আল্লাহর নুর হতে রসুলে পাক(দঃ) এর সৃষ্টি সম্পর্কিত হাদিসের ব্যাখ্যা

Standard

মূল: শায়খ আহমদ সুকায়রিজ আত্ তিজানী (রহ:)
ইংরেজি ভাষান্তর: ড: জি, এফ, হাদ্দাদ (বৈরুত)
অনুবাদ: কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন

শায়খ আহমদ সুকায়রিজ আত্ তিজানী (১৮৭৮-১৯৪৪ খৃষ্টাব্দ) তাঁর প্রণীত ‘আশ্ শাতাহাত আস্ সুকায়রিজিয়্যা’ গ্রন্থের ৫৫-৫৭ পৃষ্ঠায় বলেন:

মুসলমান সর্বসাধারণ যাঁরা মীলাদ উদযাপন করেন, তাঁরা হযরত জাবের (রা:)-এর বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করে থাকেন, যে বর্ণনাটিতে হযরত জাবের (রা:) রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর কাছে আরয করেছিলেন, ‘এয়া রাসূলাল্লাহ (দ:)! আমার পিতা ও মাতা আপনার জন্যে কুরবান হোন। (অনুগ্রহ করে) আমায় বলুন, আল্লাহতা’লা সর্বপ্রথম বা সর্বাগ্রে কী সৃষ্টি করেন?’ জবাবে মহানবী (দ:) বলেন, ‘ওহে জাবের! নিশ্চয় আল্লাহ পাক সর্বাগ্রে তোমার নবী (দ:)-এর নূর (জ্যোতি)-কে তাঁর নূর হতে সৃষ্টি করেন।’ ইমাম কসতুলানী (রহ:) নিজ ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা’ গ্রন্থে এই হাদীসটি উদ্ধৃত করেন এবং জানান যে এটি মোহাদ্দীস হযরত আবদুর রাযযাক (রহ:)-এর বর্ণিত। এভাবেই আমরা এটি সম্পর্কে জানতে পেরেছি। অনুরূপভাবে, মীলাদুন্নবী (দ:) যাঁরা উদযাপন করেন, তাঁরা ওই বর্ণনাটিও উদ্ধৃত করেন যেখানে বিবৃত হয়েছে, ‘আল্লাহতা’লা তাঁর নিজের এক মুঠি (পরিমাণ) নূর নিয়ে সেটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘হে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম), অস্তিত্বশীল হোন! [এই বর্ণনা হাদীসের গ্রন্থগুলোতে পাওয়া না গেলেও আস্ সুফুরী তাঁর ’নুযহাত আল-মাজালিস্’ পুস্তকের ‘মহানবী (দ:)-এর মীলাদ’ অধ্যায়ে তা বর্ণনা করেন]

আল্লাহতা’লা তাঁর নূর থেকে এক কবজা নূর নেয়ার মানে ওই নূর তাঁর সাথেই সম্বন্ধযুক্ত (’মোযাফ লাহু’); আর ’মিন নূরিহী’ (তাঁর নূর হতে) বাক্যটিতে ’মিন’ (’হতে’) শব্দটি হলো ’লিল বয়ান’ তথা ব্যাখ্যামূলক। ব্যাকরণবিদরা যেভাবে নিরূপণ করেন, সেভাবে ‘মিন’ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করে মহানবী (দ:) যেন বলছেন, ’রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর নূর (প্রকৃতপক্ষে) আল্লাহতা’লারই নূর’ এবং ‘খোদায়ী এক মুঠি (কবজা) হচ্ছে খোদারই নিজস্ব নূর।’ আমাদের সাইয়্যেদ (ছরকার) মোহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর নূর সকল নূরের উৎস বটে, যা থেকে সেগুলোকে নিজস্ব পর্যায় অনুযায়ী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করা হয়েছে। তাই ওই নূর সৃষ্টি করা হয়। কোনো এক আ’রেফ (খোদা-জ্ঞানী) বলেন, ’নূরিহী’ বাক্যটিতে ‘হু’ (তিনি) যমীর (সর্বনাম)-টি ‘তোমার নবী (দ:)-এর নূর’ বাক্যটিতে ‘তোমার নবী (দ:)’-কে উদ্দেশ্য করে। অতএব, এটি এক রকম ‘এসতেখদাম’ তথা দ্ব্যর্থমূলক প্রয়োগ পদ্ধতি  [“এসতেখদাম হলো এমন কোনো শব্দের প্রয়োগ যার দু’টি অর্থ বিদ্যমান; এর মধ্যে খোদ শব্দটি দ্বারাই প্রথম অর্থ বেরিয়ে আসে; আর দ্বিতীয় অর্থটি তার সর্বনাম দ্বারা প্রকাশ পায়। যেমন এরশাদ হয়েছে – ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউ ওই (রমযান) মাস পাবে, সে যেন অবশ্যই সেটির রোযা পালন করে’ (আল-কুরআন, ২:১৮৫)। এখানে ‘মাস’ বলতে নতুন চাঁদকে বোঝানো হয়েছে, আর ’সেটি’ বলতে (রোযার) ’সময়কাল’কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।” – কারাম আল-বোস্তানী, আল-বয়ান (বৈরুত, মকতাবাত সাদির, তারিখবিহীন), ৮৬-৮৭ পৃষ্ঠা]। মহানবী (দ:) যেন এতে (ওপরোক্ত বাক্যে) বলছেন, ’তোমার নবী (দ:)-এর নূর সৃষ্ট হয়েছে তোমার নবী (দ:)-এর নূর হতেই’; তা এই অর্থে যে ওই নূর হতে মহানবী (দ:)-এর সত্তা মোবারক তথা তাঁর পবিত্র রূহ এবং তাঁরই সমস্ত আহওয়াল বা (আত্মিক) অবস্থাকে সৃষ্টি করা হয়। অতএব,তাঁর নূর দ্বারা তিনি অস্তিত্বশীল হন, এবং তাঁরই নূর হতে সকল সৃষ্টি অস্তিত্ব পায়।

খোদাতা’লার সত্তা মোবারকের নূর (জ্যোতি) প্রসঙ্গে বলা যায়, এটি প্রাক-সূচনালগ্ন থেকে বিদ্যমান, মানে এর কোনো সূচনাকাল নেই। আর মহান আল্লাহতা’লার ’নূর’কে কোনো পদ্ধতিতে বর্ণনা করা যেমন যায় না, তেমনি সেটি কল্পনা করাও যায় না। উপরন্তু, তাঁর ক্ষেত্রে ‘নূর’ শব্দটি ‘মুনাওয়ার’ (আলোকোজ্জ্বলকারী) অর্থে বোঝাবে, যেমনটি উল্লেখিত হয়েছে আল-কুরআন ২৪:৩৫-এর তাফসীরে – “আল্লাহ নূর আসমানসমূহ ও জমিনের” – মানে তিনি হলেন আসমানসমূহ ও দুনিয়াতে নূর (জ্যোতি) বিচ্ছুরণকারী। অতএব, তাঁর পবিত্র সত্তা থেকে কোনো কিছু (সরিয়ে) নেয়া যায় না; আমাদের প্রভুর মহান সত্তা, তাঁর বৈশিষ্ট্যমণ্ডলী, কিংবা তাঁর ক্রিয়া কল্পনারও অতীত! আরেক কথায়, মহানবী (দ:) বলতে চেয়েছেন, ‘আল্লাহ পাক তাঁর সৃষ্টিশীল নূর হতে তোমার নবী (দ:)-এর নূরকে সৃষ্টি করেন এবং ওই (সৃষ্টিশীল) নূর-ই তোমার নবী (দ:)-এর নূর। অতএব, সমস্ত সৃষ্টিজগতে (মহানবী দ:-এর) ওই নূরের আগে কিছুই ছিল না, বরঞ্চ সমগ্র সৃষ্টিজগতেরই উৎপত্তি হয় ওই নূর হতে। সম্ভাবনাময়তার আওতাভুক্ত প্রতিটি বিষয় বা বস্তু-ই ওই নূরের ফলশ্রুতিতে অস্তিত্ব পেয়ে থাকে। আর সৃষ্টিজগতে প্রতিটি অস্তিত্বশীল বস্তু, তা যা-ই হোক না কেন, সবই ওই নূরের দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়।

আমি ওপরের বিষয়টি নিয়ে স্বপ্নে দেখলাম আমাদের সূফী মাশায়েখদের অন্যতম শায়খ আবূ আল-কাসেম মোহাম্মদ ফাতাহ বিন কাসেম আল-কাদেরী (রহ:)-এর সাথে আলাপ করছি। তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম সে সব ব্যাপারে যা’তে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হতে সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সূচনা ও তাঁর নূর হতে বিভিন্ন পর্যায়ে অন্যান্য নূরের সৃষ্টি; যে বিবর্তনে রয়েছে শারীরিকভাবে জন্মগ্রহণ থেকে আরম্ভ করে ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে চিরকল্যাণপ্রাপ্তি ও অন্যান্য ফলশ্রুতি, যা হতে পারে মহিমান্বিত বা লজ্জাকর, আশীর্বাদধন্য বা অধঃপতিত, জীবন বা মৃত্যু, প্রাণিকুল, জড় পদার্থ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য বিষয়। ওই স্বপ্নে তিনি আমাকে বলেন:

