মসনবী শরীফ ২

Standard

মসনবী শরীফ ২
মূল: মাওলানা রুমী (রহ:)
অনুবাদক: এ, বি, এম, আবদুল মান্নান
মুমতাজুল মোহদ্দেসীন, কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা।

[বাংলা এই ভাবানুবাদ বরিশাল থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে প্রকাশিত। এই দুর্লভ সংস্করণটি সরবরাহ করেছেন সুহৃদ (ব্যাংকার) নাঈমুল আহসান সাহেব।  সম্পাদক – কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন]

বায়ু হযরত হুদ (আ:)-এর জমানায় কওমে আদকে ধ্বংস করার কেচ্ছা

হুদ গেরদে মোমেনানে খত্তে কাশীদ।
নরমে মী শোদ বাদে কাঁ জামী রছীদ।
হরকে বীরু বুদ জে আঁ খত্তে জুমলারা
পারাহ্‌ পারাহ্‌ মীগাস্ত আন্দর হাওয়া।
হামচুনীঁ শায়বানে রায়ী মী কাশীদ
গেরদে বর গেরদে রমা খত্তে পেদীদ।
চুঁ ব জমায়া মী শোদ উ ওয়াক্তে নামাজ
তা নাইয়ারাদ গুরগে আঁ জাতর কাতাজ
হীচে গুরগে দর নাইয়ামদ আন্দরাঁ
গোছ পান্দে হাম না গাস্তি জে আঁ নেশাঁ।
বাদে হেরচে গোরগো হেরচে গোচকান্দ।
দায়েরাহ্‌ মরদে খোদা রা বুদে বন্দ্‌।

অর্থ: হযরত হুদ (আ:)-এর সময়ে যখন বায়ুর তুফান আসিয়াছিল, তখন তিনি মোমেনদের চতুর্পাশ্বে রক্ষা কবজস্বরূপ একটা রেখা টানিয়া দিলেন। বায়ু যখন ঐখানে আসিয়া পৌঁছিত, নরম হইয়া যাইত। কাফেরগণ যাহারা রেখার বাহিরে ছিল, তাহাদিগকে উর্ধ্বে উঠাইয়া ঠকর ঠকর করিয়া আছড়াইয়া টুকরা টুকরা করিয়া ফেলিয়াছিল। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, বায়ু আল্লাহ্‌র হুকুমের বাধ্যগত। বুদ্ধিহীন পশুরাও আল্লাহ্‌র হুকুমের বাধ্যগত। যেমন মাওলানা একটা কেচ্ছা সংক্ষেপে বর্ণনা করিয়াছেন, শাইবান (রা:) একজন কামেল বোজর্গ ছিলেন, তিনি যখন জুমার নামাজ পড়িতে যাইতেন, তখন নিজের স্থানে বকরিদের চারিপার্শ্বে একটি রেখা টানিয়া দিতেন, যেন সেখানে কোনো নেকড়ে বাঘ আক্রমণ না করে। অতএব, সেই রেখার মধ্যে কোনো নেকড়ে বাঘ প্রবেশ করিত না এবং সেই রেখার মধ্য হইতে কোনো বক্‌রি বাহিরে যাইত না। যেমন নেকড়ে বাঘের উহার মধ্যে প্রবেশ করিবার কোনো লোভ হইত না, আর বকরিদেরও উহার মধ্য হইতে বাহির হইবার কোনো ইচ্ছা হইত না। লালসা বায়ুর ন্যায়, উহা হইতে বিরত থাকা সহজ নয়। ঐ খোদার প্রিয় বান্দার রক্ষণ-বেষ্টনীর মধ্যে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছিল। নেকড়ে বাঘের লালসা অগ্রসর হয় নাই, আর বকরিদের লোভ বাহিরে যায় নাই।

হামচুনিঁ বাদে আজল বা আরেকানে
নরম ও খোশ হামচুঁ নছিমে গোলেস্তান।
আতেশে ইবরাহীম রা দানাদ আঁ নজদ্‌।
চুঁ গোজিদাহ হক বুদ চউনাশ গোজাদ।
জে আতেশ শাহওয়াত নাছুজাদ মরদে দীন্‌
বাকিয়ানেরা বোরদাহ্‌ তাকায়ারে জমীন
মউজে দরিয়া চুঁ বা আমরে হক বতখ্‌ত
আহলে মুছারা আজ কেবতী ওয়া শেনাখত।
খাকে কারুনরা  চু ফরমান দর রছীদ।
বা জর ও তখতাশ্‌ ব কায়ারে খোদ কাশীদ্‌।

অর্থ: এখানে মাওলানা আনাছেরে আরবায়া আল্লাহ্‌র কুদরাতের বাধ্যগত বলিয়া প্রমাণ করিয়াছেন। যেমন হুজুর (দ:)-এর জমানায় বায়ু মোমিনদের জন্য নরম হইয়াছিল। এইরূপভাবে মৃত্যু কওমে আদের বায়ুর ন্যায় কামেল লোকের জন্য নরম ও শান্তিদায়ক হইয়া যায়। যেমন ভোরের হাওয়া বাগানে আনন্দায়ক হয়।

অগ্নি হজরত ইব্রাহিম (আ:)-কে স্পর্শ করে নাই। কেননা, তিনি আল্লাহ্‌র বন্ধু ছিলেন। কেমন করিয়া তাঁহার ক্ষতি করিবে? এইরূপভাবে যে ব্যক্তি ধার্মিক, সে কখনও কু-রিপুর অগ্নিতে দগ্ধ হয় না। অন্যান্য লোকদিগকে কু-রিপু জাহান্নামে নিয়া পৌঁছাইয়া দেয়। আল্লাহতায়া কু-রিপুগুলিকে ধার্মিকদের উপর জয়ী হইতে পাঠান নাই। নীল নদের তুফান আল্লাহর আদেশ মান্য করিয়া হজরত মূসা (আ:)-এর অনুচরবর্গকে ফেরাউনের দল হইতে পার্থক্য করিয়া চিনিয়া লইয়াছিল। মূসা (আ:)-এর অনুসারীদিগকে পার হইবার পথ দেখাইয়া দিয়াছিল এবং ফেরাউনের দলকে ডুবাইয়া দিল। কারুণের দেশের মাটিকে যখন আল্লাহ্‌র আদেশ দেওয়া হইল, তখন তাহাকে, তাহার ধনসম্পদ ও সিংহাসন সহ নিজের পেটের মধ্যে টানিয়া লইল।

আব ও গেল্‌ চুঁ আজ দমে ঈছা চরীদ,
বাল ও পর ব কোশাদ ও মোরগে শোদ পেদীদ্‌
হাস্তে তাছবীহাত বজায়ে আব ও গেল,
মোরগে জান্নাত শোদ জে নফখে ছেদকে দেল।
আজ দেহানাত চুঁ বর আমদ হামদে হক,
মোরঘে জান্নাত ছাখতাশ রব্বুল ফালাক।

অর্থ: পানি ও কাদায় যখন হজরত ঈসা (আ:)-এর ফুঁক হইতে বরকত টানিয়া লইল, তখন আল্লাহর কুদরাতে পালক ও পাখা নির্গত হইয়া পাখী হইয়া উড়িয়া গেল। এইরূপে মাটির হাকীকাত হইতে প্রকৃত পাখী হবার উদাহরণ দিয়া মাওলানা বলিতেছেন, তোমাদের তাসবীহ (সোবহানাল্লাহ) বলা যেমন মাটির তাসবীহ বলা একইরূপ। কিন্তু সত্য দেলের ফুঁকে মাটি বেহেস্তী পাখী হইয়া উড়িয়া গেল। এই রকম যখন তোমার মুখ দিয়া আল্লাহর প্রশংসা বাহির হয়, তখন আল্লাহ তোমাকে বেহেস্তী পাখীতে পরিণত করেন।

কোহেতুর আজ নূরে মূছা শোদ বরকছ
ছুফীয়ে কামেল শোদ ওরাস্তে উজে নকছ।
চে আজব গার কোহে ছুফী শোদ্‌ আজিজ
জেছমে মুছা আজ কুলুখী বুদ্‌ নীজ।

অর্থ: তুর পর্বত হজরত মূসা (আ:)-এর নূরের তাজাল্লির দরুন নাচিতে আরম্ভ করিয়াছিল। নূরে মূসা এই জন্য বলা হইয়াছে যে, ঐ নূরে এলাহীর আসল উদ্দেশ্য ছিল মূসা (আ:) । ঐ তূর পর্বত নূরে ইলাহীর তাজাল্লির বরকতে খাঁটি পূর্ণ সূফী হইয়া গিয়াছিল এবং পাথর হিসাবে তাহার মধ্যে যে ত্রুটি ছিল, উহা দূর হইয়া গেল। অর্থাৎ, সে এখন আর পাথর রহিল না। এখন সে খোদার প্রিয় সূফী হইয়া গেল। অবস্থার সামঞ্জস্যের দিক দিয়া আশ্চর্যের বিষয় কিছুই নহে। অবশেষে হজরত মূসা (আ:)-এর মাটির দেহও মাটি দিয়া গঠিত ছিল। যদি তিনি খোদার প্রিয় সূফী হইতে পারেন, তবে পাহাড় কেন সূফী হইতে পারিবে না? অতএব, তূর পর্বতের খোদার প্রিয় সূফী হওয়া সম্বন্ধে কোনো আশ্চর্যের ব্যাপার হইতে পারে না। ইহা দ্বারা প্রমাণ পাওয়া যায় যে, ইহ-জগতে যাহা কিছু সৃষ্টি আছে, সবই আল্লাহর কুদরাতের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আল্লাহর কুদরাতের বাহিরে কোনো কিছুই দেখা যায় না।
ইহুদী বাদশাহর নিজস্ব লোকের নসীহত কবুল না করা

ইঁ আজায়েব দীদ আঁ শাহে জহুদ,
যুজকে তানাজ ও যুজকে এনকারাশ নাবুদ্‌।
নাছেহানে গোফতান্দ আজ হদ্দে মগোজার আঁ,
মারকাবে ইস্তজিহা রা চন্দেইঁ মরা আঁ।
বোগজার আজ কোশতানে মকুন ইঁ ফেলেবদ,
বাদে আজ ইঁ আতেশ মজান দরজানে খোদ্‌।
নাছেহানেরা দস্তে বস্ত ও বন্দে করদ্‌।
জুলমেরা পেওন্দ দর পেওন্দ করদ্‌
বাংগে আমদ্‌ কারে চুঁ ইঁজা রছীদ,
পায়েদার আয় ছাগে কে কাহারে মা রছীদ।

অর্থ: এই রকম আশ্চর্যজনক ঘটনা দেখিয়াও ইহুদী বাদশাহ কিছুতেই আল্লাহর কুদরাতের কথা স্বীকার করিল না। বাদশাহর হিতাকাঙ্ক্ষীরা বলিল যে, সীমা অতিক্রম করিয়া বেশী অগ্রসর হইও না। আর বিরুদ্ধাচরণ করিও না। এখন মানুষ হত্যা করা হইতে বিরত থাক। এই প্রকার অন্যায়-অত্যাচার করিও না। নিজেকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করিও না। বাদশাহ নসীহতকারীদিগকে ধরিয়া বাঁধিয়া কয়েদখানায় আবদ্ধ করিয়া রাখিলেন। এবং অত্যাচারের সীমা অধিকতর বাড়াইয়া দিলেন। যখন অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করিল, তখন গায়েব হইতে এক আওয়াজ আসিল যে, “হে নাপাক কুকুর, তুমি একটু থাম, এখনই আমার পক্ষ হইতে শাস্তি আসিতেছে”।

চল্লিশ গজ উচ্চ এক অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হওয়া এবং গোলাকার ধারণ করিয়া সমস্ত ইহুদীদিগকে ঘেরাও করিয়া জ্বালাইয়া পোড়াইয়া ছাই করিয়া দেওয়া

বাদে আজ আঁ আতেশে চেহেল গজ বর ফরুখত,
হলকা গাস্ত ও আঁ জহুদাঁরা বছোখত্‌।
আছলে ইঁশা বুদ আতেশ জে ইবতে দা,
ছুয়ে আছলে খেশে রফ্‌তান্দ ইন্‌তেহা।
হামজে আতেশ জাদাহ্‌ বুদান্দ আঁ ফরীক,
যুজবেহারা ছুয়ে কুল বাশদ তরীক।
আতেশী বুদান্দ মোমেন ছুজ ও বছ,
ছুখ্‌তে খোদ আতেশে মর ইঁশারা চুখছ।

অর্থ: ঐ গায়েবী আওয়াজ আসার পর চল্লিশ গজ উচ্চ এক অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত হইয়া ইহুদীদের চতুর্দিক হইতে ঘিরিয়া লইল এবং সমস্ত ইহুদীদিগকে জ্বালাইয়া পোড়াইয়া ভস্ম করিয়া দিল। মাওলানা বলেন, এই ইহুদীদিগের মূলধাত অগ্নির তৈরী ছিল বলিয়া শেষ পর্যন্ত অগ্নিতে মিশিয়া চলিয়া গেল। যেমন প্রত্যেক বস্তুর মূলের সহিত তাহার একটা সম্বন্ধ থাকে। যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, “আল্লাহতায়ালা মানুষ জাতিকে হজরত আদম (আ:)-এর পিঠে কোমরের উপরিভাগ হইতে বাহির করিয়া কতকের সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে, ইহাদিগকে বেহেস্তের জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছে, আর অন্যদের সম্বন্ধে বলিয়াছেন যে ইহাদিগকে দোজখবাসী হইবার জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছে”। তাই কার্যকলাপের দিক দিয়া দোজখীরা যাহাতে দোজখে অতি সহজে যাইতে পারে, সেই সমস্ত কাজ তাহারা খুশির সহিত পালন করে। কেননা, দোজখের সহিত তাহাদের বিশেষ রকমের সম্বন্ধ আছে। অতএব, ইহাদের প্রকৃত অবস্থান দোজখেই হইবে। ইহারা অগ্নি দ্বারা সৃষ্টি হইয়াছে। তাই ইহাদের গতি অগ্নির দিকেই হইবে। তাহাদের অগ্নির সহিত এমন সম্বন্ধ রহিয়াছে, যেমন তাহারা নিজেরাই অগ্নি। মোমেনদিগকে সর্বদা জ্বালাতন করিয়া বেড়ায়। তাহারা নিজেরাও খর-কুটার ন্যায় অগ্নিতে প্রজ্বলিত হইয়া থাকে।

আঁ কে উ বুদাস্ত উম্নু হাওবিয়া।
হাওবিয়া আমদ মর উরা জে আওবিয়া।
মাদারে ফরজান্দে জুইয়ানে ওয়ায়ে ইস্ত,
আছলোহা মর পরউহারা দর পায়ে আস্ত।
আবে হা দর হাউজে গার জেন্দানিস্ত,
বাদে নাশ ফাশ মী কুনাদ কায়ে কানিস্ত।
মী রেহানাদ মী বোরাদ তা মায়াদেনাশ,
আন্দেক আন্দেক তা না বীনি বুরদানাশ।
ওয়াইঁ নফছে জানে হায়ে মারা হাম চুনা,
আন্দেক আন্দেক দোজদাদ আজ হাবছে জাহাঁ।

অর্থ: মাওলানা এখানে দুনিয়ার স্বাভাবিক নিয়ম বর্ণনা করিয়া বলিতেছেন, যাহার মা হাওবিয়া নামক দোজখ হইবে, সে নিশ্চয়ই তাহার আশ্রয় স্থান দোজখে তালাশ করিয়া লইবে। কেননা ছেলের মা সব সময়ই ছেলে অন্বেষণ করিয়া লইয়া নিজের কাছে রাখিবে। এইভাবে দোজখ সব সময় নিজের খাদ্য হিসাবে কাফেরদিগকে তালাশ করিয়া লইবে। ঈমানদারদের বেলায় ইহার ব্যতিক্রম ঘটিবে। কারণ, দোজখ সর্বদা ঈমানদারদের হইতে দূরে থাকিবার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে। যেমন, ঈমানদারগণ সর্বদা খোদার নিকট দোজখ হইতে দূরে থাকার জন্য প্রার্থনা করেন। মূল যেমন সর্বদা শাখাকে আকর্ষণ করিয়া থাকে, তেমনি দোজখ সর্বদা দোজখীদের আকর্ষণ করিয়া নেয়। যেমন কূপের আবদ্ধ পানি, বায়ু সব সময়ই আকর্ষণ করিয়া বাষ্পে পরিণত করিয়া উর্ধ্বে নিয়া যায়। কারণ পানি এবং বায়ুর মূল ধাতের মধ্যে সামঞ্জস্য আছে, তাই একে অন্যকে সর্বদা আকর্ষণ করিতে থাকে। বায়ু পানিতে আস্তে আস্তে ক্রমান্বয় আকর্ষণ করিয়া শীতল স্তরে নিয়া যায়, তাহা আমরা অনুভবও করিতে পারিনা যে, কত পানি কোন্ সময় নিয়া গিয়াছে। এই ভাবে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস আমাদের জীবনী শক্তিকে একটু একটু করিয়া দুনিয়া হইতে পরকালের দিকে নিয়া যাইতেছে। কারণ, আমাদের রুহ্‌ পরকালের দিকে মুখাপেক্ষী এবং পরকালের সাথে সম্বন্ধ রাখে। তাই সেই দিকেই ক্রমান্বয় একটু একটু করিয়া অগ্রসর হইতেছে। শ্বাস-প্রশ্বাসকে আল্লাহতায়ালা ইহার অসীলা করিয়া দিয়াছেন। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্বারা আমাদের বয়স কমিয়া যায়। যত বয়স কমিয়া যায়, ততই আখেরাত নিকটবর্তী হইয়া যায়, মৃত্যু আসিয়া দ্বারে উপস্থিত হয়।

তা ইলাইহে ইয়াছ আদু আতইয়াবুল কালেমে,
ছায়েদা আমেন্না ইলা হাইছু আলেমে।
তারতাকী আন ফাছুনা বিল মুনতাকা,
মোতাহাফ্‌ফামিন্না ইলা দারেল বাকা।
ছুম্মা ইয়াতীনা মুকাফাতুল মাকাল,
জেয়াফা জাকা রাহমাতুম মিনজীল জালাল।
ছুম্মা ইউল জীনা ইলা আমছালে হা,
কায়ে ইয়ানালাল আবদু মিম্মা নালাহা।
হাকাজা তায়ারুজু ওয়া তান জেলু দায়েমা,
জা ফালা জালাত আলাইহে কায়েমা।

অর্থ: এখানে মাওলানা পরস্পর আকর্ষণের কথা ব্যাখ্যা করিতে যাইয়া বলিতেছেন, আমাদের সৎ বাক্যগুলিও আল্লাহর দরবারে যাইয়া পৌঁছিতে থাকে, আমাদের পবিত্র বাক্যগুলি পবিত্র স্থানের সাথে কবুল হবার সম্বন্ধ রাখে, এইজন্য উহা পবিত্র স্থানে চলিয়া যায়। আল্লাহর হুকুমে সেখানে যাইয়া উপস্থিত হয়। এখানেও আকর্ষণের শক্তি দেখা যায়। এই রকমভাবে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস ও আকর্ষণের কারণে ‘দারুল বাকা’র দিকে চলিয়া যায়। তারপর ঐ পবিত্র বাক্যের প্রতিফল আমাদের কাছে দ্বিগুণ, তিনগুণ সওয়াব বৃদ্ধি পাইয়া ফিরিয়া আসে। আল্লাহতায়ালা বান্দার সৎবাক্য নেক আমল করিয়া লন, তাহার পর নিজেও বান্দার কথা স্মরণ করেন। আল্লাহ্‌তায়ালার মেহেরবানীতে বান্দার আমল কবুল করার দরুন বান্দা আরো বেশী করিয়া নেক আমল করে। বান্দার নেক আমল বেশী করার আকাঙ্ক্ষা অন্তরে সৃষ্টি হওয়া আল্লাহর কবুলের প্রমাণ দেয়। নেক আমল আল্লাহতায়ালার কবুলের অর্থ, বান্দার অন্তরে বেশী করিয়া নেক কর্ম করার তাওফিক বাড়াইয়া দেন। যাহাতে বান্দা অধিক নেক আমল করিয়া অধিক সওয়াব পাইতে পারে তাহার সুযোগ করিয়া দেন। এই রূপে বান্দার সৎবাক্য ও নেক কাজ সর্বদা আল্লাহর নিকট যাইয়া পৌঁছে এবং আল্লাহ উহা কবুল  করিয়া প্রতিফলস্বরূপ বান্দাকে নেক আমল করার শক্তি বাড়াইয়া দেন।

পারছি গুইয়াম ইয়ানী ইঁ কাশাশ,
জা আঁ তরফ আইয়াদ কে আইয়াদ আঁ চুশাশ।
চশমেহর কওমে বছুয়ে মান্দাস্ত,
কা আঁ তরফ একরোজ জওকী বান্দাস্ত।

অর্থ: মাওলানা বলেন, আমি ফারসী ভাষায় বলিতেছি যে উক্ত আকর্ষণ ঐ দিক দিয়া আসে, যে দিক হইতে ইহার সম্বন্ধ স্থাপন হয়। কারণ, সম্বন্ধের মধ্যে একটা আকর্ষণশক্তি থাকে। যেমন আল্লাহর এবাদত করার স্বাদ আল্লাহর তরফ হইতে প্রাপ্ত হওয়া যায়। অতএব, ইবাদত ও আবেদের আকর্ষণ আল্লাহর দিকেই হইবে। প্রত্যেক জাতির চক্ষু ঐ দিকেই থাকিবে,  যে দিক হইতে সে একদিন স্বাদ-প্রাপ্ত হইয়াছে। ঐ দিকেই তাহার অন্তরের দৃষ্টি থাকিবে। স্বতঃসিদ্ধ কথা এই যে, প্রত্যেক বস্তুই সহজাতের প্রতি আকৃষ্ট থাকে। যেমন মাওলানা পরে বলিতেছেন,

জওকে জেনছে আজ জেনছে খোদ বাশদ ইয়াকীন,
জওকে জুজবে আজ কুল খোদ বাশদ বাবীন।
ইয়া মাগার কাবেলে জেনছে বুদ,
চুঁ বদু পেওস্ত জেনছে উ শওয়াদ।
হামচু আবো ও নানে কে জেনছে মা নাবুদ,
গাস্তে জেনছে মা ও আন্দর মা কেজুদ।
নকশে জেনছিয়াত নাদারাদ আবো ও নান,
জে ইতে বারে আখের আঁরা জেনছে দাঁ

অর্থ: মাওলানা বলেন, সহজাত নিজের সহজাতের দিকে আকর্ষণ করে এবং অংশ পূর্ণতার দিকে মূখাপেক্ষী থাকে। কেননা, উহার মধ্যে সহজাতের সম্বন্ধ আছে। যদি ঐ বস্তু সহজাতের উপযুক্ত না হয়, তবে যখন উহার সাথে মিলিয়া যাইবে, তখন নিশ্চয় ঐ বস্তুর সহজাতরূপে পরিগণিত হইবে। যেমন রূটি ও পানি যদিও আমাদের সহজাত নয়, তথাপি উহার মধ্যে সহজাত হইবার শক্তি আছে। তাই খাইবার পরে উহা আমাদের সহজাতে পরিণত হইয়া যায় এবং আমাদের মধ্যে অংশ হইয়া আমাদিগকে বর্ধিত ও শক্তিশালী করিয়া তোলে। তবে দেখা যায় যে, যদিও রুটি এবং পানির মধ্যে সহজাত হইবার অবস্থা দেখা যায় না, কিন্তু অন্য প্রকারে উহা সহজাত হইবার শক্তি রাখে। যাহা ভবিষ্যতে সহজাতে পরিণত হইয়া যায়। অতএব, রুটি ও পানিকে আমাদের সহজাত মনে করিতে হইবে। সহজাত হইবার শক্তির দিক দিয়া রুটি ও পানি আমাদের সহজাত বলিয়া সেই দিকে আমাদের আকর্ষণ থাকে।

ওয়ার বেগায়েরে জেনছে বাশদ জওকে মা,
আঁ মাগার মানেন্দে বাশদ জেনছে রা।
আঁ কে মানেন্দাস্ত বাশদ আরিয়াত,
আরিয়াত বাকী নামানাদ আকেবাত।
মোরগেরা গার জওকে আইয়াদ আজ ছফীর,
চুঁকে জেনছে খোদ নাইয়াবদ শোদ নফীর।
তেশনা রাগার জওকে আইয়াদ আজ ছরাব,
চুঁ রছাদ দর্‌ওয়ে গেরীজাদ জুইয়াদ আব।
মোফ্‌লেছানে গার খোশ শওয়ান্দ আজ জররে কলব,
লেকে আঁ রেছওয়া শওয়াদ দরদারে জরাব।

অর্থ: এখানে মাওলানা বলেন, কোনো কোনো সময় দেখা যায় যে সহজাত ছাড়াও আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। ইহার কারণ সম্বন্ধে বলিতে যাইয়া তিনি বলিতেছেন, যদি সহজাত ছাড়া আকর্ষণ দেখা যায়, তবে মনে করিতে হইবে যে উহা সহজাতের ন্যায় মনে হয় বলিয়া ঐ দিকে ধাবিত হয়। প্রকৃতপক্ষে সহজাত নয়, সহজাতের মতন কোনো কিছু অস্থায়ীরূপে দেখা যায় বলিয়া ধোকায় পড়িয়া সেই দিকে ধাবিত হয়। পরে যখন ঐ সন্দেহ চলিয়া যায়, তখন নিরাশ হইয়া ফিরিয়া আসে অথবা ধোকায় পড়িয়া ধ্বংস হইয়া যায়। যেমন, কোনো পাখীকে শিকারী যদি নিজে পাখীর ন্যায় আওয়াজ দিয়া ভুলাইয়া নিকটে আনে, পাখী নিজের সহজাতের ডাক শুনিয়া তাড়াতাড়ি করিয়া আসিয়া ফাঁদে আটকাইয়া আবদ্ধ হইয়া যায়। সহজাতের ন্যায় আওয়াজ শুনিয়া আকর্ষণ ঘটিয়াছিল। নিকটে আসিয়া যখন সহজাতকে দেখিতে পাইল না, তখন নিশ্চয়ই সে দুঃখিত হইবে এবং ভীত হইয়া পড়িবে। শুধু সাময়িক আওয়াজের দিক দিয়া সামঞ্জস্য হওয়ায় মহব্বত ও আকর্ষণ সৃষ্টি হইয়াছিল। কিন্তু উহা প্রকৃত সামঞ্জস্য ছিল না বলিয়া উক্ত আকর্ষণ ছিন্ন হইয়া গেল। দ্বিতীয় উদাহরণ দিয়া মাওলানা বলিতেছেন, যেমন পিপাসার্ত ব্যক্তি মরিচা দেখিয়া পিপাসা নিবারণার্থে সেই দিকে দৌড়াইয়া  ছুটে, কিন্তু যখন নিকটে যায়, তখন মরিচা দেখিয়া উহা হইতে ভাগিয়া শীঘ্র করিয়া পানির তালাশে যায়। অন্য উদাহরণ দিয়া মাওলানা প্রকাশ করিতেছেন, যেমন গরীব ব্যক্তি নকল স্বর্ণ পাইয়া অতিশয় খুশী হয়। যখন সে স্বর্ণ পরখকারীর কাছে যাইয়া পৌঁছে, তখন নিরাশ হইয়া অসন্তুষ্ট হইয়া পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত লজ্জিত হয়।

তা জর আন্দুদিয়াত আজ রাহে না ফাগানাদ
তা খেয়ালে কাজ তোরা চে না ফগানাদ।
আজ কালিলা বাজে জু আঁ কেচ্ছা রা
ও আন্দর আঁ কেচ্ছা তলবে কুন হেচ্ছারা।
দর কালিলা খান্দাহ্‌ বাশী লেকে আঁ,
কেশরো ও আফছানা নায়ে মগজে আঁ।

অর্থ: মাওলানা এখানে তরীকাপন্থীদের নসীহত করিতে যাইয়া বলিতেছেন যে, তোমরা বাহ্যিক আড়ম্বর ও লেবাস তরীকা দেখিয়া ফেরেববাজের ধোকায় পড়িয়া তাহাদের অনুসরণ করিও না। কারণ, ইহাতে শেষ পর্যন্ত বিফল মনোরথ হইয়া বিপদে পতিত হইতে হয়। তাই মাওলানা বলেন, সাবধান! কলাই করা স্বর্ণ রঙ্গীন চকচকে দেখিয়া সত্য পথ হইতে পিছলাইয়া পড়িওনা। অর্থাৎ, ধোকাবাজের ধোকায় পড়িয়া খোদার রাস্তা হইতে দূরে চলিয়া যাইও না। বাঁকা পথকে সরল পথ মনে করিয়া উহার অনুসরণ করিয়া গোমরাহীর মধ্যে পতিত হইও না। ’কালিলা দামনা’ কেতাবের মধ্যে খরগোশ ও বাঘের কেচ্ছা তালাশ করিয়া পাঠ কর, এবং নিজের অবস্থা উহার উপর বিবেচনা কর। উক্ত কেচ্ছার সারমর্ম এই যে, একটি খরগোশের পরামর্শে বাঘ কূপের মধ্যে নিজের ছবি দেখিয়া ক্রোধে কূপে ঝাঁপ দিয়া পড়িয়া নিজেকে নিজে বিপদগ্রস্ত করিয়াছিল। ঐরূপ অবস্থা তোমাদের যেন না হয়। এইজন্য মাওলানা সবাইকে সাবধান করিয়া দিতেছেন। মাওলানা বলেন, তোমরা বোধ হয় কালিলা দামনার কেচ্ছা পাঠ করিয়াছ, কিন্তু শুধু খুশি এবং গল্পস্বরূপ পাঠ করিয়াছ, আমি উহার সারমর্ম বাহির করিয়া পূর্ণ তত্ত্ব প্রকাশ করিলাম।

বন্য পশুদের কথায় বাঘের তাওয়াক্কুল করা ও নিজের চেষ্টা পরিত্যাগ করার কর্ণনা

তায়ফায়ে নাখ্‌চির দর ওয়াদিয়ে খেশ,
বুদে শাঁ আজ শেরে দায়েম কাশমা কাশ।
বছকে আঁ শের আজ কমিনে দরমী রেবুদ,
আঁ চেরা বর জুমলা না খোশ গাস্তাহ্‌ বুদ।
হীলা কর দান্দ আমদান্দ ইঁশা ব শের,
কাজ ওজীফা মা তোরা দারেম ছায়ের।
যুজ ওজীফা দর পায়ে ছায়েদে মইয়া,
তা না গরদাদ তলখে বরমা ইঁ গোয়া।

অর্থ: কোনো এক জঙ্গলে বন্য পশুরা বাস করিত, কিন্তু একটা বাঘের উৎপাতে ইহারা বিপদগ্রস্ত ছিল। বাঘ যে সময় ইচ্ছা করিত সেই সময়ই আসিয়া পশুদের যাহাকে ইচ্ছা বদ করিয়া লইয়া যাইত। এই জন্য ঐ জায়গায় চারণভূমি পশুদের নিকট অশান্তিদায়ক মনে হইত। অবশেষে সমস্ত পশুরা পরামর্শ করিয়া একটি পদ্ধতি ঠিক করিয়া বাঘের নিকট যাইয়া বলিল, আমরা আপনার দৈনিক খোরাক নির্ধারিত করিয়া দেই। ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত আপনার কাছে খাদ্য আসিয়া পৌঁছিবে এবং আপনি সর্বদা উহা খাইয়া তৃপ্তিলাভ করিতে পারিবেন। অতএব, আপনার দৈনিক সাধারণ খাদ্যের জন্য শিকার করিতে আসিবেন না। কারণ, তাহাতে আমাদের নিকট এই সবুজ ভূমি ভীতিজনক ও অশান্তিদায়ক বলিয়া মনে হয়।

বন্য পশুদেরকে বাঘের প্রদত্ত উত্তর এবং নিজের চেষ্টার উপকারিতা বর্ণনা করা

গোফ্‌ ত আরেগার ওফা বীনাম না মকর,
মক্‌রেহা বছ দীদাম আজ জীদো ও বকর
মান্‌ হালাকে ফেলো ও মকরে মর দমাম্‌
মান গোজিদাহ্‌ জখ্‌মে মারো ও কাজ দমাম্‌।
নফ্‌ছে হরদম আজ দরুনাম দর কামীন।
আজ হামা মরদাম তবরে দর মক্‌রো ও কীন।
গোশে মান্‌ লা ইউল দাগুল মোমেনে শানীদ,
কউলে পয়গম্বর বজানো ও দেল গোজীদ।

অর্থ: বাঘ উত্তর করিল যে, তোমাদের প্রস্তাব মানিয়া নিতে কোনো ক্ষতি নাই। কিন্তু আমাকে দেখিয়া নিতে হইবে, তোমরা তোমাদের প্রতিজ্ঞা পূর্ণ কর কি না? অথবা ইহার মধ্যে তোমাদের ধোকাবাজী আছে কি না? কেননা, আমার এই বয়সে আমি বহুত লোকের ধোকাবাজী দেখিয়াছি এবং অনেক প্রকার লোকের ধোকায় ও ফেরেববাজীতে পড়িয়া অনেক মার খাইয়াছি। অনেক ক্ষতিকারক বস্তুর আঘাতপ্রাপ্ত হইয়াছি। এইজন্য এখন আর আমার বিশ্বাস হয় না। মাওলানা এই প্রসঙ্গে বলিতেছেন, এই রকমভাবে প্রত্যেকের অন্তরে নফস্ ওত পাতিয়া বসিয়া রহিয়াছে। সুযোগ বুঝিয়া প্রত্যেককে ধোকা দিতে ও হিংসা করিতে প্রেরণা যোগায়। তাহার পর বাঘের কথা উল্লেখ করিয়া বলিতেছেন, বাঘ বলিল, আমার কর্ণে ঐ কথা শুনিয়াছি যে মোমেন ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বিপদে পদক্ষেপ করেন না। অর্থাৎ, যে কাজে একবার বিপদ ঘটিয়াছে, সেই কাজ মোমেন ব্যক্তি দ্বিতীয়বার করেন না। অতএব, আমি যখন লোকের বিশ্বাসঘাতকতা দেখিয়াছি, তখন উহার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ভুল হইবে। আমি পয়গম্বর (দ:)-এর কথা জান ও দেল দিয়া গ্রহণ করিয়া লইয়াছি। এখন আর কাহারো কথায় কর্ণপাত করি না।

বন্য পশুদের চেষ্টা ও কামাইয়ের উপর অদৃষ্টের স্থান দেওয়া সম্বন্ধে বর্ণনা

জুম্‌লা গোফ্‌তান্দ আয় আমীরে বা খবর,
আল হজর দায়া লাইছা ইয়াগনী আন্‌কদর।
দর হজর শুরিদানে শুর ও শর আস্ত,
রাও তাওয়াক্কুল কুন তাওয়াক্কুল বেহতেরাস্ত।
বা কাজা পানজাহ্‌ মজান আয়তন্দ ও তেজ,
তা না গিরাদ হাম কাজা বাতু ছেতীজ।
মুরদাহ্‌ বাইয়াদ বুদে পেশে আমরে হক,
তা নাইয়ায়েদ জখমে আজ রব্বেল ফালাক।

অর্থ: সমস্ত বন্য পশুরা বলিল, আপনি সকল ভয় ও সন্দেহ ত্যাগ করুন। কেননা, ভীতি ও সন্দেহ তক্‌দীরের বিরুদ্ধে কিছুই করিতে পারিবে না। সন্দেহ করার মধ্যে শুধু হৈ চৈ ছাড়া কিছুই হয় না। তাওয়াক্কুল করা চাই, তাওয়াক্কুল-ই উত্তম। কাজা ও কদরের বিরুদ্ধাচরণ করিবেন না। তাহা হইলে কাজা ও কদর আপনার প্রতি অশান্তি দান করিবে। আল্লাহতায়ালার আদেশের সম্মুখে একদম মৃত্যের ন্যায় হইয়া যাইবেন। তাহা হইলে আল্লাহর তরফ হইতে আপনার কোনো কষ্ট হইবে না।

বাঘ বলিল, তাওয়াক্কুলের উপর সমর্পিত হওয়ার চাইতে কষ্ট করিয়া কামাই করা উত্তম

গোফ্‌তে আরে গার তাওয়াক্কুল বেহতেরাস্ত,
ইঁ ছবাব হাম ছুন্নাতে পয়গম্বরাস্ত।
গোফ্‌তে পয়গম্বর বা আওয়াজে বলন্দ,
বা তাওয়াক্কুল জানুয়ে আশ্‌তর বা বন্দ।
রমজেল কাছেবে হাবিবাল্লাহ শোনো,
আজ তাওয়াক্কুল দের ছবাবে কাহেল মানো।
দর তাওয়াক্কুল জোহোদো ও কছবো আওলাতরাস্ত,
তা হাবিবে হক্কে শওবী ইঁ বেহ্‌তরাস্ত।
রো তাওয়াক্কুল কুন তু বা কছবে আয় আমু,
জোহ্‌দে মীকুন কছবে মীকুন মু বমো।
জোহ্‌দে কুন জেন্দে নুমা তা ওয়ার হী,
ওয়ার তু আজ জোহদাশ বেমানী আবলাহী।

অর্থ: বাঘে উত্তর করিল, তোমাদের কথা সর্বজন মান্য এই মর্মে যে, তাওয়াক্কুল অতি উত্তম বস্তু। কিন্তু অসীলা অবলম্বন করাও শেষ পর্যন্ত নবী (দ:)-এর সুন্নাত। যেমন একদিন এক ব্যক্তি উটে আরোহণ করিয়া আসিয়া মসজিদে নববীর দরজার উপর উট বসাইয়া রাখিয়াছিল, কোনো রশি দিয়া বাঁধিয়া রাখে নেই। তাহাকে তখন নবী করিম (দ:) উচ্চস্বরে বলিয়াছিলেন, শুধু তাওয়াক্কুল করিও না। তাওয়াক্কুলের সহিত রশি দিয়া জানোয়ারও বাঁধিয়া রাখ, যাহাতে হাঁটিয়া যাইতে না পারে। কষ্ট করিয়া অর্জনকারীকে আল্লাহর বন্ধু বলা হয়। ইহা দ্বারা কষ্ট করিয়া অর্জন করার মহত্ব অনুমান করিতে পারা যায়। তাওয়াক্কুল করার দরুন চেষ্টা করার মধ্যে অলসতা করিও না। তাওয়াক্কুলের অবস্থায়ও চেষ্টা করা ও অর্জন করা উত্তম। তাহা হইলে তুমি হাবীবুল্লাহ, অর্থাৎ, আল্লাহর বন্ধুরূপে পরিগণিত হইতে পারিবে। অতএব, তাওয়াক্কুল কষ্ট করিয়া কামাই করার সহিত করা চাই। চেষ্টা ও তদবীর অতি উত্তমরূপে করা চাই, তবেই অলসতা হইতে মুক্তি পাইবে। আর যদি চেষ্টা ও তদবীর যাহাকে আল্লাহতায়ালা অসীলা নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন, উহা হইতে বিরত থাক, তবে বোকা বলিয়া বিবেচিত হইবে।

চেষ্টা ও তদবীর করার চাইতে তাওয়াক্কুল করা উত্তম বলিয়া বন্য পশুদের বর্ণনা

কওমে গোফ্‌ তান্দাশ ছবাবে আজ জুয়ুখে ফলক,
লোকমায়ে তাজবীরে দাঁ বর কদরে হলক।
পাছ বেদাঁকে কছবেহা আজ জুয়োফে খাছাস্ত,
দর তাওয়াক্কুল তাকিয়া বর গায়েরে খাতাস্ত।
নিস্তে কছবে আজ তাওয়াক্কুল খুবে তর,
চীস্ত আজ তাছলীমে খোদ মাহবুব তর।
বছ গরীজান্দ আজ বালা ছুয়ে বালা,
বছ জাম্বাদ আজ মারে ছুয়ে আজদাহা।
হলিা ফরদ ইনছানো ও হীলাশ দামে বুদ,
আঁফে জান পেন্দাস্ত খুনে আশাম বুদ।
দরবাবস্ত ও দুশমন আন্দরখানা বুদ।
হীলায়ে ফেরআউন জেইঁ আফছানা বুদ।
ছদ্‌ হাজারানে তেফলে কোশ্‌ত আঁকীনা কাশ,
ও আঁকে উ মী জুস্ত আন্দার খানাশ।

