বিদায় হজ্জ্বের ভাষণ

Standard

— ইমরান বিন বদরী

নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম -আম্মা বা’দ।

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا

আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। (সূরা মায়েদাহ,৩)

এই ভাষণে হাজার হাজার সাহাবা উপস্থিত ছিলেন আরাফার ময়দানে। এই আয়াত নাযিলের পর সমস্ত সাহাবীরা যখন খুশিতে আনন্দিত, ঠিক তখনি আফজালুন্নাস্ বাদাল আম্বিয়া হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহু অশ্রুসজল চোখে বল্লেন, এই আয়াত যে বিদায়ের আয়াত – আজ আমি বিদায়ের গন্ধ পাচ্ছি; ইসলাম পরিপূর্ণ করার মানে প্রিয় নবীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কাজের জন্য এসেছিলেন, তা সমাপ্ত হয়েছে; আর তা সমাপ্ত করার মানে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন।

হজ্বের ভাষণ

দশম হিজরির জিলহজ মাসে আল্লাহর রাসূল প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গী-সাথীসহ হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা নগরীতে গমন করেন এবং হজ্ব সম্পাদন করেন। এই ভাষণে ইসলামের প্রকৃত মূল্যবোধ অনুযায়ী মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা ছিলো। ভাষণে ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী সংক্ষেপে বর্ণিত হয়। মুসলিম জাতির সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর এ ভাষণে চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা দেন। আজ লাখো কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে –‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’

لبيك اللهم لبيك ، لاشريك لك لبيك ، إن الحمد والنعمة لك والملك لاشريك

দীর্ঘ ২৩ বছর কঠিন পরিশ্রম, সংগ্রাম, অপরিসীম কুরবানি ও ত্যাগ স্বীকার করে আজ তা পূর্ণতায় উপনীত। ইসলামের ইতিহাসে তা-ই ‘হাজ্জাতুল বিদা’ বা ‘বিদায় হজ’ নামে এটি পরিচিত। এ ছাড়া এই ভাষণকে ‘হাজ্জাতুল বালাগ’ ও ‘হাজ্জাতুত তামাম’ বা পূর্ণতার হজ নামেও অভিহিত করা হয়। সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আগত, বিগত পৃথিবীর সব ভাষণের মধ্যে এ ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় বিভূষিত। বিশ্বমানবতার মুক্তির এমন কোনো দিক নেই, যার ছোঁয়া এই মূল্যবান ভাষণে লাগেনি। মূলত বিদায় হজের ভাষণ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুয়তি জীবনের কর্মপন্থা ও প্রজ্ঞার নির্যাস। তা ছাড়া এ ভাষণ ছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কিয়ামত অবধি বিপদসংকুল পৃথিবীতে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতি ও সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান। এ ভাষণ ছিল বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার এক পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তব কর্মসূচি। মুসলিম উম্মাহ আজ আরাফাতের ময়দানে সমবেত। আরাফাতের ময়দানে ৯ জিলহজ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব মানুষের সামনে দাঁড়ালেন। আল্লাহর রাসূল ﷺ প্রথমে আল্লাহ্ তা’আলার প্রশংসা করলেন। এরপর তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ পেশ করলেন –

হে মুসলিম উম্মাহ, আমার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনো। আমার মনে হচ্ছে এর পরে হজ্বে যোগ দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে না।

আমি তোমদের কাছে দু’টি বিষয় রেখে যাচ্ছি, তা দৃঢ়তার সাথে ধরে রাখলে তোমরা সামান্যও পথভ্রষ্ট হবে না। তা হচ্ছে كِتَابَ اللهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) ও তাঁর রাসূলের সুন্নাত’ (হাদীস/আদর্শ)। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

মূর্খ যুগের সমস্ত কুসংস্কার, সমস্ত অন্ধ বিশ্বাস এবং সকল প্রকারের অনাচার আজ মথিত হয়ে গেল। (সহীহ বুখারী)

একজনের অপরাধের জন্যে অন্যকে দণ্ড দেয়া যাবে না। অতএব, পিতার অপরাধের কারণে সন্তান, আর সন্তানের অপরাধের কারণে পিতাকে দায়ী করা চলবে না। (তিরমিযী)

সমস্ত রক্ত-প্রতিশোধ আজ থেকে রহিত। আমি সর্বপ্রথম ঘোষণা করছি, আমার গোত্রের প্রাপ্য সকল সুদ ও সকল প্রকার রক্তের দাবি আজ থেকে রহিত হয়ে গেল। (সহীহ মুসলিম)

মনে রেখো, তোমাদের সবাইকেই আল্লাহর সামনে উপস্থিত হতে হবে। তাঁর কাছে সকল বিষয়ে জবাবদিহি করতে হবে। সাবধান! তোমরা যেন আমার পরে ধর্মভ্রষ্ট হয়ে না যাও। কাফের হয়ে পরস্পরের রক্তপাতে লিপ্ত হয়ো না। (সহীহ বুখারী)

দেখো, আজকের এই হজ্ব দিবস যেমন মহান, এই মাস যেমন মহিমাপূর্ণ, মক্কার এই হারাম (বাইতুল হারাম) যেমন পবিত্র, প্রত্যেক মুসলমানের ধন সম্পদ, মান-সম্ভ্রম এবং প্রত্যেক মুসলমানের রক্তবিন্দু তেমনি তোমাদের কাছে মহান, তেমনি পবিত্র। পূর্বোক্ত বিষয়গুলোর অবমাননা করা যেমন তোমরা হারাম মনে করো, ঠিক তেমনি কোনো মুসলমানের সম্পত্তি, সম্মান ও প্রাণের ক্ষতি করা তোমাদের জন্যে হারাম। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

আজ শয়তান নিরাশ হয়েছে, সে আর কখনো তোমাদের কাছে পাত্তা পাবে না। কিন্তু সাবধান! অনেক বিষয়কে তোমরা ক্ষুদ্র বলে মনে করো, অথচ শয়তান সে বিষয় দিয়েই তোমাদের সর্বনাশ করে থাকে। ওই বিষয়গুলো সম্পর্কে খুবই সতর্ক থাকবে। (ইবনে মাজাহ)

নারীদের ব্যাপারে আমি তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি, তাদের প্রতি কখনো নির্মম হয়ো না। এক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই তোমরা তাদেরকে আল্লাহর জামিনে গ্রহণ করেছো এবং তাঁরই কালাম দ্বারা তোমাদের দাম্পত্য স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মনে রেখো, তোমাদের স্ত্রীদের ওপর তোমাদের যেমন দাবি ও অধিকার আছে, তোমাদের ওপরও তাদের তেমন দাবি ও অধিকার আছে। তোমরা পরস্পর পরস্পরকে নারীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে উদ্বুদ্ধ করবে। মনে রেখো, এই অবলাদের বল তোমরাই, এদের একমাত্র সহায় তোমরাই। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

যারা উপস্থিত আছো, তারা অনুপস্থিতদেরকে আমার এই সকল পয়গাম পৌঁছে দেবে। হতে পারে, উপস্থিত কিছু লোকের চেয়ে অনুপস্থিত কিছু লোকের দ্বারা বেশি ফায়দা হবে। (সহীহ বুখারী)

সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। এই সীমা লঙ্ঘনের দরুন তোমাদের পূর্ববর্তী বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। (ইবনে মাজাহ)

যদি কোনো হাবশী কৃতদাসকেও তোমাদের আমীর নিযুক্ত করা হয়, আর সে যদি আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তোমাদের পরিচালনা করতে থাকে, তবে তোমরা সর্বতোভাবে তার আদেশ মেনে চলবে; তার অবাধ্য হবে না। (সহীহ মুসলিম)

যে ব্যক্তি নিজের বংশের পরিবর্তে নিজেকে অন্য বংশের বলে পরিচয় দেয়, তার প্রতি আল্লাহ পাকের, ফেরেশতাদের ও সমগ্র মানবজাতির অভিশাপ। (আবু দাউদ)

সাবধান! দাস-দাসীদের নির্যাতন করো না। কোনো মানুষের প্রতি অত্যাচার করো না। শিরক করো না, অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করো না, ব্যাভিচার করো না। জেনে রাখো, এক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই।

#এরপর তিনি শরীয়তের অনেক মৌলিক বিধান বিবৃত করেন। ভাষণশেষে তিনি বললেন, ‘হে মহান প্রভু! আমি কি আপনার দ্বীনের দাওয়াত পরিপূর্ণ (তথা যথাযথ)-ভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি। তখন উপস্থিত জনতা সবাই সম্মিলিতভাবে বললেন, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর দ্বীন পরিপূর্ণভাবে পৌঁছাতে পেরেছেন। তখন তিনি আবার বললেন, হে প্রভু! আপনি শুনুন, আপনি সাক্ষী থাকুন, এরা বলেছে আমি আপনার দ্বীন লোকদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছি। তখন নূর-নবীর ﷺ আলোকদীপ্ত চেহারা মোবারক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এ সময় পবিত্র কুরআনে কারীমের শেষ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল। শেষবারের মতো হজ্ব করে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলে গেলেন সেই ইয়াছরেবে (মদিনা মোনাওয়ারায়) যা রাহমাতুল্লীল আলামীন (সেখানে) যাওয়ার আগে ছিল এক অন্ধকারে নিমজ্জিত জনপদ। আজ তা হয়ে গেল মদিনা মোনাওয়ারা, যেখানে আছে জান্নাতের এক টুকরো অংশ। আজ অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ফিরে যেতে হবে সেই চৌদ্দ‘শ বছর আগে। জীবনকে ঢেলে সাজাতে হবে বিদায় হজের ভাষণের সুমহান আদর্শে।

