জানাজার নামাজের পর হাত তোলে দোআ করা সুন্নাত

Standard

image

✔️✔️জানাযা নামাজের পর মৃত ব্যক্তির জন্য হাত উঠিয়ে দোয়া করা সুন্নাত ।

সালাতুল জানাযা তথা জানাযার নামাজ ফরজে কিফায়াহ। জানাযা নামাজের পূর্বে, পরে ও দাফনের পরে মাইয়্যিতের জন্য হাত উঠিয়ে দোয়া করা জায়িয ও সুন্নাত।

জানাযা নামাজের পর কাতার ভঙ্গ করে মাইয়্যিতের জন্য ইজতিমায়ী ভাবে হাত তুলে দোয়া করা জায়িয ও সুন্নাত।

এটাই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত এর ফতওয়া গ্রাহ্য মত।
যারা এ মতের বীপরিত মত পোষন করে, তাদের কথা পরিত্যজ্য এবং কুরআন, হাদীস, ইজমা, ও কিয়াসের খিলাফ।

মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বলেন-

واذا سألك عبادي عني فاني قريب اجيب دعوة الدعي اذا دعان

হে আমার রাসূল (সা:) ! আমার বান্দাগণ যখন আপনার কাছে জিজ্ঞাসা করে, আমার ব্যাপারে মূলত আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা দোয়া করে তাদের দোয়া কবুল করে নেই।যখন আমার কাছে দোয়া করে।
(সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৬)

অত্র আয়াতে কারীমায় اذا دعان যখনই দোয়া করবে এর দ্বারা অন্যান্য সময়ের মত জানাযা নামাজের পরের সময়টিও অন্তর্ভুক্ত। যা এই আয়াতের হুকুম থেকে খালি নয়।

তাই, জানাযা নামাজের পরও দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়টি এই আয়াতে দৃষ্টিগোচর হয়। তাই জানাযা নামাজের পর দোয়া করা জায়িয।

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা:) থেকে বর্ণিত,

النبي صلي الله عليه وسلم قال ما من عبد يبسط كفيه في دبر كل صلوة يقول اللهم الهي . . . . الا كان حقا علي الله ان الا يرد يديه خأئبتين

রাসূল (সা:) বলেন, যখন কোন বান্দা প্রত্যেক নামাজের পর উভয় হাত উঠিয়ে বলবে, আয় আল্লাহ পাক . . . . তখন আল্লাহ পাক উনার দায়িত্ব হয়ে যায়, তাকে খালি হাতে না ফিরানো। (আল আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইল লিইবনিস সিন্নী)।

এই হাদীস থেকে কি জানাযার নামাজ বাদ পরে যায়?

হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত,

قال سمعت رسول الله صلي الله عليه وسلم يقول اذا صليتم علي الميت فاخلصوا له الدعاء

রাসূল (সা:) বলেছেন, যখন তোমরা মৃত ব্যক্তির জানাযা পড়ে ফেল, তখন তার জন্য খাছ করে দোয়া কর। (আবু দাউদ শরীফ; ২/৪৫৬ পৃষ্ঠা)

হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত,

قال رسول الله صلي الله عليه وسلم علي جنازة فقال اللهم اغفر لحينا وميتنا وصغيرنا وكبيرنا وذكرنا وانثانا وشاهدنا وغائبنا اللهم من احييته منا فاحيه علي الايمان ومن توفيته منا فتوفه علي الاسلام اللهم لا تحرمنا اجره ولا تضلنا بعده

রাসূল (সা:) জনৈক ব্যক্তির জানাযার নামাজ আদায়ের পর এরূপ দোয়া করেন, ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাদের জীবিত ও মৃতদের ক্ষমা করুন।
আমাদের ছোট ও বড় , পুরুষ ও মহিলা, উপিস্থত ও অনুপস্থিত সকলকে ক্ষমা করুন।

ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাদের মাঝে যাকে জীবিত রাখেন, তাকে ঈমানের উপর জীবিত রাখুন এবং যাকে মৃত্যু দেন তাকে ইসলামের উপর মৃত্যু দান করুন।

ইয়া আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে বিনিময় হতে মাহরূম করবেন না এবং এরপর আমাদেরকে গোমরাহ করবেন না। (আবু দাউদ শরীফ; ২/১০০ পৃষ্ঠা )

এনায়া শহরে হেদায়া গ্রন্থে উল্লেখ আছে –

روي ان رسول الله صلي الله عليه وسلم وأي رجلا فعل هكذا بعد الفراغ من الصلاة فقال صلي الله عليه وسلم ادع استجيب لك

রাসূল (সা:) সালাতুল জানাযার পরে জনৈক ব্যক্তিকে এমত দোয়া করতে দেখে তাকে সম্বোধন করে বললেন দোয়া কর্।নিশ্চয়ই তোমার দোয়া কবুল করা হবে। (এনায়া শহরে হেদায়া)

অন্য হাদীসে আছে-

روي عن ابن عباس رضي الله تعالي عنهما وابن عمر رضي الله تعالي عنهما انهما فاتهما الصلاة علي الجنازة فلما حضرا مازادا علي الاستغفارله

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) ও হযরত ইবনে উমর (রা:) থেকে বর্ণিত। তাদের দু’জনের একদা জানাযা নামাজ ফউত হলো। যখন তারা (নামাজের পর মাইয়্যিতের কাছে) উপস্থিত হলেন, তখন মাইয়্যিতের জন্য অতিরিক্ত ইস্তিগফার করলেন।(আল মাবসূত লিস সারাখসী; ২য় জি: ৬৭ পৃষ্ঠা)

অন্য যায়গায় উল্লেখ আছে-

وعبد الله ابن سلام رضي الله عنه فاتته الصلاة علي جنازة عمر فلما حضر قال ان سبقتموني با الصلاة عليه فلا تسبقوني بالدعاء

হযরত আব্দুল্লাহ বিন সালাম (রা:) আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা:) এর জানাযার নামাজ পাননি। (জানাযার পর) তিনি যখন (সেখানে) উপস্থিত হলেন তখন বললেন, “তোমরা জানাযার নামাজ যদিও আমার পূর্বে পড়ে ফেলেছ, তবে দোয়ার ক্ষেত্রে আমার থেকে অগ্রগামী হয়ো না।
(আল মাবসূত লিস সারাখসী; ২য় জি: ৬৭ পৃষ্ঠা)

হযরত ইমাম আবু হানীফা (রহ:) বলেন যে, দাফনের পরে নয় বরং দাফনের আগে সমবেদনা জ্ঞাপন করা সুন্নাত।কেননা, দাফনের আগে বিরহ-বেদনা অনেক বেশি থাকে।তাই (দাফনের পূর্বে) শোক প্রকাশ করবেন এবং মাইয়্যিতের জন্য দোয়া করবেন।(মিযানুল কুবরা নিশ শা’রানী, জায়াল হক্ব ১ম হিচ্ছা ২৬৪ পৃষ্ঠা)

নাফিউল মুসলিমীন কিতারে উল্লেখ আছে যে, মাইয়্যিতের জন্য দাফনের পূর্বে (অর্থাৎ জানাযা নামাজের পর) উভয় হাত উঠিয়ে দোয়া করা জায়িয।(জাওয়াহিরুন নাফীস শরহে দুররুল ক্বাইস; ১৩২ পৃষ্ঠা)
(নাফিউল মুসলিমীন)

✅ দেওবন্দী উলামায়ে কেরামের অভিমত।

প্রশ্ন: জানাযা নামাজের পর ঈসালে সওয়ার প্রসঙ্গে: সওয়াল ৩১০৩): জানাযা নামাজের পর মৃতের ওলী উপস্থিত মুসল্লীদেরকে লক্ষ করে বলেন যে, আপনারা তিন বার সূরা ইখলাছ পড়ে মাইয়্যিতের উপর সওয়ার বখশিয়ে দিন। (এটা কিরূপ?)

