ইমামের পিছনে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সম্পর্কে মতভেদ

Standard

ইমামের পিছনে মুক্তাদীর সূরা ফাতিহা পাঠ করার ব্যাপারে ইমামদের মতভেদঃ
=============
اختلاف العلماء في القراءة خلف الإمام
ইমামের পিছনে মুক্তাদীর উপর সূরা ফাতিহা পাঠ করা বা না করার ব্যাপারে আলেমদের তিনটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে।
নিম্নে দলীল সহকারে এই মত তিনটির বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হলঃ

* প্রথম মতঃ القول الأول
ইমাম, মুক্তাদী ও একাকী ব্যক্তি সবার জন্য সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব। এই মতের লোকেরা নিম্নের হাদীছগুলোকে দলীল হিসেবে পেশ করেন।
১) রাসূল (সাঃ) বলেনঃ
لاَ صَلاَةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتاَبِ
যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়বে না তার ছালাত হবে না। (ছহীহ] বুখারী, অধ্যায়ঃ আযান, অনুচ্ছেদঃ ইমাম ও একাকী ব্যক্তির ক্বেরাত পাঠ করা ওয়াজিব। হা/ ৭১৪। মুসলিম, অধ্যায়ঃ নামায, অনুচ্ছেদঃ প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব। হা/ ৫৯৫)
২) অপর বর্ণনায় এসেছে, যে ব্যক্তি ছালাত আদায় করবে অথচ তাতে উম্মুল কুরআন সূরা ফাতিহা পাঠ করবে না তার ছালাত অসম্পূর্ণ। রাসূলুল্লাহ। ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কথাটি তিনবার বলেছেন। (মুসলিম)
৩) উবাদাহ বিন ছামিত (রাঃ) বলেনঃ
أن النبي صلى الله عليه وسلم صلى الصبح فثقلت عليه القراءة, فلما انصرف قال إني أراكم تقرؤون وراء إمامكم ، قلنا يا رسول الله إي والله. قال لا تفعلوا إلا بأم القرآن، فإنه لا صلاة لمن لم يقرأ بها
নবী (সাঃ) একদা ফজরের নামায পড়লেন। তখন তাঁর উপর কিরাআত পাঠ করা কষ্টকর হয়ে গেল। নামায শেষে তিনি বললেনঃ আমি দেখছি তোমরা তোমাদের ইমামের পিছনে কিরাআত পাঠ করে থাক। আমরা বললামঃ হ্যাঁ আল্লাহর কসম! সে আল্লাহর রাসূল! (আমরা তা পাঠ করি)। তিনি তখন বললেনঃ তোমরা এরূপ করো না। তবে উম্মুল কুরআন তথা সূরা ফাতিহা পাঠ করবে। কেননা যে ব্যক্তি তা পাঠ করবে না, তার নামায হবে না। (আবু দাউদ, নাসাঈ এবং অন্যান্য) এটি ইমাম শাফেয়ী (রঃ) এবং অন্যান্যেদর মত।

*দ্বিতীয় মতঃ القول الثاني
উঁচু আওয়াজ হোক বা নীচু আওয়াজ হোক কোন অবস্থাতেই মুক্তাদীর জন্য সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব নয়। এটি ইমাম আবু হানীফা (রঃ)এর মত। এই মতের সমর্থকদের দলীল কোরঅানের আয়াত এবং এই হাদীছ……
مَنْ كَانَ لَهُ إِمَامٌ فَقِرَاءَةُ الْإِمَامِ لَهُ قِرَاءَةٌ
“যার ইমাম রয়েছে, তার ইমামের ক্বিরাতই তার ক্বিরাত (হিসেবে যথেষ্ট)।”। আরো কয়েকটি সূত্রে হাদীছটি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামহতে বর্ণিত হয়েছে
,এই নিম্মের লিন্ক এ-বিস্তারিত পাবেন:- http://jamiatulasad.com/?p=4199

*তৃতীয় মতঃ القول الثالث
নীচু আওয়াজ বিশিষ্ট ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়া মুক্তাদির উপর ওয়াজিব, কিন্তু উঁচু আওয়াজ বিশিষ্ট ছালাতে নয়। দলীল:
إِنَّمَا جُعِلَ الْإِمَامُ لِيُؤْتَمَّ بِهِ فَإِذَا كَبَّرَ فَكَبِّرُوا وَإِذَا قَرَأَ فَأَنْصِتُوا وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ فَقُولُوا اللَّهُمَّ رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ
“ইমামকে তো নির্ধারণ করা হয়েছে তার অনুসরণ করার জন্য। যখন তিনি তাকবীর দিবেন, তোমরাও তাকবীর দিবে। যখন তিনি ক্বেরাত পড়বেন তোমরা চুপ থাকবে। তিনি সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ্ বললে, তোমরা বলবে রাব্বানা লাকাল্ হামদ।
(দেখুনঃ বুখারী, অধ্যায়ঃ আযান, অনুচ্ছেদঃ তাকবীর দেয়া ওয়াজিব ও নামায শুরু করা। হা/৬২৯। মুসলিম, অধ্যায়ঃ নামায, অনুচ্ছেদঃ মুক্তাদির ইমামের অনুসরণ করা। হা/ ৬২৫। হাদীছটির বাক্য নাসাঈ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। অধ্যায়ঃ নামায শুরু করা, অনুচ্ছেদঃ আল্লাহর বাণীঃ (وإذا قرئ القرآن..) এর ব্যাখ্যা। হা/ ৯১২)
এখান থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, ইমাম যখন পড়ে তখন চুপ থাকতে হবে। সুতরাং যুহর ও আসর নামাযে ইমাম যেহেতু নিরবে কিরাআত পড়েন এবং মুক্তাদীগণ যেহেতু ইমামের কিরাআত শুনতে পান না, তাই তাদের কিরাআত পড়তে কোন বাঁধা নেই।
প্রাধান্য প্রাপ্ত মতঃ القول الراجح
সকল মতের পক্ষের দলীল-প্রমাণ একত্রিত করলে দেখা যায় প্রথম মতটিই অধিক প্রাধান্যযোগ্য। والله أعلم আল্লাহই ভাল জানেন।