”নিশ্চয় মহান আল্লাহ পাক যখন বিশ্বজগত সৃষ্টি করেন, তখন সমগ্র আলম (জগত) ও সৃষ্টিকুল যেগুলো অস্তিত্বশীল হবার খোদায়ী এরাদা (ইচ্ছা)-প্রাপ্ত হয়েছিল, সেগুলোকে তাদের নিজ নিজ অস্তিত্বপ্রাপ্তি ও বিলুপ্তির ক্রমানুসারে একটি সর্বব্যাপী মহা-বলয়ের আওতায় সৃষ্টি করা হয় (তাহতা দা’য়েরাত আল-ফালাক আল-মুহীত বিল-কুল্ল); এতে সন্নিবেশিত হয় অন্যান্য বলয়ের স্তর যা শেষ অস্তিত্বশীল বস্তু পর্যন্ত বিস্তৃত, যেমনটি না-কি কোনো গোলক বা রসুনের আকৃতি। ওতে (মহা-বলয়ে) বিরাজমান হয় ছিদ্রসমূহ যা সকল স্তরকে ছেদ করে এমনভাবে, যার দরুন প্রতিটি ছিদ্র দিয়ে আলো বেরিয়ে গোলকের সবদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গোলকের স্তরগুলো হচ্ছে শতাব্দী, বছর, মাস, দিন, সপ্তাহ ও মিনিট (ক্ষণ), এমন কি চোখের এক পলক চাহনি-ও। আল্লাহতা’লা যখন এরাদা (ইচ্ছে) করেছিলেন তিনি নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) হতে সকল বস্তু সৃষ্টি করবেন এবং সেগুলোকে অস্তিত্বশীল করবেন, তখন তিনি নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) সৃষ্টি করেন। সেই সর্বব্যাপী মহা-বলয় বা গোলক মুখোমুখি হয় ওই নূরের তাজাল্লী তথা আলোকোচ্ছ্বটার, যে নূর ব্যতিরেকে সেটি আবির্ভূত হতে অক্ষম ছিল। ওই নূর সেই গোলকের ভেতরে আলো বিচ্ছুরণ করে এবং ছিদ্রগুলো দিয়ে গোলকের বাইরে প্রসারিত হয়। অতঃপর আল্লাহ পাক সেই বলয়কে  ‍ঘুরতে আদেশ করেন এবং সেটির অভ্যন্তরভাগের সকল স্তরকেও ঘুরতে আদেশ করেন; এটি এমন-ই এক বিস্ময়কর ব্যবস্থা যা সর্বজ্ঞানী ও অতুলনীয় স্রষ্টার এক মহা-পরিকল্পনা ছাড়া কিছু নয়। অতঃপর ছিদ্রগুলো একে অপরের সাথে ঘাত-প্রতিঘাতরত হয় এবং সেগুলোর মধ্য দিয়ে প্রসারিত আলোও তাতে রত হয়; এমতাবস্থায় হয় আলো ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে ওপরে যা আছে তার সাথে গিয়ে মেশে, নয়তো এর বিপরীতে ছিদ্রটির পাশে যা আগমন করে তার মধ্য দিয়ে আলো বের হতে না পারলে আগত ওই বস্তু-ই ছিদ্রটিকে বন্ধ করে দেয়। শেষোক্ত ক্ষেত্রে সেই ছিদ্র দিয়ে আলো বের হবার পথ-ই বন্ধ হয়ে যায়। যাঁর ওপর ওই নূর কিরণ ছড়ান, তিনি আশীর্বাদধন্য ও আলোকিত, আর যে ব্যক্তি তা (আলোপ্রাপ্তি) থেকে রহিত, সে হতভাগা ও অন্ধকারে নিমজ্জিত। এভাবেই ঈমানদারী ও কুফরীর আবির্ভাব ঘটে; সেই সাথে সেসব বিষয়েরও আবির্ভাব হয়, যেগুলো প্রকাশ্যে বা গোপনে, প্রতিটি যুগে আল্লাহর ইচ্ছায় (কাউকে) ওই দু’টোর (ঈমানদারী বা কুফরীর) যে কোনো একটির দিকে ধাবিত করে। সবাই ওই নূর হতে সেই পরিমাণ-ই গ্রহণ করেন, যতোখানি তাঁদের জন্যে (ঐশীভাবে) বরাদ্দ করা হয়েছে। অতএব, তুমি দেখতেই পাচ্ছো যে সবাই তাঁর (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের) কাছ থেকে এসেছেন এবং তাঁর নূর হতে নিজ নিজ নূর গ্রহণ করছেন……।”

আল্লাহর রহমতে এটি এক্ষণে সুস্পষ্ট যে, ‘নূরিহী’ (তাঁর জ্যোতি) বাক্যটিতে ‘হু’ (তাঁর) যমীর (সর্বনাম) দ্বারা নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-কে উদ্দেশ্য করা হয়েছে ‘এসতেখদাম’ তথা দ্ব্যর্থবোধক অর্থ প্রয়োগ পদ্ধতির সাহায্যে, যেটি ব্যাকরণ বিশেষজ্ঞদের ব্যবহৃত শব্দের এক ধরনের আলঙ্কারিক প্রয়োগ বটে। তবে এ কথা বলা উচিত হবে না যে এখানে ব্যবহৃত ‘নূর’ শব্দটি এবং ‘তোমার নবী (দ:)-এর নূর’ বাক্যটিতে উদ্দেশ্যকৃত প্রথম ’নূর’ একই; এতে ধারণা জন্মাবে যে কোনো বস্তু আপনাআপনি বা নিজ হতেই সৃষ্টি লাভ করতে সক্ষম। (পক্ষান্তরে) আমরা যা বলি তা হলো, ‘মিন নূরিহী’ (‘তাঁর জ্যোতি হতে’) বাক্যটিতে ’মিন’ (’হতে’) শব্দটি বয়ানিয়্যা তথা ব্যাখ্যামূলক, যার মানে “নূরু নাবিইয়্যিকা আল্লাযি হুয়া নূরুহ” (’তোমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নূর, যার মধ্যে তিনি নিজেই নূর’)। এটি নিশ্চয় ”তাব’এদিয়্যা” তথা সমষ্টির অংশ-নির্দেশক শব্দ নয়। আপনারা এ কথাও বলতে পারেন যে ‘তাঁর’ সর্বনামটি সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাককে উদ্দেশ্য করে, যার দরুন ‘নূর’ সৃষ্ট হলেও আল্লাহর সাথে তেমনিভাবে সম্পর্কিত, যেমনটি আল-কুরআনের আয়াতে ঘোষিত হয়েছে – “এ তো আল্লাহর সৃষ্ট” (৩১:১১)। অতএব, এটি আল্লাহ পাকের সাথে ’এযাফত’ তথা সম্বন্ধযুক্ত এবং সৃষ্ট ওই নূর আপনাদের নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এরই নূর, অন্য কিছু নয়।

প্রশ্ন করা হতে পারে, যে কোনো সৃষ্ট বস্তু-ই স্থান ও কাল দ্বারা আবদ্ধ; মানে স্থান-কাল সৃষ্টির জন্যে বাধ্যতামূলক। এতে আগেভাগে ধরে নেয়া হতে পারে যে স্থান-কাল সৃষ্টির সাথে, অথবা তারও আগে বিদ্যমান; যদিও এক্ষেত্রে মহানবী (দ:)-কে সর্বপ্রথম সৃষ্টি করা হয়েছে বলেই বর্ণনা এসেছে। এটি কীভাবে সম্ভব? জবাবে আমরা বলি, স্থান-কাল রাসূলুল্লাহ (দ:)-এর ছায়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যাঁকে ছাড়া ওগুলো গঠিত হতেই পারতো না। মহানবী (দ:) তাঁর দিব্যদৃষ্টি দ্বারা নিজ ছায়া থেকে সেগুলোর গঠন প্রত্যক্ষ করেন এবং আবর্তমান সর্বব্যাপী বলয়ের মাধ্যমে স্থান-কালের গতি-ও তিনি দর্শন করেন। এভাবেই আমরা উপলব্ধি করি খোদায়ী দয়ার্দ্রতা ও দানশীলতায় ভরা উচ্চ মকামে তাঁর অধিষ্ঠানের (ঐশী) ঘোষণাকে: “হে মাহবূব! আপনি কি আপন রব্ব (প্রভু)-কে দেখেননি, তিনি কীভাবে সম্প্রসারিত করেছেন ছায়াকে? এবং তিনি যদি ইচ্ছে করতেন, তবে সেটিকে স্থির করে দিতেন; অতঃপর আমি সূর্যকে সেটির ওপর দলীল (চালনাকারী) করেছি” (সূরা ফোরকান, ৪৫ আয়াত; মুফতী আহমদ এয়ার খান কৃত ’নূরুল এরফান’)। আল্লাহতা’লা এই আয়াতে রাসূলে করীম (দ:)-কে সেসব বিষয় সম্পর্কে বলেছেন যেগুলো তিনি দেহের সাথে রূহ (আত্মা)-এর একত্রিকরণের সময় তাঁর উচ্চ-মকামে অবস্থান করে প্রত্যক্ষ করেছিলেন; আর এই ঘটনা তিনি যখন সম্পূর্ণভাবে রূহ ছিলেন, তখনকার অবস্থা স্মরণ করার জন্যেই উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, নূরে মোহাম্মদী (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) অস্তিত্বশীল হওয়ার সাথে সাথে এমন মেধা ও উপলব্ধি-ক্ষমতা প্রাপ্ত হন যে আল্লাহ পাক তাঁকে যা কিছুই প্রদর্শন করেছিলেন, তার সবই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। নিশ্চয় তিনি তখন একেবারে একাকী তাঁর প্রভু খোদাতা’লার সান্নিধ্যে ছিলেন ওই মহান দরবারে, যখন কোনো কিছুরই সৃষ্টি হয়নি – না আদম (আ:)-এর সৃষ্টি, না অন্য কোনো সত্তার, যেমনটি তিনি স্বয়ং একটি হাদীসে ইঙ্গিত করেছেন, “আমি তখনো নবী ছিলাম, যখন আদম (আ:) নিজ রূহ এবং দেহের মধ্যবর্তী অবস্থানে ছিলেন” [হযরত আবূ হোরায়রাহ (রা:) হতে আত্ তিরমিযী (রহ:) কৃত ‘সুনান’ (ফযল আন্ নবী রচিত ’মানাকিব’: হাসান সহীহ গরিব) এবং আত্ তাহাবী প্রণীত ‘শরহে মুশকিল আল-আসা’র’(১৫:২৩১ #৫৯৭৬); হযরত মায়সারাত আল-ফাজর (রা:) হতে ইমাম আহমদ (রহ:) রচিত ’মুসনাদ’ (৩৪:২০২ #২০৫৯৬), আল-হাকীম লিখিত ‘মোসতাদরাক’ (২:৬০৮-৯), আত্ তাবারানী (রহ:) কৃত ‘আল-মো’জাম আল-কবীর’ (২০:৩৫৩ #৮৩৩-৪) এবং অন্যান্য; হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে আত্ তাবারানী (রহ:) প্রণীত ‘আল-মো’জাম আল-আওসাত’ (৪:২৭২ #৪১৭৫) এবং ‘আল-মো’জাম আল-কবীর’ (১২:৯২ #১২৫৭১); এবং হযরত আবূল জাদা’আ (রা:) হতে ইবনে সা’আদ রচিত ‘তাবাকাত’ (১:১২৩)]। ওই সময় মহানবী (দ:) নিজ মহান ছায়ার প্রতি বর্ষিত তাঁরই প্রভুর সমস্ত দান প্রত্যক্ষ করেছিলেন, এবং তার (পবিত্র ছায়ার) সম্প্রসারণ এবং তা হতে সমগ্র সৃষ্টির উৎপত্তি হবার ঘটনার সাক্ষীও তিনি হয়েছিলেন। আল্লাহতা’লা উক্ত আয়াতে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতেই যেন বলেছেন, “হে মাহবূব! আপনি কি আপন রব্ব (প্রভু)-কে দেখেননি, তিনি কীভাবে সম্প্রসারিত করেছেন ছায়াকে?” কেননা, তিনি-ই নিজ প্রভুকে এবং তাঁর দ্বারা সেই ছায়া সম্প্রসারণের ক্রিয়া-পদ্ধতিকে প্রত্যক্ষ করেছেন, যে ছায়া দ্বারা সকল সৃষ্টি গঠিত হয়েছিল। অতএব, আমাদের মহানবী (দ:) উভয় ধরনের (সাক্ষ্য) বহন করছেন, যথা – আল্লাহতা’লা সম্পর্কে সাক্ষ্য এবং সৃষ্টিকুলসম্পর্কিত সাক্ষ্য, এমন এক পর্যায়ে এই দর্শনক্ষমতা তাঁর প্রতি প্রদত্ত হয় যা তিনি ছাড়া আর কেউ প্রত্যক্ষ করেননি। তাঁর নিজস্ব বাস্তবতা তিনি ছাড়া আর কেউই এতো ভালভাবে জানতে সক্ষম হননি। তাই তিনি এরশাদ ফরমান, “লা এয়ারিফুনী হাকীকাতান্ গায়রু রাব্বী”; মানে “আমার প্রভু ছাড়া আমাকে কেউই চেনে না” [’এই বর্ণনা আমি পাইনি’ – ড: হাদ্দাদ]। ইবনে মাশীশ (রহ:)-এর বাণীতে এ কারণে তাঁকে ’সবচেয়ে বড় পর্দা’ অভিহিত করে বলা হয়েছে, ‘সবচেয়ে বড় পর্দাকে আমার আত্মার প্রাণরূপে পরিণত করুন।’

