হযরত আমীরে মুয়াবিয়া(রাঃ) জান্নাতী

Standard

image

হযরত আমীরে মুয়াবিয়া (রদি:) যে জান্নাতী তার
প্রমাণ দিলাম
*******★******★******★********
**★*****★****
হযরত উম্মে হিরাম রাসূল (দ:) থেকে বর্ণনা
করেন,১ দিন রাসূল ( দ:) আমার ঘরে আরাম
করতেছিলেন।হঠাৎ তিনি স্বপ্নে হেসে ওঠলে
তাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেল।আমি হাসির কারন জিজ্ঞেস
করলাম।তখন রাসূল (দ:) বললেন,আমি স্বপ্নে
দেখতে পেলাম রাজা-বাদশাহরা যেমন জাঁক-জমক
পূর্ণ অবস্থায় সিংহাসনে বসে থাকে,ঠিক তেমনি
আমার উম্মতের লোকেরা জাহাজের উপড়
আরোহন করে যুদ্ধ করতেছে।এতে যে দলটি
সর্বপ্রথম জিহাদের উদ্দেশ্যে সফর
করবে,তাদের উপড় জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেল।এ
কথা শুনে আমি আরজ করলাম,হে আল্লাহর রাসূল
(দ:)! আপনি দোয়া করুন যেন আমি ওই দলে
অন্তর্ভূক্ত হই।রাসূল (দ:) বললেন,তুমি ও ওই
দলের অন্তর্ভূক্ত।
অত:পর তিনি বিশ্রাম করলেন আবার হেসে ঘুম
থেকে জেগে ওঠলেন।এবার ও আমি হাসির কারণ
জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন:যে দলটি সর্বপ্রথম
কনষ্টান্টিয়ার বাদশাহর সাথে যুদ্ধ করবে তাদের গুনাহ
ক্ষমা করা হল।
উক্ত ভবিষ্যত বাণীতে ৩ টি বিষয় উল্লেখ করা
হল:-
১/সমুদ্র পথে জিহাদ তথা মুসলিম নৌ বাহিনী স্থাপন।
২/ঐ বাহিনীতে উম্মে হিরামের অংশগ্রহন।
৩/রোম সম্রাটের রাজধানী
কনষ্টান্টিনোপলের উপড় আক্রমণ।
হযরত উসমান গণি (রদি:) এর আমলে ঐ জিহাদ
অনুষ্টিত হয়।ইসলামের ইতিহাসে এই প্রথম নৌ
অভিযাএীর দলের সেনাপতি ছিলেন হযরত
আমীরে মুয়াবিয়া (রদি:)।
এই যুদ্ধে উম্মে হিরাম ও অংশগ্রহণ করেন।সফর
শেষে যখন তীরে আরোহন করেন,তখন
সাওয়ারী হতে পড়ে গিয়ে শাহাদাত বরণ করেন।।
……সূএ-ফতেহুল বারী..সহীহ
বোখারী,হাদীস নং-৬৫৩০….
আরো হাদিছ দেখুন-
এক,
__________________________
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত মুয়াবিয়া
রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্য দোয়া করেছেন এ
বলে,
হে আল্লাহ, তুমি তাকে (মুয়াবিয়া) পথ প্রদর্শক এবং
সঠিক পথপ্রাপ্ত বানিয়ে দাও এবং তার দ্বারা
(অন্যদেরকে) হেদায়াত কর।
রেফারেন্সঃ
সুনানুত তিরমিযি- ৩৮৪২
হাদীসটি সহীহ।
দুই,
________________________
হযরত ইরবাদ বিন সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামকে বলতে শুনেছি,
হে আল্লাহ, তুমি মুয়াবিয়াকে কোর’আন এবং হিসাব
নিকাশের শিক্ষা দাও এবং তাকে (জাহান্নামের) আযাব
থেকে রক্ষা কর।
রেফারেন্সঃ
মুসনাদ আহমাদ-১৭২০২
হাদীসটি সহীহ।
তিন,
___________________________
বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুল্লাহ বিন মুবারক (রাহ) কে
জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মুয়াবিয়া বিন আবী সুফিয়ান (রাঃ)
এবং উমার বিন আব্দুল আযীয (রাহ) এর মধ্যে কে
উত্তম?
তিনি জবাবে বললেন,
আল্লাহর কসম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লামের সাথে চলতে গিয়ে হযরত মুয়াবিয়া
রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাকের ভিতর যে ধুলা ঢুকেছিল,
সে ধুলা উমার বিন আব্দিল আযীয থেকে হাজার
বার উত্তম। এই সেই মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু যিনি
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পিছনে সালাত
আদায় করেছিলেন। যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, সামি’আল্লাহু লিমান হামিদাহ,
তখন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু (পেছন থেকে)
বলেছিলেন, রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ।
এরপর আর কী কথা থাকতে পারে?
রেফারেন্সঃ
ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ান লি ইবনি খাল্লিকান-৩/৩৩
চার,
___________________________
জাররাহ আল মুসিলী বলেন, আমি এক লোককে
বিশ্ববিখ্যাত ইমাম হাফিযুল হাদীস মু’আফী বিন
ইমরান (রাহ)কে জিজ্ঞাসা করতে শুনেছি, মুয়াবিয়া
বিন আবী সুফিয়ানের তুলনায় উমার বিন আব্দিল
আযীযের অবস্থান কোথায়?
আমি তখন মুয়াফী বিন ইমরান (রাহ)কে প্রচন্ড
ভাবে রেগে উঠতে দেখেছি। তিনি রাগতঃ
স্বরে বলেছিলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের সাথে কারো তুলনা
করা যাবেনা। মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন তাঁর
(রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) লেখক,
সাহাবী এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ওহীর
আমানতদার।
রেফারেন্সঃ
আশ শারী’আহ লিল আজিরী – ৫/২৪৬৬-২৪৬৭

Advertisements

সুন্নাহ ভিত্তিক তাসাউফের স্থান

Standard

সুন্নাহ-ভিত্তিক ইসলামে তাসাউফের স্থান
মূল: শায়খ নূহ হা মিম কেলার (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন
[Bengali translation of Shaykh Nuh Ha Mim Keller’s Online article “The Place of Tasawwuf in Traditional Islam”]
উৎসর্গ: পীর ও মোর্শেদ সৈয়্যদ মওলানা শাহ সূফী এ, জেড, এম, সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-কাদেরী আল-চিশ্তী (রহ:)-এর পুণ্যস্মৃতিতে………।

বর্তমান যুগে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সঠিকভাবে জ্ঞান অর্জন করার সম্ভবতঃ সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জ হচ্ছে সুন্নীপন্থী তথা ঐতিহ্যবাহী ইসলামী উলামাবৃন্দের অভাব। এ বিষয়ে ইমাম বোখারী (রহ:) সহীহ সনদে বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর একখানা হাদীস, যা’তে তিনি এরশাদ ফরমান:

“নিশ্চয় আল্লাহতা’লা ঐশী জ্ঞান তাঁর বান্দাদের কাছ থেকে অপসারণ করেন না, বরঞ্চ তা অপসারণ করেন ইসলামী উলামাবৃন্দের রূহ (আত্মা)-গুলোকে ফিরিয়ে নিয়ে (বেসালপ্রাপ্তিতে), যতোক্ষণ একজন আলেম-ও আর অবশিষ্ট না থাকেন; এমতাবস্থায় লোকেরা অজ্ঞ-মূর্খদেরকে তাদের (ধর্মীয়) ইমাম মেনে নেয়, যাদেরকে প্রশ্ন করা হলে না জেনেই ধর্মীয় বিষয়ে তারা ফতোওয়া দেয়; ফলে তারা নিজেরাও গোমরাহ-পথভ্রষ্ট হয়, মানুষকেও পথভ্রষ্ট করে।”  [‘ফাতহুল বারী, ১:১৯৪; হাদীস নং ১০০]

ওপরোক্ত হাদীসে বর্ণিত প্রক্রিয়াটি এখনো সম্পন্ন হয়নি, তবে নিশ্চিতভাবে তার সূচনা হয়েছে। আর আমাদের এ জমানায় সুন্নীপন্থী উলামাবৃন্দের ঘাটতি, চাই তা ইসলামী বিধি-বিধান (ফেকাহ) ও হাদীস (মহানবীর বাণী) শাস্ত্রেই হোক, অথবা তাফসীর (কুরঅান ব্যাখ্যাকারক) শাস্ত্রেই হোক, তা ধর্ম সম্পর্কে এমনই এক বোধ জাগিয়ে তুলেছে যা এতদসংক্রান্ত বিষয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণতা হতে বহু বহু দূরে, এবং কখনো কখনো সত্য হতেও বহু দূরে। উদাহরণস্বরূপ, আমি ইসলামী বিধি-বিধান (ফেকাহ)-বিষয়ক জ্ঞানার্জনকালে প্রাচ্যবিশারদ ও মুসলিম-সংস্কারক লেখনীসমূহ হতে প্রাথমিক ধারণা যেটি পাই, তাতে মনে হয়েছিল মযহাবের ইমাম-মণ্ডলী বুঝি ইসলামী সুন্নাহ’র সম্পূর্ণ বাইরের এক ঝাঁক নিয়মকানুন নিয়ে এসে কোনো না কোনোভাবে মুসলমানদের ওপর তা চাপিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন আমি মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নীপন্থী উলামাবৃন্দের সাথে বসে বিস্তারিত জানতে চাইলাম, তখনই আমি কুরআন ও সুন্নাহ হতে আইনকানুন বের করার ভিত্তি সম্পর্কে জানতে পেরে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ফিরলাম।

অনুরূপভাবে, ‘তাসাউফের’ ক্ষেত্রেও এই শাস্ত্রের উলামাবৃন্দের সাথে আমার বৈঠকে আমি পশ্চিমা বিশ্বে যা দেখতে পেয়েছিলাম, তার থেকে ভিন্ন একটি চিত্রের দেখা পেয়েছি। আজ রাতে আমার এ প্রভাষণে ইনশা’আল্লাহতা’লা আল-কুরঅান ও সহীহ হাদীস হতে এবং সিরিয়া ও জর্দানের প্রকৃত তাসাউফ-শিক্ষকদের কাছ থেকে এতদসংক্রান্ত জ্ঞান ব্যাখ্যা করা হবে; এটি এ বিবেচনায় যে আমাদেরকে গতানুগতিক ধারণার ঊর্ধ্বে ওঠা প্রয়োজন, আর ইসলামী উৎসগুলো হতে বাস্তব তথ্য জানা দরকার, যাতে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর জানা যায় যে তাসাউফ কোত্থেকে এসেছে? দ্বীন-ইসলামে এর ভূমিকা কী? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এ জ্ঞান সম্পর্কে আল্লাহতা’লারই বা হুকুম কী?

‘তাসাউফ’ শব্দটির উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য অনেক ইসলামী বিদ্যাশাস্ত্রের মতোই এর নামটি প্রথম মুসলিম প্রজন্মের কাছে ছিল অপরিচিত। ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তাঁর ‘মোকাদ্দেমা’ গ্রন্থে এ বিষয়ে উল্লেখ করেন:

এই জ্ঞান ইসলামী ঐশী বিধানেরই একটি শাখা যার উৎপত্তি উম্মতের মধ্য হতে হয়েছে। সূচনালগ্ন হতেই এ ধরনের পুণ্যাত্মাবৃন্দের পথকেও সত্য ও হেদায়াতের রাস্তা, সাহাবা-এ-কেরাম (রা:), তাঁদের দ্বারা প্রশিক্ষিত তাবেঈন ও তৎপরবর্তী সময়ে আগত তাবে’ তাবেঈনের তরীকাহ হিসেবে বিবেচনা করতেন প্রাথমিক যুগের মুসলমান সমাজ ও বিশিষ্টজনেরা।

এটি মূলতঃ এবাদত-বন্দেগীতে নিবেদিত হওয়া, মহান আল্লাহতা’লার প্রতি পূর্ণ উৎসর্গিত থাকা, দুনিয়ার তাবৎ চাকচিক্য হতে নির্মোহ হওয়া, অধিকাংশ মানুষের অন্বেষিত আনন্দ-বিনোদন, ধনসম্পদ ও সুখ্যাতি  পরিহার করা, অন্যদের থেকে দূরে সরে একাকী এবাদত-বন্দেগী পালন ইত্যাদি রীতিনীতির সমষ্টি। এই ছিল মহানবী (দ:)-এর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) এবং প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের আচরিত সাধারণ/সার্বিক রীতি। কিন্তু ইসলামী দ্বিতীয় শতক হতে তৎপরবর্তী যুগগুলোতে মানুষের মাঝে যখন দুনিয়াবী মোহ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যাঁরা এবাদত-বন্দেগীতে উৎসর্গিত হন তাঁদেরকে ‘সুফিয়্যা’ বা ‘মোতাসাউয়ীফ’ (তাসাউফপন্থী আলেম) নামে ডাকা হতো। [ইবনে খালদুন কৃত ‘আল-মোকাদ্দেমা’; মক্কা দারুল বা’য কর্তৃক পুনর্মুদ্রিত ১৩৯৭ হিজরী/১৯৭৮ খৃষ্টাব্দ; ৪৬৭ পৃষ্ঠা]

ইবনে খালদুনের ভাষ্যমতে, “মহান আল্লাহতা’লার প্রতি পূর্ণ উৎসর্গিত থাকা” মর্মে ‘তাসাউফের’ সারকথা ছিল “মহানবী (দ:)-এর সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) এবং প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের আচরিত সাধারণ/সার্বিক রীতি।” অতএব, এ পদটি প্রাথমিক যুগে অস্তিত্বশীল না থাকলেও আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে ইসলামী অনেক বিদ্যাশাস্ত্রের ক্ষেত্রে একই অবস্থা বিদ্যমান ছিল; যেমন ‘তাফসীর’ (কুরআন-ব্যাখ্যামূলক জ্ঞান), কিংবা ‘এলম আল-জারহ ওয়া তা’দিল’ (হাদীস বর্ণনাকারীদের গ্রহণযোগ্যতায় প্রভাব বিস্তারকারক ইতিবাচক ও নেতিবাচক উপাদানসমূহ), অথবা ‘এলম আত্ তাওহীদ’ (ইসলামী আকীদা-বিশ্বাসসংক্রান্ত জ্ঞান)। এসব জ্ঞানের শাখার সবগুলোই যে ধর্মের সঠিক সংরক্ষণ ও প্রসারে সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করেছে, তা আজ সপ্রমাণিত।

‘তাসাউফ’ শব্দটির উৎস হয়তো ‘সূফী’ শব্দ হতে, যা ওই পুণ্যাত্মাবৃন্দকে বোঝায় যাঁরা তাসাউফ অর্জন করেছেন। সূফী শব্দটির উৎপত্তি তাসাউফেরও আগে। কেননা, ইমাম হাসান বসরী (রহ:) যিনি ১১০ হিজরী সালে বেসালপ্রাপ্ত হন, তাঁর বক্তব্যে উভয় পদের মধ্যে সূফী শব্দটির উল্লেখ সর্বপ্রথম পাওয়া যায়। বর্ণিত আছে যে তিনি বলেন, “আমি এক সূফীকে কা’বা শরীফ তাওয়াফ করতে দেখে তাঁকে এক দিরহাম দিতে চাই। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি।” অতএব, তাসাউফকে বুঝতে হলে সূফী কী তা জানতে চেষ্টা করাই মনে হয় সমীচীন হবে। আর হয়তো সূফী ও তাঁর পথ (তাসাউফ-তরীকত), যা এই বিদ্যাশাস্ত্রের বুযূর্গবৃন্দ বেশির ভাগ সময়ই উল্লেখ করে থাকেন, তার সবচেয়ে যথাযথ সংজ্ঞাটি পাওয়া যায় মহানবী (দ:)-এর সুন্নাহ থেকে, যা’তে তিনি এরশাদ ফরমান:

আল্লাহ পাক বলেন, “যে ব্যক্তি আমার ওলী (বন্ধু)-এর প্রতি শত্রুতাভাব পোষণ করে, তার বিরুদ্ধে আমি (অাল্লাহ) যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার বান্দা আমার সান্নিধ্য অন্বেষণ করে আমারই পছন্দকৃত ফরয এবাদতের মাধ্যমে; অতঃপর সে আমার সান্নিধ্য লাভ করে নফল (তরীকতের রেয়াযত তথা সাধনা) এবাদত-বন্দেগী দ্বারা, যতোক্ষণ না আমি তাকে ভালোবাসি। আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, আমি তার শ্রবণশক্তি হই যা দ্বারা সে শোনে; তার দৃষ্টিশক্তি হই যা দ্বারা সে দেখে; তার হাত হই যা দ্বারা সে কাজ করে; তার পা হই যা দ্বারা সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করলে নিশ্চয় (তৎক্ষণাৎ) আমি তা মঞ্জুর করি; সে আমার কাছে আশ্রয় চাইলে আমি তাকে রক্ষা করি।” [ফাতহুল বারী, ১১:৩৪০-৪১, হাদীস নং ৬৫০২]

