মেরাজ নিয়ে আপত্তির নিষ্পত্তি 

Standard

মি‘রাজ নিয়ে বাতিলের দুটি আপত্তির নিষ্পত্তি :
আমাদের কিছু বেশী জ্ঞানী হযরত আজ ২৭ রযব মি‘রাজ এর রাত তা মানতেই চাই না। এবার কথা না বাড়িয়ে কয়েকজন ইমামের অভিমত পেশ করবো যাদের ধুলার সমানও এই কাঠ মোল্লারা হবে না। বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দীন মাহমুদ আইনী (রহ.) বলেন-

كَانَ الْإِسْرَاء لَيْلَة السَّابِع وَالْعِشْرين من رَجَب 

-‘‘রাসূল (দ.) এর ইসরা ভ্রমন বা মি‘রাজ ২৭ ই রযব হয়েছিল।’’ (আইনী, উমদাতুল ক্বারী, ৪/৩৯পৃ. দারু ইহ্ইয়াউত তুরাসুল আরাবী, বয়রুত, লেবানন) বিশ্বের মুসলিম সমাজের নিকট এ মতই সুপ্রসিদ্ধ। বুখারী শরীফের আরেক ব্যাখ্যাকার আল্লামা শিহাবুদ্দীন কাস্তাল্লানী (রহ.) উল্লেখ করেন-  

كان ليلة السابع والعشرين من رجب

-‘‘মি‘রাজ ২৭ ই রযব হয়েছিল’’ (কাস্তাল্লানী, মাওয়াহেবুল্লাদুনিয়্যাহ, ১/১৬২ পৃ.) এ মত গ্রহণ করে এবং এই মতের ব্যাখ্যায় ইমাম জুরকানী (রহ.) বলেন-

قال بعضهم: وهو الأقوى

-‘‘অনেক ইতিহাসবিদ বলেছেন, এই মতটিই অধিক শক্তিশালী। (জুরকানী, শরহুল মাওয়াহেব, ২/৭১ পৃ.দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন) এবার আপনাদের সামনে আহলে হাদিস ও দেওবন্দীরা যাকে ইমাম মানেন, তিনি হচ্ছেন আল্লামা হাফেয ইবনে কাসির (রহ.)। এ বিষয়ে তিনি কি বলেন এবার দেখবো। তিনি তার বিখ্যাত একটি গ্রন্থে লিখেন-

أَنَّ الْإِسْرَاءَ كَانَ لَيْلَةَ السَّابِعِ وَالْعِشْرِينَ مِنْ رَجَبٍ وَاللَّهُ أَعْلَمُ.

-‘‘অবশ্যই মি‘রাজ সংগঠিত হয়েছে রযব মাসের ২৭ তারিখ।মহান রব তা‘য়ালাই এই বিষয়ে ভাল জানেন।’’ (ইবনে কাসির, বেদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩/১৩৫ পৃ.দারু ইহ্য়িাউত তুরাসুল আরাবী, বয়রুত, লেবানন) যাই হোক তাদের ইমামের কথা তারা না মানলে আমাদের কিছু করার নেই।

মি‘রাজের ইবাদত:

মি‘রাজ উপলক্ষ্যে নামায এবং রোযা রাখলে আমাদের আশে পাশে ফাতওয়া দেওয়ার মৌলভীর অভাব নেই। ইমাম বায়হাকী (রহ.) সংকলন করেন-ইমাম বায়হাকী (রহ.) সংকলন করেন-

عَنْ أَنَسٍ، عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: فِي رَجَبٍ لَيْلَةٌ يُكْتَبُ لِلْعَامِلِ فِيهَا حَسَنَاتُ مِائَةِ سَنَةٍ، وَذَلِكَ لِثَلَاثٍ بَقَيْنَ مِنْ رَجَبٍ، فَمَنْ صَلَّى فِيهَا اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً يَقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ وَسُورَةٌ مِنَ الْقُرْآنِ يَتَشَهَّدُ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ، وَيُسَلِّمُ فِي آخِرِهِنَّ، ثُمَّ يَقُولُ: سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ مِائَةَ مَرَّةٍ، وَيَسْتَغْفِرُ اللهَ مِائَةَ مَرَّةٍ، وَيُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِائَةَ مَرَّةٍ، وَيَدْعُو لِنَفْسِهِ مَا شَاءَ مِنْ أَمْرِ دُنْيَاهُ وَآخِرَتِهِ، وَيُصْبِحُ صَائِمًا فَإِنَّ اللهَ يَسْتَجِيبُ دُعَاءَهُ كُلَّهُ إِلَّا أَنْ يَدْعُو فِي مَعْصِيَةٍ

-‘‘হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (দ.) ইরশাদ করেন, রযবের একটি রাত রয়েছে যে রাতে ইবাদত করলে ১০০ শত বছরের (নফল) ইবাদতের সাওয়াব পাওয়া যায়। আর সেটি হচ্ছে রযব মাসের ৩ দিন বাকি থাকার রাত (২৭ ই রযব)। আর এ রাতে ১২ রাক‘আত নামায পড়বে আর প্রত্যেক রাক‘আতে সূরা ফাতেহা ও তার সাথে অন্য সূরা দ্বারা এক সালামে দুই রাক‘আত নামায আদায় করবে এবং নামায শেষে সুবহানাল্লাহ, আল-হামদুল্লিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ১০০ বার পড়বে। আর নবী পাক (দ.) এর উপরে ১০০ বার দরুদ পড়বে এবং তারপরে আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য র্প্রাথনা করবে, দিনে রোযা রাখবে তাহলে মহান রব অন্যায় দোয়া ছাড়া সকল দোয়া কবুল করবেন।’’ (ইমাম বায়হাকী, শুয়াবুল ঈমান, ৫/৩৪৬ পৃ. হা/৩৫৩১) 

এ বিষয়ে ইমাম বায়হাকী (রহ.) আল্লাহ যেন এই ধোঁকাবাজ থেকে হেফাযত করেন। আমিন। যরত সালমান ফারসী (রা.) হতেও আরেকটি হাদিস বর্ননা করেছেন। (ইমাম বায়হাকী, ফাযায়েলুল আওকাত, ১/৯৫ পৃ.) এ বিষয়ে আরও অনেক হাদিস জানতে আমার প্রকাশের পথে ‘প্রমাণিত হাদিসকে জাল বানানোর স্বরূপ উন্মোচন’ তৃতীয় খন্ড দেখুন।

রজবের ২৭ তারিখের আমল

Standard

পবিত্র রজব মাসের ২৭ তারিখের আমল ও রোজার বিষয়ে সহীহ হাদীছ সনদ সহকারে।
  أَخْبَرَنَا أَبُو عَبْدِ اللهِ الْحَافِظُ، حَدَّثَنِي أَبُو نَصْرٍ رَشِيقُ بْنُ عَبْدِ اللهِ الرُّومِيُّ إِمْلَاءً مِنْ كِتَابِهِ بالطَّابِرانِ، أَخْبَرَنَا الْحُسَيْنُ بْنُ إِدْرِيسَ الْأَنْصَارِيُّ، حَدَّثَنَا خَالِدُ بْنُ الْهَيَّاجِ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ سُلَيْمَانَ التَّيْمِيِّ، عَنْ أَبِي عُثْمَانَ، عَنْ سَلْمَانَ الْفَارِسِيِّ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” فِي رَجَبٍ يَوْمٌ وَلَيْلَةٌ مَنْ صَامَ ذَلِكَ الْيَوْمَ، وَقَامَ تِلْكَ اللَّيْلَةَ كَانَ كَمَنْ صَامَ مِنَ الدَّهْرِ مِائَةَ سَنَةٍ، وَقَامَ مِائَةَ سَنَةٍ وَهُوَ ثَلَاثٌ بَقَيْنَ مِنْ رَجَبٍ، وَفِيهِ بَعَثَ اللهُ مُحَمَّدًا “، ” وَرُوِيَ ذَلِكَ بِإِسْنَادٍ آخَرَ أَضْعَفُ مِنْ هَذَا كَمَا ”

