প্রত্যেকের জীবনের আমলের চেয়ে বেশি।’ (ইবন মাজা : ১৬২; আহমাদ বিন হাম্বল, ফাযাইলুস ছাহাবা : ১৫)
এ ব্যাপারে ইবন হাযম একটি মূল্যবান বাক্য রয়েছে, তিনি বলেন, ‘আমাদের কাউকে যদি যুগ-যুগান্তর ব্যাপ্ত সুদীর্ঘ হায়াত প্রদান করা হয় আর সে তাতে অব্যাহতভাবে ইবাদত করে যায়, তবুও তা ওই ব্যক্তির সমকক্ষ হতে পারবে না যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক সেকেন্ড বা তার চেয়ে বেশি সময়ের জন্য দেখেছেন।’(ইবন হাযম, আল-ফাছলু ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল : ৩৩/২)
আল কুরআনে ছাহাবায়ে কেরাম: আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে অনেক স্থানে এ ছাহাবীদের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের সম্মান ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, 

وَالسّابِقونَ الأَوَّلونَ مِنَ المُهاجِرينَ وَالأَنصارِ وَالَّذينَ اتَّبَعوهُم بِإِحسانٍ رَضِيَ اللَّـهُ عَنهُم وَرَضوا عَنهُ وَأَعَدَّ لَهُم جَنّاتٍ تَجري تَحتَهَا الأَنهارُ خالِدينَ فيها أَبَدًا ذلِكَ الفَوزُ العَظيمُ﴿التوبة-১০০﴾

‘মুহাজির ও আনছারগণের মধ্যে অগ্রবর্তী ছাহাবীগণ এবং কল্যাণকর্মের মাধ্যমে তাঁদের অনুসারীগণের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তাঁরাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন’ (তওবাহ ১০০)

ছাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে আমাদের অন্তঃকরণকে নিষ্কলুষ রাখতে হবে। তাঁদের প্রতি হৃদয়ে কোন হিংসা-বিদ্বেষ বা ঘৃণা থাকবে না; থাকবে না কোন প্রকার শত্রুতা। বরং হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান পাবে শুধু ভালবাসা, অনুগ্রহ আর সহানুভূতি। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন, 

وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ﴿الحشر-১০﴾

‘যারা তাদের পরে এসেছে তারা বলে: ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে ও আমাদের ভাই যারা ঈমান নিয়ে আমাদের পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে তাদের ক্ষমা করুন; এবং যারা ঈমান এনেছিল তাদের জন্য আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না; হে আমাদের রব, নিশ্চয় আপনি দয়াবান, পরম দয়ালু।’ {সূরা আল-হাশর, আয়াত : ১০}
ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর গুণকীর্তন শুধুমাত্র পবিত্র কুরআনেই আসেনি; বরং তাঁদের সৃষ্টির আগেই তাওরাত ও ইঞ্জীলে তাঁদের প্রশংসার কথা বিঘোষিত হয়েছে। সূরা আল-ফাত্হের শেষ আয়াতে মহান আল্লাহ ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) সম্পর্কে ইরশাদ করেন, 

مُّحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّـهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ تَرَاهُمْ رُكَّعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّـهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْأَهُ فَآزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزُّرَّاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ وَعَدَ اللَّـهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا ﴿الفتح-২৯﴾

‘হযরত মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, আপনি তাদেরকে রুকূকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবেন। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সিজদার চি‎হ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজীলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মত, যে তার কচিপাতা উদগত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কা-ের ওপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন।’ {সূরা আল-ফাতহ, আয়াত : ২৯} 
ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর প্রতি সুবাসিত এই প্রশংসা ও গুণকীর্তন উল্লিখিত হয়েছে তাওরাত ও ইঞ্জীলে। এ ছাড়া আরও অনেক আয়াতে ছাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। 
হাদিসে পাকে ছাহাবায়ে কেরাম:
একইভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও ছাহাবীদের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। তাঁদের মর্যাদা ও মর্তবার কথা ব্যক্ত করেছেন। এ কথা থেকেই মানুষ তাঁদের মর্যাদা অনুধাবন করতে পারে যে, ইবাদত-বন্দেগী ও তাকওয়া-পরহেযগারীতে কেউ যতই উচ্চতায় পৌঁছুক না কেন ছাহাবীগণ যে স্তরে পৌঁছেছিলেন তার ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। নিচের হাদীসই সে কথা বলছে। ছাহাবী আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

وفي الصحيحين عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ : ” يَأْتِي عَلَى النَّاسِ زَمَانٌ يَغْزُونَ فِيهِ فِئَامًا مِنَ النَّاسِ ، فَيُقَالُ : هَلْ فِيكُمْ مِنْ صَحْبِ رَسُولِ اللَّهِ ؟ فَيُقَالُ : نَعَمْ . فَيُفْتَحُ لَهُمْ , ثُمَّ يَأْتِي عَلَيْهِمْ زَمَانٍ يَغْزُو فِيهِ فِئَامٌ مِنَ النَّاسِ ، فَيُقَالُ : هَلْ فِيكُمْ مِنْ صَحْبِ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ ؟ فَيُقَالُ : نَعَمْ , فَيُفْتَحُ لَهُمْ , ثُمَّ يَأْتِي عَلَيْهِمْ زَمَانٌ يَغْزُو فِيهِ فِئَامٌ مِنَ النَّاسِ ، فَيُقَالُ : هَلْ فِيكُمْ مِنْ صَحْبِ مَنْ صَاحَبَهُمْ ؟ فَيُقَالُ : نَعَمْ . فَيُفْتَحُ لَهُمْ . ((صحيح البخاري গ্ধ كتاب فضائل الصحابة গ্ধ باب فضائل أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم. رقم الحديث ৩৪৪৯)

 

‘লোকদের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন একদল লোক যুদ্ধ করবে, তারা বলবে, তোমাদের মধ্যে কি কেউ আছেন যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ লাভ করেছেন? সবাই বলবে, হ্যাঁ। তখন তাদের বিজয় দান করা হবে। অতপর লোকদের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন একদল লোক যুদ্ধ করবে, তারা বলবে, তোমাদের মধ্যে কি কেউ আছেন যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গলাভকারী কারও ছোহবত পেয়েছেন? সবাই বলবে, জী হ্যাঁ। তখন তাদের বিজয় দান করা হবে। অতপর লোকদের ওপর এমন এক যুগ আসবে যখন একদল লোক যুদ্ধ করবে, তারা বলবে, তোমাদের মধ্যে কি কেউ আছেন যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গ লাভকারীর সোহবতপ্রাপ্ত কারও সাহচর্য পেয়েছেন? সবাই বলবে, হ্যাঁ। তখন তাদের বিজয় দান করা হবে।’([বুখারী : ৩৬৪৯; মুসনাদ আহমদ : ২৩০১০])
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ , قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ : ” لا تَسُبُّوا أَصْحَابِي , فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلا نَصِيفَهُ(“( صحيح البخاري গ্ধ كتاب فضائل الصحابة গ্ধ باب قول النبي صلى الله عليه وسلم لو كنت متخذا خليلاصحيح البخاري – المناقب (৩৪৭০)  صحيح مسلم – فضائل الصحابة (২৫৪১)  سنن الترمذي – المناقب (৩৮৬১)  سنن أبي داود – السنة (৪৬৫৮)  سنن ابن ماجه – المقدمة (১৬১)  مسند أحمد – باقي مسند المكثرين (৩/১১)  مسند أحمد – باقي مسند المكثرين (৩/৫৫)  مسند أحمد – باقي مسند المكثرين (৩/৬৪)(
আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘তোমরা আমার ছাহাবীদের গালমন্দ করো না। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ। যদি তোমাদের কেউ উহুদ পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তবে তা তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেকরও সমকক্ষ হতে পারবে না।’(বুখারী : ৩৬৭৩; মুসলিম : ৬৬৫১])
কোন একজন ছাহাবী যদি একজন মিসকীনকে এক মুদ্দ (সামান্য) পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য দান করে আর আপনি এক ওহোদ পরিমাণ স্বর্ণ দান করেন, তথাপিও আপনি ঐ ছাহাবীর এক মুদ্দ পরিমাণ দানের ধারে কাছেও যেতে পারবেন না। যদিও এটি সম্ভব নয় যে, আমাদের কারো ওহোদ পরিমাণ স্বর্ণ হবে এবং সে তা আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করবে। 
ছহীহ হাদীছে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بن مسعود رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: خَيْرُ النَّاسِ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ، ثُمَّ يَجِيءُ أَقْوَامٌ تَسْبِقُ شَهَادَةُ أَحَدِهِمْ يَمِينَهُ، وَيَمِينُهُ شَهَادَتَهُ  (روى البخاري (২৬৫২) ، ومسلم (২৫৩৩)(

‘আমার যুগের মানুষই সর্বোত্তম মানুষ। অতঃপর তার পরের যুগের মানুষ, অতঃপর তার পরের যুগের মানুষ’(বুখারী-২৬৫২, মুসলিম-২৫৩৩()

। 
আরেক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

“النُّجُومُ أَمَنَةٌ لِلسَّمَاءِ فَإِذَا ذَهَبَتْ النُّجُومُ أَتَى السَّمَاءَ مَا تُوعَدُ وَأَنَا أَمَنَةٌ لِأَصْحَابِي فَإِذَا ذَهَبْتُ أَتَى أَصْحَابِي مَا يُوعَدُونَ وَأَصْحَابِي أَمَنَةٌ لِأُمَّتِي فَإِذَا ذَهَب أَصْحَابِي أَتَى أُمَّتِي مَا يُوعَدُونَ”. (মুসলিম : ৬৬২৯; মুসনাদ আহমদ : ১৯৫৬৬](
‘নক্ষত্ররাজি হলো আসমানের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ, তাই যখন তারকারাজি ধ্বংস হয়ে যাবে, আসমানের জন্য যা প্রতিশ্রুত ছিল তা এসে যাবে। একইভাবে আমি আমার ছাহাবীদের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। অতএব আমি যখন চলে যাব তখন আমার ছাহাবীদের ওপর তা আসবে যা তাদের ওয়াদা করা হয়েছিল। আর আমার ছাহাবীরা আমার উম্মতের জন্য নিরাপত্তাস্বরূপ। যখন আমার ছাহাবীরা চলে যাবে তখন আমার উম্মতের ওপর তা আসবে যা তাদের ওয়াদা করা হয়েছিল।’ 