সম্মানিত বন্ধুরা, আসুন ইসলামের রাহে উম্মতে মুহাম্মদীর মুক্তির কথা বলি।
আল্লাহপাক আমাদের সবাইকে সে তৌফিক দান করুন, আমিন,সুম্মা আমিন।

*সমাপ্ত*

Advertisements

কেন মদীনা শরীফ যেয়ারত করতে হবে

Standard

মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান

হজ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের অন্যতম নিদর্শন, মুসলমানদের মিলনমেলার অন্যতম নিমিত্ত । বান্দাকে তার রবের নিকটবর্তী করে হজ্ব । মুমিন বান্দাহ স্বীয় রবের প্রেমে মত্ত হয়ে হজ্বের কার্যাবলি আদায় করে, এক স্থান হতে অন্য স্থানে ছুটে যায়, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ বলতে বলতে তাওয়াফ করে, সাফা মারওয়াতে দৌড়ায়, শয়তানকে কঙ্কর নিক্ষেপ করে, এমনিভাবে মিনা,মুযদালিফা ও আরাফায় গমন করে বিভিন্ন নিদর্শনাদি অবলোকন করে, এতে করে বান্দার অন্তরে খোদাপ্রেম আরও তীব্রতর হয় । মোটকথা স্বীয় রবের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে । আর আল্লাহ কার উপর সবচেয়ে বেশি সন্তুষ্ট ? কাকে তিনি মাহবুব বলেছেন ? কার জন্যে তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন ? মু’মিন মাত্রই এ সব প্রশ্নের উত্তর জানা আছে । সুতরাং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এই ইবাদতে অংশ নিতে গিয়ে তাঁর প্রিয় হাবীব সরকারে কায়েনাতের দরবারে উপস্থিত হওয়া কোন অংশে কম মাহাত্ম্যপূর্ণ নয় । মদীনা মুনাওয়ারায় উপস্থিত হওয়া হজ্বের আরকান সমূহের মধ্যে নয় কিন্তু নিঃসন্দেহে অধিক মর্যাদাপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ, বরকতময়, নৈকট্য অর্জনের উচ্চতর মাধ্যম বটে । আর এ কথা নিঃসন্দেহ যে, এটি নবীপ্রেম ও নৈকট্যের ব্যাপার, এটি ঈমান মজবুতিকরন ও বলবৎ রাখার উৎকৃষ্ট মাধ্যম । কেননা সরকার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবার খোদাপ্রাপ্তি, গুনাহ মাফ, রহমত-বরকতের স্থান বৈকি ।

কুরআনের ভাষায় নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র রওযায় উপস্থিতিঃ
ইরশাদ হচ্ছে-

وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَحِيمًا

অনুবাদঃ এবং যদি কখনো তারা নিজেদের আত্মার প্রতি অবিচার জুলুম করে তখন, হে মাহবুব! (তারা) আপনার দরবারে উপস্থিত হয় এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে । আর রাসুল তাদের পক্ষে সুপারিশ করেন, তবে অবশ্যই আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী ও অত্যন্ত দয়ালু পাবে । [১]

এই আয়াতে কারীমা দ্বারা ক্ষমাপ্রাপ্তির জন্য তিনটি অবস্থান বর্ণনা করা হয়েছে-

১. আক্বা মাওলা নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার দরবারে মুকাদ্দাসায় উপস্থিত হওয়া ।
২. সেখানে (দরবারে নবী) উপস্থিত হয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা ।
৩. রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ প্রার্থনা বা তাঁর উসিলায় ক্ষমা চাওয়া ।
এই তিন বিষয়ের সমন্বয়ে গুনাহগার বান্দা অতি সহজে আল্লাহর পক্ষ হতে ক্ষমা লাভ করবে । আর এই পদ্ধতি কোন বান্দার দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতি নয় বরং খোদ বারী তায়ালা নিজেই তা বাতলে দিয়েছেন । আজ তাঁরি বান্দা খাদেম দাবী করে আমরা যিয়ারত করতে বাঁধা দেই ? নিরুৎসাহিত করি।

সর্বসম্মতভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে গুনাহ মাফ চাওয়া বৈধ । মুফাসসিরীন কেরাম তাঁর হায়াতে তাইয়্যেবাহ ও তাঁর পরবর্তী সময় উভয়কেই এতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন । আর এই আয়াত দ্বারাই হায়াতুন্নবীর বৈধতাও প্রমাণিত হয় । ইমাম বাযযার এ প্রসঙ্গে সহীহ সনদে বর্ণনা করেন –

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন –

حَيَاتِي خَيْرٌ لَكُمْ تُحَدِّثُونَ وَيُحَدَّثُ لَكُمْ وَوَفَاتِي خَيْرٌ لَكُمْ تُعْرَضُ عَلَيَّ أَعْمَالُكُمْ فَمَا كَانَ مِنْ حَسَنٍ حَمِدْتُ اللَّهَ عَلَيْهِ وَمَا كَانَ مِنْ سَيِّئٍ اسْتَغْفَرْتُ اللَّهَ لَكُمْ

অনুবাদঃ আমার জীবন তোমাদের জন্য কল্যাণকর । তোমরা আমার নিকট কোন কিছু জানতে চাইবে, আমি তার জবাব দেবো । আমার ওফাতও তোমাদের জন্য কল্যাণকর । তোমাদের আমলসমূহ আমার নিকট পেশ করা হবে, তোমাদের উত্তম আমলসমূহ দেখে আমি আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করব । আর তোমাদের মন্দ আমল দেখতে পেলে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিকট মাগফেরাত কামনা করব । [২]

এ দ্বারা নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ওফাত পরবর্তী সময়েও উম্মতের জন্য সুপারিশ সাব্যস্ত হয় । আর রওযা মুকাদ্দাসায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার জীবিত থাকার বিষয় তাঁর হাদীস হতেই পাওয়া যায় । এ ছাড়া পরবর্তী সময়ে সাহাবা কেরাম, তাবেঈ ও উম্মতের উলামায়ে হক্ব রওযা মুকাদ্দাসে ওসীলা তালাশ করেছেন ।

পবিত্র কুরআনে আরও ইরশাদ হচ্ছে-

وَإِذَا جَاءَكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِآيَاتِنَا فَقُلْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ كَتَبَ رَبُّكُمْ عَلَى نَفْسِهِ الرَّحْمَةَ أَنَّهُ مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِهِ وَأَصْلَحَ فَأَنَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

অনুবাদঃ আর যখন আপনার নিকট তারা উপস্থিত হবে, যারা আমার নিদর্শনসমূহের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, তখন তাদেরকে আপনি বলুন, ‘তোমাদের উপর শান্তি’! তোমাদের প্রতিপালক নিজ করুণার দায়িত্বে রহমত অবতীর্ণ করেছেন যে, তোমাদের মধ্যে কেউ মূর্খতাবশতঃ কোন মন্দ কাজ করে বসে, অতঃপর এর পরে তাওবা করে এবং সংশোধন করে নেয়, তবে নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু । [৩]

নবী পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওযা মুকাদ্দাসায় উপস্থিত যিয়ারত অতি সওয়াব ও বরকতময় কাজ। এটি মুস্তাহাব কাজসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম বরং ওয়াজিবের কাছাকাছি ।

হাদীসের আলোকে রওযা মুকাদ্দাসায় উপস্থিতির ফজিলতঃ

হাদীস নং-১: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত-
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ زَارَ قَبْرِي وَجَبَتْ لَهُ شَفَاعَتِي
অনুবাদঃ নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমার রওযা মুবারক যিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফাআ’ত ওয়াজিব হয়ে গেল । [৪]
হাদীস নং-২: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে আরও বর্ণিত হয়-
عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ زَارَ قَبْرِي حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي
অনুবাদঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আমার রওযা মুবারক যিয়ারত করল, তার জন্য আমার শাফাআ’ত আবশ্যক হয়ে গেল । [৫]
হাদীস নং-৩: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত-
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ جَاءَنِي زَائِرًا لَا يَعْلَمُهُ حَاجَةً إِلَّا زِيَارَتِي كَانَ حَقًّا عَلَيَّ أَنْ أَكُونَ لَهُ شَفِيعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অনুবাদঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যাক্তি (যিয়ারতকারী) আমার নিকট (রওজা শরীফে) কেবল যিয়ারতের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হয়, তার জন্য আমার উপর হক যে, কিয়ামতের দিন যেন আমি তার শাফাআ’তকারী হই । [৬]
হাদীস নং-৪: উমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পরিবারের এক সদস্য হতে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ زَارَ قَبْرِي ” أَوْ قَالَ: ” مَنْ زَارَنِي كُنْتُ لَهُ شَفِيعًا أَوْ شَهِيدًا، وَمَنْ مَاتَ فِي أَحَدِ الْحَرَمَيْنِ بَعَثَهُ اللهُ مِنَ الْآمِنِينَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অনুবাদঃ যে ব্যক্তি আমার যিয়ারত করল অথবা বেসাল শরীফের পর আমার যিয়ারত করল, আমি তার জন্য সাক্ষ্যদাতা ও শাফাআ’তকারী হব । আর যে ব্যক্তি দুই হেরেম শরীফের একটিতে মৃত্যুবরণ করল, সে কিয়ামতের দিন নিরাপত্তাপ্রাপ্তদের সাথে উত্থিত হবে ।[৭]
হাদীস নং-৫: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
مَنْ حَجَّ فَزَارَ قَبْرِي بَعْدَ مَوْتِي كَانَ كَمَنْ زَارَنِي فِي حَيَاتِي
অনুবাদঃ যে ব্যক্তি হজ্ব পালন করবে; অতঃপর আমার ওফাতের পর আমার যিয়ারত করবে, তার যিয়ারত ঐ ব্যক্তির মত হবে যে জীবদ্দশায় আমার যিয়ারত করেছে । [৮]
হাদীস নং-৬: উমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর পরিবারের এক সদস্য হতে বর্ণিত-
عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ زَارَنِي مُتَعَمِّدًا كَانَ فِي جِوَارِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অনুবাদঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কেবল যিয়ারতের উদ্দেশ্যে আমার নিকট মদীনায় আগমণ করবে, সে কিয়ামতের দিন আমার পাশে ,প্রতিবেশী হবে । [৯]
হাদীস নং-৭: হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত-
قَالَ رَسُول الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ حَجَّ الْبَيْتَ وَلَمْ يَزُرْنِي فَقَدْ جَفَانِي
অনুবাদঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বায়তুল্লাহর হজ্ব করবে আর আমার যিয়ারত করলনা, সে যেন আমার উপর জুলুম করল । [১০]
যিয়ারতের আদবঃ