 যেমন- হজরত সায়্যিদুনা সালমান ফারসী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত- প্রিয় নবী, হুজুর পুরনুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “রজবে এমন একটি দিন ও একটি রাত রয়েছে, যে এদিন রোজা রাখবে, আর রাত জেগে ইবাদত করবে, তবে সে যেন ১০০ বছরের রোজা রাখল এবং ১০০ বছরের রাত জেগে ইবাদত করলো, আর তা হচ্ছে রজবের ২৭ তারিখ।” (শোয়ায়বুল ঈমান- তাকছিছু শাহরী রজব বিল যিকরী, ৫ম খন্ড ৩৪৫পৃ, হাদিস-৩৫৩০, ফাদ্বায়িলুল আওকাত ১/৯৬, জামিউল আহাদীস ১৪/৪৯৬ : হাদীস ১৪৮১২, কানযুল উম্মাল ১২/৩১২: হাদীস ৩৫১৬৯,  জামেউ জাওয়ামে ১ খন্ড, নেদায়ে রাইয়ান ফি ফিক্বহিস সওমে ওয়া ফদলী রমাদ্বান ১/৪২১)
3531 – أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ الْحَافِظُ، أَخْبَرَنَا أَبُو صَالِحٍ خَلَفُ بْنُ مُحَمَّدٍ بِبُخَارَى، أَخْبَرَنَا مَكِّيُّ بْنُ خَلَفٍ، وَإِسْحَاقُ بْنُ أَحْمَدَ، قَالَا: حَدَّثَنَا نَصْرُ بْنُ الْحُسَيْنِ، أَخْبَرَنَا عِيسَى وَهُوَ الْغُنْجَارُ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْفَضْلِ، عَنْ أَبَانَ، عَنْ أَنَسٍ، عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: ” فِي رَجَبٍ لَيْلَةٌ يُكْتَبُ لِلْعَامِلِ فِيهَا حَسَنَاتُ مِائَةِ سَنَةٍ، وَذَلِكَ لِثَلَاثٍ بَقَيْنَ مِنْ رَجَبٍ، فَمَنْ صَلَّى فِيهَا اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً يَقْرَأُ فِي كُلِّ رَكْعَةٍ فَاتِحَةَ الْكِتَابِ وَسُورَةٌ مِنَ الْقُرْآنِ يَتَشَهَّدُ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ، وَيُسَلِّمُ فِي آخِرِهِنَّ، ثُمَّ يَقُولُ: سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ مِائَةَ مَرَّةٍ، وَيَسْتَغْفِرُ اللهَ مِائَةَ مَرَّةٍ، وَيُصَلِّي عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِائَةَ مَرَّةٍ، وَيَدْعُو لِنَفْسِهِ مَا شَاءَ مِنْ أَمْرِ دُنْيَاهُ وَآخِرَتِهِ، وَيُصْبِحُ صَائِمًا فَإِنَّ اللهَ يَسْتَجِيبُ دُعَاءَهُ كُلَّهُ إِلَّا أَنْ يَدْعُو فِي مَعْصِيَةٍ ”

রজব মাসে একটি রাত আছে ওই রাতের আমলকারীর সমস্ত আমলের ছওয়াব ১০০ গুণ করে লিপিবদ্ধ করা হয় সে রাতটি হলো ২৭মে রজব। যে ব্যক্তি ওই রাতে ১২ রাকায়াত নামায আদায় করবে যাতে সূরা ফাতিহা সহ অন্য কোন আয়াত শরীফ পাঠ করবে প্রতি দু’রাকায়াতে তাশাহুদ  (দুরুদ শরীফ ও দুয়ায়ে মাছুরাসহ) পাঠ শেষে সালাম ফিরাবে। এবং নিম্নক্তো দুআ ১০০ বার পাঠ করবে-

سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ 
অতপর ১০০ বার ইস্তিগফার পাঠ করবে অতপর ১০০ বার দুরুদ শরীফ পাঠ করবে। ওই ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যানকর যত দু‘আই করবে এবং সকালে রোযাদার অবস্থায় অবস্থান করবে তার সকল দু‘আই কবুল করা হবে, শুধুমাত্র গুণাহের কাজে জন্য দু‘আ ব্যতীত। (শোয়াবুল ঈমান- তাকছিছু শাহরী রজব বিল যিকরী, ৫ম খন্ড ৩৪৬পৃ, হাদিস-৩৫৩১, ফাদ্বায়িলুল আওকাত ১/৯৭ : হাদীস ১২, তাবয়িনুল আযাব বিমা উরিদা ফি ফাদলি রজব ১/৩১, জামিউল আহাদীস ১৪/৪৯৬ : হাদীস ১৪৮১২, কানযুল উম্মাল ১২/৩১২: হাদীস ৩৫১৭০, জামেউ জাওয়ামে ১ খন্ড বাবু হারফূ ফা, আসারুল মারফুয়া  ১/৬১ , তানযিয়াতু শরীয়াতিল মারফুয়া ২/৮৯)
সূতরাং সবাই এই রাতে ইবাদত করে দিনে রোজা রেখে সহীহ হাদীসের উপর আমল করুন।

কোরআন হাদিসের আলোকে মেরাজ

Standard

ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে পবিত্র ইসরা ও মি’রাজ।

                                     
                       সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী

                        ****************************************

সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ,

খতীব, মুসাফির খানা জামে মসজিদ, নন্দনকানন, চট্টগ্রাম।                        

৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥৥

 

পবিত্র ক্বোরআন করীমের পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সর্বশ্রেষ্ঠ মু’জিযা হলো পবিত্র ইস্রা ও মি’রাজ। আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীনের মহান কুদরত ও তাঁর প্রিয় হাবীবের নবূয়্যত-রিসালতের সত্যতার স্বপক্ষে একটি বিরাট প্রমাণ এবং ঈমানদার ও জ্ঞানীদের জন্য হেদায়ত, নেয়ামত, রহমত ও শিক্ষা। 

এ মহান বিরল সফরে আল্লাহ্ পাক তাঁর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে এমন নিকটতম স্থানে সমাসীন করেছেন যে স্থানে (لم يصل اليه ملك مقرب ولا نبى مرسل)  পৌঁছতে পারেননি কোনও নৈকট্যধন্য ফেরেশতা এবং কোন নবী-রাসূল আলায়হিমুস্ সালামও। যে সফরে আল্লাহ্ তা‘আালা তাঁর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র বিশ্বের সকল নিদর্শনাদি ও রহস্যাদি অবলোকন করানোর মধ্য দিয়ে স্বীয় কুদরতের গোপন ভা-ার ও অজানা বিষয়াদি সম্পর্কে চাক্ষুস ও প্রত্যক্ষ জ্ঞান দ্বারা ধন্য করেন।
                                                 ইস্রা ও মি’রাজ কি?
الاسراء (ইস্রা) শব্দটির অর্থ রাতে ভ্রমণ করানো। যা পবিত্র কাবা ঘর হতে ভূমধ্য সাগরের পূর্বতীর ফিলিস্তিনে অবস্থিত পবিত্র বাইতুল মাকদিস বা মুকাদ্দাস পর্যন্ত ভ্রমণ। যার বর্ণনা পবিত্র ক্বোরআনুল করীমের সূরা ইসরা বা বনী ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে ও অসংখ্য বিশুদ্ধ হাদিসে বিবৃত হয়েছে। 

المعراج (মি’রাজ) হলোঃ عروج (ওর”জ) শব্দ থেকে উৎকলিত যার অর্থ হলো- ঊর্ধ্বগমন, আর معراج (মি’রাজ)’র অর্থ হলো ঊর্ধ্বগমনের বাহন বা সিঁড়ি। আর তা হলোঃ বাইতুল মাকদেস থেকে সপ্ত আসমান, সিদরাতুল মুনতাহা, জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শনপূর্বক ‘ক্বাবা ক্বাউসাইন আও আদনা’ (দুই ধনুক বা তার চেয়ে কম) দূরত্ব পরিমাণে মহান আল্লাহ্ তা‘আলার নৈকট্য ও সাক্ষাৎ লাভ। 

যার বর্ণনা পবিত্র ক্বোরআনুল করীমের সূরা ‘আন্ নাজম’ এর প্রথম থেকে আঠার (১-১৮) আয়াতসমূহে ও নির্ভুল গ্রহণযোগ্য শতাধিক হাদিসে বিস্তারিতভাবে বিদ্যমান। যা সমষ্ঠিগতভাবে মুতাওয়াতির (সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত) পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। 
                          ইসরা ও মি’রাজ কখন সংঘটিত হয়েছিলো?
এ বিষয়ে কারও মতবিরোধ নেই যে, ইস্রা ও মি’রাজ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র হিজরতের পূর্বে সংগঠিত হয়েছিলো। শুধু তারিখ ও বছর নির্ধারণের বিষয়ে সামান্য মতবিরোধ লক্ষ্য করা যায়। তবে বিশ্ব মুসলিমের নিকট যে রাতই মি’রাজের রজনী হিসেবে পরিচিত। সেটি হলো ২৬ তারিখ দিবাগত রাত তথা ২৭ তারিখ রজব মাসে। আর যা ছিল নবূয়তের দশম বছর ৬২০ খ্রিস্টাব্দে।
                     ইস্রা ও মি’রাজ কেন সংঘটিত হয়েছিলো?