حديث أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “افْتَرَقَتِ الْيَهُودُ عَلَى إِحْدَى أَوْ ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، وَتَفَرَّقَتِ النَّصَارَى عَلَى إِحْدَى أَوْ ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِى عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً” (رواه أبود داوود والترمذي وابن ماجة وأحمد ، وقال الترمذي: حسن صحيح.(
“হাদীছ শরীফে আরো উল্লেখ আছে যে, অতি শীঘ্রই আমার উমমত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে । একটি দল ব্যতীত বাহত্তরটি দলই জাহান্নামে যাবে। তখন ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণ বললেন, ইয়া রসুলাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! যে একটি দল নাযাতপ্রাপ্ত, সে দল কোন্টি? হুযুর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি এবং আমার ছাহাবা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম’র মত ও পথের উপর যারা কায়েম থাকবে । অর্থাৎ তারাই নাযাতপ্রাপ্ত দল । (তিরমিযী শরীফ) অপর এক হাদীছ শরীফে বর্ণিত রয়েছে :

وحديث معاوية بن أبي سفيان رضي الله عنهما قال: ألا إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قام فينا فقال: “أَلاَ إِنَّ مَنْ قَبْلَكُمْ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ افْتَرَقُوا عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وَإِنَّ هَذِهِ الْمِلَّةَ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ ، ثِنْتَانِ وَسَبْعُونَ فِي النَّارِ، وَوَاحِدَةٌ فِي الْجَنَّةِ، وَهِي الْجَمَاعَةُ”( و صحّحه الترمذي، و ابن حبان (১৪।১৪০)، و الحاكم (১।১২৮)، والمنذري، و الشاطبي في الاعتصام (২।১৮৯) و السيوطي في الجامع الصغير (২।২০)، وجوّده الزين العراقي في تخريج أحاديث الإحياء.(

 “হযরত মুয়াবিয়া রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণিত আছে, বাহাত্তরটি দল হবে জাহান্নামী, আর একটি দল হবে জান্নাতী । আর সে দলটিই হচ্ছে জামায়াতে সাহাবা (তথা আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াত) ।( ইবনু হিব্বান-১৪/১৪০,হাকেম-১/১২৮  )

نِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : ” اللَّهَ اللَّهَ فِي أَصْحَابِي ، لا تَتَّخِذُوهُمْ غَرَضًا مِنْ بَعْدِي ، فَمَنْ أَحَبَّهُمْ فَبِحُبِّي أَحَبَّهُمْ ، وَمَنْ أَبْغَضَهُمْ فَبِبُغْضِي أَبْغَضَهُمْ ، وَمَنْ آذَاهُمْ فَقَدْ آذَانِي ، وَمَنْ آذَانِي فَقَدْ آذَى اللَّهَ ، وَمَنْ آذَى اللَّهَ فَيُوشِكُ أَنْ يَأْخُذَهُ ” .
আবদুল্লাহ ইবন মুগাফফাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘আমার ছাহাবীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো আল্লাহকে ভয় কর। আমার পরবর্তীকালে তোমরা তাঁদের সমালোচনার নিশানায় পরিণত করো না। কারণ, যে তাদের ভালোবাসবে সে আমার মুহাব্বতেই তাদের ভালোবাসবে। আর যে তাঁদের অপছন্দ করবে সে আমাকে অপছন্দ করার ফলেই তাদের অপছন্দ করবে। আর যে তাঁদের কষ্ট দেবে সে আমাকেই কষ্ট দেবে। আর যে আমাকে কষ্ট দেবে সে যেন আল্লাহকেই কষ্ট দিল। আর যে আল্লাহকে কষ্ট দেবে অচিরেই আল্লাহ তাকে পাকড়াও করবেন।’([তিরমিযী : ৪২৩৬; সহীহ ইবন হিব্বান : ৭২৫৬])
উপরের উদ্ধৃতিগুলো থেকে আমরা জানলাম যে, আল্লাহ তা‘আলা ছাহাবীদের প্রশংসা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের ওপর তাঁর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ কর্তৃক তাঁদের স্তুতি ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাঁদের ভূয়সী প্রশংসাই প্রমাণ করে যে তাঁরা হলেন ন্যায়নিষ্ঠ। সর্বোপরি আপন নবীর সঙ্গী ও তাঁর সহযোগী হিসেবে আল্লাহ যাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন তাঁদের তো আর কোনো ন্যায়নিষ্ঠতা প্রমাণের প্রয়োজন নেই। এর চেয়ে বড় আর কোনো সনদ হতে পারে না। এর চেয়ে পূর্ণতার আর কোনো দলীল হতে পারে না।( ইবন আবদিল বার, আল-ইস্তি‘আব ফী মা‘রিতিল আসহাব : ১/১])
আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর আরেকটি উক্তি এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, 

قَالَ ابْنُ مَسْعُودٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ ” مَنْ كَانَ مِنْكُمْ مُتَأَسِّيًا فَلْيَتَأَسَّ بِأَصْحَابِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؛ فَإِنَّهُمْ كَانُوا أَبَرَّ هَذِهِ الأُمَّةِ قُلُوبًا وَأَعْمَقَهَا عِلْمًا وَأَقَلَّهَا تَكَلُّفًا وَأَقْوَمَهَا هَدْيًا وَأَحْسَنَهَا حَالا ، قَوْمًا اخْتَارَهُمُ اللَّهُ لِصُحْبَةِ نَبِيِّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، فَاعْرِفُوا لَهُمْ فَضْلَهُمْ وَاتَّبِعُوهُمْ فِي آثَارِهِمْ ؛ فَإِنَّهُمْ كَانُوا عَلَى الْهُدَى الْمُسْتَقِيمِ. “) الشريعة للآجري ৪/১৬৮৬ ,كذا أخرجه أبو نعيم في الحلية (১/৩০৬،৩০৫(

“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি অনুসরণ করতে চায় তবে সে যেন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছাহাবীগণেরই অনুসরণ করে। কারণ, তাঁরাই ছিলেন এ উম্মতের মধ্যে আত্মার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নেককার, ইলমের দিক থেকে গভীরতর, লৌকিকতার দিক থেকে সল্পতম, আদর্শের দিক থেকে সঠিকতম, অবস্থার দিক থেকে শুদ্ধতম। তাঁরা এমন সম্প্রদায় আল্লাহ যাদেরকে আপন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংস্পর্শধন্য হবার জন্য এবং তাঁর দ্বীন কায়েমের উদ্দেশ্যে বাছাই করেছেন। অতএব তোমরা তাঁদের মর্যাদা অনুধাবন করো এবং তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করো। কারণ, তাঁরা ছিলেন সীরাতে মুস্তাকীমের ওপর প্রতিষ্ঠিত। (আবূ নাঈম, হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৩০৫/১; . মুহাম্মদ ইবন আবূ শাহবা, আল ইসরাঈলিয়্যাত ওয়াল মাওযূয়াত ফী কুতুবিত তাফসীর])

وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين. والحمد لله رب العالمين

শবে বরাতের সমর্থনে ২২ সহিহ হাদীস 

Standard

আজ ক্ষমার রজনী পবিত্র শবে বারাত। শবে বরাতের সমর্থনে ২২ সহিহ হাদীস নিম্নে পেশ করছি। নিজে পড়ুন ও শেয়ার করুন। 

__________________________________

(১)

উম্মুল মুমীনিন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা

রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ

সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা

করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম

ইরশাদ করেন, তুমি কি এ রাত তথা শাবানের ১৫তম রজনী সম্পর্কে কিছু জান? তিনি আরজ করলেন এ রাতে কি রয়েছে? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, এ রাতে যে সকল বনী আদম জন্মগ্রহন করবে তাদের নাম চূড়ান্ত করা হবে আর যে সকল বনী আদম মৃত্যুবরন করবে তাদের নামও লিপিবদ্ধ করা হবে। এ রাতে তদের পুরো বছরের আমলসমূহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে পেশ করা হবে আর এ রাতে তাদের রিজিক/জিবিকা নির্ধারণ করা হবে। অতপর তিনি আরজ করলেন, নিশ্চই

আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যতীত কেও জান্নাতে প্রবেশ

করতে পারবেনা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি

ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চই আল্লাহর অনুগ্রহ ব্যতীত কেও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা তিনি এ বাক্য তিনবার বলেন। অতপর তিনি আরজ করলেন, আপনিও হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্বীয় হাত মুবারক মাথা মুবারকের উপর রেখে ইরশাদ করেন, নিশ্চই আমি আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে জান্নাতে প্রবেশ করব। এ বাক্য তিনি তিনবার ইরশাদ করেন।
বায়হাক্বী শরীফ-দাওয়াতে কবীর হাদীস নং-৫৩০;

মিশকাত শরীফ-১১৫ পৃঃ হাদীস নং-১৩০৫
(২)

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা

রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেনন,

একরাতে আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি

ওয়াসাল্লামকে ঘরে পেলামনা বা তাঁর খোঁজে বের

হলাম। তখন দেখলাম তিনি জান্নাতুল বাক্বী

কবরস্থানে আসমানেকে মাথা মুবারক উত্তোলন

করে অবস্থান করছেন। আমাকে সেখানে দেখে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন- হে আয়েশা! তুমি কি এ ভয় করছ যে, আল্লাহ তাঁর রসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তোমার প্রতি অবিচার করবে? তিনি আরজ করলেন আপনি বলছেন, এমন কিছু আসলে আমার মনে নেই বরং; আমি

ধারণা করেছি যে, আপনি আপনার কোন স্ত্রীর

হুজরায় তাশরীফ নিয়েছেন। তখন নবী করীম

সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন- নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা শা’বানের পনেরতম রাতে প্রথম আসমানে তাশরীফ আনেন। অতঃপর বনী ক্বলব এর মেষগুলোর লোম এর সংখ্যার চেয়েও অধিক

