ইতিকাফের মাসাআলা

Standard

২০শে রমযানের সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পূর্ব হইতে ২৯/৩০ তারিখ অর্থাৎ যে দিন ঈদের চাঁদ দেখা যাইবে সে তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরুষদের মসজিদে এবং মেয়েদের নিজ গৃহের যেখানে নামায পড়ার স্থান নির্ধারিত আছে তথায় পাবন্দীর সহিত অবস্থান করাকে এ’তেকাফ বলে। ইহার সওয়াব অনেক বেশী। এ’তেকাফ শুরু করিলে পেশাব পায়খানা কিংবা পানাহারের মজবুরী হইলে তথা অন্যত্র যাওয়া দুরুস্ত আছে । আর যদি খানা পানি পৌঁছাইবার লোক থাকে, তবে ইহার জন্য বাহিরে যাইবে না, সেখানেই থাকিবে । বেকার বসিয়া থাকা ভাল না । কোরআন মাজিদ তেলাওয়াত করিবে , নফল নামায , দসবীহ্‌ সাধ্যমত পড়িতে থাকিবে এবং ঘুমাইবে । হায়েয বা নেফাস আসিলে এ’তেকাফ ছাড়িয়া দিবে । এই অবস্থায় এ’তেকাফ দুরুস্ত নাই । এ’তেকাফে স্বামী স্ত্রী মিলন ( সহবাস) আলিঙ্গনও দুরুস্ত নাই ।
মাসআলাঃ
এ’তেকাফের জন্য তিনটি বিষয় জরুরী ।
(১) যেই মসজিদে নামাযের জমা’আত হয়, (পুরুষের) উহাতে অবস্থান করা।
(২) এ’তেকাফের নিয়তে অবস্থান করা। এরাদা ব্যতীত অবস্থান কে এ’তেকাফ বলে না । যেহেতু নিয়ত ছহীহ্‌ হওয়ার জন্য নিয়তকারীর মুসল্মান এবং আক্কেল হওয়া শর্ত কাজেই এই উভয়টি নিয়তের শামিল ।
(৩) হায়েয নেফাস ও গোসলের প্রয়োজন হইতে পাক হওয়া।
মাসআলাঃ
এ’তেকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হইল ( ক’বা শরীফের ) মসজিদে হারাম । তারপর মসজিদে নববী , তারপর মসজিদে বায়তুল মুকাদ্দস । তারপর যে জামে মসজিদে জমা’তের এন্তেযাম আছে । অন্যথায় মহল্লার মসজিদ । তারপর যে মসজিদে বড় জাম’আত হয় ।
মাসআলাঃ
এ’তেকাফ তিন প্রকার । (১) ওয়াজিব, (২) সুন্নতে মুআক্কাদা, (৩) মোস্তাহাব। মান্নতের এ’তেকাফ ওয়াজিব , বিনাশর্তে হউক যেমন কেহ কোন শরত ব্যতীত এ’তেকাফের মান্নত করিলে , কিংবা শর্তের সহিত হউক; যেমন, কেহ শরত করিল যে, যদি আমার অমুক কাজ হইয়া যায়, তবে আমি এ’তেকাগ করিব । রমযানের শেষ দশ দিন এ’তেকাফ করা সুন্নতে মুআক্কাদা । নবী (দঃ) নিয়মিতভাবে প্রত্যেক রমযানের শেষ দশ দিন এ’তেকাফ করিয়াছেন বলিয়া ছহীহ্‌ হাদীসে উল্লেখ আছে । কিন্তু এই সুন্নতে মুআক্কাদা কেহ কেহ করিলে সকলেই দায়িত্বমুক্ত হইবে। রমযানের এই শেষ দশ দিন ব্যতীত, প্রথম দশ দিন হউক বা মাঝের দশ দিন হউক বা অন্য কোন মাসে হউক এ’তেকাফ করা মোস্তাহাব।
মাসআলাঃ
ওয়াজিব এ’তেকাফের জন্য রোযা শর্ত । যখনই এ’তেকাফ করিবে , রোযাও রাখিতে হইবে । বরং যদি ইহাও নিয়ত করে যে, রোযা রাখিব না, তবুও রোযা রাখিতে হইবে। এ জন্য যদি কেহ রাত্রের এ’তেকাফ নিয়ত করে, তবে উহা বেহুদা মনে করিতে হইবে । কেননা, রাত্রে রোযা হয় না, অবশ্য যদি রাত দিন উভয়ের নিয়ত করে কিংবা কয়েক দিনের নিয়ত করে , তবে ততসঙ্গে রাত শামিল হইবে এবং রাত্রে এ’তেকাফ করা যরুরী