মহানবী (দ:), তাঁর আহলে বায়ত (রা:) ও আসহাবে কেরাম (রা:)-এর প্রতি শান্তি ও আশীর্বাদ বর্ষিত হোক, আমীন।

-আস্ সুন্নাহ ফাউন্ডেশন অফ আমেরিকা ২০১২         

মাযহাব নিয়ে এক ওহাবীর মিথ্যাচারের জবাব

Standard

অভিযোগঃ এক
____________________
“কথা বলার ইচ্ছাই ছিল না কারন সভ্য ও বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের সাথে কথা বলা যায় কিন্তু এরা এমন অন্ধকার বিশ্বাসে নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছে যে এদের সাথে কথা বললে নিজেকেও ওদের মতই তৈরি করতে হবে যা আমি কখনই পারবনা কারন কোরানের বিরুধীতা করা কোন ঈমানদারের কাজ নয়”।
জবাবঃ
১/উদর পিন্ড বুধোর ঘাড়ে চাপানোর নির্লজ্জ প্রচেস্টা। নিজেকে সভ্য দাবী করা হচ্ছে, অথচ কুল্লু শাই ইন ইয়ারজি উ ইলা আসলিহী। যে আসল থেকে আপনার পরিচয় প্রকাশ, যে আপনার গুরু, সেই ছিল একটা মস্ত বড় অসভ্য। কোন সভ্য মানুষ মুসলমানদেরকে আমভাবে গালি দিতে পারেনা। মুহাম্মাদ বিন আব্দিল ওয়াহাব নজদী, মানে মাযহাব অস্বীকার কারীদের কথিত শায়েখ যাকে তারা পুজা করে থাকে, এ লোকটি সাধারণ মুসলমানদেরকে কাফির মুশরিক বলেছে। এমনকি সাহাবীদেরকে ও মুশরিক বলে ফতোয়া দিয়েছে। তো যে লোকটি এমন অসভ্যের মত কথা বলতে পারে, তাকে যারা অনুসরণ করে বললে ভুল হবে, পুজা করে, তারা সভ্য, না?
২/ “এরা এমন অন্ধকার বিশ্বাসে নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছে”-
এটা তো নজদী পূজারীদেরকে বলতে হয়। তারা যেভাবে তার কথাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে, কোর’আন ও সহীহ হাদীসের প্রমাণ দেয়ার পরও যারা তাদের গুরুকে ছাড়তে নারাজ, মূলত তারাই এমন অন্ধকার বিশ্বাসে নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছে।
৩/ “কোরানের বিরুধীতা করা কোন ঈমানদারের কাজ নয়”।
যারা তাফসীর ছাড়া সরাসরি কোর’আনে কারীমের আয়াত থেকে অর্থ গ্রহণ করে, তারা নাকি আবার কোর’আনে কারীমকে অনুসরণ করে!! যারা কোর’আনে কারীমের আয়াতের অর্থ তাফসীর ছাড়া গ্রহণ করে, তারাই কোর’আনে কারীমের বিরোধিতা করে। আমরা এমন কাজ কখনো করিনা। যে কোন আয়াতের অর্থ মুফাসসিরীনে কেরামের তাফসীর অনুসারে গ্রহণ করে থাকি। তাই “কোরানের বিরুধীতা করা কোন ঈমানদারের কাজ নয়”। এ কথাটি আমাদের জন্য। নজদীভক্তরা একথার উপর আমল করে না-এটা প্রমাণিত।

অভিযোগঃ দুই
______________________
“কথায় কথায় গালি দেয়া মুনাফিকের স্বভাব এটা মনে হয় আপনাদের অজানা। মুখ আমারও আছে গালি আমিও জানি কিন্তু আমার মধ্যে আরো একটা জিনিস আছে তা হল তাকওয়া”।
জবাবঃ
১/ আমরা কথায় কথায় গালি দেয়াকে বিশ্বাস করিনা। কিন্তু যে গালি পাবার উপযুক্ত তাকে ছেড়ে কথা বলিনা। এটা তার প্রাপ্য। যার যা প্রাপ্য, তাকে তা দিতে হবে। এবং আমাদের সে সমালোচনার পিছনে থাকে আল্লাহর সন্তুস্টি।
প্রমাণ,
عن أبي أمامة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم :
” من أحبَّ لله، وأبغض لله، وأعطى لله، ومنع لله، فقد استكمل الإيمان .”
سـنـن أبـي داود.
আর এটাই তাকওয়ার পরিচয়। আর এ তাকওয়া আমরা দীলে পোসণ করে থাকি। কারণ এর পেছনে দুনিয়াবী কোন উদ্দেশ্য নেই।
২/ইসলামে ক্ষেত্র বিশেষে সমালোচনার জন্য বিশেষ শব্দ প্রয়োগ করার বিধান রয়েছে । যেমন কাউকে কুকুর বলা। যদি তার মধ্যে বিশেষ দোষ পাওয়া যায়, তবে তাকে জাহান্নামের কুকুর বলার বিধান রয়েছে।
প্রমাণ,
عن ابن أبي أوفى رضي الله عنه؛ قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم :
(( الخوارج كلاب النار )).

صحيح ابن ماجة 143
এই যামানার খারেজী হলো তারা যারা মুহাম্মাদ বিন আব্দিল ওয়াহাব নজদী, মতিউর রাহমান নজদীদের অনুসরণ করছে। এরা যে খারেজী, তা প্রমাণিত। কারণ তারা কাফির মুশরিকদের উপর নাযিল হওয়া আয়াতকে মুসলমানদের উপর চাপানোর ঘৃণ্য পায়তারা করেছে, এবং এখনো করছে। এদেরকে যারা অনুসরন করছে, তারা খারেজীদের দলভুক্ত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন যদি এদেরকে প্রত্যক্ষ প্রমাণ সাপেক্ষে “জাহান্নামের কুকুর” বলা হয়, তবে সেটা হবে হাদীস সম্মত, যদিও তা শুনে নজদীভক্তদের গায়ের চুলকানী চরমাকার ধারণ করে। দুঃখিত, আমাদের এখানে কিছু করার নেই। নিজের কর্মফল নিজেকেই পেতে হবে।
অন্য হাদীসে যারা ইমামের আগে রুকুতে যায়, তাদের মাথার সাথে গাধার মাথার তুলনা করা হয়েছে।
প্রমাণ,
عن محمد بن زياد سمعت أبا هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم قال أما يخشى أحدكم أو لا يخشى أحدكم إذا رفع رأسه قبل الإمام أن يجعل الله رأسه رأس حمار أو يجعل الله صورته صورة حمار

সহীহ আল বুখারী।
অন্যান্য হাদীসে ক্ষেত্র বিশেষে কাউকে শয়তানের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
সুতরাং ক্ষেত্রবিশেসে কাউকে প্রমাণ সাপেক্ষে গালি দেয়া দোষের বিষয় নয়। আমরা জানি, নজদীরা অন্যকে মুশরিক বেদ’আতী বলে অবলীলায় গালি দিতে পারে, কিন্তু তাদেরকে গালি দিলে নিজের আত্মসম্মানে ঘা লাগে। তেলে বেগুনে জলে উঠে।

অভিযোগঃ তিন
_________________________
“এতই যদি নিজেদের সত্যবাদী ভাবেন তবে নিচের লিখিত প্রতিটি কথা ও আয়াতের ভুল প্রমান করুন।
আল্লাহ বলেন, নিশ্চয় যারা স্বীয় ধর্মকে খন্ড-বিখন্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে তাদের সাথে আপনার কোন সর্ম্পক নেই। তাদের ব্যাপার আল্লাহ তা’আয়ালার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দেবেন যা কিছু তারা করে থাকে। (আন-আম-১৫৯) এখানে আল্লাহ স্পষ্ট ভাষায় বলছেন, যারা ধর্মের মধ্যে নানা মতের সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়, হে নবী তাদের কোন দায়িত্ব আপনার নেই। তাদের বিষয় আল্লাহর জানা আছে এবং তাদের কৃতকর্মের কথা আল্লাহ তাদেরকে জানিয়ে দিবেন। তার মানে ইসলামে মাযহাব বা দল তৈরি করা সম্পুর্ন হারাম যা আল্লাহ পবিত্র কোরানের বহু জায়গায় বর্ণনা করেছেন”।

জবাবঃ
________________________
আয়াতটি হচ্ছে
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ ۚ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ (159
তো, ওয়াহাবী, মাযহাব অস্বীকার কারীরা বলতে চায়, এ আয়াত দ্বারা বুঝাচ্ছে যে মুসলমানদের মধ্যে মাযহাবের অনুসারীরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। মানে তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতই না, তাইতো? কারণ তারা মাযহাবের মত হারাম কাজ করেছে।
আগেই বলেছি, এই ফেতনাবাজরা কোর’আনে কারীমের তাফসীর অবজ্ঞা করে নিজের মনগড়া কথা কোর’আনে কারীমের আয়াতের সাথে জোড়া লাগিয়ে দেয়। আর এটা তাদের রূহানী বাবার অভ্যাস থেকে প্রাপ্ত।
চলুন, আয়াতটির তাফসীর একটু দেখে নেই। মুফাসসিরগণ এ আয়াতের তাফসীরে কী বলেছেন,

তাফসীরে ইবনে কাসীরঃ
________________
বিশ্ববিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবনু কাসীরে বলা হয়েছে,
عن ابن عباس في قوله : ( إن الذين فرقوا دينهم وكانوا شيعا ) وذلك أن اليهود والنصارى اختلفوا قبل أن يبعث محمد صلى الله عليه وسلم ، فتفرقوا . فلما بعث الله محمدا صلى الله عليه وسلم أنزل : ( إن الذين فرقوا دينهم وكانوا شيعا لست منهم في شيء )

ইমাম ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াতের তাফসীর করেছেন সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার প্রদত্ত তাফসীর অনুযায়ী। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন, এ আয়াতটি নাযিল হয়েছে ইয়াহুদী নাসারাদের সম্পর্কে যারা ইতোপূর্বে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আর এদের ব্যাপারে আল্লাহ রাসুল (সা) কে বলেহছেন, তাদের সাথে আপনার কোন সম্পর্ক নেই কোন বিষয়ে।

এবার আসুন দেখে নেই,
ইয়াহুদী নাসারাদের বিবাদ কেমন ছিল?
তারা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে নিয়ে বিবাদ করেছিল এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

প্রমাণ,
সীরাতে ইবনু হিশামে উল্লেখ করা হয়েছে,
قال أحبار يهود ونصارى نجران ، حين اجتمعوا عند رسول الله – صلى الله عليه وسلم – فتنازعوا ، فقالت الأحبار : ما كان إبراهيم إلا يهوديا ، وقالت النصارى من أهل نجران : ما كان إبراهيم إلا نصرانيا
নাজরানের ইয়াহদী ও খ্রিস্টানদের আহবারগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে সমবেত হলো। অতঃপর ইয়াহুদীগণ বললো, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ইয়াহুদী ছিলেন। নাসারাগণ বলে উঠলো, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) খ্রীস্টান ছিলেন।
রেফারেন্সঃ
السيرة النبوية لابن هشام
من اجتمع إلى يهود من منافقي الأنصار
اختلاف اليهود والنصارى في إبراهيم عليه السلام

এবার ভাবুন,
যে আয়াতটি বিধর্মীদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে, যারা স্বয়ং ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছিল এবং পরিণতিতে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আর এ আয়াত কিনা মাযহাবের বিরুদ্ধে দাঁড় করার ঘৃণ্য সড়যন্ত্র মূলক পায়তারা ওয়াহাবীরা মানে মুহাম্মাদ বিন আব্দিল ওয়াহাব নজদীরা করছে।
কী বলবেন এদেরকে?