বান্দাকে ক্ষমা করে দেন।
ইবনে মাজা শরীফ,হাদীস নং-১৩৮৯; 

জামে আত তিরমিযি-৭৩৯; 

মুসনাদে আ’ব্দ বিন হুমায়দ-১৫০৯;

মুসান্নাফে আবী শায়বাহ-২৯৮৫৮; 

মুসনাদে আহমদ-২৬০১৮,২৬০৬০; 

বায়হাক্বী ফাজায়িলুল আওকাত-২৮; 

শো’আবুল ঈমান-৩৫৪৩,৩৫৪৪,৩৫৪৫; 

আন নুযুল দারে ক্বুতনী-৯০; 

বগভী শরহুস সুন্নাহ-৯৯২;

সুয়ুতী তাফসীরে দুররে মানসুর, সুরদুখান-৭:৪০২;

তাফসীরে রূহুল মা’আনী, সুরা দুখান ১৮:৪২৩/১৩:১১০; 

তাফসীরে কাশশাফ, সুরা দুখান, ৪:২৭০; তাফসীরে কবীর, সুরা দুখান ২৭:৬৫৩
(৩)

হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রাদ্বিল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি অয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,যখন শাবানের পনেরতম রাত হয়, তখন তোমরা রাতে নামাজ পড় এবং রোজা রাখ। কেননা ঐ দিন সূর্যাস্তের সময় আল্লাহ

তা’আলা প্রথম আসমানে তাশরীফ এনে বান্দাদের উদ্দেশ্যে বলেন- ক্ষমা প্রার্থনাকারী কেও আছ, আমি তাকে ক্ষমা করব, রিজিক আন্বেষণকারী কেও আছ, আমি তাকে রিজিক দিব, আসুস্থ কেও আছ আমি তাকে সুস্থতা দান করব, এভাবে অন্যান্য

বিষয়েও বলতে থাকেন ফজর পর্যন্ত।
ইবনে মাজাহ ,হাদীস নং-১৩৮৮; 

ফাকেহী আখবারে মক্কা-১৮৩৭,৩:৮৪; 

বায়হাক্বী ফাজায়িলুল আওকাত-২৪; 

শো’আবুল ঈমান-৩৫৪২;

মিশকাত শরীফ-১১৫ পৃঃ, হাদীস নং-১৩০৮; কানযুল উম্মাল-৩৫১৭৭; 

তাফসীরে রূহুল মা’আনী, সুরা দুখান,

১৮:৪২৪/১৩:১১০; 

তাফসীরে ক্বুরতুবী, সুরা দুখান ১৬:১২৭
(৪)

হযরত মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি

ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন- আল্লাহ তায়ালা

শাবানের পনেরতম রাতে স্বীয় সৃষ্টির প্রতি

রহমতের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং মুশরিক, হিংসুক ব্যতীরেকে সবাইকে ক্ষমা করেছেন।
তাবরানী মু’জামুল আউসাত হাদীস নং-৬৭৭৬;

মু’জামুল কবীর-২০:১০৮,২১৫, 

মুসনাদে শামেয়ীন-২০৩,২০৫,৩৫৭০; 

ইবনে আসেম আস সুন্নাহ-৫১২; 

সহীহ ইবনে হিব্বান- ৫৬৬৫;

বায়হাক্বী ফাজায়িলুল আওকাত-২২; 

শো’আবুল ঈমান হাদীস নং-৩৫৫২, ৬২০৪; 

দারে ক্বুতনী আন নুযুল-৭৭; 

হায়ছামী মাজমাউজ যাওয়ায়িদ-১২৯৬০;

আলবানী সহীহ আত তারগীব ওয়াত

তাহরিব-১০২৬,২৭৬৭; 

সুয়ুতী তাফসীরে দুররে মানসুর, সুরা দুখান-৭:৪০৩, 

কানযুল উম্মাল-৩৫১৮০ 
(৫)

হযরত আবু মুসা আশয়ারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বরনিত, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেছেন- নিশ্চই আল্লাহ তা’আলা শাবানের পনেরতম রাতে সৃষ্টির প্রতি কৃপা দৃষ্টি দেন এবং সকলকে ক্ষমা করেন, মুশরিক এবং বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীরেকে।
ইবনে মাজা শরীফ হাদীস নং-১৩৯০; 

ইবনে আসেম আস সুন্নাহ-৫১০; 

বায়হাক্বী ফাজায়িলুল আওকাত-২৯; 

দারে ক্বুতনী আন নুযুল-৯৪; 

কানযুল উম্মাল-৩৫১৭৫; 

আলবানী সহীহুল জামে-১৮১৯

হাদীসটি হাসান/ সহীহ লিগাইরিহি
(৬)

হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু

আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,যখন পনেরই

শাবানের রাত হয়, তখন আল্লাহ তায়ালা প্রথম

আসমানে তশরীফ আনেন এবং সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, মুশরিক ও অপর ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত।
মুসনাদে বাযযার ১:২০৬, হাদীস নং-৮০; 

ইবনে আসেম আস সুন্নাহ-৫০৯; 

দারে ক্বুতনী আন নুযুল-৭৫,৭৬; 

ইবনে খুযাইমাহ আত তাওহীদ-৪৮; 

আলী মুরুযী মুসনাদে আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-১০৪; 

আবু নুয়াইম তারিখে ইস্পাহান-২:২; 

হায়ছামী মাজমাউজ যাওয়ায়িদ-১২৯৫৭; 

সুয়ুতী তাফসীরে দুররে মানসুর, সুরা দুখান-৭:৪০৩ 
(৭)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আল্লাহ তায়ালা

শ’বানের পনেরতম রাতে সিদ্ধান্তসমুহ চুড়ান্ত করেন এবং শবে ক্বদরে তা বাস্তবায়নকারী

ফেরেশতাদের সোপর্দ করেন।
তাফসীরে খাজিন ৪র্থ খণ্ড,পৃষ্ঠাঃ১১২ /১১৬;

তাফসীরে বগভী আল ইহিয়ায়ুত তুরাস, ৪:১৭৪, সুরা দুখান; 

তাফসীরে ক্বুরতুবী, ১৬:১২৭, সুরা দুখান;

ইবনে আ’দিল আল লুবাব ফি উলুমিল কিতাব-১৭:৩১১
(৮)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন এমন পাঁচটি রাত আছে যে রাতগুলোয় দু’আ ফেরত হয়না। ওইগুলো হল- জুমু’আর রাত, রজব মাসের প্রথম রাত, শ’বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত এবং দুই ঈদের রাত অর্থাৎ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত।
মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, কিতাবুস সিয়াম

হাদীস নং-৭৯২৭; 

বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান-৩৪৪০;

ফাজায়িলুল আওকাত-১৪৯
(৯)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু

হতে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু

আলায়হি অয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা শা’বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে স্বীয় মাখলুকের প্রতি রহমতের দৃষ্টি

নিক্ষেপ করেন। অতঃপর দু শ্রেণীর বান্দা ব্যতীত

সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। তারা হল মুসলমান ভাইয়ের প্রতি হিংসা বিদ্বেষ পোষণকারী এবং অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যাকারী।
মুসনাদে আহমদ-৬৬৪২; আত তাগরীব; 

হায়ছামী মাজমাউজ যাওয়ায়িদ-১২৯৬১; তাফসীরে রূহুল মা’আনী, সুরা দুখান, ১৮:৪২৩/১৩:১১০
(১০)

হযরত কাসীর বিন মুররাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি

অয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- শাবানের মধ্য

রাত্রিতে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা মুশরিক ও

কলহকারী ব্যতীত সকল দুনিয়াবাসীদের ক্ষমা করে দেন।
বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান হাদীস নং-৩৫৫০;

আলবানী সহীহ আত তারগীব ওয়াত তাহরিব-২৭৭০
(১১)

হযরত কাসীর বিন মুররাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি

অয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- শাবানের মধ্য

রাত্রিতে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা আল্লাহ

তায়ালা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ

করেন এবং মুশরিক ও কলহকারী ব্যতীত সকল

ক্ষমাপ্রার্থী দুনিয়াবাসীদের ক্ষমা করে দেন।
মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, কিতাবুস সাওম-৭৯২৩; 

মুসান্নাফে আবী শায়বাহ-২৯৮৫৯; আন

নুযুল দারে ক্বুতনী-৮২, ৮৩, ৮৪; বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান হাদীস নং ৩৫৫০, ৩৫৪৯
(১২)

হযরত আবু সা’অলাবা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে

বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি

অয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- যখন পনেরই শাবানের রাত হয়,আল্লাহ তায়ালা তাঁর সৃষ্টির প্রতি বিশেষ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে দেন ও কাফিরদের অবকাশ দেন। আর হিংসা বিদ্বেষ পোষণকারীদের আহ্বান করেন অবকাশ দেন (তাওবার জন্য) যতক্ষণ তাদের হিংসার কারণে তারা তার নিকট তওবা না করে।
বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান হাদীস নং-৩৫৫১;

ইবনে আসেম আস সুন্নাহ-৫১০; 

তাবরানী আল মু’জামুল কবীর ২২: ২২৩, ২২৪, হাদীস নং ৫৯০, ৫৯৩;

বায়হাক্বী আস সুনানুস সগীর-১৪২৬; ফাজায়িলুল আওকাত-২৩; দার ক্বুতনী আন নুযুল-৭৮,৮১; 

হায়ছামী মাজমাউজ যাওয়ায়িদ ১২৯৬২; আলবানী সহীহ আত তারগীব ওয়াত তাহরিব ২৭৭১;সহীহুল জামে ৭৭১;

সুয়ুতী তাফসীরে দুররে মানসুর, সুরা দুখান-৭:৪০৩,

কানযুল উম্মাল-৩৫১৮৩ 
(১৩)

হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন পনেরই শাবানের রাত হয়, তখন আল্লাহ তায়ালা সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন, মুশরিক ও অপর ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত।
মুসনাদে বাযযার ১৬:১৬১ হাঃনং-৯২৬৮;