অর্থ: বন্য পশুরা বলিল, সাবাব বা অসীলা প্রচলিত হওয়ায় লোকের সৎসাহস কমিয়া গিয়াছে। যেমন খাদ্যের লোকমা হলকুমের (কণ্ঠনালির) আন্দাজে তৈয়ার করা হয়। রোগীর পথ্য খাদ্যের নামে প্রস্তুত করা হয়। কেননা, পুষ্টিকর শক্তিশালী খাদ্য হজম করিতে পারিবে না বলিয়া হালকা হজমের খাদ্য তৈয়ার করিয়া দেওয়া হয়। অতএব, জানিয়া রাখ, চেষ্টা তদবীর শুধু দুর্বলদের জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছে। না হইলে তাওয়াক্কুলের মধ্যে অন্যের উপর ভরসা করা অত্যন্ত দোষ। কেননা, আসবাব তো অন্যই। তাই তাওয়াক্কুল ব্যতীত অন্য কিছু্ই উত্তম হইতে পারে না। উপরন্তু, নিজেকে খোদার নিকট সমর্পণ করিয়া দেওয়ার চাইতে আর কী উত্তম হইতে পারে? অনেক মানুষ এমন আছে যে, বিপদ হইতে ভাগিয়া বিপদের মধ্যেই পতিত হয়। যেমন সাপের ভয়ে পালাইয়া আজদাহার নিকট যাইয়া উপস্থিত হয়। অর্থাৎ, মানুষে নিজের ভালাইর জন্য তদবীর করে। কিন্তু ঐ তদবীর-ই তাহার জন্য ফাঁদ হইয়া দেখা দেয়। যাহাকে বন্ধু মনে করিয়াছিল, সে-ই ঘাতক বলিয়া প্রমাণিত হয়। এইরূপ দৃষ্টান্ত হইতে পারে যে, কেহ শত্রুর ভয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করিল। ঘটনাক্রমে ঘরের মধ্যেই শত্রু রহিয়া গেল। যেমন ফেরাউনের চেষ্টাও এই প্রকারের ছিল। লক্ষ লক্ষ শিশু বাচ্চা হত্যা করিয়া ফেলিল, কিন্তু যাহাকে হত্যা করার উদ্দেশ্য ছিল, সে তাহার ঘরেই ছিল, অর্থাৎ, হজরত মূসা (আ:)। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, চেষ্টা ও তদবীর দ্বারা কিছুই ফল লাভ করা যায় না।

দীদায়ে মা চুঁ বছে ইল্লাতে দরুস্ত,
রউফানা কুন দীদে খোদ দর দীদে দোস্ত।
দীদে মারা দীদে উ নেয়ামূল এউজ,
ইয়াবি আন্দার দীদে উ কুল্লি গরজ।
তেফ্‌লে তা গীর উ তা পুইয়া না বুদ।
মারকাবাশ জয্‌ গরদানে বাবা না বুদ।
চুঁ ফজুলি করদো ও দস্তো পা নামুদ,
দর ইনা উফ্‌তাদ ও কোরো ও কাবুদ।

অর্থ: যখন আমাদের চেষ্টা ও তদবীরের মধ্যে হাজারো খারাবি দেখা যায়, তখন আমাদের চেষ্টা ও তদবীর আল্লাহর নিকট সমর্পণ করাই উত্তম। ইহাকেই তাওয়াক্কুল বলা হয়। কেননা, আল্লাহর তদবীর আমাদের তদবীরের পরিবর্তে কত উত্তম। যদি আমাদের চেষ্টা ও তদবীর ত্যাগ করিয়া দেই, তবে আল্লাহ আমাদের জন্য বন্দোবস্ত করিবেন এবং তাঁহার তদবীরের মারফত আমরা সব কিছুই হাসেল করিতে পারিব। ইহার দৃষ্টান্ত, যেমন বাচ্চা যখন পর্যন্ত হাত দিয়া ধরিতে না শিখে এবং পা দিয়া হাঁটিতে না পারে, ততদিন পর্যন্ত ধাইমার কাঁধে চড়িয়া বেড়ায়। যদি নিজে ইচ্ছা করিয়া হাত পা বাড়ায় তবে কষ্টে পতিত হয়। ঐরূপভাবে বান্দারও একই অবস্থা; যদি তাওয়াক্কুল করিয়া হাত পা শূন্য হইয়া যায়, তবে আল্লাহ তাহার জন্য সাহায্যকারী হইয়া যান। আর যে ব্যক্তি নিজে নিজে কামাই রোজগারের চেষ্টা ও তদবীর করে, সে নিজেই নিজের জিম্মাদার হইয়া যায়।

জানে হায়ে খলকে পেশ আজ দস্তো পা,
মী পরিদান্দ আজ ওফা ছুয়ে ছাফা।
চুঁ বা আমরে ইহ্‌বেতু বন্দি শোদান্দ,
হাবছে খশমো ও হেরছো খো রছান্দি শোদান্দ।
বা আয়ালে হজরতেম ও শের খাহ্‌,
গোফ্‌তেল খলকে আয়ালুন লিল ইলাহ্‌।
আঁ কে উ আজ আছমান বারাঁ দেহাদ,
হাম তাওয়ানাদ কো জে রহমত নানে দেহাদ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, আমাদের রূহসমূহ দেহের মধ্যে আবদ্ধ হওয়ার আগে আল্লাহর মহব্বতে আল্লাহর দরবারে উড়িতেছিল। যখন আল্লাহর আদেশে দেহের মধ্যে আবদ্ধ হইল, তখন হইতেই রূহসমূহ মানবিক গুণে, অর্থাৎ, লোভ, লালসা, ক্রোধ ও খুশীর গুণে গুণান্বিত হইল এবং আল্‌মে সাফা হইতে অবতরণ করিয়া এই দুনিয়ায় আসিল। মাওলানা বলেন, আমরা ঐ আলমে আরওয়াহর মধ্যে খোদার নিকট শিশু বাচ্চার ন্যায় দুধ পান করিতাম। হাত পায়ের কোনো প্রয়োজন ছিল না। উড়িয়া বেড়াইতাম। মহা আনন্দে কাল কাটাইতাম। সেইখান থেকে পৃথক হইয়া আসিয়া আমরা দুঃখজনক অবস্থায় পতিত হইয়াছি। তাই আমাদের রূহ সর্বদা বিরহ বেদনায় কাঁদিয়া কাটাইতেছে। যেমন, এই ’মসনবী’র প্রথমেই বিরহ বেদনার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। আমরা যেমন আলমে আরওয়াহের মধ্যে হাত-পা হীন অবস্থায় আল্লাহর প্রতিপালনে ও তাঁহার হেফাজতে ছিলাম। এখন হাত পা থাকা অবস্থায়ও সেই রকম থাকাই ভাল। আল্লাহর কাছেই আমরা আমাদের রোজীর প্রার্থনা করিব। তদবীর কেন করিব? কেননা, আল্লাহ নিজেই আসমান হইতে বৃষ্টি দান করেন, যদ্বারা আমরা কৃষির কাজ করি। তিনি ইহাও পারেন যে, তাঁহার রহমত দ্বারা আমাদিগকে রুটি দান করিবেন। আমরা সোজা পথে ইহা কামনা করিব না কেন?

রোজে দীগার ওয়াক্তে দউয়ানো ও লেকা,
শাহ ছোলাইমান গোফ্‌তে আজরাইল রা।
কা আঁ মোছলমান রা বখশমে আজ চেছবাব,
বেংগরিদী বাজে গো আয় পেকে রব।
আয় আজব ইঁ করদাহ বাশী বহরে আঁ
তা শওয়াদ আওয়ারাহ্‌ উ আজ খানোমান।
গোফতাশ আয় শাহে জাহাঁ বজওয়াল,
ফাহ্‌মে কাজ কর্‌দ ও নামুদ উ রা খেয়াল।
মান দরু আজ খশমে কায়ে করদাম নজর,
আজ তায়াজ্জুব দীদামাশ দররাহে গোজার।
কে মরা ফরমুদে হক কা মরো জেহাঁ,
জানে উ রা তু ব হিন্দুস্তান ছেতা।
দীদামাশ ইঁজা ও বছ হয়রাণ শোদাম,
দর তাফাক্কুর রফতাহ্‌ ছার গরদান শোদাম।
আজ আজব গোফতাম গার উ রা ছদ পোরুস্ত,
জু বা হিন্দাস্তান শোদান দূর আন্দারাত।
চুঁ বা আমরে হক ব হিন্দুস্তান শোদাম,
দীদামাশ আঁজা ও জানাশ বছতাদাম।
তু হামা কারে জাহাঁ রা হাম চুনিঁ,
কুন কিয়াছ ও চশমে ব কোশাও বা বীনিঁ।
আজ কে ব গোরিজেম আজ খোদ আয় মহাল,
আজ কে বর তা বেম আজ হক আয় ওবাল।

অর্থ: দ্বিতীয় দিন হজরত সোলাইমান (আ:) যখন দরবারে বসিলেন এবং হজরত আজরাইল (আ:)-এর সাথে সাক্ষাৎ হইল, তখন হজরত সোলাইমান (আ:) হজরত আজরাইল (আ:)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, কী কারণে আপনি ঐ গরীব মোসলমান বেচারাকে ক্রোধের দৃষ্টিতে দেখিলেন? ইহা বড় আশ্চর্যের ব্যাপার। এইজন্য কি আপনি তাহার প্রতি কুপিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়াছেন যে, তাহার মান-ইজ্জাত হইতে বিমুখ করিয়া দিতে চান? হজরত আজরাইল (আ:) উত্তর করিলেন, হে দীনের বাদশাহ! সে ব্যক্তি ভুল বুঝিয়াছে, আমার ক্রোধান্বিত হওয়া তাহার খেয়ালের বুঝ। নচেৎ আমি তাহাকে কখন ক্রোধের নজরে দেখিয়াছি? বরং তাহাকে আমি শুধু রাস্তায় চলিতে দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়াছি। কেননা, আল্লাহতায়ালা আমাকে আদেশ করিয়াছেন যে তাহাকে আজ হিন্দুস্তানে বসিয়া জান কবজ করিয়া আনো। তাই আমি এখন তাহাকে এখানে দেখিয়া হয়রান হইয়া পড়িয়াছি এবং চিন্তায় মাথা ঘুরিতেছিল। আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিতেছিলাম, যদি ইহার হাজারো পাখা বাহির হইয়া আসে তবুও সে হিন্দুস্তানে যাইয়া পৌঁছিতে পারিবে না। তারপর যখন হিন্দুস্তানে যাইয়া পৌঁছিল, এবং আমিও যাইয়া সেখানে তাহাকে পাইলাম, জান কবজ করিয়া লইলাম। মওলানা এখন নসীহাতচ্ছলে বলিতেছেন যে, তোমরা সমগ্র পৃথিবীর কাণ্ডকারখানা এই রকমভাবে মনে করিয়া লও এবং ভালভাবে অনুমান করিয়া লও, চক্ষু খুলিয়া দেখিয়া লও যে, বান্দা তাকদীর হইতে ভাগিয়া যাইয়া তাকদীরের জালেই আবদ্ধ হইল। আমরা কী হইতে ভাগিয়া যাই? নিজের ধাত হইতে ভাগিয়া যাই? ইহা সম্পূর্ণ অসম্ভব। অর্থাৎ, যেমন নিজের জ্ঞান হইতে ভাগিয়া যাওয়া অসম্ভব, সেই রকম আল্লাহতায়ালা, যিনি জানের চাইতেও নিকটবর্তী তাঁহার নিকট হইতে ভাগিয়া যাওয়া আরো অসম্ভব। দ্বিতীয় পংক্তিতে পরিষ্কার করিয়া বলা হইয়াছে যে, আমরা কাহার নিকট হইতে মুখ ফিরাইয়া লই? আল্লাহর নিকট হইতে? ইহা মস্ত বড় বিপদের কথা।

পুনরায় বাঘ চেষ্টা ও তদবীরকে তাওয়াক্কুলের উপর প্রাধান্য দেওয়ার বর্ণনা

শের গোফ্‌তে আরে ওয়ালেকীন হাম বা বীন,
জোহদ হায়ে আম্বিয়া ও মুরছালীন।
ছায়ীয়ে আবরারো জেহাদে মোমেনাঁ,
তাবদীঁ ছায়াতে জে আগাজে জাহাঁ।
হক তায়ালা জোহ্‌দে শানেরা বাসত্ কর্‌দ,
আঁ চে দীদান্দ আজ জাফা ও গরমে ছরদ।
হীলা হা শানে জুমলা হালে আমদ লতিফ,
কুল্লু শাইয়েম মেন জরিফেন হো জরীফ।
দামেহা শানে মোরগ গেরদনী গেরেফ্‌ত,
নকচেহা শানে জুমলা আফ্‌জুনি গেরেফ্‌ত।
জোহদ মী কুন তা তাওয়ানী আয়কেয়া,
দর তরীকে আম্বিয়া ও আওলিয়া।
বা কাজা পাঞ্জা জাদান নাবুদ জেহাদ,
জা আঁকে ইঁরাহাম কাজা বর মানেহা।
কা ফেরাম মান গার জীয়ানে করদাস্ত কাছ,
দররাহে ঈমান ও তায়াতে এক নফছ।
ছার শেকাস্তাহ নিস্তে হায়েঁ ছাররা বন্দ,
এক দো রোজাক জোহদ কুন বাকী ব খান্দ।

অর্থ: বাঘ উত্তর করিল, তোমাদের কথা স্বীকৃত। কিন্তু, হজরত আম্বিয়া ও মুরসালীন (আ:)-গণের চেষ্টা ও কষ্ট করা, নেক লোকদের কষ্ট করা ও মোমিনদের জেহাদ করা দুনিয়ার প্রথম হইতে আজ পর্যন্ত যাহা কিছু ঘটিয়াছে, উহাও দেখা দরকার। শেষ পর্যন্ত তাঁহারা যত প্রকার কষ্ট ও যাতনা ভোগ করিয়াছেন, আল্লাহতায়ালা তাঁহাদের চেষ্টা ও যত্নকে ঠিক বলিয়া গণ্য করিয়া নিয়াছেন। এবং তাহাদের চেষ্টা ও তদবীর সব সময়ই আল্লাহর নিকট প্রিয় বলিয়া বিবেচিত হইয়াছে। আর হইবেই বা না কেন? যাহা  ভালোর তরফ হইতে হইয়া থাকে, উহা ভাল বলিয়া বিবেচিত হয়। নবী-আম্বিয়া (আ:)-গণের কাজের লাগাম আসমানী মোরগ ধরিয়া থাকে। তাঁহাদের ধর্মে যাহা কমতি ছিল, তাহা উন্নতি লাভ করিয়া গিয়াছে। যখন চেষ্টা ও তদবীর আম্বিয়া (আ:)-গণের সুন্নাত বলিয়া প্রমাণ হইল, তখন হে মানুষ, তুমি যত চালাকই হওনা কেন, যতদূর সম্ভব আওলিয়া (রহ:) ও আম্বিয় (আ:)-গণের পথে চলিতে চেষ্ট কর। কাজার উপর হাতে চেষ্টা করা কাজার সাথে যুদ্ধ করা হয় না। কেননা, উহা ত কাজা দ্বারাই নির্দিষ্ট করা হইয়াছে। মাওলানা কসম করিয়া বলিতেছেন, যদি কোনো ঈমানদার ব্যক্তি খোদার ইবাদাতে কষ্ট করিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তথাপি তাহাকে কষ্ট করিয়া চেষ্টা করা হইতে বিরত হওয়া চলিবে না। তোমার হাত-পা সুস্থ থাকিতে উহাকে বেকার রাখা, যেমন তোমার মাথা সুস্থ ও সঠিক আছে, কোনো জখম হয় নাই, তবুও মাথায় পট্টি বাঁধা চলিবে না। সামান্য কালের জন্য কিছু মেহনত করিয়া লও, যদ্বারা নেক আমলের কিছু সম্বল জমা করা হয়। তার পর সর্বদা শান্তিতে ও খুশীতে থাকিতে পারিবে।

বদ মহালে জুস্তো কো দুনিয়া বা জুস্ত,
নেক হালে জুস্তো কো উক্‌রা বা জুস্ত।
মকরেহা দর কছবে দুনিয়া বারেদন্ত,
মকরেহা দর তরকে দুনিয়া ওয়ারেদাস্ত।
মকরে আঁ বাশদ কে জেন্দানে হুফরাহ্‌ করদ্‌,
আঁ কে হুফরাহ্‌ বস্তে আঁ মকরীস্ত ছরদ।
ইঁ জহান জেন্দানে ওমা জেন্দানিয়া
হুফ্‌রাহ্‌ কুন জেন্দানে ও খোদরা ওয়ারে হাঁ।

অর্থ: এখানে পরকালের শাস্তির দিক লক্ষ্য রাখিয়া দুনিয়ায় নেক আমল করার জন্য উৎসাহ দিয়া মাওলানা বলিতেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়ার শান্তির জন্য শুধু পরিশ্রম করে, সে অত্যন্ত খারাপ কাজ করে এবং ভিত্তিহীন কাজ করে। আর যে ব্যাক্তি পরকালের শান্তির জন্য কাজ করে, সে প্রশংসনীয় কাজ করে। তাহা দ্বারা সে পরকালে শান্তির পথ পাইবে। দুনিয়ার কামাইয়ের জন্য তদবীর করা বোকামী ছাড়া আর কিছুই নহে। দুনিয়া তরক করার জন্য আয়াতে কোরানে ও হাদীসে নির্দেশ আছে। দুনিয়া মুমিনদের জন্য কয়েদখানা স্বরূপ। অতএব, কয়েদখানা ভাঙ্গিয়া মুক্তি পাইবার জন্য চেষ্টা ও তদবীর করা উত্তম কাজ। আর যে ব্যক্তি কয়েদখানায় থাকিয়া উহা ভাঙ্গিয়া বাহির হইবার চেষ্টা করে না, বরং স্থায়ীভাবে কয়েদখানায় থাকিবার চেষ্টা করে, সে চিরদিনই কয়েদখানায় আবদ্ধ থাকিবে। যেমন, ইহকালে দুনিয়ার কষ্টে আবদ্ধ থাকে, তেমন পরকালেও দোজখের মধ্যে অগ্নিতে আবদ্ধ থাকিবে।

চীস্তে দুনিয়া আজ খোদা গাফেল বুনাদ,
নায়ে কামাশ ও নকরা ও ফরজান্দো জন।
মালেরাগার বহ্‌রে দীনে বাশী হামুল,
নেয়মা মালুন ছালেহুন খোন্দাশ রছুল।
আবে দর কাস্তি হালাকে কাস্তি আস্ত,
আবে আন্দর জীরে কাস্তি পুস্তি আস্ত।
চুঁকে মালো ও মূলকেরা আজ দেল বুরান্দ,
জে আঁ ছোলাইমানে খেশ জুয্‌ মিকীন নাখান্দ।
কুজায়ে ছার বস্তাহ্‌ আন্দর আবে জাফাত,
আজ দেল পুরবাদ ফওকে আবে রাফাত।
বাদে দরবেশী চু দর বাতেনে বুয়াদে,
বরছারে আবে জাহাঁ ছাকেন বুয়াদ।
আবে না তাওয়ানাদ মর উরা গোতাহ্‌ দাদ্‌
কাশে দে আজ নফখাহ্‌ ইলাহী গাস্তশাদ।
গারচে জুমলাহ্‌ ইঁ জাহাঁ মুলকে ওয়ারেস্ত,
মুলকে দর চশমে দেলে উ লাশায়েস্ত।
পাছ দেহানে দেল বা বন্দ ও মহর কুন,
পুর কুনাশ আজ বাদে কেবরা মিল্লাদুন।

অর্থ: এখানে মাওলানা দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করিতেছেন। তিনি বলেন, দুনিয়া অর্থ খোদাতায়ালা হইতে ভুলিয়া যাওয়া। কোনো ধন-দৌলত বা স্ত্রী-পুত্রের নাম নয়, প্রকৃত পক্ষে দুনিয়া ঐ অবস্থার নাম, যে অবস্থা মানুষের মৃত্যুর পূর্বক্ষণে হয়। চাই সে অবস্থা ভাল হউক অথবা মন্দ। যদি সে অবস্থা আখেরাতের জন্য শুভ না হয়, তবে সে দুনিয়া মন্দ এবং দুনিয়া শব্দ প্রায়ই এই অর্থে ব্যবহার করা হয়। আর যদি আখেরাতের জন্য শুভ হয়, তবে সে দুনিয়া অতি উত্তম। আখেরাতে শুভ ফলদায়ক দুনিয়া কোনো সময়ই মন্দ নয়। কেননা, সম্পদ যদি নিজের কাছে দ্বীনের খেদমতের জন্য রাখ, যেমন নবী করিম (দ:) ফরমাইয়াছেন, নেয়মাল মালুছ ছালেহো লিররাজুলেছ ছালেহ্‌। অর্থাৎ, নেক লোকের জন্য নেক মাল অতি উত্তম বস্তু। মাল দুনিয়ায় ক্ষতিকারক বস্তু নয়। মালের মহব্বত অন্তরে দূষণীয়। ইহার দৃষ্টান্ত এইরূপ, যেমন, পানি যদি নৌকার মধ্যে প্রবেশ করে তবে নৌকা ডুবিয়া যায়। আর যদি নৌকার নিচে হয়, তবে নৌকা চলনে খুব সুবিধা হয়। অতএব, দুনিয়া পানির ন্যায় এবং অন্তর নৌকার মতন। যদি দুনিয়া এবং ইহার ধন-সম্পদের মহব্বত অন্তরে বিঁধিয়া যায়, তবে অন্তর নিশ্চয়ই খারাপ হইয়া যায়। আর যদি দুনিয়ার মাল-সম্পদ অন্তরের বাহিরে থাকে, অর্থাৎ হাতে থাকে তবে দ্বীনের সাহায্য হইতে পারে। এই কারণেই হজরত সোলাইমান (আ:) এত মরতবা এবং ধন-দৌলতের অধিকারী হইয়াও তাঁহার অন্তরে বাদশাহী ও ধন-দৌলতের মহব্বত প্রবেশ করিতে পারে নাই। এই জন্যই তিনি নিজেকে মিসকীনের ন্যায় মনে করিতেন। বিলকীস বিবিকে যে পত্র দিয়াছিলেন, তাহাতে তিনি শুধু ’সোলাইমানের তরফ হইতে’ এই বাক্য লিখিয়াছিলেন। বাদশাহ্‌দের ন্যায় কোনো উপাধি বা পদের নাম উল্লেখ করেন নাই। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, হজরত সোলাইমান (আ:)-এর অন্তরে দুনিয়ার কোনো মহব্বত প্রবেশ করে নেই। দুনিয়াদারী অর্থ দুনিয়ার মহব্বত অন্তরে থাকা। দ্বিতীয় উদাহরণ হইল, একটি ঘটি বা লোটার মুখ বন্ধ করিয়া দিয়া গভীর পানিতে ছাড়িয়া দিলে উহার ভিতরে বায়ু পরিপূর্ণ থাকে বলিয়া পানিতে ডুবিয়া যায় না। পানির উপরে ভাসিতে থাকে। এইভাবে আল্লাহর মহব্বতের জোশে অন্তর পরিপূর্ণ থাকিলে, সে দুনিয়ার উপর শান্তিতে বসবাস করিতে পারিবে। দুনিয়ার মহব্বতে কোনো সময় পড়িবে না এবং ডুবিয়াও যাইবে না। কেননা, তাহার অন্তর আল্লাহর মহব্বতের বায়ুতে সর্বদা পরিপূর্ণ। সে শান্তিতে সন্তুষ্ট থাকিবে। যদিও সে সমস্ত জাহানের বাদশাহ হয়, তথাপি তাহার নজরে বাদশাহী কিছু না বলিয়াই মনে হইবে। ইহা দ্বারা বুঝা গেল, যাহার অন্তর ইশকে এলাহী মা’রেফাতে রব্বানীতে পরিপূর্ণ, সে কখনও দুনিয়ার মহব্বতে ডুবিয়া যাইবে না। অতএব, তোমাদের উচিত তোমাদের অন্তর আল্লাহর বুজর্গির বায়ু দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া মোহর মারিয়া অন্তরের মুখ বন্ধ করিয়া দেওয়া। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর মহব্বত অন্তরে প্রবেশ করিতে দিও না, তবে তুমি মুখ বন্ধ করা ঘটির ন্যায় দুনিয়ার উপর ভাসিতে পারিবে।

কছবে কুন জোহ্‌দে নুমা ছায়ী বকুন।
তা বদানী ছেররে এল্‌মে মিল্লাদুন।
জোহদ হকাস্ত ও দাওয়া হকাস্ত ও দরদ,
মুনকার আন্দর নফি জোহ্‌দাশ জোযদ করদ।
গারচে ইঁ জুমলা জাহাঁ পোর জোহ্‌ দ শোদ,
জোহদ কে দর কামে জাহেল শহদ শোদ।

অর্থ: এখানে মাওলানা বলিতেছেন, তোমরা কষ্ট কর, চেষ্টা কর, তবে তোমরা আল্লাহর এলেমের রহস্য বুঝিতে পারিবে যে, কাজ এবং কাজের সাবাবের মধ্যে কী কী সম্বন্ধ নিহিত আছে। কষ্ট করা চাই, ইহা ঠিক সত্য। ব্যথা সত্য, দাওয়াও সত্য। যেমন ব্যথা কারণ হিসাবে দেখা দেয় ঔষধ ব্যবহার করার জন্য। আবার ঔষধ কারণ হয় চেষ্টা ও কষ্ট করিয়া ঔষধ হাসেল করার জন্য। এই সব প্রমাণ দেওয়া হইতেছে সাবাবকে সত্য প্রমাণ করার জন্য। জোহদ (কৃচ্ছ্বব্রত) অস্বীকারকারী নিজেই জোহদ করিয়া জোহদকে অস্বীকার করে। যদি জোহদ শুধু বাতেল হইত, তবে সে কেন জোহদ করিয়া অস্বীকার করে? যাহার মধ্যে অজ্ঞতা বিরাজ করিতেছে, তাহার অবস্থা এইরূপই হয়। যদি সমগ্র জাহান জোহদ দ্বারা পরিপূর্ণ হইয়া যায়, দিন রাত ইহার ধারা প্রবাহিত থাকে, তাহা হইলেও অজ্ঞ লোকের মগজে ইহা মধু হইয়া কখনও কি ঢুকিবে?

তাওয়াক্কুলের চাইতে চেষ্টা ও কষ্ট করার প্রাধান্য নির্ধারিত হওয়া

জীঁ নম্‌তে বেছিয়ার বুরহানে গোফ্‌ত শের,
কাজ জওয়ারে আঁ যবরিয়ানে গাস্তান্দ ছায়ের।
রোবা ও আহু ও খরগোশ ও শেগাল,
যবর্‌রা ব গোজাস্তান্দ ও কীল ও কাল।
আহাদ্‌হা করদান্দ বা শেরে জিয়াঁ,
কান্দরীঁ বয়েতে না ইয়াফতাদ দর জবান।
কেছমে হর রোজাশ বইয়ায়েদ বে জরার,
হাজতাশ নাবুদ তাকাজায়ে দিগার।
আহাদে চুঁ বছতান্দ ও রফতান্দ আঁ জমান,
ছুয়ে মারয়া আয়মান আজ শেরে জিয়ান।
জমায়া ব নেশাছতান্দ একজা আঁ ওহুশ,
উফতাদাহ্‌ দরমীয়ানে জুমলা জোশ।
হর কাছে তদবীর ওয়ারায়ে মীজাদান্দ,
হর একে দর খুনে হর এক মী শোদান্দ।
আকেবাত শোদ ইত্তেফাকে জুমলা শাঁ,
তা বইয়ায়েদ কোরয়া আন্দর মীয়া।
কোরয়া বর হরকে উফ্‌তাদ উ তায়ামাস্ত,
বে ছোখান শেরে জীয়ানেরা লোক্‌মাস্ত।
হাম বর ইঁ করদান্দ আঁ জুমলা করার,
কোরয়া আমদ ছার বছার রা ইখতিয়ার।
কোরয়া বর হর কোফ্‌তাদে রোজে রোজ,
ছুঁয়ে আঁ শের উ দাবীদে হামচু ইউজ।

অর্থ: বাঘ এমনভাবে চেষ্টা ও তদবীরের প্রমাণাদি পেশ করিল যে, বন্য পশুদের আর উত্তর করিবার সুযোগ রহিল না। প্রত্যেকে যবর সম্বন্ধে উচ্চবাচ্য করা ত্যাগ করিল। হিংস্র বাঘের নিকট প্রতিজ্ঞা করিল যে, প্রতিজ্ঞার মুদ্দাতের মধ্যে বাঘের কোনো প্রকার কষ্ট স্বীকার করিতে হইবে না। প্রত্যেক দিন তাহার নিকট প্রত্যেক দিনের খাবারের ভাগ বিনা কষ্টে যাইয়া পৌঁছিবে এবং তাহাকে কোনো কিছুর জন্য বলিতে হইবে না। এইরূপ ওয়াদা ও প্রতিজ্ঞা করিয়া ও করাইয়া বন্য পশুরা সকলেই নিশ্চিন্তায় চারণভূমিতে ফিরিয়া গেল, এবং সকলেই একত্রিত হইয়া এক জায়গায় বসিল। প্রত্যেকের মধ্যেই এক প্রকার উত্তেজনা প্রকাশ পাইতেছিল। প্রত্যেকেই বিভিন্ন রায় এবং তদবীর পেশ করিতেছিল, প্রত্যেকেই চিন্তা করিতেছিল যে, নিজে বাঁচিয়া যাইবে এবং অন্যকে বাঘের খোরাক হিসাবে পাঠাইবে। অবশেষে সিদ্ধান্ত হইল যে, লটারি ধরিয়া নির্ণয় করিতে হইবে। যাহার নাম লটারিতে উঠিবে, তাহাকেই বাঘের খাদ্য হিসাবে পাঠাইবে। এই সিদ্ধান্তে সকলেই বাধ্য হইল, লটারী ধরাই সবে পছন্দ করিল। তারপর এই নিয়মই হইল যে, যাহার নাম লটারীতে উঠে, সেই-ই দৌড়াইয়া বাঘের নিকট যাইয়া উপস্থিত হইত। চীতা বাঘের ন্যায়, অর্থাৎ, খুব তাড়াতাড়ি দৌড়াইয়া বাঘের মুখের কাছে হাজির হইত।

খরগোশ বাঘের কাছে বিলম্বে যাওয়া, বন্য পশুদের অস্বীকার করা সম্বন্ধে বর্ণনা

চুঁ ব খরগোশ আমদ ইঁ ছাগের ব দাউর,
বাংগে জাদ খরগোশ কা আখের চান্দে জওর।
কওমে গোফ্‌তান্দাশ কে চান্দে ইঁ গাহে মা,
জান ফেদা করদেম দর আহাদো ওফা।
তু মজো বদনামী সা আয় অনুদ,
তা রঞ্জাদ শেরে রো তু জুদে জুদ।

অর্থ: যখন বাঘের খাদ্যের জন্য যাইবার পালা খরগোশের আসিল, তখন খরগোশ চিৎকার করিয়া উঠিয়া বলিল, শেষ পর্যন্ত এই রকম জুলুম কতদিন পর্যন্ত চলিতে থাকিবে? অন্য পশুরা বলিল, দেখো, এতদিন পর্যন্ত আমরা আমাদের ওয়াদা পূরণ করার জন্য আমাদের জান কোরবান করিয়া দিয়া আসিতেছি। যাহাতে বাঘের সাথে ওয়াদা খেলাফী না হয়। তুমি এখন আমাদের বদনাম করিও না, তুমি জলদি করিয়া যাও। তাহা হইলে বাঘে কষ্ট পাইবে না।

খরগোশের বন্য পশুদের কাছে উত্তর দেওয়া এবং ইহাদের নিকট বাঘের নিকট বিলম্বে গমনের সময় চাওয়ার বর্ণনা

গোফ্‌তে আয় ইয়ারাণে মরা মেহলাত দেহেদ,
তা ব মকরাম আজ বালা বীরুঁ জাহীদ।
তা আমান ইয়াবদ ব মকরাম জানে তান,
মানাদ ইঁ মীরাছ ফরজান্দানে তান।
হর পয়ম্বর উম্মাতানেরা দর জাহাঁ,
হামচুনীঁ তা মোখলেচী মী খানাদ শাঁ।
কাজ ফালাক রাহে বীরুঁ শো দীদাহ্‌ বুদ,
দর নজরে চুঁ মরদেমাক পীচীদাহ্‌ বুদ।
মরদামাশ চুঁ মরদেমাক দীদান্দ খোরদ,
দর বোজর্গি মরদেমাক কাছরাহ্‌ নাবোরদ।

অর্থ: খরগোশ বলিল, আমাকে কিছু সময় দাও, তাহা হইলে আমার তদবীর দ্বারা দৈনিক মুসিবত হইতে রেহাই পাইবে এবং তোমাদের জানসমূহ মুক্তি পাইবে। তোমাদের ফরজন্দেরা মীরাস্ সূত্রে এই সবুজ চারণভূমির মালিক হইবে। তাহা না হইলে যদি এইরূপ প্রথা তোমাদের চলিতে থাকে, তবে একদিন আপন হইতেই সকলের শেষ হইয়া যাইতে হইবে এবং চারণভুমি বাঘের অধীনে চলিয়া যাইবে। অতঃপর মাওলানা বলিতেছেন, এইভাবে সমস্ত আম্বিয়া আলাইহেমুচ্ছালামগণ নিজ নিজ উম্মৎদিগকে তাহাদের মুক্তির পথে ডাকিতে থাকিতেন। কেননা, তাঁহারা এই আকাশ দ্বারা সীমাবদ্ধ দুনিয়া হইতে বাহির হইয়া যাইবার রাস্তা অন্তরের আলো দিয়া দেখিতেন এবং সেই পথে নিজেদের উম্মৎদিগকে নিয়া যাইবার চেষ্টা-তদবীর করিতেন। কেননা, সমস্ত আম্বিয়াগণের চেষ্টা ও কষ্ট করার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, দুনিয়ার সম্বন্ধ ত্যাগ করিয়া আখেরাতের সহিত সম্বন্ধ কর। কিন্তু সাধারণ লোকের জানা ছিল না যে, আম্বিয়া আলাইহেমুচ্ছালামগণের এইরূপ দেখার শক্তি আছে। কেননা, সাধারণ লোকের চক্ষে তাঁহারা নয়নের পুতুলের ন্যায় ছিলেন। তাঁহাদের অভ্যন্তরীন অবস্থা গুপ্ত ছিল। প্রকাশ্য দৃষ্টিতে তাঁহাদিগকে ছোট দেহবিশিষ্ট এবং সামান্য মরতবা-ওয়ালা দেখিতে লাগিত। লোকের খেয়াল হইত না যে, তাঁহাদের মধ্যে এত বড় দেখার শক্তির গুণ নিহিত আছে। কিন্তু বুঝিয়া লও, তাঁহাদের দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা কত পরিমাণ ছিল। এইভাবে আম্বিয়াগণকে (আঃ) নয়নের পুতুলের ন্যায় ছোট মনে করিয়াছে। কিন্তু পুতুলের বুজর্গির মধ্যে কেহ চিন্তা করে নাই।

বন্য পশুদের খরগোশের কথার প্রতিবাদ করা

কওমে গোফতান্দাশকে আয় খরগোশে জার,
খেশরা আন্দাজায়ে খরগোশে দার।
হায়েঁ চে লাফাস্ত ইঁ কে আজ তু মেহতরাঁ,
দর নাইয়া ওরদান্দ আন্দর খাতেরে আঁ।
মায়াজাবী ইয়াখোদ কাজা মান দর পায়েস্ত।
ওয়ারনা ইঁ দম লায়েক চুঁ তু কায়েস্ত।

অর্থ: বন্য পশুরা বলিল, হে হীন খরগোশ! নিজে নিজেকে খরগোশের মরতবায় রাখ, ইহা তুমি জংলী বৃদ্ধ পশুর ন্যায় বলিতেছ। কেননা, যে তোমার চাইতে বড়, সে ত তোমার ন্যায় এই রকম কথার খেয়ালও করে নাই। অতএব, ইহা হয়ত তুমি নিজেই পছন্দ করিয়া বিপদে পতিত হইতেছ। অথবা আমাদের সকলের মৃত্যু ঘনাইয়াছে। এত বড় লম্বা চওড়া দাবী তোমার মত জীবের করা সমুচিত বলিয়া মনে হয় না। কেননা, তুমি সব দিক দিয়াই হীন।

পুনরায় খরগোশের পশুদিগকে উত্তর করা

গোফতে আয় ইয়ারানে হকাম এলহাম দাদ,
মর জয়ীফেরা কওমী রায়ে ফাতাদ।
আঁচে হক আমুখত মর জম্বুরে রা,
আঁ নাবাশদ শেরেরাও গোরে রা।
খানেহা ছাজাদ পুর আজ হালওয়ায়ে তর,
হক বর ওয়া এলমে রা বকোশাদ দর।
আঁচে হক আমুখত করমে পীলারা,
হীচ পীলে দানাদ আঁ গোঁহীলারা।

অর্থ: খরগোশ উত্তর করিল, প্রকৃতপক্ষে আমি দুর্বল ও হীন, আমি কী এবং আমার রায়-ই বা কী? কিন্তু ইহা আমার রায়ের ফলাফল নয়। বরং আল্লাহতায়ালা আমার কাছে যে এলহাম (ঐশী প্রত্যাদেশ) পাঠাইয়াছেন, ঐ এলহামের দরুন এক দুর্বলের অন্তঃকরণে শক্তিশালী রায় আসিয়া পৌঁছিয়াছে। দুর্বল সৃষ্ট জীবের নিকট এলহাম আসা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। যেমন দেখ, আল্লাহতায়ালা মধুমক্ষিকাকে এল্‌হামের মারফত যাহা শিক্ষা দিয়াছেন, উহা মহা শক্তিশালী বাঘ ও বন্য গাধাকেও শিক্ষা দেন নাই। কেননা, মধুমক্ষিকা ফুল চোষণ করিয়া মধু তৈয়ার করে, তাহারা নিজেদের ঘর কীরূপ সুন্দর করিয়া তৈয়ার করে। ব্যাঘ্র বা বন্য গাধা এইরূপ হেকমাত কোথায় পাইবে? তাই মাওলানা বলেন, মধুমক্ষিকা এমন সুন্দর সুন্দর ঘর তৈয়ার করে যে ইহা মধুপূর্ণ থাকে। আল্লাহ তায়ালা এইরূপ বিশেষ বিদ্যা ঐ মধুমক্ষিকাকে শিক্ষা দিয়াছেন। এইভাবে আল্লাহতায়ালা রেশমের পোকাকে রেশম তৈয়ার করার ক্ষমতা শিক্ষা দিয়াছেন। হাতী এত বড় জানোয়ার হইয়াও রেশম বানানোর তদবীর জানে না। অতএব, ইহা দ্বারা বোঝা গেল যে এল্‌হাম আসা ও না আসার ভিত্তি, শক্তি অথবা দুর্বলতার উপর নির্ভর করে না।

আদ্‌মে খাকী জে হক্‌ আমুখত এল্‌ম,
তা ব হাপ্তমে আছমান আফ্‌রুখত এল্‌ম।
নামো নামুচ্ছে মুলকেরা দর শেকাস্ত,
মোরে আঁ কাছফে বা হক্কে দর শেকাস্ত।
জাহেদে শশছদ হাজারানে ছালাহ্‌ রা
পুজেবন্দে ছাখতে আঁ গোছালারা।
তা নাতানাদ শেরে এলমে দীনে কাশীদ,
তা না গরদাদ গেরদে আঁ কাছরে মাশীদ।
ইলমে হায়ে আহ্‌লে হেচ্ছে শোদ পুজে বন্দ,
তা না গীরাদ শেরে আজ আঁ এলমে বলন্দ।