জওয়াব: এরূপ করাতে কোন দোষ বা ক্ষতি নেই। সুতরাং জানাযা নামাজের পর যদি সকল লোক অথবা কিছু লোক সূরা ইখলাছ তিনবার পড়ে মাইয়্যিতের জন্য সওয়ার রিসানী করে তাতে কোনই ক্ষতি নেই। (অর্থাৎ জায়িয) (ফতওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ ৫ম জি: ৪১৮ পৃষ্ঠা)

জানাযা নামাজের পর ঈসালে সওয়ার প্রসঙ্গে: সওয়াল ৩১৩৪) জানাযা নামাজের পর দাফনের পূর্বে কতক মুসল্লী (মৃতের প্রতি) সওয়ার রিসানী করার জন্য অল্প আওয়াজে একবার সূরা ফাতিহা, তিনবার সূরা ইখলাছ পড়া এবং জানাযা নামাজের ইমাম অথবা কোন নেক লোকের জন্যে (জানাযা নামাজের পরে) উভয় হাত উঠিয়ে সংক্ষিপ্ত দোয়া করা জায়িয কি না?

জওয়াব: এরূপ পদ্ধতিতে দোয়া করাতে কোন ক্ষতি নেই।
(ফতওয়ায়ে দারুল উলূম দেওবন্দ, ৫ম জি: ৪৩৪, ৪৩৫)

অতএব উপরোক্ত বর্ণনার পরে প্রতিয়মান হয় যে কেহ যদি জানাযার নামাজ পর মৌখিকভাবে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করে তবে তা সুন্নাত হিসেবে প্রমাণিত হবে।

আর সবাই মিলে দু’হাত তুলে মহান আল্লাহর কাছে মৃত ব্যক্তির ক্ষমা প্রার্থনা করে তবে তা আরো উত্তমতার দাবী রাখে।

Advertisements

রসুলে পাকের ইন্তিকালের সময় মালাকুল মাওতের কথাবার্তা

Standard

রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ইন্তিকালের সময় মালাকুল মাওতের আগমন ও কথাবার্তা
=======================
রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আজরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর সাথে কথা বলেছেন, এ মর্মে সহিহ সূত্রে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
মিশকাত শরীফে ’’বাবু ওফাতুন্নাবী’’ সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধ্যায়ে হযরত আলী ইবনে হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর একটি দীর্ঘ হাদিস রয়েছে, উক্ত হাদীসে আজরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘটনাটি এভাবে উল্লেখ আছে।
** -‘‘অতঃপর আজরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর হুযরা মোবারকে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তারপর জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! এই যে মালাকুল মওত আজরাঈলও আপনার নিকট আসবার অনুমতি চাই”ছেন। তিনি একমাত্র আপনি ব্যতিত আর কখনও কোন মানুষের নিকট আসতে অনুমতি চাননি। অতএব তাকে প্রবেশের অনুমতি দিন। তখন হুযুর পাক (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে অনুমতি দিলেন। তিনি এসে হুজুর (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে সালাম করলেন এবং বললেন, আপনি অনুমতি দিলে আপনার রূহ মোবারক কবজ করব। আর আমাকে তা বাদ দিতে বললে, আমি তা বাদ দিব। তখন হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে আজরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনি কি এইরূপ করতে পারবেন? আজরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হ্যাঁ, আমি এরূপও আদিষ্ট হয়েছি যে, আমি যেন আপনার নির্দেশ অনুযায়ী চলি। রাবী বলেন, এই সময় হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হযরত জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর দিকে তাকালেন। জিবরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, হে মুহাম্মদ (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আল্লাহ পাক আপনার সাক্ষাত লাভের জন্য অত্যন্ত আগ্রহী। এটা শুনামাত্র হুযুরে পাক (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আজরাঈল (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বললেন, যে জন্য আপনি আদিষ্ট হয়েছেন তা বাস্তবায়ন কর“ন। তারপর রূহ মোবারক কবজ করলেন।’’
সুত্র:—-
ক. ইমাম বায়হাকী : দালায়েলুন নবুওয়াত : ৭/২৬৭পৃ., দারুল হাদিস, মিশর হতে প্রকাশিত।
খ. খতিব তিবরিযী : মিশকাত শরীফ : হাদিস : ৫৭২০ প:ৃ
গ. ইমাম ইবনে সা‘দ : আত্-তবকাতুল কোবরা : ২/২৬০ পৃ:
ঘ. আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতি : আল-খাসায়েসুল কোবরা : ২/৫৩০ পৃ. হাদিস : ৩৩৯৯
ঙ. ইমাম তাবরানী : মুজামুল কবীর : ৩/১২৮ প:ৃ হাদিস : ২৮৯০
চ. ইমাম আদনী : আল মুসনাদ : ৫/২৪৫ পৃ:
ছ. ইমাম জুরজানী : তারীখে জুরজান : ১/৩৬২ পৃ.
জ. ইমাম ইবনে হাজার হায়সামী : মাযমাউয যাওয়াইদ : ৭/৩৫ পৃ
ঝ. ইমাম শাফেয়ী : আস সুনানিল নাক্কাস : ১/৩৩৪ পৃ :
ঞ. ইমাম কুস্তালানী : মাওয়াহেবে লাদুন্নীয়া : ৩/৩৬০ পৃ.
ট.যুরকানী,শরহুল মাওয়াহেব,১২/১২৭পৃ.দারুল কুতব ইলমিয়্যাহ,বযরুত।

**-‘‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন- রাসূল (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর কাছে মালাকুল মওত আযরাঈল আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মানব বেশে) আগমন করল। হুযুর (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মাথা মোবারক তখন হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর কোলে ছিল। মালাকুল মওত ভেতরে আসার অনুমতি চেয়ে বলল, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আপনি চলে যান। এখন আমরা আপনার প্রতি মনোযোগ দিতে পারব না। নবী করীম (সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আবুল হাসান! তুমি কি তাকে চেন? ইনি মালাকুল মাওত। অতঃপর তিনি মালাকুল মাওতকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। মালাকুল মওত প্রবেশ করে বললেন,আপনার পরওয়ারদিগার আপনাকে সালাম প্রেরণ করেছেন। হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে, মালাকুল মাওত এর আগে কারও পরিবারকে সালাম বলেন নি এবং পরেও আর কাউকে সালাম বলবেন না।’’
সুত্র:—-
ক. ইমাম তাবরানী : মুজামুল কবীর : ১২/১৪১ : হাদিস : ১২৭০৮
খ. আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সূয়তী : খাসায়েসুল কোবরা : ২/৫৩১ পৃ : হাদিস : ৩৪০১
গ. আল্লামা ইমাম বায়হাকী : দালায়েলুন নবুওয়াত : ৭/২৬৮ পৃ.
ঘ. ইমাম কুস্তালানী : মাওয়াহেবে লাদুন্নীয়া : ৩/৩৬০ পৃ.
ঙ. ইমাম যুরকানী : শরহুল মাওয়াহেব : ১২/১২৭ পৃ. দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত।

** তারপরে আজরাঈল  আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবস্থা সম্পর্কে অন্য হাদিস এসেছে এভাবে-
-‘‘হযরত আলীরাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাত হয়ে গেলে মালাকুল মাওত আযরাঈল সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাশে কাঁদতে কাঁদতে গেলেন। যিনি হুযুর সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্য নবীরূপে প্রেরণ করেছেন, তার কসম, আমি আকাশে ‘ওয়া মুহাম্মদ’ বলে (আজরাঈলকে) কাঁদতে শুনেছি।’’
সুত্র:—-
ক. ইমাম আবু নঈম : হুলিয়াতুল আউলিয়া :
খ. আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সূয়তী : খাসায়েসুল কোবরা : ২/৫৩২ : হাদিস : ৩৪১১