হায়ছামী মাজমাউজ যাওয়ায়িদ ১২৯৫৮; নুজহাতুল মাজালিস ওয়া মুনতাখাবুন নাফাইস, বাব,ফাদলু শ’বান ওয়া ফাদলু সালাতুত তাসবীহ, ১:১৪৬/১:১৬১
(১৪)

হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত,

তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি

ওয়াসাল্লাম একদা রাতে সালাত আদায় করছিলেন। তিনি সিজদায় গিয়ে দীর্ঘ সময় সিজদায় থাকলেন। এমনকি আমার মনে হলো যে, তাঁর ওফাত হয়ে গেছে। আমি যখন এমনটি দেখলাম, তখন শোয়া থেকে উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম, ফলে তিনি নড়ে উঠলেন। তখন আমি (বিছানায়) ফিরে গেলাম। অতঃপর যখন তিনি সিজদা থেকে মস্তক উঠালেন এবং নামায শেষ করলেন তখন বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি মনে করেছিলে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তোমার সাথে প্রতারণা করছেন? আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, আমি

এমনটি মনে করিনি। বরং আপনার দীর্ঘ সিজদার কারনে আমার মনে হয়েছে যে, আপনার ওফাত হয়ে গেছে। তখন তিনি বললেন, তুমি কি জান এটি কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম অবগত। তিনি বললেন এটি মধ্য শাবানের রাত। আল্লাহ তাআলা এ রাতে তার বান্দাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। যারা ক্ষমা প্রার্থনা করে তাদেরকে ক্ষমা করেন, যারা দয়া প্রার্থনা করে তাদেরকে দয়া করেন এবং যারা বিদ্বেষী তাদেরকে তাদের অবস্থাতেই রেখে দেন।
বায়হাক্বী শোয়া’বুল ঈমান-৩৬৭৫/৩৫৫৪;

ফাযায়িলুল আওকাত-২৬; 

সুয়ুতী আদ দুররুল মান্সুর,সুরা দুখান,৭:৪০৩
(১৫)

হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, চারটি রাত এমন রয়েছে যেগুলোর ফযীলত তাদের দিনের ন্যায় দিনের ফযীলত রাতের ন্যায়। যাতে আল্লাহ তা’আলা বান্দাহদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেন, তাঁর বান্দাদের মুক্ত করেন এবং অফুরন্ত নি’আমত প্রদান করেন। তা হল- কদরের রাত ও তার পরবর্তী দিন, আরাফার রাত ও তার পরবর্তী দিন, শাবানের মধ্য রাত্রি (শবে বরাত) ও তার পরবর্তী দিন, জুম’আর রাত ও তার পরবর্তী দিন।
দায়লামি, কানযুল উম্মাল-৩৫২১৪; 

সুয়ুতী জামেউল আহাদীস-৩০৮০
(১৬)

হযরত উসমান বিন আবীল আ’স রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,তিনি বলেন-রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,যখন পনেরই শাবানের রাত হয়,তখন আহবানকারী আহবান করবে এই বলে, আছে কেউ মুক্তিকামী গুনাহ হতে ? তাকে

ক্ষমা করা হবে। কেউ আছে যে কিছু চাইবে তাকে

তা দান করা হবে। প্রত্যেক কামনাকারীকে প্রদান

করা হবে শুধুমাত্র মুশরিক ও ব্যভিচারকারী মহিলা ব্যতীত।
বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান হাদীস নং-৩৫৫৫;

ফাজায়েলু আওকাত-২৫; 

কানযুল উম্মাল-৩৫১৭৮;

সুয়ুতী তাফসীরে দুররে মানসুর, সুরা দুখান-৭:৪০৩
(১৭)

আতা বিন ইয়াসার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, শা’বানের মধ্য রজনীতে (শবে বরাতে) মানুষের হায়াত পূর্ণ করা হয়। অথচ লোকটি ভ্রমণকারী হিসেবে বের হয়েছে, এমতাবস্থায় তার হায়াত পূর্ণ করা হয়েছে এবং মৃত্যু তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং বিবাহ করেছে এমতাবস্থায় তার হায়াত শেষ করা হয়েছে ও মৃত্যু তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অর্থাৎ জীবন, মৃত্যু ইত্যাদি এ রাতে নির্ধারিত হয়।
মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, কিতাবুস সাওম-৭৯২৫;

সুয়ুতী তাফসীরে দুররে মানসুর, সুরা দুখান-৭:৪০৩
(১৮)

হযরত ইকরামা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,

তিনি সুরা দুখানের আয়াত (এ রাতে প্রত্যেক

প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজের ফয়সালা দেওয়া হয়।

আয়াত-৪)এর তাফসীরে বলেন, শাবানের মধ্য

রজনীতে আল্লাহ তায়ালা পরবর্তী বছরে যে সকল

ঘটনা সংগঠিত হবে (বাজেট) তা লিপিবদ্ধ করবেন যারা মৃত্যু বরণ করবে তাদের মধ্য থেকে কারো কারো হায়াত বৃদ্ধি করা হবে এবং যারা আল্লাহর পবিত্র গৃহের তাওয়াফ করবে অর্থাৎ হজ্জ্ব আদায় করবে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা হবে। অতঃপর দের মধ্যে কোন কিছু বৃদ্ধি পাবে না এবং তাদের মধ্য হতে কমতিও হবে না।
সুয়ুতী আদ দুররুল মান্সুর,সুরা দুখান,৭:৪০১; শিহাব উদ্দীন আলুসী রুহুল মা’আনী, সুরা দুখান,১৩:১১২/ ১৮:৪২৭; 

ইবনে জারীর তাবারী তাফসীরে ত্ববারী

জামেউল বয়ান, সুরা দুখান,২২:১০; 

তাফসীরে সা’লাবী ৮:৩৪৯; 

তাফসীরে বগভী, সুরা দুখান ৪:১৭৩;

তাফসীরে মাযহারী ৮:৩৬৮
(১৯)

উসমান বিন মুগীরাহ বিন আখফাশ রাদ্বিয়াল্লাহু

আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ

সাল্লাল্লাহু আলায়হি অয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

শবে বরাতে এক শা’বান হতে আর এক শা’বানের

মধ্যকার হায়াত কর্তন করা হয়। অথচ মানুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় সন্তান সন্ততি জন্ম দেয়

এমতাবস্থায় তার নাম মৃত্যুর তালিকায় নেয়া হয়।

(হাদিসটি হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতেও বর্ণিত হয়েছে।)
বায়হাক্বী শো’আবুল ঈমান হাদীস নং-৩৫৫৮;

শিহাব উদ্দীন আলুসী রুহুল মা’আনী, সুরা

দুখান,১৩:১১২/১৮:৪২৭; 

ইবনে জারীর তাবারী তাফসীরে ত্ববারী জামেউল বয়ান, সুরা দুখান,২২:১০; 

কানযুল উম্মাল-৪২৭৮০; 

তাফসীরে সা’লাবী ৮:৩৪৯; 

তাফসীরে খাজিন ৪:১১২/১১৬;

শওকানী ফাতহুল ক্বাদীর, সুরা দুখান,৪:৬৫৫; সুয়ুতী জামেউল আহাদীস-১০৯১৭; 

দায়লামী ২:৭৩-২৪১০;

তাফসীরে বগভী সুরা দুখান ৪:১৭৪; 

তাফসীরে মাযহারী ৮:৩৬৮

সুয়ুতী আদ দুররুল মান্সুর, সুরা দুখান,৭:৪০১;

শওকানী ফাতহুল ক্বাদীর, সুরা দুখান ৪:৬৫৫; মুসনাদে দায়লামী-২৪১০
(২০)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়ায়াল্লাহু

আনহু হতে বর্ণিত, শা’বানের মধ্য রজনীতে যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা করা হয় এবং উহা রমযানের ২৭ তারিখ ক্বদরের রাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দায়িত্বশীলদের নিকট সোপর্দ করা হয়।
শিহাব উদ্দীন আলুসী রুহুল মা’আনী,সুরা

দুখান,১৩:১১২/১৮:৪২৭
(২১)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়ায়াল্লাহু

আনহু হতে বর্ণিত, নিশ্চই আল্লাহ্ তা’আলা

শা’বানের মধ্য রজনীতে যাবতীয় বিষয়ের ফয়সালা করেন এবং উহা ক্বদরের রাতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দায়িত্বশীলদের নিকট সোপর্দ করেন।
তাফসীরে বগভী, সুরা দুখান ৪:১৭৪; 

তাফসীরে খাযিন, সুরা দুখান ৪:১১৬, 

আল লুবাব ফি উলুমিল কিতাব ১৭:৩১১; তাফসীরে মাযহারী ৮:৩৬৮
(২২)

হযরত আবু উমামাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,তিনি বলেন এমন পাঁচটি রাত আছে যে রাতগুলোয় দু’আ ফেরত হয়না। ওইগুলো হল-জুমু’আর রাত,রজব মাসের প্রথম রাত,শ’বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত এবং দুই ঈদের রাত অর্থাৎ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত।
সুয়ুতী জামেউল আহাদীস-১১৯৭৯; দায়লামী

ইমামের পিছনে নামাজ পড়ার সময় চুপ থাকা

Standard

▆ নামাযে “ইমামের পড়ার সময় তোমরা চুপ থাকবে’’ হাদিস পাকের তাহকিক📓
হাদিস শরিফটির দু’টি সনদ এর পর্যালোচনাঃ

১ম সনদ :

“ইমামের পড়ার সময় তোমরা চুপ থাকবে’’ এই কথাটুকু সহীহ মুসলিম শরিফে হযরত আবু মূসা আশআরী রা. কর্তৃক বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ।

সম্পূর্ণ হাদীসটি ইমাম মুসলিম রহ. এঁর সনদে নিম্নরূপ:

حدثنا سعيد بن منصور ، وقتيبة بن سعيد ، وأبو كامل الجحدري ، ومحمد بن عبد الملك الأموي ، اللفظ لأبي كامل قالوا: حدثنا أبو عوانة ، عن قتادة ، عن يونس بن جبير ، عن حطان بن عبد الله الرقاشي قال:  صليت مع أبي موسى الأشعري صلاة …فقال أبو موسى …إن رسول الله صلى الله عليه وسلم خطبنا فبين لنا سنتنا وعلمنا صلاتنا ، فقال إذا صليتم فأقيموا صفوفكم ، ثم ليؤمكم أحدكم ، فإذا كبر فكبروا ، وإذا قال  غير المغضوب عليهم ولا الضالين  فقولوا آمين ، يجبكم الله …وإذا قال سمع الله لمن حمده فقولوا اللهم ربنا لك الحمد، يسمع الله لكم…

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِى شَيْبَةَ ، حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ أَبِى عَرُوبَةَ ، ح وَحَدَّثَنَا أَبُو غَسَّانَ الْمِسْمَعِىُّ ، حَدَّثَنَا مُعَاذُ بْنُ هِشَامٍ ، حَدَّثَنَا أَبِى ، ح وَحَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ ، أَخْبَرَنَا جَرِيرٌ ، عَنْ سُلَيْمَانَ التَّيْمِىِّ ،كُلُّ هَؤُلاَءِ عَنْ قَتَادَةَ فِى هَذَا الإِسْنَادِ بِمِثْلِهِ. “وَفِى حَدِيثِ جَرِيرٍ عَنْ سُلَيْمَانَ ، عَنْ قَتَادَةَ ، مِنَ الزِّيَادَةِ:  “وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا ”

অর্থাৎ : “আবু মূসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত।

তিনি বলেন,

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের খেতাব করলেন এবং আমাদের দ্বীনের তরীকা ও নামাযের নিয়ম শেখালেন।

তিনি বললেন,

যখন তোমরা নামায পড়তে শুরু কর তখন (প্রথমে) কাতারগুলো সোজা কর।

অত:পর তোমাদের একজন ইমাম হবে।

সে যখন তাকবীর দেয় তখন তোমরা তাকবীর দিবে।

আর সে যখন পড়ে তখন তোমরা চুপ থাকবে।

সে যখন  غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ বলে তখন তোমরা আমীন বলবে।

আল্লাহ তোমাদের দুআ কবুল করবেন…।

সে যখন سمع الله لمن حمده  বলে তখন তোমরা  اللهم ربنا لك الحمد বলবে।

আল্লাহ তোমাদের প্রশংসা শুনবেন…।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪০৪।

 

সনদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা

সহীহ মুসলিম থেকে সনদের যে আরবী পাঠ উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ইমাম মুসলিম এ হাদীসটি একাধিক নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেছেন।

আর

আলোচিত বাক্যটিও এ হাদীসের অংশ এবং যে সনদে তা আছে তা-ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

আর

তা বর্ণনা করেছেন এভাবে-

“وَفِى حَدِيثِ جَرِيرٍ عَنْ سُلَيْمَانَ ، عَنْ قَتَادَةَ ، مِنَ الزِّيَادَةِ : وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا ”

অর্থাৎ : (এ হাদীসে) কাতাদা থেকে সুলায়মান তাইমীর বর্ণনায়, যা বর্ণনা করেছেন জারীর, এ কথাও রয়েছে- وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا “(ইমাম) যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাকবে”।

ইমাম মুসলিমের মতে তা সহীহও বটে। একারণেই তিনি তা তাঁর ‘সহীহ’ তে এনেছেন।

উপরন্তু

একজনের প্রশ্নের উত্তরে তা স্পষ্ট ভাষায় বলেও দিয়েছেন।

প্রশ্ন কর্তা ও ইমাম মুসলিম রহ. এঁর সেই কথোপকথনটিও সহীহ মুসলিমে আছে।

আর

তা এই-

قَالَ أَبُو إِسْحَاقَ : قَالَ أَبُو بَكْرِ ابْنُ أُخْتِ أَبِى النَّضْرِ فِى هَذَا الْحَدِيثِ ، فَقَالَ مُسْلِمٌ : تُرِيدُ أَحْفَظَ مِنْ سُلَيْمَانَ؟!…

অর্থাৎ : আবু ইসহাক বলেন, আবু নাযরের ভাগ্নে আবু বকর এ হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন তুললে (ইমাম) মুসলিম বলেন,

“তুমি কি সুলায়মান (তাইমীর) চেয়েও বড় হাফেয চাও?…!

গ্রন্থ সূত্র:

*_* সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৪০৪-এর আলোচনায়।

সুতরাং

দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, ইমাম মুসলিম (২৬১হি.)-এর বিচারে এ হাদীস অর্থাৎ ‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ সহীহ।

 

ইমাম আহমদ রাহ.-এঁর সিদ্ধান্তঃ

আবু বকর আছরাম বলেন,

আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (২৪১ হি.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম,

  “وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا” (

সে যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে কে বর্ণনা করেছেন?

উত্তরে বললেন,

…জারীরের হাদীস, যা তিনি সুলায়মান তাইমী থেকে বর্ণনা করেছেন।

তাদের ধারণা সুলায়মান তাইমী থেকে এটি মুতামিরও বর্ণনা করেছেন।

বললাম, জ্বী, মুতামিরও বর্ণনা করেছেন।

তিনি বললেন, তাহলে আর কী চাও?

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আততামহীদ, ইবনে আবদুল বার ১১/৩৪

আবু তালেব বলেন,

আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করলাম, তারা বলে, আবু খালেদ এখানে ভুল করেছেন?

ইমাম আহমাদ রহ. উত্তরে বললেন,

এটি সুলায়মান তাইমীর সূত্রে আবু মূসা আশআরী. রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে।

জিজ্ঞাসা করলাম,

তারা বলে, তাইমী এখানে ভুল করেছেন?

ইমাম আহমাদ রহ. বললেন,

এ কথা যে বলে সে তাঁর উপর অপবাদ আরোপ করে!

من قال هذا فقد بهته!

গ্রন্থ সূত্র :

*_* শরহে মুগলাতা; ৩/৪০৯।

 

বিভিন্ন মনীষীদের আরো মতামতঃ

০১. ইবনে আবদুল বার রহ. (৪৬৩হি.) বলেন,

“কেউ যদি এ প্রশ্ন করে যে, ইহা (ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাকবে) আবু হুরায়রা রা.-এর হাদীসে ইবনে আজলান ছাড়া আর আবু মূসা আশআরী.-এর হাদীসে সুলায়মান তাইমী ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেনি, তাহলে তাকে বলা হবে যে,

এঁদের চেয়ে বড় হাফেয কেউ এঁদের বিরোধিতা করেননি।

সুতরাং

এঁদের বর্ণনা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

ইমাম আহমদ উভয় হাদীসকে সহীহ বলেছেন…”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আততামহীদ; ১১/৩৪।
০২. আবু মূসা আশআরী রা.-এঁর হাদীস এবং তাতে ইমাম দারাকুতনীর আপত্তি উদ্ধৃত করে মুনযিরী রাহ. (৬৫৬হি.) বলেন,

“সুলায়মান তাইমী ছিকা ও হাফেযে হাদীস হওয়ায় তাঁর একক বর্ণনা ইমাম মুসলিমের কাছে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে নি।

তাই

তিনি (ইমাম মুসলিম রহ.) ইহাকে সহীহ বলেছেন…”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মুখতাসারে সুনানে আবু দাউদ; ১/৩১৩।
০৩. ইবনে তাইমিয়া (৭২৮হি.) লিখেন,

…ولم يؤثر عند مسلم تفرد سليمان بذلك، لثقته وحفظه ، وصحح هذه الزيادة… 

অর্থাৎ : “আবু মূসা আশআরী রা.-এঁর হাদীসে বর্ণিত ‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ কথাটিকে ইমাম আহমদ, ইসহাক (২৩৮হি.) ও মুসলিম ইবনে হজ্জাজ প্রমুখ সহীহ বলেছেন।

আর

বুখারী রহ. এর এই ইল্লত বের করেছেন যে,

ইহাতে রাবীদের ইখতিলাফ হয়েছে!

অথচ

তা বর্ণনাটির বিশুদ্ধতায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে না”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মাজমূ ফাতাওয়া; ২২/৩৪০।
একই মত পোষণ করেছেন যাঁরাঃ

০৪. ইমাম ইবনুল মুনযির (৩১৮হি.),

০৫. ইবনুত তুরকুমানী (৭৪৫হি.), ইবনুল হুমাম (৮৬১হি.),

০৬. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২হি.) ও

০৭. বদরুদ্দীন আইনী (৮৫৫হি.)

প্রমুখও একই মত পোষণ করেছেন।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলজাওহারুন নাকী, ইবনুত তুরকুমানী ২/১৫৫-১৫৬ (আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী’র সাথে মুদ্রিত);

*_* ফাতহুল কাদীর, ইবনুল হুমাম ১/৩৪১;

*_* ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/২৮৩;

*_* উমদাতুল কারী ৬/১৫;

*_* ফাছলুল খিতাব ফী মাসআলাতি উম্মিল কিতাব পৃ. ৪২-৪৩।
কোনো কোনো ইমামের ভিন্নমতঃ

এখন আমরা আরো কিছু ইজতিহাদী মতামত নিয়ে আলোচনা করব।

ইমাম বুখারী রহ. সহ কোনো কোনো ইমামের ভিন্নমতও এখানে আছে।

তাঁরা বলেন,

আলোচিত বাক্যটি ‘সহীহ’ নয়।

তাঁদের যুক্তি হচ্ছে,

কাতাদা থেকে হাদীসটি সায়ীদ ইবনে আবী আরুবা, হিশাম দাস্তওয়ায়ী, হাম্মাম ইবনে ইয়াহইয়া ও আবান ইবনে ইয়াযিদ প্রমুখও বর্ণনা করেছেন।

তাদের বর্ণনায় ‘সে যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ কথাটি নেই। শুধু সুলায়মান তাইমী তা বর্ণনা করেন। সুতরাং ওঁদের বর্ণনাই সঠিক, সুলায়মান তাইমী এটা হয়ত ভুলে বাড়িয়ে দিয়েছেন!

