কবর ভাঙ্গা!

Standard

 প্রশ্ন: মিশকাত শরীফে জানাজা পর্বে মৃতকে দাফন করা অধ্যায়ে আছে তাবেয়ী আবুল হাইয়াজ আসাদী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু আমাকে বললেন,আমি তোমাকে ঐ কাজে পাঠাব না? যে কাজে আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পাঠিয়েছেন। তা এই, কোন মূর্তি পেলে নষ্ট না করে ছাড়বে না এবং কোন উঁচু কবর সমান না করে রাখবে না। এ হাদীস দ্বারা বুঝা যায় যে, কোন উঁচু কবর দেখলে তা ভেঙ্গে এক বিঘতের সমান করে দিতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে কিছু মাজারে দেখা যায় যে, কবর (গিলাফ ব্যতীত) এক বিঘতের চেয়ে উঁচু। সেটা কি জায়েয নাকি নাজায়েয।
 জোবাইদুন নাহার পান্না

জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।
 উত্তর: মিশকাত শরীফে তাবেয়ী আবুল হাইয়াজ আসাদী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

قال لى على الا ابعثك على ما بعثنى عليه رسول الله صلى الله عليه وسلم ان لاتدع تمثالا الا طمسته ولا قبرًا مشرفًا الا مَوَّيتَهُ-

অর্থ: হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বলেন, আমি কি তোমাকে ঐ কাজে পাঠাব না? যে কাজে আমাকে প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পাঠিয়েছেন। তাহলো কোন মূর্তি পেলে নষ্ট না করে ছাড়বে না এবং কোন উঁচু কবর সমান না করে রাখবে না।

[মিশকাত শরীফ: পৃষ্ঠা ১৪৮, মুসিলম শরীফ: হাদিস নম্বর ৯৬৯]

এই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কবরকে মাটির সাথে সমান করে দিতে হবে। কবর মাটির উপরে হতে পারবে না। অথচ আমাদের দেশে নয় শুধু বিশ্বের প্রতিটি দেশে মুসলমানদের কবর মাটি হতে উপরে। এমনকি সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীনে এজাম, তাবে

তাবেয়ীন স্বয়ং নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রওজা মোবারক ও এর ব্যতিক্রম নয়। তাহলে প্রশ্ন জাগতে পারে এ হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা ও মর্মার্থ কি?

অবশ্যই এ হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তাহলো রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যে সব কবর মাটির সাথে সমান করে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন তা মূলত মুশরিক ও ইহুদী-নাসারাদের কবর সম্পর্কে উক্ত নির্দেশ দিয়েছেন। এবং হযরত মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হযরত আবুল হাইয়াজ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকেও যে নির্দেশ দিয়েছেন কোন মুসলমানের কবরকে তিনি মাটির সাথে সমান করতে বলেন নি। কারণ সম্মানিত সাহাবাগণকে দাফন করার সময় প্রায় হুযূর পাক রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত থাকতেন অথবা সাহাবায়ে কেরাম রাসূলে কায়েনাত-এর অনুমতি নিয়ে কবর তৈরি করতেন। তাহলে এমন কবর কোথায় থাকল? যা ভাঙ্গার জন্য নির্দেশ দিতে হল।

[সাঈদুল হক ফি তাখরিজে জা’আল হক: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০৫]

যেহেতু তখন ইহুদী নাসারা ও মুশরিকদের কবর ছিল বেশী উঁচু, তাই ভাঙ্গার জন্য রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন- সহীহ বোখারীতে বর্ণিত আছে-

امر النبى صلى الله عليه وسلم بقبور المشركين فنبثت

অর্থাৎ নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মুশরিকদের কবরের ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন অতঃপর তা ভেঙ্গে খনন করে ফেলে দেয়া হয়েছে। [বোখারী শরীফ: ১ম খণ্ড, ৬১ পৃষ্ঠা]

এর ব্যাখ্যায় শেখুল ইসলাম হাফেজুল হাদিস ইবনে হাজর আল্ আসাকালানী বলেন-

اى دون غيرها من قبورالانبياء واتباعهم لما فى ذالك اهانة لهم-

অর্থাৎ আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাদের অনুসারীদের কবর ব্যতীত। কারণ তাদের কবর ভাঙ্গার ও খনন করার মধ্যে তাদের প্রতি অসম্মান হবে।

[ফতহুল বারী শরহে সহীহ বোখারী: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২৪]

তিনি আরো বলেন-

وفى الحديث جواز تصرف فى المقبرة المملوكة وجواز تبش قبور الدراسة اذا لم يكن محرمة-

অর্থ: এই হাদিসে এ কথার উপর দলিল যে, মালিকানাধীন কবরস্থানে লেনদেন করা এবং পুরাতন কবর উচ্ছেদ করা বৈধ। তবে শর্ত হল তা যেন সম্মানিত না হয়। অর্থাৎ সম্মানিত কোন অলী বুযর্গের কবর হলে তা সরানো বৈধ হবে না।

[ফতহুল বারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫২৪]