অর্থ: আল্লাহতায়ালা দুর্বলকে এমন বিদ্যা দান করেন, যাহা শক্তিশালীকে দান করেন না। যেমন মাটির তৈরী হজরত আদম (আ:)-কে আল্লাহতায়ালা সকল বস্তুর রহস্য সম্বন্ধে বিদ্যা দান করিয়াছেন, উহা দ্বারা তিনি সপ্তম আসমান ও জমিন আলোকিত করিয়া দিয়াছেন। এমন কি, আরশে মোয়াল্লা পর্যন্ত আলোকিত করিয়া দিয়াছেন। প্রধান প্রধান ফেরেস্তারাও হজরত আদম (আ:)-এর ইলমের কথা অনুভব করিতে পারিয়াছেন, যাহাতে তাঁহাদের মরতবা ও গৌরব নষ্ট হইয়া গিয়াছে। অবশেষে বাধ্য হইয়া তাঁহারা বলিয়াছেন, যেমন পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, “হে খোদা, আমরা তোমার পবিত্রতা বর্ণনা করিতেছি, তুমি যাহা শিক্ষা দিয়াছ, তাহা ব্যতীত আমাদের কোনো বিদ্যা নাই। মাওলানা বলেন, ইহা সত্ত্বেও যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর কুদরাতের উপর সন্দেহ করে, তবে সে অন্ধ ব্যতীত আর কিছুই না।” মাটির তৈরির অবস্থা ত এই প্রকার। কিন্তু অগ্নির তৈরির অবস্থা কিছু বর্ণনা করা দরকার। ইবলিস শয়তান ছয় লক্ষ বৎসর আল্লাহর ইবাদতে মশ্‌গুল থাকিয়াও অজ্ঞতা এবং বর্বরতায় গরুর বাছুরের ন্যায় ছিল। তাহার চেহারার উপর জুলমাত ও জেহালাতের একটা ছাপ মারা ছিল। যাহাতে ইলমে দীনের হাকিকাত না দেখিতে পারে এবং উহা দ্বারা ফায়দা হাসেল না করিতে পারে। হজরত আদম (আ:)-এর অভ্যন্তরীণ রহস্য অনুমান করার শক্তি ছিল না এবং তাঁহার উচ্চ মরতবার নিকটবর্তীও হইতে পারিত না। সমস্ত বৈজ্ঞানিকগণ, যাহাদের অন্তরে খোদাপ্রদত্ত বিদ্যার আলো প্রবেশ করে নাই, তাহাদের নিকট বিদ্যা যেমন ঘোড়ার লাগামের ন্যায়। এলমে মারেফাত হইতে কোনো অংশ লাভ করিতে পারে নাই।

কাতরায়ে দেলরা একে গওহার ফাতাদ,
কা আঁ বদরিয়া হাও গেরদো হা নাদাদ।

অর্থ: বিদ্যা শিক্ষাপ্রাপ্ত হইবার মূল ভিত্তি শক্তি বা প্রকাশ্য দুর্বলতার উপর নয়। যেহেতু, মানুষের অন্তর, যাহা একবিন্দু রক্ত মাত্র, উহা এমন একটি মূল্যবান বস্তু মানবকে দান করা হইয়াছে, যাহা বড় বড় সাগর বা উচ্চ আসমানসমূহকেও প্রদান করা হয় নাই। ইহা সত্ত্বেও অন্তরের পরিমাণ ও আন্দাজের দিক দিয়া বড় বড় সাগর ও সুউচ্চ আসমানের তুলনায় কিছুই নয়। এইসব প্রমাণ দ্বারা প্রকাশ পায় যে, কোনো বস্তুর বাহ্যিক আকৃতি ও গঠনের দিক দিয়া কোনো মূল্য বোধ হয় না, প্রকৃতপক্ষে অভ্যন্তরীণ নিহিত মূল রহস্য দ্বারা বস্তুর মূল্য নির্ধারণ করিতে হইবে।

চান্দে ছুরাত আখের আয় ছুরাত পোরোস্ত,
জানেবে মায়ানিয়াত আজ ছুরাত নারোস্ত।
গারবা ছুরাতে আদমী ইনছাঁ বুদে,
আহ্‌মদ ও বু জাহেল হাম একছাঁ বুদে।
আহ্‌মদ ও বু জাহেল দর বুতখানা রফত,
জে ইঁ শোদান তা আঁ শোদান ফরকীস্ত যফ্‌ত।
ইঁ দর আইয়াদ ছার নেহান্দ উরা বতাঁ,
উ দর আইয়াদ ছার নেহাদ চুঁ উম্মাতাঁ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, যখন প্রকাশ্য গঠন ও আকৃতির কোনো মূল্য নাই, তখন তোমাদের সুরাতে জাহেরীর পূজা করা উচিৎ না। এই রকমভাবে জাহেরী সুরাতের পূজা করিতে করিতে তোমাদের অন্তঃকরণ অবুঝ রহিয়াছে। প্রকৃত রহস্য অনুধাবন করিতে পার না। শুধু সুরাত দ্বারা কিছুই বুঝা যায় না। কেননা, যদি সুরাত দ্বারাই মানুষের মনুষ্যত্ব প্রকাশ পাইত, তবে হজরত মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) এবং আবু জাহেল একই রকম হইত। কেননা, মানুষের গঠনের দিক দিয়া ত একই রকম ছিল। কিন্তু উভয়ের মধ্যে আসমান ও জমিন পরিমাণ পার্থক্য ছিল। আরো ধরা যায় যে, আবু জাহেল ও হজরত মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম) উভয়ই বুতখানায় যাওয়া প্রকাশ্যে একই রকম দেখায়, কিন্তু নবী (দ:)-এর যাওয়া এবং আবু জাহেলের যাওয়ার মধ্যে বহুত পার্থক্য আছে। হজরত (দ:) যদি তাশরীফ আনিতেন, তবে মূর্তিসমূহ হজরতের (দ:) সম্মুখে মাথা নত করিয়া সেজদায় পড়িয়া যাইত এবং আবু জাহেল যখন যাইত, তখন সে নিজেই বুতকে মাথা নত করিয়া সেজদা দিত।

নকশে বর দউয়ারে মেছলে আদমাস্ত
বেংগর আন্দর ছুরাতে উ চে কমাস্ত
জানে কমাস্ত আঁ ছুরাতে বেতাব আ
রও বজ্যে আঁ গওহরে নাইয়াবরা
শোদ ছারেশেরাণে আলমে জুমলা পোস্ত,
চুঁ ছাগে আছহাবেরা দাদান্দ দাস্ত
কায়ে জিয়ানাতাশ আজ আঁ নকশে নফুর,
চুঁকে জানাশ গরকে শোদদর বহরে নূর।

অর্থ: দেয়ালের উপর মানুষের যে ছবি অঙ্কন করা হয়, উহা অবিকল মানুষের ন্যায় হয়। বল দেখি, উহার প্রকাশ্য সুরাত মানুষের চাইতে কোন্ দিক দিয়া কম? শুধু একটি প্রাণশক্তি উহার মধ্যে কম। এই জন্য উহাকে বে-জান বলা হয়। এখন অমূল্য ধন প্রাণশক্তি তালাশ কর, ঐ বে-জান সুরাত ত্যাগ কর। আসহাবে কাহাফের কুকুরের দিকে লক্ষ্য কর, যখন আল্লাহ্‌তায়ালা কাজায় কুদরাত সাহায্যে ইহাদিগকে মারেফাতে কামাল দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দিয়াছেন, তখন ইহাদের সম্মুখে সমস্ত পৃথিবীর বাঘের মাথা নত হইয়া গিয়াছে। তবে কুকুরের আকৃতিতে দোষ কী? ইহার প্রমাণ আল্লাহর মারেফাতের নূর দ্বারা পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে।

ওয়াছফে ছুরাত নিস্তে আন্দর ভামে হা,
আলেম ও আদেল বুদ দর নামে হা।
আলেম ও আদেল হামা মায়ানীস্ত ও বছ,
কাশে নাইয়াবী দর মাকানে পেশ ও পাছ।
মী জানাদ বরতন জে ছুয়ে লা মাকান,
মী না গোঞ্জাদ দর ফালাকে খুরশীদে জান।

অর্থ: মাওলানা আরো উদাহরণ দ্বারা পরিষ্কার করিয়া দিতেছেন, যেমন-লিখনে মানুষের উপাধি যে আলেম বা আদেল লিখা হয়। ঐ সমস্ত গুণাগুণ সুরাত হিসাবে লিখা হয় না, বরং নিহিত গুণের হিসাবে লিখা হয়। ঐ সমস্ত গুণ কোনো জায়গায় পাওয়া যায় না। কেননা ইহা দেহের গুণাগুণ নয় যে কোনো স্থানে পাওয়া যাইবে। এই সমস্ত গুণ ও আওসাফ রূহের; রূহ্‌ কোনো পদার্থ নয়। ইহা খোদার হুকুম মাত্র। এইজন্য ইহার কোনো জায়গার দরকার হয় না। রূহ্‌ এমন এক প্রকার আলো, যাহার আলো বিস্তার সমস্ত আসমান জমিনে সামাই হয় না। শূন্যস্থান হইতে রূহের ক্রিয়া দেহের উপর পতিত হয়।

খরগোশের জ্ঞানের কথা এবং জ্ঞানের উপকারিতা সম্বন্ধে বর্ণনা

ইঁ ছুখান পায়ানে না দারাদ হুশে দার,
গাশে ছুয়ে কেচ্ছা খরগোশে দার,
গোশে খর ব ফেরুশ ও দীগার গোশে খর,
কা ইঁ ছুখানরা দর নাইয়াবদ গোশে খর।
রো তু রো বা বাজী খরগোশে বীঁ,
মকর ও শের আন্দাজী খরগোশে বীঁ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, উপরোক্ত দৃষ্টান্তসমূহের শেষ নাই। তবে এখন সতর্কতা সহকারে খরগোশের কেচ্ছা শুন, কিন্তু বাহ্যিক কান গাধার কানের ন্যায় ইহা ত্যাগ কর, অন্য প্রকারের কান দিয়া শুন। কেননা, এই কেচ্ছা দিয়া যে রহস্য বাহির হইবে, ইহা অন্তরের কান না হইলে বুঝিতে পারিবে না। খরগোশের হীলাবজী ও ফেরেব দেখ, কেমন করিয়া সে বাঘকে কুপের মধ্যে নিক্ষেপ করিল।

খাতেমে মূলকে ছোলাইমানাস্ত এলম,
জুমলা আলম ছুরাতো ও জানাস্ত এলম।
আদমী রা জীঁ হুনার বেচারা গাস্ত,
খলকে দরিয়া হাও খরকে কোহ্‌ও দাস্ত।
জু পালং ও শেরে তরছা হামচু মূশ,
জু শোদাহ পেনহা বদস্তো কে ওহুশ।
জু পরী ও দেও ছা হল হা গেরেফ্‌ত,
হরকে দর জায়ে পেনহা জা গেরেফ্‌ত।

অর্থ: খরগোশের তদবীর-বিদ্যার মাখা ছিল বলিয়া মাওলানা বিদ্যা সম্বন্ধে কিছু ফজিলত বর্ণনা করিয়া বলিতেছেন যে, বিদ্যা হজরত সোলাইমান (আ:)-এর আংগোটির ন্যায়, অর্থাৎ, হজরত সোলাইমান (আ:) যেমন আংগোটির ক্রিয়ায় সমস্ত জ্বীন ও ইন্‌সান এবং পশু-পক্ষী ইত্যাদি সবই আয়ত্তে রাখিয়াছিলেন, সেই রকম খোদার দান বিদ্যা দ্বারা ইহ-জগতে সব কিছু অধীনস্থ করা যায়। এই অমূল্য সম্পদ আল্লাহতায়ালা মানুষকে দান করিয়াছেন বলিয়া মানুষ শ্রেষ্ঠ জীব ও অন্যান্য সৃষ্ট প্রাণী সব মানুষের অধীনস্থ; মানুষকে ভয় করে। সাগরের প্রাণীসমূহ, পাহাড় ও জঙ্গলের বড় বড় হিংস্র প্রাণীসকল মানুষকে ভয় করে। জ্বীন, পরী ও দেও-দানব মানুষের ভয়েতে দূরদূরান্তে সাগরের কিনারায় ও বন জঙ্গলে বাস করে। প্রত্যেকেই মানুষের ভয়ে মানুষ হইতে বহু দুরে বনে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, পর্বতে লুকাইয়া বাস করে। অতএব, ইহাতে বুঝা গেল যে বিদ্যা এমন একটি বস্তু, যাহার দরুন মানুষ সমস্ত পশু-পক্ষী ও জ্বীন জাতিকে কয়েদ করিয়া নিতে পারে এবং কষ্টও দিতে পারে। এইজন্য সকলেই মানুষ হইতে পালাইয়া থাকে।

আদমী রা দুশমনে পেনহা বছে আস্ত,
আদমী বা হজরে আকেল কাছে আস্ত।
খলকে খুব ও জেস্তে হাস্ত আজ মানে হাঁ,
মী জানাদ বরদেল বহরদমে কোবে শাঁ।
বহর গোছলে আর দররুয়ে দর জুয়েবার,
বরতু আপচে জানাদ দর আবেখার।
গারচে পেনহানে খার দর আবাস্ত পোস্ত,
চুঁ কে দর তু ম খালাদ দানিকে হাস্ত।
খারেকার হেচ্ছে হাও ও ছুছাহ্‌,
আজ হাজারাণে কাছ বুদেবে এক কাছাহ্‌।
বাশ তা হেচ্ছে হায়ে তু মাবদাল শওয়াদ,
তা বা বীনি শানো মশ্‌কেল হল শওয়াদ।
তা ছুখান হায়ে কেয়া রদ কর্‌দাহ্‌,
তা কেয়াঁ রা ছারওয়ার খোদ কর্‌দাহ্‌।

অর্থ: উপরে মানুষের বাহ্যিক শত্রুর কথা বর্ণনা করা হইয়াছে। এখানে মানুষের অভ্যন্তরীণ বাতেনী শত্রুর কথা বর্ণনা করিতে যাইয়া মাওলানা বলিতেছেন যে, মানুষের অন্তরে নিহিত কতগুলি শত্রু আছে। যে ব্যক্তি ইহা ভয় করিয়া সাবধানতা অবলম্বন করিয়া চলে, সে ব্যক্তি জ্ঞানী। যেভাবে বাতেনী শত্রু আছে, সেই রকম বাতেনী মিত্রও আছে, যেমন ফেরেস্তারা। অতএব, চরিত্রের ভাল-মন্দ আমাদের নিকট সুপ্তভাবে নিহিত আছে। যদিও আমরা উহা প্রকাশ্যে স্বচক্ষে দেখিতে পারি না বা অনুভব করিতে পারি না, কিন্তু উহার ক্রিয়া সর্বদা আমাদের অন্তরে পৌঁছিতে থাকে। ইহা দ্বারা বুঝা যায়, যে কোন বস্তু অন্তরে ক্রিয়া করিতেছে। যেমন হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, রসূলুল্লাহ (দ:) ফরমাইয়াছেন – “মানুষের উপর এক শয়তান আসর করিতে থাকে এবং অন্য প্রকার আসর ফেরেস্তারা করিতে থাকে। অতএব, খারাপ কাজের খেয়াল শয়তান হইতে আসে, আর ভাল কাজের খেয়াল ফেরেস্তার তরফ হইতে আসে। মাওলানা উদাহরণ দিয়া বুঝাইয়া দিয়াছেন, কাজের ক্রিয়া দ্বারা কারণ অনুভব করা যায়, যদিও কারণ প্রকাশ্যে দেখা যায় না। যেমন তুমি নদীতে গোসল করিতে গেলে, পানির মধ্যে পায়ে কাঁটা বিঁধিয়া গেল। কাঁটা গভীর পানির নিচে, তাহা দেখা যায় না। কিন্তু তোমার পায়ে বিঁধিতেছে, তুমি নিশ্চয় করিয়া বুঝিতেছ যে কাঁটা আছে। এই রকম শয়তান যদিও দেখা যায় না, কুমন্ত্রণা দানে বুঝা যায় যে, শয়তান ক্রিয়া করিতেছে। এ রকমও মনে করা ঠিক না যে শয়তান মাত্র একটা। হাজার  হাজার শয়তান আছে। যেমন হাদীস দ্বারা জানা যায় যে, অজুর মধ্যে ধোকা দেয় সেই শয়তানের নাম খানজাব; আর নামাজের মধ্যে যে ওয়াসওয়াসা দেয়, তাহার নাম ওলহান। এই রকম প্রত্যেক কাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শয়তান আছে। এই সমস্ত ফেরেস্তা এবং শয়তান বিদ্যমান থাকার অবস্থা প্রমাণাদি দ্বারা বুঝা গেল। যদি স্বচক্ষে দেখিতে চাও, তবে ধৈর্য ধারণ কর, তোমার অনুভূতি-শক্তি পরিবর্তন হইয়া যাইবে। হয়ত মৃত্যুর পরে অথবা জীবিত অবস্থায় মারেফাতে রব্বানীর আলোতে দেখিতে পাইবে।

বন্য পশুদের খরগোশকে তাহার যুক্তি প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করা

বাদে আজ আঁ গোফ্‌তান্দ কা আয়ে খরগোশে চোস্ত,
দরমীয়ানে আর আঁচে দর এদরাকে তুস্ত।
একে তু বাশেরে দর পিচিদায়ে,
বাজে গো রায়ে কে আন্দে শীদায়ে।
মোশওয়ারাতে এদরাকে ও হুশিয়ারী দেহাদ,
আকলেহা মর আকলেরা ইয়ারে দেহাদ।
গোফ্‌তে পয়গম্বর বকুন আয়রায়ে জন,
মোশওয়ারাতে কাল মোছতাশারে মোতামান।
কওলে পয়গম্বর বজানে বাইয়াদ শনুদ,
বাজে গো তা চীস্তে মাকছুদে তু জুদ।

অর্থ: বন্য পশুরা বলিল, হে চালাক খরগোশ! তুমি যে যুক্তির খেয়াল করিয়াছ, উহা প্রকাশ করিয়া বল। তুমি হীন ও দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও শক্তিশালী বাঘের সহিত যে চাল চালিতে যাইতেছ, উহা প্রকাশ করিয়া বল। কেননা, পরামর্শ করায় অনুভূতি ও হুঁশিয়ারি বৃদ্ধি পায় এবং এক বুদ্ধির সহিত শত বুদ্ধির শক্তি যোগ হয়। পয়গম্বর (দ:) ফরমাইয়াছেন, যদি কোনো ব্যক্তি কোনো মত পোষণ করে, তবে উহা পরামর্শ করিয়া লওয়া উচিত। যখন হুজুর (দ:) পরামর্শের জন্য তাকিদ করিয়াছেন, তখন পরামর্শ করা অত্যন্ত আবশ্যকীয় বিষয় বলিয়া বুঝা উচিত। এইজন্য মাওলানা উৎসাহ দিয়া বলিতেছেন যে, পয়গম্বর (দ:)-এর এই এরশাদ মন ও প্রাণ দিয়া পালন করা চাই।

খরগোশের পরামর্শ করিতে অস্বীকার করা

গোফ্‌ত হর রাজে না শাইয়াদ বাজে গোফ্‌ত,
জোফ্‌তে তাকে আইয়াদ গাহে গাহ্‌ তাকে জুফত্‌
আজ ছাফা গরদাম জনে বা আয়না,
তেরাহ্‌ গরদাদ জুদে বামা আয়না।
দর বয়ানে ইঁ ছে কম জম্বানে বস্ত,
আজ জেহাবে ও আজ জাহাবে ও জানাদ বস্ত।
কা ইঁ ছে রা বেছিয়ারে খছমাস্ত ও আদু,
দর কমিনাত ইস্তাদ চুঁ দানাদ উ।
ওয়ার বগুই বা একে গো আলবেদা,
কুল্লু ছেররেন জাওয়াজাল উছনাইনে শায়া।
গেরদো ছার পরেন্দাহ্‌ রা বন্দী বহাম,
বর জমীনে মনেন্দে মাহবুছ আজ আলাম।

অর্থ: খরগোশ উত্তর করিল, পরামর্শ নিশ্চয় উত্তম বস্তু। কিন্তু প্রত্যেক রহস্য প্রকাশ করা উচিত নহে। জোড় বাক্য কোনো সময় বেজোড় হইয়া যায়, এবং বেজোড় বাক্য কোনো কোনো সময় জোড় বাক্যে পরিণত হয়। অতএব, প্রকাশ করিলেই বাক্য নিজের শক্তি হইতে অন্যের অধীনে চলিয়া যায়। ইহাও সম্ভব যে, যাহার জন্য প্রস্তাব করা হয়, উহাতে না প্রয়োগ করিয়া অন্য বিষয় ব্যবহার করা হয়। এইজন্য প্রকাশ না করাই ভাল। সকল কাজের জন্য পরামর্শ করার আদেশ দেওয়া হয় নাই। বরং ঐ সমস্ত কাজের জন্য পরামর্শ করার আদেশ দেওয়া হইয়াছে, যাহা ব্যক্ত হইলেও কোনো ক্ষতির আশংকা নাই। যেমন, তুমি যদি আয়নার উপর ফুঁক দাও, তবে নিশ্চয়ই আয়নার পরিচ্ছন্নতা নষ্ট হইয়া যাইবে। এই রকম বাক্য উচ্চারণকারীর রহস্য মুখ হইতে বাহির হইয়া গেলে, আয়নায় ফুঁক দিবার মত হইয়া যায়। যেমন, আয়নায় ফুঁক দিলে অস্বচ্ছ হইয়া যায়। এই রকম যতক্ষণ পর্যন্ত রহস্য প্রকাশ না করা হয়, ততক্ষণ শ্রোতার অন্তঃকরণ আয়নার ন্যায় পরিষ্কার থাকে। তারপর যখনই তাহাকে রহস্য সম্বন্ধে জানান হয়, অধিকাংশ সময়েই দেখা যায় শ্রোতার অন্তরের পরিচ্ছন্নতা দূর হইয়া চালাকিতে পরিণত হয় এবং ক্ষতি করার চেষ্টা আরম্ভ করিয়া দেয়। অস্বচ্ছ আয়নার ন্যায় অপরিষ্কার হইতে আরম্ভ হয়। এইজন্য গুপ্ত রহস্য প্রকাশ করা অনুচিত। বিশেষ করিয়া নিম্নলিখিত তিনটি বিষয় – এমনকি মুখেও আনিতে হয় না। প্রথম হইল নিজের কোনো স্থানে যাইবার অবস্থা; যেমন কখন যাইবে, কীভাবে যাইবে ইত্যাদি। দ্বিতীয় নিজের টাকা পয়সার পরিমাণ কোথায় আছে, কাহারও নিকট প্রকাশ করিবে না। তৃতীয় গন্তব্যস্থান। কোথায় যাইয়া পৌঁছিবে, কাহারও কাছে প্রকাশ করিবে না। কেননা, এ তিন বিষয়ের অনেক শত্রু আছে। যদি কোনো শত্রু জানিতে পারে, তবে সে ওঁত পাতিয়া থাকিবে, যে কীভাবে ক্ষতি করা যায়। যদি একজনের নিকটও প্রকাশ করা হয়, তবে তুমি বেশ করিয়া জানিয়া রাখ, যে গুপ্ত রহস্য দ্বিতীয় ব্যক্তির কাছে যায়, উহা প্রকাশ হইয়া গিয়াছে বলিয়া ধরিয়া নিতে হইবে। গুপ্ত রহস্য প্রকাশ হইবার দ্বিতীয় উদাহরণ দিয়া মাওলানা বলিতেছেন, দুইটি বা চারিটি পাখী ধরিয়া একে অন্যের সহিত মিলাইয়া বাঁধিয়া জমিনে ফেলিয়া রাখ। তবে দেখিবে বিপদগ্রস্ত হইয়া অসহায় অবস্থায় জমিনের উপর পড়িয়া থাকিবে। যদি তুমি ইহাদিগকে খুলিয়া দাও, তবে উড়িয়া যাইবে। এই রকমভাবে তোমার গুপ্ত রহস্য যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার অন্তরে আবদ্ধ থাকিবে, প্রকাশ পাওয়া হইতে নিরাপদ মনে করিবে এবং যখন ঐ কয়েদকানা হইতে বাহির করিয়া দিবে তখন চতুর্দিকে প্রকাশ হইয়া যাইবে।

মোশাওয়ারাতে দারীদ ছের পুশিদাহ্‌ খুব,
দরকেনায়াতে বা গলতে আফগান মশোব।
মোমাওয়ারাত কর্‌দী পয়ম্বর বস্তা ছার,
গোফ্‌তে ইশানাদ জওয়াবো বেখবর।
দর মেছালে বস্তা গোফ্‌তি রায়রা,
তা নাদানাদ খছমে আজ ছেররে পায়রা।
উ জওয়াবে খেশে বগেরেফ্‌তে আজু,
ওয়াজ ছেওয়াশ মী না বোরদে গায়রেবু।

অর্থ: মাওলানা বলেন, আমি উপরে উল্লেখ করিয়াছি গুপ্ত রহস্য সম্বন্ধে পরামর্শ করা উচিত না এবং সর্ব বিষয় পরামর্শ করা চাই না। বরং গুপ্ত বিষয়ের পরামর্শ ইশারা বা কেনায়া দ্বারা হওয়া উত্তম। এমন বাক্য দ্বারা হওয়া চাই, যাহাতে শ্রোতারা ভুল বুঝের মধ্যে পড়ে। প্রকৃত ঘটনা বুঝিতে পারিবে না। পরামর্শ ত হইল কিন্তু সন্দেহজনকভাবে। ইহাতে পরামর্শ করাও হইয়া গেল আর গুপ্ত বিষয় গুপ্তই থাকিয়া গেল। হজরত (দ:) গুপ্ত বিষয়ের প্রকৃত ঘটনা আবৃত রাখিয়া পরামর্শ করিতেন, শ্রোতারা শুনিয়া জওয়াব দিতেন। কিন্তু ঘটনা সম্বন্ধে কেহই অবগত হইতে পারিতেন না। যেমন, কোনো উদাহরণের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা পেশ করিয়া মতামত চাওয়া হইত। বিরুদ্ধবাদীরা মূল ঘটনা সম্বন্ধে কিছুই জানিতে পারিত না। ঐ উদাহরণের জওয়াবে হুজুর (দ:) নিজের প্রশ্নের জওয়াব ঠিক করিয়া নিতেন, অন্য কেহ হুজুরের (দ:) উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিত না।

ইঁ ছুখান পায়ানে নাদারাদ বাজে গরদ,
ছুয়ে খরগোশ দেলাওয়ার তা চে করদ।
হাছেল আঁ খরগোশ রায়ে খোদ না গোফ্‌ত,
মকর আন্দেশীদ রা খোদ তাক ও জোফ্‌ত।
বা ওহুশ আজ নেক ও বদ না কোশাদ রাজ,
ছেররে খোদ দরজানে খোদ মীরাজ বাজ।

অর্থ: এই গুপ্ত রহস্যের বিষয় বর্ণনার শেষ নাই। অতএব, এখন খরগোশের কেচ্ছা বর্ণনা করা উচিত। খরগোশ নিজের উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নিজের অন্তরের ভেদ অন্য কাহারও কাছে ব্যক্ত করে নাই। নিজের অন্তরে বিভিন্ন রকমের ফন্দির কথা চিন্তা করিতেছিল। অন্য পশুদের নিকট ভাল-মন্দ কিছুই প্রকাশ করে নাই। নিজের গুপ্ত তদবীর নিজের অন্তরেই চালাইতেছিল।

খরগোশ বাঘের সহিত ধোকাবাজী করার বর্ণনা

ছায়াতে তাখীর করদ আন্দর শোদান,
বাদে আজ আঁ শোদ পেশে পেরে পাঞ্জা জান।
জে আঁ ছবাব কা আন্দার শোদান উমানাদ দের,
খাকে রা মী কুনাদ ওয়ামী গরীদ শের।
গোফ্‌তে মান গোফতাম কে আহাদে আঁ খাছান,
খাকে বাশদ খামো ছুছ্‌ত ও নারেছান।
দমে দমাহ্‌ ইশানে মরা আজ খর ফাগান্দ,
চান্দে বফরীবাদ মরা ইঁ দহর চান্দ।
ছখত দর মানাদ আমীরে ছুছতে রেশ,
চুঁ না পাছ বীনাদ না পেশে আজ আহমকেশ।

অর্থ: খরগোশ বাঘের সম্মুখে যাইতে বহুত দেরী করিয়া গিয়াছে। খরগোশের দেরী করিয়া যাওয়ার কারণে বাঘ ক্রোধে জমিনের সমস্ত মাটি উল্টাইয়া ফেলিতেছিল এবং ক্রোধে গরগর করিতে করিতে বলিতেছিল, আমি ত প্রথমেই বলিয়াছিলাম যে এই সমস্ত অনুপযুক্তদের ওয়াদা অসার ও অসম্পূর্ণ হইবে। ইহাদের ধোকাবাজী ও ফেরেবে আমাকে ধোকায় ফেলিয়াছে। ইহাদের ধোকায় আমাকে গাধার চাইতেও বোকা বানাইয়া ছাড়িয়াছে। আমি জানিনা, এই জামানার পশুরা আমাকে আর কত ধোকা দিবে। নির্বোধ হাকীম বোকামীর দরুণ সম্মুখ পিছন না ভাবিয়া রায় দিলে মহাবিপদে পড়িতে হয়। যেমন না ভাবিয়া এই বন্য পশুদের ওয়াদার উপর বিশ্বাস করিয়া আমার অবস্থা ঘটিয়াছে।

রাহে হামওয়ারাস্ত ও জীরাশ দামেহা,
কাহাতে মায়ানী দরমিয়ানে নামেহা।
লফ্‌ জেহাও নামেহা চু দামে হাস্ত,
লফ্‌জে শিরিন রেগে আবে ওমরে মাস্ত।
ওমরে চুঁ আবস্ত ওয়াক্তে উ রা চু জু,
খুলকে বাতেন রেখে জুই ওম্‌রে তু।

অর্থ: এখানে মাওলানা বলিতেছেন, জাহেরী কাজের পরিণাম চিন্তা না করিয়া কাজ করিলে যেমন ভুলে পতিত হইতে হয়, সেইরূপ বাতেনী কার্যকলাপের পরিণাম সম্বন্ধে অবগত না হইয়া তরীকা অবলম্বন করিলে পথভ্রষ্ট হইয়া বিপদগ্রস্ত হইতে হয়। অনেক ধোকাবাজ নকল পীর, মিষ্টি কথা ও বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদ দ্বারা মানুষকে ভুলাইয়া ফেলে। জনসাধারণ ধোকায় পড়িয়া তাহার হাতে বায়াত হয়, প্রকৃত অবস্থার তদারক করে না। এইজন্য মাওলানা বলিতেছেন, অনেক সময় রাস্তার উপর দিয়া মসৃণ দেখা যায়, কিন্তু উহার নিচে ফাঁদ বিছান থাকে। এই সমস্ত স্থানে বুদ্ধিমানের হুঁশিয়ারির আবশ্যকতা আছে। ধোকাবাজ নকল কামেলের উপরিভাগটা খুব পরিচ্ছন্ন-পবিত্র দেখায়, কিন্তু তাহার ধোকাবাজী ও খারাবী ভিতরে গুপ্ত ফাঁদের ন্যায় নিহিত থাকে। বাহ্যিক নামধামের মধ্যে এমন গুণের শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে, যাহার অর্থের দিক দিয়া তাহার মধ্যে কিছুই পাওয়া যায় না। যেমন শাহ্‌ সাহেব, মিয়া সাহেব, জাকেরে শাগেল, আবেদ ও জাহেদ ইত্যাদি। এই সমস্ত আওসাফের শব্দের অর্থের কিছুই তাহাদের মধ্যে পাওয়া যায় না। এইসব শব্দ তাহাদের নামে ব্যবহার করা হয় শুধু অশিক্ষিত জনসাধারণকে ধোকা দিবার জন্য। মিষ্টি বাক্য আমাদের জীবনের জন্য বালুর ন্যায়, যে বালু পানি চোষণ করিয়া নিয়া যায়। এই রকম মারেফাত শিক্ষার্থীর জীবন ধোকাবাজ দরবেশে ধ্বংস করিয়া দেয়। ধোকাবাজ দরবেশের নিকট গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই শিক্ষা পাওয়া যায় না। শিক্ষার্থী ফেরেববাজীতে আবদ্ধ হইয়া অন্য কাহারও নিকট যাইতেও পারে না। এইরূপভাবে ধোকাবাজ পীরের খেদমতে আবদ্ধ হইয়া গেলে, মানুষের জীবন নষ্ট হইয়া যায়। মানুষের জীবন পানির ন্যায়; আর ওয়াক্ত, অর্থাৎ, জমানা ঐ জীবনের একটা অংশ মাত্র। তোমার মধ্যে যে খারাপ স্বভাব আছে, উহা তোমার জীবনের জন্য বালুর ন্যায়, অর্থাৎ, মন্দ স্বভাবে তোমার জীবনকালকে ধ্বংস করিয়া দিতেছে।

আঁ একে রেগে কে জুশোদ আব আজ উ,
ছখতে কামইয়াবাস্ত রাও আঁ রা বজু।
হাস্তে আঁ রেগ আয় পেছার মরদে খোদা,
কে বহক্কে পউস্ত ও আজ খোদ শোদ জুদা।
আবে আজব দীনে হামী জুশোদ আজু,
তালেবানে রা আজু হায়াতাস্ত ও নামু
গায়রে মরদে হক চু রেগে খোশ্‌কে দাঁ,
কা আবে ওমরাত রা খোরদে উ হর জমাঁ।

অর্থ: ভণ্ড ও ধোকাবাজ দরবেশের কথা বর্ণনা করার পর মাওলানা হাকিকী দরবেশের কথা বর্ণনা করিয়া দিতেছেন, তাহা হইতে তালেবের পক্ষে অনুসন্ধান করিয়া লওয়া সহজ হইবে; এবং খাঁটি কামেলের হাতে বায়াত হইতে বেগ পাইতে হইবে না। যেহেতু বাহ্যিক দৃষ্টিতে উভয় প্রকার দরবেশ একই রকম হইতে পারে, কিন্তু বাতেনী অবস্থার দিক দিয়া পার্থক্য নিশ্চয়ই থাকে; কিন্তু তা’সীরের দিক দিয়া পার্থক্য আছে। কোনো বালু এমন হয়, যাহার মধ্য হইতে পানি নির্গত হয়। এইরূপ বালুর সাথে কামেল শায়েখের তুলনা দেওয়া হয় আর কোনো বালু এমন হয় যে পানি যাহা থাকে, তাহাও চুষিয়া লইয়া যায়  । এই প্রকার বালুর সাথে ধোকাবাজ পীরের তুলনা দেওয়া হইয়াছে। তাই মাওলানা বলিতেছেন যে, এক প্রকার বালু উহা হইতে পানি উথলিয়া নির্গত হয়। পীরে কামেল ঐ বালুর ন্যায়। তাঁহার মধ্য হইতেও বিদ্যা, মারেফত ও হাকিকাত উথলিয়া বাহির হইতে থাকে। এই প্রকার বালু সফলকাম হইয়া থাকে। ইহা তালাশ কর, অর্থাৎ, প্রকৃত আল্লাহর অলি, যিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিয়াছেন। পাপ তাঁহার নিকট হইতে দূর হইয়া গিয়াছে। দ্বীনের মিষ্টি পানি তাঁহার ভিতর হইতে যোশ মারিয়া বাহির হয়। ইহা দ্বারা প্রকৃত শিক্ষার্থীর উপকার হয়। আর যে ধোকাবাজ দরবেশ হয়, সে শুকনা বালুর ন্যায়। তোমার জীবনের রস সব সময় চুষিয়া খায়। অর্থাৎ, তোমার জীবনের বিদ্যা, আমল ও বয়স সব কিছুরই ক্ষতি করিয়া ফেলে।
হেকমাত শো আজ মরদে হেকীম,
তা আজ উ গরদী তু বেনিয়া ও আলীম।
মাম্বায়া হেকমত শওয়াদ্‌ হেকমত তলব,
ফারেগ আইয়াদ্‌ উ জে তাহ্‌ ছীলো ছবাব।
লোহে হাফেজ লোহে মাহ্‌ফুজী শওয়াদ্‌,
আকলে উ আজরূহে মাহ্‌ফুজে শওয়াদ্‌।
চুঁ মোয়াল্লেম বুয়াদ্‌ আকলাশ জে ইবতে দা,
বাদে আজ আঁ শোদ আকলে শাগেরদী ওরা।
আকলে চুঁ জিবরীলে গুইয়াদ আহ্‌মাদা,
গার একে গামে নেহাম ছুজাদ মরা।
তু মরা বোগজার জেইঁ পাছ পেশ রাঁ,
হদ্দে মান ইঁ বুয়াদ আয় ছুলতানে জাঁ।

অর্থ: যখন মানুষ দুই প্রকার প্রমাণ হইল, এক প্রকার শায়েখে কামেল, অন্য প্রকার ধোকাবাজ গণ্ডমূর্খ। অতএব, তুমি শায়েখে কামেল হইতে মারেফত শিক্ষা কর। তাহা হইলে তুমি নিজে জ্ঞানী ও কামেল ব্যক্তি হইতে পারিবে। যে ব্যক্তি মারেফতের অন্বেষণকারী হয়, সে একদিন মারেফতের উৎপত্তিস্থল, অর্থাৎ, মারেফতের ভাণ্ডার হইয়া যায়। মারেফতের ভাণ্ডারে পরিণত হইলে, জাহেরী এলেম শিক্ষার আবশ্যক হয় না। কেননা, সে আল্লাহর তরফ হইতে এল্‌মে লাদুনী প্রাপ্ত হইতে থাকে। ঐ ব্যক্তি এল্‌মে মারেফত শিক্ষার সময় লোহে হাফেজ ছিল, অর্থাৎ, শায়েখ হইতে শুনিয়া নিজের কলবের মধ্যে হেফাজত করিতেছিল। এলমে লাদুনী হাসেল হওয়ার পরে নিজের কলব লোহে মাহ্‌ফুজের ন্যায় হইয়া যায়। আল্লাহর তরফ হইতে তাঁহার কলবে এলমে হাকীকির নক্‌শা হইয়া যাইতে থাকে এবং তাহার জ্ঞান পবিত্র রূহের হেফাজতে থাকে। এলমে মারেফত শিক্ষা করার পূর্বে তাহার জ্ঞান চালক ছিল। মারেফতে কামালাত হাসেল করার পর আকল রূহের শাগরীদ হইয়া যায়। অর্থাৎ, পবিত্র রূহের  দ্বারা আকল পরিচালিত হয়। তারপর আকল তাহাকে বলিতে থাকে, যেমন হজরত জিবরাইল (আ:) হজরত আহমদে মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে বলিয়াছিলেন, “যদি আমি সম্মুখে আর এক কদম অগ্রসর হই, তবে আল্লাহর নূরের তাজাল্লিতে পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইব। আপনি আমাকে এখন এখানে থাকিতে দেন আর আপনি নিজে আগে তশরীফ রাখেন, আমার এই পর্যন্ত-ই সীমা ছিল। এই স্থানে যেমন হজরত জিবরাইল (আ:) প্রথম পথপ্রদর্শক ছিলেন, পরে অপারগ হইয়া গেলেন। এই রকমভাবে আকল প্রথমে পথ দেখাইয়া মারেফত শিক্ষা দিতে নিয়াছে। পরে আকল নিজেই অপারগ হইয়া যায়।

হর্‌কে মানাদ আজ কাহেলী বে শোকর ও ছবর,
উ হামী দানাদ কে গীরাদ পায়ে জবর।
হর্‌কে ষবর আওরাদ ও খোদ রঞ্জুরে করদ,
তা হুমানে রঞ্জুরেশে দর গোরে করদ।
গোফ্‌তে পয়গম্বর কে রঞ্জুরে বা লাগ,
রঞ্জে আরাদ তা বমীরাদ চুঁ চেরাগ।

অর্থ: এখানে মাওলানা যে ব্যক্তি অলসতা করিয়া শায়েখে কামেল হইতে শিক্ষা গ্রহণ না করে, তাহার কুফলের কথা বর্ণনা করিয়া বলিতেছেন, যে ব্যক্তি অসলতা করিয়া না শোকর ও বে-সবর থাকিয়া গেল, অর্থাৎ, খোদাপ্রদত্ত শিক্ষা, শক্তি কাজে না লাগাইয়া বেকার থাকিয়া গেল, সে যেন আল্লাহর নেয়ামতের শোকর আদায় করিল না, কষ্ট সহ্য করিয়া এলেম কামাই করিল না, অধৈর্য হইয়া পড়িল। মাওলানা বলেন, যে ব্যক্তি অলসতা সহকারে যবরিয়া হইয়া বসে, সে যেন নিজেকে রোগী বানাইয়া বসিল। অবশেষে ঐ রোগেই তাহাকে কবরে পৌঁছাইয়া দেয়। যেমন, হুজুর (দ:) ফরমাইয়াছেন যে ঝুট-মুট এবং হাসি-তামাসা রোগ বৃদ্ধি করিয়া দেয়। আর সততায় রোগীকে সুস্থ করিয়া দেয়। অতএব, অলসতার দরুন মিথ্যার ভান করিতে হয় না; তাহা হইলে প্রকৃতপক্ষে মিথ্যার দরুন ধ্বংস হইতে হইবে।