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলকেরাত খালফাল ইমাম, বুখারী পৃ. ৫৮;

*_* সুনানে দারাকুতনী ২/১২১;

*_* আলইলাল, দারাকুতনী ৭/২৫৪;

*_* আলকেরাত খালফাল ইমাম, বায়হাকী পৃ. ১২৮-১৩১।
পক্ষান্তরে

অনেক ইমামের মতে এ কথাটি সহীহ এবং এ হাদীসের অংশ।

যেমনটি ইমাম আহমাদ ও ইমাম মুসলিমের বক্তব্যে আমরা পেলাম।

এবং

সার্বিকভাবে এ মতটিই অধিকতর সঙ্গত।

কারণ

সুলায়মান তাইমী অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।

তাছাড়া

এই বর্ণনায় তিনি একা নন, তাঁর একাধিক মুতাবি (সমর্থনকারীও) রয়েছে।
সুলায়মান তাইমী রহ. সম্পর্কে ইমামদের মতামতঃ

০১. সুফিয়ান ছাওরী রাহ. বলেন,

বসরার হাফেযে হাদীস ছিলেন তিনজন- সুলায়মান তাইমী, আসেম আহওয়াল ও দাউদ ইবনে আবী হিন্দ।

০২. মুয়াল্লা ইবনে মনসূর বলেন,

আমি ইসমাইল ইবনে উলাইয়্যাকে বসরার হাফেযে হাদীসদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাদের মধ্যে সুলায়মান তাইমীর নাম উল্লেখ করেন।

০৩. ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তান বলেন,

তাইমী আমাদের কাছে হাদিস বিশারদদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

০৪. ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন ও আহমদ ইবনে হাম্বল বলেন,

তিনি ‘ছিকা’।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলজারহু ওয়াততাদীল ৪/১২৪-১২৫;

*_* তারীখে ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন, উসমান ইবনে সায়ীদ দারিমী পৃ. ৪৯।
এই বর্ণনায় সুলায়মান তাইমী কি একাইঃ

এই ধরনের হাফেযে হাদীসদের একক বর্ণনা ইমামগণ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ববুল করেন।

অথচ

আগেই বলেছি, এ বর্ণনায় তাঁর দু’জন সমর্থনকারীও রয়েছে।

০১. উমর ইবনে আমের।

বর্ণনাটি এই- (রেফারেন্সকে ফলো-আপ করুন)

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মুসনাদে বায্যার ৬/৬৬, হাদীস ৩০৬০।
০২. আবু উবায়দা (মুজ্জাআ ইবনে যুবাইর)।

বর্ণনাটি এই-

قال أبو عوانة : حَدَّثَنَا سَهْلُ بْنُ بَحْرٍ الْجُنْدَيْسَابُورِيُّ ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رُشَيْدٍ ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو عُبَيْدَة َ، عَنْ قَتَادَةَ ، عَنْ يُونُسَ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنْ حِطَّانَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الرَّقَاشِيِّ ، عَنْ أَبِي مُوسَى الأَشْعَرِيِّ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم -: إِذَا قَرَأَ الإِمَامُ فَأَنْصِتُوا، وَإِذَا قَالَ: {غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلا الضَّالِّينَ فَقُولُوا آمِين .

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সহীহ আবু আওয়ানা; ২/১৩৩।

উভয় বর্ণনার সনদ সমর্থক বর্ণনা হিসেবে খুবই গ্রহণযোগ্য।

প্রথমটির সনদ হাসান পর্যায়ের আর দ্বিতীয়টি তো ইমাম আবু আওয়ানা তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থেই এনেছেন।
ইমাম বুখারী রহ. আরেকটি আপত্তি করেছেন।

আপত্তিটি হলো :

“সুলায়মান তাইমী কাতাদা থেকে আর কাতাদা ইউনুস ইবনে জুবাইর থেকে শুনেছেন কি না, তা এই বর্ণনায় অনুল্লেখিত।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলকেরাত খালফাল ইমাম, বুখারী পৃ. ৫৮।

বাস্তবে ইহাও কোনো প্রভাবক ত্রুটি নয়।

কারণ

সুলায়মান তাইমী কাতাদা থেকে আর কাতাদা ইউনুস ইবনে জুবাইর থেকে শুনেছেন।

মুতামির ইবনে সুলায়মানের বর্ণনায় সহীহ সনদে তার উল্লেখ রয়েছে।

বর্ণনাটি এই-  

قال الامام أبو داود : حَدَّثَنَا عَاصِمُ بْنُ النَّضْرِ، حَدَّثَنَا الْمُعْتَمِرُ قَالَ: سَمِعْتُ أَبِى حَدَّثَنَا قَتَادَةُ عَنْ أَبِى غَلاَّبٍ يُحَدِّثُهُ عَنْ حِطَّانَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الرَّقَاشِىِّ بِهَذَا الْحَدِيثِ زَادَ فَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا .

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৯৭৩।

আরো দ্রষ্টব্য :

*_* আলআওসাত, ইবনুল মুনযির ৩/২৬০।
সারকথা এই যে,

আলোচিত হাদীসটি আবু মূসা আশআরী রা.-এঁর সূত্রে সহীহ ও প্রমাণিত।

এ প্রসঙ্গে কোনো কোনো ইমামের যে ভিন্নমত রয়েছে তার চেয়ে এ সিদ্ধান্তই অগ্রগণ্য।

কারণ

এ হাদীসের বর্ণনাকারী সুলায়মান তাইমী অতি উঁচু পর্যায়ের ছিকা ও হাফিযুল হাদীস, যাঁদের একক বর্ণনাও ইমামগণ ক্ববুল (Accept) করেন, তদুপরি এই বর্ণনায় তিনি একা (Alone) নন, অন্তত দু’জন সমর্থনকারী রাবী তাঁর রয়েছে।
২য় সনদ :

অন্য সাহাবীর সূত্রে “ইমামের পড়ার সময় তোমরা চুপ থাকবে’’ হাদিস শরিফের অংশের পর্যালোচনা।

আলোচ্য হাদীসটি আলাদা সনদে অন্য সাহাবী থেকেও বর্ণিত হয়েছে।

ইহা হযরত আবু হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসেরও অংশ।

সনদসহ পুরো হাদীসটির আরবী পাঠ এই-

قال ابن أبي شيبة : حَدَّثَنَا أَبُو خَالِدٍ الأَحْمَرِِ ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَجْلاَنَ ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ ، عْن أَبِي صَالِحٍ ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : إنَّمَا جُعِلَ الإِمَام لِيُؤْتَمَّ بِهِ فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا ، وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا ، وَإذَا قَالَ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ ، وَلاَ الضَّالِّينَ فَقُولُوا آمِينَ ، وَإِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوا ، وَإذَا قَالَ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ فَقُولُوا اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ ، وَإِذَا سَجَدَ فَاسْجُدُوا ، وَإِذَا صَلَّى جَالِسًا فَصَلُّوا جُلُوسًا.

অর্থাৎ : “আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত।

নবী করীম সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ইমাম হল অনুসরণের জন্য।

সুতরাং

সে যখন তাকবীর দেয় তখন তোমরা তাকবীর দিবে।

আর সে যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাকবে।

সে যখন  غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ পড়ে তখন তোমরা আমীন বলবে।

সে যখন রুকূ করে তখন তোমরা রুকূ করবে।

সে যখন سمع الله لمن حمده  বলে তখন তোমরা اللهم ربنا لك الحمد বলবে।

সে যখন সেজদা করে তখন তোমরা সেজদা করবে।

সে যখন বসে নামায পড়ে তখন তোমরা বসে নামায পড়বে”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৭২১৪।

আরো দেখুন :

*_* মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯৪৩;

*_* সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৬০৪;

*_* সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৯২১।

 

এই সনদের প্রাসঙ্গিক আলোচনাঃ

এই হাদীসটি ইমাম মুসলিম রহ. ‘সহীহ’ গ্রন্থে না-আনলেও ইহা তাঁর মতে তা সহীহ।

সহীহ মুসলিম শরিফে উল্লেখিত ইমাম মুসলিম রহ. ও আবু নাযর রহ. এঁর ভাগ্নে আবু বকরের মধ্যকার কথোপকথনটিতে তা স্পষ্টভাবে আছে।
কথোপকথনটি এই :

… আবু বকর জিজ্ঞাসা করলেন,

তাহলে আবু হুরায়রা রা.-এঁর হাদীস (অর্থাৎ ইহা কি আপনার মতে সহীহ)?
ইমাম মুসলিম রহ. বললেন,

আমার মতে এটি সহীহ।
আবার জিজ্ঞাসা করলেন,

তাহলে ‘সহীহ’ গ্রন্থে কেন আনেননি?
ইমাম মুসলিম রহ. বললেন,

আমার মতে যা সহীহ তার সব তো এখানে আনিনি।

এখানে এনেছি কেবল এমন হাদীস যাতে তাঁরা ঐকমত্য পোষণ করেছেন”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সহীহ মুসলিম, হাদীস  ৪০৪-এর আলোচনায়।
তাঁদের কথোপকথনটির আরবী পাঠ এই-

ৃفَقَالَ لَهُ أَبُو بَكْرٍ: فَحَدِيثُ أَبِى هُرَيْرَةَ؟ فَقَالَ هُوَ صَحِيحٌ يَعْنِى وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا. فَقَالَ: هُوَ عِنْدِى صَحِيحٌ. فَقَالَ: لِمَ لَمْ تَضَعْهُ هَا هُنَا؟ قَالَ: لَيْسَ كُلُّ شَىْءٍ عِنْدِى صَحِيحٍ وَضَعْتُهُ هَا هُنَا ، إِنَّمَا وَضَعْتُ هَا هُنَا مَا أَجْمَعُوا عَلَيْهِ.

ইহা থেকে স্পষ্ট যে,

ইমাম মুসলিম রহ. এঁর মতে আবু হুরায়রা রা.-এঁর সূত্রে বর্ণিত এ হাদীস অর্থাৎ ‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ সহীহ।

আবু বকর আছরাম বলেন,

আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, “وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا” (সে যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে কে বর্ণনা করেছেন?