Advertisements

খাজা বাবা(রঃ) এর কারামাত

Standard

হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) সিস্তান রাজ্যের সন্জ্ঞর গ্রামে ৫৩৩ হিজরী ও ১১৩৮ ইংরেজি সালে জন্ম গ্রহন করেন।
উনার পিতার নাম গিয়াসুদ্দিন ও মাতার নাম সৈয়দা উম্মুল ওয়ারা।পরে স্বপরিবারে খোরাসান শহরে( বর্তমান আফগানিস্তান) হিজরত করেন।মাত্র ১৫ বৎসর বয়সে বাবা – মা উভয়কেই হারান।
একদিন নিজ জমিতে কাজ করে পরিশ্রান্ত অবস্তায় বিশ্রাম নিছিছলেন।এমন সময় সেখানে এসে উপস্হিত হলেন এক অচেনা আগন্তুক। কিশোর খাজা মইনুদ্দিন তাকে বাগানের কিছু আঙ্গুর এনে আপ্যায়ন করলেন। আগন্তুক ছিলেন আল্লাহর এক অলিআল্লাহ,হজরত ইব্রাহিম কান্দুযী(রঃ)।খুশী হলেন কিশোরের আপ্যায়নে।হাত তুলে দোয়া করলেন অনেকক্ষন।তারপর ঝুলি থেকে বের করলেন এক টুকরো শুকনো রুতি।রুটির একাংশ কিছুক্ষন চিবুলেন তারপর অন্য অংশটুকু মইনুদ্দিনকে খেতে দিলেন।আদেশ পালন করলেন মইনুদ্দি একটু পরেই উছ্ছিষ্ট রুটির প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হতে শুরু করলো।বিস্মিত হলেন ।অন্তরের আছছাদন যেন উবে যাছেছ একে একে।অদ্ভুত এক জ্যোতির্ময় অনুভব এসে ধীরে ধীরে আলোকিত করছে হৃদয়ের সর্বত্র।দরবেশ চলে গেলেন।অন্তরে জ্বালিয়ে দিয়ে গেলেন আল্লাহ প্রেমের
অনন্ত অনল।এই হলো অলিআল্লাহদের তাওয়াজ্জোহ এর ফল। মইনুদ্দিন বাগান ও ভিটে বাড়ি সহ সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে বেরিয়ে পরলেন তিনি
আল্লাহর পথে।প্রথমেই জাহেরী এলেম শিক্ষার জন্য হাজির হলেন বোখারা,সমরখন্দে।দীর্ঘ দিন সেখানে অবস্হান করে বুৎপত্তি অর্জন করলেন জাহেরী এলমের সমস্ত শাখা প্রশাখায়। তারপর বেরিয়ে পরলেন বাতেনী ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে।
হাদিস শরীফে উল্লেখ আছে, ”জ্ঞান দুই প্রকার।জবানী ইলম ও বাতেনী ইলম।” (মেশকাত শরীফ)।ইমাম মালিক (রঃ) বলেছেন-”যে ব্যক্তি
বাতেনী জ্ঞান অর্জন করলো কিন্তু ইলমে শরীয়ত শরীয়ত গ্রহন করলো না সে নিশ্চিত কাফের ,আর যে ব্যক্তি শুধু ইলমে শরীয়ত গ্রহন করল কিন্তু
বাতেনী ইলম গ্রহন করলো না সে নিশ্চয় ফাছেক”।আর জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মোসলমানের উপর যেহেতু ফরয তাই বাতেনী এলেম অর্জন করাও
ফরয।এই বাতেনী জ্ঞান অর্জনের জন্য আবার খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) বের হয়ে গেলেন বাতেনী জ্ঞান সম্পন্ন শিক্ষক অন্যেশনের উদ্দেশ্য।
৫৫০ হিজরি সাল।বাগদাদে এসে সাক্ষাৎ পেলেন হজরত বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রঃ) এর।কয়েক মাস উনার সাথে অবস্হানের
পর আবার নুতন শিক্ষকের সন্ধানে বের হলেন।বিদায়ের সময় বড়পীর(রঃ) বললেন,’হে মইনুদ্দিন ।তুমি যখন হিন্দুস্হানে সফর করবে ,তখন পথে পরবে ভাতীসা রমন্ত নামে এক স্হান।সে স্হানে আছে সিংহতুল্য এক মর্দে মুমিন।তার কথা মনে রেখ তুমি।’
শুরু হল নুতন শয়েখের সন্ধান।পথে বিভিন্ন অলির সাথে সাক্ষাতের পর এসে উপস্হিত হলেন খোরাসান এবং ইরাকের মধ্যবর্তী নিশাপুর অন্চলের হারুন নগরে। এই শহরেই বসবাস করেন আউলিয়া সম্প্রদায়েরমস্তকের মুকুট হজরত ওসমান হারুনী(রঃ)।উনার নিকট বায়াত হবার দরখাস্ত পেশ করলে মন্জুর হল।উনার সাথে বিশ বৎসরের অধিক সময় অতিবাহিত করে কামালিয়াতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌছলেন।
এবার দাওয়াতের পালা।অলী আল্লাহগন হলেন নবী রাসুলদের প্রকৃত উত্তরসুরী।সেই দায়িত্বের ভার এসে পড়ল খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর উপর।ইতিমধ্যে নুতন এক ছাত্র এসে হাজির হয়েছে খাজার দরবারে। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ছাত্র জনাব কুতুবুদ্দিন বখতিকে সাথে নিয়ে হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন মক্কায়।হজ্ব পর্ব শেষ করে মদীনা শরীফ এসে হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) রসুলে পাক(সাঃ) এর কাছ থেকে এক অবিস্মরনীয় সুসমাচার।হযরত রসুলে পাক(সাঃ) জ্যোতির্ময় চেহারায় আবির্ভুত হয়ে জানালেন,”প্রিয় মইনুদ্দিন।তুমি আমার ধর্মের মইন(সাহায্যকারী)।আমি তোমাকে হিন্দুস্হানের বেলায়েত প্রদান করলাম।হিন্দুস্হান বুৎপরোস্তির অন্দ্ধকারে নিমজ্জিত।তুমি আজমীরে যও।সেখানে তোমর মধ্যমে পবিত্র ইসলামের ব্যাপক প্রসার ঘটবে।
সুসমাচার শুনে পরিপৃপ্ত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)।
পরক্ষনেই চিন্তিত হলেন তিনি।কোথায় আজমির? বিশাল হিন্দুস্হানের কোন দেশে আছে রসূল নির্দেশিত আজমীর?
চিন্তিত অবস্হায় তন্দ্রাছ্ছন্ন হয়ে পরেছিলেন খাজা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)।সেই অবস্হায় তিনি দেখলেন,হজরত মোহাম্মদ(সাঃ) তার শিয়রে উপবিষ্ট।তিনি তাকে আজমীর শহরের দৃশ্য দেখিয়ে দিলেন।সেই সঙ্গে দিয়ে দিলেন প্রয়োজনীয় পথ নির্দেশনা।এরপর দয়াল নবী (সাঃ) তার হাতে দিলেন একটি সুমিষ্ট আনার।তারপর তার জন্য দোয়ায়ে খায়ের করে যাত্রা শুরু করবার নির্দেশ দিয়ে দিলেন।
সফর শুরু হলো আবার।সঙ্গে সাথী কুতুবুদ্দিন।চলতে চলতে এসে পৌছলেন লাহোর।মনে পড়ে গেল হজরত বড়পীর(রঃ) এর সেই মুল্যবান উপদেশ – মর্দেমুমিন সেই সিংহ পুরুষ এর কথা,সেই ভাতীসা রমস্হ জায়গার কথা। হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) জানতে পারলেন এই লাহোরেই আছে সেই সিংহতুল্য মর্দে মুমিনের মাজার শরীফ।তার মোবারক নাম হজরত দাতাগন্জ্ঞে বখশ(রঃ)।তিনি একাধারে দুই মাস অবস্হান করলেন।তারপর শুরু হল যাত্রা।এবারের যাত্রার গন্তব্য
দিল্লী।
এগিয়ে চলল হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর বেহেশতীকাফেলা।এখন আর কাফেলা দুইজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।বিভিন্ন স্হানে
বিরতির সময় সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কিছু খাটি আল্লাহ অনুরক্ত ফকির দরবেশ।আস্তে আস্তে এর সংখ্যা এসে দারিয়েছে চল্লিশে।সঙ্গী সাথী সহ
দিল্লী এসে উপস্হিত হলেন হজরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)।দিল্লীর শাসক তখন হিন্দুরাজা খান্ডরাও।আজমীর অধিপতি পৃথ্বিরাজের ভাই ছিলেন তিনি।পৃথ্বিরাজই তাকে তার প্রতনিধি হিসেবে দিল্লীর শাসনভারঅর্পন করেছিলেন।
রাজমহলের অদুরেই নির্মিত হলো ফকির দরবেশদের ডেরা।নির্ভয়ে তরা শুরু করলেন তাদের নিয়মিত ইবাদত বন্দগী।ক্রমে ক্রমে ইসলামের আলো প্রসারিত হতে থাকলো।দিল্লীর আধ্যাতিক দৈন্যতায় এলো ইমানের জ্যোতির্ময় জোয়ার।পিতৃ ধর্ম ত্যাগ করে দলে দলে লোক এসে প্রবেশ
করতে থাকলো আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম ইসলামের সুবাসিত কাননে।বিরোধিতা যেমন বাড়তে লগলো।তামনি বাড়তে থকলো বিজয়ের বিরতিহীন অভিঘাত।কিন্তু গন্তব্যত এখানে নয় ।এগিয়ে যেতে হবে আরো সন্মুখে।রসুল পাক(সাঃ) এর নির্দেশিত সেই আজমীরের আকর্ষন একসময় উদ্বেলিত করে তুললো খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)
এর অন্তরকে।দিল্লীর কুতুব হিসেবে নির্বাচিত করলেন হযরত কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী(রঃ) কে।দিল্লীর দ্বীন প্রচার ও নওমুসলিমের বিড়াট কাফেলার হেফাজতের দায়িত্ব হযরত কাকির উপর।
খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) তার আত্নোৎসর্গকারী ফকির দরবেশদের নিয়ে রওয়ানা হলেন আজমীর অভিমুখে।পিছনে পরে থাকলো দিল্লী,দিল্লীর শোকাকুল জনতা ও দিল্লীর নব নিযুক্ত কুতুব হযরত বখতিয়ার কাকী(রঃ)।