যবর চে বুদ বুস্তানে আশেকাস্তারা,
ইয়া বা পেওস্তান রগে বগোস্তারা।
চুঁ দর ইঁ রাহ্‌ পায়ে খোদ নাশেকাস্তা,
বরফে মী খান্দি চে পারা বস্তা।
ও আঁফে পায়াশ দর রাহে কোশন শেকাস্ত,
দর রছীদে উ রা বুরাফ ও বর নেছাস্ত,
হামেলে দীনে বুদ উ মাহ্‌মুল শোদ,
কাবেলে ফর্‌মানে বুদ উ মকবুলে শোদ।
তা কনুঁ ফরমানে পেজিরফতী জেশাহ্‌,
বাদে আজ ইঁ ফর্‌মান রেছানাদ বর ছপাহ্‌।
তা কানুঁ আখ্‌তারে আছর কর্‌দে দরুউ,
বাদে আজ আঁ বাশদ আমীরে আখতারে উ।
গার তোরা এশকালে আইয়াদ দর নজর,
পাছ তু শক দারী দর ইনশাক্কাল কামার।

অর্থ: এখানে মাওলানা যবরিয়া মতবাদের উত্তর দিতেছেন যে, যবর কী? যবর শব্দের অর্থ ভাঙ্গাকে গড়া। অথবা ছিন্ন রগকে জোড়ান। তুমি পথ চলিতে যাইয়া পা ভাঙ্গো নাই বা কোনো রগ ছিন্ন হয় নাই, যাহা তুমি জোড়া লাগাইবে বা পট্টি বাঁধিয়া গড়াইবে। বরং যে ব্যক্তির পা মোজাহেদা করার পথে ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, অর্থাৎ, নিজের শক্তি অনুযায়ী মোজাহেদাহ করিতে করিতে শক্তি ক্ষয় হইয়া গিয়াছে, এখন আর শক্তি নাই, অপারগ হইয়া গিয়াছে, এস্থলে বলা হইয়াছে যে পা ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। তাহার জন্য আল্লাহতায়ালার আকর্ষণ আসিয়া পৌঁছিবে। সেই আকর্ষণের দরুন সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করিবে। যে ব্যক্তি মোজাহেদা ও মোশক্কাত করিয়া আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে, সে প্রথমে ধর্মের বিধান পালন করার কষ্ট মাথায় বহন করিত। যখন আল্লাহর ইশ্‌কের নূর হাসেল হইয়া যায়, তখন তাহাকে আর কষ্ট স্বীকার করিতে হয় না। তাহাকেই বহন করিয়া নেওয়া হয়। গায়েবী আকর্ষণ তাহাকে গন্তব্যস্থানে নিয়া পৌঁছাইয়া দেয়। প্রথমে আল্লাহতায়ালার আদেশ নিষেধ পালন করিতে হইত, এখন সে আল্লাহর দরবারে কবুল হইয়া যাইবে। যেমন, কোনো ব্যক্তি কোনো বাদশাহর বাধ্যগত চলিত। কিছু দিন পরে পদের উন্নতি হওয়ায় নিজেই এখন সৈন্যদের উপর আদেশ নিষেধ চালাইতে পারে; এই রকমভাবে আহলে মারেফাতের অবস্থা হয়। প্রথমে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী চলিতে হয়। পরে নিজে কামেল হইয়া অপরকে তালীম ও তরবিয়াত দিতে পারে। কামালাতের দরজা হাসেল করার আগে তাহার উপর তারকাসমূহের ক্রিয়া চলে। কামালাতের দরজায় পৌঁছিয়া গেলে, তারপর সে নিজেই তারকাসমূহের উপর হুকুমাত চালনা করিতে পারে। অর্থাৎ, তাহার ইচ্ছায় তারকা চালিত হয়। প্রকৃতপক্ষে তারকাসমূহ খোদার ইচ্ছায় চালিত হয়। কিন্তু বান্দা খোদার নিকট মকবুল হইয়া গেলে, খোদার ইচ্ছার সাথে বান্দার ইচ্ছা সামঞ্জস্য হইয়া যায়। সেই হিসাবে শায়েখে কামেল সব কিছু চালনার শক্তি হাসেল করেন। মাওলানা বলেন, তুমি যদি এই সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ কর, তবে তুমি নিশ্চয়ই চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়া সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ কর ধরিয়া নিতে হইবে। নবী (আ:)-দের নিকট হইতে যে কাজ মোজেজা হিসাবে প্রকাশ পাইয়াছে, পরে ঐরূপ কাজ তাঁহাদের মকবুল উম্মাত শায়েখে কামেল হইতে কারামত হিসাবে প্রকাশ পাওয়ায় কোনো নিষেধ নাই। কিন্তু মোজেজায় কুরআন, পবিত্র কুরআনের ন্যায় ঐরূপ মোজেজা কেহ দেখাইতে পারিবে না। পবিত্র কুরআনেই সে কথা উল্লেখ করিয়া দিয়াছেন। বাকী সম্বন্ধে কোনো অসম্ভাব্যতার প্রমাণ নাই। খোদায় ইচ্ছা করিলে ঐরূপ কাজ কারামত হিসাবে তাঁহার দ্বারাও প্রকাশ করাইতে পারেন।

তাজাহ্‌কুন ঈমান না আজ গোফ্‌তে জবান,
আয় হাওয়া রা তাজাহ কর্‌দাহ দরনেহাঁ।
তা হাওয়া তাজাহাস্ত ঈমান তাজাহ্‌ নিস্ত,
কে ইঁ হাওয়া জুয্‌ কুফলে আঁ দরওয়াজা নিস্ত।
কর্‌দায়ে তাওবীলে লফ্‌জে বকরে রা,
খেশেরা তাওবীলে কুল নায়ে জেকরেরা।
ফেক্‌রে তু তাওবীলে করদাহ্ জেকরে রা,
জেকরে রা মানো বগেরদাঁ ফেকরে রা।
বর হাওয়া তাওবীলে কুরআন মী কুনী,
পুস্তো কাজ শোদ আজ তু মায়ানী ছুনী।

অর্থ: উপরে চন্দ্র দ্বি-খণ্ডিত হওয়া মোজেজা সম্বন্ধে যে প্রমাণ দেওয়া হইয়াছে, উহাতে কেহ সন্দেহ না করিতে পারে, এইজন্য মাওলানা সন্দেহ দূর করার জন্য বলিতেছেন, তোমরা সত্যবাদিতা সহকারে মনে প্রাণে ঈমান তাজা কর। শুধু মুখ দিয়া ঈমান প্রকাশ করিলে যথেষ্ট হয় না, তোমরা অন্তরে খাহেশে নফ্‌সানী তাজা করিয়া রাখিয়াছ। ইহার দরুনই তোমরা চন্দ্র দুই খণ্ড হওয়া অস্বীকার করিতে পার। কেননা, আহলে বেদায়াত (বেআতী)-রা খাহেশে নফসানীর প্রভাবে আয়াতে কুর্‌য়ানীর মধ্যে রদ বদল আরম্ভ করিয়া দেয়। অতএব, যতক্ষণ পর্যন্ত খাহেশে নফসানী তাজা থাকিবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান তাজা বা সবল হইবে না। হাদীসে উল্লেখ আছে যে, হুজুর (দ:) ফরমাইয়াছেন, তোমাদের মধ্যে কেহ-ই পূর্ণ ঈমানদার হইতে পারিবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে খাহেশে নফসানীর অনুসরণ করিবে। কেননা, খাহেশে নফ্‌সানী ঈমানের দরজার তালাস্বরূপ, যদ্বারা ঈমান ও আমল প্রকাশ পাইতে পারে না। অতএব, তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত খাহেশে নফসানী দূর করিতে না পারিবে, ততক্ষণ পবিত্র কুরআন ও হাদীসের মর্ম অনুধাবন করিতে পারিবে না। তোমার মূর্খতা ও অজ্ঞতার কারণে সুরক্ষিত কোরআন ও হাদীসসমূহের মধ্যে তাওবীল করিতে আরম্ভ কর। পবিত্র কুরআনের শব্দ ও বাক্যসমূহের তাওবীল না করিয়া নিজেকে তাওবীল কর। নিজের নফ্‌সকে সংশোধন কর, তবে তুমি কোরআন ও হাদীসের মর্ম ও রহস্য অনুধাবন করিতে পারিবে। তোমার চিন্তাধারা ও ফেকের দ্বারা পবিত্র কুরআনকে পরিবর্তন করিতে চাও। ইহা না করিয়া কোরআনকে কোরানের স্থানে থাকিতে দাও, বরং তোমার চিন্তাধারাকে পরিবর্তন কর। তোমার চিন্তাধারা অনুযায়ী পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা করিলে কুরআন পরিবর্তন হইয়া যায়। এইজন্যই হুজুর (দ:) বর্ণনা করিয়াছেন, যে ব্যক্তি নিজের চিন্তাধারা অনুযায়ী পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যা করিবে, সে কাফের হইয়া যাইবে।

ক্ষুদ্র মাছির ব্যাখ্যা করার বর্ণনা

খানাদ আহ্‌ওয়ালাতে বদাঁ তরফা মাগাছ,
কো হামী পেন্দাশত খোদরা হাস্তে কাছ।
আজ খোদী ছার মস্তে গাস্তাহ বেশরাব,
জর্‌রায়ে খোদ্‌রা বদীদাহ্‌ আফতাব।
ওয়াছফে বাজাঁ রা শনিদাহ্‌ দর বয়ান,
গোফ্‌তে মান উনকায়ে ওয়াক্তাম বে গুমান।
গোফ্‌তে মান দরিয়াও কাস্তি খান্দাম,
মুদ্দাতে দর ফেক্‌রে আঁ মী মান্দাম।
আঁ মাগাছ বর বরগে কাহে ও বউলে খর,
হাম চু কাস্তিয়াঁ হামী আফরাস্তে ফর।
ইঁ নাক ইঁ দরিয়াও ইঁ কাস্তি ও মান,
মরদে কাস্তি বাঁ ও আহ্‌লে রায়ে ও ফান।
বর্‌ছারে দরিয়া হামী রানাদ ও আমাদ,
মী নামুদাশ আঁকদরে বীরুঁ জে হদ।
বুদে বে হদ আঁ চেমীন নেছবাত বদু,
আঁ নজর কো বীনাদ আঁ রা রাস্তে কু।
আলমাশ চান্দাঁ বুদে কাশ বীনাশাস্ত,
চশমে চান্দি ইঁ বহরে হাম চান্দিনা শাস্ত।
ছাহেবে তাওবীলে বাতেল চুঁ মাগাছ,
ও হাম উ বউলে খর ও তাছবীরে খাছ।
গার্‌ মাগাছ তাওবীলে বোগজারাদ বরায়ে,
আঁ মাগাছ রা বখতে গরদান্দ হুমায়ে।
আঁ মাগাছ নাবুদে কাশ ইঁ গায়রাতে বুদ,
রূহে উ নায়ে দর খোরে ছুরাতে বুদ।
হাম চু আঁ খরগোশে কো বর শেরে জাদ,
রূহে উ কায়ে বওয়াদ আন্দর খোরদে কাদ।

অর্থ: উপরোক্ত বয়াত-সমূহে মাওলানা বাতেল ব্যাখ্যাসমূহের দৃষ্টান্ত দিয়া প্রকাশ করিতেছেন, বাতেল ব্যাখ্যাকারীর অবস্থা যেমন আশ্চর্যজনক ক্ষুদ্র এক মাছির ন্যায়। ঐ ক্ষুদ্র মাছি নিজেকে নিজে মস্ত বড় একটি প্রকাণ্ড প্রাণী বলিয়া মনে করিত। শরাব পান ইহার মাথায় ঘুরপাক মারিতে থাকিত এবং ক্ষুদ্র নিজেকে আফ্‌তাব মনে করিত। কোনো স্থানে বাজ পাখীর কেচ্ছা শুনিলে বলিত, আমি বর্তমান সময়ের উন্‌কা পাখী। উন্‌কা বাজ পাখীর চাইতেও অনেক বড়। এই রকম খেয়ালের একটি মাছি ঘটনাক্রমে একদিন এক গাধার পেশাবের মধ্যে ভাসমান একটা শুকনা খড়ের উপর যাইয়া বসিল। তারপর বিজ্ঞ মাঝির ন্যায় গর্ব করিয়া বলিতে লাগিল যে আমি সাগর আর নৌকার কেচ্ছা কেতাবে পাঠ করিয়াছিলাম। বহুদিন পর্যন্ত এই চিন্তায় ছিলাম, দরিয়া এবং নৌকা কীরূপ হইয়া থাকে? এখন বুঝিতে পারিলাম যে দরিয়া ইহাকেই বলে। অর্থাৎ, গাধার পেশাব, আর এই শুক্‌না খড় নৌকা হইবে এবং আমি বিজ্ঞ মাঝি। ঐ দরিয়ায় বসিয়া সে আনন্দ করিতেছিল। ঐ পরিমাণকেই সে সীমার বাহিরে মনে করিতেছিল। প্রকৃতপক্ষেই এতখানি গাধার পেশাব ইহার নিকট সীমাহীন বলিয়া মনে হইতেছিল। এই রকম চিন্তা শক্তি আর কোথায় পাওয়া যায় যে ইহাকে শুদ্ধ বলিয়া মনে করিবে। মাছির পৃথিবী ত এতখানি, যতখানি সে চক্ষে দেখে। যখন দৃষ্টিশক্তি এতখানি, তখন তাহার দরিয়াও অতটুকু হইবে। দৃষ্টিশক্তির পরিমাণ যখন কম ছিল, তখন অতটুকু গাধার পেশাব তাহার নিকট কিনারাহীন দরিয়া ও সীমাহীন পৃথিবী মনে হইতেছিল। অতএব, ভুল ব্যাখ্যাকারীদেরও অবস্থা ঐ ক্ষুদ্র মাছির ন্যায়। নিজেকে বিদ্বান ও বিজ্ঞ পণ্ডিত বলিয়া মনে করে। তাহার ধ্যান-ধারণা গাধার পেশাবের ন্যায় ভুল দরিয়া। যদি মাছি নিজের জ্ঞান-আন্দাজ রায় না দিত, বরং কামেল বোযুর্গের অনুসরণ করিত, ইহাকে শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে রাখিত, তবে রায় দ্বারা পরিষ্কার জানা যাইত যে দলিলে শরিয়ত দ্বারা ব্যাখ্যা করা জায়েজ আছে। তাহা হইলে ঐ ক্ষুদ্র মাছির বলন্দ নসিব হাসেল হইত। ক্ষুদ্র জ্ঞানী ও আহ্‌লে বাতেল (বাতেল লোকেরা) কামেলের সোহবাত দ্বারা আহলে হক ও কামেল হইতে পারে। মাওলানা বলেন, ঐ ক্ষুদ্র মাছি মাছি-ই থাকিবে না; যাহার এই রকম গায়েরাত হইবে। যে শরিয়তের মধ্যে ঐ রকম নিজের রায় দ্বারা কাজ না করে, তবে ঐ ব্যক্তিকে অসম্পূর্ণ মনে করা চাই না। যদিও বাহ্যিক পড়াশুনা করার দিক দিয়া শূন্য। এই রকম অনেক কামেল লোক অতিবাহিত হইয়া গিয়াছেন, যাহারা বাহ্যিক পড়াশুনা করেন নাই, কিন্তু আলেমদের সোহবাতে থাকিয়া বাহ্যিক বিদ্যা হাসেল করিয়া লইয়াছেন। প্রকৃত রহস্যসমূহ এলম দ্বারা মালুম করিয়া লইয়াছেন। তাহাদের প্রকাশ্য সুরাত বাতেনী রূহের সহিত সামঞ্জস্য ছিল না। যদিও প্রকাশ্যে এলম বা বিদ্যাশূন্য বলিয়া মনে হইত। কিন্তু হাকিকতের দিক দিয়া পূর্ণ কামেল ছিলেন। যেমন পরে মাওলানা খরগোশের ঘটনা উল্লেখ করিয়া প্রমাণ করিয়া দিতেছেন যে, খরগোশ যদিও আকৃতিতে ক্ষুদ্র, তথাপি ইহা জ্ঞানের দিক দিয়া পূর্ণ কামেল ছিল।

খরগোশের বিলম্বে আসার দরুন বাঘের মনঃকষ্ট হওয়ার বর্ণনা

শের মী গোফ্‌ত আজ ছারে তেজী ও খশ্‌ম,
কাজ রাহে গোশাম আদু বর বস্তে চশম।
মকরে হায়ে যবরিয়া নাম বস্তা কর্‌দ।
তেগে চৌ বীনে শানে তনাম রা খাস্তা কর্‌দ।
জে ইঁ ছেপাছ মান না শনুম আঁ দমদমা,
বাংগে দেও আনাস্ত ও গুলানে আঁ হামা।
বর দরানে আ বদেলে তু ইশাঁরা মাইস্ত,
পোস্তে শাঁ বর কুনফে গায়েরে গোস্ত নীস্ত।

অর্থ: খোরগোশের যখন যাইতে দেরী হইল, তখন বাঘ রাগান্বিত হইয়া গর্জন করিয়া বলিতেছিল যে, এই সমস্ত বন্য দুশ্‌মনেরা কানের দিক দিয়া আমার চক্ষু অন্ধ করিয়া রাখিয়াছে। অর্থাৎ, সত্য মিথ্যা কথা বলিয়া প্রকৃত ঘটনা আমার নিকট গুপ্ত রাখিয়াছে। ঐ যবরিয়াদের ধোকায় আমাকে শিকার করা হইতে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে এবং ইহাদের সত্য ও মিথ্যায় আমার দেহ জখম হইয়া গিয়াছে। ইহার পর হইতে আমি কখনও ইহাদের ধোকাবাজীর কথা শুনিব না। কেননা, ইহাদের সকল কথাই শয়তানদের কথার ন্যায়। পথিকদিগকে ডাকিয়া ডাকিয়া পথ ভুলাইয়া দেয়। আচ্ছা! হে মন, তুমি ইহাদিগকে শাস্তি দাও, কখনও থামিও না। ইহাদের চামড়া খসাইয়া ফেল। কেননা, ইহাদের মধ্যে চামড়া ব্যতীত অন্য কোন ভাল গুণ নাই। ওয়াদা পূরণ করে না, সত্য কথা বলে না। তাই ইহাদিগকে শাস্তি দেওয়া দরকার।

পোস্ত চে বুদ গোফ্‌ তাহায়ে রংগে রংগে,
চু জরাহ বর আবেকাশ নাবুদ দেরেঙ্গ।
ইঁ ছুখান চুঁ পোস্তে মায়ানী মগজে দাঁ,
ইঁ ছুখান চুঁ নকশে মায়ানী হামচু জাঁ।
পোস্তে বাশদ মগ্‌জে বদরা আয়েবে পোশ,
মগজে নেকুরা জে গায়েরাত গায়েবে পোশ।
চুঁ জে বা দস্তাত কলমে দফতর জে আব,
হরচে বনাওবেছী ফানা গর্‌দাদ শেতাব।
নকশে আবাস্ত আর ওফা জুই আজ আঁ,
বাজে গর্‌দী দস্তে হায়ে খোদ গোজাঁ।

অর্থ: এখানে মাওলানা চামড়া সম্বন্ধে বলিতেছেন, তোমরা কি জানো চামড়া কী বস্তু? ইহা অতিরঞ্জিত নানা প্রকার রংয়ের কথাবার্তা। ইহা দ্বারা ভিতরের বস্তু ঢাকিয়া রাখে। ইহার দৃষ্টান্ত যেমন পানির উপর বাতাসের দ্বারা যে ঢেউয়ে ফেনা তৈয়ার হইয়া যায়, ইহার কনো স্থায়িত্ব নাই। এইভাবে জাহেরী কালাম-সমূহকে খালের ন্যায় মনে কর এবং ইহার মায়ানী ও হাকিকাতকে মগজের ন্যায় মনে কর। আরো দৃষ্টান্ত দেওয়া যাইতে পারে। যেমন জাহেরী কালামকে নক্‌শা ও দেহের সাথে তুলনা করা যায়, আর উহার মায়ানীকে রূহের সহিত উপমা দেওয়া যায়। খেয়াল কর, যেমন খাল ও নকশা উদ্দেশ্যবিহীন হয়, আর মগজ ও রূহ্‌ আসল উদ্দেশ্য থাকে। এইভাবে প্রকাশ্যে বাক্য দ্বারা কোনো উদ্দেশ্য থাকে না, আসল উদ্দেশ্য হইল ইহার অর্থ। চামড়া বা খালের স্বভাব হইল ভিতরের বস্তু ঢাকিয়া রাখা। যদি ভিতরে খারাপ জিনিস থাকে, তবে উহা লুকাইয়া রাখে, যাহাতে উপর দিয়া খারাবি দেখা না যায়। আর যদি ভিতরে উত্তম জিনিস থাকে, তবে নিজের আত্মসম্মান বজায় রাখার জন্য সম্মানহীনদের নজরে যাহাতে না পড়ে, সেই জন্য ঢাকিয়া রাখে। এইভাবে কালামেরও স্বভাব আছে। প্রায় ভণ্ড দাবীদারদের কালাম-ই অতিরঞ্জিত ও চটকদার হইয়া থাকে, ঐ কালামের দরুণ তাহাদের প্রকৃত অবস্থা অশিক্ষিত জনসাধারণের নিকট লুপ্ত থাকে, প্রকাশ পায় না এবং আহালে হকদের কালাম প্রায়-ই সাদাসিধা, সংক্ষেপে রংবিহীন আকারে বলা হয়। ইহার আড়ালে বোজর্গ লোকদের কামালাত জনসাধারণের নিকট প্রকাশ পায় না, গুপ্ত থাকে। এইজন্য জাহেরী কালামকে চামড়ার সাথে তুলনা করা হইয়াছে। অতএব, এই জাহেরী কালাম ক্রিয়া ও স্বভাবের দিক দিয়া চামড়ার ন্যায়, বিশেষ করিয়া অতিরঞ্জিত কালাম-গুলি স্থায়িত্বের দিক দিয়া পানির ফেনার ন্যায়। যেমন উপরের বয়াতে উল্লেখ করা হইয়াছে। সেইদিকে লক্ষ্য করিয়া মওলানা বলিতেছেন যে, যখন বায়ুর কলম ও পানির দফতর, তবে যাহা কিছু লিখা হয়, উহা শীঘ্রই ফানা হইয়া যাইবে। কেননা, উহা শুধু পানির উপরের নকশা মাত্র। ইহা হইতে যদি ওয়াফা-দারীর আশা কর, তবে পরিণামে যাইয়া হতাশা প্রকাশ করিতে হইবে। এই রূপভাবে রঙ্গীন বাক্যের উচ্চারণকারীর নিকট ওয়াদা পূরণের আশা করা চাই না।

বাদে দর মরদম হাওয়াও আরজুস্ত,
চুঁ হাওয়া বগোজাস্তী পয়গামে হুস্ত
খোশে বুদ পয়গাম হায়ে কের্‌দে গার,
কো জেছার তা পায়ে বাশদ পায়েদার।
খোতবায়ে শাহানে বগরদাদ ও আঁকেয়া,
জয কেয়া ও খোতাব হায়ে আম্বিয়া।
জা আঁকে বুশে বাদশাহানে আজ হাওয়াস্ত,
বারে নামা আম্বিয়া আজ কিবরিয়াস্ত।
আজ দরমেহা নামে শাহানে বর কুনান্দ,
নামে আহ্‌মাদ তা কিয়ামত মী জানান্দ।
নামে আহ্‌মাদ নামে জুমলা আম্বিয়াস্ত,
চুঁকে ছদ আমদ নূদে হাম পেশে মাস্ত।
ইঁ ছুখান পায়ানে না দারাদ আয় পেছার,
কেচ্ছায়ে খরগোশে গো ও শেরে নর।

অর্থ: মাওলানা বলেন, মানুষের মধ্যে যে হাওয়ায়ে নফ্‌সানী ও আকাঙ্ক্ষাসমূহ আছে, ইহা বায়ুর সাথে তুলনা রাখে। অতএব, যে সমস্ত কাজ ও কথা ঐ হাওয়ায়ে নফসানী দ্বারা উৎপত্তি হয়, উহার মধ্যে সত্য মিথ্যার কোনো পার্থক্য থাকে না; ইহা শুধু পানির উপর বুদবুদের ন্যায়, ইহার কোনো স্থায়িত্ব নাই এবং বিশ্বাসযোগ্যও নহে। যদি এই খাহেশে নফ্‌সানী পরিত্যাগ করা যায়, তবে কলবের মধ্যে সত্যকাজের প্রেরণা আসে এবং আল্লাহর তরফ হইতে গায়েবী এলেম ও মদদ পাওয়া যায়। তারপর যে সমস্ত কথা অন্তারে খেয়াল হয়, নিশ্চয়ই ইহার স্থায়িত্ব থাকে এবং বিশ্বাসযোগ্যও হয়। যেমন, মাওলানা বলেন, আল্লাহতায়ালার তরফ হইতে যে হুকুম হয় উহাই উত্তম এবং স্থায়ী হয়। বাদশাহদের খোতবা ও তাহাদের নেতৃত্ব পরিবর্তন হইয়া যায়। যেমন একজন বাদশাহ মরিয়া গেল। তাহার নাম খুতবা হইতে বাদ দেওয়া হয় এবং তাহার রাজত্বকাল চলিয়া যায়। কিন্তু আম্বিয়া (আ:)-গণের নেতৃত্ব ও তাঁহাদের খুতবা-সমূহ, তাঁহারা মৃত্যুমুখে পতিত হইলেও তাহার পরেও শেষ হয় না। বাদশাহদের কার্যকলাপ মনের খেয়ালে ও দুনিয়ার শখে করা হয়। আর হজরত আম্বিয়া (আ:)-গণের সৌন্দর্য্য ও মরতবা শরিয়তের নির্দেশ অনুযায়ী  আল্লাহর তরফ হইতে প্রাপ্ত হয়। এইজন্য কোনো বাদশার মৃত্যু হইলে তাহার নামের মোহর টাকার উপর দেওয়া বন্ধ করিয়া দেয়া হয়। আম্বিয়া (আ:)-গণের শান এই রকম যেমন হজরত আহ্‌মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নাম মোবারক কিয়ামত পর্যন্ত জিন্দা থাকিবে। ইহাতে বুঝা যায়, যে কাজ নিজের মনের খেয়ালে শখের জন্য করা হয়, উহা স্থায়ী হয় না। যাহা আল্লাহর তরফ হইতে করা হয়, উহা স্থায়ী থাকে। মাওলালা বলেন, সমস্ত আম্বিয়া (আ:)-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়া শুধু হজরত পাক (দ:)-এর নাম মোবারক বলা হইল। ইহার কারণ, হজরত আহ্‌মদ মোস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের নামের মধ্যে সকলের নাম-ই নিহিত আছে, অর্থাৎ, ‘আহ্‌মদ’ সব আম্বিয়া (আ:)-গণের মোবারক নাম। কেননা, হুজুর (দ:) সমস্ত আম্বিয়া (আ:)-গণের কামালাতের সমষ্টি। অতএব, হুজুর পাক (দ:)-এর নাম লওয়া অর্থ সমস্ত আম্বিয়া (আ:)-গণের নাম লওয়া। আহমদী শরিয়ত বাকী থাকা অর্থ সমস্ত নবীদের শরিয়ত বাকী থাকা। এই জন্য সবের নাম না উল্লেখ করিয়া হযরত আহমদ মোস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর নাম মোবারক উল্লেখ করা হইয়াছে এবং তাঁহার দ্বীন বাকী থাকার কথা উল্লেখ করিয়া সমস্ত আম্বিয়া (আ:)-দের দ্বীন বাকী থাকা প্রমাণ করা হইয়াছে। ইহার দৃষ্টান্ত যেমন একশত উল্লেখ করিলে ইহার মধ্যে নব্বইকে পাওয়া হয়। আল্লাহর তরফ হইতে যাহা হয়, ইহা স্থায়ী হয়। এরূপ দৃষ্টান্ত বহু দেওয়া যায়, ইহার কোনো সীমা নাই। অতএব, এখন শেষ করিয়া খরগোশের কেচ্ছা বলা উচিত।

খরগোশের বাঘের সম্মুখে বিলম্বে যাওয়া এবং খরগোশের ধোকাবাজীর কথা বর্ণনা

দরশোদানে খরগোশ বছতারিখে কর্‌দ,
মক্‌রে রা বা খেশতনে তাকরীরে কর্‌দ।
দররাহে আমদ বাদে তাখীরে দরাজ,
তা বগোশে শেরে গুইয়াদ এক দোরাজ।

অর্থ: খরগোশ বাঘের সম্মুখে যাইতে খুব দেরী করিল। নিজের মনে অনেক ধোকা ও তদবীর চিন্তা করিয়া বাহির করিয়া লইল। তারপর রাস্তায় বাহির হইয়া চলিতে লাগিল, এবং মনে মনে স্থির করিল যে, নিজের চিন্তা করা ধোকার দুই একটা উপযোগী সময়ে বাঘের কানে বলিবে।

তাচে আলেম হাস্ত দর ছুদায়ে আকল,
তাচে বা পেন হাস্ত ইঁ দরিয়ায় আকল।
বহরে পে পায়ামে বুদ আকলে বাশার,
বহরে রা গেওয়াজ বাইয়াদ আয় পেছার।
ছুরাতে মা আন্দরে ইঁ বহরে আজাব,
মী দুদ চুঁ কাছেহা বরবোয়ে আব।
তা নাশোদ পুর বর ছারে দরিয়া তোশ্‌ত।
চুঁকে পুরশোদ তোশ্‌তে দর ওয়ে গর্‌কে গাস্ত।
আকলে পেনহাস্ত ও জাহেরে আলমে,
ছুরাতে মা মউজু ইয়া আজ ওয়ে নমে।
হরচে ছুরাতে মী ওছিলাতে ছাজাদাশ,
জে আঁ ওছিলাতে বহরে দূর আন্দাজাদাশ।
তা না বীনাদ দেল দেহেন্দাহ রাজেরা,
তা না বীনাদ তীরে দূর আন্দাজেরা।

অর্থ: মাওলানা বলেন, জ্ঞানের খেয়ালে কত রকম মূল্যবান বিষয় পড়িয়া রহিয়াছে। তোমরা চিন্তা করিয়া দেখ। জ্ঞানের সাগর কত বড় প্রশস্ত ভাবিয়া দেখ। ক্ষুদ্র খরগোশ অত্যন্ত ক্ষীণ দেহ নিয়া বাঘকে ধ্বংস করার সাহস সঞ্চয় করিয়াছে এবং নিজের শক্তি ও খেয়ালে কী রকম ফন্দি আঁটিয়াছে। প্রাণীর জ্ঞান শুধু প্রশস্ত-ই, কিন্তু মানুষের জ্ঞান সীমাহীন সাগর। এই সাগরে ডুব দেওয়া দরকার। এই সীমাহীন সাগরে ডুব দিয়া অমূল্য সম্পদ, জ্ঞান, হাসেল করা আবশ্যক। তাহা না হইলে মানুষের জ্ঞান ও পশুর বুদ্ধি একই রকম হইয়া যায়। কেননা, যে দরিয়ায় গওহর আছে, তাহা যদি ডুব দিয়া বাহির করা না যায়, তবে যে দরিয়ায় গওহর নাই, সেই দরিয়া এবং গওহর বিশিষ্ট দরিয়া একই প্রকার হওয়া লাজেম আসে। এখন মাওলানা ঐ মূল্যবান বস্তু জ্ঞান আর দেহের সাথে সম্বন্ধ বর্ণনা করিতেছেন যে, আমাদের দেহের আকৃতি জ্ঞানের সাগরে এমনভাবে দৌড়াইয়া ফিরিতেছে, যেমন পানির উপর পেয়ালা ভাসিতেছে। যতক্ষণে পেয়ালায় পানি পরিপূর্ণ না হইবে, ততক্ষণ ভাসিতে থাকিবে। যখন পেয়ালার মধ্যে পানি পূর্ণ হইয়া যাইবে, তখন পানির মধ্যে ডুবিয়া যাইবে। এই রকমভাবে মানুষের দেহ যতক্ষণ পর্যন্ত জ্ঞানের আলো দ্বারা পরিপূর্ণ না হইবে, ততক্ষণ শারীরিক বিধানগুলি জয়ী থাকিবে। আর রূহানী শক্তি আবৃত থাকিবে। যেমন খালি পেয়ালা পানির উপর ভাসিতে ছিল, পানি নিচে ছিল। যখন দেহ জ্ঞানের আলোতে পরিপূর্ণ হইবে এবং ভবিষ্যৎ জ্ঞান যথেষ্ট পরিমাণ হাসেল হইবে, তখন শারীরিক বিধানসমূহ যথা খাহেশ ও ক্রোধ পরাস্ত হইয়া যাইবে। রূহানী বিধানসমূহ যথা মহব্বত ও মারেফত জয়ী হইয়া যাইবে। যেমন উল্লেখিত দৃষ্টান্তে পেয়ালার পানি পরিপূর্ণ হইয়া পানি পেয়ালার উপরে উঠিয়াছে। পেয়ালা পানির মধ্যে চলিয়া গিয়াছে। আমাদের জ্ঞান আবৃত। যেমন পানির উপরে পাত্র দ্বারা পানি আবৃত থাকে। আমাদের বাহ্যিক দেহ প্রকাশ্য পানির উপর পেয়ালার ন্যায়। আমাদের দেহ ঐ জ্ঞানের সাগরে একটি ঢেউয়ের ন্যায় অথবা একটি বিন্দুর মত। দেহ জ্ঞানের অধীনস্থ, ঢেউ পানির অধীনস্থ। তবুও ঢেউ যদি অধিক পরিমাণে বাড়িয়া যায়, তবে পানি ঢাকিয়া ফেলে। ঐ রকম দেহের বিধানগুলি জয়ী হইলে জ্ঞানকে লুকাইয়া ফেলে। যখন জ্ঞান নেতা এবং দেহ অধীনস্থ প্রমাণ হইল, তখন যদি কেহ জ্ঞানকে ছাড়িয়া দেহকে আঁকড়াইয়া ধরে, তবে ইহার ক্ষতি সম্বন্ধে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, যদি কেহ পার্থিব বস্তুকে অসীলা নির্দিষ্ট করিয়া আল্লাহকে পাইতে চায়, যেমন কাফেররা মূর্তি পূজা করিয়া আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসেল করিতে চায়, তাহা হইলে অসীলা নির্দিষ্ট করার জন্য জ্ঞানের সাগর তাহাকে জ্ঞান হইতে অনেক দূরে নিক্ষেপ করিয়া ফেলে। কেননা, আকৃতির সাথে কেন সে মশগুল হইল,  এবং আকৃতিকে কেন সে অসীলা বানাইল? আল্লাহর নিকট পৌঁছিবার প্রকৃত অসীলা মারেফত ও তলব। ইহা জ্ঞানের শক্তি, যাহা জ্ঞানের সাগর হইতে হইতে হাসেল করা যায়। এইজন্য জ্ঞানের শক্তিকে আল্লাহর নিকট পৌঁছিবার মত উপযুক্ত করা চাই। কোনো আকৃতিকে উপযুক্ত করা যায় না। যেহেতু ইহা যদিও কোনো অংশে অসীলা হইবার উপযুক্ততা অর্জন করে, তবে উহা উত্তম বিশ্বাস ও সততার উপর নির্ভর করে এবং তাহা অন্তরের কাজ। আর অন্তর এবং জ্ঞান মূলে একই বস্তু। এই জন্য মাওলানা বলিতেছেন যে, কোনো আকৃতিবিশিষ্ট বস্তু আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য অসীলা হইতে পারে না। কেননা, আকৃতির পূজারী রূহ দেখিতে পারে না। রূহ্‌ মিন আমরিল্লাহ। রূহ ব্যতীত আল্লাহকে পাওয়া যাইবে না।

আছপে খোদ্‌রা ইয়া ওয়াহ্‌ দানাদ ওজে ছেতীজ,
মী দাওয়ানাদ আছপে খোদ দর্‌রাহে তেজ।
আছপে খোদ্‌রা ইয়া ওয়াহ্‌ দানাদ আঁ জওয়াদ,
ওয়াছপে খোদ উরা কাশান কর্‌দাহ্‌ চু বাদ।
দরফাগানো জুস্তে জু আঁ খীরাহ্‌ ছার,
হর তরফে পুরছালো জুইয়ানে দর বদার।
কা আঁকে দোজদীদ আছপে মারা কোওকীস্ত,
ইঁ কে জীরে রানে তুস্ত ই খাজা চীস্ত।
আরে ইঁ আছপাস্ত লেকে আঁ আছপে কো,
বা খোদ আ আয়ে শাহ ছওয়ার আছপেজো।
ওয়াছফেহারা মোস্তামেয় গুইয়াদ বা রাজ,
তা শেনাছাদ মরদে আছপে খেশে বাজ।
জানে জে পয়দাই ও নজদী কীস্ত গোম,
চুঁ শেকেম পুর আবো লবে খুশকে চুখোম।
দর দরুনে খোদ বফজা দর্‌দেরা।
তা বা বীনি ছবেজো ছুরখো জর্‌দেরা।

অর্থ: মাওলানা উপরে রূহ্‌ এবং দেহের কথা বর্ণনা করিয়াছেন যে, রূহ্‌ নেতা এবং দেহ তাহার অধীন। দেহ কখনও আল্লাহর নৈকট্য লাভের অসীলা হইতে পারে না। রূহ্‌ আল্লাহর নৈকট্য লাভের একমাত্র উপায়। তাই রূহ কোথায়, কীভাবে আছে ও তাহাকে জানার উপয় কী? এই সম্বন্ধে বলিতে যাইয়া তিনি বলিতেছেন যে, যদি কেহ জিজ্ঞাসা করে যে রূহ্ কোথায়? আমারা কেমন করিয়া তাহাকে অসীলা বানাইতে পারি? ইহার উত্তরে মাওলানা জওয়াব দিতেছেন যে, রূহ্‌ তোমার অতি নিকট, তোমারই সাথে আছে। কিন্তু তোমার অজ্ঞতার কারণে ইহা তোমা হইতে দূরে এবং লুকান বলিয়া ধারণা হয়। বাস্তবে রূহ অতি নিকটে কিন্তু জ্ঞাত হওয়ার দিক দিয়া বহু দূরে বলিয়া মনে হয়। ইহা একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত দিয়া পরিষ্কার করিয়া বুঝাইয়া দেওয়া হইয়াছে। যেমন, এক ব্যক্তি নিজের ঘোড়ার উপর সওয়ার হইয়া চলিতেছে, ভুলবশতঃ নিজের ঘোড়া হারাইয়া গিয়াছে মনে করিয়া অজ্ঞতার দরুন নিজের ঘোড়াকে পথে খুব তেজের সহিত চালাইতেছিল। নিজের ঘোড়া হারাইয়া গিয়াছে বলিয়া মনে করিতেছিল। প্রকৃতপক্ষে তাহার নিজের ঘোড়া তাহাকে নিয়া বায়ুবেগে চলিতেছিল। ঐ ব্যক্তি চুতুর্দিকে দৌড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিতেছিল, আমার ঘোড়া চুরি করিয়া কে নিল? সে কোথায়? কোনো এক ব্যক্তি উত্তর করিল, মিয়া তোমার রানের নিচে ঐটি কী? সে উত্তর করিল, হাঁ এটি ঘোড়া, কিন্তু আমার ঘোড়া কোথায়? লোকটি বলিল, আরে তুমি নিজে হুঁশ কর। লোকটি সওয়ারের নিকট চুপে চুপে তাহার অবস্থা ও ঠিকানা বাতলাইয়া দিল, যাহাতে তাহার নিজের ঘোড়া বলিয়া চিনিতে পারে। অতএব, এই ব্যক্তি যেমন নিজের ঘোড়ার উপর সওয়ার হওয়া অবস্থায় আছে এবং প্রকৃতপক্ষে ঘোড়া তাহার নিজের নিকটই আছে, কিন্তু অনুভূতি নষ্ট হইয়া যাওয়ার দরুন অজানা হইয়া গিয়াছে। কেননা, সে জ্ঞানশূন্য হইয়া গিয়াছে। তাই ঘোড়া হারান গিয়াছে এবং বহু দূরে গিয়াছে বলিয়া মনে করে। রূহের অবস্থাও এই রকম ঘোড়ার ন্যায় মানুষ লইয়া দৌড়াইয়া ফিরে। কেননা, দেহ যত কিছু করুক না কেন, সবই রূহের অসীলায় করে। রূহ ব্যতীত কিছুই করিতে পারে না। ইহা সত্ত্বেও মানুষ রূহকে চিনিতে পারে না। এইজন্য মানুষ রূহ হইতে অজ্ঞাত রহিয়াছে এবং আশ্চর্যান্বিত হইয়া রূহ সম্বন্ধে প্রশ্ন করে। প্রকৃতপক্ষে রূহ তাহার অতি নিকটেই প্রকাশ আছে। কিন্তু তাহার অনুভূতি হারাইয়া গিয়াছে। যেমন মট্‌কা পানি পূর্ণ আছে; বহির্ভাগ শুষ্ক। পানি পূর্ণ মটকা হওয়া সত্ত্বেও পানি গুপ্ত থাকে। এই রকম রূহ  দেহের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও গুপ্ত রহিয়াছে। এখন যদি কেহ বলে যে, রূহ এই রকম গুপ্ত থাকিলে, ইহাকে কেমন করিয়া মা‘লুম করা যায় এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অসীলা বানান যায়? উত্তরে বলা হইয়াছে যে, নিজের অন্তরে তালাশ করার ইচ্ছাশক্তি তৈয়ার কর। অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসার ব্যথা সৃষ্টি কর। তাহা হইলে তোমার মধ্যে নিহিত বিভিন্ন বস্তুসমূহের রহস্য জানিতে পারিবে। যেমন লাল, সবুজ ও হলুদ রংয়ে অনেক কিছু জানিতে পারিবে। এখানে মাওলানা অভ্যন্তরীণ লতিফা-সমূহের দিকে ইশারা করিয়াছেন।