আল্লাহ কি আরশে না সবখানে

Standard

আল্লাহ কোথায়? শুধু কি আরশে, নাকি সবখানে?
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيمِ إن الحمد لله نحمده ونستعينه ونستغفره ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا.
من يهده الله فلا مضل له ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أن محمدا عبده ورسوله
এ বিষয় নিয়ে লেখার কোন ইচ্ছেই আমার ছিলো না। বাধ্য হয়ে লিখতে হচ্ছে। আল্লাহ তা’আলা ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন। এটি খুবই সূক্ষ বিষয়। এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে পূর্ববর্তী মনীষীগণ নিষেধ করেছেন। বলা যায় এটি একটি বিদ’আতি আলোচনা। এ বিষয়ে কথা বলা বিদ’আত। এমনটিই আমরা পূর্ববর্তী মুহাক্কিক আলেমগণ থেকে দেখতে পাই। হযরত ইমাম মালিক রহঃ বলেন—
ﺍﻻﺳﺘﻮﺍﺀ ﻣﻌﻠﻮﻡ ﻭﺍﻟﻜﻴﻔﻴﺔ ﻣﺠﻬﻮﻟﺔ، ﻭﺍﻟﺴﺆﺍﻝ ﻋﻨﻪ ﺑﺪﻋﺔ، ﻭﺍﻻﻳﻤﺎﻥ ﺑﻪ ﻭﺍﺟﺐ ،
অর্থাৎ- “আল্লাহ তা’আলার আরশে ইস্তিওয়া এর বিষয়টি জানা যায়, কিন্তু অবস্থা অজানা। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদ’আত। আর এ বিষয়ে ঈমান রাখা ওয়াজিব”।
এজন্য এ বিষয়ে অযথা কথনে লিপ্ত হওয়া কিছুতেই কাম্য নয়। আমিও এ বিষয়ে কোন কথা বলতে চাচ্ছিলাম না। যেহেতু এটি খুবই সঙ্গীন একটি বিষয়। আর আল্লাহ তা’আলা আছেন, তিনি সব কিছু দেখছেন, তিনি আমাদের উপর ক্ষমতাশীল এসব আমাদের মূল ঈমানের বিষয়। তিনি কোন অবস্থায় আছেন? এসব আমাদের ঈমানের মূল বিষয় নয়। তাই এটি নিয়ে অযথা কথোপকথনে লিপ্ত হওয়া কিছুতেই উচিত নয়। খুবই গর্হিত কাজ।
কিন্তু কুরআন শরীফের মুতাশাবিহ তথা অস্পষ্ট আয়াত নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি করা এসবকে মূল প্রাতিপাদ্য বিষয় বানানো এক শ্রেণীর ফিতনাবাজদের মূল মিশন তা আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনেই জানিয়ে দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে—
ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺃَﻧﺰَﻝَ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏَ ﻣِﻨْﻪُ ﺁﻳَﺎﺕٌ ﻣُّﺤْﻜَﻤَﺎﺕٌ ﻫُﻦَّ ﺃُﻡُّ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏِ ﻭَﺃُﺧَﺮُ ﻣُﺘَﺸَﺎﺑِﻬَﺎﺕٌ ۖ ﻓَﺄَﻣَّﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻓِﻲ ﻗُﻠُﻮﺑِﻬِﻢْ ﺯَﻳْﻎٌ ﻓَﻴَﺘَّﺒِﻌُﻮﻥَ ﻣَﺎ ﺗَﺸَﺎﺑَﻪَ ﻣِﻨْﻪُ ﺍﺑْﺘِﻐَﺎﺀَ ﺍﻟْﻔِﺘْﻨَﺔِ ﻭَﺍﺑْﺘِﻐَﺎﺀَ ﺗَﺄْﻭِﻳﻠِﻪِ ۗ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﻌْﻠَﻢُ ﺗَﺄْﻭِﻳﻠَﻪُ ﺇِﻟَّﺎ ﺍﻟﻠَّﻪُ ۗ ﻭَﺍﻟﺮَّﺍﺳِﺨُﻮﻥَ ﻓِﻲ ﺍﻟْﻌِﻠْﻢِ ﻳَﻘُﻮﻟُﻮﻥَ ﺁﻣَﻨَّﺎ ﺑِﻪِ ﻛُﻞٌّ ﻣِّﻦْ ﻋِﻨﺪِ ﺭَﺑِّﻨَﺎ ۗ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﺬَّﻛَّﺮُ ﺇِﻟَّﺎ ﺃُﻭﻟُﻮ ﺍﻟْﺄَﻟْﺒَﺎﺏِ [ ٣ : ٧ ]
অর্থাৎ- তিনিই আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। তাতে কিছু আয়াত রয়েছে সুস্পষ্ট,সেগুলোই কিতাবের আসল অংশ। আর অন্যগুলো রূপক। সুতরাং যাদের অন্তরে কুটিলতা রয়েছে,তারা অনুসরণ করে ফিৎনা বিস্তার এবং অপব্যাখ্যার উদ্দেশে তন্মধ্যেকার রূপকগুলোর। আর সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলেনঃ আমরা এর প্রতি ঈমান এনেছি। এ সবই আমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। আর বোধশক্তি সম্পন্নরা ছাড়া অপর কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। {সূরা আলে ইমরান-৭}
‡‡ আল্লাহ তা’আলা কোথায় আছেন? এটি কুরআনের একটি মুতাশাবিহাত তথা রূপক শব্দের অন্তর্ভূক্ত। তাই আমাদের পূর্ববর্তী মুহাক্কিকগণ এটির ব্যাপারে অতি গবেষণা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছেন। কিন্তু যাদের মনে কূটিলতা আছে তারা ফিতনা বিস্তারের জন্য এসবকেই প্রচারণার মূল টার্গেট বানিয়ে কাজ করে যায়। সেই কূটিল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত প্রচলিত বিদ’আতি ফিরকা কথিত আহলে হাদীস। যাদের কাজই হল মুতাশাবিহ এবং মতভেদপূর্ণ বিষয়কে মানুষের সামনে তুলে ধরে ফিতনা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা।
যেহেতু এ বিষয়ে ফেইজবুকে লিখালিখি হচ্ছে তাই অনেকে আমার কাছে অনুরুধ করেছেন আহলে সুন্নাতের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য। তাই বাধ্য হয়ে এ বিষয়ে কলম ধরলাম। আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল। আমাদের ভুলগুলো ক্ষমা করে দিয়ে তাঁর প্রিয়ভাজন হবার পথে অগ্রসর হবার তৌফিক দান করুন। আমীন!
আমরা বিশ্বাস করি-আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু কথিত আহলে হাদীস সম্প্রদায় প্রচার করে থাকে, আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান নয়। তারা দলীল হিসেবে পেশ করে থাকে সূরা হাদীদের ৩ নং আয়াত। যেখানে ঘোষিত হয়েছে আল্লাহ তায়ালা আরশে সমাসীন।
ওরা কিছু আয়াত দিয়ে আরো অসংখ্য আয়াতকে অস্বীকার করে নাউজুবিল্লাহ! যে সকল আয়াত দ্বারা বুঝা যায় আল্লাহ তায়ালা আরশসহ সর্বত্র বিরাজমান। কিছু আয়াতকে মানতে গিয়ে আরো ১০/ ১২টি আয়াত অস্বীকার করার মত দুঃসাহস আসলে কথিত আহলে হাদীস নামী ফিতনাবাজ বাতিল ফিরক্বাদেরই মানায়। অসংখ্য আয়াতে কারীমাকে অস্বীকার করে আল্লাহ তা’আলাকে কেবল আরশে সীমাবদ্ধ করার মত দুঃসাহস ওরা দেখাতে পারলেও আমরা পারি না।
আমরা বিশ্বাস করি-আল্লাহ তা’আলার কুরসী আসমান জমিন সব কিছুকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। তিনি স্থান কাল থেকে পবিত্র। আল্লাহর গোটা রাজত্বের সর্বত্র তিনি রয়েছেন। আল্লাহ তাআলা আরশে রয়েছেন একথা আমরা অস্বীকার করি না। তিনি আরশে রয়েছেন। তিনি এছাড়াও সর্বত্র রয়েছেন। তাহলে আমরা সকল আয়াতকেই মানি।
আর ওরা শুধু আরশ সংশ্লিষ্ট কিছু আয়াত মানে, বাকিগুলোকে অস্বিকার করে। কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকা দেহধারী সত্তার বৈশিষ্ট। আল্লাহ তা’আলার মত নিরাকার সত্তার জন্য এটা শোভা পায় না। এই আহলে হাদীস বাতিল ফিরকাটি এতটাই বেয়াদব যে, আল্লাহ তা’আলার দেহ আছে বলে বিশ্বাস করে।
দেহ থাকাতো সৃষ্টির বৈশিষ্ট। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী সকল সৃষ্টির স্রষ্টার জন্য দেহ সাব্যস্ত করা এক প্রকার সুষ্পষ্ট শিরক। এই শিরকী আক্বিদা প্রচার করছে ইংরেজ সৃষ্ট কথিত আহলে হাদীস সম্প্রদায়। আল্লাহ তা’আলা আমাদের এই ভয়াবহ মারাত্মক বাতিল ফিরকার হাত থেকে আমাদের দেশের সরলমনা মুসলমানদের হিফাযত করুন।
বক্ষমান প্রবন্ধে আল্লাহ তা’আলা সর্বত্র বিরাজমান নিয়ে একটি দলীল ভিত্তিক আলোচনা উপস্থাপন করা হল। পরবর্তী প্রবন্ধে আল্লাহ তা’আলা যে দেহ থেকে পবিত্র, আল্লাহ তা’আলার দেহ সাব্যস্ত করা সুষ্পষ্ট শিরকী, এই ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা প্রকাশ করা হবে ইনশাআল্লাহ!
