শব ই বরাত( কোরআন হাদিসের আলোকে)

Standard

image

শবে বরাত ফার্সী ভাষা, ফার্সী শব অর্থ রাত্রি
এবংবরাত অর্থ ভাগ্য বা মুক্তি। সুতরাং শবে বরাত মানে
হল ভাগ্য রজনী বা মুক্তির রাত।কোরআনে শবে কদর
নাই,লাইলাতুল কদর আছে,শবে বরাত নাই,লাইলাতুল
মোবারাকা আছে।কুরআন শরীফে শবে বরাতকে লাইলাতুম
মুবারাকাহ বা বরকতময় রাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর হাদীস শরীফে শবে বরাতকে লাইলাতুন নিছফি মিন
শা’বান বা শা’বান মাসের মধ্য রাত হিসেবে উল্লেখ করা
হয়েছে।

<<<শবে বরাত সম্পর্কিত আরো পড়ুন এখান থেকেশাবানের ফযিলত>>>

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক কুরআন শরীফে ইরশাদ করেন,
ﻭَﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏِ ﺍﻟْﻤُﺒِﻴﻦِ
ﺇِﻧَّﺎ ﺃَﻧﺰَﻟْﻨَﺎﻩُ ﻓِﻲ ﻟَﻴْﻠَﺔٍ ﻣُّﺒَﺎﺭَﻛَﺔٍ ﺇِﻧَّﺎ ﻛُﻨَّﺎ ﻣُﻨﺬِﺭِﻳﻦَ
ﻓِﻴﻬَﺎ ﻳُﻔْﺮَﻕُ ﻛُﻞُّ ﺃَﻣْﺮٍ ﺣَﻜِﻴﻢٍ
ﺃَﻣْﺮًﺍ ﻣِّﻦْ ﻋِﻨﺪِﻧَﺎ ﺇِﻧَّﺎ ﻛُﻨَّﺎ ﻣُﺮْﺳِﻠِﻴﻦَ
অর্থঃ
” শপথ প্রকাশ্য কিতাবের! নিশ্চয়ই আমি বরকতময় রজনীতে
কুরআন নাযিল করেছি। নিশ্চয়ই আমিই সতর্ককারী। আমারই
নির্দেশক্রমে উক্ত রাত্রিতে প্রতিটি প্রজ্ঞাময় বিষয়গুলো
ফায়সালা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।”
(সূরা দু’খানঃ ২-৫)
কেউ কেউ বলে থাকে যে, “সূরা দু’খানের উল্লেখিত আয়াত
শরীফ দ্বারা শবে ক্বদর-কে বুঝানো হয়েছে। কেননা উক্ত
আয়াত শরীফে সুস্পষ্টই উল্লেখ আছে যে, নিশ্চয়ই আমি
বরকতময় রজনীতে কুরআন নাযিল করেছি……..। আর কুরআন
শরীফ যে ক্বদরের রাতে নাযিল করা হয়েছে তা সূরা
ক্বদরেও উল্লেখ আছে ।”
এ প্রসঙ্গে মুফাসসির কুল শিরোমণি রঈসুল মুফাসসিরীন
বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস
রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ” উক্ত আয়াতের দুটি ব্যাখ্য
দিয়েছেন ১ লাইলাতুল কদর ২, লাইলাতুল বারায়াত।
প্রখ্যাত মুফাসসির হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (), হযরত
আবু হুরায়রা () এবং হযরত ইকরামা () সহ বহু সংখ্যক সাহাবী
তাবেয়ীনদের মতে উক্ত আয়াতে লাইলাতুল মুবারাকা
দ্বারা চৌদ্দ-ই শাবান দিবাগত রাত বা শবে বারাআত
বুঝানো হয়েছে।
যেমন কয়েকজন মুফাসসিরদের মতামত দেয়া হল-
(১) ﻗﺎﻝ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻋﻨﻬﻤﺎ ﺣﻢ ﻳﻌﻨﻰ ﻗﻀﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﺎ ﻫﻮ ﻛﺎﺋﻦ ﺍﻟﻰ ﻳﻮﻡ ﺍﻟﻘﻴﺎﻣﺔ
ﻭﺍﻟﻜﺘﺎﺏ ﺍﻟﻤﺒﻴﻦ ﻳﻌﻨﻰ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﻣﺒﺎﺭﻛﺔ ﻫﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻭﻫﻰ ﻟﻴﻠﺔ
ﺍﻟﺒﺮﺃﺓ –‘‘হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস () বলেন, হা-মীম
অর্থাৎ- আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করেছেন কিয়ামত
পর্যন্ত যা ঘটবে, সুস্পষ্ট কিতাবের শপথ অর্থাৎ- আল কুরআন,
লাইলাতুল মুবারাকা অর্থাৎ শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ
দিবাগত রাত তা হল লাইলাতুল বারাআত।’’
# ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতি : তাফসীরে দুররে মানসুর :
৭/৪০১পৃ
(২), ﻋﻦ ﻋﻜﺮﻣﺔ ﺍﻟﻠﻴﻠﺔ ﺍﻟﻤﺒﺎﺭﻛﺔ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﺍﻧﺰﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺟﺒﺮﺍﺋﻴﻞ ﺍﻟﻰ ﺍﻟﺴﻤﺎﺀ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ ﻓﻰ ﺗﻠﻚ
ﺍﻟﻠﻴﻠﺔ ﺣﺘﻰ ﺍﻣﻠﻰ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻜﺘﺒﺔ ﻭﺳﻤﺎﻫﺎ ﻣﺒﺎﺭﻛﺔ ﻻﻧﻬﺎ ﻛﺜﻴﺮﺓ ﺍﻟﺨﻴﺮ ﻭﺍﻟﺒﺮﻛﺔ ﻟﻤﺎ ﻳﻨﺰﻝ ﻓﻴﻬﺎ ﻣﻦ
ﺍﻟﺮﺣﻤﺔ ﻭﻳﺠﺎﺏ ﻓﻴﻬﺎ ﻣﻦ ﺍﻟﺪﻋﻮﺓ –
-‘‘হযরত ইকরামা () বলেন, “লাইলাতুল মুবারাকা” দ্বারা
শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতকে বুঝানো
হয়েছে, আল্লাহ তায়ালা হযরত জিবরাঈল () কে ঐ রাতে
প্রথম আবৃত্তি করতে পারেন। এই রাতকে মুবারক নাম রাখার
কারণ হলো এতে কল্যাণ, বরকত ও আল্লাহর রহমত নাযিল হয়
এবং রাতে দোয়া কবুল হয়।’’
# তাফসীরে কাশফুল আসরার, ৯/৯৮.পৃ.
৩,মুবারাকা বা বরকতময় বলার কারণ কি এ প্রসঙ্গে
আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী () বলেছেন,
ﺍﻟﻠﻴﻠﺔ ﺍﻟﻤﺒﺎﺭﻛﺔ ﻛﺜﻴﺮﺓ ﺧﻴﺮﻫﺎ ﻭﺑﺮﻛﺘﻬﺎ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻌﺎﻟﻤﻴﻦ ﻓﻴﻬﺎ ﺍﻟﺨﻴﺮ ﻭﺍﻥ ﻛﺎﻥ ﺑﺮﻛﺎﺕ ﺟﻤﺎﻟﺔ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﺗﺼﻞ ﺍﻟﻰ
ﻛﻞ ﺫﺭﺓ ﻣﻦ ﺍﻟﻌﺮﺵ ﺍﻟﻰ ﺍﻟﺜﺮﻯ ﻛﻤﺎ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻘﺪﺭ –
-‘‘লাইলাতুল মুবারাকা বলা হয় এ রাতে অনেক খায়ের ও
বরকত নাযিল হয়। সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর সৌন্দর্যের বরকত
আরশের প্রতি কণা থেকে ভূতলের গভীরে পৌঁছে যেমনটি
শবে কদরের মধ্যে হয়ে থাকে।’’
# আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী : তাফসীরে রুহুল বায়ান : ৮/১০১
পৃ.
(৪) আল্লামা ইমাম সুয়ূতি (রহ.) আরও বলছেন,
ﻋﻦ ﺍﺑﻰ ﻫﺮﻳﺮﺓ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻋﻨﻪ ﺍﻥ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻗﺎﻝ ﺍﻗﻄﻊ
ﺍﻻﺟﺎﻝ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﺍﻟﻰ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﺣﺘﻰ ﺍﻥ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﻟﻴﻨﻜﺢ ﻭﻳﻮﻟﺪ ﻟﻪ ﻭﻗﺪ ﺧﺮﺝ ﺍﺳﻤﻪ ﻓﻰ ﺍﻟﻤﻮﺗﻰ –
-‘‘হযরত আবু হুরায়রা () হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ () ইরশাদ
করেছেন, এক শাবান থেকে অপর শাবান পর্যন্ত মানুষের
হায়াত চূড়ান্ত করা হয়। এমনকি একজন মানুষ বিবাহ করে
এবং তার সন্তান হয় অথচ তার নাম মৃতের তালিকায় উঠে
যায়।’’
# আল্লামা ইমাম জালালুদ্দীন সূয়তী : তাফসীরে দুররে
মানসুর : ৭/৪০১ পৃ
(৫) আল্লামা ইমাম কুরতুবী () তাফসীরে কুরতুবীতে এই
আয়াতের তাফসীরে লিখেছেন-
ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻭﻟﻬﺎ ﺍﺭﺑﻌﺔ ﺍﺳﻤﺎﺀ ﺍﻟﻠﻴﻠﺔ ﺍﻟﻤﺒﺎﺭﻛﺔ ﻭﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺒﺮﺃﺓ ﻭﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺼﻚ ﻭﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻘﺪﺭ ﻭﻭﺻﻔﻬﺎ
ﺑﺎﻟﺒﺮﻛﺔ ﻟﻤﺎ ﻳﻨﺰﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﻓﻴﻬﺎ ﻋﻠﻰ ﻋﺒﺎﺩﻩ ﻣﻦ ﺍﻟﺒﺮﻛﺎﺕ ﻭﺍﻟﺨﻴﺮﺍﺕ ﻭﺍﻟﺜﻮﺍﺏ –
-‘‘লাইলাতুল মুবারাকা দ্বারা অর্ধ শাবান (শবে বরাত) এর
রাতকে বুঝানো হয়েছে। এই ১৫ই শাবানের রাত তথা শবে
বরাতের চারটি নাম রয়েছে, যেমন. ১. লাইলাতুল মুবারাকা
বা বরকত পূর্ণ রাত, ২. লাইলাতুল বারায়াত তথা মুক্তি বা
ভাগ্যের রাত. ৩। লাইলাতুল ছক্কি বা ক্ষমা স্বীকৃতি
দানের রাত ৪. লাইলাতুল ক্বদর বা ভাগ্য রজনী।’’
আর শবে বরাতকে বরকতের সঙ্গে এই জন্য সম্বন্ধ করা হয়েছে
যেহেতু আল্লাহ পাক এই শবে বরাতে বান্দাদের প্রতি
বরকত, কল্যাণ এবং পূণ্য দানের জন্য দুনিয়ায় কুদরতীভাবে
নেমে আসেন অর্থাৎ- খাস রহমত নাযিল করেন।
(৬) ইমাম কুরতবী () আরও বলেন,
ﻭﻗﺎﻝ ﻋﻜﺮﻣﺔ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻋﻨﻪ ﺍﻟﻠﻴﻠﺔ ﺍﻟﻤﺒﺎﺭﻛﺔ ﻫﻬﻨﺎ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ –
-‘‘বিখ্যাত সাহাবী হযরত ইকরামা () তিনি বলেন,
লাইলাতুল মুবারাকা দ্বারা এখানে অর্ধ শাবান (শবে
বরাতকে) এর রাতকেই বুঝানো হয়েছে।’’
প্রখ্যাত মুফাসসির হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (), হযরত
আবু হুরায়রা () এবং হযরত ইকরামা () সহ বহু সংখ্যক সাহাবী
তাবেয়ীনদের মতে উক্ত আয়াতে লাইলাতুল মুবারাকা
দ্বারা চৌদ্দ-ই শাবান দিবাগত রাত বা শবে বারাআত
বুঝানো হয়েছে।
# ইমাম কুরতুবী : তাফসীরে কুরতবী : ৮/১২৬ পৃ.
৭) ইমাম কুরতুবী () আরও বলেন, ﻋﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻠﻪ ﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻋﻨﻬﻤﺎ
ﺍﻳﻀﺎ ﺍﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻳﻘﻀﻰ ﺍﻻﻗﻀﻴﺔ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻭﻳﺴﻠﻤﻬﺎ ﺍﻟﻰ ﺍﺭﺑﺎ ﺑﻬﺎ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻘﺪﺭ –
-‘‘প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস () থেকে
বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা অর্ধ
শাবান (শবে বরাতে) এর রাত্রিতে যাবতীয় বিষয়ের ভাগ্য
তালিকা প্রস্তুত করেন। আর কদরের রাত্রিতে ঐ ভাগ্য
তালিকা বাস্তবায়নকারী ফেরেশতাদের হাতে পেশ
করেন।’’
#ইমাম কুরতুবী: তাফসীরে কুরতুবী : ৯/১৩০ : পৃ:
(৮) আল্লামা সৈয়দ মাহমুদ আলূসী () “তাফসীরে রুহুল
মায়ানীতে’’ সূরা দুখানের উক্ত আয়াতের তাফসীরে বলেন,
ﻭﻭﺻﻒ ﺍﻟﻠﻴﻠﺔ ﺑﺎﻟﺒﺮﻛﺔ ﻟﻤﺎ ﺍﻥ ﺍﻧﺰﺍﻝ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ ﻣﺴﺘﺘﺒﻊ ﻟﻠﻤﻨﺎﻓﻊ ﺍﻟﺪﻳﻨﻴﺔ ﻭﺍﻟﺪﻧﻮﻳﺔ ﺑﺄﺟﻤﻌﻬﺎ ﺍﻭ ﻟﻤﺎ ﻓﻴﻬﺎ ﻣﻦ
ﻧﻨﺰﻝ ﺍﻟﻤﻼﺋﻜﺔ ﻭﺍﻟﺮﺣﻤﺔ ﻭﺍﺟﺎﺑﺔ ﺍﻟﺪﻋﻮﺓ ﻭﻓﻀﻴﻠﺔ ﺍﻟﻘﺒﺎﺩﺓ ﺍﻭ ﻟﻤﺎ ﻓﻴﻬﺎ ﻣﻦ ﺫﻟﻚ ﻭﺗﻘﺪﻳﺮ ﺍﻻﺭﺯﺍﻕ ﻭﻓﻀﻞ
ﺍﻻﻗﻀﻴﺔ ﻻﺟﺎﻝ ﻭﻏﻴﺮﻫﺎ ﻭﺍﻋﻄﺎﺀ ﺗﻤﺎﻡ ﺍﻟﺸﻔﺎﻋﺔ ﻟﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺍﻟﺴﻼﻡ ﻭﻫﺬﺍ ﺑﻨﺎﺀ ﻋﻠﻰ ﺍﻧﻬﺎ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺒﺮﺃﺓ ﻓﻘﺪ
ﺭﻭﻯ ﺍﻧﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﺳﺄﻝ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺜﺎﻟﺚ ﻋﺸﺮ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻓﻰ ﺃﻣﺘﻪ ﻓﺄﻋﻄﻰ ﺍﻟﺜﻠﺚ ﻣﻨﻬﺎ ﺛﻢ
ﺳﺄﻝ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺮﺍﺑﻊ ﻋﺸﺮ ﻓﺄﻋﻄﻰ ﺍﻟﺜﻠﺜﻴﻦ ﺛﻢ ﺳﺄﻝ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺨﺎﻣﺲ ﻋﺸﺮ ﻓﺄﻋﻄﻰ ﺍﻟﺠﻤﻴﻊ ﺍﻻ ﻣﻦ ﺷﺮﺩ ﻋﻠﻰ
ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﺷﺮﺍﺩ ﺍﻟﺒﻌﻴﺮ –
-‘‘লাইলাতুল মুবারাকা বরকতের রাত হিসেবে এবং
দুনিয়াবী বহুবিদ কল্যাণের জন্য নাযিলের সিদ্ধান্ত দেয়া
হয়েছে। ঐ রাতে সমস্ত ফেরেশতারা অবতরণ করেন এবং
রহমত নাযিল হয়, বান্দাদের দোয়াকবুল করা হয়। বান্দাদের
রিযিক বন্টন করা হয় এবং সমস্ত কিছুর ভাগ্য সমূহ পৃথক করা
হয়। যেমন মৃত্যু এবং অন্যান্য সব বিষয়ের। এবং রাসূল () এর
সমস্ত বিষয়ের সুপারিশ কবুল করা হয়। আর এই বরকতের
রাতকে বরাতের রাত হিসেবেও নাম করণ করা হয়। যেহেতু
এ সম্পর্কে হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে যে, আখিরী রাসূল
() তিনি শাবান মাসের ১৩ তারিখ রাতে স্বীয় উম্মতের
ক্ষমার জন্য আল্লাহ পাকের কাছে প্রার্থনা করেন। অতঃপর
অনুরূপভাবে ১৪ই শাবান তথা শবে বরাতেও মহান আল্লাহ
পাকের কাছে হুযুর পাক () স্বীয় উম্মতের জন্য ক্ষমা
প্রার্থনা করেন, তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি শবে
বরাতে তার উম্মতের দুই তৃতীয়াংশ উম্মতকে ক্ষমা করেন।
অতঃপর অনুরূপভাবে ১৫ই শাবান তথা শবে বরাতেও মহান
আল্লাহ পাকের কাছে হুযুর পাক () স্বীয় উম্মতের জন্য ক্ষমা
প্রার্থনা করেন, তখন মহান আল্লাহ পাক তিনি সেই শবে
বরাতে তার সমস্ত উম্মতগণকে ক্ষমা করে দেন। তবে ওই
সমস্ত উম্মত ব্যতীত যারা মহান আল্লাহ পাক এর ব্যাপারে
চরম বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে।’’
#আল্লামা আলুসী বাগদাদী: তাফসীরে রুহুল মায়ানী :
১৩/১১২ পৃ:
(৯) ইমাম খাযেন () রচিত তাফসীরে লুবাবুত তাভীল” এ উক্ত
আয়াতের তাফসীরে উল্লেখ আছে-
( ﻓﻴﻬﺎ ‏) ﺍﻯ ﻓﻰ ﺍﻟﻠﻴﻠﺔ ﺍﻟﻤﺒﺎﺭﻛﺔ ‏(ﻳﻔﺮﻕ ‏) ﻳﻔﺼﻞ ‏( ﻛﻞ ﺍﻣﺮ ﺣﻜﻴﻢ ‏) —— ﻭﻗﺎﻝ ﻋﻜﺮﻣﺔ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ
ﻋﻨﻪ ﻫﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻳﻘﻮﻡ ﻓﻴﻬﺎ ﺍﻣﺮ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻭﺗﻨﺴﺦ ﺍﻻﺣﻴﺎﺀ ﻣﻦ ﺍﻻﻣﻮﺍﺕ ﻓﻼ ﻳﺰﺍﺩ ﻓﻴﻬﻢ ﻭﻻ
ﻳﻨﻘﺺ ﻣﻨﻬﻢ ﺍﺣﺪ ﻗﺎﻝ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺼﻼﺓ ﺍﻟﺴﻼﻡ ﺗﻘﻄﻊ ﺍﻻﺟﺎﻝ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﺍﻟﻰ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﺣﺘﻰ ﺍﻥ ﺍﻟﺮﺟﻞ ﻟﻴﻨﻜﺢ
ﻭﻳﻮﻟﺪ ﻟﻪ ﻭﻟﻘﺪ ﺍﺧﺮﺝ ﺍﺳﻤﻪ ﻓﻰ ﺍﻟﻤﻮﺗﻰ ﻭﻋﻦ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﻋﻨﻬﻤﺎ ﺍﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻳﻘﻀﻰ
ﺍﻻﻗﻀﻴﺔ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻭﻳﺴﻠﻤﻬﺎ ﺍﻟﻰ ﺍﺭﺑﺎﺑﻬﺎ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻘﺪﺭ –
-‘‘ওই মুবারক তথা বরকত পূর্ণ রাত্রিতে অর্থাৎ- শবে বরাতের
প্রত্যেক হিকমত পূর্ণ যাবতীয় বিষয় সমূহের ফায়সালা করা
হয়। বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত ইকরামা () তিনি বলেন,
লাইলাতুল মুবারাকা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্ধ শাবান
তথা (শবে বরাত) এর রাত। এই শবে বরাতে আগামী এক
বৎসরের যাবতীয় বিষয়ের ভাগ্য তালিকা প্রস্তুত করা হয়
এবং তালিকা প্রস্তুত করা হয় মৃত ও জীবীতদের। ওই
তালিকা থেকে কোন কম বেশি করা হয় না অর্থাৎ-
পরিবর্তন হয় না।
#ইমাম খাজেন: তাফসীরে লুবাবুত তাভীল : ১৭/৩১০-৩১১পৃ
১০, মালেকী মাযহাবের আল্লামা শেখ আহমদ ছাভী বলেন,
( ﻗﻮﻟﻪ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ‏) ﻫﻮ ﻗﻮﻝ ﻋﻜﺮﻣﺔ ﻭﻃﺎﺋﻔﺔ ﻭﻭﺟﻪ ﺑﺎﻣﻮﺭ ﻣﻨﻬﺎ ﺍﻥ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ
ﻟﻬﺎ ﺍﺭﺑﻌﺔ ﺍﺳﻤﺎﺀ ﺍﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻤﺒﺎﺭﻛﺔ ﻭﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺒﺮﺃﺓ ﻭﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺮﺣﻤﺔ ﻭﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺼﻚ ﻭﻣﻨﻬﺎ ﻓﻀﻞ ﺍﻟﻌﺒﺎﺩﺓ ﻓﻴﻬﺎ –
অর্থঃ ঐ বরকতময় রজনী হচ্ছে অর্ধ শাবানের রাত্রি
(মোফাসসিরীনে কেরামের অন্যতম মোফাসসির) বিশিষ্ট
তাবেয়ী হযরত ইকরামা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)ও অন্যান্য
তাফসীরকারকদের একদলের অভিমত। তারা এর কয়েকটি
কারণও উল্লেখ করেছেন। শাবানের চৌদ্দ তারিখের
দিবাগত রাত্রির চারটি নামে নামকরণ করেছেন। যেমন- ১।
লাইলাতুম মুবারাকাহ- বরকতময় রজনী। ২। লাইলাতুল
বারাআত- মুক্তি বা নাজাতের রাত্রি। ৩। লাইলাতুর
রহমাহ- রহমতের রাত্রি। ৪। লাইলাতুছ ছাক- সনদপ্রাপ্তির
রাত্রি ইত্যাদি।
#(তাফসীরে ছাভী, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা-৪০)
১১, তাফসীরে বাগভী শরীফে বর্ণিত আছে,…
ﻋﻦ ﺍﺑﻦ ﻋﺒﺎﺱ ﺭﺿﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﻤﺎ ﺃﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻳﻘﻀﻰ ﺍﻷﻗﻀﻴﺔ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ, ﻭﻳﺴﻠﻤﻬﺎ ﺇﻟﻰ
ﺃﺭﺑﺎﺑﻬﺎ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻘﺪﺭ –
অর্থঃ নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ শবে বরাতের রাতে সকল
বিষয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা করেন এবং শবে ক্বদরের রাতে তা
সংশ্লিষ্ট দায়িত্ববান ফেরেশতাদের কাছে ন্যস্ত করেন ।
# (তাফসীরে বাগভী, খণ্ড-৭, পৃষ্ঠা ২২৮)
= অনেকেই বলে থাকে পবিত্র কুরআন শরীফ অবতীর্ণ
হয়েছে রমাদ্বান শরীফ-এর মাসে লাইলাতুল ক্বদরে। এ
প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি সূরা বাক্বারায় উল্লেখ
করেন-
(১২৯) ﺷﻬﺮ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﺍﻟﺬﻯ ﺍﻧﺰﻝ ﻓﻴﻪ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ
পবিত্র কুরআন শরীফ রমাদ্বান মাসে অবতীর্ণ করা হয়েছে।
আর সূরা আদ দুখানেও আল্লাহ পাক তিনি বলেন-
(১৩০)
ﺍﻧﺎ ﺍﻧﺰﻟﻨﺎﻩ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﻣﺒﺎﺭﻛﺔ
নিশ্চয়ই আমি উহা তথা কুরআন শরীফ অবতীর্ণ করেছি
মুবারকময় রজনীতে। এখানে লাইলাতুম মুবারাকা দ্বারা
যদি শবে বরাতের রাতকে গণনা করা হয় তাহলে উভয়
রাতের সমাধান কি?
উল্লেখ্য যে, এ ব্যাপারে অসংখ্য তাফসীর ও হাদীছ শরীফ-
এর উদ্ধৃতির মাধ্যমে সমাধান দেয়া হয়েছে যে, লাইলাতুম
মুবারাকা দ্বারা অর্ধ শা’বানের রাত তথা শবে বরাতকেই
বুঝানো হয়েছে। আর এই রাতে কুরআন শরীফ অবতীর্ণের
কথা যে বলা হয়েছে তা হচ্ছে মহান আল্লাহ পাক তিনি
প্রথম যখন পবিত্র কুরআন শরীফ লওহে মাহফূযে অবতীর্ণ
করেন সেই রাতটি ছিলো লাইলাতুম মুবারাকা তথা অর্ধ
শাবানের রাত্রি অর্থাৎ শবে বরাতের রাত্রি। আর লওহে
মাহফূয থেকে দুনিয়ার আকাশে একই সঙ্গে অবতীর্ণ করা
হয়। সেখান থেকে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম উনার
মাধ্যমে সুদীর্ঘ তেইশ বৎসরে বিভিন্ন অবস্থার প্রেক্ষিতে
খ- খ-ভাবে তা হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম-উনার উপর নাযিল করা হয়।
===> বিশ্ব বিখ্যাত তাফসীর তাফসীরে খাযিন-এর ৪র্থ খ-ে
র (সূরা ক্বদরের তাফসীরে) ২৯৫ পৃৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-
(১৩১-১৩৫)
ﺍﻧﺎ ﺍﻧﺰﻟﻨﺎﻩ ﻳﻌﻨﻰ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ ‏(ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻘﺪﺭ ﻭﺫﻟﻚ ﺍﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ ﺍﻧﺰﻝ ﺍﻟﻘﺮﺍﻥ ﺍﻟﻌﻈﻴﻢ ﺟﻤﻠﺔ ﻭﺍﺣﺪﺓ ﻣﻦ
ﺍﻟﻠﻮﺡ ﺍﻟﻤﺤﻔﻮﻅ ﺍﻟﻰ ﺍﻟﺴﻤﺎﺀ ﺍﻟﺪﻧﻴﺎ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻘﺪﺭ ﻓﻮﺿﻌﻪ ﻓﻰ ﺑﻴﺖ ﺍﻟﻌﺰﺓ ﺛﻢ ﻧﺰﻝ ﺑﻪ ﺟﺒﺮﻳﻞ ﻋﻠﻴﻪ ﺍﻟﺴﻼﻡ
ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻨﺒﻰ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ ﻧﺠﻮﻣﺎ ﻣﺘﻔﺮﻗﺔ ﻓﻰ ﻣﺪﺓ ﺛﻼﺙ ﻭﻋﺸﺮﻳﻦ ﺳﻨﺔ ﻓﻜﺎﻥ ﻳﻨﺰﻝ ﺑﺤﺴﺐ
ﺍﻟﻮﻓﺎﺋﻊ ﻭﺍﻟﺤﺎﺟﺔ ﺍﻟﻴﻪ .
অর্থ: নিশ্চয়ই আমি উহা তথা পবিত্র কুরআন শরীফ ক্বদরের
রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি। এই বাণী মুবারক-এর দ্বারা
ইহা বুঝানো হয়েছে যে, নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তায়ালা
পবিত্র কুরআনুল কারীম একই সঙ্গে লাওহে মাহফূয থেকে
দুনিয়ার আকাশে অবতীর্ণ করেন লাইলাতুল ক্বদরে। অতঃপর
ওই পবিত্র কুরআন শরীফ বাইতুল ইযযতে রাখা হয়। সেখান
থেকে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম উনার মাধ্যমে
আস্তে আস্তে সুদীর্ঘ তেইশ বছরে বিভিন্ন অবস্থার
প্রেক্ষিতে এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে খ- খ-ভাবে হুযূর পাক
ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-উনার উপর অবতীর্ণ
করেন।
(সূরা আদ দুখান এর তাফসীরে তাফসীরে খাযিন ৪র্থ খন্ড
১১২ পৃষ্ঠা, তাফসীরে বাগবী ৪র্থ/১১২ পৃষ্ঠা, তাফসীরে রহুল
মায়ানী, তাফসীরে রুহুল বয়ান, দুররুল মানছুর, ইত্যাদি
তাফসীরে সমূহ)
তাছাড়াও সমাধানে আরো উল্লেখ আছে যে, লাইলাতুম
মুবারাকা দ্বারা অর্ধ শা’বানের রাত তথা শবে বরাতকে
আর নির্ধারিত ভাগ্যসমূহ চালুকরণের রাতকে লাইলাতুল
ক্বদর তথা শবে ক্বদরের রাতকে বুঝানো হয়েছে।
যেমন এ প্রসঙ্গে বিশ্ব বিখ্যাত তাফসীর তাফসীরে রুহুল
মায়ানী ১৫তম খ-ের ২২১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-
(১৩৬) ﻭﺍﻟﺜﺎﻧﻰ ﺍﻇﻬﺎﺭ ﺗﻠﻚ ﺍﻟﻤﻘﺎﺩﻳﺮ ﻟﻠﻤﻼﺋﻜﺔ ﻋﻠﻴﻬﻢ ﺍﻟﺴﻼﻡ ﺗﻜﺘﺐ ﻓﻰ ﺍﻟﻠﻮﺡ ﺍﻟﻤﺤﻔﻮﻅ ﻭﺫﻟﻚ ﻓﻰ ﻟﻴﻠﺔ
ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻨﺸﻌﺒﺎﻥ ﻭﺍﻟﺜﺎﻟﺚ ﺍﺛﺒﺎﺕ ﺗﻠﻚ ﺍﻟﻤﻘﺎﺩﻳﺮ ﻓﻰ ﻧﺴﺦ ﻭﺗﺴﻠﻴﻤﻬﺎ ﺍﻟﻰ ﺍﺭﺑﺎﺑﻬﺎ ﻣﻦ ﺍﻟﻤﺪﺑﺮﺍﺕ
অর্থ: লাইলাতুল ক্বদরের অনেক অর্থ রয়েছে তন্মধ্যে
দ্বিতীয় একটি অর্থ হচ্ছে অর্ধ শা’বানের রাতে তথা শবে
বরাতে যেসব বিষয়ের তালিকা লাওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ
করা হয়েছে সেসব ভাগ্য তালিকা ফেরেশ্তা আলাইহিমুস
সালামগণ উনাদের মাধ্যমে যে রাত্রিতে প্রকাশ তথা চালু
করা হয় সেই রাতকেই লাইলাতুল ক্বদর তথা ভাগ্য
নির্ধারণের রাত বা মহান মর্যাদাবান রাতও বলে।
তৃতীয়ত: অপর একটি অর্থ হচ্ছে নির্ধারিত ভাগ্যসমূহ যা
তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তা চালু করার জন্য কার্যকারী
ফেরেশতাদের হাতে যে রাতে পেশ করা হয় সেই রাতকে
লাইলাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদর বলে।
==মাওলানা মাহিউদ্দীন খান তার মাসিক মদীনায়
জুলাই/২০১১ এর ৪১পৃষ্ঠায় “আল-কুরআনে শব-ই-বরাত: একটি
বিশ্লেষন” শিরোনামে লিখেছে-
সুরা দুখানের লাইলাতুম মুবারকা শব্দের সংখ্যাতাত্ত্বিক
বিশ্লেষন করলে দেখা যায় যে, সুরা দুখান কুরআনের ১ম
থেকে ৪৪নং সুরা। ৪৪ এর অঙ্কদ্বয়ের সমষ্টি ৪+৪=৮; ৮দ্বারা
বুঝায় ৮ম মাস অর্থাৎ শাবান মাসে লাইলাতুম মুবারকা
অবস্থিত। আবার কুরআনের শেষ থেকেও সুরা দুখান ৭১ নং
সুরা। ৭১ অঙ্কদ্বয়ের সমষ্টি ৭+১=৮, পুনরায় ৮ম মাসের দিকেই
ইঙ্গিত করে। আবার এ সুরার প্রথম থেকে ১৪টি হরফ শেষ
করে ১৫তম হরফ থেকে লাইলাতুম মুবারকায় কুরআন নাযিল
সংক্রান্ত আয়াত শুরু হয়েছে। এটা ইঙ্গিত করে যে, ঐ ৮ম
মাসের ১৪ তারিখ শেষ হয়ে ১৫তারিখ রাতেই লাইলাতুম
মুবারকা। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষন প্রমান করে, সুরা
দুখানে বর্নিত লাইলাতুম মুবারকা ১৪ই শাবান দিবাগত ১৫ই
শাবানের রাত। অর্থাৎ লাইলাতুল বারাআত বা শব-ই-
বারাআত। এছাড়া মুফাসিসরীনদের বিশাল এক জামাত
দাবী করেছেন, সুরা দুখানে বর্নিত যে রাতকে লাইলাতুম
মুবারকা বলা হয়েছে তা অবশ্যই শব-ই-বরাত। (ইমাম কুরতবী,
মোল্লা আলী কারী (রহ), বুখারী শরীফের সর্বশ্রেষ্ঠ
ভাষ্যকার হাফিজুল হাদীস আল্লামা ইবনে হাজার
আসকালানী রহ; এবং হাম্বলী মাজহাবের অন্যতম ইমাম
বড়পীর আব্দুল কাদির জিলানী রহমাতুল্লাহি সহ আরো
অনেকে এ বিষয়ে একমত)
কুরআন শরীফ নাযিল করেছি।” এর ব্যাখ্যামূলক অর্থ হলো,
“আমি ক্বদরের রাত্রিতে কুরআন শরীফ নাযিল শুরু করি।”
অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক “লাইলাতুম মুবারকাহ বা শবে
বরাতে” কুরআন শরীফ নাযিলের সিদ্ধান্ত নেন আর শবে
ক্বদরে তা নাযিল করা শুরু করেন। এজন্যে মুফাসসিরীনে
কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনারা শবে বরাতকে ﻟﻴﻠﺔ
ﺍﻟﺘﺠﻮﻳﺰ অর্থাৎ ‘ফায়সালার রাত।’ আর শবে ক্বদরকে ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﺘﻨﻔﻴﺬ
অর্থাৎ ‘জারী করার রাত’ বলে উল্লেখ করেছেন। কেননা
শবে বরাতে যে সকল বিষয়ের ফায়সালা করা হয় তা ‘সূরা
দুখান-এর’ উক্ত আয়াত শরীফেই উল্লেখ আছে। যেমন ইরশাদ
হয়েছে-
ﻓﻴﻬﺎ ﻳﻔﺮﻕ ﻛﻞ ﺍﻣﺮ ﺣﻜﻴﻢ
অর্থাৎ- “উক্ত রজনীতে প্রজ্ঞাসম্পন্ন সকল বিষয়ের
ফায়সালা করা হয়।”
হাদীছ শরীফেও উক্ত আয়াতাংশের সমর্থন পাওয়া যায়।
যেমন ইরশাদ হয়েছে-
ﻓﻴﻬﺎ ﺍﻥ ﻳﻜﺘﺐ ﻛﻞ ﻣﻮﻟﻮﺩ ﻣﻦ ﺑﻨﻰ ﺍﺩﻡ ﻓﻰ ﻫﺬﻩ ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻭﻓﻴﻬﺎ ﺍﻥ ﻳﻜﺘﺐ ﻛﻞ ﻫﺎﻟﻚ ﻣﻦ ﺑﻨﻰ ﺍﺩﻡ ﻓﻰ ﻫﺬﻩ
ﺍﻟﺴﻨﺔ ﻭﻓﻴﻬﺎ ﺗﺮﻓﻊ ﺍﻋﻤﺎﻟﻬﻢ ﻭﻓﻴﻬﺎ ﺗﻨﺰﻝ ﺍﺭﺯﺍﻗﻬﻢ
অর্থাৎ- “বরাতের রাত্রিতে ফায়সালা করা হয় কতজন
সন্তান আগামী এক বৎসর জন্ম গ্রহণ করবে এবং কতজন সন্তান
মৃত্যু বরণ করবে। এ রাত্রিতে বান্দাদের আমলগুলো উপরে
উঠানো হয় অর্থাৎ আল্লাহ পাক-উনার দরবারে পেশ করা হয়
এবং এ রাত্রিতে বান্দাদের রিযিকের ফায়সালা করা
হয়।” (বায়হাক্বী, মিশকাত)
===> লাইলাতুম মুবারাকাহ দ্বারা শবে বরাতকে বুঝানো
হয়েছে তার যথার্থ প্রমাণ সূরা দু’খানের ৪ নম্বর আয়াত
শরীফ ﻓِﻴﻬَﺎ ﻳُﻔْﺮَﻕُ ﻛُﻞُّ ﺃَﻣْﺮٍ ﺣَﻜِﻴﻢٍ । এই আয়াত শরীফের ﻳُﻔْﺮَﻕُ শব্দের অর্থ
ফায়সালা করা।প্রায় সমস্ত তাফসীরে সকল মুফাসসিরীনে
কিরামগণ ﻳُﻔْﺮَﻕُ (ইয়ুফরাকু) শব্দের তাফসীর করেছেন ইয়ুকতাবু
অর্থাৎলেখা হয়, ইয়ুফাছছিলু অর্থাৎ ফায়সালা করা হয়,
ইয়ুতাজাও ওয়াযূ অর্থাৎ বন্টন বা নির্ধারণ করা হয়,
ইয়ুবাররেমু অর্থাৎ বাজেট করা হয়, ইয়ুকদ্বিয়ু অর্থাৎ
নির্দেশনা দেওয়া হয়
কাজেই ইয়ুফরাকু -র অর্থ ও তার ব্যাখার মাধ্যমে আরো
স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, লাইলাতুম মুবারাকাহদ্বারা শবে
বরাত বা ভাগ্য রজনীকে বুঝানো হয়েছে। যেই রাত্রিতে
সমস্ত মাখলুকাতের ভাগ্যগুলো সামনের এক বছরের জন্য
লিপিবদ্ধ করা হয়, আর সেই ভাগ্যলিপি অনুসারে রমাদ্বান
মাসের লাইলাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদরে তা চালু হয়। এজন্য
শবে বরাতকে লাইলাতুত্ তাজবীজ অর্থাৎ ফায়সালার
রাত্র এবং শবে ক্বদরকেলাইলাতুল তানফীয অর্থাৎ
নির্ধারিত ফায়সালার কার্যকরী করার রাত্র বলা হয়।
(তাফসীরে মাযহারী,তাফসীরে খাযীন,তাফসীরে ইবনে
কাছীর,বাগবী, কুরতুবী,রুহুল বয়ান,লুবাব)
==যে বিষয় টি লক্ষ্যনীয়- শবে কদর হাজার বছরের চেয়ে
শ্রেষ্টরাত এবং সেইদিন হল বন্ঠনের রাত কিন্তু শবে বরাত
হল ফয়সালার রাত,সেহেতু সুরা দুখুানে এসছে—“ আমারই
নির্দেশক্রমে উক্ত রাত্রিতে প্রতিটি প্রজ্ঞাময় বিষয়গুলো
ফায়সালা হয়। আর নিশ্চয়ই আমিই প্রেরণকারী।” (সুরা
দুখান-৫)এবং হাদিসেও ১৫ই শাবান কে ফয়সালার রাত
হিসেবে উল্লেখ অাছে যেটি শবে কদর সর্ম্পকে নাই।

image

শবে বরাত সম্পর্কীয় বহু বর্ণনা হাদীসের কিতাবে
বিদ্যমান। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হাদীস নিম্নে
পেশ করছি-
*প্রথম হাদীস
হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা. রাসূল স. থেকে বর্ণনা করেন,
আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে
সমস্ত সৃষ্টি কুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করে সকলকে
ক্ষমা করে দেন। তবে মুশরিক এবং হিংসুক ছাড়া। (দেখুন:
শুয়াবুল ঈমান-৫/২২৭ , আল-মু‘জামূল কাবীর-২০/১০৮)
░▒▓█►হাদীসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের অভিমত
ক. হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী র. মুয়ায রা. এর হাদীসটি
বর্ণনা করে বলেন, ইবনে হিবক্ষান হাদীসটিকে সহীহ
বলেছেন। আর নির্ভরযোগ্যতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
*দ্বিতীয় হাদীস
হযরত আয়েশা রা. বলেন, একরাতে আমি রাসূল স.কে
বিছানায় পেলাম না। তাই (খোজার উদ্দেশ্যে) বের হলাম।
তখন দেখতে পেলাম,তিনি জান্নাতুল বাকীতে আছেন।
আমাকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, তুমি কি এ আশঙ্কা
করছো যে, আল্লাহ এবং তার রাসূল তোমার প্রতি অবিচার
করবেন ? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল ! আমি ধারণা
করছিলাম, আপনি আপনার অন্য স্ত্রীর ঘরে তাশরীফ
নিয়েছেন। রাসূল স. বলেন শাবানের পনের তারিখ রাতে
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং ‘বনু
কালব’ গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক
লোককে মাফ করে দেন। (তিরমিযী শরীফ: ১/১৫৬)
░▒▓█►হাদীসটির ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের অভিমত
ইবনে হিবক্ষান র. আয়েশা রা. এর হাদীসটিকে হাসান
বলেছেন। (শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুনিয়্যাহ: ৭/৪৪১
*তৃতীয় হাদীস
হযরত আবী সা’লাবা আল খুশানী রা. থেকে বর্ণিত হুজুর স.
ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা‘আলা শা’বান মাসের পনের
তারিখ রাতে স্বীয় বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন।
অতঃপর মুমিনদেরকে ক্ষমা করেন এবং কাফেরদেকে সুযোগ
দেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে বিদ্বেষ পরিত্যাগ
করা পযর্ন্ত অবকাশ দেন। (শুয়াবুল ঈমান: ৩/৩৮১ , মু‘জামূল
কাবীর: ২২/২২৩)
*চতুথ হাদীস:-
আবু মূসা আল আশ’আরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা‘আলা শাবানের
মধ্যরাত্রিতে আগমণ করে, মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত
ব্যক্তিদের ব্যতীত, তাঁর সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে
দেন। হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৫৫,
হাদীস নং ১৩৯০),এবং তাবরানী তার মু’জামুল কাবীর
(২০/১০৭,১০৮) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
░▒▓█► আল্লামা বূছীরি বলেন: ইবনে মাজাহ বর্ণিত
হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাবরানী বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে
আল্লামা হাইসামী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) মাজমা‘
আয যাওয়ায়েদ (৮/৬৫) গ্রন্থে বলেনঃ ত্বাবরানী বর্ণিত
হাদীসটির সনদের সমস্ত বর্ণনাকারী শক্তিশালী।
হাদীসটি ইবনে হিব্বানও তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন। এ
ব্যাপারে দেখুন, মাওয়ারেদুজ জাম‘আন, হাদীস নং (১৯৮০),
পৃঃ (৪৮৬)।
*৫ম হাদীস:-
আলী ইবনে আবী তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে
বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যখন শা‘বানের মধ্যরাত্রি আসবে
তখন তোমরা সে রাতের কিয়াম তথা রাতভর নামায পড়বে,
আর সে দিনের রোযা রাখবে; কেননা সে দিন সুর্যাস্তের
সাথে সাথে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়ার আকাশে অবতরণ
করেন এবং বলেন: ক্ষমা চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি
ক্ষমা করব। রিযিক চাওয়ার কেউ কি আছে যাকে আমি
রিযিক দেব। সমস্যাগ্রস্ত কেউ কি আছে যে আমার কাছে
পরিত্রাণ কামনা করবে আর আমি তাকে উদ্ধার করব। এমন
এমন কেউ কি আছে? এমন এমন কেউ কি আছে? ফজর পর্যন্ত
তিনি এভাবে বলতে থাকেন”।
░▒▓█►সনদ পর্যালোচনা ঃ
হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৪৪, হাদীস
নং ১৩৮৮) বর্ণনা করেছেন। আল্লামা বূছীরি
(রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) তার যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ
(২/১০) গ্রন্থে বলেন, হাদীসটির বর্ণনাকারীদের মধ্যে ইবনে
আবি সুবরাহ রয়েছেন।যদি তিনি দুর্বল রাবী হন তাহলে
হাদীস টি হাসান।
*৬ষ্ট হাদীস:-
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
(সা.) বলেছেন : ১৫ই শা’বানের রাত্রে আল্লাহ পাক তার
বান্দাদের ক্ষমা করে দেন দুই ব্যক্তি ছাড়া। এক.
পরশ্রীকাতর। দুই. অন্যায় ভাবে কাউকে হত্যাকারী।
মুসনাদে আহমদ-৬/১৯৭, হাদীস-৬৬৪২, মাজমাউস
জাওয়ায়েদ-৮/৬৫, হাদীস-১২৯৬১, আত তারগীব ওয়াত তারহীব
লিল মুনজেরী-৩/৩০৮, হাদীস-৪৮৯২। ইত্যাদি অসংখ্য
কিতাব..।
░▒▓█►সনদ পর্যালোচনা ঃ
হাদীসটির মান : উক্ত হাদীসটি হাসান তথা প্রমাণযোগ্য।
*৭ম হাদীস:-
-‘‘হযরত আবু হুরায়রা () হতে বর্ণিত, আঁকা () ইরশাদ ফরমান,
যখন শাবানের ১৫ই তারিখের রাত আগমন করে তখন আল্লাহ
তা‘য়ালা ঈমানদার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন, শুধু
মুশরিক (আল্লাহর সাথে শরীককারী) ও হিংসুক ব্যতীত।’
░▒▓█►সনদ পর্যালোচনা ঃ
আল্লামা হাইসামী উক্ত হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন-
ﺭَﻭَﺍﻩُ ﺍﻟْﺒَﺰَّﺍﺭُ، ﻭَﻓِﻴﻪِ ﻫِﺸَﺎﻡُ ﺑْﻦُ ﻋَﺒْﺪِ ﺍﻟﺮَّﺣْﻤَﻦِ ﻭَﻟَﻢْ ﺃَﻋْﺮِﻓْﻪُ، ﻭَﺑَﻘِﻴَّﺔُ ﺭِﺟَﺎﻟِﻪِ ﺛِﻘَﺎﺕٌ .-
-‘‘উক্ত হাদিসটি ইমাম বায্যার () ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা
করেন, তার বর্ণনাকারীদের একজন “হিশাম ইবনে আব্দুর
রহমান’’ তার সম্পর্কে আমি পরিচিত বা অবগত নই, বাকী সব
রাবী মজবুত ও সিকাহ বা বিশ্বস্ত। অতএব একজনের জন্য
হাদিস যঈফ হবে না; বরং “হাসান”।ইমাম বায্যার : আল
মুসনাদ : ১৬/১৬১পৃ. : হাদিস :৯২৬৮ (২) ইবনে হাজার
হায়সামী : মাযমাউয যাওয়াইদ,হাদিস, ৮/৬৫পৃ.
হাদিস,১২৯৫৮ (৩) সুয়ূতি, জামিউল আহাদিস, ৩/৪৮৪পৃ.
হাদিস,২৬২৩, (৪) খতিবে বাগদাদ, তারীখে বাগদাদ,
১৪/২৮৫পৃ. (৫) ইবনে যওজী, আল-ইল্ললুল মুতনাহিয়্যাহ, ২/৫৬০পৃ.
হাদিস,৯২১ (৬) ইমাম তবারী, শরহে উসূলুল আকায়েদ, ৩/৪৯৫পৃ.
হাদিস,৭৬৩, হাইসামী, কাশফুল আশতার, ২/৪৩৬পৃ.
হাদিস,২০৪৬
*৮নং হাদিস ঃ
-‘‘হযরত আওফ বিন মালেক আশজারী () হতে বর্ণিত, রাসূলে
খোদা () ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাবারাকা ও তায়ালা ১৫ই
শাবানের রাত্রে (শবে বরাত) সকল ঈমানদার বান্দাদেরকে
ক্ষমা করে দেন। তবে মুশরিক এবং হিংসুক ব্যতীত সবাইকে।
’░▒▓█►সনদ পর্যালোচনা ঃ
আল্লামা হাইসামী উক্ত হাদিসটি সংকলন করে বলেন-
-‘‘উক্ত হাদিসটি ইমাম বায্যার তার মুসনাদ গ্রন্থে বর্ণনা
করেছেন, উক্ত সনদে “আব্দুর রহমান বিন যিয়াদ বিন আনআম”
ইমাম আহমদ বিন সালেহ এর মত তিনি সিকাহ আবার কিছু
মুহাদ্দিসের কাছে তিনি দুর্বল রাবী এবং ইবনে লাহিয়া
হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে নরম প্রকৃতির।’ একজন রাবী দ্বঈফ
হওয়াতে হাদিসটির সম্পূর্ণ সনদটি দুর্বল হবে না বরং
“হাসান”।
ইমাম বায্যার : আল-মুসনাদ :৭/১৮৬পৃ.হাদিস,২৭৫৪ (২) ইবনে
হাজার হায়সামী, মাযমাউয যাওয়াইদ, ৮/৬৫পৃ. (৩) খতিব
তিবরিযী : মিশকাতুল মাসাবীহ : হাদিস : ১৩০৬ : কিয়ামে
রামাদ্বান (৪) ইবনে কাসীর, জামিউল মাসানীদ ওয়াল
সুনান, ৬/৬৯১পৃ. হাদিস,৮৫৩৯
🏡* ৯নংহাদীস:-
-‘‘হযরত কাসীর ইবনে হাদ্বরামী () হতে বর্ণিত, রাসূল ()
ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা শাবানের ১৫ই তারিখ
রাতে ঈমানদার বান্দাদেরকে ক্ষমা করে দেন, তবে হ্যা দুই
ধরনের ব্যক্তি ছাড়া, তারা হল মুশরিক ও হিংসুক।’’
░▒▓█►সনদ পর্যালোচনা ঃ
উক্ত হাদীসের সনদ প্রসঙ্গে আহলে হাদীসের মুহাদ্দিস
মোবারকপুরী এবং ইমাম মুনযির বলেন- ﻗﺎﻝ ﻣﻨﺬﺭﻯ : ﺭﻭﺍﻩ ﺍﻟﺒﻴﻬﻘﻲ ﻭ ﻗﺎﻝ
ﻫﺬﺍ ﻣﺮﺳﻞ ﺟﻴﺪ
-‘‘ইমাম মুনযির বলেন, উক্ত হাদিসটি ইমাম বায়হাকী
বর্ণনা করেছেন। আর বলেছেন, উক্ত হাদিসটি মুরসাল, তবে
সনদ শক্তিশালী।’’ এ হাদিসটির ইমাম আবদুর রাজ্জাকের
সূত্রটি খুবই সংক্ষিপ্ত;অনেক শক্তিশালী।
ইবনে আবী শায়বাহ : আল মুসান্নাফ : ৬/১০৮পৃ.হাদিস :২৯৮৫৯
(২) ইমাম আব্দুর রাজ্জাক : আল মুসান্নাফ : ৪/৩১৭ : হাদিস :
৭৯২৩(৩) ইমাম বায়হাকী : শুয়াবুল ঈমান : ৫/৩৫৯পৃ.হাদিস :
৩৫৫০
🏡*১০ নং হাদীস:-
-‘‘হযরত আতা ইবনে ইয়াসার () হতে বর্ণিত, রাসূল () ইরশাদ
করেন, শাবানের মধ্য রজনীতে আয়ূ নির্ধারণ করা হয়। ফলে
দেখা যায় কেউ সফরে বের হয়েছে অথচ তার নাম মৃতদের
তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, আবার কেউ বিয়ে করছে
অথচ তার নাম জীবিতের খাতা থেকে মৃত্যুর খাতায় লিখা
হয়ে গেছে।’’
░▒▓█►সনদ পর্যালোচনা ঃ রাবী ‘‘ইবনে লাহিয়াহ’ সম্পর্কে
মোটামুটি তিনি সিকাহ বা বিশ্বস্ত ছিলেন। তাছাড়া
মোবারকপুরী বলেন,
ﻗﺎﻝ ﻣﻨﺬﺭﻯ : ﺭﻭﺍﻩ ﺍﺣﻤﺪ ﺑﺎﺳﻨﺎﺩ ﻟﻴﻦ- ﺗﺤﻔﺔ ﺍﻻﺣﻮﺫﻯ : ৪৪১/৩
-‘‘ইমাম মুনযিরী () বলেন, ইমাম আহমদ উক্ত হাদিসটি বর্ণনা
করেছেন এবং বলেন, উক্ত হাদীসের সনদটি ইবনে লাহিয়ার
কারণে লীন বা নরম প্রকৃতির।’’
ইমাম বায্যার : আল মুসনাদ :৩ পৃ- ১৫৮, হাদিস : ৭৯২৫(২)
সুয়ূতি, জামিউল আহাদিস, ৪১/৬৯পৃ. হাদিস,৪৪৩১৪, (৩) ইবনে
রাহবিয়্যাহ, মুসনাদ, ৩/৯৮১পৃ. হাদিস,১৭০২ (৪) তবারী, শরহে
উসূলুল আকায়েদ, ৩/৪৯৯পৃ. হাদিস,৭৬৯
🏡*১১ নং হাদীস:-
আয়শা (রা:) বলেন, “রাসূলুল্লাহ আমার ঘরে প্রবেশ করলেন
এবং তাঁর পোশাকটি খুলে রাখলেন। কিন্তু তত্ক্ষণাত্
আবার তা পরিধান করলেন। এতে আমার মনে কঠিন
ক্রোধের উদ্রেক হয়। কারণ আমার মনে হলো যে, তিনি
আমার কোন সতীনের নিকট গমন করেছেন। তখন আমি
বেরিয়ে তাঁকে অনুসরণ করলাম এবং দেখতে পেলাম যে,
তিনি বাক্বী গোরস্থানে মুমিন নরনারী ও শহীদদের পাপ
মার্জনার জন্য দোয়া করছেন। আমি (মনে মনে) বললাম,
আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কুরবানী হউন, আমি আমার
জাগতিক প্রয়োজন নিয়ে ব্যস্ত আর আপনি আপনার রবের
কাছে ব্যস্ত। অত:পর আমি ফিরে গিয়ে আমার কক্ষে প্রবেশ
করলাম, তখন আমি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে হাঁপাচ্ছিলাম।
এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স.) আমার নিকট আগমন করে
বললেন, আয়শা, তুমি এভাবে হাঁপাচ্ছ কেন? আয়শা বললেন,
আমার পিতা মাতা আপনার জন্য কুরবানী হউন, আপনি
আমার কাছে আসলেন এবং কাপড় খুলতে শুরু করে তা আবার
পরিধান করলেন। ব্যাপারটি আমাকে খুব আহত করল। কারণ
আমি ধারণা করেছিলাম যে, আপনি আমার কোন সতীনের
সংস্পর্শে গিয়েছেন। পরে আপনাকে বাক্বী’তে দোয়া
করতে দেখলাম। তিনি বললেন, হে আয়েশা, তুমি কি
আশংকা করেছিলে যে, আল্লাহ ও তদীয় রাসুল তোমার
উপর অবিচার করবেন? বরং আমার কাছে জিবরাঈল (আ.)
আসলেন এবং বললেন, এ রাত্রটি মধ্য শাবানের রাত।
আল্লাহ তা’য়ালা এ রাতে ‘কালব’ সম্পদায়ের মেষপালের
পশমের চাইতে অধিক সংখ্যককে ক্ষমা করেন। তবে তিনি
শিরকে লিপ্ত, বিদ্বেষী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী,
কাপড় ঝুলিয়ে (টাখনু আবৃত করে) পরিধানকারী, পিতা
মাতার অবাধ্য সন্তান ও মদ্যপায়ীদের প্রতি দৃষ্টি দেন না।
অত:পর তিনি কাপড় খুললেন এবং আমাকে বললেন, হে
আয়শা, আমাকে কি এ রাতে ইবাদত করার অনুমতি দিবে?
আমি বললাম, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উত্সর্গিত
হোন! অবশ্যই। অত:পর তিনি সালাত আদায় করতে লাগলেন
এবং এমন দীর্ঘ সিজদা করলেন আমার মনে হলো যে, তিনি
মৃত্যুবরণ করেছেন। অত:পর আমি (অন্ধকার ঘরে) তাকে
খুঁজলাম এবং তাঁর পদদ্বয়ের তালুতে হাত রাখলাম। তখন
তিনি নড়াচড়া করলেন। ফলে দুশ্চিন্তা-মুক্ত হলাম। আমি
শুনলাম, তিনি সিজদারত অবস্থায় বলছেন: ‘আমি আপনার
কাছে শাস্তির পরিবর্তে ক্ষমা চাই, অসন্তুষ্টির পরিবর্তে
সন্তুষ্টি চাই। আপনার কাছে আপনার (আজাব ও গজব) থেকে
আশ্রয় চাই। আপনি সুমহান। আপনার প্রশংসা করে আমি
শেষ করতে পারি না। আপনি তেমনই যেমন আপনি আপনার
প্রসংশা করেছেন। আয়শা (রা.) বলেন, সকালে আমি এ
দোয়াটি তাঁর কাছে উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, হে
আয়শা, তুমি কি এগুলো শিখেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ। তখন
তিনি বললেন, হে আয়শা তুমি এগুলো ভাল করে শিখ এবং
অন্যকে শিক্ষা দাও। জিবরাঈল (আ.) আমাকে এগুলো
শিক্ষা দিয়েছেন এবং সিজদার ভিতরে বারবার বলতে
বলেছেন।
(বায়হাকীর শুয়াবুল ইমান ২/৩৮৩)।
░▒▓█► হাদীসটির মান :
ইমাম বায়হাকী নিজেই উক্ত হাদীস উল্লেখ করে বলেন-
ﻗُﻠْﺖُ : ﻫَﺬَﺍ ﻣُﺮْﺳَﻞٌ ﺟَﻴِّﺪٌ ﻭَﻳُﺤْﺘَﻤَﻞُ ﺃَﻥْ ﻳَﻜُﻮﻥَ ﺍﻟْﻌَﻠَﺎﺀ ﺑْﻦُ ﺍﻟْﺤَﺎﺭِﺙِ ﺃَﺧَﺬَﻩُ ﻣِﻦْ ﻣَﻜْﺤُﻮﻝٍ ﻭَﺍﻟﻠﻪُ ﺃَﻋْﻠَﻢُ ،
অর্থাৎ : উক্ত হাদীসটি (মুরসাল) সনদ অনেক উত্তম। অতএব
হাদীসটি প্রমাণযোগ্য।