আজমীর শহরের উপকন্ঠে এসে উপস্হিত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ।সফর সঙ্গীগন সবাই পরিশ্রান্ত।বিশ্রামের ব্যবস্হা করতেই হয়।এই সেই হিন্দুস্হানের বেলায়াতের প্রতিশ্রুত কেন্দ্রভুমি আজমীর ।চারিদিকে পাহাড়,পাথর মরুভুমি।নিকটেই বৃক্ষছায়া।এখানেই বিশ্রামের জন্য উপবেশন করলেন দরবেশদের কাফেলা।
স্হানটি ছিল রাজা পৃথ্বিরাজের উষ্ঠ্র বাহিনির বিশ্রামস্হল। রাজার লোকেরা কিছুক্ষন যেতে না যেতেই সবাইকে স্হান ত্যাগ করতে বলল।বিস্মিত হলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ।উটের দলতো এসে পৌছবে সেই সন্দ্ধাবেলায়।অথচ লোকগুলি তাদেরকে এখনই তাড়িয়ে দিতে চায়।তিনি বললেন, ”ঠিক আছে আমরা চললাম।তোমাদের উটই এখানে বসে বসে বিশ্রাম করুক।”
পরিশ্রান্ত কাফেলা আবার এগিয়ে চললো সামনের দিকে।।অদুরে ‘আনা সাগর’। সাগরতো নয় একটি বিশাল হ্রদ।লোকে বলে আনা সাগর।আনা সাগরের পাড় ঘেষে অজস্র মন্দির। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এই হ্রদেরই এক ছোট টিলার উপর বসবাসের স্হান নির্বাচন করলেন।সে রাতেই মুখে মুখে আগন্তুক দরবেশের আগমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র।সকালে মহা রাজ পৃথ্বিরাজও শুনতে পেলেন এক অদ্ভুত সংবাদ।উষ্ঠশালার কর্মচারীগন এসে জানালো।গতকাল সন্দ্ধায় যে উটগুলি উষ্ঠ্রশালায় আনাহয়েছিল সবগুলি এখনও শুয়ে আছে।কিছুতেই উঠবার নাম করছে না।সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান দরবেশদলের ঘতনাও বর্নীত হলো রাজার কাছে।দরবেশদলের নেতা উষ্ঠ্রশালা পরিত্যাগের সময় বলেছিলেন , ”তোমাদের উটই এখনে বসে বসে বিশ্রাম করুক।”
ইতিপুর্বে বিক্ষিপ্তভাবে মুসলমান ফকিরদের সম্পর্কে এরকম অনেক কথা রাজার কর্নগোচর হয়েছিল।চিন্তিত হয়ে পড়লেন রাজা পৃথ্বিরাজ।মনে পড়ে গেল তার রাজমাতার ভবিষ্যতবানীর কথা।তিনি বলেছিলেন ”এক মুসলমান ফকিরের অভিসম্পাদেই পৃথ্বিরাজের রাজ্য ধ্বংস হয়ে যাবে।”
একি তবে সেই ফকির ? সম্ভবত এই ফকিরের কথাতেই এই অবস্হার সৃষ্টি হয়েছে।কর্মচারীদেরকে ফকিরদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার
জন্য নির্দেশ দিলেন রাজা। রাজ আদেশ পালন করল শ্রমিকেরা ।
হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) বললেন যাও।এ অবস্হা আর থাকবে না।উটশালায় ফিরে এসে বিশ্বয়ের সঙ্গে সবাই লক্ষ্য করল উটগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল শুরু করেছে।ফকিরের কারামতি দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।ধীরে ধীরে আজমীরের অবস্হান্তর ঘটতে লাগলো।কৌতুহল নিবারনের জন্য লোকজন যাতায়াত শুরু করে দিল হযরত খাজার আস্তানায়।তার পবিত্র চেহারা আর তার সাথীদের প্রানখোলা মধুর চরিত্রের প্রভাবে সম্মোহিত হতে লাগলো আজমিরবাসী। হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর সোহবতের(সাক্ষাৎ) বরকতে তাদের অন্তরের অন্দ্ধকার দুর হতে লাগলো।জেগে উঠলো আজমেরীর সত্যান্বেষী জনতা।কিন্তু আতংকিত হলো পুরোহিতরা,শোষক বর্নবাদী হিন্দু সমাজ।ভীত হলো হিংস্র রাজপুরুষগন এবং সামনতবাদী সম্রাট।
ইসলাম বিদ্বেসী ক্রোধান্দ্ধ শহর লোকজন রাজদরবারে গিয়ে হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ও তার সহচরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো।
অভিযোগ শুনে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন রাজা পৃথ্বিরাজ।অহংকারের নীচে চাপা পরে গেল মায়ের সদুপদেশবানী।রাজা একদল সৈন্যকে আদেশ দিলেন ফকির দরবেশদলকে এক্ষনি রাজ্য থেকে বিতাড়িত করতে। রাজার আদেশ পেয়ে ঝাপিয়ে পরলো অভিযানে। হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) নির্বিকার।আল্লাহ পাকের সাহায্য কামনা করলেন তিনি।সাথে সাথেই আক্রমনকারীদের কেউ হলেন অন্ধ,কারও শরীর হল নিঃসাড়।কেউ হলো ভুতলশায়ী।
নিরুপায় হয়ে পায়ে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলো তারা।দয়ার সাগর গরীবে নেওয়াজ হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) ক্ষমা করে দিলেন সবাইকে।
রাজা পৃথ্বিরাজ ভেবে কুল পান না কি করবেন তিনি।সমরাস্ত্র, সুসজ্জিত সৈন্যদল কোন কিছুই যে আর কাজে আসছে না।এক দুরাগত যবন ফকিরের নিকট পরাজয় বরন করতে হবে তাকে ?ঐশ্বরিক ক্ষমতাধর এই ফকিরের আনুগত্য স্বীকার করবেন নাকি তাকে বিতাড়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। এ কি বিশ্বয়কর সংকট।চুপ করে থাকলেও বিপদ ।বিরুদ্ধাচরন করলেও সমস্যা।এদিকে দলে দলে লোকজন গ্রহন করছে ফকিরের প্রচারিত একত্ববাদী ধর্মমত।
রাজা ভেবে চিন্তে ঠিক করলেন ,হিন্দু ধর্মের আধ্যাধিক সিদ্ধপুরুষদের দ্বারা প্রতিরোধ করতে হবে ফকিরকে।তাই সিদ্ধপুরুষ বলে খ্যাত ”রামদেও” কে অনুরোধ করলেন তার যোগমন্ত্র বলে এই যবন ফকিরকে বিতাড়িত করতে।রামদেও রাজী হলেন।তার ধীর্ঘ সাধনালব্দ্ধ আধ্যাধিক শক্তিতে হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) কে পরাস্ত করার বাসনায় হাজির হলেন হযরতের দরবারে।
হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) তখন ছিলেন ধ্যানমগ্ন অবস্হায়।কিছুক্ষন পর চোখ খুললেন হযরত।দৃষ্টিপাত করলেন রামদেও খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর জ্যোতির্ময় চেহারার দিকে।মুগ্ধ হয়ে গেলেন রামদেও।তার আধ্যাতিক শক্তি মুহুর্তের মধ্যে নিশ্চিন্ন হয়ে গেল।অন্ধকারে আলো জ্বললে মুহুর্তেই যেমন করে অন্ধকার অপসারিত হয়।হজরত খাজার কদম মোবারকে লুতিয়ে পড়লেন রামদেও।নির্দ্বধায় স্বীকার করলেন ইসলাম। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) তার নাম রাখলেন মোহাম্মদ সাদী।
রামদেও এর ইসলাম গ্রহনের সংবাদ শুনে রাজা ক্ষোভে দঃখে অস্হির হয়ে উঠলেন।কিন্তু বিদূষী মায়ের উপর্যুপরি উপদেশের বাধ্য হয়ে সংযত হলেন রাজা।কিন্তু কিছুদিন পরই দেখা দিল আরেক বিপদ।
আনা সগরের পানি শুধুমাত্র উচ্চ বর্নের হিন্দু এবং পুরোহিত সম্প্রদায়
ছারা অন্য কেও ব্যবহার করতে পারতো না।নিম্ন বর্নের হি্ন্দুরা এটা তাদের ধর্মীয় বিধান বলে মনে করত।কিন্তু মোসলমানরা কি আর বর্নভেদের ধার ধারে ? একদিন আনাল সাগরে অজু করতে গেলন হজরত খাজার একজন সাগরেদ।পুরোহিতরা অপমান করে তাড়িয়ে দিলো তাকে।সাগরেদ সমস্ত ঘটনা বর্ননা করলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) কে।হযরত খাজা মোহাম্মদ সাদীকে ”আনা সাগর” থেকে এক ঘটি পানি আনার নির্দেশ দিলেন।নির্দেশ মত মোহাম্মদ সাদী ‘আনা সাগর’ থেকে এক ঘটি পানি আনতেই দেখা গেলো এক আশ্চর্য দৃশ্য।কোথায় সাগর ? সব পানি তার শুকিয়ে গিয়েছে একেবারে।
এই আলৌকিক ঘটনা রাজাকে জানালো প্রজারা।বিব্রত বোধ করলো রাজা।রাজা বাধ্য হয়ে আবারও তাদের প্রজাদের দুর্ব্যবহারের জন্য ফকিরের কাছে ক্ষমা চাইতে নির্দেশ দিলেন রাজা।প্রমাদ গুনলেন পুরোহিত সম্প্রদায়।কিন্তু উপায়ন্তর না দেখে তারা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর কাছে গিয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করলেন ।
মানুষের দুর্দশা দেখে ও পুরোহিতদের ক্ষমার প্রেক্ষিতে মোহাম্মদ সাদীকে পুনরায় ঘটিতে ভরা পানি আনা সাগরে ঢেলে দিতে নির্দেশ দিলেন।নির্দেশ পালিত হলো।ঘটির পানি ঢেলে দেয়ার সাথে সাথেই ভরে গেল বিশাল হ্রদ ‘আনাল সাগর’।এই আলৌকিক ঘটনার পর বহুলোক ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিল খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ)এর হাত ধরে।
