জানাজার নামাজের পর দোআ

Standard

জানাজা’র নামাজের পর দোয়া করা
***************************************************
লেখকঃ- আলহাজ্ব মুফতী এস এম সাকীউল কাউছার।
নায়েব-ই সাজ্জাদানশীনঃ- তরীকায়ে নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া গাউছিয়া।
ঘিলাতলা দরবার শরীফ, কুমিল্লা।
——————————————————————————————–
প্রসংগ কথাঃ- একজন মুসলমানের এ দুনিয়াতে শেষ অনুষ্ঠান নামাজে জানাজা। মৃত ব্যক্তির জন্য জানাজার নামাজ পড়া জীবিতদের জন্য ফরজে কেফায়া। জানাজাতে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী মুটামূটি অনেক লোক সমাগম হয়ে থাকে। জানাজার নামাজের পর অনেক লোক চলে যায় দাফন পর্যন্ত থাকেনা। দাফনের পর মুনাজাতে লোক কম হয় তাই জানাজার পর পরই দোয়া করা হলে অধিক লোকের হাত আল্লাহ’র দারবারে তোলার কারণে মৃত ব্যক্তির উপর আল্লাহ’র দয়া, মাগফিরাত, তার কবর ও আখিরাতের জীবন আরও উন্নত হওায়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে । এই দোয়া শরীয়তের কোন নিষেধাজ্ঞা নেই বরং মুস্তাহাব। অথচ এ পূণ্য কাজটি অনেকে বিদাত বলে এবং জানাজা’র নামাজই দোয়া আর মুনাজাতের দরকার নেই এ বলে সাধারণ মুসলমানকে বিভ্রান্ত করছে। জানাজার পর ও দাফনের পর দোয়া করা হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। অতএব এ বিষয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে আলোকপাত করছি।
জানাজা-নামাজ,দোয়া নয়ঃ-
ফরজ নামাজ দুই প্রকার- ফরজে আইন (৫ ওয়াক্তের নামাজ), ফরজে কেফায়া (জানাজার নামাজ)। নামাজের জন্য অনেক শর্ত রয়েছে, পবিত্রতা, কেবলামূখী হওয়া, নিয়্যত করা, তাকবীরে তাহরিমা, সালাম ফিরায়ে নামাজ শেষ করা ইত্যাদি। ৫ ওয়াক্ত নামাজ ও জানাজার নামাজসহ সকল নামাজ তাকবীরে তাহরীমা দ্বারা শুরু হয় এবং ডানে বামে সালাম দ্বারা শেষ হয়। কিন্ত দোয়া-মুনাজাতের মধ্যে এগুলো শর্ত নয়। অতএব নামাজ ও দোয়ার মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। জানাজার নামাজে নিয়্যতের মধ্যে “ছালাছাতিল জানাজা” অর্থাৎ জানাজার ছালাত বা নামজ উল্লেখ আছে। তাই তা নামাজ যা ইমামের পিছনে লাশকে সামনে রেখে কেবলা মূখী হয়ে কাতার বন্দী অবস্থায় আদায় করতে হয়। অনেকে বলে জানাজার মধ্যে দোয়া আছে তাই এটাই দোয়া ? আমি বলব ৫ ওয়াক্ত নামাজের ভিতরও দোয়া (দোয়া মাছুরা,ছানা ইত্যাদি), জিকির (রুকু-সিজদার তাছবীহ ইত্যাদি) ও দারূদ আছে। তাই বলে কি নামাজকে দোয়া, জিকির ও দরূদ বলা হয়? আল্লাহ্‌ পাক বলেন- اقيموا الصلوة لذكرى (আকিমুছ ছালাতা লে জিকরি) অর্থাৎ আমার জিকির বা স্মরণের উদ্দেশ্যে তুমরা ছালাত বা নামাজ কায়েম কর। এখন কি কেহ বলে নামাজই জিকির আর জিকির করতে হবেনা ?