হইবে। আর যদি শুধু একদিনের এ’তেকাফের মান্নত করে, তবে তার সঙ্গে রাত শামিল হইবে না । খাছ করিয়া এ’তেকাফের জন্য রোযা রাখা যরুরী নহে । যে কোন উদ্দেশ্যে রোযা রাখুক এ’তেকাফের জন্য যথেষ্ট । যেমন কোন ব্যক্তি রমযান শরীফের এ’তেকাফের মান্নত করিলে, রমযানের রোযা এ’তেকাফের জন্য যথেষ্ট । অবশ্য এই রোযা ওয়াজিব রোযা হওয়া যরুরী । নফল রোযা উহার জন্য যথেষ্ট নহে । যেমন নফল রোযা রাখার পর এ’তেকাফের মান্নত করিলে ছহীহ্‌ হইবে না । যদি কেহ পুরা রমযান মাসের এ’তেকাগের মান্নত করে এবং ঘটনাক্রমে রমযানের এ’তেকাফ করিতে না পারে , তবে অন্য যে কোন মাসে এ’তেকাফ করিলে মান্নত পুরা হইবে । কিন্তু একাধারে রোযাসহ এতেকাফ করা যরুরী হইবে।
মাসআলাঃ
সুন্নত এ’তেকাফে তো রোযা হইয়ায় থাকে । কাজেই উহার জন্য রোযার শর্ত করার প্রয়োজন নাই।
মাসআলাঃ
কাহারও মতে মোস্তাহাব এ’তেকাফে রোযা শর্ত । নির্ভরযোগ্য মতে শর্ত নহে ।
মাসআলাঃ
ওয়াজিব এ’তেকাফ কমপক্ষে এক দিন হইতে হইবে । আর বেশী যত দিনের নিয়ত করিবে ( তাহাই হইবে) । আর সুন্নত এ’তেকাফ দশ দিন । কেননা সুন্নত এ’তেকাফ রমযান শরীফের শেষ দশ দিন । মোস্তাহাব এ’তেকাফের জন্য কোন পরিমান নির্ধারিত নাই , এক মিনিট বা উহা হইতেও কম হইতে পারে ।
মাসআলাঃ
এ’তেকাফ অবস্থায় দুই প্রকার কাজ হারাম । অর্থাৎ উহা করিলে ওয়াজিব ও সুন্নত এ’তেকাফ ফাসেদ হইবে এবং ক্বাযা করিতে হইবে । মোস্থাহাব এ’তেকাফ হইলে উহাও শেষ হইয়া যায় । ইহার জন্য কোন সময় নির্ধারিত নাই । কাজেই উহার ক্বাযাও নাই ।
প্রথম প্রকারঃ (হারাম কাজ) এ’তেকাফের স্থান হইতে তব্‌য়ী (স্বাভাবিক) বা শরয়ী প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যাওয়া । স্বাভাবিক প্রয়োজন যেমন , পেশাব পায়খানা, জানাবাতের গোসল, খানা আনিবার কোন লোক না থাকিলে খানা খাইতে যাওয়া। শর্‌য়ী প্রয়োজন যেমন, জুমু’আর নামায ।
মাসআলাঃ
যে যরুরতের জন্য এ’তেকাফের মসজিদ হইতে বাইরে যাইবে ঐ কাজ শেষ হইলে আর তথায় অবস্থান করিবে না । এমন অবস্থানে যরুরত পুরা করিবে যাহা যথাসম্ভব মসজিদের নিকটবর্তী হয়। যেমন, পায়খানার জন্য গেলে যদি নিজের বাড়ী দূরে হয়, তবে নিকটবর্তী কোন বন্ধুর বাড়ী যাইবে । অবশ্য যদি নিজ বাড়ী ব্যতীত অন্যত্র গেলে যরুরত পুরা না হয়, তবে দূরে হইলেও নিজ বাড়ীতে যাওয়া জায়েয আছে। যদি জুমু’আর নামাযের জন্য অন্য কোন মসজিদে যায় এবং নামাযের পর সেইখানে থাকিয়া যায় এবং সেখানেই থাকিয়া যায় এবং সেখানেই এ’তেকাফ পুরা করে, তবুও জায়েয আছে । অবশ্য মকরুহ্‌ (তান্‌যিহী) ।
মাসআলাঃ
নিজ এ’তেকাফের মসজিদ হইতে ভুলেও এক মিনিট বা তদপেক্ষা কম সময়ের জন্য (অযথা) বাহিরে থাকিতে পারিবে না ।
মাসআলাঃ