কায়ে বা বীনি ছোরখো ছবজো ও বুরেরা,
তা না বীনি পেশে আজ আঁ ছে নুরে রা।
লেকে চুঁ দর রংগে গমশোদ হুশে তু,
শোদ জে নূরে আঁ রংগে হা রোপোশে তু।
চুঁ কে শবে আঁ রংগেহা মস্তুরে বুদ,
পাছ বদিদী দীদে রংগে আজ নূরে বুদ।
নীস্তে দীদে রংগে বে নূরে বেরুঁ,
হাম চুনীঁ রংগে খেয়ালে আন্দরুঁ।
ইঁ বেরু আজ আফতাবে ও আজ ছুহাস্ত,
ও আ দরুঁ আজ আকছে আনওয়ারে আলাস্ত।
নূরে নূরে চশমে খোদ নূরে দেলাস্ত,
নূরে চশমে আজ নূরে দেলহা হাছেলাস্ত।
বাজ নূরে নূরে দেল নূরে খোদাস্ত,
কো জে নূরে আকলো হেচ্ছে পাকো জুদাস্ত।
শবে না বুদ নূর ও নাদিদী রংগেরা।
পাছ ব জেদ্দে নূরে পয়দা শোদ তোরা।
শবে নাদিদী রংগে কাঁবে নূরে বুদ,
রংগে চে বুদ মোহরা কো রো কাবুদ।
দীদানে নূরাস্ত আঁগাহ দীদে রংগ,
ওয়া ইঁ বজেদ্দে নূরে দানী বেদে রংগ।
রঞ্জো গমেরা হক পায়ে আঁ ফরিদ,
তা বদীঁ জেদ্দে খোশ দেলী আইয়াদ পেদীদ।
পাছ নেহানী হা ব জেদ্দে পয়দা শওয়াদ,
চুঁকে হক্কেরা নীস্ত জেদ্দে পেনহা বওয়াদ।
কে নজরে বর নূরে বুয়াদ আঁগাহ্‌ ব রংগ,
জেদ্দে বজেদ্দে পয়দা বওয়াদ চুঁরুম ও জংগ।
পাছ ব জেদ্দে নূরে দানাস্তী তু নূর,
জেদ্দে জেদ্দেরা মী নুমাইয়াদ দর ছদূর।
নূরে হক রা নীস্তে জেদ্দে দর ওজুদ,
তা বজেদ্দে উরা তাওয়াঁ পয়দা নামুদ।
লা জারাম আবছারে নালা তুদরেক্‌হু,
ওয়া হুয়া ইউদরেকু বীঁ তু আজ মুছা ও কোহু।

অর্থ: মাওলানা বলেন, তুমি কেমন করিয়া লাল, সবুজ ও গোলাপী ইত্যাদি রং সমূহ দেখিবে, যদি তুমি এই তিন রং দেখিবার পূর্বে প্রকাশ্য আলো দেখিতে না পাও? কিন্তু দেখিবার সময় তোমার খেয়াল যদি সম্পূর্ণ আলোর মধ্যে ডুবিয়া যায়, তাহা হইলে ঐ রং আলো হইতে আবৃত থাকিবে। কেননা, রংয়ের দিকে খেয়াল করিলে আলো গুপ্ত হইয়া যায়। আলোর দিকে খেয়াল থাকে না। রাত্রে অন্ধকারে রং ঢাকিয়া যায়, দেখা যায় না। তখন তুমি মনে কর আলো দ্বারাই দেখা যায়। তাই যেমন জাহেরী (প্রকাশ্য) রং সমূহ জাহেরী আলো ব্যতীত দেখা যায় না। এই রকম বাতেনী আলোর অবস্থা, যাহাকে খেয়াল বলা হয়। খেয়াল অর্থ অনুভূতি-শক্তি। চাই প্রকাশ্য বস্তুর অনুভূতি অথবা বাতেনী বস্তুর অনুভূতি-শক্তি। অনুভূতি সব জায়গায়-ই দরকার। এই অনুভূতির জন্য বাতেনী আকলের দরকার। প্রকাশ্যে সূর্যের আলো অথবা তারকার আলো থাকে। আর বাতেনী আলো, ইহা সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার আলোর প্রতিবিম্ব। সূর্য ও তারকারাজির আলোও আল্লাহর আলো হইতে উপকৃত হয়। যেমন আমাদের চক্ষের দৃষ্টিশক্তির আলো অন্তর হইতে প্রাপ্ত হওয়া যায়। কেননা, ইহা প্রমাণিত হইয়াছে যে অনুভূতি-শক্তি প্রকৃতপক্ষে বাতেনী শক্তি। প্রকাশ্য অনুভূতি হাতিয়ার-যন্ত্রপাতি ও স্পর্শশক্তি ছাড়া আর কিছুই না। অতএব, চক্ষুর আলো প্রকাশিত হওয়া জ্ঞানের শক্তির উপর নির্ভর করে। তাই প্রকৃতপক্ষে বস্তু প্রকাশ পাওয়া ও জ্ঞাত হওয়া আকলের উপরই নির্ভর করে বলিয়া প্রমাণিত হইল। এইজন্য অন্তঃকরণের আলোকে চক্ষুর আলো বলা হইয়াছে। তারপর অন্তরের আলো, ইহা খোদাপ্রদত্ত আলো। ইহা জ্ঞানের ও স্পর্শশক্তির আলো হইতে পবিত্র ও অন্য রকম। রাত্রি অন্ধকার বলিয়া ইহার মধ্যে রং দেখা যায় না। ইহা দ্বারা আলোর জ্ঞান পরিষ্কার হইয়া ফুটিয়া উঠে। কেননা, বিপরীত বস্তু দ্বারা জিনিষের পরিচয় উত্তমরূপে জানা যায় রং কী বস্তু? উহা মহ্‌রা কোরে কাবুদের ন্যায়। উহার মধ্যে আলোশক্তি নাই, যদ্বারা নিজে প্রকাশিত হইতে পারে। তাই ইহাকে দেখিতে হইলে প্রথমে আলো দেখা চাই, তারপর রং দেখিতে হয়। একথা আগেই প্রমাণ হইয়া গিয়াছে যে, আলো ইহার বিরীত বস্তু দ্বারা বিনা চিন্তায় অনুমান করা যায়। অন্য উদাহরণ দিয়া দেখান হইতেছে, যেমন আল্লাহতায়ালা দুঃখ-কষ্ট সৃষ্টি করিয়াছেন, ইহা দ্বারা সন্তুষ্টির প্রকৃত অবস্থা ভালরূপে বুঝা যাইবে। অতএব, বুঝা গেল যে গুপ্ত বস্তু অথবা অপ্রকাশ্য বিষয় ইহার বিরুদ্ধে বস্তু দ্বারা অনুধাবন করা সহজ হইয়া পড়ে। কিন্তু আল্লাহতায়ালার কোনো বিরুদ্ধ নাই, এইজন্য তিনি গুপ্ত রহিয়াছেন। সর্বদা তাঁহার নূরের উপর নজর ফেলিতে হইবে। তারপর রংয়ের উপর নজর দিতে হইবে। ইহা দ্বারা প্রত্যেক বস্তুর হাকীকাত জানার পূর্বে আল্লাহতায়ালার জাতে পাকের আলো প্রকাশ পাইতে হইবে। পরে অন্য বস্তু প্রকাশ পাইবে; এইভাবে এক বস্তুর বিরুদ্ধ দিয়া অন্য বস্তু প্রকাশ পাইবে। যেমন ইউরোপবাসীদের দেখিয়া আফ্রিকাবাসীদেরকে অনুমান করা যায়। কিন্তু আল্লাহতায়ালাকে বিপরীত বস্তু দিয়া হাসেল করা যায় না। কারণ তাঁহার বিরুদ্ধ বা বিপরীত কিছু-ই নাই। এইজন্য আল্লাহতায়ালা নিজেই বলিয়া দিয়াছেন, আমাকে কোনো চক্ষু দেখিতে পারিবে না। তিনি সবাইকে দেখেন। ইহার সত্যতা প্রমাণ পাওয়া যায়, হজরত মূসা (আ:)-এর তূর পর্বতের ঘটনার দিকে লক্ষ্য করিলে। ঐ ঘটনায় চক্ষু দিয়া দেখিতে পারে নাই, চক্ষু দিয়া দেখা ত দূরের কথা স্বয়ং পাহাড়-ই তাঁহার গরমি সহ্য করিতে পারে নাই। ইহা খোদার এক বিশেষ তাজাল্লি ছিল, যাহা ইচ্ছা করিয়াও অনুধাবন করিতে পারে নাই। আর বয়াত-সমূহের মধ্যে যাহা উল্লেখ করা হইয়াছে, উহা খেয়ালহীনের সম্বন্ধে বলা হইয়াছে। এইজন্য বিরুদ্ধ নাই বলিয়া বলা হইয়াছে, যে বিরুদ্ধ দ্বারা খেয়াল ফিরাইয়া লইবে। অতএব, আল্লাহকে পাইতে আল্লাহর আলো রূহের মধ্যে পাইতে হইবে। এইজন্য মারেফাতের মধ্যে মোজাহেদা করা আবশ্যক।

ছুরাতে আজ মায়ানী চু শেরে আজ বেশা দাঁ,
ইয়া চু আওয়াজ ও ছুখান জে আন্দেশা দাঁ।
ইঁ ছুখান ও আওয়াজ আজ আন্দেশা খাস্ত,
তু নাদানি বহরে আন্দেশা কুজাস্ত।
লেকে চুঁ মউজে ছুখান দীদে লতিফ,
বহরে আ দানী কে বাশদ হাম শরীফ।
চুঁ জে দানেশ মউজে আন্দেশা বতাখ্‌ত,
আজ ছুখান ও আওয়াজে উ ছুরাতে বছাখ্‌ত।
আজ ছুখানে ছুরাতে বজাদ ও বাজে মরদ,
মউজে খোদ্‌রা বাজে আন্দর বহ্‌রে বোরাদ।
ছুরাতে আজ বেছুরাতে আমদ বেরুঁ,
বাজে শোদ কা না ইলাইহে রাজউন।

অর্থ: এখানে মাওলানা আরো উদাহরণ দিয়া পরিষ্কার করিয়া বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, জ্ঞানের সাগর প্রকাশ্য জগতের চাইতে অধিক স্থায়ী এবং সব সুরাতের মূল বস্তু। তাই তিনি বলেন, বাস্তব আকৃতি এবং আকৃতির মূল উৎপত্তিস্থান জ্ঞান, এই দুইয়ের মধ্যে সম্বন্ধ যেমন বাঘ জঙ্গল হইতে বাহির হয়। অথবা এইরূপ মনে করিয়া লও, যেমন কথা ও ইহার আওয়াজ। কথার আওয়াজ বাহিরে প্রকাশ পায় আকল দ্বারা। কথার রূপ ও নক্‌শা প্রথমে জেহেনের মধ্যে তৈয়ার হয়। পরে উচ্চারিত হইলেই বাহিরে শব্দ শুনা যায়। মূলে আকল হইতেই বাক্য সৃষ্টি হয়। এই দৃষ্টান্ত দ্বারা বুঝা যায় যে, জঙ্গল দিয়া বাঘ বাহির হয়। অতএব জঙ্গল আসল এবং জঙ্গলের স্থায়িত্বও অধিককাল পর্যন্ত থাকে। কেননা, একই জঙ্গল দিয়া হাজার হাজার বাঘ আগে ও পরে মৃত্যু হইয়া চলিয়া যায়। কিন্তু জঙ্গল বাকী থাকে। এই দিক দিয়া দেখা যায় জঙ্গল আসল আর বাঘ শাখা এবং কালাম জ্ঞানের অনুপাতে শাখা, তাহা বর্ণনা করার দরকার করে না। অতএব, সুরাত বাঘ ও কালামের ন্যায় শাখা এবং ক্ষণস্থায়ী আর আকল জঙ্গলের ন্যায় আসল এবং দীর্ঘস্থায়ী ও মজবুত। তাই মাওলানা বলিতেছেন, দেখো, বাস্তব সুরাত বাতেনী সুরাত আকল দ্বারা প্রকাশ পায়। সুরাতে জেহেনিয়া আকলের একটা কার্য মাত্র, কাজের জন্য কর্তার আবশ্যক, ইহা বর্ণনা করা দরকার করে না। কিন্তু ইহা মালুম করা যায় না, যেহেতু মূল্যবান জ্ঞান আল্লাহর হুকুম। ইহা কোনো জায়গা বা স্থানের সহিত সীমাবদ্ধ না। যখন ইহার জন্য কোনো জায়গা নাই, তখন নির্দিষ্ট স্থান কেমন করিয়া হইবে? কালামের উৎপত্তিস্থল জেহেন, অর্থাৎ, মেধাশক্তি আর মেধাশক্তির উৎপত্তির স্থান আকল অর্থাৎ জ্ঞান। অতএব, জ্ঞানের শক্তি স্পর্শ দ্বারা বুঝা যায় না। কিন্তু ইহার ক্রিয়া স্বরূপ যে বাক্য নির্গত হয় তাহা অনুভব করা যায়।
অতএব, বাক্য দ্বারা জ্ঞানের বিদ্যমান হওয়া বুঝা যায়। মওলানা এই কথার প্রমাণ আগের বয়াতে করিতেছেন যে, যখন বাক্যসমূহ নেক ও সারমর্মপূর্ণ পাওয়া যায়, তবে মনে করিতে হইবে ইহার উৎপত্তিস্থান জ্ঞানের সাগর বোজর্গ হইবে। যখন কথা উত্তম হইবে, তখন জ্ঞানও উত্তম বলিয়া বিবেচিত হইবে। এইভাবে জ্ঞানের বিদ্যমান হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। যখন জ্ঞান দ্বারা মেধাশক্তির বাক্যগুলি নির্গত হইতে থাকে, তখন বাক্য এবং উহার আওয়াজ একই হইয়া যায়। বাক্যে আওয়াজ করিয়া পুনরায় উৎপত্তিস্থান আকলের মধ্যে ফিরিয়া যায়। যেমন সমুদ্রের ঢেউ, পানি হইতে উৎপত্তি হইয়া পুনরায় পানিতে মিশিয়া যায়। বিনা আকৃতিতে যে সুরাত, অর্থাৎ, কালাম বাহির হইয়া আসিয়াছিল, ইহা আবার ফিরিয়া নিজ স্থানে যায়। যেমন, আল্লাহ বলিয়াছেন যে আমরা নিশ্চয়ই তাঁহার নিকট ফিরিয়া যাইব। অর্থাৎ, আমরা যেথা হইতে আসিয়াছি, সেই স্থানেই আবার ফিরিয়া যাইব। এখানে বাক্যের বেলায়ও সেইরূপ যে স্থান হইতে উৎপত্তি হইয়াছে সেই জায়গায় আবার ফিরিয়া যায়। অর্থাৎ, স্মরণের স্থানে যাইয়া থাকে। হয়ত বহুদিন পর ভুলিয়া যাইতে পারে।

পাছ তোরা হর লেহাজা মরগো রেজায়াতিস্ত
মোস্তফা ফরমুদ দুনিয়া ছায়াতিস্ত।
ফেকরে মা তীরিস্ত আজ হাওয়া দর হাওয়া,
দর হাওয়াকে পাইয়াদ আইয়াদ তা খোদা।
হর নফছে নওমে শওয়াদ দুনিয়া ও মা,
বে খবর আজ নও শোদান আন্দর বাকা।
ওমরে হাম চুঁ জওয়ে নও নও মীরছাদ,
মোস্তামারে মী নোমাইয়াদ দর জাছাদ।
আঁ জে তেজী মোস্তামার শেক্‌লে আমদাস্ত,
চুঁ শর রকশে তেজ জম্বানে বদস্ত।
শাখে আতশ্‌রা বজম্বানে বছাজ,
দর নজরে আতেশে নোমাইয়াদ বছদরাজ।
ইঁ দরাজী মুদ্দাতে আজ তেজী ছানায়া,
মী নুমাইয়াদ ছুরায়াত আংগীজী ছানায়া।
তালেবে ইঁ ছারে আগার আল্লামা ইস্ত,
নকে হুচ্ছামদ্দিন ফে ছামী নামা ইস্ত।
ওয়াছফে উ আজ শরাহ মোস্তাগানা বুদ,
রু হেকায়েত গোকে বে গাহ মী শওয়াদ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, কালাম যেমন আকল হইতে প্রত্যেক মুহূর্তে বাহির হইতে পারে এবং বন্ধও হইতে পারে, সেইরূপ জীবনও প্রত্যেক মুহূর্তে মরে এবং ফিরিয়া আসে। যেমন হাদীসে হজরত (দ:) ফরমাইয়াছেন যে, দুনিয়ার জীবন এক মুহূর্তের জন্য মাত্র। আমাদের চিন্তা ও খেয়াল যেমন কোনো ব্যক্তি উপরে বায়ুর তীর নিক্ষেপ করে। এইভাবে আমাদের চিন্তা আল্লাহর তরফ হইতে আসে। ঐ তীর বায়ু ভরিয়া থাকে না; তীর নিক্ষেপকারীর নিকট ফিরিয়া আসে। এই রকমভাবে আমাদের চিন্তা ও খেয়াল অস্থায়ী হিসাবে আমাদের কাছে থাকে না। উহা আল্লাহর নিকট ফিরিয়া যায়। কেননা, প্রত্যেক মুহূর্তে সমস্ত দুনিয়া নূতন সৃষ্টি হয়।

আমরা প্রকাশ্যে বিদ্যমান আছি বলিয়া ঐ নূতন সৃষ্টির খবর রাখি না। আমাদের জীবনকাল প্রত্যেক মুহূর্তে নূতন হইয়া সৃষ্টি হয় এবং আমরা নূতন নূতন জীবন লাভ করি। যেমন নহরে পানি প্রবাহিত হয়, সব সময়েই উপরের দিক হইতে পানি আসে, কিন্তু জীবনকাল উভয় মুহূর্ত দেহে বিদ্যমান ও স্থায়ী বলিয়া মনে হয়। কিন্তু প্রথম মুহূর্তে পানি যে জায়গায় ছিল, উহা প্রবাহিত হওয়ার কারণে বহু দূরে চলিয়া গিয়াছে। কিন্তু একই রকম পানি মিলিত প্রবাহের কারণে বহু দূরে চলিয়া যাওয়া অনুমান করা যায় না। কেননা ঐ স্থানে একই রকম পানি আসিয়া পৌঁছিয়াছে। এই অবস্থা-ই বিদ্যমান কালের অবস্থা। পূর্ব মুহূর্তের অবস্থা এক আর পর মুহূর্তের অবস্থা অন্য রকম। মাঝখানে নাই অবস্থা ছিল। এইরূপ না হইলে বাস্তবে বিদ্যমান বস্তুর পরিবর্তন হইত না। মুহূর্তগুলি এত তেজে আসে এবং যায়, যাহাতে পৃথক হওয়ার ধারণা করা যায় না। মনে হয় যেন মিলিত ভাবে সর্বদা আসিতেছে। যেমন যদি কেহ অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হাতে লইয়া খুব তেজের সহিত ঘুরাইতে থাকে, তবে মনে হয় যেন সবই আগুন। চতুর্দিকে একটি আগুনের কুণ্ডলীর ন্যায় মনে হইবে। প্রকৃতপক্ষে অত লম্বা দরাজ আগুন নয়, মাত্র এক টুকরা আগুন তেজী চলনের দরুণ সমস্ত জায়গা ব্যাপিয়া আগুন মনে হইতেছে। ঐ রূপভাবে আমাদের জীবনের মুহূর্তগুলি এত তাড়াতাড়ি আসে এবং যায়, মনে হয় যেন মাঝে শুন্য নয়। প্রকৃতপক্ষে মাঝখানে না হওয়া মুহূর্তগুলি আছে, আমরা বুঝিতে পারি না। এই লম্বা দরাজ জীবনকাল আমাদের তেজী কারিগরীর দরুণ। অর্থাৎ, বিদ্যমান হওয়া মুহূর্তটি খুব তাড়াতাড়ি দান করেন। এইরূপ সূক্ষ্ম বিষয়ের জ্ঞান যদি কাহারও থাকে এবং সে বিজ্ঞ পণ্ডিত হয়, তবে তাহাকে আল্লামা ও আরেফ বলা যাইতে পারে। তাহার আমলনামা পাপের কাজ হইতে খালি বলিয়া উচ্চ সম্মান লাভ করিল। এই রকম আরেফের কোনো প্রকার প্রশংসা করা দরকার হয় না। তাঁহার কথা ত্যাগ করিয়া ঘটনা বর্ণনা কর। সময় চলিয়া যায়।

খরগোশ বাঘের নিকট উপস্থিত হওয়া এবং বাঘ খরগোশের উপর রাগান্বিত হওয়া

শেররা আফজুদ খশমো শো নাফুর,
দীদ কাঁ খরগোশ মী আইয়াদ জে দুর।
মী দূদ বেদাহাশাত ও গোস্তখে উ,
খশমেগীন ও তুন্দ ও তেজ ও তরাশ রো।
কাজ শেকাস্তাহ আমদান তোহমাত বুদ,
ওয়াজ দেলীরী দাফেয় হর রাইবাত বুদ।
চুঁ রছীদ উ পেশতর নজদীকে ছফ,
বাংগে বরজাদ শেরে হাঁ আয় না খোলফ্‌।
মানফে পায়লান রা আজ হাম বদরীদাম,
মানকে গোশে শেরে না মালীদাম।
নীমে খরগোশে কে বাশদ কো চুনীঁ,
আমরে মারা আফগানাদ উবর জমীঁ।
তরকে খাবো গফ্‌লাত খরগোশে কুন,
গোর্‌রাহ ইঁ শের আয় খরগোশ কুল।

অর্থ: বাঘের ক্রোধ অত্যন্ত বাড়িয়া গেল, দেখিল যে জঙ্গলের খরগোশ দূর হইতে আসিতেছে না। কেননা, ভয়তে সংকোচিত হইয়া আসিলে দোষী বলিয়া মনে হইবে, এবং নির্ভয়ে বাহাদুরের ন্যায় আসিলে সন্দেহ দূর হইতে থাকে। যখন খরগোশ বাঘের নিকট আসিল, তখন বাঘ খুব শাসাইল যে, আমি অমুক-সমুক, সামান্য খরগোশ হইয়া আমার আদেশ অমান্য কর। এখন খরগোশী ধারণা ত্যাগ কর, আমার গড়গড়া শোন, তোমার শাস্তির সময় ঘনাইয়া আসিয়াছে।

খরগোশের বাঘের নিকট কৈফিয়াত  দেওয়া এবং তোষামোদ করার বর্ণনা

গোফ্‌তে খরগোশ আল আমান ওজরেম হাস্ত,
গার দোহাদ্‌ আফু খোদাওয়ান্দিয়াতে দস্ত।
বাজে গুইয়াম চুঁ নও দস্তুরে দিহী,
তু খোদাওয়ান্দী ও শাহী মান রাহীঁ।
গোফ্‌ত চে ওজর আয় কছুরে আবলেহান,
ইঁ জমানে আইয়াদ দরপেশে শাহান।
মোরগেবে ওয়াক্তে ছারাত বাইয়াদ বুরীদ।
ওজরে আহমক রা নমী বাইয়াদ শনীদ।
ওজরে আহমক বদতর আজ জোরমাশ
ওজরে নাদান জহ্‌রে হরর দানেশে বুদ।
ওজরাত আয় খরগোশ আজ দানেশ তিহী,
মান না খরগোশাম কে দর গোশাম নিহী।
গোফ্‌তে আয় শাহা নাকাছেরা কাছ শুমার,
ওজরাস্তাম দীদায়েরা গোশে দার।
খাছ আজ বহরে জে কাত্তাতে জাহে খোদ,
গোমরাহে রাতু মর আঁ আজ রাহে খোদ।
বহরে কো আবে বহর জুয়ে দেহাদ,
হর খাছেরা বর ছারো রুয়ে মী নেহাদ।
কম না খাহাদ গাস্তে দরিয়া জে ইঁ করম,
আজ কর্‌মে দরিয়া না গরদাদ বেশ ও কম।
গোফ্‌তে দারাম মান করমে বর জায়ে উ,
জমা হর কাছ বোরাম বালায়ে উ।

অর্থ: খরগোশ নিরাপদ আশ্রয় প্রার্থনা করিয়া বলিল, যদি আপনি আমাকে ক্ষমা করেন, তবে আমার একটি ওজর আছে, ইজাজত পাইলে বলিব। বাঘ পলিল, কী ছাই তোমার ওজর? বোকা, বাদশাহদের সম্মুখে এখন আসিয়াছ, অসময়ে আসায় তুমি মোরগে বে ওয়াক্ত হইয়াছ। তোমার মাথা দ্বিখণ্ডিত করা আবশ্যক। বোকার ওজর শোনা অনুচিত। কেননা, বোকার আপত্তি শোনা অপরাধের চাইতেও বড় অপরাধ এবং গণ্ডমূর্খের ওজর শুনিলে বিদ্যা ও জ্ঞান সবই ধ্বংস হইয়া যায়। খরগোশ বলিল, নিঃসন্দেহে আমি বোকা ও অনুপযুক্ত। কিন্তু সামান্য সময়ের জন্য আমাকে উপযুক্ত মানিয়া লন। আমার ওজরটা একটু শুনিয়া লন। আপনার সম্মান ও মরতবার সদকা মনে করিয়া আমাকে দূর করিয়া দিবেন না, দেখুন দরিয়া নিজের দয়ায় নহরসমূহে পানি দান করে; খড়-কুটাকে নিজের উপর ভাসাইয়া লয়, ইহাতে দরিয়ার কোনো অংশ কমিয়া যায় না। অতএব, আপানিও দরিয়ার মত আমার উপর দয়া করিবেন। বাঘ বলিল, আমি দয়াও সুযোগ বুঝিয়া করি। যেমন লোকে বলিয়া থাকে, প্রত্যেক ব্যক্তি তাহার পোষাক নিজের কাঁধ আন্দাজ কাটিয়া থাকে। অতএব, এখন তোমাকে দয়া করার সময় না, তোমাকে দয়া করা হইবে না।

গোফ্‌তে বেশনু গার নাবাশদ জায়ে নুতফ্‌,
ছার নেহাদাম পেশে আজ দরহায়ে উন্‌ফ।
মান ব ওয়াক্তে চাস্তে দর রাহে আমদাম,
বা রফিকে খোদ ছুয়ে শাহ আমদাম,
বা মান আজ বহরে তু খরগোশে দিগার,
জোফ্‌ত ও হামরাহ্‌ করদাহ্‌ ‍বুদান্দ আঁন কর।
শেরে আন্দর রাহে কছদে বান্দাহ করদ,
কছদে হর দো মাহরাহে আয়েন্দাহ করদ।
গোফতামাশ মা বান্দাহ শাহেন শাহাম,
খাজা তা শানে কে আঁদর গাহেম।
গোফ্‌তে শাহান শাহ্‌কে বাশদ শোদাম দার
পেশে মানতু ইয়াদে হর নাকেছ মইয়ার।
হাম তোরা ও হাম শাহাত রা বর দারাম,
গার তু বা উয়ারাত ব করদী আজ দেরাম।
গোফ্‌তামাশ বোগজার তা বারে দীগার,
রুয়ে শাহ্‌ বীনাম বোরাম আজ তু খবর।
গোফ্‌তে হামরাহ্‌ রা গেরো নেহ পেশে মান,
ওয়ার না কোরবাণী তু আন্দর কীশে মান,
লাবা করদামেশ বাছে ছুদে না করদ,
ইয়ারে মান বস্তাদ মরা বগোজাস্ত ফরদ।
মানাদ আঁ হামরা গেরো দরপেশে উ,
খুন রওয়াঁ শোদ আজ দেলে বে খোশে উ।
ইয়ারাম আজ জেফাতে ছে চান্দা বুদ কেমান,
হাম ব লুতফে ও হাম বখুবি হাম বা তন।
বাদে আজ ইঁ জে আঁশের ইঁ রাহ বস্তাহ শোদ,
হালে মা ইঁ বুদ বা তু গোফ্‌তা শোদ।
আজ অজিফা বাদে আজইঁ উমেদ বুর,
হক হামী গুইয়েম তোরা আল হক্কু মুর্‌রা।
গার অজিফা বাইয়েদাত রাহ পাক কুন,
হায়েঁ বইয়াও দাফেয় আঁবে বাক কুন।

অর্থ: খরগোশ বলিল, আমি যদি দয়ার পাত্র না হই, তবে আমি শক্ত আজদাহার সম্মুখে পড়িয়া যাইতে বাধ্য থাকিব। আগে আপনি আমার কথা শুনিয়া লন। ঘটনা হইল যে, আমি আমার এক বন্ধুকে সাথে নিয়া চাশ্‌ত ওয়াক্তের সময় আপনার নিকট আসিবার জন্য রওয়ানা হইলাম। বন্য পশুরা আপনার জন্য আমার সাথে আরও একটি খরগোশ দিয়াছিল। পথিমধ্যে অন্য আর একটি বাঘের সাথে দেখা হইল। সে আমাদের উভয়কেই নিতে চাহিল। আমি তাহাকে বলিলাম, আমি শাহানশাহের গোলাম। তাহার দরবারের সামান্য রকমের খাদেম। কিন্তু সে বলিল, কে তোর বাদশাহ? আমার সম্মুখে না-লায়েকদের কথা উল্লেখ করিস না। আমি তোকে আর তোর বাদশাহকে ফাঁড়িয়া ফেলিব। তখন আমি বলিলাম, তবে কিছু সময়ের জন্য আমাকে ছাড়িয়া দেন, আমি আমার বাদশাহর সহিত একবার দেখা করিয়া তাহাকে আপনার সংবাদ জানাইয়া আসি। সে উত্তর দিল, আচ্ছা, তোমার সাথীকে আমার কাছে বন্ধক রাখিয়া যাও, না হইলে আমার মোজাহাবে তোমাকে হালাল করিয়া ছাড়িব। আমি তাহাকে অনেক তোষোমোদ করিলাম যে আমাদের উভয়কেই যাইতে দেন। কিন্তু তাহাতে কোনো উপকার হইল না। অবশেষে আমার সাথীকে লইয়া গেল, এবং আমাকে একা ছাড়িয়া দিল। ঐ বেচারা আমার সাথী তাহার নিকট বন্ধক রহিয়া গেল। সে বেচারা কাঁদিতে কাঁদিতে চক্ষু দিয়া রক্ত বাহির করিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু বাঘের দেল ইহাতে ভীত না। আমার সাথী আমার চাইতে তিনগুণ মোটা বেশী ছিল। সৌন্দর্য্য, মাধুর্য্য ও পুষ্টির দিক দিয়া অতি উত্তম ছিল। এখন আগামীতে ঐ বাঘের দরুণ ঐ রাস্তা একদম বন্ধ মনে করিবেন। আপনার কাছে আমাদের আর কোনো পশু আসিতে পারিবে না। আপনার অভ্যাস অনুযায়ী দৈনিক খাদ্য পাইবার আশা বন্ধ করিতে পারেন। আমি সম্পূর্ণ সত্য কথা বলিলাম, যদিও সত্য কথা তিক্ত মনে হয়। যদি আপনার দৈনিক খাদ্যের দরকার হয়, যাহা বন্য পশুদের তরফ হইতে ওয়াদা অনুযায়ী আসিতেছিল, তবে রাস্তা পরিষ্কার করুন, এবং আসুন, ঐ সাহসী বাঘকে দূর করুন, না হইলে সে সব সময় এই রকম রাস্তা হইতে পশু ছিনাইয়া লইবে।

বাঘ খরগোশকে জওয়াব দেওয়া এবং খরগোশের সহিত রওয়ানা হওয়া

গোফ্‌ত বিছমিল্লাহ বইয়া তা উ কুজাস্ত,
পেশে রো শো গারহামী গুই তোরাস্ত।
তা ছাজায়ে উ ও ছদ চুঁউ দেহাম,
ওয়ার দোরু গাস্ত ইঁ ছাজায়ে তু দেহাম।
আন্দার আমদ চুঁ কালা ও জী বা পেশ,
তা বোরাদ উরা বছুয়ে দামে খেশ।
ছুয়ে চাহে কো নেশানাদশ করদা বুদ,
চাহে মগ্‌রা দামে জানাশ করদা বুদ।
মী শোদান্দ ইঁ হরদো তা নজদীকে চাহ,
ইঁ নাত খরগোশে চু আবে জীরে কাহ্‌।
আবে কাহে রা ভামুন মী বুরাদ
আবে কোহেরা আজব চুঁমী বুরাদ।
দামে মকরে উ কামান্দে শেরে বুদ,
তরফা খরগোশেকে শেরেরা রেবুদ।

অর্থ: বাঘ খরগোশকে বলিল, আচ্ছা বিসমিল্লাহ। চলো, ঐ বাঘ কোথায়? দেখিব, তুমি যদি সত্য হও, তবে আগে চলিয়া পথ দেখাও, উহাকে এবং উহার মত শতটা হইলেও সকলকেই শাস্তি দিব। আর যদি এই কথা মিথ্যা হয়, তবে ঐ শাস্তি-ই তোমাকে দিব। অতএব, খরগোশ আগে আগে পথ দেখাইয়া চলিতে লাগিল। খরগোশের উদ্দেশ্য ছিল বাঘকে ফাঁদে ফেলিয়া মারিবে। তাই যে কূপ এই কাজের জন্য নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছিল এবং কূপটি অত্যন্ত গভীর ছিল, আর যাহাকে মারার অসীলা করিয়াছিল, এইভাবে উভয়ে কূপের নিকটে গেল। মাওলানা আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলেন, দেখ! সামান্য খরগোশ কত বড় ধোকাবাজ। ইহা ত সব সময়ই হইয়া আসিতেছে যে পানি মাঠের ও জঙ্গলের সামান্য ঘাস ভাসাইয়া লইয়া যায়। ইহাও রীতি যে, পানি পাহাড়কেও ভাসাইয়া লইয়া যায়। পানি যেমন পাহাড়কে ভাসাইয়া নেয়, সেই রকম বাঘ এবং খরগোশ বড় ছোট হিসাবে পাহাড় ও পানির সহিত তুলনা রাখে। অর্থাৎ, খরগোশ এমন ফাঁদ বিস্তার করিয়াছে যে বাঘ ইহার মধ্যে আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে। প্রকৃতপক্ষে আজব খরগোশ বাঘকে উড়াইয়া দিল।

মূছা ফেরআউন রা তা রোদে নীল,
মী কাশাদবালস্কর ও জমায়া ছাকীল।
পোশ্‌শায়ে নমরূদেরা বা নীমে পর,
মী শেগাকাদ মী রওয়াদ মগজেছার।

অর্থ: মাওলানা আশ্চর্যজনক আরো দুইটি ঘটনার দিকে ইশারা করিয়াছেন যে, তোমরা হজরত মূসা (আ:)-এর ঘটনা মনে করিয়া দেখ, সাজ ও সরঞ্জামের দিক দিয়া অত্যন্ত দুর্বল ছিলেন, ফেরাউনের মত এত বড় শক্তিশালী বাদশাহকে তাহার সৈন্য-সামন্তসহ টানিয়া নিয়া নীলনদে ডুবাইয়া দিলেন। আর সামান্য একটি মশা, যাহার দুই পাখের মাত্র একটি পাখ ছিল যাহার জন্য অর্ধ-পাখবিশিষ্ট বলা হইয়াছে, সে নমরুদের মত পরাক্রমশালী বাদশাহর মাথা ফাঁড়িয়া মগজ পর্যন্ত ঢুকিয়া গিয়াছিল। ইহা দ্বারা প্রমাণ হয় যে খোদার কুদরাত যখন ইচ্ছা করেন দুর্বলকে শক্তিশালীর উপর জয়ী করিয়া দেন।

হালে আঁ কো কউলে দুশমনরা, শনুদ,
বী যাজায়ে আংকে মোদ ইয়ারে হাছুদ
হালে ফেরাউনে কে হামান রা শনুদ,
হালে নমরূদে কে শয়তান রা ছেতুদ
দুশমনে আরচে দোস্তানা গুইয়াদাত,
দামে দানে গারছে জে দানা গুইয়াদাত
গার তোরা কান্দে হেদাদ আঁ জহরে দাঁ,
গার বতু লুৎফে কুনাদ আঁ কহরে দাঁ।

অর্থ: মাওলানা এখানে বলিতেছেন, শত্রুর কথার প্রতি আমল করিলে তাহার পরিণাম ফল দুঃখজনক হয়। তাই মাওলানা বাঘ ও খরগোশের ঘটনার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া বলিতেছেন, যে ব্যক্তি শত্রুর কথা অনুযায়ী কাজ করে, তাহার পরিণাম ঐ বাঘের ন্যায় হয়। আর যে ব্যক্তি হিংসুককে অনুসরণ করে, তাহার পরিণাম ফেরাউনের কথা মনে করিয়া চিন্তা করিয়া দেখ। কেননা, ফেরাউন তাহার মন্ত্রী হামানের কথা শুনিত। সে ফেরাউনের ধর্মের শত্রু ছিল। দুনিয়ার দিক দিয়া হামান দোস্ত ছিল। আর নমরূদেরও এই রকম অবস্থা হইয়াছিল, সে শয়তানের পরামর্শে চলিত। অতএব, শত্রু যদি তোমাকে বন্ধুর ন্যায় কথা বলে, তথাপি তাহার কথাকে ফাঁদের ন্যায় মনে করিবে, যদিও সে জ্ঞানী লোকের ন্যায় কথা বলে। সে যদি তোমাকে মিষ্টি দান করে, তবে তুমি ইহাকে বিষ বলিয়া মনে করিবে। যদি তোমাকে মেহেরবানীর সহিত ব্যবহার করে, তবে তুমি উহাকে গজব মনে করিবে। মূল উদ্দেশ্য হইতেছে নফস ও শয়তানের দিকে ইশারাহ করা। কেননা তোমাদের নফস ও ইবলিস শয়তান তোমাদের জন্য বড় শত্রু। ইহাদের প্রেরণা হইতে সর্বদা সাবধান থাকিবে।

চুঁ কাজা আউয়াদ না বীনি গায়েরে পোস্ত,
দুশমনিয়ানেরা বাজে না শেনাছি জে দোস্ত।
চুঁ চুনী শোদ ইবতেহালে আগাজ কুন,
নালা ও তাছবীহ ও রোজা ছাজে কুন
নালা মী কুন কা আয় তু আল্লামুল গুইউব,
জীরে ছংগে মকরে বদ মারা ম কোব।
ইনতেকামে আজ মা মকোশ আন্দর জুনুব,
ইয়া করিমোল আফু ছাত্তারুল উইয়ুব
আঁচে দর কাউনাস্ত আসিয়া হরচে হাস্ত
ওয়াইন্নামা জানেরা বহরে ছুরাত কে হাস্তা।
গার ছাগী করদেম আয় শেরে আফরী,
শেরেরা মগুমার বর মা জী কামীন
আবে খোশরা ছুরাতে আতেশে মদেহ,
আন্দর আতেশ ছুরাতে আবে মনেহ্‌।
আজ শরাবে কাহ্‌রে চুঁ মস্তি দিহী,
নিস্তে হারা চুঁরাতে হাস্তি দিহী,
চীস্তে মস্তী বন্দে চশমে আজ দীদে চশম,
তা নুমাইয়াদ ছংগে গওহার পশমে পশম।
চীস্তে মস্তী চেচ্ছেহা মবদাল শোদান,
চুবে গঞ্জ আন্দর নজরে ছন্দাল শোদান।