তাই জানাজার নামাজের ভিতর দোয়া থাকলেও তাকে শুধু দোয়া বলা যাবে না তা নামাজ। তাছাড়া দোয়া বার বার করা যায় এতে উপকার ছাড়া ক্ষতি নাই। জানাজার আগেও লাশ সামনে রেখে কোরআন তালওয়াত, অজিফা ইত্যাদি পড়া হয় এ গুলো দোয়ার মধ্যে শামিল। জানাজার নামাজ ‘ফরজে আইন’ আর দোয়া হলো ‘সুন্নাত’। হাদীছে আছে- اكثرو الذعاء অর্থাৎ বেশী করে দোয়া প্রার্থনা করো। জানাজাও অনেক সময় ২-৩-৪ বার হয়। তাহলে জানাজার পর হাত তোলে আবার আল্লাহ’র নিকট দোয়া করাতে অসুবিধা কি? আর দোয়াও এক প্রকার ইবাদত। মিশকাত শরীফের কিতাবুদ দাওয়াতে হাদীছ বর্ণিত আছে- الدعاء هو العبادة অর্থাৎ দোয়া একপ্রকার ইবাদত। একই জায়গায় এই হাদীছ খানাও আছে- الدعاء مخ العبادة অর্থাৎ দোয়া ইবাদতের মূল। আর জানাজার নামাজ ফরজ ইবাদত।

জানাজা নামাজের পর দোয়ার প্রমাণঃ-
আবু দাউদ শরীফ হতে মেশকাত শরীফের ‘ছালাতুজ জানাজা’ অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বর্ণিত হাদিছ- اذا صليتم على الميت فاخلصوا له الدعاء (ইজা ছাল্লাইতুমু আ’লাল মাইয়্যেতে ফাখলিছু লাহুদ দোয়া) অর্থাৎ যখন তুমরা মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ পরে ফেল, তখন আন্তরিক ভাবে তার জন্য দোয়া কর।
এখানে ‘ফা’ হরফ বা অক্ষর দ্বারা জানাজার নামাজ ও দোয়াকে আলাদা করা হয়েছে। অর্থাৎ নামাজের পর পরই তার জন্য দোয়া করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা এ হাদীছের অর্থ ‘জানাজার মধ্যে দোয়া কর’ বলে তারা ‘ফা’ এর অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞ। কারণ আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘ছাল্লাইতুম’ হচ্ছে শর্ত এবং ‘ফাখলিছু’ এর জাযা। শর্ত অ জাযার মধ্যে পার্থক্য থাকা বাঞ্ছণীয়, একতা অন্যটার অন্তর্ভুক্ত নয়।আর ‘ছাল্লাইতুম’ হলো অতীত কাল জ্ঞাপক ক্রিয়া এবং ‘ফাখলেছু’ হলো আদেশ বা নির্দেশাত্মক ক্রিয়া, তাই বুঝা গেল, নামাজ পড়ার পরই দুয়ার নির্দেশ রয়েছে। যেমন কোরআনে আছে- فااذا طعمتم فانتشروا অর্থাৎ যখন খাওয়া শেষ হবে তখন ছড়িয়ে পর। এখানেও ‘ফা’ শব্দ দ্বারা খাওয়ার পর ছড়িয়ে পরতে বলা হয়েছে, খাওয়ার মাঝখানে নয়।
মেশকাত শরীফের একই জায়গায় আরও উল্লেখ আছে- قرء على الجنازة بفاتحة الكتاب (ক্বারা’আ আ’লাল জানাজাতে বে ফাতিহাতিল কিতাব) অর্থাৎ হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাজায় সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন।
এ হাদীছের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যা ‘আশ’আতুল লুময়াত’ কিতাবে উল্লেখ আছে- “সম্ভবত হুজুর সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাজার নামজের পরে বা আগে বরকতের জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন, যেমন আজকাল এর প্রচলন দেখা যায়”। এর থেকে বুঝা গেল মুহাদ্দিছকুল শিরমনি হযরত আব্দুল হক মুহাদ্দিছে দেহলবী (রঃ) এর যুগেও জানাজার নামাজের আগে বা পরে বরকতের জন্য সূরা ফাতিহা পাঠের প্রচলন ছিল। তিনি এতে নিষেধ করেননি, বরং হাদীছের অনুসরণই বলতে চেয়েছেন। আর সুরা ফাতিহা পাঠও এক প্রকার দোয়া।