# মদীনা শরীফে উপস্থিত হয়ে যিয়ারতের নিয়ত করা ।
# গোসল করে পবিত্র ও সাফ সুতর অবস্থায় যাওয়া । পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা ।
# যিয়ারতের আগ হতেই অর্থাৎ, রওজা মুকাদ্দাসায় পৌঁছাবার পূর্ব হতেই আদবের সাথে চলা, নত মস্তকে প্রবেশ করা ।
# পুরো পথ সালাত-সালাম পেশ করা ।
# প্রথমে মসজিদে নববী শরীফে প্রবেশ করে দু’রাকাআ’ত নফল নামায, অতঃপর দু’রাকা’ত শোকরানা নামায আদায় করা।
# রওযা শরীফে উপস্থিত হয়ে সালাম পেশ করা ।
# নিজেকে একাগ্রতার সাথে সরকারে দো আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার সামনে উপস্থিত করা ।
# আদবের সাথে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজার দিকে মুখ করে দু’আ করা ।
ইবনে হুমাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর ফাতহুল কাদীরে ইমাম আজম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর মুসনাদের বরাত দিয়ে ইবনে উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন-
مِنْ السُّنَّةَ أَنْ تَأْتِيَ قَبْرَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ قِبَلِ الْقِبْلَةِ وَتَجْعَلَ ظَهْرَك إلَى الْقِبْلَةِ وَتَسْتَقْبِلَ الْقَبْرَ بِوَجْهِك ثُمَّ تَقُولَ: السَّلَامُ عَلَيْك أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
অনুবাদঃ (সাহাবা ও তাবেঈগণের) সুন্নত পদ্ধতি হল, যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার রওযা মুনাওয়ারায় উপস্থিত হবে তখন স্বীয় পিঠকে ক্বিবলার দিকে করবে এবং চেহারা রওযা শরীফের দিকে করবে। অতঃপর সালাম পেশ করবে । [১১]

ইমাম মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইবনে ওহাব হতে বর্ণনা করেন-
إذَا سَلَّمَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَدَعَا يَقِفُ وَوَجْهُهُ إلَى الْقَبْرِ لَا إلَى الْقِبْلَةِ
অনুবাদঃ রওযা মুকাদ্দাসার সামনে উপস্থিত হয়ে সালাম প্রদান ও দু’আ করার সময় ক্বিবলার দিকে মুখ না করে বরং রওযা শরীফের দিকে করতে হবে । [১২]

একবার খলিফা আবু জাফর মনসুর ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর নিকট জিজ্ঞাসা করেন, জিয়ারতের সময় ক্বিবলার দিকে মুখ রাখবেন, না রওযা মুবারকের দিকে রাখবেন ? উত্তরে তিনি বলেন-

فَقَالَ وَلم تَصْرفْ وَجْهَكَ عَنْهُ وَهُوَ وَسِيلَتُكَ وَوَسِيلَةُ أَبِيكَ آدَمَ عيه السَّلَامُ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ؟ بَلِ اسْتَقْبِلْهُ واسْتَشْفِعْ بِهِ فَيُشَفِّعهُ اللَّهُ قَالَ اللَّهُ تعالى (وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظلموا أنفسهم) الآيَةَ
অনুবাদঃ রওজা মুকাদ্দাসা হতে মুখ কেন ফিরাবেন ? যেখানে হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনার এবং আদি পিতা আদম আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ওসীলা হবেন । হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকে মুখ রেখে আপনি শাফাআ’ত চান, আপনার শাফাআ’ত কবুল হবে । যেমন আয়াতে করীমায় উল্লেখ হয়…… (وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظلموا أنفسهم) [১৩]
মুনীব বিন আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত-
رَأَيْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ أَتَى قَبْرَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَوَقَفَ فَرَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ افْتَتَحَ الصَّلَاةَ فَسَلَّمَ عَلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثُمَّ انْصَرَفَ
অনুবাদঃ আমি হযরত আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে দেখেছি যে, তিনি হুযুর করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার পবিত্র রওজায় উপস্থিত হয়ে দীর্ঘক্ষণ যাবৎ হাত উঠিয়ে দু’আ করতে থাকেন, এমনকি আমার মনে হয়েছিল- তিনি যেন নামাযের জন্য নিয়ত করে ফেললেন, অতঃপর তিনি সালাম পেশ করে রওজা শরীফ ত্যাগ করলেন । [১৪]

আল্লাহ পাক রাব্বুল ইজ্জত আমাদেরকে নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে পাকে যথাযথ আদব ও পদ্ধতি সহ উপস্থিত হওয়ার তাওফিক দান করুন । মাসনুন পদ্ধতিতে আদবের সাথে হজ্জ্ব -ওমরার সকল কার্যাদি ও যিয়ারতে মদীনা মুনাওয়ারা বারবার নসীব করুন । আমিন, বিহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালীন!

তথ্যসূত্রঃ
১. আল কুরআন,সূরা নিসা: ৬৪ অনুবাদ- আ’লা হযরত (রহঃ) কৃত কানযুল ঈমান ।
২. হাফিজ ইবনে কাসীর কৃত আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৫:২৭৫ দারুল ফিকর বৈরুত, মুসনাদে বাযযার ,কিতাবু আলামাতিন নবুওয়াহ, হাদীস-৯৫৩, হায়সামী মাজমাউজ যাওয়ায়িদ হাদীস নং-১৪২৫০ ।
৩. আল কুরআন,সূরা আনয়া’ম: ৫৪ অনুবাদ- আ’লা হযরত (রহঃ) কৃত কানযুল ঈমান ।
৪. সুনানে দারে ক্বুতনী, ৩:৩৩৪ কিতাবুল হজ্ব, হাদীস-২৬৯৫ মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ বৈরুত , বায়হাক্বী শোয়া’বুল ঈমান হাদীস নং-৩৮৬২ মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ, ওয়াফা উল ওয়াফা ৪:১৬৮ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত।
৫. ওয়াফা উল ওয়াফা ৪:১৭০ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত, হায়সামী কাশফুল আসতার আন যাওয়ায়িদুল বাযযার হাদীস-১১৯৮ মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ বৈরুত ।
৬. তাবরানী আল মু’জামুল কবীর ১২:২৯১ হাদীস-১৩১৪৯, মাকতাবাতু ইবন তাইমিয়্যাহ কায়রো, ওয়াফা উল ওয়াফা ৪:১৭০ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত, মাওয়াহিবে লাদুনিয়্যাহ ৩:৫৮৮ মাকতাবাতুত তাওফিকিয়্যাহ কায়রো ।
৭. বায়হাক্বী শোয়া’বুল ঈমান ৬:৪৮ হাদীস নং-৩৮৫৭ মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ, মুসনাদে আবু দাউদ তাইয়ালসি হাদীস নং-৬৬ দারুল হিজর মিশর, মিশকাতুল মাসাবীহ হাদীস- ২৭৫৫/২৬৩৫ ।
৮. তাবরানী আল মু’জামুল কবীর ১২:৪০৬ হাদীস-১৩৪৯৭, মাকতাবাতু ইবন তাইমিয়্যাহ কায়রো, মিশকাতুল মাসাবীহ হাদীস- ২৭৫৬/২৬৩৬, ওয়াফা উল ওয়াফা ৪:১৭১ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত।
৯. বায়হাক্বী শোয়া’বুল ঈমান ৬:৪৭ হাদীস নং-৩৮৫৬ মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ, সুয়ূতী জামেউল আহাদীস, হাদীস-২২৩০৮, মিশকাতুল মাসাবীহ, কিতাবুল মানাসিক হাদীস-২৭৫৬/২৬৩৬ ।
১০. ওয়াফা উল ওয়াফা ৪:১৭১ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত, শিফাউস সিকাম ২৭পৃঃ , সুয়ূতী জামেউল আহাদীস, হাদীস-২১৯৯৭
১১. ইবনে হুমাম, ফতহুল ক্বদীর ৩:১৮০ দারুল ফিকর বৈরুত ।
১২. মোল্লা আলী ক্বারী কৃত শরহুস শিফা ২:১৫৩ দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ বৈরুত ।
১৩. কাযী আয়ায, আশ শিফা বিতা’রিফে হুক্বুকিল মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ২:৯২,৯৩ দারুল ফিহা ওমান ।
১৪. বায়হাক্বী শোয়া’বুল ঈমান ৬:৫৩ হাদীস নং-৩৮৬৭ মাকতাবাতুর রুশদ রিয়াদ,

মাযহাব অনুসরণঃএকটি পর্যালোচনা

Standard

মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ

وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ۚ ذَ‌ٰلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴿٥٩﴾
এরশাদ হচ্ছে

ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, নির্দেশ মান্য করো রাসূলের আর তোমাদের মধ্যে যারা মতায় অধিষ্ঠিত তাদেরও (নির্দেশ মেনে চলো)। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে সেটাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সমীপে উপস্থাপন করো তথা কুরআন ও সুন্নাহ্ থেকে এর সমাধান খুঁজে বের করো (সঠিক সিদ্ধান্ত লাভের আশায়) যদি আল্লাহ্ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হও। এটা উত্তম এবং এর পরিণাম সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। [সূরা নিসা : আয়াত : ৫৯]

আলোকপাত
সুন্নী মুসলিম হিসাবে আমাদের অন্তরে এই বিশ্বাস ও আক্বীদাহ রাখতে হবে যে, পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নিবেদিত হয়ে মহান আল্লাহ তায়ালার একক ও নিরংকুশ আনুগত্যই হলো তাওহীদের মর্মকথা এবং সাথে সাথে রসূলে করীম রাউফুর রহীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর আনুগত্যও এ জন্য অত্যাবশ্যক যে, তাঁর প্রতিটি কথন, জীবনের প্রতিটি আচরণ উম্মতের নিকট শরীয়তে ইলাহীয়ার প্রতিবিম্ব হিসেবেই বিবেচিত। এমনকি রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কোন নির্দেশ বাহ্যত কুরআন মজীদের বিপরীত প্রতীয়মান হলেও সেেেত্র ব্যাখ্যা সাপেে তাঁর নির্দেশিত বিষয় তথা হাদীস শরীফই শরীয়তের দলীল হিসেবে গণ্য হবে। হযরত মা ফাতেমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা) এর জীবদ্দশায় হযরত আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কে ২য় বিবাহের অনুমতি না দেয়া এবং হযরত খুযাইমা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এর স্যা দুইজন সাীর সা্েযর সমতূল্য ঘোষণা দেয়া ইত্যাদি এরই অন্তর্ভুক্ত। অতএব মুমিন দাবীদার কোন ব্যক্তি কোন গ্রহণযোগ্য ও শরয়ী কারণ ব্যতিরেকে রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত অমান্য করা মূলত নিজের ঈমানকে অস্বীকার করার নামান্তর। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেনÑ
فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُوْنَ حَتّى يُحَكِّمُوْكَ فِيْمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لاَ يَجِدُوْا فِىْ اَنْفُسِهِمْ حَرَجٌ مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوْا تَسْلِيْمًا ـ
অর্থ: ‘সুতরাং হে মাহবুব! আপনার প্রতিপালকের শপথ, তারা মু’মিন হবে না যতণ না তারা তাদের পারস্পরিক বিবাদের েেত্র আপনাকে বিচারক মানবে অতঃপর আপনার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অন্তরে সংশয় রাখবে না এবং সমর্পিত চিত্তে গ্রহণ করবে না।’’
এ আয়াতে ঈমানের পূর্ণতা নয় বরং ঈমানকেই অস্বীকার করা হয়েছে। অতএব এ বিষয়ে ভিন্ন মতের কোনও অবকাশ নেই যে, মানুষের ইহ ও পরকালীন মুক্তি ও সাফল্যের জন্য আল্লাহ্তায়ালাও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র যথাযথ আনুগত্যের কোন বিকল্প আছে। নিঃসন্দেহে কোন বিকল্প পথ নেই।
আলোচ্য আয়াতে اولى الامر এর আনুগত্যের কথাও বলা হয়েছে। যার অর্থ ‘আদেশ দাতাগণ’, মতায় অধিষ্ঠিত ইত্যাদি। সংখ্যাগরিষ্ঠ তাফসীরকাকের মতে اولى الامر দ্বারা ‘কোরআন-সুন্নাহ’র জ্ঞানের অধিকারী ফকীহ ও মুজতাহিদগণকেই বুঝানো হয়েছে। উক্ত মতের পে যাদের অবস্থান তাদের মধ্যে হযরত জাবের বিন আবদিল্লাহ, হযরত আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস, হযরত মুজাহিদ, হযরত আতা বিন আবি রিবাহ, হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। কারো কারো মতে উক্ত اولى الامر দ্বারা মুসলিম শাসকবর্গ উদ্দেশ্য।
ইমাম আবু বকর জাস্সাস (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) এর মতেاولى الامر শব্দটির ব্যাপকার্থ ধরা হলে তাফসীরদ্বয়ের মাঝে আর কোন বিরোধ থাকে না। তখন অর্থ দাঁড়াবে প্রশাসনের েেত্র তোমরা প্রশাসকবর্গের এবং আহকাম ও মাসায়েলের েেত্র বিজ্ঞ আলেমগণের কথা মেনে চলো। যদি আমরা তাঁর উক্ত মতের সাথে আরেকটি কথা সংযোজন করি তাহলে اولى الامر এর ব্যাপকার্থকে সীমাবদ্ধতার পরিসরে নিয়ে আসা যায়, আর তা হলো اولى الامر দ্বারা যদি মুসলিম শাসক উদ্দিষ্ট হয় তাহলে কোন সমস্যা নেই। কারণ প্রশাসন, আহকাম ও মাসায়েলের েেত্র শাসকবর্গ সুবিজ্ঞ আলেমগণের সিদ্ধান্ত ও পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য। সুতরাং শাসকবর্গের আনুগত্য আলেমগণের আনুগত্যের নামান্তর মাত্র।
মোদ্দাকথা হলো, আলোচ্য আয়াতের আলোকে আল্লাহ্ তায়ালা ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আনুগত্য যেমন ফরজ ঠিক তেমনিভাবে সুশাসক বা কোরআন-সুন্নাহ্র যথোপযোগী ব্যাখ্যাদাতা বিজ্ঞ আলেম ও মুজতাহিদগণের আনুগত্যও অপরিহার্য, আর পরিভাষায় এরই নাম হলো তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণ। তাক্বলীদ বা কোন ইমামের মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতার স্বপে উক্ত আলোচ্য আয়াত ছাড়াও পবিত্র কুরআন ও হাদীসে অসংখ্য প্রত্য ও পরো প্রমাণ রয়েছে।
আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেনÑ

ধর্মজ্ঞান অর্জনের নিমিত্তে প্রত্যেক দল থেকে কেন একটি উপদল বের হয় না, যেন ফিরে এসে স্বজাতিকে সতর্ক করতে পারে এবং যেন স্বজাতিরা সর্তকবাণী শ্রবণ করে সর্তক হতে পারে। [সূরা তাওবা, আয়াত : ১২৩]
উক্ত আয়াতের সারমর্ম হলো উম্মতের মাঝে এমন একটি দল থাকা অপরিহার্য যারা দিবা-রাত্রি কোরআন-সুন্নাহর জ্ঞানার্জনে নিয়োজিত থাকবে এবং ইজতিহাদ বঞ্চিত মুসলমানদের মাঝে ইজতিহাদ প্রসূত জ্ঞান বিতরণ করবে সাথে সাথে সর্বসাধারণের করণীয় হলো তাঁদের প্রদর্শিত মত, পথ অনুসরণ করা এবং যাবতীয় অকল্যাণ থেকে বেঁচে থাকা। উক্ত আয়াতের হুকুম ও তাক্বলীদের মাঝে বৈপরীত্য কোথায়? মহান আল্লাহ্ তায়ালা অন্যত্র ইরশাদ করেনÑ

অর্থাৎ তোমরা না জানলে বিজ্ঞজনদের কাছে জিজ্ঞেস করো। [সূরা নাহাল, আয়াত- ৪৩]
উল্লেখিত আয়াত নিঃসন্দেহে তাকলিদ বা মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতা প্রমাণ করছে। আয়াতে বলা হচ্ছে জ্ঞানের দৈন্যের কারণে অনভিজ্ঞ লোকদের উচিত অভিজ্ঞ ও জ্ঞানসমুদ্রে বিচরণকারী ব্যক্তিদের দ্বারস্ত হয়ে তাদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমল করা।
এভাবে পবিত্র কুরআনে তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণের স্বপে এমন অসংখ্য প্রামান্য তথ্য রয়েছে। অনুরূপ পবিত্র হাদিস শরীফে তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণের স্বপে প্রামান্য তথ্য বিদ্যমান। যেমন- হযরত হুযায়ফা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনÑ

অর্থাৎ আমার পরে তোমরা আবু বকর ও ওমর এ দুইজনকে অনুসরণ করে যাবে। [তিরমিযী, ইবনে মাজাহ্, আহমদ]
উল্লেখিত হাদীসেاقتداء শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
ধর্মীয় আনুগত্যের অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন

অর্থ- তোমরা (আমার কর্মপদ্ধতি প্রত্য করার মাধ্যমে)
আমাকে অনুসরণ করে যাও আর তোমাদের পরবর্তীরা তোমাদেরকে অনুসরণ করে যাবে। [বুখারী, মুসলিম]
এভাবে সাহাবায়ে কেরামসহ সিংহভাগ পূর্ববর্তী ইসলামী মনীষীদের অসংখ্য উক্তি তাকলীদ তথা মাযহাব মানার পে প্রমাণ বহন করে।
উল্লেখ্য একজন মুকাল্লিদ (তাক্বলীদকারী) তার অনুসরণের পাত্র কোন মুজতাহিদকে আইন প্রণেতা বা শরীয়তের স্বতন্ত্র উৎস মনে করে না (যেমন আহলে হাদীস বা লা-মাযহাবীদের একটি অংশ মুকাল্লিদ সম্পর্কে তেমনটি মনে করে থাকে) বরং এই বিশ্বাসে তারা মুজতাহিদগণের অনুসরণ করে থাকে যে, কুরআন ও সুন্নাহ্ হলো ইসলামী শরিয়তের প্রধান দু’টি শাশ্বত উৎস এবং এ উৎসদ্বয়ের সুবিশাল ও বিস্তৃত জগতে সে (তাক্বলীদকারী) একজন অসহায় ও আনাড়ি পথিক মাত্র আর অন্যদিকে মুজতাহিদ হলেন সেই সমুদ্রের একজন নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। সেেেত্র তাঁর প্রদত্ত ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তই হলো বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ এবং বাস্তব সত্যের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি মাত্র। সুতরাং মুজতাহিদগণ আইন প্রণেতা নন বরং আইনের ব্যাখ্যাদাতা। আহলে হাদীস বা লামাযহাবীদের ন্যায় যে বা যারা ইমাম আযম আবু হানীফা (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম মালেক (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম শাফেয়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) প্রমুখ ইমামগণকে নিজেদের সাথে তুলনা করার ঘৃণ্য অপচেষ্টায় লিপ্ত, মূলত এহেন চিন্তাধারা তাদের স্থুলবুদ্ধি, হীন মানসিকতা এবং নগ্ন নির্লজ্জতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুতরাং এ ধরনের ব্যক্তি বা সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।
আলোচ্য আয়াতের শেষাংশ দ্বারাও অনেকে একটি অগ্রহণযোগ্য ও দুর্বল অভিমত ব্যক্ত করে থাকে। আয়াতাংশটি হলো-
فان تنازعتم فى شئ فردوه الى الله والرسول ان كنتم تؤمنون بالله واليوم الاخر
অর্থাৎ আয়াতের প্রথমাংশে বর্ণিত ‘ঈমানদার’ দ্বারা যে সকল সাধারণ ঈমানদার উদ্দেশ্য। فان تنازعتمদ্বারা ঠিক একই শ্রেণীর ঈমানদার উদ্দিষ্ট। অর্থাৎ তারা আয়াতটির এই অর্থ নেয়, ‘হে ঈমানদারগণ যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতানৈক্য সৃষ্টি হয় তবে সেটাকে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সমীপে উপস্থাপন করো তথা কুরআন ও হাদীস থেকে এর সমাধান খুঁজে বের করো যদি আল্লাহ্ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হও। এ সম্পর্কে বিজ্ঞজনদের বক্তব্য হলো আলোচ্য আয়াতের প্রথমাংশে সর্বসাধারণকে এবং শেষাংশে ইজতেহাদের যোগ্যতাসম্পন্ন ইমামগণকে বুঝানো হয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লামা আবু বকর জাস্সাস (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) আহকামুল কুর’আনে ব্যক্ত করেনÑ

অর্থাৎ মহান আল্লাহ্ তায়ালাاولى الامر তথা মুজতাহিদগণকে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো, কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে সমাধান দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘‘সাধারণ লোক’’ এবং বিজ্ঞ আলেম শ্রেণীভূক্ত নয় এমন ব্যক্তির সে যোগ্যতা নেই। কেননা এ পর্যায়ের ব্যক্তিরা বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো কুরআন-সুন্নাহ্র আলোকে সমাধান দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নয়। ‘‘লা মাযহাবীদের’’ কর্ণধার নবাব সিদ্দিক হাসান খাঁনও ‘ফাতহুল বয়ান’ গ্রন্থে এ কথা অকপটে স্বীকার করেছেন- তিনি বলেন-

মূলত এখানে [فان تنازعتم দ্বারা] মুজতাহিদগণকে স্বতন্ত্রভাবে সম্বোধন করা হয়েছে।
অতএব সাধারণ মুসলমানরা মুজতাহিদগণের ইজতিহাদ প্রসূত মাসায়েল অনুযায়ী আমল করার মাধ্যমেই আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর যথাযথ আনুগত্য প্রকাশ করবে।
আশা করি, পাঠক মহল ‘‘তাক্বলীদ’’ বা মাযহাব অনুসরণের অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা সংপ্তি প্রামাণ্য তথ্য দ্বারা বুঝতে পেরেছেন।
* তাক্বলীদ বা মাযহাব অনুসরণ সাধারণত দু’প্রকার,
১.تقليد مطلق তথা মুক্ত তাক্বলীদ
২.تقليد شخصى তথা ব্যক্তি তাক্বলীদ।
পরিভাষায়,تقليد مطلق বা মুক্ত তাক্বলীদ বলতে সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট মুজতাহিদের পরিবর্তে বিভিন্ন মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত অনুসরণকে বুঝায়, تقليد شخصىবা ব্যক্তি তাক্বলীদ বলতে সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট মুজতাহিদের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করাকে বুঝায়। সাহাবী ও তাবেয়ীগণের যুগে ‘‘মুক্ত তাকলীদ’’ ও ‘‘ব্যক্তি তাকলীদ’’ উভয়েরই প্রচলন ছিল। অবশ্য উভয় প্রকারের ল্য ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। তবে পরবর্তীতে পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেেিত উম্মাতের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞ আলেম ও ফকীহগণ। সর্বসম্মতভাবে মুক্ত তাকলীদের পরিবর্তে ব্যক্তি তাকলীদের পে রায় দিয়েছেন। কেননা তাঁরা ‘প্রবৃত্তির দাসত্ব’’ নামে এক ভয়ংকর ব্যাধি সর্বসাধারণদের মাঝে প্রত্য করেছিলেন। যে প্রবৃত্তির দাসত্বকে চরিতার্থ করার জন্য শরীয়তকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে তারা সামান্যতম কুণ্ঠিত হলো না, এ ধরণের সুবিধাভোগী ব্যক্তিরা যখন নিজেদের ঘৃণ্য চাহিদা পূরণে মুক্ত তাকলীদের নামে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল প্রমাণ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ঠিক এহেন মুহুর্তে মুক্ত তাক্বলীদের পরিবর্তে ব্যক্তি তাকলীদের অপরিহার্যতার পে এক বৈপ্লবিক রায় প্রদান করে, বিজ্ঞ মুজতাহিদগণ তাদের এক অনন্য দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ্ তায়ালা তাঁদের কবর শরীফকে রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন। আমীন। সুতরাং ব্যক্তি তাকলীদের অপরিহার্যতার ধারাবাহিকতায় আজ পৃথিবী জুড়ে সমাদৃত হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী এই চারটি বরহক্ব মাযহাব বিদ্যমান আছে।
মাযহাবগুলোর রূপকার হলেন যথাক্রমে ইমাম আযম আবু হানীফা নু’মান বিন ছাবিত (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ইমাম দারুল হিজরাহ্ হযরত মালেক বিন আনাস (রাহমাতুল্লহি আলাইহি) ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রিছ আশ্শাফেয়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)। আমাদের আক্বীদাহ হলো ইমাম চতুষ্টয়সহ সকল ছালেহ ইমাম ও মুজতাহিদ হক্বপন্থীদের অর্ন্তভূক্ত। তবে ইমামুল হারামাইন, আল্লামা শামী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) সহ বিজ্ঞজনদের অভিমত হলো বর্তমানে ছাহাবা, তাবেয়ীগণসহ এমন কোন ইমাম বা মুজতাহিদের তাকলীদ বৈধ নয় যাদের মাযহাব ও ফতোয়া পূর্ণাঙ্গ ও সুবিন্যস্তাকারে আমাদের কাছে নেই। বিশ্লেষণের নিরিখে আমরা বলতে পারি একমাত্র চার ইমামের মাযহাব ও ফতোয়া সুবিন্যস্ত গ্রন্থাবদ্ধ। সুতরাং অনিবার্য কারণবশতঃ উক্ত চার ইমাম ছাড়া অন্য কারো তাক্বলীদ সম্ভব নয়। হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী থেকে যেকোন একটি মাযহাবের অনুসরণ করা ওয়াজিব। মাযহাব না মানা পথভ্রষ্টতা।
মহান আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে তাকলীদের অপরিহার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা বুঝার তাওফীক দান করুন। লামাযহাবীসহ সকল বাতিলপন্থীর মন্দ আক্বীদাহ্ থেকে আমদের ক্বলবকে পবিত্র রাখুন। কুরআন-সুন্নাহ্র নির্দেশিত সঠিক পথ ও মতে চলার মাধ্যমে দু’জাহানের সাফল্য দান করুন। আমীন, বিহুরমতি সায়্যিদিল মুরসালিন।