ওপরের এ হাদীসে কুদসী বর্ণনা করেছেন সর্ব-ইমাম বোখারী (রহ:), আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ:), আল-বায়হাকী (রহ:) ও অন্যান্য আলেম-উলেমা, যা একাধিক কাছাকাছি এসনাদ দ্বারা সহীহ প্রমাণিত। এ রেওয়ায়াত বা বর্ণনাটি তাসাউফের মৌলিক বাস্তবতা প্রকাশ করে, যা নির্ভুলভাবে বোঝায় ‘পরিবর্তন’; যে পরিবর্তনের পথকে সুন্নাহ’র সাথে সঙ্গতি রেখে ব্যাখ্যা করতে যেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মাশায়েখবৃন্দ সূফী’র সংজ্ঞা হিসেবে বলেন, “ফাকিহুন ‘আমিলা বি ’ইলমিহী ফা আওরাসাহু-আল্লাহু ‘ইলমা মা লাম এয়া’লাম” – অর্থাৎ, “শরয়ী বিধানে জ্ঞানী পুণ্যাত্মা যিনি যা জানেন তা-ই অনুশীলন করেছেন; অতঃপর আল্লাহ তাঁকে এরই ফলশ্রুতিস্বরূপ দান করেছেন এমন জ্ঞান যা তিনি জানতেন না।”

স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে বল্লে সূফী হচ্ছেন দ্বীনী জ্ঞানে আলেম-(এ-হক্কানী/রব্বানী)-বৃন্দ। কেননা ওপরের হাদীসে কুদসীটি ঘোষণা করে, “আমার বান্দা আমার সান্নিধ্য অন্বেষণ করে আমারই পছন্দকৃত ফরয এবাদতের মাধ্যমে”; জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমেই কেবল সূফী আল্লাহর আদেশ বা যা ফরয করা হয়েছে সে সম্পর্কে জানতে পারেন; তিনি যা জানেন তা-ই অনুশীলন বা প্রয়োগ করেন, কারণ হাদীসে কুদসীটি আরও বলে তিনি ফরয এবাদতের মাধ্যমে কেবল আল্লাহর সান্নিধ্য অন্বেষণ করেন না, বরং “সে আমার সান্নিধ্য লাভ করে নফল (তরীকতের রেয়াযত তথা সাধনা) এবাদত-বন্দেগী দ্বারা, যতোক্ষণ না আমি তাকে ভালোবাসি।” আর এরই প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহতা’লা তাঁকে এমন জ্ঞান মঞ্জুর করেন যা তিনি জানতেন না। কেননা হাদীসে কুদসীটি আরও বলে, “আর আমি যখন তাকে ভালোবাসি, আমি তার শ্রবণশক্তি হই যা দ্বারা সে শোনে; তার দৃষ্টিশক্তি হই যা দ্বারা সে দেখে; তার হাত হই যা দ্বারা সে কাজ করে; তার পা হই যা দ্বারা সে চলাফেরা করে।” এটি আসলে ‘তাওহীদ’ বা আল্লাহর একত্ব-সম্পর্কিত পূর্ণ সচেতনতাজ্ঞাপক একখানা রূপক, যেটি শ্রবণ, দর্শন, হাত দ্বারা কর্ম সম্পাদন ও পদচারণার মতো মানুষের কাজের প্রেক্ষিতে আল্লাহ সম্পর্কে আল-কুরআনে বিবৃত ওই বাণী উপলব্ধির সমষ্টিও, যে বাণী ঘোষণা করে – “অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের কর্মগুলোকেও” [সূরা সোয়াফ-ফাত, ৯৬ আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান (রহ:) কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]

বস্তুতঃ সূফী তরীকার উৎস নিহিত রয়েছে মহানবী (দ:)-এর সুন্নাহ’তে। আল্লাহতা’লার প্রতি একনিষ্ঠ বা নিবেদিত হওয়ার নিয়ম চালু ছিল প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের মধ্যে। তাঁদের কাছে এটি ছিল নামবিহীন এক (আধ্যাত্মিক) অবস্থা। অন্যদিকে, মুসলমান সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ যখন এই (আধ্যাত্মিক) অবস্থা থেকে দূরে সরে যান, তখন-ই এটি একটি স্বতন্ত্র বিদ্যাশাস্ত্রে পরিণত হয়। এমতাবস্থায় পরবর্তী মুসলিম প্রজন্মগুলোর দ্বারা এ বিদ্যার্জনের জন্যে প্রয়োজন পড়ে এক পদ্ধতিগত প্রয়াসের। অধিকন্তু, প্রাথমিক প্রজন্মগুলোর পরবর্তীকালে ইসলামী পরিবেশে পরিবর্তনের কারণেই তাসাউফ নামের এ বিদ্যাশাস্ত্র অস্তিত্বশীল হয়।

কিন্তু যদি এটি-ই প্রকৃত উৎস হয়, তাহলে আরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায়: ধর্মের কতোখানি মৌলিক বিষয় এ তাসাউফশাস্ত্র? আর সামগ্রিকভাবে এটি  দ্বীন-ইসলামে কোথায় খাপ খায়? সম্ভবতঃ এ প্রশ্নের সেরা উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় মুসলিম শরীফের একটি রেওয়ায়াতে, যা’তে হযরত উমর ফারূক (রা:) বর্ণনা করেন:

“একদিন আমরা নবী করীম (দ:)-এর খেদমতে হাজির ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আমাদের সামনে উপস্থিত হলেন, যাঁর কাপড় ধবধবে সাদা ও চুল গাঢ় কালো ছিল। তাঁর মধ্যে সফরের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিলো না এবং আমাদের কেউ তাঁকে চিনতেও পারছিলাম না। অবশেষে তিনি হুযূর পাক (দ:)-এর কাছে গিয়ে বসলেন এবং নিজের হাঁটুযুগল রাসূল (দ:)-এর বরকতময় হাঁটুযুগলের সাথে লাগিয়ে দিলেন, অার নিজ হাত নিজ উরুর ওপর রাখলেন। অতঃপর (তিনি) আরয করলেন, ‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে বলুন।’ জবাবে নবী করীম (দ:) এরশাদ করলেন, ‘ইসলাম এই যে তুমি এ মর্মে সাক্ষ্য দেবে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মা’বূদ (উপাস্য) নেই এবং মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম আল্লাহর (প্রেরিত) রাসূল বা পয়গম্বর। অতঃপর নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে, রমযানের রোযা রাখবে, পবিত্র কা’বার হজ্জ্ব করবে, যদি সেখানে পৌঁছুতে পারো।’ (ওই ব্যক্তি) আরয করলেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ আমরা তাঁর ব্যাপারে আশ্চর্যান্বিত হলাম এ কারণে যে তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-এর কাছে (প্রশ্ন) জিজ্ঞাসাও করেছেন এবং (এখন উত্তরের) সত্যায়নও করছেন। তিনি আবার আরয করলেন, ‘আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন।’ হুযূর পাক (দ:) এরশাদ করলেন, ‘আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা-মণ্ডলী, (অাসমানী) কেতাবসমূহ, তাঁর রাসূলবৃন্দ এবং শেষ (বিচার) দিবসে বিশ্বাস করো। আর ভাল-মন্দ তাকদীরে বিশ্বাস করো।’ (ওই ব্যক্তি) আরয করলেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ (তিনি) পুনরায় আরয করলেন, ‘আমাকে এহসান সম্পর্কে বলুন।’ মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমালেন, ‘অাল্লাহর এবাদত (আরাধনা) এভাবে করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তাহলে খেয়াল করো যে তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।’ (ওই ব্যক্তি) আরয করলেন, ‘কেয়ামত সম্পর্কে সংবাদ দিন।’ রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ করলেন, ‘তুমি যাঁর কাছে জিজ্ঞেস করছো, তিনি কেয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারীর চেয়ে অধিক অবগত নন।’ (প্রশ্নকর্তা আবার) আরয করলেন, ‘কেয়ামতের কিছু নিদর্শন সম্পর্কে বলুন।’ এবার হুযূর পাক (দ:) এরশাদ করলেন, ‘দাসী নিজ মালিককে প্রসব করবে, খালি পা, উলঙ্গ শরীরবিশিষ্ট দরিদ্র এবং মেষ-রাখালদেরকে বড় বড় দালানে গর্ব করতে দেখবে।’ (বর্ণনাকারী হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন) অতঃপর ওই প্রশ্নকারী ব্যক্তি চলে গেলেন। আমি সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করলাম। রাসূলুল্লাহ (দ:) আমাকে সম্বোধন করে এরশাদ ফরমালেন, ‘হে উমর! তুমি কি জানো এই প্রশ্নকারী কে?’ আমি আরয করলাম, ‘আল্লাহ ও (তাঁর) রাসূল (দ:)-ই ভাল জানেন।’ তিনি এরশাদ করলেন, ‘তিনি জিবরীল (আ:); তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন’।” [মূল: মুসলিম শরীফ; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘মিরআত শরহে মিশকাত’ ১ম খণ্ড, ১৯ পৃষ্ঠা, ’ঈমান পর্ব’ হতে সংগৃহীত; অনুবাদক: মওলানা এম, এ, মান্নান, চট্টগ্রাম]

এটি সহীহ হাদীস, ইমাম নববী (রহ:) যেটিকে ইসলামের ভিত্তিস্বরূপ হাদীসগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ‘আতাকুম ইউ’আল্লিমুকুম দীনাকুম’ (জিবরীল তোমাদেরকে তোমাদের দ্বীন শেখাতে এসেছিলেন) – এই শেষ বাক্যটি ব্যক্ত করে যে দ্বীন ইসলাম হাদীসটিতে বর্ণিত তিনটি মৌলিক বিষয়ের সমষ্টি: ১/ ইসলাম, অর্থাৎ, আমাদের প্রতি আল্লাহর আদিষ্ট এতায়াত বা আনুগত্য; ২/ ঈমান, অর্থাৎ, আম্বিয়া (আ:) কর্তৃক প্রদত্ত অদৃশ্য বিষয়গুলোর সংবাদে বিশ্বাস স্থাপন; এবং ৩/ এহসান, অর্থাৎ, আল্লাহর এবাদত-বন্দেগী এমনভাবে করা যেন কেউ তাঁকে দেখতে পাচ্ছেন। আল-কুরআনের সূরা মরিয়মে আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন:

“নিশ্চয় আমি অবতীর্ণ করেছি এই কুরআন এবং নিশ্চয় আমি নিজেই সেটির সংরক্ষক।” [আয়াত নং ০৯; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেবের কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]

অতঃপর আমরা যখন আল্লাহতা’লার হেকমত তথা ঐশী জ্ঞান ও কৌশল সম্পর্কে চিন্তা করি এ মর্মে যে তিনি কীভাবে এই কুরআনকে সংরক্ষণ করেছেন, তখন আমরা দেখতে পাই যে (পুণ্যবান) সুন্নী উলেমাবৃন্দ দ্বারা তিনি এটি করেছেন; যাঁদেরকে তিনি (হাদীসটিতে উল্লেখিত) ধর্মের প্রতিটি স্তরে কাজ করতে পাঠিয়েছেন। ইসলামের ক্ষেত্রে শরীয়তের ইমামবৃন্দ (আইম্মায়ে মযাহিব); ঈমানের ক্ষেত্রে আকায়েদের ইমামবৃন্দ; এবং এহসান মানে “অাল্লাহর এবাদত (আরাধনা) এভাবে করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো”, এ বিদ্যার ক্ষেত্রে তাসাউফের ইমামবৃন্দ এ মহান দায়িত্ব পালন করেছেন।

‘আল্লাহর এবাদত করো’ – হাদীসের এ বাণীটি নিজেই (ইসলামের) এই তিনটি মূল বিষয়ের (মানে ইসলাম, ঈমান ও এহসানের) আন্তঃসম্পর্ক আমাদের প্রদর্শন করে থাকে। কেননা, কীভাবে ‘এবাদত-বন্দেগী’ করতে হবে সে সম্পর্কে জানা যায় শুধু দ্বীন-ইসলামের প্রকাশ্য বিধি-বিধান থেকে; পক্ষান্তরে, এই আরাধনার গ্রহণযোগ্যতার পূর্বশর্ত হচ্ছে আল্লাহতা’লা ও ইসলামের ঐশী বিধানের প্রতি ঈমান তথা বিশ্বাস পোষণ, যেটি ছাড়া এবাদত স্রেফ শারীরিক কসরতে পরিণত হবে এবং ফলদায়ক বা গ্রহণযোগ্য হবে না; অপরদিকে, ‘যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছো’ – এ কথাটি স্পষ্ট প্রতীয়মান করে যে এহসান একটি মানবিক পরিবর্তনের সূচনাকারী, কারণ এতে নিহিত রয়েছে এমন-ই এক অভিজ্ঞতা যা আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ সঞ্চয় করেননি। তাই তাসাউফ-শাস্ত্রকে বুঝতে হলে ইসলাম ও ঈমানের প্রেক্ষাপটে এ পরিবর্তনের প্রকৃতিকে আমাদের অবশ্যই পর্যবেক্ষণ করতে হবে; আর আজ রাতে এটি-ই হবে আমার আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।

ইসলামের পর্যায়ে আমরা বলেছিলাম যে ‘খোদায়ী আজ্ঞার প্রতি সমর্পণের’ মাধ্যমে তাসাউফের প্রয়োজন পড়ে দ্বীন-ইসলামকে; কিন্তু ইসলামেরও নিজস্ব প্রয়োজনে একইভাবে তাসাউফকে প্রয়োজন পড়ে। কেন? এটি এই সঙ্গত কারণে যে, মুসলমানদেরকে যে সুন্নাহ অনুসরণের আদেশ দেয়া হয়েছে, তা কেবল মহানবী (দ:)-এর বাণী ও কর্ম-ই নয়, বরং তাতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তাঁর অন্তরের আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা, যেমন তাকওয়া বা খোদাভীরুতা, এখলাস বা নিষ্ঠা, তাওয়াককুল বা আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা, রাহমা বা করুণা, তাওয়াদু বা বিনয় ইত্যাদি গুণাবলী।

অধিকন্তু, ইসলামী নৈতিকতার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মানুষের কর্ম শুধু সঠিক ও ভুল, এ দু’টি ভাগে কিন্তু বিভক্ত নয়। বরঞ্চ তা পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত, যা সেগুলোর পারলৌকিক জগতের ফলাফল মোতাবেক ক্রমানুসারে বিন্যস্ত। ওয়াজীব বা বাধ্যতামূলক আমল পালন পরলোকে আল্লাহতা’লা কর্তৃক পুরস্কৃত হবে, আর তা পালন না করলে শাস্তি পেতে হবে। মানদূব হচ্ছে সেসব আমল যেগুলো অনুশীলন করলে সওয়াব পাওয়া যাবে, না করলে গুনাহ হবে  না। মোবাহ হচ্ছে অনুমতিপ্রাপ্ত, সওয়াব বা শাস্তির সাথে তা (মূলতঃ) সম্পৃক্ত নয়। মাকরূহ বা কটু হচ্ছে সেসব বিষয় যার বর্জনকে পুরস্কৃত করা হবে, কিন্তু চর্চাকে শাস্তি দেয়া হবে না। হারাম (অবৈধ) বিষয়গুলোর বর্জনকে পুরস্কৃত করা হবে এবং চর্চাকে শাস্তি দেয়া হবে, যদি কেউ তা হতে তওবা না করে মারা যান।

কুরআন মজীদ ও হাদীস শরীফ সরলভাবে আমাদের কাছে ব্যক্ত করে যে মানুষের অন্তরের অবস্থা এসব শিরোনামের প্রতিটিরই অন্তর্গত। তবু ফেকাহ বা ঐশী বিধি-বিধানের বইপত্রে এগুলো আলোচিত হয়নি; কেননা নামায, রোযা, যাকা’তের ব্যতিক্রম হিসেবে এগুলো পরিমাপ করা যায় না এ মর্মে যে কতোটুকু পরিমাণ এর অনুশীলন করতে হবে। গণনাযোগ্য না হলেও এগুলো প্রত্যেক মুসলমানের জন্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, কিছু উদাহরণের দিকে তাকানো যাক –

১/ – আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা: আল-কুরঅানের সূরা বাকারায় আল্লাহ পাক তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপনকারীদেরকে দোষারোপ করেন; কারণ এরা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের উপাস্য মূর্তিকে ভালোবাসে। অতঃপর তিনি এরশাদ ফরমান:

“এবং ঈমানদারদের অন্তরে আল্লাহর মতো কারো ভালোবাসা নেই।” [২:১৬৫; তাফসীরে নূরুল এরফান]

এ আয়াতে মহান প্রভু (মুসলমানদের) ঈমানদারির শর্তারোপ করেছেন যে তাঁর চেয়ে বেশি কাউকে ভালোবাসা যাবে না।