image

**মুহাদ্দিসীনে কেরাম ও ফকীহগণের দৃষ্টিতে শবে বরাত
=============
(১) আহলে হাদীসের অন্যতম আলেম মুবারকপুরী তিরমিযী
শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ”তোহফাতুল আহওয়াযীতে” বলেন,
ﺍﻋْﻠَﻢْ ﺃَﻧَّﻪُ ﻗَﺪْ ﻭَﺭَﺩَ ﻓِﻲ ﻓَﻀِﻴﻠَﺔِ ﻟَﻴْﻠَﺔِ ﺍﻟﻨِّﺼْﻒِ ﻣِﻦْ ﺷَﻌْﺒَﺎﻥَ ﻋِﺪَّﺓُ ﺃَﺣَﺎﺩِﻳﺚَ ﻣَﺠْﻤُﻮﻋُﻬَﺎ ﻳَﺪُﻝُّ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻥَّ ﻟَﻬَﺎ ﺃَﺻْﻠًﺎ
——– ﻓَﻬَﺬِﻩِ ﺍﻟْﺄَﺣَﺎﺩِﻳﺚُ ﺑِﻤَﺠْﻤُﻮﻋِﻬَﺎ ﺣُﺠَّﺔٌ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻦْ ﺯَﻋَﻢَ ﺃَﻧَّﻪُ ﻟَﻢْ ﻳَﺜْﺒُﺖْ ﻓِﻲ ﻓَﻀِﻴﻠَﺔِ ﻟَﻴْﻠَﺔِ ﺍﻟﻨِّﺼْﻒِ ﻣِﻦْ ﺷَﻌْﺒَﺎﻥَ
ﺷَﻲْﺀٌ ﻭَﺍَﻟﻠَّﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﺃَﻋْﻠَﻢُ – ‏( ﻛﺘﺎﺏ ﺍﻟﺼﻮﻡ ﻋﻦ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﻪ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭﺳﻠﻢ, ﺑﺎﺏ : ﻣﺎ ﺟﺎﺀ ﻓﻲ ﻟﻴﻠﺔ
ﻻﻧﺼﻒ ﻣﻦ ﺍﻟﺸﻌﺒﺎﻥ )
-‘‘জেনে রাখুন, শাবানের মধ্যরাতের (শবে বরাতের) ফযীলত
সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সব হাদিস একত্রিত
করলে প্রমাণিত হয় যে, এ রাতের ফযীলতের ক্ষেত্রে
নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। অনুরূপভাবে এ হাদিসগুলো
সম্মিলিতভাবে তাদের বিপক্ষে প্রমাণ বহন করে যারা
ধারণা করে যে, শবে বরাতের ফযীলতের ক্ষেত্রে কোন
প্রমান মেলে না। আল্লাহ তায়ালাই ভাল জানেন।’’
(২) আল্লামা ইমাম ইবনে ইসহাক বুরহান উদ্দিন ইবনে
মুফলিহ ওফাত.৮৮৪হি.বলেন,
ﻭَﻳُﺴْﺘَﺤَﺐُّ ﺇِﺣْﻴَﺎﺀُ ﻣَﺎ ﺑَﻴْﻦَ ﺍﻟْﻌِﺸَﺎﺀَﻳْﻦِ ﻟِﻠْﺨَﺒَﺮِ. ﻗَﺎﻝَ ﺟَﻤَﺎﻋَﺔٌ: ﻭَﻟَﻴْﻠَﺔِ ﻋَﺎﺷُﻮﺭَﺍﺀَ، ﻭَﻟَﻴْﻠَﺔِ ﺃَﻭَّﻝِ ﺭَﺟَﺐٍ، ﻭَﻟَﻴْﻠَﺔِ ﻧِﺼْﻒِ
ﺷَﻌْﺒَﺎﻥَ، – ﺍﻟﻤﺒﺪﻉ ﺷﺮﺡ ﺍﻟﻤﻘﻨﻊ: ٢/ ٣٣ ﺑﺎﺏ : ﺻﻠﻮﺓ ﺍﻟﺘﻄﻮﻉ –
-‘‘মুস্তাহাব হলো মাগরিব ও ইশার মাঝখানে এই সমস্ত
রাত্রিগুলোতে জেগে ইবাদত করা। এক জামাত ইমামগণ
বর্ণনা করেছেন, এই সমস্ত রাত্রি হল, আশুরার রাত্রি,
রজবের প্রথম রাত্রি, এবং শাবানের ১৫ তারিখ (শবে বরাত)
রাত্রি। এই সমস্ত রাত্রিতে জাগ্রত থাকা মুস্তাহাব।’’
(৩) অন্যতম মুহাদ্দিস আল্লামা ইমাম যুরকানী ()
ওফাত.১১২২হি. বলেন,
ﺍﺫﺍ ﻛﺎﻥ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻓﻘﻮﻣﻮﺍ ﻟﻴﻠﻬﺎ ﻓﻘﻮﻣﻮﺍ ﻟﻴﻠﻬﺎ ” ﺃﻱ : ﺃﺣﻴﻮﻩ ﺑﺎﻟﻌﺒﺎﺩﺓ ﻭﺍﻧﺼﺒﻮﺍ ﺃﻗﺪﺍﻣﻜﻢ ﻟﻠﻪ
ﻗﺎﻧﺘﻴﻦ، –
-‘‘যখন ১৫ই শাবান আসবে তখন রাতে তোমরা ইবাদতের জন্য
দন্ডায়মান হও। এবং এই ইবাদতের দ্বারা রাত্রকে জীবিত
রাখ।’’
(৪) আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী () এক হাদীসের
ব্যাখ্যায় বলেন –
ﻫﺬﺍ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺑﺎﻟﺒﺎﺏ ﺍﻻﻳﺬﺍﻥ ﺑﺎﻥ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻟﻤﺎ ﻭﺭﺩ ﻓﻰ ﺃﺣﻴﺎﺋﻬﺎ ﻣﻦ ﺍﻟﺜﻮﺍﺏ – ﺑﺎﺏ : ﻗﻴﺎﻡ
ﺷﻬﺮ ﺭﻣﻀﺎﻥ –
-‘‘এই হাদীসে অধ্যায়ের দ্বারা সংবাদ বা খবর দিয়েছে যে
শাবানের ১৫ই তারিখ রাতে (শবে বরাতে) জেগে ইবাদত
করলে সাওয়াব রয়েছে যেমনটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।’’
(৫) আল্লামা তাহতাভী হানাফী () বলেন, ﻭﻧﺪﺏ ﺃﺣﻴﺎﺀ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ
ﺷﻌﺒﺎﻥ –
-‘‘শবে বরাতে (১৫ই শাবান) রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদত
করা মুস্তাহাব।’’
(৬) আল্লামা আলাউদ্দিন হাসকাফী () বলেন,
ﻣﻦ ﺍﻟﻤﻨﺪﻭﺑﺎﺕ ﺭﻛﻌﺘﺎ ﺍﻟﺴﻔﺮ ﻭﺍﻟﻘﺪﻭﻡ ﻣﻨﻪ ﻭﺃﺣﻴﺎﺀ ﻟﻴﻠﺘﻰ ﺍﻟﻌﻴﺪﻳﻦ ﻭﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻭ ﺍﻟﻌﺸﺮ ﺍﻻﺧﻴﺮ
ﻣﻦ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﻭﺍﻻﻭﻝ ﻣﻦ ﺫﻯ ﺍﻟﺤﺠﺔ –
-‘মুস্তাহাব হলো এ সমস্ত রাত্রিগুলোতে ইবাদত করা
কমপক্ষে দুরাকাত নামায হলেও পড়া যেমন ১. সফরের প্রথম
রাত ২. দুই ঈদের রাত ৩. শবেই বরাত (১৫ই শাবানের রাত) ৩.
রমযানের শেষ দশ দিনের রাত জিলহজ্ব এর ১ম তারিখ।’’
(৭) আল্লামা ইবনে নুজাইজ হানাফী মিশরী () বলেন,
ﻭﻣﻦ ﺍﻟﻤﻨﺪﻭﺑﺎﺕ ﺃﺣﻴﺎﺀ ﻟﻴﺎﻟﻰ ﺍﻟﻌﺸﺮ ﻣﻦ ﺭﻣﻀﺎﻥ ﻭﻟﻴﻠﺘﻰ ﺍﻟﻌﻴﺪﻳﻦ ﻟﻴﺎﻟﻰ ﻋﺸﺮ ﺫﻯ ﺍﻟﺤﺠﺔ ﻭﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ
ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻛﻤﺎ ﻭﺭﺩﺕ ﺍﻻﺛﺎﺭ –
-‘‘মুস্তাহাব হলো রমযানের শেষ দশ দিনের রাতে ও দুই
ঈদের রাতে ইবাদত করা। জিলহজ্ব মাসের দশ রজনী এবং
শবে বরাতের রাতে ইবাদত করা যা হাদিস দ্বারা
প্রমাণিত।’
(৮) বিখ্যাত ফকীহ আল্লামা শায়খ মনসূর বিন ইউনূস বাহুতী
(রহ.) বলেন,
ﻭﻓﻰ ﺍﺳﺘﺤﺒﺎﺏ ﻗﻴﺎﻣﻬﺎ ﺃﻯ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻨﺼﻒ ﻣﻦ ﺷﻌﺒﺎﻥ ﻣﺎ ﻓﻰ ﺃﺣﻴﺎﺀ ﻟﻴﻠﺔ ﺍﻟﻌﻴﺪ – ‏(ﻛﺸﻒ ﺍﻟﻘﻨﺎﻉ : ١/ ٤٢٠ ،
ﺑﺎﺏ : ﻗﺒﻴﻞ ﻓﺼﻞ ﺳﺠﺪﺓ ﺍﻟﺘﻼﻭﺓ ) -‘‘শবে বরাত (১৫ শাবান) এর রাতে, দুই
ঈদের রাতে দাড়িয়ে অর্থাৎ নামাযে লিপ্ত হওয়া
মুস্তাহাব।’’
৯,*ইমাম আহমাদ (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)।
১০,*ইমাম আওযায়ী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি)।
১১,*ইবনে তাইমিয়া ।
১২,*ইমাম ইবনে রাজাব আল হাম্বলী (রাহমাতুল্লাহি
আলাইহি)।
১৩,*নাসিরুদ্দিন আল-আলবানী ।
সুত্র:==========
১,আল্লামা মুবারকপুরী: তোহফাতুল আহওয়াজী শরহে
তিরমিযী : ৩/৪৪১ পৃ. হাদিস : ৭৩৬
২, মুফলিহ : মাবদাউ শরহে মাকানা: ২/৩৩পৃ.দারুল কুতুব
ইলমিয়্যাহ,বয়রুত,লেবানন।
৩,আল্লামা ইমাম যুরকানী : শরহে মাওয়াহেবে লাদুন্নীয়া
: ১০/৫৬১ পৃ.
৪,আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী মিরকাত : কিয়ামে
রমযান: ৩/৩৪০ : হাদিস : ১৩০০
৫,আল্লামা ইমাম তাহতাভী : মারাকিল ফালাহ : পৃ-৩২৫
৬,আল্লামা আলাউদ্দিন হাস্কাফী দুররুল মুখতার : ২/২৪-২৫ পৃ
কিতাবুল বিতর এবং নফল অধ্যায়
৭,আল্লামা ইবনে নুজাইম মিশরী : বাহরুর রায়েক : ২/৫২
কিতাবুল বিতর ওয়ান নাওয়াফেল
৮,আল্লামা শায়খ মনসূর বিন ইউনূস বায়হাকী : কাশফুল
কানাঈ : ১/৪২০ : সিজদা ও তেলাওয়াতের ফযীলত অধ্যায়।
৯, [ইবনে তাইমিয়া তার ইকতিদায়ে ছিরাতে মুস্তাকীমে
(২/৬২৬) তা উল্লেখ করেছেন]
১০, [ইমাম ইবনে রাজাব তার ‘লাতায়েফুল মা‘আরিফ’ গ্রন্থে
(পৃঃ১৪৪) তার থেকে তা বর্ণনা করেছেন]
১১, [ইকতিদায়ে ছিরাতে মুস্তাকীম ২/৬২৬,৬২৭, মাজমু‘
ফাতাওয়া ২৩/১২৩, ১৩১,১৩৩,১৩৪]।
১২,[তার লাতায়েফুল মা‘আরিফ পৃঃ১৪৪ দ্রষ্টব্য]।
১৩ [ছিলছিলাতুল আহাদীস আস্সাহীহা ৩/১৩৫-১৩৯]

image

শবে বরাতে জাগরণ করলে জান্নাতের সু-সংবাদ:-
হযরত মু‘আয রা. বর্ণনা করেন,রাসূল স. ইরশাদ করেন- যে
ব্যক্তি পাঁচ রাত ইবাদত বন্দেগীতে কাটাবে তার জন্য
জান্নাত অবধারিত। ১. জিলহজ্জের আট তারিখের রাত। ২.
আরাফার রাত। ৩. ঈদুল আযহার রাত। ৪. ঈদুল ফিতরের রাত।
৫. শাবানের মধ্য রাত অর্থাৎ শবে বরাত। (আত-তারগীব
ওয়াত তারহীব: ২/১৫২)
হযরত ইবনে ওমর (রঃ) বলেনঃ পাঁচটি রজনীতে দুআ করা
হলে তা কখনো ফেরত দেয়া হয় না (অবশ্যই ক্ববুল হয়) জুমআর
রাত্র, রজবের প্রথম রাত, শাবানের পঞ্চদশ রাত এবং দুই
ঈদের রাত।
( ইমাম বায়হাকী তাঁর শুয়াবুল ঈমানে; আব্দুর রাজ্জাক তাঁর
মুসনাদে )
===== # রাতে ইবাদত করা
হযরত আলা ইবনে হারিস ( রহমতুল্লাহি আলাইহি ) থেকে
বর্ণিত, হযরত আয়িশা ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা )
বলেন, একবার রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম ) নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সিজদা করেন যে,
আমার ধারণা হয় তিনি হয়ত মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন
উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তখন তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি
নড়ল। যখন তিনি সিজদা থেকে উঠলেন এবং নামাজ শেষ
করলেন, তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা বা ও
হুমাইরা! তোমার কি এ আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহ ও তাঁর
রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি বললাম, তা নয়, ইয়া
রাসূলাল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সিজদা দেখে আমার আশংকা
হয়েছিল, আপনি মৃত্যু বরণ করেছেন কিনা। নবীজী
( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) জিজ্ঞেস করলেন,
তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর
রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) ভাল
জানেন। রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
বললেন, এটা হল অর্ধ শাবানের রাত। আল্লাহ তাআলা অর্ধ
শাবানে তাঁর বান্দাদের প্রতি নজর দেন এবং
ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের
প্রতি অনুগ্রহ করেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে ছেড়ে
দেন তাদের অবস্থাতেই। ( বায়হাকী, ৩য় খন্ড-৩৮২পৃ )
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হল, এ রাতে দীর্ঘ নফল নামাজ
পড়া উত্তম, যাতে সিজদাও দীর্ঘ হবে। এছাড়াও এ রাতে
কুরআন তেলাওয়াত, যিকির আযকার ইত্যাদি আমল করা যায়।
শবে বরাতের নামাজ বিষয়ে একটি অলোচনা পাবেন এই
লিন্কে:-
http://hifazat-e-islam.blogspot.com/2013/06/blog-post_23.html
==== # পরদিন রোযা রাখা
হযরত আলী ( রাদীয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) থেকে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )
বলেছেন,পনেরো শাবানের (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত)
যখন আসে, তখন তোমরা রাতটি ইবাদত বন্দেগীতে কাটাও
এবং দিনে রোযা রাখ। কেননা এ রাতে সূর্যাস্তের পর
আল্লাহ তাআলা পড়থম আসমানে আসেন এবং বলেন, কোন
ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করবো।
আছে কি কোন রিযিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দিব।
এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের
প্রয়োজনের কথা বলে তাদেরকে ডাকতে থাকেন। ( সুনানে
ইবনে মাজাহ, হাদীস-১৩৮৪, বাইহাকী-শুআবুল ঈমান,
হাদীস-৩৮২৩ )
ইমরান ইবনে হোসায়েন (রা.) বলেছেন যে, “রসূলে
পাক (স.) তাকে অথবা অপর কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি
কি শাবান মাসের মধ্যভাগে (শব-ই- বরাতের) রোজা
রেখেছিলে? তিনি বললেন, না। তখন রসূলে পাক (স.) বললেন,
যখন তুমি রাখনি তখন দু’দিন (রোজার শেষে) রোজা
রেখে দিও” (মুসলীম শরীফ,হাদীস নং-২৬২২,২৬২৩,২৬২৪,ই
ফা)
======# কবর জিয়ারত:
হযরত আয়েশা রা. বলেন, একরাতে আমি রাসূল স.কে
বিছানায় পেলাম না। তাই (খোজার উদ্দেশ্যে) বের হলাম।
তখন দেখতে পেলাম,তিনি জান্নাতুল বাকীতে আছেন।
আমাকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, তুমি কি এ আশঙ্কা
করছো যে, আল্লাহ এবং তার রাসূল তোমার প্রতি অবিচার
করবেন ? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল ! আমি ধারণা
করছিলাম, আপনি আপনার অন্য স্ত্রীর ঘরে তাশরীফ
নিয়েছেন। রাসূল স. বলেন শাবানের পনের তারিখ রাতে
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং ‘বনু
কালব’ গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক
লোককে মাফ করে দেন। (তিরমিযী শরীফ: ১/১৫৬)
░▒▓█►হাদীসটির ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের অভিমত
ইবনে হিবক্ষান র. আয়েশা রা. এর হাদীসটিকে হাসান
বলেছেন। (শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুনিয়্যাহ: ৭/৪৪১
প্রশ্নঃ শাবানের মধ্যরাত্রি উদযাপন করা যাবে কিনা?
উত্তরঃ শাবানের মধ্যরাত্রি পালন করার কি হুকুম এ নিয়ে
আলেমদের মধ্যে ২টি মত রয়েছে:
সম্মিলিত ইবাদত:
এক. শা‘বানের মধ্য রাত্রিতে মাসজিদে জামাতের সাথে
নামায ও অন্যান্য ইবাদত করা জায়েয । প্রসিদ্ধ তাবেয়ী
খালেদ ইবনে মি‘দান, লুকমান ইবনে আমের সুন্দর পোশাক
পরে, আতর খোশবু, শুরমা মেখে মাসজিদে গিয়ে মানুষদের
নিয়ে এ রাত্রিতে নামায আদায় করতেন। এ মতটি ইমাম
ইসহাক ইবনে রাহওয়ীয়াহ থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
(লাতায়েফুল মা‘আরেফ পৃঃ১৪৪)।
একক ইবাদত:
দুই. শা‘বানের মধ্যরাত্রিতে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত
বন্দেগী করা জায়েয। ইমাম আওযা‘য়ী, ইবনে তাইমিয়া,
এবং আল্লামা ইবনে রজব (রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম) এ মত
পোষণ করেন। তাদের মতের পক্ষে তারা যে সমস্ত হাদীস
দ্বারা এ রাত্রির ফযীলত বর্ণিত হয়েছে সে সমস্ত সাধারণ
হাদীসের উপর ভিত্তি করে ব্যক্তিগতভাবে ইবাদত করাকে
জায়েয মনে করেন।
শবে বরাতে তাবেয়ীগণের আমলঃ
তাবেয়ী কারাঃ
তাবেয়ী হচ্ছেন তারা যারা রাসূলে পাক (সাঃ) এর
সাক্ষাৎ লাভ করতে পারেননি তবে সাহাবায়ে কেরামের
সাক্ষাৎ লাভ করেছেন,তাদের নিকট থেকে তালীম গ্রহণ
করেছেন এবং তাদের আদর্শ অনুসরণ করেছেন।
তাবেয়ীগণ শবে বরাতে ইবাদাতে মশগুল থাকতেন।
তারা এ রাত উপলক্ষে যা করতেনঃ
১। নতুন কাপড় পরিধান করতেন ২।
চোখে সুরমা লাগাতেন
৩।সারা রাত মসজিদে অবস্থান করে ইবাদাতে কাটিয়ে
দিতেন।
হাম্বলী মাযহাবের বিশ্বখ্যাত ইমাম ইবনু রাজাব
হাম্বলীর লিখিত লাতাইফুল মাআরিফ, পেইজ নং ২৬৩
তাবেয়ীগণের যারা এমন আমল করতেন, তাদের কয়েকজনের
নাম উল্লেখ করছি।– খালিদ বিন মা’দান (রাঃ)- তিনি
শাম প্রদেশের ইমাম ছিলেন। তিনি সাহাবায়ে কেরামের
মহান চ্রিত্রের বর্ণনা করতেন। যেসকল সাহাবায়ে কেরাম
থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁরা হলেন- ছাওবান,
আবু উমামাহ, মুয়াবিয়া, আবু হুরায়রা, মিকদাম,ইবনু
উমার,উতবাহ,ইবনু আমর, জুবাইর বিন নুফাইর, হুজর বিন হুজর,
রাবীয়াহ,খিয়ার বিন সালামাহ,ইবনু আবী হিলাল,আমর
বিন আসওয়াদ,কাসীর বিন মুররাহ, আবু বাহরিইয়্যাহ প্রমুখ।
সুত্রঃ সিয়ারু আলামীন নুবালা, আত তাবাকাতুছ ছানিয়াহ
তিনি এমন নির্ভরযোগ্য ইমাম যে ইমাম বুখারী (রা) তাঁর
থেকে বর্ণিত হাদীস সংকলন করেছেন। দেখুন- সহীহ
বুখারী,কিতাবুল জিহাদি ওয়াস সিয়ারি-২৭৬৬
মাকহুল(রা)- ইমাম মাকহুল(রা) সম্পর্কে ইমাম যুহরি
বলেন,সারা দুনিয়ায় আলেম হলেন চারজন- মদিনা শরীফে
সায়ীদ বিন মুসায়্যিব,কুফা নগরীতে শাবী, বসরা নগরীতে
হাসান বসরী এবং শাম প্রদেশে মাকহুল(রা)। তিনি
ছিলেন শামের সবচেয়ে বড় ফকীহ। সুত্রঃ সিয়ারু আলামীন
নুবালা, আত তাবাকাতুছ ছানিয়াহ তাদের সাথে আরো
অনেকে সারা রাত মসজিদে অবস্থান করে ইবাদাতে
কাটিয়ে দিতেন। শবে বরাত উপলক্ষে মসজিদে যাওয়া,নফল
ইবাদাত করা হচ্ছে সালফে সালেহীনের অনুসরণ করা।
করণীয়:-
*কুরআন তেলোয়াত করা
*গোসল করা
*মা-বাবা থেকে ক্ষমা চাওয়া
*দান সদকা করা।(গরীব দু:খী কে,মাজারে নয় )
*পরিবারের জন্য সতদার নিয়তে ভালো খাবারের ব্যবস্তা
করা।
*গরীব দু:খী মানুষকে খাওয়ানো
ইত্যাদি…
বর্জনীয়:
এ রাতে একটি কুসংস্কার হল আতশবাজি। এটা এমন
একটি বাজে কাজ, যাতে দুনিয়ার ফায়দাও নেই,
আখিরাতেও ফায়দা নেই। আছে কেবল অপচয়,
অপব্যয়, পাপ, আরও আছে বিধর্মী, অগ্নিপূজকদের
অনুকরণ। এই বরকতময় রাতে আল্লাহ এবং তাঁর
ফিরিশতাগণ দুনিয়াবাসীদের প্রতি রহমত বিতরণ
করতে তশরীফ আনেন। বান্দাগণকে দান গ্রহণের জন্য
অবিরত আহবান করতে থাকেন। আমাদের ছেলে-
মেয়েরা আল্লাহ্র তাজাল্লী, নূর ও রহমতের অংশ
নেওয়া, তাঁর দান গ্রহণ, তাঁর নূরে নূরানী হওয়ার
পরিবর্তে আতশবাজীর দ্বারা তার প্রতি পরিহাস ও
বিদ্রূপ প্রদর্শন করছে, এই অবস্থা কি সঙ্গত?
এটা রোধ করার কোন দায়িত্ব কি অভিভাবকগণের
স্কন্ধে নেই। একদিকে ইবাদত অন্যদিকে পরিহাস!
দুটি এক সঙ্গে চলতে দেয়া কি উচিত?
আরো একটি কুসংস্কার হল আলোকসজ্জা করা।
প্রয়োজনাতিরিক্ত বাতি জ্বালানো শরীয়তের
দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। এটা অপচয়ও বটে। আল
মুফতীতে বলা হয়েছে যে, এটা দূষণীয়।

image

আপত্তি নং-১
– আলী (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত
হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ
করেছেনঃ “১৫ শা’বানের রাতে তোমরা
বেশী বেশী করে ইবাদত কর, এবং দিনের
বেলায় রোযা রাখ। এ রাতে আল্লাহ
তা’আলা সূর্যাস্তের সাথে সাথেই
দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং
বলতে থাকেনঃ ‘কে আছ আমার কাছে
গুনাহ মাফ চাইতে? আমি তাকে মাফ
করতে প্রস্তুত। কে আছ রিযক চাইতে?
আমি তাকে রিযক দিতে প্রস্তুত। কে
আছ বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে
বিপদমুক্ত করতে প্রস্তুত। কে আছ …’
এভাবে (বিভিন্ন প্রয়োজনের নাম
নিয়ে) ডাকা হতে থাকে সুবহে
সাদেক পর্যন্ত”। (ইবনে মাজাহ কর্তৃক
হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে)।
এ হাদিসটি যে আদৌ সহীহ নয়, সে
ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে
প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ইমাম হাফেজ
শিহাব উদ্দিন তাঁর যাওয়ায়েদে
ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেন,
হাদিসটির সনদ যইফ (দুর্বল), কারণ
হাদিসটির সনদের মাঝখানে আবু বকর বিন
আবু সাবরা নামে একজন রাবী
(বর্ণনাকারী) অনির্ভরযোগ্য। এমনকি
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং প্রখ্যাত
হাদিস বিশারদ ইবনু মাইন তার ব্যাপারে
মন্তব্য করেছেনঃ “লোকটি মিথ্যা
হাদিস রচনা করে থাকে।” (দেখুনঃ
সুনান ইবনে মাজাহ, মন্তব্য ও
সম্পাদনাঃ মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল
বারী, পৃষ্ঠা ৪৪৪)।
জবাব:- হাদিসটির তাহকীক/ পাবেন এই লিন্কে-১ https://
islamicdefination.wordpress.com/2015/05/29/শবে-বরাত-এর-
হাদিস-নিয়ে-লাম/
লিন্ক-২

set=a.105319336323036.6436.100005349094333&type=1&theater
২. আয়েশা (রাঃ)-এর বরাত দিয়ে
বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেনঃ “আমি
এক রাতে দেখতে পাই যে,
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার পাশে নেই।
আমি উনার সন্ধানে বের হলাম। দেখি
যে তিনি জান্নাতুল বাকী (কবর
স্থানে)অবস্থান করছেন।
ঊর্ধ্বাকাশপানে তাঁর মস্তক
ফেরানো। আমাকে দেখে বললেন,
‘আয়েশা, তুমি কি আশঙ্কা করেছিলে
যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)
তোমার প্রতি অবিচার করেছেন?’ আমি
বললাম, ‘এমন ধারণা করিনি, তবে মনে
করেছিলাম, আপনার অন্য কোন বিবির
সান্নিধ্যে গিয়েছেন কিনা।’
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘আল্লাহ
তা’আলা ১৫ই শা’বানের রাতে দুনিয়ার
আকাশে নেমে আসেন এবং কালব
গোত্রের সমুদয় বকরীর সকল পশমের
পরিমাণ মানুষকে মাফ করে
দেন।’” (তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)। ইমাম
তিরমিজি হাদিসটি বর্ণনা করে নিজেই
মন্তব্য করেছেনঃ আয়েশা (রাঃ)-এর
বরাত দিয়ে বর্ণিত এই হাদিসটি
হাজ্জাজ বিন আয়তাআহ্ ছাড়া আর
কেউ বর্ণনা করেছেন বলে জানা নেই।
ইমাম বোখারী বলেছেনঃ এ হাদিসটি
যইফ (দুর্বল)। হাজ্জাজ বিন আয়তাআহ্
বর্ণনা করেছেন ইয়াহ্ইয়া বিন আবি
কাসির থেকে। অথচ হাজ্জাজ
ইয়াহ্তইয়া থেকে আদৌ কোন হাদিস
শুনেননি। ইমাম বোখারী আরও
বলেছেনঃ এমনকি ইয়াহ্ইয়া বিন আবি
কাসিরও রাবী ওরওয়া থেকে আদৌ
কোন হাদিস শুনেননি। (দেখুনঃ
জামে’ তিরমিজী, সাওম অধ্যায়, মধ্য
শা’বানের রাত, পৃষ্ঠা ১৬৫-১৬৮)।
জবাব:- হাদিসটি তিরমীিজ ছাড়াও বায়হাকী শরীফে
সহীহ সনদে অন্য একটি সুত্র আছে এবং সনদটি সহিহ।
বিস্তারিত:- https://islamicdefination.wordpress.com
/2015/05/29/শবে-বরাত-এর-হাদিস-নিয়ে-লাম-2/
৩. আবু মুসা আশ’আরী (রাঃ) থেকে
বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন,
“১৫-ই শা’বানের রাতে আল্লাহ
তা’আলা নিচে নেমে আসেন এবং সকল
মানুষকেই মাফ করে দেন। তবে
মুশরিককে এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ
সৃষ্টিকারীকে মাফ করেন না” (ইবনে
মাজাহ)। এ হাদিসটির ব্যাপারে হাফেজ
শিহাব উদ্দিন তাঁর যাওয়ায়েদে
ইবনে মাজাহ গ্রন্থে উল্লেখ
করেনঃ এর সনদ যইফ (দুর্বল)। একজন রাবী
(বর্ণনাকারী) আব্দুল্লাহ বিন
লাহইয়াহ্ নির্ভরযোগ্য নন। আরেকজন
রাবী ওয়ালিদ বিন মুসলিম
তাফলীসকারী (সনদের মাধ্যে
হেরফের করেতে অভ্যস্ত) হিসেবে
পরিচিত।
প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আসসিন্দী
বলেছেনঃ আরেকজন রাবী আদদাহহাক
কখনও আবু মুসা থেকে হাদিস
শুনেননি। শবে বরাত সংক্রান্ত
বর্ণিত সবগুলো হাদিসের সনদের
মধ্যেই এ জাতীয় দুর্বলতা বিদ্যমান
থাকার কারণে একটি হাদিসও সহীহ’র
মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
জবাব:- https://islamicdefination.wordpress.com/2015/05/29/শব-
ই-বরাত-এর-হাদিস-নিয়ে-লাম/

শবে বরাত এর হাদিস নিয়ে লামাজহাবীদের আপত্তির জবাব- ২

হযরত আয়শো রা. বলনে, একরাতে আমি রাসূল স.কে বছিানায় পলোম না। তাই (খোজার উদ্দশ্যে)ে বরে হলাম। তখন দখেতে পলোম,তনিি জান্নাতুল বাকীতে আছনে। আমাকে দখেে তনিি বলে উঠলনে, তুমি কি এ আশঙ্কা করছো যে, আল্লাহ এবং তার রাসূল তোমার প্রতি অবচিার করবনে ? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল ! আমি ধারণা করছলিাম, আপনি আপনার অন্য স্ত্রীর ঘরে তাশরীফ নযি়ছেনে। রাসূল দঃ বলনে শাবানরে পনরে তারখি রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনযি়ার আসমানে অবতরণ করনে এবং ‘বনু কালব’ গোত্ররে ভডে়ার পশমরে চযে়ওে অধকি সংখ্যক লোককে মাফ করে দেন। (তিরমিযী শরীফ: ১/১৫৬)
সনদ পর্যালোচনা
░▒▓█►হাদীসটরি ব্যাপারে মুহাদ্দসিদরে অভমিত
ইবনে হিব্বান র. আয়শো রা. এর হাদীসটকিে হাসান বলছেনে। (শরহুল মাওয়াহবিলি লাদুনযি়্যাহ: ৭/৪৪১

আল্লামা ইমাম মুনযিরী () “তারগীব” গ্রন্থে এবং আহলে হাদীসের অন্যতম আলেম মোবারকপুরী উক্ত হাদিস সম্পর্কে বলেন,
اخرجه البزار و البيهقى با اسناد لا بأس به كذا فى ترغيب و الترهيب للمنذرى في باب الترهيب من الهاجر- تحفة الاحوذي, باب: ما جاء النصف من الشعبان:৪৪০/৩ –الرقم: ৭৩৬
-‘‘উক্ত হাদিসটি ইমাম বায্যার () ও ইমাম বায়হাকী () বর্ণনা করেছেন। উক্ত সনদটিلا بأس به অর্থাৎ- উক্ত হাদীসের সনদে কোন অসুবিধা নেই। অনুরূপ বলেছেন ইমাম মুনযির () স্বীয় ‘তারগীব ওয়াত তারহীব’ গ্রন্থে।’’’
অপরদিকে ইমাম তিরমিযী উক্ত হাদিসটি বর্ণনার পর বলেন,
و قال ابو عيسى الترمذى: و في الباب عن ابى بكر الصديق-
-‘‘ইমাম তিরমিযী () বলেন, এ পরিচ্ছেদে (এ বিষয়ে) হযরত আবু বকর () হতে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।’’
হযরত আয়েশা () এর উক্ত হাদিস প্রসঙ্গে মোবারকপুরী আরো বলেন,
رواه البيهقى و قال: هذا مرسل جيد: تحفة الاحوذى: ৪৪১/৩
-‘‘উক্ত হাদিসটি ইমাম বায়হাকী ()ও একটি সনদে বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হাকী () বলেন, উক্ত হাদিসটি মুরসাল, তবে শক্তিশালী সনদ।’’ আল্লামা ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ুতী () বলেন, هذا حديث حسن-‘‘উক্ত হাদিসটি সনদের দিক দিয়ে হাসান পর্যায়ের।’
পরিশেষে বলতে চাই, যেহেতু উক্ত হাদিসটি হক্কানী মুহাদ্দিসগণ গ্রহণযোগ্য বলেছেন, সেহেতু আহলে হাদিস আলবানীর যঈফ বালার কোন ভিত্তি নেই।

আপত্তিঃ৩
আবু মূসা আল আশ’আরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ‘আল্লাহ তা‘আলা শাবানের মধ্যরাত্রিতে আগমণ করে, মুশরিক ও ঝগড়ায় লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যতীত, তাঁর সমস্ত সৃষ্টিজগতকে ক্ষমা করে দেন। হাদীসটি ইমাম ইবনে মাজাহ তার সুনানে (১/৪৫৫, হাদীস নং ১৩৯০),এবং তাবরানী তার মু’জামুল কাবীর (২০/১০৭,১০৮) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
░▒▓█► আল্লামা বূছীরি বলেন: ইবনে মাজাহ বর্ণিত হাদীসটির সনদ দুর্বল। তাবরানী বর্ণিত হাদীস সম্পর্কে আল্লামা হাইসামী (রাহমাতুল্লাহি আলাইহি) মাজমা‘ আয যাওয়ায়েদ (৮/৬৫) গ্রন্থে বলেনঃ ত্বাবরানী বর্ণিত হাদীসটির সনদের সমস্ত বর্ণনাকারী শক্তিশালী। হাদীসটি ইবনে হিব্বানও তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে দেখুন, মাওয়ারেদুজ জাম‘আন, হাদীস নং (১৯৮০), পৃঃ (৪৮৬)।
আহলে হাদীসের অন্যতম আলেম মোবারকপুরী ইমাম মুনযিরের সূত্রে উক্ত হাদিস সম্পর্কে বলেন,
رواه ابن ماجه من حديث ابي موسى الاشعرى باسناد لا بأس به
-‘‘ইমাম মুনযির বলেন, উক্ত হাদিসটি ইমাম ইবনে মাযাহ হযরত আবু মুসা আশআরী () হতে বর্ণনা করেন। উক্ত হাদীসের সনদটি لا بأس به অর্থাৎ- তার মধ্যে কোন অসুবিধা নেই।’’
অপরদিকে ইবনে মাযাহ আরেকটি সূত্র আছে বলে উল্লেখ করেছেন।
ক. মোবারকপুরী : তুহফাতুল আহওয়াজী : ৩/৪৪১ পৃ.
খ. ইমাম ইবনে মুনযিরী : আত-তারগীব ওয়াত তারহীব : ৪/২৪০ পৃ.

Advertisements

তাসাউফ অর্জন ও বাইআত গ্রহণ

Standard

আলহাজ্ব মুফতী গাজী সাইয়্যেদ মুহাম্মদ সাকীউল কাউছার (মা:)
(ডাবল টাইটেল ফার্স্ট ক্লাস-বিএ)
নায়েব-ই সাজ্জাদানশীন, ঘিলাতলা দরবার শরীফ, কুমিল্লা।
 
ইসলামে তাসাউফ তথা শরীয়তের পাশাপাশি তরীকত হাকীকত ও মারেফাত অর্জন এবং সে জন্য পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত গ্রহণ একটি অত্যাবশকীয় বিষয় যা কোরআন হাদীছ ইজমা ও ক্বিয়াস দ্বারা সাব্যস্ত।

এ প্রসঙ্গে প্রথমে আমি মহান কোরআনুল কারীমের আয়াত শরীফ উল্লেখ করছি। আল্লাহ পাক বলেন –

لقد من الله على المؤمنين اذ بعث فيهم رسولا من انفسهم يتلوا عليهم أيته يزكيهم و يعلمهم الكتب والحكمة و ان كانوا من قبل لفى ضلل مبين-

(লাকাদ মান্নাল্লাহু আলাল মু’মিনীনা ইঁজ বা’আছা ফীহিম রাছুলাম মিন আনফুছিহিম ইয়াতলু আলাইহিম আ-ইয়াতিহী ওয়া ইয়ূজাক্কিহিম ওয়া ইয়ূ আল্লীমুহুমুল কিতাবা ওয়াল হিকমাহ ওয়া ইন কানু মিন কাবলু লাফী দ্বালা-লিম মুবীন)।

অর্থাৎ, মু’মিনদের প্রতি আল্লাহ পাকের বড়ই ইহসান যে তাদের মধ্যে হতে তাদের জন্য একজন রসূল প্রেরণ করেছেন, তিনি আল্লাহ পাকের আয়াতগুলো তেলায়াত করে শুনাবেন, তাদেরকে তাজকিয়া (পরিশুদ্ধ) করবেন এবং কিতাব ও হিকমত (আধ্যাত্মিক) জ্ঞান শিক্ষা দিবেন। যদিও তারা পূর্বে হেদায়েত প্রাপ্ত ছিল না। (সূরা আল এমরান, আয়াত-১৬৪)

অনুরূপভাবে, সুরা বাকারা’র ১২৯ ও ১৫১ নং আয়াত শরীফে উপরোক্ত আয়াত শরীফের সমার্থবোধক আয়াতে কারীমার উল্লেখ আছে। মূলতঃ উল্লেখিত আয়াত শরীফে বিশেষভাবে চারটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে: তন্মধ্যে আয়াত শরীফ তেলাওয়াত করে শুনানো এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়া, এ তিনটি বিষয় হচ্ছে এলমে জাহির বা ইলমে ফিকাহ এবং ইলমে মারেফতের অন্তর্ভুক্ত। যা এবাদাতে জাহের বা দ্বীনের যাবতীয় বাহ্যিক হুকুম আহকাম পালন করার জন্য ও দৈনন্দিন জীবন যাপনে হালাল কামাই করার জন্য প্রয়োজন। আর চতুর্থ হচ্ছে তাজকিয়ায়ে “ক্বলব”, অর্থাৎ, অন্তর পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি লাভ করা। মুফাসসিরীনে কিরামগণ “ইউযাক্কীহিম”-এর ব্যাখ্যায় প্রসিদ্ধ তাফসীরের কিতাব, যেমন তাফসীরে জালালাইন-কামালাইন, বায়হাকী, ইবনে কাছীর, রুহুল বয়ান, তাফসীরে মাযহারী, মা’রেফুল কোরআন-সহ আরও অনেক তাফসীরে তাজকিয়ায়ে ক্বলব বা অন্তঃকরণ পরিশুদ্ধ করাকে ফরজ বলেছেন এবং তজ্জন্যে এলমে তাসাউফ অর্জন করাও ফরজ বলেছেন। এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত মুফাসসিরে ফকিহুল উম্মত হযরত মাওলানা শায়খ ছানাউল্লাহ পানি পথি (রহ:) তাঁর বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীরে মাযহারী’-তে উল্লেখ করেন, যে সকল লোক ইলমে লা-দুন্নী বা ইলমে তাছাউফ হাছিল করেন তাঁদেরকে সূফি বলে। তিনি ইলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ আইন বলেছেন। কেননা, ইলমে তাছাউফ মনকে বা অন্তঃকরণকে গায়রুল্লাহ হতে ফিরিয়ে আল্লাহ পাকের দিকে রুজু করে দেয়। সর্বদা আল্লাহ পাকের হুজুরী পয়দা করে দেয় এবং ক্বলব্ বা মন থেকে বদ খাছলত-সমূহ দূর করে নেক খাছলত-সমূহ পয়দা করে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে দেয়।

আত্মশুদ্ধি অর্জনের জন্য ইলমে তাসাউফ যে ফরজ, এ প্রসঙ্গে আফজালুল মুফাসসিরীন আল্লামা হযরত ইসমাঈল হাক্কি (রহ:) তাঁর ‘তাফসীরে রুহুল বয়ানে’ উল্লেখ করেন যে, দ্বিতীয় প্রকার ইলম হচ্ছে ইলমে তাছাউফ যা ক্বলব বা অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট। এ ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মু’মিনের জন্য ফরজ।

এলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ হওয়া সম্পর্কে ‘জামিউল উসুল’ নামক কিতাবে উল্লেখ আছে যে, এলমে তাছাউফ বদ খাছলত-সমূহ হতে নাজাত বা মুক্তি পাওয়ার একমাত্র মাধ্যম। পক্ষান্তরে, আল্লাহ-প্রাপ্তি, রিপু বিনাশ ও সংযম শিক্ষার একমাত্র পথও। এই জন্য ইলমে তাছাউফ শিক্ষা করা ফরজে আইন।

মূলতঃ শরীয়ত, তরীকত, হাকীকত ও মারেফত, এ সবের প্রত্যেকটি-ই কোরআন সুন্নাহসম্মত এবং তা মানা ও বিশ্বাস করে কার্যে পরিণত করা কোরআন-সুন্নাহ’র-ই নির্দেশের অর্ন্তভুক্ত।

আল্লাহপাক তাঁর কালাম পাকে এরশাদ করেন –

لكل جعلنا منكم شرعة و منهاجا “লি-কুল্লিন-জ্বায়াল না মিনকুম শির’আতাউ ওয়া মিনহাজ”।

অর্থাৎ, আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি জীবন বিধান বা শরীয়ত, অপরটি তরীকত-সম্পর্কিত বিশেষ পথ নির্ধারণ করে দিয়েছি। (সূরা মাইয়িদা, আয়াত ৪৮)

আল্লাহ পাক তাঁর কালাম পাকে আরও এরশাদ করেন –

و ان لواستقاموا على الطريقة- (ওয়া আল লাওয়িস্তেকামু আলাত তারীকাতে- সূরা জ্বিন আয়াত ১৬)

অর্থাৎ, তারা যদি তরীকতে (সঠিক পথে) কায়েম থাকতো। অতএব, তরীকত শব্দটি কোরআন শরীফে রয়েছে।

আর হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে –

الشَّريةٌ شَجرَةٌ وَ الطَّرِيقَةُ اَغصَانُهَا وَ المَعرِفَةُ اَورَقُهَا وَ الحَقِيقَةُ ثَمَرُهَا –

অর্থাৎ, শরীয়ত একটি বৃক্ষস্বরূপ, তরীকত তার শাখা প্রশাখা, মারেফাত তার পাতা এবং হাকীকত তার ফল । (সিসরুল আসরার)

হাদীস শরীফে আরও এরশাদ হয়েছে –

اَلشَّرِيعَةُ اَقوَالِى وَ الطَّرِقَةُ اَفعَالِى وَالحَقِيقَةُ اَحوَالِى وَالمَعرِيفَةُ اَسرَارِى-

অর্থাৎ, শরীয়ত হলো আমার কথাসমূহ (আদেশ-নিষেধ), তরীকত হলো আমার কাজসমূহ (আমল), হাকীকত হলো আমার গুপ্ত রহস্য। (ফেরদাউস)

উল্লেখ্য যে, উক্ত শিক্ষা বা এলমে তাছাউফ অর্জন করার ও এছলাহে নাফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে এমন কোনো কামেলে-মোকাম্মেল পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হওয়া, যিনি ফয়েজ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। এখন প্রশ্ন হলো, এছলাহে নাফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করা যদি ফরজ হয়, আর তা লাভ করার মাধ্যম বাইয়া’ত হয়, তবে বাইয়া’ত হওয়া নাজায়েজ হয় কী করে?