                      ++++++++++++++++++++++++
ইস্রা ও মি’রাজ কেন সম্পাদিত হলো তা নিয়ে বিশ্বখ্যাত প-িত ব্যক্তিবর্গ ক্বোরআন-হাদিসের পাশাপাশি নানা তথ্য-তত্ত্ব ও হিকমত তুলে ধরেছেন। নিম্নে কয়েকটি বিবৃত হলোঃ
                               খোদায়ী নিদর্শনাদি দেখানোর জন্য:
আল্লাহ্ তা‘আলা সূরা বনী ইসরাঈল এর প্রথম আয়াতে এরশাদ করেন لنريه من اياتنا (তাঁকে আমার নিদর্শনাদি দেখানোর জন্য) [বনী ইসরাঈল, আয়াত-১]

যাঁকে সৃষ্টি করা না হলে এ বিশ্ব জাহান সৃষ্টি করা হতো না বরং যাঁর ওসীলায় এ সমগ্র দুনিয়ার সৃষ্টি তাঁকে যদি এ সৃষ্টিজগত দেখানো না হয়, তাতে অপূর্ণতা থেকেই যাবে। কারণ তিনি হলেন এ সৃষ্টির প্রাণ, প্রাণহীন দেহের যেমন কোন মূল্য নেই অনুরূপ তাঁর নূরানী কদমের ছাঁয়া ব্যতিরেকে এ পৃথিবী প্রাণহীন। তাই বিশ্বজগতে প্রাণ সঞ্চালনের জন্য তাঁকে এ নিদর্শনাবলীর পরিদর্শন। 
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র শ্রেষ্ঠত্ব ও সকল প্রকার মু’জিযার সমাহার:
আল্লাহ্ তা‘আলা অন্যান্য নবীকে পৃথক পৃথক কতগুলো মু’জিযা দ্বারা সম্মানিত করেছিল, যেমন হযরত মুসা আলায়হিস্ সালামকে তুর পাহাড়ে আল্লাহ্র সাথে কথোপকথন। হযরত ইসমাঈল আলায়হিস্ সালামকে চতুর্থ আসমানে হযরত ইদরিস আলায়হিস্ সালামকে জান্নাতে প্রবেশ ইত্যাদি। সকল নবীকে পৃথক পৃথকভাবে যা দেয়া হয়েছে এককভাবে তা প্রিয়নবীকে মি’রাজ রজনীতে দেয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে কথা, আসমানে, আরোহন, জান্নাত পরিদর্শনসহ আরও অনেক কিছু। যা তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও ব্যাপক মু’জিযার প্রমাণ।
                               জান্নাত-জাহান্নামের প্রত্যক্ষদর্শী:
নবী-রাসূলগণ আলায়হিমুস্ সালাম তাঁদের উম্মতদেরকে দোযখের সংবাদ দিয়েছেন চাক্ষুষভাবে না দেখে, একমাত্র আল্লাহ্ তা‘আলার বাণীর উপর নির্ভর ও বিশ্বাস করে। কিন্তু একমাত্র আমাদের নবীই স্বচক্ষে জান্নাত-জাহান্নাম প্রত্যক্ষ করে উম্মতদেরকে সংবাদ দিয়েছেন। তাই না দেখে বর্ণনা আর প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান।
                                           আসমানের ফরিয়াদ কবুল:
আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যদিওবা সকল বিশ্বের জন্য রহমত এবং আসমানের জন্যও কিন্তু তাঁর অবস্থানস্থল হলো জমিন। তাই আসমানের তথা ঊর্ধ্ব আকাশের ফরিয়াদ ছিল তাঁকে এক নজর দেখার। আর আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের এ ফরিয়াদ কবুল করেন মি’রাজ রজনীতে।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র নূরের দর্শন লাভে তৃপ্ত হবার জন্য ফেরেশতাদের ফরিয়াদ:
বিশ্বখ্যাত তাফসীরকারকগণ বলেন, ফেরেশতাদের হযরত আদম আলায়হিস্ সালামকে সিজদার মূল কারণ ছিল তাঁর কপালে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র নুর মুবারক চমকাচ্ছিল। তাই যে নূরের সামান্য ঝলক দেখে ফেরেশতাগণ সিজদায় অবনত হন, সে নূরকে চোখ ভরে দেখে পরিতৃপ্ত হবার জন্য তাঁদের মাঝে আগ্রহ অধিকহারে বৃদ্ধি পায়। যেমনভাবে শুকনো পিপাসার্ত জমিনে সামান্য বৃষ্টির ফোঁটার মাঝে তৃষ্ণা আরও বৃদ্ধি পায় ঠিক সেভাবে। তাই আল্লাহ্ তা‘আলা তার প্রিয় নবীকে আরশ আজীমে দাওয়াত দিয়ে পথিমধ্যে ফেরেশতাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে তাঁদেরকে চোখ ও মন-প্রাণ ভরে প্রিয় নবীর দর্শন দানের মাধ্যমে পরিতৃপ্ত করেন।
জান্নাত ক্রয়ের চুক্তি সম্পাদন:
إِنَّ اللّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُم بِأَنَّ لَهُمُ الجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْداً عَلَيْهِ حَقّاً فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنجِيلِ وَالْقُرْآنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللّهِ فَاسْتَبْشِرُواْ بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُم بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ (التوبة১১১)
অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা খরিদ করে নিয়েছেন মু’মিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও সম্পদকে বেহেশতের বিনিময়ে…. [সূরা তাওবা, আয়াত-১১১]
আল্লাহ্ তা‘আলা ক্রেতা, মু’মিনগণ বিক্রেতা, পণ্য দর্শন ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় সম্পাদন বৈধ নয়। তাই আল্লাহ্ ও বান্দার মধ্যকার সম্পাদিত এ চুক্তির একমাত্র ওয়াকীল হিসেবে প্রিয় নবীর মধ্যস্থতায় এ চুক্তি সম্পাদিত হয়। কারণ তিনি উম্মতদের পক্ষ থেকে তাদের ক্রয়কৃত বেহেশত পরিদর্শন করে নিয়েছেন। 
            ভূ-মন্ডল  ও নবমন্ডল উভয়ে প্রিয় নবীর রাজত্ব ও কর্তৃত্বের প্রমাণ:
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,

قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” لِي وَزِيرَانِ مِنْ أَهْلِ السَّمَاءِ ، وَوَزِيرَانِ مِنْ أَهْلِ الأَرْضِ ، فَأَمَّا وَزِيرَايَ مِنْ أَهْلِ السَّمَاءِ : فَجِبْرِيلُ ، وَمِيكَائِيلُ ، وَأَمَّا وَزِيرَايَ مِنْ أَهْلِ الأَرْضِ : فَأَبُو بَكْرٍ ، وَعُمَرَ ” .(الترمذي)

অর্থাৎ আমার আসমানে দু’জন এবং জমিনে দু’জন উজির আছেন, জমিনে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও হযরত ওমর ফার”ক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আর আসমানে হযরত জিব্রাঈল ও মিকাঈল আলায়হিমাস্ সালাম। [তিরমিযী]

আসমানে উজির থাকা মানে তাঁর ক্ষমতা আসমানেও জারি হয়। তাই তিনি মি’রাজ রজনীতে স্বীয় কর্তৃত্বাধীন ভূমি পরিদর্শন করে উভয় জগতকে ধন্য করেন এবং স্বীয় কর্তৃত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। 
                          নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম-এর প্রতিশ্র”তি পূরণ:
(আলমে  আরওয়াহতে) আল্লাহ্ তা‘আলা নবী-রাসুলগণের কাছ থেকে ওয়াদা নিয়ে ছিলেন যে, যখন প্রিয় নবী তাঁদের নবুয়তকালে তাশরীফ আনবেন তখন তারা সকলে তাঁর উপর ঈমান আনবেন এবং তাঁকে সাহায্য করবেন। 

[সূরা আলে ইমরান, আয়াত-৮১]
কিন্তু তারা কেউ এ ওয়াদা পূরণ করতে পারেননি কারণ তাঁরা প্রত্যেকেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র আগমনের পূর্বেই ইন্তেকাল করেন (একমাত্র ঈসা আলায়হিস্ সালাম ছাড়া) তাই তাঁরা তাঁদের এ ওয়াদা পূরণ করেছেন বাইতুল মাকদিসে প্রিয়নবীর ইমামতিতে নামায আদায়ের মাধ্যমে তাঁর প্রতি ঈমান ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্বকে মেনে নিয়েছিলেন। এ ছাড়াও ইসরা ও মি’রাজের অনেক হিকমত নিহিত রয়েছে।
               ক্বোরআন-হাদিসের আলোকে প্রিয় নবীর ইস্রা ও মি’রাজ:

                 ************************************************

পবিত্র ক্বোরআনের বহু আয়াতে বিশেষ করে সূরা ‘বনী ইসরাঈল’ ও সূরা ‘আন্ নাজম’ এ এবং বুখারী-মুসলিমসহ অসংখ্য হাদিসগ্রন্থে প্রিয় নবীর ইসরা ও মি’রাজ সম্পর্কে বর্ণনা আসে। নিম্নে তার সামান্য বর্ণনা তুলে ধরা হলোঃ
আল্লাহ্ তা‘আলা সূরা বনী ইসরাঈলে এরশাদ করেন-

﴿ سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ البَصِيرُ﴾ الإسراء/১.