২/ – করুণা: আল-বোখারী (রহ:) ও মুসলিম (রহ:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: “যে কেউ মানুষের প্রতি করুণাশীল না হলে আল্লাহ পাক-ও তার প্রতি করুণাশীল হবেন না।” [সহীহ মুসলিম, ৪:১৮০৯; হাদীস নং ২৩১৯] ইমাম তিরমিযী (রহ:)-ও বর্ণনা করেন হাসান সহীহ শ্রেণিভুক্ত একখানি হাদীস – “অভিশপ্ত ছাড়া কারো অন্তর থেকেই করুণা অপসারণ করা হয় না।” [আল-জামেউস্ সহীহ, ৪:৩২৩; হাদীস নং ১৯২৩]

৩/ – পারস্পরিক ভালোবাসা: ইমাম মুসলিম (রহ:) নিজ সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “শপথ আল্লাহর নামে, যাঁর হাতে আমার রূহ (আত্মা)! তোমাদের মধ্যে কেউই বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না যতোক্ষণ না তোমরা ঈমান আনো, আর কেউই তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যতোক্ষণ না তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালোবাসো….” [সহীহ মুসলিম, ১:৭৪; হাদীস নং ৫৪]

৪/ – নামাযে একাগ্রতা: ইমাম আবূ দাউদ (রহ:) নিজ সুনান পুস্তকে বর্ণনা করেন যে হযরত আম্মার ইবনে এয়াসের (রা:) হুযূর পূর নূর (দ:)-কে বলতে শুনেছেন – “নিশ্চয় কোনো মানুষ (দুনিয়া) ত্যাগ করলে তার সালাত/নামাযের এক-দশমাংশ লিপিবদ্ধ হয়ে থাকে; বা এক-নবমাংশ, কিংবা এক-অষ্টমাংশ, অথবা এক-সপ্তমাংশ, বা এক-ষষ্ঠাংশ, কিংবা এক-পঞ্চমাংশ, বা এক-চতুর্থাংশ, অথবা এক-তৃতীয়াংশ, বা অর্ধেক (লিপিবদ্ধ হয়)।” [সুনানে আবি দাউদ, ১:২১১; হাদীস নং ৭৯৬] তার মানে কারো এবাদত-বন্দেগী ততোক্ষণ কবূল হয় না, যতোক্ষণ তিনি আন্তরিকভাবে খোদাতা’লার সামনে হাজির না হন।

৫/ – নবী-প্রেম: ইমাম বোখারী (রহ:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: “তোমাদের মধ্যে কেউই ঈমানদার হতে পারবে না যতোক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, পুত্র ও সকল মানবের চেয়ে বেশি ভালোবাসার পাত্র হই।” [ফাতহুল বারী, ১:৫৮; হাদীস নং ১৫]

ওপরে বর্ণিত এসব দালিলিক প্রমাণ থেকে এটি স্পষ্ট যে করুণা, ভালোবাসা বা অন্তরের একাগ্রতা, এই (আধ্যাত্মিক) অবস্থাগুলোর কোনোটি-ই গাণিতিকভাবে পরিমাপযোগ্য নয়। কেননা, শরীয়ত সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে বলতে পারে না ‘করুণার দুটি একক অনুশীলন করো’, অথবা ‘হুযূরী কলব্ তথা অন্তরের একাগ্রতার তিনটি একক ধারণ করো’, ঠিক যেমনটি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে নামাযের রাক’আতগুলোর বেলায়। তবু এগুলোর প্রতিটি-ই মুসলমানদের জন্যে ব্যক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক। কতিপয় হারাম তথা ‘কঠোরভাবে নিষিদ্ধ’ উদাহরণের দিকে নজর দিয়ে পুরো চিত্রটি এক্ষণে সম্পূর্ণ করা যাক:

১/ – আল্লাহ ভিন্ন কাউকে ভয় করা: আল্লাহতা’লা তাঁর পাক কালামের সূরা বাকারায় এরশাদ করেন:

“এবং আমার অঙ্গীকার পূরণ করো, আমিও তোমাদের অঙ্গীকার পূরণ করবো আর বিশেষ করে আমারই ভয় (অন্তরে) রাখো” [২:৪০; নূরুল এরফান]। আয়াতের শেষ বাক্যটি সম্পর্কে ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী বলেন, “এতে মহান আল্লাহ পাক ছাড়া আর কাউকেই ভয় না পেতে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।” [তাফসীর আল-ফখরুদ্দীন আল-রাযী, ৩:৪২]

২/ – নৈরাশ্য: মহান আল্লাহতা’লা এরশাদ ফরমান:

“নিশ্চয় (কেউই) আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ হয় না, শুধু কাফেররা ছাড়া” [সূরা ইউসূফ, ৮৭]। এতে কুফর তথা অবিশ্বাসের মতো সম্ভাব্য সর্বনিকৃষ্ট (আত্মিক) অবস্থার সাথে অন্তরের এই অবৈধ অবস্থা (নিরাশা)-কে যোগ করার ইঙ্গিত রয়েছে।

৩/ – দম্ভ: ইমাম মুসলিম (রহ:) তাঁর সহীহ গ্রন্থে বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর একটি হাদীস, যা’তে তিনি এরশাদ ফরমান: “কেউই জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাবে না যতোক্ষণ তার অন্তরে এক অণুকণা পরিমাণ অহঙ্কার বিরাজ করবে।” [সহীহ মুসলিম, ১:৯৩; হাদীস নং ৯১]

৪/ – ঈর্ষা: অর্থাৎ, কারো নেয়ামত বা আশীর্বাদপ্রাপ্তিতে হিংসাবশতঃ তার আশীর্বাদের অবসান কামনা করা। ইমাম আবূ দাউদ (রহ:) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “হিংসার ব্যাপারে সতর্ক হও, কেননা তা নেক আমল বিনষ্ট করে, যেমনিভাবে আগুন কাঠকে পুড়িয়ে খাক করে।” [সুনান-এ-আবি দাউদ, ৪:২৭৬; হাদীস নং ৪৯০৩]

৫/ – এবাদত-বন্দেগীর প্রদর্শনী: ইমাম আল-হাকিম (রহ:) সহীহ এসনাদ-সহ বর্ণনা করেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর একখানা হাদীস, যা’তে তিনি এরশাদ ফরমান: “নেক আমলে তথা পুণ্যদায়ক কর্মের অনুশীলনে সামান্যতম প্রদর্শনীর মানে হলো আল্লাহর সাথে অন্যান্য সত্তার অর্চনা করা…..।” [আল-মোস্তাদরাক ‘আলাল-সহিহাইন, ১:৪]

এ ধরনের হারাম আত্মিক অবস্থার বিবরণ ফেকাহ বা ইসলামী বিধি-বিধানের বইপত্রে পাওয়া যায় না, কারণ ফেকাহ-শাস্ত্র শুধু গাণিতিকভাবে পরিমাপযোগ্য ঐশী বিধানেরই বিবরণ দেয়। বরঞ্চ এসব (অবৈধ আত্মিক) অবস্থার কারণ ও সমাধান পাওয়া যায় ‘অন্তঃস্থিত ফেকাহ’ তথা তাসাউফের ইমামবৃন্দেরই বইপত্রে; যেমন – হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযযালী (রহ:)-এর ‘এহইয়াও উলূম-উদ্দীন’(ধর্মীয় জ্ঞানের উজ্জীবন), ইমাম-এ-রব্বানী হযরত আহমদ ফারূকী সেরহিন্দী (রহ:)-এর ‘মকতুবাত’ (পত্রাবলী), সুলতানুল আরেফীন শায়খ শেহাবউদ্দীন সোহরাওয়ার্দী (রহ:)-এর ‘আওয়ারিফুল মা’আরিফ’ (খোদা-জ্ঞানীদের জ্ঞান) ও অনুরূপ কালজয়ী ইসলামী লেখনীসমূহে, যেগুলো অভ্যন্তরীন জীবনের হাজারো নীতিগত প্রশ্ন সম্পর্কে আলোকপাত করে এবং তার সমাধানও দেয়। এসব বইপত্র শরীয়তেরই কেতাবাদি এবং এগুলোতে নিহিত প্রশ্নাবলী ঐশী বিধানসম্পর্কিত বিষয়-ই, যা নির্দেশ করে কোনো মুসলমানের জন্যে কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ আত্মিক অবস্থা অার এ ক্ষেত্রে তাঁর আহওয়াল তথা আধ্যাত্মিক অবস্থা-ই বা কী হবে। অতএব, এসব বই আধ্যাত্মিক অবস্থা-সংক্রান্ত রাসূল (দ:)-এর সুন্নাহ’র অংশকেই সংরক্ষণ করেছে বটে।

এসব তথ্য কাদের জানা প্রয়োজন? বস্তুতঃ সকল মুসলমানেরই জানা প্রয়োজন, কেননা কুরআন মজীদের বিভিন্ন আয়াত ও সহীহ হাদীস শরীফ এ বাস্তবতাকেই কেবল নির্দেশ করে না যে মুসলমানদেরকে কিছু নির্দিষ্ট আমল পালন তথা ধর্মীয় অনুশীলনী চর্চা করতে হবে এবং কিছু নির্দিষ্ট কথা বা বাক্য আওড়াতে হবে, বরং এ-ও নির্দেশ করে যে তাঁদেরকে নির্দিষ্ট উন্নত  আধ্যাত্মিক অবস্থা অর্জন করতে হবে এবং (মন্দ) আত্মিক অবস্থাগুলো দূর করতে হবে। আমরা কি আল্লাহ ভিন্ন আর কাউকে ভয় পাই? আমাদের অন্তরে কি অহঙ্কারের এক অণুকণা-ও বিরাজমান? মহানবী (দ:)-এর প্রতি আমাদের মহব্বত (ভালোবাসা) কি অন্য যে কোনো মানুষের চেয়েও বেশি? আমাদের নেক আমল পালনে কি সামান্যতম প্রদর্শনীও বিদ্যমান?

কোনো মুসলমান ব্যক্তি আধ-মিনিটখানেক আত্মবিশ্লেষণাত্মক চিন্তা করলেই নিজ ধর্মের (ওপরোক্ত) এসব বিষয়ে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হতে সক্ষম হবেন; আর তিনি এ-ও বুঝতে পারবেন কেন ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানদেরকে এসব আধ্যাত্মিক মকাম (পর্যায়) অর্জনে সহায়তা করার কাজ আনাড়ীদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়নি, বরং অন্তর-বিশেষজ্ঞ তথা তাসাউফের উলামাবৃন্দের হাতে তার দায়িত্বভার ন্যস্ত হয়েছিল। বেশির ভাগ মানুষেরই বদ-অভ্যাসগত কারণে, নিজেদের প্রবঞ্চিত করার সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচের দরুন এ পরিবর্তন সাধন সহজ হয় না; তবে সর্বোপরি, আমাদের প্রত্যেকেরই মাঝে বিরাজ করছে এক একগুঁয়ে সত্তা, এক কুপ্রবৃত্তি, যাকে আরবীতে বলা হয় ‘আন্ নাফস্’ এবং যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আল্লাহ পাক সাক্ষ্য দেন সূরা ইউসূফে –

“ইন্নান্-নাফসা লাআম্মা-রাতুম্ বিস্ সূ-ই”; অর্থাৎ, নিশ্চয় (কু)-প্রবৃত্তি তো মন্দকর্মের বড় নির্দেশদাতা। [১২:৫৩; তাফসীরে নুরুল এরফান]

আপনাদের যদি ওপরোক্ত আয়াতে বিশ্বাস না হয়, তাহলে সহীহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হাদীস শরীফটি বিবেচনা করতে পারেন, যা’তে বিবৃত হয়:

পুনরুত্থান দিবসে প্রথম যে ব্যক্তির বিচার করা হবে, সে গযওয়ায় (ধর্মযুদ্ধে) নিহত একজন।

ওই লোককে আল্লাহর সামনে আনা হলে তাকে তিনি তাঁর প্রদত্ত নানা আশীর্বাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন এবং সে তা স্বীকারও করবে। এমতাবস্থায় আল্লাহতা’লা জিজ্ঞেস করবেন, “সেগুলোর ব্যাপারে তুমি কী করেছো?” ওই লোক তখন জবাবে বলবে, “আমি আপনারই খাতিরে যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছি।”

আল্লাহতা’লা প্রত্যুত্তর দেবেন, “তুমি মিথ্যে বলছো। তুমি যুদ্ধ করেছো যাতে বীর বলে তোমার (উচ্চসিত) প্রশংসা করা হয়, আর তা ইতোমধ্যেই করা হয়েছে।” এরপর তাকে দণ্ড দেয়া হবে এবং মুখ থুবড়ে পড়া অবস্থায় টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

অতঃপর আরেক লোককে হাজির করা হবে; সে ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করেছিল, তা অন্যান্যদের শিক্ষাও দিয়েছিল এবং কুরআন তেলাওয়াত-ও করেছিল। আল্লাহ পাক তাকেও তাঁর উপহৃত ঐশী করুণাধারার কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন, আর সে তা স্বীকারও করবে। এরপর মহান প্রভু বলবেন, “সেগুলোর ব্যাপারে তুমি কী করেছো?” লোকটি জবাব দেবে, “আমি আপনারই খাতিরে ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করেছি, তা শিক্ষা দিয়েছি এবং কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করেছি।”

আল্লাহতা’লা বলবেন, “তুমি মিথ্যে বলছো। তুমি জ্ঞানার্জন করেছো যাতে তোমাকে আলেম বলা হয়; কুরআন তেলাওয়াত করেছো যাতে তোমাকে ক্কারী বলা হয়; আর তা ইতোমধ্যেই বলা হয়েছে।” এরপর ওই লোককে দণ্ড দেয়া হবে এবং মুখ থুবড়ে পড়া অবস্থায় টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

এরপর আরেক লোককে সামনে হাজির করা হবে যাকে আল্লাহ পাক নানা ধরনের ধন-সম্পদ দ্বারা আশীর্বাদধন্য করেছিলেন। আল্লাহতা’লা তা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে সে-ও তা স্বীকার করবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ বলবেন, “সেগুলোর ব্যাপারে তুমি কী করেছো?” লোকটি উত্তর দেবে, “আপনি পছন্দ করেন এমন কোনো একটি ব্যয়-ও আমি বাদ রাখিনি, আর তা আপনারই খাতিরে খরচ করেছি।”

এমতাবস্থায় আল্লাহতা’লা বলবেন, “তুমি মিথ্যে বলছো। তুমি তা করেছো যাতে তোমাকে দাতা বলা হয়, আর তা ইতোমধ্যেই বলা হয়েছে।” এরপর ওই লোককে দণ্ড দেয়া হবে এবং মুখ থুবড়ে পড়া অবস্থায় টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [সহীহ মুসলিম শরীফ, ৩:১৫১৪; হাদীস নং ১৯০৫]

এ বিষয়ে আত্মপ্রবঞ্চনার আশ্রয় নেয়া আমাদের উচিত হবে না, কেননা আমাদের তাকদীর বা ভাগ্য এর ওপরই নির্ভর করছে। শৈশবকালে আমাদের পিতামাতা প্রশংসা বা দোষারোপের সময়ে আমরা কীভাবে আচরণ করবো, তা আমাদের শিখিয়েছিলেন; আর এটি আমাদের অধিকাংশেরই কর্ম সংঘটনের পুরো প্রেষণাকে (কোনো একটি খাতে) প্রবাহিত ও রংয়ে রঙ্গীন করেছে। কিন্তু শৈশবশেষে যখন আমরা ইসলামী বিধান জারির বয়সে পৌঁছি, তখন ওপরোক্ত হাদীস শরীফ ও “নেক আমলে তথা পুণ্যদায়ক কর্মের অনুশীলনে সামান্যতম প্রদর্শনীর মানে হলো আল্লাহর সাথে অন্যান্য সত্তার অর্চনা করা” – মহানবী (দ:)-এর উচ্চারিত এ বাণীর দ্বারা ইসলাম ধর্ম আমাদেরকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে অন্যান্যরা যেটিকে ভাল মনে করে তা আমাদের জন্যে যথেষ্ট নয়; আর এ-ও ব্যক্ত করে যে আমাদের প্রেরণার সামগ্রিক পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন; আর এ প্রেরণা অন্য কোনো কিছুর দ্বারা নয়, বরং একমাত্র আল্লাহরই রেযামন্দি হাসিলের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা হওয়া চাই। অতএব, ইসলামী বিধি-বিধান মুসলমানদের জ্ঞাত করে যে তাঁদের চিন্তাভাবনা ও প্রেরণার (চিরাচরিত) অভ্যেসকে পরিত্যাগ করা তাঁদের জন্যে বাধ্যতামূলক, কিন্তু তা কীভাবে করতে হবে সে কথা তাঁদেরকে তা জানায় না। এ বিষয়টি জানতে হলে মুসলমানদেরকে ওইসব আধ্যাত্মিক অবস্থার বিশেষজ্ঞ-উলামা তথা সূফী-দরবেশদের কাছে যেতে হবে, যেমনটি (ঐশী আজ্ঞার মাধ্যমে) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কুরআন মজীদের নিম্নবর্ণিত আয়াতে করীমায়:

“ফাস্আলূ আহলায্ যিকরি ইন্ কুনতুম লা তা’লামূন” – অর্থাৎ, “ওহে মানুষেরা, জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করো যদি তোমাদের জ্ঞান না থাকে।” [সূরা অান্ নাহল্, ৪৩ নং আয়াত; তাফসীরে নূরুল এরফান]

নিঃসন্দেহে এই পরিবর্তন সাধন, অাত্মিক সততা ও নিষ্ঠা অর্জনের মাধ্যমে মুসলমানদেরকে পরিশুদ্ধকরণ হলো মহানবী (দ:)-এর অন্যতম প্রধান কর্তব্য; কেননা আল্লাহ পাক তাঁর কেতাবের সূরা আলে এমরানে ঘোষণা করেন:

“নিশ্চয় আল্লাহর মহা অনুগ্রহ হয়েছে মুসলমানদের প্রতি (এ মর্মে) যে, তাদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের প্রতি তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন এবং তাদেরকে পবিত্র/পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত (তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞান) শিক্ষা দান করেন।” [আল-কুরঅান, ৩:১৬৪, নূরুল এরফান]

ওপরের আয়াতে করীমায় নব্যুয়তের চারটি দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এর দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘ইউযাক্-কিহিম’, যার মানে ‘তাঁদেরকে পবিত্র বা পরিশুদ্ধ করেন’। এর আর অন্য কোনো অর্থ তাফসীরে নেই। অতএব, এ কথাও স্পষ্ট যে চিরস্থায়ী ঐশী বিধানের অংশ হিসেবে এই শিক্ষাদানের কাজটি মুসলমানদের প্রথম প্রজন্ম বেসালপ্রাপ্ত হওয়ার সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়নি, যে বাস্তবতাটি আল্লাহ পাক তাঁর মহাগ্রন্থের সূরা লোকমানে প্রদত্ত ঐশী আজ্ঞায় নিশ্চিত করেছেন:

“ওয়াত্তাবি’ সাবীলা মান্ আনা-বা ইলাইয়্যা” – অর্থাৎ, “আর তারই পথে চলো, যে আমার প্রতি প্রত্যাবর্তন করেছে।” [অাল-কুরআন, ৩১:১৫; নূরুল এরফান]

মুসলমানদের মাঝে যাঁরা ইসলামী বিধিবিধান প্রচার-প্রসার করার কাজে রত, এসব আয়াতে করীমা তাঁদের শিক্ষাদান ও (মুসলমানদের) রূপান্তরে ভূমিকা সম্পর্কে আলোকপাত করে; আর ওপরোল্লিখিত দ্বিতীয় আয়াতটিতে উদ্ধৃত ‘এত্তেবা’ শব্দটি, যেটি অধিকতর সার্বিক, সেটি কোনো (আধ্যাত্মিকতার পাঠদাতা) শিক্ষকের সোহবত তথা সান্নিধ্যে থাকার পাশাপাশি তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ-অনুকরণকেও ইঙ্গিত করে। এ কারণেই তাসাউফ-চর্চার ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, অসংখ্য এতদসংক্রান্ত তরীকাহ বা অনুশীলন-পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও এ দু’টি বিষয় কখনোই পরিবর্তিত হয়নি: ১/ কোনো শায়খ বা মোর্শেদের সান্নিধ্য লাভ; এবং ২/ তাঁর পদাংক অনুসরণ, ঠিক যেমনটি সাহাবা-এ-কেরাম (রা:) মহানবী (দ:)-এর সোহবত দ্বারা ও তাঁরই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আধ্যাত্মিক উন্নতির শিখরে আরোহণ ও আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভ করেছিলেন।

এ কারণেই কোনো নির্দিষ্ট সূফী শায়খের অধীনে থেকে তরীকাগুলো তাসাউফ-শাস্ত্রের সংরক্ষণ ও প্রচার-প্রসার করে আসছে। প্রথমতঃ এটি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর আচরিত (অন্তরসমূহ) পবিত্রকরণের সুন্নাহ, যা আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ ইসলামী জ্ঞান কখনোই শুধুমাত্র লেখনীর মাধ্যমে প্রচারিত হয়নি, বরং উলামাবৃন্দের কাছ থেকে তাঁদের শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। তৃতীয়তঃ এ জ্ঞানের ধরন হচ্ছে ‘আহওয়াল’ তথা অন্তরের অবস্থাসংক্রান্ত এবং তা শুধু জানার সাথে সম্পর্কিত নয়; তাই এ জ্ঞানশিক্ষার পূর্বশর্ত হচ্ছে জীবিত পীর-মোর্শেদবৃন্দের এমন এক পরম্পরা (সিলসিলা) থেকে তা গ্রহণ করা, যাঁরা মহানবী (দ:) পর্যন্ত ফেরত গিয়েছেন। কেননা, ওপরোল্লিখিত আয়াতে কার্যকরভাবে শর্তারোপকৃত স্রেফ অন্তরের আহওয়ালের ব্যাপ্তি ও সংখ্যা এতোই যে, তা (আধ্যাত্মিকতার পাঠদাতা)-শিক্ষকের দৃষ্টান্ত অনুসরণ-অনুকরণকেই কার্যকরভাবে এক্ষেত্রে একমাত্র প্রচারের মাধ্যম করে দিয়েছে।

এ যাবত আমরা ইসলাম-ধর্মের প্রেক্ষিতে তাসাউফ সম্পর্কে আলোচনা করেছি, যা কারো জীবনে ঐশী বিধি-বিধানের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্যে, কুরআন-হাদীসে দাবিকৃত অন্তরের আহওয়াল (অবস্থা) অর্জনের জন্যে অতি প্রয়োজনীয় ইসলামী শরীয়তের এক বিদ্যাশাস্ত্র। মালেকী মযহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম মালেক (রহ:)-এর বাণীতে শরীয়ত ও তাসাউফের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যক্ত হয়েছে; তিনি বলেন, “ফেকাহ তথা শরীয়তের আইন-কানুন  শিক্ষা না করে যে ব্যক্তি তাসাউফ চর্চা করে, সে অবিশ্বাসীতে পরিণত হয়; আর যে ব্যক্তি তাসাউফ চর্চা না করে ফেকাহ শিক্ষা করে, সে নিজেকে পথভ্রষ্ট করে। যে ব্যক্তি উভয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে, সে-ই সত্যে উপনীত হয়।” এ কারণেই মালয়েশিয়া হতে মরক্কো পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলমান দেশগুলোর মাদ্রাসাসমূহে পঠিত ঐতিহ্যবাহী পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে তাসাউফ-বিদ্যা শিক্ষা দেয়া হতো; আর এ উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ শরীয়ত-বিশেষজ্ঞ আলেম-উলামার অনেকেই ছিলেন সূফী-দরবেশ; আর গত শতাব্দীর শুরুতে ইসলামী খেলাফতের সমাপ্তি ও তৎপরবর্তী সময়ে মুসলমান রাজ্যগুলোর ওপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত লক্ষ্ণৌ হতে ইস্তাম্বুল ও মিসরে অবস্থিত উচ্চতর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাসাউফের শিক্ষকবৃন্দ পাঠদান করতেন।

কিন্তু তাসাউফের দ্বিতীয় আরেকটি দিক সম্পর্কে আমরা এখনো আলোকপাত করিনি। তা হলো, (হাদীসে জিবরীলে বর্ণিত) ধর্মের দ্বিতীয় বিষয় ‘প্রকৃত ঈমানের’ সাথে তারই সম্পৃক্ততা; ইসলামী বিদ্যাশাস্ত্রগুলোর প্রেক্ষাপটে এই ঈমান হচ্ছে ‘আকীদা-বিশ্বাসের’ সমষ্টি।

সকল মুসলমান আল্লাহ পাকে বিশ্বাস করেন; অর্থাৎ, এ আকীদা-বিশ্বাস রাখেন যে তিনি মানব-মস্তিষ্কের ধারণাতীত বা কল্পনারও উর্ধ্বে; কেননা মানবের জ্ঞান-বুদ্ধি তার নিজের ইন্দ্রিয় ও তৎনিঃসৃত চিন্তাভাবনার প্রণালীসমূহে আবদ্ধ, যেমন না-কি সংখ্যা, দিকসমূহ, স্থানের ব্যাপ্তি, সময়কাল ইত্যাদি। আল্লাহতা’লা এগুলোর সবকিছুরই উর্ধ্বে, যেমনটি তিনি এরশাদ ফরমান:

“তাঁর (অাল্লাহতা’লার) মতো কিছুই নেই।” [আল-কুরঅান, ৪২:১১; তাফসীরে নূরুল এরফান]

এ আয়াত সম্পর্কে এক মুহূর্ত চিন্তা করলে আমরা দেখতে পাই, মুসলিম শরীফের ওই হাদীসে উল্লেখিত ‘এহসান’ অনুসারে “আল্লাহতা’লার এবাদত-বন্দেগী এমনভাবে করো যেন তাঁকে দেখছো” – এই আদেশের অর্থ আমরা বুঝতে পারি যে ‘দেখা’ মানে চোখ দ্বারা দেখা নয়; কেননা চোখ শুধু তার নিজের মতোই পদার্থ বা বস্তু প্রত্যক্ষ করতে পারে; আর এর অর্থ মস্তিষ্ক-ও নয়, যেটি নিজের কল্পনার উর্ধ্বে ওঠে খোদায়ী তত্ত্ব উপলব্ধি করতে একেবারেই অক্ষম। বরঞ্চ এর অর্থ নিশ্চয়তাসূচক বিশ্বাস, ঈমানের নূর (জ্যোতি), যার সঠিক স্থান চোখ অথবা মস্তিষ্ক নয়, বরং ‘রূহ’ তথা আত্মা – যেটি আল্লাহ পাক আমাদের প্রত্যেকের মাঝে সৃষ্টি করে ফুঁকে দিয়েছেন, যেটির জ্ঞান-প্রজ্ঞা (খোদার) সৃষ্ট বিশ্বজগতের সীমা-পরিসীমা দ্বারা বাধাগ্রস্ত বা অবরুদ্ধ নয়। আল্লাহতা’লা এই রূহকে (ঐশী) রহস্যাবৃত রেখে এর মর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন; তিনি এরশাদ ফরমান:

“(হে রাসূল) বলুন, ‘রূহ আমার রব্ব (প্রভু)-এর আদেশ থেকে এক বস্তু’।” [আল-কুরআন, ১৭:৮৫; নূরুল এরফান]

এই রূহের (আত্মার) খোরাক হচ্ছে ‘যিকর’ বা ‘আল্লাহতা’লার স্মরণ’। কেন? কারণ আনুগত্যপূর্ণ কাজ-কর্ম নিশ্চয়তাসূচক বিশ্বাসের আলো ও রূহের মধ্যে ঈমানদারি বৃদ্ধি করে; আর যিকর ওই ধরনের আমলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, যা ইমাম আল-হাকীম নিশাপুরী (রহ:) কর্তৃক বর্ণিত এক সহীহ হাদীস দ্বারা সাবেত (প্রমাণিত) হয়; মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান:

“আমি কি তোমাদের বলবো না তোমাদের সেরা আমল (অনুশীলন)-টি সম্পর্কে, যেটি তোমাদের প্রভুর দৃষ্টিতে সবচেয়ে খাঁটি/নির্মল, তোমোদের মর্যাদাবৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের, স্বর্ণ ও রৌপ্যদানের চেয়েও শ্রেয়, আর তোমাদের শত্রুদের মোকাবেলা ও তাদের ঘাড়ে আঘাত এবং তাদের দ্বারা তোমাদের ঘাড়ে প্রত্যাঘাতের (মানে জ্বেহাদের) চেয়েও শ্রেষ্ঠ?” সাহাবা (রা:)-বৃন্দ জিজ্ঞেস করেন, “এটি কী, এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)?” তিনি জবাবে বলেন, “যিকরুল্লাহি ‘আযযা ওয়া জাল্লা” মানে “সর্বশক্তিমান ও মহা-রাজকীয় খোদাতা’লার স্মরণ।” [আল-মোস্তাদরাক ’আলাল্ সহিহাইন, ১:৪৯৬]

নেক আমল (পুণ্যময় কর্ম) এবং বিশেষ করে যিকিরের মাধ্যমে ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি করা (মানে ঈমানকে সুদৃঢ় করা) ইসলাম ধর্ম ও সুন্নাহ-ভিত্তিক আধ্যাত্মিকতার জন্যে বড় ধরনের এক উপলক্ষ। জনৈক অ-মুসলিম একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “খোদা যদি অস্তিত্বশীল হয়েই থাকেন, তবে কেন এই তালবাহানা? তিনি কেন প্রকাশ্যে এসে তা ঘোষণা দেন না?”

এর উত্তর হলো, এ জীবনে তাকলিফ তথা ‘নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য’ শুধু বাহ্যিক আমলের সাথেই সম্পৃক্ত নয়, বরং তা আমাদের আকীদা-বিশ্বাস ও তার দৃঢ়তার সাথেও সম্পৃক্ত। এ দুনিয়ায় যদি আল্লাহতা’লা ও চির সত্য বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপন অনায়াসে হতো, তাহলে আল্লাহতা’লার দ্বারা আমাদেরকে এর জন্যে দায়ী করার কোনো মানেই হতো না; এটি হতো অটোমেটিক বা আপনাঅাপনি, যেমন না-কি আমাদের বিশ্বাস লন্ডন শহরটি ইংল্যান্ডে অবস্থিত। এমতাবস্থায় বিশ্বাস না করার মতো অসম্ভব কোনো বিষয়ের জন্যে কাউকে দায়ী করাটা একেবারেই অর্থহীন হতো।

কিন্তু আল্লাহতা’লা যে দায়িত্ব আমাদের কাঁধে ন্যস্ত করেছেন, তা হলো গায়ব তথা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপন, যা এ দুনিয়ায় আমাদের জন্যে কুফর ও ঈমানের মধ্যে পাথর্ক্য করতে এক পরীক্ষাস্বরূপ; আর অবিশ্বাসী হতে বিশ্বাসীদের পার্থক্য করতে এবং সমস্ত মুসলমান হতে কতিপয় ঈমানদারকে উচ্চ মর্যাদা দিতেও এটি একটি পরীক্ষা বটে।

এ কারণে যিকরের মাধ্যমে ঈমান সুদৃঢ়করণ তাসাউফ-শাস্ত্রের জন্যে এতোটাই পদ্ধতিগত গুরুত্ব বহন করে; মুসলমান হিসেবে আমাদেরকে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশ্বাস করতে আদেশ-ই শুধু দেয়া হয়নি, বরং তাতে পূর্ণ নিশ্চিয়তাসূচক আস্থা রাখতে আদেশও করা হয়েছে। আমাদের দেখা আশপাশের জগতটি আলো ও আঁধারের পর্দাসমূহের সমষ্টি; বিভিন্ন ঘটনার উদ্ভব হয়ে আমাদের কারো কারো ঈমান হারিয়ে যায়। আর আল্লাহতা’লা ধর্মের চিরসত্য বিষয়গুলোতে আমরা কতোটুকু নিশ্চিত বা সুদৃঢ় ঈমান রাখি, তার মাত্রা জনে জনে পরিমাপ করে থাকেন। তাই এই অর্থেই হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা:) বলেছিলেন, “যদি হযরত আবূ বকর (রা:)-এর ঈমান গোটা উম্মতের ঈমানের মোকাবেলায় (পাল্লায়) পরিমাপ করা হতো, তবুও তাঁর ঈমান ভারী হতো।”

সুন্নী আকীদা-বিশ্বাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ‘ওয়াহদানীয়্যাত’ বা সর্বশক্তিমান আল্লাহতা’লার ‘একত্ব ও অনন্য বৈশিষ্ট্য’। এর মানে তাঁর পবিত্র সত্তা অথবা গুণাবলী কিংবা কর্মে কোনো শরীক বা অংশীদার নেই। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের বিশৃঙ্খল ও উদ্দাম লড়াইয়ে এই অন্তর্দৃষ্টি ধরে রাখার সামর্থ্য হচ্ছে অন্তরের এয়াকীন (নিশ্চিত বিশ্বাস)-ভিত্তিক শক্তি বা বলেরই একটি কাজ। আল্লাহ পাক তাঁর নবী (দ:)-কে আল-কুরআনে বলেন:

“হে রাসূল (দ:)! আপনি বলুন, ‘আমি আমার নিজের ভাল-মন্দের মধ্যে খোদ-মোখতার (স্বাধীন) নই, কিন্তু আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন (সে ঐশী ক্ষমতাবলে ক্ষমতাবান)।’ [সূরা আ’রাফ, ১৮৮ আয়াত; তাফসীরে নূরুল এরফান গ্রন্থে লিপিবদ্ধ শানে নুযূল দেখুন, যা’তে রাসূলুল্লাহ (দ:) আধ্যাত্মিক জ্ঞান দ্বারা হারিয়ে যাওয়া নিজ উটনীর খবর বলে দেন।]

তবু আমরা নিজেদের ওপর এবং আমাদের পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করি, আর আকীদা-বিশ্বাসের বাস্তবতা সম্পর্কে বিস্মৃত হয়ে এ কথা ভুলে যাই যে আমাদের পরিকল্পনাগুলোর কোনো কার্যকারিতা-ই নেই এবং আল্লাহতা’লা একাই সব কিছুর ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছেন।

আপনি এ ব্যাপারে পরীক্ষা নিতে চাইলে এমন কারো কাছ থেকে সাহায্য নিতে চেষ্টা করুন যার (সমাজে বা রাষ্ট্রে) বড় বড় যোগাযোগের মানুষ আছে, যাদের সাহায্য আপনার জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; ওই ধরনের ক্ষমতাবানদের কাছে ভালভাবে তদবির করার জন্যে তাকে বলার মুহূর্তে নিজ বিবেকের দিকে খেয়াল করুন এবং দেখুন আপনি কার ওপর নির্ভর করছেন। আমাদের অধিকাংশের মতোই যদি অাপনি হয়ে থাকেন, মানে আল্লাহ আপনার চিন্তার অগ্রভাগে না থাকেন, যদিও বাস্তবতা হলো তিনি-ই সমস্ত বিষয়ের নিয়ন্তা, তাহলে এটি কি আপনার আকীদা-বিশ্বাসের ঘাটতি নয়? অন্ততঃ আপনার নিশ্চিত বিশ্বাসের মধ্যে এটি কমতি নয় কি?