বিখ্যাত ‘ফতহুল কাদির’ কিতাবের ‘জানাজার নামায’ পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছে, হজুর আলাইহিস সালাম মিম্বরের উপর দাঁড়িয়ে মুতা যুদ্ধের খবর দিলেন। এর মধ্যে হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রাঃ) এর শাহাদাতের খবর দিলেন। فصلى عليه رسول الله صلى الله عليه وسلم و دعاله و قال استغفروا له অর্থাৎ অতঃপর তার নামাজের জানাজা পড়লেন এবং তার জন্য দোয়া করলেন এবং লোকদেরকে বললেন তুমরাও তার মাগফিরাতের জন্য দোয়া কর। উল্লেখিত ইবারতে ‘দোয়া’ শব্দের আগে ‘ওয়াও’ অব্যয় দ্বারা বুঝা যায় যে,এ দোয়া নামাজের পরই করা হয়েছিল।
মাওয়াহিবে লাদুনিয়া কিতাবের দ্বিতীয় খন্ডের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে-
فيما اخبر من الغيوب এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উপরোক্ত ঘটনা হুবহু বর্ণনা করার পর বলেছেন- ثم قال استغفروا استغفرو له (ছুম্মা ক্বালা এস্তাগফেরু এস্তাগফেরুলাহু) অর্থাৎ মাগফিরাত কামনা কর, তার জন্য মাগফিরাত কামনা কর। রকম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এর জানাজার পর দোয়া করেছেন। অতএব প্রমাণিত হলো যে, জানাজার পর মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা জায়েয বা সুন্নাত।
সামশুল আয়িম্মা সরখসি (রঃ) এর রচিত “মাবসুত” নামক কিতাবের দ্বিতীয় খন্ডের ৬০ পৃষ্ঠায় ‘গোসলিল মাইয়্যেত’ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) একবর জানাজার নামাজের পর উপস্থিত হন এবং বলেন- ان سبقتمونى بالصلوة عليه فلا تسبقونى بالدعاء অর্থাৎ যদিও তুমরা আমার আগে নামাজ পড়ে ফেলেছো, কিন্তু দোয়ার সময় আমার আগে যেয়েও না। অর্থাৎ আমার সাথে দোয়ায় শরীক হও। ‘মাসবুত’ কিতাবের একই জায়গায় হযরত ইবনে উমর (রাঃ), আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রাঃ) থেকে প্রমাণ করেছেন যে, তাঁরা জানাজার নামাজের পর দোয়া করেছেন এবং উপরোক্ত হাদীছের ‘ফালা তাশবেকু’ এর দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, জানাজার পর দোয়ার মধ্যে সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ) আমল করতেন। অতএব জানাজার পর দোয়া করা বেদাত-নাজায়েয বলা গোমরাহি।
প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া করা সুন্নাত ও দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশী থাকে। যেমন- মিশকাত শরীফে ‘আজ জিকরু বা’দাছ ছালাত’ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে- قيل يا رسول الله اى الدعاء اسمع قال جوف الليل الاخر و دبر الصلوة المكتوبات অর্থাৎ হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আরজ করা হলো কোন সময়ের দোয়া বেশী কবুল হয়, তিনি এরশাদ করেন- শেষ রাত্রির মধ্যবর্তী সময় ও ফরজ নামাজের পরে। জানাজার নামাজও ফরজ (ফরজে কেফায়া) তাই জানাজার পরেও দোয়া করলে কবুল হওয়ার আশা বেশী। মৃত ব্যক্তির জন্য যা নাজাতের উসিলা হতে পারে।