তরীকত যথাযথভাবে পালন করতে হলে দ্বীনী এলেম অর্জন করতে হবে যা ফরজ। এই এলেম দু’প্রকার- ১) ইলমে ফিকাহ, ২) ইলমে তাছাউফ।

ইলমে ফিকাহ: ইলমে ফিকাহ দ্বারা এবাদাতে জাহেরা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ হয়। ইলমে তাছাউফ-এর দ্বারা এবাদাতে বাতেন বা অভ্যন্তরীন অবস্থা পরিশুদ্ধ হয়ে ইখলাছ অর্জিত হয়। এ মর্মে হাদীছ শরীফে এরশাদ হয়েছে –

عن الحسن رضى الله عنه قال العلم علمان فعلم فى القلب فذاك العلم النافع و علم على للسان فذالك حجة الله غز و جل على ابن ادم-

(আনিল হাসান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ক্বালা আল এলমু এলমানে ইলমু ফিল ক্বালবে ফাজাকাল ইলমুন নাফেউ ওয়া ইলমুল আলাল লেছানি ফাজাকা হুজ্জাতুল্লাহে আলা এবনে আদামা)। অর্থাৎ, এলেম দু’প্রকার (১) ক্বালবী এলেম। এটা হলো উপকারী এলেম। (২) লিসানী বা জবানী এলেম। এটা হলো আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে আদম সন্তানদের প্রতি দলীলস্বরূপ। (মিশকাত শরীফ)

আর এ হাদীসের ব্যাখ্যায় মালিকী মজহাবের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম, ইমামুল আইম্মা রঈসুল মুহাদ্দিসীন ফখরুল ফুকাহা শায়খুল উলামা হযরত ইমাম মালিক (রহঃ) বলেন –

مَن تَفَقَّهَ وَ لَم يَتَصَوَّفَ فَقَد تَفَسَّقَ وَ مَن تَصَوَّفَ وَ لَم يَتَفَقَّهَ فَقَد تَزَندَقَ وَ مَن جَمَعَ بَينَهُمَا فَقَد تَحضقَّقَ-

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি এলেম ফিকাহ (জবানী এলেম) অর্জন করলো, কিন্তু এলেম তাছাউফ (ক্বালবী) এলেম অর্জন করলো না, সে ব্যক্তি ফাসিক। আর যে ব্যক্তি ইলমে তাছাউফের দাবি করে, কিন্তু শরীয়ত স্বীকার করেনা, সে ব্যক্তি যিন্দীক (কাফের); আর যে ব্যক্তি উভয় প্রকার এলেম অর্জন করলো সে ব্যক্তি মুহাক্কিক তথা মু’মিনে কামেল। (মিরকাত, কিতাবুল ইলম)

অর্থাৎ, এলমে ফিকাহ ও এলমে তাছাউফ উভয় প্রকার এলেম অর্জন করে দ্বীনের ওপর সঠিকভাবে চলার চেষ্টা করা প্রত্যেকের জন্য ফরজ। বর্তমান মুসলমানের কাছে আসল সত্য জিনিস বা শিক্ষা না থাকাতে মানুষ প্রকৃত মু’মিন হতে পারছে না। কেবল মাত্র ক্বলব নামের অমূল্য রত্নটা হস্তগত করতে জীবনের সব সময়ই চলে যায়, তবে মানুষ খাঁটি ঈমানদার হবে কবে। এ জন্য আমরা চিন্তা ফিকির করি না। তরীকতের এমন সরল সহজ পথ অবলম্বন করা দরকার যাতে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে উক্ত নেয়ামত পেতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য যে, উক্ত নেয়ামত বা এলমে তাছাউফ অর্জন করার ও এছলাহে নফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে কোনো কামেলে-মোকাম্মেল পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হওয়া। এখন প্রশ্ন হলো তাজকিয়ায়ে নাফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করা যদি ফরজ হয়, আর তা লাভ করার মাধ্যম বাইয়া’ত হয়, তবে বাইয়া’ত হওয়া নাজায়েজ হয় কী করে? কেননা উছুল-ই রয়েছে যে আমলের দ্বারা ফরজ পূর্ণ হয় এবং সেই ফরজকে পূর্ণ করার জন্য সে আমল করাও ফরজ। উদাহরণ দিলে বুঝতে পারবেন: যেমন এ প্রসঙ্গে “দুররুল মুখতার” কিতাবে উল্লেখ আছে, যে আমল ব্যতিরেকে ফরজ পূর্ণ হয় না বা আদায় হয় না, সে ফরজ আদায় করার জন্য সে আমলটাও ফরজ। যেমন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নামাজ আদায় করা ফরজ। আর এ নামাজ আদায় হওয়ার একটি শর্ত হচ্ছে পবিত্রতা অর্জন করা, অর্থাৎ, ওজু। যখন কেউ নামাজ আদায় করবে, তখনই তার জন্য ওযু করা ফরজ হয়ে যাবে। যেহেতু ওজু ছাড়া নামাজ হবে না, ঠিক তদ্রুপ-ই এলমে তাছাউফ অর্জন করা ফরজ। আর বাইয়া’ত হওয়াও ফরজ। আর হাদীস শরীফের ভাষায় এ ধরণের ফরজকে অতিরিক্ত ফরজ বলে গণ্য করা হয়েছে। কাজেই উক্ত হাদিসে বর্ণিত অতিরিক্ত ফরজের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে মাজহাব মানা, বাইয়া’ত হওয়া ইত্যাদি।

বস্তুতঃ পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হতে হবে। এটা মহান আল্লাহ পাকের কালামে অসংখ্য আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত। যদি এখন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহাজ্ঞানী ব্যক্তিবর্গগণ নিজেদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখার জন্য না মানেন, তবে কার কী বলার আছে। তাদেরকে যতোই বোঝানো হউক না কেন, কিছুতেই তারা বোঝার চেষ্টা করবে না; বা বুঝতে সক্ষম হয় না। তাদের ক্বালবে সীলমোহর মারা আছে।

সূফীকুল শিরোমনি আল্লামা জালাল উদ্দিন রুমী (রহ:) বলেন –

‘ইলমে জাহের হাম চুঁ মসকা, ইলমে বাতেন হাম চুঁ শীর
কায় বুয়াদে বে শীরে মসকা, কায় বুয়াদে বেপীরে পীর’।

অর্থাৎ, ইলমে জাহের জানো দুধের মেছাল (উপমা), আর বাতেন জানো মাখনের মেছাল, দুধ ছাড়া মাখন কীভাবে হয় আর পীরের আনুগত্য ছাড়া পীর কীভাবে হয়। (মসনবী শরীফ)

এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তাঁর পবিত্র কালামে এরশাদ করেন –

ﻳَﺎ ﺃَﻳُّﻬَﺎ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁَﻣَﻨُﻮﺍ ﺍﺗَّﻘُﻮﺍ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﻛُﻮﻧُﻮﺍ ﻣَﻊَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ

(ইয়া আইয়্যুহাল্লাজীনা আ-মানুত্তাক্কুলা ওয়া কুনু মা’আছ্ছাদিকীন)।

অর্থাৎ, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ পাককে ভয় করো, আর ছাদেকীনদের সঙ্গী হও” (সূরা তওবা, আয়াত-১১৯)। এ আয়াত পাকে আল্লাহ পাক মূলতঃ পীর-মাশায়েখগণের সঙ্গী বা সোহবত এখতিয়ার করার কথা বলেছেন। কারণ হক্কানী মুর্শিদগণ-ই হাকীকি ছাদেকীন।

আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা’আলা কোরআন শরীফের প্রথম সূরাতেই শিখিয়ে দিচ্ছেন –

ﺍﻫْﺪِﻧَﺎ ﺍﻟﺼِّﺮَﺍﻁَ ﺍﻟْﻤُﺴْﺘَﻘِﻴﻢَ ﺻِﺮَﺍﻁَ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻤْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ

অর্থাৎ, আমাদের সরল সঠিক পথ [সীরাতে মুস্তাকিম] দেখাও। তাঁদের পথ যাঁদেরকে তুমি নিয়া’মত দান করেছো। {সূরা ফাতিহা, ৬-৭}

সূরায়ে ফাতিহায় মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দারা যে পথে চলেছেন, সেটাকে সাব্যস্ত করেছেন সীরাতে মুস্তাকিম।

আর তাঁর নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দারা হলেন –

ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺃَﻧْﻌَﻢَ ﺍﻟﻠَّﻪُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺼِّﺪِّﻳﻘِﻴﻦَ ﻭَﺍﻟﺸُّﻬَﺪَﺍﺀِ ﻭَﺍﻟﺼَّﺎﻟِﺤِﻴﻦَ

অর্থাৎ, যাদের ওপর আল্লাহ তা’আলা নিয়ামত দিয়েছেন, তাঁরা হলেন নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও নেককার বান্দাগণ। {সূরা নিসা, ৬৯}

এ দু’আয়াত একথাই প্রমাণ করছে যে, নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দা হলেন নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ, আর নেককারগণ তথা আল্লাহ’র অলীগণ।যাঁদের শানে আল্লাহ্‌ নিজেই ঘোষণা দেন –

ألاَ اِنَّ اَولِياَء اللهِ لاَ خَوفٌ عَلَيهِم وَلَاهُم يَحزَنُون-

অর্থাৎ, সাবধান! নিশ্চয়ই আল্লাহ’র অলী বা বন্ধুগণের কোনো ভয় নেই এবং তাঁদের কোনো চিন্তা-পেরেশানী নেই। (সূরা ইউনূস, ৬২)

আর ওই সকল প্রিয় বান্দাদের পথ-ই সরল সঠিক তথা সীরাতে মুস্তাকিম। অর্থাৎ, তাঁদের অনুসরণ করলেই সীরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলা হয়ে যাবে। যেহেতু আমরা নবী দেখিনি, দেখিনি সিদ্দীকগণও, দেখিনি শহীদদের। তাই আমাদের সাধারণ মানুষদের কুরআন সুন্নাহ থেকে বের করে সীরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলার চেয়ে একজন পূর্ণ শরীয়ত-তরীকতপন্থী হক্কানী বুযুর্গের অনুসরণ করার দ্বারা সীরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলাটা হবে সবচেয়ে সহজ। আর একজন শরীয়ত সম্পর্কে প্রাজ্ঞ আল্লাহ ওয়ালা ব্যক্তির সাহচর্য গ্রহণ করার নাম-ই হল পীর-মুরিদী বা তাসাউফ অর্জন ও বাইয়া’ত গ্রহণ।

আল্লাহ পাক তাঁর পাক কালামে আরো এরশাদ করেন —

يا ايها الذين امنوا وابتغوا اليه الوسيلةَ وَ جَاهِدُوا فِى سَبِيلِهَ لَعَلَّكُم تُفلِحُون-

(ইয়া আইয়্যূলহাল্লাজীনা আ-মানুত্তা কুল্লাহা অবতাগু ইলাইহিল অছিলাতা অ জ্বা-হিদু ফি ছাবিলিহী লা’আল্লাকুম তুফলিহুন)। অর্থাৎ, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহপাককে ভয় করো, আর তাঁর সন্তষ্টি লাভের জন্য উছিলা গ্রহণ করো (সুরা মায়িদা, আয়াত-৩৫)।

মুফাসসিরীনগণ বলেন, উল্লেখিত আয়াত শরীফে বর্ণিত উছিলা দ্বারা তরীকতের মাশায়েখগণকে বোঝানো হয়েছে। যেমন তাফসীরে রুহুল বয়ানে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে -‘আল ওয়াসলু লা ইয়াহছিলু ইল্লা বিল উছিলাতে ওয়াহিয়া ওলামায়ে মুহাক্কেকীনা ওয়া মাশায়েখুত তরিকত’, অর্থাৎ, উক্ত আয়াতে উছিলা ছাড়া উদ্দেশ্যকে (আল্লাহ্‌কে) লাভ করা যাবেনা, আর সে উছিলা হলো মুহাক্কীক আলেম বা যিনি তরীকতের শায়খ বা পীর। যদিও অনেকে নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, দান সদকা, জিহাদ ইত্যাদিকে উছিলা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু হাকিকতে পীর-মাশায়েখগণই হচ্ছেন প্রধান ও শ্রেষ্ঠতম উছিলা। কারণ পীর-মাশায়েখগণের কাছে বাইয়া’ত হওয়া ছাড়া তাজকিয়া নাফস বা আত্মশুদ্ধি অর্জিত হয় না। আর আত্মশুদ্ধি ব্যতিরেকে নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ, তাবলীগ কোনো কিছুই আল্লাহ পাকের দরবারে কবুল হয় না বা নাজাতের উছিলা হয় না। তাই দেখা যাবে অনেক লোক নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, দান ছদকা, জিহাদ, তাবলীগ ইত্যাদি করেও এক লাফে জাহান্নামে যাবে। যেমন আল্লাহ পাক বলেন,فويل للمصلين (ফাওয়াইলুল্লিলমুছাল্লিন); অর্থাৎ, মুসুল্লীদের জন্য জাহান্নাম (সূরা মাউন, আয়াত-৭)। কোন মুসুল্লী জাহান্নামে যাবে – যে মুছল্লী তাজকিয়ায়ে নাফসের মাধ্যমে অন্তর থেকে রিয়া দূর করে “ইখলাছ” হাছেল করেনি, তাই সে মানুষকে দেখানোর জন্য নামাজ আদায় করছে। আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টির জন্য নামাজ আদায় করেনি। আল্লাহ বলেন, “আল্লাজিনা হুম ইউরা-উন”। অর্থাৎ, তারা ওই নামাজি যারা রিয়ার সহকারে নামাজ আদায় করেছে (সূরা-মাউন, আয়াত-৬)।
একটি হাদীছ শরীফ উল্লেখ করলাম যাতে আপনারা বুঝতে পারেন। মুসলিম শরীফের ছহীহ হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে কেয়ামতের দিন শহীদ, দানশীল ও দ্বীন প্রচারকারী আলেম, এ তিন প্রকার লোক থেকে কিছু লোককে সর্বপ্রথম জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে, যেহেতু তারা এখলাছের সাথে জিহাদ, তাবলীগ, দান ছদকা ইত্যাদি করেনি। যে সব আলেম বলে থাকে কোরআন শরীফে বর্ণিত উছিলা হচ্ছে নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, জিহাদ ইত্যাদি, তাদের কাছে আমার প্রশ্ন: তাহলে নামাজ আদায় করে জিহাদ করে ইলিয়াছি তাবলীগ করেও বান্দা জাহান্নামে যাবে কেন? কেনো উক্ত আমলসমূহ তার জন্য নাজাতের উছিলা হলো না? নিশ্চয়ই আপনারা বলবেন, তাদের এখলাছ ছিল না। কেন এখলাছ ছিল না? তারা কামেলে-মোকাম্মেল পীরের কাছে বাইয়া’ত হয়ে এলমে তাছাউফ আমলের মাধ্যমে তাজকিয়ায়ে নফস বা আত্মশুদ্ধি লাভ করে এখলাছ অর্জন করেনি। তাহলে বোঝা গেল, পীর-মাশায়খগণ হচ্ছেন প্রধান ও শ্রেষ্ঠতম উছিলা, তথা উছিলাসমূহের উছিলা। কারণ তাঁদের কাছে বাইয়া’ত হওয়ার উছিলাতেই এছলাহ লাভ হয়, এখলাছ অর্জিত হয়। যার ফলে নামাজ, রোজা, জিহাদ, দান খয়রাত ইত্যাদি কবুল হয় বা নাজাতের উছিলা হয়।

কামেল পীর-মুর্শিদের গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ পাক এরশাদ করেন –

من يهد الله فهو المهتد و منيضلل فلن تجد له وليا مرشدا-

(মাই ইয়াহদিল্লাহু ফাহুয়াল মুহতাদে ওয়ামাই ইয়ুদ্বলিল ফালান তাজিদালাহু ওলিইয়্যাম মুর্শেদা)

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি হেদায়েত চায় আল্লাহ পাক তাকে হেদায়ত দেন, আর যে ব্যক্তি গোমরাহীর মধ্যে দৃঢ় থাকে সে কখনও অলিয়ে কামেল মুর্শিদ খুঁজে পাবে না (সূরা-কাহাফ, আয়াত-১৭)। উক্ত আয়াত শরীফের দ্বারা মূলতঃ এটাই বোঝানো হয়েছে যে ব্যক্তি কোনো কামেল-মোকাম্মেল পীর সাহেবের কাছে বাইয়া’ত হয়নি, সে ব্যক্তি গোমরাহ।

আল্লাহ্‌ পাক আরও মুর্শিদের আনুগত্যের বিষয়ে এরশাদ করেন –

أَطِيعُوا الله وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِى الآَمرِ مِنكُم-

অর্থাৎ, আনুগত্য করো আল্লাহ’র, আনুগত্য করো রাসূলের এবং যারা তোমাদের মধ্যে হুকুমদাতা। (সূরা নিসা, আয়াত নং ৫৯)

উক্ত আয়াতে কারীমায় ‘ তোমাদের মধ্যে যারা হুকুমদাতা (উলিল আমর)’ দ্বারা শরীয়ত ও তরীকতের আলেমকে বোঝানো হয়েছে। এটাই বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য মত।

আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন- يوم ندعوا كل اناس بامامهم অর্থাৎ, সেই দিন আমি প্রত্যেক দলকে তাদের ইমামের (শায়খের) নামে আহ্বান করবো। (সূরা বনি ইসরাঈল)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে “আ’রায়েসুল বয়ান”-এ উল্লেখ রয়েছে, “ওয়া ইয়াদ’উল মুরীদিনা বে আসমায়ে মাশায়েখেহীম”। অর্থাৎ, হাশরের দিন প্রত্যেক মুরীদকে ডাকা হবে যার যার শায়খ বা পীরের নামে। তাই পীরের দলভুক্ত হয়ে আল্লাহ’র দরবারে হাজিরা দিতে হবে।

বাইয়াত

“বাইয়া’ত” শব্দের উৎপত্তি হয়েছে, “বাইয়ু’ন” শব্দ থেকে।“বাইয়ু’ন” শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে “ক্রয়-বিক্রয়”। এখানে এই “ক্রয়-বিক্রয়” মানে হচ্ছে আমার আমিত্বকে আল্লাহর রাহে রাসূল (দ:) বা নায়েবে রাসূলের কাছে কোরবান করে দিলাম, বিলীন করে দিলাম, বিক্রি করে দিলাম। আমার আমিত্ব, আমার যতো অহংকার আছে, অহমিকা আছে, আমি আমি যতো ভাব আছে, সমস্ত কিছু আল্লাহর রাসূল (দ:) বা নায়েবে রাসূলের কাছে আল্লাহর রাহে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করে দেয়া, কোরবান করে দেয়া, বিক্রি করে দেয়া, এবং পক্ষান্তরে, রাসূল (স:)-এর কাছ থেকে কোরআন সুন্নাহ-ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা খরিদ করে, সমস্ত উপাসনার মালিক আল্লাহ, এবাদতের মালিক আল্লাহ, কুল মখলুকাতের মালিক আল্লাহ, এই দৃঢ় ঈমানে ঈমানদার হয়ে যাওয়া, এটাকেই বলা হয় বাইয়াত বা “ক্রয়-বিক্রয়”।

আল্লাহ্‌ রাব্বুল ইজ্জত এরশাদ করেন –

آَ نَّ اللهَ اَشتَرَى مِنَ المُؤمِنِينَ اَنفُسَهُم وَ اَموَالَهُم بِاَنَّ لَهُمُ الجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِى سَبِيلِ اللهِ فَيَقتُلُونَ وَ يُقتَلُونَ وَعدَا عَلَيهِ حَقَّا فِى التَّورة وَالاِنجِيلِ وَالقُرأنِ وَ مَن اَوفى بِعَهدِهِ مِنَ اللهِ فَاستَبشِرُوا بِبَيعِكُمُ الَّذِى بَايَعتُمْ بِهِ وَ ذًالِكَ هُوَ الْفًوْزُ الْعَظِيمُ-

অর্থাৎ, নিশ্চয়ই আল্লাহ খরিদ করে নিয়েছেন মু’মিনদের থেকে তাদের জান ও মাল এর বিনিময়ে যে, অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। তারা যুদ্ধ করে আল্লাহর পথে, কখনও হত্যা করে এবং কখনও নিহত হয়। তাওরাত ও কুরআনে এ সম্পর্কে সত্য ওয়াদা রয়েছে। আল্লাহর চাইতে নিজের ওয়াদা অধিক পালনকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আনন্দ করো তোমাদের সে সওদার জন্য যা তোমরা তাঁর সাথে করেছ। আর তা হলো মহা সাফল্য। (তাওবা:১১১)

لَقَد رَضِىَ الله عَنِ المُؤمِنِينَ اِذ يُبَايِعُونَكَ تَحتَ الشَّجَرَةِ-

অর্থাৎ, হে রাসূল! আল্লাহ মু’মিনদের ওপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়া’ত হচ্ছিল। (সূরা ফাতহা : ১৮)

* যে ব্যক্তি তার ওয়াদা (প্রতিশ্রুতি) পূর্ণ করবে এবং তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করবে, সে আল্লাহ পাকের প্রিয়জন হবে। আর নিশ্চিতভাবে আল্লাহ পাক মুত্তাকীদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ৭৬)

o ﺇِﻥَّ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﻳُﺒَﺎﻳِﻌُﻮﻧَﻚَ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﻳُﺒَﺎﻳِﻌُﻮﻥَ ﺍﻟﻠَّﻪَ ﻳَﺪُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻓَﻮْﻕَ ﺃَﻳْﺪِﻳﻬِﻢْ

অর্থাৎ, হে রাসূল! যেসব লোক আপনার কাছে বাইয়া’ত হচ্ছিল, তারা আসলে আল্লাহর কাছেই বাইয়া’ত হচ্ছিল। তাদের হাতের ওপর আল্লাহর (কুদরতের) হাত ছিল। (সূরা ফাতহা-১০)

يَاايٌهَا النَّبِىٌّ اِذا جَاءَكَ المُؤمِنتِ ﻳُﺒَﺎﻳِﻌْﻧَﻚَ-

অর্থাৎ, হে রাসূল (দ:)! যে সকল মু’মিন মহিলারা আপনার কাছে বাইয়াত হওয়ার জন্য আসে (মুরিদ হওয়ার জন্য আসে), তাঁদেরকে আপনি বাইয়া’ত দান করুন। (সূরা মুমতাহানা: ১২)

হাদিছ শরীফে বর্ণিত আছে যে, হযরত আওফ বিন মালেক আশ’আরী (রা:) বলেন, আমরা ৯ জন কিংবা ৮ অথবা ৭ জন নবী করীম (দ:)-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। হযরত নবী করীম (দ:) বললেন, তোমরা কি আল্লাহর রাসূলের হাতে বাইয়া’ত হবে না? আমরা নিজ নিজ হাত প্রসারিত করে দিলাম এবং বললাম, হে আল্লাহ’র রাছুল (দ:) কোন বিষয়ের বাইয়া’ত হবো? নবী পাক (দ:) বললেন, এ বিষয়ের ওপর যে তোমরা আল্লাহ পাকের এবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কায়েম করবে এবং যাবতীয় হুকুম-আহকাম শুনবে ও মান্য করবে। (মুসলিম, আবু দাউদ ও নাছাই শরীফ)

অন্য হাদীছ শরীফে এরশাদ হয়েছে –

وَ مَن مَاتَ وَ لَيسَ فىِ عُنُقِهِ بَيعَةُ مَاتَ مِيتَةَ جَاهِلِيَّةُ-

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি এমতাবস্থায় মৃত্যু বরণ করলো যে, তার গর্দানে বাইয়া’তের (আনুগত্যের) বেড়ি থাকলো না, সে জাহেলীয়াতের মৃত্যুতে মৃত্যু বরণ করলো। (মুসলীম শরীফ: কিতাবুল ইমারা, হাদীছ নং-৪৮৯৯)।

পীর মাশায়েখগণের মধ্যে বাইয়া’ত করার যে প্রথা প্রচলিত তার সারমর্ম হলো জাহেরী ও বাতেনী আমলের ওপর দৃঢ়তা অবলম্বন করা এবং গুরুত্ব প্রদান করার অঙ্গীকার করা। তাঁদের পরিভাষায় একে বাইয়া’তে তরীকত, অর্থাৎ, তরীকতের কাজ বা আমল করার অঙ্গীকার করা। কেউ কেউ এ বাইয়া’তকে অস্বীকার করে থাকেন। কারণ হিসেবে বলেন যে হুজুর পাক (দ:) হতে তা বর্ণিত নেই। তখন শুধু কাফেরদেরকে ইসলামের বাইয়া’ত করার দরকার ছিল। কিন্তু উল্লেখিত হাদীছ শরীফে এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ বিদ্যমান। তাই অনেক ইমাম মুজতাহিদ আলেমগণ বলেছেন- من ليس له شيخ فشيخه الشيطان ‘মান লায়ছা লাহু শায়খুন ফা-শায়েখুহুশ শয়তানুন’ ( জুনায়েদ বাগদাদী রহ:)। অর্থাৎ, যে ব্যক্তি কোনো হাক্কানী পীর বা শায়েখের বাইয়া’ত গ্রহণ করেনি, তার শায়খ বা ওস্তাদ হয় শয়তান। শয়তান-ই তাকে গোমরাহ বা বিভ্রান্ত করে দেয়। কাজেই গোমরাহী থেকে বাঁচা যেহেতু ফরজ, সেহেতু পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হওয়া ছাড়া তা সম্ভব নয়। তাই পীর-মুর্শিদের কাছে বাইয়া’ত হওয়াও ফরজ। আর ঠিক এ কথাটি বলেছেন আমাদের হানাফী মজহাবের ইমাম, ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ:)। তিনি বলেন, “লাওলা ছানাতানি লাহালাকান নোমান”। অর্থাৎ, “আমি নোমান বিন ছাবিত যদি দু’টি বছর না পেতাম তবে হালাক হয়ে যেতাম”। অর্থাৎ, যদি আমি আমার পীর সাহেব ইমাম জাফর সাদেক (রা:)-এর কাছে বাইয়া’ত হয়ে দু’টি বছর অতিবাহিত না করতাম, তবে আত্মশুদ্ধি লাভ না করার কারণে গোমরাহ ও হালাক (ধ্বংস) হয়ে যেতাম।

আর বিখ্যাত কবি, দার্শনিক ও আলেমকুল শিরোমণি বিশিষ্ট সুফি সাধক হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রহ:) বলেন –

“মাওলানা রুম হারগেজ কামেল নাশুদ; তা গোলামে শামছে তিবরীজ নাশুদ”

অর্থাৎ, আমি মাওলানা রুমী ততোক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ-ওয়ালা হতে পারিনি যতোক্ষণ পর্যন্ত আমার পীর হযরত শামছে তাবরীজ (রহ:)-এর কাছে বাইয়া’ত হয়ে এলমে তাছাউফ আমল করে এখলাছ হাছিল না করেছি। অর্থাৎ, এলমে তাছাউফ আমলের মাধ্যমে এখলাছ অর্জন করার পরই আমি হাকীকি মু’মিন হতে পেরেছিলাম (মসনবী)।

তাই কাদেরীয়া তরীকার ইমাম হযরত গাউছুল আযম মাহবুবে ছোবহানী কুতুবে রব্বানী গাউছে সামদানী শায়খ মহিউদ্দীন আব্দুল কাদের জীলানী (রহ:) তাঁর বিখ্যাত কেতাব “সিররুল আসরার”-এর ৫ম অধ্যায়ে তওবার বয়ানে লিখেছেন, ক্বলব বা অন্তরকে জীবিত বা যাবতীয় কু-রিপু হতে পবিত্র করার জন্য আহলে তালকীন তথা পীরে কামেল গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য ফরজ। কারণ তাওহীদের রত্ন (বীজ) কোনো যোগ্য মুর্শিদের অন্তর থেকে গ্রহণ করতে হবে।

হাদীস শরীফে যে এলেম অর্জন করা ফরজ বলা হয়েছে তা দ্বারা এলমে মারেফাত ও কোরবতকেই বোঝানো হয়েছে। এ ছাড়া আরও অন্যান্য সর্বজনমান্য ও সর্বজনস্বীকৃত ইমাম-মুজতাহিদ ও আওলিয়া ই-কিরামগণ (রহ:) পীর-মাশায়েখের কাছে বাইয়া’ত গ্রহণ করা ফরজ বলে ফতওয়া দিয়েছেন।

উদাহরণস্বরূপ, হুজ্জাতুল ইসলাম হযরত ইমাম গাজ্জালী (রহ:) তাঁর “এহইয়াউ উলুমুদ্দীন ও কিমিয়া সায়াদাত” কিতাবে, হযরত খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতি আজমেরী (রহ:)-এর মালফুজাত “আনিসুল আরওয়াহ” কিতাবে, ইমামুশ শরীয়াত ওয়াত তরীকত শায়খ আবুল কাশেম কুশাইরী (রহ:) “রিছালায়ে কুশাইরিয়া” কিতাবে, হযরত মাওলানা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথি (রহ:) “মালাবুদ্দা মিনহু ও এরশাদুত্তালেবীন” কিতাবে, শাহ আব্দুল আজিজ মহাদ্দিস দেহলভী (রহ:) “তাফসীরে আজিজ” শীর্ষক কিতাবে, আল্লামা শামী (রহ:) “রদ্দুল মোখতার” কিতাবে, ইমাম ফখরুদ্দীন রাজী (রহ:) তাঁর “তাফসীরে কবীর” কিতাবে, কাইয়্যুমে আউয়াল আফজালুল আউলিয়া হযরত ইমাম মোজাদ্দেদে আলফে ছানী (রহ:) তাঁর বিখ্যাত আল-“মাকতুবাত শরীফে”, হযরত ইমাম আহমদ রেফায়ী (রহ:) তাঁর “বুনইয়ানুল মুআইয়্যাদ” কিতাবে, হযরত ইসমাঈল হাক্কি (রহ:) “তাফসীরে রুহুল বয়ানে” সরাসরি পীর গ্রহণ করা ফরজ বলে ফতুয়া দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে কারামত আলী জৌনপুরীও তার “যাদুত তাকাওয়াতে” লিখেছে যে এলমে তাছাউফ ছাড়া ইলমে শরীয়তের ওপর যথাযথ আমল করা কিছুতেই সম্ভব নয়। সুতরাং ছাবেত হলো যে এলমে মারেফত চর্চা করা সকলের জন্যই ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য। আর এই এলেমে তাছাউফ পারদর্শী মুর্শিদে কামেল-এর সোহবত ও তা’লীম ব্যতিরেকে অর্জন করা কখনও সম্ভব নয়।

হাটহাজারী খারিজিদের মুরুব্বী মুফতী শফি সাহেব স্বয়ং নিজেই “মা’আরেফুল কুরআনে” সূরা বাক্বারায় উক্ত আয়াত শরীফের তাফসীরে লেখেন, আত্মশুদ্ধি অর্জিত হবে না যতোক্ষণ পর্যন্ত এছলাহ-প্রাপ্ত কোনো বুর্যুর্গ বা পীরে কামেলের অধীনে থেকে তালীম ও তরবিয়াত হাসিল না করবে। আমল করার হিম্মত তাওফিক কোনো কিতাব পড়া ও বোঝার দ্বারা অর্জিত হয় না, তা অর্জন করার একটি-ই পথ; আর তা হলো অলীগণের সোহবত তথা সান্নিধ্য।

পীর-মুর্শিদগণই হচ্ছেন হাকীকি আলেম। কেননা, পীর-মুর্শিদগণই এলমে শরীয়ত ও মারেফত, এই উভয় প্রকার এলমের অধিকারী। আর উক্ত উভয় প্রকারের এলমের অধিকারীগণই হচ্ছেন হাদীছ শরীফের ঘোষণা অনুযায়ী- العلماء ورثة الانبياء প্রকৃত আলেম বা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া। যেমন এ প্রসঙ্গে ইমামে রব্বানী মাহবুবে সুবহানী কাইয়ূমে আওয়াল সুলতানুল মাশায়েখ হযরত মোজাদ্দেদ আলফে ছানি (রহ:) তাঁর বিখ্যাত কিতাব ’মকতুবাত শরীফে’ উল্লেখ করেন, আলিমগণ নবীগণের ওয়ারিছ। এ হাদীস শরীফে বর্ণিত আলেম তারাই যাঁরা নবীগণের রেখে যাওয়া এলমে শরীয়ত ও এলমে মারিফত এই উভয় প্রকার এলমের অধিকারী। অর্থাৎ, তিনি-ই প্রকৃত ওয়ারিছ বা স্বত্বাধিকারী। আর যে ব্যক্তি শুধুমাত্র এক প্রকারের এলমের অধিকারী, সে নবীগণের প্রকৃত ওয়ারিশ নয়। কেননা, পরিত্যক্ত সম্পত্তির সকল ক্ষেত্রে অংশিদারী হওয়াকেই ওয়ারিছ বলে। আর যে ব্যক্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তির কোনো নির্দিষ্ট অংশের অধিকারী হয়, তাকে ’গরীম’ বলে। অর্থাৎ, সে ওয়ারিছ নয়, গরীমের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে, যারা পীর-মাশায়েখ নয়, অর্থাৎ, শুধু এলমে শরীয়তের অধিকারী ও এলমে তাছাউফ-শূন্য, তারা প্রকৃত আলেম নয়।

অতএব, প্রমাণিত হলো, হক্কানী পীর-মাশায়েখগণই হচ্ছেন প্রকৃত বা খাঁটি আলেমে দ্বীন। ক্বলব জারি করতে হলে তাঁদের কাছে যেতে হবে। যে ব্যক্তি কোনো পীর-মাশায়েখের কাছে বাইয়া’ত হয়ে আত্মশুদ্ধি লাভ করে খিলাফত প্রাপ্ত হয়নি, তার কাছে বাইয়া’ত হওয়া অনুচিত।

অতএব, আত্মশুদ্ধি ও এলমে তাছাউফ অর্জন করা যেহেতু ফরজে আইন, আর কামেল পীর-মাশায়েখ ছাড়া এলমে তাছাউফ বা আত্মশুদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়, সেহেতু একজন কামেল পীর-মুর্শিদ অন্বেষণ করে বাইয়া’ত গ্রহণ করা ফরজ। এটাই গ্রহণযোগ্য, বিশুদ্ধ ও দলীলভিত্তিক ফতওয়া। এর বিপরীত মত পোষণকারীরা বাতিল ও গোমরাহ।

ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ। ওয়াল্লাহু ওয়া রাসূলাহু আ’লামু

হাকিকতে নূরে মোহাম্মদি সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

Standard

Courtesy:ajmirer kafela

নূরে মোহাম্মদীর সৃষ্টির রহস্য:

মহান স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন
সর্বপ্রথম যে মাখলুক সৃষ্টি করেছিলেন, তা ছিলো মহা-সম্মানী একখানা নূর মোবারক এবং সেই নূর মোবারকের নামকরণ করেছিলেন মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর এ আজিমুশশান নূর মোবারককেই বলা হয়ে থাকে নূরে মোহাম্মদী।

মাহবুবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম এর নূর মোবারক সৃষ্টির পূর্বে
যেহেতু আর কোন মাখলুকই ছিল না, সেহেতু আল্লাহ তাকারাকা ওয়া তা’য়ালা হেকমতে কামেলা দ্বারা তাঁর হাবিবের নূর মোবারক সৃষ্টি করেছিলেন।কোন ধাতু ছাড়াই কিভাবে কি করে আল্লাহতা’য়ালা তাঁর হাবিব সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সৃষ্টি করলেন তা কেউ বলতে পারে না।নূরে মোহাম্মদীর সৃষ্টির এই অজানা রহস্যকেই বলা হয় নূরে মোহাম্মদীর হাকিকত।

আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামার নূরানী ফরমান-

ﻳﺎ ﺍﺑﺎ ﺑﻜﺮ ﻟﻢ ﻳﻌﺮﻓﻨﻰ ﺣﻘﻴﻘﺔ ﻏﻴﺮ ﺭﺑﻰ –

অর্থাৎ ‘হে আবু বকর! আমার প্রভু ব্যতিত আমার হাকিকত সম্বন্ধে কেউই অবগত নন’।

এ হাদিস শরীফের মর্ম অনুযায়ী বলা হয়ে থাকে-

ﻣﺤﻤﺪ ﺳﺮ ﻗﺪﺭﺕ ﮨﮯ – ﮐﻮﺉ ﺭﻣﻮﺯ ﺍﺱ ﮐﺎ ﮐﯿﺎ ﺟﺎﻧﮯ
ﺷﺮﯾﻌﺖ ﻣﯿﮟ ﺗﻮ ﺑﻨﺪﮦ ﮨﮯ- ﺣﻘﯿﻘﺖ ﻣﯿﮟ ﺧﺪﺍ ﺟﺎﻧﮯ

অর্থাৎ ‘আল্লাহর হাবিব মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুদরতে এলাহির এক গোপনীয় সুক্ষ্ম রহস্য। যার ভেদ কেউ জানতে পারে নাই। শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনিতো আল্লাহর একজন বান্দা কিন্তু তার মূল হাকিকত কি তা জানেন একমাত্র আল্লাহতা’য়ালা।’

এ প্রসঙ্গে চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খাঁন (আলাইহির রহমত) তাঁর লিখিত ‘সিলাতুস সাফা ফি নূরীল মোস্তফা’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেন-

ﻋﺎﻟﻢ ﻣﯿﮟ ﺫﺍﺕ ﺭﺳﻮﻝ ﮐﻮ ﺗﻮ ﮐﻮﺉ ﭘﮩﭽﺎﻧﺘﺎ ﻧﮩﯿﮟ

অর্থাৎ ‘এ নশ্বর পৃথিবীতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার সঠিক পরিচিতি কেউই অবগত নন’।

তিনি আরো বলেন-

ﺍﺱ ﺗﺨﻠﯿﻖ ﮐﮯ ﺍﺻﻞ ﻣﻌﻨﯽ ﺗﻮ ﺍﻟﻠﮧ ﻭﺭﺳﻮﻝ ﺟﺎﻧﯿﮟ ﺟﻞ
ﻭﻋﻠﯽ ﻭﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ –

অর্থাৎ ‘মাহবুবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার সৃষ্টির মূল রহস্য একমাত্র আল্লাহতা’য়ালা ও তাঁর রাসূলই জানে’।

অন্যত্র বলেন-

ﮐﮧ ﻧﻮﺭ ﻣﺤﻤﺪﯼ ﺟﺐ ﻗﺪﯾﻢ ﺍﻭﺭ ﺍﺯﻟﯽ ﻧﻮﺭ ﮐﯽ ﭘﮩﻠﯽ ﺗﺠﻠﯽ
ﮨﮯ ﺗﻮ ﮐﺎﺋﻨﺎﺕ ﻣﯿﮟ ﺑﮭﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﺗﻌﺎﻟﯽ ﮐﮯ ﻭﺟﻮﺩ ﮐﺎ ﻭﮬﯽ
ﺳﺐ ﺳﮯ ﭘﮩﻠﮧ ﻣﻈﮭﺮ ﮨﮯ –

অর্থাৎ ‘নূরে মোহাম্মদী যখন নূরে কাদীম ও নূরে আজলি অর্থাৎ আল্লাহতা’য়ালার
জাতের প্রথম তাজাল্লি।এতে প্রমাণিত
হলো সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে তিনিই হলেন
আল্লাহতা’য়ালারর অজুদ বা অস্তিত্বের
প্রথম প্রকাশক।’

আ’লা হযরত আরো বলেন-

ﺍﻟﻠﮧ ﺗﻌﺎﻟﯽ ﻧﮯ ﻣﺤﻤﺪ ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ ﮐﯽ ﺫ
ﺍﺕ ﭘﺎﮎ ﮐﻮ ﺍﭘﻨﯽ ﺫﺍﺕ ﮐﺮﯾﻢ ﺳﮯ ﭘﯿﺪﺍﮐﯿﺎ ﯾﻌﻨﯽ ﻋﯿﻦ ﺫﺍﺕ
ﮐﯽ ﺗﺠﻠﯽ ﺑﻼ ﻭﺍﺳﻄﮧ ﮨﻤﺎﺭﮮ ﺣﻀﻮﺭ ﮨﯿﮟ ﺑﺎﻗﯽ ﺳﺐ
ﮨﻤﺎﺭﮮ ﺣﻀﻮﺭ ﮐﮯ ﻧﻮﺭ ﻭﻇﮭﻮﺭ ﮨﯿﮟ ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ –

অর্থাৎ ‘আল্লাহতা’য়ালা হযরত মোহাম্মদ
মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এর পবিত্র সত্বাকে আল্লাহর জাতে পাকের স্বীয়জাতে করিম কর্তৃক সৃষ্টি করেছেন অর্থাৎ আমাদের হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহতা’য়ালার জাতের তাজাল্লি আর বাকী কুল কায়েনাত আমাদের নূর নবীর মাধ্যমে প্রকাশ’।

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্টভাবে
প্রতীয়মান হলো যে, নূর নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামার নূর মোবারক
আল্লাহপাকের কাদীম ও আজলি নূরের প্রথম তাজাল্লি অর্থাৎ আল্লাহর জাত কর্তৃক সৃষ্ট নূর।

আল্লাহর নূর কর্তৃক নবীজীর নূর সৃষ্টি কথাটির ব্যাখ্যা:

নূরে মোহাম্মদী সৃষ্টির রহস্য উদঘাটন ও আলোচনার ক্ষেত্রে হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণিত হাদিসখানা উল্লেখযোগ্য-

ﻳﺎ ﺝ
ﺍﺑﺮ ﺍﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻗﺪ ﺧﻠﻖ ﻗﺒﻞ ﺍﻻﺷﻴﺎﺀ ﻧﻮﺭ ﻧﺒﻴﻚ ﻣﻦ ﻧﻮﺭﻩ –

‘হে জাবির! নিশ্চয়ই আল্লাহতা’য়ালা সব কিছুর পূর্বে তোমার নবীর নূর মোবারক স্বীয় নূর কর্তৃক সৃষ্টি করছেন’।

এ হাদিস শরীফের ব্যাখ্যায় আল্লামা জারকানি আলাইহির রহমত বলেন-

ﻣﻦ ﻧﻮﺭﻩ ﺍﻯ ﻣﻦ ﻧﻮﺭ ﻫﻮ ﺫﺍﺗﻪ –

অর্থাৎ আল্লাহতা’য়ালা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ নূর কর্তৃক সৃষ্টি করেছেন যা ﻋﻴﻦ
ﺫﺍﺕ ﺍﻟﻬﻰ আল্লাহর প্রকৃত জাত অর্থাৎ
আল্লাহতা’য়ালা স্বীয় জাত কর্তৃক তাঁর হেকমতে কামেলার দ্বারা কোন মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন।
এর অর্থ এই নয় যে আল্লাহতা’য়ালার নূর নবী সৃষ্টির ধাতু।আল্লাহতা’য়ালা কোন মাধ্যম ছাড়াই ‘কুন’ বলেছেন ‘ফাইয়াকুন’ নবীর নূর মোবারক সৃষ্টি হয়ে গেল।

চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আলা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খাঁন বেরলভী আলাইহির রহমত ‘সিলাতুস সফা ফি
নূরিল মোস্তফা’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন-

ﮬﺎﮞ ﻋﯿﻦ ﺫﺍﺕ ﺍﻟﮭﯽ ﺳﮯ ﭘﯿﺪﺍ ﮨﻮﻧﮯ ﮐﮯ ﯾﮧ ﻣﻌﻨﯽ ﻧﮩﯿﮟ
ﮐﮧ ﻣﻌﺎﺫ ﺍﻟﻠﮧ ﺫﺍﺕ ﺍﻟﮭﯽ ﺫﺍﺕ ﺭﺳﺎﻟﺖ ﮐﮯ ﻟﮱ ﻣﺎﺩﮦ ﮨﮯ
ﺟﯿﺴﮯ ﻣﭩﯽ ﺳﮯ ﺍﻧﺴﺎﻥ ﭘﯿﺪﺍ ﮨﻮﺍ ﻋﯿﺎﺫ ﺑﺎﻟﻠﮧ ﺫﺍﺕ ﺍﻟﮭﯽ ﮐﺎ
ﮐﻮﺉ ﺣﺼﮧ ﯾﺎ ﮐﻞ ﺫﺍﺕ ﻧﺒﯽ ﮨﻮﮔﯿﺎ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﺰ ﻭﺟﻞ ﺣﺼﮯ
ﺍﻭﺭ ﭨﮑﺮﮮ ﺍﻭﺭ ﮐﺴﯽ ﮐﮯ ﺳﺎﺗﮧ ﻣﺘﺤﺪ ﮨﻮﺟﺎﻧﮯ ﯾﺎ ﮐﺴﯽ
ﻣﯿﮟ ﺣﻠﻮﻝ ﻓﺮﻣﺎﻧﮯ ﺳﮯ ﭘﺎﮎ ﻭﻣﻨﺰﮦ ﮨﮯ ﺣﻀﻮﺭ ﺳﯿﺪ ﻋﺎﻟﻢ
ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ ﺧﻮﺍﮦ ﮐﺴﯽ ﺷﺊ ﮐﻮ ﺟﺰﺀ ﺫﺍﺕ
ﺍﻟﮭﯽ ﺧﻮﺍﮦ ﮐﺴﯽ ﻣﺨﻠﻮﻕ ﮐﻮ ﻋﯿﻦ ﻭﻧﻔﺲ ﺫﺍﺕ ﺍﻟﮭﯽ
ﻣﺎﻧﻨﺎ ﮐﻔﺮ ﮨﮯ –

(আলা হযরত ইমাম আহমদ রেজা খাঁন আলাইহির রহমত ﺣﻀﻮﺭ ﻋﯿﻦ ﺫﺍﺕ ﺍﻟﮭﯽ ﺳﮯ ﭘﯿﺪﺍ ﮨﻮﺍ এর ভাবার্থ উদঘাটন করতে গিয়ে উল্লেখ করেন)

ভাবার্থ: আইনে জাতে এলাহি বা আল্লাহর প্রকৃত জাত থেকে (নূরে হাকিকী আল্লাহর জাত কর্তৃক)
হাবিবে খোদা সৃষ্টি হওয়ার অর্থ এই নয় যে,আল্লাহর জাত রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জাত সৃষ্টির জন্য মাদ্দা বা মূল ধাতু।(নাউজুবিল্লাহ) যেমন মাটি দ্বারা মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা ইহার অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর জাতের কোন অংশ বা আল্লাহর কুল জাত নবী হয়ে গিয়েছেন। (নাউজুবিল্লাহ)

মহান আল্লাহ অংশ,টুকরো এবং কোন কিছুর সাথে একীভূত হওয়া অথবা
কোন বস্তুর মধ্যে হুলুল হওয়া থেকে পবিত্র।হুজুর সাইয়িদে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনকি কোন বস্তুকে আল্লাহর জাতের অংশ এমনকি কোন সৃষ্টিকে প্রকৃত জাত ও নফসে জাতে এলাহি মানা বা আক্বিদা রাখা কুফুরি।’