পৃথ্বিরাজ ভেবে পান না কি করে এ মোসলমান ফকিরকে প্রতিহত করা যায় ।কেউ কেউ রাজাকে বুদ্ধি দিলেন বিখ্যাত ঐন্দ্রজালিক অজয় পালকে দিয়ে কিছু করা যায় কিনা ?রাজা তাকেই ডেকে পাঠালেন এবং রাজকীয় পুরুস্কারের প্রস্তাব করলেন।অজয় পাল তার সর্বশক্তি দিয়ে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) কে ঘায়েল করার চেষ্টা করলেন।কিন্তু মিথ্যা কি কখনো সত্যকে প্রতিহত করতে পারে ? অজয় পালও তার ভুল বুঝতে পেরে তার সঙ্গী সাথী সহ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করলেন।খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) অজয় পালের নাম রাখলেন ‘আব্দুল্লাহ বিয়াবানী’।
সংবাদ শুনে মুষড়ে পরলেন রাজা।নিজ রাজ্য রক্ষার কথা চিন্তা করে সংঘর্ষমুক্ত সহাবস্হানের পথ অবলম্বন করলেন রাজা।কিন্তু সত্য মিথার সংষর্ষ যে অবসম্ভাবী।আবারও সংঘর্ষের সূত্রপাত হলো এভাবে-
রাজদরবারের একজন কর্মচারী ছিলেন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর একান্ত অনুরক্ত।মুসলমানও হয়ে গিয়েসিলেন তিনি।রাজা একথা জেনেও তাকে খুব পছন্দ করতেন তার উত্তম স্বভাব,বিশ্বস্হতা ও সততার জন্য।কিন্তু রাজদরবারের অন্যান্য সদস্যদের প্ররোচনায় এক সময় সেই কর্মচারীর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন রাজা। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর কাছে বার বার হেনস্ত হবার সমস্ত ক্ষোভ যেন গিয়ে পড়লো তার উপর।মুসলমান কর্মচারী সমস্ত দুঃখের কথা খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর কাছে বর্ননা করার পর খাজাকে অনুরোধ করলেন তার জন্য রাজার কাছে একটি সুপারিশ পত্র পাঠাতে।পর দুঃখে কাতর খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) একান্ত বিনয় ও নম্রতার মাধ্যমে সেই কর্মচারীর পক্ষে একটি সুপারিশ পত্র পাঠালেন।সেই সঙ্গে রাজাকে জানালেন ইসলাম গ্রহনের একান্ত আহ্বান।
চিঠি পেয়ে রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন পৃথ্বিরাজ।মুসলমান কর্মচারীকে চকুরীচ্যুত করলেন রাজা।সেই সঙ্গে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর বিরুদ্ধে উচ্চারন করলেন অশালীন বক্তব্য।সংবাদ শুনে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর প্রেমময় অন্টরেও প্রজ্জলিত হলো রুদ্ররোষের সর্বধ্বংসী আগুন।তিনি একটুকরা কাগজে লিখে পাঠালেন রাজা পৃথ্বিরাজকে-”মান তোরা যেন্দা বদস্তে লশকরে ইসলাম বছোপর্দম”। অর্থাৎ আমি তোমাকে তোমার জীবিতাবস্হাতেই মুসলিম সেনাদের হাতে সোদর্প করলাম।এর পরেই স্বপ্ন দেখলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী এবং উনার নেতৃত্বেই হিন্দুস্হানে উরলো মোসলমানদের বিজয় পতাকা এবং পতন হলো মহারাজা পৃথ্বিরাজের।
নিদ্রাভিবুত ছিলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।স্বপ্নে দেখলেন শ্বেত শুভ্র বস্ত্রাবৃত এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ সিংহাসনে বসা।তার সামনে দন্ডায়মান অনেক অনুচর।তাদের মধ্যে একজন সুলতান ঘোরীকে হাত ধরে একদল সুসজ্জিত মুসলমান সেনাদলের নিকট নিয়ে গেল।আর সেই সময় সেই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ তাকে লক্ষ্য করে বললেন,”যাও তোমাকে আমি হিন্দুস্হানের শাসন ক্ষমতা দান করলাম।”।
স্বপ্ন ভেঙ্গে গেল।চমকিত হলেন সুলতান।এ নিশ্চয়ই শুভ স্বপ্ন হবে। সকালে ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে স্বপ্নের বৃত্তান্ত জানালেন।সবাই একবাক্যে বললেন ,মনে হয় অচিরেই হিন্দুস্হান আপনার করতলগত হবে।এ স্বপ্ন তারই আগাম সুসংবাদ।
সুলতান মনস্হির করলেন হিন্দুস্হান অভিযান শুরু করার। সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেককে প্রস্তুত হবার নির্দেশ দিলেন।৫৮৮ হিজরি সালে সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী তার বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে হিন্দুস্হান অভিমুখে রওয়ানা হলেন।অন্তরে বিগত যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি।সে গ্লানি এবার মুছতেই হবে।ইতি পুর্বে দুই দুইবার হিন্দুস্হান আক্রমন করেও সফল হতে পারেন নি।শুরু হল তুমুল যুদ্ধ। সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরীর সৈন্যসংখ্যা রাজা পৃথ্বিরাজের সৈন্যের তুলনায় একেরারেই কম।কিন্তু ইমানের বলে বলীয়ান এক আল্লাহর একছ্ছত্র শক্তির প্রতি নির্ভর করে তারা নির্ভয়ে এগিয়ে চললো। এই বাহিনীর প্রধান সেনাপতি কুতুবুদ্দিন আইবেক।তারায়েনা প্রান্তরে দুই বাহিনীর মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হলো। মুসলমানদের প্রচন্ড আক্রমনের সামনে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল পৌত্তলিক সৈন্যবাহিনী।নাস্তানাবুদ হয়ে পালিয়েও নিস্তার পেল না তারা।ক্ষিপ্রগতিতে রাজপুত সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবন করে যাকে যেভাবে পাওয়া গেল,তাকে সেভাবেই হত্যা করতে লাগলো মুসলমান সৈন্য বাহিনী।উপায়ন্তর না দেখে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে গেলো সেনাপতি খান্ডে রাও।রাজা পৃথ্বিরাজও সরস্বতী নদীর তীর ধরে পালাবার চেস্টা করার সময় মোসলমানদের সৈন্যদের হাতে বন্দী হয়ে গেল রাজা।শেষাবধি হত্যা করা হল তাকে।৫৮৮ হিজরী সালে ভয়াবহ এ যুদ্ধে সুলতান সাহাবুদ্দিন ঘোরী নিরংকুশ বিজয় লাভ করলেন।আরো সামনে এগিয়ে চললো ঘোরী বাহিনী।এর পর সহজেই এক এক করে সরস্বতী,সামানা ও হাশিসহ অধিকৃত হল দিল্লী।সুলতান দিল্লীর দায়িত্ব দিলেন কুতুবুদ্দিন আইবেককে ।তারপর সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী এগিয়ে চললেন আজমীরের দিকে।
তার এই এই অপ্রতিরুদ্ধ অগ্রাভিযানের সামনে অবনত হলো যুদ্ধে নিহত হিন্দু রাজাদের পুত্রগন।দেউল নামক স্হানে সম্রাটের সঙ্গে সাক্ষাত করলো অনেক রাজপুত্রগন।মুসলিম শাসনের প্রতি তাদের আনুগত্যের বিনিময়ে সম্রাট তাদেরকে দান করলেন বিভিন্ন রাজ্যের জায়গী। সুলতান এগিয়ে চললেন আজমীরের দিকে।
এদিকে আজমীরে ক্রমাগত বেড়েই চলছে খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর কাফেলা। ইসলাম কবুলকারীদের সংখ্যা এখন লক্ষ লক্ষ।শুধু আজমীরে নয় এখন খাজা মইনুদ্দিন চিশ্‌তী (রঃ) এর জামাত এখন ছড়িয়ে পরেছে হিন্দুস্হানের কোনায় কোনায়।দর্শনার্থীদের ভীর সব সময় লেগেই থাকে।
সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী অবশেষে আজমীর এসে পৌছলেন।তখন সন্ধা হয় হয়।সুর্যাস্ত হওয়ার পর সচকিত হয়ে উঠলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।দুরে কোথায় আজানের ধ্বনি শোনা যায়।সেদিকে এগিয়ে যেতেই তিনি দেখলেন একদল নুরানী জান্নাতী
লোক হাত বেধে দাড়িয়েছেন।দরবেশদের জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করলেন সুলতান।সালাত শেষে জামাতের ইমামের মুখের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন সুলতান শাহাবুদ্দিন মোহাম্মদ ঘুরী।এইতো সেই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ,স্বপ্নে যিনি জানিয়েছেন হিন্দুস্হান বিজয়ের সুসংবাদ।
সুলতান শ্রদ্ধাভরে পরিচিত হলেন হজরত খাজার সাথে।তিনদিন হযরতের মোবরক সহবতে অতিবাহিত করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন সুলতান।তার প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লীতে রেখে গেলেন কুতুবুদ্দিন আইবেক কে।তিনিও বায়াত গ্রহন করলেন খাজার প্রতিনিধি খাজা বখতিয়ার কাকী(রঃ) হাতে।এর পর রাজনৈতিক ও রুহানী শক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পৌত্তলিকতা উছ্ছেদের অভিযান চলতে থাকলো সমান্তরাল গতিতে।কুতুবুদ্দিন আইবেক ক্রমে ক্রমে প্রসারিত করলেন মুসলিম রাজ্যের সীমানা।কনৌজ,বানারস সহ আরো বহু স্হানে উড়িয়ে দিলেন মোসলমানদের বিজয় পতাকা।

