হিজরী সাল বা মুসলিম বর্ষপন্জী

Standard

— ইমরান বিন বদরী
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ
পাঠকমণ্ডী, মুসলিম হিসেবে হিজরী নববর্ষ উদযাপন কিংবা মুসলিমদের গৌরবের দিনটি পালনের ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে ব্যাপকতা লাভ করেনি। আমরা অনেকেই জানি না যে মুসলিমদের নববর্ষ কোন্ মাসে হয়? আবার কেউ হয়তবা হিজরীবর্ষ গণনার সঠিক ইতিহাসও জানেন না। হিজরী সালের তারিখের খবরও রাখেন না। এর প্রতি মানুষ আকর্ষণও অনুভব করেন না। তা খুব দুঃখজনক। আর আমরা যারা মুসলমান আমাদের হিজরী সাল সম্পর্কে জানাটা অত্যাবশ্যক। আর সেই লক্ষেই আজ আমার এই লেখা। আশা করি লেখাটি বিস্তারিত পড়ে দেখবেন।

আল্লাহ পাক তাঁর ইবাদতের জন্যে যেমন মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তাদের হিদায়াতের জন্যে যুগে যুগে নবী ও রাসূলবৃন্দ (আ:)-কেও প্রেরণ করেছেন। তাঁরা নিজেদের সকল চেষ্টা, শ্রম ও সাধনা এ পথে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। দিন-রাত মানুষকে আহ্বান করেছেন আল্লাহর পথে। কিন্তু খুব কম লোকই নবী রাসূল (আ:)-বৃন্দের হক্বের দাওয়াতকে কবুল করেছে। অধিকাংশ লোক তাঁদের দাওয়াতকে অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আল্লাহর এই প্রিয় বান্দাদেরকে নানাভাবে অত্যাচার ও নিপীড়ন করেছে। তাঁদের ইবাদতে-দাওয়াতে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। তাঁদেরকে মাতৃভূমি থেকে উৎখাত করার, এমনকি হত্যা করার চক্রান্তও করা হয়েছে।
যেমন, কুরাইশদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ জাল্লা শানুহু জানান,

وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُواْ لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللّهُ وَاللّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
এবং হে মাহবূব, স্মরণ করুন, যখন কাফির (গোষ্ঠী) আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলো যে আপনাকে বন্দি করে রাখবে কিংবা শহীদ করবে অথবা নির্বাসিত করবে এবং তারা নিজেদের মতো ষড়যন্ত্র করছিলো; আর আল্লাহ নিজের গোপন কৌশল (প্রয়োগ) করছিলেন; এবং আল্লাহর গোপন কৌশল সর্বাপেক্ষা উত্তম। (সূরা আনফাল: ৩০; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’)

কাফিরদের এসব গর্হিত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের ফলে একদিকে যেমন তারা আল্লাহর কঠিন আযাবের উপযুক্ত হয়ে যেতো, অন্যদিকে এতে এই সকল নবী (আ:)-দের জীবনে আল্লাহর রাহে কুরবানী, সবর ও মহাব্বতের কঠিন পরীক্ষাও হয়ে যেতো। এহেন কঠিন পরিস্থিতিতেই তাঁদের জীবনে নেমে আসতো হিজরতের খোদায়ী বা ঐশী আদেশ।

হিজরী একটি চন্দ্রনির্ভর বর্ষপঞ্জি। এটি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে। আর পৃথিবীব্যাপী মুসলমান সমাজ তা অনুসরণ করেন ইসলামের পবিত্র দিনসমূহ উদযাপনের উদ্দেশ্যে। ৬২২ খ্রীষ্টাব্দে আল্লাহর নির্দেশে সাইয়্যেদুল মুরসালীন (নবীকুল সরদার) , সাফিউল মুজনেবিন (পাপী-তাপীর সুপারিশকারী), খাতামুন্ নাবিয়্যীন (সর্বশেষ নবী) আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাথী খোলাফায়ে রাসূল হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহুকে নিয়ে মক্কা থেকে উত্তরে অবস্থিত ইয়াসরিব শহরে (মদীনা মোনাওয়ারায়) হিজরত করেন।

হিজরতের সময় মদীনার সর্বস্তরের জনগণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বাগত জানান এই বলে –

طلع البدر علينا, من سانية البداع ‘তালা আল বাদরু আলাইনা মিন সানিয়াতিল বিদা।
وجب الشكر علينا, ما دعا لله داع ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা,মা দা‘আ লিল্লাহি দা’।
أيها المبعوث فينا, جئت بالأمر المطاع আইয়্যুহাল মাব উসু ফি-না,জি’তা বিল আমরিল মুতা।
جئت شارادا المدينة, مرحبا يا خير داع জি’তা শাররাদ্দাল মাদিনা,মারহাবান ইয়া খাইরা দা।