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের কথা মানবো ? না চটি বই পড়ুয়া ওয়াহাবী দুস্টের কথা মানবো?
______________________________
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা, যার সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দোয়া করেছিলেন, اللهم فقهه في الدين وعلمه التأويل তিনি এ আয়াতের মর্মার্থ বুঝলেন বেশী? না ফেতনাবাজ ওয়াহাবীরা বুঝলো বেশী? সমস্যাটা এ জায়গায়। তারা নিজেকে অতি পন্ডিত মনে করে, কিন্তু তাদের ভেতর যে সদরঘাট, তারা তা বুঝতে পারেনা, আর পারবে কী করে? তারা যে অন্ধকার বিশ্বাসে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছে!

মদীনাবাসীর ইমামের অনুসরণঃ
______________________
একদল মদিনাবাসী হযরাত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে মাসআলা জিজ্ঞেস করলেন যে, ফরয তাওয়াপের পর বিদায়ী তাওয়াফের আগে যদি কোন মহিলার ঋতুস্রাব শুরু হয় তাহলে কি করবে?
উত্তরে তিনি বললেন,
বিদায়ী তাওয়াফ না করে মক্কা শরীফ ত্যাগ করতে পারবে ।
মদিনাবাসি যাইদ বিন সাবিতের অনুসরণ করতেন। তাই তারা বললেন, আমরা যাইদ বিন সাবিতকে উপেক্ষা করে আপনার কথা মানতে পারিনা। যেহেতু আপনার ফাতওয়া তাঁর বিপরীতে ।
রেফারেন্সঃ
সহীহ আল-বুখারি-২/৫৪১

সম্মানিত পাঠক,
লক্ষ্য করুন। এঘটনার পর মুফাসসিরীনদের প্রধান হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা কিন্তু বলেননি, তোমরা তো এভাবে একেকজনকে অনুসরণ করে বিভক্তি সৃষ্টি করছ? কোর’আনে কারীমে নিষেধ করা হয়েছে।
অথচ তিনি সেটা করেননি, বরং যায়েদ বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি পরে বুঝিয়ে বলেছিলেন। কিন্তু মদীনাবাসীগণকে তিনি কিছুই বলেননি।
মানে কি দাঁড়ালো?
সাহাবীদের যামানায় একেকজন সাহাবীকে একেক দল মুসলমান অনুসরণ করতেন, শুধু তাই নয়, একেকদল তাদের ইমামের ফতোয়া ছাড়া অন্য কোন ইমামের ফতোয়া মানতেন না।

ওয়াহাবীদের ইমাম ইবনুল কায়্যিম এর কথাঃ
সাহাবায়ে কেরামের সময় ইমামদের অস্তিত্ব ছিলঃ
_____________________________________
তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরামের যামানায় চার জন ইমাম ছিলেন, যাদেরকে সকল মুসলমান অনুসরণ করতেন। তিনি বলেন,
والدين والفقه والعلم انتشر في الأمة عن أصحاب ابن مسعود ، وأصحاب زيد بن ثابت ، وأصحاب عبد الله بن عمر ، وأصحاب عبد الله بن عباس ، فعلم الناس عامته عن أصحاب هؤلاء الأربعة ، فأما أهل المدينة فعلمهم عن أصحاب زيد بن ثابت وعبد الله بن عمر ، وأما أهل مكة فعلمهم عن أصحاب عبد الله بن عباس ، وأما أهل العراق فعلمهم عن أصحاب عبد الله بن مسعود

রেফারেন্সঃ
ই’লামুল মুয়াক্কিয়ীন
ইবনুল কায়্যিম আল জাওযী
খন্ড-১, পেইজঃ১৭

অর্থাৎ, এই উম্মতের মধ্যে দ্বীন, ফিকহ, এবং ইলিম চারজন সাহাবী থেকে প্রসার লাভ করেছেঃ
১/ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর অনুসারীদের থেকে।
২/যায়েদ বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহুর অনুসারীদের থেকে।
৩/আব্দুল্লাহ বিন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার অনুসারীদের থেকে।
৪/আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার অনুসারীদের থেকে।
সমগ্র মানুষ জ্ঞান লাভ করেছে এই চারজন সাহাবীদের অনুসারীদের থেকে।
১/ মদীনাবাসীরা জ্ঞান লাভ করেছেন যায়েদ বিন সাবিত ও আব্দুল্লাহ বিন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমার অনুসারীদের থেকে।
২/ মক্কাবাসীরা জ্ঞান লাভ করেছে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহ্মার অনুসারীদের থেকে।
৩/ ইরাকবাসীরা জ্ঞান লাভ করেছে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর অনুসারীদের থেকে।

ভাবুন,
________
চার সাহাবী থেকে চার চারটি বিশাল দল! তাও আবার একেক দল একেকজনকে অনুসরণ করতেন। অন্যজনের ফতোয়া মানতেন না।

তাহলে প্রশ্ন জাগে,
____________
১/সাহাবীরা কি বুঝতে পারলেন না, হায়, দীনের নামে চারটি বিভক্তি চলে এসেছে। এটা হারাম। কোর’আনে কারীমে বিভক্তি সৃষ্টি হারাম করা হয়েছে সূরা আন’আমে–?
২/ এই চার সাহাবী কেন একসাথে মিলে এ বিভক্তি দূর করলেন না?
৩/ তাহলে ওয়াহাবীদের শয়তানী ও ভ্রান্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী তারা সকলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই বিভক্তি সৃষ্টি করার কারণে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন?
৪/ এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে সাহাবীদের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ালো?

আপনি কি জানেন?
ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ নিজে শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেনঃ
_____________________________________
এই বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাসীরের গ্রন্থকার যিনি এই আয়াতের তাফসীর করেছেন, তিনি নিজেও শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। এই আয়াতটি দ্বারা যদি মাযহাব হারাম হত, তবে তিনি কীভাবে মাযহাবের অনুসারী ছিলেন?

প্রমাণঃ
_____
ওয়াহাবীদের এক শায়েখ ইমাম যাহাবী উল্লেখ করেছেন, ইমাম ইবনু কাসীর শাফেয়ী ছিলেন। তিনি বলেন,
” إسماعيل بن عمر بن كثير : الإمام ، الفقيه ، المحدث الأوحد ، البارع ، عماد الدين البصروي الشافعي ، فقيه متقن ، ومحدث متقن ، ومفسر نقال ، وله تصانيف مفيدة ، يدري الفقه ، ويفهم العربية والأصول ، ويحفظ جملة صالحة من المتون والتفسير والرجال وأحوالهم ، سمع مني ، وله حفظ ومعرفة ” انتهى .
“معجم المحدثين” (1/56) .
তো তিনি কি কোর’আনে কারীমের এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বুঝতে পারলেন না যে মাযহাব অনুসরণের কারণে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তাঁর আর কোন সম্পর্ক থাকছেনা? তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন?

তাফসীরে কুরতুবী থেকে আয়াতটির তাফসীরঃ
____________________________
ইমাম কুরতুবী রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে বলেন,
এখানে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে দ্বীন থেকে বের হয়ে যাওয়া। তিনি বলেন,
على معنى أنهم تركوا دينهم وخرجوا عنه
তারপর তিনি বলেন, এই আয়াত দ্বারা ইয়াহুদী ও নাসারাদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। তিনি বলেন,
والمراد اليهود والنصارى في قول مجاهد وقتادة والسدي والضحاك
আর এ কথার সমর্থনে তিনি কোর’আনে কারীমের অন্য আরেকটি আয়াত উল্লেখ করেন, আর তা হচ্ছে-
وما تفرق الذين أوتوا الكتاب إلا من بعد ما جاءتهم البينة
সুতরাং তিনি প্রমাণ করেছেন, এ আয়াতটি ইয়াহুদী ও নাসারাদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।
দেখুন, তিনি এই আয়াতের তাফসীর করতে গিয়ে ও কি বুঝতে পারলেন না যে এই আয়াত দ্বারা মাযহাব হারাম করা হয়েছে। কারণ মাযহাব অনুসরণ করলে মানুষ দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে?

আপনি কি জানেন?
ইমাম কুরতুবী মালিকী মাযহাবের ছিলেনঃ
_______________________
অথচ তিনি মালেকী মাযহাব অনুসরণ করতেন!!
প্রমাণ নেবেন?
কিতাবটি পড়ুন, এখানে প্রমাণ রয়েছে, তিনি মালেকী মাযহাব অনুসরণ করতেন।
কিতাবের নামঃ
১/মানযুমাতুল কুরতুবী ফিল ইবাদাতি ‘আলা মাযহাবিল ইমামিল মালিকি।
শায়েখ ইয়াহইয়া আল কুরতুবী।
২/ আত তাফসীরু ওয়াল মুফাসসিরূন
মুহাম্মাদ আয যাহাবী।

অভিযোগঃ চার
_______________________
“তো ভাইয়েরা এরপরেও যে আল্লাহর আয়াত অমান্য করবে তার ব্যপারে আমার আর কিছুই বলার নাই । সে যে কেমন বান্দা তা সকল জ্ঞানীরা বুঝে যাবেন”।

জবাবঃ
_____________________
অলরেডী প্রমাণিত হয়ে গেছে, ওয়াহাবীদের ধান্ধা কী? ওয়াহাবীরা যে কত বড় ফেতনাবাজ, তা সকল জ্ঞানীরা বুঝে যাবেন।

অভিযোগঃ পাঁচ
_____________________
তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হইও না যারা আল্লাহর শরীক উপাসনা করে। আর তাদের মত হইও না যারা দ্বীনের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয় আর প্রত্যেক দলই উল্লাস করে যে তারা সত্যের পথে আছে।
(সুরা রুম- ৩১ ও ৩২)

জবাবঃ
আয়াতটি হচ্ছে,
وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ – مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ-
মূলতঃ এ আয়াতটি আগের আয়াতটির কথাই বলছে। একই মাফহুম। এখানেও মুশরিকদের কথা বলা হয়েছে।