অর্থ: মাওলানা বলেন, যখন আল্লাহর হুকুম হয়, তখন প্রকাশ্য অবস্থা ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না, এবং শত্রু ও মিত্র সম্বন্ধে কোনো পার্থক্য করিতে পারে না। এই জন্য শত্রু হইতে বিরত থাকিতে পারে না, শত্রুর ফাঁদে আটকাইয়া যায়। যখন এই রকম অবস্থা হয়, তবে শুধু নিজের জ্ঞান ও তদবীরের ভরসার উপর নির্ভর করিও না। বরং আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ কর। জ্ঞান ও তদবীর ত্যাগ করিও না। তদবীর ও জ্ঞানের সহিত আল্লাহর নিকট নম্রতা সহকারে অনুনয়-বিনয় করিয়া প্রার্থনা করিতে থাক যে, হে আলেমুল গায়েব! আমাকে ধর্মের শত্রুর ক্ষতি হইতে দিও না। যদিও আমাদের পাপের দরুন আমরা গজবের পাত্রের উপযুক্ত। কিস্তু তুমি পাপের শাস্তি দিও না, দয়াপরবশ হইয়া আমাদিগকে ক্ষমা কর। তুমি সাত্তারুল আয়েব, এবং যে পরিমাণ বস্তু ইহ-জগতে মওজুদ আছে, ঐ পরিমাণ আমাদের কলব খুলিয়া দাও, যেন নেক আর বদের মধ্যে পার্থক্য করিতে পারি। আর কোনো ধোকাবাজের ধোকায় আবদ্ধ না হই। যদিও আমরা অন্যায় কাজ করিয়াছি, কিন্তু বাঘের ন্যায় যে শত্রু আমাদের নফস ও শয়তান, ইহাকে আমাদের উপর গালেব (বিজয়ী) করিও না। তাহারা যেন আমাদের অজ্ঞাতসারে বাহির হইয়া আমাদিগকে ধ্বংস করিয়া না দেয়। শান্তির পানিকে অগ্নিতে পরিণত করিয়া দিও না, এবং আগুণের মধ্যে পানির সুরাত দিও না। অর্থাৎ, আমাদের উপকারী কার্যসমূহ আমাদের নফসের কাছে যেন অপছন্দ না হয়, এবং অপকারী কাজগুলি যেন আমাদের নফস পছন্দ না করে। কেননা, আপনার গজব দ্বারা যখন কাহারও জ্ঞান লোপ করিয়া নিবেন, যেমন শরাব পান করিলে জ্ঞান লোপ পাইয়া যায়, তখন অবিদ্যমান বস্তুকে বিদ্যমান দেখে, যাহাতে মোটেও উপকার নাই, তাহার মধ্যে অনেক উপকার আছে বলিয়া মনে করে। ইহা আল্লাহর গজবের নমুনা জানিতে হইবে। জ্ঞান লোপ হইয়া যাওয়ার অর্থ, চক্ষের দৃষ্টিশক্তি হইতে মারেফাতের শক্তি লোপ পাওয়া। যেমন পাথরকে গওহর মনে করা। মাস্তির অর্থ অনুভূতি শক্তি লোপ পাওয়া।
হজরত সোলাইমান (আ:) এবং হুদ-হুদ পাখীর কেচ্ছা এবং যখন আল্লাহর হুকুম হয়, চক্ষু বন্ধ হইয়া যাওয়ার বর্ণনা

চুঁ ছুলাইমান রা ছারা পরদাহ জাদান্দ,
জুমলা মোরগানাশ ব খেদমতে আমদান্দ
হাম জবান ও মোহারর্‌মে খোদ ইয়াফতান্দ,
পেশে উ এক এক বজানে বশেতাফতান্দ।
জুমলা মোরগানে তরক করদাহ্‌ জীক জীক,
বা ছোলাইমন গাস্তাহ্‌ আফছাহ্‌ মেন আখীক।
হাম জবানী খেশী ও পেওন্দস্ত,
মরদে বানা মোহরে মানে চুঁ বন্দীস্ত
আয় বছা হিন্দো ও তোরক হাম জবান,
আয় বছা দু তুরকে চু বে গানে গান
পাছ জবানে মোহরামে খোদ দীগারিস্ত,
হাম দিলী আজ হাম জবানী বেহতরিস্ত।
গায়েরে নোতকে ও গায়েরে ইমা ও ছাজান,
ছদ হাজারানে তর জমানে খীজাদ জে দেল।

অর্থ: যখন হজরত সোলাইমান (আ:)-এর জন্য তাবু খাটান হইল, তখন যত প্রকারের পাখী হজরত সোলাইমান (আ:)-এর হুকুমের অধীন ছিল, সকলেই আসিয়া উপস্থিত হইল। কেননা, হজরত সোলাইমান (আ:) নিজেদের সহভাষী এবং ইহাদের অন্তরের ভাব অনুধাবনকারী ছিলেন। এই জন্য প্রত্যেকেই দৌড়াইয়া তাহার কাছে আসিল, এবং নিজেদের চেঁচামেচি আওয়াজ ছাড়িয়া তাঁহার সাথে মানুষের চাইতেও সুন্দর ভাষায় কথাবার্তা বলিতে লাগিল। মাওলানা বলেন, এই ভাষা বুঝা শুধু প্রকাশ্যে সহভাষী বলিয়া এত দুর সম্বন্ধ স্থাপন হইয়াছে যে, সমস্ত পাখী তাঁহার কাছে দৌড়াইয়া হাজির হইয়াছে। প্রকৃত সহভাষীর সম্বন্ধ ও সহাবস্থান-ই হইল আন্তরিকতা; যেমন দুই ব্যক্তির গুণ একই রকম, তাহাদের মধ্যে মহব্বত বেশী দেখা যায়। না মোহাররম মধ্যে যদি পরস্পর প্রকৃত জাতের ও ধাতের সম্বন্ধ পাওয়া না যায়, তবে মানুষ একেবারে কয়েদখানায় আবদ্ধ হইয়া যায়। প্রকাশ্যে এক জায়গায় একত্রিত হইয়া বসে। কিন্তু অন্তরে ভয় থাকে, যাহাতে ঐ জায়গায় বসা কয়েদ বলিয়া মনে হয়। অনেক হিন্দুস্তানী ও তুর্কী জাতিগতভাবে প্রকৃতপক্ষে ভিন্ন ভাষা হওয়া সত্ত্বেও সহভাষী হয়, যখন তাহাদের মধ্যে প্রকৃত সম্বন্ধ পাওয়া যায় এবং বহুত তুর্কি লোক বেগানার ন্যায় থাকে, যখন তাহাদের মধ্যে পরস্পর কোনো কারণে অসন্তুষ্টি এবং হিংসার সৃষ্টি হয়, যদিও তাহারা সহভাষী। অতএব বুঝা গেল যে, মোহাররেমিয়াত ও সম্বন্ধ প্রকৃত এক থাকা সত্ত্বেও ভাষা দুই হয়। এক আত্মা হওয়া যাহাকে প্রকৃত সম্বন্ধ বলা হইয়াছে, প্রকাশ্যে সহভাষী হওয়ার চাইতে ভাল। যখন প্রকৃত সম্বন্ধ স্থাপিত হয়, তখন বলার আবশ্যক করে না। ইশারারও দরকার হয় না, কেনায়া ও লেখারও আবশ্যক হয় না। অন্তর হইতে হাজার হাজার দোভাষী সৃষ্টি হইয়া যায়। ঐ দোভাষী বাতেনী আকর্ষণ ও গুণাবলী। ইহা অন্তাঃকরণ হইতে সৃষ্টি হইয়া আসে। ইহা দ্বারা ইশারায় বুঝা যায় যে, সত্য তালেবে হক আহলে আল্লাহকে আপন আত্মীয় এগানার চাইতে অধিক ভালোবাসে এবং অধিক সম্বন্ধ রাখে।

জুমলা মোরগানে হর একে আছরারে খোদ,
আজ হুনার ও জে দানেশ ও আজ কারে খোদ
বা ছোলাইমান এক ব এক ওয়া মী নামুদ,
আজ বরায়ে আরজা খোদরা মী ছেতুদ।
আজ তাকব্বর নায়ে ত আজ হাস্তী খেশ,
বহরে আঁতা রাহ দেহাদ উরা বা পেশ।
চু বইয়াবা বান্দায়েরা খাজা,
আরজা দারাদ আজ হুনার দীবাজা।
চুঁকে ওয়ারেদ আজ খরিদা রেশে নংগ,
খোদ কুনাদ বীমার ও কার্‌রাও শাল ও লংগ।

অর্থ: সমস্ত পাখীরা একত্রিত হইয়া হজরত সোলাইমান (আ:)-এর কাছে নিজ নিজ হুনার ও কর্মের কথা প্রকাশ করিতেছিল এবং নিজেদের প্রকৃত অবস্থা পেশ করার জন্য নিজ নিজ প্রশংসা করিতেছিল, এবং ইহা অহংকারসূত্রে বা দাবী হিসাবে নয়। শুধু এইজন্য করিতেছিল যে, হজরত সোলাইমান (আ:) ইহাদিগকে প্রথম স্থান দান করেন এবং কোনো কাজ করিতে দেন। সাধারণভাবে নিয়ম আছে যে, যখন কোনো মনিব কোনো গোলাম খরিদ করিতে যায়, তখন ঐ গোলাম নিজের হুনার সম্বন্ধে মনিবের কাছে বর্ণনা করে। যাহাতে তাহাকে সহজে খরিদ করিয়া লয়। আর যখন মনিবের খরিদ করা না-পছন্দ করে, তখন নিজেকে রোগী বা বধির অথবা খোঁড়া বলিয়া প্রকাশ করে, যাহাতে খরিদ না করে। অতএব, পাখীরা যখন হজরত সোলাইমান (আ:)-এর খেদমতের মুখাপেক্ষী ছিল, তখন নিজেদের হুনার হেকমতের কথা বর্ণনা করিতেছিল।

ভাব: শায়েখে কামেল যদি কোনো সময় নিজের কামালতের কথা প্রকাশ করেন, তবে ইহাকে অহংকার বা রিয়ার জন্য প্রকাশ করা হয় না। ইহা শুধু আল্লাহর নিকট শোকরিয়া প্রকাশ করিয়া তাঁহার ইবাদত করা হয়, এবং আগামীতে যাহাতে খোদাতায়ালা আরো অধিক শক্তি দান করেন এবং লোকের খেদমত করিতে পারেন, সেই জন্য প্রকাশ করা হয়। দ্বিতীয় কারণ শিক্ষার্থীর জন্য কোনো কোনো সময় বলা হয়, যাহাতে শিক্ষার্থী অধিক আগ্রহ সহকারে শিক্ষা লাভ করে। আর কোনো কোনো সময় শুধু খোদার নেয়ামত প্রকাশের জন্য বলা হয়।

নওবাতে হুদহুদ রছীদ ও পেশাশ,
ও আঁ বয়ানে ছানায়াত ও আন্দোশাশ।
গোফ্‌তে আয় শাহ এক হুনার কাঁ কাহ্‌ তরাস্ত,
বাজে গুইয়াম গোফ্‌তে কো তাহ বেহতারাস্ত।
গোফ্‌তে বর গো তা কুদামাস্ত আঁ হুনার,
গোফ্‌তে মান আঁ গাহকে বাশাম উজে বর।
বেংগরাম আজ উজে বা চশমে ইয়াকীন,
মী বা বীনাম আবেদর কায়ারে জমীন।
তা কুজাইস্ত ও আমকাস্তাশ চেরংগ,
আজ চে মী জুশাদ জেখাকে ইয়াজে ছংগ।
আয় ছোলাইমান বহরে শোকরে গাহেরা,
দর ছফর মী দার ইঁ আগাহ্‌ রা।

অর্থ: এইভাবে হুদ-হুদ পাখীর পালা আসিল যে, তাহার হুনার ও শিল্পের বর্ণনা দিতে হইবে। সে বলিল, আমার মধ্যে সবচেয়ে নিচু স্তরের যে গুণ আছে, ইহা বর্ণনা করিতেছি। কেননা, কথা সংক্ষেপেই বলা উত্তম। হজরত সোলাইমান (আ:) বলিলেন, বলো, তোমার হুনার কী আছে? পাখী বলিল, “আমি যখন শূন্যে অতি উচ্চে উঠি, তখন ঐখান হইতেই জমীনের কোনখানে পানি আছে, দৃঢ়ভাবে জানিয়া লই যে কোনখানে আছে, কতটুকু গভীরে আছে, কী রং এবং কীভাবে বাহির হয়, উথলিয়া অথবা বালু দিয়া, এই সমস্ত বিষয় ভালরূপে জানিয়া লই। অতএব, আমাকে আপনার সফরের সাথী রাখিবেন। কোনো সময় যদি আপনার লস্করের পানির দরকার হয়, তবে জমিন খনন করার দরকার হইবে না।”

পাছ ছোলাইমান গোফত মারা শো রফীক,
দর বিয়া বানে হায়ে বে আব আয় শফীক।
তা বয়াবী বহরে লষ্কর আবেরা,
দর ছফরে ছাক্কা শওবী আছহারেরা।
হামরাহ্‌ মা বাশী ওহাম পেশোওয়া,
তাকুনী তু আবে পয়দা বহ্‌রে মা।
বাশে হামরাহে মান আন্দর রোজো ও শব,
তা নাবীনাদ আজ আতাশে লষ্কর তায়াব।
বাদে আজ আঁ হুদহুদ বদা হামরাহ বুয়াদ,
জে আঁকে আজ আবে নেহাঁ আগাহ বওয়াদ।

অর্থ: হজরত সোলায়মান (আ:) বলিলেন, আচ্ছা, যে সমস্ত মাঠে পানি মিলিবে না, ঐখানে আমাদের সাথী থাকিবে এবং আমার লস্করের জন্য পানি তালাশ করিবে। সাথীদের মধ্যে তুমি সাকী (বিতরণকারী) হিসাবে থাকিবে। পথে তুমি আমাদের আগে আগে চলিবে, তবে আমাদের জন্য সহজে পানি হাসেল করিতে পারিবে এবং সব সময় আমাদের সাথে থাকিবে, তাহা হইলে সৈন্যদের পানির পিপাসায় কষ্ট করিতে হইবে না। ইহার পর হইতে হুদ-হুদ পাখী সব সময় হজরত সোলায়মান (আ:)-এর সাথে থাকিতে আরম্ভ করিল। হুদ-হুদ পাখী গুপ্ত পানি সম্বন্ধে খবর রাখে।

কাকের হুদহুদ পাখীর দাবীর প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করা

জাগে চুঁ বশ নূদ আমদ আজ হাছাদ,
বা ছোলাইমান গোফ্‌ত কো কাজ গোফত ও বাদ
আজ আদবে নাবুদ বা পেশে শাহ মকাল,
খাচ্ছা খোদ লাকো দোরোগীন ও মহাল।
গার মর উরা ইঁ নজরে বুদে মোদাম,
চুঁ না দীদে জীরে মুশতে খাকে দাম
চুঁ গেরেফতার আমদে দর দামে উ,
চুঁ কাফাছে আন্দর শোদে না কামউ
পাছ ছোলাইমান গোফত কা আয় হুদহুদ রওয়াস্ত,
কাজ তু দর আউয়াল কাদাহ ইঁ দুরদে খাস্ত।
চুঁ নোমাই মস্তে খেশ আয় খোরদাহ দূগ,
পেশে মান লাফে জানি আঁকে দোরুগ।

অর্থ: কাক যখন হুদহুদ পাখীর এই কথা শুনিল, তখন হিংসার বশবর্তী হইয়া হজরত সোলাইমান (আ:)-এর নিকট বলিতে লাগিল যে হুদহুদ পাখী সম্পূর্ণ ভুল ও মিথ্যা বলিয়াছে। প্রথমতঃ হুজুরের সামনা-সামনি কথা বলা-ই বেয়াদবী। তারপর বিশেষ করিয়া মিথ্যা ও অসম্ভব কথা বলা। যদি ইহার ঐরূপ দৃষ্টি থাকিত, তবে এক মুষ্টি মাটির নিচে জাল বিছানো থাকে, ইহা সে দেখিতে পারে না কেন? তারপর হজরত সোলাইমান (আ:) হুদহুদ পাখীকে বলিলেন, তোমার এইরূপ কথা বলা কখনও উচিত হয় নাই। প্রথমেই কথাবার্তায় মিথ্যা বলিয়া ইহাই প্রমাণ করিয়া দিলে, যেমন কোন ব্যাক্তি পেয়ালাপূর্ণ শরাব পান করাইবে, কিন্তু যদি প্রথমেই পেয়ালার নিচের ময়লা বাহির হইয়া যায়, তবে বুঝা যায় যে বেতমিজীর সহিত পেয়ালা ভরা হইয়াছে। তাহাতে ময়লা ঐ শরাবের সহিত মিলিত হইয়া গিয়াছে। গাঁজা খাইয়া নিজেকে উন্মাদের ন্যায় প্রকাশ করিয়াছ। আমার সম্মুখে শায়েখের ন্যায় মুরব্বি সাজিয়া মিথ্যা ছড়াইয়াছ। গাঁজাখোরের ন্যায় বাজে বকবক করিয়াছ।

হুদহুদ কাকের মিথ্যা দোষারোপের জবাব দেওয়া

গোফত আয় শাহ বর মানে উর ও গাদা,
কওলে দুশমন মশোনে আজ বহরে খোদা।
গার না বাশদ ই কে দাওয়া মী কুনাম,
মান নেহাদাম ছার ববার ই গরদানেম।
জাগে কো হুকমে খোদারা মুনকেরাস্ত,
গার হাজারানে আকল দারাদ কাফেরাস্ত।
দরতু তা কাফীবুদ আজ কাফেরান,
জায়ে গান্দো শাহওয়াতে চু কাফেরান।
মান ব বীনাম দামেরা আন্দর হাওয়া,
গার না পুশাদ চশমে আকলাম রা কাজা।
চুঁ কাজা আইয়াদ শওয়াদ দানেশ বখাব
মাহ ছীয়াহ গরদাদ বগীরাদ আফতাব।
আজ কাজা ইঁ তায়াবীয়া কে নাদেরাস্ত,
আজ কাজা দা কো কাজারা মুনকেরাস্ত।

অর্থ: হুদহুদ পাখী আরজ করিল, হুজুর আল্লাহর কসম। আমার মত অসহায় ফকিরের বিরুদ্ধে আমার এই শত্রুর কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ইহা শুনিবেন না। আমি যে কথার দাবী করিয়াছি ইহা যদি সত্য না হয়, তবে আমার গর্দান দ্বিখণ্ডিত করিতে আমি রাজি আছি। এই কাক আল্লাহ্‌র হুকম অস্বীকার করিতেছে এবং বুঝিতেছে না যে আমার ফাঁদ না দেখা আল্লাহ্‌র-ই হুকুম। ইহাতে আমার জমিনের নিচে পানি দেখিয়া লওয়ার শক্তি নাই বা মিথ্যা বুঝায় না। যদি এই কাকের হাজারো আকল থাকে, তথাপি সে কাফের। যদি তোমার মধ্যে শব্দ কাফেরের কাফ অক্ষরও থাকে, অর্থাৎ, কুফরির বিন্দু মাত্র অংশ পাওয়া যায়, তবে তুমি কাফের। কাফেরের কোন অংশ তোমার মধ্যে থাকিলে, তুমি মেয়েলোকের পেসাবের স্থানের মত। আমি বায়ুর মধ্যে ফাঁদ নিশ্চয় দেখিতে পারি, যদি আমার আকলের চক্ষু আল্লাহ্‌তায়ালা বন্ধ না করিয়া দেন। যখন আল্লাহর হুকুম আসিয়া যায় আকলের চক্ষু বন্ধ হইয়া যায় এবং ঘুমাইয়া থাকে। চন্দ্রগ্রহণ লাগিয়া কাল হইয়া যায় এবং সূর্যগ্রহণ লাগিয়া অন্ধকার হইয়া যায়।আল্লাহর হুকুমে এই রকম অবস্থা হওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়। এই কাক যে অস্বীকার করিতেছে ইহাও আল্লাহর হুকুম।

হজরত আদম (আ:)-এর কেচ্ছা ও প্রকাশ্য নিষেধ রক্ষা করা এবং ব্যাখ্যা ত্যাগ করা হইতে কাজায় ইলাহি জ্ঞানের চক্ষু বন্ধ করিয়া রাখা

বুল বাশার কো এলমোল আছমা আ বেগাস্ত,
ছদ হাজারানে এলমাশ আন্দর হর রগাস্ত।
এছমে হর চীজে চুনাঁ কাঁ চীজ হাস্ত,
তা ব পায়ানে জানে উরা দাদে দস্ত।
হর লকব কো দাদে আ মোবাদ্দাল নাশোদ,
আঁকে চুস্তাশ খানাদ উ কাহেল নাশোদ।
আঁকে আখের মোমেনাস্ত আউয়াল বদীদ
হরকে আখের কাফের উরা শোদ পেদীদ।
হরকে আখের বী বুদ উ মোমেনাস্ত।
হরকে আখের বী বুধ উ বেদীনাস্ত।
হরকে উরা মোকবাল ও আজাদ খান্দ,
উ আজিজ ও খোররাম ও দেল শাদে মান্দ

অর্থ: হজরত আদম (আ:) বিশ্বের সমস্ত বস্তু সম্বন্ধে আল্লাহর তরফ হইতে জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। সৃষ্টির প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত যাহা কিছু হইয়াছে আর হইবে, সমস্ত বস্তুর ও বিষয়ের নাম-ধাম এবং ইহার হাকিকাত, মাহিয়াত ও ক্রিয়াকলাপের বিষয় প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত সবই তিনি জানিতেন। তাঁহার রগে রগে ও প্রত্যেক ধমনীতে বিদ্যা পরিপূর্ণ ছিল। অনেক বস্তুর হাকিকাত ও ইহার ক্রিয়া সম্বন্ধে বিশেষ করিয়া মানবতার হিসাবে জ্ঞানলাভ করিয়াছিলেন, যাহা ফেরেস্তারা লাভ করিতে পারে নাই। এই কারণেই ফেরেস্তাদের উপর আদমের মরতবা অনেক বেশী। হজরত আদম (আ:)-এর সব বিষয়ের জ্ঞান ও হাকিকাত সবের চাইতে অধিক ও পূর্ণভাবে জানা ছিল বলিয়া তাঁহাকে যে উপাধি মহাপ্রভু দিয়াছিলেন উহার কোনো পরিবর্তন ঘটে নাই। কেননা, তাঁহার লকব দেওয়ার অর্থ এলমে ইলাহির বর্ণনা দেওয়া। আল্লাহর এলেমের কোনো পরিবর্তন নাই বলিয়া উক্ত উপাধিসমূহের কোনো পরিবর্তন হয় নাই। যেমন, তিনি যাহাকে কর্মঠ বলিয়াছেন, সে কখনও অলস হয় নাই। যাহাকে শেষ পর্যন্ত মোমিন বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন, তিনি তাহাকে প্রথম হইতেই মোশাহেদা করিয়া বলিয়াছেন। যাহাকে কাফের বলিয়াছেন, সে শেষ পর্যন্ত কাফের বলিয়াই প্রকাশ পাইয়াছে। মাওলানা বলেন, যখন শেষ অবস্থাই ধর্তব্য বিষয়, এবং ইহার সম্বন্ধে হজরত আদম (আ:)-এর মালুম ছিল, দুনিয়া ও আখেরাত এই দুই অবস্থার মধ্যে যখন আখেরাত-ই আখের অবস্থা, তখন আখেরাতের দিকে অধিক লক্ষ্য রাখাই জ্ঞানের কাজ। অতএব, যে ব্যক্তি আখেরাতের দিকে লক্ষ্য রাখে, সেই-ই প্রকৃত মোমেনে কামেল। আর যে ব্যক্তি শুধু দুনিয়ার শান-শওকাত ও খাহেশাতে নফ্‌সানির লোভে মত্ত থাকে, সে পূর্ণ কাফের। আর যে ব্যক্তি উভয় দিকের কিছু কিছু লক্ষ্য রাখে, সে ধর্ম সম্বন্ধে দুর্বল বলিয়া বিবেচিত। ইহার কেয়াস করিয়া মাওলানা বলেন, যাহাকে আদম (আ:) ইহ-জগতে সম্মানিত ও স্বাধীন বলিয়া বলিয়াছেন, সে সব সময় দুনিয়ার ইজ্জাত সহকারে শান্তি ও খুশীতে জীবন কাটাইয়া গিয়াছে।

ইলমে হর চীজে তু আজ দানা শোনো,
ছেররো রমজে ইলমোল আছমা শোনো।
ইছ্‌মে হর চীজে বর মা জাহেরাশ,
ইছ্‌মে হস চীজে বর খালেকে দেররাশ।
নজ্‌দে মূছা নামে চউবাশ বুদ আছা,
নজ্‌দে খালেকে বুদ নামাশ আজদাহা।
বুদ ওমরেরা নামে ইঁ জা বুত পোরাস্ত,
লেকে মোমেন বুদ নামাশ দরাস্ত।
আঁকে বুদ নজদীকে মা নামাশ মেনা,
পেশে হক্‌ ইঁ নকশে বুদ কে বা মেনা।
ছুরাতে বুদ ই মেনা আন্দর আদম,
পেশে হক্কে মউজুদানে বেশ ও না কম।
হাছেলে ইঁ আমদ হাকিকাতে নামে মা,
পেশে হজরত কানে বুদ আনজামে মা
মরদেরা বর আকেবাত নামে নেহান্দ
চশমে চুঁ ব নূর পাকে দীদ,
জানো ছেররে নামেহা গাশ্‌তাশ পেদীদ।
চু মালায়েক নূরে হক দীদান্দ, দীদান্দ আজু,
জুমলা উফ্‌তাদান্দ দর ছেজদা বারু।
চু মালাক আনোয়ারে হক দরওয়ে বইয়াফ্‌ত,
দর ছজুদে উফ্‌তাদ ও দরখেদমতে শোতাফ্‌ত

অর্থ: মাওলানা বলেন, তুমি যে কোনো জিনিসের জ্ঞান হাসেল করিতে চাও, তবে আরেফ বিল্লাহের নিকট হইতে হাসেল কর। জিনিসের নাম ও ইহার রহস্য জানা চাই। কেননা, ঐ বোজর্গানে দ্বীনের শিক্ষা দ্বারা প্রকৃত রহস্য জানা যায়। আমাদের নিকট প্রত্যেক জিনিসের প্রকাশ্য অবস্থাদৃষ্টে নাম জানা আছে। হাকিকাতের অবস্থা আমাদের জানা নাই বলিয়া ইহার প্রকৃত অবস্থা আমাদের নিকট আবৃত। আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক বস্তুর হাকিকত ও ক্রিয়া সম্বন্ধে অবগত আছেন, তাই সেই অনুযায়ী তাহার নাম ও ক্রিয়া বাতলাইয়া দিয়াছেন। অতএব, আরেফ বিল্লাহ সেই এলেম হাসেল করিয়া থাকেন। যেমন হজরত মূসা (আ:)-এর লাঠি। ইহা হজরত মূসা (আ:) লাঠি বলিয়া জানিতেন, কিন্তু ইহা দ্বারা যে আজদাহা বানান যায়, সেই এলেম তাঁহার নিকট জ্ঞাত ছিল না। আল্লাহর নিকট উহার নাম আজদাহা ছিল। এইভাবে হজরত উমরের (রা:) নাম দুনিয়ায় বহুদিন যাবৎ মূর্তিপূজারী বলিয়া ছিল।  কেননা, তাঁহার মোমিন হওয়া স্বতঃসিদ্ধ ছিল বলিয়া তিনি মোমেন হইয়াছিলেন। এই রকমভাবে আমাদের নিকট মেনা মূর্তি। আমাদের জানা নাই যে, ইহা মানুষ হইবে না, আসল মানুষ হইবে না। ইহা আল্লাহর এলেমে জানা আছে। এই রকম সুরাতে মানুষ ছিল। যে রকমভাবে তোমরা আমার সম্মুখে বসিয়া আছ। এই মেনা না হওয়ার অবস্থায় আল্লাহর এলেমে মানুষের সুরাতে ছিল। বর্তমান অবস্থার চাইতে ইহার মধ্যে কিছু বেশীও ছিল না, আর কমও ছিলনা। অতএব, আমাদের প্রকৃত খাঁটি নাম ঐটাই হইবে, যাহা আমাদের শেষ অবস্থায় হইবে। যেমন হাদীসে বর্ণনা করা হইয়াছে, প্রত্যেক ব্যক্তির শেষ ফল অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা বিচার করিবেন। আল্লাহতায়ালা কোনো অস্থায়ী গুণের বিচার করিয়া নাম রাখেন না। হজরত আদম (আ:) আল্লাহ্‌তায়াতালার এলেমের নূর দ্বারা সমস্ত জিনিস দেখিয়াছেন, তাই জিনিসের রহস্য ও হাকিকত তাঁহার নিকট প্রকাশ্য ছিল। এই প্রকৃত ফজিলতের নূরের তাজাল্লি হজরত আদম (আ:)-এর উপর আলো বিস্তার করিয়াছিল; এবং ইহা দ্বারাই তিনি রঞ্জিত হইয়াছিলেন। এই নূরে হকের প্রতিচ্ছবি ফেরেস্তারা হজরত আদম (আ:)-এর মধ্যে দেখিতে পাইয়াছিলেন। এই জন্য তাঁহারা সেজদায় পতিত হইয়া খেদমতের জন্য দৌড়াইয়া গিয়াছিলেন। কিন্তু ইবলিস শয়তান তাহার নজর শুধু মাটির উপর পড়িয়াছিল, নুরে ইলাহি দেখা হইতে অন্ধ হইয়া পড়িয়াছিল।

ইঁ চুনী আদমকে নামাশ মী বোরাম,
গার ছেতায়েম তা কিয়ামত কাছেরাম।
ইঁ হামা দানাস্ত ওচুঁ আমদ কাজা,
দানাশ এক নিহী শোদ বরওয়ে গেতা।
কা আয় আজব নিহী আজ পায়ে তাহরীম বুদ,
ইয়া ব তাওবীলে বদু ও তাওহীমে বুদ
দর দেলাশ তাওবীলে চুঁ তরজীহ ইয়াফ্‌ত,
তবেয় দর হায়রাত ছুয়ে গন্দম শেতাফ্‌ত।
বাগে বানরা খারে চুঁ দর পায়ে রফ্‌ত,
দোজদে ফুরছত ইয়াফত গালা বুরাদ তাফ্‌ত।
চুঁজে হায়রাত রাস্ত বাজে আমদ বরাহ,
দীদে বুরদাহ্‌ দোজদে রোখত আজ কারেগাহ্‌
রাব্বানা ইন্না জালাম না গোফ্‌ত ও আহ্‌,
ইয়ানে আমদ জুলমাত ও গোমগাস্ত রাহ্‌।

অর্থ: হুদ-হুদ পাখী বলে, এই রকমভাবে হজরত আদম (আ:), যাঁহার নাম আমি উল্লেখ করিলাম, তাঁহার প্রশংসা কিয়ামত পর্যন্ত করিলেও শেষ হইবে না। তিনি এত বড় বিদ্বান হইয়াও যখন তাঁহার উপর আল্লাহর কাজা পতিত হইল, তখন এক নিষেধাজ্ঞার রহস্য তিনি বুঝিতে পারিলেন না। শত্রুর ধোকার পড়িয়া সন্দিহান হইয়া পড়িয়াছিলেন যে খোঁজা নিষেধ, ইহা কি হারামের জন্য, না কোনো তাবীলের জন্য ছিল। যখন তাঁহার অন্তরে নিষেধ কোনো কারণের জন্য করিলেন, তখন পেরেশান হইয়া গন্দমের দিকে দৌড়াইয়া গেলেন। এই ঘটনার উদাহরণ, যেমন কোনো বাগবানের পায়ে কাঁটা বিধিয়া গেল। সে কাঁটা তুলিবার চেষ্টায় ছিল, এই ফুরসতে চোর তাহার আসবাব চুরি করিয়া লইয়া গেল। এইরূপভাবে হজরত আদম (আ:)-এর অন্তরে ধোকার কাঁটা বিধিল। উহা দূর করিবার চেষ্টার মধ্যেই শয়তানে তাঁহার তাক্‌ওয়া ও দৃঢ়তা হরণ করিয়া লইয়া গেল। তারপর যখন ঐ সন্দেহ ও পেরেশানী হইতে ফিরিয়া সঠিক পথে আসিলেন, তখন দেখিলেন যে চোরে তাঁহার কারখানার সমস্ত আসবাবপত্র চুরি করিয়া লইয়া গিয়াছে। অর্থাৎ, তাঁহার অন্তর হইতে সবর ও দৃঢ়তা নষ্ট করিয়া দিয়াছে। তখন আফ্‌সোস করিয়া রাব্বানা জালামনা বলিয়া দুঃখ প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলেন; অর্থাৎ, হে খোদা, আমার অন্তরে পর্দা পড়িয়া বুঝশক্তি অন্ধকার হইয়া গিয়াছে। সত্য অনুধাবন করিতে ভুল করিয়াছি।

ইঁ কাজা আবরে বুদ খুরশদে পুশ,
শের ও আজ দরেহা শওয়াদ জু হামচু মুশ।
মান আগার দামে না বীনাম গাহে হুকম,
মান না তানহা জাহেলাম দররাহে হুকম।
আয় খনক আঁ কো নেকু কারে গেরেফ্‌ত।
জোরেরা ব গোজাস্ত উ জারী গেরেফ্‌ত।
গার কাজা পুশাদ ছিয়া হামচু শবাত,
হাম কাজা দস্তাত বেগীরাদ আকেবাত।
গার কাজা ছদ বারে কছদে জানে কুনাদ,
হাম কাজা জানাত দেহাদ দরমানে কুনাদ,
ই কাজা ছদ বারে গার রাহাত জানাদ,
বর ফরাখে চরখে খর গাহাত জানাদ।
আজ করমে দাঁ ইকে মী তরছা নাদাত,
তা বা মুলকে আয়মনী না বেশা নাদাত
ই ছুখান পায়ানে না দারাদ গাস্তে দের,
গোশে কুন তু কেচ্ছায় খরগোশ ও শের।

অর্থ: হজরত আদম (আ:)-এর কেচ্ছা বর্ণনা করার পর তাহার ফলস্বরূপ মওলানা বলেন, কাজা যেমন মেঘ সূ্র্যকে ঢাকিয়া লয়। এইরূপ প্রকাশ্য কাজ যাহা সহজে দৃষ্ট হয়, সেগুলিকে কাজা ঢাকিয়া লয়। কাজা এমন বস্তু যে বড় বাঘ ও আজদাহা তাহার সম্মুখে ইঁদুরের ন্যায় হইয়া যায়। হুদ-হুদ পাখী বলে, আমি যদি কাজার হুকমের সময় ফাঁদ না দেখি, তবে ইহা কিছু আশ্চর্যের বিষয় না। কেননা, হুকমে কাজার পথে আমি শুধু একাই নহি, বরং বড় বড় জ্ঞানীরাও নাদান হইয়া গিয়াছে। যখন মানুষ কাজার বশবর্তী, তখন ঐ ব্যক্তি-ই শাস্তিতে আছে, যে নেক আমল করিয়াছে এবং শক্তি ত্যাগ করিয়া নম্রতা অবলম্বন করিয়াছে। যদি তোমার উপর কাজা রাতের অন্ধকারের ন্যায় কাল হইয়া আসে, তবে উহা হইতে ভাগিয়া অন্যপথ ধরিও না। কেননা, শেষ পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা-ই তোমায় সাহায্য করিবেন, অন্য কেহ কিছু করিতে পারিবে না। যদি কাজা একশত বারও তোমার জান নিবার চেষ্টা করিয়া থাকে, তবে মনে রাখ, কাজাই তোমার প্রাণ দান করিয়াছে, শান্তি দিয়াছে। এই কাজা যদি শতবারও তোমার ডাকাতি করিয়া থাকে, তথাপি সে উচ্চস্থানে তোমায় স্থান দান করিবে। তোমাকে তওবা করার তাওফিক দান করিয়া উচ্চ সম্মানে পৌঁছাইয়া দেওয়ার সুযোগ করিয়া দিবে। ইহাও কাজার অনুগ্রহ মনে কর। যে তোমাকে প্রাণের ভয় দেখায়, এই ভয়তে তুমি কাজা হইতে ভাগিয়া যাইও না। কেননা, তাহার ভয় দেখানের উদ্দেশ্য তোমাকে নিরাপদ স্থানে বসাইবে। তুমি ভয় করিলেই গুণাহ হইতে রক্ষা পাইবে। যদি তুমি বাধ্যতা ও দাসত্ব স্বীকার কর, তবে সর্বদা শান্তিতে থাকিতে পারিবে। এই কাজার বর্ণনার শেষ নাই। তবে এখন খরগোশ ও বাঘের কেচ্ছা আরম্ভ করা উচিত।

যখন খরগোশ ও বাঘ কূপের নিকট গিয়া পৌছিল, তখন খরগোশ বাঘের সম্মুখে চলা
হইতে পা পিছনে টানিয়া রাখার বর্ণনা

শের বা খরগোশ চুঁ হামারা শোদ,
পুর গজব পুর কীনা ও বদ খাহ শোদ
বুদ পেশা পেশ খরগোশে দিলীর,
না গাহানে পারা কাশীদ আজ পেশে শের।
চুঁ কে নজদে চাহ আমদ শেরে দীদ,
কাজ রাহ আঁ খরগোশ মানাদ ও পা কাশীদ।
গোফ্‌তে পা ওয়াপেছ কাশীদী তু চেরা,
পায়েরা ওয়াপেছ ম কাশ পেশে আন্দর আঁ।
গোফ্‌তে কো পায়াম কে দস্তো পায়ে রফ্‌ত।
জানে মান লরজীদ ও দেল আজ জায়ে রফ্‌ত।
রংগে রুইয়াম রানমী বীনি চু জর,
জানাদ রওনে খোদ মী দেহাদ রংগাম খবর।

অর্থ: বাঘ ক্রোধে ও হিংসায় পরিপূর্ণ হইয়া খরগোশের সহিত চলিতে লাগিল। খরগোশ বাঘের সম্মুখে সম্মুখে চলিতে লাগিল। যখন ঐ কূপের নিকটবর্তী হইল, তখন বাঘ দেখিল যে খরগোশ সম্মুখে চলা বন্ধ করিয়া দিয়াছে। বাঘ বলিল, তুমি পিছনে হাঁটিতেছ কেন? এই রকম করিও না, সামনে চল। খরগোশ বলিল, আমার পা কোথায় যে সামনে চালাইব বা পিছনে হটাইব? আমার হাত পা সব অবশ হইয়া গিয়াছে। প্রাণ কাঁপিতেছে, অন্তর আত্মা বাহির হইয়া যাইতে চায়; আমার চেহারার রং হলুদ বর্ণ হইয়া গিয়াছে। আপনি কি ইহা দেখেন না? অন্তরে ভীতির অবস্থা বাহিরের চেহারা দেখিয়া বুঝা যায়।

হক চুঁ ছীমারা মোয়ার্‌রেফ খান্দাস্ত,
চশমে আরেফ ছুয়ে ছীমা মান্দাস্ত
রংগো বু গাম্মাজ আমদ চুঁ জরাছ,
আজ করদে আগাহ্‌ কুনাদ বাংগে ফরাছ।
বাংগে হর চীজে রেছানাদ জু খবর,
তা শেনাছি বাংগে খর আজ বাংগে দর।
গোফ্‌তে পয়গাম্বর বা তমীজে কাছান,
মর ও ম খফী লাদায়ে তাইয়ুল লিছান।
রংগে রু আজ হালে দেল দারাদ নিঁশান,
রহমাতাম কুন মহরেমান দর দেলে নিশান
রংগে রুয়ে ছুরখে দারাদ বাংগে শোকর,
রংগে রুয়ে জরদে দারাদ ছবরোনা কর।