তাসাউফ প্রত্যেক মুসলমানের মধ্যে আল্লাহর প্রতি এয়াকীন তথা নিশ্চিত বিশ্বাস ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে এ ধরনের ঘাটতি মেটায় বা সংশোধন করে। আকীদা-বিশ্বাসের দাবিকৃত এয়াকীন অর্জনে তাসাউফের প্রধান দুটো মাধ্যম হলো মোযাকারা তথা ইসলামী বিশ্বাসের সুন্নাহ-ভিত্তিক মূলনীতিমালা শিক্ষা করা এবং যিকির তথা আল্লাহতা’লার স্মরণ দ্বারা নিশ্চিত বিশ্বাসের সুদৃঢ়ীকরণ। এটি আমাদের ঈমানেরই অংশ, যেমনটি আল-কুরআনে এরশাদ হয়েছে:

“অথচ আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের কর্মগুলোকেও।” [সূরা সোয়ফ্-ফা-ত, ৯৬ নং অায়াত; নূরুল এরফান]

তবু আমাদের কয়জনের জন্যে এ ব্যাপারটি প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতাস্বরূপ বিদ্যমান? যেহেতু তাসাউফ তা’লিম (পাঠদান) ও যিকিরের এক নিয়মবদ্ধ পদ্ধতির মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান দেয় এবং ঈমানী দুর্বলতা দূর করে, সেহেতু ঐতিহ্যগতভাবেই ধর্মের এই স্তম্ভটির (মানে ঈমানের) জন্যে এ বিদ্যাশাস্ত্রকে ব্যক্তি পর্যায়ে বাধ্যতামূলক বলে বিবেচনা করা হয়েছে; আর এ শাস্ত্র ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই নিজের যোগ্যতা বা যথার্থতা প্রমাণ করে এসেছে।

আজ রাতে আমাদের আলোচনায় শেষ যে প্রশ্নটির প্রতি আমরা দৃষ্টি দেবো তা হলো: আমাদের জানা ইসলামী শিক্ষার খেলাফ বা পরিপন্থী কর্ম-সংঘটনকারী ’সূফী’দের ব্যাপারে কী ফায়সালা?

এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে সূফী বলতে দুটো অর্থ: প্রথমটি “নিজেকে সূফী মনে করে এমন যে কেউ।” এটি সূফীতত্ত্বের প্রাচ্য-বিশারদ ইতিহাসবিদ ও জনপ্রিয় লেখকদের অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের পর প্রতিষ্ঠিত এক পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া, যারা ’সূফী’ বলতে ‘উলামা’দের বিরোধী কাউকে বোঝান। আমি মনে করি, আজ রাতে প্রকৃত তাসাউফের পরিধি ও পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা যেসব কুরআনের আয়াত ও হাদীস শরীফ উল্লেখ করেছি, তা পরিস্ফুট করেছে কেন সূফীর নিম্নবর্ণিত সংজ্ঞা আমাদের কাছে প্রাধান্য পাবে: “শরয়ী বিধানে জ্ঞানী পুণ্যাত্মা যিনি যা জানেন তা-ই অনুশীলন করেছেন; অতঃপর আল্লাহ তাঁকে এরই ফলশ্রুতিস্বরূপ দান করেছেন এমন জ্ঞান যা তিনি জানতেন না।”

ধর্মীয় জ্ঞানে শিক্ষিত একজন সূফী প্রথম যে জিনিসটি জানেন তা হলো, ইসলামী শরীয়ত ও আকীদা-বিশ্বাস সকল মানবের উর্ধ্বে। যে কেউ এ বিষয়টি না জানলে তিনি কখনোই সূফী হতে পারবেন না; তবে ব্যতিক্রম শুধু প্রাচ্যবিদের দৃষ্টিতে এ শব্দটির অর্থ, যার দৃষ্টান্ত হচ্ছে কেউ কোনো স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে দামী স্যূট-টাই পরে ব্রিফকেস্ হাতে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যেন সবাই মনে করেন তিনি একজন স্টক-ব্রোকার। কিন্তু প্রকৃত স্টক-ব্রোকার হওয়াটা একেবারেই আলাদা একটা ব্যাপার।

যেহেতু এই পার্থক্য আজকাল মুসলমান সমাজ এতদ্ভিন্ন সদ্ভাবাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও অবহেলা করেন, সেহেতু এ কথাটি অহরহ ভুলে যাওয়া হয় যে আলেমদের মধ্যে যারা সূফীদের সমালোচনা করেছিলেন, যেমন ইবনুল জাওযী নিজ ‘তালবিসে ইবলিস’ (শয়তানের ধোকা) পুস্তকে, কিংবা ইবনে তাইমিয়্যা তার ফতোওয়ার বিভিন্ন স্থানে, অথবা ইবনে কাইয়্যেম জাওযিয়্যা, তারা সবাই কিন্তু শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত বিদ্যাশাস্ত্রের শাখা হিসেবে তাসাউফের সমালোচনা করেননি। এর প্রমাণ হলো ইবনে জাওযীর প্রণীত পাঁচ খণ্ডের ‘সিফাতুস্ সাফওয়া’ শিরোনামের বইটি; এতে বিধৃত হয়েছে সেই একই সূফীদের জীবনী, যাঁদের সম্পর্কে ইমাম আল-কুশায়রী (রহ:) তাঁর বিখ্যাত তাসাউফের কেতাব ‘রেসালা-এ-কুশায়রীয়্যা’-তে লিখেছিলেন। ইবনে তাইমিয়্যা নিজেকে কাদেরীয়্যা সিলসিলার সূফী মনে করতো, আর তার রচিত ৩৭ খণ্ডে সমাপ্ত ‘মজমু’আয়ে ফাতাওয়া’ গ্রন্থের ১০ম ও ১১তম খণ্ডগুলো তাসাউফের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। আর ইবনে কাইয়্যেম আল-জাওযিয়্যা ৩ খণ্ডের ‘মাদারিজ আস্ সালেকীন’ গ্রন্থটি লেখে আবদুল্লাহ আনসারী আল-হারাউয়ী’র সূফী তরীকার বিভিন্ন আধ্যাত্মিক মকাম-বিষয়ক ‘মানাযিল আল-সা’য়েরীন’ শীর্ষক বইয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হিসেবে। এসব লেখনী পরিস্ফুট করে যে এগুলোর লেখকদের কৃত সমালোচনা মূল তাসাউফশাস্ত্রের প্রতি ছিল না, বরং তাদের সময়কার নির্দিষ্ট কিছু দলের প্রতি-ই ছিল। আর ওই সমালোচনাকে ওর (খাস্) অর্থেই গ্রহণ করতে হবে।

অন্যান্য ইসলামী বিদ্যাশাস্ত্রের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়েছে, ঠিক তেমনি তাসাউফের ইতিহাসেও ভুলত্রুটি হয়েছে; এগুলোর বেশির ভাগই হয়েছে সবার ওপরে শরীয়ত ও অাকীদা-বিশ্বাসের প্রাধান্য উপলব্ধি করতে না পারায়। কিন্তু এসব ভুল-ভ্রান্তি নীতিগতভাবে ভিন্ন ছিল না সেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে, যা ঘটেছিল, উদাহরণস্বরূপ, তাফসীর-শাস্ত্রে অনুপ্রবিষ্ট ইসরাঈলীয়্যা (বনূ ইসরাঈল-সম্পর্কিত বানোয়াট কাহিনি)-এর ক্ষেত্রে, কিংবা হাদীস-শাস্ত্রে অনুপ্রবিষ্ট মওদু’আত (জাল হাদীস)-এর বেলায়। কিন্তু তাফসীর-শাস্ত্র মন্দ বা হাদীস-শাস্ত্র বিচ্যুতিমূলক হওয়ার প্রমাণ হিসেবে এসব ভুলকে পেশ করা হয়নি, বরং প্রতিটি শাস্ত্রের বেলায়ই ওই শাস্ত্রবিদ ইমামবৃন্দ ভুল-ভ্রান্তি শনাক্ত করে ওগুলোর ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করেন; কেননা উম্মাহকে এর থেকে রেহাই দেয়া জরুরি ছিল। আর এ ধরনের সংশোধনী-ই আমরা ইমাম কুশায়রী (রহ:)-এর ‘রেসালা’, ইমাম গাযযালী (রহ:)-এর ‘এয়াহইয়া’ এবং সূফী মতাদর্শের অন্যান্য বইপত্রে দেখতে পাই।

ওপরে আমাদের উল্লেখিত সমস্ত কারণেই তাসাউফকে এ উম্মতের উলামাবৃন্দ ইসলাম ধর্মের অত্যাবশ্যক অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এর জাজ্বল্যমান প্রমাণ হচ্ছেন তাসাউফেরই উচ্চতর জ্ঞানে জ্ঞানী ইসলামী শরীয়তের অন্যান্য বিদ্যাশাস্ত্রের আলেম-উলেমাবৃন্দ; এঁদের মধ্যে রয়েছেন সর্ব-ইমাম ইবনে আবেদীন শামী (রহ:), আল-রাযী, আহমদ ফারূকী সেরহিন্দী (রহ:), যাকারিয়্যা আনসারী, ইযয ইবনে আব্দিস্ সালাম (রহ:), ইবনে দাকিক আল-ঈদ, ইবনে হাজর হায়তামী মক্কী (রহ:), শাহ ওলীউল্লাহ, আহমদ দারদির, ইবরাহীম আল-বাজুরী, আবদুল গনী নাবলুসী (রহ:), আন্ নববী (রহ:), তকীউদ্দীন সুবকী (রহ:), আস্ সৈয়ুতী (রহ:) প্রমুখ।

সূফী-মণ্ডলী যাঁরা ইসলামের খেদমতে কলমের পাশাপাশি তরবারিও ব্যবহার করেছেন, তাঁদের সম্পর্কে ‘উমদাত আস্ সালেক’ (খোদার পথের পথিকবৃন্দের ভরসা/শায়খ নূহ হা মিম কেলার অনূদিত Reliance of the Traveler) শীর্ষক পুস্তকে লিপিবদ্ধ আছে:

এ ধরনের পুণ্যাত্মাবৃন্দ হলেন নকশবন্দী (সিলসিলার) শায়খ শামিল দাগেস্তানী (রহ:), যিনি ১৯ শতকে ককেশাস্ অঞ্চলে রুশদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করেছিলেন; সাইয়্যেদ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ সোমালী, সালেহীয়্যা সিলসিলার শায়খ যিনি ১৮৯৯ হতে ১৯২০ সাল পর্যন্ত বৃটিশ ও ইতালীয়দের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে মুসলমানদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; কাদেরীয়্যা তরীকার শায়খ উসমান ইবনে ফদী, যিনি ১৮০৪ হতে ১৮০৮ সাল পর্যন্ত ইসলামী অাইন প্রতিষ্ঠার জন্যে উত্তর নাইজেরিয়ায় জ্বেহাদ পরিচালনা করেছিলেন; কাদেরীয়্যা সিলসিলার শায়খ আবদুল কাদের জাযা’ইরী, যিনি ১৮৩২ হতে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আলজেরীয়দের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন; দারকাউয়ী (সিলসিলার) ফকীর আলহাজ্জ্ব মোহাম্মদ অাল-অাহরাশ, যিনি ১৭৯৯ সালে মিসরে ফরাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন; তিজানী (সিলসিলার) শায়খ আলহাজ্জ্ব উমর তাল, যিনি গিনী, সেনেগাল ও মালি অঞ্চলে ১৮৫২ হতে ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত ইসলামী জ্বেহাদ পরিচালনা করেছিলেন; এবং কাদেরী (সিলসিলার) শায়খ মা’অাল-আয়নাঈন অাল-ক্কালক্কামী, যিনি ১৯০৫ হতে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত উত্তর মৌরিতানিয়া ও দক্ষিণ মরক্কোয় ফরাসীদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিরোধ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ধর্ম প্রচারের দ্বারা গোটা অঞ্চলসমূহকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে এসেছিলেন যে সকল পুণ্যাত্মা, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সানুসিয়্যা সিলসিলার প্রতিষ্ঠাতা শায়খ মোহাম্মদ আলী সানুসী, ১৮০৭ হতে ১৮৫৯ সাল পর্যন্ত যাঁর প্রচেষ্টা ও জ্বেহাদ দ্বারা লিবিয়ার মরু এলাকা ও আফ্রিকী সাব-সাহারা অঞ্চলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাঝে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়; আরও রয়েছেন শাযিলী (সিলসিলার) শায়খ মোহাম্মদ ফারূক ও কাদেরী শায়খ উবায়স অাল-বারাউয়ী, যাঁদের প্রচেষ্টায় পূর্ব আফ্রিকী উপকূল এলাকা হতে পশ্চিম দিকে এবং সমুদ্র-দূরবর্তী অঞ্চলে ইসলামের প্রচার-প্রসার হয়। [Reliance of the Traveler, ৮৬৩ পৃষ্ঠা]

এ সকল পুণ্যাত্মার দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট হয় কোন্ ধরনের (মহান) মুসলমানবৃন্দ সূফী ছিলেন; অর্থাৎ, (তাঁরা) সব ধরনেরই (ছিলেন), আর তাঁরা সবার এবং সব কিছুর ওপরই প্রভাব ফেলেছিলেন – আর তাসাউফ তাঁদের সাধ্যানুযায়ী ইসলামের খেদমতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

অতএব, আজ রাতে আমার প্রভাষণের সার-সংক্ষেপ হলো: প্রথমে তাসাউফ ও শরীয়তের দিকে নজর দিয়ে আমরা দেখতে পেয়েছি যে অনেক কুরআনের আয়াত ও হাদীস শরীফ মুসলমানদেরকে নিজেদের অন্তরের হারাম অবস্থা (আহওয়াল) যেমন – দম্ভ, হিংসা, আল্লাহ ভিন্ন অন্য কাউকে ভয় করা ইত্যাদি দূর করতে আদেশ দেয়; পক্ষান্তরে, করুণা, মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক মহব্বত ও স্নেহ-মমতা, নামাযে অন্তরের একাগ্রতা এবং মহানবী (দ:)-এর প্রতি ভালোবাসার মতো অন্তরের আহওয়াল (অবস্থা) অর্জনের জন্যেও তা আদেশ করে। আমরা দেখতে পেয়েছি যে এসব অন্তরের অবস্থার বর্ণনা ফেকাহ’র বই-পুস্তকে খুঁজে পাওয়া যায় না, যেগুলোর উদ্দেশ্য-ই হলো (শুধু) শরীয়তের বাহ্যিক ও পরিমাপযোগ্য বিষয়সমূহ সুনির্দিষ্ট করা। অথচ এই আহওয়ালের জ্ঞান প্রত্যেক মুসলমানের জন্যেই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এ কারণেই এটি এহসান-বিশারদ তথা তাসাউফের শিক্ষকদের অধীনে শেখা হয়েছে ইসলামী ইতিহাসের সকল অধ্যায়েই – বর্তমান শতকের প্রারম্ভ অবধি।

অতঃপর আমরা ঈমানের পর্যায়ে নজর দিয়েছি এবং দেখেছি, যদিও এ জগতে আল্লাহতা’লা একাই সব কিছুর ওপর প্রভাব বিস্তার করেন বলে মুসলমানদের আকীদা-বিশ্বাস রয়েছে, তবুও দৈনন্দিন জীবনে এ কথা মনে রাখাটা মানব সচেতনতার অর্পিত কোনো কিছু নয় (মানে মানুষ সজ্ঞানে এটি মনে রাখতে অক্ষম), বরং এটি মুসলমানের এয়াকীন তথা নিশ্চিত বিশ্বাসেরই একটি ক্রিয়া। আর আমরা দেখতে পেয়েছি আকীদা-বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত বিদ্যার শাখা হিসেবে তাসাউফ-শাস্ত্র মোযাকারা তথা ‘আকীদা-বিশ্বাস শিক্ষাদান’ ও যিকর তথা ‘আল্লাহ পাকের স্মরণ’ – এই উভয় পন্থায় ওই এয়াকীনের (নিশ্চিত বিশ্বাসের) সুশৃঙ্খল বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে থাকে; আর তা দিয়ে থাকে মহানবী (দ:)-এর উচ্চারিত এহসান-সম্পর্কিত বাণীর সাথে সঙ্গতি রেখেই, যেমনটি তিনি এরশাদ করেন, “আল্লাহতা’লার এবাদত এমনভাবে করো যেন তুমি তাঁকে দেখছো।”