উত্তরে ইমাম আহমাদ রহ. বললেন,

ইবনে আজলানের হাদীস, যা তাঁর থেকে আবু খালেদ বর্ণনা করেছেন…”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আততামহীদ, ইবনে আবদুল বার ১১/৩৪।

তবে

ইমাম বুখারী রহ. সহ আরো কোনো কোনো ইমামের ভিন্নমতও এখানে আছে।

ইমাম আবু দাউদ রহ. বলেন,

‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাকবে’ কথাটি সহিহ্ নয়। আমার মতে এ ভুলটি হয়েছে আবু খালেদ (সুলায়মান ইবনে হাইয়্যান) থেকে।
মুনযিরী রাহ. ইমাম আবু দাউদ-এঁর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেছেন,

“তাতে (ইমাম আবু দাউদের বক্তব্যে) আপত্তি আছে।

কারণ

সুলায়মান ইবনে হাইয়্যান আহমার ছিকা রাবীদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের হাদীস ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ. সহীহ গ্রন্থে দলীলস্বরূপ এনেছেন।

তাছাড়া

এই বর্ণনায় তিনি একা (Alone) নন, মুহাম্মাদ ইবনে সা‘দ তাঁর সমর্থন করেছেন।

আর

তিনি (মুহাম্মাদ ইবনে সা‘দ) ছিকা…। ইমাম নাসায়ী উভয় হাদীস তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে এনেছেন…।”

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মুখতাসারে সুনানে আবু দাউদ; ১/৩১৩।

একই মত যাঁরা পোষণ করেছেন :

০১. ইমাম ইবনে আবদুল বার,

০২. ইবনে হাযম (৪৫৬হি.),

০৩. ইবনুত তুরকুমানী ও

০৪. বদরুদ্দীন আইনী

প্রমুখও একই মত পোষণ করেছেন।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলমুহাল্লা, ইবনে হাযম ৩/২০১;

*_* আলজাওহারুন নাকী ২/১৫৬-১৫৮;

*_* উমদাতুল কারী ৬/১৫;

*_* ফাছলুল খিতাব ফী মাসআলাতি উম্মিল কিতাব পৃ. ৪৩-৪৪।

আর

সার্বিক বিচারে এই মতটিই অধিকতর সঙ্গত।

কারণ

আবু খালেদ নিভর্রযোগ্য।

তাছাড়া

এই বর্ণনায় তিনি একা (Alone) নন, তাঁর মুতাবি (সমর্থনকারীও) রয়েছে।

এই বর্ণনায় তাঁর সমর্থন করেছেন মুহাম্মদ ইবনে সা’দ।

বর্ণনাটি এই-

قال النَّسَائي: أخبرنا محمد بن عبد الله بن المبارك ، قال: حدثنا محمد بن سعد الأنصاري قال: حدثني محمد بن عجلان عن زيد بن أسلم ، عن أبي صالح ، عن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه و سلم: إنما الإمام ليؤتم به ، فإذا كبر فكبروا ، وإذا قرأ فأنصتوا.

قال أبو عبد الرحمن : كان المخرمي يقول : هو ثقة يعني محمد بن سعد الأنصاري

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৯২২।
সমর্থনকারীও ছিকা :

মুহাম্মদ ইবনে সা‘দ ছিকা। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক আলমুর্খারিমী ও নাসায়ী তাকে ‘ছিকা’ বলেছেন এবং ইবনে হিব্বান ‘ছিকাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* তারীখে বাগদাদ ৫/৩২১;

*_* আছছিকাত ৯/৪১;

*_* সুনানে দারাকুতনী ২/১১৮।
বাকি রইল মুহাম্মদ ইবনে আজলানের একা (lonely) বর্ণনা করা, যাহাকে বুখারী ও আবু হাতেম রাহ. এখানে ইল্লত (filthy) মনে করেছেন।

আসলে এটিও কোনো প্রভাবক ত্রুটি (ইল্লত) নয়।

কারণ

তিনি ছিকা।

তাছাড়া

তাঁর বর্ণনায় অন্যান্য রাবীদের বর্ণনার বিরোধী কিছু নেই।

বরং

ব্যাপারটি এখানে এরকম যে,

তাঁর বর্ণনায় একটি বিষয় উল্লেখিত হয়েছে; যা অন্যদের বর্ণনায় উল্লেখিত হয়নি।

ইহা মূলত ‘যিয়াদাতুছ ছিকা’র অধীনে আসে।

মুহাম্মাদ ইবনে আজলান রহ. শুধু উঁচু  পর্যায়ের ছিকা বা হাদীস বর্ণনায় বিশ্বস্ত ও ইমামগণের আস্থাভাজন রাবীই নন, তিনি ফিকহ ও ফতোয়ারও ইমাম।

আর

ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন, ইজলী, আবু হাতেম ও আবু যুরআ তাঁকে ছিকা বলেছেন।

ইমাম ইবনে উয়াইনা তো হাদীসের ক্ষেত্রে তাঁর উঁচু মানের প্রশংসাও করেছেন।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* তারীখে ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন, দূরী ১/১৪৫, ১৬৬, ১৬৭;

*_* আলইলাল ওয়ামারিফাতুর রিজাল ১/১৯৮, ২/১৯, ১৫৪;

*_* আলজারহু ওয়াততাদীল ৮/৪৯-৫০;

*_* আলমারিফাতু ওয়াততারীখ ১/৬৯৮;

*_* মারিফাতুছ ছিকাত ২/২৪৮;

*_* সিয়ারু আলামিন নুবালা ৬/৩১৮।

এরুপ বর্ণনাকারীর ‘যিয়াদাহ’ গ্রহণ করা সালাফের ফিকহ ও ইজতিহাদের ইমামগণ তো বটেই; জরহ-তাদীল ও ইলালের অনেক ইমামেরও মাযহাব।

তাই ইবনে আজলানের এই রেওয়ায়েত সম্পর্কে করা “উপরোক্ত আপত্তি” সঠিক নয়।

আর

এই জন্যেই ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিমসহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনেক হাদীসের ইমাম ইহাকে সহীহ বলেছেন। যেমনটি আমরা একটু আগে দেখে এসেছি।

লক্ষণীয়,

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে হাদীসটি আবু সালামা, কায়স ইবনে আবী হাযেম, আবুয যিনাদ, আবু ইউনুস, আবু আওয়ানা প্রমুখ বর্ণনা করেছেন।

প্রায় সবার বর্ণনায় শব্দ-বাক্যের কমবেশি রয়েছে।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সহীহ বুখারী, হাদীস ৭২২, ৭৩৪;

*_* সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪১৪-১১৭;

*_* মুসান্নফে আবদুর রায্যাক, হাদীস ৪০৮৩;

*_* মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৭১৪৪, ৮১৫৬, ৮৫০২, ৯০১৫।

অথচ

কারো বর্ণনাকে ভুল আখ্যায়িত করা হয়নি।

কারণ

তাঁরা সবাই ছিকা এবং বর্ণনাগুলো পারস্পরিক সাংঘর্ষিক নয়।

সুতরাং

মুহাম্মদ ইবনে আজলান (অনুরুপভাবে সুলায়মান তাইমী ও আবু খালেদ)-এঁর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হবে।
সারকথা এই যে,

হযরত আবু হুরায়রা রা.-এঁর সূত্রেও আলোচিত হাদীসটি সহীহ।

এই প্রসঙ্গে কোনো কোনো ইমামের যে ভিন্নমত রয়েছে তার চেয়ে বর্ণনাটি সহীহ হওয়ার সিদ্ধান্তই অগ্রগণ্য।

কারণ

এই হাদীসের বর্ণনাকারী আবু খালেদ নির্ভরযোগ্য।

উপরন্তু

এই বর্ণনায় তিনি একা (Alone) নন, তাঁর সমর্থনকারী রয়েছে। তাঁরাও ছিকা।

আর

মুহাম্মদ ইবনে আজলানও ছিকা রাবী।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* জামিউল বায়ান ফী তাবীলি আয়ীল কুরআন, ইবনে জারীর ১০/৬৬৭;

আরো দেখুন :

*_* আলমুনতাকা শরহুল মুয়াত্তা, আবুল ওলীদ বাজী ১/৩৫৪;

*_* শরহুল মুয়াত্তা, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল বাকী আয্যুরকানী ১/২৫২।
এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে,

‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ কথাটি দুই সাহাবী- হযরত আবু মূসা আশআরী ও আবু হুরায়রা রা.-এঁর সূত্রে “সহীহ-ও-প্রমাণিত”।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ ও মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ ইহাকে সহীহ বলেছেন।

আর

ইবনে জারীর তবারী (৩১০হি.), ইবনুল মুনযির, ইবনে হাযম, ইবনে আবদুল বার, মুনযিরী, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুত তুরকুমানী, ইবনে হাজার আসকালানী ও ইবনুল হুমাম প্রমুখ এ মতই পোষণ করেছেন।

সর্বশেষ কথা এই যে,

এখানে নির্ধারিত বর্ণনার উপর সনদগত আলোচনা উপস্থাপিত হলো।

অন্যথায়

মূল বিষয়টি কুরআন মাজীদের আয়াত ও অনেক সাহাবী-তাবেয়ীর ফতোয়া ও আমল দ্বারা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত, যা মৌখিক সাধারণ বর্ণনা-সূত্রের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

ইবনে তাইমিয়া বড় সুন্দরভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন।
সহিহ্ মুসলিম শরিফের ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়ার মন্তব্যঃ

তিনি সহীহ মুসলিমের বিভিন্ন হাদীসের অংশ-বিশেষকে বিভিন্ন মুহাদ্দিস কর্তৃক যে যয়ীফ বলা হয়েছে, সে বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, এইসব জায়গায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইমাম মুসলিম রহ. এঁর সিন্ধান্তই সঠিক।

যেমন

আবু মূসা আশআরী রা.-এঁর হাদীসে وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا অংশটি।

ইহাকে ইমাম মুসলিম রহ. সহীহ বলেছেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল ও অন্যরা তা গ্রহণ করেছেন।