অর্থাৎ: “পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে আমাদের ওপর, বিদা পাহাড়ের চূড়া থেকে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের পক্ষে ওয়াজিব হয়েছে, আহবানকারীর আল্লাহর প্রতি আহবানের বিনিময়ে। যতোদিন পর্যন্ত আল্লাহর পথের দিকে কোনো একজন আহ্বানকারী থাকবে। আমাদের মাঝে প্রেরিত হে প্রিয়জন! আপনি বাধ্যতামূলক আনুগত্যের নির্দেশনা নিয়ে এসেছেন, এসেছেন অকল্যাণসমূহ দূর করতে। শুভেচ্ছা-স্বাগতম! হে সর্বোত্তম পথের প্রতি আহ্বানকারী।” এ কথা বলে বলে তাঁরা অভ্যর্থনা ঞ্জাপন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মভূমি ত্যাগ করার ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যেই এ ঘটনাকে ইসলামে ‘হিজরত’ আখ্যা দেয়া হয় বা হিজরী সাল গণনার সূচনা হয়। হিজরতের ১৭তম বর্ষে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু‘র শাসনামলে চন্দ্র মাসের হিসেবে এই পঞ্জিকা প্রবর্তন করা হয়। হিজরতের এই ঐতিহাসিক তাৎপর্যের ফলেই হযরত ওমর রাদিআল্লাহু আনহু’র শাসনামলে যখন মুসলমানদের জন্যে পৃথক ও স্বতন্ত্র পঞ্জিকা প্রণয়নের কথা ওঠে আসে, তখন তাঁরা সর্বসম্মতভবে হিজরত থেকেই এই পঞ্জিকার গণনা শুরু করেন, যার ফলে চাঁদের মাসের এই পঞ্জিকাকে বলা হয় ‘হিজরী সাল’।
ইসলামে রমযানের রোযা, ঈদ, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে চন্দ্রবর্ষ বা হিজরী সাল ধরেই আমল করতে হয়। রোযা রাখতে হয় চাঁদ দেখে, ঈদ করতে হয় চাঁদ দেখে। এভাবে অন্যান্য আমলও। অর্থাৎ, আমাদের ধর্মীয় কতোগুলো দিন-তারিখের হিসেব-নিকেশের ক্ষেত্র রয়েছে, সেগুলোতে চাঁদের হিসেবে দিন, তারিখ, মাস ও বছর হিসেব করা আবশ্যক। মুসলমানদের (আমাদের) জন্যে ‘হিজরী সাল’ অনুসরণ করা জরুরি।

কুরআন মজীদে হজ্বের বিষয়কে চাঁদের ওপর নির্ভরশীল ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন –

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الأهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ – আপনার কাছে তারা জিজ্ঞেস করে নতুন চাঁদের বিষয়ে। বলে দিন যে এটি মানুষের জন্যে সময় নির্ধারণ এবং হজ্বের সময় ঠিক করার মাধ্যম। (সূরা বাকারা: ১৮৯)

রোযার বিষয়কে চাঁদের ওপর নির্ভরশীল ঘোষণা করা হয়েছে। সূরা বাক্বারাহ আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন –
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ – রমযান মাস-ই হলো সে মাস, যা’তে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্যে হেদায়েত এবং সত্য-পথযাত্রীদের জন্যে সুষ্পষ্ট পথনির্দেশ, আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্যবিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। (সূরা বাক্বারাহ: ১৮৫)

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো। (সহীহ বুখারী: ১৯০৯)
হিজরী মাসের নামসমূহ নিম্নরূপ:
মুহররম محرّم
সফর صفر
রবিউল আউয়াল ربيع الأول
রবিউস সানি ربيع الآخر أو ربيع الثاني
জমাদিউল আউয়াল جمادى الأول
জমাদিউস সানি جمادى الآخر أو جمادى الثاني
রজব رجب
শা’বান شعبان
রমজান رمضان
শাওয়াল شوّال
জ্বিলকদ ذو القعدة
জ্বিলহজ্জ ذو الحجة
পাঠকমণ্ডলী, আমাদের উচিত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের তাৎপর্য স্পষ্টভাবে জনসম্মুখে তুলে ধরা এবং হিজরী সাল অনুসরণ করা। আপনারা সবাই মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।

                                                                 *সমাপ্ত*

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s