চলুন, তাফসীর দেখে নেই। আমরা তো আর ওয়াহাবীদের মত স্বঘোষিত পন্ডিত না যে তাফসীর অনুসুরণ না করেই মনগড়া কোর’আনে ব্যাখ্যা করে ফেলবো।

তাফসীরে ইবনু কাসীরঃ
_____________________

ইমাম ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ এ আয়াতের তাফসীরে বলেন,
وَقَوْله تَعَالَى ” مِنْ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينهمْ وَكَانُوا شِيَعًا كُلّ حِزْب بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ ” أَيْ لَا تَكُونُوا مِنْ الْمُشْرِكِينَ الَّذِينَ قَدْ فَرَّقُوا دِينهمْ أَيْ بَدَّلُوهُ وَغَيَّرُوهُ وَآمَنُوا بِبَعْضٍ وَكَفَرُوا بِبَعْضٍ وَقَرَأَ بَعْضهمْ فَارَقُوا دِينهمْ أَيْ تَرَكُوهُ وَرَاء ظُهُورهمْ وَهَؤُلَاءِ كَالْيَهُودِ وَالنَّصَارَى وَالْمَجُوس وَعَبَدَة الْأَوْثَان وَسَائِر أَهْل الْأَدْيَان الْبَاطِلَة مِمَّا عَدَا أَهْل الْإِسْلَام كَمَا قَالَ تَعَالَى ” إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينهمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْت مِنْهُمْ فِي شَيْء إِنَّمَا أَمْرهمْ إِلَى اللَّه ” الْآيَة فَأَهْل الْأَدْيَان قَبْلنَا اِخْتَلَفُوا فِيمَا بَيْنهمْ عَلَى آرَاء وَمُثُل بَاطِلَة . وَكُلّ فِرْقَة مِنْهُمْ تَزْعُم أَنَّهُمْ عَلَى شَيْء وَهَذِهِ الْأُمَّة أَيْضًا اِخْتَلَفُوا فِيمَا بَيْنهمْ عَلَى نِحَل كُلّهَا ضَلَالَة إِلَّا وَاحِدَة وَهُمْ أَهْل السُّنَّة وَالْجَمَاعَة الْمُتَمَسِّكُونَ بِكِتَابِ اللَّه وَسُنَّة رَسُوله صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبِمَا كَانَ عَلَيْهِ الصَّدْر الْأَوَّل مِنْ الصَّحَابَة وَالتَّابِعِينَ وَأَئِمَّة الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَدِيم الدَّهْر وَحَدِيثه كَمَا رَوَاهُ الْحَاكِم فِي مُسْتَدْرَكه أَنَّهُ سُئِلَ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ الْفِرْقَة النَّاجِيَة مِنْهُمْ فَقَالَ ” مَنْ كَانَ عَلَى مَا أَنَا عَلَيْهِ الْيَوْم وَأَصْحَابِي”

অর্থাৎ (এ আয়াতটির মর্মার্থ হচ্ছে) তোমরা মুশরিকদের মত হয়োনা, যারা তাদের দীনকে পরিবর্তন করেছে, কিছু অংশের উপর ঈমান এনেছে আর কিছু অংশকে অস্বীকার করেছে। (সংক্ষেপিত)
আর তারা হচ্ছে ইয়াহুদী, নাসারা, অগ্নিপূজক, মূর্তিপূজক এবং আহলে ইসলাম ব্যতীত অন্য সকল বাতিল ধর্মের অনুসারীগণ। যেমন আল্লাহ (অন্য আয়াতে) বলেছেন,
إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينهمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْت مِنْهُمْ فِي شَيْء إِنَّمَا أَمْرهمْ إِلَى اللَّه
(এ আয়াতের আলোচনা ইতোমধ্যে করা হয়েছে, নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই।)

এ আয়াতটি মাযহাবের বিপক্ষের নয়, বরং পক্ষের দলীলঃ
______________________________
ইমাম ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
وَكُلّ فِرْقَة مِنْهُمْ تَزْعُم أَنَّهُمْ عَلَى شَيْء وَهَذِهِ الْأُمَّة أَيْضًا اِخْتَلَفُوا فِيمَا بَيْنهمْ عَلَى نِحَل كُلّهَا ضَلَالَة إِلَّا وَاحِدَة وَهُمْ أَهْل السُّنَّة وَالْجَمَاعَة الْمُتَمَسِّكُونَ بِكِتَابِ اللَّه وَسُنَّة رَسُوله صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبِمَا كَانَ عَلَيْهِ الصَّدْر الْأَوَّل مِنْ الصَّحَابَة وَالتَّابِعِينَ وَأَئِمَّة الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَدِيم الدَّهْر وَحَدِيثه كَمَا رَوَاهُ الْحَاكِم فِي مُسْتَدْرَكه أَنَّهُ سُئِلَ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ الْفِرْقَة النَّاجِيَة مِنْهُمْ فَقَالَ ” مَنْ كَانَ عَلَى مَا أَنَا عَلَيْهِ الْيَوْم وَأَصْحَابِي

এদের প্রত্যেকটি দল দাবী করে, তারা সত্যের উপর বিদ্যমান। এবং এই উম্মতের অবস্থা ও এমন যে, তারা নিজেদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি করে। এদের প্রত্যেকেই পথভ্রষ্ট। শুধুমাত্র একটি দলই সঠিক পথপ্রাপ্ত। আর সেটি হচ্ছে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আত।
তারপর তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন,
الْمُتَمَسِّكُونَ بِكِتَابِ اللَّه وَسُنَّة رَسُوله صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبِمَا كَانَ عَلَيْهِ الصَّدْر الْأَوَّل مِنْ الصَّحَابَة وَالتَّابِعِينَ وَأَئِمَّة الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَدِيم الدَّهْر وَحَدِيثه كَمَا رَوَاهُ الْحَاكِم فِي مُسْتَدْرَكه أَنَّهُ سُئِلَ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ الْفِرْقَة النَّاجِيَة مِنْهُمْ فَقَالَ ” مَنْ كَانَ عَلَى مَا أَنَا عَلَيْهِ الْيَوْم وَأَصْحَابِي

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ হচ্ছেন তারা,
১/যারা কোর’আনে কারীমকে আঁকড়ে ধরে থাকে।
২/সুন্নাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আঁকড়ে ধরে থাকে।
৩/সাহাবায়ে কেরামের পথকে আঁকড়ে ধরে থাকে,
৪/তাবেয়ীগণের পথকে আঁকড়ে ধরে থাকে।
৫/এবং মুসলমানদের ইমামগণের পথকে আঁকড়ে ধরে থাকে।
যেমনিভাবে ইমাম হাকিম তাঁর মুসতাদরাক কিতাবে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নাজাত প্রাপ্ত দলের কথা জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, যে পথে আমি এবং আমার সাহাবায়ে কেরাম আছেন, এ পথে যারা থাকবে, (তারাই নাজাতপ্রাপ্ত।)।

তাহলে যা দাঁড়ালো,
যদি কোন কাজ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়গণ করে থাকেন, তা মানা ও অনুসরণ করার মধ্যে নাজাত নিহীত। আর এ অনুসুরণকারীরাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ।

এবার চলুন, মাযহাব নিয়ে আলোচনা করি।

মাযহাব সাহাবায়ে কেরামের যামানায় ছিলঃ
______________________

ইবনু তাইমিয়্যার স্বীকারোক্তিঃ
———————–
সাহাবায়ে কেরামের যামানায় যে মাযহাব বিদ্যমান ছিল, তার সাক্ষ্য দিয়েছেন ওয়াহাবী লা-মাযহাবীদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইমাম, তাদের শায়খুল ইসলাম,ইবনু তাইমিয়্যাহ।
তিনি “মাযাহিবুস সাহাবাহ” অর্থাৎ সাহাবীদের মাযহাব—ঠিক হুবহু এমন শব্দ উল্লেখ করে বলেছেন,

فإن الصحابة والتابعين والأئمة إذا كان لهم في تفسير الآية قول وجاء قوم فسروا الآية بقول آخر لأجل مذهب اعتقدوه وذلك المذهب ليس من مذاهب الصحابة والتابعين لهم بإحسان صاروا مشاركين للمعتزلة وغيرهم من أهل البدع في مثل هذا .

রেফারেন্সঃ
মাজমু উল ফাতাওয়া
কিতাবু মুকাদ্দামাতিত তাফসীরি

তিনি বলেছেন, (সংক্ষেপে)
সাহাবীগণ এবং তাবেয়ীগণের মাযহাব এর বিরুদ্ধে অন্য কোন নতুন মাযহাব অনুসরণ করলে তারা বেদ’আতী বলে গন্য হবে।
লক্ষ্য করুন,
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এখানে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের মধ্য যে মাযহাব বিদ্যমান ছিল, তা তিনি স্পষ্ট ও প্রকাশ্যভাবে বলে দিলেন।

তিনি অন্যস্থানে ও ঠিক এভাবেই সাহাবীদের যে মাযহাব ছিল , তা নির্দ্বিধায় বলেছেন। তিনি বলেছেন,
فصل وأما إذا قال : إن فعلته فعلي إذا عتق عبدي . فاتفقوا على أنه لا يقع العتق بمجرد الفعل ; لكن يجب عليه العتق .

وهو مذهب مالك وإحدى الروايتين عن أبي حنيفة . وقيل : لا يجب عليه شيء وهو قول طائفة من التابعين وقول داود وابن حزم .

وقيل : عليه كفارة يمين وهو قول الصحابة وجمهور التابعين ومذهب الشافعي وأحمد وهو مخير بين التكفير والإعتاق على المشهور عنهما .

وقيل : يجب التكفير عينا ; ولم ينقل عن الصحابة شيء في الحلف بالطلاق فيما بلغنا بعد كثرة البحث وتتبع كتب المتقدمين والمتأخرين ; بل المنقول عنهم إما ضعيف ; بل كذب من جهة النقل وإما ألا يكون دليلا على الحلف بالطلاق ; فإن الناس لم يكونوا يحلفون بالطلاق على عهدهم ; ولكن نقل عن طائفة منهم في الحلف بالعتق أن يجزيه كفارة يمين كما إذا قال : إن فعلت كذا فعبدي حر .

وقد نقل عن بعض هؤلاء نقيض هذا القول . وأنه يعتق .

وقد تكلمنا على أسانيد ذلك في غير هذا الموضع . ومن قال من الصحابة والتابعين : إنه لا يقع العتق فإنه لا يقع الطلاق بطريق الأولى كما صرح بذلك من صرح به من التابعين .

وبعض العلماء ظن أن الطلاق لا نزاع فيه فاضطره ذلك إلى أن عكس موجب الدليل فقال : يقع الطلاق ; دون العتاق وقد بسط الكلام على هذه المسائل وبين ما فيها من مذاهب الصحابة والتابعين لهم بإحسان والأئمة الأربعة وغيرهم من علماء المسلمين وحجة كل قوم في غير هذا الموضع .