অর্থ: আল্লাহতায়ালা যখন প্রকাশ্য আলামতকে বুঝিবার অসীলা বলিয়াছেন, এইজন্য আরেফীনদের নজর আলামতের প্রতি থাকে। আলামতের অর্থ ঐ আলামত, যাহা অন্তরের নেককাম বাবদ কাম দ্বারা পুরিস্ফুট হইয়া উঠে। আর অনুভব করার জন্য ঐ শক্তির দরকার, যাহা আল্লাহর নূরের দ্বারা আলোকিত হইয়া থাকে। জাহেরী রং এবং ঘ্রাণ ঘন্টার শব্দের ন্যায় জানাইয়া দেয়। যেমন ঘোড়ার আওয়াজ ঘোড়ার সন্ধান বাতলাইয়া দেয়। প্রত্যেক বস্তুই ইহার আওয়াজ দ্বারা বুঝা যায়। যেমন গাধার আওয়াজ এবং দরজা বন্ধ করার আওয়াজ পার্থক্য করিয়া লওয়া যায়। যেমন নবী করিম (দ:) বিভিন্ন প্রকারের লোকদিগকে পার্থক্য করিয়া লওয়ার জন্য ফরমাইয়াছেন, “মানুষ নিজের জিহ্বার ভাঁজের মধ্যে গুপ্ত থাকে”, অর্থাৎ, মানুষের কথার ভাব-ভঙ্গি দ্বারা মানুষের আন্দাজ করা যায়। তাহার পোষাক পরিচ্ছদ দ্বারা নয়। খরগোশ বলিল, আমার চেহারার রং দেখিয়া আমার অন্তরের অবস্থা বুঝিয়া লন। আমার প্রতি দয়া করুন। আমার মহব্বত দেলে স্থান দেন। চেহারার রং যদি লাল হয়, তবে শোকরের চিহ্ন বুঝা যায়। আর যদি চেহারার রং হলুদ বর্ণ হয়, তবে ধৈর্য্য, না-পছন্দ ও অসন্তুষ্টির চিহ্ন বুঝা যায়। মানুষের অন্তরে যে সব গুণ থাকে, ইহার চিহ্ন নিশ্চয়ই বাহিরে প্রকাশ পায়। অতএব, মানুষের অন্তর যদি আল্লাহর মহব্বত, ভীতি ও জেকেরে পরিপূর্ণ থাকে, তবে প্রকাশ্যে তাহা দ্বারা আমল সম্পন্ন হইবে না কেন? অন্তর শুদ্ধ ও পবিত্র হওয়ার জন্য প্রকাশ্য আমলগুলি শুদ্ধভাবে সম্পন্ন করা আবশ্যক। জাহের দুরুস্ত করার জন্য বাতেন দুরুস্ত করা আবশ্যক করে না।

দরমান আমদ আঁকে দস্তো পা বারাদ,
রংগে রো ও কূয়াত ও ছীমা বারাদ।
আঁকে দর হরচে দর আইয়াদব শেকানাদ,
হর দরখে আজ বীখো বুন উ বরকানাদ।
দরমান আমদ আঁকে আজ ওয়ায়ে গাস্তে মাত,
আদমী ও জানোয়ার জামদ নাবাত।
ইঁ খোদ আজইয়ান্দ কুল্লিয়াতে আজু,
জরদে কর্‌দা রংগো ফাছেদ করদাবু।
তাজাহান গাহ্‌ ছাবেরাস্ত ও গাহ শাকুর
বুস্তানে গাহ হুল্লা পুশীদ গাহ্‌ উর।

অর্থ: খরগোশ নিজের পেরেশানী ও পরিবর্তন হইয়া যাওয়ার কারণ বর্ণনা করিয়া বলিতেছে, আমার মধ্যে এমন একটি বিষয় আসিয়া গিয়াছে, যাহাতে আমার হাত পা অবশ হইয়া গিয়াছে এবং চেহারার রং, শক্তি এবং চিহ্ন সব নষ্ট হইয়া গিয়াছে। ঐ বস্তু আল্লাহর কাজ, অর্থাৎ, খোদার হুকুমের ক্রিয়া। যাহা দ্বারা আমার মৃত্যুর ভয় আসিয়া পড়িয়াছে। ঐ হুকুমের কাজ এমন বস্তু, যাহার মধ্যে আসিবে, সে-ই পরিবর্তন হইয়া যাইবে এবং সকল বৃক্ষকে ইহার মূল হইতে উৎপাটন করিয়া ফেলে। আমার মধ্যে ঐরূপ বস্তু আসিয়া পড়িয়াছে। ইহাতে আমার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হইয়া গিয়াছে। মানুষ, পশু, পক্ষী, বৃক্ষলতা ও পাথর ইত্যাদি আনাসেরে আরবায়ার অংশ, ইহার সমষ্টিও বিবর্ণ হইয়া পরিবর্তিত হইয়া যায়, ইহা জগতের এইরূপ অবস্থা। কোনো সময় ধৈর্যশীল আর কোনো সময় শোকর আদায়কারী বলিয়া গণ্য করা হয়। আর কোনো সময় ধ্বংস হইয়া যায় আবার কোনো সময় বাগানের ন্যায় ফলে ফুলে পরিপূর্ণ রূপ প্রকাশ পায় এবং কোনো সময় পাতা শূন্য হইয়া পড়ে।

আফতাবে কো বর আইয়াদ নারে গুণ,
ছায়াতে দীগার শওয়াদ উ ছার নেগু।
আখতারানে তাফ্‌তা বর চারে তাক,
লহাজা লহাজা মুবতালায়ে ইহতেরাক।
মাহে কো আফজুদ জে আখতার দর জামাল
শোদ জে রঞ্জুদকউ হামচু হেলাল।

অর্থ: প্রত্যেক বস্তু-ই হুকমে কাজার দরুণ পরিবর্তিত হইয়া যায়। যেমন সূর্য সকাল বেলা অতি তেজের সহিত চকমক করিয়া উদিত হয়। দ্বিপ্রহরের পর প্রখরতা কমিয়া ক্রমান্বয়ে আলো লোপ পাইয়া ডুবিয়া যায়। এইরূপ তারকাসমূহ আসমানে কী সুন্দরভাবে চকমক করিতে থাকে। আবার আস্তে আস্তে ইহাদের উজ্জ্বলতা হ্রাস পায়। চন্দ্রের দিকে লক্ষ্য করিয়া দেখ, তারকার চাইতেও উজ্জ্বল আলো দান করে। তাহাও আস্তে আস্তে লোপ পাইয়া হেলালে পরিণত হয়। এই সমস্ত পরিবর্তন সব-ই কাজার দারুণ হইয়া থাকে।

ইঁ জমীন বা ছকুন ও বা আদব,
আন্দর আরাদ জল জলাশ দর লরজো তাব
আয় বছাকে জী বালায়ে নাগাহান,
গাস্তাস্ত আন্দর জমীন চুঁ রেগে আন।
আয় বছাকে জীঁ বালায়ে মোরদা রেগ।
গাস্তাস্ত আন্দর জাহানে উ খোরদা রেগ।
ইঁ হাওয়া বা রূহু আমদ মোকতারান,
চু কাজা আইয়াদ ওবাগাস্ত ও আফন।
আবেখোশ কো রূহ রা হামশীরা শোদ;
দর গাদীরে জরদো তলখ ও তীরাশোদ।
আতেশে কো হাদে দারাদ দর বরুওয়াত,
হাম একে বাদে বরু খানাদ ইয়ামুত।
খাকে কো শোদ মায়ায়ে গোল দরবাহার,
নাগাহানে বাদে দর আরাদ জুদে মার
হারে দরিয়া জে ইজতেরাবে জোশে উ,
ফাহাম কুন তাবদীলে হায়ে হুশে উ।

অর্থ: জমিন দেখ, কীভাবে স্থায়ী শান্ত রহিয়াছে। ইহাকে ভূমিকম্পে কীরূপভাবে অস্থির করিয়া তোলে, তাপে ও কম্পনে কোনো জায়গা ধ্বংস করিয়া দেয়। এইভাবে অনেক পাহাড় হঠাৎ বিপদ আসার কারণে খণ্ড খণ্ড হইয়া মাটির সাথে বালু হইয়া মিলিয়া যায়। এইভাবে আগ্নেয়গিরি পাহাড়ে হঠাৎ আগুন লাগিয়া পুড়িয়া ছাই হইয়া যায়। বায়ু দেখ, ইহার সম্বন্ধ রূহের সাথে কীরূপ নিকটতম। শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্বারা অন্তরে যাইয়া রূহকে শান্তি ও জীবন-শক্তি দান করে। যখন বাহিরে আসিয়া যায়, তখন এই বায়ুই মরণের কারণ হইয়া পড়ে। এই রকম পানির প্রতি লক্ষ্য কর, ইহা জীবন ধারণ ও শান্তির জন্য এত জরুরি যে, ইহা ব্যতীত বাঁচা যায় না। কিন্তু কোনো কোনো সময় কূপের পানি হলুদ বর্ণ, তিক্ত ও বদ মজা হইয়া যায়। অগ্নির অবস্থা লক্ষ্য কর, কীরূপভাবে প্রজ্বলিত হইয়া স্ফুলিঙ্গ উর্ধ্বে উঠে, হঠাৎ বাতাস আসিয়া নিভাইয়া ফেলে। মাটি দেখ, বসন্ত ঋতুতে কী সুন্দর ফল ও ফুলদান করে, হঠাৎ ঝটিকা বায়ু প্রবাহিত হইয়া ইহার সৌন্দর্য নষ্ট করিয়া দেয়। নদী সাগরের প্রতি চিন্তা কর, যাহা পৃথিবীর তিনের দুই অংশ, ইহাদের বান তুফানের ভয়াবহ মূর্তির অবস্থা ভাবিয়া দেখ। ইহা সকল-ই কাজার দরুণ হইয়া থাকে।

চরখে ছার গরদানকে আন্দর জুস্তোজু আস্ত,
হালে উচুঁ হালে ফর জান্দানে উস্ত
গাহ্‌ হাদীদে ও গাহ্‌ মিয়ানা গাহে উজ,
আন্দরু আজ ছায়াদ ও নহছে ফউজে ফউজ।
গাহ্‌ শরফে গাহে ছউদ ও গাহ্‌ ফরাহ্‌
গাহ ওবাল ওগাহ্‌ হবুত ওগাহ্‌ তরাহ্‌।

অর্থ: এই বিশাল আসমানের ঘূর্ণন মনে হয় যেন কোনো ব্যক্তি কোনো বস্তু তালাশ করিতেছে। তাহার ঘুরাফেরা বালকদের ন্যায় চঞ্চল। তাহাদের চঞ্চলতা ও পরিবর্তনে মনে হয় যেন আসলের মধ্যে পরিবর্তন হয়; সেই কারণে ইহাদের পরিবর্তন হইতেছে। এই আসমানের পরিবর্তন দেখিয়া মনে হয়, ইহার গতিবিধির দরুণ হাদীদ গ্রহ জন্ম লাভ করে। কোনো সময় আওসাত কোনো সময় উজ পয়দা হয়। এই আসমানের গতিতে হাজার হাজার সায়াদ ও নহস পয়দা হয়। পুনঃ ঐ তারকারাজির শরফের স্থান লাভ হয়। কোনো সময় উচ্চে উঠে, কোনো সময় উহা দ্বারা শা্ন্তি ও খুশী হাসেল হয়। আর কোনো সময় উহার দরুণ দুঃখ-কষ্টে পতিত হইতে হয়। এই সব পরিবর্তনকে মাওলানা বয়াত মারফত প্রকাশ করিয়াছেন।

আজ খোদ আয় জুযবে জে কুল্লেহা মোখতালাত,
ফাহাম মী কুন হালতে হর মোম্বাছাত
চুঁ নচিবে মেহ তরানে দরদাস্ত ও রঞ্জ,
কাহ্‌তরান রা কায়ে তাওয়ানাদ বুদেগঞ্জ
চুঁকে কুল্লিায়াতে রা রঞ্জাস্ত ও দরদ,
জুযবে ইশাঁ চুঁ না বাশদ রুয়ে জরদ।
খাচ্ছা জুযবি কোজো জেদ্দে উস্তে জমা,
জে আব ও কাক ও আতেশ ও বাদাস্ত জমা।

অর্থ: হে মানুষ! যে অংশ যাহার দ্বারা গঠিত, সেই মূলের দরুণ শাখা-প্রশাখাগুলিও পরিবর্তিত হইতে থাকে। ইহা ভাল করিয়া বুঝিয়া লও। অতএব, যখন প্রমাণ পাওয়া গেল যে মূলের পরিবর্তনের কারণে অংশগুলিও পরিবর্তিত হয়, তখন মূলের কোস্তানে ব্যথা বা কষ্ট অনুভব হইলে তাহার শাখা-প্রশাখা সুস্থ থাকিতে পারে না। বিশেষ করিয়া বিভিন্ন ধাতে মিলিতভাবে গঠিত হইলেও এক অংশে পরিবর্তন দেখা দিলে, অন্য অংশেও নিশ্চয়-ই পরিবর্তন হইবে। বিরুদ্ধ অংশবাদের মধ্যেও ইহা লক্ষ্য করা যায়। যেমন মানুষ আগুন, পানি, মাটি ও বায়ু দ্বারা সৃষ্ট। একত্রিত বিভিন্ন ধাত থাকা সত্ত্বেও এক অংশে অসুবিধা মনে হইলে অন্য অংশসমূহেও অসুবিধা মনে হইতে থাকে। এই হিসাবে পরিবর্তন হওয়া কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়।

ইঁ আজব না বুয়াদ কে মেশ আজ গোরকে জুস্ত,
ইঁ আজব কে মেশ দেলদার গোরগে বস্ত
জেন্দেগানী আশতী ও শেনান,
মোরগ ওয়া রফতান বা আছলে খেশ রফতান,
ছুলাহ্‌ দুশমন দার বাশদ আরিয়াত,
দেল বাছুয়ে জংগে তা জাদ আকেবাত,
জেন্দেগানী জে আশতী জেদ্দেহাস্ত,
মোরগে আঁকে দরমিয়ানে শাঁ জংগে খাস্ত।
ছুলেহ্‌ আজ দাদাস্ত ওমরে ইঁ জাহান,
জংগে আজ দাদাস্ত ওমরে জা ও দান
রোজ কে চান্দে আজ বরায়ে মছলেহাত,
বা জেদ্দান্দ আন্দর ও ফাউ মারহামাত
আকেবাত হর এক ব জওহার বাজে গাস্ত,
হরকে বা জেনছে খোদ আম্বাজ গাস্ত
লুৎফে বারি ইঁ পালংগ ও রংগেরা,
লুৎফে হক ইঁ শেরেরা ও গোরেরা,
উলফে দাদাস্ত ইঁ দো জেদ্দেরা দর ওফা
চুঁ জাহান রঞ্জুর ও জেন্দনী বুদ,
চো আজব রঞ্জুরে গার ফানী বুদ।
খানাদ বর শেরে উ আজ ইঁ রো পন্দেহা,
গোফ্‌তে মান পাছ মান্দাম জে ইঁ বন্দেহা।

অর্থ: মাওলানা বলেন, ইহা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে মেষ চিতা বাঘ হইতে পালাইয়া যায়। কিন্তু ইহা আশ্চর্যের বিষয় যে মেষ এবং চিতা বাঘে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। প্রকৃতপক্ষে ইহা জগতের জীবন বিরুদ্ধবাদের সংমিশ্রণ ও সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ থাকা। আর মৃত্যু হইলে সমস্ত বিপরীত অঙ্গুলি নিজ নিজ স্থানে প্রত্যাবর্তন করা। ইহা স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম যে শত্রুর সহিত সন্ধি করার অর্থ সাময়িক শান্তি স্থাপন করা। শেষ পর্যন্ত বিরুদ্ধতা করা ও পৃথক হইয়া যাওয়া। উভয় দৃষ্টান্ত দ্বারা পরিষ্কার বুঝা গেল যে দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী মাত্র। ইহার প্রমাণ মাওলানা সম্মুখে আরো দিতেছেন – এই দুনিয়ার জীবন বিরুদ্ধবাদী বস্তুর সন্ধি। আর পরকাল জীবন হইল, বিরুদ্ধবাদী বস্তুসমূহের লড়াই। এ বিরুদ্ধবাদ বস্তুসমূহের মধ্যে যাহাদের স্পর্শ ও মিলন আছে, তাহারা নিজ নিজ স্থানে যাইয়া মিলিয়া যায় এবং লতিফা-সমূহ নিজ নিজ সম্বন্ধ ছিন্ন করিয়া চলিয়া যায়। মৃত্যু ইহারই হইয়া থাকে। হাশরের ময়দানে পুনরায় এই পার্থক্য দূর হইয়া একত্রিত হইবে। কয়েকদিনের জন্য পরস্পরের স্বার্থে মিলিত থাকিবে। অবশেষে নিজ নিজ মিলনের স্থানে চলিয়া যাইবে। শুধু খোদার মেহেরবানীতে ইহারা মিলিয়া থাকিবে। যেমন বাঘ ও বকরির মধ্যে বন্ধুত্ব হইবে। ইহাদের শত্রুতা দূর করিয়া দেওয়া হইবে। খোদার এই মেহেরবানীতে গাধা ও বাঘের মধ্যে মিলনের বন্ধুত্ব দান করিয়াছেন। উপরের বর্ণনা দ্বারা যখন বুঝা গেল যে পৃথিবী কয়েদখানা, কষ্টকর স্থান, এখান হইতে মরিয়া যাওয়া কোনো আশ্চর্যের বিষয় না। পৃথিবী ধ্বংস হওয়াও কোনো অসম্ভব কথা নয়। আল্লাহতায়ালা ইহার খবর আগেই দিয়া রাখিয়াছেন। অতএব, আল্লাহর মহব্বত অন্বেষণকারীর পক্ষে উচিত সে যেন ইহ-জগতের সহিত সম্বন্ধ বেশী বাড়াইয়া না তুলে। ঐ খরগোশ বাঘকে এই রকমভাবে অনেক কিছু বর্ণনা করিয়া বুঝাইয়া দিয়া বলিল যে, আমি এই জন্য সম্মুখে অগ্রসর হইতে পারি না।

বাঘ খরগোশের পা পিছনে রাখার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা

শের গোফ্‌ তাশ তু জে আছবাবে মরজ,
ইঁ ছবাব গো খাছে কা নিস্তম গরজ।
পায়েরা ওয়াপেছ কাশিদী তু চেরা,
মী দিহ বাজিচা আয় দাহী মরা।
গোফ্‌তে আঁশের আন্দর ইঁ চে ছাকেনাস্ত,
আন্দরইঁ কেলায়া জে আফাতে আয়মনাস্ত।
ইয়ারে মান বস্তাদ জে মান দরচাহে বুরাদ,
বর গেরেফতাশ আজ রাহো বেরাহ্‌ বুরাদ।

অর্থ: বাঘ খরগোশকে বলিল, তুমি যাহা বর্ণনা করিলে ইহা সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করিয়া বল এবং নির্দিষ্ট করিয়া বল, যাহাতে আমি বুঝিতে পারি। তোমার মধ্যে বড় রকমের কাজা আসিয়া গিয়াছে। কিন্তু ইহা কী, ঠিক করিয়া বল। তুমি পা কেন পিছনে হটাইয়া নিতেছ? হে ধোকাবাজ, তুমি আামাকে ধোকা দিতেছ। খরগোশ উত্তর করিল, ঐ নির্দিষ্ট কারণ এই যে, আমি যে আপনার নিকট বাঘের কথা বলিয়াছিলাম, সে এই কূপের মধ্যে থাকে। আর এই দূর্গে সে নিরাপদে থাকে। আমার সাথী যে খারগোশ ছিল, তাহাকে নিয়া এই কূপের মধ্যে রাখিয়াছে। তাহাকে রাস্তা হইতে কাড়িয়া নিয়া যে রাস্তায় নিয়া গিয়াছে, সেখানে যাইবার পথ নাই।

কায়ারে চাহব গোজদি হরকো আকেলাস্ত
জা আঁকে দরখেল ওয়াতে ছাফা হায়ে দেলাস্ত।
জুলমাতে চাহবে কে জুল মাতাহায়ে খলক,
ছার না বুরাদ আঁকাছ ফে গীরাদ পায়ে খলক।

অর্থ: যে ব্যক্তি জ্ঞানী সে কূপের গর্তকে নিজের থাকার জন্য পছন্দ করিয়া লয়। কেননা, নির্জন স্থানে কলব-সাফা অধিক পরিমাণে হাসেল হয়। যদি কূপের অন্ধকার পছন্দ না হয়, তবে মানুষের সাথে মিলামেশার দরুণ যে অন্ধকার সৃষ্টি হয়, ইহা হইতে কূপের অন্ধকার অনেক ভাল। এই জন্য কূপের অন্ধকার পছন্দ করা উচিত। যে ব্যক্তি নিজের উদ্দেশ্য হাসেল করার জন্য মানুষের পা ধরিবে, অর্থাৎ, তোষামদ করিবে তাহার মাথা সালামতে থাকিবে না, অর্থাৎ, পরকাল নষ্ট হইয়া যাইবে।

গোফ্‌তে পেশ আজ খমে উরা কাহেরাস্ত,
তু বা বীঁ কাঁশের দর চাহ হাজেরাস্ত।
গোফ্‌তে মান ছুজীদাম জে আঁ আতশী,
তুমাগার আন্দর বর খেশাম কাশী।
তা বা পোস্তে তূ মান আয় কানে করম।
চশমে বা কোশায়েম বাচে দর বেংগারাম

অর্থ: বাঘ বলিল, তুমি মোটেও ভয় করিও না, নির্ভয়ে সামনে চলিয়া আস। শুধু এইটুকু দেখিয়া লও, সে কূপের মধ্যে আছে কি-না? তারপর দেখিবে যে আমার আঘাতে এখনই তাহার কাম শেষ হইয়া যাইবে। খরগোশ বলিল, আমি ঐ অগ্নি মেজাজ বাঘ হইতে ভয়ে মাটি হইয়া গিয়াছি। তবে কেমন করিয়া আমি সম্মুখে অগ্রসর হইয়া তাহাকে দেখিব? হাঁ, যদি তুমি আমাকে সাথে করিয়া লও, তবে তোমার শক্তির উপর ভর করিয়া চক্ষু খুলিয়া কূপের মধ্যে দেখিতে পারি।

বাঘের কূপের মধ্যে নজর করা এবং খরগোশ ও নিজের প্রতিবিম্ব দেখা

চুঁকে শের আন্দর বর খেশাশ কাশীদ,
দর পানাহে শেরে তা চে মী দওবীদ।
চুঁকে দর চাহ্‌ বেংগরীদান্দ আন্দর আব,
আন্দর আব আজ শেরোউ দর তাফ্‌তে তাব।
শেরে আক্‌ছে খেশ দদি আজ আবে তাফ্‌ত,
শেকলে শেবে ফরবে ও খরগোশে জফ্‌ত।
চুঁ কে খছমে খেশেরা দর আবে দীদ,
মরউরা বা গোজাস্তে আন্দর চাহ্‌ জাহদী।
দর ফতাদ আন্দর চাহে কো কান্দা বুদ,
জাঁ কে জুলমাশ বরছারাশ আয়েন্দা বুদ।

অর্থ: যখন বাঘ খরগোশকে বগলে চাপাইয়া কূপের নিকট গেল এবং উভয়েই কূপের মধ্যে ঝুঁকিয়া দেখিল, তখন পানির মধ্যে বাঘ এবং খরগোশের প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হইল। বাঘ এক সাথে পানির মধ্যে দেখিল যে একটি মোটা বাঘ এবং একটি খরগোশ রহিয়াছে।যখনই বাঘ দেখিল যে তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী পানির মধ্যে আছে, অমনি খরগোশকে ছাড়িয়া ঝুপ করিয়া কূপের মধ্যে লাফাইয়া পড়িল। খরগোশকে এই জন্য ছাড়িয়া দিল যে, সেখানে অন্য আর একটি খরগোশ আছে, বাঘ মারিয়া সেটিকেই ভক্ষণ করিতে পারিবে। মাওলানা বলেন, বাঘ যে জুলুমে কূপ বন্য পশুদের জন্য খনন করিয়াছিল, সেই কূপেই নিজে যাইয়া পতিত হইল। কেননা, তাহার জুলুমের প্রতিফল নিজের মাথায়-ই পতিত হইবার কারণ ছিল। কেননা, জুলুম-ই তাহার কূপে পতিত হইবার কারণ ছিল।

চাহে মাজলাম গাস্তে জুলমে জালেমাঁ,
ইঁচুনিঁ গোফ্‌তান্দ জুমলা আলেমাঁ।
হরকে জালেম তর চাহাশ বা হাওলে তর,
আদলে ফরমুদাস্ত বাদতররা বতর।
আয় ফে তু আজ জুলমে চাহেমী কুনী,
আজ বরায়ে খেশে দামে মী তনী
বর জয়ীফানে গারতু জুলমে মী কুনী,
দাঁকে আন্দর কায়ায়ে চাহে বে বানী।
গরদে খোদ চুঁ করমে পীলা বর মতন,
বহরে খোদ চাহমী কুনী আন্দাজাহ কুন।
মর জয়ীফানে রা তু বে খছমী মদাঁ,
আজ বনে ইজ জায়া নছরুল্লাহে বখাঁ।
গারতু পীলি খছমে তু আজ তু রমীদ,
নফে জাযা তাইরান আবা বীলাত রছীদ।
গার জয়ীফে দর জমনে খাহাদ আমান,
গোল গোল উফ্‌তাদ দরছেপাহে আছমান।
গার বদান্দাশ গুজী পুর খুনে কুনী,
দরদে দান্দানাত বগীরাদ ‍চুঁ কুনী।

অর্থ: এখানে মাওলানা কূপ প্রসঙ্গে কয়েকটি নসীহতের কথা বর্ণনা করিতেছেন, জালেমদের জুলুমের কূপ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সমস্ত বোজর্গানে দ্বীন এইরূপ মত প্রকাশ করিয়াছেন – যাহার জুলুম অধিকতর হইবে, কূপ ও তত অধিক ভয়াবহ হইবে। কেননা আল্লাহর ইনসাফ হইল, বদ কাজের প্রতিফল বদ-ই ইহবে। অতএব, তুমি যে জুলুমের কূপ খনন করিতেছ, উহা প্রকৃতপক্ষে তোমার নিজের জন্যই ফাঁদ বিস্তার করিতেছ। তুমি যে দুর্বলদের উপর জুলুম করিতেছ, নিশ্চয় করিয়া জানিয়া রাখ, অতল কূপের মধ্যে পতিত হইবার আসবাব (কারণ) যোগাড় করিতেছ। তুমি রেশমের  পোকার ন্যায় নিজের লালা মাখিয়া নিজের মৃত্যুর কারণ ঘটাও কেন? অর্থাৎ, রেশমের পোকার স্বভাব হইল যে, নিজের মুখের লালা সূতায় মাখিয়া রেশম তৈয়ার করিতে থাকে। অবশেষে রেশম পূর্ণ হইলে নিজে মারা পড়ে। সেই রকম তুমি নিজে জুলুম অবলম্বন করিয়া নিজের ধ্বংস টানিয়া আন। যখন জুলুম-ই করিতেছ, তবে নিজেই যতদূর কষ্ট বা শাস্তি সহ্য করিতে পারিবা বুঝিয়া সেই পরিমাণ জুলুম কর। অর্থাৎ, শাস্তি ত মোটেই সহ্য করিতে চাও না, অতএব জুলুম করা ত্যাগ কর। দুর্বলদিগকে মনে করিও না যে তাহাদের জন্য প্রতিশোধ লইবার কেহ নাই। পবিত্র কুরআনের মধ্যে ইজা-জা-আ নাসরুল্লাহে পাঠ করিয়া দেখ রাসূলুল্লাহ (দ:) অসহায় ও দুর্বল থাকা সত্ত্বেও আল্লাহতায়ালা শক্তিশালী জালেমদের বিরুদ্ধে কীরূপ সাহায্য করিয়ছিলেন। তুমি যদি হাতীর ন্যায় শক্তিশালীও হও এবং তোমার বিরুদ্ধবাদী দুর্বল হয়, তোমা হইতে ভাগিয়া যায়, তথাপি শাস্তিস্বরূপ তোমার মাথায় ’তাইরান আবাবীল’ পাখী পড়িবে। যেমন ’আসহাবে ফীল’কে আবাবীল পাখী দ্বারা ধ্বংস করিয়া দেওয়া হইয়াছে। তোমার অত্যাচারের দরুন যদি কোনো দুর্বল ব্যক্তি পৃথিবীতে আমান চায়, তখন আসমানের ফেরেস্তাদের মধ্যে শোরগোল পড়িয়া যায়। তুমি যদি কোনো দুর্বলকে দাঁত দিয়া কাটিয়া রক্তাক্ত করিয়া দাও এবং তোমার দাঁত ব্যথাপূর্ণ হইয়া যায়, তবে তুমি কী করিবা?

শেরে খোদরা দীদে দরচাহো ও জে গলু,
কেশেরা না শেনাখ্‌ত আন্দাম আজ আদু।
নফছে খোদরা উ আদুয়ে খেশে দীদ,
লাজেরাম বর খেশে শামশীর কাশীদ

অর্থ: বাঘ কূপের মধ্যে নিজেকে দেখিয়াছিল, কিন্তু ক্রোধে ও হিংসায় পরিপূর্ণ অবস্থায় ছিল বলিয়া নিজেকে নিজের শত্রু হইতে পার্থক্য করিতে পারে নাই। সে নিজেকে নিজের শত্রু মনে করিয়া নিজের উপর-ই তরবারী চালাইয়া দিয়াছে।

আয়বছা জুলমে কে বীনি আজ কাছাঁ
খোয়ে তু বাশদ দর ইশানে আয় ফালাঁ।
আন্দর ইশানে তাফ্‌তা হাস্তিতু,
আজ নেফাকো ও জুলমো ও বদ মস্তী তু।
আঁ তুই ও আঁ জখমে বরখোদ মী জানী,
বরখোদ আঁ ছায়াতে তু লায়ানাত মী কুনী।
দরখোদ আঁ বদরা নমী বীনি আয়ান,
ওয়ারনা দুশমান বুদাহ খোদরা আবেজান।
হামলা বরখোদ মী কুনী আয় ছাদাহ্‌ মরদ,
হামচুঁ আঁ শেরে কে বরখোদ হামরা করদ
চুঁ ব কায়ারে খুয়ে খোদ আন্দর রছী,
পাছ বদানী কাজ ত বুদ আঁ না কাছী।
শেরে রা দর কায়ারে পয়দা শোদকে বুদ,
নকশে উ আঁ কাশ দেগার কাছ মী নামুদ
হরকে দান্দানে জয়ীফে মী কানাদ,
কারে আঁ শেরে গলতে বীঁ মীকুনাদ।
আয় বদীদাহ খালে বদ বররুয়ে আম,
আকছে খালে তুস্ত আঁ আজ আমে মরাম।

অর্থ: এখানে মাওলানা বাঘের অবস্থার ন্যায় সর্বসাধারণের অবস্থার কথা বর্ণনা করিতেছেন যে, বাঘ যেরূপ নিজের দেহকে অন্যের দেহ মনে করিতেছিল, এই রূপভাবে কোনো কোনো লোক অন্যের মধ্যে খারাপ গুণ মনে করে। প্রকৃতপক্ষে এ খারাপ স্বভাব নিজের মধ্যেই থাকে। এই রকম ঘটনা অনেকই দেখা যায়। তাই মাওলানা বলেন, বহুত জুলুম ও অত্যাচার অন্য লোকে করে বলিয়া মনে হয়। কিন্তু উহা তোমারই খাসলাত, যাহা তাহার মধ্যে দেখিতেছ, তোমার নেফাকী (কপটতা), জুলুম ও বদ মস্তীর দরুন অন্যের মধ্যে দেখিতেছ। প্রকৃত অবস্থায় তুমি-ই ঐ দোষে দোষী। ঐ বদনাম তোমার নিজের উপর-ই দিতেছ। কারণ, যে গুণের জন্য অপরকে দোষারোপ করিতেছে, ঠিক ঐ গুণ-ই তোমার মধ্যে আছে। অতএব, দোষারোপ হিসাবে যাহা বলিতেছ, ইহা তোমার উপর-ই আসিয়া পৌঁছিতেছে। কিন্তু তুমি তোমার মধ্যে দেখ না বলিয়া ঐরকম দোষারোপ কর। না হইলে তুমি নিজেই বিরুদ্ধে যাইতে। এই জন্য নিজের উপর আক্রমণ করিতেছ; যেমন উক্ত বাঘ নিজের উপর নিজে আক্রমণ করিয়াছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের চরিত্র দেখিতে না শিখিবে, ততদিন পর্যন্ত নিজেকে অনুপযুক্ত বলিয়া মনে করিবে। যেমন ঐ বাঘ কূপের তলদেশে যাইয়া বুঝিতে পারিয়াছিল। যে ছবি দেখিয়াছিল, উহা তাহার নিজের ছবি-ই ছিল। কিন্তু অন্যের সুরাত বলিয়া মনে করিয়াছিল। এইভাবে যদি কেহ কোনো নির্দোষী দুর্বলের উপর দোষী বলিয়া জুলুম করে, তবে সে ঐ বাঘের ভুলের ন্যায় ভুল করিয়া বসিবে। দেখিতে মনে হয় যেন অন্যের ক্ষতি করিতেছে, কিন্তু উহার শেষ ফল তাহার নিজেরই ভোগ করিতে হইবে। শেষ কথা এই যে, তুমি যে অন্য মুসলমানের অন্যায় দেখিতেছ, উহা প্রকৃতপক্ষে তোমার-ই অন্যায়। তাহার প্রতিবিম্ব অন্যের উপর দেখিতেছ। অন্যের দোষ বর্ণনা করিও না।

মোমেনানে আয় নায়ে এক দীগারান্দ,
ইঁ খবর রা আজ পয়গম্বর আওর দান্দ।
পেশে চশমাতে দাস্তী শীশায়ে কাবুদ,
জে আঁ ছবাব আলমে কাবুদাত মী নাবুদ।
গার না কুরী ইঁ কাবুদে দাঁ জে খেশ,
খেশে রা বদ গো মগো কাছরা তু বেশ।
মোমেনার ইয়ানজুরু বেনুরিল্লাহে নাবুদ,
আয়বে মোমেন রা বরহেনা চুঁ নামুদ।
চুঁ কে তুই ইয়ানজুরু বেনারাল্লাহে বদী,
দর বদী আজ নেকুই গাঁফেল শোদী।
আন্দেক আন্দেক আব বর আতেশ বজান
তা শওয়াদ নারে তু নূর বুল হাজান।

অর্থ: উপরে মাওলানা পরের দোষ দেখাকে নিজের দোষ বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। ইহাতে সন্দেহ হইতে পারে যে উস্তাদ শাগরেদের দোষ বর্ণনা করিয়া ধরাইয়া দিলে ইহা উস্তাদেরই দোষ বলিয়া মনে হইবে এবং কামেলকেও তালেবের দোষসমূহ নিজের বলিয়া মনে করিতে হইবে। অথবা সর্বসাধারণের ভালাইয়ের জন্য যে দোষসমূহ প্রকাশ করিয়া বলা হয়, উহাও কামেলের নিজের দোষ বলিয়া মনে করা। এই সমস্ত সন্দেহ দূর করার জন্য মওলানা এখানে বর্ণনা করিতেছেন যে, ঈমানদার ব্যক্তিরা একে অন্যের জন্য আয়নাস্বরূপ। যেমন আয়নার সম্মুখে গেলেই নিজের চেহারার ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। সেইরূপ একজন মোমেন ব্যক্তি অন্য মোমেনের নিকট গেলেই নিজের ত্রুটি লক্ষ্য করিতে পারিবে। যেমন হুজুর পাক (দ:) ইরশাদ করিয়াছেন, মোমেন ব্যক্তি মোমেনের জন্য দর্পণস্বরূপ। এখানে ঈমানের নূর দ্বারা দেখা শর্ত করা হইয়াছে। কেননা, খাঁটি ঈমানের দৃষ্টি সঠিক হয়, অন্যভাবে দৃষ্টি করিলে সঠিক দৃষ্ট হয় না। যেমন তুমি যদি জ্ঞানের চক্ষুতে নীলা চশমা লাগাইয়া দেখ, তবে সমস্ত-ই নীলবর্ণ দেখা যাইবে। কেননা, তুমি প্রকৃত খাঁটি ঈমানের চক্ষু দিয়া দেখিতে পার নাই। তোমার দৃষ্টির মধ্যে তোমার-ই কোনো বদ খাসলাত দ্বারা দৃষ্টি বাধাপ্রাপ্ত হইয়াছে। এই জন্য অন্যকে তোমার দোষে দোষী বলিয়া মনে হইতেছে। অতএব, তুমি এবং আহলে কামেলের মধ্যে এই পার্থক্য দেখা যায়। যদি তুমি অন্তরের দিক দিয়া অন্ধ না হও, তবে ঐ অন্ধকার নিজের মধ্যে, অর্থাৎ, ঐ দোষগুলি নিজের মধ্যে মনে কর এবং নিজেকে মন্দ বলিয়া জান, অন্যকে খারাপ বলিও না। কিন্তু মোমেন ব্যক্তিরা ইহার বিপরীত; কারণ তাঁহারা ঈমানের চক্ষু দিয়া দেখেন, তাঁহাদের দেখা শুদ্ধ; আল্লাহর নূরের সাহায্যে দেখেন। এই জন্য হুজুর পাক (দ:) মোমেনের জ্ঞানের কথা ভয় করিতে বলিতেছেন। তাঁহাদের কথা অবহেলা করিতে নিষেধ করিয়াছেন। আর তুমি আল্লাহর আগুন দিয়া দেখ, অর্থাৎ, নিজের নফ্‌সের খাহেশ অনুযায়ী দেখ, উহা জাহান্নামে যাইবার কারণ। নিজের আত্মার ’বদী’ (মন্দভাব) দিয়া দেখ, এই জন্য অপরের আত্মার নেকী দেখা যায় না। অতএব, তোমার নজর শুদ্ধ করার জন্য ঐ আগুন নির্বাপনের পদ্ধতি হইল, অল্প অল্প পানি, অর্থাৎ, কামেল বোযর্গের ফায়েজ ঐ আগুণের উপর দিতে থাক, তবে ধীরে ধীরে তোমার অগ্নি নূরে পরিণত হইয়া যাইবে।

তু বজনে ইয়া রাব্বানা আবে তহুর,
তা শওয়াদ ইঁ নারে আলম জামিলা নূর।
কোহ্‌ ও দরিয়া জুমলা দরফরমানে তুস্ত,
আবো ও আতেশ আয় খোদাওয়ান্দে আনেতুস্ত।
গার তু খাহী আতেশ আবে খোশ শওয়াদ,
ওয়ার না খাহী আবো হাম আতেশ শওয়াদ।
ই তলবে দরমা হাম আজ ইজাদে তুস্ত,
রোস্তানে আজ বেদাদে ইয়া রাব্বে দাদে তুস্ত।
বেতলবে তুইঁ তলবে মানে দাদাহ্‌,
গঞ্জে ইহছান বরহামা ব কোশাদাহ্‌।
বেশুমার ও হদ্দে আতাহা দাদাহয়ে,
বাবে রহমতে বরহামা ব কোশাদাহয়ে,
বে তলবে হাম মীদিহী গঞ্জে নেহাঁ,
রায়েগানে বখ্‌শিদাহ্‌ জানো ও জাহাঁ।
দর আদমকে বুদ মারা খোদে তলব,
বে ছবাব করদী আতাহায়ে আজব।
খনোও মান দাদী ও ওমরে জা ও দাঁ,
ছায়েরে নেয়ামত কে না আইয়াদ দর রয়াঁ।
হাকাজা আনয়ামা ইলা দারেচ্ছালাম,
বিন্নবীয়েল মোস্তফা আখিরুল আনাম।
বা তলবে চুঁ না দিহী আয় হাইউন ওদুদ,
কাজ তু আমদ জুমলগে জুদো ও অজুদ।

অর্থ: এখানে মাওলানা আগুনকে নূরে পরিবর্তন করার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করিতেছেন। উদ্দেশ্য এই যে, কোনো সালেক যেন নিজের এলেম ও মোজাহেদা শক্তির জন্য অহংকার না করে, বরং সর্বদা আল্লাহর কাছে নম্রভাবে প্রার্থনা করিতে থাকিবে, হে খোদা! তুমি পবিত্র পানি বর্ষণ করিয়া দাও। অর্থাৎ, তুমি তোমার রহমতের ফায়েজ দান কর, যাহাতে এই জগতের পাপসমূহ বিদূরিত হইয়া যায় এবং সমস্ত তোমার নূরের আলোতে আলোকিত হইয়া যায়। কেননা, তোমার হুকুমাত ও কুদরাত এত প্রশস্ত যে সাগর, পাহাড় পর্বত তোমার হুকুমের বশবর্তী, আগুন ও পানি তোমার-ই গোলাম। তুমি যাহা চাও করতে পার। যদি তুমি চাও, তবে আগুন শান্তির পানি হইয়া যাইতে পারে, আর যদি ইচ্ছা কর, তবে পানি আগুন হইয়া যায়। আমাদের এই প্রার্থনার ইচ্ছাও তুমি অন্তরে পয়দা করিয়া দিয়াছ। সমস্ত জুলুম ও অন্যায় হইতে মুক্তি পাওয়া তোমার-ই দান, অথবা তোমার-ই ইনসাফ। আমরা তলব করার আগেই আমাদিগকে দান করিয়াছ। বিনা তলবেই আমাদিগকে তোমার নিকট অনুনয় ও বিনয় সহকারে প্রার্থনা করার শক্তি দান করিয়াছ। তোমার দানের ভাণ্ডার সকলের জন্য উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছ। অসংখ্য দান তুমি আমাদের প্রতি করিয়াছ। তোমার রহমতের দরজা সকলের জন্য খোলা রাখিয়াছ। বিনা তলবে তোমার গুপ্ত ভাণ্ডারও দান করিয়া থাক! জান এবং জাহানও বিনা প্রার্থনায় দান করিয়া থাক। কেননা, আমরা যখন ছিলাম না, তখন আমাদিগকে আশ্চর্য রকমের বহু দান করিযাছ। খাদ্য-খাদক ও মান-ইজ্জত দিয়াছ। অন্যান্য যাহা দান করিয়াছ, তাহা আমাদের বর্ণনা করা শক্তির বাহিরে। যেমন তুমি-ই ত বলিয়াছ যে, আমার প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ তোমরা গণনা করিয়া সীমাবদ্ধ করিতে পারিবে না। এখন পর্যন্ত নেয়ামত দান করিতেছ, এই রকম খাইরুল বাশার হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম)-এর অসীলার দারুস্ সালাম পর্যন্ত দান করিতে থাকিবে। যখন বিনা তলবে এত কিছু দান করিয়াছ, তবে প্রার্থনা করিলে দান করিবে না কেন? কেননা, সমস্ত সৃষ্টি ও সমস্ত দান তোমার-ই।