১- ﺛُﻢَّ ﺍﺳْﺘَﻮَﻯ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟْﻌَﺮْﺵِ অতঃপর তিনি আরশের উপর ক্ষমতাশীল হোন। {সূরা হাদীদ-৩}
২- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﺇِﺫَﺍ ﺳَﺄَﻟَﻚَ ﻋِﺒَﺎﺩِﻱ ﻋَﻨِّﻲ ﻓَﺈِﻧِّﻲ ﻗَﺮِﻳﺐٌ ﺃُﺟِﻴﺐُ ﺩَﻋْﻮَﺓَ ﺍﻟﺪَّﺍﻉِ ﺇِﺫَﺍ ﺩَﻋَﺎﻥِ } Page: 11 আর আমার বান্দারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তুতঃ আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। {সূরা বাকারা-১৮৬}
৩- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﻧَﺤﻦُ ﺃَﻗﺮَﺏُ ﺇِﻟَﻴﻪِ ﻣِﻦ ﺣَﺒﻞِ ﺍﻟﻮَﺭِﻳﺪِ { [ ﻕ 16 ] আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী। {সূরা কাফ-১৬}
৪- ﻓَﻠَﻮْﻻ ﺇِﺫَﺍ ﺑَﻠَﻐَﺖِ ﺍﻟْﺤُﻠْﻘُﻮﻡَ ( 83 ) ﻭَﺃَﻧْﺘُﻢْ ﺣِﻴﻨَﺌِﺬٍ ﺗَﻨْﻈُﺮُﻭﻥَ ( 84 ) ﻭَﻧَﺤْﻦُ ﺃَﻗْﺮَﺏُ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻭَﻟَﻜِﻦْ ﻻ ﺗُﺒْﺼِﺮُﻭﻥَ ( 85 ) অতঃপর এমন কেন হয়না যে, যখন প্রাণ উষ্ঠাগত হয়। এবং তোমরা তাকিয়ে থাক। এবং তোমাদের চেয়ে আমিই তার বেশি কাছে থাকি। কিন্তু তোমরা দেখতে পাওনা {সূরা ওয়াকিয়া-৮৩,৮৪,৮৫}
৫- { ﻭَﻟﻠَّﻪِ ﺍﻟْﻤَﺸْﺮِﻕُ ﻭَﺍﻟْﻤَﻐْﺮِﺏُ ﻓَﺄَﻳْﻨَﻤَﺎ ﺗُﻮَﻟُّﻮﺍْ ﻓَﺜَﻢَّ ﻭَﺟْﻪُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺍﺳِﻊٌ ﻋَﻠِﻴﻢٌ { [ ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ 115 – ] পূর্ব এবং পশ্চিম আল্লাহ তায়ালারই। সুতরাং যেদিকেই মুখ ফিরাও,সেদিকেই রয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞাত {সূরা বাকারা-১১৫}
৬- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ } ﻭَﻫُﻮَ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺃَﻳْﻨَﻤَﺎ ﻛُﻨﺘُﻢْ { [ ﺍﻟﺤﺪﻳﺪ – 4 ] তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন {সূরা হাদীদ-৪}
৭- ﻭﻗﺎﻝ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻋﻦ ﻧﺒﻴﻪ : ( ﺇِﺫْ ﻳَﻘُﻮﻝُ ﻟِﺼَﺎﺣِﺒِﻪِ ﻻ ﺗَﺤْﺰَﻥْ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻣَﻌَﻨَﺎ ( ﺍﻟﺘﻮﺑﺔ ﻣﻦ ﺍﻵﻳﺔ 40 যখন তিনি তার সাথীকে বললেন- ভয় পেয়োনা, নিশ্চয় আমাদের সাথে আল্লাহ আছেন {সূরা হাদীদ-৪০}
৮- ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻣَﺎ ﻳَﻜُﻮﻥُ ﻣِﻦ ﻧَّﺠْﻮَﻯ ﺛَﻼﺛَﺔٍ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺭَﺍﺑِﻌُﻬُﻢْ ﻭَﻻ ﺧَﻤْﺴَﺔٍ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺳَﺎﺩِﺳُﻬُﻢْ ﻭَﻻ ﺃَﺩْﻧَﻰ ﻣِﻦ ﺫَﻟِﻚَ ﻭَﻻ ﺃَﻛْﺜَﺮَ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﻣَﻌَﻬُﻢْ ﺃَﻳْﻦَ ﻣَﺎ ﻛَﺎﻧُﻮﺍ ﺛُﻢَّ ﻳُﻨَﺒِّﺌُﻬُﻢ ﺑِﻤَﺎ ﻋَﻤِﻠُﻮﺍ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﺇِﻥَّ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﺑِﻜُﻞِّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋَﻠِﻴﻢٌ ( ﺍﻟﻤﺠﺎﺩﻟﺔ – 7 কখনো তিন জনের মাঝে এমন কোন কথা হয়না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন, এবং কখনও পাঁচ জনের মধ্যে এমন কোনও গোপন কথা হয় না, যাতে ষষ্ঠজন হিসেবে তিনি উপস্থিত না থাকেন। এমনিভাবে তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশি, তারা যেখানেই থাকুক, আল্লাহ তাদের সঙ্গে থাকেন। অতঃপর কিয়ামতের দিন তিনি তাদেরকে অবহিত করবেন তারা যা কিছু করত। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছু জানেন {সূরা মুজাদালা-৭}
৯- ﻭَﺳِﻊَ ﻛُﺮْﺳِﻴُّﻪُ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﻭَﺍﺕِ ﻭَﺍﻷَﺭْﺽَ আল্লাহ তায়ালার কুরসী আসমান জমিন ব্যাপৃত {সূরা বাকারা-২৫৫}
‡‡ একটি মৌলিক প্রশ্ন প্রথমে একটি বিষয় সুনির্দিষ্ট করে নিতে হবে। সেটা হল, আল্লাহ তা’আলার সর্বত্র বিরাজমানতার আয়াতগুলোকে ব্যাখ্যা সহ মানা হবে? না শুধু শাব্দিক অর্থের উপর রাখা হবে? দুই পদ্ধতির যে কোন একটি পদ্ধতি অবশ্যই অবলম্বন করতে হবে।
যদি ব্যাখ্যাসহ মানা হয়, তাহলে সকল আয়াতের ব্যাখ্যাই করতে হবে। এক আয়াতের ব্যাখ্যা আর অন্য আয়াতের শুধু শাব্দিক অর্থ নেয়া যাবে না। আর যদি শুধু শাব্দিক অর্থই গ্রহণ করা হয়, ব্যাখ্যা ছাড়া। তাহলে এ সম্পর্কীয় সকল আয়াতকেই তার শাব্দিক অর্থের উপর রাখতে হবে। কোনটারই ব্যাখ্যা করা যাবে না। সেই হিসেবে যদি ব্যাখ্যা নেয়া হয়, তাহলে সব আয়াতের ব্যাখ্যা নিতে হবে।
তাই আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশি নিকটবর্তী। {সূরা কাফ-১৬} তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন {সূরা হাদীদ-৪} ইত্যাদি আয়াতের ব্যাখ্যায় যেমন কথিত আহলে হাদীস ভাইয়েরা বলে থাকেন যে, এর মানে হল আল্লাহ তাআলা ইলম ও ক্ষমতা হিসিবে সবার সাথে আছেন। ঠিকই একই ব্যাখ্যা নিতে হবে অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন [কর্তৃত্বশীল হোন] {সূরা হাদীদ-৩} এ আয়াতের। অর্থাৎ তখন আমরা বলবো, এ আয়াতের ব্যাখ্যা হল আল্লাহ তাআলা ইলম ও ক্ষমতা হিসেবে আরশে সমাসীন।
আর যদি বলা হয়, না আয়াতের শাব্দিক অর্থ গৃহিত হবে। কোন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ গ্রহণযোগ্য হবে না। তাহলে অতঃপর তিনি আরশে সমাসীন হন [কর্তৃত্বশীল হোন] {সূরা হাদীদ-৩} এ আয়াতের শাব্দিক অর্থ হিসেবে যেমন আমরা বলি আল্লাহ তা’আলা আরশে। ঠিক একইভাবে আর আমি বান্দার গলদেশের শিরার চেয়েও বেশী নিকটবর্তী। {সূরা কাফ-১৬} তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন {সূরা হাদীদ-৪} ইত্যাদি আয়াতের শাব্দিক অর্থ হিসেবে বলতে হবে যে, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। সর্বত্র আছেন। কোন ব্যখ্যা করা যাবে না।
যেমন সূরা হাদীদের ৩ নং আয়াতের কোন ব্যাখ্যা করা হচ্ছে না। আশা করি এ মূলনীতি অনুসরণ করলে আর কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। এক আয়াতের ব্যাখ্যা আরেক আয়াতের শাব্দিক অর্থ মনগড়াভাবে করলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
‡ আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান হলে আকাশের দিকে কেন হাত উঠিয়ে দুআ করা হয়? আদবের জন্য। যদিও আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু আল্লাহ তায়ালার শান হল উঁচু, তাই আদব হিসেবে উপরের দিকে হাত উঠিয়ে দুআ করা হয়। যেমন কোন ক্লাশরুমে যদি লাউডস্পীকার ফিট করা হয়। চারিদিক থেকে সেই স্পীকার থেকে শিক্ষকের আওয়াজ আসে। তবুও যদি কোন ছাত্র শিক্ষকের দিকে মুখ না করে অন্যত্র মুখ করে কথা শুনে তাহলে শিক্ষক তাকে ধমক দিবেন। কারণ এটা আদবের খেলাফ। এই জন্য নয় যে, অন্য দিক থেকে আওয়াজ শুনা যায় না। তেমনি আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমান থাকা সত্বেও উপরের দিকে মুখ করে দুআ করা হয় আল্লাহ তায়ালা উঁচু, সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই আদব হিসেবে উপরের দিকে হাত তুলে দুআ করা হয়।