সবশেষে, আমরা দেখতে পেয়েছি, ইবনে আল-জাওযী ও ইবনে তাইমিয়্যার মতো আলেম-উলেমা তাসাউফের প্রতি যে অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন, তা নীতিগতভাবে তাসাউফের প্রতি ছিল না, বরং তা ছিল তাদের সময়কার কিছু নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির প্রতি উদ্দেশ্যকৃত, যার প্রমাণ ওই একই লেখকদের অন্যান্য বইপত্রে বিধৃত, যেখানে তারা তাসাউফকে শরীয়তেরই একটি জ্ঞানের শাখা হিসেবে স্বীকার করেছেন।

আজ রাতে আমার প্রভাষণ যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম তাতে ফিরে গিয়ে বলতে হয়, এই উম্মতের মধ্য হতে (প্রকৃত) ইসলামী উলামাদের হারিয়ে যাওয়ার ফলে বর্তমানে তাসাউফের দু’টি একদম ভিন্ন চিত্রের উদয় হয়েছে। গত শতাব্দীতে ঔপনিবেশিক শাসন দ্বারা সুন্নী ইসলামের অবকাঠামো ভেঙ্গে ফেলার পরবর্তীকালে লিখিত বইপত্র পড়লে আমরা দেখতে পাই মস্ত বড় এক ধোকা তাতে বিদ্যমান, অার তা হলো: আধ্যাত্মিকতাবিহীন ইসলাম ও তাসাউফ-হীন শরীয়ত। কিন্তু যদি আমরা ইসলামী বিদ্বানদের সনাতন বা ঐতিহ্যবাহী পুরোনো বইপত্র পড়ি, তাহলে তা থেকে আমরা জানতে পারি যে ইসলামের ইতিহাসজুড়ে তাফসীর, হাদীস বা অন্যান্য শাস্ত্রের মতোই শরীয়তের একটি বিদ্যাশাস্ত্র হিসেবে বিরাজমান ছিল তাসাউফ। আমাদের রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান:

“নিশ্চয় আল্লাহ পাক তোমাদের বাহ্যিক আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি দেখেন তোমাদের অন্তর ও কর্ম।” [সহীহ মুসলিম, ৪:১৩৮৯; হাদীস নং ২৫৬৪]

আর এটি-ই সবচেয়ে বড় আশার বাণী ইসলাম বর্তমান আধুনিক বিশ্বকে শোনাতে পারে, যে আধুনিক জগত বস্তুবাদ ও নাস্তিবাদের দ্বারা অন্ধকারাচ্ছন্ন। ইসলাম প্রকৃতপ্রস্তাবেই ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ধর্ম হিসেবে বাহ্যতঃ একদিকে যেমন পারলৌকিক মুক্তির আশা, অপরদিকে তেমনি তা অাত্মিকভাবে সরাসরি খোদায়ী মহব্বত তথা ঐশীপ্রেম ও উদ্ভাসনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতাও।

  *সমাপ্ত*

ইয়াযিদ বিষয়ে হাদিসে কুসতুনতুনিয়ার অপব্যাখ্যার খন্ডন

Standard

image

মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান

[নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লি ওয়ানুসাল্লিমু আলা হাবীবিহিল করীম ওয়ালা আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজমায়ীন আম্মা বা’দ ]

বর্তমান সময়ে প্রচলিত ফিতনা সমূহের মধ্যে একটি হল ইয়াযিদকে লা’নতি(অভিশপ্ত) না মেনে তাকে নিরাপরাধ এমনকি আল্লাহর নিকট মাকবুল এবং জান্নাতী ঘোষণা দিয়ে এর প্রচার করা । ইয়াযিদের ব্যাপারে নানা ঠুনকো বর্ণনা এবং কারবালা ও তার পরবর্তী ঘটনায় তার সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকা দিয়ে তাকে নিষ্পাপ প্রমাণের এক নির্লজ্জ অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে । এমনকি সহীহ আল বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদীসকে তার শানে সম্পৃক্ত করে তার পক্ষে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে । যেখানে এই হাদিসের অনুসারেও ইয়াযিদ এর হুকুমের অংশ নয় এটাই আহলে ইলমের মত এবং এটাই সত্য । সত্যনিষ্ঠ ঐতিহাসিক বর্ণনার মাধ্যমেই ইয়াযিদ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের নিকট একজন পাপিষ্ঠ ও লাঞ্ছিত ব্যক্তি, তার উপর আল্লাহর লা’নত(অভিশম্পাত) । পরিতাপের বিষয়, নবীজাদা ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাত ও তাঁর পরবর্তীতে পবিত্র শহর মক্কা মদীনায় নৃশংস হামলার পরও এর হুকুমদাতা ইয়াযিদ কিভাবে নিরাপরাধ হয় । একজন মু’মিনের পক্ষে কিভাবে তা চিন্তা করা বা বলা সম্ভব ?
হাদীসে কুসতুনতুনিয়া

حَدَّثَنِي إِسْحَاقُ بْنُ يَزِيدَ الدِّمَشْقِيُّ، حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ حَمْزَةَ، قَالَ: حَدَّثَنِي ثَوْرُ بْنُ يَزِيدَ، عَنْ خَالِدِ بْنِ مَعْدَانَ، أَنَّ عُمَيْرَ بْنَ الأَسْوَدِ العَنْسِيَّ، حَدَّثَهُ – أَنَّهُ أَتَى عُبَادَةَ بْنَ الصَّامِتِ وَهُوَ نَازِلٌ فِي سَاحَةِ حِمْصَ وَهُوَ فِي بِنَاءٍ لَهُ، وَمَعَهُ أُمُّ حَرَامٍ – قَالَ: عُمَيْرٌ، فَحَدَّثَتْنَا أُمُّ حَرَامٍ: أَنَّهَا سَمِعَتِ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ: أَوَّلُ جَيْشٍ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُونَ البَحْرَ قَدْ أَوْجَبُوا، قَالَتْ أُمُّ حَرَامٍ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَنَا فِيهِمْ؟ قَالَ: أَنْتِ فِيهِمْ، ثُمَّ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَوَّلُ جَيْشٍ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُونَ مَدِينَةَ قَيْصَرَ مَغْفُورٌ لَهُمْ، فَقُلْتُ: أَنَا فِيهِمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: لا

অর্থাৎ হযরত উমাইর ইবনে আসওয়াদ আনসী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি উবাদা ইবনে সামিত রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আসলেন । তখন উবাদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হিমস উপকূলে তার একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন এবং তার সঙ্গে ছিলেন উম্মে হারাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা । উমাইর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উম্মে হারাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা আমাদের কাছে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইরশাদ করতে শুনেছেন যে, আমার উম্মতের মধ্যে প্রথম যে দলটি নৌ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে তাদের জন্য জান্নাত অনিবার্য । উম্মে হারাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা আরজ করলেন, আমি কি তাদের মধ্যে হব ? হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, তুমি তাদের মধ্যে হবে । উম্মে হারাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন, তারপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, আমার উম্মতের প্রথম যে দলটি কায়সার [রোমক সম্রাট] এর রাজধানী [কুসতুনতুনিয়া তথা কনস্টানটিনোপোল] আক্রমণ করবে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত । তারপর আমি [উম্মে হারাম] বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি কি তাদের মধ্যে হব ? নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, না । [১]
ইয়াযিদ প্রেমীদের বক্তব্য হল- কুসতুনতুনিয়ায় আক্রমণকারী প্রথম সৈন্যবাহিনীকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে । আর ইয়াযিদ এ বাহিনীতে ছিল এতে করে সে ক্ষমাপ্রাপ্ত ।
কিন্তু এরূপ দাবী নিয়ে আগ্রাসনকারী ব্যক্তিরা এই হাদীসের বক্তব্যটুকু ভালভাবে পড়ে নেয়া জরুরী মনে করেননি বোধহয় । নইলে তারা ইয়াযিদকে ক্ষমাপ্রাপ্ত হিসেবে দাবী করে কিভাবে । হাদিস শরীফের বক্তব্য অনুসারে কায়সারের শহর বা কুসতুনতুনিয়ায় হামলাকারী প্রথম বাহিনীকে ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে; এমন বলা হয়নি যে, এ জিহাদে অংশ নেয়া সকলেই ক্ষমাপ্রাপ্ত । এমন কথা কোথাও বর্ণিত আছে কি ? এ সম্পর্কিত দলীলগুলো নিম্নে উপস্থাপন করা হল ।
কায়সারের শহর

আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহ তার বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে উল্লেখ করেন-
وَجَوَّزَ بَعْضُهُمْ أَنَّ الْمُرَادَ بِمَدِينَةِ قَيْصَرَ الْمَدِينَةُ الَّتِي كَانَ بِهَا يَوْمَ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تِلْكَ الْمَقَالَةَ وَهِيَ حِمْصُ وَكَانَتْ دَارَ مَمْلَكَتِهِ إِذْ ذَاكَ

অর্থাৎ কোন কোন উলামার মতে কায়সারের শহর দ্বারা ঐ শহরকে বুঝানো হয়েছে, যা হুযুর করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে কায়সারের অধীনে ছিল আর তা ছিল হিম্‌স বা হাম্‌স আর ঐ সময়ে সেখানেই কায়সারের শাসনকার্য চলত । [২]
এ বিষয়ক কোন হাদীসেই কুসতুনতুনিয়া শব্দের উল্লেখ হয়নি বরং উল্লেখ হয়েছে কায়সারের শহর এর । আর কায়সার রোমের বাদশাহর উপাধি । সে যেখানে অবস্থান করত সেটাকেই মদীনায় কায়সার বলা হত । আর এ মর্মে হাম্‌স ছিল সে শহর যেখানে প্রথম বাহিনী প্রেরণ হয় ১৫ হিজরীতে হযরত উমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে । যেখানে বহু শীর্ষস্থানীয় সাহাবা কেরাম অংশ নেন । আল্লামা ইবনে আসীর উল্লেখ করেন –
فَلَمَّا فَرَغَ أَبُو عُبَيْدَةَ مِنْ دِمَشْقَ سَارَ إِلَى حِمْصَ، فَسَلَكَ طَرِيقَ بَعْلَبَكَّ

অর্থাৎ হযরত আবু উবাইদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু দামেশক হতে বের বা’লাবাক্ক শহরের রাস্তা হয়ে হিমসের দিকে রওনা হলেন । [৩]
আল্লামা হাফেজ ইবনে কাসীর বর্ণনা করেন –
لَمَّا وَصَلَ أَبُو عُبَيْدَةَ فِي اتِّبَاعِهِ الرُّومَ الْمُنْهَزِمِينَ إِلَى حِمْصَ، نَزَلَ حَوْلَهَا يُحَاصِرُهَا، وَلَحِقَهُ خَالِدُ بْنُ الْوَلِيدِ فَحَاصَرُوهَا حِصَارًا شَدِيدًا، وَذَلِكَ فِي زَمَنِ الْبَرْدِ الشَّدِيدِ

অর্থাৎ ১৫ হিজরী সনে হযরত উমর ফারূক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হযরত আবু উবাইদাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন, তারা রোম বিজয় করে হিম্‌সের দিকে এগিয়ে যায়, পরবর্তীতে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাতে যোগ দেন । মুসলমানরা সেখানে অবস্থান নেন এবং অবরোধ করেন । সে সময় সেখানে প্রচন্ড শীত পড়ে এবং এ অবস্থায় মুসলমানরা কঠিন ধৈর্যের পরিচয় দেন । তারা হিমস জয় করেন । [৪]
এই ঘটনা তখনের যখন পাপিষ্ঠ ইয়াযিদের জন্মই হয়নি । ইয়াযিদের জন্ম প্রসঙ্গে ইতিহাসভিত্তিক বর্ণনা –
হাফেজ ইবনে কাসীরের মতে-
وُلِدَ سَنَةَ خَمْسٍ أَوْ سِتٍّ أَوْ سَبْعٍ وَعِشْرِينَ

অর্থাৎ ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়ার জন্ম ২৫/২৬/২৭ হিজরী সনে । [৫]
ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতীর মতে-
২৫/২৬ হিজরীতে , ইবনে হাজর আসকালানীর মতে উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে, ইবনে আসীরের মতে ২৬ হিজরীতে । [৬]
কুসতুনতুনিয়ায় ১ম হামলা

এ বর্ণনা দ্বারা উদ্দেশ্য কুসতুনতুনিয়া হলেও সে বাহিনীতে ইয়াযিদ ছিলনা । সুতরাং সে ক্ষমার সংবাদ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত নয় ।
আল্লামা হাফেজ ইবনে কাসীরের বর্ণনানুসারে –
وَفِيهَا غَزَا مُعَاوِيَةُ بِلَادَ الرُّومِ حَتَّى بَلَغَ الْمَضِيقَ مَضِيقَ الْقُسْطَنْطِينِيَّةِ وَمَعَهُ زَوْجَتُهُ عَاتِكَةُ

অর্থাৎ ৩২ হিজরী সনে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রোমে আক্রমণ করেন এবং একের পর এক স্থান অতিক্রম করেন এমনকি তার নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী কুসতুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌছে যায় । তার সাথে তার স্ত্রী আতিকাহও ছিলেন । [৭]
আল্লামা ইবনে আসীর বর্ণনা করেন –
قِيلَ: فِي هَذِهِ السَّنَةِ غَزَا مُعَاوِيَةُ بْنُ أَبِي سُفْيَانَ مَضِيقَ الْقُسْطَنْطِينِيَّةِ وَمَعَهُ زَوْجَتُهُ عَاتِكَةُ بِنْتُ قَرَظَةَ

অর্থাৎ বর্ণিত আছে, এ বছরই হযরত আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কুসতুনতুনিয়া পর্যন্ত আক্রমণ করেন এবং তার সাথে তার স্ত্রী আতিকাহ বিন্তে কারযাহ ছিল । [৮]
আল্লামা তাবারীর তারিখেও ৩২ হিজরীর ঘটনায় অনুরূপ উল্লেখ হয় ।
এটা ছিল কুসতুনতুনিয়ায় প্রথম হামলার বর্ণনা, যা ৩২ হিজরী সনে হয়েছিল । আর ইয়াযিদের জন্ম ২৫ বা ২৬ হিজরী সনে হয়েছিল । আর এ বর্ণনায় আমীর মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তার স্ত্রী ছিলেন আর কারো কথা উল্লেখ হয়নি ।
কুসতুনতুনিয়ায় ২য় হামলাঃ

কুসতুনতুনিয়ায় দ্বিতীয়বার অভিযান ৪৩ হিজরী সনে হয় । হাফেজ ইবনে কাসীরের বর্ণনা-
فِيهَا غَزَا بُسْرُ بْنُ أَبِي أَرْطَاةَ بِلَادَ الرُّومِ فَوَغَلَ فِيهَا حَتَّى بَلَغَ مَدِينَةَ قُسْطَنْطِينِيَّةَ

অর্থাৎ এ বছর অর্থাৎ ৪৩ হিজরীতে বসর বিন আবী আরতাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয় আর তা রোম ছড়িয়ে কুসতুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌছে যায় । [৯]
তারিখে ইবনে খালদুনে উল্লেখ হয়-
ثم دخل بسر بن أرطاة أرضهم سنة ثلاث وأربعين ومشى بها وبلغ القسطنطينيّة

অর্থাৎ অতঃপর হযরত বসর বিন আরতাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী রোমে প্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে তারা কুসতুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌছে যায় । [১০]
ইবনে জারীর তাবারীর তারিখে ৪৩ হিজরীর বর্ণনায় এর উল্লেখ হয় ।
কুসতুনতুনিয়ায় ৩য় হামলাঃ

কুসতুনতুনিয়ায় ৩য় অভিযান ৪৪ অথবা ৪৬ হিজরী সনে পরিচালিত হয় । তারিখে কামিলে ৪৪ হিজরীর বর্ণনায় উল্লেখ হয়-
فِي هَذِهِ السَّنَةِ دَخَلَ الْمُسْلِمُونَ مَعَ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ بِلَادَ الرُّومِ وَشَتَوْا بِهَا، وَغَزَا بُسْرُ بْنُ أَبِي أَرْطَأَةَ فِي الْبَحْرِ