(গ্রন্থ সহায়তা – মোহাম্মদ মামুনুর রশীদ রচিত -” চেরাগে চিশতী”,প্রকাশক-সেরহিন্দ প্রকাশন,উয়ারী ,ঢাকা।)

হযরত মূসা(আঃ) কর্তৃক আযরাঈল(আঃ) কে থাপ্পর মারার ঘটনা

Standard

হজরত মুসা [আ.] কর্তৃক আজরাইলকে থাপ্পর মারার ঘটনা!
========================
হাদীসটি সহীহ। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মালাকুল মাউত (জান কবজকারী ফেরেশতা) কে মূসা আ.-এর নিকট প্রেরণ করা হল। তিনি যখন এলেন তখন মূসা আ. তাকে জোরে থাপ্পড় মারলেন। যার ফলে মালাকুল মাউতের চক্ষু বের হয়ে পড়ল।

তখন তিনি আল্লাহ তাআলার নিকট আরজ করলেন, আপনি আমাকে এমন বান্দার নিকট প্রেরণ করেছেন যিনি মওত চান না। আল্লাহ তাআলা তখন (নিজ কুদরতে) তার চক্ষু আপন স্থানে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি আবার যাও এবং তাকে বল-আপনি একটি ষাড়ের পিঠে হাত রাখুন। ঐ হাতের নিচে যত পশম পড়বে আপনি চাইলে এর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে আপনার হায়াত এক বছর করে দীর্ঘায়িত হবে। মূসা আ. এ কথা শুনে বললেন, এরপর কী হবে? আল্লাহ তাআলা বললেন, মৃত্যুই আসবে। মূসা আ. বললেন, তাহলে এখনি মৃত্যু দিন। [সহীহ বুখারী হাদীস : ৩৪০৭; সহীহ মুসলিম হাদীস : ২৩৭২ উল্লেখ্য, বিখ্যাত হাদীস-বিশারদগণ বলেন, মালাকুল মাওত মূসা আ.-এর অনুমতি না নিয়েই মানুষের বেশে তাঁর ঘরে প্রবেশ করেছিলেন। তখন তিনি তাকে না চিনতে পেরে বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ করার কারণে চপেটাঘাত করেন।-ফাতহুল বারী ৬/৫০৮; শরহে নববী ১৫/১২৯]

শুধু বোখারী,মুসলিমে সহীহ হাদিস খোঁজা ভুল

Standard

কটি মারাত্মক ভুলঃ
_____________________
আমাদের সমাজে অনেকেই শুধু বুখারী ও মুসলিম শরীফে সহীহ হাদীস খুঁজে।
জেনে রাখা প্রয়োজন, শুধু বুখারী শরীফে ও মুসলিম শরীফে সহীহ হাদীস খুঁজলে সেটা হবে মারাত্মক ভুল।
দেখুন, তারা নিজেরা এ নিয়ে কী বলেছেনঃ

ঈমাম বুখারী (রা) এর কথাঃ
_______________________
** ইমাম বুখারী (রা) বলেছেন,
আমি আমার জামে’ কিতাবে (সহীহ বুখারীতে) সহীহ হাদীস সংকলন করেছি, তবে (কিতাব) দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে আমি অনেক সহীহ হাদীস ছেড়ে দিয়েছি।
রেফারেন্সঃ
তাহকীকু ইস্মাইস সাহীহাঈন
পেইজ নাম্বার-৯

ইমাম মুসলিম (রা) এর কথাঃ
_______________________
**ইমাম মুসলিম (রা) বলেছেন,
আমি যেসকল হাদীস এ কিতাবে সংকলন করেছি তা সহীহ। আর যেসকল হাদীস সংকলন করিনি, আমি বলিনা সে হাদীসগুলো দায়ীফ বা দুর্বল।
রেফারেন্সঃ
তারীখু বাগদাদঃ৪/২৭৩

এভাবে হাদীস তলব করা বেদ’আতীদের কাজঃ
__________________________________
বিশ্ববিখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম আবু যুর’আহ (রাহঃ) ইমাম মুসলিম (রা) এর সহীহ মুসলিম দেখে বলেছিলেন,
” সে তো বেদ’আতীদেরকে আমাদের উপর কথা বলার সুযোগ করে দিলো। কারণ, বেদ’আতীদের নিকট কোন হাদিস দ্বারা দলীল পেশ করলে (এখন থেকে) তারা বলবে,
“এ হাদীস তো সহীহ হাদীসের কিতাবে নেই”।
রেফারেন্সঃ
বাযলুল ইহসানঃ১/৫১

পুনশ্চঃ
_________
আহলে হাদীস নামধারী বেদ’আতীদের মাঝে এধরণের কথা বলার বদ অভ্যাস পাওয়া যায়। সুতরাং এদের থেকে সাবধান।
শেয়ার করবেন ইনশা আল্লাহ।

বিতিরের নামাজ ৩ রাকাত

Standard

image

বিতর নামায এক রাকাত না তিন রাকাত?
———
লেখক-মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ লুধিয়ানভী