المرجع
مجموع الفتاوي
لابن تيمية
الجزء الثاني والثلاثون
كتاب النكاح

ইমাম বুখারীর প্রসিদ্ধ উস্তাদ আলী বিন মাদীনীর কথাঃ
___________________________
তিনি ও ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এর ন্যায় বলেছেন, সাহাবীদের মধ্যে মাযহাব বিদ্যমান ছিল।
আলী বিন মাদীনী রাহিমাহুল্লাহ হচ্ছেন, বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উস্তাদ। তিনি তাঁর কিতাবে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে প্রমাণ করেছেন, সাহাবায়ে কেরামের যুগে মাযহাব বিদ্যমান ছিল।

আলী বিন মাদীনী বলেন,
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মাত্র তিনজন সাহাবী ছিলেন, যাদের মাযহাবকে বাকী সকলে অনুসরণ করতেন।
যে তিনজন সাহাবীর মাযহাবকে অনুসরণ করা হত, তারা হচ্ছেন,
১/ আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু
২/যায়েদ বিন সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু
৩/আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু।
আলী বিন মাদীনী বলেছেন,
এই তিনজন সাহাবীর প্রত্যেকের ছিলেন অনুসারীগণ। একেক দল সাহাবায়ে কেরাম একেক সাহাবীর মাযহাব অনুসরণ করতেন এবং ঐ সাহাবীর ফতোয়া মেনে চলতেন এবং একই ফতোয়া দিয়ে অন্যদেরকে ফতোয়া দিতেন।
রেফারেন্সঃ
কিতাবুল ইলাল
পৃষ্ঠা : ১০৭-১৩৫

তিনি বলেন,

ولم يكن في أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم من له صُحَيْبَةٌ، يذهبون مذهبه، ويفتون بفتواه ويسلكون طريقته، إلا ثلاثة عبد الله بن مسعود وزيد بن ثابت وعبد الله بن عباس رضي الله عنهم، فإن لكل منهم أصحابا يقومون بقوله ويفتون الناس

তাহলে প্রমাণিত হয়ে গেল, সাহাবীদের যামানায় মাযহাব বিদ্যমান ছিল।

মাযহাবের অনুসারীগণই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্তঃ
__________________________________
যেহেতু প্রমাণিত হয়ে গেছে, সাহাবীদের মধ্যে মাযহাব ছিল, এবং পরবর্তীতে তাবেয়ীগণের যামানায় সেটা প্রসার লাভ করেছে। তাই এ মাযহাবকে যারা অনুসরণ করে, মূলতঃ তারা সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণের পথই অনুসরণ করলো।
যেমন ইবনু কাসীর বলেছেন,
الْمُتَمَسِّكُونَ بِكِتَابِ اللَّه وَسُنَّة رَسُوله صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَبِمَا كَانَ عَلَيْهِ الصَّدْر الْأَوَّل مِنْ الصَّحَابَة وَالتَّابِعِينَ وَأَئِمَّة الْمُسْلِمِينَ

এমন প্রমাণ পাওয়ার পর যে সাহাবীদের মাযহাবকে অস্বীকার ও ক্রিটিসাইজ করবে, সে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের লোক নয়।
__________________________________
ইমাম ইবনু কাসীর তো বলেই রেখেছেন এ কথাটি, যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া ওয়াহাবীদের ইমাম স্বয়ং বলেছেন, সাহাবীদের মাযহাবের বিরুদ্ধাচরণ কেউ করলে সে বেদ’আতী বলে গণ্য হবে।
সুতরাং তাদের ইমামের কথায় বলতে হয়,
আজকের ফেতনাবাজ মাযহাব অস্বীকারকারী ও টাট্টা বিদ্রূপকারী ওয়াহাবীরা হচ্ছে যামানার কুখ্যাত বেদ’আতী।

অভিযোগঃ ছয়
________________________
“এছাড়াও পবিত্র কোরানে সূরা শূরায়- ১৩ ও ১৪ নং আয়াতে আছে, যে তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো আর কোন রকম মতভেদ সৃষ্টি করো না”।

জবাবঃ
______________
আয়াতটি হলো,
أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ

এখানে আল্লাহ বলেছেন, “মতভেদ সৃষ্টি করোনা”—এর তাফসীর কী? এ ব্যাপারে তাফসীরে তাবারীতে বলা হয়েছে,
عن قتادة, قوله: ( وَلا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ) تعلموا أن الفرقة هلكة, وأن الجماعة ثقة
কাতাদাহ থেকে বর্ণিত হয়েছে, জেনে রাখ, (বিভেদকারী) দল বা ফিরকা ধ্বংসশীল এবং জামাত নির্ভরশীল।

তাহলে এই জামাত কোন জামাত?
তার ব্যাখ্যা ইমাম ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ উল্লেখ করেছেন, আর তা হচ্ছে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাত। পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাত কারা?
ইমাম ইবনু কাসীর তারও ব্যাখ্যা করেছেন যা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

মাযহাব ও আলোচ্য আয়াতঃ সম্পর্ক
___________________
তাহলে দুটি বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরের আলোকে যা প্রকাশ পেল, তা হচ্ছে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্ত থাকা এবং বিভেদ সৃষ্টি না করা।
আর ইমাম ইবনু কাসীর বলেছেন, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ মানে সাহাবী ও তাবেয়ীগণের পথকে অনুসরণ করা। (সংক্ষেপিত)

আমরা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছি, সাহাবাগণ এবং তাবেয়ীগণের যামানায় মাযহাব বিদ্যমান ছিল। অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সুতরাং যারা মাযহাবকে অনুসরণ করে, তারা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের অন্তর্ভুক্ত। আর যারা অস্বীকার ও মশকরা করে তারাই হচ্ছে সে বিভেদ সৃষ্টিকারী দল।

আপনি কি জানেন?
________________________
১। ইমাম বুখারী রহঃ শাফেয়ী মাজহাবের
অনুসারী।

ইবনুল কায়্যিম বলেন,
قال ابن القيّم: «البخاري ومسلم وأبو داود والأثرم وهذه الطبقة من أصحاب أحمد أتبع له من المقلدين المحض المنتسبين إليه.
إعلام الموقعين عن رب العالمين
– ابن القيّم، محمد بن أبي بكر بن أيوب بن سعد شمس الدين
طبعة دار الكتب العلمية
:ج2 ص170
ওয়াহাবীদের ইমাম ইবনুল কায়্যিম বলেছেন, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আবু দাঊদ এবং আসরাম হাম্বালী মাযহাবের ছিলেন।
রেফারেন্সঃ
এ’লামুল মুয়াক্কিয়ীন
খন্ড- ২, পেইজ-১৭০

২। ইমাম মুসলিম রহঃ শাফেয়ী মাজহাবের
অনুসারী।
সুত্রঃ
আল-হিত্তা
ছিদ্দিক হাঃ খান
পৃষ্ঠা নং ২২৮।
৩। ইমাম তিরমিজী নিজে মুজ্তাহিদ ছিলেন।
তবে হানাফী ও হাম্বলী মাজহাবের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন।
সুত্রঃ
আল-ইনসাফ
শা ওয়ালিউল্লাহ রহঃ
পৃষ্ঠা নং ৭৯।
৪। ইমাম নাসাঈ শাফেয়ী মাজহাবের
অনুসারী ছিলেন।
আল-হিত্তা
পৃষ্ঠা নং ২৯৩।
৫। ইমাম আবুদাউদ রহঃ শাফেয়ী।
সুত্রঃ আল-হিত্তা পৃষ্ঠা নং ২২৮।
৬। ইমাম ইবনে মাজাহ শাফেয়ী মাজহাবের অনুসারী।
সুত্রঃ ফয়জুলবারী ১/৫৮।

সউদী ফতোয়া বিভাগের স্বীকারোক্তিঃ
মাযহাব কোর’আন সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত।
________________________
সউদী ফতোয়া বিভাগ লাজনাহ দাইমাহ স্বীকার করেছে, চার মাযহাব কোর’আন হাদীসের উপর প্রতিষ্ঠিত। এবং যারা নিজে কোর’আন হাদীস থেকে মাস’আলা বের করার ক্ষমতা রাখেনা, তাদের জন্য মাযহাব এর তাকলীদ করা জায়েয।

প্রমাণঃ
__________

أولا : المذاهب الأربعة منسوبة إلى الأئمة الأربعة الإمام أبي حنيفة والإمام مالك والإمام الشافعي والإمام أحمد ، فمذهب الحنفية منسوب إلى أبي حنيفة وهكذا بقية المذاهب.
ثانيا : هؤلاء الأئمة أخذوا الفقه من الكتاب والسنة وهم مجتهدون في ذلك ، والمجتهد إما مصيب فله أجران ، أجر اجتهاده وأجر إصابته ، وإما مخطئ فيؤجر على اجتهاده ويعذر في خطئه.
ثالثا: من لا قدرة له على الاستنباط يجوز له أن يقلد من تطمئن نفسه إلى تقليده ، وإذا حصل في نفسه عدم الاطمئنان سأل حتى يحصل عنده اطمئنان .

المرجع:
فتاوى اللجنة 5/28

সৃষ্টির মূল উৎস রসুলে পাক সল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

Standard

عَنْ جَابِر بْن عَبْدِ اللّٰہِ قَالَ قُلْتُ یَارَسُوْلَ اللّٰہِ بِاَبِیْ اَنْتَ وَاُمِّیْ اَخْبِرْنِیْ عَنْ اَوَّلِ شَیْءٍ خَلَقَہُ اللّٰہُ تَعَالٰی قَبْلَ الْاَشْیَاءِ؟ قَالَ یَاجَابِرُ اِنَّ اللّٰہَ تَعَالٰی قَدْ خَلَقَ قَبْلَ الْاَشْیَاءِ نُوْرَ نَبِیِّکَ مِنْ نُوْرِہٖ فَجَعَلَ ذَالِکَ النُّوْر یَدُوْرُ بِالْقُدْرَۃِ حَیْثُ شَآءَ اللّٰہُ تَعَالٰی وَلَمْ یَکُنْ فِیْ ذَالِکَ الْوَقْتِ لَوْحٌ وَلَا قَلَمٌ وَلَا جَنَّۃٌ وَلَا نَارٌ وَلَا مَلَکٌ وَلَا سَمَاءٌ وَلَااَرْضٌ وَلَاشَمْسٌ وَلَاقَمَرٌوَلَا جِنٌّ وَلاَ اِنْسٌ فَلَمَّا اَرَادَ اللّٰہُ تَعَالٰی اَنْ یَّخْلُقَ الْخَلْقَ قَسَّمَ ذَالِکَ النُّوْر اَرْبَعَۃ اَجْزَاء فَخَلَقَ مِنَ الْجُزْءِ الْاَوّلِ الْقَلَمَ وَمِنَ الثَّانِی اللَّوْحَ وَمِنْ الثَّالِثِ الْعَرْشَ ثُمَّ قَسَّمَ الْجُزْءَ الرَّابِعَ اَرْبَعَۃَ اَجْزَاءِ فَخَلَقَ مِنَ الْاَوّلِ حَمَلَۃَ الْعَرْشِ وَمِنَ الثَّانِیْ الْکُرْسِیَّ وَمِنَ الثَالِثِ بَاقِیَ الْمَلَآءِکَۃِ ثُمَّ قَسَّمَ الرَّابِعَ اَرْبَعَۃَ اَجْزَاءَ فَخَلَقَ مِنَ الْاَوّلِ السَّمٰوَاتِ وَمِنَ الثَّانِی الْاَرْضِیْنَ وَمِنَ الثَّالِثِ الْجَنَّۃَ وَالنَّار ۔۔۔ الخ