ইমাম আবূ দাউদ (রহ:) ও ইমাম বায়হাকী (রহ:) ‘হাসান’ এসনাদে হযরত উসমান (রা:) থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন: মহানবী (দ:) ইন্তেকাল প্রাপ্ত কারো দাফনের পরে তার (কবরের) পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, ‘এই ইন্তেকাল প্রাপ্তের গুনাহ মাফের জন্যে দোয়া করো, যাতে সে দৃঢ় থাকে; কেননা তাকে (কবরে) প্রশ্ন করা হচ্ছে।‘
অতএব প্রমাণিত হলো শরীয়তের দৃষ্টিতে জানাজার পর ও দাফনের পর দোয়া করা সুন্নাত-মোস্তাহাব। বেদাত বা নাজায়েয নয়। —–সমাপ্ত——-

2 thoughts on “জানাজার নামাজের পর দোআ

  1. শফিকুল ইসলাম

    জানাযা নামাজ পড়ে,
    মুর্দাকে সামনে রেখে সম্মিলিত
    ভাবে মুনাজাত করা
    জায়েজ নয় ।
    দলিল সমুহ নিম্নে
    প্রদান করা হল :
    1, মিরকাত শরহে
    মেশকাত 4 র্থ খন্ডের
    64 পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে ।
    “জানাযার নামাজের
    পর মুনাজাত
    করবে না ,কারণ এটা
    জানাযার
    নামাজে অতিরিক্ত
    সংযোজন সদৃশ ।
    2, মাযাহেরে হক শরহে
    মেশকাত 2 খন্ড 125
    পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে ,
    “অন্যান্য নামাজের
    সালাম ফেরানোর পর
    যেভাবে দোয়া করা হয়,
    সেভাবে জানাযার
    নামাজের পর মুর্দার
    জন্য দোয়া করা
    যাবে না ।
    3, খুলাসাতুল
    ফতোয়া 1ম খন্ড 225
    পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে,
    “জানাযা নামাজের পর
    দোয়ার জন্য
    দাড়াবে না” ।
    4, বাহরুক রায়েক 2য়
    খন্ড 183 পৃষ্ঠায়
    উল্লেখ আছে ,
    “খুলাছা কিতাবে
    এভাবেই বর্ণিত
    হয়েছে যে,
    জানাযার নামাজের
    সালামের
    পরে দোয়া করবে না” ।
    5 ,ফতোয়ায়ে রহীমিয়া
    5ম খন্ড110 পৃষ্ঠায়
    উল্লেখ আছে ,
    “জানাযা নামাজ শেষ
    হলে দোয়া করবে না ।
    এটাই ফতোয়ায়ে
    সিরাজিয়ার ও বিবরণ।
    এর পর কি জানাযা
    নামাজের পর
    দোয়া করা যায় ?

    Like

    • Islamer soynik

      #জানাজার_দোআ_করা_অনেকে_বিদআত_বলে_থাকে_তাদের_জন্য_এই_পোষ্ট

      একজন মুসলমানের এ দুনিয়াতে শেষ অনুষ্ঠান নামাজে জানাজা।ইন্তেকালপ্রাপ্ত ব্যক্তির জানাজার নামাজ পড়া জীবিতদেরজন্যে ফরজে কেফায়া। জানাজাতে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া- প্রতিবেশীসহ মোটামুটি অনেক মানুষের সমাগম হয়ে থাকে। জানাজার নামাজের পর অনেক মানুষ চলে যান,
      দাফন পর্যন্ত থাকেন না। দাফনের পর মুনাজাতে মানুষ কম হয়; তাই জানাজার পরপর-ই দোয়া করা হলে অধিক লোকের হাত আল্লাহ’র দারবারে তোলার কারণে ইন্তেকালপ্রাপ্ত ব্যক্তির ওপর আল্লাহ’র দয়া, মাগফিরাত, তাঁর কবর ও আখিরাতের জীবন
      আরও উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে । এই দোয়ার ব্যাপারে শরীয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই,