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের নামায তিন রাকাত পড়তেন, এক রাকাত পড়া প্রমাণিত নয়। তদ্রূপ যেসব রেওয়ায়েতে তিন রাকাতের অধিক, যথা পাঁচ, সাত বা নয় রাকাত পড়ার কথা বলা হয়েছে সেখানেও মূল বিতর তিন রাকাত। বর্ণনাকারী পূর্বের বা পরের রাকাতসমূহ মিলিয়ে সমষ্টিকে ‘বিতর’ বলে বর্ণনা করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামায তিন রাকাত পড়তেন তা নীচের হাদীসসমূহ দ্বারা প্রমাণিত।
১.
আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘রমযানুল মুবারকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামায কীরূপ হত?’ উম্মুল মুমিনীন বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানে ও রমযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন-এত সুন্দর ও দীর্ঘ সে নামায, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অতঃপর চার রাকাত পড়তেন-এরও দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে চেয়ো না। এরপর তিন রাকাত পড়তেন।’
عن أبي سلمة بن عبد الرحمن أنه سأل عائشة رضي الله عنها كيف كان صلاة رسول الله صلى الله عليه وسلم في رمضان؟ قالت ما كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يزيد في رمضان ولا في غيره على إحدى عشرة ركعة، يصلي أربعا فلا تسأل عن حسنهن وطولهن، ثم يصلي أربعا فلا تسأل عن حسنهن وطولهن ثم يصلي ثلاثا. (সহীহ বুখারী ১/১৫৪; সহীহ মুসলিম ১/২৫৪; সুনানে নাসায়ী ১/২৪৮; সুনানে আবু দাউদ ১/১৮৯; মুসনাদে আহমদ ৬/৩৬)
২. সা’দ ইবনে হিশাম বলেন, (উম্মুল মুমিনীন) আয়েশা রা. বলেছেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন না।’ عن سعد بن هشام أن عائشة حدثته أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان لا يسلم في ركعتي الوتر. (সুনানে নাসায়ী ১/২৪৮; মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ পৃ. ১৫১)
৩. ইমাম হাকেম রাহ. সা’দ ইবনে হিশামের বিবরণ এভাবে বর্ণনা করেছেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের প্রথম দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন না।’ كان رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يسلم في الركعتين الأوليين من الوتر. هذا حديث صحيح على شرط الشيخين ولم يخرجاه (আলমুস্তাদরাক ১/৩০৪)
৪. অন্য সনদে বিবরণটি এভাবেও বর্ণিত হয়েছে, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামায তিন রাকাত পড়তেন এবং শুধু শেষ রাকাতে সালাম ফেরাতেন। আমীরুল মু’মিনীন উমর রা. এই নিয়মে বিতর পড়তেন এবং তাঁরই সূত্রে আহ্লে মদীনা এই নিয়ম গ্রহণ করেছে।’ كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوتر بثلاث، لا يسلم إلا في آخرهن. وهذا وتر أمير المؤمنين عمر بن الخطاب رضي الله عنه، وعنه أخذه أهل المدينة. (আলমুস্তাদরাক)
৫. মুসনাদে আহমদ কিতাবে (৬/১৫৬) বিবরণটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশার নামায আদায় করে ঘরে আসতেন এবং দুই রাকাত নামায পড়তেন। এরপর আরো দুই রাকাত পড়তেন, যা পূর্বের নামাযের চেয়ে দীর্ঘ হত। অতঃপর তিন রাকাত পড়তেন, যা মাঝখানে আলাদা করতেন না। এরপর বসে বসে দুই রাকাত নামায পড়তেন। রুকু-সেজদাও সেভাবেই করতেন। أن رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا صلى العشاء دخل المنزل ثم صلى ركعتين. ثم صلى بعدهما ركعتين أطول منهما، ثم أوتر بثلاث، لا يفصل بينهن ثم صلى ركعتين وهو جالس، يركع وهو جالس ويسجد وهو جالس.
৬. আবদুল্লাহ ইবনে আবু কায়স বলেন, আমি (উম্মুল মু’মিনীন) আয়েশা রা.কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কত রাকাত বিতর (আদায়) করতেন? উম্মুল মু’মিনীন বললেন, ‘চার ও তিন রাকাত, ছয় ও তিন রাকাত এবং আট ও তিন রাকাত। তিনি তেরো রাকাতের অধিক এবং সাত রাকাতের কম বিতর করতেন না।’ عن عبد الله بن أبي قيس قال سألت عائشة رضي الله عنها بكم كان رسول الله صلى الله صليه وسلم يوتر قالت : بأربع وثلاث، وست وثلاث، وثمان وثلاث ولم يكن يوتر بأكثر من ثلاث عشرة ولا أنقص من سبع. (সুনানে আবু দাউদ ১/১৯৩; শরহু মাআনিল আছার তহাবী ১/১৩৯) উপরোক্ত হাদীসে তাহাজ্জুদ ও বিতরকে একত্রে ‘বিতর’ বলা হয়েছে। এতে মূল বিতর তিন রাকাত, বাকীগুলো তাহাজ্জুদ।
৭. আবদুল আযীয ইবনে জুরাইজ বলেন, ‘আমি (উম্মুল মু’মিনীন) আয়েশা সিদ্দীকা রা.কে জিজ্ঞাস করেছি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামাযে কী কী সূরা পাঠ করতেন? উম্মুল মু’মিনীন বলেছেন, তিনি প্রথম রাকাতে সূরা আ’লা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাছ ও ‘মুআওয়াযাতাইন’ (ফালাক ও নাস) পাঠ করতেন।’ عن عبد العزيز بن جريج قال سألت عائشة رضي الله عنها بأي شيء كان يوتر رسول الله صلى الله عليه وسلم؟ قال يقرأ في الأولى بسبح اسم ربك الأعلى، وفي الثانية بقل يا ايها الكافرون وفي الثالثة بقل هو الله احد والمعوذتين. قال أبو عيسى هذا حديث حسن غريب. (সুনানে আবু দাউদ ১/২০১; সুনানে তিরমিযী পৃ. ৬১; সুনানে ইবনে মাজাহ পৃ. ৭৩; মুসনাদে আহমদ ৬/২২৭; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক
৮. ‘আমরা বিনতে আবদুর রহমান উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামায তিন রাকাত পড়তেন। প্রথম রাকাতে সূরা আ’লা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করতেন।’ عن عمرة عن عائشة رضي الله عنها أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يوتر بثلاث. يقرأ في الركعة الأولى بسبح اسم ربك الأعلى، وفي الثانية قل يا ايها الكافرون وفي الثالثة قل هو الله احد وقل اعوذ برب الفلق وقل اعوذ برب الناس. هذا حديث صحيح على شرط الشيخين ولم يخرجاه. وقال الذهبي رواه ثقات عنه، وهو على شرط خ ـ م. (আলমুসতাদরাক ১/৩০৫)
৯. মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর পিতা আলী ইবনে আবদুল্লাহ থেকে, তিনি তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শয্যাত্যাগ করলেন, অতঃপর মিসওয়াক করলেন এবং দুই রাকাত করে ছয় রাকাত নামায আদায় করে শয্যাগ্রহণ করলেন। কিছুক্ষণ পর পুনরায় শয্যাত্যাগ করলেন, মিসওয়াক করলেন এবং দুই রাকাত করে ছয় রাকাত আদায় করলেন। এরপর তিন রাকাত বিতর পড়লেন। এরপর আরো দুই রাকাত (অর্থাৎ ফজরের সুন্নত) আদায় করলেন।’ عن محمد بن علي عن أبيه عن جده عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قام من الليل فاستن ثم صلى ركعتين ثم نام ثم قام فاستن ثم توضأ فصلى ركعتين حتى صلى ستا ثم أوتر بثلاث وصلى ركعتين. (সুনানে নাসায়ী ১/২৪৯)
১০. ইয়াহইয়া ইবনুল জাযযার রাহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে আট রাকাত নামায পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন। অতঃপর ফজরের নামাযের পূর্বে দুই রাকাত নামায পড়তেন।’ عن يحي بن الجزار عن ابن عباس رضي الله عنهما قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يصلي من الليل ثمان ركعات ويوتر بثلاث ويصلي ركعتين قبل صلاة الفجر. (সুনানে নাসায়ী ১/২৪৯; শরহু মাআনিল আছার তহাবী ১/১৪০)
১১. সায়ীদ ইবনে জুবাইর রাহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামায তিন রাকাত পড়তেন, প্রথম রাকাতে সূরা আ’লা, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং তৃতীয় রাকাতে সূরা ইখলাছ পড়তেন।’ عن سعيد بن جبير عن ابن عباس رضي الله عنهما قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوتر بثلاث يقرأ في الأولى سبح اسم ربك الأعلى وفي الثانية قل يا ايها الكافرون وفي الثالثة قل هو الله احد. (সুনানে দারেমী ১/৩১১, হাদীস : ১৫৯৭; সুনানে তিরমিযী ১/৬১; সুনানে নাসায়ী ১/২৪৯; সুনানে ইবনে মাজাহ পৃ. ৮৩; শরহু মাআনিল আছার তহাবী ১/১৪০; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ১/২৯৯; আল-মুহাল্লা, ইবনে হায্ম ২/৫১) ইমাম নববী ‘খুলাসা’ কিতাবে বলেন, بإسناد صحيح অর্থাৎ হাদীসটি সহীহ সনদে বর্ণিত। (নাসবুর রায়া ২/১১৯)
হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রা. ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ছাড়াও বিতরের তিন রাকাতে তিন সূরা পাঠের হাদীস যাঁরা বর্ণনা করেছেন তারা হলেন :
১. হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবযা রা.। (নাসায়ী ১/২৫১; তহাবী ১/১৪৩; ইবনে আবী শায়বা ২/২৯৮; আবদুর রাযযাক ২/৩৩)
২. হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা.। (নাসায়ী ১/২৪৮; ইবনে আবী শায়বা ২/৩০০)
৩. হযরত আলী ইবনে আবী তালিব রা.। (তিরমিযী ১/৬১; আবদুর রাযযাক ৩/৩৪; তহাবী ১/১৪২)
৪. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু আওফা রা.। (মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২৪১)
৫. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.। (মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২৪১)