বুখারী শরীফের উক্ত হাদিস এবং তার ব্যাখ্যাই প্রশ্নে উল্লেখিত হাদিসের আসল ব্যাখ্যা। অর্থাৎ হযরত মাওলা আলী শেরে খোদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক হাদিসে কাফির ও মুশরিকদের কবরকে মাটির সাথে সমান করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয়ত অন্য হাদিসে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তখনকার কবরের সাথে ছবি আকার কথা ও ইরশাদ করেছেন অথচ মুসলমানদের কবরে কোন ছবি থাকে না। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, প্রশ্নোল্লেখিত হাদিসে মুশরিকদের কবরের কথাই বলা হয়েছে। কারণ তাদের সম্মানিত পূর্ব পুরুষদের কবরে ছবি তথা মূর্তি থাকত। এবং মুশরিকরা এগুলোর পূজা করত। তাই রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কবরকে ভেঙ্গে সমান করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। যা পরে মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু একই নির্দেশ দিয়েছেন।

তৃতীয়ত: প্রশ্নোল্লেখিত হাদিসে কবরকে মাটির সাথে সমান করার কথা বলা হয়েছে, অথচ মুসলমানদের কবরের ক্ষেত্রে সুন্নাত হল জমিন হতে কবর এক হাত অথবা এক বিঘত পরিমাণ উঁচু করা। মুসলমানদের কবরকে একদম মাটির সাথে সমান করা সুন্নাতের খিলাফ ও পরিপন্থি। সুতরাং বুঝা যায় উক্ত হাদিসে মুশরিক ও কাফিরদের কবরকে বুঝানো হয়েছে। বরং ‘মুনতাকা শরহে মুয়াত্তায়’ এবং ইমাম কাসানী হানাফীর ‘আলবাদায়ে ওয়াচ্ ছানায়ে’ এর বর্ণনায় দেখা যায় যে, প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত জয়নব বিনতে জাহাশ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা-এর কবরের উপর হযরত উম্মুল মুমেনীন আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা স্বীয় ভাই হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবি বকরের কবরের উপর এবং হযরত মুহাম্মদ বিন হানাফিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাসের কবর শরীফের উপর কুব্বা তথা গম্বুজ বানিয়েছেন।

যদি কোন মুসলমানের কবর উঁচু করে বানানো হয় তখনো তা ভাঙ্গা যাবে না। কারণ এতে মুসলমানের অসম্মান হবে। তবে প্রথম থেকে কবরকে উঁচু না করা উচিত।

উল্লেখ্য, যে সকল মুসলমানের কবর এক বিঘতের চেয়ে বেশি বানানো হয়েছে তা আর ভাঙ্গা যাবে না। তা যেমন আছে তেমন থাকবে। যেমন: ক্বোরআন শরীফ ছোট আকারে ছাপানো নিষেধ কিন্তু ছাপানো হয়ে গেলে তা ফেলে দেয়া কিংবা আগুনে পুড়ে ফেলা যাবে না। কেননা এতে পবিত্র ক্বোরআনের অবমাননা হবে। আর নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত মুসলমানদের কবরের উপর বসা, পায়খানা করা, ক্ষেত-খামার করা এবং জুতা নিয়ে চলা-ফেরা করা সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ এবং তা মুসলমানের কবরের প্রতি অবমাননা। সুতরাং মুসলমানের উঁচু কবর ভেঙ্গে সমান করা অবমাননা ও চরম অপরাধ।

উল্লেখ্য, প্রখ্যাত আউলিয়ায়ে কেরাম ও বিশিষ্ট হক্কানী ওলামায়ে এজামের সম্মানার্থে, জিয়ারতকারীদের জিয়ারত, ফাতেহাপাঠ ও ক্বোরআন তেলাওয়াতের সুবিধার্থে এবং সাধারণ মানুষের অন্তরে তাদের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা সৃষ্টির নিমিত্তে তাঁদের কবরে ঘর/ইমারত ও গম্বুজ নির্মাণ করাকে সলফে সালেহীন বিশেষত মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, শেখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত ইসমাইল হক্কী হানাফী রহমাতুল্লাহি আলায়হি সহ আরো অনেক মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ জায়েয ও মুবাহ বলে ফতোয়া প্রদান করেছেন। সুতরাং যে সমস্ত খারেজী, ওহাবী ও আহলে হাদীসের মওলভীরা উল্লেখিত হাদিসের আলোকে বিশেষত অলি-আবদালের গুম্বুজ ও ইমারত বিশিষ্ট মাজার ও কবর শরীফ সম্পর্কে বাজে মন্তব্য কটূক্তি ও বেয়াদবী করে মূলত তারা উক্ত হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

[তাফসীরে রুহুল বয়ান: তৃতীয় খণ্ড, কৃত হযরত ইসমাঈল হক্কী রহ., মেরকাত শরহে মিশকাত- কিতাবুল জানায়েয, দাফনুল মাইয়্যিত অধ্যায়: কৃত মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী রহ., শেখ আবদুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভীর শরহে সফরুস্ সা’দাত, জা-আল হক্ব: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৫- ২৮৬, কৃত: মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহ., সাঈদুল হক ফি তাখরিজে জা-আল হক্ব: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬০৫, আমার রচিত বাগে খলিল: ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯-৫০, দারুল ইফতা আল্ মিস্রিয়া ইত্যাদি]