উপরোক্ত দলিলভিত্তিক আলোচনা দ্বারা
স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, আল্লাহতা’য়ালার জাত মোবারক এমন একটি নূর যার কোন উদাহরণ বা মিসাল নেই।বেনজীর বেমিসাল নূর।যে নূরের অংশ হয় না,ভাগ হয় না, টুকরো হয় না,লাল, হলুদ,সবুজ এককথায় সৃষ্টির মধ্যে যার কোন তুল্য নেই।

মোটকথা আল্লাহর নূর হলো নূরে হাকিকী এবং রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূর হলো নূরে তাখলিকী বা আল্লাহর সৃষ্টি নূর।

আ’লা হযরত ‘নূরুল মোস্তফা’ নামক গ্রন্থের ১১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-

ﻧﻮﺭ ﻋﺮﻑ ﻋﺎﻣﮧ ﻣﯿﮟ ﺍﯾﮏ ﮐﯿﻔﯿﺖ ﮨﮯ ﮐﮧ ﻧﮕﺎﮦ ﭘﮩﻠﮯ ﺍﺳﮯ
ﺍﺩﺭﺍﮎ ﮐﺮﺗﯽ ﮨﮯ ﺍﻭﺭ ﺍﺱ ﮐﮯ ﻭﺍﺳﻄﮯ ﺳﮯ ﺩﻭﺳﺮﯼ ﺍﺷﯿﺎﺋﮯ
ﺩﯾﺪﻧﯽ ﮐﻮ ﻗﺎﻝ ﺍﻟﺴﯿﺪ ﻓﯽ ﺗﻌﺮﯾﻔﺎﺗﮧ ﺍﻟﻨﻮﺭ ﮐﯿﻔﯿۃ ﺗﺪﺭﮐﮭﺎ
ﺍﻟﺒﺎﺻﺮۃ ﺍﻭﻻ ﻭﺑﻮﺍﺳﻄﺘﮭﺎ ﺳﺎﺋﺮ ﺍﻟﻤﺒﺼﺮﺍﺕ- ﺍﻭﺭ ﺣﻖ ﯾﮧ ﮐﮧ
ﻧﻮﺭ ﺍﺱ ﺳﮯ ﺍﺟﻠﯽ ﮨﮯ ﮐﮧ ﺍﺱ ﮐﯽ ﺗﻌﺮﯾﻒ ﮐﯽ ﺟﺎﺋﮯ – ﯾﮧ
ﺟﻮ ﺑﯿﺎﻥ ﮨﻮﺍ ﺗﻌﺮﯾﻒ ﺍﻟﺠﻠﯽ ﺑﺎﻟﺨﻔﯽ ﮨﮯ ﮐﻤﺎ ﻧﺒﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻓﯽ
ﺍﻟﻤﻮﺍﻗﻒ ﻭﺷﺮﺣﮭﺎ ﻧﻮﺭ ﺑﺎﯾﮟ ﻣﻌﻨﮯ ﺍﯾﮏ ﻋﺮﺽ ﻭﺣﺎﺩﺙ ﮨﮯ
ﺍﻭﺭ ﺍﺏ ﻋﺰ ﻭﺟﻞ ﺍﺱ ﺳﮯ ﻣﻨﺰﮦ ﮨﮯ –

অর্থাৎ উরফে আম বা প্রচলিত সংজ্ঞায় নূর হচ্ছে একটি কাইফিয়ত বা অবস্থা দৃষ্টিশক্তি প্রথমে যেটিকে অনুধাবন করে এবং এর মাধ্যমে অন্যান্য দৃষ্ট জিনিসও অনুধাবিত হয়-

ﻗﺎﻝ ﺍﻟﺴﻴﺪ ﻓﻰ ﺗﻌﺮﻳﻔﺎﺗﻪ ﺍﻟﻨﻮﺭ
ﻛﻴﻔﻴﺔ ﺗﺪﺭﻛﻪ ﺍﻟﺒﺎﺻﺮﺓ ﺍﻭﻻ ﻭﺑﻮﺍﺳﻄﺘﻬﺎ ﺳﺎﺋﺮ ﺍﻟﻤﺒﺼﺮﺍﺕ

সঠিক তত্ত্ব হল এই এখানে যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে,তা থেকে নূর অনেক উর্দ্ধে। এটা ﺗﻌﺮﻳﻒ ﺍﻟﺠﻠﻰ
ﺑﺎﻟﺨﻔﻰ ‘তা’রিফুল জলি বিল খফি’। যেমন ﻣﻮﺍﻗﻒ ও
তার ব্যাখ্যা গ্রন্থে তা বর্ণনা করা হয়েছে। এই অর্থে নূর হচ্ছে আরজ ও হাদেস তথা যা অন্যের মাধ্যমে স্থিতিশীল এবং ণস্থায়ী।আর আল্লাহতা’য়ালা এগুলো
থেকে পবিত্র। (এ জন্য উপরোক্ত অর্থে আল্লাহ তা’য়ালার পবিত্র সত্ত্বাকে নূর বলা যেতে পারে না।)

একাদশ শতাব্দীর দশম মুজাদ্দিদ, হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী আশ শায়খ আহমদ সিরহিন্দী আলাইহির
রহমত (ওফাত ১০৩৪ হিজরি) তদীয়-
ﻣﻜﺘﻮﺑﺎﺕ ﺍﻣﺎﻡ
ﺭﺑﺎﻧﻰ
‘মাকতুবাতে ইমামে রাব্বানী’ নামক কিতাবের তৃতীয় জিলদের (উর্দু) ১৬১৫/১৫৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-

ﻣﻤﮑﻦ ﭼﮧ ﺑﻮﺩ ﮐﮧ ﻇﻞ ﻭﺍﺟﺐ ﺑﺎﺷﺪ
ﻭﺍﺟﺐ ﺗﻌﺎﻟﯽ ﮐﺎ ﺳﺎﯾﮧ ﮐﯿﻮﮞ ﮨﻮﮔﺎ ﮐﯿﻮﻧﮑﮧ ﻣﺜﻞ ﮐﯽ ﺗﻮﻟﯿﺪ
ﮐﺎ ﻣﻮﮨﻢ ﮨﮯ ﺍﻭﺭ ﻋﺪﻡ ﮐﻤﺎﻝ ﻟﻄﺎﻓﺖ ﮐﮯ ﺷﺎﺋﺒﮧ ﮐﯽ ﺧﺒﺮ
ﺩﯾﺘﺎﮨﮯ- ﺟﺒﮑﮧ ﺭﺳﻮﻝ ﺍﻟﻠﮧ ﺻﻠﯽ ﺍﻟﻠﮧ ﻋﻠﯿﮧ ﻭﺳﻠﻢ ﮐﺎ
ﻟﻄﺎﻓﺖ ﮐﯽ ﻭﺟﮧ ﺳﮯ ﺳﺎﯾﮧ ﻧﮧ ﺗﮭﺎ ﺗﻮ ﺧﺪﺍﮰ ﻣﺤﻤﺪ ﮐﺎ
ﺳﺎﯾﮧ ﮐﯿﻮﮞ ﮨﻮﮔﺎ- ﺧﺎﺭﺝ ﻣﯿﮟ ﻣﻮﺟﻮﺩ ﺑﺎﻟﺬﺍﺕ ﺍﻭﺭ
ﺑﺎﻻﺳﺘﻘﻼﻝ ﺻﺮﻑ ﺍﻟﻠﮧ ﺗﻌﺎﻟﯽ ﮐﯽ ﺫﺍﺕ ﮨﮯ ﺍﻭﺭ ﯾﺎﭘﮭﺮ ﺍﻟﻠﮧ
ﺗﻌﺎﻟﯽ ﮐﯽ ﺻﻔﺎﺕ ﺛﻤﺎﻧﯿﮧ ﺣﻘﯿﻘﯿﮧ ﺍﻭﺭ ﺍﻥ ﮐﮯ ﺳﻮﺍ ﺟﻮ
ﮐﭽﮫ ﺑﮭﯽ ﮨﮯ ﻭﮦ ﺍﻟﻠﮧ ﺗﻌﺎﻟﯽ ﮐﯽ ﺍﯾﺠﺎﺩ ﺳﮯ ﻣﻮﺟﻮﺩ ﮨﻮﺍ ﮨﮯ
ﺍﻭﺭ ﻣﻤﮑﻦ ﺍﻭﺭ ﻣﺨﻠﻮﻕ ﺍﻭﺭ ﺣﺎﺩﺙ ﮨﮯ ﺍﻭﺭ ﮐﻮﺉ ﻣﺨﻠﻮﻕ
ﺍﭘﻨﮯ ﺧﺎﻟﻖ ﮐﺎ ﻇﻞ ﻧﮩﯿﻦ ﮨﮯ –

ভাবার্থ: মমকিনের কি ক্ষমতা যে, ওয়াজিবের প্রতিচ্ছায়া হয়।ওয়াজিব বা অবশ্যম্ভাবী জাত বা সত্ত্বার (আল্লাহতা’য়ালার) ছায়া কেন হবে? যেহেতু ছায়া বিশিষ্ট হওয়া, অনুরূপ বস্তুর সাদৃশ্যের ধারণার জন্ম দিয়ে থাকে।ছায়াবিশিষ্ট না হওয়া পূর্ণ সূক্ষ্ম
অস্তিত্বের নিদর্শন জ্ঞাপক।যখন সূক্ষ্মতা বশত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার দেহ মোবারকে ছায়া ছিল না, তবে মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার রব বা
প্রতিপালকের ছায়া হবে কেন?

খারেজ বা বহিঃজগতে ﻣﻮﺟﻮﺩ ﺑﺎﻟﺬﺍﺕ ‘মাওজুদ বিজজাত’ বা স্বীয় অস্তিত্বে অস্তিত্ববান এবং স্বয়ং সম্পন্ন একমাত্র আল্লাহতা’য়ালার যাত বা সত্ত্বা।
আল্লাহতা’য়ালার অষ্ট সিফাতে খাসসা বা খাস গুণাবলী প্রকৃত আদি বা বাস্তব গুণ বিদ্যমান আছে।ইহা ছাড়া অন্যান্য গুণাবলী যা আছে সম্ভাব্য সৃষ্ট ও হাদেস বা নতুন বস্তু।কোন সৃষ্টি বস্তু স্বীয় স্রষ্টার ছায়া নয়।

ﺩﺭ ﺧﻮﺍﺳﺘﮧ ﺍﺳﺖ ﺍﻧﺤﻀﺮﺕ ﺍﮮ ﺧﺪﺍ ﮐﮧ ﺩﺭ ﺟﻤﯿﻊ ﺍﻋﻀﺎ
ﻭﺟﮭﺎﻥ ﻧﻮﺭ ﺑﺨﺸﺪ ﻭﺩﺭ ﺁﺧﺮ ﺁﮔﻔﺘﮧ ﻭﺍﺟﻌﻠﻨﯽ ﻧﻮﺭﺍ ﻭﭼﻮﮞ
ﺁﻧﺤﻀﺮﺕ ﻋﯿﻦ ﻧﻮﺭ ﺑﺎﺷﺪ ﻧﻮﺭ ﺭﺍﺳﺎﯾﮧ ﻧﻤﯿﺒﺎﺷﺪ ( ﻣﺪﺍﺭﺝ
ﺍﻟﻨﺒﻮۃ ﺹ ১/ ۱ ٤٦ ﻓﺎﺭﺳﯽ )

ভাবার্থ: নূরনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাজাত করতেন, ইয়া আল্লাহ! আমার সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও চতুর্দিকে নূর দান করুন।(নূরানী করে
দিন) দো’য়ার শেষাংশে উল্লেখ রয়েছে- ﻭﺍﺟﻌﻠﻨﻰ ﻧﻮﺭﺍ আমাকে নূরে পরিণত করে দাও। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ﻋﻴﻦ ﻧﻮﺭ ﺑﺎﺷﺪ
‘আইনে নূরে বাসদ’ অর্থাৎ নিজেই নূর ছিলেন, আর নূরের তো ছায়া হয় না।’

উপরেলিখিত দলিলভিত্তিক আলোচনার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো আল্লাহতা’য়ালা সর্বপ্রথম নবীর নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন তাঁর হেকমতে কামেলার দ্বারা এবং নবীর নূর মোবারক
দ্বারা সবকিছু কুল কায়েনাত আল্লাহপাক সৃষ্টি করেছেন।
আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল্লা নূরে হাকিকী বরং হাকিকতে বা প্রকৃতপক্ষে তিনিই একমাত্র নূর।অর্থ
ﻣﻨﻮﺭ ‘মুনাওইর’ বা নূরের সৃষ্টিকর্তা এবং হুজুর
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছে নূরে তাখলিকী বা সৃষ্ট নূর। ﻟﻄﺎﻓﺖ ‘লতিফ’ বা সূক্ষ্ম হওয়ার কারণে নবীর যেমন ছায়া ছিল না, আল্লাহতা’য়ালারও
ছায়া নাই কারণ তিনি হচ্ছেন সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম।
ওয়াজিবুল ওজুদ ও নূরে হাকিকী একমাত্র আল্লাহ:

ওয়াজিবুল ওজুদ একমাত্র আল্লাহতা’য়ালা। তিনি ব্যতিত ওয়াজিবুল ওজুদ আর কেউ নেই। কেননা ওয়াজিবুল ওজুদ ঐ সত্ত্বাকে বলে যিনি সত্ত্বাগতভাবে স্বয়ং অস্তিত্বশীল, অন্যের দ্বারা অস্তিত্বশীল নন। যিনি কখনো অস্তিত্বহীন ছিলেন না এবং অস্তিত্বহীন হবেনও না। এমন সত্ত্বা একমাত্র আল্লাহ। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই বলা হয় لا موجود الا الله অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতিত কারো কোন অস্তিত্ব নেই। যারা অন্যের দ্বারা একবার অস্তিত্বশীল হন আবার এক সময় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েন তাকে বলা হয় মমকিনুল ওজুদ। আর এর উদাহরণ হল সমস্ত মাখলুক।
এভাবে নূরে হাকিকী বা নূরে মতলক একমাত্র আল্লাহ। কেননা নূরে হাকিকী বা প্রকৃত অর্থে নূর একমাত্র আল্লাহতা’য়ালার জাত বা সত্ত্বাকেই বুঝায়। আল্লাহতা’য়ালা ব্যতিত যা কিছু আছে তাকে বিজ্জাত মুজলিম বা অন্ধকার বলা হয়। হ্যাঁ আল্লাহপাক যাকে নূর বানিয়েছেন বা নূর দান করেছেন তাকে রূপক অর্থে নূর বলা হয়। এ ধরনের নূরকে নূরে মুজাজি বলে। অতএব আল্লাহতা’য়ালা ব্যতিত যে সকল সম্মানিত মাখলুককে আমরা নূর বলে থাকি তা নূরে মজাজি।নূরে মতলক বা নূরে হাকিকী নয়।

এ প্রসঙ্গে তাফসিরে রূহুল মায়ানী ৬ষ্ঠ খণ্ড ১৮ পারা- الله نور السموات والارض এ আয়াতের তাফসিরে ১৬৩ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

فالوجود الحق- والله تعالى كما ان النور الحق هو الله عزوجل-

‘অতএব যেমনিভাবে ওজুদে হক একমাত্র আল্লাহতা’য়ালা তেমনিভাবে নূরে হক আল্লাহতা’য়ালা’।
এর কয়েক লাইন পরে উল্লেখ রয়েছে-

وفسر النور فى هذه الاية اعنى قوله تعالى (الله نور السموات والارض) بذلك ثم اشار الى وجه الاضافة الى (السموات والارض) بقوله: لا ينبغى ان يخفى عليك ذلك بعد ان عرفت انه تعالى هو النور ولا نور سواه-

অর্থাৎ الله نور السموات والارض এ আয়াতে কারীমার মধ্যে যে নূর রয়েছে, এ নূর দ্বারা আল্লাহ যে নূরে হাকিকী তারই প্রমাণ বহন করে একমাত্র আল্লাহতা’য়ালাই ‘হাকিকী নূর’। অন্য নূরের সঙ্গে যার কোন তুলনা হতে পারে না। এ নূর হচ্ছে আজলি ও কাদীম যার কোন আরম্ভ নেই।

তারপর অনুমান ১১ লাইন পরে উল্লেখ রয়েছে-

معنى النور وهو الظهور فى نفسه واظهار لغيره-

আল্লাহতা’য়ালাই যে হাকিকী নূর যা নিজে নিজে প্রকাশ এবং অন্যকে প্রকাশকারী।

এর পর আরো ১১ লাইন পরে উল্লেখ রয়েছে-

وقيل: نور بمعنى منور وروى ذلك عن الحسن- وابى العاليه والضحاك وعليه جماعة عن المفسرين-

অর্থাৎ ‘نور ‘নূর’ এর অর্থ হচ্ছে منور ‘মুনাওইর’ অন্য সব কিছুকে আলোকিতকারী।হাসান আবু আলীয়া ও জেহহাকসহ এবং এক জামাত মুফাসসিরীনে কেরামের অভিমত এর উপর রয়েছে।

আল্লামা রাগেব ইস্পাহানির লিখিত ‘আল মুফরিদাত’ নামক কিতাবের ৫০৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

وسمى الله تعالى نفسه نورا من حيث انه هو المنور- قال: (الله نور السموات والارض)

অর্থাৎ ‘আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালা স্বীয় নাফস বা জাতকে নূর বলে নামকরণ করেছেন, এ মর্মে যে এ নূরের অর্থ হলো منور ‘মুনাওইর’ বা আলোদানকারী।আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেছেন আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর দানকারী।’
অর্থাৎ আল্লাহ হচ্ছেন হাকিকী নূর আর নবী হচ্ছেন তাখলিকী বা সৃষ্টি নূর। আল্লাহতা’য়ালা তাঁর হেকমতে কামেলার দ্বারা এ নূর মোবারককে সৃষ্টি করে, এর সম্পর্ক সরাসরি আল্লাহর জাত মোবারকের দিকে রেখেছেন। এজন্য বলা হয় আল্লাহর জাত কর্তৃক নবীর জাত সৃষ্টি।

ষষ্ঠ শতাব্দীর পঞ্চম মুজাদ্দিদ আল্লামা ইমাম গাজ্জালি আলাইহির রহমত (ওফাত ৫০৫ হিজরি) ‘মিশকাতুল আনওয়ার’ নামক একখানা কিতাব প্রণয়ন করেছেন এবং কুরআন সুন্নাহর দলিল আদিল্লাহর মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন আল্লাহতা’য়ালাই একমাত্র নূর, নূরে হাকিকী, নূরে মতলক, আল্লাহর জাত হলো নূর এবং আল্লাহ ছাড়া সবই مظلم ‘মুজলিম’ বা অন্ধকার। আল্লাহ যাকে নূর দান করেছেন তিনিই একমাত্র নূর নামে আখ্যায়িত হয়েছেন। আল্লাহর হাবিব নিজেই এরশাদ করেছেন- اول ما خلق الله نورى সর্ব সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহতা’য়ালা আমি নবীর নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং আল্লাহর হাবিব হচ্ছেন আল্লাহতা’য়ালার সৃষ্ট নূর।

সপ্তম শতাব্দীর ষষ্ঠ মুজাদ্দিদ আল্লামা ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী আলাইহির রহমত (ওফাত ৬০৪ হিজরি) তদীয় ‘তাফসিরে কবির’ নামক কিতাবের ১২ নম্বর জিলদের ২৩ নম্বর জুজ এর ২৩০ পৃষ্ঠায় ইমাম গাজ্জালি আলাইহির রহমত এর- مشكوة الانوار ‘মিশকাতুল আনওয়ার’ নামক কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন-

والممكن لذاته يستحق العدم من ذاته والوجود من غيره والعدم هو الظلمة- ( ص ۲۳٠ جزء ۲۳)

ভাবার্থ : মুমকিন বিজ্জাত বা সত্ত্বাগত মুমকিন বলা হয় যা স্বয়ং অস্তিত্বশীল নয়, অন্যের দ্বারা অস্তিত্বশীল হয়, আর সকল عدم ‘আদম’ বা অস্তিত্বহীন হচ্ছে জুলমত বা অন্ধকার (যা নূরের বিপরীত)।

অতঃপর বলেন-

الحاصلة والوجود هو النور- فكل ما سوى الله مظلم لذاته مستنير بانارة الله تعالى (ص ۲۳٠ جزء ۲۳)

ভাবার্থ: সারকথা হচ্ছে, আল্লাহতা’য়ালার ওজুদই হচ্ছে একমাত্র নূর (বা হাকিকী নূর বমা’না منور ‘মুনাওইর’ নূর সৃষ্টিকারী)

অতএব আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু সত্ত্বাগতভাবে জুলমত বা অন্ধকার এবং আল্লাহ প্রদত্ত নূরের দ্বারাই নূরান্বিত।

এককথায় আল্লাহ হচ্ছেন ওয়াজিবুল ওজুদ যার আরম্ভ নেই, শেষও নেই যিনি বিজ্জাত মওজুদ অর্থাৎ নিজে নিজেই অস্তিত্বশীল।

অতঃপর আরো বলেন-
وعند هذا يظهر ان النور المطلق هو الله سبحانه وان اطلاق النور على غيره مجاز اذ كل ما سوى الله (ص ۲۳٠ جزء ۲۳)

ভাবার্থ: দলিলভিত্তিক আলোচনার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, নিশ্চয় মতলক নূর হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা। আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপর নূরের এতলাক বা অন্য কাউকে নূর আখ্যায়িত করা মজাজ বা রূপক অর্থে প্রয়োগ হবে। (হাকিকী নূর একমাত্র আল্লাহতা’য়ালা। আল্লাহ তাঁর হাবিবের নূর মোবারক সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছেন।)

অতঃপর আরো বলেন-
فثبت انه سبحانه هو النور- وان كل ما سواه فليس بنور الاعلى سبيل المجاز (ص ۲۳٠ جزء ۲۳)

ভাবার্থ: অতএব, স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালাই একমাত্র নূর। আল্লাহতা’য়ালা ছাড়া অন্য যা কিছুই রয়েছে কাউকে নূর বলে আখ্যায়িত করা যায় না কিন্তু তা হবে মজাজ বা রূপক অর্থে নূর। অতঃপর আরো বলেন-

واعلم ان هذا الكلام الذى روينا عن الشيخ الغزالى رحمه الله كلام مستطاب ولكن يرجع حاصله بعد التحقيق الى ان معنى كونه سبحانه نورا انه خالق للعالم وانه خالق للقوى الدراكة وهو المعنى من قولنا معنى كونه نورا السموات والارض انه هادى اهل السموات والارض- فلاتفاوت بين ما قاله وبين الذى نقلناه عن المفسرين فى المعنى والله اعلم (جلد ۱۲ ص ۲۳۱ جزء ۲۳ تفسير كبير)

ভাবার্থ: ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী আলাইহির রহমত বলেন- জেনে রাখুন! নিশ্চয়ই এই বক্তব্য যা আমি বর্ণনা করেছি, তাহলো শায়খ ইমাম গাজ্জালী আলাইহির রহমত হতে كلام مستطاب উত্তম কালাম বা গ্রহণযোগ্য বক্তব্য থেকে বর্ণনা করেছি। তা তাহকিক বা বিশ্লেষণ করে যা প্রাধান্য পায় তা হলো যে, এ অর্থে আল্লাহতা’য়ালা নূর যে, তিনি জগতের স্রষ্টা এবং নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহতা’য়ালা) শক্তিশালী জ্ঞান বা বোধগম্যতা সৃষ্টিকারী) আমাদের বক্তব্যে এ অর্থই বহন করে যে, আল্লাহতা’য়ালার কালাম الله نور السموات والارض আল্লাহতা’য়ালা আসমান জমিনের নূর অর্থাৎ তিনি (আল্লাহতা’য়ালা) নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের অধিবাসীদের পথ প্রদর্শক।

আল্লামা ইমাম গাজ্জালী আলাইহির রহমত যে ফয়সলা দিয়েছেন এবং মুফাসসিরীনগণ থেকে আমরা যা বর্ণনা করেছি এর উভয়ের মধ্যে অর্থের দিক দিয়ে কোন পার্থক্য নেই।
সহিহ মুসলিম শরীফ ১ম জিলদের ৭৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

عن ابى ذر قال سالت رسول الله صلى الله عليه وسلم هل رأيت ربك قال نور انى اراه-
عن قتادة عن عبد الله بن شقيق قال قلت لابى ذر لو رأيت رسول الله صلى الله عليه وسلم لسألته فقال عن اى شئ كنت تسأله قال كنت اسأله هل رأيت ربك قال ابو ذر قد سألته فقال رأيت نورا-

অর্থাৎ হযরত আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আমি আরজ করেছি ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি আপনার রবকে দেখেছেন? আল্লাহর হাবিব উত্তরে বললেন- তিনি নূর আমি তাকে কিভাবে দেখব?

হযরত কাতাদা হযরত আব্দুল্লাহ বিন শাকীক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলছি যে, যদি রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাাত পেতাম, তাহলে আমি জিজ্ঞেস করতাম। তখন আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- তুমি কোন বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করবে। তিনি বললেন- আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করতাম, আপনি কি আপনার রবকে দেখেছেন? হযরত আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন- আমি এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছি। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আমি তাঁকে নূর দেখেছি।

মুজাদ্দিদে আলফেসানী আলাইহির রহমত তদীয় ‘মাকতুবাতে ইমামে রাব্বানী’

جیسا کہ رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم نے اللہ تعالی کو دیکھنے کے سوال کے جواب میں فرمایا تھا کہ وہ تو نور ھے میں اسے کیسے دیکھ سکتا ہو-

যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহতায়ালার দর্শনের ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন যে, তিনি তো নূর আমি তাঁকে কিভাবে দেখব।

উপরোক্ত হাদিস শরীফ ও মুজাদ্দিদে আলফেসানী আলাইহির রহমত এর দলিলভিত্তিক ভাষ্য দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো- আল্লাহর জাত নূর বমা’না منور ‘মানাওইর’ নূর সৃষ্টিকারী।
শরহে ফেকহে আকবর নামক কিতাবে উল্লেখ রয়েছে-

(كما وصف) اى الله سبحانه (نفسه) اى ذاته؟ وفيه دليل على جواز اطلاق النفس على ذاته تعالى- … وقد ورد تفكروا فى كل شئ ولا تفكروا فى ذات الله-

ভাবার্থ: যে ভাবে তিনি গুণান্বিত অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা نفسه ‘নাফসাহু’ অর্থাৎ তাঁর পবিত্র জাত বা সত্ত্বা এতে দলিলভিত্তিক প্রমাণিত হলো- النفس ‘আন নফস’ এর প্রযোজ্য আল্লাহতা’য়ালার জাতের উপর হয়ে থাকে।… এবং বর্ণিত আছে যে, প্রত্যেক বস্তুর উপর চিন্তা ফিকির কর। আল্লাহর জাত বা সত্ত্বার উপর চিন্তা ফিকির কর না। কারণ আল্লাহর জাত কি তা বুঝার মতা কারো নেই।

‘তাফসিরে আবিস সউদ’ নামক কিতাবের মোহাম্মদ ইবনে মোহাম্মদ এমাদি আলাইহির রহমত (ওফাত ৯৫১ হিজরি) الله نور السموات والارض এর আয়াতে কারীমার তাফসিরে উল্লেখ করেন-

وعبر عن المنور بنفس النور تنبيها على قوة التنوير وشدة التأثير وايذانا بانه تعالى ظاهر بذاته وكل ما سواه ظاهر باظهاره كما ان النور نير بذاته وما عداه مستنير به-

ভাবার্থ: নূরকে মুনাওইর (আলো দানকারী) অর্থে গণ্য করা হয়েছে। কারণ আলো দান করার শক্তি, ভীষণ প্রভাবের দরুণ শুধু নূরকে মুনাওইর অর্থে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহতা’য়ালা স্বয়ং জাহের বা প্রকাশমান এবং তাঁকে ছাড়া অন্য সবকিছু প্রকাশ হয়ে থাকে তাঁর প্রকাশ করার কারণে। যেমন নিশ্চয় তিনি নিজে নিজেই আলোকিত। আর অন্য সব কিছুকে আলো দানকারী।

চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ইমাম আহমদ রেজা খাঁন আলাইহির রহমত তদীয় نور المصطفى নামক কিতাবে উল্লেখ করেন-

محققین کے نزدیک نور وہ کہ خود ظاھر ہو اور دوسروں کا مظھر کما ذکرہ الامام حجۃ الاسلام الغزالی ثم العلامہ الزرقانی فی شرح المواھب الشریف باین معنی اللہ عز وجل نور حقیقی ہے بلکہ حقیقۃ وھی نور ہے اور آیۃ کریمہ اللہ نور السموات والارض بلا تکلف وبلاتاویل اپنے معنی حقیقی پرہے فان اللہ عز وجل ھو الظاھر بنفسہ المظھر لغیرہ من السموات والارض ومن فیھن وسائر المخلوقات-
حضور پرنور سید عالم صلی اللہ علیہ وسلم بلا شبہ اللہ عز وجل کے نور ذاتی سے پیدا ہیں- حدیث شریف میں وارد ہے: ان الله تعالى قد خلق قبل الاشياء نور نبيك من نوره- اے جابر بیشک اللہ تعالی نے تمام اشیاء سے پہلے ترے نبی کا نور اپنے نور سے پیدا فرمایا- رواہ عبد الرزاق ونحوہ عند البیھقی حدیث میں نورہ فرمایا جسکی ضمیر اللہ کی طرف ہے کہ اسم ذات ہے من نور جمالہ یا نور علمہ یا نور رحمتہ وغیرہ نہ فرمایا کہ نور صفات سے تخلیق ہو- علامہ زرقانی رحمہ اللہ تعالی اسی حدیث کے تحت میں فرما تے ہیں (من نورہ) ای من نور ھو ذات یعنی اللہ عز وجل نے نبی صلی اللہ علیہ وسلم کو اس نور سے پیدا کیا جو عین ذات الھی ہے یعنی اپنی ذات سے بلا واسطہ پیدا فرمایا کما سیاتی تقریرہ-

ভাবার্থ: মুহাক্কিক বা বিশ্লেষকদের মতে নূর ইহাকেই বলে যে, স্বয়ং প্রকাশমান এবং অন্যকে প্রকাশকারী, যেমন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী আলাইহির রহমত, আল্লামা যারকানী শরহে মাওয়াহিব শরীফে উল্লেখ করেছেন। এ অর্থে মহান আল্লাহতা’য়ালা হচ্ছেন নূরে হাকিকী বা প্রকৃতপে حقيقة তিনিই একমাত্র নূর, আর الله نور السموات والارض ‘আল্লাহু নূরুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি’ আয়াতে কারীমায় জটিল ও কুটিল ব্যাখ্যা ব্যতিত স্বীয় হাকিকী অর্থে প্রযোজ্য হবে। কেননা নিশ্চয় আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা নিজেই প্রকাশমান এবং অন্যকে প্রকাশকারী। আসমান, জমিন উভয়ের অধিবাসী এবং সমস্ত সৃষ্টিজগতকে জাহির বা প্রকাশ করেছেন। হুজুর পুর নূর সাইয়েদে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিঃসন্দেহে আল্লাহতা’য়ালার জাতি নূর কর্তৃক সৃষ্ট। (অর্থাৎ আল্লাহতা’য়ালা তাঁর হাবিবের জাতি নূরকে সর্বপ্রথম সৃষ্টি করে সেই নূরের সম্পর্ক বেলাওয়াসেতা বা ডাইরেক্ট আল্লাহর জাতের সঙ্গে রেখেছেন। এ অর্থে আল্লাহর জাতি নূর কর্তৃক সৃষ্টি বলা হয়ে থাকে।)

হাদিসশরীফে বর্ণিত আছে-

ان الله تعالى قد خلق قبل الاشياء نور نبيك من نوره-

হে জাবির! নিশ্চয় আল্লাহতা’য়ালা সবকিছুর পূর্বে তোমার নবীর নূর স্বীয় নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন।শায়খ আব্দুর রাজ্জাক এ হাদিসখানা বর্ণনা করেছেন। অনুরূপ ইমাম বায়হাকিও বর্ণনা করেছেন।

হাদিসশরীফে من نوره ‘মিননূরুহি’ বর্ণিত হয়েছে, যার ضمير ‘জমির’ আল্লাহতা’য়ালার ইসমে জাতের দিকে প্রত্যার্পন করেছে। من نور جماله ‘মিন নূরে জামালিহি’ অথবা نور علمه ‘নূরে ইলমিহি’ অথবা نور رحمته ‘নূরে রাহমাতিহি’ ইত্যাদি বলেননি, যেহেতু নূরে সিফাত দ্বারা সৃষ্টি বলা হয়নি।

আল্লামা জারকানী আলাইহির রহমত উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন- من نوره اى من نور هو ذات অর্থাৎ আল্লাহতা’য়ালা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঐ নূর দ্বারা সৃষ্টি করেছেন যা عين ذات الهى‘আইনে জাতে ইলাহি’ বা আল্লাহর প্রকৃত জাত অর্থাৎ স্বীয় জাত কর্তৃক কোন মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্ট বলে অভিহিত করেছেন।

শারিহে বোখারি আল্লামা ইমাম কাসতালানী রাদিয়াল্লাহু আনহু مواهب لدنيه ‘মাওয়াহিবে লাদুনিয়া’ নামক কিতাবে হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একখানা দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদিসশরীফে নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সম্বোধন করে বলেন-

قال يا جابر ان الله تعالى قد خلق قبل الاشياء نور نبيك من نوره (الحديث)

অর্থাৎ ‘হযরত জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে আল্লাহর হাবিব বললেন- হে জাবির! নিশ্চয়ই আল্লাহতা’য়ালা সমুদয় বস্তু সৃষ্টির পূর্বে তাঁর নূর কর্তৃক তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন।’

উক্ত হাদিসশরীফের ব্যাখ্যায় আল্লামা জারকানী আলাইহির রহমত ‘শরহে মাওয়াহিবে লাদুনিয়া’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেন-

من نوره اضافة تشريف واشعار بانه خلق عجيب وان له شانا مناسبة ما الى الحضرة الربوبية على حد قوله تعالى ونفخ فيه من روحه وهى بيانية اى من نور هو ذاته لابمعنى انها مادة خلق نوره منها بل بمعنى تعلق الارادة به بلا واسطة شئ فى وجوده-

অর্থাৎ মিন নূরিহি তাঁর (আল্লাহর) নূর হতে বা নূর কর্তৃক ইহা ইজাফতে তাশরিফি বা সম্মানসূচক সম্বন্ধ এবং ইহা জানিয়ে দেয়া উদ্দেশ্য যে, ইহা সৃষ্টিজগতের এক আশ্চর্য বস্তু। ইহার একটি পৃথক শান রয়েছে আল্লাহতা’য়ালার দরবারে। এ শানটির একটি মুনাসিবত বা সাদৃশ্য হতে পারে আল্লাহতা’য়ালার ঐ বাণীর সাথে- ونفخ فيه من روحه আদম আলাইহিস সালামের দেহ মোবারকে তাঁর (আল্লাহর) রূহ ফুঁকলেন অর্থাৎ এখানে রূহের সম্বন্ধ আল্লাহতা’য়ালার দিকে সম্মানার্থে করা হয়েছে।
من نوره এর মধ্যে من ‘হরফে জার’ বয়ানিয়া, বর্ণনামূলক।من نوره এর মধ্যে
যে নূর রয়েছে এর ব্যাখ্যায় আল্লামা জারকানি আলাইহির রহমত বলেন-

اى من نور هو ذاته অর্থাৎ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে সে নূর আল্লাহতা’য়ালার জাত কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আল্লাহর জাত রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সৃষ্টির মাদ্দা বা মূল ধাতু, বরং ইহার অর্থ এই যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূর মোবারক সৃষ্টি করার মধ্যে আল্লাহতা’য়ালার এরাদা বা ইচ্ছার সম্পর্ক বেলা ওয়াসেতা বা সরাসরি অর্থাৎ কোন কিছুর মাধ্যম ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন।

আল্লামা জারকানি আলাইহির রহমত এর উপরোক্ত দলিলভিত্তিক আলোচনা দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো আল্লাহতা’য়ালা হেকমতে কামেলার দ্বারা সর্বপ্রথম তাঁর হাবিবের নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন এবং সেই সৃষ্ট নূরের ডাইরেক্ট বা সরাসরি সম্পর্ক আল্লাহর জাতের সঙ্গে রয়েছে।

এজন্য বলা হয়ে থাকে আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম عین ذات الھی سے پیدا ہوا আল্লাহর প্রকৃত জাত কর্তৃক সৃষ্টি।

সুতরাং আল্লাহ হচ্ছেন নূরে হাকিকী অর্থ নূর সৃষ্টিকারী আর রাসূলেপাক হচ্ছেন সৃষ্টিতে নূর جنس ‘জিনছে’ বা জাতিতে বশর অর্থাৎ নূরের মানুষ।

পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে, আল্লাহর জাত বা মূল সত্ত্বা হচ্ছে নূরে হাকিকী বা হাকিকী নূর। আল্লাহতা’য়ালার নূরের অংশ হয় না টুকরো হয় না, ভাগ হয় না, এ নূরের কোন উদাহরণ বা মিসাল নেই।
এ প্রসঙ্গে আল্লামা ফাসী আলাইহির রহমত তদীয় ‘মাতালিউল মুসাররাত শরহে দালাইলুল খায়রাত’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেন-

قد قال الاشعرى انه تعالى نور ليس كا الانوار والروح النبوة القدسية لمعة من نوره والملئكة شرر تلك الانوار وقال صلى الله تعالى عليه وسلم اول ما خلق الله نورى ومن نورى خلق كل شئ وغيره مما فى معناه-

অর্থাৎ ইমামে আহলে সুন্নাত আবুল হাসান আশআরী আলাইহির রহমত এরশাদ করেন- নিঃসন্দেহে আল্লাহতা’য়ালা নূর কিন্তু অন্য কোন নূরের মত নয়। (যার কোন উদাহরণ নেই) হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র রূহ মোবারক সেই নূরেরই ঝলক এবং ফেরেশতাগণ ঐ জ্যোতি থেকে ঝড়ে পড়া নূরের খণ্ডসমূহ। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- আল্লাহতা’য়ালা সর্বপ্রথম আমার নূর মোবারককে সৃষ্টি করেছেন এবং আমার নূর হতেই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

শায়খ মুহাক্কিক আল্লামা আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত (ওফাত ১০৫২ হিজরি) তদীয় ‘মাদারিজুন নবুয়ত’ নামক গ্রন্থের ২/৭৭১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

انبیاء مخلوق انداز اسماء ذاتیہ حق واولیاء ازاسماء صفاتیہ وبقیہ کائنات ازصفات فعلیہ وسید رسل مخلوق ست ازذات حق و ظھور حق دروی بالذات ست-

অর্থাৎ ‘আম্বিয়ায়ে কেরামগণকে আল্লাহতা’য়ালার ইসমে জাত (সত্ত্বাগত নাম) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর আউলিয়ায়ে কেরামগণকে আসমায়ে সিফাতিয়া (গুণগত নামসমূহ) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্যান্য সকল সৃষ্টিকে সৃষ্টি করা হয়েছে সিফাতে ফে’লিয়া (ক্রিয়াগত গুণসমূহ) থেকে। সাইয়িদুল মুরসালিনকে হক তা’য়ালার জাত (সত্ত্বা) কর্তৃক সৃষ্টি করা হয়েছে। আর হক তা’য়ালার বহিঃপ্রকাশ বা বিকাশ ঘটেছে তার মধ্যে সত্ত্বাগতভাবে।’
আল্লাহপাকের জাত সম্পর্কে মুফতি মোস্তফা হামিদী সাহেবের ভুল ব্যাখ্যা:

শর্ষিণা দারুচ্ছুন্নাত কামেল মাদ্রাসার সাবেক উপাধ্য মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ মোস্তফা হামিদী সাহেব ‘ফাতাওয়ায়ে দারুচ্ছুন্নাত’ নামক একখানা পুস্তক সংকলন করেছেন।উক্ত পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ডের ২১ পৃষ্ঠায়- الله نور السموات والارض ‘আল্লাহতা’য়ালা আসমান জমিনের নূর’ এ আয়াতে কারীমার তাফসির করতে গিয়ে ‘তাফসিরে কবির’ নামক কিতাবের নিম্নলিখিত এবারত পেশ করে প্রমাণ করতে অপচেষ্টা করেছেন যে- نور ‘নূর’ আল্লাহতা’য়ালার জাত হতে পারে না।

اعلم ان لفظ النور موضوع فى اللغة لهذه الكيفية الفائضة من الشمس والقمر والنار على الارض والجدران وغيرهما وهذه الكيفية يسحيل ان تكون الها لوجوه الخ-

জানা উচিত যে, আভিধানিক অর্থে নূর ঐ আলোকে বলে যা সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি হতে ভুপৃষ্টে প্রাচীর ও অন্যান্য বস্তুর উপর নিপতিত হয়।আর আলোর এ অবস্থাকে কয়েকটি কারণে ইলাহ (প্রভু) বলা অসম্ভব।

উপরোক্ত এবারতের যে ভাবার্থ- তা হলো সৃষ্ট নূর। আল্লাহতা’য়ালার نور হচ্ছে হাকিকী নূর যার অর্থ منور ‘মুনাওইর’ নূর সৃষ্টিকারী। আল্লাহর নূর হচ্ছে নূরে মতলক।

আল্লাহই হচ্ছেন একমাত্র নূর।আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপর যে নূরের এতলাক হয় তা হচ্ছে বিজ্জাত জুলমত বা অন্ধকার।যাকে আল্লাহ নূর করেছেন তিনিই হচ্ছেন আল্লাহর সৃষ্টি নূর।যেমন সহিহ হাদিসশরীফে রয়েছে আল্লাহর হাবিব নিজেই এরশাদ করেছেন- اول ما خلق الله نورى ‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আমি নবীর নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন’। নবী হচ্ছেন আল্লাহর সৃষ্ট নূর।
আল্লাহতা’য়ালার নূর হচ্ছে হাকিকী নূর। যার আরম্ভও নেই, শেষও নেই।তিনি হচ্ছেন ওয়াজিবুল ওজুদ।অবশ্যম্ভাবী যার তুলনা সৃষ্টির মধ্যে কেউই নেই, এবং আল্লাহতা’য়ালার জাতে কোন শরীক নেই,তেমনি আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল্লার সিফাতে খাসসা বা খাস গুণাবলীরও কোন নজির নেই।

ইতোপূর্বে ‘তাফসিরে কবির’ নামক কিতাব হতে মুহাক্কিকীনদের তাহকিক এর দলিল সহকারে ৫টি এবারতের মাধ্যমে উল্লেখ করে প্রমাণ করা হয়েছে:

১. আল্লাহতা’য়ালাই একমাত্র নূর। আল্লাহ ব্যতিত সব কিছু بالذات বা সত্ত্বাগতভাবে মুজলিম বা অন্ধকার।

২. আল্লাহতা’য়ালা হচ্ছেন নূরে মতলক এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যের উপর নূরের এতলাক বা অন্য কাউকে নূর বলে আখ্যায়িত করা রূপক অর্থে (মজাজি) নূর।

হামিদী সাহেব ‘তাফসিরে কবির’ নামক কিতাবের সৃষ্ট নূর এর এবারত পেশ করে আল্লাহর জাত নূর নয় বলে যে দাবি করেছেন তা সঠিক নয়।তা ব্যাখ্যার নামে অপব্যাখ্যা করা হয়েছে।

কিন্তু এ তাফসিরে আল্লামা ইমাম গাজ্জালী আলাইহির রহমতের তাহকিকাত পেশ করে ইমাম ফখরুদ্দিন রাজী আলাইহির রহমত স্পষ্টভাবে তাহকিকের সাথে আল্লাহর ‘জাত’ যে নূর যার অর্থ منور ‘মুনাওইর’ তা প্রমাণ করেছেন।

হামিদী সাহেব তাফসিরে কবিরের আদ্যপান্ত পাঠ করেন নাই।তাই নিজের মনগড়া মতে ফতওয়া দিয়েছেন।তার এ ফতওয়া সংশোধন আমরা কামনা করি।
আল্লাহপাকের জাত ও সিফাত সম্পর্কে আকিদা:

হুজ্জাতুল ইসলাম আল্লামা ইমাম গাজ্জালী আলাইহির রহমত এর ‘এহইয়ায়ে উলুমুদ্দিন’ নামক কিতাবের ১ম জিলদের ৫৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-

انه واحد لاشريك له فرد لا مثل له صمد لا ضد له منفرد لا ند له وانه قديم لا اول له ازلى لا بداية له مستمر الوجود لا اخر له ابدى لا نهاية له قيوم لا انقطاع له دائم لا انصرام له لم يز
ل ولا يزال موصوف نبعوث الجلال لا يقضى عليه بالانقضاء والانفصال بتصرم الاماد (اى لا يقضى عليه بانقضاء تصرم الاماد) وانقراض الاجال بل هو الاول والاخر والظاهر والباطن-

অর্থাৎ নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) তাঁর অস্তিত্বে অদ্বিতীয় তাঁর কোন শরিক নেই, তিনি একক, তাঁর কোন সাদৃশ্য নেই, তিনি অভাবশূণ্য, তাঁর কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, তিনি সর্বসর্বা, তাঁর কোন অংশিদার নেই, তিনি অনাদিও অসীম, সর্বক্ষণ বিরাজমান, তাঁর কোন বিরাম নেই, তিনি অনন্তকাল স্থায়ী, তাঁর কোন শেষ নেই, তিনি গৌরবের গুণে সকল সময়ই গুণান্বিত ছিলেন, আছেন ও থাকবেন, সময়ের অতীতেও তাঁর শেষ নেই। তিনি প্রথম, তিনি শেষ, তিনি প্রকাশ্য, তিনি গুপ্ত এবং সর্ব বিষয়ে তিনি মহাজ্ঞানী।

তারপর ইমাম গাজ্জালী আলাইহির রহমত উক্ত কিতাবের ৫৩ পৃষ্ঠায় আরো লিখেন-

وانه ليس بجسم مصور ولا جوهر محدود مقدر انه لا يماثل الاجسام لا فى التقدير ولا فى قبول الانقسام وانه ليس بجوهر ولا تحله الجوهر ولا يعرض ولا تحله الاعراض بل لا يماثل موجودا ولا يماثله موجود ليس كمثله شئ ولا هو مثل شئ وانه لا يحده المقدار ولا تحويه الاقطار ولا تحيط به الجهات ولا تكشفه الارضون ولا السموات وانه مستو على العرش على الوجه الذى قاله وبالمعنى الذى اراده استواء منزها عن المماسة والاستقرار والتمكن والحلول والانتقال لا يحمله العرش بل العرش وحملته محمولون بلطف قدرته ومقهورون فى قبضته-

ভাবার্থ: আল্লাহ অশরিরী নিরাকার, পরিমাণশূণ্য, সাদৃশ্যহীন, তকদীরহীন, অবিভাজ্য, অণু-পরমাণূশূণ্য, তাঁর দৈর্ঘ বা প্রস্থ নেই, কোন জিনিস দ্বারা তাঁর দৃষ্টান্ত দেয়া যায় না, তিনি কোন জিনিসের তুল্য নন, তাঁর ন্যায় আর কিছুই নেই। তিনি কোন জিনিসের ন্যায় নন। তিনি পরিমাণের ভেতর সীমাবদ্ধ নন, কোন স্থানের ভেতর তিনি বিবদ্ধ নন, কোন দিক তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না।
আসমান ও জমিন তাঁকে লুকিয়ে রাখতে পারে না। তিনি পরিশ্রম, বিশ্রাম, স্থিতি, স্থান পরিবর্তন হতে মুক্ত। তিনি আরশের সম্মুখে অবস্থিত, যার সম্মন্ধে আল্লাহ নিজেই বলেছেন- استوى على العرش আর ইসতাওয়ার অর্থ হচ্ছে- পরিশ্রম, বিশ্রাম, স্থিতি, স্থান পরিবর্তন হতে তিনি (আল্লাহ) মুক্ত। আরশ তাঁকে বহন করে না (অর্থাৎ আল্লাহ আরশে বসতে পারেন না, কারণ আল্লাহ নিরাকার, অশরিরী) বরং আরশ ও তার বহনকারী (ফেরেশতা)-কে আল্লাহর কুদরতের করুণা বহন করে আসছে। সবকিছুই আল্লাহর আয়াত্তাধীন।’

তারপর তিনি বলেন-

وهو الان على ما عليه كان وانه بائن عن خلفه بصفاته ليس فى ذاته

অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) পূর্বে যেরূপ ছিলন, এখনও তিনি সেরূপই আছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টির নিকট গুণ দ্বারা প্রকাশ, অস্তিত্ব বা জাত দ্বারা নয়।

আল্লামা ইমাম গাজ্জালী আলাইহির রহমত ‘এহইয়ায়ে উলুমিদ্দিন’ নামক কিতাবের ১ম জিলদের ৫৪ পৃষ্ঠায় আরো বলেন-

يرى من غير حدقة واجفان ويسمع من غير ضمخة واذان كما يعلم بغير قلب ويبطش بغير جارخة ويخلق بغير اله اذ لاتشبه صفاته صفات الخلق كما لا تشبه ذاته ذات الخلق-

অর্থাৎ আল্লাহপাক চক্ষু ব্যতিত দেখেন, কর্ণ ব্যতিত শুনেন, দ্বিল ব্যতিত জ্ঞান রাখেন, হস্ত ব্যতিত ধরেন, যন্ত্র ব্যতিত সৃষ্টি করেন, তাঁর গুণ সৃষ্টির তুল্য নয়। যেরূপ তাঁর অস্তিত্ব, সৃষ্টির অস্তিত্বের তুল্য নন।

সারকথা হলো- আল্লাহর মহান গুণ হলা আল্লাহ কারো মুখাপেী বা মুহতাজ নন, الله الصمد আল্লাহ হলেন সমদ বা বেনিয়াজ। অর্থাৎ আল্লাহর দেখতে চোখের প্রয়োজন নেই, শুনতে কানের প্রয়োজন নেই, জ্ঞান রাখতে দিলের প্রয়োজন নেই, ধরতে হাতের প্রয়োজন নেই।

আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত তদীয় ‘তাকমীলুল ঈমান’ নামক কিতাবে আল্লাহর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন-

وليس مجسم ولا جوهر ولا عرض ولا مصور ولا مركب ولا معدود ولا محدود ولا فى جهة ولا فى مكان ولا فى زمان-

অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) দেহবিশিষ্ট নন, তিনি জওহর বা বস্তু বিশেষ নন, আরজ বা বস্তু বিশিষ্টও নন। তিনি আকারবিশিষ্ট নন, তিনি মুরাক্বাব নন, (তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেই)।

সংখ্যা ও আধিক্যতাবিশিষ্ট নন, পরিমাণযোগ্য নন, তিনি দিকশূণ্য, তিনি কোন স্থানে অবস্থান করেন না এবং তাঁর উপর কোন সময় বহে না। অর্থাৎ তিনি নিরাকার, জমান মকান ও দিক থেকে তিনি পবিত্র তারপর তিনি উক্ত কিতাবে আরো বলেন-

لا مثل له ولا شبه ولا ضد ولا ند له ولا ظهر ولا معين-

অর্থ: তিনি উপমাহীন, রূপকহীন, তাঁর সমতুল্য কেউ নেই, তাঁর সমক কেউ নেই, তাঁর সাহায্যকারী ও সহযোগী কেউ নেই অর্থাৎ তাঁর সাহায্য-সহযোগিতার কোন প্রয়োজন নেই তিনি হলেন সমদ বা কারো মুখাপেী নন।

উপরোক্ত আলোচনার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, আল্লাহ এক, তাঁর কোন শরিক নেই, তিনি সৃষ্টিকর্তা, তিনি কোন বস্তুর মত নন, কোন বস্তুও তার মত নয়, গোটা আলম তথা আল্লাহ ছাড়া যা কিছু আছে সবই হাদস অর্থাৎ ধ্বংসশীল।
যখন এসব কিছুই ছিল না তিনি তখনও ছিলেন আবার যখন কোন কিছুই থাকবে না তিনি তখনও থাকবেন। তিনি একাই নিজের কুদরত দ্বারা সম্পূর্ণ ‘নেই’ হতে সব কিছু সৃজন করেছেন, তথা অস্তিত্ব দান করেছেন, তিনিই হলেন আল্লাহ।
তিনি এক, একক ও অদ্বিতীয়, অনাদি, অবিনশ্বর, শাশ্বত ও চিরজীব, সর্বময় মতার অধিকারী, সর্বজ্ঞ, সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা এবং স্বাধীন ও কার্যকর ইচ্ছাশক্তির মালিক।

তিনি عرض ‘আরজ’ তথা এমন বস্তু নন, যা অন্যের মাধ্যম ছাড়া স্থিতিশীল হতে পারে না। যথা- রং, গন্ধ, স্বাদ, তাপ, শীতলতা, আদ্রতা ও শুষ্কতা ইত্যাদি।
তিনি জিসিম তথা দেহবিশিষ্ট নন। কেননা দেহ বহু অবিভ্যাজ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ এবং স্থান দখলকারী। অথচ এ সবই নশ্বর সৃষ্টিকুলের বৈশিষ্ট্য।

তিনি মানুষ কিংবা অন্যান্য প্রাণীর আকার আকৃতিবিশিষ্টও নন। কেননা ইহা (আকৃতি) দেহের বৈশিষ্ট্য, যা দেহের প্রান্তসীমা ও পরিধি তথা দৈর্ঘ, প্রস্থ ও বেধ দ্বারা অর্জিত অবস্থা তথা আয়তন ও পরিমাণ হতে সৃষ্টি হয়ে থাকে।
তিনি প্রান্ত, সীমা ও পরিধিবিশিষ্ট নন। অর্থাৎ তিনি সসীম তথা পরিমাণযোগ্য নন। বরং তিনি আদি, অন্ত, মধ্যহীন, তিনি অনন্ত, অসীম।
তিনি সংখ্যা ও আধিক্যতাবিশিষ্ট নন। অর্থাৎ তিনি গণণা ও পরিসংখ্যানযোগ্য নন। তিনি অংশ ও আংশিকতা মুক্ত। তাঁর জাত বিভিন্ন খণ্ডে খণ্ডে ও অংশে বিভক্ত ও বিভাজ্য হয় না।
বহু পৃথক পৃথক ও স্বতন্ত্র অংশে মিলিত হয়ে তাঁর জাত গড়ে উঠেনি। কেননা যার অংশ থাকে এবং যা বহু বিচ্ছিন্ন অংশ দ্বারা সংযোজিত, উহার অস্তিত্ব লাভের ক্ষেত্রে ঐ সব অংশের প্রতি মুখাপেীতা অপরিহার্য। আর এই মুখাপেতিা আল্লাহর অনিবার্য সত্ত্বার পরিপন্থী।

তাঁর উপর কোন সময় বহে না। তাঁর সাথে কোন বস্তুর সাদৃশ্য নেই। তাঁর ইলম ও কুদরতের বহির্ভুত কোন বস্তু নেই। তাঁর জাতের মধ্যে অন্য কোন বস্তু স্থান পায় না এবং পেতে পারে না। তিনি কোন বস্তুতে প্রবেশ করে না এবং তাঁর মধ্যেও কোন বস্তু প্রবেশ করে না এবং করতেও পারে না এবং তিনি কোন বস্তুর সাথে এক হয়ে যান না।

তিনি অনন্ত ও অসীম। কেননা সসীম হওয়া পরিমাণ ও পরিসংখ্যানযোগ্য বস্তুর বৈশিষ্ট্য। তিনি অংশ ও আংশিকতামুক্ত। তিনি কোন বস্তুর শ্রেণিভুক্ত নন। তিনি দেহের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য গুণাবলী যথা- রং, স্বাদ, গন্ধ, তাপ, শীতলতা, আদ্রতা ও শুষ্কতা ইত্যাদি হতে মহাপবিত্র। কেননা এসবই দেহ তথা সংযোজিত ও সংমিশ্রিত বস্তুর গুণ। তিনি কোন স্থানে অবস্থান করেন না।

অনুরূপ শাহ ওলি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত তদীয় ‘আল কাওলুল জামিল’ নামক কিতাবের ৩৭ পৃষ্ঠা লিখেছেন-

منزه من جميع سمات النقص والزوال من الجسمية والتحير والعرضية والجهة والالوان والاشكال-

অর্থাৎ ‘আল্লাহতা’য়ালা অপূর্ণতা ও নশ্বরতার এ জাতীয় সবকিছু থেকে মুক্ত। তিনি দেহধারী, স্থান গ্রহণকারী, কোন দিকে অবস্থানকারী, বর্ণ ও আকৃতিধারী এবং দেহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যধারী নন।

‘মাকতুবাতে ইমামে রাব্বানী’ নামক কিতাবের (উর্দু) ১১৫৮/৬২পৃষ্ঠায় মাকতুবাত নং ৬৭) উল্লেখ করেন-

اور اللہ کسی چیز سے متحد نہیں ہوتے اور نہ ھی کوئ اور چیز ان سے متحد ہوتی ہے اور اللہ تعالی کسی چیز میں حلول بھی نہیں کرتا اور نہ ھی کوئ چیز اللہ میں حلول کرتی ھے اور اللہ تعالی کے لۓ اجزاء اور حصص کا ہونا بھی محال ہے اور ترکیب وتحلیل اللہ تعالی کی بارگاہ میں ممنوع ھے اور اللہ تعالی کا کوئ مثل اور کفو نہیں ھے بیوی بچے نہیں ہیں- اسکی ذات وصفات بے چوں بے جگون اور بے شبیہ اور بے نمونہ ہیں- ھم صرف اتناجنتے ہیں کہ اللہ تعالی اور اسماء وصفات کاملہ سے جن سے اپنے آپ کی تعریف کی ہے ان سے متصف ہے ان میں جو چیز بھی ہمارے فھم وادراک اۓ اور ہم اسے سمجہ سکیں اور تصور کرسکا وہ اس سے پاک اور بلند ہے-

ভাবার্থ: আল্লাহতা’য়ালা কোন বস্তুর সাথে একত্রিত নন এবং কোন বস্তু তাঁর সঙ্গে এক হয়ে যায় না। আল্লাহতা’য়ালা কোন বস্তুর ভিতর অনুপ্রবেশ করেন না। আল্লাহতা’য়ালার জন্য খণ্ড ও অংশ হওয়া অসম্ভব। তরকীব বা সংমিশ্রণ, তাহলিল বা দ্রবীভূত হওয়া তাঁর পাক জাতে দুস্কর ও নিষিদ্ধ। আল্লাহতা’য়ালার কোন অনুরূপ ও সমশ্রেণিভূক্ত কেউ নেই। তাঁর স্ত্রী পুত্র নেই। তাঁর জাতে ও সিফাত বা গুণাবলীসমূহ রকম প্রকারবিহীন এবং অনুরূপ ও নিদর্শন রহিত।
আমরা শুধু এতটুকু জানি (ঈমান রাখি) যে আল্লাহতা’য়ালা আছেন এবং তিনি যেরূপ নিজের প্রশংসা করেছেন, তদ্রুপ তাঁর নাম ও কামেল গুণাবলীতে বর্তমান আছেন।’

উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল্লা স্বেচ্ছায় অস্তিত্ববান এবং অপরাপর সবকিছুই তাঁর সৃষ্টির কারণে অস্তিত্ব লাভ করেছে, আল্লাহপাক আপন জাত ও সিফাত এবং কর্মকাণ্ডের মাঝে সম্পূর্ণ একা। প্রকৃতপে কোন বিষয়ে চাই উহা অস্তিত্ব হোক অথবা অস্তিত্বহীন হোক, কেউই তাঁর সঙ্গে অংশীদার নন। নামগত অংশিদারত্ব ও শব্দগত সম্পর্কে আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়।

মাকতুবাত ৩/১১৫৭/৬২ পৃষ্ঠা মাকতুবাত নং ৬৭ উল্লেখ রয়েছে-

اللہ سبحانہ وتعالی اکیلا ہے ان کا کوئ شریک نہیں نہ وجوب ووجود میں اور نہ عبادت کے مستحق ہونے میں- وجود وجوب (لازمی طور پر قائم رھنا) اللہ تعالی کے سوا کسی کے لۓ لائق نہیں اور نہ عبادت کا استحقاق اس کے سوا کسی کے لۓ درست نہیں-
اللہ تعالی صفات کاملہ رکھتا ہے جن میں سے حیات- علم- قدرت- اردہ- سمع- بصر- کلام اور تکوین بھی ہیں- یہ صفات ازلی اور قدیمی ہیں- اور اللہ جل سلطانہ کی ذات کے ساتھ قائم ہیں

ভাবার্থ: আল্লাহপাক সুবহানাহু ওয়াতায়ালা এক তাঁর কোন শরিক বা সমকক্ষ নেই। অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বধারী হিসেবে হোক অথবা এবাদতের উপযোগী হিসেবে হোক তিনি সমকক্ষ বিহীন। তিনি ব্যতিত অন্য কেউই অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বের উপযোগী নয় এবং ইবাদতের যোগ্যতাও কেউই রাখেন না।

আল্লাহতা’য়ালার সিফাতে কামেলা বা পূর্ণাঙ্গ গুণ সর্বমোট ৮টি রয়েছে-
১. হায়াত বা জীবনী শক্তি
২. এলম বা জ্ঞান
৩. কুদরত বা ক্ষমতা
৪. এরাদত বা ইচ্ছাশক্তি
৫. ছামা বা শ্রবণশক্তি
৬. বছর বা দর্শনশক্তি
৭. কালাম বা বাকশক্তি
৮. তাকবিন বা সৃষ্টিশক্তি

এ ৮টি সিফাতসমূহ কাদীম ও আজলি বা প্রাচীন। (যার কোন আরম্ভ নেই) অনাদি (যার কোন শেষ নেই)। এ গুণসমূহ আল্লাহ জাল্লা শানুহুর জাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নবজাত বস্তুসমূহের সাথে সম্পর্ক সিফাতসমূহের অনাদিত্বের মধ্যে কোনরূপ ব্যতিক্রম ঘটাতে সক্ষম হয় না। সম্পর্কিত বস্তুর নতুনত্ব ইহাদের চিরস্থায়ীত্বের প্রতিবন্ধক হয় না।’

মাকতুবাতে ইমামে রাব্বানী ৩/১৬১৩/১৫৩ পৃষ্ঠা মকতুব নং ১২২ উল্লেখ রয়েছে-

آنحضرت صلی اللہ علیہ وسلم بھی اس جاہ وجلال اور اس بلندی شان کے با وجود ہمیشہ ممکن ہیں اور ہرگز امکان سے باہر نہیں آسکتے اور نہ واجب سے مل سکتے کیونکہ یہ الوھیت سے متصف ہونے کو مستلزم ہے اور تعالی اس سے بلند ھے کہ کوئ اسکا شریک اور برابری کرنے والا ہو-
دع ما ادعتہ النصاری فی نبیھم
واحکم بما شئت مدحا فیہ واحتکم

ভাবার্থ: হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ শান-শওকত ও কুল কায়েনাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও সবসময় (চিরকালই) তিনি হচ্ছেন ممكن মমকিন বা সম্ভাব্য ও সৃষ্টবস্তু। নিশ্চয় তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ممكن মমকিন বা সম্ভাব্য হতে নিষ্কৃতি লাভ করেন নাই এবং আল্লাহতা’য়ালা যিনি واجب الوجود ‘ওয়াজিবুল ওজুদ’ বা অবশ্যম্ভাবী জাতে পাকের সাথে মিলিত হতে পারেন না, এজন্য জাতে উলুহিয়াতের সাথে মিলিত হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে।কারণ আল্লাহতা’য়ালা তাঁর সমকক্ষ ও শরিক হওয়া হতে তিনি অতি উচ্চ ও পবিত্র।

কহিল নাছারা যাহা স্বীয় নবীর পরে
কহিও না তোরা তাহা মম নবী বরে।

মাহবুবে খোদা আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি নূর:

আল্লাহর হাবিব সৃষ্টি নূর এবং তাঁর নূর দ্বারা আল্লাহপাক কুল কায়েনাত সৃষ্টি করেছেন। একাদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আল্লামা শেখ আব্দুল হক মোহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত তদীয় مدارج النبوة ‘মাদারিজুন নবুয়ত’ নামক কিতাবের ২/২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন-

بدانکہ اول مخلوقات وواسطۂ صدور کائنات وواسطۂ خلق عالم وآدم نور محمدست صلی اللہ علیہ وسلم- چنانکہ درحدیث صحیح وارد شدہ کہ اول ما خلق اللہ نوری وسائرمکونات علوی وسفلی ازان نور وازان جوھر پاک پیدا شدہ ازارواح واشباح وعرش وکرسی ولوح وقلم وبہشت ودوزخ وملک وفلک وانس وجن وآسمان وزمین وبحار وجبال واشجار وسائر مخلوقات ودرکیفیت صدور این کثرت ازان وحدت وبروز وظھور مخلوقات ازان جوھر عبارات وتغيرات غر
يب آوردہ اند وحدیث اول ما خلق اللہ العقل نزد محققین ومحدثین بصحت نرسیدہ وحدیث اول ما خلق اللہ القلم نیزگفتہ اند کہ مراد بعد العرش والماءاست کہ واقع شدہ است وکان عرشہ علی الماء الخ-

ভাবার্থ: এ এক চিরন্তন বাস্তবতা যে, নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন সমগ্র সৃষ্টির প্রথম, সমস্ত কায়েনাতের ওসিলা, বিশ্বজগৎ এবং হযরত আদম আলাইহিস সালাম এর সৃষ্টির মাধ্যম হচ্ছে নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সহিহ হাদিসশরীফে এসেছে, রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- اول ما خلق الله نورى ‘আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু নুরী’
অর্থাৎ আল্লাহতা’য়ালা সমস্ত মাখলুক সৃষ্টির পূর্বে আমার নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন এবং ঊর্ধ্ব ও অধঃজগতের সবকিছুই নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নূর মোবারক থেকে সৃষ্ট। তাঁর পবিত্র নূরী জাওহার থেকে সৃষ্টি হয়েছে রূহসমূহ, আরশ, কুরসি, লওহ, কলম, বেহেশত, দোযখ, ফেরেশতা, ইনসান, জিন, আসমান, জমিন, সাগর, পাহাড়, গাছ, বৃক্ষ এবং কুল মাখলুকাত। এ সকল কিছুর প্রকাশ ও বিকাশ ঘটেছে তাঁরই ওসিলায়। সেই হাকিকতের প্রকাশের বর্ণনায় বিজ্ঞ বিজ্ঞ আলেমগণ বিস্ময়কর ও সূক্ষ বর্ণনা পেশ করেছেন।’

এক রেওয়ায়েতে এসেছে-اول ما خلق الله العقل ‘আউয়ালু মা খালাকাল্লাহুল আকলু’ আল্লাহতা’য়ালা সর্বপ্রথম আকল সৃষ্টি করেছেন। তবে এই হাদিস মুহাক্কিক ও মুহাদ্দিসগণের মতে সহিহ এর স্তরে পৌছেনি। অন্য রেওয়ায়েতে রয়েছে- اول ما خلق الله القلم ‘আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু কলম’ সর্বপ্রথম আল্লাহতা’য়ালা কলম সৃষ্টি করেছেন। এ হাদিসটির অর্থ মুহাদ্দিসগণ এভাবে করেছেন যে, আরশ ও পানি সৃষ্টির পরে প্রথমে কলম সৃষ্টি করেছেন। আবার কোন কোন হাদিসের ব্যাখ্যায় এ রকম এসেছে যে, পানি সৃষ্টি হয়েছিল আরশের পূর্বে وكان عرشه على الماء
এর পরপরই আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত বলেন- হাদিসশরীফে এসেছে, যখন কলম সৃষ্টির পর আল্লাহতা’য়ালা তাকে বললেন লেখ, তখন কলম বললো, কি লেখবো? আল্লাহতা’য়ালা বললেন- ما كان وما يكون الى الابد ‘মা কানা ওয়ামা ইয়াকুনু ইলাল আবাদ’ অতীত এবং ভবিষ্যতের সবকিছু লিখ।
এতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল যে, কলম সৃষ্টির পূর্বেও কিছু সৃষ্টি হয়ে ছিল।
আলেমগণ বলেন- আরশ, কুরসি এবং রূহসমূহ সৃষ্টির পূর্বে নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূর মোবারক প্রকাশ্য জগতে এসেছে। ما كان ‘মা কানা’ যা কিছু হয়েছিল এ অর্থই বহন করে। তাহল নূরে মুহাম্মদীর হাল ও সিফাতসমূহ। কেননা সমগ্র জগতের মধ্যে নূরে মুহাম্মদী অগ্রগণ্যতা সুসাব্যস্ত اول ما خلق الله نورى অপরদিকে وما يكون ‘ওমা ইয়াকুনু’ এর অর্থ হলো পৃথিবীর পরবর্তীতে প্রকাশিতব্য সকল কিছু। আলমে জহুর বা বাহ্যিকজগতে রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়ত প্রমাণিত ছিল। যেমন আল্লাহর হাবিব বলেছেন- كنت نبيا وادم بين الروح والجسد অর্থ- আমি ঐ সময়ও নবী ছিলাম, যখন আদম আলাইহিস সালাম আত্মা ও দেহের মাঝামাঝিতে ছিলেন। (মাদারিজুন নবুয়ত- ২-৩ পৃষ্ঠা)

আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত হাদিসের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন-

ودر اخبار آمدہ است کہ چون مخلوق شد نور انحضرت وبیرون آمدازوی انوار انبیاء علیہم السلام امرکرد اورا پروردگار تعالی کہ نظر کند بجانب انوار ایشان پس نظر کرد آنحضرت وپوشید انوار ایشاں را گفتندای پروردگار ما این کیست کہ پوشید نوروی انوار ما را گفت اللہ تعالی این نور محمد بن عبد اللہ است اگر ایمان آرید بوے میگرادنم شمارا انبیاء گفتند ایمان آوردیم یارب بوے وبہ نبوت وی پس گفت رب العزت جل جلالہ گواہ شدم برشمادانیست معنی قول حق سبحانہ تعالی واذا اخذ اللہ میثاق النبیین لما اتیتکم من کتاب رحکمۃ الایۃ- مدارج النبوۃ ص ۳/ ۲

ভাবার্থ: ‘হাদিসশরীফে এসেছে, যখন নূরে মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সৃষ্টি করা হলো এবং তাঁর নূর থেকে (আল্লাহর হাবিবের নূর থেকে) সকল নবীগণ আলাইহিমুস সালাম এর নূরসমূহ বের করা হল, তখন আল্লাহতায়ালা নূরে মোস্তফা আলাইহিস সালামকে বললেন, ঐ নূরসমূহের প্রতি দৃষ্টিপাত কর।তিনি তাই করলেন।ফলে তাঁর নূরে সকল নূরের উপর প্রধান্য বিস্তার করল এবং অন্যান্য নূর হয়ে গেল আলোকবিহীন।তাঁরা নিবেদন করল, হে পরওয়ার দিগারে আলম! তা কার নূর যা আমাদের সকলের নূরকে ম্লান করে দিল? আল্লাহতা’য়ালা ইরশাদ করলেন- এ নূর মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহর। তোমরা যদি তাঁর উপর ঈমান আন তবে আমি তোমাদেরকে নবী বানাবো। সকলেই সমস্বরে বলল, হে আমাদের রব! আমরা তাঁর উপর ও তাঁর নবুয়তের উপর ঈমান আনলাম। আল্লাহতা’য়ালা বলেন- আমি তোমাদের এ কথার সাক্ষী রইলাম। এদিকে ইঙ্গিত করেই কোরআন মজীদের এক আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে-

واذ اخذ الله ميثاق النبيين لما اتيتكم من كتاب و حكمة الخ

অর্থাৎ আল্লাহ যখন নবীগণের নিকট থেকে এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করব। (মাদারিজুন নবুয়ত, ২-৩ পৃষ্ঠা)

তাফসিরে রুহুল মায়ানী ৩য় জিল্দ ৮ পারা ৭১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

(وانا اول المسلمين ۱٦۳) وقيل: هذا اشارة الى قوله عليه الصلوة والسلام- اول ما خلق الله تعالى نورى-

অর্থাৎ আলোচ্য আয়াতে কারীমার তাফসিরে রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী- اول ما خلق الله نورى সর্বপ্রথম আল্লাহতা’য়ালা আমার নূর সৃষ্টি করেছেন। এ দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

تفسير روح البيان ‘তাফসিরে রুহুল বয়ান’ ৩য় জিলদের সূরায়ে আনআম ১২৯ পৃষ্ঠায় আশ শায়খ ইসমাঈল হক্কী বরছয়ী আলাইহির রহমত
(ওফাত ১১৩৭ হিজরি)

(وانا اول المسلمين) يعنى اول من استسلك عند الايجاد لامركن وعند قبول فيض المحبة لقوله (يحبهم ويحبونه) والاستلام للمحبة فى قوله يحبونه دل عليه قوله عليه السلام (اول ما خلق الله نورى)

অর্থাৎ وانا اول المسملين আমি সর্বপ্রথম মুসলমান এর অর্থ হলো সর্বপ্রথম সৃষ্টি করার সময় আল্লাহতা’য়ালার আদেশ كن ‘কুন’ হয়ে যায়কে আমি সর্বপ্রথম মেনে নিয়েছি। অনুরূপভাবে মহব্বতের ফয়েজ গ্রহণ করার সময় আমি সর্বপ্রথম গ্রহণ করেছি। কারণ আল্লাহতা’য়ালা এরশাদ করেন, তিনি তাদের মহব্বত করেন। আর তাঁরা আল্লাহকে মহব্বত করেন। এ মহব্বতে ফয়েজ গ্রহণের বেলায় নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম, যা তাঁর বাণী ‘আল্লাহ তা’য়ালা আমার নূরকে সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেছেন প্রমাণ করছে।

শেখ আব্দুল হক মোহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত বলেন-

فضيلت اعلی واکمال وی صلی اللہ علیہ وسلم وآلہ وسلم آنست کہ پرور دگار تعالی روح اورا پیشتر ازارواح خلائق پیدا کردہ وارواح سائر مکونات را از روح وے منشعب گردایندہ ہمہ را از نوروی آفریدہ ووی صلی اللہ علیہ وسلم وآلہ وسلم نبی بودہ وآدم ھنوزمیاں روح وجسد بود کما رواہ الترمذی عن ابیھریرۃ رضی اللہ عنہ ودر عالم ارواح نیز فیض بارواح انبیاء از روح او رسیدہ، (مدارج النبوت جلد ۱ ص ۱٤۳)

ভাবার্থ: নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে উন্নত ও পরিপূর্ণ মর্যাদা হল এই যে, আল্লাহতা’য়ালা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূহ মোবারককে অন্যান্য সকল রূহ মোবারকের পূর্বে সৃষ্টি করেছেন। তারপর আল্লাহর হাবিবের রূহ মোবারক হতে সমস্ত রূহ সৃষ্টি করেছেন।হযরত আদম আলাইহিস সালাম রূহ ও জসদ বা শরিরাকৃতির মধ্যে থাকা অবস্থায় রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী ছিলেন।যেমন তিরমিজিশরীফে হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করা হয়েছে। অপরদিকে আলমে আরওয়াহ বা রূহের জগতে এমনকি সমস্ত নবীগণের রূহ মোবারকগণ ও সায়্যিদে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূহ মোবারক হতে পূর্ণ ফয়েজ ও বরকত প্রাপ্ত হয়েছেন।

শাহ ওলি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত তদীয় ‘ইনতেবাহ ফি সালাসিলিল আউলিয়া আল্লাহ’ নামক কিতাবের ৮২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

نور اول کہ آں نور محمدی ست صلی اللہ علیہ وسلم ونیز آں را شھود اول می گویند-

অর্থাৎ নূরে মুহাম্মদী সর্বপ্রথম সৃষ্টি। এজন্য তিনিই সর্বপ্রথম আল্লাহর একত্বের স্বাক্ষ্য প্রদান করেছিলেন।
মুল্লা আলী ক্বারী আলাইহির রহমত مرقاة شرح مشكوة ‘মিরকাত শরহে মিশকাত’ নামক কিতাবের ১ম জিলদের ১৩৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

ان اول شئ خلق الله القلم وهو غير صحيح … فا الاولية اضافيه والاول الحقيقى هو النور المحمدى على ما بينته فى المورد للمولد-

অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন।আর সেটা হচ্ছে গায়রে সহিহ বা অশুদ্ধ। অতএব আউয়ালিয়তে এজাফি বা প্রথম। আর আউয়ালিয়তে হাকিকী প্রকৃত অর্থে সর্বপ্রথম সৃষ্টি হচ্ছে নূরে মুহাম্মদী। এ সম্পর্কে আমি ‘মাওরিদু লিল মাওলিদ’ নামক কিতাবে সবিস্তার বর্ণনা করেছি।

হুব্বে এলাহির প্রথম বিকাশ:

সৃষ্টির প্রথমেই আল্লাহতা’য়ালার حب ‘হু
ব্ব’ اراده ‘ইরাদা’। সুতরাং তওয়াজুহে হুব্বীই অর্থাৎ মহব্বতের দৃষ্টিই হচ্ছে প্রথম সৃষ্টি যা আল্লাহতা’য়ালা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বাকী সমস্ত মাখলুকাত সেই প্রথম সৃষ্টির শাখা এবং সমস্ত হাকিকত حب ‘হুব্ব’ এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

মুজাদ্দিদে আলফেসানী আলাইহির রহমত তদীয় ‘মাকতুবাতে ইমামে রাব্বানী’ (তৃতীয় জিলদের ১৬০৭ পৃষ্ঠা ও ১৪৯ পৃষ্ঠা ১২২ নং মাকতুব) কিতাবে উল্লেখ করেন-

اور حقیقت محمدی علیہ وعلی آلہ الصلوۃ والسلام جوکہ حقیقت الحقائق ہے- مراتب ظلال طے کرنے کے بعد اس فقیر پر آخرکار جو کچھ منکشف ہوا ہے وتعین وظھور حبی ہے جوکہ تمام ظھورات کا مبدآ اور تمام مخلوقات کی پیدائش کا منشا ہے- مشھور حدیث قدسی میں آیا ہے- كنت كنزا مخفيا فاحببت ان اعرف فخلقت الخلق لاعرف (میں ایک مخفی خزانہ تھا میں نے محبوب رکھاکہ میں پہچانا جا‌ؤں پھر میں نے مخلوق کو پیدا کیا تاکہ میں پہچانا جا‌ؤں) سب سے پہلی چیز جو اس مخفی خزانہ سے ظھور کے تخت پرجلوہ گرہوئ وہ محبت تھی جو کہ مخلوقات کی پیدائش کا سبب ہوئ- اگر یہ محبت نہ ہوتی تو ایجاد کا دروازہ نہ کھلتا اور عالم عدم میں مستقل طور پر اپنا ٹھکانا رکھتا- حديث قدسى لو لاك لما خلقت الافلاك (اگر تونہ ہوتا تو میں آسمانوں کو پیدا نہ کرتا) جوکہ خاتم الرسل کی شان میں واقع ہے کا راز اس جگہ سے معلوم کرنا چاھۓ اور لو لاك لما اظهرت الربوبيت (اگر تونہ ہوتا تو میں ربوبیت کو ظاھر نہ کرتا) کی حقیقت کو اس مقام میں تلاش کرنا چاھۓ

ভাবার্থ: হাকিকতে মুহাম্মদী আলাইহি ওয়ালা আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম যিনি حقيقت الحقائق ‘হাকিকাতুল হাকাইক’ বা সমস্ত হাকিকতের হাকিকত বা মূল। সর্বশেষে প্রতিবিম্বসমূহের স্তরসমূহ অতিক্রম করার পর এ ফকিরের প্রতি যা বিকশিত হলো, তা আল্লাহপাকের ‘হুব্ব বা মহব্বতের বিকাশ, যা সৃষ্টিজগতের উৎপত্তির কারণ এবং আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা, হাদিসে কুদসিতে মশহুর রয়েছে-

(كنت كنزا مخفيا فاحببت ان اعرف فخلقت الخلق لاعرف)

‘আমি গুপ্ত ধনভাণ্ডার ছিলাম। তৎপর আমি মুহব্বত রাখলাম যে, আমি পরিচিত হব এর পর আমি এক মাখলুক সৃষ্টি করলাম যাতে আমি পরিচিত হই।

গুপ্ত ধনভাণ্ডার হতে সর্বপ্রথম যা প্রকাশ পেয়েছে তাই হলো, حب ‘হুব্ব’ বা মহব্বত। বিশ্বজগত সৃষ্টির কারণ ইহাই। যদি এ হুব্ব বা মহাব্বত না হতো তাহলে সৃষ্টির দ্বার উম্মুক্ত হত না এবং সমূহ জগত নাস্তি বা শূন্যের গর্ভে দৃঢ়রূপে চিরস্থায়ী থাকত।

এ ব্যাপারে হাদিসে কুদসিতে উল্লেখ রয়েছে-
(لو لا ك لما خلقت الافلاك)

যদি আপনি না হতেন তাহলে আমি (খোদা) আকাশাদি সৃষ্টি করতাম না, যা সর্বশেষ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শানে এসেছে। তাঁর হাকিকত বা রহস্য এ স্থলে অন্বেষণ করা উচিত এবং لو لاك لما اظهرت الربوبيت ‘আপনি না হলে আমি স্বীয় প্রভুত্বও প্রকাশ করতাম না।’ হাদিসের তত্ব এ স্থলে জ্ঞাত হওয়া আবশ্যক।

আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত ‘মাদারিজুন নবুয়ত’ নামক কিতাবের দ্বিতীয় জিলদের ৭৮১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

(وصل در بیان سر تسمیہ وی صلی اللہ علیہ وسلم الخ)

অনুবাদ: রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম মোবারক حبيب خدا হাবিবে খোদা হওয়ার রহস্যবলীর আলোচনা এবং তাঁর নাম মোবারক মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাব্যস্ত হওয়ার কারণ।

এ সম্পর্কে হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে হাদিস বর্ণিত হয়েছে- আল্লাহর হাবিব বলেছেন- একদিন সাহাবায়ে কেরামগণ রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনের অপেক্ষায় বসে ছিলেন।কিছুক্ষণ পর আল্লাহর হাবিব তাশরিফ আনলেন এবং সাহাবায়ে কেরামের নিকটবর্তী হলেন।শুনতে পেলেন, সাহাবিগণ পরস্পরে আলোচনা করছেন, নিশ্চয় আল্লাহতায়ালার মাখলুকের মধ্য থেকে ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে তাঁর খলিল বানিয়েছেন। অপরজন বললেন- আল্লাহতায়ালা মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে কথা বলেছেন। তৃতীয়জন বললেন, আল্লাহতা’য়ালা ঈসা আলাইহিস সালামকে কালিমুল্লাহ এবং রূহুল্লাহর মর্যাদা দান করেছেন। চতুর্থজন বললেন- আদম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তায়ালা সফিউল্লাহ বানিয়েছেন।

রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদেরকে সালাম দিয়ে বললেন- আমি তোমাদের কথোপকথন শুনলাম।তোমরা বলেছো, আল্লাহতা’য়ালা ইব্রাহিমকে খলিল, মুসাকে কালিমউল্লাহ, ঈসাকে রূহুল্লাহ এবং আদমকে সফিউল্লাহ বানিয়েছেন। তোমরা জেনে রাখ এবং হুশিয়ার হয়ে যাও যে, আল্লাহতা’য়ালা আমাকে حبيب الله ‘হাবিবুল্লাহ’ উপাধীতে ভূষিত করেছেন এবং এতে আমার কোন অহংকার নেই। কিয়ামত দিবসে আমি লিওয়াউল হাম্দ বা প্রশংসার পতাকা বহনকারী হবো। এতে আমার কোন ফখর নেই।
আমি কিয়ামতের দিন প্রথম শাফায়াতকারী হবো এবং আমার শাফায়াত সর্বপ্রথম কবুল করা হবে। এতে আমার কোন ফখর নেই। কিয়ামতের দিন আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজায় করাঘাত করবো, তখন আমার জন্য সর্বপ্রথম জান্নাতের দরজা খোলা হবে। সেদিন আমিই সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবো। তখন আমার সঙ্গে থাকবে আমার উম্মতের ফকির দরবেশগণ। আমিই اولين واخرين পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের মধ্যে অধিক সম্মানিত হবো, এতে আমার কোন দর্প বা ফখর নেই।
হাবিবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কামালাত ও সর্ব সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণনায় এ হাদিসটি পূর্ণাঙ্গ দলিল হিসেবে পরিগণিত।’

ইমাম ইবনে হজর হাইতমী আলাইহির রহমত (ওফাত ৯৭৪ হিজরি) তদীয় ‘আদদুররুল মনদুদ’ নামক কিতাবের ২৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

قال الفخر الرازى: وقع الاجماع على ان افضل النوع الانسان نبينا سيدنا محمد صلى الله عليه وسلم لقوله صلى الله عليه وسلم- انا سيد ولد ادم ولا فخر-

ভাবার্থ: হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানবজাতীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানব এর উপর ইজমা হয়েছে।আল্লাহর হাবিব নিজেই এরশাদ করেন- আমি আদম সন্তানের সরদার।এতে আমার কোন গর্ব নেই।

উপরোক্ত দলিলভিত্তিক বর্ণনা দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো আল্লাহ তায়ালা নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্ব সৃষ্টির শ্রেষ্টত্ব প্রদান করে তাঁকে حبيب ‘হাবিব’ নামে ভূষিত করেছেন।

অতঃপর আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত مدارج النبوة ‘মাদারিজুন নবুয়ত’ কিতাবের দ্বিতীয় জিলদের ৭৮২ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ করেন-

وبتحقیق گذشت بیان علو مکان ومکانت وی صلی اللہ علیہ وسلم مقصود اینجا اگاھے بسر تخصیص اوست صلی اللہ علیہ وسلم باسم الحبیب پس بدانکہ مقام حبی اعلا مقامات کمالیہ است ۔۔۔ الخ

অর্থাৎ ‘নিঃসন্দেহে ইতোপূর্বে রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উচ্চস্থান এবং উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।এখানে বর্ণনা করার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য حبيب ‘হাবিব’ শব্দটি রহস্য উদঘাটন। সুতরাং গভীরভাবে হৃদয়ঙ্গম করে নাও যে, কামালাতের মাকামসমূহের মধ্যে উন্নততর মাকাম হচ্ছে مقام حبى ‘মাকামে হুব্বী’ বা মহব্বতের স্থল। به تحقيق তাহকিক সহকারে বর্ণনা করা হয়েছে।

হাদিসে কুদসিতে, আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন-

كنت كنزا مخفيا فاحببت ان اعرف فخلقت الخلق وتعرف اليهم فبى عرفونى وعرفت بهم-

(আমি গুপ্ত ধণভাণ্ডার ছিলাম তৎপর আমি মহব্বত রাখলাম যে, আমি পরিচিত হবো, এরপর আমি এক মাখলুক সৃষ্টি করলাম এবং আমি তাদের কাছে পরিচিত হলাম। এ দ্বারা তারা আমাকে চিনলো আমিও তাদেরকে চিনলাম।

সুতরাং توجه حبى ‘তাওয়াজ্জুহে হুব্বীই’ অর্থাৎ মহব্বতের দৃষ্টিই হচ্ছে প্রথম সৃষ্টি।যা আল্লাহতা’য়ালা থেকে প্রকাশিত হয়েছে।বাকী সমস্ত মাখলুকাত সেই প্রথম সৃষ্টির শাখা এবং সমস্ত হাকিকত حب ‘হুব্ব’ এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।সৃষ্টির যে প্রথম হুব্ব (ইরাদা) তা যদি না হতো, তাহলে কোন মাখলকুই পয়দা হতো না।
আর যদি মাখলুক পয়দা না হতো তাহলে আসমা ও সিফাতে এলাহিকে কেউ জানতো না। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র রূহে মোবারকের ওসিলায় মাখলুক প্রকাশিত হয়েছে।

মুদ্দাকথা হলো রূহে মুহাম্মদী না হলে কোন কিছুই সৃষ্টি হতো না এবং আল্লাহতায়ালাকে কেউ জানতো না। কারণ হুব্ব حب হচ্ছে ওজুদে মওজুদা বা সৃষ্টির অস্তিত্বের জন্য প্রথম ওয়াসেতা বা মাধ্যম।

(اگر روح پاک محمدی نمی بود نمی شناخت خدارا ھیچ احدی زیرا کہ پیدا نمی بود ھیچ احدی پس حب واسطہ اولی است مروجود موجودات را)

به تحقيق তাহকিকের মাধ্যমে বর্ণিত আছে, আল্লাহতায়ালা মে’রাজের রাত্রিতে তাঁর হাবিবকে বলেছিলেন-

لو لا ك لما خلقت الافلاك

‘লাউ লাকা লামা খালাকতুল আফলাক’ অর্থাৎ হে আমার হাবিব আপনি না হলে আমি আসমানসমূহ সৃষ্টি করতাম না।

সুতরাং স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হল, রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গোপন ভাণ্ডার পরিচয়ের জন্য توجه حبى ‘তাওয়াজুহে হুব্বী’ই হলো মুল মাকসুদ।
তারপর তিনি ব্যতিত যত কিছু সব কিছুই তাঁর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে।তিনিই حب الهى ‘হুব্বে এলাহি’র মূল মাকসুদ। তিনি ব্যতিত অন্য সব তার শাখা তুল্য। সেই জন্য আল্লাহতা’য়ালা তাঁকে حبيب ‘হাবিব’ নাম দ্বারা খাস করেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কাউকে হাবিব নামে আখ্যায়িত করা হয়নি।আল্লাহর হাবিবের উম্মতের মধ্য থেকে যে তার অনুসরণ করবে, আল্লাহপাক তাকে محبوب ‘মাহবুব’ বানাবেন। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালা নিজেই ইরশাদ করেছেন-

قل ان كنتم تحبون الله فاتبعونى يحببكم الله-

হে হাবিব! আপনি বলে দিন,তোমরা যদি আল্লাহতা’য়ালার ভালবাসা বা মুহব্বত লাভ করতে চাও।তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহতা’য়ালা তোমাদিগকে মহব্বত করবেন।

মাদারিজুন নবুয়ত ২য় জিলদের ৭৮৩ পৃষ্ঠায় (ফার্সি) উল্লেখ রয়েছে-
‘প্রকাশ থাকে যে, حب على الاطلاق ‘হুব্ব আলাল ইতলাক’ অর্থাৎ হুব্বে মতলাক বা সাধারণত ‘হুব্ব’ এর নয়টি স্তর রয়েছে।তন্মধ্যে একটি স্তর খালেক এর মধ্যে। আর বাকী স্তরসমূহ মাখলুকের মধ্যে বিদ্যমান।

প্রথম স্তর যা খালেক এর মধ্যে বিদ্যমান তার নাম হচ্ছে حب ‘হুব্ব’ তবে এ ‘হুব্ব’ এর প্রকাশের জন্য হরকত বা প্রতিক্রিয়া হওয়া জরুরি নয়।এই ‘হুব্ব’ যখন সৃষ্টি হবে তখন তাঁর মধ্যে পাওয়া যাবে اراده ‘এরাদা’ বা অভিপ্রায়। প্রকৃত পক্ষে اراده ‘ইরাদা’ হক তা’য়ালার জন্য খাস।

উল্লেখ্য যে, আল্লাহতায়ালার আটটি সিফাতে খাসসা রয়েছে এর মধ্যে একটি হল اراده ।
আল্লাহতা’য়ালার সিফাতে কামেলা হলো-

১. حيات হায়াত বা জীবনী শক্তি
২. قدرت কুদরত বা ক্ষমতা
৩. علم বা জ্ঞান
৪. كلام কালাম বা বাকশক্তি
৫. بصر বা দর্শনশক্তি
৬. سمع সামা বা শ্রবণশক্তি
৭. اراده ইরাদা বা ইচ্ছাশক্তি
৮. تكوين তাকবিন বা সৃষ্টিশক্তি।

এ সকল সিফাত আজলি এবং কাদীমী। যার আরম্ভও নেই শেষও নেই। আল্লাহতা’য়ালার জাতের সঙ্গে বিদ্যমান।

হুব্ব এর নয়টি স্তর রয়েছে:

(১.) ميلان ‘ময়লান’ মাকলুকের মধ্যে যে ‘হুব্ব’ হয়ে থাকে, তার প্রথম স্তর হচ্ছে ميل ‘ময়ল’ বা মহব্বত করা। আর ময়লান হচ্ছে মতলব বা কাম্য বস্তুর প্রতি মনে আকর্ষণ।

(২.) رغبت ‘রগবত’ বা আকর্ষন। এই আকর্ষন যখনই বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে বলা হয় ‘রগবত’ বা আকৃষ্ট হওয়া।

(৩.) طلب ‘তলব’ রগবত বা আকৃষ্ট হওয়ার মাত্রা অধিক হলে তাকে বলা হয় ‘তলব’ বা তালাশ করা।

(৪.) ولع ‘ওলা’ তলব এর মাত্রা অধিক হলে তাকে বলা হয় ‘ওলা’ বা হালকা পাতলা অবস্থায় অতিক্রম করা।

(৫.) صابه ‘সবা’ বা বুদ্ধিহীনতা। ‘ওলা’র মধ্যে যখন কঠিন অবস্থা সৃষ্টি হয় এবং সে অবস্থা স্থায়িত্ব লাভ করে, তখন তাকে বলা হয় صابه ‘সবা’ বা বুদ্ধিহীনতা।

(৬.) ہوا ‘হাওয়া’ বা শূণ্যস্থান।এ অবস্থা যখন প্রবল হয় এবং অন্তরের গভীরে নেমে আসে এবং কাম্য বস্তুলাভে শান্তিপায় তখন বলে ‘হাওয়া’ বা শূণ্যস্থান।

(৭.) شغف ‘শাগাফ’ বা হৈচৈ। হাওয়া যখন প্রবল আকার ধারণ করে এবং তা অন্ত:করণে আচ্ছন্ন হয়ে যায়, তখন তাকে বলে ‘শাগাফ’ বা হৈচৈ।

(৮.) عزم ‘এযাম’ এই শাগাফ যখন প্রেমিককে ফানা করে দেয়, সেই ফানা এমনভাবে বৃদ্ধিপায় যে, নিজের সত্ত্বা থেকেও পৃথক হয়ে যায় এবং ফানা থেকেও ফানা হয়ে যায়, তখন তাকে ‘এযাম’ বা ফানার মাদ্দায় বা প্রাণপনে দৌঁড়ানোকে বলা হয় ‘এযাম’।

(৯.) এই ‘এযাম’ যখন সুদৃঢ় ও সুপ্রতিষ্টিত হয়ে বাহ্যিকতায় অবস্থান গ্রহণ করে তখন ‘মুহিব’ ও ‘হাবিব’ ফানার মাধ্যমে দু’জনের দুসত্ত্বা থাকে না। অর্থাৎ একজন ফানা হয়ে বিলীন হয়ে যায় এবং অপর জন আল্লাহতায়ালার অস্তিত্বই একমাত্র বহাল থাকে তাকে حب مطلق হুব্বে মতলক বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ আশিক আল্লাহতায়ালার প্রেমে বিলীন হয়ে যায়, ইহাই ফানা ফিল্লাহ।

উপরোক্ত ‘হুব্ব’ এর নয়টি স্তর প্রকৃতপে মাখলুকের জন্য খাস। আল্লাহ তায়ালার শানে তা ব্যবহার করা যাবে না। তবে হ্যাঁ এ সমস্ত স্তরসমূহের সৃষ্টিকারী একমাত্র আল্লাহতায়ালা।

حب ‘হুব্ব’ ও اراده ‘ইরাদা’ একমাত্র আল্লাহতায়ালার জন্য খাস। এ ‘হুব্ব’ এর আর একটি স্তর আছে যা আল্লাহতায়ালা ও মাখলুকের মধ্যে প্রকাশ পায় তাকে مرتبه جامعه ‘মুরাত্বাবায়ে জামিয়া’ বা সমন্বিত স্তর নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। আবার দ্বিতীয় স্তরও বলা হয়।
আসমায়ে এলাহির মধ্যে একটি নাম আছে ودود ‘ওয়াদুদ’। আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে চান, তাকে প্রেমদান করে থাকেন এবং বান্দা ও তাঁর সাথে আল্লাহর সাথে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। আল্লাহতা’য়ালা কালামে পাকে এরশাদ করেন-

فسوف يأتى الله بقوم يحبهم ويحبونه-

নিশ্চয়ই আল্লাহতা’য়ালা এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদেরকে তিনি (আল্লাহ) মহব্বত করবেন বা ভালবাসবেন এবং তাঁরাও আল্লাহতা’য়ালাকে মহব্বত করবেন। এখানে উভয়েই ভালবাসাকে মহব্বতের এ স্তরে পরস্পর শরিক।
ভালবাসার এ স্তরটি আলমে জহুরে (প্রকাশ্যজগতে) উভয় পক্ষ থেকে হওয়ার কারণে মহব্বতের স্তরসমূহের মধ্যে সর্বশেষ মাকাম।

মাখলুকাতের জন্য ইশকে এলাহির স্তর থেকে অগ্রগামী কিছুই নেই-
اذ هو نار الله الموقدة التى تطلع على الافئدة-

যেহেতু ইহা আল্লাহতা’য়ালার প্রজ্বলিত হুতাশ যা হৃদয়েকে গ্রাস করবে।
উপরোক্ত দলিলভিত্তিক আলোচনার দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো- আল্লাহতা’য়ালা হচ্ছেন قديم ‘কাদীম’ যার কোন আরম্ভ নেই শেষও নেই। যিনি ওয়াজিবুল ওয়াজুদ- الله موجود بالذات ।
আল্লাহতা’য়ালা সর্বপ্রথম তাঁর হাবিবের নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন হেকমতে কামেলা দ্বারা এবং এ সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহতা’য়ালা ‘হুব্ব’ বা ইরাদা ছিল সরাসরি যার মধ্যে কোন ওয়াসেতা ব মাধ্যম ছিল না। আল্লাহ হচ্ছেন খালিক বা সৃষ্টিকর্তা এবং তাঁর হাবিব হচ্ছেন আল্লাহর সর্বপ্রথম সৃষ্টি যাকে আল্লাহ মহব্বতের সঙ্গে সৃষ্টি করেছেন যিনি সৃষ্টির মধ্যে বেনজির।

আল্লাহর হাবিব সৃষ্টিতে নূর, আপাদমস্তক নূর যার ছায়া ছিলনা আইনী নূর কিন্তু جنس بشر জিনসে বশর বা জাতিতে মানুষ কিন্তু সৃষ্টির মধ্যে তাঁর কোন তুলনা নেই।তাঁকে আমাদের মত মানুষ বা দশজনের মধ্যে একজন মানুষ বলা বা আকিদা রাখা কুফুরি। অপরদিকে আল্লাহর হাবিব হচ্ছেন جنس بشر জাতিতে মানুষ اكمل بشر পূর্ণাঙ্গ মানুষ, خير البشر সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বা মহামানব।

নূর নবীর বেনজির বাশারিয়াত:

নূরে মুজাসসাম রহমতে আলম মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নূরানীয়ত যেমন এক বিস্ময়কর ব্যাপার,যা ইতোপূর্বে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। তেমনিভাবে নবীজীর বাশারিয়াত বা মানবত্বও এক অলৌকিক বিস্ময়কর ব্যাপার।

নবীজীর আপাদমস্তক দেহ মোবারক ছিল নূর, যাকে বলা হয় নূরে মুজাসসাম। তিনি এক অলৌকিক মহামানব, যার কোন তুলনা হয় না। যার দেহ মোবারকের কোন ছায়া ছিল না।
নবীজীর বাশারিয়াতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামগণ লিখেছেন যে,তিনি হলেন-

خير البشر- اكمل بشر- نورانى بشر- افضل بشر- سيد البشر-
سيد ولد ادم- – جنس بشر- النوع الانسان ও سيد كل حادث
প্রভৃতি।

মূলকথা নবীজীর নূরানীয়ত আর বাশারিয়াত সর্বদিক দিয়ে তিনি এক স্বতন্ত্র বেনজির মহা সম্মাানিত মাখলুক সৃষ্টিজগতে যার কোন তুলনা নেই।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা আল্লাহর হাবিব সৃষ্টি নূর এবং জাতিতে মহামানব।
এ প্রসঙ্গে মুফতিয়ে বাগদাদ আল্লামা সৈয়দ মাহমদু আলুছি বাগদাদী তদীয় ‘তাফসিরে রুহুল মায়ানী’ নামক কিতাবের ২য় খণ্ড ৬ষ্ঠ পারা ৯৭ পৃষ্ঠায়- قد جاء كم من الله نور وكتاب مبين আয়াতে কারীমার তাফসিরে উল্লেখ করেন-