‡ জিবরাঈল উপর থেকে নিচে নেমে আসেন মানে কি? এর মানে হল-যেমন পুলিশ এসে কোন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে কারণ বলে যে, উপরের নির্দেশ। এর মানে কি পুলিশ অফিসার উপরে থাকে? না সম্মান ও ক্ষমতার দিক থেকে যিনি উপরে তার নির্দেশ তাই বলা হয় উপরের নির্দেশ? তেমনি আল্লাহ তায়ালা ফরমান নিয়ে যখন জিব্রাঈল আসেন একে যদি বলা হয় উপর থেকে এসেছেন, এর মানেও সম্মানসূচক ও পরাক্রমশালীর কাছ থেকে এসেছেন। তাই বলা হয় উপর থেকে এসেছেন। এই জন্য নয় যে, আল্লাহ তায়ালা কেবল আরশেই থাকেন।
‡ আল্লাহ তায়ালা কি সকল নোংরা স্থানেও আছেন? নাউজুবিল্লাহ! এই উদ্ভট যুক্তি যারা দেয় সেই আহমকদের জিজ্ঞেস করুন। তার কলবে কি দু’একটি কুরাআনের আয়াত কি সংরক্ষিত আছে? যদি বলে আছে। তাহলে বলুন তার মানে সীনায় কুরআনে কারীম বিদ্যমান আছে। কারণ সংরক্ষিত সেই বস্তুই থাকে, যেটা বিদ্যমান থাকে, অবিদ্যমান বস্তু সংরক্ষণ সম্ভব নয়। তো সীনায় যদি কুরআন বিদ্যমান থাকে, সেটা নিয়ে টয়লেটে যাওয়া কিভাবে জায়েজ? কুরআন নিয়েতো টয়লেটে যাওয়া জায়েজ নয়। তখন ওদের আকল থাকলে বলবে-কুরআন বিদ্যমান, কিন্তু দেহ থেকে পবিত্র কুরআন। তেমনি আমরা বলি আল্লাহ তা’আলা সর্বত্র বিরাজমান। কিন্তু তিনি দেহ থেকে পবিত্র। সেই হিসেবে সর্বত্র বিরাজমান। সুতরাং কুরআন যেমন সীনায় থাকায় সত্বেও টয়লেটে যেতে কোন সমস্যা নেই। কুরআনে কারীমের বেইজ্জতী হয়না, সীনায় সংরক্ষিত কুরআনের দেহ না থাকার কারণে, তেমনি আল্লাহ তায়ালার দেহ না থাকার কারণে অপবিত্র স্থানে বিদ্যমান থাকাটাও কোন বেইজ্জতীর বিষয় নয়।
‡ স্ববিরোধী বক্তব্য , কথিত আহলে নামধারী আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান নামক একজন একটি প্রবন্ধ লিখেছেন “আল্লাহ তাআলা কোথায় আছেন” নামে। উক্ত প্রবন্ধটির শুরুতে লেখক বলেন—
“কোরআন ও সহিহ হাদীছে আল্লাহ তা’আলার যে সমস্ত সিফাতের কথা বলা হয়েছে তার উপর ঈমান আনা ওয়াজিব। তাঁর সিফাতসমূহের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করা, অথবা তার কিছু সিফাতকে যেভাবে আছে সেভাবেই স্বীকার করা আর কিছুকে পরিবর্তন করে বিশ্বাস করা কিছুতেই জায়েয হবে না”।
তিনি দাবি করছেন, কুরআন ও হাদীছে বর্ণিত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কোন সিফাত যেভাবে বর্ণিত হুবহু সে অবস্থায়ই বিশ্বাস করতে হবে, পরিবর্তন করে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
কিন্তু আফসোস ও হাস্যকর বিষয় হল তিনি নিজেই প্রবন্ধের শেষ দিকে আল্লাহ তা’আলা সর্বত্র বিরাজমানতার স্পষ্ট প্রমাণবাহী আয়াতকে মূল অর্থ পাল্টে মনগড়া ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে বলেন—
“আল্লাহ তাআলার বাণী: ﻭَﻫُﻮَ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺃَﻳْﻦَ ﻣَﺎ ﻛُﻨْﺘُﻢْ ( ﺍﻟﺤﺪﻳﺪ 4 ) তোমরা যেখানেই থাক না কেন, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। (সূরা হাদীদ, ৫৭: ৪ আয়াত)। অত্র আয়াতের ব্যখ্যা হল; নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা আমাদের সাথে আছেন দেখার দ্বারা, শ্রবনের দ্বারা, যা বর্ণিত আছে তফসীরে জালালাইন ও ইবনে কাসীরে। এই আয়াতের পূর্বের ও শেষের অংশ এ কথারই ব্যখ্যা প্রদান করে”।
বিজ্ঞ পাঠকগণ! লক্ষ্য করুন! আয়াতে স্পষ্ট বলা হচ্ছে যে, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সাথেই আছেন, যার স্পষ্ট অর্থ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র রয়েছেন। কিন্তু এ স্পষ্ট অর্থবোধক আয়াতকে ব্যাখ্যা ছাড়া হুবহু বিশ্বাস না করে পাল্টে তিনি ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান নন, বরং দেখা ও শ্রবণ শক্তি রয়েছে সর্বত্র। “দেখা ও শ্রবণ দ্বারা বিরাজমান” ব্যাখ্যা করার দ্বারা তিনি তার নিজের ফাতওয়া অনুযায়ীই না জায়েয কাজটি করেছেন। তাই নয় কি?
কারণ তিনিই তো আগে বললেন যে, আল্লাহর সিফাত সম্বলিত আয়াত বা হাদীছকে হুবহু বিশ্বাস করতে হবে, ব্যাখ্যা করা জায়েয নেই। অথচ তিনি নিজেই স্ববিরোধী হয়ে সূরা হাদীদের ৪ নং আয়াতকে “দেখা ও শ্রবণ দ্বারা বিরাজমান” শব্দে ব্যাখ্যা করে না জায়েয কাজ করলেন।
আল্লাহ তা’আলা শুধুই আসমানে আছেন বলাটা আল্লাহ তা’আলার বড়ত্বকে খাট করা। আমরা জানি, কোন বস্তু যখন অন্য বস্তুর উপর থাকে, তখন যে বস্তুর উপর বস্তুটি রাখা হয়, তা বড় থাকে, আর যা রাখা হয় তা হয় ছোট। যেমন-যদি বলা হয় যে, কলমটি টেবিলের উপর আছে, তখন বুঝতে হবে যে, টেবিলটি বড় আর কলমটি ছোট, কারণ, কলম বড় হলে কলমটি টেবিলের উপর থাকতে পারে না। এটাই মুহিত ও মুহাতের পার্থক্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুহীত তথা সর্ব কিছুকে পরিবেষ্টনকারী। তাকে পরিবেষ্টনকারী কিছু নেই।
যদি বলা হয় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শুধু আরশের উপর আছেন, তাহলে আরশ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে মুহীত করে ফেলছে, তথা পরিবেষ্টন করে ফেলছে, তথা আরশ হয়ে যাচ্ছে বড়, আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হয়ে যাচ্ছেন ছোট নাউজুবিল্লাহ! যা কেবল নাস্তিকরাই বলতে পারে, কোন মুমিন মুসলমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে এভাবে খাট করতে পারে না। তাই সহীহ আক্বিদা হল-আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বত্র বিরাজমান। তিনি যেমন আরশে আছেন, তেমনি জমিন আসমান সর্বত্র বিরাজমান।
‡‡ কথিত আহলে হাদীসদের কাছে আমাদের প্রশ্ন-
১- আল্লাহ তাআলা আরশেই অবস্থান করলে আরশ সৃষ্টির আগে আল্লাহ তাআলা কোথায় ছিলেন?
২- কিয়ামতের সময় সব কিছু যখন ধ্বংস হয়ে যাবে তখন আল্লাহ তাআলা কোথায় থাকবেন?
৩- আল্লাহ তা’আলা আরশেই অবস্থান করলে মুসা আঃ কে দেখা দেয়ার জন্য তূর পাহাড়ে কেন ডেকে নিলেন?
৪- বিভিন্ন সহীহ হাদীছ দ্বারা প্রতিয়মান হয় যে, শেষ রাতে আল্লাহ তা’আলা প্রথম আসমানে এসে বান্দাদেরকে ইবাদত করার জন্য আহবান করে থাকেন, যেন বান্দা ইবাদত করে।
এখন প্রশ্ন হল, সারা পৃথিবীতে একই সময়ে শেষ রাত হয় না, এক দেশ থেকে আরেক দেশের সময়ের পার্থক্য রয়েছে। এক ঘন্টা থেকে নিয়ে বার তের ঘন্টা এমনকি বিশ বাইশ ঘন্টাও। তাহলে কি আল্লাহ তা’আলা বাংলাদেশের আসমানে শেষ রাতে একবার আসেন, তারপর তিন ঘন্টা পর আবার সৌদিতে যান, তারপর এভাবে একের পর এক দেশের প্রথম আসমান ঘুরতেই থাকেন? কুরআন ও সহীহ হাদীছের শব্দসহ উক্ত বিষয়ের সমাধান চাই।
‡ যে সকল ভাইয়েরা আল্লাহ তায়ালা সর্বত্র বিরাজমানতাকে অস্বীকার করে আল্লাহ তা’আলাকে নির্দিষ্ট স্থানে সমাসীন বলে আল্লাহ তা’আলার সত্তার বেয়াদবী করছে ওদের অপপ্রচার থেকে, বাতিল আক্বিদা থেকে আমাদের আল্লাহ তায়ালা রক্ষা করুন। আমীন।
এসব অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের আলোচনা থেকে আমাদের বিরত থাকার মত পরিবেশ সৃষ্টি করে দিন। আমীন!