      বরং এটি মুস্তাহাব। অথচ এ পুণ্যময় কাজটিকে অনেকে ’বিদআত’ (শরীয়তগর্হিত নতুন প্রবর্তিত
      প্রথা) বলে আখ্যা দেয় এবং জানাজা’র নামাজে দোয়া আর মুনাজাতের দরকার নেই বলে সাধারণ মুসলমানকে বিভ্রান্ত করে থাকে। জানাজার পর এবং দাফনের পরেও দোয়া করা হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। অতএব, এ বিষয়ে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাতকরছি।

      জানাজা-নামাজ দোয়া নয়
      ফরজ নামাজ দুই প্রকার – ফরজে আইন (৫ ওয়াক্তের নামাজ) ও ফরজে কেফায়া (জানাজার নামাজ)। নামাজের জন্যে অনেক শর্ত রয়েছে, যেমন পবিত্রতা, কেবলামুখি হওয়া, নিয়্যত করা, তাকবীরে তাহরিমা, সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা ইত্যাদি। ৫
      ওয়াক্ত নামাজ ও জানাজার নামাজসহ সকল নামাজ
      তাকবীরে তাহরীমা দ্বারা শুরু হয় এবং ডানে-বামে সালাম দ্বারা শেষ হয়। কিন্ত দোয়া-মুনাজাতের
      মধ্যে এগুলো শর্ত নয়। অতএব, নামাজ ও দোয়ার
      মধ্যে অনেক পার্থক্য বিদ্যমান। জানাজার নামাজে নিয়্যতের মধ্যে “সালাসাতিল জানাজা”, অর্থাৎ, জানাজার সালাত বা নামাজ উল্লেখ আছে। তাই তা নামাজ যা ইমামের পেছনে মরদেহকে সামনে রেখে কেবলামুখি হয়ে কাতার-বন্দী অবস্থায় আদায় করতে হয়। অনেকে বলে জানাজার মধ্যে দোয়া আছে, তাই এটাই দোয়া (?)। আমরা বলবো, ৫ ওয়াক্ত নামাজের ভেতরও দোয়া (দোয়া মাসুরা,সানা ইত্যাদি), জিকির (রুকু-সিজদার তাসবীহ ইত্যাদি) ও দারূদ আছে। তাই বলে কি নামাজকে দোয়া, জিকির ও দরূদ বলা হয়? আল্লাহ্ পাক বলেন – ﺍﻗﻴﻤﻮﺍ ﺍﻟﺼﻠﻮﺓ ﻟﺬﻛﺮﻯ (আকিমুস্
      সালাতা লে জিকরি); অর্থাৎ, আমার জিকির বা স্মরণের উদ্দেশ্যে তোমরা সালাত বা নামাজ কায়েম করো। এখন কি কেউ বলতে পারবে যে নামাজ-ই জিকির, আর তাই জিকির করতে হবে না ?
      বস্তুতঃ জানাজার নামাজের ভেতরে দোয়া থাকলেও
      তাকে শুধু দোয়া বলা যাবে না; বরঞ্চ তা নামাজ।
      তাছাড়া দোয়া বার বার করা যায়, এতে উপকার ছাড়া ক্ষতি নাই। জানাজার নামাজ ‘ফরজে কেফায়া’, আর দোয়া হলো ‘সুন্নাত’।
      হাদীসে বর্ণিত আছে – ﺍﻛﺜﺮﻭ ﺍﻟﺬﻋﺎﺀ অর্থাৎ,
      বেশি করে দোয়া প্রার্থনা করো। জানাজাও অনেক সময় ২/৩/৪ বার হয়। তাহলে জানাজার পর হাত তুলে আবার আল্লাহ’র দরবারে দোয়া করাতে অসুবিধা কী? আর দোয়াও এক প্রকার ইবাদত। মিশকাত শরীফের কিতাবুদ দাওয়া’তে একখানি হাদীস বর্ণিত আছে – ﺍﻟﺪﻋﺎﺀ ﻫﻮ ﺍﻟﻌﺒﺎﺩﺓ অর্থাৎ, দোয়া এক ধরনের ইবাদত। একই জায়গায় এই হাদীস খানাও আছে – ﺍﻟﺪﻋﺎﺀ ﻣﺦ ﺍﻟﻌﺒﺎﺩﺓ অর্থাৎ, দোয়া ইবাদতের মূল বা সারবস্তু। আর জানাজার নামাজ ফরজ ইবাদত। জানাজা নামাজের পর দোয়ার প্রমাণ
      আবু দাউদ শরীফ হতে মেশকাত শরীফের ‘সালাতুজ জানাজা’ অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে বর্ণিত একটি হাদিসে ঘোষিত হয়েছে – ﺍﺫﺍ ﺻﻠﻴﺘﻢ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻤﻴﺖ ﻓﺎﺧﻠﺼﻮﺍ ﻟﻪ ﺍﻟﺪﻋﺎﺀ (ইজা সাল্লাইতুমু আ’লাল মাইয়্যেতে ফাখলিসু লাহুদ দোয়া); অর্থাৎ, যখন তোমরা ইন্তেকালপ্রাপ্ত ব্যক্তির জানাজার নামাজ