(قد جاء كم من الله نور) عظيم هو نور الانوار والنبى المختار صلى الله عليه وسلم والى هذا ذهب قتادة واختاره الزجاج وقال ابو على الجبائى عنى بالنور القران لكشفه واظهاره طرق الهدى واليقين واقتصر على ذلك الزمخشرى وعليه فالعطف فى قوله تعالى) كتاب مبين) لتنزيل المغائرة بالعنوان منزلة المغائرة بالذات واما على الاول فهو ظاهر

ভাবার্থ: আয়াত قد جاء كم من الله نور(নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে এক মহা সম্মানিত নূর এসেছে) সেই নূর হচ্ছে সকল নূরসমূহের নূর।সেই নূর দ্বারা মুরাদ হল,নবীয়ে মুখতার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।তাবেয়ী মুফাসসির হযরত কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অনুরুপ মতপোষণ করেছেন এবং জুজাজও এই অভিমত গ্রহণ করেছেন (মুতাজিলীদের নেতা) আবু আলী জুবাঈ বলেন- এখানে নূর দ্বারা মুরাদ হল কোরআন।কেননা কোরআনের দ্বারা হেদায়ত ও ইয়াকিনের পথসমূহ প্রকাশিত ও উম্মোচিত হয়ে থাকে। মু’তাজিলীপন্থি জমকশরীও অনুরূপ মত পোষণ করেছেন।

(আল্লামা আলুছি বলেন) মুদ্দাকথা হলো আল্লাহতা’য়ালার বাণী- كتاب مبين (রৌশন কিতাব) অংশকে নূর এর عطف (আতফ) দ্বারা দুইটি বিষয়ের প্রোপট অবতরণ হওয়া বুঝানো হয়েছে। কেননা- معطوف و معطوف عليه (মা’তুফ ও মা’তুফ আলাইহি) দ্বারা مغايرة بالذات (মুগাইরাত বিজ্জাত) বুঝানো হয়ে থাকে।এই প্রথম ব্যাখ্যাই অধিক সুস্পষ্ট।

উপরোক্ত আয়াতে কারীমার তাফসির দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো, আয়াতে কারীমায় نور ‘নূর’ দ্বারা মুরাদ হচ্ছেন নবীউল মুখতার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ইহাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের অভিমত যে, আল্লাহর হাবিব সৃষ্টিতে নূর এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এ দুনিয়াতে নূরই এসেছেন।

এ প্রসঙ্গে ইমাম মহিউস সুন্নাহ আবি মুহাম্মদ হুসাইন ইবনে মাসউদ বগবী আলাইহির রহমত (ওফাত ৫১৬ হিজরি) ‘তাফসিরে মুয়ালিমুত তানজিল’ ৩৬৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

قد جاء كم من الله نور يعنى محمد صلى الله عليه وسلم

উপরোক্ত আয়াতে কারীমায় نور ‘নূরুন’ দ্বারা মুরাদ হচ্ছেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

মাদারিজুন নবুয়ত ১/২৬ পৃষ্ঠায় আরো উল্লেখ রয়েছে-

آنحضرت راسایہ نہ در آفتاب ونہ در قمر رواہ الحکیم الترمذی عن ذکوان فی نوادر الاصول وعجب است ازیں بزرگان کہ ذکر نکردند چراغ را ونور یکی از اسماء آنحضرت ست ونور راسایہ نمی باشد-

নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ মোবারকের কোন ছায়া ছিল না।রৌদ্রের প্রচন্ড কিরণে কিংবা চন্দ্রের স্নিগ্ধ আলোতে তাঁর পবিত্র নূরের কায়ার কোন ছায়া পরতো না। হাকিম ও তিরমিজি যাকওয়ান হতে নাওয়াদিরুল উসূলে ইহা বর্ণনা করেছেন।উল্লেখিত বুজুর্গ ব্যক্তিবর্গ কেবল মাত্র চন্দ্র এবং সূর্যের রশ্মির কথাই উল্লেখ করেছেন।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় প্রদীপের কথা উল্লেখ করেন নাই। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার একটি নাম হল নূর বা আলো,নূরের কোন ছায়া হয় না।

দশম শতাব্দীর নবম মুজাদ্দিদ হাফিজুল হাদিস ইমাম জালালউদ্দিন সুয়ুতি আলাইহির রহমত (ওফাত ৯১১ হিজরি) الخصائص الكبرى নামক কিতাবের ১ম জিলদের ১১৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

اخرج الحكيم الترمذى عن ذكوان ان رسول الله صلى الله عليه وسلم لم يكن يرى له ظل فى شمس ولاقمر قال ابن سبع: من خصائصه ان ظله كان لا يقع على الارض وانه كان نورا فكان اذا مشى فى الشمس او القمر لا ينظر له ظل- قال بعضهم: ويشهد له حديث قوله صلى الله عليه فى دعائه- واجعلى نورا-

অর্থাৎ হাকিম তিরমিজি হযরত যাকওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেছেন, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ছায়া- না সূর্যের আলোতে দেখা যেত, না চন্দ্রের আলোতে (দেখা যেত)। ইবনে সাবা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন- রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বৈশিষ্ট্য যে, নিশ্চয় তাঁর ছায়া জমিনে পতিত হতো না, কেননা তিনি ছিলেন নূর। অতএব, তিনি যখন সূর্যের আলোতে অথবা চন্দ্রের আলোতে চলতেন, তখন তাঁর ছায়া দেখা যেত না। কেউ কেউ বলেছেন, রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার ছায়া না থাকার বিষয়টি হাদিসশরীফ দ্বারাই প্রমাণিত। হাবিবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়ার মাধ্যমে এরশাদ করেন, আয় আল্লাহ আমাকে নূর করে দাও।

তাফসিরে দুররে মানসুরে রয়েছে-

اخرج ابن ابى عمر العدنى عن ابن عباس ان قريشا كانت نورا بين يدى الله تعالى قبل ان يخلق الخلق بالفى عام يسبح ذلك النور وتسبح الملائكة بتسبيحه- فلما خلق الله ادم عليه السلام القى ذلك النور فى صلبه- قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: فاهبطنى الله الى الارض فى صلب ادم عليه السلام وجعلنى فى صلب نوح وقذف بى فى صلب ابراهيم ثم لم يزل الله ينقلنى من الاصلاب الكريمة الى الارحام الطاهرة حتى اخرجنى من بين ابوى لم يلتقيا على سفاح قط- (الدر المنثور ص ٤/۳۲৯ لقد جاء كم رسول من انفسكم پاره ۱۱ توبه ۱۲٨ اية)

ভাবার্থ: ইবনে আবু উমর আদনী ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন তিনি বলেন নিশ্চয় তিনি কোরেশি বা কুরেশ বংশীয়। তিনি মাখলুক (আদম আলাইহি সালাম) সৃষ্টির দুইহাজার বৎসর পূর্বে আল্লাহর দরবারে নূর ছিলেন।সেই নূর তাসবিহ পাঠ করতো এবং তাঁর তাসবির সাথে ফেরেশতাগণও তাসবিহ পাঠ করতো। অতঃপর যখন আল্লাহতা’য়ালা হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করলেন,তখন আদম আলাইহিস সালাম এর পৃষ্টদেশে সেই নূর মোবারক স্থাপন করলেন।রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন- অতঃপর আল্লাহতা’য়ালা আমাকে হযরত আদম আলাইহিস সালামের পৃষ্টদেশে থাকা অবস্থায় জমিনে পাঠালেন। অতঃপর হযরত নূহ আলাইহিস সালাম এর পৃষ্টদেশে আমাকে স্থাপন করলেন। বংশ পরম্পরায় আমাকে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের পৃষ্টে থাকাকালীন নমরূদের তৈরি অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এভাবে স্থানান্তরিত হতে হতে পবিত্র পৃষ্টদেশে থেকে পবিত্র রেহেমে স্থানান্তরিত হতে থাকি এমনকি আমার পিতা-মাতা পর্যন্ত। আমার পূর্ব পুরুষের মধ্যে কখনো জিনা সংঘটিত হয়নি।’

উপরোক্ত হাদিসশরীফের দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো- আল্লাহর হাবিবের নূর সর্বপ্রথম আল্লাহতা’য়ালা সৃষ্টি করে আদম আলাইহিস সালামের পৃষ্ট হতে একের পর এক স্থানান্তরিত হতে হতে হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহু আনহা এর রেহেম মোবারকে স্থির হয়ে এই নূর মোবারকই জমিনে অবতীর্ণ হয়েছেন। সুতরাং আল্লাহর হাবিব সৃষ্টিতে নূর জাতিতে বশর।

মিশকাত শরীফ ৫১৩ পৃষ্ঠায় আছে-

عن العرباض بن ساريه عن رسول الله صلى الله عليه وسلم انه قال انى عند الله مكتوب خاتم النبيين وان ادم لمنجدل فى طينته وساخبركم باول امرى دعوة ابراهيم وبشارة عيسى ورؤيا امى التى رأت حين وضعتنى وقد خرج لها نور اضاءلها منه قصور الشام- رواه فى شرح السنة ورواه احمد عن ابى امامة من قوله ساخبركم الى اخره- (دلائل النبوة ومعرفة احوال صاحب الشريفة للبيهقى ص ۲/۱۳٠ (مشكوة شريف ص ۵۱۳(

অর্থাৎ ‘ইরবাজ বিন সারিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন নিশ্চয় আমি আল্লাহর দরবারে খাতামুন নাবিয়ীন বা সর্বশেষ নবী হিসেবে মনোনীত ছিলাম। ঐ সময় হযরত আদম আলাইহিস সালামের দেহ মোবারক মাটিতে মিশ্রিত ছিল। আর অচিরেই তোমাদেরকে আমার প্রথম অবস্থার সংবাদ দিব। আমি ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের দোয়া, হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সুসংবাদ এবং আমার আম্মার চাক্ষুস দর্শন, যা তিনি আমাকে আমার প্রসবকালীন সময়ে দেখেছিলেন।নিশ্চয়ই তাঁর থেকে এক নূর প্রকাশ হয়েছিল, যার দ্বারা শ্যাম বা সিরিয়ার দালানগুলো আলোকিত হয়ে ছিল।’

মিশকাত শরীফ ৫১৩ পৃষ্ঠায় আছে-

عن عرباض بن ساريا صاحب رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: انى عبد الله وخاتم النبيين وابى منجدل فى طينته وساخبركم عن ذلك: دعوة ابى ابراهيم وبشارة عيسى ورؤيا امى التى رأت وكذلك امهات (النبيين) يرين وان ام رسول الله صلى الله عليه وسلم رأت حين وضعته نورا اضائت له قصور الشام ثم تلا يا ايها النبى انا ارسلناك شاهدا ومبشرا ونذيرا وداعيا الى الله باذنه وسراجا منيرا) مشكوة ص ۵۱۳ اشعة لمعات ص ٤/٤۷٤ مرقاة ص ۳٦۷

ভাবার্থ: আল্লাহতা’য়ালার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামার সাহাবি হযরত ইবরাদ বিন সারিয়া হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি বলেন- নিশ্চয়ই আমি আল্লাহতা’য়ালার বান্দা ও সর্বশেষ নবী ঐসময়ও ছিলাম যখন আমার পিতা (হযরত আদম আলাইহিস সালাম) এর দেহ মোবারক মাটি ও পানিতে ছিল। আমি অচিরেই তোমাদেরকে এ সম্পর্কে অর্থাৎ আমার প্রাথমিক অবস্থার বর্ণনা দিব, আমি হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের দোয়ার ফসল, আমি হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের সুসংবাদ এবং আমার মায়ের চাক্ষুস দর্শন। এভাবে সকল নবীগণের মাতাগণের দর্শন এবং নিশ্চয় আল্লাহর রাসূলের জননী এ ধরাতেই আগমনের সময়কালীন সময়ে দেখে ছিলেন যে, তার থেকে একটি নূর প্রকাশিত হয়েছিল, যদ্বারা সিরিয়া দেশের অট্টালিকাসমূহ আলোকিত হয়েছিল। অতঃপর পাঠ করলেন-

يا ايها النبى انا ارسلناك شاهدا ومبشرا ونذيرا وداعيا الى الله باذنه وسراجا منيرا-

অর্থ: হে নবী (গায়েবের সংবাদদাতা) নিঃসন্দেহে আমি আপনাকে হাজির নাজির, সুসংবাদদাতা, ভীতি প্রদর্শনকারী এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর আদেশ আহ্বানকারী এবং উজ্জ্বল সূর্য করে প্রেরণ করেছি।
(সূরা আহযাব, আয়াত- ৪৫)

তাফসিরে রুহুল মায়ানী ৪র্থ জিলদ ১১ পারা ৫২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

(لقد جاء كم) الخطاب للعرب (رسول) اى رسول عظيم القدر (من انفسكم) اى من جنسكم ومن نسبكم عربى مثلكم … وقيل: الخطاب للبشر على الاطلاق ومعنى كونه عليه الصلوة والسلام من انفسهم انه من جنس البشر الخ-

অর্থাৎ لقد جاء كم رسول নিশ্চয় তোমাদের নিকট এসেছেন অতি সম্মানিত একজন রাসূল তোমাদের থেকে অর্থাৎ তোমাদের جنس ‘জাত’ থেকে এবং তোমাদের আরবি সম্প্রদায় থেকে। …

আরো বর্ণিত আছে, আয়াতে গোটা মানব সম্প্রদায়কে সম্বোধন করা হয়েছে।অর্থাৎ রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের থেকে এসেছেন। নিশ্চয় তিনি جنس بشر ‘জিনসে বশর’ বা জাতিতে মানব। (কিন্তু সৃষ্টিতে নূর)

তাফসিরে রুহুল মায়ানী ২য় জিল্দ ৪ নং পারা ১১২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

لقد من على المؤمنين اذ بعث فيهم رسولا من انفسهم

উপরোক্ত আয়াতে কারীমার তাফসিরে আল্লামা সৈয়দ মাহমদু আলুছি বাগদাদী (ওফাত ১২৭০ হিজরি) উল্লেখ করেন-

(رسولا) عظيم القدر جليل الشان (من انفسهم) اى من نسبهم او من جنسهم عربيا مثلهم او من بنى ادم لاملكا ولا جنيا الخ-
অর্থাৎ رسولا من انفسهم অতি সম্মানিত ও মহান শানের অধিকারী রাসূল প্রেরিত হয়েছেন তাদের মধ্য থেকে অর্থাৎ তাদের সম্প্রদায় থেকে অথবা তাদের স্বজাতি থেকে, তাদের ন্যায় আরবীয় সম্প্রদায় থেকে। অথবা বনি আদম থেকে। তিনি ফিরিশতা জাতি ও নন, জিন জাতিও নন।

আল্লামা আলুছি উক্ত তাফসিরের ১১৩ পৃষ্ঠায় আবার উল্লেখ করেন-

وقد سئل الشيخ ولى الدين العراقى هل العلم بكونه صلى الله عليه وسلم بشرا ومن العرب شرط فى صحة الايمان او من فروض الكفاية؟ فاجاب بانه شرط فى صحة الايمان- ثم قال: فلو قال شخص: او من برسالة محمد صلى الله عليه وسلم الى جميع الخلق لكن لا ادرى هل هو من البشر او من الملائكة او من الجن- اولا ادرى هل هو من العرب او العجم؟ فلا شك فى كفره لتكذيبه القران وجحده ما تلقته قرون الاسلام خلفا عن سلف وصار معلوما بالضرورة عند الخاص والعام-

ভাবার্থ: শায়খ ওলিউদ্দিন ইরাকী আলাইহির রহমতকে জিজ্ঞাসা করা হয়ে ছিল যে, রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে بشرا ومن العرب জাতিতে মানব এবং তিনি আরবি এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখা কি ঈমান বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত অথবা তা কি ফরজে কিফায়া? তদোত্তরে তিনি বলেন- নিশ্চয় আল্লাহর হাবিবকে জাতিতে মানব এবং তিনি আরবীয় সম্পর্কে জ্ঞান রাখা বিশুদ্ধ ঈমানের জন্য শর্ত। অতঃপর তিনি বলেন- যদি কোন ব্যক্তি বলেন যে, আমি বিশ্বাস করি বা ঈমান রাখি হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমগ্র সৃষ্টির জন্য রাসূল হয়ে প্রেরিত হয়েছেন কিন্তু আমি জানি না যে, তিনি কি মানব জাতি না ফেরেশতা জাতীয়, না জ্বিন জাতীয় অথবা আমি জানি না তিনি কি আরবীয় না অনারবীয়? (উত্তরে তিনি ফতওয়া প্রদান করে বলেন) فلا شك فى كفره لتكذيبه القران ঐ ব্যক্তির কুফরি সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই কেননা সে কোরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলো।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর দ্বাদশ মুজাদ্দিদ শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত (ওফাত ১২৩৯ হিজরি) তদীয় ‘তাফসিরে আজিজি ফার্সী’ ২১৪ পৃষ্ঠা ২৯ পারা الا من ارتضى من رسول আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেন-

(ক)
یعنی مگر کسے کہ پسند میکند وآں کس رسول میبا شد خواہ ازجنس ملک باشد مثل حضرت جبریل علیہ السلام وخواہ ازجنس بشر مثل حضرت محمد صلی اللہ علیہ وسلم وموسی وعیسی علیہم الصلوات والتسلیمات کہ اورا اظھار بر بعضے از غیوب خاصۂ خود می فرماید تا آں غیوب را مکلفین برسا ند الج-

অর্থাৎ আল্লাহর পছন্দনীয় রাসূল ব্যতিত কারো নিকট সেই খাস গায়েব প্রকাশ করেন না। যাদের কাছে প্রকাশ করেন, তারা হচ্ছেন রাসূল, সেই রাসূল হয়তো জিনসে মালাক বা ফেরেশতা জাতীয়, যেমন হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালাম অথবা জিনসে বশর বা মানব জাতীয় যেমন হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। হযরত মুসা ও হযরত ঈসা আলাইহিমুস সালাম তাঁদের নিকট আল্লাহ কতক খাস গায়েব সম্পর্কে অবহিত করান।

উপরোক্ত এবারত দ্বারা প্রমাণিত হলো আমাদের প্রিয় নবী আল্লাহর হাবিব হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিনসে বাশার ও মানব জাতীয়। হুজুরপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূর ও বশর উভয়েই।পরকালে তাঁর নূরানীয়তের প্রাধান্য সর্বদা বিদ্যমান থাকবে। বাশারিয়াতের অস্তিত্বের প্রাধান্য থাকবে না। শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত এর নিম্নে এবারত তা প্রমাণ করে।

(খ)
তাফসিরে আজিজি ফার্সি (২৭১ পৃষ্ঠা আম পারা) وللاخرة خير لك من الاولى এ আয়াতে কারীমার তাফসিরে শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত উল্লেখ করেন-

یعنی والبتہ ہر حالت آخر بہتر باشد ترا از معاملت اول تا آنکہ بشریت ترا اصلا وجود نماند وغلبۂ نور حق برتو علی سبیل الدوام-

অর্থাৎ আপনার জন্য ইহকাল থেকে পরকাল উত্তম। যেন আপনার বাশারিয়াত বা মনবত্বের অস্তিত্ব পরকালে থাকবে না। সর্বদা নূরানীয়তের প্রাধান্য আপনার মধ্যে বিদ্যমান থাকবে।

আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত বলেন-

آنحضرت بتمام از فرق تا قدم ہمہ نور بود کہ دیدۂ حیرت در جمال باکمال وی خیرہ میشد مثل ماہ وآفتاب تابان وروشن بود واگر نہ نقاب بشریت پوشیدہ بودی ہیچکس را مجال نظر وادراک حسن او ممکن نبودی وہمیشہ جوہروی نوری بود کہ انتقال کرد از اصلاب آباوا رحام امھات اززمن آدم تا انتقال بصلب عبد اللہ ورحم آمنہ سلام اللہ عليهم اجمعين- مدارج النبوة فارسى ص ۱/۱۳۷ اردو ص ۱/۲۱۳

ভাবার্থ: আমাদের নবী সায়্যিদে আলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপদমস্তক ছিলেন নূর। তাঁর নূর বা সৌন্দর্য প্রভায় দৃষ্টিশক্তি উল্টা যেন ফিরে আসত। তিনি যদি মানবীয় পোশাক পরিধান না করতেন, তবে কারো জন্য তাঁর সৌন্দর্য প্রভা উপলব্ধি করা সম্ভব হত না। তাঁর جوهر نورى ‘জাওহারে নূরী’ বা নূরানী জাওহার হযরত আদম আলাইহিস সালাম হতে শুরু করে হযরত আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত পবিত্র ঔরসে ও পবিত্র রেহেমে স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসছিল।

چنانچہ فرمودوی سبحانب ( ما زاغ البصر وما طغی) چنانچہ بندگان خاص در حضرت ملوک میکنند واین کمال ست کہ جز اکمل بشر وسید رسل را صلوات اللہ وسلامہ میسر نیست ( مدارج النبوة فارسى ۱/ص ۲٠٤)

ভাবার্থ: আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমত বলেন ما زاع البصر وما طفى যেরূপভাবে বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তিগণ বাদশাহ এর দরবারে উপস্থিত হয়ে থাকেন। ইহা এমন পূর্ণত্ব যা পূর্ণত্ব মানব اكمل بشر মহামানব ও সকল রাসূলের সরদার আলাইহিস সালাম ব্যতিত আর কেউই লাভ করতে পারেনি।

আল্লামা শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী আলাইহির রহমতের ‘মাদারিজুন নবুয়ত’ এর উপরোক্ত দু’টি এবারত থেকে স্পষ্টভাবে এ কথা প্রমাণিত হল তার তাহকিক মতে আল্লাহর হাবিব আপাদমস্তক নূর এবং তিনি আকমলে বশর বা পরিপূর্ণ মানব (মহামানব)।

উল্লেখ্য যে, বাংলা ভাষায় জাত বা জাতি শব্দটি বংশ, গোত্র ও সম্প্রদায় ইত্যাদি বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে আরবি ذات জাত শব্দটি সত্বা বা অস্তিত্ব বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয় এবং এর সাথে নিসবত বা সম্পর্কিত বুঝানোর ক্ষেত্রে ذاتى (জাতি) শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

সহজ কথায় جنس بشر বা ‘মানব জাতি’ বলতে হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও তাঁর আওলাদ বা বংধরগণকে বুঝানো হয়ে থাকে। যেহেতু রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন انا سيد ولد ادم অর্থাৎ আমি আদম সন্তানের সরদার। (মুসলিম শরীফ ২/২৪৫ পৃষ্ঠা) এ হাদিস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত।

আরো প্রমাণিত হলো রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহ্যিক আদম আলাইহিস সালামের সন্তান হিসেবে মানব কিন্তু তিনি হচ্ছেন বনী আদমের সরদার। এজন্য তিনি বেনজির ও বেমিসাল বশর বা মানব। নূরানী মানুষ যার কোন তুলনা সৃষ্টির মধ্যে নেই।

তাফসিরে রুহুল বয়ানে রয়েছে-

(لقد جاء كم من انفسكم) (من انفسكم) اى من جنسكم ادمى مثلكم لا من الملائكة ولا من غيرهم- (تفسير روح البيان ص ۳/۵٤۲)

ভাবার্থ: নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্যে থেকে একজন সম্মানিত রাসূল আগমন করেছেন। এখানে من انفسكم (তোমাদের মধ্য থেকে) এর তাফসির হচ্ছে اى من جنسكم অর্থাৎ তোমাদের স্বজাত থেকে। বাহ্যত তোমাদের ন্যায় মানব, তিনি ফিরিশতা জাতিও নন। মানব ছাড়া অন্য কোন জাতিও নন।

(قل انما انا بشر مثلكم) قل يا محمد ما انا الا ادمى مثلكم فى الصورة ومساويكم فى بعض البشرية (يوحى الى) من ربى (انما الهمكم اله واحد) ما هو الا متفرد فى الا لوهية لا تظيرله فى ذاته ولا شريك له فى صفاته يعنى انا معترف ببشريتى ولكن الله من على من بينكم بالنبوة والرسالة- (تفسير روح البيان ص ۵/۳٠৯)

(হে হাবিব! আপনি বলুন, নিশ্চয় আমি তোমাদের ন্যায় মানব।) হে মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনি বলুন, আমি মানব ছাড়া অন্য কিছুই নই। সুরত বা আকৃতিগত দিক থেকে তোমাদের ন্যায় এবং মানবীয় কতিপয় গুণ বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে তোমাদের সাথে আমার মিল রয়েছে। আমার প্রতি ওহি আসে আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে (নিশ্চয় তোমাদের ইলাহ বা মা’বুদ এক অভিন্ন) উলুহিয়ত বা উপাস্য হওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এক ও অভিন্ন। তার জাত বা স্বত্ত্বার কোন মিসাল বা উপমা নেই। তাঁর গুণাবলী থেকেও কোন অংশিদার নেই। আমি মানব জাতি তার স্বীকৃতি আমি দিচ্ছি কিন্তু আল্লাহতা’য়ালা তোমাদের মধ্যে আমাকে নবুয়ত ও রিসালাত দিয়ে বড়ই অনুগ্রহ করেছেন।

‘তাফসিরে রুহুল’ বয়ান নামক কতিাবের প্রথম জিলদের ৩৯৫ পৃষ্ঠায় والذين اوتوا العلم درجات (১৫পারা সূরা বনি ইসরাঈল) আয়াতের ব্যাখ্যা রয়েছে, আল্লামা ইসমাঈল হাক্কী বরছয়ী আলাইহির রহমত উল্লেখ করেন-

فانه صلى الله عليه وسلم ما بقى مكان ولا فى الامكان لانه كان فانيا عن ظلمة وجوده باقيا بنور وجوده لهذا سماه الله نورا فى قوله تعالى قد جاء كم من الله نور وكتاب مبين فالنور هو محمد عليه السلام والكتاب هو القران-

অর্থাৎ ‘নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মে’রাজের রজনীতে) কোন স্থানে বা সৃষ্টিজগতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। কেননা তখন তিনি তাঁর জড় অস্তিত্বের অন্ধকার অতিক্রম করে তাঁর নূরের অস্তিত্বে বিদ্যমান থাকলেন। এ কারণেই কোরআন মজীদে আল্লাহতায়ালা তাঁকে নূর বলে আখ্যায়িত করে এরশাদ করেছেন- قد جاء كم من الله نور وكتاب مبين (নিশ্চয় তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নূর ও একটি সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে)

অতএব উক্ত আয়াতে কারীমায় নূর দ্বারা মুরাদ হচ্ছে হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং কিতাব দ্বারা মুরাদ হচ্ছে কোরআনুল করিম।’

উপরোক্ত দলিলভিত্তিক আলোচনা দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো মেরাজ রজনীতে আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাশারিয়াত ফানা হয়ে নূরের ওজুদ বিদ্যমান ছিল।
হুজুরকে আমাদের মতো মানুষ বলা কুফুরি।কেননা হুজুর হচ্ছেন সৃষ্টিতে নূর আপাদমস্তক নূর তাঁর ছায়া ছিল না। কিন্তু তিনি জাতিতে মানুষ।

একাদশ শতাব্দীর দশম মুজাদ্দিদ আল্লামা মুল্লা আলী ক্বারী আলাইহির রহমত (ওফাত ১০১৪ হিজরি) তদীয়- المورد الروى فى المولد النبوى ‘আল মাওরিদুর রাউয়ী ফি মাওলিদিন নববী’ নামক কিতাবের ৫৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

الحاصل ان مجئ الرسول نعمة جسيمة- وكونه من جنس البشر منحة عظيمة وقال بعضهم قوله من انفسكم اى جنس العرب- وهو لا ينافى ما سبق-

সারকথা নিশ্চয় রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শুভাগমন এক মহান নিয়ামত বা বড় অনুগ্রহ। অথচ তিনি হচ্ছেন جنس البشر বা জাতিতে মানব। অনেকেই বলেন- আল্লাহর বাণী- من انفسكم এর তাফসির جنس العرب আরব দেশীয়। ইতোপূর্বে যা আলোচনা হয়েছিল ইহা এর ব্যতিক্রম নয়। অর্থাৎ جنس البشر ও جنس العرب উভয় তাফসিরে কোন বৈপিরিত্ব নেই।

মিশকাত শরীফ ৫২০ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

عن عائشة قالت كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يخصف نعله ويخيط ثوبه ويعمل فى بيته كما يعمل احدكم فى بيته وقالت كان بشرا من البشر يغلى ثوبه ويحلب شاته ويخدم نفسه- رواه الترمذى-

ভাবার্থ: হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই জুতা মোবারকের ফিতা লাগাতেন, নিজের কাপড় সেলাই করতেন, নিজ গৃহের কাজ নিজেই সম্পন্ন করতেন। যেমন তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ করে থাক। তিনি আরো বলেন- তিনি মানুষ জাতীর মধ্য থেকে একজন মহামানব ছিলেন। নিজ কাপড় পরিচ্ছন্ন রাখতেন, নিজ হাতে দুধ দোহন করতেন, নিজে নিজের কাজ আঞ্জাম দিতেন। (তিরমিজি)
মুদ্দাকথা হলো, আল্লাহতা’য়ালা সর্বপ্রথম তাঁর হাবিবের নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন।সহিহ হাদিসশরীফে রয়েছে-

اول ما خلق الله نورى الخ

আল্লাহর হাবিব এরশাদ করেন, আল্লাহতা’য়ালা সর্বপ্রথম আমার নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন।মাদারিজুন নবুয়তের রেফারেন্স দিয়ে ইতোপূর্বে এ নূরের হাদিসখানা বর্ণনা করা হয়েছে।

ইমামে রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফেসানী শায়খ আহমদ ফারুকি সারহিন্দী আলাইহির রহমত তদীয় ‘মাকতুবাতে ইমামে রাব্বানী’ মাকতুব নং ১০০ পৃষ্ঠা উর্দু ১৫৫২-১৫৫৩ তৃতীয় জিলদে উল্লেখ রয়েছে-

جاننا چاھۓ کہ خلق محمدی دوسرے افراد انسانی کی پیدائش کی طرح نہیں ھے بلکہ عالم کے افراد میں سے کسی فرد کی پیدائش سے بھی مناسبت نہیں رکھتی کہ رسول اللہ صلی اللہ علیہ وسلم باوجود عنصری پیدائش کے اللہ تعالی کے نور سے پیدا ہوے ہیں جیسا کہ نبی صلی اللہ علیہ وسلم نے فرمایا ہے خلقت من نور اللہ (میں اللہ تعالی کے نور سے پیدا کیا گیا ہوں- اور دوسروں کی یہ دولت نہیں ہوئ-

মাকতুবাতে ইমামে রাব্বানী’ কিতাবের ফার্সি মূল এবারত নিম্নে প্রদত্ত হলে-

باید دانست کہ خلق محمدی صلی اللہ علیہ وسلم دررنگ خلق سائر افراد انسانی نیست بلکہ بخلقے ھیچے فردے از افراد عالم مناسبت نہ دارد کہ اوصلی اللہ علیہ وسلم باوجود نشاء عنصری از نور حق جل واعل مخلوق گشتہ است کما قال علیہ الصلوۃ والسلام خلقت من نور اللہ-

ভাবার্থ: মুজাদ্দিদে আলফেসানী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- জেনে রাখা অতিব প্রয়োজন যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সৃষ্টি অপরাপর মানুষের মত নয়।এমনকি কুলকায়েনাত বা সমগ্র সৃষ্টিজগতের কেহই সৃষ্টির মধ্যে তাঁর সাথে কোন প্রকার সাদৃশ্য রাখে না।কেননা তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘নিশায়ে উনসুরিতে’ বা মানবীয় দেহ বিশিষ্ট হয়ে জন্মগ্রহণ করলেও আল্লাহ জাল্লা শানুহুর নূর কর্তৃক সৃষ্টি হয়েছে (অর্থাৎ আল্লাহতা’য়ালা নিজ নূরে জাত কর্তৃক হেকমতে কামেলার দ্বারা আল্লাহর হাবিবের নূর সৃষ্টি করেছেন-) আল্লাহর হাবিব নিজেই এরশাদ করেছেন আমি আল্লাহর নূর কর্তৃক সৃষ্টি হয়েছি।
(মাকতুবাত ১০০ নম্বর উর্দু তৃতীয় খণ্ড ১৫৫ পৃষ্ঠা)

মাদারিজুন নবুয়ত ১/৮১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে-

وصل- وحق سبحانہ اورا نور نام وسراج منیر در غایت انارت خواند کہ روشن روپیدا گشت بوی طریق قرب واصول وروشن شد بجمال وکمال وی ابصار وبصائر چنانکہ فرمود قد جاء من الله نور وكتاب مبين وفرمود يا ايها النبى انا ارسلناك شاهدا ومبشرا ونذيرا وداعيا الى الله باذنه وسراجا منيرا وگفتہ اندکہ تشبیہ بسراج با وجود انکہ مبالغہ در تشبیہ بشمس وقمر بیشتراست بجہت آنست کہ وجود عنصری صلی اللہ علیہ وسلم ارضی است ونیز سراج را خلفا می باشد چنانکہ ازیک صد ہزار سراج میتواں افروخت بخلاف شمس وقمر کہ خلیفہ ندارند-

ভাবার্থ: আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা’য়ালা নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম মোবারককে সর্বোচ্চ বিকিরণ হওয়ার কারণে نور ‘নূর’ এবং سراجا منيرا ‘সিরাজাম মুনিরা’ নামে আখ্যায়িত করেছেন।কেননা তাঁর (হাবিবে খোদার) ওসিলায় আল্লাহতা’য়ালার সান্নিধ্য ও নৈকট্য লাভের পদ্ধতিসমূহ উজ্জ্বলরূপে প্রকাশিত হয়েছে। এবং তাঁর জামাল বা সৌন্দর্য কামাল বা পরিপূর্ণতার দরুণ আভা হতে দৃষ্টিশক্তি ও বিবেকশক্তি লাভ হয়েছে।

এতদ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন মজিদে এরশাদ হয়েছে-

قد جاء كم من الله نور وكتاب مبين

(নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট আল্লাহতা’য়ালার পক্ষ থেকে নূর ও প্রকাশ্য কিতাব এসেছে)

আল্লাহতা’য়ালা আরো এরশাদ করেন-

يا ايها النبى انا ارسلناك شاهدا ومبشرا ونذيرا وداعيا الى الله باذنه وسراجا منيرا-

ভাবার্থ: হে (গায়েবের খবর দেনে ওয়ালা) নবী! নিশ্চয়ই আমি আপনাকে প্রত্যদর্শী সাক্ষ্য প্রদানকারী (হাজের ও নাজের) সুসংবাদ দানকারী,ভীতি প্রদর্শনকারী হিসেবে এবং আল্লাহতা’য়ালার নির্দেশে তাঁর পথে আহ্বানকারী এবং উজ্জ্বলতম প্রদীপ হিসেবে প্রেরণ করেছি।

আলেমগণ বলেন, আল্লাহতা’য়ালা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রদীপের সঙ্গে তুলনা করেছেন,এজন্য যে এ তুলনার মধ্যে চন্দ্র কিংবা সূর্যের তুলনার চাইতেও অধিকতর শোভনীয়।
সিরাজ বা প্রদীপের সঙ্গে এ জন্য তুলনা করা হয়েছে যে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের وجود عنصرى ‘ওজুদে উনসুরি’ বা দৈহিক সম্পর্ক ارضى ‘আরদি’ বা জমিনের সাথে সম্পৃক্ত।

এতদ্ব্যতীত প্রদীপের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- একটি প্রদীপ হতে শত-শহস্র প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করা যায়। পান্তরে চন্দ্র কিংবা সূর্যের কোন প্রতিভূ নেই।’

এ পর্যন্ত দলিলভিত্তিক যা কিছু আলোচনা হলো তার সার সংক্ষেপে হলো এই-

(১.) আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম সকল সৃষ্টির পূর্বে তার হেকমতে কামেলা দ্বারা তাঁর হাবিব হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন এবং ঊর্ধ্ব ও অধঃজগতের সবকিছুই নূর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নূর মোবারক থেকে সৃষ্ট।
তাঁর পবিত্র নূরী জওহর থেকে রূহসমূহ, আরশ,কুরসি,লওহ,কলম,বেহেশত, দোযখ,ফেরেশতা, ইনসান,জিন,আসমান,জমিন,সাগর,পাহাড়,গাছ, বৃক্ষ এবং কুল মাখলুকাত সৃষ্টি হয়েছে।

(২.) হাবিবে খোদা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপাদমস্তক নূর। عين نور باشد তিনি নিজেই নূর ছিলেন।তাঁর নূর মোবারক দ্বারা আল্লাহতা’য়ালা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন নূরে তাখলিকী বা আল্লাহতা’য়ালা কর্তৃক সর্বপ্রথম সৃষ্টি নূর।আল্লাহর হাবিব لطافت ‘লতাফত’ বা সূক্ষ হওয়ার কারণে তাঁর কোন ছায়া ছিল না।

(৩.) আল্লাহতা’য়ালা হচ্ছেন نور حقيقى ‘নূরে হাকিকী’ بمعنى অর্থ হলো منور ‘মুনাওইর’ বা নূরের সৃষ্টিকর্তা।আল্লাহর হাবিব হচ্ছেন নূরে মজাজি অর্থাৎ আল্লাহতা’য়ালা ‘হুব’ এরাদা এবং হেকমতে কামেলা দ্বারা তাঁর হাবিবের নূর মোবারক সৃষ্টি করেছেন।

(৪.) আল্লাহতা’য়ালার জাত হচ্ছে নূরে হাকিকী অর্থাৎ নূর সৃষ্টিকর্তা। অপরদিকে নবীর جنس ‘জিনস’ বা জাত হচ্ছে বশর যার তুলনা সৃষ্টির মধ্যে নেই।যা কোরআন সুন্নাহর দ্বারা প্রমাণিত।

(৫.) আল্লাহতা’য়ালা হচ্ছেন نور مطلق ‘নূরে মতলক’।নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন جنس بشر ‘জিনসে বশর’।

(يظهر ان النور المطلق هو الله سبحانه واطلاق النور على غيره مجاز اذ كل ما سوى الله- (تفسير كبير جلد ۱۲ ص۲۳٠)
الخطاب للبشر على الاطلاق ومعنى كونه عليه الصلوة والسلام من انفسهم انه من جنس البشر ( روح المعانى جلد ٤ ص۵۲ باره ۱۱)

(৬.) আল্লাহতা’য়ালা অন্যান্য সকল রূহ মোবারকের পূর্বে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রূহ মোবারক সৃষ্টি করেছেন।তারপর আল্লাহর হাবিবের রূহ মোবারক হতে সমস্ত রূহ সৃষ্টি করেছেন। (মাদারিজুন নবুয়ত, ১/১৪৩ পৃষ্ঠা ফার্সি)

(৭.) আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম بشر ‘বশর’ বা বেমিসাল, বেনজির মানুষ।সুরত বা আকৃতির দিক দিয়ে তোমাদের মত অর্থাৎ আকৃতিতে বা দেখতে আমাদের মত মানুষ কিন্তু সৃষ্টিতে নূর আপাদমস্তক নূর,আইনী নূর, যার ছায়া ছিল না। কারণ তিনি হচ্ছেন لطافت ‘লতাফত’ বা সূক্ষ্ম।(তাফসিরে রুহুল বয়ান ৫/৩০৭ পৃষ্ঠা)

(৮.) সকল ঈমানদার মুসলমানের ঈমান সহিহ শুদ্ধ হওয়ার জন্য শর্ত হলো, আল্লাহর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম جنس بشر ‘জিনসে বশর’ জাতিতে মানুষ এবং তিনি ছিলেন আরবি এ জ্ঞান সকল মুসলমানের থাকতে হবে এবং মানতে হবে।অপরদিকে এ আকিদাও রাখতে হবে যে,আল্লাহর হাবিব মানুষ বটে কিন্তু কখনই আমাদের মত মানুষ নন বরং নুরের মানুষ,যার কোন তুলনা সৃষ্টির মধ্যে নেই। (তাফসিরে রুহুল মায়ানী, তাফসিরে রহুল বয়ান, মাদারিজুন নবুয়ত গং কিতাবাদিতে তার প্রমাণাদি বিদ্যমান রয়েছে যা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে)

(৯.) রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৃষ্টিতে নূর,আপাদমস্তক নুর যার ছায়া ছিল না।কেননা তাঁর জিসিম মোবারক لطافت ‘লতাফত’ সূক্ষ।তিনি জাতিতে মানুষ সৃষ্টির মধ্যে যার কোন তুলনা নেই।আল্লাহর হাবিবের বেলাদত বা জন্ম ছিল ব্যতিক্রমধর্মী যার কোন তুলনা নেই।

এ প্রসঙ্গে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের সুপ্রসিদ্ধ আলেম সর্বজন মান্য শায়খ আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন আমের শাবরাভী শাফেয়ী (ওফাত ১১৫৪ হিজরি) তদীয় كتاب الاتحاف بحب الاشراف ‘কিতাবুল ইত্তেহাফ বিহুব্বিল আশরাফ’ নামক কিতাবের ১১৭ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন-

غريبة قال العلامة التلمسانى كل مولود غير الانبياء يولد من الفرج وكل الانبياء غير نبينا مولودون من فوق الفرج وتحت السرة واما نبينا صلى الله عليه وسلم فمولود من الخاصرة اليسرى تحت الضلوع ثم التأم لوقته خصوصية له ولم يصح نقل ان نبينا من الانبياء ولد من الفرج ولهذا افتى المالكية بقتل من قال ان النبى صلى الله عليه وسلم ولد من مجرى البول اه ملخصا.

ভাবার্থ: غريبة ‘গারিবাতুন’ বা আশ্চর্যজনক বিষয় হলো নবীর জন্ম মোবারক ব্যতিক্রমধর্মী।আল্লামা তিলমিসানী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন- আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালাম ব্যতীত সকল মানব সন্তান মায়ের প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ভূমিষ্ট হয়ে থাকেন। আর আম্বিয়ায়ে কেরামগণ ভূমিষ্ট হয়েছেন মায়ের নাভী ও প্রস্রাবের রাস্তার মধ্যবর্তী স্থান দিয়ে এবং আমাদের নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভূমিষ্ট হয়েছেন হযরত আমেনা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহার বাম পাঁজরের নিম্নভাগ দিয়ে। অতঃপর উক্ত স্থান সাথে সাথে জোড়া লেগে যায়। এ খুসুসিয়ত বা বিশেষত্ব একমাত্র নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একক বৈশিষ্ট্য।
নবীগণ আলাইহিমুস সালামের মধ্য থেকে কোন নবী আলাইহিমুস সালাম মায়ের প্রস্রাবের স্থান দিয়ে ভূমিষ্ট হয়েছেন, এমন বর্ণনা সহীহ বা সঠিক নয়। একারণেই মালেকী মাযহাবের মুফতি ও উলামায়ে কেরামগণ ফতোয়া দিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তি যদি বলে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, তাকে কতল বা হত্যা করা ওয়াজিব।

মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থের “নূর বিষয়ক” অধ্যায়

Standard

[ইমাম অাহমদ শেহাবউদ্দীন আল-কসতলানী (রহ:) প্রণীত ‘আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া’ গ্রন্থের ‘রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর নূর’ অধ্যায় হতে অনূদিত। প্রকাশক: অাস্ সুন্নাহ ফাউন্ডেশন অফ আমেরিকা;  Imam Qastalani’s book ‘al-Mawahib al-Laduniyya’ (‘Light of the Prophet’ chapter); from As-Sunnah Foundation of America; translated by K.S.Hossain]

বঙ্গানুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

উৎসর্গ
আমার পীর ও মোর্শেদ চট্টগ্রাম বোয়ালখালীস্থ আহলা দরবার শরীফের আউলিয়াকুল শিরোমণি হযরতুল আল্লামা শাহ সূফী সৈয়দ এ, জেড, এম, সেহাবউদ্দীন খালেদ সাহেব (রহ:)-এর পুণ্যস্মৃতিতে….।
– অনুবাদক 

ইমাম মোহাম্মদ যুরকানী মালেকী (রহ:) ’আল-মাওয়াহিব’ বইটির ওপর ৮ খণ্ডের একটি ব্যাখ্যামূলক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ইমাম কসতলানী (রহ:) ’আল-মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়া’ (যুরকানী রচিত ’শরাহ’ বা ব্যাখ্যা, ৩:১৭৪) গ্রন্থে বলেন:

মহা বরকতময় নাম ‘মোহাম্মদ’ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) ওই নামের অর্থের সাথে যথাযথভাবে মিলে যায় এবং আল্লাহতা’লা মানুষের দ্বারা তাঁর প্রতি ওই মোবারক নামকরণের আগেই নিজ হতে ওই পবিত্র নাম তাঁর প্রতি আরোপ করেন। এটি তাঁর নবুয়্যতের একটি প্রতীকী-চিহ্ন প্রতিষ্ঠা করে, কারণ তাঁর নাম তাঁরই (নবুয়্যতের) সত্যতাকে নিশ্চিত করে। অতএব, তিনি যে জ্ঞান-প্রজ্ঞা দ্বারা (সবাইকে) হেদায়াত দান করেছেন এবং (সবার জন্যে) কল্যাণ এনেছেন, সে কারণে তিনি এই দুনিয়ায় প্রশংসিত (মাহমূদ)। আর পরকালে শাফায়াত তথা সুপারিশ করার সুউচ্চ মকামে অধিষ্ঠিত হবেন বলেও তিনি প্রশংসিত (মাহমূদ)।

[আল্লাহতা’লা সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নবুয়্যতকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে কীভাবে তাঁকে মহাসম্মানিত করেছেন, তার বর্ণনা; এতে আরও বর্ণিত হয়েছে তাঁর বংশপরিচয়, ঔরস, বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) ও (ছেলেবেলার) শিক্ষাদীক্ষা] 

আশীর্বাদধন্য রূহের সৃষ্টি

আল্লাহতা’লা সৃষ্টিকুলকে অস্তিত্বশীল করার এরাদা (ঐশী ইচ্ছা) পোষণ করার পর তিনি নিজ ‘নূর’ হতে নূরে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করেন। এরপর তিনি মহানবী (দ:)-এর নূর হতে বিশ্বজগত ও আসমান-জমিনের তাবৎ বস্তু সৃষ্টি করেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে তাঁর রেসালাত সম্পর্কে অভিহিত করেন; ওই সময় হযরত আদম (আ:) রূহ এবং দেহের মধ্যবর্তী (ঝুলন্ত) অবস্থায় ছিলেন। হুযূর পূর নূর (দ:) হতেই তখন সমস্ত রূহ অস্তিত্বশীল হন, যার দরুন তিনি সকল সৃষ্টির চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে সাব্যস্ত হন এবং সকল অস্তিত্বশীল বস্তুর উৎসমূলে পরিণত হন।

সহীহ মুসলিম শরীফে নবী করীম (দ:) এরশাদ করেন যে আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই আল্লাহ পাক সৃষ্টিকুলের ভাগ্য (তাকদীর) লিপিবদ্ধ করেছিলেন। অধিকন্তু, (হাদীসে) আরও বলা হয় যে আল্লাহতা’লার আরশ-কুরসি ছিল পানিতে এবং যিকির তথা উম্মুল কেতাবে যা কিছু লেখা হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের ’খাতামুন্ নাবিয়্যিন’ হওয়ার বিষয়টি। হযরত এরবায ইবনে সারিয়্যা (রা:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান, “আল্লাহ বিবৃত করেন যে আমি তখনো আম্বিয়া (আ:)-এর মোহর ছিলাম, যখন আদম (আ:) রূহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন (মানে সৃষ্টি হননি)।”

হযরত মায়সারা আল-দাব্বী (রা:) বলেন যে তিনি মহানবী (দ:)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এয়া রাসূলুল্লাহ (দ:)! আপনি কখন নবী হন?” তিনি জবাবে বলেন, “যখন আদম (আ:) রূহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন।”

সুহায়ল বিন সালেহ আল-হামাদানী (রহ:) বলেন, “আমি (একবার) হযরত ইমাম আবূ জা’ফর মোহাম্মদ ইবনে আলী (রা:)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘মহানবী (দ:) কীভাবে অন্যান্য পয়গম্বর (আ:)-মণ্ডলীর অগ্রবর্তী হতে পারেন, যেখানে তিনি-ই সবার পরে প্রেরিত হয়েছেন?’ হযরত ইমাম (রা:) উত্তরে বলেন যে আল্লাহ পাক যখন বনী আদম তথা আদম-সন্তানদেরকে জড়ো করে তাঁর নিজের সম্পর্কে সাক্ষ্য (‘আমি কি তোমাদের প্রভু নই?’ প্রশ্নের উত্তর) নিচ্ছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (দ:)-ই সর্বপ্রথমে উত্তর দেন, ‘জ্বি, হ্যাঁ।’ তাই তিনি-ই সকল আম্বিয়া (আ:)-এর পূর্বসূরী, যদিও তাঁকে সবশেষে প্রেরণ করা হয়েছে।”

ইমাম তকীউদ্দীন সুবকী (রহ:) ওপরোল্লিখিত হাদীস (মুসলিম শরীফ) সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে আল্লাহতা’লা যেহেতু দেহের আগে রূহ (আত্মা) সৃষ্টি করেন এবং যেহেতু মহানবী (দ:) কর্তৃক ‘আমি তখনো নবী ছিলাম যখন আদম (আ:) রূহ ও দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন’ মর্মে মন্তব্য করা হয়, সেহেতু তাঁর ওই বক্তব্য তাঁর-ই পবিত্র রূহকে, তাঁর-ই বাস্তবতাকে উদ্দেশ্য করে; আর আমাদের মস্তিষ্ক (বিচার-বুদ্ধি) এই সব বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে অপারগ হয়ে পড়ে। কেউই সেসব বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে সক্ষম নয় একমাত্র সেগুলোর স্রষ্টা (খোদাতা’লা) ছাড়া, আর সে সকল পুণ্যাত্মা ছাড়া, যাঁদেরকে আল্লাহ পাক হেদায়াতের নূর দান করেছেন।