কোন অর্থে নবী ও রসুল উম্মী

Standard

আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-
اَلَّذِيْنَ يَتَّبِعُوْنَ الرَّسُوْلَ النَّبِىَّ الْاُمِّىَّ الَّذِيْنَ يَجِدُوْنَهُ مَكْتُوْبًا عِنْدَهُمْ فِىْ التَّوْرَاةِ وَالْاِنْجِيْلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوْفِ وَيَنْهَهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ لَهُمْ الطَّيِّبَتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمْ الْخَبَائِثُ وَيَضَعُ عَنْهُمْ اِصْرَهُمْ وَالْاَغْلَلَ الَّتِىْ كَانَتْ عَلَيْهِمْ ط فَالَّذِيْنَ اَمَنُوْا بِهِ وَعَزَّرُوْهُ وَنَصَرُوْهُ وَاتَّبَعُو النُّوْرَ الَّذِيْنَ اُنْزِلَ مَعَهُ اُولَئِكَ هُمْ الْمُفْلِحُوْنَ- (سوره الاعراف: اية ১৫৭)
তরজমা: ওই সব লোক, যারা দাসত্ব করবে এ রসূল, পড়া বিহীন অদৃশ্যের সংবাদ দাতার যাকে লিপিবদ্ধ পাবে নিজের নিকট তাওরীত ও ইঞ্জীলের মধ্যে; আর পবিত্র বস্তু সমূহ তাদের জন্য হালাল করবেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ তাদের উপর হারাম করবেন; এবং তাদের উপর থেকে ওই কঠিন কষ্টের বোঝা ও গলার শৃঙ্খল, যা তাদের উপর ছিলো, নামিয়ে অপসারিত করবেন। সুতরাং ওইসব লোক, যারা তাঁর উপর ঈমান এসেছে, তাকে সম্মান করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং ওই নূরের অনুসরণ করেছে, যা তাঁর সাথে অবতীর্ণ হয়েছে তারাই সফলকাম হয়েছে।
[সূরা আ’রাফ: আয়াত- ১৫৭, তরজমা কানযুল ঈমান]
আল্লাহ্ তা‘আলা খোদ এ আয়াত শরীফে হুযূর-ই আকরামের বহু গুণের উল্লেখ করেছেন- অতি উত্তম রূপে। সুতরাং এ আয়াত শরীফকে শুধু একটি গুণ (না‘ত) নয়, বহু না‘তের সমষ্টি বলা যাবে।
প্রথমত, এ’তে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালামকে তিনটি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে- ১. নবী, ২. রসূল, ৩. উম্মী। সুতরাং ‘রসূল’ হলেন ওই মহান সত্তা, যিনি স্রষ্টা ও সৃষ্টিকুলের মধ্যে এক মহান মাধ্যম। অর্থাৎ তিনি মহান রব থেকে ফয়য (কল্যাণ ধারা) নিয়ে সৃষ্টি পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন, সৃষ্টির গুনাহ্ ও ভুল-ত্র“টি মহান স্রষ্টার নিকট থেকে ক্ষমা করিয়ে নেন। অথবা সৃষ্টিকে কুফর ও শির্ক থেকে বাঁচিয়ে স্রষ্টা পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন। বস্তুত হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর মধ্যে এ গুণ পূর্ণাঙ্গ পর্যায়ে রয়েছে। কারণ আরবের মতো দেশে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন, আরববাসীদের থেকে কাউকে সিদ্দিক্ব কাউকে ফারূক্ব ইত্যাদি বানিয়ে দিয়েছেন।
আর ‘নবী’র সংবাদ দাতা। প্রথমোক্ত অর্থের ভিত্তিতে, বাস্তবিক পক্ষে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর ওই মর্যাদা রয়েছে, যাতে মানুষতো দূরের কথা, কোন ফেরেশতাও তাঁর ওই মর্যাদা সম্পর্কে যথাযথতভাবে জানতে পারেন না। আল্লাহকে একমাত্র তিনি জানেন আর মাহবূবকে আল্লাহ্ই জানেন। কবির ভাষায়-
معراج ميں جبريل سے كهل لگے شاه امم- تم نے تو ديكها هے جهاں بتلاو تو كيسے هں هم
روح الامين كهنے لگے ا مه جبين تيرى قسم- افا قها گرديده ام مهر تبا در زيده ام
بسيار خوباں ديده ام ليكن تو چيزے ديرى
অর্থ: মি’রাজে উম্মতকুলের বাদশাহ্ হুযূর-ই আকরাম হযরত জিব্রাঈলকে বলতে লাগলেন, ‘‘তুমি গোটা বিশ্বকে অবলোকন করেছো, বলতো আমি কেমন?
রুহুল আমীন (হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম) বলতে লাগলেন, ওহে চন্দ্ররূপী ললাট বিশিষ্ট হাবীবে খোদা, আপনারই শপথ, পৃথিবীর সব প্রান্তে ও দিগন্তে আমি ঘুরে ঘুরে এসেছি, উজ্জ্বল সূর্যকেও আমি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। সৃষ্টি জগতে অনেক সুন্দর সুন্দর মাখলুক দেখেছি। কিন্তু সেগুলোর তুলনায় আপনি এক অনন্য সত্তা। আপনি সবার চেয়ে সুন্দর, সবার চেয়ে পূর্ণাঙ্গ। সুবহা-নাল্লাহ্!!
ওই সব শব্দমালায়, যেগুলো মানুষের মুখ থেকে বের হয়, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রশংসা করা সম্ভবপর নয়। তাঁর ফযিলত বা গুণাবলী বাস্তবাবস্থায় মানুষের ধারণা-কল্পনা পৌঁছতে পারে না। হযরত হাস্সান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেছেন-
مَا اِنْ مَدَحْتُ مُحَمَّدًا مَقَالَتِىْ – لكِنْ مَدَحْتُ مَقَالَتِىْ بِمُحَمَّدٍ
অর্থাৎ আমি আমার বচনগুলো দ্বারা হুযূর মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রশংসা করিনি, বরং নিজের বচনগুলোকে তাঁর পবিত্র নাম দ্বারা প্রশংসাযোগ্য করেছি।
অথবা ‘নবী’ মানে (নবী’র শেষোক্ত অর্থের ভিত্তিতে) অদৃশ্যের সংবাদ দাতা। বাস্তবেও হুযূর-ই আকরাম জান্নাত ও দোখের, কিয়ামতের, কিয়ামত পর্যন্তের একেকটি ঘটনার খবর দিয়েছেন। এ হচ্ছে অদৃশ্যের সংবাদ।
তারপর এরশাদ হয়েছে- ‘উম্মী’। উম্মী শব্দের একাধিক অর্থ হতে পারে- এটা ‘’ দ্বারা শব্দের সাথে সম্পৃক্ত শব্দ। আরবীতে (উম্মুন) বলে মাকে, আসল বা মূলকে। অর্থাৎ এর অর্থ হচ্ছে মা বিশিষ্ট নবী। দুনিয়ায় সব মানুষ মা বিশিষ্টই হয়; কিন্তু যেমন ‘মা’ আল্লাহ্ তা‘আলা হুযূর-ই আকরামকে দান করেছেন, তেমন গোটা দুনিয়ায় কেউ পায়নি। হযরত মরিয়মও ‘মা’-ই ছিলেন। কিন্তু ‘নবীকুল সরদার’ যেমন বে-মেসাল (উপমাহীন), তাঁর আম্মাজানও তুলানাহীন (বে-মেসাল)। কবির ভাষায়-

وه كنوپارى اك مريم وه نَفَخْتُ فِيْهِ كادم
هے عجب نشان اعظم مر امنه كا جايا
وه هے سب سے افضل ايا

অর্থ: তিনি ওই পবিত্র কুমারী মরিয়ম, তিনি আল্লাহর তা‘আলার বাণী- ‘আমি তার মধ্যে রূহ ‘ফুৎকার করেছি’-এর প্রাণবায়ু বা সারতত্ব। তিনি এক বৃহত্তর নিদর্শনের আশ্চর্যজনক প্রকাশস্থল। (এতে কোন সন্দেহ নেই।) কিন্তু হযরত আমেনার মহান সন্তান (হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) হলেন সবার সেরা, সবার চেয়ে শ্রেষষ্ঠ হিসেবেচ এ ধরা বুকে তাশরীফ এনেছেন।
যে ঝিনুক নিজের পেটে মূল্যবান মুক্তা ধারণ করে, ওই ঝিনুকও মূলবান হয়ে যায়। যেই বরকতময়ী মা আপন পাক গর্ভাশয়ে ওই অদ্বিতীয় মুক্তাকে ধারণ করেন, তিনি কতই বরকত মণ্ডিত হবেন! (তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।)
আরেক বৈশিষ্ট্য ‘পড়াবিহীন’। এর অর্থ হচ্ছে তিনি আপন মায়ের গর্ভাশয় থেকে সর্ববিষয়ে জ্ঞানবান হয়েই ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, দুনিয়ার কারো নিকট পড়ালেখা করেন নি, করতে হয়নিত। কবি বলেন-
خاك وبراوج عرش منزل – امى وكتاب خانه در دل
امى ودقيقه دان عالم – بے سايه وسائبان عالم