পক্ষান্তরে

ইমাম বুখারী রহ. ইহাকে যঈফ গণ্য করেছেন।

অথচ

এই কথাটি কুরআন মাজীদের বক্তব্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

এই বিষয়ে যদি কোনো সহীহ হাদীস নাও থাকত তবু ক্বুরআন অনুযায়ী আমল করা তো জরুরি।

আল্লাহর বাণী-

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا*

অর্থাৎ : যখন কুরআন পড়া হয় তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক।

ইহার ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য রয়েছে যে,

ইহা সালাত সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে এবং সালাতের কেরাতকে ইহাতে উদ্দেশ্য করা হয়েছে”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মাজমূ ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া ১৮/২০।

এই বিষয়ে তিনি ‘মাজমূ ফাতাওয়া’ ২৩/২৭২-২৭৩-তে আরো দীর্ঘ আলোচনা করেছেন।

আগ্রহী পাঠক তা দেখে নিতে পারেন।

_________

▆ মুক্তাদীর জন্যে কি সুরা ফাতিহা পড়া ওয়াজীব?

https://mbasic.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1729044500744321

▆ সহিহ্ পাঠ হচ্ছে “গাইরিল মাগদ্বুবী ‘আলাইহিম ওয়ালাদ্বোয়াল্লীণ” : “গাইরিল মাগজুবী ‘আলাইহিম ওয়ালাজজোয়াল্লীণ” পাঠ ক্বুরআ’ন বিকৃতি 📓

https://mbasic.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1767421030240001

______

▆ হাদিস সম্পর্কে জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয়ঃ
নোট ০১. দ্বয়ীফ হাদিসের উপর ‘আমল করা মুস্তাহাব

https://mobile.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1697298063918965

নোট ০২. জাল হাদিসের হুকুম

https://mobile.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1697295443919227

নোট ০৩. “হাদিসটি সহিহ্ নয়“ বলতে মুহাদ্দিসিনে ক্বিরাম কি বুঝিয়ে থাকেন!

https://mobile.facebook.com/hasan.mahmud/posts/169

শবে বরাতের হাদিসের রাবীসহ

Standard

পবিত্র শবে বরাত প্রসঙ্গে অসংখ্য সহীহ হাদীস শরীফ বর্ণিত আছে। এত ব্যাপক সংখ্যক বর্ণনার ফলে লা’মাযহাবীদের গুরুরাও হাদীস শরীফ গুলোকে সহীহ বলতে বাধ্য হয়েছে। তারপরও কিছু কুয়োর ব্যাঙ সালাফী, হাদীস শরীফ সর্ম্পেকে অজ্ঞ হওয়ার করনে সহীহ হাদীস সমূহের বিরোধিতা করে। আসুন তাদের একটা বিরোধিতার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেওয়া যাক-
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে,

عن حضرت ابى موسى الاشعرى رضى الله تعالى عنه عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ان الله تعالى ليطلع فى ليلة النصف من شعبان فيغفر لجميع خلقه الا لمشرك او مشاحن رواه ابن ماجه ورواه احمد. عن عبد الله بن عمرو بن العاص رضى الله تعالى عنه وفى رواية الا اثنين مشاحن وقاتل نفس.

অর্থ: “হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে। তিনি হাবীবুল্লাহ হুযূর ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার থেকে বর্ণনা করেন যে, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ করেছেন, অর্ধ শা’বানের রাত্রি তথা শবে বরাতে মহান আল্লাহ পাক স্বয়ং নাযিল হন এবং উনার সকল সৃষ্টিকে ক্ষমা করে দেন তবে মুশরিক এবং বিদ্বেষভাবাপন্ন ব্যক্তিদেরকে ক্ষমা করেন না। কিন্তু হযরত ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি এটাকে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রদ্বিয়াল্লাহ তায়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন। আর উনার অপর এক রেওওয়ায়েত রয়েছে, দু’ব্যক্তি ব্যতীত। যথা- বিদ্বেষভাবাপন্ন ব্যক্তি এবং মানুষ হত্যাকারী ব্যতীত সকলকেই ক্ষমা করা হয়।” (ইবনে মাজাহ পৃষ্ঠা ১০১: হাদীস ১৩৯০, বায়হাকী শুয়াইবুল ঈমান ৩/৩৮২: হাদীস ৩৮৩৫, মিসবাহুল জুজাহ ১/৪৪২: হাদীস ৪৮৭, মিশকাতুল মাছাবীহ ১১৫ পৃষ্ঠা: হাদীস ১৩০৬, আত তাগরীব ওয়াত তারহীব ৪/২৪০, কানযুল উম্মাল ১২/৩১৫: হাদীস ৩৫১৮২, মাযমাউয যাওয়াইদ ৮/৬৫: হাদীস ১২৯৬০, জামেউস সগীর : হাদীস ২৭০০, ফাযায়েলে ওয়াক্ত লি বায়হাকী ১/১৩২: হাদীস ২৯, জামিউল মাসানিদ ওয়াল সুনান লি ইবনে কাছীর : হাদীস ১৩০৭৬)
উক্ত হাদীস শরীফের সনদ নিম্নরূপঃ
১)হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু- তিনি ছিলেন বিখ্যাত ফক্বীহ সাহাবী। 

২)হযরত দ্বাহাক বিন আব্দুর রহমান ইবনে আয়যব রহমতুল্লাহি আলাইহি- ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি বলেন, তিনি ছিলেন তৃতীয় তবকার ছেকাহ রাবী। এছাড়া তিনি একজন তাবেয়ীও ছিলেন। (তাহযীবুত তাহযীব ৪/৩৯২, মিযানুল ইতিদাল ২/৩২৪)

৩)হযরত দ্বাহাক বিন আয়মন রহমতুল্লাহি আলাইহি- ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি বলেন, তিনি অপরিচিত। (তাহযীবুত তাহযীব ৪/৪৮৯)

৪)হযরত ওলীদ বিন মসলিম আল কুরাশী রহমতুল্লাহি আলাইহি- হযরত ইবনে সাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সর্ম্পেকে বলেন, তিনি হচ্ছেন নির্ভরযোগ্য এবং অধিক হাদীস শরীফ বর্ণনাকারী। (তাহযীবুত তাহযীব ১১/১৩৪)

৫)হযরত রাশেদ ইবনু সায়ীদ রহমতুল্লাহি আলাইহি- উনার সর্ম্পেকে ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি বলেন, তিনি ছিলেন দশম তবকার ছিকাহ রাবী।” (তাহযীবুত তাহযীব ৩/১৯৬)
সালাফীরা উক্ত সনদের তৃতীয় বর্ণনাকারী হযরত দ্বাহাক বিন আয়মান রহমতুল্লাহি আলইহি উনার কারনে হাদীস শরীফকে অস্বীকার করতে চায়। এখানে ফিকিরের বিষয় হচ্ছে উক্ত রাবী ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি উনার কাছে অপরিচিত হলেও সিয়া সিত্তার ইমাম হযরত ইবনে মাজাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে অপরিচিত ছিলেন না। ইবনে মাজাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার বিলাদত ২০৯ হিজরীতে আর রাবী ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি উনার বিলাদত ৮৫২ হিজরীতে। সূতরাং (৮৫২-২০৯)= ৬৪৩ বছর আগের ইমাম হযরত ইবনে মাজাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে উক্ত রাবীর খবর ইবনে হাজার আসকালানী রহমতুল্লাহি থেকে ভালো জানার কথা। সূতরাং উক্ত রাবীকে ঢালাও ভাবে মাজহুল বা অপরিচিত বলা মোটেও ঠিক হবে না। 
উক্ত হাদীস শরীফ সর্ম্পেকে লা’মাযহাবীদের ইমাম মোবারকপুরী উল্লেখ করেছে, 

رواه لبن ماجه من حديث ابي موسي الاشعري باسناد لا بأس به

“ইমাম মুনযির রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, উক্ত হাদীস শরীফ খানা ইমাম হযরত ইবনে মাজাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু হতে বর্ণনা করেন। উক্ত হাদীস শরীফের সনদটির মধ্যে কোন অসুবিধা নেই।” (তুহফাতুল আহওয়াজী ৩/৪৪১)
তাছাড়া উক্ত হাদীস শরীফ কমপক্ষে ১০ টা সনদে বর্ণিত হয়েছে। যা হাদীস শরীফকে শাহেদ হাদীস হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। 
আহলে হাদীস লা’মাযহাবীদের অন্যতম পুজনীয় নাসির উদ্দীন আলবানী উক্ত হাদীস শরীফ সর্ম্পেকে বলেছে,

ورواه ابن ماجه بلفظه من حديث أبي مويي الاشعري : صحيح لغيره 

হযরত ইবনে মাজাহ রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক বর্ণিত হযরত আবু মুসা আশয়ারী রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সূত্রে বর্ণিত হাদীস শরীফ খানা সহীহ লি গাইরিহী। (দলীলঃ সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব ৩ খন্ড: হাদীস ২৭৬৮)
এবার আসুন সহীহ লিগাইরিহী কাকে বলে জেনে নিই,-

ছহীহ লিগাইরিহীঃ এটা হাসান লিযাতিহী হাদীছ শরীফরে অনুরূপ। ছহীহ হাদীছ শরীফ-এর কোন রাবীর মধ্যে স্বরণ শক্তি কছিুটা কম থাকে। তবে সইে অভাব বা ত্রুটিটুকু অন্যান্য উপায়ে এবং অধকি রওিয়ায়তে দ্বারা পুরণ হয়ে যায়। মোট কথা, উহার সমর্থনে বহু রিওয়ায়েত বর্ণিত থাকায় তাহার ত্রুটি ক্ষতপিুরণ হয়ে গেছে। এরূপ হাদীছ শরীফকে ছহীহ লিগাইরিহী। (তাদরীবুর রাবী, মিজানুল আখবার)
লা’মাযহাবীদের গুরুরাই উক্ত হাদীস শরীফকে সহীহ বলে উল্লেখ করেছে এবং বলেছে সনদে কোন অসুবিধা নেই তাহলে এখন কুয়ার ব্যং লা’মাযহাবীরা কোন সাহসে এই হাদীস শরীফের বিরোধিতা করে ?