জিলহজ্জ্ব মাসের ফযীলত

Standard

আল্লামা সাইয়্যেদ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আযহারী

আমাদের মাঝে যিলহজ্ব মাস সমাগত। এ মাস হজ্বের মাস, কুরবানীর মাস। এ মাস অতি ফযীলতপূর্ণ, মহিমান্বিত।আল্লাহর তাআলার বিধানানুসারে যে চারটি মাস পবিত্র ও সম্মানিত, তার একটি হল যিলহজ্ব মাস। আর এমাসের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ সময় হল আশারায়ে যিলহজ্ব বা যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশক।
দুটি ইবাদত এ দশকের মর্যাদাকে আরো অধিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে। আল্লাহ রাববুল আলামীন এ মাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হজ্ব এর বিধান রেখেছেন, যাকে হাদীস শরীফে ইসলামের পাঁচ রুকনের একটি বলা হয়েছে। ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ্বের আমল মাসটিকে আরো আড়ম্বর ও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আল্লাহ প্রেমিকরা সাদা ইহরামের কাপড় পরিধান করে বায়তুল্লাহ যেয়ারত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজা এবং তার স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলো যিয়ারত করে নিজেদের আত্মার পিপাসা নিবারণ করেন।
হজ্বের সাদা ইহরাম, তালবিয়া পাঠ করা, পবিত্র কাবা তওয়াফ করা, হজরে আসওয়াদ (কালো পাথর) চুমু খাওয়া, সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয় প্রদক্ষিণ করা, আরাফা, মিনা ও মুযদালিফার ময়দানে অবস্থান করা, মদীনাতুন নববীতে গমন করা , মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজা মুবারক যেয়ারত করা, রওজাতুম মিন রিয়াজিল জান্নাতে অবস্থান করা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রিয় সাহাবীগণের কবর যেয়ারত করা, বদর, উহুদ, খন্দকের মত বিশ্ব বিখ্যাত জিহাদ প্রান্তর পরিদর্শনসহ আরো কত ধরনের কর্মসূচী সম্পৃক্ত হয়ে হজ্বের এ মাসকে করে তুলে আরো বর্ণাঢ্যময়।
এ মাসের দ্বিতীয় বিশেষ ইবাদত কুরবানী, যা শা‘আইরে ইসলাম বা ইসলামের নিদর্শনসমূহের অন্যতম। এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের জন্যে এ মাসের নির্ধারণ থেকেও এর মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অনুমান করা যায়। তদুপরি কুরআন-হাদীস থেকেও এ মাসের এবং এ মাসের বিশেষ কিছু দিবস-রজনীর মর্যাদা প্রতীয়মান হয়। কারণ এ মাস চার মহিমান্বিত মাসের অন্যতম, যাকে কুরআন মজীদে ‘‘আরবাআতুন হুরুম’’ বলা হয়েছে। সূরাতুল ফাজরে আল্লাহ তাআলা যে দশ রজনীর শপথ করেছেন, মুফাসসিরগণের মতে তা এ মাসের প্রথম দশ রাত। তেমনি সূরাতুল হজ্বে (২২:২৮) যে ‘নির্দিষ্ট দিবসগুলোতে’ আল্লাহর নাম স্মরণের প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে, তাও যিলহজ্বের প্রথম দশ দিন।আল্লাহ পাক ঈরশাদ করেন “আমি মূসা (আঃ)-এর সাথে ওয়াদা করেছি ত্রিশ রাত্রির এবং তা পূর্ণ করেছি আরো দশ দ্বারা” মুফাসিসির গণ বলেছেন, সেই দশদিনও ছিল যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিন।
এ দশ দিনের মর্যাদা বুঝার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, আল্লাহ তাআলা মহাগ্রন্থ আল কুরআনে এ দশ দিনের কসম করেছেন। তিনি বলেন- “শপথ ফজরের ও দশ রাতের” (সূরা ফজর:১-২)। দশ রাত বলতে এখানে যিলহজ্বের দশ রাতকে বুঝানো হয়েছে। আর আল্লাহ তাআলা বড় কোনো বিষয় ছাড়া কসম খান না। ফজিলতে পূর্ণ এই মাসের ফজিলত প্রসঙ্গে হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন “যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের নেক আমল আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয় নয়। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন জিহাদও নয় কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন- জিহাদও নয়। তবে ঐ ব্যক্তি ব্যতিক্রম যে নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বের হয়েছে এবং কিছু নিয়ে ফিরে আসেনি। অর্থাৎ শহীদ হয়ে গিয়েছে।” (বোখারী শরীফ- ৯২৬, তিরমিযী শরীফ- ৭৫৭)
হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহর ইবাদতের জন্য যিলহজ্বের প্রথম দশ দিনের চেয়ে উত্তম কোন দিন নেই, এর একদিনের রোজা এক বছরের রোযার সমতুল্য এবং এক রাতের ইবাদত ক্বদরের রাত্রের ইবাদতের সমতুল্য। (তিরমিযী, ইবনে মাজা)
হযরত কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে আরাফা’র দিনে রোজা রাখার ফজীলত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলেন- “এর দ্বারা অতীতের এক বছর এবং ভবিষ্যতের এক বছরের গুনাহের কাফ্ফারা হয়ে যায়”। (মুসলিম শরীফ-২৭৩৯)
অন্য বর্ণনায় হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে:যিলহজ্বের দশ দিনের চেয়ে কোনো দিনই আল্লাহর নিকট উত্তম নয়।(সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ২৮৪২)
কুরআনের উপরোক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহের আলোকে স্পষ্ট বুঝা যায়, এই দশ দিনের যে কোনো নেক আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। তাই মুমিন বান্দার জন্য অধিক পরিমাণে সওয়াব অর্জন, আল্লাহরনৈকট্য লাভ এবং আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহের এরচেয়ে উপযুক্ত সময় আর কী হতে পারে? এজন্য পূর্ববর্তীদের জীবনীতে এই দশকের আমল সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন এই দশকের দিনগুলোর আগমন ঘটত এত অধিক আমল ও মুজাহাদা করতেন, যা পরিমাপ করাও সম্ভব নয়।আমাদেরও উচিত বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে এই দশকের রাত-দিনগুলোকে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত করে তোলা।তাছাড়া বিভিন্ন হাদীসে এই দশকের বিশেষ কিছু আমলের কথাও বর্ণিত হয়েছে। যেমন-