অনুবাদ ঃ
হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্‌ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবেদন করলাম, এয়া রসূলাল্লাহ্‌! আমার মা-বাবা আপনার কদমে উৎসর্গিত, আপনি দয়া করে বলুন, সকল বস্তুর পূর্বে সর্বপ্রথম আল্লাহ্‌ তাজ্ঞআলা কোন বস্তুটি সৃষ্টি করেছিলেন? নবীজী এরশাদ করলেন, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সমস্ত কিছুর পূর্বে তোমার নবীর (আমার) নূরকেই তাঁরই নূর হতে সৃষ্টি করেছেন অতঃপর ওই নূর আল্লাহ্‌ তাজ্ঞআলারই মর্জি মুতাবেক তাঁরই কুদরতি শক্তিতে পরিভ্রমণ করতে লাগল। ওই সময় না ছিল লৌহ-কলম, না ছিল বেহেশ্‌ত-দোযখ, আর ছিলনা আসমান- যমীন, চন্দ্র-সূর্য, মানব ও দানব। এক পর্যায়ে মহান আল্লাহ্‌ যখন সৃষ্টিজগত পয়দা করার মনস্থ করলেন, প্রথমেই ওই নূর মুবারক চারভাগে বিভক্ত করে প্রথম অংশ দিয়ে কলম, দ্বিতীয় অংশ দিয়ে লওহ, তৃতীয় অংশ দিয়ে আর্‌শ, সৃষ্টি করে চতুর্থাংশকে পুনরায় চারভাগে বিভক্ত করে প্রথমাংশ দিয়ে আর্‌শবহনকারী ফেরেশ্‌তাদের, দ্বিতীয় অংশ দ্বারা কুর্‌সী, তৃতীয় অংশ দ্বারা অন্যান্য ফেরেশ্‌তাদের সৃষ্টি করে চতুর্থাংশকে আবারও চারভাগে বিভক্ত করে প্রথম ভাগ দিয়ে সপ্ত আসমান, দ্বিতীয় ভাগ দিয়ে সপ্ত যমীন, তৃতীয় ভাগ দিয়ে বেহেশ্‌ত-দোযখ এবং পরবর্তী ভাগ দিয়ে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন।
[ইমাম কুস্তলানী : আল্‌ মাওয়াহিবুল লাদুনিয়া, ১ম খণ্ড, ৭১ পৃষ্ঠা। ইমাম যুরকানী : শরহুল মাওয়াহিব, ১ম খণ্ড, ৮৯-৯১ পৃষ্ঠা। হালভী : আস্‌সিরাতুল হালভিয়া, ১ম খণ্ড, ৫০ পৃষ্ঠা। আল্লামা আজলুনী : কাশফুল খেফা, ১ম খণ্ড, ৩১১ পৃষ্ঠা। শায়খ আবদুর রায্‌যাক : জ্ঞআল্‌ মুসান্নাফঞ্চ। ড.তাহেরুল কাদেরী : খাছাইছে মুস্তফা। নাবহানী : আল্‌ আনওয়ারুল মুহাম্মদিয়া ১৩ পৃষ্ঠা, ইস্তাম্বুল থেকে প্রকাশিত। ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলাইহি : সালাতুস্‌ সফা।]

হাদীসের বর্ণনাকারী
হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্‌ রদ্বিয়াল্লাহু আনহু। নবীপ্রেমে উৎসর্গিত এক তরুণ সাহাবী। মাত্র আঠার বৎসর বয়সে দ্বিতীয় আকাবায় ইসলামের পতাকাতলে সমবেত, হন কম বয়সের কারণে বদর-উহুদের জিহাদে শরিক হতে না পারলেও পরবর্তীতে প্রায় ১০ জিহাদে অংশগ্রহণ করে বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন। মদীনার মসজিদে নবভী হতে এক মাইল দূরে তাঁর বাসস্থান হওয়া সত্ত্বেও পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে নবভীতেই জামাজ্ঞআত সহকারে নিয়মিত আদায় করতেন। ঐতিহাসিক খন্দকের যুদ্ধে অবিরাম পরিশ্রম আর উপবাসের কারণে মুসলিম সৈন্যদের অবস্থা একেবারে কাহিল। এমনকি নবীজীর পবিত্র পেট মুবারকেও পাথর বাঁধা দেখে হযরত জাবের রদ্বিয়াল্লাহু আনহু নিজেকে আর সামলাতে না পেরে বিদ্যুৎবেগে দৌঁড়ে ঘরে পৌঁছে বিবির কাছে জানতে পারলেন তাঁদের ঘরে সামান্য আটা আর একটি ছোট ছাগলছানা ছাড়া আর কিছুই নেই। বিবিকে নির্দেশ দিলেন ঠিক আছে এই ছাগলছানা জবাই করে রান্না কর; আর যৎসামান্য আটা যা-ই রয়েছে তা দিয়ে রুটি তৈরি কর, আমি হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত দিয়ে আসি। এ কথা বলে আরেক দৌঁড়ে নবী করীমের খেদমতে এসে একেবারে কাছে গিয়ে কানে কানে দাওয়াতটা দিলেন এবং জানিয়ে দিলেন নবী পাক সাথে যাঁরা যাবেন তাঁদের সংখ্যা যেন দশজন অতিক্রম না করে। দাওয়াত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নবীজী সৈন্যবাহিনীর কাছে ঘোষণা দিলেন সবাই জাবেরের বাড়িতে যাব। সেখানে খাবারের আয়োজন হয়েছে। নবী করীমের এই আম ঘোষণা শুনে হযরত জাবির রদিয়াল্লাহু আনহুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল! ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলেন। ছোট একটা বকরির বাচ্চা দিয়ে দশজনের বেশি খাওয়া কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে এ লোককে নবী করীম দাওয়াত দিয়ে দিলেন। কিন্তু আপত্তি-অভিযোগ করার কোন সাহস ছিল না। তবে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল নবীর দরবারে কোন অভাব নেই। ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে নিশ্চয়। এ চিন্তা করতে করতে নবী করীম সেনা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে তাঁর ঘরে এসে হাযির হলেন। এরপর সামান্য আটা যা ছিল তার উপর এবং বকরির রান্না করা গোশ্‌ত ও হাঁড়ির মধ্যে থুথু মুবারক নিক্ষেপ করলেন। তারপর খাবার পরিবেশন শুরু হল। নবী পাকের পবিত্র থুথু মুবারকের ওসীলায় খাবারের এতই বরকত হয়ে গেল যে, পর্যায়ক্রমে সেখান থেকে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত লোককে তৃপ্তি সহকারে খাওয়ানোর পরও প্রথম অবস্থায় খাবার যা ছিল তাঞ্চই রয়ে গেল [সুবহানাল্লাহ্‌]।

হাদীসের ব্যাখ্যা
গভীর দৃষ্টিতে লক্ষ করলে দেখা যায়, পবিত্র ক্বোরআনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকটি সূরার প্রতিটি আয়াতে কোননা কোনভাবেই আমাদের প্রিয়নবী হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রশংসা বর্ণিত হয়েছে। দুনিয়ার অন্য কোন সৃষ্টির সাথে তাঁর তুলনা হয় না। কারণ, তিনি সৃষ্টির মূল আর অন্যরা তাঁরই শাখা-প্রশাখা। তিনিই আল্লাহর প্রথম সৃষ্টি এবং আল্লাহর দরবারে প্রথম আত্মসমর্পণকারী। যেমন পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে-

قُلْ اِنَّ صَلٰوتِیْ وَنُسُکِیْ وَمَحْیَاءِیْ وَمَمَاتِیْ لِلّٰہِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ لَاشَرِیْکَ لَہٗ وَبِذَالِکَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِیْنَ
অর্থাৎ হে নবী! আপনি বলুন, নিশ্চয় আমার নামায, হজ্ব, কোরবানী, আমার জীবন ও ওফাত বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যই; যার কোন শরীক নেই এবং এ বিষয়ে আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলমান (আল্লাহর দরবারে আত্মনিবেদনকারী)। [ সূরা আন্‌জ্ঞআম, আ.১৬২-১৬৩।]
আলোচ্য আয়াতের শেষের অংশ জ্ঞআমিই প্রথম মুসলমানঞ্চ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই আল্লাহর দরবারে প্রথম আত্মসমর্পণকারী এমনকি মানবজাতির আদিপিতা হযরত আদম আলাইহিস সালামের আগেও। শুধু তাই নয় মানবজাতির আগে জিনজাতির মধ্যে যারা আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণকারী ছিল তাদেরও পূর্বে। এমনকি ফেরেশতাদেরও পূর্বে। সৃষ্টিজগতের সকল সৃষ্টিই আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণকারী ছিল। কেউ আগে আবার কেউ পরে। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ বাধ্য হয়ে। যেমন এরশাদ হয়েছে

وَلَہٗ اَسْلَمَ مَنْ فِی السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ طَوْعًا وَّ کَرْھًا وَاِلَیْہِ یَرجِعُوْن
অর্থাৎ আসমান-যমীনে যা কিছু রয়েছে সকলই স্বেচ্ছায় হোক কিংবা বাধ্য হয়ে, তারই কাছে আত্মসমর্পণ করেছে এবং তাঁরই প্রতি সকলই প্রত্যাবর্তিত হবে।
[সূরা আলেইমরান, আ.৮৩।]
কাজেই সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বপ্রথম আত্মসমর্পণকারী হলেন হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সুতরাং তিনিই সর্বপ্রথম সৃষ্টি। এভাবে পবিত্র ক্বোরআনের অনেক আয়াত রয়েছে যদ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনুধাবন করা যায়, নবী করীম সৃষ্টির মূল উৎস ছিলেন এবং তাঁরই পবিত্র নূর হতে অন্যান্য জগত সৃজিত, যা হাদীস শরীফের ভাষ্য দ্বারা প্রতিভাত হয়েছে। তেমনি অপর এক হাদীস শরীফে রয়েছে, হযরত আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তাজ্ঞআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-

کُنْتُ اَوّلُ النَّبِیِٖنَ فِی الْخَلْقِ وَاٰخِرُھُمْ فِی الْبَعْثِ
অর্থাৎ আমি সৃষ্টিগতভাবে প্রথম নবী আর দুনিয়াতে আগমনের দিক দিয়ে শেষ নবী। [দাইলামী : আল্‌ ফেরদাউস, ৩য় খণ্ড, ২৮২ পৃষ্ঠা; ইবনে কাসীর : তাফসীরুল কোরআন আল্‌ আযীম, ৩য় খণ্ড, ৪৭০ পৃষ্ঠা।]
হযরত আলী রদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম এরশাদ করেন-