অর্থাৎ এ বছর অর্থাৎ ৪৪ হিজরীতে মুসলিম বাহিনী হযরত আব্দুর রহমান বিন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে রোমে জিহাদ পরিচালনা করে আর শীতকালীন সময়ে সেখানে অবস্থান করেন । আর হযরত বসর বিন আবী আরতাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সমুদ্রপথে সেখানে আক্রমণ পরিচালনা করেন । [১১]
হাফেজ ইবনে কাসীরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াতেও অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় ।
তারিখে কামিলে ৪৬ হিজরীর বর্ণনায় উল্লেখ হয়-
فِي هَذِهِ السَّنَةِ كَانَ مَشْتَى مَالِكِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بِأَرْضِ الرُّومِ، وَقِيلَ: بَلْ كَانَ ذَلِكَ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ، وَقِيلَ: بَلْ كَانَ مَالِكُ بْنُ هُبَيْرَةَ

অর্থাৎ এ বছর অর্থাৎ ৪৬ হিজরীতে হযরত মালিক বিন আব্দুল্লাহ রোমে অবস্থান করেন, আর বলা হয় যে, আব্দুর রহমান বিন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সেখানে ছিলেন । আবার বলা হয়ে থাকে মালিক বিন হুবাইরাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন । [১২]
হাফিজ ইবনে কাসীরের বর্ননাতেও অনুরূপ উল্লেখ হয় ।
হযরত আব্দুর রহমান বিন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্ব দানের কথা কেবল ইতিহাসের কিতাবেই নয়, হাদীসের কিতাবেও তা উল্লেখ হয়েছে । আর তা সিহাহ সিত্তাহর কিতাব সুনানে আবী দাউদে-
عَنْ أَسْلَمَ أَبِي عِمْرَانَ قَالَ : غَزَوْنَا مِنَ الْمَدِينَةِ نُرِيدُ الْقُسْطَنْطِينِيَّةَ، وَعَلَى الْجَمَاعَةِ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ خَالِدِ بْنِ الْوَلِيدِ، وَالرُّومُ مُلْصِقُو ظُهُورِهِمْ بِحَائِطِ الْمَدِينَةِ، فَحَمَلَ رَجُلٌ عَلَى الْعَدُوِّ، فَقَالَ النَّاسُ: مَهْ مَهْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، يُلْقِي بِيَدَيْهِ إِلَى التَّهْلُكَةِ، فَقَالَ أَبُو أَيُّوبَ: ” إِنَّمَا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ فِينَا مَعْشَرَ الْأَنْصَارِ لَمَّا نَصَرَ اللَّهُ نَبِيَّهُ، وَأَظْهَرَ الْإِسْلَامَ قُلْنَا: هَلُمَّ نُقِيمُ فِي أَمْوَالِنَا وَنُصْلِحُهَا “، فَأَنْزَلَ اللَّهُ تَعَالَى: {وَأَنْفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ} فَالْإِلْقَاءُ بِالْأَيْدِي إِلَى التَّهْلُكَةِ أَنْ نُقِيمَ فِي أَمْوَالِنَا وَنُصْلِحَهَا وَنَدَعَ الْجِهَادَ “، قَالَ أَبُو عِمْرَانَ: فَلَمْ يَزَلْ أَبُو أَيُّوبَ يُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى دُفِنَ بِالْقُسْطَنْطِينِيَّةِ

অর্থাৎ আসলাম আবূ ইমরান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা মদীনা মুনাওয়ারাহ হতে কুসতুনতুনিয়া ( ইস্তাস্বুল) অভিমুখে যুদ্ধ যাত্রা করলাম। আমাদের সেনাপতি ছিলেন খালিদ ইবন ওয়ালীদের পুত্র আবদুর রহমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। রোমের সৈন্যদল ইস্তাম্বুল শহরের দেওয়ালে পিঠ লাগিয়ে যুদ্ধের জন্য দন্ডায়মান ছিল। এমতাবস্থায় এক ব্যক্তি শত্রু- সৈন্যের উপর আক্রমণ করে বসল। তখন আমাদের লোকজন বলে উঠল : থাম, থাম, লা ইলাহা ইল্লাহ্, সে তো নিজেই ধ্বংসের দিকে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে। তখন আবূ আইয়ূব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ( অনুচ্ছেদে বর্ণিত) এ আয়াত আমাদের আনসার সম্প্রদায় সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছিল। যখন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ সাহায্য করলেন এবং ইসলামকে জয়যুক্ত করলেন, তখন আমরা বলেছিলাম, আমরা যুদ্ধে না গিয়ে ঘরে থেকে আমাদের সহায় – সম্পদ দেখাশুনা করব এবং এর সংস্কার সাধন করব। তখন আল্লাহ্ এ আয়াত নাযিল করেনঃ ‘‘ আর তোমরা আল্লাহ রাস্তায় ব্যয় কর এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।’’ আমাদের ঘরে থেকে মালামালে রক্ষণাবেক্ষণ করা ও যুদ্ধে না যাওয়াই হল নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া। আবূ ইমরান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন , এ কারণেই আবূ আইয়ূব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আ্ল্লাহর রাস্তায় সর্বদা জিহাদে লিপ্ত থাকতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হয়ে কুসতুনতুনিয়ায় সমাহিত হলেন । [১৩]
তারিখে কামিলে ৪৬ হিজরীর বর্ণনা অনুসারে হযরত আব্দুর রহমান বিন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ৪৬ হিজরীতে হিমসে ওফাত লাভ করেন । বিদায়া নিহায়াতেও একই কথা উল্লেখ হয় ।
৪৭ হিজরী সনে মালিক বিন হুবাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে রোম অঞ্চলে অভিযান পরিচালিত হয় । এ বর্ণনাও তারিখে কামিল ও বিদায়া নিহায়াতে উল্লেখ হয় ।
উপরোক্ত আলোচনা হতে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, কুসতুনতুনিয়াতে প্রথম দিকে যে জিহাদ পরিচালিত হয় তাতে ইয়াযিদের অংশগ্রহণ ছিল না । তাহলে হাদীসের বক্তব্য অনুসারে সে কিভাবে ক্ষমাপ্রাপ্তদের দলে অন্তর্ভুক্ত হয় ?

কুসতুনতুনিয়ার জিহাদে ইয়াযিদের অন্তর্ভুক্তিঃ

কুসতুনতুনিয়ায় ইয়াযিদের অন্তর্ভুক্তির সাল নিয়ে নানা বর্ণনা উল্লেখ হয়, হাফেজ ইবনে কাসীর বলেন-
فِيهَا غَزَا يَزِيدُ بْنُ مُعَاوِيَةَ بِلَادَ الرُّومِ حتى بلغ قسطنطينية

অর্থাৎ এ বছর ইয়াযিদ বিন মু’আবিয়া রোমে আক্রমণ করে এবং এ বাহিনী কুসতুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌছে যায় । [১৪]
তারিখে তাবারীতেও ইবনে জারীর তাবারী একই বর্ণনা উল্লেখ করেন ।
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ উমদাতুল কারীতে উল্লেখ করেন –
أَن يزِيد بن مُعَاوِيَة غزا القسنطينية فِي سنة اثْنَتَيْنِ وَخمسين

অর্থাৎ ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া কুসতুনতুনিয়ায় অভিযানে ৫২ হিজরী সনে অংশ নেন । আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানীও ফাতহুল বারীতে একই বর্ণনা দেন ।
বর্ণিত হয়, এ সময়ে বহু সাহাবী তাতে অংশ নেন । হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদত ও দাফন এখানেই হয় । এরূপ বর্ণনা বুখারী শরীফের হাদীস হতেও পাওয়া যায়। কিন্তু তা হতে ইয়াযিদের ক্ষমাপ্রাপ্তির অন্তর্ভুক্তি হয় না । কেননা সুনানে আবু দাউদের বর্ণনা অনুসারে কুসতুনতুনিয়ায় হামলা আব্দুর রহমান বিন খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে হয় । এছাড়াও তারিখের(ইতিহাসের) কিতাবসমূহে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনীকে ৩২ হিজরীতে কুসতুনতুনিয়ায় অভিযানের কথা উল্লেখ হয় । আবার অন্য বর্ণনায় বসর বিন আবী আরতাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর বাহিনী ৪৩ হিজরীতে অভিযানের কথা উল্লেখ হয় । প্রথম বাহিনীতে ইয়াযিদ ছিল কই ? ইয়াযিদ কুসতুনতুনিয়ায় হামলাকারী বাহিনীতে ছিল কিন্তু প্রথম আক্রমণকারী বাহিনীতে নয় আর সেটা স্পষ্ট উল্লেখিত দলীলসমূহ হতে ।
ইয়াযিদ কুসতুনতুনিয়ায় আক্রমণকারী বাহিনীতে ছিল; কিন্তু তা জিহাদের উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাকে তো সেখানে শাস্তিস্বরূপ পাঠানো হয়েছিল । আল্লামা ইবনে আসীর বর্ণনা করেন –
فِي هَذِهِ السَّنَةِ، وَقِيلَ:سَنَةَ خَمْسِينَ، سَيَّرَ مُعَاوِيَةُ جَيْشًا كَثِيفًا إِلَى بِلَادِ الرُّومِ لِلْغَزَاةِ وَجَعَلَ عَلَيْهِمْ سُفْيَانَ بْنَ عَوْفٍ وَأَمَرَ ابْنَهُ يَزِيدَ بِالْغَزَاةِ مَعَهُمْ، فَتَثَاقَلَ وَاعْتَلَّ، فَأَمْسَكَ عَنْهُ أَبُوهُ، فَأَصَابَ النَّاسُ فِي غَزَاتِهِمْ جُوعٌ وَمَرَضٌ شَدِيدٌ، فَأَنْشَأَ يَزِيدُ يَقُولُ: مَا إِنْ أُبَالِي بِمَا لَاقَتْ جُمُوعُهُمُ … بِالْغَزْقَذُونَةِ مِنْ حُمَّى وَمِنْ مُومِ
إذا اتكأت على الأنماط مرتفقاً … بدير سمعان عندي أم كلثوموَأُمُّ كُلْثُومٍ امْرَأَتُهُ، وَهِيَ ابْنَةُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَامِرٍ.فَبَلَغَ مُعَاوِيَةَ شِعْرُهُ فَأَقْسَمَ عَلَيْهِ لَيَلْحَقَنَّ بِسُفْيَانَ إِلَى أَرْضِ الرُّومِ لِيُصِيبَهُ مَا أَصَابَ النَّاسَ، فَسَارَ وَمَعَهُ جَمْعٌ كَثِيرٌ أَضَافَهُمْ إِلَيْهِ أَبُوهُ
অর্থাৎ এই বছর, অর্থাৎ, ৪৯ বা ৫০ হিজরী সালে হযরত আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রোমের উদ্দেশ্যে এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি এর দায়িত্বভার অর্পণ করেন সুফিয়ান বিন আউফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি এবং তাঁর ছেলে ইয়াযিদকে ওই বাহিনীর সাথে যেতে নির্দেশ দেন। কিন্তু ইয়াযিদ অসুস্থ হওয়ার ভান করে এবং যেতে অস্বীকৃতি জানায়। এ অভিযানে মুসলিম যোদ্ধারা ক্ষুধা ও রোগ-ব্যাধিগ্রস্ত এবং নানা কঠিন পরিস্থিতির শিকার হন । ইয়াযিদের কাছে যখন এ খবর আসে, তখন সে ব্যঙ্গ করে কবিতায় বলে, ‘ফারকুদওয়ানা-এ মহা গযবে তারা পতিত হয়েছে; তাদের জ্বর বা অন্য যা-ই কিছু হোক, তাতে আমার যায় আসে না। কেননা, আমি বসে আছি উচ্চ ফরাশে (ম্যাট্রেস), আর আমার বাহুবন্ধনে আছে উম্মে কুলসুম ।’ উম্মে কুলসুম ছিলেন ইয়াযিদের স্ত্রীদের একজন আব্দুল্লাহ বিন আমের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা । হযরত আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু যখন এই কবিতার শ্লোক সম্পর্কে জানতে পারেন, তখন তিনি এয়াযীদকে শপথ গ্রহণ করতে ও কনস্টানটিনোপোলে সুফিয়ান ইবনে আউফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সাথে যোগ দিতে বাধ্য করেন, যাতে করে ’সেও ইসলামের মুজাহিদদের মোকাবেলাকৃত কঠিন পরীক্ষার অংশীদার হতে পারে’ (এটি ইয়াযিদের প্রতি শাস্তি ছিল)। এমতাবস্থায় ইয়াযিদ অসহায় হয়ে পড়ে এবং তাকে যুদ্ধে যেতে হয়; আর হযরত আমীরে মু’আবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তার সাথে আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করেন । [১৫]
এ ঘটনা ইবনে খালদুনের তারিখেও উল্লেখ হয় । [১৬]
এ থেকেই বুঝা যায় ইয়াযিদের মুসলিম বাহিনীতে অন্তর্ভূক্তি কিভাবে হয়েছে । সে মুসলিম সৈন্যদের নিয়ে বিদ্রুপ করার দরুন শাস্তিস্বরূপ সেখানে প্রেরিত হয় ।
আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর উমদাতুল কারীতে উল্লেখ করেন-
الْأَظْهر أَن هَؤُلَاءِ السادات من الصَّحَابَة كَانُوا مَعَ سُفْيَان هَذَا وَلم يَكُونُوا مَعَ يزِيد بن مُعَاوِيَة، لِأَنَّهُ لم يكن أَهلا أَن يكون هَؤُلَاءِ السادات فِي خدمته

অর্থাৎ অসংখ্য সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম হযরত সুফিয়ান ইবনে আউফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর অধীনে যুদ্ধে গিয়েছিলেন এবং ‘ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে যান নি, কেননা সে তাঁদেরকে নেতৃত্বদানে অযোগ্য ছিল ‘। [১৭]
এরপরেও ইয়াযিদ প্রেমীরা তাকে ক্ষমাপ্রাপ্ত বা জান্নাতী দাবী কিভাবে করতে পারে, যেখানে কায়সারের শহর বা কুসতুনতুনিয়ায় আক্রমণকারী প্রথম বাহিনীতে সে ছিলই না । হাদীসে প্রথম বাহিনীর কথা বলা হয়েছিল, সেখানে যারা জিহাদ করবে সকলের কথা বলা হয়নি । এরপরও মেনে নেয়া হল সে ছিল, এর দ্বারা তার পরবর্তী গুনাহের কাজ, অনুমোদন ইত্যাদি যে মাফ হবে তা কিভাবে হয় । হাদীস শরীফে বহু জায়গায় ক্ষমার কথা উল্লেখ আছে এমনকি ”লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলার কারণে জান্নাতী হবার ঘোষণাও আছে। এর মানে এ নয় যে, এতে করে সব হিসেব নিকেশ মাফ হয়ে যাবে, এমন হলে তো আমলের প্রয়োজনই ছিল না । ক্ষমা তারই হবে যে এর উপযুক্ত থাকবে । আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী বলেন-
فَإِن قلت: قَالَ، صلى الله عَلَيْهِ وَسلم، فِي حق هَذَا الْجَيْش: مغْفُور لَهُم. قلت: لَا يلْزم، من دُخُوله فِي ذَلِك الْعُمُوم أَن لَا يخرج بِدَلِيل خَاص، إِذْ لَا يخْتَلف أهل الْعلم أَن قَوْله، صلى الله عَلَيْهِ وَسلم: مغْفُور لَهُم، مَشْرُوط بِأَن يَكُونُوا من أهل الْمَغْفِرَة حَتَّى لَو ارْتَدَّ وَاحِد مِمَّن غَزَاهَا بعد ذَلِك لم يدْخل فِي ذَلِك الْعُمُوم، فَدلَّ على أَن المُرَاد مغْفُور لمن وجد شَرط الْمَغْفِرَة فِيهِ مِنْهُم