৬. হযরত নু’মান ইবনে বাশীর রা.। (মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২৪১)
৭. হযরত আবু হুরায়রা রা.। (মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২৪১)
৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.। (মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২৪১)
৯. হযরত ইমরান ইবনে হুসাইন রান.। (তহাবী ১/১৪২; ইবনে আবী শায়বা ২/২৯৮; মাজমাউয যাওয়াইদ ২/২৪১; কানযুল উম্মাল ১/১৯৬)
১০. আবু খাইছামা রা. তাঁর পিতা হযরত মুয়াবিয়া ইবনে খাদীজ রা. থেকে। (মাজমাউয যাওয়াইদ ২/২৪১)
১১. আমির ইবনে শারাহীল শা’বী রাহ. বলেন,‘আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাতের নামায সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.কে জিজ্ঞাসা করেছি। তারা বলেছেন, ‘তেরো রাকাত নামায পড়তেন। আট রাকাত তাহাজ্জুদ ও তিন রাকাত বিতর। অতঃপর সোবহে সাদেক হওয়ার পর আরো দুই রাকাত পড়তেন।’ عن عامر الشعبي قال سألت ابن عمر وابن عباس رضي الله عنهما كيف كان صلاة رسول الله صلى ا لله عليه وسلم بالليل فقالا ثلاث عشرة ركعة، ثمان ويوتر بثلاث، وركعتين بعد الفجر. (তহাবী ১/১৩৬)
১২. ছাবিত আল বুনানী রাহ. বলেন, হযরত আনাস ইবনে মালিক রা. আমাকে বললেন, ‘হে ছাবিত! আমার নিকট থেকে (দ্বীনের আহকাম) গ্রহণ কর। কারণ (এ বিষয়ে এখন) আমার চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি তুমি আর পাবে না। আমি (দ্বীন) গ্রহণ করেছি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে। তিনি জিব্রীল আ.-এর নিকট থেকে। আর জিব্রীল আ. গ্রহণ করেছেন আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে।’ এরপর আনাস রা. আমাকে নিয়ে ইশার নামায আদায় করলেন। অতঃপর ছয় রাকাত নামায এভাবে পড়লেন যে, প্রতি দু রাকাতে সালাম ফেরাতেন। শেষে তিন রাকাত বিতর পড়লেন ও সর্বশেষ রাকাতে সালাম ফেরালেন। عن ثابت البناني قال قال لي أنس بن مالك يا ثابت اخذ عني، فإنك لن تأخذ عن أحد أوثق مني، إني أخذته عن رسول الله صلى الله عليه وسلم وأخذه رسول الله صلى الله عليه وسلم عن جبريل وأخذ جبريل عن الله عز وجل، قال : ثم صلى بي العشاء ثم صلى ست ركعات يسلم بين كل ركعتين ثم يوتر بثلاث، يسلم في آخرهن. رواه الروياني وابن عساكر ورجاله ثقات. (কানযুল উম্মাল ৪/১৯৬)
১৩. ইমাম আবু হানীফা রাহ. ইমাম আবু জা’ফর বাকির রাহ. থেকে বর্ণনা করেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইশা ও ফজরের মাঝে তেরো রাকাত নামায পড়তেন। আট রাকাত নফল, তিন রাকাত বিতর এবং দুই রাকাত ফজরের সুন্নত। أخبرنا أبو حنيفة، حدثنا أبو جعفر قال كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يصلي ما بين صلاة العشاء إلى صلاة الصبح ثلاث عشرة ركعة ثمان ركعات تطوعا، وثلاث ركعات الوتر وركعتي الفجر. (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ পৃ. ১৪৯)
এই হাদীসগুলো থেকে কয়েকটি বিষয় প্রমাণ হয়। যথা :
ক. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামায তিন রাকাত পড়তেন।
খ. তিন রাকাত এক সালামে আদায় করতেন।
গ. বিশেষ কয়েকটি সূরা তেলাওয়াত করতেন।
এ পর্যন্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামায কীভাবে আদায় করতেন সে বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এবার তাঁর কিছু বাণী উল্লেখ করছি।
হাদীসের আলোকে বিতর ৩ রাকাত
১. হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘বিতর নামায শুধু তিন রাকাত পড়ো না;বরং পাঁচ রাকাত বা সাত রাকাত পড়। একে মাগরিবের নামাযের মতো বানিয়ে ফেলো না।’ عن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : لا توتروا بثلاث وأوتروا بخمس أو سبع، ولا تشبهوا بصلاة المغرب. وقال رجاله ثقات (তহাবী ১/১৪৩; দারাকুতনী পৃ. ১৭১; صحيح على شرط الشيخين হাকিম ১/৩০৪)
২. আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মাগরিব হল দিবসের বিতর। অতএব তোমরা রাতের নামাযকেও বিতর (বেজোড়) কর। عن ابن عمر رضي الله عنهما أن النبي صلى الله عليه وسلم قال صلاة المغرب وتر النهار فأوتروا صلاة الليل. (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ৩/২৮) মুসনাদে আহমদে রেওয়ায়েতটি এভাবে আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মাগরিবের নামায দিবসের নামাযকে বিতর (বেজোড়) করেছে। অতএব রাতের নামাযকেও বিতর (বেজোড়) কর। ولأحمد عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال صلاة المغرب أوترت صلاة النهار فأوتروا صلاة الليل. قال العراقي : سنده حسن. (যুরকানী শরহুল মুয়াত্তা ১/২৫৯; ইলাউস সুনান ৬/১১)
৩. উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মাগরিব যেমন তিন রাকাত তেমনি বিতরও তিন রাকাত।’ عن عائشة رضي الله عنها قالت : قال رسول الله صلى عليه وسلم الوتر ثلاث كثلاث المغرب. (মাজমাউয যাওয়াইদ ২/২৪২)
৪. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, দিবসের বিতর অর্থাৎ মাগরিব যেমন তিন রাকাত তেমনি রাতের বিতরও তিন রাকাত।’ عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه قال : قال رسول ا لله صلى الله عليه وسلم وتر الليل ثلاث كوتر النهار صلاة المغرب. (দারাকুতনী, নাসবুর রায়া ২/১১৯) উল্লেখ্য, শেষোক্ত রেওয়ায়েত দু’টি ‘মারফু’ হওয়ার বিষয়ে মুহাদ্দিসগণের আপত্তি আছে, কিন্তু প্রথমত বর্ণনা দুটির বিষয়স্তু অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত, দ্বিতীয়ত বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হওয়ার কারণে রেওয়াত দু’টি ‘হাসান’ বলে গণ্য। তাছাড়া হযরত আয়েশা রা. এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর বাণী সহীহ সনদেও বর্ণিত হয়েছে, যা সামনে উল্লেখ করা হবে। আর এ ধরনের বিষয় যেহেতু নিছক যুক্তির ভিত্তিতে বলা যায় না এজন্য মওকূফ হাদীসও এক্ষেত্রে ‘মারফু’ বলে গণ্য হবে। মোটকথা, উপরের হাদীসগুলো প্রমাণ করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে বিতর নামায মাগরিবের মতোই তিন রাকাত। তদ্রূপ মাগরিবের মাধ্যমে যেমন দিবসের নামায বেজোড় হয় তেমনি বিতরের মাধ্যমে রাতের নামায বেজোড় হয়ে যায়। এজন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামায শুধু তিন রাকাত পড়া পছন্দ করেননি; বরং বিতরের পূর্বে দু’ চার রাকাত হলেও নফল পড়ার আদেশ করেছেন। যেন বিতর ও মাগরিবের মাঝে পার্থক্য হয়। কারণ মাগরিবের পূর্বে নফল নেই।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী ও কর্মের পর সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীনের কর্মপন্থা উল্লেখ করছি। এতে খায়রুল কুরূনের তা’আমুল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে।
তাবেয়ীদের আমলের আলোকে বিতর ৩ রাকাত
১. মিসওয়ার ইবনে মাখরামা রাহ. বলেন, ‘আমরা রাতের বেলায় আবু বকর সিদ্দীক রা.কে দাফন করলাম। উমর রা. বললেন, আমি এখনো বিতর পড়িনি। তিনি বিতরের নামায পড়তে দাড়ালেন, আমরা তার পিছনে কাতার করলাম। তিনি আমাদের নিয়ে তিন রাকাত নামায পড়লেন এবং শুধু শেষ রাকাতে সালাম ফেরালেন।’ (তহাবী ১/১৪৩; ইবনে আবী শায়বা ১/২৯৩; আবদুর রাযযাক ৩/২০) বলাবাহুল্য, এই ঘটনায় বড় বড় সাহাবী উপসি’ত ছিলেন। তাঁরা সবাই হযরত উমর রা.-এর একতেদা করেছেন। তাঁদের সম্মিলিত কর্মের দ্বারা প্রমাণ হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতর নামায এক সালামে তিন রাকাত পড়তেন।
২. ইতিপূর্বে ‘মুসতাদরাকে হাকেমে’র উদ্ধৃতিতে (১/৩০৪) সা’দ ইবনে হিশামের রেওয়ায়েত উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের তৃতীয় রাকাতে সালাম ফেরাতেন। ঐ রেওয়ায়েতের শেষে এই অংশটুকুও আছে, ‘এবং আমীরুল মু’মিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব রা.ও এই নিয়মে বিতরের নামায পড়তেন।’
৩. ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. থেকে বর্ণিত, হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, ‘আমি তিন রাকাত বিতর পরিত্যাগ করা পছন্দ করি না, এর পরিবর্তে লাল বর্ণের (মূল্যবান) উট পেলেও। (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ পৃ. ১৫০)
৪. হাসান বসরী রাহ.কে বলা হল যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. তো বিতর নামাযে দুই রাকাতের পর সালাম ফেরাতেন। তখন তিনি বললেন, ‘তাঁর ওয়ালিদ হযরত উমর রা. তাঁর চেয়ে বড় ফকীহ ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় রাকাতে সালাম না ফিরিয়ে আল্লাহু আকবার বলে (তৃতীয় রাকাতে) দাঁড়িয়ে যেতেন।’ (হাকিম ১/৩০৪)
৫. মাকহুল রাহ. থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিতর নামায তিন রাকাত পড়তেন। মাঝে সালাম ফিরিয়ে আলাদা করতেন না।’ (ইবনে আবী শায়বা ২/২৯৪)
৬. যাযান আবু উমর বলেন, ‘হযরত আলী রা.-এর আমলও এরূপ ছিল।’ (ইবনে আবী শায়বা ২/২৯৫)