অর্থ: তিনি মাটির পৃথিবীতে সদয় অবস্থায় করছেন, অথচ আরশের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হয়েছেনদ। তিনি ‘উম্মী’ (দুনিয়ার কোন ওস্তাদের নিকট পড়ালেখা করেননি, কিন্তু তাঁর পবিত্র নূরানী হৃদয়ে রয়েছে বিশালতম কিতাবখানা- (গ্রন্থালয়)।
তিনি ‘উম্মী’ উপাধিধারী, অথচ বিশ্বের সূক্ষ্মাতিসূক্ষè বিষয়াদি সম্পর্কে অবগত। তাঁর ছায়া ছিলো না, অথচ সেটা বিশ্বের জন্য বিশাল সামিয়ানা।
হুযূর আকরামের ছায়া ছিলো না, কিন্তু সমগ্র দুনিয়ার উপর তাঁর ছায়া রয়েছে। ‘উম্মী’ শব্দের তৃতীয় অর্থ- ‘উম্মুল কোরা’ (মক্কা মুকাররামাহ্)’য় সদয় অবস্থানকারী। এর চতুর্থ অর্থ- তিনি সমগ্র বিশ্বের মূল।
এ তিনটিতে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর উপাধি ছিলো। এখন তাঁর আরো ছয়টি গুণ বা বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা হচ্ছে- ১. তিনি তাওরীত ও ইঞ্জীলের মধ্যে লিপিবদ্ধ। ইহুদী সম্প্রদায়ের যেসব আলিম ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং ‘সাহাবী’ হবার মর্যাদা লাভ করেছেন, যেমন হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম, হযরত কা’ব-ই আহকার প্রমুখ। তাঁরা হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর ওইসব গুণের কথাও শুনিয়েছেন, যেগুলো তাওরীত শরীফে এসেছে। সুতরাং হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে সালাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাওরীত থেকে এসব গুণ শুনিয়েছেন- (আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন,) ‘‘হে নবী, আমি আপনাকে ‘শাহিদ’ (সাক্ষী, হাযির-নাযির), ‘বশীর’ (সুসংবাদদাতা), ‘নাযীর’ (ভীতি প্রদর্শনকারী করে প্রেরণ করেছি। আপনি ‘পড়াবিহীনদের তত্ত্বাবধায়ক, আপনি আমার প্রিয় বান্দা ও রসূল। আমি আপনার নাম ‘মুতাওয়াক্কিল (ভরসাকারী) রেখেছি। আপনি মন্দ চরিত্রের অধিকারীও নন, কঠোর স্বভাবেরও নন, বাজারগুলোতে শোরগোলকারীও নন। আপনি অপকারের বদলা অপকার দ্বারা নেবেন না, বরং দোষীদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ্ ওই সময় পর্যন্ত আপনাকে দুনিয়া থেকে নিয়ে যাবেন না, যতক্ষণ না আপনার বরকতে বিকৃত দ্বীন পূর্ণতা লাভ করবে; লোকেরা যতক্ষণ না কলেমা পড়তে থাকবে। আপনার বরকতে অন্ধ চোখগুলো জ্যোতির্ময়, বধির কানগুলো শ্র“তি শুক্তি বিশিষ্ট এবং পর্দাকৃত হৃদয়গুলো খুলে যাবে।’’
এ ধরণের উক্তি হযরত কা’ব-ই আহ্বার থেকেও বর্ণিত হয়েছে- খ্রিস্টানগণ অনেক চেষ্টা করেছে- হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর সমস্ত গুণ, পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য ইঞ্জীল থেকে বের করে (মুছে) দিতে। কিন্তু এখানকার ইঞ্জীলে, যাতে অনেক রদ-বদল হয়ে গেছে, হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর গুণাবলী এভাবে উল্লিখিত রয়েছে।
‘ইহান্নার ইঞ্জীল, ব্রিটিশ এণ্ড ফরেন বাইবেল সোসাইটী কর্তৃক লাহোর থেকে ১৯৩১ ইংরেজীতে মুদ্রিত কপির ‘‘১৪ অধ্যায়! ১৬শ আয়াতে আছে- ‘আমি পিতার নিকট দরখাস্ত করবো। সুতরাং তিনি তোমাদের অন্য এক সাহায্যকারী দান করবেন, যিনি অনন্তকাল যাবৎ তোমাদের সাথে থাকবেন। এটা হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালামের না’ত (প্রশংসা) এবং তিনি শেষ নবী হবার পক্ষে বর্ণনা।
এ কিতাবের এ অধ্যায়েই ২৯, ৩০তম আয়াতে আছে, ‘‘আমি তোমাদের সাথে আর বেশী কথা বলবো না। কারণ, দুনিয়ার সরদার আসছেন এবং আমার মধ্যে তাঁর কিছুই নেই।’’
এ কিতাবের ১৬শ অধ্যায়, আয়াত নম্বর ৭-এ আছে, ‘‘কিন্তু আমি তোমাদের সাথে সত্য কথাটা বলছি। তা হচ্ছে আমার চলে যাওয়া তোমাদের জন্য উপকারী। কেননা, আমি না গেলে ওই সাহায্যকারী তোমাদের নিকট আসবেন না। যদি আমি চলে, যাই, তবে (আমি গিয়ে) তাঁকে তোমাদের নিকট পাঠিয়ে দেবো।
এ কিতাবের এ অধ্যায়ের ১৩ নম্বর আয়াতে আছে- ‘‘কিন্তু যখন তিনি, অর্থাৎ সত্য তার রূহ আসবেন, তখন তিনি তোমাদেরকে সকল সত্য পথ দেখিয়ে দেবেন। তাও এজন্য যে, তিনি নিজ থেকে কিছুই বলবেন না, কিন্তু তিনি যা কিছু শুনবেন, তা-ই বলবেন, আর তোমাদেরকে ভবিষ্যতের সব সংবাদ দেবেন।’’
চিন্তা করুন, হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর পর ওইসব গুণে গুণান্বিত হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম ব্যতীত আর কে এসেছেন? দ্বিতীয় গুণ বর্ণিত হয়েছে- ‘তিনি নির্দেশ দেন ভাল কাজগুলোর।’ তৃতীয় গুণ বলেছেন, ‘নিষেধ করেন মন্দ কাজগুলো করতে।’ এ থেকে বুঝা গেলো যে, ভালো কাজ হচ্ছে সেটাই, যাকে ভাল লোকদের সরদার বৈধ করেছেন, আর মন্দ কাজ হচ্ছে সেটাই, যা করতে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম নিষেধ করেছেন। চতুর্থ গুণ বর্ণিত হয়েছে- পবিত্র বস্তুসমূহকে তিনি তাদের জন্য হালাল করেন, পঞ্চম গুণ বলেছেন, ৫ মন্দ ও অপবিত্র বস্তু সমূহ তাদের জন্য হারাম করেন। এ থেকে বুঝা গেলো যে, হালাল ও হারাম করার ইখতিয়ার হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালামকে মহামহিম রব দিয়েছেন। তিনি শরীয়তের মালিক। এ সম্পর্কে বহু হাদীস শরীফ বর্ণিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বনী ইস্রাঈলের উপর তাদের গুনাহর কারণে কিছু ভাল জিনিসও হারাম করে দেওয়া হয়েছিলো; যেমন হালাল পশুগুলোর চর্বি ইত্যাদি। হুযূর আলায়হিস্ সালাম-এর বরকতে সেটা হালাল হয়ে গেছে। অনুরূপ মদ ইত্যাদি অপবিত্র বস্তু তাদের জন্য হালাল ছিলো। সেটাকে হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম ক্বিয়ামত পর্যন্তের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। ষষ্ঠ গুণ এটা বর্ণিত হয়েছে যে, তাদের উপর থেকে বোঝা অপসারণ করেন, অর্থাৎ পূর্বে বিধানাবলী কঠিন ছিলো, যেগুলো পালন করা মানুষের জন্য কষ্ট সাধ্য ছিলো। যেমন সম্পদের এক চতুর্থাংশে যাকাত হিসেবে প্রদান করা, ওযুর স্থলে তায়াম্মুম করতে না পারা নামায শুধু ইবাদত খানা গুলোতে সম্পন্ন করা, অন্য কোন যায়গায় কাপড়ে নাপাক লাগলে, সেটাকে জ্বালিয়ে ফেলা কিংবা কেটে ফেলা ইত্যাদি। এ সব বিধানই বনী ইস্রাঈলের উপর প্রযোজ্য ছিলো। কিন্তু হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর বরকতে এসব মুসীবত দূরীভতি হয়েছে। এখন যাকাত দিয়ে হয় সম্ভব পর না হয়, তবে তায়াম্মুম কারার বিধান দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর সেখানে ইচ্ছা নামায সম্পন্ন করা। গনীমতের মাল হালাল করে দেওয়া হয়েছে। এসব সহজ বিধান ও বরক হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে।

কোরবানী

Standard

নাহমাদুহু ওয়া নুসল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম – আম্মা বা’দ

।(عيد الأضحىইসলামের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে একটি ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদ। ঈদুল আযহা মূলতঃ আরবী বাক্যাংশ ( এর অর্থ হলো ত্যাগের উৎসব কিংবা ত্যাগ করা। এ দিনটিতে মুসলমানেরা সাধ্যমত ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী উট, গরু, দুম্বা কিংবা ছাগল কোরবানি বা জবাই দেন পরম করুণাময় রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যে।

কুরবানী শব্দটি আরবী কুরবান শব্দ থেকে উদ্ভূত। কুরবানী শব্দের অর্থ উৎসর্গ ও নৈকট্য অর্জন। কিন্তু শরীয়তের পরিভাষায় জিলহজ্ব চাঁদের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে নির্দিষ্ট নিয়মে নির্দিষ্ট জন্তুকে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে জবেহ করে উৎসর্গ করার নাম কুরবানী। এটি ইসলাম ধর্মের অতি মূল্যবান ইবাদত।

ঐতিহাসিক পটভূমি

আল্লাহ তায়ালা মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ:)-কে অনেক পরীক্ষা করেছেন। সকল পরীক্ষায় তিনি ধৈর্য ও সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হয়েছেন। একরাতে তিনি স্বপ্নে দেখলেন, আল্লাহপাক তাঁকে ইঙ্গিত করেছেন তাঁর সবচাইতে প্রিয় জিনিসটিকে আল্লাহর রাস্তায় কোরবানী করতে। হযরত ইব্রাহীম (আ:) অনেক ভেবেচিন্তে দেখলেন একমাত্র পুত্র ইসমাঈল (আ:)-এর চেয়ে তাঁর কাছে প্রিয় আর কোনো কিছু নেই। এমনকি নিজের জীবনের চাইতেও তিনি পুত্র ইসমাঈল (আ:)-কে বেশি ভালোবাসতেন। তারপরও তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ:)-কে কোরবানী করার সিদ্ধান্ত নিলেন। অতঃপর পুত্র ইসমাঈল (আ:)-কে তিনি তার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে: “হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে আমি জবাই করছি। এখন তোমার অভিমত কী?” সে (হযরত ইসমাঈল (আঃ) বলল, “হে পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহ চাহেনতো আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন” (সূরা সফফাত আয়াত-১০২)।
#কুরবানীর অনুমোদনের ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলা বলেন:
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ

আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কোরবানী নির্ধারণ করেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। (সূরা হাজ্জ, আয়াত নং-৩৪)
#আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন: فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ

অতএব, তোমরা রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড়ো এবং নহর করো। (সূরা কাউসার : ২)
#তিনি আরো বলেন :وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُم مِّن شَعَائِرِ اللَّهِ