অর্থাৎ তিনি পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আক্বসা পর্যন্ত, যার চতুর্দিকে আমি বরকতময়তার বিস্তার করেছি, তাকে আমার নিদর্শন হতে প্রদর্শনের জন্য। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা। 

[সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-১]
অনুরূপ সূরা ‘নাজম’এ এরশাদ করেন-

وَالنَّجْمِ إِذَا هَوَى * مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى * وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى * إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى * عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى * ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوَى * وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى * ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى * فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى * فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى * مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى * أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى * وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى * عِنْدَ سِدْرَةِ الْمُنْتَهَى * عِنْدَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى * إِذْ يَغْشَى السِّدْرَةَ مَا يَغْشَى * مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى * لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى

(سورة النجم: الآيات ১-৮)

অর্থাৎ ১. শপথ নক্ষত্রের যখন তা স্মমিত হয়। ২. তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নন, বিপথগামীও নন, ৩. এবং তিনি মনগড়া কথাও বলেন না, ৪. তা তো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, ৫. তাঁকে শিক্ষা দান করেন শক্তিশালী, ৬. প্রজ্ঞাসম্পন্ন, অতঃপর স্থির হন, ৭. তখন তিনি ঊর্ধ্ব দিগন্তে, ৮. অতঃপর তিনি তাঁর নিকটবর্তী হলেন, অতি নিকটবর্তী, ৯. ফলে তাঁদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইলো অথবা তারও কম, ১০. তখন আল্লাহ্ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন, ১১. যা তিনি দেখেছেন তাঁর অন্তকরণ তা অস্বীকার করেননি, ১২. তিনি যা দেখেছেন, তোমরা কি সে বিষয়ে তাঁর সাথে বিতর্ক করবে? ১৩. নিশ্চয় তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন, ১৪. সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, ১৫. যার নিকট অবস্থিত জান্নাতুল মাওয়া, ১৬. যখন সিজদা যা দ্বারা আচ্ছাদিত হবার তা দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল, ১৭. তার দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি, ১৮. তিনি তো তাঁর প্রতি পালকের মহান নিদর্শনাবলী দেখেছিলেন। [সূরা নাজম, আয়াত ১-১৮]
                   বাইতুল মাকদাসে নামাজ আদায় ও ইমামতি:
মুসলিম শরীফে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,  

جاء في صحيح مسلم عن أنس بن مالك أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: “أتيت بالبراق، وهو دابة أبيض طويل فوق الحمار ودون البغل، يضع حافره عند منتهى طرفه فركبته، حتى أتيت بيت المقدس قال: فربطته بالحلقة التي يربط به الأنبياء، قال ثم دخلت المسجد فصليت فيه ركعتين 

অতঃপর আমাকে মসজিদের দরজার কাছে নিয়ে আসে, সেখানে লক্ষ্য করি, অদ্ভুত আকৃতির একটি প্রাণী, যাকে গাধাও বলা যায় না আবার তা ঘোড়ার মতও না। উর”তে বিশাল আকার দু’টি পাখা, যার মাধ্যমে সে পায়ে আঘাত করে। চোখের দৃষ্টিসীমার প্রান্তে গিয়ে তার সম্মুখ পা দু’টি মাটি স্পর্শ করে। এর নাম মুবারক। আগের যুগের নবীগণ এর উপরেই আরোহণ করতেন। আমাকে তার উপর আরোহণ করাল। জিবরিল আমিনের সাহচর্যে আমি আসমান-জমিনের বিচিত্র নিদর্শন দেখতে দেখতে বায়তুল মাকদিসে পৌঁছি। সেখানে অবতরণ করে জিবরিল দরজার আংটার সাথে বোরাক বাঁধেন, আল্লাহ্ পাক সেখানে সকল নবীদের একত্রিত করেন, জিব্রাঈল নবীজীকে আগে বাড়িয়ে দেন, নবীজি সকলকে নিয়ে জামাতে নামায আদায় করেন। [মুসলিম শরীফ]
                                         নবীগণের সাথে সাক্ষাত:

  

বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,

حَدَّثَنَا إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُوسَى أَخْبَرَنَا هِشَامُ بْنُ يُوسُفَ أَخْبَرَنَا مَعْمَرٌ عَنْ الزُّهْرِيِّ عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي رَأَيْتُ مُوسَى وَإِذَا هُوَ رَجُلٌ ضَرْبٌ رَجِلٌ كَأَنَّهُ مِنْ رِجَالِ شَنُوءَةَ وَرَأَيْتُ عِيسَى فَإِذَا هُوَ رَجُلٌ رَبْعَةٌ أَحْمَرُ كَأَنَّمَا خَرَجَ مِنْ دِيمَاسٍ وَأَنَا أَشْبَهُ وَلَدِ إِبْرَاهِيمَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِهِ ثُمَّ أُتِيتُ بِإِنَاءَيْنِ فِي أَحَدِهِمَا لَبَنٌ وَفِي الْآخَرِ خَمْرٌ فَقَالَ اشْرَبْ أَيَّهُمَا شِئْتَ فَأَخَذْتُ اللَّبَنَ فَشَرِبْتُهُ فَقِيلَ أَخَذْتَ الْفِطْرَةَ أَمَا إِنَّكَ لَوْ أَخَذْتَ الْخَمْرَ غَوَتْ أُمَّتُكَ

আমি লক্ষ্য করি, হযরত ইবরাহিম, মুসা ও ইসা আলায়হিমুস্ সালাম এর সাথে আরো অনেক নবীগণ একত্রিত হয়েছেন সেখানে। হযরত মুসা আলায়হ্সি সালাম এর আকৃতি একটি উপমাযোগ্য দেহের ন্যায়। শানুয়া বংশের পুর”ষদের মত অনেকটা। কোঁকড়ানো চুল, হালকা গড়ন, লম্বা শরীর। হযরত ঈসা আলায়হ্সি সালাম-এর আকৃতি মাঝারি গড়ন, ঝুলন্ত সোজা চুল, চেহারা সৌন্দর্য তিলকে ভর্তি। মনে হচ্ছিল তিনি গোসলখানা হতে বের হয়েছেন, পানি টপকাচ্ছে মাথা হতে, অথচ কোন পানি টপকাচ্ছিল না। প্রায় উরওয়া ইবনে মাসউদ সাকাফির মত। হযরত ইব্রাহিমের আকৃতি আমার মত, আমি-ই তার সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। অতঃপর আমার সামনে দু’টি পেয়ালা, একটি মদের অপরটি দুধের পেশ করা হয়। আমাকে বলা হল, যেটা ইচ্ছে পান কর”ন, আমি দুধের পেয়ালা হাতে নেই এবং পান করি। আমাকে বলা হয়, সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যদি আপনি মদের পেয়ালা হাতে নিতেন, পান করতেন, আপনার উম্মত গোমরাহ্ হয়ে যেত। অপর একটি বর্ণনায় পানির তৃতীয় আরেকটি পেয়ালার উল্লেখ পাওয়া যায়। [ইবনে হিশাম, বোখারী, মুসলিম শরীফ]
                                 বরকতময় স্থানে নামাজ আদায়:
নাসায়ী শরীফে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বাইতুল মাকদাস যাত্রাকালে তিনস্থানে যাত্রা বিরতি করেন এবং নামাজ আদায় করেন। তা দ্বারা আল্লাহর প্রিয়ভাজন বান্দাদের বরকতময় স্মৃতি ও নিদর্শনাবলীর প্রতি সম্মান ও বরকত হাসিলের বাস্তব প্রমাণ। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, 

أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال أتيت بدابة فوق الحمار ودون البغل خطوها عند منتهى طرفها فركبت ومعي جبريل عليه السلام فسرت فقال انزل فصل ففعلت فقال أتدري أين صليت صليت بطيبة وإليها المهاجر ثم قال انزل فصل فصليت فقال أتدري أين صليت صليت بطور سيناء حيث كلم الله عز وجل موسى عليه السلام ثم قال انزل فصل فنزلت فصليت فقال أتدري أين صليت صليت ببيت لحم حيث ولد عيسى عليه السلام ثم دخلت بيت المقدس فجمع لي الأنبياء عليهم السلام فقدمني جبريل حتى أممتهم )سنن النسائي كتاب الصلاة‘ رقم الحديث : ৪৫০)

অর্থাৎ প্রিয় নবী তাজেদারে মদিনা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বোরাকের উপর বায়তুল মাকদিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। হযরত আনাস ইবনে মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, বাইতুল মাকদিসে যাত্রাকালে বোরাক থেকে নেমে দু’রাকাত নামায আদায় করতে অনুরোধ করলে আমি দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করি। অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, আপনি ইয়াসরিব তথা মদিনা মুনাওয়ারায় নামায আদায় করেছেন, যেখানে হিজরত করে আপনি আশ্রয় গ্রহণ করবেন। মদিনা হতে আবার যাত্রা করলেন। কিছুদূর অতিক্রম করার পর হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বোরাক থেকে অবতরণ করে নামাজ আদায় করতে আরজ করলে তিনি নামায আদায় করেন। হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, এটা সিনাই পাহাড়, এখানে যে গাছ দেখছেন তার নিকট হযরত মুসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর সাথে কথা বলতেন। আবার ভ্রমণ শুর” হলো। কিছূদূর পর জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, বোরাক থেকে নেমে সালাত আদায় কর”ন। নবীজি তাই করলেন। হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, আপনি হযরত শুয়ায়ব আলায়হিস্ সালাম’এর আবাস মাঠে সালাত আদায় করলেন। আবার যাত্রা শুর” করে কিছুদূর যাওয়ার পর হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম মাটিতে নেমে নামায পড়তে বললেন, তিনি নামায আদায় করেন। অতঃপর হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, এ জায়গার নাম বাইতুলহম (বেথেলহাম), হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম এখানেই জন্মগ্রহণ করেন। 