অতএব, হযরত আদম (আ:)-এর সৃষ্টিরও আগে আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-এর রূহ মোবারককে নবুওয়্যত দান করেছিলেন; কেননা, তিনি তাঁকে সৃষ্টি করে অগণিত (অফুরন্ত) নেয়ামত দান করেন এবং খোদার আরশে মহানবী (দ:)-এর নাম মোবারকও লেখেন, আর ফেরেশতা ও অন্যান্যদেরকে মহানবী (দ:)-এর প্রতি নিজ মহব্বত ও উচ্চধারণা বা শ্রদ্ধা সম্পর্কে জানিয়ে দেন। ফলে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাস্তবতা তখন থেকেই বিরাজমান, যদিও তাঁর মোবারক জিসম (দেহ) পরবর্তীকালে আবির্ভূত হন। হযরত আল-শি’বী (রা:) বর্ণনা করেন যে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনি কখন থেকে নবী ছিলেন?” হুযূর পূর নূর (দ:) এরশাদ ফরমান, ”যখন আদম (আ:) তাঁর রূহ এবং দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন এবং আমার কাছ থেকে ওয়াদা নেয়া হয়েছিল।” তাই আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মধ্যে তিনি-ই সর্বপ্রথমে সৃষ্ট এবং সর্বশেষে প্রেরিত।

বর্ণিত আছে যে, মহানবী (দ:)-ই হলেন একমাত্র বনী আদম, যাঁকে রূহ ফোঁকার আগে (সর্বপ্রথমে) বেছে নেয়া হয়; কেননা তিনি-ই মনুষ্যজাতির সৃষ্টির কারণ, তিনি-ই তাদের অধিপতি, তাদের অন্তঃসার, তাদের উৎসমূল এবং মাথার মুকুট।

সর্ব-হযরত আলী ইবনে আবি তালেব (ক:) ও ইবনে আব্বাস (রা:) উভয়েই বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আদম (আ:) থেকে আরম্ভ করে সমস্ত নবী-রাসূল প্রেরণের আগে তাঁদের কাছে আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:) সম্পর্কে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন যে, যদি তাঁদের হায়াতে জিন্দেগীতে তাঁরা মহানবী (দ:)-এর সাক্ষাৎ পান, তবে যেন তাঁরা তাঁর প্রতি ঈমান আনেন এবং তাঁকে (সর্বাত্মক) সাহায্য-সমর্থন করেন; আর যেন তাঁরা নিজেদের উম্মতকেও অনুরূপ কর্তব্য পালনের আদেশ দেন।”

বর্ণিত আছে যে আল্লাহ পাক যখন আমাদের মহানবী (দ:)-এর নূর সৃষ্টি করেন, তখন তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-কে অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-এর নূরের দিকে তাকাতে বলেন। রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর নূর সবার নূরকে ঢেকে ফেলে (অথবা সবার নূরকে ছাপিয়ে ওঠে) ; এমতাবস্থায় আল্লাহ পাক তাঁদেরকে কথা বলতে দিলে তাঁরা জিজ্ঞেস করেন, ‘এয়া আল্লাহ, কে আমাদেরকে তাঁর নূর দ্বারা ঢেকে রেখেছেন?’ আল্লাহতা’লা জবাবে বলেন, ‘এটি সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর নূর। যদি তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনো, তবে আমি তোমাদেরকে নবী বানিয়ে দেবো।’ তাঁরা সবাই বলেন, ‘আমরা তাঁর প্রতি এবং তাঁর নবুওয়্যতের প্রতি ঈমান আনলাম।’ অতঃপর আল্লাহ পাক জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কি তোমাদের সাক্ষী হবো?’ তাঁরা উত্তর দেন, ’হ্যাঁ’। আল্লাহ পাক আবার প্রশ্ন করেন, ‘তোমরা কি এই প্রতিশ্রুতি পালনের বাধ্যবাধকতা মেনে নিলে?’ তাঁরা উত্তরে বলেন, ‘আমরা তা মানার ব্যাপারে একমত।’এমতাবস্থায় আল্লাহতা’লা বলেন, ‘তাহলে সাক্ষী হও, আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী হলাম।’ এটি-ই হলো পাক কালামের অর্থ যেখানে আল্লাহতা’লা এরশাদ করেছেন: “এবং স্মরণ করুন! যখন আল্লাহ আম্বিয়াবৃন্দের কাছ থেকে তাদের অঙ্গিকার নিয়েছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমত প্রদান করবো, অতঃপর তাশরীফ আনবেন তোমাদের কাছে ওই রাসূল, যিনি তোমাদের কিতাবগুলোর সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা নিশ্চয় নিশ্চয় তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং অবশ্যঅবশ্য তাঁকে সাহায্য করবে’।” [আল-কুরআন, ৩:৮১]

ইমাম তকীউদ্দীন সুবকী (রহ:) বলেন, “এই মহান আয়াতে করীমায় মহানবী (দ:)-এর প্রতি পেশকৃত শ্রদ্ধা ও উচ্চ সম্মান একেবারেই স্পষ্ট। এতে আরও ইঙ্গিত আছে যে অন্যান্য আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর জীবদ্দশায় মহানবী (দ:)-কে প্রেরণ করা হলে তাঁর রেসালাতের বাণী তাঁদের জন্যে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হতো। অতএব, তাঁর রেসালাত ও রেসালাতের বাণী সাইয়্যেদুনা আদম (আ:) থেকে আরম্ভ করে শেষ বিচার দিবস পর্যন্ত আগত সমস্ত সৃষ্টিকুলের জন্যে সার্বিক হিসেবে সাব্যস্ত হয় এবং সকল আম্বিয়া (আ:) ও তাঁদের উম্মত-ও মহানবী (দ:)-এর উম্মতের অন্তর্গত বলে গণ্য হন। এ কারণে ‘আমাকে সকল জাতির জন্যে প্রেরণ করা হয়েছে’ মর্মে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীসটি শুধু তাঁর সময়কার ও শেষ বিচার দিবস অবধি আগত মনুষ্যকুলের জন্যে উচ্চারিত হয়নি, বরং এতে অন্তর্ভুক্ত আছেন তাদের পূর্ববর্তীরাও। এ বিষয়টি আরও সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে তাঁর নিম্নবর্ণিত হাদীসকে, যেখানে তিনি এরশাদ ফরমান: ‘আমি তখনো নবী ছিলাম, যখন আদম (আ:) রূহ এবং দেহের মধ্যবর্তী অবস্থায় ছিলেন।’ মহানবী (দ:) যে নবী (আ:)-দের নবী (দ:), সেটি জানা যায় তখনই, যখন দেখতে পাই মে’রাজ রজনীতে সকল আম্বিয়া (আ:) তাঁর ইমামতিতে নামায পড়েছিলেন। পরকালে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠত্ব আরও স্পষ্ট হবে, যখন সকল আম্বিয়া (আ:) তাঁর-ই পতাকাতলে সমবেত হবেন।”

জিসম মোবারকের সৃষ্টি

হযরত কা’আব আল-আহবার (রা:) বলেন, “আল্লাহতা’লা যখন সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করতে চাইলেন, তখন তিনি ফেরেশতা হযরত জিবরীল আমীন (আ:)-কে পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু হতে মাটি আনতে বল্লেন, যেটি হলো ওর সৌন্দর্য ও নূর (জ্যোতি)। অতঃপর হযরত জিবরীল (আ:) জান্নাতুল ফেরদৌস ও রফীকে আ’লার ফেরেশতাদেরকে সাথে নিয়ে (ধরণীতে) নেমে আসেন এবং মহানবী (দ:)-এর মোবারক দেহ সৃষ্টির জন্যে (বর্তমানে) যেখানে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর রওযা শরীফ অবস্থিত, সেখান থেকে এক মুঠাে মাটি নেন। সেই মাটি ছিল ধবধবে সাদা এবং নূরানী তথা আলো বিচ্ছুরণকারী। এরপর ফেরেশতা জিবরীল (আ:) ওই পবিত্র মাটিকে জান্নাতের ‘তাসনিম’ নহরের সেরা সৃষ্ট পানির সাথে মিশিয়ে নেন, যতোক্ষণ পর্যন্ত না তা তীব্র প্রভা বিকীরণকারী সাদা মুক্তোর মতো হয়ে গিয়েছিল। ফেরেশতাবৃন্দ তা বহন করে সুউচ্চ আরশ, পাহাড়-পর্বত ও সাগর-মহা সাগর ঘুরে বেড়ান। এভাবেই ফেরেশতাবৃন্দ ও সকল সৃষ্টি আমাদের আকা ও মওলা মহানবী (দ:) সম্পর্কে জানতে পারেন, যা তাঁরা হযরত আদম (আ:)-কে জানারও আগে জেনেছিলেন।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “মহানবী (দ:)-এর (ওই) মাটির মূল উৎস পৃথিবীর নাভি হতে উৎসারিত, যা মক্কা মোয়াযযমায় কা’বা ঘর যেখানে অবস্থিত, সেখানেই কেন্দ্রীভূত। অতএব, সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম সৃষ্টির উৎসমূলে পরিণত হন, আর সকল সৃষ্টি তাঁর-ই অনুসরণকারী হন।”

’আওয়ারিফুল মা’আরিফ’ গ্রন্থপ্রণেতা (সুলতানুল আরেফীন শায়খ শেহাবউদ্দীন সোহরাওয়ার্দী রহমতুল্লাহে আলাইহে) বলেন যে (হযরত নূহ আলায়হিস্ সালামের যুগের) মহাপ্লাবনের সময় স্রোতের তোড়ে মহানবী (দ:)-এর মৌল সত্তা  মদীনা মোনাওয়ারায় তাঁর বর্তমানকালের রওযা শরীফের কাছে এসে অবস্থান নেন। তাই তিনি মক্কা মোয়াযযমা ও মদীনা মোনাওয়ারা উভয় স্থানের বাসিন্দা হিসেবে পরিণত হন।

বর্ণিত আছে যে আল্লাহ পাক যখন হযরত আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেন, তখন ‍তিনি তাঁকে এ আরজি পেশ করতে অনুপ্রাণিত করেন, “এয়া আল্লাহ! আপনি কেন আমাকে ‘আবূ মোহাম্মদ’ (মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের পিতা) নামে ডেকেছেন?” আল্লাহতা’লা জবাবে বলেন, “ওহে আদম! তোমার মাথা তোলো!” তিনি শির মোবারক তুলে (খোদার) আরশের চাঁদোয়ায় মহানবী (দ:)-এর নূর মোবারক দেখতে পান। হযরত আদম (আ:) আরয করেন, “এই জ্যোতি কিসের?” জবাবে আল্লাহ পাক ফরমান, “এটি তোমারই ঔরসে অনাগত এক নবী (দ:)-এর জ্যোতি। আসমানে (বেহেশ্তে) তাঁর নাম আহমদ (সাল্লাল্লাহু আলােইহে ওয়া সাল্লাম), আর দুনিয়াতে হলো মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আ’লেহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁকে সৃষ্টি না করলে আমি তোমাকে, বা আসমান, অথবা জমিন কিছুই সৃষ্টি করতাম না।”

ইমাম আব্দুর রাযযাক (রহ:) বর্ণনা করেন হযরত জাবের বিন আব্দিল্লাহ (রা:) হতে, যিনি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমার পিতা ও মাতা আপনার জন্যে কুরবান হোন। (অনুগ্রহ করে) আমায় বলুন, আল্লাহতা’লা সর্বপ্রথম বা সর্বাগ্রে কী সৃষ্টি করেন?’ জবাবে মহানবী (দ:) বলেন, ‘ওহে জাবের! নিশ্চয় আল্লাহ পাক সর্বাগ্রে তোমার নবী (দ:)-এর নূর (জ্যোতি)-কে তাঁর নূর হতে সৃষ্টি করেন। ওই নূর আল্লাহতা’লা যেখানে চান, সেখানেই তাঁর কুদরতে ঘুরতে আরম্ভ করেন। সেসময় না ছিল লওহ, না কলম, না বেহেশ্ত, না দোযখ, না ফেরেশ্তাকুল, না আসমান, না জমিন, না সূর্য, না চন্দ্র, না জ্বিন-জাতি, না মনুষ্যকুল। আল্লাহতা’লা যখন সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করতে চাইলেন, তখন তিনি ওই নূরকে চারভাগে বিভক্ত করলেন। অতঃপর প্রথম অংশটি হতে তিনি কলম সৃষ্টি করেন; লওহ সৃষ্টি করেন দ্বিতীয় অংশ থেকে, আর তৃতীয় অংশ থেকে আরশ সৃষ্টি করেন। এরপর তিনি চতুর্থ অংশটিকে আবারও চারভাগে বিভক্ত করেন। ওর প্রথম অংশ দ্বারা তিনি আরশের (আজ্ঞা)-বাহকদের (তথা শীর্ষস্থানীয় ফেরেশতাদের) সৃষ্টি করেন; দ্বিতীয় অংশ দ্বারা কুরসী সৃষ্টি করেন; আর তৃতীয় অংশটি দ্বারা বাকি সকল ফেরেশতাকে সৃষ্টি করেন। অতঃপর তিনি চতুর্থ অংশকে আবারও চারভাগে বিভক্ত করেন: প্রথম অংশটি দ্বারা তিনি সমস্ত আসমান সৃষ্টি করেন; দ্বিতীয় অংশটি দ্বারা সমস্ত জমিন সৃষ্টি করেন; তৃতীয় অংশটি দ্বারা বেহেশ্ত ও দোযখ সৃষ্টি করেন। এরপর আবারও তিনি চতুর্থ অংশটিকে চারভাগে বিভক্ত করেন: প্রথম অংশ থেকে তিনি ঈমানদারদের দর্শনক্ষমতার নূর সৃষ্টি করেন; দ্বিতীয় অংশ থেকে অন্তরের নূর (তথা আল্লাহকে জানার যোগ্যতা) সৃষ্টি করেন; আর তৃতীয় অংশ থেকে মো’মেন (বিশ্বাসী)-দের সুখ-শান্তির নূর (উনস্, অর্থাৎ, ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ কলেমাটি) সৃষ্টি করেন।”

অপর এক বর্ণনা হযরত আলী ইবনে আল-হুসাইন (রহ:), তিনি তাঁর পিতা (রা:) হতে, তিনি তাঁর প্রপিতা (রা:) হতে, তিনি রাসূলুল্লাহ (দ:) হতে রেওয়ায়াত করেন; মহানবী (দ:) এরশাদ ফরমান: “আমি ছিলাম এক নূর আমার প্রভু খোদাতা’লার দরবারে, এবং তা হযরত আদম (আ:)-এর সৃষ্টিরও চৌদ্দ হাজার বছর আগে।” বর্ণিত আছে যে আল্লাহতা’লা যখন আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেন, তখন তিনি ওই নূরে মোহাম্মদী (দ:)-কে তাঁর পিঠে স্থাপন করেন; আর সেই নূর তাঁর সম্মুখভাগে এমন আলো বিচ্ছুরণ করতেন যে তাঁর (আদমের) অন্যান্য জ্যোতি তাতে ম্লান হয়ে যেতো। এরপর আল্লাহ পাক সেই নূরকে তাঁরই মহাসম্মানিত আরশে উন্নীত করেন এবং ফেরেশতাদের কাঁধে বহন করান; আর তিনি তাঁদের প্রতি আদম (আ:)-কে সমস্ত আসমান ঘুরিয়ে তাঁরই সৃষ্টি-সাম্রাজ্যের (শ্রেষ্ঠতম) বিস্ময়গুলো দেখাতে আদেশ দেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “হযরত আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করা হয় শুক্রবার অপরাহ্নে। আল্লাহতা’লা অতঃপর ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর বাঁ পাঁজর থেকে তাঁরই স্ত্রী বিবি হাওয়াকে সৃষ্টি করেন। তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠে মা হাওয়াকে দেখে স্বস্তি বোধ করেন এবং নিজ হাত মোবারক তাঁর দিকে বাড়িয়ে দেন। ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, ‘ওহে আদম (আ:)! থামুন।’ তিনি এমতাবস্থায় প্রশ্ন করেন, ‘কেন, আল্লাহতা’লা কি একে আমার জন্যে সৃষ্টি করেননি?’ ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, ‘আপনার দ্বারা তাঁকে দেনমোহর পরিশোধ না করা পর্যন্ত নয়।’ তিনি আবার প্রশ্ন করেন, ‘তার দেনমোহর কী?’ জবাবে ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, ‘সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি তিনবার সালাত-সালাম (দুরুদ) পাঠ’।” [অপর রেওয়ায়াতে আছে বিশবার]

আরও বর্ণিত আছে যে হযরত আদম (আ:) বেহেশত ত্যাগ করার সময় আরশের পায়ায় এবং বেহেশতের সর্বত্র আল্লাহতা’লার নামের পাশে মহানবী (দ:)-এর নাম মোবারক লিপিবদ্ধ দেখতে পান। তিনি আরয করেন, “হে প্রভু, মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) কে?” আল্লাহ পাক জবাব দেন, “তিনি তোমার পুত্র, যাঁকে ছাড়া আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না।” অতঃপর হযরত আদম (আ:) ফরিয়াদ করেন, “হে প্রভু, এই পুত্রের অসীলায় (খাতিরে) এই পিতার প্রতি করুণা বর্ষণ করুন।” আল্লাহতা’লা উত্তরে বলেন, “ওহে আদম! আসমান ও জমিনের অধিবাসীদের জন্যে যদি তুমি মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যস্থতায় (অসীলায়) সুপারিশ করতে, আমি তা গ্রহণ বা মঞ্জুর করতাম।”

হযরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী, যিনি এরশাদ ফরমান: “আদম (আ:) কর্তৃক নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার পর তিনি আরয করেন, ‘এয়া অাল্লাহ! সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর অসীলায় আমায় ক্ষমা করুন।’ আল্লাহতা’লা বলেন, ‘তুমি তাঁকে কীভাবে চেনো, আমি তো এখনো তাঁকে সৃষ্টি করিনি?’ হযরত আদম (আ:) উত্তর দেন, ‘হে প্রভু, এটি এ কারণে যে আপনি যখন আপনার কুদরতী হাতে আমায় সৃষ্টি করেন এবং আমার দেহে আমার রূহ ফোঁকেন, তখন আমি মাথা তুলে আরশের পায়ায় লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (কলেমা) বাক্যটি লিপিবদ্ধ দেখতে পাই। অামি বুঝতে পারি, সৃষ্টিকুলে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কারো নাম-ই আপনি আপনার নামের পাশে যুক্ত করেছেন।’ অতঃপর আল্লাহ পাক বলেন, ‘ওহে আদম! তুমি সত্য বলেছো। আমার সৃষ্টিকুলে তিনি-ই আমার সবচেয়ে প্রিয়ভাজন। আর যেহেতু তুমি তাঁর-ই অসীলায় আমার কাছে চেয়েছো, সেহেতু তোমাকে ক্ষমা করা হলো। মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) যদি না হতেন, তাহলে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না। তিনি তোমারই বংশে পয়গম্বর-মণ্ডলীর সীলমোহর’।”

হযরত সালমান ফারিসী (রা:)-এর এক বর্ণনায় জানা যায়, হযরত জিবরীল আমীন (আ:) অবতীর্ণ হয়ে মহানবী (দ:)-কে বলেন: “আপনার প্রভু খোদাতা’লা বলেন, ‘আমি ইবরাহীম (আ:)-কে আমার খলীল (বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করলে আপনাকেও (হে হাবীব) তা হিসেবেই গ্রহণ করেছি। আপনার চেয়ে আমার এতো কাছের জন হিসেবে আর কাউকেই আমি সৃষ্টি করিনি; উপরন্ত, আমি এই বিশ্বজগতকে এবং এর অধিবাসীদেরকে সৃষ্টি করেছি কেবল আপনার শান-মান এবং আপনি আমার কতো প্রিয় তা জানাবার উদ্দেশ্যেই; আপনি না হলে আমি এই বিশ্বজগত সৃষ্টি করতাম না’।”

হযরত আদম (আ:) ও বিবি হাওয়ার ঘরে বিশ বারে সর্বমোট চল্লিশজন পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু মা হাওয়ার গর্ভে সাইয়্যেদুনা শীষ (আ:)-এর জন্ম হয় আলাদাভাবে। এর কারণ হলো আমাদের মহানবী (দ:)-এর প্রতি তা’যিম বা শ্রদ্ধা প্রদর্শন, যাঁর নূর মোবারক হযরত আদম (আ:) থেকে শীষ (আ:)-এর মাঝে স্থানান্তরিত হয়েছিল। সাইয়্যেদুনা আদম (আ:)-এর ’বেসাল’ তথা খোদার সাথে পরলোকে মিলনপ্রাপ্তির আগে তিনি শীষ (আ:)-এর জিম্মায় তাঁর (ভবিষ্যত) প্রজন্মকে রেখে যান; আর এরই ধারাবাহিকতায় শীষ (আ:)-ও সন্তানদেরকে আদম (আ:)-এর অসীয়তনামা হস্তান্তর করেন; সেই অসীয়ত হলো, শুধু পুতঃপবিত্র ও নির্মল (আত্মার) নারীর মাঝে ওই নূর হস্তান্তর করা। এই অসীয়ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছিল, যতোক্ষণ না আল্লাহ পাক আব্দুল মোত্তালিব ও তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে এই নূর মঞ্জুর করেন। এভাবেই আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-এর পূর্বপুরুষদের বংশপরম্পরাকে মূর্খদের অবৈধ যৌনাচার থেকে পুতঃপবিত্র রেখেছিলেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি বিবৃত করেন: “মূর্খতাজনিত অবৈধ যৌনাচার আমার বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন)-কে স্পর্শ করেনি। আমার বেলাদত হয়েছে ইসলামী বিবাহ রীতির ফলশ্রুতিতেই।”

হিশাম ইবনে মোহাম্মদ আল-কালবী বর্ণনা করেন তাঁর বাবার ভাষ্য, যিনি বলেন: “আমি রাসূলে খোদা (দ:)-এর  উর্ধ্বতন (বা পূর্ববর্তী) বংশীয় পাঁচ’শ জন মায়ের হিসেব আমার গণনায় পেয়েছি। তাঁদের কারো মাঝেই কোনো অবৈধ যৌনাচারের লেশচিহ্ন মাত্র আমি খুঁজে পাইনি, যেমনটি পাইনি অজ্ঞদের কর্মকাণ্ড।”

সাইয়্যেদুনা হযরত আলী (ক:) বর্ণনা করেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমি বিয়ের ফলশ্রুতিতেই বেলাদত-প্রাপ্ত হয়েছি, অবৈধ যৌনাচার থেকে নয়; আবির্ভূত হয়েছি আদম (আ:) হতে বংশপরম্পরায় আমার পিতামাতার ঘরে। মূর্খতাজনিত অবৈধ যৌনাচারের কোনো কিছুই আমাকে স্পর্শ করেনি।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) রেওয়ায়াত করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমার পিতামাতা কখনোই অবৈধ যৌনাচার করেননি। আল্লাহতা’লা আমাকে পুতঃপবিত্র ঔরস থেকে পুতঃপবিত্র গর্ভে স্থানান্তর করতে থাকেন; যখনই দুটো (বিকল্প) পথ সামনে এসেছে, আমি সেরা পথটি-ই পেয়েছি।”

হযরত আনাস (রা:) বর্ণনা করেন যে হুযূর পাক (দ:) ‘লাকাদ জা’আকুম রাসূলুম্ মিন আনফুসিকুম’- আয়াতটি তেলাওয়াত করেন এবং বলেন: “আমি আমার খানদান, আত্মীয়তা ও পূর্বপুরুষের দিক দিয়ে তোমাদের মাঝে সেরা; হযরত আদম (আ:) হতে আরম্ভ করে আমার পূর্বপুরুষদের কেউই অবৈধ যৌনাচার করেননি।”

সাইয়্যেদাহ আয়েশা সিদ্দীকা (রা:) মহানবী (দ:) হতে বর্ণনা করেন যে হযরত জিবরীল আমীন (আ:) বলেন, “আমি পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত খুঁজেও মহানবী (দ:)-এর মতো সেরা ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাইনি; আর বনূ হাশিম গোত্রের পুত্রদের মতো কোনো বাবার সন্তানের দেখাও পাইনি আমি।”

সহীহ বোখারী শরীফে হযরত আবূ হোরায়রা (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে আদম সন্তানদের সেরা প্রজন্মে, একের পর এক, যতোক্ষণে আমি না পৌঁছেছি আমার (বর্তমান)-টিতে।”

সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত ওয়াতিলা ইবনে আল-আসকা’ বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান, “আল্লাহ পাক হযরত ইসমাঈল (আ:)-এর পুত্রদের মধ্যে কেনানাকে বেছে নিয়েছেন এবং কেনানা হতে কুরাইশ গোত্রকে পছন্দ করেছেন; অার কুরাইশ গোত্র হতে বনূ হাশিমকে বেছে নিয়েছেন; এবং চূড়ান্তভাবে হাশিমের পুত্রদের মাঝে আমাকেই পছন্দ করেছেন।”

হযরত আব্বাস (রা:) রেওয়ায়াত করেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বাণী, যিনি বলেন: “সৃষ্টিকুলের অস্তিত্ব দেয়ার পর আল্লাহ পাক আমাকে সেরা দলগুলোতে অধিষ্ঠিত করেন; এবং দুটো দলের মধ্যে সেরা দলে (আমি অধিষ্ঠিত হই)। অতঃপর তিনি গোত্রগুলো বেছে নেন এবং সেগুলোর সেরা পরিবারটিতে আমাকে অাবির্ভূত করেন। অতএব, আমার ব্যক্তিত্ব, আত্মা ও স্বভাব সর্বসেরা এবং আমি এগুলোর সেরা উৎস হতে আগত।”

হযরত ইবনে উমর (রা:) বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আল্লাহতা’লা তাঁর সৃষ্টিকুলকে যাচাই করে আদম সন্তানদেরকে তা থেকে বাছাই করেন; এরপর তিনি আদম সন্তানদেরকে যাচাই করে তাদের মধ্য থেকে আরবদেরকে মনোনীত করেন; অতঃপর তিনি আরবদেরকে যাচাই করে আমাকে তাদের মধ্য হতে পছন্দ করে নেন। অতএব, আমি-ই সব পছন্দের সেরা পছন্দ। সতর্ক হও, আরবদেরকে যে মানুষেরা ভালোবাসে, তা আমার প্রতি ভালোবাসার কারণেই ভালোবাসে; আর যারা আরবদেরকে ঘৃণা করে, তারা আমাকে ঘৃণা করার কারণেই তা করে থাকে।”

জ্ঞাত হওয়া দরকার যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লাম তাঁর পিতামাতা হতে সরাসরি (জন্ম নেয়া) কোনো ভাই বা বোনের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন না; তিনি ছিলেন তাঁদের একমাত্র সন্তান এবং তাঁর খানদান তাঁরই কাছে এসে শেষ হয়। এভাবে তিনি এক অনন্য খানদানে বেলাদত-প্রাপ্ত হয়েছিলেন যা আল্লাহতা’লা (তাঁরই) নবুয়্যতের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছার জন্যে এরাদা (ঐশী ইচ্ছে) করেছিলেন, যে নব্যুয়ত সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী।

আপনারা যদি মহানবী (দ:)-এর উচ্চ বংশমর্যাদা ও তাঁর পবিত্র বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) সম্পর্কে বিচার-বিশ্লেষণ করেন, তবে আপনারা তাঁর মহাসম্মানিত পূর্বপুরুষদের ব্যাপারে নিশ্চিত হবেন। কেননা, তিনি হচ্ছেন আন্ নবী (দ:), আল-আরবী (দ:), আল-আবতাহী (দ:), আল-হারাআমী (দ:), আল-হাশেমী (দ:), আল-কুরাইশী (দ:), হাশেমী সন্তানদের সেরা, সেরা আরব গোত্রগুলোর মধ্য হতে পছন্দকৃত, সেরা বংশোদ্ভূত, সর্বশ্রেষ্ঠ খানদানে আগত, সেরা বর্ধনশীল শাখা, সবচেয়ে উঁচু স্তম্ভ, সেরা উৎস, সবচেয়ে মজবুত ভিত, সুন্দরতম বাচনভঙ্গির অধিকারী, সবচেয়ে বোধগম্য শব্দচয়নকারী, সর্বশ্রেষ্ঠ নির্ণায়ক মানদণ্ড, সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী, সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গ, পিতামাতার দু’দিক থেকেই সবচেয়ে সম্মানিত আত্মীয়স্বজন, এবং আল্লাহতা’লার জমিনে সবচেয়ে সম্মানিত ভূমি (আরবদেশ) হতে আগত। তাঁর অনেক মোবারক নাম রয়েছে, যার সর্বাগ্রে হলো মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম, যিনি আবদুল্লাহ’র পুত্র। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে রয়েছেন তাঁরই দাদা আবদুল মোত্তালিব, যাঁর নাম শায়বাত আল-হামদ; হাশেমের পুত্র আমর, আবদ মানাআফের পুত্র আল-মুগীরা, কুসাইয়ের পুত্র মোজাম্মী’, কিলাআবের পুত্র হাকীম, মুররার পুত্র, (কুরাইশ গোত্রীয়) কাআবের পুত্র, লু’আইয়ের পুত্র, গালিবের পুত্র, ফিহর-এর পুত্র, যাঁর নাম কুরাইশ, মালেকের পুত্র, আল-নাযহিরের পুত্র, যাঁর নাম কায়েস, কিনানার পুত্র, খুযায়মার পুত্র, মুদরিকার পুত্র, ইলিয়াসের পুত্র, মুদারের পুত্র, নিযারের পুত্র, মাআদ্দ-এর পুত্র, আদনানের পুত্র।

ইবনে দিহিয়া বলেন, “উলেমাবৃন্দ (এ ব্যাপারে) একমত এবং জ্ঞানীদের এই ঐকমত্য একটি প্রামাণ্য দলিল যে মহানবী (দ:) তাঁর পূর্বপুরুষদের নাম আদনান পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন এবং এর ওপরে আর যাননি।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহী ওয়া সাল্লাম তাঁর পূর্বপুরুষদের বংশপরম্পরা উল্লেখ করার সময় কখনোই আদনানের পুত্র মা’আদ্দ-এর ওপরে যেতেন না, বরঞ্চ এ কথা বলে শেষ করতেন, “বংশ বর্ণনাকারীরা (উদ্ভববিজ্ঞানীরা) মিথ্যে বলেছে।” এ কথা তিনি দু’বার বা তিনবার বলতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “আদনান ও হযরত ইসমাঈল (আ:)-এর মধ্যে ত্রিশজন পূর্বপুরুষের নাম অজ্ঞাত রয়েছে।”

কাআব আল-আহবার (রহ:) বলেন, “মহানবী (দ:)-এর নূর (জ্যোতি) আবদুল মোত্তালিবের কাছে পৌঁছুবার কালে তিনি পূর্ণ যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন; ওই সময় এক রাতে তিনি কা’বা ঘরের বহিঃপ্রাঙ্গনে ঘুমিয়েছিলেন। (সকালে) জেগে উঠলে তাঁর চোখ দুটো কালো সুরমামাখা ও চুল তেলমাখা এবং পরনে সুন্দর জাঁকজমকপূর্ণ জামাকাপড় দেখা যায়। কে এ রকম করেছেন, তা না জানার দরুন তিনি বিস্মিত হন। তাঁর পিতা তাঁকে হাত ধরে দ্রুত কুরাইশ বংশীয় গণকদের কাছে নিয়ে যান। তারা তাঁর পিতাকে বলেন পুত্রকে বিয়ে দিতে। তিনি তা-ই করেন। আবদুল মোত্তালিবের শরীর থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ মেশকের গন্ধ বের হতো, আর তাঁর ললাট হতে উজ্জ্বল প্রভা ছড়াতো নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)। কখনো খরা দেখা দিলে কুরাইশ গোত্র তাঁকে ‘সাবীর’পর্বতে নিয়ে যেতো এবং তাঁরই অসীলায় আল্লাহর দরবারে বৃষ্টি প্রার্থনা করতো। আল্লাহ পাক-ও তাদের প্রার্থনার জবাব দিতেন এবং নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে
ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর খাতিরে বৃষ্টি বর্ষণ করতেন।”

ইয়েমেনী রাজা আবরাহা যখন পবিত্র কা’বা ঘর ধ্বংসের অভিপ্রায়ে মক্কা শরীফ অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং এর খবর কুরাইশ গোত্রের কাছে পৌঁছে, তখন আবদুল মোত্তালিব তাদের বলেন, “সে (বাদশাহ) এই ঘর পর্যন্ত পৌঁছুবে না, কারণ এটি মহান প্রভুর সুরক্ষায় আছে।” মক্কা মোয়াযযমার পথে বাদশাহ আবরাহা কুরাইশ গোত্রের অনেক উট ও ভেড়া লুঠপাট করে; এগুলোর মধ্যে ছিল আবদুল মোত্তালিবের মালিকানাধীন চার’শ মাদী উট। এমতাবস্থায় তিনি সওয়ারি হয়ে অনেক কুরাইশকে সাথে নিয়ে ’সাবীর’ পর্বতে আরোহণ করেন। সেখানে নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) তাঁর কপালে অর্ধ চন্দ্রাকারে দৃশ্যমান হয় এবং সেটির আলোকোচ্ছ্বটা পবিত্র (কা’বা) ঘরে প্রতিফলিত হয়। আবদুল মোত্তালিব তা দেখার পর বলেন, “ওহে কুরাইশ গোত্র, তোমরা এখন ফিরে যেতে পারো, কেননা কা’বা এখন নিরাপদ। আল্লাহর কসম! এই কিরণ (নূর) যখন আমাকে ঘিরে রেখেছে, তখন কোনো সন্দেহ নেই যে বিজয় আমাদেরই হবে।”

কুরাইশ গোত্রীয় মানুষেরা মক্কায় ফিরে গেলে আবরাহা রাজার প্রেরিত এক ব্যক্তির সাথে তাদের দেখা হয়। আবদুল মোত্তালিবের চেহারা দেখে ওই ব্যক্তি ভাবাবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং তাঁর জিহ্বা তোতলাতে থাকে; তিনি মুর্ছা যান, আর তাঁর কণ্ঠ থেকে জবেহকৃত বৃষের আওয়াজ বেরুতে থাকে। জ্ঞান ফিরে এলে তিনি আব্দুল মোত্তালিবের পায়ে পড়ে যান এ কথা বলে, “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনি সত্যিসত্যি কুরাইশ গোত্রের অধিপতি।”

বর্ণিত আছে যে আবদুল মোত্তালিব যখন বাদশাহ আবরাহার মুখোমুখি হন, ওই সময় বাদশাহর সেনাবাহিনীতে সর্ববৃহৎ সাদা হাঁতিটি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে উট যেভাবে হাঁটু গেড়ে নত হয় ঠিক সেভাবে নত হয়ে যায় এবং সেজদা করে। আল্লাহতা’লা সেই প্রাণিকে বাকশক্তি দেন এবং সে বলে, “ওহে আবদুল মোত্তালিব, আপনার ঔরসে নূর (-এ-মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।” রাজা আবরাহার বাহিনী কা’বা ঘর ধ্বংস করার জন্যে অগ্রসর হলে ওই হাঁতি আবারো হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তারা সেটিকে দাঁড় করানোর জন্যে মাথায় বেদম প্রহার করে, কিন্তু সেটি তা করতে অস্বীকার করে। তারা হাঁতিটিকে ইয়েমেনের দিকে মুখ করালে সেটি উঠে দাঁড়ায়। অতঃপর আল্লাহতা’লা বাদশাহর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সমুদ্র হতে এক ঝাঁক পাখি প্রেরণ করেন, যেগুলোর প্রত্যেকটি তিনটি করে পাথর বয়ে আনে: একটি পাথর ঠোঁটে, অপর দুটি দুই পায়ে। এই পাথরগুলো আকৃতিতে ছিল মশুরি ডালের দানার সমান। এগুলো সৈন্যদেরকে আঘাত করামাত্রই তারা মৃত্যুমুখে পতিত হতে থাকে। ফলে সৈন্যরা ভয়ে রণভঙ্গ দেয়। এমতাবস্থায় আবরাহা এক কঠিন রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। তার হস্তাঙ্গুলির ডগা এক এক করে পড়ে যেতে থাকে। আর তার শরীর থেকে রক্ত ও পুঁজ-ও বের হয়। অবশেষে তার হৃদযন্ত্র চৌচির হয়ে সে মারা যায়।

এই ঘটনাটি-ই আল্লাহতা’লা উল্লেখ করেছেন তাঁর পাক কালামে, যেখানে মহানবী (দ:)-কে সম্বোধন করে তিনি এরশাদ ফরমান, “হে মাহবূব! আপনি কি দেখেননি আপনার রব্ব (খোদাতা’লা) ওই হস্তী আরোহী বাহিনীর কী অবস্থা করেছেন?” [সূরা ফীল, ১ম আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ‘তাফসীরে নূরুল এরফান’]। এই ঘটনা আমাদের সাইয়্যেদুনা হযরতে মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের উচ্চমর্যাদার এবং তাঁর রেসালাত ও তা প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত বহন করে। এতে আরও ফুটে ওঠে তাঁরই উম্মতকে প্রদত্ত সম্মান ও তাঁদের প্রতি (খোদার) হেফাযত (সুরক্ষা), যার দরুন সমস্ত আরব জাতিগোষ্ঠী তাঁদের কাছে সমর্পিত হন এবং তাঁদের মহত্ত্ব ও বিশিষ্টতায় বিশ্বাস স্থাপন করেন। এটি এ কারণেই সম্ভব হয়েছে যে আল্লাহ পাক তাঁদেরকে হেফাযত করেছেন এবং দৃশ্যতঃ অজেয় আবরাহা বাদশাহর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁদেরকে সমর্থন যুগিয়েছেন।

মায়ের গর্ভে প্রিয়নবী (দ:)

আবরাহা’র শ্যেনদৃষ্টি থেকে আল্লাহতা’লা কর্তৃক রক্ষা পাবার পর এক রাতে আবদুল মোত্তালিব কা’বা ঘরের প্রাঙ্গনে ঘুমোবার সময় এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেন। তিনি জেগে ওঠে ভয় পান এবং কুরাইশ গোত্রীয় গণকদের কাছে গিয়ে এর বিবরণ দেন। তারা তাঁকে বলে, “এ স্বপ্ন সত্য হলে আপনার ঔরসে এমন কেউ আসবেন যাঁর প্রতি আসমান ও জমিনের বাসিন্দারা বিশ্বাস স্থাপন করবেন এবং যিনি সুপ্রসিদ্ধি লাভ করবেন।” ওই সময় তিনি ফাতেমা নাম্নী এক মহিলাকে বিয়ে করেন, যাঁর গর্ভে জন্ম নেন আবদুল্লাহ আল-যাবীহ (রা:), যাঁর ইতিহাসও সর্বজনবিদিত।

অনেক বছর পরে আবদুল্লাহ (রা:) নিজ জীবনরক্ষার সদকাহ-স্বরূপ এক’শটি উট কোরবানি করে তাঁর পিতাসহ যখন বাড়ি ফিরছিলেন, তখন তাঁরা ফাতেমা নাম্নী এক ইহুদী গণকের সাক্ষাৎ পান। সে কুরাইশ গোত্রের সেরা সুদর্শন যুবক আবদুল্লাহ (রা:)-এর চেহারার দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনার জন্যে যতোগুলো উট কোরবানি করা হয়েছে, আমি ততোগুলো উট আপনাকে দেবো; তবে শর্ত হলো এই মুহূর্তে আপনাকে আমার সাথে সহবাস করতে হবে।” তার এ কথা বলার কারণ ছিল সে আবদুল্লাহ (রা:)-এর মুখমণ্ডলে নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) দেখতে পেয়েছিল। আর সে এও আশা করেছিল সম্মানিত মহানবী (দ:)-এর মাতা সে-ই হতে পারবে। কিন্তু আবদুল্লাহ (রা:) জবাব দেন:

হারামের মোকাবেলায় কাম্য কেবল মৃত্যু
আর আমি এতে দেখি না কোনো হালাল বা বৈধত্ব
বরঞ্চ এক্ষণে তোমার দ্বারা যা আমা হতে যাচিত
সম্মানী মানুষের তা হতে নিজ সম্মান ও দ্বীন রাখা চাই সুরক্ষিত।

পরের দিন আবদুল মোত্তালিব নিজ পুত্রকে ওয়াহাব ইবনে আবদ মানাআফের সাথে দেখা করিয়ে দেন; ইনি ছিলেন বনূ যোহরা গোত্রপ্রধান, বংশ ও খানদানে তাদের অধিপতি। আবদুল মোত্তালিব পুত্র আবদুল্লাহ (রা:)-কে ওয়াহাবের কন্যা আমিনা (রা:)-এর সাথে বিয়ে দেন; ওই সময় আমিনা (রা:) ছিলেন কুরাইশ গোত্রে বংশ ও পারিবারিক দিক দিয়ে অন্যতম সেরা মহিলা। অতঃপর মিনা দিবসগুলোর মধ্যে কোনো এক সোমবার আবূ তালিবের গিরিপথে তাঁরা দাম্পত্যজীবনের শুভসূচনা করেন এবং মহানবী (দ:) তাঁর মায়ের গর্ভে আসেন।

তৎপরবর্তী দিবসে আবদুল্লাহ (রা:) ঘরের বাইরে বেরুলে ইতিপূর্বে তাঁর কাছে প্রস্তাবকারিনী সেই মহিলার দেখা পান। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, “গতকাল যে প্রস্তাব তুমি আমায় দিয়েছিলে, আজ কেন তা আমায় দিচ্ছ না?” সে প্রত্যুত্তরে বলে, “গতকাল যে জ্যোতি তুমি বহন করেছিলে, তা আজ তোমায় ত্যাগ করেছে। তাই আমার কাছে আজ আর তোমাকে প্রয়োজন নেই। আমি ওই নূর আমার (গর্ভ) মাঝে পেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু খোদাতা’লা তা অন্যত্র রাখার এরাদা করেছেন।”

মহানবী (দ:) তাঁর মা আমিনা (রা:)-এর গর্ভে আসার সূচনালগ্ন থেকেই বহু মো’জেযা তথা অলৌকিক বা অত্যাশ্চর্য ঘটনা ঘটতে থাকে। সাহল ইবনে আবদিল্লাহ আত্ তুসতরী (রহ:) বলেন, “আল্লাহতা’লা যখন রজব মাসের কোনো এক শুক্রবার রাতে মহানবী (দ:)-কে তাঁর মায়ের গর্ভে পয়দা করেন, তখন তিনি বেহেশতের রক্ষক রিদওয়ানকে সর্বসেরা বেহেশতের দ্বার খুলে দিতে আদেশ করেন। কেউ একজন আসমান ও জমিনে ঘোষণা দেন যে অপ্রকাশ্য নূর যা দ্বারা হেদায়াতকারী পয়গম্বর (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) গঠিত হবেন, তা এই নির্দিষ্ট রাতেই তাঁর মায়ের গর্ভে আসবেন, যেখানে তাঁর সৃষ্টিপ্রক্রিয়া পূর্ণতা পাবে। আরও ঘোষিত হয় যে তিনি সুসংবাদ দানকারী এবং সতর্ককারী হিসেবে (পৃথিবীতে) আবির্ভূত হবেন।”

কাআব আল-আহবার (রহ:) থেকে বর্ণিত আছে, মহানবী (দ:) তাঁর মায়ের গর্ভে আসার রাতে আসমানসমূহে এবং জমিনের প্রতিটি প্রান্তে ঘোষণা করা হয় যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে যে অপ্রকাশ্য নূর হতে সৃষ্ট, তা তাঁর মা আমিনা (রা:)-এর গর্ভে আসবেন।

উপরন্তু, ওই দিন পৃথিবীর বুকে যতো মূর্তি ছিল সবই মাথা নিচের দিকে এবং পা ওপরের দিকে উল্টো হয়ে গিয়েছিল। কুরাইশ গোত্র মারাত্মক খরাপীড়িত ও দুর্দশাগ্রস্ত ছিল; কিন্তু এই মহা আশীর্বাদধন্য ঘটনার বদৌলতে ধরণীতল আবারও শষ্যশ্যামল হয়ে ওঠে এবং বৃক্ষতরু ফলবতী হয়; আর আশীর্বাদ ও কল্যাণ (ওই গোত্রের) চারপাশ থেকে তাদের দিকে ধাবমান হয়। এ সব মঙ্গলময় লক্ষণের জন্যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম যে বছর তাঁর মায়ের গর্ভে আসেন, সেটিকে ‘বিজয় ও খুশির বছর’ বলা হয়।

ইবনে এসহাক বর্ণনা করেন যে আমিনা (রা:) সবসময়ই উল্লেখ করতেন মহানবী (দ:) তাঁর গর্ভে থাকাকালীন সময়ে ফেরেশতাবৃন্দ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসার কথা; আর তাঁকে বলা হতো, “এই জাতির অধিপতি আপনার গর্ভে অবস্থান করছেন।” তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন, “আমি কখনোই (মহানবীকে) গর্ভে ধারণ অবস্থায় অনুভব করিনি যে আমি গর্ভবতী। আর আমি অন্যান্য গর্ভবতী নারীদের মতো কোনো অসুবিধা বা খিদেও অনুভব করিনি। আমি শুধু লক্ষ্য করেছি যে আমার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একবার আমি যখন ঘুম আর জাগ্রতাবস্থার মাঝামাঝি ছিলাম, তখন কোনো এক ফেরেশতা এসে আমাকে বলেন, ‘আপনি কি মনুষ্যকুলের অধিপতিকে গর্ভে ধারণ করার অনুভূতি পাচ্ছেন?’ এ কথা বলে তিনি চলে যান। মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি আবার এসে আমাকে বলেন: ‘বলুন, আমি তাঁর (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) প্রতি প্রত্যেক বিদ্বেষভাব পোষণকারীর ক্ষতি থেকে তাঁরই সুরক্ষার জন্যে মহান সত্তার মাঝে আশ্রয় প্রার্থনা করি এবং তাঁর নাম রাখি (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)’।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “মহানবী (দ:)-এর দ্বারা তাঁরই মায়ের গর্ভে আসার অলৌকিক ঘটনা (মো’জেযা)-গুলোর একটি হচ্ছে এই যে, ওই রাতে কুরাইশ গোত্রের মালিকানাধীন সমস্ত পশুপাখি মুখ খুলে এ কথা বলেছিল, “কা’বাগৃহের প্রভুর দোহাই, রাসূলুল্লাহ (দ:) (তাঁর মায়ের) গর্ভে এসেছেন। তিনি-ই হলেন সারা জাহানের অধিপতি এবং এর অধিবাসীদের জ্যোতি (নূর)। এমন কোনো রাজার সিংহাসন নেই যা আজ রাতে ওলটপালট না হয়ে গিয়েছে।” পূর্বাঞ্চলের তাবৎ পশুপাখি পশ্চিমাঞ্চলের পশুপাখির কাছে এই খোশখবরী নিয়ে ছুটে গিয়েছে; আর অনুরূপভাবে সাগরজলের অধিবাসীরাও একে অপরকে একইভাবে সম্ভাষণ জানিয়েছে। তাঁর গর্ভে আসার মাসের প্রতিদিনই আসমানে এলান (ঘোষণা) দেয়া হয়েছে এবং জমিনেও এলান দেয়া হয়েছে এভাবে: ‘খুশি উদযাপন করো, (কেননা) আশীর্বাদধন্য ও সৌভাগ্যবান আবূল কাসেম আবির্ভূত হবার সময় সন্নিকটে।”

আরেকটি রেওয়ায়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে ওই রাতে প্রতিটি ঘরই আলোকিত করা হয়েছিল, আর ওই নূর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল; উপরন্তু, সমস্ত প্রাণিজগত-ও কথা বলেছিল।

আবূ যাকারিয়্যা এয়াহইয়া ইবনে আইস্ বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম তাঁর মায়ের গর্ভে পুরো নয় মাস অবস্থান করেছিলেন, আর (ওই সময়) তাঁর মা কখনোই এমন কোনো ব্যথা বা অসুবিধা অনুভব করেননি যা একজন গর্ভধারিনী মা গর্ভকালীন সময়ে অনুভব করে থাকে। তিনি সবসময়ই বলতেন, ‘এই গর্ভের চেয়ে সহজ আর কোনো গর্ভ আমি প্রত্যক্ষ করিনি, এর চেয়ে আশীর্বাদধন্য গর্ভও আমি দেখিনি’।”

আমিনা (রা:)-এর গর্ভকালের দ্বিতীয় মাসে আবদুল্লাহ (রা:) মদীনা মোনাওয়ারায় তাঁরই বনূ নাজ্জার গোত্রীয় চাচাদের উপস্থিতিতে বেসাল (খোদার সাথে পরলোকে মিলন)-প্রাপ্ত হন। তাঁকে আল-আবওয়া’ নামের স্থানে সমাহিত করা হয়। এ সময় ফেরেশতাবৃন্দ বলেন, “হে আমাদের প্রভু ও মালিক! আপনার রাসূল (দ:) একজন এয়াতিম হয়ে গিয়েছেন।” জবাবে আল্লাহ পাক বলেন, “আমি-ই হলাম তাঁর রক্ষক ও সাহায্যকারী।”