کُنْتُ نُوْرًا بَیْنَ یَدَی رَبِّیْ قَبْلَ خَلْقِ اٰدَمَ عَلَیْہِ الصَّلٰوۃُ
وَالسَّلَامُ بِاَرْبَعَۃِ عَشَرَ اَلْفَ عَامٍ
অর্থাৎ হযরত আদম আলাইহিস্‌ সালামকে সৃষ্টির চৌদ্দহাজার বৎসর পূর্বে আমি আমার রবের দরবারে নূরের আকৃতিতে মওজূদ ছিলাম।
[কুস্তলানী : আল্‌ মাওয়াহেবুল্‌ লাদুনিয়া; আজলুনী : কাশফুল খেফা, ২য় খণ্ড, ১৭০ পৃষ্ঠা।]
আল্লামা বুরহানুদ্দীন হালবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস শরীফ স্বীয় প্রসিদ্ধ কিতাব জ্ঞসিরাতে হালাবিয়াঞ্চয় সঙ্কলন করেন-

عَنْ اَبِیْ ھُرَیْرَۃَ رَضِیَ اللّٰہُ عَنْہُ انَّ رَسُوْلَ اللّٰہِ صَلَّی اللّٰہُ عَلَیْہِ وَسَلَّمَ سَأَلَ جِبْرَاءِیْلَ عَلَیْہِ السَّلَام فَقَالَ یَاجِبْرَءِیْلُ کَمْ عمَرْکََ مِنَ السّنِیْنَ ؟ فَقَالَ یَارَسُوْلَ اللّٰہِ لَسْتُ اَعْلَمُ غَیْرَ اَنَّ فِی الْحِجَابِ الرَّابِعِ نَجْمًا یَطْلَعُ فِیْ کُلِّ سَبْعِیْنَ اَلْفَ سَنَۃٍ مَرَّۃً رَأیْتُہٗ اِثْنِیْنِ وَسَبْعِیْنَ اَلْفَ مَرَّۃٍ فَقَالَ یَاجِبْرَءِیْلُ وَعِزَّۃِ رَبِّیْ جَلَّ جَلَالُہٗ اَنَا ذَالِکَ الْکَوْکَبُ

অর্থাৎ হযরত আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস্‌ সালামকে জিজ্ঞেস করলেন- ওহে জিব্রাঈল! আপনার বয়স কত? উত্তরে জিব্রাঈল আলাইহিস্‌ সালাম বললেন, এয়া রসূলাল্লাহ্‌! আমি তাতো সঠিক জানি না। তবে এতটুকু বলতে পারি (সৃষ্টিজগত সৃষ্টির পূর্বে) আল্লাহ্‌ তাজ্ঞআলার নূরানী আযমতের পর্দাসমূহের চতুর্থ পর্দায় একটি নূরানী তারকা সত্তর হাজার বছর পর পর উদিত হত। আমি আমার জীবনে সেই নূরানী তারকা বাহাত্তর হাজার বার দেখেছি। অতঃপর নবীপাক এরশাদ করলেন, মহান রব্বুল আলামীনের ইয্‌যাতের ক্বসম করে বলছি, সেই অত্যুজ্জ্বল নূরানী তারকা আমিই ছিলাম। [আল্‌ হালভী : আস্‌ সীরাতুল হালভিয়া, ১ম খণ্ড, ৩০ পৃষ্ঠা।]
উপরিউক্ত কোরআন-হাদীসের আলোচনা থেকেই বুঝা গেল রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৃষ্টির মূল উৎস। এরপরেও একশ্রেণীর লোক বলে বেড়ায় নবী আমাদের মত সাধারণ মানুষ, মাটির তৈরি মানুষ, দোষে-গুণে মানুষ, তিনি অতিমানব নন, না নূরের তৈরি ইত্যাদি। [গোলাম আযম : সিরাতুন্‌ নবী সঙ্কলণ।]
আল্লাহ্‌ পাক তাঁর প্রিয়হাবীবকে এমন অসংখ্য নূরানী ও অনন্য বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যা অন্য মানুষতো দূরের কথা অন্য নবীকেও দেওয়া হয়নি। এ বিষয়টি তন্মধ্যে অন্যতম। কাজেই হাদীস শরীফের ভাষ্যমতে নবী করীমের নূর মুবারক তখনই সৃষ্টি করা হয়েছিল যখন মাটিতো দূরের কথা আর্‌শ, কুর্‌সী, লওহ্‌, কলম তথা সৃষ্টিকুলের কোন কিছুই সৃষ্টি করা হয়নি। সুতরাং কীভাবে এ কথা তারা বলার দুঃসাহস দেখায়, নবী আমাদের মত মাটির তৈরি? [গোলাম আযম : সিরাতুন্‌ নবী সঙ্কলণ]
তারা বলে নবী আমাদের মত। কারণ, তিনি খাবার খেয়েছেন, বাজার করেছেন, সংসার করেছেন ইত্যাদি। তাহলে আমরা বলব এ যুক্তি তো কাফিরদেরই। পবিত্র ক্বোরআনে এসেছে কাফিররা নবী করীমের উপর ঈমান না আনার জন্য এ হেন খোঁড়া যুক্তি প্রদর্শন করেছিল,

َالِھٰذَا الرَّسُوْلِ یَأْکُلُ الطَّعَامَ وَیَمْشِیْ فِی الْاَسْوَاقِ
অর্থাৎএ রসূলের কী হয়েছে (ইনি কিভাবে রসূল হতে পারেন) যিনি খাবার খান এবং বাজারে চলাফেরা করেন।ঞ্চঞ্চ সুতরাং কাফিরদের কথার সাথে সূর মিলিয়ে কেউ যদি নিজেদেরকে কাফিরদের দলভুক্ত করে নিতে চায় তাহলে আমাদের করার কী আছে?

তারা বলে বেড়ায় নবী কিভাবে নূরের তৈরি, তিনিতো আমাদের মত রক্তমাংসে গড়া মানুষ। তাহলে আমরা বলব সহীহ হাদীস শরীফে দেখা যায়, নবী পাকের পবিত্র দেহ মুবারকে কোন দিন মশা- মাছি বসেনি; অথবা সুযোগ পেলেই মশা-মাছি আমাদের শরীরের রক্ত টেনে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। নবী পাকের নূরানী দেহ আর আমাদের দেহ কোন দিন এক হতে পারে না। সাধারণ মানুষ মারা যাওয়ার পর কবরে তাদের দেহ মাটির সাথে মিশে যায়। কিন্তু নবীগণের দেহ মোবারক কবরের মাটিতে বিলীন হয় না। আর আমাদের নবীর শানতো অনেক উর্ধ্বে। হাদীস পাকে এসেছে,

اِنَّ اللّٰہَ حَرَّمَ عَلَی الْاَرْضِ اَنْ تَأْکُل اَجْسَادَ الْاَنْبِیَاء
অর্থাৎ- নিশ্চয় আল্লাহ্‌ পাক (ইন্তিকালের পর) নবীগণের দেহ মুবারক খাওয়া মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন। [ফাদলুস্‌ সালাওয়াত। ]
তারা বলে আমাদের যেমন শরীরে রক্ত আছে নবীর শরীরেও রক্ত ছিল তিনি কি আমাদের মত নন? বড় দুঃখের সাথে লক্ষ করছি আমরা নবীর উম্মত হয়ে এই এক শ্রেণীর লোক ছলে-বলে- কৌশলে চাচ্ছে যে, নবী তাদের মতই হোক, আর তারা নবীর মত হয়ে যাক (নাঊযুবিল্লাহ্‌)।
তাহলে আমরা তাদের প্রত্যেকের কাছে জানতে চাই, তুমি কি জান তোমার রক্ত নাপাক, খাওয়াতো দূরের কথা কারো গায়ে লাগলেও ধুয়ে ফেলা আবশ্যক? কিন্তু নবী পাকের রক্ত মুবারক নাপাক ছিল বলে শরীয়তের কোন প্রমাণ দেখাতে পারবেন কি? বরং নবী করীমের রক্ত মুবারকের পবিত্রতার উপর অসংখ্য হাদীস শরীফ বিদ্যমান। ঐতিহাসিক উহুদ যুদ্ধে নবী করীমের দাঁত মুবারক শহীদ হওয়ার পর মুখ দিয়ে যখন রক্ত ঝরে পড়ছিল তখন সাহাবীরা গিয়ে হাত বসিয়ে দিয়েছিলেন এবং এক বিন্দু রক্তও মাটিতে পড়তে দেন্‌নি। নবীজী ওই রক্ত মুবারক হিফাযত করার জন্য সাহাবী হযরত মালিক ইবনে সিনান রদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে কেউ দেখতে না পায়। যুদ্ধের মাঠে নবী করীমের সেই রক্ত মুবারক হিফাযতের এমন কোন জায়গা খুঁজে পেলেন্‌ না যেখানে কেউ দেখবে না। পরিশেষে বুদ্ধি করে চুমুক দিয়ে রক্তের সবটুকুই পান করে নিলেন। পরবর্তীতে নবী করীম ওই রক্ত মুবারকের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, তিনি বললেন, হুযূর এমন জায়গায় লুকিয়ে রেখেছি যেখানে দুনিয়ার কোন মানুষ দেখতে পাবে না। নবী করীম জায়গাটির কথা জানতে চাইলেন। উত্তরে বললেন, হুযূর সেই নূরানী রক্ত মুবারক দুনিয়ার কোথাও রাখা আমার পছন্দ হয়নি তাই আমি তা নিজেই পান করেছি। প্রেমিক সাহাবীর এ ধরনের মুহাব্বত দেখে নবী করীম মুচকি হাসলেন আর সুসংবাদ দিলেন, যে পেটে আমার রক্ত পৌঁছেছে সে পেটকে কোনদিন জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। [আল্‌ বুরহান।]
ওহাবী-খারেজী, দেওবন্দী, ক্বাদিয়ানী, মওদূদীবাদের অনুসারীরা কি কোন দিন প্রমাণ করতে পারবে- তাদের রক্ত পবিত্র এবং সেই রক্ত পানে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ দিতে পারবে? তাহলে কেন ওই সব শয়তানী যুক্তি দিয়ে সরলপ্রাণ মুসলিম মিল্লাতকে গোমরাহ্‌ করা হচ্ছে ?
আসলে নবীপাকের শান-মান শুনলে ঈমানদারের ঈমান মজবুত হয় আর শয়তানের মন হয়ে যায় দুঃখ ভারাক্রান্ত। যারা নবীপাকের সুউচ্চ শান-মান সহ্য করতে পারে না, তারা শয়তানের প্রেতাত্মা নয় কি? ঈমানদার সব সময় ক্বোরআন-হাদীসের আলোকেই কথা বলবে। কোন যুক্তি তার সামনে টিকে থাকতে পারে না। মহান আল্লাহ্‌ যেখানে তাঁর প্রিয় নবীর শান ও মান-মর্যাদাকে বুলন্দ করেছেন সেক্ষেত্রে নবীর দুশমনেরা হাজার চেষ্টা করলেও কোন কাজ হবে না।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর মাসে নবীপ্রেমিকরা উজ্জীবিত হয়, নব উদ্যমে তাঁদের মুখে মুখে থাকে প্রিয়নবীর প্রশংসাগীত। তিনিই আল্লাহ্‌র নূর, তিনিই সমস্ত সৃষ্টির রহমত এবং তিনিই সৃষ্টির মূল উৎস।
নবী মোর নূরে খোদা, তাঁরই তরে সকল পয়দা
আদমের কলবেতে তাঁরই নূরের রৌশনী।।