[নাসাঈ, কিতাবুস্ সালাত, হাদিস নং-৪৫০]
অতএব, স্মরণ রাখতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে, শবে মি’রাজ শুধুমাত্র কোনো আশ্চর্য বা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, মি’রাজ আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল বাস্তব দৃষ্টান্ত, আল্লাহর প্রিয় হাবীব হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মহান আল্লাহর সাক্ষাত লাভ, পূর্ববর্তী নবী-রাসূল, ফেরেশতাদের সঙ্গে মোলাকাত, বেহেশত-দোযখ স্বচক্ষে দর্শন, বায়তুল মুকাদ্দাস ও বায়তুল মা’মুরে নামায আদায়, উম্মতের জন্য সুপারিশ ও ফরিয়াদ করার কারণে এ শবে মি’রাজের রাতটি অতীব তাৎপর্যবহ এবং মহিমান্বিত।
বিশ্ব মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বজনীন জীবন ব্যবস্থা হিসেবে রূপ দেওয়ার জন্য তিনি বিশ্ব পালনকর্তা আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীনের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেয়েছিলেন মি’রাজ রজনীতে। এ জন্য এ রাতটি মুসলমানের জন্য অতীব গুর”ত্বপূর্ণ। হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সব মু’জিযার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মু’জিযা হলো মি’রাজ। এ রাতে তিনি বায়তুল মোকাদ্দাসে নামাজে সব নবীর ইমাম হয়ে সাইয়্যিদুল মুরসালিনের আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। ফলে এ রাতটি নিঃসন্দেহে তার শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবোজ্জ্বল নিদর্শন বহন করে। 
হযরত আবদুল্লাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত হাদিসে আছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, মি’রাজের রাতে আল্লাহর সান্নিধ্যে যাওয়ার পর আল্লাহ্ আমাকে তিনটি বিশেষ উপহার প্রদান করেছেন, ১. পাঁচ ওয়াক্ত নামায, ২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত, ৩. যে মুসলিম আল্লাহর সাথে শরীক করবে না তার সকল কবিরা গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হবে। [সহীহ্ মুসলিম]

ইমামের পিছনে নামাজ পড়ার সময় চুপ থাকা

Standard

▆ নামাযে “ইমামের পড়ার সময় তোমরা চুপ থাকবে’’ হাদিস পাকের তাহকিক📓
হাদিস শরিফটির দু’টি সনদ এর পর্যালোচনাঃ

১ম সনদ :

“ইমামের পড়ার সময় তোমরা চুপ থাকবে’’ এই কথাটুকু সহীহ মুসলিম শরিফে হযরত আবু মূসা আশআরী রা. কর্তৃক বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ।

সম্পূর্ণ হাদীসটি ইমাম মুসলিম রহ. এঁর সনদে নিম্নরূপ:

حدثنا سعيد بن منصور ، وقتيبة بن سعيد ، وأبو كامل الجحدري ، ومحمد بن عبد الملك الأموي ، اللفظ لأبي كامل قالوا: حدثنا أبو عوانة ، عن قتادة ، عن يونس بن جبير ، عن حطان بن عبد الله الرقاشي قال:  صليت مع أبي موسى الأشعري صلاة …فقال أبو موسى …إن رسول الله صلى الله عليه وسلم خطبنا فبين لنا سنتنا وعلمنا صلاتنا ، فقال إذا صليتم فأقيموا صفوفكم ، ثم ليؤمكم أحدكم ، فإذا كبر فكبروا ، وإذا قال  غير المغضوب عليهم ولا الضالين  فقولوا آمين ، يجبكم الله …وإذا قال سمع الله لمن حمده فقولوا اللهم ربنا لك الحمد، يسمع الله لكم…

حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِى شَيْبَةَ ، حَدَّثَنَا أَبُو أُسَامَةَ، حَدَّثَنَا سَعِيدُ بْنُ أَبِى عَرُوبَةَ ، ح وَحَدَّثَنَا أَبُو غَسَّانَ الْمِسْمَعِىُّ ، حَدَّثَنَا مُعَاذُ بْنُ هِشَامٍ ، حَدَّثَنَا أَبِى ، ح وَحَدَّثَنَا إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ ، أَخْبَرَنَا جَرِيرٌ ، عَنْ سُلَيْمَانَ التَّيْمِىِّ ،كُلُّ هَؤُلاَءِ عَنْ قَتَادَةَ فِى هَذَا الإِسْنَادِ بِمِثْلِهِ. “وَفِى حَدِيثِ جَرِيرٍ عَنْ سُلَيْمَانَ ، عَنْ قَتَادَةَ ، مِنَ الزِّيَادَةِ:  “وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا ”

অর্থাৎ : “আবু মূসা আশআরী রা. থেকে বর্ণিত।

তিনি বলেন,

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের খেতাব করলেন এবং আমাদের দ্বীনের তরীকা ও নামাযের নিয়ম শেখালেন।

তিনি বললেন,

যখন তোমরা নামায পড়তে শুরু কর তখন (প্রথমে) কাতারগুলো সোজা কর।

অত:পর তোমাদের একজন ইমাম হবে।

সে যখন তাকবীর দেয় তখন তোমরা তাকবীর দিবে।

আর সে যখন পড়ে তখন তোমরা চুপ থাকবে।

সে যখন  غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ বলে তখন তোমরা আমীন বলবে।

আল্লাহ তোমাদের দুআ কবুল করবেন…।

সে যখন سمع الله لمن حمده  বলে তখন তোমরা  اللهم ربنا لك الحمد বলবে।

আল্লাহ তোমাদের প্রশংসা শুনবেন…।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪০৪।

 

সনদের প্রাসঙ্গিক আলোচনা

সহীহ মুসলিম থেকে সনদের যে আরবী পাঠ উপরে উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, ইমাম মুসলিম এ হাদীসটি একাধিক নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেছেন।

আর

আলোচিত বাক্যটিও এ হাদীসের অংশ এবং যে সনদে তা আছে তা-ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

আর

তা বর্ণনা করেছেন এভাবে-

“وَفِى حَدِيثِ جَرِيرٍ عَنْ سُلَيْمَانَ ، عَنْ قَتَادَةَ ، مِنَ الزِّيَادَةِ : وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا ”

অর্থাৎ : (এ হাদীসে) কাতাদা থেকে সুলায়মান তাইমীর বর্ণনায়, যা বর্ণনা করেছেন জারীর, এ কথাও রয়েছে- وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا “(ইমাম) যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাকবে”।

ইমাম মুসলিমের মতে তা সহীহও বটে। একারণেই তিনি তা তাঁর ‘সহীহ’ তে এনেছেন।

উপরন্তু

একজনের প্রশ্নের উত্তরে তা স্পষ্ট ভাষায় বলেও দিয়েছেন।

প্রশ্ন কর্তা ও ইমাম মুসলিম রহ. এঁর সেই কথোপকথনটিও সহীহ মুসলিমে আছে।

আর

তা এই-

قَالَ أَبُو إِسْحَاقَ : قَالَ أَبُو بَكْرِ ابْنُ أُخْتِ أَبِى النَّضْرِ فِى هَذَا الْحَدِيثِ ، فَقَالَ مُسْلِمٌ : تُرِيدُ أَحْفَظَ مِنْ سُلَيْمَانَ؟!…

অর্থাৎ : আবু ইসহাক বলেন, আবু নাযরের ভাগ্নে আবু বকর এ হাদীস সম্পর্কে প্রশ্ন তুললে (ইমাম) মুসলিম বলেন,

“তুমি কি সুলায়মান (তাইমীর) চেয়েও বড় হাফেয চাও?…!

গ্রন্থ সূত্র:

*_* সহীহ মুসলিম, হাদীস : ৪০৪-এর আলোচনায়।

সুতরাং

দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, ইমাম মুসলিম (২৬১হি.)-এর বিচারে এ হাদীস অর্থাৎ ‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ সহীহ।

 

ইমাম আহমদ রাহ.-এঁর সিদ্ধান্তঃ

আবু বকর আছরাম বলেন,

আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (২৪১ হি.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম,

  “وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا” (

সে যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে কে বর্ণনা করেছেন?

উত্তরে বললেন,

…জারীরের হাদীস, যা তিনি সুলায়মান তাইমী থেকে বর্ণনা করেছেন।

তাদের ধারণা সুলায়মান তাইমী থেকে এটি মুতামিরও বর্ণনা করেছেন।

বললাম, জ্বী, মুতামিরও বর্ণনা করেছেন।

তিনি বললেন, তাহলে আর কী চাও?

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আততামহীদ, ইবনে আবদুল বার ১১/৩৪

আবু তালেব বলেন,

আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে জিজ্ঞাসা করলাম, তারা বলে, আবু খালেদ এখানে ভুল করেছেন?

ইমাম আহমাদ রহ. উত্তরে বললেন,

এটি সুলায়মান তাইমীর সূত্রে আবু মূসা আশআরী. রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে।

জিজ্ঞাসা করলাম,

তারা বলে, তাইমী এখানে ভুল করেছেন?

ইমাম আহমাদ রহ. বললেন,

এ কথা যে বলে সে তাঁর উপর অপবাদ আরোপ করে!

من قال هذا فقد بهته!