      আদায় করে নাও, তখন আন্তরিকভাবে তার
      জন্যে দোয়া করো। ওপরে উদ্ধৃত হাদীসে ‘ফা’ হরফ বা অক্ষর দ্বারা জানাজার নামাজ ও দোয়াকে আলাদা করা হয়েছে। অর্থাৎ, নামাজের পরপর- ইন্তেকালপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্যে দোয়া করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যারা এ হাদীসের অর্থ ‘জানাজার মধ্যে দোয়া করো’ বলে, তারা ‘ফা’-এর অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞ। কারণ আরবী ব্যাকরণ অনুযায়ী ‘সাল্লাইতুম’ হচ্ছে শর্ত এবং ‘ফাখলিসূ’ এর জাযা। শর্ত ও জাযার মধ্যে পার্থক্য
      থাকা বাঞ্ছণীয়, একটা অন্যটার অন্তর্ভুক্ত নয়। আর ‘সাল্লাইতুম’ হলো অতীতকালজ্ঞাপক ক্রিয়া এবং ‘ফাখলিসূ’ হলো আদেশ বা নির্দেশাত্মক ক্রিয়া। তাই বোঝা গেল, নামাজ পড়ার পরই দোয়ার নির্দেশ রয়েছে। যেমন কোরআনে আছে – ﻓﺎﺍﺫﺍ ﻃﻌﻤﺘﻢ ﻓﺎﻧﺘﺸﺮﻭﺍ অর্থাৎ, যখন খাওয়া শেষ হবে, তখন
      ছড়িয়ে পড়ো। এখানেও ‘ফা’ শব্দ দ্বারা খাওয়ার পর
      ছড়িয়ে পড়তে বলা হয়েছে, খাওয়ার মাঝখানে নয়।
      মেশকাত শরীফের একই জায়গায় আরও উল্লেখ আছে – ﻗﺮﺀ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺠﻨﺎﺯﺓ ﺑﻔﺎﺗﺤﺔ ﺍﻟﻜﺘﺎﺏ (ক্বারা’আ আ’লাল
      জানাজাতে বে ফাতিহাতিল কিতাব); অর্থাৎ, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাজায় সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন।
      এ হাদীসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মেশকাত শরীফের
      ব্যাখ্যা ‘আশ’আতুল লুময়াত’ কিতাবে উল্লেখ আছে, “সম্ভবত হুজুর সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাজার নামাজের পরে বা আগে বরকতের জনন্যে সূরা ফাতিহা পাঠ করেছেন, যেমন আজকাল এর প্রচলন দেখা যায়।” এর থেকে বোঝা গেল, মুহাদ্দিসকুল শিরোমণি হযরত আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহেলবী (র:)-এর যুগেও জানাজার নামাজের আগে বা পরে বরকতের জন্যে সূরা ফাতিহা পাঠের প্রচলন ছিল। তিনি এটিকে নিষেধ করেননি, বরং তা হাদীসের অনুসরণ- ই বলতে চেয়েছেন। আর সুরা ফাতিহা পাঠও এক প্রকার
      দোয়া। বিখ্যাত ‘ফতহুল কাদির’ কিতাবের ‘জানাজার নামায’ পরিচ্ছেদে বর্ণিত আছে, হজুর আলাইহিস সালাম মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে মুতা যুদ্ধের খবর দিলেন। এর মধ্যে হযরত জাফর ইবনে আবি তালিব (রা:)-এর শাহাদাতের খবর দিলেন। ﻓﺼﻠﻰ
      ﻋﻠﻴﻪ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻭ ﺩﻋﺎﻟﻪ ﻭ ﻗﺎﻝ ﺍﺳﺘﻐﻔﺮﻭﺍ ﻟﻪ অর্থাৎ, অতঃপর তাঁর নামাজে জানাজা পড়লেন, এবং তাঁর জন্যে দোয়া করলেন; আর মানুষজনকে বললেন, তোমরাও তার মাগফিরাতের
      জন্যে দোয়া করো। উল্লেখিত ইবারতে ‘দোয়া’
      শব্দের আগে ‘ওয়াও’ অব্যয় দ্বারা বোঝা যায়, এ
      দোয়া নামাজের পর-ই করা হয়েছিল।
      মাওয়াহিবে লাদুনিয়া কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডের দ্বিতীয়