অর্থাৎ যদিও ইয়াযিদ এই বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়, তবুও সে এই সুসংবাদের হুকুম হতে বের হয়ে যায় তার পরবর্তী কৃতকর্মের কারণে । এ জন্যে যে, উলামা কেরামের এই মাসয়ালায় ঐকমত্য আছে যে হুযুর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই ঘোষণা ‘ তাদের ক্ষমা করে দেয়া হবে’ কাজে দিবে এই শর্তে যে এর পরবর্তীতেও তারা এর উপযুক্ত থাকবে । পরে যদি কেউ ইসলাম হতে বের হয়ে যায়, ফাসিক, মুরতাদ হয়ে যায় তবে তার অন্তর্ভুক্তি হবে না । সুতরাং এ যুদ্ধে অংশ নেয়া লোকেরা ক্ষমা পাবে তখনই যখন এর উপযুক্ততা তদের মধ্যে উপস্থিত পাওয়া যাবে । [১৮]
উলামায়ে আহলে সুন্নাতের মতে ইয়াযিদ একজন পাপিষ্ঠ ও অভিশপ্ত ব্যক্তি । এতে কোন প্রকার সংশয় রাখা যাবে না । আর যে ব্যক্তির নির্দেশে আহলে বায়তের উপর নির্মমভাবে হামলা হয়, শহীদ করা হয় তাদের । শহীদ হন হযরত ইমাম হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। অপদস্থ হন আহলে বায়তের পবিত্র নারীগণ, হামলা হয় পবিত্র দুই শহর মক্কা ও মদীনা শরীফে, শহীদ করা হয় সাহাবা ও তাবেয়ী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমদের, পবিত্রতা নষ্ট করা হয় মক্কা-মদীনা শরীফের, মসজিদে নববীর পবিত্রতা নষ্ট করা হয়, আজান বন্ধ করা হয়, কাবা ঘরের গিলাফ পোড়ানো হয় । এমনকি ইয়াযিদের মৃত্যুও হয় যখন মক্কা মুকাররামায় আগুন জ্বলছিল আর আর তার পাশে ছিল মদের পেয়ালা । একজন বিবেকবান মাত্রই বলতে ও বুঝতে সক্ষম যে, এ প্রকার ব্যক্তি ক্ষমাপ্রাপ্ত হয় কিভাবে । অথচ যে বাহিনীতে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তাকে বর্তমানে জান্নাতী বানানোর ঘৃণ্য পায়াতারা চালানো হচ্ছে, সে বাহিনীকে নিয়েই সে বিদ্রুপ করেছিল, আর তারই শাস্তি স্বরূপ সে সেখানে যেতে বাধ্য হয় । আল্লাহ আমাদের এসকল ফিতনা হতে হিফাজত করুন এবং তাঁর প্রিয় হাবীব, তাঁর আসহাব ও আহলে বাইতের পথে অটল রাখুন । আমিন, বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালীন ।
তথ্যসূত্রঃ

১. সহীহ আল বুখারী, কিতাবুল জিহাদ, ৪:৪২ হাদীস নং- ২৯২৪/২৭৬৬ , ৫ম খণ্ড ১৮৩ পৃষ্ঠা হাদীস-২৭২৩ [ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ], তাবরানী আল মু’জামুল কবীর ২৫:১৩৩ হাদীস-৩২৩ মাকতাবা ইবনে তাইয়্যিমাহ কায়রো ।
২. আসকালানী ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী ৬:১০৩ দারুল মা’রেফাহ বৈরুত ।
৩. ইবনে আসীর তারিখে কামিল ২:৩২২ দারুল কিতাবিল আরাবী বৈরুত ।
৪. ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া,৮:২৪৮ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসুল আরাবী বৈরুত, ৭:৫২ দারুল ফিকর বৈরুত ।
৫. ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া,৮:২৪৮ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসুল আরাবী বৈরুত, ৮:২২৬ দারুল ফিকর বৈরুত ।
৬. সুয়ূতী তারিখুল খুলাফা ১৫৬ পৃঃ (ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া অধ্যায়), ইবনে আসীর তারিখে কামিল ২:৪৬০ দারুল কিতাবিল আরাবী বৈরুত, তাহযীবুত তাহযীব ১১:৩৬০ ।
৭. ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭:১৭৯ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসুল আরাবী বৈরুত, ৭:১৫৯ দারুল ফিকর বৈরুত ।
৮. ইবনে আসীর তারিখে কামিল ২:৫০৩ দারুল কিতাবিল আরাবী বৈরুত।
৯. ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:২৭ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসুল আরাবী বৈরুত, ৮:২৪ দারুল ফিকর বৈরুত ।
১০. তারিখে ইবনে খালদুন ৩:১১ দারুল ফিকর বৈরুত ।
১১. ইবনে আসীর তারিখে কামিল ৩:৩৮ দারুল কিতাবিল আরাবী বৈরুত।
১২. ইবনে আসীর তারিখে কামিল ৩:৫১ দারুল কিতাবিল আরাবী বৈরুত।
১৩. সুনানে আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ হাদীস নং-২৫১২, হাকেম আল মুস্তাদরিকু আলাস সাহিহাইন, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস-২৪৩৪ ।
১৪. ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮:৩৬ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসুল আরাবী বৈরুত, ৮:৩২ দারুল ফিকর বৈরুত ।
১৫. ইবনে আসীর তারিখে কামিল ৩:৫৬,৫৭ দারুল কিতাবিল আরাবী বৈরুত।
১৬. তারিখে ইবনে খালদুন ৩:১২ দারুল ফিকর বৈরুত ।
১৭. উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী, বাবু মা ক্বীলা ফি ক্বিতালির রূম, ১৪:১৯৮,১৯৯ দারু ইহয়ায়ুত তুরাসুল আরাবী বৈরুত ।
১৮. প্রাগুপ্ত ১৪:১৯৯ ।

হিজরী সাল বা মুসলিম বর্ষপন্জী

Standard

— ইমরান বিন বদরী
নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ
পাঠকমণ্ডী, মুসলিম হিসেবে হিজরী নববর্ষ উদযাপন কিংবা মুসলিমদের গৌরবের দিনটি পালনের ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে ব্যাপকতা লাভ করেনি। আমরা অনেকেই জানি না যে মুসলিমদের নববর্ষ কোন্ মাসে হয়? আবার কেউ হয়তবা হিজরীবর্ষ গণনার সঠিক ইতিহাসও জানেন না। হিজরী সালের তারিখের খবরও রাখেন না। এর প্রতি মানুষ আকর্ষণও অনুভব করেন না। তা খুব দুঃখজনক। আর আমরা যারা মুসলমান আমাদের হিজরী সাল সম্পর্কে জানাটা অত্যাবশ্যক। আর সেই লক্ষেই আজ আমার এই লেখা। আশা করি লেখাটি বিস্তারিত পড়ে দেখবেন।

আল্লাহ পাক তাঁর ইবাদতের জন্যে যেমন মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তাদের হিদায়াতের জন্যে যুগে যুগে নবী ও রাসূলবৃন্দ (আ:)-কেও প্রেরণ করেছেন। তাঁরা নিজেদের সকল চেষ্টা, শ্রম ও সাধনা এ পথে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন। দিন-রাত মানুষকে আহ্বান করেছেন আল্লাহর পথে। কিন্তু খুব কম লোকই নবী রাসূল (আ:)-বৃন্দের হক্বের দাওয়াতকে কবুল করেছে। অধিকাংশ লোক তাঁদের দাওয়াতকে অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং আল্লাহর এই প্রিয় বান্দাদেরকে নানাভাবে অত্যাচার ও নিপীড়ন করেছে। তাঁদের ইবাদতে-দাওয়াতে বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। তাঁদেরকে মাতৃভূমি থেকে উৎখাত করার, এমনকি হত্যা করার চক্রান্তও করা হয়েছে।
যেমন, কুরাইশদের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ জাল্লা শানুহু জানান,

وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُواْ لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللّهُ وَاللّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ
এবং হে মাহবূব, স্মরণ করুন, যখন কাফির (গোষ্ঠী) আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলো যে আপনাকে বন্দি করে রাখবে কিংবা শহীদ করবে অথবা নির্বাসিত করবে এবং তারা নিজেদের মতো ষড়যন্ত্র করছিলো; আর আল্লাহ নিজের গোপন কৌশল (প্রয়োগ) করছিলেন; এবং আল্লাহর গোপন কৌশল সর্বাপেক্ষা উত্তম। (সূরা আনফাল: ৩০; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’)

কাফিরদের এসব গর্হিত ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের ফলে একদিকে যেমন তারা আল্লাহর কঠিন আযাবের উপযুক্ত হয়ে যেতো, অন্যদিকে এতে এই সকল নবী (আ:)-দের জীবনে আল্লাহর রাহে কুরবানী, সবর ও মহাব্বতের কঠিন পরীক্ষাও হয়ে যেতো। এহেন কঠিন পরিস্থিতিতেই তাঁদের জীবনে নেমে আসতো হিজরতের খোদায়ী বা ঐশী আদেশ।

হিজরী একটি চন্দ্রনির্ভর বর্ষপঞ্জি। এটি চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে। আর পৃথিবীব্যাপী মুসলমান সমাজ তা অনুসরণ করেন ইসলামের পবিত্র দিনসমূহ উদযাপনের উদ্দেশ্যে। ৬২২ খ্রীষ্টাব্দে আল্লাহর নির্দেশে সাইয়্যেদুল মুরসালীন (নবীকুল সরদার) , সাফিউল মুজনেবিন (পাপী-তাপীর সুপারিশকারী), খাতামুন্ নাবিয়্যীন (সর্বশেষ নবী) আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাথী খোলাফায়ে রাসূল হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহুকে নিয়ে মক্কা থেকে উত্তরে অবস্থিত ইয়াসরিব শহরে (মদীনা মোনাওয়ারায়) হিজরত করেন।

হিজরতের সময় মদীনার সর্বস্তরের জনগণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বাগত জানান এই বলে –

طلع البدر علينا, من سانية البداع ‘তালা আল বাদরু আলাইনা মিন সানিয়াতিল বিদা।
وجب الشكر علينا, ما دعا لله داع ওয়াজাবাশ শুকরু আলাইনা,মা দা‘আ লিল্লাহি দা’।
أيها المبعوث فينا, جئت بالأمر المطاع আইয়্যুহাল মাব উসু ফি-না,জি’তা বিল আমরিল মুতা।
جئت شارادا المدينة, مرحبا يا خير داع জি’তা শাররাদ্দাল মাদিনা,মারহাবান ইয়া খাইরা দা।

অর্থাৎ: “পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে আমাদের ওপর, বিদা পাহাড়ের চূড়া থেকে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের পক্ষে ওয়াজিব হয়েছে, আহবানকারীর আল্লাহর প্রতি আহবানের বিনিময়ে। যতোদিন পর্যন্ত আল্লাহর পথের দিকে কোনো একজন আহ্বানকারী থাকবে। আমাদের মাঝে প্রেরিত হে প্রিয়জন! আপনি বাধ্যতামূলক আনুগত্যের নির্দেশনা নিয়ে এসেছেন, এসেছেন অকল্যাণসমূহ দূর করতে। শুভেচ্ছা-স্বাগতম! হে সর্বোত্তম পথের প্রতি আহ্বানকারী।” এ কথা বলে বলে তাঁরা অভ্যর্থনা ঞ্জাপন করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মভূমি ত্যাগ করার ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যেই এ ঘটনাকে ইসলামে ‘হিজরত’ আখ্যা দেয়া হয় বা হিজরী সাল গণনার সূচনা হয়। হিজরতের ১৭তম বর্ষে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহু‘র শাসনামলে চন্দ্র মাসের হিসেবে এই পঞ্জিকা প্রবর্তন করা হয়। হিজরতের এই ঐতিহাসিক তাৎপর্যের ফলেই হযরত ওমর রাদিআল্লাহু আনহু’র শাসনামলে যখন মুসলমানদের জন্যে পৃথক ও স্বতন্ত্র পঞ্জিকা প্রণয়নের কথা ওঠে আসে, তখন তাঁরা সর্বসম্মতভবে হিজরত থেকেই এই পঞ্জিকার গণনা শুরু করেন, যার ফলে চাঁদের মাসের এই পঞ্জিকাকে বলা হয় ‘হিজরী সাল’।
ইসলামে রমযানের রোযা, ঈদ, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে চন্দ্রবর্ষ বা হিজরী সাল ধরেই আমল করতে হয়। রোযা রাখতে হয় চাঁদ দেখে, ঈদ করতে হয় চাঁদ দেখে। এভাবে অন্যান্য আমলও। অর্থাৎ, আমাদের ধর্মীয় কতোগুলো দিন-তারিখের হিসেব-নিকেশের ক্ষেত্র রয়েছে, সেগুলোতে চাঁদের হিসেবে দিন, তারিখ, মাস ও বছর হিসেব করা আবশ্যক। মুসলমানদের (আমাদের) জন্যে ‘হিজরী সাল’ অনুসরণ করা জরুরি।

কুরআন মজীদে হজ্বের বিষয়কে চাঁদের ওপর নির্ভরশীল ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন –

يَسْأَلُونَكَ عَنِ الأهِلَّةِ قُلْ هِيَ مَوَاقِيتُ لِلنَّاسِ وَالْحَجِّ – আপনার কাছে তারা জিজ্ঞেস করে নতুন চাঁদের বিষয়ে। বলে দিন যে এটি মানুষের জন্যে সময় নির্ধারণ এবং হজ্বের সময় ঠিক করার মাধ্যম। (সূরা বাকারা: ১৮৯)

রোযার বিষয়কে চাঁদের ওপর নির্ভরশীল ঘোষণা করা হয়েছে। সূরা বাক্বারাহ আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন –
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ – রমযান মাস-ই হলো সে মাস, যা’তে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্যে হেদায়েত এবং সত্য-পথযাত্রীদের জন্যে সুষ্পষ্ট পথনির্দেশ, আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্যবিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। (সূরা বাক্বারাহ: ১৮৫)

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তোমরা চাঁদ দেখে রোযা রাখো এবং চাঁদ দেখে ইফতার করো। (সহীহ বুখারী: ১৯০৯)
হিজরী মাসের নামসমূহ নিম্নরূপ:
মুহররম محرّم
সফর صفر
রবিউল আউয়াল ربيع الأول
রবিউস সানি ربيع الآخر أو ربيع الثاني
জমাদিউল আউয়াল جمادى الأول
জমাদিউস সানি جمادى الآخر أو جمادى الثاني
রজব رجب
শা’বান شعبان
রমজান رمضان
শাওয়াল شوّال
জ্বিলকদ ذو القعدة
জ্বিলহজ্জ ذو الحجة
পাঠকমণ্ডলী, আমাদের উচিত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিজরতের তাৎপর্য স্পষ্টভাবে জনসম্মুখে তুলে ধরা এবং হিজরী সাল অনুসরণ করা। আপনারা সবাই মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।

                                                                 *সমাপ্ত*

ফরয গোসলের মাসআলা

Standard

হাদীছ= মূসা ইবনু ইসমা‘ঈল (রহঃ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মায়মূনা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য গোসলের পানি রাখলাম। তিনি তাঁর হাত দু’বার বা তিনবার ধুয়ে নিলেন। পরে তাঁর বাম হাতে পানি নিয়ে তাঁর লজ্জাস্থান ধুয়ে ফেললেন। তারপর মাটিতে হাত ঘষলেন। তারপর কুলি করলেন, নাকে পানি দিলেন আর তাঁর চেহারা ও দু’হাত ধুয়ে নিলেন। এরপর তাঁর সারা দেহে পানি ঢাললেন। তারপর একটু সরে গিয়ে দু’পা ধুয়ে নিলেন। {সহীহ বুখারী}
হাদীছ= আবদুল্লাহ ইবনু যুবাইর হুমায়দী (রহঃ) মায়মূনা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানবাতের গোসল করলেন। তিনি নিজের লজ্জাস্থান ধুয়ে ফেললেন। তারপর হাত ঘষলেন এবং তা ধুইলেন। তারপর সালাত (নামায)-এর উযূর মত উযূ করলেন। গোসল শেষ করে তিনি তাঁর দু পা ধুইলেন।
হাদীছ= মূসা ইবনু ইসমা‘ঈল (রহঃ) ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মায়মূনা (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য গোসলের পানি রাখলাম। তিনি তাঁর হাত দু’বার বা তিনবার ধুয়ে নিলেন। পরে তাঁর বাম হাতে পানি নিয়ে তাঁর লজ্জাস্থান ধুয়ে ফেললেন। তারপর মাটিতে হাত ঘষলেন। তারপর কুলি করলেন, নাকে পানি দিলেন আর তাঁর চেহারা ও দু’হাত ধুয়ে নিলেন। এরপর তাঁর সারা দেহে পানি ঢাললেন। তারপর একটু সরে গিয়ে দু’পা ধুয়ে নিলেন।{সহীহ বুখারী}
★হাদীসের দ্বারা প্রতিয়মাণ হল যে, জানাবাত ব্যক্তি {যার উপর গোসল ফরজ হয়েছে } সর্বপ্রথম দুই হাত তিনবার ধুয়ে বাম হাতে পানি নিয়ে লজ্জাস্থান থেকে নাপাকি দূর করে মাটির সাথে বা সাবান দিয়ে হাত ভালোভাবে ঘষবে।। তারপর অজু করে সমস্ত শরির ভালোভাবে ধৌত করবে। যদি এমন জায়গায় গোসল করা হয় যেখানে পানি জমে থাকে তবে গোসল শেষে শুকনা জায়গায় এসে পা ধৌত করবে।।।
★জানাবাতের কাপড় ধোয়ার নিয়ম:- প্রথমে কাপড় থেকে প্রকাশ্য নাপাকি দূর করে ভালো পানিতে একবার বা তিনবার চুবিয়ে নিলে কাপড় পাক হয়ে যাবে।। আর নাপাকি যদি অপ্রকাশ্য {যা দেখা যায়না } হয় তবে তিনবার নতুন নতুন ভালো পানিতে চুবিয়ে নিতে হবে, এবং প্রতিবার চুবানোর পর কাপড় ভালো করে চিপতে হবে তারপর দ্বিতীয়বার এভাবে তিনবার …. ধোয়ার পর কাপড় পাক হয়ে যাবে ….