গ্রন্থ সূত্র :

*_* শরহে মুগলাতা; ৩/৪০৯।

 

বিভিন্ন মনীষীদের আরো মতামতঃ

০১. ইবনে আবদুল বার রহ. (৪৬৩হি.) বলেন,

“কেউ যদি এ প্রশ্ন করে যে, ইহা (ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাকবে) আবু হুরায়রা রা.-এর হাদীসে ইবনে আজলান ছাড়া আর আবু মূসা আশআরী.-এর হাদীসে সুলায়মান তাইমী ছাড়া আর কেউ বর্ণনা করেনি, তাহলে তাকে বলা হবে যে,

এঁদের চেয়ে বড় হাফেয কেউ এঁদের বিরোধিতা করেননি।

সুতরাং

এঁদের বর্ণনা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়।

ইমাম আহমদ উভয় হাদীসকে সহীহ বলেছেন…”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আততামহীদ; ১১/৩৪।
০২. আবু মূসা আশআরী রা.-এঁর হাদীস এবং তাতে ইমাম দারাকুতনীর আপত্তি উদ্ধৃত করে মুনযিরী রাহ. (৬৫৬হি.) বলেন,

“সুলায়মান তাইমী ছিকা ও হাফেযে হাদীস হওয়ায় তাঁর একক বর্ণনা ইমাম মুসলিমের কাছে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে নি।

তাই

তিনি (ইমাম মুসলিম রহ.) ইহাকে সহীহ বলেছেন…”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মুখতাসারে সুনানে আবু দাউদ; ১/৩১৩।
০৩. ইবনে তাইমিয়া (৭২৮হি.) লিখেন,

…ولم يؤثر عند مسلم تفرد سليمان بذلك، لثقته وحفظه ، وصحح هذه الزيادة… 

অর্থাৎ : “আবু মূসা আশআরী রা.-এঁর হাদীসে বর্ণিত ‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ কথাটিকে ইমাম আহমদ, ইসহাক (২৩৮হি.) ও মুসলিম ইবনে হজ্জাজ প্রমুখ সহীহ বলেছেন।

আর

বুখারী রহ. এর এই ইল্লত বের করেছেন যে,

ইহাতে রাবীদের ইখতিলাফ হয়েছে!

অথচ

তা বর্ণনাটির বিশুদ্ধতায় বিঘ্ন সৃষ্টি করে না”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মাজমূ ফাতাওয়া; ২২/৩৪০।
একই মত পোষণ করেছেন যাঁরাঃ

০৪. ইমাম ইবনুল মুনযির (৩১৮হি.),

০৫. ইবনুত তুরকুমানী (৭৪৫হি.), ইবনুল হুমাম (৮৬১হি.),

০৬. ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২হি.) ও

০৭. বদরুদ্দীন আইনী (৮৫৫হি.)

প্রমুখও একই মত পোষণ করেছেন।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলজাওহারুন নাকী, ইবনুত তুরকুমানী ২/১৫৫-১৫৬ (আসসুনানুল কুবরা, বায়হাকী’র সাথে মুদ্রিত);

*_* ফাতহুল কাদীর, ইবনুল হুমাম ১/৩৪১;

*_* ফাতহুল বারী, ইবনে হাজার ২/২৮৩;

*_* উমদাতুল কারী ৬/১৫;

*_* ফাছলুল খিতাব ফী মাসআলাতি উম্মিল কিতাব পৃ. ৪২-৪৩।
কোনো কোনো ইমামের ভিন্নমতঃ

এখন আমরা আরো কিছু ইজতিহাদী মতামত নিয়ে আলোচনা করব।

ইমাম বুখারী রহ. সহ কোনো কোনো ইমামের ভিন্নমতও এখানে আছে।

তাঁরা বলেন,

আলোচিত বাক্যটি ‘সহীহ’ নয়।

তাঁদের যুক্তি হচ্ছে,

কাতাদা থেকে হাদীসটি সায়ীদ ইবনে আবী আরুবা, হিশাম দাস্তওয়ায়ী, হাম্মাম ইবনে ইয়াহইয়া ও আবান ইবনে ইয়াযিদ প্রমুখও বর্ণনা করেছেন।

তাদের বর্ণনায় ‘সে যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ কথাটি নেই। শুধু সুলায়মান তাইমী তা বর্ণনা করেন। সুতরাং ওঁদের বর্ণনাই সঠিক, সুলায়মান তাইমী এটা হয়ত ভুলে বাড়িয়ে দিয়েছেন!

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলকেরাত খালফাল ইমাম, বুখারী পৃ. ৫৮;

*_* সুনানে দারাকুতনী ২/১২১;

*_* আলইলাল, দারাকুতনী ৭/২৫৪;

*_* আলকেরাত খালফাল ইমাম, বায়হাকী পৃ. ১২৮-১৩১।
পক্ষান্তরে

অনেক ইমামের মতে এ কথাটি সহীহ এবং এ হাদীসের অংশ।

যেমনটি ইমাম আহমাদ ও ইমাম মুসলিমের বক্তব্যে আমরা পেলাম।

এবং

সার্বিকভাবে এ মতটিই অধিকতর সঙ্গত।

কারণ

সুলায়মান তাইমী অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।

তাছাড়া

এই বর্ণনায় তিনি একা নন, তাঁর একাধিক মুতাবি (সমর্থনকারীও) রয়েছে।
সুলায়মান তাইমী রহ. সম্পর্কে ইমামদের মতামতঃ

০১. সুফিয়ান ছাওরী রাহ. বলেন,

বসরার হাফেযে হাদীস ছিলেন তিনজন- সুলায়মান তাইমী, আসেম আহওয়াল ও দাউদ ইবনে আবী হিন্দ।

০২. মুয়াল্লা ইবনে মনসূর বলেন,

আমি ইসমাইল ইবনে উলাইয়্যাকে বসরার হাফেযে হাদীসদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাদের মধ্যে সুলায়মান তাইমীর নাম উল্লেখ করেন।

০৩. ইয়াহইয়া ইবনে সায়ীদ আলকাত্তান বলেন,

তাইমী আমাদের কাছে হাদিস বিশারদদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

০৪. ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন ও আহমদ ইবনে হাম্বল বলেন,

তিনি ‘ছিকা’।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলজারহু ওয়াততাদীল ৪/১২৪-১২৫;

*_* তারীখে ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন, উসমান ইবনে সায়ীদ দারিমী পৃ. ৪৯।
এই বর্ণনায় সুলায়মান তাইমী কি একাইঃ

এই ধরনের হাফেযে হাদীসদের একক বর্ণনা ইমামগণ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ববুল করেন।

অথচ

আগেই বলেছি, এ বর্ণনায় তাঁর দু’জন সমর্থনকারীও রয়েছে।

০১. উমর ইবনে আমের।

বর্ণনাটি এই- (রেফারেন্সকে ফলো-আপ করুন)

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মুসনাদে বায্যার ৬/৬৬, হাদীস ৩০৬০।
০২. আবু উবায়দা (মুজ্জাআ ইবনে যুবাইর)।

বর্ণনাটি এই-

قال أبو عوانة : حَدَّثَنَا سَهْلُ بْنُ بَحْرٍ الْجُنْدَيْسَابُورِيُّ ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ رُشَيْدٍ ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو عُبَيْدَة َ، عَنْ قَتَادَةَ ، عَنْ يُونُسَ بْنِ جُبَيْرٍ، عَنْ حِطَّانَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الرَّقَاشِيِّ ، عَنْ أَبِي مُوسَى الأَشْعَرِيِّ ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم -: إِذَا قَرَأَ الإِمَامُ فَأَنْصِتُوا، وَإِذَا قَالَ: {غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلا الضَّالِّينَ فَقُولُوا آمِين .

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সহীহ আবু আওয়ানা; ২/১৩৩।

উভয় বর্ণনার সনদ সমর্থক বর্ণনা হিসেবে খুবই গ্রহণযোগ্য।

প্রথমটির সনদ হাসান পর্যায়ের আর দ্বিতীয়টি তো ইমাম আবু আওয়ানা তাঁর ‘সহীহ’ গ্রন্থেই এনেছেন।
ইমাম বুখারী রহ. আরেকটি আপত্তি করেছেন।

আপত্তিটি হলো :

“সুলায়মান তাইমী কাতাদা থেকে আর কাতাদা ইউনুস ইবনে জুবাইর থেকে শুনেছেন কি না, তা এই বর্ণনায় অনুল্লেখিত।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলকেরাত খালফাল ইমাম, বুখারী পৃ. ৫৮।

বাস্তবে ইহাও কোনো প্রভাবক ত্রুটি নয়।

কারণ

সুলায়মান তাইমী কাতাদা থেকে আর কাতাদা ইউনুস ইবনে জুবাইর থেকে শুনেছেন।

মুতামির ইবনে সুলায়মানের বর্ণনায় সহীহ সনদে তার উল্লেখ রয়েছে।

বর্ণনাটি এই-  

قال الامام أبو داود : حَدَّثَنَا عَاصِمُ بْنُ النَّضْرِ، حَدَّثَنَا الْمُعْتَمِرُ قَالَ: سَمِعْتُ أَبِى حَدَّثَنَا قَتَادَةُ عَنْ أَبِى غَلاَّبٍ يُحَدِّثُهُ عَنْ حِطَّانَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الرَّقَاشِىِّ بِهَذَا الْحَدِيثِ زَادَ فَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا .

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৯৭৩।

আরো দ্রষ্টব্য :

*_* আলআওসাত, ইবনুল মুনযির ৩/২৬০।
সারকথা এই যে,

আলোচিত হাদীসটি আবু মূসা আশআরী রা.-এঁর সূত্রে সহীহ ও প্রমাণিত।

এ প্রসঙ্গে কোনো কোনো ইমামের যে ভিন্নমত রয়েছে তার চেয়ে এ সিদ্ধান্তই অগ্রগণ্য।

কারণ

এ হাদীসের বর্ণনাকারী সুলায়মান তাইমী অতি উঁচু পর্যায়ের ছিকা ও হাফিযুল হাদীস, যাঁদের একক বর্ণনাও ইমামগণ ক্ববুল (Accept) করেন, তদুপরি এই বর্ণনায় তিনি একা (Alone) নন, অন্তত দু’জন সমর্থনকারী রাবী তাঁর রয়েছে।
২য় সনদ :

অন্য সাহাবীর সূত্রে “ইমামের পড়ার সময় তোমরা চুপ থাকবে’’ হাদিস শরিফের অংশের পর্যালোচনা।

আলোচ্য হাদীসটি আলাদা সনদে অন্য সাহাবী থেকেও বর্ণিত হয়েছে।

ইহা হযরত আবু হুরায়রা রা. কর্তৃক বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসেরও অংশ।

সনদসহ পুরো হাদীসটির আরবী পাঠ এই-

قال ابن أبي شيبة : حَدَّثَنَا أَبُو خَالِدٍ الأَحْمَرِِ ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَجْلاَنَ ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَسْلَمَ ، عْن أَبِي صَالِحٍ ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم : إنَّمَا جُعِلَ الإِمَام لِيُؤْتَمَّ بِهِ فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا ، وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا ، وَإذَا قَالَ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ ، وَلاَ الضَّالِّينَ فَقُولُوا آمِينَ ، وَإِذَا رَكَعَ فَارْكَعُوا ، وَإذَا قَالَ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ فَقُولُوا اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ ، وَإِذَا سَجَدَ فَاسْجُدُوا ، وَإِذَا صَلَّى جَالِسًا فَصَلُّوا جُلُوسًا.

অর্থাৎ : “আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত।

নবী করীম সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

ইমাম হল অনুসরণের জন্য।

সুতরাং

সে যখন তাকবীর দেয় তখন তোমরা তাকবীর দিবে।

আর সে যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাকবে।

সে যখন  غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ পড়ে তখন তোমরা আমীন বলবে।

সে যখন রুকূ করে তখন তোমরা রুকূ করবে।

সে যখন سمع الله لمن حمده  বলে তখন তোমরা اللهم ربنا لك الحمد বলবে।

সে যখন সেজদা করে তখন তোমরা সেজদা করবে।

সে যখন বসে নামায পড়ে তখন তোমরা বসে নামায পড়বে”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ৭২১৪।

আরো দেখুন :

*_* মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯৪৩;

*_* সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৬০৪;

*_* সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৯২১।

 

এই সনদের প্রাসঙ্গিক আলোচনাঃ

এই হাদীসটি ইমাম মুসলিম রহ. ‘সহীহ’ গ্রন্থে না-আনলেও ইহা তাঁর মতে তা সহীহ।

সহীহ মুসলিম শরিফে উল্লেখিত ইমাম মুসলিম রহ. ও আবু নাযর রহ. এঁর ভাগ্নে আবু বকরের মধ্যকার কথোপকথনটিতে তা স্পষ্টভাবে আছে।
কথোপকথনটি এই :

… আবু বকর জিজ্ঞাসা করলেন,

তাহলে আবু হুরায়রা রা.-এঁর হাদীস (অর্থাৎ ইহা কি আপনার মতে সহীহ)?
ইমাম মুসলিম রহ. বললেন,

আমার মতে এটি সহীহ।
আবার জিজ্ঞাসা করলেন,

তাহলে ‘সহীহ’ গ্রন্থে কেন আনেননি?
ইমাম মুসলিম রহ. বললেন,

আমার মতে যা সহীহ তার সব তো এখানে আনিনি।

এখানে এনেছি কেবল এমন হাদীস যাতে তাঁরা ঐকমত্য পোষণ করেছেন”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সহীহ মুসলিম, হাদীস  ৪০৪-এর আলোচনায়।
তাঁদের কথোপকথনটির আরবী পাঠ এই-

ৃفَقَالَ لَهُ أَبُو بَكْرٍ: فَحَدِيثُ أَبِى هُرَيْرَةَ؟ فَقَالَ هُوَ صَحِيحٌ يَعْنِى وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا. فَقَالَ: هُوَ عِنْدِى صَحِيحٌ. فَقَالَ: لِمَ لَمْ تَضَعْهُ هَا هُنَا؟ قَالَ: لَيْسَ كُلُّ شَىْءٍ عِنْدِى صَحِيحٍ وَضَعْتُهُ هَا هُنَا ، إِنَّمَا وَضَعْتُ هَا هُنَا مَا أَجْمَعُوا عَلَيْهِ.

ইহা থেকে স্পষ্ট যে,

ইমাম মুসলিম রহ. এঁর মতে আবু হুরায়রা রা.-এঁর সূত্রে বর্ণিত এ হাদীস অর্থাৎ ‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ সহীহ।

আবু বকর আছরাম বলেন,

আমি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, “وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا” (সে যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সূত্রে কে বর্ণনা করেছেন?

উত্তরে ইমাম আহমাদ রহ. বললেন,

ইবনে আজলানের হাদীস, যা তাঁর থেকে আবু খালেদ বর্ণনা করেছেন…”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আততামহীদ, ইবনে আবদুল বার ১১/৩৪।

তবে

ইমাম বুখারী রহ. সহ আরো কোনো কোনো ইমামের ভিন্নমতও এখানে আছে।

ইমাম আবু দাউদ রহ. বলেন,

‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাকবে’ কথাটি সহিহ্ নয়। আমার মতে এ ভুলটি হয়েছে আবু খালেদ (সুলায়মান ইবনে হাইয়্যান) থেকে।
মুনযিরী রাহ. ইমাম আবু দাউদ-এঁর এই বক্তব্য উদ্ধৃত করে লিখেছেন,

“তাতে (ইমাম আবু দাউদের বক্তব্যে) আপত্তি আছে।

কারণ

সুলায়মান ইবনে হাইয়্যান আহমার ছিকা রাবীদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের হাদীস ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ. সহীহ গ্রন্থে দলীলস্বরূপ এনেছেন।

তাছাড়া

এই বর্ণনায় তিনি একা (Alone) নন, মুহাম্মাদ ইবনে সা‘দ তাঁর সমর্থন করেছেন।

আর

তিনি (মুহাম্মাদ ইবনে সা‘দ) ছিকা…। ইমাম নাসায়ী উভয় হাদীস তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে এনেছেন…।”

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মুখতাসারে সুনানে আবু দাউদ; ১/৩১৩।

একই মত যাঁরা পোষণ করেছেন :

০১. ইমাম ইবনে আবদুল বার,

০২. ইবনে হাযম (৪৫৬হি.),

০৩. ইবনুত তুরকুমানী ও

০৪. বদরুদ্দীন আইনী

প্রমুখও একই মত পোষণ করেছেন।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* আলমুহাল্লা, ইবনে হাযম ৩/২০১;

*_* আলজাওহারুন নাকী ২/১৫৬-১৫৮;

*_* উমদাতুল কারী ৬/১৫;

*_* ফাছলুল খিতাব ফী মাসআলাতি উম্মিল কিতাব পৃ. ৪৩-৪৪।

আর

সার্বিক বিচারে এই মতটিই অধিকতর সঙ্গত।

কারণ

আবু খালেদ নিভর্রযোগ্য।

তাছাড়া

এই বর্ণনায় তিনি একা (Alone) নন, তাঁর মুতাবি (সমর্থনকারীও) রয়েছে।

এই বর্ণনায় তাঁর সমর্থন করেছেন মুহাম্মদ ইবনে সা’দ।

বর্ণনাটি এই-

قال النَّسَائي: أخبرنا محمد بن عبد الله بن المبارك ، قال: حدثنا محمد بن سعد الأنصاري قال: حدثني محمد بن عجلان عن زيد بن أسلم ، عن أبي صالح ، عن أبي هريرة قال: قال رسول الله صلى الله عليه و سلم: إنما الإمام ليؤتم به ، فإذا كبر فكبروا ، وإذا قرأ فأنصتوا.