      পরিচ্ছেদে আরবী ﻓﻴﻤﺎ ﺍﺧﺒﺮ ﻣﻦ ﺍﻟﻐﻴﻮﺏ -এর
      ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে উপরোক্ত ঘটনা হুবহু বর্ণনা করার পর
      বলেছেন – ﺛﻢ ﻗﺎﻝ ﺍﺳﺘﻐﻔﺮﻭﺍ ﺍﺳﺘﻐﻔﺮﻭ ﻟﻪ (সুম্মা ক্বালা এস্তাগফেরু এস্তাগফেরুলাহু); অর্থাৎ, মাগফিরাত কামনা করো, তার জন্যে মাগফিরাত কামনা করো। এ রকম হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা:) জানাজার পর দোয়া করেছেন। অতএব,
      প্রমাণিত হলো যে জানাজার পর মাগফিরাতের
      জন্যে দোয়া করা জায়েয ও সুন্নাত।
      সামশুল আয়িম্মা সরখসি (র:)-এর রচিত “মাবসুত” শীর্ষক কিতাবের দ্বিতীয় খণ্ডের ৬০ পৃষ্ঠায় ‘গোসলিল মাইয়্যেত’ অধ্যায়ে বর্ণিত আছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা:)একবার জানাজার নামাজের পর উপস্থিত হন এবং বলেন – ﺍﻥ ﺳﺒﻘﺘﻤﻮﻧﻰ
      ﺑﺎﻟﺼﻠﻮﺓ ﻋﻠﻴﻪ ﻓﻼ ﺗﺴﺒﻘﻮﻧﻰ ﺑﺎﻟﺪﻋﺎﺀ অর্থাৎ, যদিও তোমরা আমার আগে নামাজ পড়ে ফেলেছো, কিন্তু দোয়ার সময় আমার আগে যেয়ো না। অর্থাৎ, আমার সাথে দোয়ায় শরীক হও। ‘মাসবুত’ কিতাবের একই জায়গায় সর্ব-হযরত ইবনে উমর (রা:), আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা:) এবং আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম
      (রা:) থেকে প্রমাণ করেছেন যে তাঁরা জানাজার নামাজের পর দোয়া করেছেন; এবং উপরোক্ত হাদীসের ‘ফালা তাশবেকু’ বাক্য দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে জানাজার পর দোয়া করার আমল সাহাবায়ে কিরাম (রা:) পালন করতেন। অতএব, জানাজার পর দোয়া করা বেদআত-নাজায়েয বলা স্রেফ গোমরাহি।
      প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর দোয়া করা সুন্নাত
      এবং তাতে দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যেমন – মিশকাত শরীফে ‘আজ জিকরু বা’দাস্ সালাত’ অধ্যায়ে বর্ণিত
      আছে – ﻗﻴﻞ ﻳﺎ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺍﻯ ﺍﻟﺪﻋﺎﺀ ﺍﺳﻤﻊ ﻗﺎﻝ ﺟﻮﻑ ﺍﻟﻠﻴﻞ ﺍﻻﺧﺮ ﻭ ﺩﺑﺮ ﺍﻟﺼﻠﻮﺓ ﺍﻟﻤﻜﺘﻮﺑﺎﺕ অর্থাৎ, হুজুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরজ করা হলো, কোন্ সময়ের দোয়া বেশি কবুল হয়। তিনি এরশাদ করেন, শেষ রাত্রির মধ্যবর্তী সময় ও ফরজ
      নামাজের পরে। জানাজার নামাজও ফরজ (ফরজে কেফায়া)। তাই জানাজার পরেও দোয়া করলে কবুল হওয়ার আশা বেশি। ইন্তেকালপ্রাপ্ত ব্যক্তির জন্যে যা নাজাতের অসীলা হতে পারে।
      ইমাম আবূ দাউদ (রহ:) ও ইমাম বায়হাকী (রহ:) ‘হাসান’ এসনাদে হযরত উসমান (রা:) থেকে বর্ণনা করেন; তিনি বলেন: মহানবী (দ:) ইন্তেকালপ্রাপ্ত কারো দাফনের পরে তাঁর (কবরের) পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, ‘এই ইন্তেকাল প্রাপ্তের গুনাহ মাফের জন্যে দোয়া করো, যাতে সে দৃঢ় থাকে; কেননা তাকে (কবরে) প্রশ্ন করা হচ্ছে।‘
      অতএব, প্রমাণিত হলো যে শরীয়তের দৃষ্টিতে জানাজার পর ও দাফনের পর দোয়া করা সুন্নাত-মোস্তাহাব; বেদআত বা নাজায়েয নয়।
      সমাপ্ত

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s