মহানবী (দ:)-এর ধরাধামে আবির্ভাবে অলৌকিকত্ব

আমর ইবনে কুতায়বা তাঁর জ্ঞানী পিতা (কুতায়বা) থেকে শুনেছেন, তিনি বলেন: “আমিনা (রা:)-এর গর্ভের চূড়ান্ত সময় উপস্থিত হলে আল্লাহতা’লা ফেরেশতাদের আদেশ দেন, ‘আসমানের সব দরজা ও বেহেশতের সব দরজাও খুলে দাও।’ ওই দিন সূর্য তীব্র প্রভা দ্বারা সুসজ্জিত হয়, আর আল্লাহতা’লা মহানবী (দ:)-এর ওয়াস্তে ওই বছর পৃথিবীতে সকল নারীর গর্ভে পুত্র সন্তান মঞ্জুর করেন।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন যে আমিনা সবসময় বলতেন, “আমার গর্ভ যখন ছয় মাস, তখন এক ফেরেশতা আমায় স্বপ্নে দেখা দেন এবং বলেন: ‘ওহে আমিনা, আপনি বিশ্বজগতের সেরা জনকে গর্ভে ধারণ করেছেন। তাঁর বেলাদতের সময় আপনি তাঁর নাম রাখবেন (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) এবং সেই নাম (মোবারক) গোপন রাখবেন।’ প্রসব বেদনা অনুভূত হতে শুরু করলে কেউই জানেননি যে আমি ঘরে একা। আবদুল মোত্তালিব-ও জানতে পারেননি, কেননা তিনি ওই সময় কা’বা ঘর তওয়াফ করছিলেন। আমি একটি প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পাই যা আমাকে ভীতিগ্রস্ত করে। অতঃপর লক্ষ্য করতেই মনে হলো একটি সাদা পাখির ডানা আমার হৃদয়ে (মধুর) পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে, যার দরুন আমার সমস্ত শংকা উবে যায়; আর আমার অনুভূত সমস্ত (প্রসব) বেদনাও প্রশমিত হয়। আমার সামনে দৃশ্যমান হয় এক সাদা রংয়ের শরবত, যা আমি পান করি। এরপর এক তীব্র জ্যোতি আমার প্রতি নিক্ষেপিত হয় এবং আমি কয়েকজন মহিলা দ্বারা নিজেকে পরিবেষ্টিত দেখতে পাই। এঁরা তালগাছের সমান লম্বা ছিলেন, আর এঁদেরকে দেখতে লাগছিল আবদ মানাআফ গোত্রের নারীদের মতোই। আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে ভাবলাম, ‘এঁরা কীভাবে আমার সম্পর্কে জানলেন?’ ওই মহিলাবৃন্দ আমাকে বলেন, ‘আমরা হলাম ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া এবং ইমরানের কন্যা মরিয়ম।’ এদিকে আমার (শারীরিক) অবস্থা আরও তীব্র আকার ধারণ করলে ধুপধাপ আওয়াজও বৃদ্ধি পেতে থাকে, যা প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় আরও ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এই অবস্থায় অামি হঠাৎ দেখতে পাই একখানি সাদা রেশমের ফালি আসমান ও জমিনের মাঝে বিছিয়ে দেয়া হয় এবং কেউ একজন বলেন, ‘তাঁকে লুকিয়ে রাখো যাতে মানুষেরা দেখতে না পায়।’ আমি আকাশে রূপার পানি ঢালার ‘জগ’ হাতে নিয়ে মানুষদেরকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাই। অতঃপর এক ঝাঁক পাখি এসে আমার ঘর ভরে যায়; এগুলোর ঠোঁট ছিল পান্নার, আর ডানা লালমণির। আল্লাহতা’লা এমতাবস্থায় আমার চোখের সামনে থেকে পর্দা উঠিয়ে নেন এবং আমি প্রত্যক্ষ করি সারা পৃথিবীকে, পূর্ব হতে পশ্চিমে, যেখানে তিনটি পতাকা ছিল উড্ডীন: একটি পূর্বদিকে, আরেকটি পশ্চিমদিকে এবং তৃতীয়টি কা’বা গৃহের ওপর। ঠিক সে সময়ই মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হয়। তিনি ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথেই সেজদায় পড়ে যান এবং আসমানের দিকে হাত তুলে বিনীতভাবে দোয়া করেন। অতঃপর আমি দেখতে পাই আসমানের দিক থেকে একটি সাদা মেঘ এসে তাঁকে ঢেকে ফেলে, যার দরুন তিনি আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। একটি কণ্ঠস্বরকে আমি বলতে শুনি, ‘তাঁকে দুনিয়ার সকল প্রান্তে নিয়ে যাও, পূর্ব ও পশ্চিমদিকে, সাগর-মহাসাগরে, যাতে সবাই তাঁকে তাঁর (মোবারক) নামে, বৈশিষ্ট্যে ও আকৃতিতে চিনতে পারে।’ এর পরপরই ওই সাদা মেঘমালা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায়।”

আল-খতীব আল-বাগদাদী (রহ:) বর্ণনা করেন আমিনা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “আমার গর্ভে (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত হওয়ার সময় আমি আধ্যাত্মিকতায় উদ্দীপ্ত আলোকোজ্জ্বল একখানি বড় মেঘ দেখতে পাই, যা’তে অনেকগুলো ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, ডানা ঝাপটানোর এবং মানুষের কথাবার্তার আওয়াজ শুনি। ওই মেঘ তাঁকে ঢেকে ফেলে এবং তিনি আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে যান। অতঃপর আমি একটি কণ্ঠস্বরকে বলতে শুনি, ‘(সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-কে সারা পৃথিবীতে ঘোরাও। তাঁকে জ্বিন, ইনসান, ফেরেশতা, বন্য পশুপাখির মতো সমস্ত আত্মাবিশিষ্ট সত্তার কাছে প্রদর্শন করো। তাঁকে দাও আদম (আ:)-এর (দৈহিক) আকৃতি; শীষ নবী (আ:)-এর জ্ঞান; নূহ (আ:)-এর সাহস; ইব্রাহীম (আ:)-এর (মতোই খোদার) নৈকট্য; ইসমাঈল (আ:)-এর জিহ্বা; এসহাক (আ:)-এর (অল্পে) তুষ্টি; সালেহ নবী (আ:)-এর বাগ্মিতা; লুত (আ:)-এর প্রজ্ঞা; এয়াকুব (আ:)-এর (কাছে প্রদত্ত) শুভসংবাদ; মূসা (আ:)-এর শক্তি; আইয়ুব নবী (আ:)-এর ধৈর্য; ইউনূস নবী (আ:)-এর তাবেদারী/আনুগত্য; ইউশা বিন নূন (আ:)-এর দ্বন্দ্বসংঘাত মোকাবেলা করার সামর্থ্য; দাউদ (আ:)-এর প্রতি প্রদত্ত সুরক্ষা; দানিয়েল নবী (আ:)-এর (খোদা)-প্রেম; ইলিয়াস নবী (আ:)-এর উচ্চমর্যাদা; এয়াহইয়া (আ:)-এর নিষ্কলঙ্ক অবস্থা; এবং ঈসা (আ:)-এর কৃচ্ছ্বব্রত। অতঃপর তাঁকে অবগাহন করাও আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর বৈশিষ্ট্যসমূহের মহাসমুদ্রে।’ এরপর ওই মেঘ সরে যায় এবং সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) একটি সবুজ রেশমের টুকরো হাতে পেঁচিয়ে শক্তভাবে ধরেন; আর তা থেকে অনবরত পানি বেরোচ্ছিল। এমতাবস্থায় কেউ একজন বলেন, ‘উত্তম, উত্তম, মহানবী (দ:) সমগ্র জগতকে মুঠোর মধ্যে নিয়েছেন; জগতের সমস্ত সৃষ্টি-ই তাঁর মুঠোর অভ্যন্তরে রয়েছে, কেউই বাদ পড়েনি।’ এমতাবস্থায় আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁকে জ্যোৎস্না রাতের পূর্ণচন্দ্রের মতোই (আলোকোজ্জ্বল) দেখাচ্ছিল। তাঁর কাছ থেকে ওই সময় সেরা মেশকের সুগন্ধ ছড়াচ্ছিল। আর এমনই সময় হঠাৎ সেখানে আবির্ভূত হন তিনজন। একজনের হাতে ছিল রুপার নির্মিত পানি ঢালার ‘জগ’; দ্বিতীয়জনের হাতে পান্নার তৈরি কাপড় কাচার বড় কাঠের পাত্র; আর তৃতীয়জনের হাতে ছিল এক টুকরো সাদা রংয়ের রেশমবস্ত্র, যা তিনি মোড়ানো অবস্থা থেকে খোলেন। এরপর তিনি একটি চোখ ধাঁধানো আংটি বের করে তা ওই ‘জগ’ হতে পানি দ্বারা সাতবার ধোন এবং সেই আংটির সাহায্যে মহানবী (দ:)-এর পিঠে (দুই কাঁধের মাঝে) একটি মোহর বা সীল এঁকে দেন। অতঃপর ওই রেশম দ্বারা তিনি তাঁকে মুড়িয়ে নিজ ডানার নিচে বহন করে এনে আমার কাছে ফেরত দেন।” [সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম]

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন, “মহানবী (দ:)-এর যখন বেলাদত হয়, তখন বেহেশতের রক্ষণাবেক্ষণকারী ফেরেশতা রিদওয়ান তাঁর কানে কানে বলেন, ‘ওহে (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম), খুশি উদযাপন করুন। কেননা, অন্যান্য পয়গম্বরের যতো জ্ঞান আছে, তার সবই আপনাকে মঞ্জুর করা হয়েছে। অতএব, আম্বিয়া (আ:)-বৃন্দের মধ্যে আপনি-ই সর্বাধিক জ্ঞানী এবং সাহসীও’।”

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন আমিনা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন: “আমার গর্ভে মহানবী (দ:)-এর বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) হলে তাঁর সাথে আবির্ভূত হয় এক জ্যোতি, যা পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে অবস্থিত সমস্ত আকাশ আলোকিত করে। এরপর তিনি মাটিতে নেমে হাতের ওপর ভর দিয়ে এক মুঠো মাটি তুলে নেন এবং শক্তভাবে ধরেন; অতঃপর তিনি আসমানের দিকে তাঁর মস্তক মোবারক উত্তোলন করেন।”

আত্ তাবারানী (রহ:) বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) যখন মাটিতে নামেন, তখন তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ ছিল এবং তাঁর তর্জনী আল্লাহতা’লার একত্বের সাক্ষ্য দিতে ওপরদিকে ওঠানো ছিল।

উসমান ইবনে আবি-ইল-আস্ বর্ণনা করেন যে তাঁর মাতা ফাতেমা বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদতের সময় আমি দেখতে পাই (আমিনার) ঘর আলোকিত হয়ে গিয়েছিল এবং তারকারাজি এতো কাছে চলে এসেছিল যে আমি মনে করেছিলাম সেগুলো বুঝি আমার ওপরই পড়ে যাবে।”

আল-এরবায ইবনে সারিয়্যা (রা:) বর্ণনা করেন মহানবী (দ:)-এর বাণী, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমি-ই হলাম আল্লাহতা’লার বান্দা ও আম্বিয়া (আ:)-মণ্ডলীর সীলমোহর; ঠিক সে সময় হতে আমি তা-ই, যখন আদম (আ:)-এর কায়া মাটি ছিল। আমি এই বিষয়টি তোমাদের কাছে ব্যাখ্যা করবো: আমি-ই আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম (আ:)-এর দোয়ার উত্তর (ফসল); আর ঈসা (আ:)-এর প্রদত্ত শুভসংবাদ; আর আমার মায়ের দেখা স্বপ্নের বিষয়বস্তু। পয়গম্বরবৃন্দের মায়েরা অহরহ-ই (এ ধরনের) স্বপ্ন দেখে থাকেন।” মহানবী (দ:)-এর মা আমিনা (রা:) তাঁর বেলাদতের সময় এমন এক নূর (জ্যোতি) দেখতে পান যার আলোকোচ্ছ্বটায় সিরিয়ার প্রাসাদগুলোও আলোকিত হয়। হুযূর পূর নূর (দ:)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:) তাঁর রচিত কবিতায় এই বিষয়টি-ই উল্লেখ করেন এভাবে –

”(হে নবী) আপনার বেলাদত হয়েছিল যবে
ভুবন ও দিগন্ত আলোকিত হয়েছিল আপনারই নূরের বৈভবে
সেই নূরের আলোয় ও ন্যায়ের পথেই চলেছি আমরা সবে।”

ইবনে সাআদ (রহ:) বর্ণনা করেন যে আমিনা (রা:)-এর গর্ভে যখন মহানবী (দ:)-এর বেলাদত হয়, তখন নবজাতকের শরীরে যে প্রসবোত্তর মল থাকে তা তাঁর মধ্যে ছিল না।

সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও জর্দান (শাম-দেশ)-এর প্রাসাদগুলো আলোকিত হওয়ার যে কথা (বর্ণনায়) এসেছে, সে সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে মহানবী (দ:)-এর নবুওয়্যতের নূর হতে ওই সমস্ত রাজ্য আশীর্বাদধন্য হয়েছে; কেননা, ওগুলো তাঁরই নবুওয়্যতের এলাকাধীন। এ কথা বলা হয়েছে, “ওহে কুরাইশ গোত্র, রেসালাত এখন আর বনী ইসরাঈল বংশের আয়ত্তে নেই। আল্লাহর কসম, মহানবী (দ:) তোমাদেরকে এমন প্রভাব বিস্তারের দিকে পরিচালনা করবেন, যা পূর্ব হতে পশ্চিম পর্যন্ত আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হবে।”

মহানবী (দ:)-এর বেলাদত তথা ধরাধামে শুভাগমনকালীন অলৌকিক ঘটনাবলীর কিছু কিছু ইমাম এয়াকূব ইবনে সুফিয়ান নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের সূত্রে নিজ ‘ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন যে পারস্যরাজ কিসরা (খসরু)-এর প্রাসাদ ওই সময় কেঁপে উঠেছিল এবং সেটির চৌদ্দটি ঝুল-বারান্দা ভেঙ্গে পড়েছিল; তাইবেরিয়াস হৃদের পানি শুকিয়ে গিয়েছিল; পারস্যের আগুন নিভে গিয়েছিল (যা অসংখ্য বর্ণনামতে এক হাজার বছর যাবত অবিরাম জ্বলেছিল); আর আসমানে প্রহরী ও ধুমকেতুর সংখ্যা বৃদ্ধি দ্বারা নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে শয়তানের দলের আড়ি পাতার বদমাইশিকে প্রতিরোধ করা হয়েছিল।

হযরত ইবনে উমর (রা:) ও অন্যান্যদের বর্ণনানুযায়ী, হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বেলাদত খতনা অবস্থায় হয় এবং তাঁর নাড়িও ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গিয়েছিল। হযরত আনাস (রা:) উদ্ধৃত করেন রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর হাদীস, যিনি এরশাদ ফরমান: “আমার মহান প্রভু কর্তৃক আমার প্রতি মঞ্জুরিকৃত উচ্চমর্যাদার একটি হলো, আমার বেলাদত (ধরাধামে শুভাগমন) খতনা অবস্থায় হয়েছে এবং কেউই আমার গোপন অঙ্গ দেখেনি।”

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বেলাদতের বছর সম্পর্কে (ঐতিহাসিকদের) বিভিন্ন মত রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠদের মত হচ্ছে তিনি ’হস্তীর বছর’ ধরণীতে আগমন করেন। সেটি ছিল আবরাহা বাদশাহ’র হস্তী বাহিনীর ঘটনার পঞ্চাশ দিন পরে পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখের ভোরে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত সোমবার হয়; রেসালাতের দায়িত্বও সোমবার তাঁর প্রতি ন্যস্ত হয়; মক্কা মোয়াযযমা থেকে মদীনা মোনাওয়ারায় হিজরত-ও করেন সোমবার; মদীনায় আগমনও করেন সোমবার; আর কালো পাথর বহনও করেন সোমবার। উপরন্তু, মক্কা বিজয় ও সূরা আল-মায়েদা অবতীর্ণ হবার উভয় দিন-ই ছিল সোমবার।”

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আল-আস্ (রহ:) বর্ণনা করেন, “সিরিয়াবাসীদের এক পুরোহিত বসবাস করতেন মারর্ আল-যাহরান এলাকায়, যাঁর নাম ছিল ইয়াসা। তিনি সবসময় বলতেন, ‘মক্কায় এক নবজাতক শিশুর আবির্ভাবের সময় হয়ে এসেছে, যাঁর কাছে আরব জাতি সমর্পিত হবে; আর অনারব জাতিগোষ্ঠীও যাঁর কর্তৃত্বাধীন হবে। এটি-ই তাঁর (নবুওয়্যতের) জমানা।’ কোনো নবজাতকের জন্মের খবর পেলেই ওই পুরোহিত তার খোঁজখবর নিতেন। সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর বেলাদত (ধরণীতে শুভাগমন) দিবসে আবদুল মোত্তালিব ঘর থেকে বেরিয়ে পুরোহিত ইয়াসা’র সাথে দেখা করতে যান। তিনিও ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে বলেন, ‘আপনাকে যে নবজাতকের ব্যাপারে বলেছিলাম, আপনি যেন তাঁর আশীর্বাদধন্য পিতামহ হোন। আমি বলেছিলাম, তাঁর বেলাদত হবে সোমবার, নবুওয়্যত পাবেন সোমবার, বেসাল (পরলোকে খোদার সাথে মিলন)-প্রাপ্তিও হবে সোমবার।’ আবদুল মোত্তালিব জবাবে বলেন, ‘এই রাতে, ভোরে আমার (ঘরে) এক নবজাতক আবির্ভূত হয়েছেন।’ পুরোহিত জিজ্ঞেস করেন, ‘তাঁর নাম কী রেখেছেন?’ তিনি উত্তর দেন, ‘(সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)।’ ইয়াসা বলেন, ‘এই নবজাতক আপনার আত্মীয়ের (বংশের) মধ্যে আবির্ভূত হবেন বলেই আমি আশা করেছিলাম। আমার কাছে এর তিনটি আলামত ছিল: তাঁর তারকা (রাশি) গতকাল উদিত হয়; তাঁর বেলাদত হয় আজ; এবং তাঁর নাম (সাইয়্যেদুনা) মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)’।” সৌর বছরের সেই দিনটি ছিল ২০শে এপ্রিল এবং বর্ণিত আছে যে তাঁর বেলাদত হয়েছিল রাতে।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা:) বর্ণনা করেন, “মহানবী (দ:)-এর বেলাদত যে রাতে হয়েছিল, ঠিক ওই সময় একজন ইহুদী বণিক মক্কা মোয়াযযমায় অবস্থান করছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে কুরাইশ গোত্র! আজ কি আপনাদের কোনো নবজাতকের আবির্ভাব হয়েছে?’ তাঁরা উত্তর দেন, ‘আমরা জানি না।’ তিনি তখন তাঁদেরকে বলেন, ‘আজ রাতে সর্বশেষ উম্মতের পয়গম্বরের বেলাদত হবে। তাঁর দুই কাঁধের মাঝখানে ঘোড়ার (ঘাড়ে) কেশের মতো কিছু কেশসম্বলিত একটি চিহ্ন থাকবে।’ কুরাইশ নেতৃবৃন্দ ওই ইহুদীকে সাথে নিয়ে আমিনা (রা:)-এর কাছে যান এবং তাঁর পুত্রকে দেখা যাবে কি না তা তাঁর কাছে জানতে চান। তিনি তাঁদের সামনে নিজ নবজাতক পুত্রকে নিয়ে আসেন এবং তাঁরা তাঁর পৃষ্ঠদেশ হতে কাপড় সরালে সেই চিহ্নটি দৃশ্যমান হয়। এতে ওই ইহুদী সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান ফিরলে তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার জন্যে আফসোস! আপনার আবার কী হলো?’ তিনি উত্তর দেন, ‘আল্লাহর কসম! বনী ইসরাঈল বংশ হতে নবুওয়্যত অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে’।”

আল-হাকীম (নিশাপুরী) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:) মক্কা মোকাররমা’র মোহাম্মদ বিন ইউসূফের ঘরে আবির্ভূত হন। তাঁর দুধ-মায়ের নাম সোয়াইবিয়া, যিনি ছিলেন আবূ লাহাবের বাঁদি এবং যাঁকে হুযূর পাক (দ:)-এর বেলাদতের খোশ-খবরী নিয়ে আসার জন্যে তাঁর মনিব (আবূ লাহাব) মুক্ত করে দিয়েছিল। আবূ লাহাবের মৃত্যুর পরে তাকে স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তুমি এখন কেমন আছো?’ সে জবাব দেয়, ‘আমি দোযখে (নরকে) আছি। তবে প্রতি সোমবার আমাকে রেহাই দেয়া হয়; সেদিন আমি আমার এই আঙ্গুলগুলো হতে পানি পান করতে পারি।’ এ কথা বলার সময় সে তার দুটো আঙ্গুলের ডগা দেখায়। সে আরও বলে, ‘এই মো’জেযা (অলৌকিকত্ব) এ কারণে যে, মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের সুসংবাদ নিয়ে আসার জন্যে আমি আমার দাসী সোয়াইবিয়াকে মুক্ত করে দিয়েছিলাম।’

ইবনে আল-জাযেরী বলেন, “অবিশ্বাসী আবূ লাহাব, যাকে আল-কুরআনে ভর্ৎসনা (লা’নত) করা হয়েছে, তাকে যদি মহানবী (দ:)-এর বেলাদতের খুশি উদযাপনের কারণে পুরস্কৃত করা হয়, তাহলে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর উম্মতের মধ্যে সেসব মুসলমানের কী শান হবে, যাঁরা তাঁর বেলাদতে খুশি উদযাপন করেন এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ সর্বাত্মক উদ্যোগ নেন? আমার জীবনের কসম, মহা করুণাশীল আল্লাহতা’লার তরফ থেকে তাঁদের পুরস্কার হলো আশীর্বাদধন্য বেহেশতে প্রবেশাধিকার, যেখানে (তাঁদের জন্যে) অপেক্ষারত মহান প্রভুর অশেষ রহমত, বরকত ও নেয়ামত।”

ইসলামপন্থী সর্বসাধারণ সবসময়-ই রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর ধরাধামে শুভাগমনের (মীলাদুন্নবীর) মাস (রবিউল আউয়াল)-কে ভোজন-আপ্যায়ন, সর্বপ্রকারের দান-সদকাহ, খুশি উদযাপন, বেশি বেশি নেক আমল এবং সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্রাম)-এর বেলাদতের বৃত্তান্ত সযত্নে পাঠ ও অধ্যয়নের মাধ্যমে উদযাপন করে থাকেন। এরই প্রতিদানস্বরূপ আল্লাহতা’লা-ও ঈমানদারদেরকে এই পবিত্র মাসের অফুরন্ত নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন। মওলিদ নামে পরিচিত মহানবী (দ:)-এর পবিত্র বেলাদত-দিবসের একটি প্রমাণিত বা প্রতিষ্ঠিত বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, এটি সারা বছরের জন্যে (খোদায়ী) হেফাযত বা সুরক্ষা বয়ে আনে এবং সেই সাথে সকল নেক মকসূদ পূরণেরও শুভবার্তা নিয়ে আসে। রাসূলে পাক (দ:)-এর মওলিদের আশীর্বাদধন্য মাসের রাতগুলোকে যাঁরা উদযাপন করেন, তাঁদের প্রতি আল্লাহতা’লা যেন তাঁর খাস্ রহমত নাযেল করেন, (আমীন)!

অত্যাশ্চর্যজনক ঘটনাবহুল বাল্যকাল

সাইয়্যেদা হালিমা (রা:) বলেন, “আমি বনূ সা’আদ ইবনে বকর গোত্রের আরও কয়েকজন (শিশুদেরকে বুকের দুধ খাওয়ানোর) ধাত্রীসহ নবজাতক শিশুদের খোঁজে মক্কা মোকাররমায় এসেছিলাম। ধাত্রী (পেশার) জন্যে সম্ভাব্য নবজাতক পাওয়ার বেলায় সেই বছরটি খারাপ যাচ্ছিল। আমি ও আমার বাচ্চা একটি গাধীর পিঠে চড়ে মক্কায় আসি; আর আমার স্বামী এমন একটি বয়স্ক উটনীকে টেনে আনেন যার এক ফোঁটা দুধও ছিল না। যাত্রা চলাকালে রাতে আমরা তিনজন ঘুমোতে পারিনি এবং আমার বাচ্চাকে খাওয়ানোর মতো কোনো বুকের দুধও আমি পাইনি।

“আমরা যখন মক্কা শরীফে এসে পৌঁছি, তখন আমাদের দলের প্রত্যেক মহিলাকে মহানবী (দ:)-এর ধাত্রী হওয়ার জন্যে অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু তাঁকে বাবা ইন্তেকালপ্রাপ্ত এয়াতীম জানার পর প্রত্যেকেই ওই প্রস্তাব নাকচ করে দেন। আক্ষরিকভাবে আমার বান্ধবীদের কেউই কোনো নবজাতক ছাড়া মক্কা মোয়াযযমা ত্যাগ করেননি, কিন্তু তারা সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-কে গ্রহণ করতে রাজি হননি। আমি এমতাবস্থায় কোনো নবজাতক শিশু না পেয়ে আমার স্বামীকে বলি যে, কোনো শিশু ছাড়া ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দলে আমি-ই একমাত্র ব্যক্তি হওয়ার ব্যাপারটি আমি পছন্দ করি না। আর তাই আমি ওই নবজাতক শিশুকে নিতে চাই।

“নবজাতক শিশুকে নেয়ার সময় তাঁর পরণে ছিল দুধের চেয়েও সাদা একটি পশমের জামা। মেশকের সুগন্ধ তাঁর গা থেকে ছড়াচ্ছিল। চিৎ হয়ে গভীর ঘুমে অচেতন অবস্থায় তিনি শুয়েছিলেন একখানা সবুজ রংয়ের রেশমী বস্ত্রের ওপর। তাঁর সৌন্দর্য ও মাধুর্য দর্শনে বিমোহিত হয়ে ঘুম না ভাঙ্গানোর বেলায় আমি যত্নশীল হই। সযত্নে কাছে গিয়ে তাঁর বুকের ওপর আমার হাত রাখলে পরে তিনি হেসে চোখ মেলে তাকান। তাঁর নয়নযুগল হতে এমন এক জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়, যা সারা আসমান আলোকিত করে; আর ওই সময় আমি (এই নয়নাভিরাম দৃশ্য) তাকিয়ে দেখছিলাম। তাঁর দু’চোখের মাঝে আমি চুম্বন করি এবং আমার ডানদিকের বুকের দুধ তাঁকে পান করাই, যা তাঁকে পরিতৃপ্ত করে। অতঃপর বাঁ দিকের বুকের দুধ পান করাতে চাইলে তিনি তা ফিরিয়ে দেন। যতোদিন তিনি আমার বুকের দুধ পান করেছিলেন, এভাবেই করেছিলেন। তিনি পরিতৃপ্ত হলে আমি আমার পুত্রকে বাঁ দিকের বুকের দুধ পান করাতাম। তাঁকে আমার তাঁবুতে আনার পরপরই আমার দু’বুকে দুধ এসে গিয়েছিল। আল্লাহতা’লার মহিমায় সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম) পূর্ণ তৃপ্তিসহ দুধ পান করেন, যেমনটি করেছিল তাঁর ভাই-ও। আমার স্বামী আমাদের জন্যে তাঁর সেই উটনীর দুধ আনতে যেয়ে দেখতে পান সেটির স্তন-ও দুধে পরিপূর্ণ! তিনি উটনীর দুধ দোহন করেন এবং আমরা তা তৃপ্তি সহকারে পান করি। আমাদের জীবনে সেটি ছিল এক বিস্ময়কর রাত! আমার স্বামী পরে মন্তব্য করেন, ‘ওহে হালিমা! মনে হচ্ছে তুমি এক পুণ্যাত্মাকে বেছে নিয়েছ। আমরা প্রথম রাতটি আশীর্বাদ ও (ঐশী) দানের মাঝে কাটিয়েছি; আর তাঁকে (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামকে) বেছে নেয়ার পর থেকে আল্লাহতা’লার এই দান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

“রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর মাকে বিদায় জানিয়ে আমি তাঁকে (মহানবীকে) আমার হাতে নিয়ে নিজস্ব গাধীর পিঠে চড়ে বসি। আমার গাধী অন্যান্য সকল সঙ্গির সওয়ারি জন্তুদের পেছনে ফেলে দ্রুত এগিয়ে যায়, যা তাঁরা অবাক হয়ে দেখতে থাকেন। বনূ সা’অাদ গোত্রের বসত এলাকা, যা (আরবের) বিরাণ ভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম, তাতে পৌঁছুলে পরে আমরা দেখতে পাই যে আমাদের ভেড়ীগুলোও দুধে পরিপূর্ণ। আমরা দুধ দোহন করে প্রচুর দুধ পান করি; সেটি এমন-ই এক সময় হয়েছিল, যখন কোনো ওলানেই এক ফোঁটা দুধ-ও পাওয়া যাচ্ছিল না। অন্যান্যরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি আরম্ভ করেন, ‘আবূ সোয়াইবের কন্যার গবাদিপশু যেখানে চরে, সেই চারণভূমিতে পশুর পাল চরাও।’ তবুও তাদের ভেড়ার পাল অভুক্ত ফিরতো, আর আমার পশুর পাল স্তনভর্তি দুধসহ ফিরতো।”

রাসূলে পাক (দ:)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা:) বলেন, “এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আপনার নবুওয়্যতের একটি নিদর্শনের আমি সাক্ষী হওয়ার দরুন আপনার ধর্মগ্রহণ করেছিলাম। আমি প্রত্যক্ষ করি যে আপনি (শিশু থাকতে) চাঁদের সাথে মহব্বতের সাথে কথা বলেছিলেন এবং আপনার আঙ্গুল তার দিকে নির্দেশ করেছিলেন। আপনি যেদিকে আঙ্গুল নির্দেশ করেছিলেন, আকাশের সেদিকেই চাঁদ ধাবিত হয়েছিল।” হুযূর পূর নূর (দ:) জবাব দেন, “আমি চাঁদের সাথে কথা বলছিলাম, আর চাঁদ-ও আমার সাথে আলাপ করছিল, যার দরুন আমার কান্না বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেটিকে আরশের নিচে সেজদা করার আওয়াজ-ও আমি শুনতে পেয়েছিলাম।”

’ফাতহুল বারী’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে মহানবী (দ:) ধরাধামে শুভাগমনের সাথে সাথেই কথা বলেন। ইবনে সাব’ উল্লেখ করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর দোলনায় ফেরেশতাবৃন্দ দোল দেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে হযরত হালিমা (রা:) সবসময় বলতেন যে মহানবী (দ:)-কে প্রথমবার যখন তিনি মাই ছাড়ান (মানে শক্ত খাবারে অভ্যস্ত হতে তা খেতে দেন), তখন তিনি উচ্চারণ করেন, “আল্লাহতা’লা শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ; আর সমস্ত প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য; সূচনা থেকে অন্ত পর্যন্ত তাঁরই পবিত্র মহিমা” (আল্লাহু আকবর কবীরা; ওয়াল্ হামদু লিল্লাহি কাসীরা; ওয়া সোবহানাল্লাহি বুকরাতান্ ওয়া আসীলা)। তিনি বড় হলে পরে বাইরে যেতেন এবং অন্যান্য শিশুদের খেলতে দেখলে তাদের এড়িয়ে চলতেন।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বর্ণনা করেন যে নবী করীম (দ:)-এর (পিতামাতার দ্বারা পালিত তাঁর) বোন আল-শায়মা’আ (রা:) প্রত্যক্ষ করেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বাল্যকালেই একটি মেঘ মহানবী (দ:)-কে সবসময় ছায়া দান করতো। তিনি পথ চল্লে সেটিও তাঁর সাথে চলতো, তিনি থামলে সেটিও থেমে যেতো। তিনি অন্য কোনো ছেলের মতো করে বড় হননি। হযরত হালিমা (রা:) বলেন, “আমি তাঁকে মাই ছাড়ানোর পর তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে যাই, যদিও আমরা তাঁকে কাছে রাখার ইচ্ছা পোষণ করছিলাম তাঁর মাঝে সমস্ত আশীর্বাদ দর্শন করে। আমরা তাঁর মায়ের কাছে অনুরোধ জানাই তাঁকে আমাদের কাছে থাকতে দেয়ার জন্যে, যতোক্ষণ না তিনি আরও শক্তিশালী হন। কেননা, আমরা মক্কার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাঁর বেড়ে ওঠার ব্যাপারে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম। আমরা বারংবার অনুরোধ করতে থাকি, যার ফলশ্রুতিতে তিনি রাজি হন মহানবী (দ:)-কে আমাদের কাছে ফেরত পাঠাতে।”

প্রারম্ভিক শৈশবকালীন মো’জেযা (অলৌকিকত্ব)

[হালিমা (রা:) আরও বর্ণনা করেন] “আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে সাথে করে ফেরত নিয়ে আসার দুই বা তিন মাস পরে আমরা আমাদের বাড়ির পেছনে নিজস্ব কিছু গবাদি পশুর যত্ন নেয়ার সময় তাঁর দুধ-ভাই (হালিমার ছেলে)
ছুটে আসে এই বলে চিৎকার করতে করতে – ‘আমার কুরাইশ-গোত্রীয় ভাইয়ের কাছে সাদা পোশাক-পরিহিত দু’জন মানুষ আসেন। তাঁরা তাঁকে শুইয়ে তাঁর বক্ষবিদীর্ণ করেন।’ ছেলের বাবা ও আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই। মহানবী (দ:) তখন দাঁড়ানো এবং তাঁর চেহারার রং বদলে গিয়েছে। তাঁর (পালক) বাবা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে পুত্র! কী হয়েছে আপনার?’ সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দেন, ‘সাদা পোশাক পরা দুই ব্যক্তি আমার কাছে আসেন। তাঁরা আমাকে শুইয়ে আমার বক্ষবিদীর্ণ করেন। অতঃপর তাঁরা (শরীরের) ভেতর থেকে কিছু একটা বের করে ফেলে দেন এবং বক্ষ যেমনটি ছিল ঠিক তেমনটি জোড়া লাগিয়ে দেন।’ আমরা তাঁকে বাড়ি নিয়ে আসি এবং তাঁর (পালক) পিতা বলেন, ‘ওহে হালিমা! আমি আশংকা করি আমাদের এই ছেলের কিছু একটা হয়েছে। আরও খারাপ কিছু হওয়ার আগে চলো তাঁকে তাঁর পরিবারের কাছে ফেরত দিয়ে আসি!’

“আমরা রাসূল (দ:)-কে মক্কায় তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা তাঁকে নেয়ার জন্যে এতো আগ্রহ প্রকাশের পরে কী কারণে আবার ফেরত এনেছো?’ আমরা তাঁকে জানাই যে মহানবী (দ:)-এর খারাপ কিছু হতে পারে ভেবে আমরা শংকিত (তাই নিয়ে এসেছি)। আমিনা (রা:) বলেন, ‘তা হতে পারে না; তোমরা সত্য কথাটি বলো যে আসলে কী হয়েছে।’ তিনি তাঁর অবস্থানে অনড় থাকার দরুন আমরা আসল ঘটনা খুলে বলি। এমতাবস্থায় তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কি ভয় পেয়েছো যে শয়তান তাঁর ক্ষতি করবে? না, তা কখনোই হতে পারে না। আল্লাহর কসম, শয়তান কোনোক্রমেই তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমার এই ছেলে মহা সম্মানের অধিকারী কেউ হবেন। তোমরা এক্ষণে তাঁকে (আমার কাছে) রেখে যেতে পারো’!”

হযরত শাদ্দাদ ইবনে আওস (রা:) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (দ:) এরশাদ ফরমান: “আমি বনী সা’আদ ইবনে বকর গোত্রে (দুধ-মায়ের) লালন-পালনে থাকাকালীন একদিন আমার সমবয়সী ছোট ছেলেদের সাথে খেলছিলাম। এমনি সময়ে হঠাৎ তিনজন ব্যক্তি আবির্ভূত হন। তাঁদের কাছে ছিল বরফভর্তি সোনালী রংয়ের একখানা ধোয়াধুয়ি করার পাত্র। তাঁরা আমাকে আমার বন্ধুদের কাছ থেকে আলাদা করেন, আর আমার বন্ধুরা সবাই বসতীর দিকে দৌড়ে ফেরত যান। ওই তিনজনের মধ্যে একজন আমাকে আলতোভাবে মাটিতে শুইয়ে আমার বুক হতে তলপেটের হাড় পর্যন্ত বিদীর্ণ করেন। আমি তা দেখতে সক্ষম হই এবং আমার এতে কোনো ব্যথা-ই অনুভূত হয়নি। তিনি আমার নাড়িভুঁড়ি বের করে বরফ দ্বারা সেটি ভালভাবে কাচেন এবং আবার যথাস্থানে স্থাপন করেন। দ্বিতীয়জন দাঁড়িয়ে তাঁর সাথীকে সরে যেতে বলেন। অতঃপর তিনি তাঁর হাত ঢুকিয়ে আমার হৃদযন্ত্র বের করে আনেন, যা আমি দেখতে পাই। তিনি তা কেটে ওর ভেতর থেকে একটি কালো বস্তু বের করে ছুড়ে ফেলে দেন এবং তাঁর দুই হাত ডানে ও বামে নাড়তে থাকেন, যেন হাতে কিছু একটা গ্রহণ করছিলেন। অকস্মাৎ তাঁর হাতে চোখ-ধাঁধানো আলোর একখানি আংটি দেখা যায়। তিনি আমার হৃদযন্ত্রের ওপর তা দ্বারা ছাপ বসিয়ে দেন, যার দরুন সেটিও আলোকোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এটি-ই নবুওয়্যত ও জ্ঞান-প্রজ্ঞার নূর (জ্যোতি)। অতঃপর তিনি আমার হৃদযন্ত্র যথাস্থানে পুনঃস্থাপন করেন এবং আমি সেই আংটির শীতল স্পর্শ দীর্ঘ সময় যাবত পাই। তৃতীয়জন এবার তাঁর সহযোগীকে সরে দাঁড়াতে বলেন। তিনি তাঁর হাত আমার বিদীর্ণ বক্ষের ওপর বুলিয়ে দিলে আল্লাহর মর্জিতে তা মুহূর্তে জোড়া লেগে যায় (অর্থাৎ, সেরে ওঠে)। এরপর তিনি সযত্নে আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেন এবং প্রথমজনকে বলেন, ‘তাঁর জাতির দশজনের সাথে তাঁকে মাপুন।’ আমি তাদের চেয়ে ওজনে ভারী প্রমাণিত হই। অতঃপর তিনি আবার বলেন, ‘তাঁর জাতির এক’শ জনের সাথে তাঁকে পরিমাপ করুন।’ আমি তাদের চেয়েও ভারী হই। এবার তিনি বলেন, ‘তাঁকে তাঁর সমগ্র জাতির সাথে মাপলেও তিনি ভারী হবেন।’ তাঁরা সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরেন, কপালে চুমো খান এবং বলেন, ‘ওহে হাবীব (দ:)! আপনার জন্যে যে মঙ্গল ও কল্যাণ অপেক্ষা করছে তা জেনে আপনি খুশি-ই হবেন’।” এই হাদীসে পরিমাপ করার বিষয়টি হলো নৈতিকতা। অতএব, মহানবী (দ:) সবাইকে নৈতিকতা ও সদগুণাবলীতে ছাড়িয়ে গিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর ’সীনা চাক’ (বক্ষ বিদারণ) জিবরাইল আমীন (আ:) কর্তৃক হেরা গুহায় ওহী বহন করে নিয়ে আসার সময় আরেকবার হয়েছিল; এছাড়া মে’রাজের রাতে ঊর্ধ্বগমনের সময়ও আরেকবার বক্ষবিদারণ হয়েছিল তাঁর। আবূ নুয়াইম নিজ ‘আদ্ দালাইল’ পুস্তকে বর্ণনা করেন যে হুযূর পূর নূর (দ:)-এর বিশ বছর বয়সে আরও একবার ’সীনা চাক’ হয়েছিল। তাঁর শৈশবে এটি হওয়ার এবং কালো বস্তু অপসারণের হেকমত বা রহস্য ছিল তাঁকে সমস্ত ছেলেমানুষি বৈশিষ্ট্য হতে মুক্ত করে প্রাপ্তবয়স্কদের (গুরুগম্ভীর) চিন্তা ও মননে বিভূষিত করা। তাঁর বেড়ে ওঠা তাই নিখূুঁতভাবে সম্পন্ন হয়। তাঁর দু’কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে মোহরে নবুওয়্যতের সীলমোহর দেয়া হয়, যা থেকে মেশকের সুগন্ধ বের হতো এবং যা দেখতে একখানা তিতিরজাতীয় পাখির ডিমের মতো ছিল।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও অন্যান্যরা বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) ছয় বছর বয়সে উপনীত হলে তাঁর মা আমিনা (রা:) ও উম্মে আয়মান (রা:) তাঁকে এয়াসরিবে (মদীনায়) অবস্থিত ’দারুল তাবে’আ’-তে তাঁরই বনূ আদী’ ইবনে আল-নাজ্জার গোত্রভুক্ত মামাদের বাড়িতে মাসব্যাপী এক সফরে নিয়ে যান। পরবর্তীকালে ওই জায়গায় ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা তিনি স্মরণ করেন। কোনো একটি নির্দিষ্ট বাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “এখানেই আমি ও আমার মা থেকেছিলাম। বনূ আদী’ ইবনে আল-নাজ্জার গোত্রের মালিকানাধীন হাউজ বা জলাধারে আমি সাঁতার শিখেছিলাম। একদল ইহুদী আমাকে দেখতে ঘনঘন এই স্থানে আসতো।” উম্মে আয়মান (রা:) বলেন, “আমি ইহুদীদের একজনকে বলতে শুনেছি যে সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম হলেন এই জাতির পয়গম্বর; আর এটি-ই হলো তাঁর হিজরতের স্থান। ইহুদীরা যা বলাবলি করেছিল, তার সবই আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”

অতঃপর রাসূলুল্লাহ (দ:) ও তাঁর মা মক্কা মোয়াযযমায় ফিরতি যাত্রা আরম্ভ করেন। কিন্তু এয়াসরিবের অদূরে আল-আবূআ’ নামের জায়গায় পৌঁছুলে মা আমিনা (রা:) ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। আল-যুহরী (রা:) হযরত আসমা’ বিনতে রাহম (রা:) হতে, তিনি তাঁর মা হতে বর্ণনা করেন, যিনি বলেন: “আমি মহানবী (দ:)-এর মা আমিনা (রা:)-এর শেষ অসুখের (মৃত্যুব্যাধির) সময় উপস্থিত ছিলাম। ওই সময় মহানবী (দ:) ছিলেন মাত্র পাঁচ বছরের এক শিশু। তিনি যখন মায়ের শিয়রে বসা, তখন আমিনা (রা:) কিছু কবিতার ছত্র পড়ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি হুযূর পূর নূর (দ:)-এর মোবারক চেহারার দিকে তাকিয়ে বলেন:‘(পৃথিবীতে) সকল প্রাণি-ই মৃত্যুবরণ করবে; যাবতীয় নতুন বস্তু-ও পুরোনোয় পরিণত হবে; আর প্রতিটি প্রাচুর্য-ও কমে যাবে; আমি মৃত্যুপথযাত্রী হলেও স্মৃতি আমার চিরসাথী হবে; আমি রেখে যাচ্ছি অফুরন্ত কল্যাণ এবং জন্ম দিয়েছি পুতঃপবিত্র সত্তাকে এই ভবে।’ এ কথা বলে তিনি ইন্তেকাল করেন। আমরা তাঁর তিরোধানে জ্বিনদের কাঁন্নার আওয়াজ শুনতে সক্ষম হই।”

বর্ণিত আছে যে হযরত আমিনা (রা:) তাঁর ইন্তেকালের পরে রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর রেসালাতের প্রতি শাহাদাত তথা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আত্ তাবারানী (রহ:) হযরত আয়েশা (রা:) হতে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণনা করেন যে মহানবী (দ:) আল-হাজূন নামের স্থানে পৌঁছুলে তিনি অন্তরে অত্যন্ত বেদনাক্লিষ্ট হন। আল্লাহতা’লার যতোক্ষণ ইচ্ছা, ততোক্ষণ তিনি সেখানেই অবস্থান করেন। ওখান থেকে ফেরার পর তিনি খুশি হন এবং বলেন, “আমি আমার মহাপরাক্রমশালী ও মহান প্রভুর (খোদাতা’লার) দরবারে আরয করেছিলাম আমার মাকে তাঁর হায়াত (জীবন) ফিরিয়ে দিতে। তিনি তা মঞ্জুর করেন এবং তারপর আবার মাকে ফেরত নিয়ে যান (পরলোকে)।” আস্ সুহায়লী ও আল-খাতীন উভয়ই বর্ণনা করেন হযরত আয়েশা (রা:)-এর কথা, যিনি বলেন যে আল্লাহ পাক হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পিতামাতা দু’জনকেই পুনরায় জীবিত করেন এবং তাঁরা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের রেসালাতের প্রতি শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান করেন।

আল-কুরতুবী তাঁর ‘আত্ তাযকেরা’ গ্রন্থে বলেন, “সাইয়্যেদুনা মোহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও সদগুণাবলী তাঁর সারা (যাহেরী/প্রকাশ্য) জিন্দেগী জুড়ে প্রকাশমান ছিল। তাঁর পিতামাতাকে আবার জীবিত করে তাঁর প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারটি মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। ইসলামী বিধানে বা যুক্তিতে এমন কিছু নেই যা এর বিরোধিতা করে।” পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে যে বনী ইসরাঈল বংশের এক ব্যক্তি খুন হওয়ার পর তাকে আবার জীবিত করে খুনী কে ছিল তা জানানো হয়। অধিকন্তু, আমাদের পয়গম্বর ঈসা (আ:) [যীশু খৃষ্ট] মৃতকে জীবিত করতেন। অনুরূপভাবে, আল্লাহতা’লা আমাদের মহানবী (দ:)-এর দ্বারাও কিছু সংখ্যক মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন। তাহলে রাসূল-এ-করীম (দ:) কর্তৃক তাঁর পিতামাতাকে পুনরায় জীবিত করে তাঁর নবুওয়্যতের প্রতি সাক্ষ্য প্রদানের বিষয়টি কেন অসম্ভব হবে, যেখানে এটি তাঁরই শান-শওকত ও মহিমা প্রকাশ করছে?

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীর মতে, সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের সকল পূর্বপুরুষ-ই মুসলমান। এটি রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর বাণী থেকেও প্রমাণিত। তিনি (দ:) বলেন, “আমাকে পুতঃপবিত্র পুরুষদের ঔরস থেকে পুতঃপবিত্র নারীদের গর্ভে স্থানান্তর করা হয়।” আর যেহেতু আল্লাহ পাক বলেছেন, “নিশ্চয় অবিশ্বাসীরা নাজাস তথা অপবিত্র”, তাই আমরা (এ আয়াতের আলোকে) দেখতে পাই যে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের পূর্বপুরুষদের কেউই অবিশ্বাসী ছিলেন না।

হাফেয শামস আদ্ দীন আদ্ দামেশকী (রহ:) এই বিষয়ে কী সুন্দর লিখেছেন:
 
“আল্লাহ পাক তাঁর নবী (দ:)-এর প্রতি নিজ আশীর্বাদ করেছেন বর্ষণ
এছাড়াও তিনি তাঁর প্রতি ছিলেন সর্বাধিক দয়াবান
তিনি তাঁর মাতা এবং পিতাকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন তাঁদের জীবন
যাতে তাঁরা করতে পারেন তাঁর নবুওয়্যতের সাক্ষ্যদান
নিশ্চয় তা ছিল সূক্ষ্ম করুণার এক নিদর্শন
অতএব, এসব অলৌকিকত্বে করো বিশ্বাস স্থাপন
কেননা, আল্লাহতা’লা এগুলোর সংঘটনকারী হিসেবে সামর্থ্যবান
যদিও বা এতে তাঁর সৃষ্টিকুলের শক্তি-সামর্থ্য ম্লান।”

সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লামের মায়ের ইন্তেকালের পরে উম্মে আয়মান (রা:) তাঁর সেবাযত্নের দায়িত্ব নেন। মহানবী (দ:) তাঁর সম্পর্কে বলতেন, “আমার মায়ের পরে উম্মে আয়মান হলেন আমার (দ্বিতীয়া) মা।” রাসূলুল্লাহ (দ:) আট বছর বয়সে উপনীত হলে তাঁর দাদা ও অভিভাবক আবদুল মোত্তালিব ইন্তেকাল করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল এক’শ দশ বছর (অপর বর্ণনায় এক’শ চল্লিশ বছর)। ইন্তেকালের সময় তাঁরই অনুরোধে মহানবী (দ:)-এর চাচা আবূ তালেব তাঁর অভিভাবক হন। কেননা, তিনি ছিলেন হুযূর পূর নূর (দ:)-এর পিতা আবদুল্লাহ’র আপন ভাই।

ইবনে আসাকির বর্ণনা করেন জালহামা ইবনে উরফাতা হতে; সাইয়্যেদুনা মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ ফরমান: “আমি এক খরার সময় মক্কায় আবির্ভূত হই। কুরাইশ গোত্রের কয়েকজন আবূ তালেবের কাছে এসে আরয করেন, ‘হে আবূ তালেব, এই উপত্যকা অনুর্বর এবং সকল পরিবার আর্তপীড়িত। চলুন, আমরা বৃষ্টির জন্যে প্রার্থনা করি।’ আবূ তালেব (ঘর থেকে) বেরিয়ে আসেন, আর তাঁর সাথে ছিলেন এক বাচ্চা ছেলে, যাঁকে দেখতে লাগছিল মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা সূর্যের মতো। তাঁর আশপাশে ঘিরে ছিল অন্যান্য শিশুর দল। আবূ তালেব তাঁকে কা’বাগৃহের দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে দেন। আকাশে ওই সময় মেঘের কোনো লেশচিহ্ন মাত্র ছিল না। কিন্তু যেমনি ওই বালক তাঁর হাত দুটো ওপরে তোলেন, অমনি সবদিক থেকে মেঘ আসা আরম্ভ করে এবং বৃষ্টিও নামে – প্রথমে অল্প, শেষে অঝোর ধারায়। ফলে উপত্যকা এলাকা উর্বর হয়ে ওঠে, আর মক্কা ও বাইরের মরুভুমি অঞ্চলও শস্যশ্যামলতা ফিরে পায়। এই মো’জেযা (অলৌকিক ঘটনা) সম্পর্কে আবূ তালেব (পদ্যাকারে) লেখেন:
 
‘জ্যোতির্ময় চেহারার সেই পবিত্র সত্তার সকাশে
যাঁর খাতিরে বারি বর্ষে
তিনি-ই এয়াতীমবর্গের আশ্রয়স্থল সবশেষে
আর বিধবাদের ভরসার উপলক্ষ নিঃশেষে’।”

                                                                  *সমাপ্ত*

[সৌজন্যে: আস্ সুন্নাহ ফাউন্ডেশন অফ আমেরিকা]