قال أبو عبد الرحمن : كان المخرمي يقول : هو ثقة يعني محمد بن سعد الأنصاري

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৯২২।
সমর্থনকারীও ছিকা :

মুহাম্মদ ইবনে সা‘দ ছিকা। ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক আলমুর্খারিমী ও নাসায়ী তাকে ‘ছিকা’ বলেছেন এবং ইবনে হিব্বান ‘ছিকাত’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* তারীখে বাগদাদ ৫/৩২১;

*_* আছছিকাত ৯/৪১;

*_* সুনানে দারাকুতনী ২/১১৮।
বাকি রইল মুহাম্মদ ইবনে আজলানের একা (lonely) বর্ণনা করা, যাহাকে বুখারী ও আবু হাতেম রাহ. এখানে ইল্লত (filthy) মনে করেছেন।

আসলে এটিও কোনো প্রভাবক ত্রুটি (ইল্লত) নয়।

কারণ

তিনি ছিকা।

তাছাড়া

তাঁর বর্ণনায় অন্যান্য রাবীদের বর্ণনার বিরোধী কিছু নেই।

বরং

ব্যাপারটি এখানে এরকম যে,

তাঁর বর্ণনায় একটি বিষয় উল্লেখিত হয়েছে; যা অন্যদের বর্ণনায় উল্লেখিত হয়নি।

ইহা মূলত ‘যিয়াদাতুছ ছিকা’র অধীনে আসে।

মুহাম্মাদ ইবনে আজলান রহ. শুধু উঁচু  পর্যায়ের ছিকা বা হাদীস বর্ণনায় বিশ্বস্ত ও ইমামগণের আস্থাভাজন রাবীই নন, তিনি ফিকহ ও ফতোয়ারও ইমাম।

আর

ইমাম সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, আহমদ ইবনে হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন, ইজলী, আবু হাতেম ও আবু যুরআ তাঁকে ছিকা বলেছেন।

ইমাম ইবনে উয়াইনা তো হাদীসের ক্ষেত্রে তাঁর উঁচু মানের প্রশংসাও করেছেন।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* তারীখে ইয়াহইয়া ইবনে মায়ীন, দূরী ১/১৪৫, ১৬৬, ১৬৭;

*_* আলইলাল ওয়ামারিফাতুর রিজাল ১/১৯৮, ২/১৯, ১৫৪;

*_* আলজারহু ওয়াততাদীল ৮/৪৯-৫০;

*_* আলমারিফাতু ওয়াততারীখ ১/৬৯৮;

*_* মারিফাতুছ ছিকাত ২/২৪৮;

*_* সিয়ারু আলামিন নুবালা ৬/৩১৮।

এরুপ বর্ণনাকারীর ‘যিয়াদাহ’ গ্রহণ করা সালাফের ফিকহ ও ইজতিহাদের ইমামগণ তো বটেই; জরহ-তাদীল ও ইলালের অনেক ইমামেরও মাযহাব।

তাই ইবনে আজলানের এই রেওয়ায়েত সম্পর্কে করা “উপরোক্ত আপত্তি” সঠিক নয়।

আর

এই জন্যেই ইমাম আহমাদ, ইমাম মুসলিমসহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনেক হাদীসের ইমাম ইহাকে সহীহ বলেছেন। যেমনটি আমরা একটু আগে দেখে এসেছি।

লক্ষণীয়,

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে হাদীসটি আবু সালামা, কায়স ইবনে আবী হাযেম, আবুয যিনাদ, আবু ইউনুস, আবু আওয়ানা প্রমুখ বর্ণনা করেছেন।

প্রায় সবার বর্ণনায় শব্দ-বাক্যের কমবেশি রয়েছে।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* সহীহ বুখারী, হাদীস ৭২২, ৭৩৪;

*_* সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪১৪-১১৭;

*_* মুসান্নফে আবদুর রায্যাক, হাদীস ৪০৮৩;

*_* মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৭১৪৪, ৮১৫৬, ৮৫০২, ৯০১৫।

অথচ

কারো বর্ণনাকে ভুল আখ্যায়িত করা হয়নি।

কারণ

তাঁরা সবাই ছিকা এবং বর্ণনাগুলো পারস্পরিক সাংঘর্ষিক নয়।

সুতরাং

মুহাম্মদ ইবনে আজলান (অনুরুপভাবে সুলায়মান তাইমী ও আবু খালেদ)-এঁর ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হবে।
সারকথা এই যে,

হযরত আবু হুরায়রা রা.-এঁর সূত্রেও আলোচিত হাদীসটি সহীহ।

এই প্রসঙ্গে কোনো কোনো ইমামের যে ভিন্নমত রয়েছে তার চেয়ে বর্ণনাটি সহীহ হওয়ার সিদ্ধান্তই অগ্রগণ্য।

কারণ

এই হাদীসের বর্ণনাকারী আবু খালেদ নির্ভরযোগ্য।

উপরন্তু

এই বর্ণনায় তিনি একা (Alone) নন, তাঁর সমর্থনকারী রয়েছে। তাঁরাও ছিকা।

আর

মুহাম্মদ ইবনে আজলানও ছিকা রাবী।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* জামিউল বায়ান ফী তাবীলি আয়ীল কুরআন, ইবনে জারীর ১০/৬৬৭;

আরো দেখুন :

*_* আলমুনতাকা শরহুল মুয়াত্তা, আবুল ওলীদ বাজী ১/৩৫৪;

*_* শরহুল মুয়াত্তা, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল বাকী আয্যুরকানী ১/২৫২।
এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে,

‘ইমাম যখন পড়ে তোমরা তখন চুপ থাক’ কথাটি দুই সাহাবী- হযরত আবু মূসা আশআরী ও আবু হুরায়রা রা.-এঁর সূত্রে “সহীহ-ও-প্রমাণিত”।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল, ইসহাক ইবনে রাহুয়াহ ও মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ ইহাকে সহীহ বলেছেন।

আর

ইবনে জারীর তবারী (৩১০হি.), ইবনুল মুনযির, ইবনে হাযম, ইবনে আবদুল বার, মুনযিরী, ইবনে তাইমিয়া, ইবনুত তুরকুমানী, ইবনে হাজার আসকালানী ও ইবনুল হুমাম প্রমুখ এ মতই পোষণ করেছেন।

সর্বশেষ কথা এই যে,

এখানে নির্ধারিত বর্ণনার উপর সনদগত আলোচনা উপস্থাপিত হলো।

অন্যথায়

মূল বিষয়টি কুরআন মাজীদের আয়াত ও অনেক সাহাবী-তাবেয়ীর ফতোয়া ও আমল দ্বারা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত, যা মৌখিক সাধারণ বর্ণনা-সূত্রের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।

ইবনে তাইমিয়া বড় সুন্দরভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন।
সহিহ্ মুসলিম শরিফের ব্যাপারে ইবনে তাইমিয়ার মন্তব্যঃ

তিনি সহীহ মুসলিমের বিভিন্ন হাদীসের অংশ-বিশেষকে বিভিন্ন মুহাদ্দিস কর্তৃক যে যয়ীফ বলা হয়েছে, সে বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, এইসব জায়গায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইমাম মুসলিম রহ. এঁর সিন্ধান্তই সঠিক।

যেমন

আবু মূসা আশআরী রা.-এঁর হাদীসে وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا অংশটি।

ইহাকে ইমাম মুসলিম রহ. সহীহ বলেছেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল ও অন্যরা তা গ্রহণ করেছেন।

পক্ষান্তরে

ইমাম বুখারী রহ. ইহাকে যঈফ গণ্য করেছেন।

অথচ

এই কথাটি কুরআন মাজীদের বক্তব্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

এই বিষয়ে যদি কোনো সহীহ হাদীস নাও থাকত তবু ক্বুরআন অনুযায়ী আমল করা তো জরুরি।

আল্লাহর বাণী-

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا*

অর্থাৎ : যখন কুরআন পড়া হয় তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক।

ইহার ব্যাপারে সকলের ঐকমত্য রয়েছে যে,

ইহা সালাত সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে এবং সালাতের কেরাতকে ইহাতে উদ্দেশ্য করা হয়েছে”।

গ্রন্থ সূত্র :

*_* মাজমূ ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া ১৮/২০।

এই বিষয়ে তিনি ‘মাজমূ ফাতাওয়া’ ২৩/২৭২-২৭৩-তে আরো দীর্ঘ আলোচনা করেছেন।

আগ্রহী পাঠক তা দেখে নিতে পারেন।

_________

▆ মুক্তাদীর জন্যে কি সুরা ফাতিহা পড়া ওয়াজীব?

https://mbasic.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1729044500744321

▆ সহিহ্ পাঠ হচ্ছে “গাইরিল মাগদ্বুবী ‘আলাইহিম ওয়ালাদ্বোয়াল্লীণ” : “গাইরিল মাগজুবী ‘আলাইহিম ওয়ালাজজোয়াল্লীণ” পাঠ ক্বুরআ’ন বিকৃতি 📓

https://mbasic.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1767421030240001

______

▆ হাদিস সম্পর্কে জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয়ঃ
নোট ০১. দ্বয়ীফ হাদিসের উপর ‘আমল করা মুস্তাহাব

https://mobile.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1697298063918965

নোট ০২. জাল হাদিসের হুকুম

https://mobile.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1697295443919227

নোট ০৩. “হাদিসটি সহিহ্ নয়“ বলতে মুহাদ্দিসিনে ক্বিরাম কি বুঝিয়ে থাকেন!

https://mobile.facebook.com/hasan.mahmud/posts/1697290543919717

 মূল সাইট