সাধারণতঃ যে সব ওযরের সম্মুখীন হইতে হয় না তজ্জন্য এ’তেকাফের স্থান ছাড়িয়া দেয়া এ’তেকাফের পরিপন্থী । যেমন, কোন (কঠিন) রোগী দেখা, বা কোন ডুবন্ত লোককে বাঁচাইবার চেষ্টা করা, কিংবা আগুন নিবাইতে যাওয়া, কিংবা মসজিদ ভাঙিয়া পড়ার ভয়ে মসজিদ হইতে বাহির হইয়া যাওয়া। যদিও এসব অবস্থায় এ’তেকাফের স্থান হইতে বাহির হইলে গোনাহ্‌ হইবে না; বরং জান বাঁচানের জন্য যরুরী, কিন্তু এ’তেকাফ থাকিবে না । যদি কোন শর্‌য়ী কিংবা তব্‌য়ী যরুরতে বাহির হয় এবং ঐ সময় যরুরত পুরা হইবার আগে বা পরে কোন রোগী দেখে, বা কোন জানাযা নামাযে শরীক হয় , তবে কোন দোষ নাই ।
মাসআলাঃ
জুমু’আর নামাযের জন্য যদি জামে মসজিদে যাইতে হয়, তবে এমন সময় যাইবে, যেন মসজিদে গিয়া তাহিয়্যাতুল মসজিদ ও সুন্নত পরিতে পারে। সময়ের অনুমান নিজেই করিয়া লইবে । এবং ফরযের পর সুন্নত পড়ার জন্য দেরী করা জায়েয আছে । অনুমানের ভুলে সামান্য কিছু আগে গেলে দোষ নাই ।
মাসআলাঃ
মু’তাকেফকে বলপূর্বক কেউ বাহিরে লইয়া গেলে এ’তেকাফ থাকিবে না । যেমন, কোন অপরাধে কাহারও নামে ওয়ারেন্ট বাহির হইল এবং সিপাহী তাহাকে গেপ্তার করিয়া লইয়া গেল, কিংবা কোন মহাজন দেনার দায়ে তাহাকে বাহিরে লইয়া গেল ।
মাসআলাঃ
এইরূপে যদি কোন শর্‌য়ী বা তব্‌য়ী যরুরতে বাহিরে যায় এবং পথে কোন মহাজন আটকায়, বা রোগাক্রান্ত হইয়া পড়ে, ফলে এ’তেকাফের স্থানে বিলম্ব হয়, তবুও এ’তেকাফ থাকিবে না।
দ্বিতীয় প্রকারঃ (হারাম কাজ) ঐ সব কাজ যাহা এ’তেকাফে নাজায়েয । যেমন – সহবাস ইত্যাদি করা, ইচ্ছাকৃত হউক বা ভুলে হউক । এ’তেকাফের কথা ভুলিয়া মসজিদে করুক বা বাহিরে করুক, সর্বাবস্থায় এ’তেকাফ বাতিল হইবে । সহবাসের আনুষঙ্গিক সব কাজ যেমন চুম্বন করা, আলিঙ্গন করা, এ’তেকাফ অবস্থায় না জায়েয। কিন্তু ইহাতে বীর্যপাত না হইলে এ’তেকাফ বাতিল হয় না । বীর্যপাত হইলে এ’তেকাফ ফাসেদ হইবে । অবশ্য যদি শুধু কল্পনা বা চিন্তার কারনে বীর্যপাত হয় তবে এ’তেকাফ ফাসেদ হইবে না ।
মাসআলাঃ
এ’তেকাফ অবস্থায় বিনা যরুরতে দুনিয়াদারীর কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরুহ্‌ তাহ্‌রীমী । যেমন, বিনা যরুরতে কেনাবেচা, বা ব্যবসা সংক্রান্ত কোন কাজ করা । অবশ্য যে কাজ নেহায়েত যরূরী ( যেমন ঘরে খোরাকী নাই, সে ব্যাতীত বিশ্বাসী কোন লোকও নাই, এওমতাবস্থায় কেনাবেচা জায়েয আছে, কিন্তু মালপত্র মসজিদে আনা কোন অবস্থায়ই জায়েয নাই-যদি উহা মসজিদে আনিলে মসজিদ খারাপ হওয়ার কিংবা জায়গা আবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা হয় । অন্যথায় কেহ কেহ জায়েয বলিয়াছেন।)
মাসআলাঃ
এ’তেকাফ অবস্থায় (সওয়াব মনে করিয়া) একেবারে চুপ করিয়া বসিয়া থাকা মকরুহ্‌ তাহ্‌রীমী । অবশ্য খারাপ কথা, মিথ্যা কথা বলিবে না বা গীবত করিবে না; বরং কোরআন মাজীদ তেলাওয়াত। দ্বীনই এল্‌ম শিক্ষা করা বা শিক্ষা দেওয়া, কিংবা অন্য কোন এবাদতে কাটাইবে। সার কথা, চুপ করিয়া বসিয়া থাকা কোন এবাদত নহে

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s