# ১. চুল, নখ, গোঁফ ইত্যাদি না কাটা:যিলহজ্বের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানীর আগ পর্যন্ত নিজের নখ, চুল, মোচ, নাভীর নিচের পশম ইত্যাদি না কাটা। এটা মুস্তাহাব আমল।হযরত উম্মে সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,তোমরা যদি যিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখতে পাও আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে তবে সে যেন স্বীয় চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৯৭৭; জামে তিরমিযী, হাদীস : ১৫২৩;সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২৭৯১; সুনানে নাসয়ী, হাদীস : ৪৩৬২; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৫৮৯৭)
যে ব্যক্তি কুরবানী করতে সক্ষম নয় সেও এ আমল পালন করবে। অর্থাৎ নিজের চুল, নখ, গোঁফ ইত্যাদি কাটবে না; বরং তা কুরবানীর দিন কাটবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:আমি কুরবানীর দিন সম্পর্কে আদিষ্ট হয়েছি (অর্থাৎ এ দিবসে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে।) আল্লাহ তাআলা তা এ উম্মতের জন্য ঈদ হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। এক ব্যক্তি আরজ করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আমার কাছে শুধু একটি মানীহা থাকে অর্থাৎ যা শুধু দুধ পানের জন্য দেওয়া হয়েছে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না; বরং সেদিন তুমি তোমার চুল কাটবে (মুন্ডাবে বা ছোট করবে),নখ কাটবে, মোচ এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর কাছে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে। (মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৬৫৭৫; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৭৭৩; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ২৭৮৯)

আল্লাহ পাক গরীবদের উপর যে অত্যন্ত ও সীমাহীন দয়া করেছেন তার প্রমাণ আলোচ্য হাদীস। সুতরাং যাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয় তাদের উপরোক্ত হাদীসে বর্ণিত আমলকে গনীমত মনে করা উচিত এবং কুরবানীর চাঁদ অর্থাৎ জিলহজ্ব মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর থেকে কুরবানী পর্যন্ত (১০দিন) নিজের চুল, নখ ইত্যাদিতে হাত না লাগানো উচিত।
অর্থাৎ যারা কুরবানী করতে সক্ষম নয় তারাও যেন মুসলমানদের সাথে ঈদের আনন্দ ও খুশি উদযাপনেঅংশীদার হয়। তারা এগুলো কর্তন করেও পরিপূর্ণ সওয়াবের অধিকারী হবে। অনুরূপভাবে হাজীদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী হবে।
# ২. ঈদের দিন ছাড়া বাকি নয় দিন রোযা রাখা:আশারায়ে যিলহজ্বের আরেকটি বিশেষ আমল হল, ঈদুল আযহার দিন ছাড়া প্রথম নয় দিন রোযা রাখা। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নয়টি দিবসে (যিলহজ্ব মাসেরপ্রথম নয় দিন) রোযা রাখতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২৪৩৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ২২২৩৪;সুনানে নাসায়ী, হাদীস : ২৪১৬)
অন্য হাদীসে হযরত হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন: চারটি আমল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোযা, যিলহজ্বের প্রথম দশকের রোযা, প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোযা, ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামায। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস :২৪১৫; সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস : ৬৪২২; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদীস : ৭০৪২; মুসনাদেআহমাদ, হাদীস : ২৬৩৩৯)
# ৩. বিশেষভাবে নয় তারিখের রোযা রাখা: যিলহজ্বের প্রথম নয় দিনের মধ্যে নবম তারিখের রোযা সর্বাধিক ফযীলতপূর্ণ। সহীহ হাদীসে এই দিবসের রোযার ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আরাফার দিনের (নয় তারিখের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর নিকট আশাবাদী যে, তিনি এর দ্বারা বিগতএক বছর ও আগামী বছরের গুনাহ মিটিয়ে দিবেন। (সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১১৬২; সুনানে আবু দাউদ,হাদীস : ২৪২৫; জামে তিরমিযী, হাদীস : ৭৪৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৭৩০)
আরেক হাদীসে এসেছে,যে ব্যক্তি আরাফার দিন রোযা রাখবে তার লাগাতার দুই বছরের গুনাহ ক্ষমা করা হবে।(মুসনাদে আবুইয়ালা, হাদীস : ৭৫৪৮; মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস : ৫১৪১)
যারা যিলহজ্বের নয় রোযা রাখতে সক্ষম হবে না তারা যেন অন্তত এই দিনের রোযা রাখা থেকে বঞ্চিত না হয়। আল্লাহ তাআলা আশারায়ে যিলহজ্বের মতো অন্যান্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দিনগুলোতে ইবাদত-বন্দেগী করার তাওফীক দিন। আমীন।
হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- দুনিয়ার দিনগুলোর শ্রেষ্ঠ দিন হচ্ছে সেই দশ দিন। অর্থাৎ যিলহজ্বের দশদিন। (মাজমাউয যাওয়াইদ, হাদীস ৫৯৩৩)
কিন্তু যিলহজ্ব মাস তো চার হারাম মাসের অন্যতম, যার সম্পর্কে কুরআন মজীদের নির্দেশ, ‘তোমরা এ সময়ে নিজেদের উপর জুলুম করো না।’ মুফাসসিরগণের ব্যাখ্যা অনুসারে এ পবিত্র সময়ে গুনাহ থেকে বিরত থাকাও এ আদেশের মধ্যে শামিল। আর ইয়াওমে আরাফা সম্পর্কে তো স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লা্ল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইরশাদ-এ তো এমন দিন যে, এদিনে যে নিজের চোখ, কান ও যবানকে নিয়ন্ত্রণে রাখে তাকে মাফ করে দেওয়া হবে। (মুসনাদে আহমদ, ১/ ৩২৯)
তেমনি দিবস রজনী ফযীলতপূর্ণ হওয়ার আরেক দাবি, সে মুবারক সময়ে ইবাদত-বন্দেগী ও নেক আমলের বিষয়ে অন্য সময়ের চেয়ে বেশী যত্নবান হওয়া।কিন্তু আমরা যাদের হজ্বে যাওয়া হচ্ছে না, তাদেরকে আল্লাহ তাআলা একেবারেই বঞ্চিত করে রাখেননি।যিলহজ্ব মাসের ঐদিনগুলোতে আমরা যেন বেশি বেশি করে ইবাদত করি সে জন্য আল্লাহ তাআলা ঐদিনগুলোর ইবাদতে আমাদের জন্য রেখেছেন অফুরন্ত ফযীলত। সেগুলোর গুরুত্ব বুঝানোর জন্য আল্লাহ তাআলা সূরা আল ফযর এ কসম করে বলেছেন: ‘ওয়া লাইয়ালিন আশর’-দশটি রাতের কসম।
এ দশটি দিনে বেশি বেশি করে নেক আমলের সুযোগ হাত ছাড়া করা নিশ্চয়ই ঠিক হবে না। এ সময়গুলোতে কি কি আমল করা উচিৎ। নফল আমলের মধ্যে সর্বোচ্চ হল নফল সালাত, বিশেষ করে সালাতুত তাহাজ্জোদ। কুরআন তেলাওয়াত, যিকর, ইস্তেগফার, দোয়া ও দরুদ ইত্যাদি।
সুনানে নাসায়ী ও মুসনাদে আহমাদসহ অন্যান্য হাদীসের কিতাবে আছে যে, আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আমলগুলো ছাড়তেন না তম্মধ্যে আশুরার রোযা (কুরবানীর ঈদের দিন ছাড়া) যিলহজ্বের দশ দিনের রোযা, ফজরের দুই রাকাত সুন্নত এবং আইয়ামে বীযের রোযা অন্যতম। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস ২৪১৫; মুসনাদে আহমাদ,হাদীস ২৬৩৩৯)
আল্লাহ রাববুল আলমীন আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন !

জিলহজ্জ্ব প্রথম ১০দিনের আমল ও ফযীলত

Standard

পবিত্র রমজান মাসের পর গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময় হলো জিলহজ মাসের প্রথম ১০দিন। এই দিনগুলোর ইবাদত আল্লাহতায়ালার নিকট অতি প্রিয়।

মুসনাদে বাজ্জার ও সহিহ ইবনে হিব্বানে সাহাবি হজরত জাবের (রা.) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম দিনসমূহ হলো- এই দশক। অর্থাৎ জিলহজের প্রথম দশ দিন। স্বয়ং আল্লাহতায়ালা এই মাসের প্রথম দশটি রাতের শপথ করেছেন, এমনকি ভিন্ন ভিন্নভাবে জোড় ও বেজোড় রাতসমূহের শপথও করেছেন। -সূরা ফাজর : ২-৩

সূরা হজ এর ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তারা আল্লাহর নামের স্মরণ করে নির্দিষ্ট দিনসমূহে। সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, নির্দিষ্ট দিন বলে এখানে জিলহজের প্রথম দশককে বুঝানো হয়েছে। -ইবনে কাসির

সহিহ বোখারির বর্ণনামতে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ভালো আমলের জন্য আল্লাহর নিকট এই দিনগুলোর চেয়ে প্রিয় কোনো দিন নেই; সাহাবারা প্রশ্ন করলেন- এমনকি আল্লাহর রাহে জিহাদও এই দিনসমূহের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়? জবাবে ইরশাদ হলো- না, অন্য সময়ে আল্লাহর রাহে জিহাদও এই দশকের ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। অবশ্য যে ব্যক্তি জান ও মাল নিয়ে আল্লাহর রাহে জিহাদ করতে বের হয়েছেন এবং তার কোনোটি নিয়েই ফিরতে পারেননি, তার কথা   ভিন্ন।

প্রসিদ্ধ হাদিস বিশারদ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, জিলহজের প্রথম দশটি দিনের বিশেষ গুরুত্বের কারণ হলো- এই দিনগুলোতে ইসলামের ৫টি রুকনের সমাহার রয়েছে। যেমন ঈমান ও সালাত অন্য দিনগুলোর মতো এদিন গুলোতেও বিদ্যমান। জাকাত বছরের অন্য যেকোনো সময়ের মতো এসময়েও প্রদান করা যায়। আরাফার দিনে রোজার নির্দেশনার ফলে ইসলামের আরেকটি রোকন- রোজারও নজীর এই দশকে পাওয়া যায়। আর পঞ্চম রুকন বা হজও। অন্যদিকে কোরবানির বিধান তো কেবল এই দশকেই পালনযোগ্য। তাছাড়া এই দশকেই রয়েছে আরাফা ও কোরবানির দিন, আরাফার দিনের দোয়াকে শ্রেষ্ঠ দোয়া বলা হয়েছে। আর কোরবানির দিনকেও বছরের সেরাদিন বলে আবু দাউদ ও নাসাঈর এক হাদিসে বর্ণিত আছে। সুতরাং মাস হিসেবে রমজান আর দিন হিসেবে এই দশক শ্রেষ্ঠ ও সর্বাপেক্ষা মর্যাদাপূর্ণ। তাই একজন মুসলিমকে ইবাদতের এই সুবর্ণ সময়ের সদ্ব্যবহার করে অন্য সময়ের আমলের ঘাটতি পূরণ করার জন্য প্রস্তুত হওয়া উচিত।

আক্ষেপের বিষয় হলো- কোরআন-হাদিসে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া এই ইবাদতের সময় সম্পর্কে সমাজের খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষই ধারণা রাখেন। জিলহজ মাসের প্রথম দশকের উল্লেখযোগ্য ১০টি আমল হলো-

১. সামর্থ্যবান হলে হজ পালন করা। -সূরা আল ইমরান: ৯৭‍

২. কোরবানি করা। -সূরা কাউসার ও তিরমিজি

৩. অধিক পরিমাণে আল্লাহতায়ালার নামের জিকির করা। -সূরা হজ : ২৮
বর্ণিত আয়াতে অবশ্য নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নামের জিকির করার কথা বর্ণিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসিরবিদ উলামায়ে কেরামের অভিমত হলো- ‘নির্দিষ্ট দিনসমূহ’ বলতে জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে।

৪. অধিক পরিমাণে নেক আমল করা। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
৫. পাপের পথ না মাড়ানো। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম
৬. কোরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির এই দশদিন- নখ, চুলসহ শরীর থেকে কোনো কিছু কর্তন না করা। -সহিহ মুসলিম

৭. বেশি বেশি তাকবির, তাহমিদ ও তাহলিল পাঠ করা। যেমন- আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। – আবু দাউদ

image

৮. আরাফার দিন ফজর হতে আইয়ামে তাশরিকে (ঈদের দিন ও তার পরে আরো তিন দিন) প্রতি নামাজের পর উল্লেখিত তাকবিরটি পাঠ করা। -আবু দাউদ

৯. আরাফার দিনে রোজা রাখা। সহিহ মুসলিমের এক বর্ণনায় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি মনে করি, তার বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা এক বছর পূর্বের ও এক বছর পরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। আরাফার দিন ছাড়াও ঈদের দিন ছাড়া প্রথম দশকের বাকি দিনগুলোতেও রোজা রাখাকে মোস্তাহাব বলেছেন ইমাম নববি (রহ.)। কেননা নফল রোজাও নেক আমলের শামিল। হাদিসে এই দশকে সাধারণভাবে নেক আমলের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য হাদিসে স্বতন্ত্র নির্দেশ থাকায় আরাফার দিনের রোজা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

১০. ঈদের দিনের যাবতীয় সুন্নতসমূহ পালনে সচেষ্ট হওয়া।

প্রিয় পাঠক! জিলহজ মাস তো কতোবারই এসেছে আমাদের জীবনে। কিন্তু আমরা কী পেরেছি জিলহজ মাসের এসব আমলসমূহ পালন করতে? কে জানে আগামী জিলহজ আমাদের জীবনে আসবে কি-না? সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় কিন্তু এখনই।