আর কুরবানীর উটকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন বানিয়েছি। (সূরা হজ :৩৬)

কুরবানীর তাৎপর্য

ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রিয়বস্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে উৎসর্গ করা। প্রচলিত কুরবানী মূলতঃ হযরত ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (আ:)-এর অপূর্ব আত্মত্যাগের ঘটনারই স্মৃতিচারণ। যে আবেগ, অনুভূতি, প্রেম-ভালবাসা ও ঐকান্তিকতা নিয়ে কুরবানী করেছিলেন ইব্রাহীম (আ:), সেই আবেগ, অনুভূতি ও ঐকান্তিকতার অবিস্মরণীয় ঘটনাকে জীবন্ত রাখার জন্যেই মহান আল্লাহতা’লা উম্মাতে মুহাম্মদীর প্রতি কুরবানী ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাই কুরবানী কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যেই নির্দিষ্ট।

#আল্লাহ পাক আরো বলেন, لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ

আল্লাহর কাছে (কুরবানীর পশুর) গোশত, রক্ত পৌঁছে না; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।
(সূরা হাজ্জ, আয়াত নং-৩৭)
কুরবানী মহান একটি ইবাদত। কোরবানি বলা হয় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন ও তাঁরই এবাদতের জন্য পশু জবেহ করা।

#হজরত আনাস ইবনু মালিক রাদিআল্লাহু আনহুর বর্ণনা করেছেন:
أن النبي – صلى الله عليه وسلم – ضحى بكبشين أملحين أقرنين ذبحهما بيده وسمى وكبر.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরতাজা ও শিং-ওয়ালা দুটি মেষ নিজ হাতে যবেহ করেছেন এবং তিনি তাতে বিসমিল্লাহ ও তাকবীর বলেছেন। (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)

#হজরত জুনদুব ইবনু সুফিয়ান বাজালী (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: আমি কুরবানীর দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে উপস্হিত ছিলাম। তিনি বললেন: যে ব্যক্তি সালাত আদায়ের পূর্বে যবাহ করেছে সে যেন এর স্থলে আবার যবাহ করে। আর যে যবাহ করেনি, সে যেন যবাহ করে নেয়। (সহিহ বুখারী)

#হজরত আয়িশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: মদিনায় অবস্থানের সময় আমরা কুররানীর গোশতের মধ্যে লবণ মিশ্রিত করে রেখে দিতাম। এরপর তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে পেশ করতাম। তিনি বলতেন: তোমরা তিন দিনের পর খাবে না। তবে এটি জরুরি নয়। বরং তিনি চেয়েছেন যে তা থেকে যেন অন্যদের খাওয়ানো হয়। আল্লাহ অধিক জ্ঞাত। (সহিহ বুখারী)

কুরবানীর হুকুম

ইমাম আবু হানীফা (রহ:) ইমাম মালেক (রহ:) ও ইমাম আহমদ (রহ:)-এর মতে কোরবানি ওয়াজিব। যারা কোরবানি পরিত্যাগ করে তাদের প্রতি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: হে মানব সকল ! প্রত্যেক পরিবারের দায়িত্ব হলো প্রতি বছর কোরবানি দেয়া। জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক, নিসাব পরিমাণ মালিকের প্রতি শুধু একটি কুরবানী-ই ওয়াজিব হবে, অবশ্য কেউ যদি একাধিক কুরবানী করে তা নফল হিসেবে সওয়াবের অধিকারী হবে। ভাগে (ভাগাভাগি করে) কুরবানী জায়েয।
#হজরত আলী রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: একটি গরু সাতজনের পক্ষে (মানে নামে) কুরবানী করা যাবে। (তিরমিযী)

#হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু আববাস রাদিআল্লাহু আনহু বলেন:
كُنَّا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ فِىْ سَفَرٍ فَحَضَرَ الْأَضْحَى فَاشْتَرَكْنَا فِى الْبَقَرَةِ سَبْعَةٌ وَ فِى الْبَعِيْرِ عَشَرَةٌ

‘আমরা রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে এক সফরে ছিলাম। এমতাবস্থায় কুরবানীর ঈদ উপস্থিত হলো। তখন আমরা সাতজনে একটি গরু ও দশজনে একটি উটে শরীক হলাম।’ (তিরমিযী, নাসাঈ,ইবনু মাজাহ)

কুরবানীর ফজিলত

(ক) কোরবানি-দাতা নবী ইবরাহিম (আ:) ও রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ বাস্তবায়ন করে থাকেন।
(খ) পশুর রক্ত প্রবাহিত করার মাধ্যমে কোরবানি-দাতা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য অর্জন করেন।
(গ) পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও অভাবীদের আনন্দ দান।

#হজরত আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, কুরবানীর দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কোনো আমল আল্লাহর কাছে নেই। ওই ব্যক্তি কিয়ামতের দিন জবেহকৃত পশুর লোম, শিং, ক্ষুর, পশম ইত্যাদি নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবেন। কুরবানীর রক্ত জমিনে পতিত হবার পূর্বেই তা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা কুরবানির দ্বারা নিজেদের নফস-কে পবিত্র করো।

কুরবানীর পশু

এমন পশু দ্বারা কোরবানি দিতে হবে যা শরিয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেগুলো উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা জাতীয় পশু। এগুলোকে কোরআনের ভাষায় বলা হয় ‘বাহীমাতুল আনআম।’ কুরবানীর পশু ভাল এবং হৃষ্টপুষ্ট হওয়া-ই উত্তম। শরিয়তের দৃষ্টিতে কোরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। উট পাঁচ বছরের হতে হবে। গরু বা মহিষ দু’বছরের হতে হবে। ছাগল, ভেড়া, দুম্বা হতে হবে এক বছর বয়সের। যদি ছয় মাসের দুম্বা বা ভেড়া এরকম মোটা-তাজা হয় যে দেখতে এক বছরের মতো মনে হয়, তাহলে এর দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে।
কোরবানির পশু যাবতীয় দোষত্রুটিমুক্ত হতে হবে যা নিম্নে বর্ণিত – অন্ধ: যার অন্ধত্ব স্পষ্ট; রোগাক্রান্ত: যার রোগ স্পষ্ট; পঙ্গু: যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট; এবং আহত: যার কোন অঙ্গ ভেঙ্গে গেছে ইত্যাদি। যে পশুটি কোরবানি করা হবে তার ওপর কোরবানি-দাতার পূর্ণ মালিকানা-সত্ত্ব থাকতে হবে।

কুরবানীর করার নিয়মাবলি

#হজরত মা আয়শা রাদিআল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শিংওয়ালা সুন্দর সাদা-কালো দুম্বা আনতে বললেন; অতঃপর নিম্নোক্ত দো‘আ পড়লেন:
بِسْمِ اللهِ أَللّهُمَّ تَقَبَّلْ مِن مُّحَمَّدٍ وَّ آلِ مُحَمَّدٍ وَّ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ رواه مسلم-

‘আল্লাহর নামে (কুরবানী করছি)। হে আল্লাহ, আপনি এটি কবুল করুন মুহাম্মাদের পক্ষ হতে, তার পরিবারের পক্ষ হতে এবং তার উম্মতের পক্ষ হতে।’ এরপর উক্ত দুম্বা দ্বারা কুরবানী করলেন।’ (মিশকাত১৪৫৪)

নিজের পশু নিজেই কুরবানী করা সর্বোত্তম। নিজে যবেহ করতে অপারগ হলে অন্যের দ্বারা কুরবানী দুরস্ত আছে। কুরবানী-দাতা ধারালো ছুরি নিয়ে ক্বিবলামুখী হয়ে দো‘আ পড়ে নিজ হাতে খুব জলদি যবহের কাজ সমাধা করবেন, যেন পশুর কষ্ট কম হয়। যবেহ করার সময় কুরবানী পশু কেবলামুখী থাকতে হবে। আর কুরবানী করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে সিনার ওপরিভাগ এবং রক্তনালীর মাঝামাঝি স্থানে যেন যবেহ করা হয়। যবেহ করার সময় বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলতে হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ না বললে হালাল হবে না। আরো উল্লেখ্য যে, গলায় চারটি রগ রয়েছে, তন্মধ্যে গলার সম্মুখভাগে দু’টি – খাদ্যনালী ও শ্বাসনালী এবং দু’পার্শ্বে দু’টি রক্তনালী। এ চারটির মধ্যে খাদ্যনালী, শ্বাসনালী এবং দুটি রক্তনালীর মধ্যে একটি অবশ্যই কাটতে হবে। অর্থাৎ, চারটি রগ বা নালীর মধ্যে তিনটি অবশ্যই কাটতে হবে। উট দাঁড়ানো অবস্থায় এর ‘হলক্বূম’ বা কণ্ঠনালীর গোড়ায় কুরবানীর নিয়্যতে ‘বিসমিল্লা-হি আল্লাহু আকবার’ বলে অস্ত্রাঘাতের মাধ্যমে রক্ত প্রবাহিত করে ‘নহর’ করতে হয় ।

পরিশেষে, মনে রাখতে হবে কুরবানী হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত ও আল্লাহ রাববুল ‘আলামিনের নৈকট্য লাভের উপায়। কুরবানীর উদ্দেশ্য শুধু গোশত খাওয়া নয়, শুধু মানুষের উপকার করা নয়, বা শুধু সদকা (দান)-ও নয়। কুরবানীর উদ্দেশ্য হলো আল্লাহ রাববুল ‘আলামীনের একটি মহান নিদর্শন তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশিত পদ্ধতিতে আদায় করা। করুণাময় রাব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালা যেন কুরবানী করার সে তাউফিক আমাদের দেন, আমিন।

*সমাপ্ত*