৭. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, দিবসের বিতর, অর্থাৎ মাগরিব যেমন তিন রাকাত তেমনি বিতরের নামাযও তিন রাকাত। عن مكحول عن عمر بن الخطاب رضي الله عنه أنه أوتر بثلاث ركعات لم يفصل بينهن بسلام. (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ পৃ. ১৫০; তহাবী ১/১৪৩; আবদুর রাযযাক ২/১৯)
৮. আলকামা রাহ. বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. আমাদেরকে বলেছেন যে, ‘বিতর সর্বনিম্ন তিন রাকাত।’ (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ পৃ. ১৫০)
৯. ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর বাণী বর্ণনা করেছেন যে, বিতর নামাযে এক রাকাত যথেষ্ট নয়। (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ পৃ. ১৫০)
১০. উকবা ইবনে মুসলিম বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.কে বিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম (তা কত রাকাত) তিনি বললেন, তুমি কি দিবসের বিতর সম্পর্কে জান? আমি বললাম, জ্বী হাঁ। মাগরিবের নামায হচ্ছে দিবসের বিতর। তিনি বললেন, তুমি ঠিক বলেছ এবং সুন্দর জওয়াব দিয়েছ। (অর্থাৎ রাতের বিতরও দিবসের বিতরের অনুরূপ।) ( তহাবী ১/১৩৬)
১১. আনাস রা. বলেন, বিতর নামায তিন রাকাত। তিনি নিজেও তিন রাকাত বিতর পড়তেন। (তহাবী ১/১৪৩; ইবনে আবী শায়বা ২/২৯৩, ২৯৪) عن أنس رضي الله عنه قال الوتر ثلاث ركعات وكان يوتر بثلاث ركعات. وقال الحافظ في الدراية إسناده صحيح.
১২. আবু মানসুর বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.কে বিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি বলেছেন, ‘(বিতর) তিন রাকাত।’ (তহাবী ১/১৪১)
১৩. আতা রাহ. বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, ‘বিতর হচ্ছে মাগরিবের নামাযের মতো।’ (মুয়াত্তা ইমাম মুহাম্মাদ পৃ. ১৫০)
১৪. আবু ইয়াহইয়া বলেন, এক রাতে হযরত মিসওয়ার ইবনে মাখরামা রা. এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. কথা বলছিলেন, ইতিমধ্যে লাল তারকা উদিত হল। তখন ইবনে আব্বাস রা. শয্যাগ্রহণ করলেন এবং আহলে যাওরার আওয়াজে তাঁর ঘুম ভাঙল। তখন তিনি সঙ্গীদের জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কি সূর্যোদয়ের আগে তিন রাকাত বিতর, এবং দুই রাকাত ফজরের সুন্নত ও দুই রাকাত ফরয পড়তে পারব? তারা বললেন, জ্বী হাঁ। এটা ছিল ফজরের আখেরী ওয়াক্ত। (তহাবী ১/১৪১)
এই রেওয়ায়েত বর্ণনা করার পর ইমাম তহাবী রাহ. বলেন, ইবনে আব্বাস রা.-এর নিকটে যদি বিতর নামায তিন রাকাতের চেয়ে কম পড়ার অবকাশ থাকত তাহলে এত সংকীর্ণ সময়ে, যখন ফজরের নামায কাযা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হচ্ছিল, তিন রাকাত বিতর পড়তেন না।
১৫. সায়ীদ ইবনে জুবাইর রাহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর বাচনিক উদ্ধৃত করেছেন যে, ‘বিতর হল সাত রাকাত বা পাঁচ রাকাত। তিন রাকাত তো পুচ্ছহীন (অসম্পূর্ণ)। আমি পুচ্ছহীন নামায পছন্দ করি না।’ (তহাবী ১/১৪১; আবদুর রাযযাক ২/২৩)
১৬. সায়ীদ ইবনুল মুসাইয়িব রাহ. উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা রা.-এর বাচনিক উদ্ধৃত করেছেন যে, ‘বিতর হচ্ছে সাত রাকাত বা পাঁচ রাকাত। আর তিন রাকাত তো পুচ্ছহীন।’ (তহাবী ১/১৪১; আবদুর রাযযাক ৩/২৩) দু’জন বিশিষ্ট সাহাবীর উপরোক্ত বক্তব্যের অর্থ হল, বিতর মূলত তিন রাকাত হলেও শুধু তিন রাকাত পড়া উচিত নয়। বিতরের পূর্বে দু’ চার রাকাত নফল নামায পড়া উচিত।
১৭. হাসান বসরী রাহ. বলেন, ‘হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা. বিতর নামায তিন রাকাত পড়তেন এবং শেষ রাকাতে সালাম ফেরাতেন, মাগরিবের নামাযের মতো।’ (আবদুর রাযযাক ৩/২৬)
১৮. আবু গালিব বলেন, ‘আবু উমামা রা. বিতর নামায তিন রাকাত পড়তেন।’ (তহাবী ১/১৪২; ইবনে আবী শায়বা ২/২৯৪)
১৯.আবু খালিদা বলেন, আমি আবুল আলিয়া রাহ.কে বিতর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, বিতর নামায মাগরিবের নামাযের মতো, তবে বিতরের তৃতীয় রাকাতেও কিরাত হয়। এটি হচ্ছে রাতের বিতর আর মাগরিবের নামায দিবসের বিতর।’ (তহাবী ১/১৪৩) এই বর্ণনা থেকে জানা গেল যে, সাহাবায়ে কেরামের নিকট মাগরিব ও বিতর আদায় করার পদ্ধতি অভিন্ন ছিল। শুধু এটুকু পার্থক্য যে, মাগরিবের তৃতীয় রাকাতে ফাতিহার সাথে কিরাত নেই, পক্ষান্তরে বিতর নামাযে ফাতিহার সাথে কুরআন তেলাওয়াত জরুরি।
২০. কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ রাহ. বলেন, ‘বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে মানুষকে বিতর নামায তিন রাকাতই পড়তে দেখেছি। তবে সকল পন্থারই অবকাশ আছে এবং আশা করি, কোনোটাতেই সমস্যা হবে না।’ (সহীহ বুখারী ১/১৭৩) মুহাম্মাদ ইবনুল কাসিম রাহ. ছিলেন একজন তাবেয়ী ও মদীনার বিখ্যাত ‘ফুকাহায়ে সাব‘আ’ সাত ফকীহ্র অন্যতম। অতএব তাঁর এই বক্তব্যের অর্থ হল, সাহাবায়ে কেরাম ব্যাপকভাবে তিন রাকাত বিতর পড়তেন। এটাই মূল ধারা। তবে কেউ কেউ যেহেতু ইজতিহাদের ভিত্তিতে এক রাকাত বিতরেরও ফতোয়া দিতেন তাই তিনি বলেছেন, সাহাবায়ে কেরামের মূল সুন্নত তো বিতর নামায তিন রাকাত পড়া তবে যারা এক রাকাতের কথা বলেছেন তারা যেহেতু ইজিতহাদের ভিত্তিতে বলেছেন তাই তাদের সমালোচনা করার প্রয়োজন নেই।
২১. আলকামা রাহ. বলেন, ‘বিতর তিন রাকাত।’ (ইবনে আবী শায়বা ২/২৯৪)
২২. ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. বলেন, … ‘(সাহাবায়ে কেরামের যুগে) এ কথাই বলা হত যে, তিন রাকাতের কম বিতর হয় না।’ (প্রাগুক্ত)
২৩. আবু ইসহাক রাহ. বলেন, ‘হযরত আলী রা. এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর সঙ্গীরা বিতরের দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন না।’ (প্রাগুক্ত পৃ. ২৯৫)
২৪. আবুয যিনাদ রাহ. বলেন, ‘আমি মদীনার সাত ফকীহ, অর্থাৎ সায়ীদ ইবনুল মুসাইযিব, কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ, উরওয়া ইবনুয যুবাইর, আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, খারিজা ইবনে যায়েদ, উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ও সুলায়মান ইবনে ইয়াসার-এর যুগ পেয়েছি। তাছাড়া আরো অনেক শায়খের যামানা পেয়েছি, যারা ইলম ও তাকওয়ায় অনন্য ছিলেন। কখনো তাদের মধ্যে মতভেদ হলে তাদের অধিকাংশের মত অনুযায়ী কিংবা ফাকাহাতের বিচারে যিনি অগ্রগণ্য তার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হত। তো এই মূলনীতি অনুসারে তাদের সেসব সিদ্ধান্ত আমি ধারণ করেছি তন্মধ্যে একটি হচ্ছে, বিতর নামায তিন রাকাত, যার শেষ রাকাতেই শুধু সালাম ফেরানো হবে। (তহাবী ১/১৪৫)
২৫. আবুয যিনাদ রাহ. বলেন, (খলীফায়ে রাশেদ) উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ. ফকীহগণের সিদ্ধান্ত অনুসারে ফয়সালা করেন যে, বিতর নামায তিন রাকাত, যার শেষ রাকাতেই শুধু সালাম ফেরানো হবে। (তহাবী ১/১৪৫)
২৬. হাসান বসরী রাহ. বলেন, ‘মুসলমানদের ইজমা রয়েছে যে, বিতর নামায তিন রাকাত, যার শুধু শেষ রাকাতেই সালাম ফেরানো হবে।’ (ইবনে আবী শায়বা ২/২৯৪)
সাহাবায়ে কেরামের আছার,মদীনার বিখ্যাত সাত ফকীহ ও অন্যান্য তাবেয়ীর ফতোয়া এবং খলীফায়ে রাশেদ হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ.-এর ফয়সালা দ্বারা দু’টি বিষয় প্রমাণ হয় :
১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানা থেকে সাহাবায়ে কেরাম পর্যন্ত এবং সাহাবায়ে কেরাম থেকে তাবেয়ীন পর্যন্ত বিতর নামায তিন রাকাতই ছিল। দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া, সাধারণভাবে তিন রাকাতই পড়া হত এবং তিন রাকাতের শিক্ষাই দেওয়া হত। একেই হাসান বসরী রাহ. মুসলমানদের ইজমা বলে আখ্যায়িত করেছেন।
২. কিছু রেওয়ায়েতের কারণে কোনো কোনো সাহাবী-তাবেয়ী বিতর নামায এক রাকাত হওয়ার কথাও বলেছেন। তবে ঐ সব রেওয়ায়েত পর্যালোচনার পর ফুকাহায়ে কেরাম তিন রাকাত বিতরের ফতোয়া দিয়েছেন এবং সেই ফতোয়া অনুযায়ী হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ. ফয়সালা করেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহীহ হাদীস এবং সাহাবায়ে কেরামের তা’আমুল ও মূল ধারার আমলের বিবেচনায় বিতর নামায তিন রাকাত হওয়াই যথার্থ। এর মোকাবেলায় অন্য মতগুলো দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন।
বিতর রাকাত ১ রাকাত ৫ রাকাত ইত্যাদী বর্ণনার পর্যালোচনা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিতর আদায়ের যে পদ্ধতি হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে এবং সাহাবা ও তাবেয়ীন ব্যাপকভাবে যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন তা ইতিপূর্বে নির্ভরযোগ্য বর্ণনার আলোকে তুলে ধরা হয়েছে। এখন ঐসব রেওয়ায়েত সম্পর্কে আলোচনা করতে চাই,যেগুলোতে পাঁচ,সাত বা এক রাকাত বিতরের কথা উল্লেখিত হয়েছে। এই ধরনের রেওয়াত।