বন্য পশুদের নিকট খরগোশের শুভ সংবাদ দেওয়া যে বাঘ কূপের মধ্যে পড়িয়া গিয়াছে

চুঁকে খরগোশ আজ রেহাই শাদে গাস্ত,
ছুয়ে নাখচিরাণে রওয়াঁ শোধ তা বদাস্ত।
শেরেরা চুঁ দীদে মোহবে জুলমে খেশ,
ছুয়ে কওমে খোদ দওবীদ উ পেশে পেশ।
শেরেরা চুঁ দীদে কোস্তা জুলমে খোদ,
মী দওবীদ উ শাদেমানে বারশোদ।
শেরে রা চুঁ দদে দরচাহে গাস্তা জার,
চরখে মীজাদ শাদে মানে মোরগেজার।
দস্তে মীজাদ চুঁ রাহীদ আজ দস্তে মোরগ,
ছব জাওয়াব কাচ্ছানে দর হাওয়া চুঁ শাখোও বরগ।

অর্থ: যখন খরগোশ বাঘ হইতে রেহাই পাইল, আনন্দ চিত্তে বন্য পশুদের নিকট চারণ-ভুমির দিকে রওয়ানা হইল। বাঘকে দেখিল যে, নিজের অত্যাচারের প্রতিফলস্বরূপ ধ্বংস হইয়া গেল। বাঘ কূপের মধ্যে অসহায় অবস্থায় পড়িয়া রহিল। খরগোশ অত্যন্ত খুশী হইয়া নিজ জাতির মধ্যে শুভ সংবাদ দিবার জন্য লম্ফ-ঝম্প দিয়া দৌড়াইতে লাগিল। মৃত্যুর হাত হইতে বাঁচিয়া গেল, এই জন্য তালি বাজাইয়া নাচিয়া চলিতেছেল। যেমন, বৃক্ষের ডাল ও পাতা বাতাসে নাচিতে থাকে।

শাখোও বগর আজ হাবছে খাক আজাদ শোদ,
ছার বর আওরাদ ও হরীফে বাদ শোদ।
বরগেহা চুঁ শাখে রা বশে গাফ্‌তান্দ,
তাব বারায়ে দরখতে ইশ্‌তাফ্‌ তান্দ।
বাজে বানে শাত্তাহ্‌ শোকরে খোদা,
মী ছারাইয়াদ হর বরু বরগে জুদা।
বে জবানে হর বারু বরগো ও শাখেহা,
মী ছেতাইয়াদ শোকরো ও তাছবীহ্‌ খোদা।
কে ব পরুরাদ আছলে মারা জুল আতা,
তা দরখতে আছতাগ্‌ লীজ আমদ ফাছতাওয়া।

অর্থ: খরগোমের নর্তন-কুর্দনকে ডাল ও পাতার সহিত তুলনা করা হইয়াছে। এই জন্য মাওলানা ডাল ও পাতার বর্ণনা করিতেছেন যে খরগোশের নাচন ও কোঁদনে মনে হইতেছে যেন শাখা ও পাতা প্রথমে মাটি হইতে বাহিরে আসিয়াছে এবং বাতাসের সংস্পর্শের কারণে এদিক সেদিক হেলিতেছে। পাতাসমূহ কাণ্ড ফাঁড়িয়া উপরে যাইয়া বৃক্ষ পর্যন্ত হইয়া গিয়াছে। এই জন্য প্রত্যেক পাতা ও শাখা নিজ নিজ ভাষায় আল্লাহর শোকর আদায় করিতেছে। বিনা জবানে প্রত্যেক পাতা ও শাখা আজাদী হাসেল করিয়া অতি উচ্চে উঠিয়া বৃক্ষে পরিণত হইতে পারিয়াছে। এইজন্য বিভিন্ন প্রকার ও ভাব-ভঙ্গিতে খোদার শোকর ও তাসবীহ আদায় করিতেছে: হে আল্লাহতায়ালা! আমাদের আসর, যাহা হইতে এই সমস্ত শাখা, প্রশাখা, পাতা ও ফল-ফুল বাহির হইয়াছে, ইহা সব তোমার-ই প্রতিপালন ও দান।

জানে হায়ে বস্তা আন্দর আবো গেল,
চুঁ রেহানাদ আজ আবো গেলহা শাদে দেল।
দর হাওয়ায়ে ইশ্‌কে হক রক্‌ছান শওয়ান্দ,
হামচু কুরচে বদর বে নোক্‌ছান শওয়ান্দ।
জেছমে শানে দর রকচোও জানেহা খোদ মপোরছ,
ও আঁকে গরদাদ জান আজ আঁহা খোদ মপোরছ।

অর্থ: উপরে বৃক্ষের মাটি হইতে রেহাই পাইবার বর্ণনা ছিল। এখানে মাওলানা রূহ্‌সমূহের দেহরূপ কয়েদখানা হইতে রেহাই পাওয়া সম্বন্ধে বর্ণনা করিতেছেন। রূহ্‌সমূহ পানি ও মাটি -কাদার দেহের মধ্যে আবদ্ধ আছে। যখন ইহারা পানি ও মাটি-কাদার দেহ হইতে মুক্ত হইয়া খুশী হয়, তখন আল্লাহর ইশ্‌কের বায়ুতে আনন্দে নাচিতে থাকে। এই নাচনের ক্রিয়া, অর্থাৎ, আনন্দের ক্রিয়া মৃত্যুর পর দেহের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। ইহা ’আহলে কুলুব’-বৃন্দ অনুমান করিতে পারেন। রূহ্‌ তখন পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় পূর্ণ আলোকে বিস্তার করে। রূহের এই আনন্দ ও স্বাদ গ্রহণের নমুনা দেহের উপর প্রতিফলিত হয় এবং মৃতদেহকে খুশীর চেহারায় দেখা যায়। জ্ঞানীরা অলি-আল্লাহর খোশ খবরি ও সুরাত দ্বারা অনুভব করিতে পারেন।

শেররা খরগোশ দর জেন্দানে নেশানাদ,
নংগে শেরে কুজে করগোশে বেমানাদ।
দরচুনা নংগি আঁগাহ আয় আজব,
ফখরে দীন খাহী কে গোয়েন্দাত লকব।
আয় তু শেরে দর নংগে ইঁ চাহে দহর;
নফছে চুঁ খরগোশ চু কোশতে বকহর।
নফছে খরগোশাত ব ছাহারা দরচেরা,
তু ব কায়ারে ইঁ চাহে চু ও চেরা।

অর্থ: এখানে মাওলানা বাঘকে রূহের সাথে এবং খরগোশকে নফসের সাথে তুলনা করিয়া বলিতেছেন, খরগোশ যেমন বাঘকে কূপে কয়েদখানায় আবদ্ধ করিয়া ফেলিয়াছে এবং বাঘ সামান্য খরগোশের নিকট লজ্জিত হইয়াছে, এই রূপভাবে রূহ নফসে আম্মারার ধোকায় পড়িয়া দুনিয়ার খাহেশ ও লজ্জতের মধ্যে গ্রেফতার হইয়া কয়েদখানায় আবদ্ধ রহিয়াছে। এইজন্য রূহের লজ্জা হওয়া উচিত। কেননা, সে নফসের সহিত পরাজিত রহিয়াছে। নফসকে দমন করিতে পারে নাই। এই রকম লজ্জিত ও পরাজিত অবস্থায় পতিত হইয়াও “ফখরে দ্বীন” উপাধি হাসেল করিতে চাও। ইহা কি লজ্জার বিষয় নহে? দুনিয়ার কূপে তুমি আবদ্ধ হইয়াছ; তোমার নফস ধোকাবাজীতে খরগোশের ন্যায়। ইহা তোমাকে ধ্বংস করিয়া ফেলিয়াছে। তোমাকে হালাক করিয়া সে দুনিয়ার স্বাদ উঠাইতেছে। আর তুমি লোক দেখানো মাতব্বরি হাসেল করার জন্য হিলা সাজী অবলম্বন করিতেছ।

ছুয়ে নাখ চিরানে দওবীদ আঁ শেরে গীর,
কা বশরো ইয়া কওমে ইজ জায়াল বশীর।
মোসদাহ, মোসদাহ, আয় গেরোহে আইশে ছাজ,
কানে ছাগে দোজখ ব দোজখ রফতে বাজ।
মোসদাহ, মোসদাহ, কা আ আদুবে জানেহা,
কানাদ কাহারে খালেকাশ দান্দানেহা।
মোসদাহ, মোসদাহ, কাজ কাজা জালেম বচাহ,
উফতাদ আজ লুৎফে ও আদলে বাদশাহ।
আ কে আজ পাঞ্জাহ বাদে ছারহা বকোফত,
হামচু খাছ জরুবে মোরগাশ হাম বরুফ্‌ত।
আ কে জুযে জুলমাশ দিগার কারে না বুদ,
আহে মাজলুমাশ গেরেফত ও ছখতে জুদ।
গেরেদানাশ বশেকাস্ত ও মগজাশ বর দরীদ,
জানে মা আজ কয়েদে মেহনাত ওয়া রাহীদ।

অর্থ: আবদ্ধ বাঘের কথা খরগোশ বন্য পশুদের নিকট যাইয়া বলিতে লাগিল, তোমরা খুশী হও, তোমাদের নিকট খোশ-খবরদাতা আসিয়াছে। হে খুশীতে বসবাসকারী! তোমাদিগকে শুভ সংবাদ দিতেছি যে, ঐ বাঘ দোজখে যাইয়া পৌঁছিয়াছে। অর্থাৎ, মারা গিয়াছে। সে যে অনেক প্রাণের শত্রু ছিল, খোদার গজবে তাহার দাঁত উৎপাটন করিয়া দিয়াছে। তাহার ক্ষতি হইতে চিরতরে মুক্তি পাইয়াছি। খোদার হুকুমে ঐ জালেম কূপের মধ্যে পড়িয়া গিয়াছে। আল্লাহর মেহেরবানী হইয়াছে যে, যাহার থাবায় বহু প্রাণ নষ্ট হইয়াছে, সে খর-কুটার ন্যায় মৃত্যুর ঝাড়ুতে পরিষ্কার হইয়া গিয়াছে। জুলুম ব্যতীত তাহার অন্য কোনো কাজ ছিল না। আফসোস, তাহাকে জুলুমে ধরিয়া হঠাৎ জ্বালাইয়া উড়াইয়া দিল। গর্দান ভাঙ্গিয়া ফেলিল, তাহার মগজ ফাটিয়া চূর্ণ-বিচুর্ণ হইয়া গেল; আমরা তাহার অত্যাচার হইতে রেহাই পাইলাম।

বন্য পশুরা খরগোশের চারিপাশে জমা হওয়া এবং খরগোশের প্রশংসা করা

জমা গাস্তান্দ আঁ জমানে জুমলা ওহুশ,
শাদ ও খান্দানে আজ তরবে দর জওকো ও জুশ।
হলকা করদান্দ উ চু শামায়া দরমিয়ান,
জেদাহ্‌ করদান্দাশ হামা ছাহরিয়ান।
তু ফেরেস্তা আছমানী ইয়া পরী,
বল্‌কে আজরাইল শেরানে নরী।
হরচে হাস্তী জানে মা কোরবানে তুস্ত,
দস্তে বুরদী দস্তো ও বাজু ইয়াত দরুস্ত।
রান্দে হক ইঁ আবেরা দর জুয়ে তু,
আকরি বর দস্তো বর বাজু ওয়ায়ে তু।
বাজে গো তা চুঁ ছেগালীদী ব মকর,
আঁ আওয়ানে রা চুঁ বে মালীদে ব মকর।
বাজে গোতা কেচ্ছা দরমানেহা শওয়াদ,
বাজে গোতা মরহামে জানেহা শওয়াদ।
বাজে গো কাজ জুলমে আঁ আস্তাম নোমা,
ছদ হাজারানে জখমে দারাদ জানে মা।
বাজে গো আঁ কেচ্ছা কো শাদী ফজাস্ত,
রূহে মারা কুয়াতো দেলরা জানে ফজাস্ত।

অর্থ: সমস্ত বন্য পশু আনন্দে উদ্বেলিত হইয়া খরগোশের চতুর্পার্শ্বে জমা হইল। খরগোশ মাঝখানে মোমবাতির ন্যায় দণ্ডায়মান ছিল। সকলে তাহাকে সেজদা করিয়া বলিতেছিল, তুমি আসমানী ফেরেস্তা না পরী আমরা বুঝিতে পারি না। তুমি এত বড় আশ্চর্যজনক কাজ করিয়াছ। তুমি পুরুষ বাঘের জান কবজকারী। যাহা হোক, আমাদের জান তোমার উপর কোরবান আছে। তুমি বাঘের সহিত লড়াই করিয়া জয়ী হইয়াছ। তোমার হাত, তোমার শক্তি সব সময় সঠিক ও সুস্থ থাকুক। আল্লাহতায়ালা এই জয় তোমার জন্য নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছিলেন। তোমার শক্তির উপর হাজার হাজার জান কোরবান আছে। এখন তুমি বল, ধোকা দেওয়ার জন্য কী কী তদবীর চিন্তা করিয়াছিলে? সেই জালেমকে কেমন করিয়া কানমলা দিয়াছিলে? শীঘ্র করিয়া বর্ণনা দাও, তবে আমাদের প্রাণের ব্যথা জুড়াইয়া যাইবে। ঐ জালেমের জখমে আমাদের প্রাণে হাজার হাজার জখম আছে। এই ঘটনা দ্বারা আমরা সন্তুষ্টি লাভ করিতে পারিব এবং আমাদের প্রাণের মনোবল বৃদ্ধি পাইবে।

গোফতে তাইদ খোদাবুদ আয়ে মাহান,
ওয়ার না খরগোশে কে বাশদ দরজাহান।
কুয়াতাম বখশীদ ও দেলরা নূরে দাদ,
নূরে দেল মর দস্তো পারা জোরে দাদ।
আজ বর হাকমী রছাদ তাফজীলেহা,
বাজে হাম আজ হক রছাদ তাবদীণেহা।
জুমলা ফজলে উস্ত দানীদ ইঁ চুনীঁ,
ছেজদাহাশ আজ জানো দেল আরিদ হাইঁ।

অর্থ: খরগোশ বলিল, হে বোজর্গবৃন্দ! ইহা শুধু খোদাতায়ালার সাহায্য ছিল। তাহা না হইলে বেচারা সামান্য খরগোশের কী শক্তি? আল্লাহতায়ালা আমাকে শক্তি দান করিয়াছেন এবং আমার অন্তরকে নূর দ্বারা আলোকিত করিয়া বুদ্ধি দান করিয়াছেন। আল্লাহর সাহায্যে আমার হাত-পায়ে শক্তি সঞ্চয় হইয়াছে। ইহা দ্বারা বাঘের উপর জয়লাভ করিয়াছি। আবার আল্লাহ এই শক্তি নিয়াও যাইতে পারেন, যাহাতে পরাজিত হইতে পারি। এই সমস্ত তাঁহার-ই দান, ইঁহা দৃঢ়ভাবে বুঝিয়া লও এবং জান-প্রাণ দিয়া তাহাকে সেজদা কর।

খরগোশের বন্য পশুদিগকে নসীহত করা এবং ইহাতে খুশী হইতে নিষেধ করা

হক ব দওরোও নওবাতেইঁ তাইদ রা,
মী নুমাইয়াদ আহলে জনু ও দীদেরা।
চুঁ বনওবাত মী দেহানাদ ইঁ দৌলাতাত,
আজ চে শোদ পুর বাউ আখের ছলবাতাত।
হায়েঁ ব মূলকে নওবতে শাদী মকুন,
আয়তু বস্তাহ নওবাতে আজাদী মকুন।
আঁকে মুলকাশ বর তর আজ নওবাতে তানান্দ,
বর তর আজ হাফতে আঞ্জুমাশ নওবাতে জানান্দ।
দওরে দায়েম রূহেহারা ছাকীয়ান্দ।
তরকে ইঁ শরবে আর বগুই এক দোরোজ,
তরকুনী আন্দর শরাবে খুলদে পুজ।
এক দোরোজী চে কে দুনিয়া ছায়াতাস্ত,
হরকে তরকাশ করদ আন্দর রাহাতাস্ত।
মায়ানিয়েত তরকে রাহাতে গোশে কুন,
বাদে আজ আজামে বাকারা নুশে কুন।
বরছেগানে বোগজারইঁ মুরদার রা,
খোরদে ব শেকান শীশায়ে পেন্দারে রা।

অর্থ: আল্লাহতায়ালা এই জয়ী হওয়া দ্বারা আহলে কামেল ও নাফেসকে দেখাইয়া দেয় যে, এক সময় এক জনকে জয়ী করেন, এবং অপরজনকে পরাজিত করেন। যেমন এক সময় বাঘের জয় ছিল; পুনরায় খরগোশের জয় হইল। ইহা দ্বারা নাফেসরা ঘটনার এই পর্যন্ত-ই মনে করে। আর কামেল লোক ইহা দ্বারা নসীহাত হাসেল করেন এবং খোদার গজব হইতে ভয় করেন। নিজের জাহেরী ও বাতেনী কামালাতের জন্য গর্বিত হন না। নিজের কামালাত নষ্ট হইয়া যাওয়ার ভয়েতে সব সময় ভীত থাকেন। যখন তোমাদের জয়ী হওয়া আল্লাহর তরফ হইতে মিলিয়াছে, তবে তোমাদের দেমাগের মধ্যে অহংকার পরিপূর্ণ হওয়ার কোনো কারণ নাই। খবরদার, এই রকম সময়ের দরুণ যে রাজত্ব বা ধন-দৌলত লাভ করা যায়, ইহাতে বেশী খুশী হইও না এবং যখন তোমাদের থেকে রাজত্ব বা ধন-সম্পদ ছিনিয়া লওয়া হয়, তখনও আজাদী বিক্রি করিয়া ফেলিও না। যে ব্যক্তিকে এমন রাজত্ব দেওয়া হয়, যাহা ধ্বংস হইবার নয়, যেমন অলিআল্লাহ ও আরেফীন লোক, তাঁহাদের প্রশংসা সপ্তর্শি তারকা পর্যন্ত পৌঁছিয়া যায়। অর্থাৎ, সপ্তম আসমান পর্যন্ত তাঁহাদের প্রশংসা হইতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে তাঁহাদের রাজত্ব স্থায়ী এবং সর্বদা বাকী থাকে; যাঁহারা রূহকে সব সময় আল্লাহর মহব্বতের শরাব পান করান। যদি তুমি দুই-চারি দিনের জন্য এই দুনিয়ার ধন-সম্পদের মহব্বত ত্যাগ কর, তাহা হইলে তোমার রূহ আল্লাহর মহব্বতের শরাব পান করিয়া তৃপ্তি লাভ করিবে। দুই-চারি দিনের অর্থ এই দুনিয়ার জীবনকাল। যেমন মাওলানা সামনে বর্ণনা করিতেছেন যে, দুনিয়া তরক করা অর্থ ধর্মের বিরোধী কাজসমূহ পরিত্যাগ করা। ধর্মের বিরোধী কাজগুলি পরিত্যাগ না করিলে আল্লাহর মহব্বত হাসেল করা যায় না। আখেরাত হাসেল করার জন্য ধর্মবিরোধী কাজ পরিত্যাগ করা শর্ত। মাওলানা বলেন, আমি ইহ-জগতের জীবনকে এক-দুই দিনের জীবন বলিয়াছি, ইহাও তো নহে, শুধু মাত্র এক ঘণ্টার ন্যায়ও নহে। যে ইহা ত্যাগ করিয়াছে, শান্তি পাইয়াছে। দুনিয়ার শান্তি ত্যাগ করার অর্থ মনোযোগ সহকারে শুন, শুনিয়া দুনিয়াকে ত্যাগ কর। তাঁহার স্থায়ী শরাবের পিয়ালা পান কর, এই মোরদা দুনিয়াকে ইহার অন্বেষণকারী কুকুরকে দিয়া দাও। এই দুনিয়াকে আয়নার মত মনে কর, ইহা হাসেল করিলে শুধু নিজের ছবি দেখা যায়। অতএব, ইহাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া ফেল।

‘আমরা ছোট লড়াই হইতে বড় লড়াইয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করিতেছি’, ইহার ব্যাখ্যা

আয় শাহান কোশতেম মা খছমে বেরুঁ,
মানাদ জু খছমে বতর দর আন্দারুঁ।
কোস্তানে ইঁ কারে আকল ও হুশে নিস্ত,
শেরে বাতেন ছোখরায়ে খরগোশে নিস্ত।
দোজখাস্ত ইঁ নফছো ও দোজখে আজ দাহাস্ত,
কো ব দরিয়া হা না গরদাদ কম ও কাস্ত।
হাফত দরিয়ারা দর আশামদ হানুজ,
কম না গরদাদ ছুজাশে আঁ খলফে ছুছ।
ছংগে হাউ কাফেরানে ছংগে দেল,
আন্দর আইনাদ আন্দরো ও খার ও খজল।
হাম না গরদাদ ছাকেনে আজ চান্দি গেজা,
তা জে হক্কে আইয়াদ মর উরা ইঁ নেদা।
ছায়ের গাস্তি, ছায়ের গুইয়াদ নায়ে হানুজ,
ইনাত আতেশে ইনাত তাবাশ ইনাত ছুজ।
আলমেরা লোকমাহ করদ ওদর কাশীদ,
মেয়দাশ নায়ারা জানান হাল মিম মাজীদ।
হক কদম বরওয়ে নেহাদ আজ লা মাকান
আগাহ্‌ উ ছাকেন শওয়াদ আজ কুন ফাকান।

অর্থ: হে বোজর্গেরা! আমি ত আমার জাহেরী শত্রু মারিয়া ফেলিয়াছি। কিন্তু এক শত্রু যে ইহার চাইতে অনেক গুণে বড়, এবং খুব ক্ষতি করিতে পারে, বাতেনে রহিয়া গিয়াছে। অর্থাৎ, আমাদের ভিতরে নফস বড় শত্রু। এই বাতেন শত্রু যাহার দরুণ খারাপ কার্যসমূহ সম্পন্ন করা হয়, ইহাকে ধ্বংস করা উচিত। ইহা শুধু আকল ও হুঁশিয়ারি দ্বারা দমন করা যায় না। কেননা, বাতেনী শের খরগোশের দ্বারা কাবু হয় না। এই নফসের উদাহরণ যেমন দোজখ, ইহা এমন এক আজদাহা যে হাজার দরিয়ার পানি পান করিয়াও তাহার পিপাসা মিটে না। দোজখ সপ্ত সাগরের ন্যায় বহু কিছু পান করিবে, কিন্তু তাহার সাধ মিটিবে না। তারপর পাথর ও কাফেরদিগকে ইহার মধ্যে দেওয়া হইবে, তাহাতেও তাহার তৃপ্তি আসিবে না। আল্লাহতায়ালা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন, তুমি কি তৃপ্তি লাভ করিয়াছ? উত্তরে উহা আরজ করিবে, হে খোদা, এখন পর্যন্ত আমার ক্ষুধা নিবৃত্তি হয় নাই। তখন আল্লাহতায়ালা লা-মাকান হইতে কুদরাতের পা রাখিয়া বলিবেন, এখন শান্ত হও। তবেই উহা শান্ত হইবে।

চুঁ কে জুযবে দোজ খাস্ত ইঁ নফছে মা,
তবেয় কুল্লু দারদ হামেশা জযবে হা।
ইঁ কদমে হকরাবুদ কোরা কাশীদ,
গায়রে হক খোদ কে কামান উ কাশীদ।
দর কামানে না নেহান্দ ইল্লা তীরে রাস্ত,
ইঁ কামান রা বাজে গোন কাজ তীরে হাস্ত।
বাস্তে শও চুঁ তীরে দাওরা আজ কামান,
কাজ কমান হর রাস্তে ব জেহাদ বেগুমান।

অর্থ: যেহেতু আমাদের নফস দোজখের এক অংশ, তাই শাখার মধ্যে মূলের ক্রিয়া বিদ্যমান থাকে। এইজন্য নফসে আম্মারাহ দোজখের ন্যায় কোনো সময় কিছুতেই তৃপ্তি লাভ করিতে চায় না। যেমন দোজখ হক তায়ালার পা ব্যতীত শান্ত হয় নাই, সেই রকম নফসেরও ইশকে ইলাহীর প্রয়োজন। কেননা, ইশকে ইলাহীর খাসিয়াত হইল, নফসে আম্মারার বদ খাসলাত দূর করা এবং বদ খাহেশ হইতে ফিরাইয়া রাখা। আল্লাহ্‌ ব্যতীত কাহার শক্তি আছে যে ইহার কামান টানিয়া রাখিতে পারে? ইহার পর দুই বয়াতে মাওলানা নফসকে কামান বলিয়াছেন। এই কামানকে আয়ত্তে রাখা এবং ইহার দ্বারা কাজ আদায় করা আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কেহই পারিবে না। তিনি যদি সাহায্য করেন তবে কার্য সিদ্ধি সম্ভব  হইবে। কামান সম্বন্ধে জ্ঞাত ব্যক্তির জানা আছে যে, ইহার মধ্যে সোজা তীর রাখিতে হইবে নতুবা এদিক সেদিক বাঁকা হইয়া যাইবে। তাই মাওলানা বলিতেছেন, তুমি সোজা তীর হইয়া ঐ কামান হইতে বাহির হইয়া যাও। কেননা, এ কামানে সোজা তীর হইলেই বাহির হওয়া যায়। তুমিও যখন সোজা হইবে, তখন এই তীর, অর্থাৎ, নফস হইতে বাহির হইয়া আসিবে। তবেই নফসের বাঁকা টেরা পথ হইতে মুক্তি পাইবে।

চুঁকে ওয়া গাস্তাম জে পেকারে রডুঁ,
রুয়ে আওরদাম বা পেকারে দরুঁ।
কাদ বাজায়ানা মিন জেহাদেল আছগারেম,
বা নব আন্দর জেহাদে আকবারেম।
কুয়াতে খাহাম জে হক দরিয়া শেগাফ,
তা বছুজানে বর ‍কুনাম ইঁ কোহে কাফ।
ছহল শেরে দাঁ কে ছফ্‌হা ব শেকানাদ,
শের আঁনাস্ত আঁকে খোদরা ব শেকানাদ।

অর্থ: যখন জাহেরী শত্রুর সহিত লড়াই করিয়া জয়ী হইয়া আসিয়াছি, এখন বাতেনী শত্রুর সাথে লড়াই করিতে লাগিয়া গেলাম। মওলানা বলেন, যখন ছোট লড়াই করিয়া জয়ী হইয়াছি, এখন নবী করিম (দ:)-এর অসীলা ধরিয়া বড় লড়াই করিতে রত হইয়া গেলাম। অর্থাৎ, প্রকাশ্য শত্রুর সহিত লড়াই করাকে ছোট লড়াই বলে। আর নিজের আত্মা পবিত্র করার চেষ্টাকে বড় লড়াই বলা হয়। এই বড় লড়াই করা নবীর তরিকা অনুসরণ করা ছাড়া হইতে পারে না। এই জন্য আল্লাহর কাছে ইহার শক্তির জন্য প্রার্থনা করিতেছি যে, তাঁহার অনুগ্রহে যেন গায়েবী শক্তি হাসেল করিতে পারি। কেননা, ঐ সাগর পাড়ি দিয়া উঠা মানুষের শক্তির পক্ষে সম্ভব না। গায়েবী শক্তির আবশ্যক আছে। তাহা হইলে আমাদের অন্তরের জেহালতের পর্দা ফাঁড়িয়া দিতে সক্ষম হইব। অন্যথায় আমাদের এই ক্ষুদ্র শক্তি দ্বারা জেহালতের পর্দা ছিন্ন করিতে চেষ্টা করা যেমন সূঁচ দ্বারা কোহে কাফকে খনন করিয়া উঠাইয়া ফেলার চেষ্টা করার ন্যায় হইবে। অর্থাৎ, সূঁচ দ্বারা খনন করিয়া যেমন পাহাড় উঠাইয়া ফেলা সম্ভব নয়, তেমনি মানুষের শক্তি প্রয়োগ করিয়া নফসে জেহালতের পর্দা ছিন্ন করাও অসম্ভব। ঐ বাঘকে সহজ মনে কর, যে কাতারকে ভাঙ্গিয়া ফেলিতে পারে। কিস্তু বড় বাঘ ত ঐ, যে নিজেকে ধ্বংস করিয়া দিতে পারে। হুজুর (দ:) ফরমাইয়াছেনে, ঐ ব্যক্তি বীর নয়, যে যুদ্ধের মাঠে শত্রুকে আছাড় দিয়া ফেলিতে পারে; বরং ঐ ব্যক্তি-ই প্রকৃত বীর, যে ক্রোধের সময় নিজের নফসকে আয়ত্তে রাখিতে পারে। এই কথা প্রমাণের জন্য সামনে হজরত ওমর (রা:)-এর ঘটনা বর্ণনা করা হইতেছে।

কায়সারে রোমের কাসেদ পত্র নিয়া হজরত ওমর (রা:)-এর নিকট উপস্থিত হওয়া

দর বয়ানে ইঁ শোনো এক কেচ্ছা,
তা বরি আজ ছার গোফতাম হেচ্ছা।
বর ওমর আমদ জে কায়ছার এক রছুল,
দর মদিনা আজ বিয়াবানে নগুল।
গোফ্‌তে কো কেছারে খলিফা আয় হাশম,
তা মান আছপে দরখতেরা আঁ জা কাশাম।
কওমে গোফতান্দাশ কে উরা কেছার নীস্ত,
মর ওমর রা কেছার জানে রওশনিস্ত।
গারচে আজ মীরি ওরা আওয়াজাস্ত,
হামচু দরবেশাঁ মর উরা কাজাইস্ত।

অর্থ: মাওলানা বলেন, বাঘ প্রকৃতপক্ষে ঐ ব্যক্তি, যে নিজেকে নিজে দমন করিয়া রাখে। আমার এক কেচ্ছা শুনো, তবে আমার কথার প্রকৃত রহস্য বুঝিতে পারিবে। কেচ্ছা হইল যে, একদিন হজরত ওমর (রা:)-এর নিকট কায়সারে রোমের একজন কাসেদ অনেক দূর দরাজ হইতে আসিয়া উপস্থিত হইয়া লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করিল, খলিফার বালাখানা কোথায়? আসবাবপত্র সওয়ারী সেইখানে রাখিব। লোকে তাহার উত্তর করিল তাঁহার কোনো জাহেরী বালাখানা নাই। তাঁহার অন্তরে আলোকিত রুহানী বালাখানা আছে। যদিও তাঁহার বাদশাহীর সুনাম প্রসিদ্ধ আছে। কিন্তু বসবাস করার জন্য ছোটখাট একখানা ঝুপড়ি আছে।

আয় বেরাদরে চুঁ বা বিনী কেছরে উ,
চুঁকে দর চশমে দেলাত রোস্তাস্ত মু।
চশ্‌মে দেল আজ মুয়ে ও ইল্লাতে পাকে আর,
ওয়া আঁ গাহানে দীদারে কাছরাশ চশমে দার।
হরকেরা হাস্ত আজ হাউছে হা জানে পাক,
জুদে বীনাদ হজরতো ও আইউয়ানে পাক।
চুঁ মোহাম্মদ পাকে শোদ জেইঁ নারো ও দুদ,
হর কুজা রো করদ ওয়াজ হুল্লাহে বুদ।
চুঁ রফিকী ওয়াছ ওয়াছা বদ খাহ্‌রা,
কে বদানী ছুম্মা ওয়াজ হুল্লাহ রা।
হক পেদী দাস্ত আজ মীয়ানে দীগারাঁ,
হামচু মাহে আন্দর মীয়ানে আখতরাঁ।
হরকেরা বাশদ জে ছীনা ফাতাহ্‌ ইয়াব,
উজে হর জররাহ বা বীনাদ আফতাব।
দোছরা নাগাস্ত বর দো চশমে নেহ্‌,
হীচ বীনি দরজাহানে ইনছাফ দাহ্‌।
গার নাবিনী ইঁ জাহান মায়াদুম নিস্ত,
আয়েবে জুয্‌ আংগাস্তে নফছ শওমে নিস্ত।
তু জে চশমে আংগাস্তেরা বরদার হায়েঁ,
ওয়াগাহানে হরচে মীখাহী বা বীঁ।

অর্থ: মাওলানা মদিনার লোকের কথার সারমর্ম বর্ণনা করিতেছেন, তুমি হজরত ওমর (রা:)-এর বাতেনী বালাখানার মরতবা কেমন করিয়া দেখিবে, যখন তোমার বাতেনী-চক্ষে হাউস রস বাকী আছে। ইহা হাকিকাত অনুধাবন করার জন্য বাধাস্বরূপ। প্রথমে তোমার বাতেনী-চক্ষু পবিত্র কর, তারপর তাঁহার বালাখানা দেখিবার ইচ্ছা কর। যে ব্যক্তির অন্তর- চক্ষু হা্উস রস হইতে মুক্ত, সে অতি শীঘ্র ঐ পবিত্র বালাখানা দেখিতে পাইবে। যেহেতু আমাদের নবী করিম (দ:) ঐ হাউস রস হইতে পবিত্র ছিলেন, তাই তিনি যে দিকে নজর করিতেন, সেই দিকেই আল্লাহর রওশনি দেখিতে পাইতেন। তুমি যখন তোমার নফস ও শয়তানের ধোকায় পতিত আছ, অর্থাৎ, মনের খাহেশ অনুযায়ী কাজ কর, এইজন্য তুমি আল্লাহর চেহারার আলো দেখিতে পাইবে না। এই পর্দা তোমার তরফ হইতে সৃষ্টি হইয়াছে; আল্লাহর তরফ হইতে নয়। কেননা, আল্লাহতায়ালা অন্যান্য মাখলুকাতের নিকট অপ্রকাশ্য নহেন। যেমন চাঁদ সমস্ত তারকাসমূহের মধ্যে প্রকাশ্যে আলোকিত থাকে। অতএব, যে ব্যক্তির কলবের দ্বার খোলা আছে, সে সব দিক দিয়া সেফাতে বারিতায়ালা ও জাতে পাকের আলো দেখিতে পারেন। আর যে ব্যক্তির এইরূপ শক্তি থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর রওশনি দেখা হইতে বিরত থাকে, সে ব্যক্তি যেমন নিজের দুইটি অঙ্গুলি দুই চক্ষুর উপর রাখিয়া ঢাকিয়া ধরিলে কিছুই দেখিতে পাইবে না। কিন্তু সেজন্য দুনিয়া নাই হইয়া যাইবে না। যাহার জন্য দেখিতেছ না উহা তোমার দোষ বা ত্রুটি। তোমার দুইটি আঙ্গুলি রাখার দরুন দেখিতেছ না। তোমার নফসও ঐরূপ, তুমি তাহার প্রলোভন ভুলিয়া অন্ধ হইয়া গিয়াছ। নফসের প্রলোভন জাতে পাকের আলো অনুধাবন করার পক্ষে পর্দাস্বরূপ। অতএব, তুমি চক্ষের অঙ্গুলি হটাইয়া ফেল, সব কিছু দেখিতে পাইবে। এইভাবে খাহেশে নফস দূর করিয়া ফেল, হাকিকাতের আলো দেখিতে পাইবে।

নূহ্‌রা গোফতান্দ উম্মাত কো ছওয়াব,
গোফ্‌তে উ জে আঁছুয়ে ওয়াস্তাগিছু ছিয়াব।
রুয়ে ও ছার দর জামেহা পিচিদাহ আন্দ,
লজেরাম বা দীদাহ ও না দিদাহ আন্দ।
আদমী দীদাস্ত বাকী পোস্তাস্ত,
দীদ আঁনাস্ত আঁকেদীদ দোস্তাস্ত।
চুঁকে দীদ দোস্ত নাবুদ কোর বেহ্‌,
দোস্ত কো বাকী না বাশদ দূর বেহ্‌।

অর্থ: হজরত নূহ (আ:)-এর নিকট তাহার উম্মতেরা এনকার সূত্রে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল যে, আখেরাতের সওয়াব কোথায়? তিনি উত্তরে বলিলেন, তোমাদের কানে, মুখে ও মাথায় কাপড় মুড়িয়া লওয়ার মধ্যে আছে। অর্থাৎ, তোমরা কানে, নাকে ও মুখে কাপড় দিয়া রাখিয়াছ, যাহাতে নসিহাতের কথা শুনিতে না পার। ইহাই তোমাদের জন্য সওয়াব না দেখার পর্দা। এই পর্দার কারণে তোমরা সওয়াব দেখিতে পার না। এই পর্দা উঠাইয়া ঈমান লও, তবে কলব দ্বারা সওয়াব ও জাবা দেখিতে পাইবে। চেহারায় কানে ও মুখে কাপড় মুড়াইয়া রাখায় প্রকাশ্য দর্শী ও বাতেন না দর্শী হইতেছ। মানুষ যে গুণে পূর্ণ মানবতা লাভ করে, ইহা শুধু হাকিকাত অনুধাবন করার নাম। আর বাকী সব খোশা বলিয়া পরিচিত। তারপর দেখার অর্থ গুপ্ত বস্তু দেখা। তাহা যদি না দেখিতে পারে তবে তাহাকে অন্ধ বলা হয়।

চুঁ রছুলে রুম ইঁ আলফাজে তর,
দর ছেমায়ে আওরাদ শোদ মোস্তাফ তর।
দীদাহ রা বর জুস্তানে ওমর গুমাস্ত,
রোখতেরা উ আছপেরা জায়ে গুজাস্ত।
হর তরফ আন্দর পায়ে আঁ মরদে কার,
মী শোদী পুরছান উ দেওয়ানা ওয়ার।
কে ইঁ চুনীঁ মরদে বুদ আন্দার জাহাঁ,
ওয়াজ জাহাঁ মনেন্দে জান বাশদ নেহাঁ।
জুস্ত উরা তাশে চুঁ বান্দাহ্‌ শওয়াদ,
নাজেরাম জুয়েন্দাহ বান্দাহ শওয়াদ।

অর্থ: যখন রোমের কাসেদ হজরত ওমর (রা:)-এর রুহের বালাখানার রওশনির কথা শুনিল, তখন তাহার সাক্ষাতের জন্য অধিক আগ্রহ সহকারে মুখাপেক্ষী হইয়া পড়িল এবং নিজ চক্ষু তাহার তালাশে লাগাইয়া দিল। নিজের আসবাব-পত্র এবং সওয়ারী অরক্ষিত ভাবে ফেলিয়া রাখিল। চতুর্দিকে লোকের কাছে জিজ্ঞাসা করিয়া পাগলের ন্যায় ফিরিতে লাগিল। নিজে মনে মনে চিন্তা করিতেছিল যে দুনিয়ায় এমন ব্যক্তি বর্তমান আছে, এবং আমি তাহার অবস্থা জানি না, এইরূপ আফসোস করিয়া হজরত ওমর (রা:)-কে তালাশ করিয়া ফিরিতেছিল। যদি তাঁহাকে পাই, তবে চিরতরে গোলাম হইয়া যাইব। শেষ পর্যন্ত যে অন্বেষণ করে, সে পাইয়া যায়।

হঠাৎ খোরমা গাছের নিচে কাসেদ আমিরুল মোমেনীন হজরত ওমর (রা:)-এর সাক্ষাৎ লাভ করা

দীদে এরাবী জনে উরা দখীল,
গোফতে ওমন নকে বজীরে আঁ নখীল।
জীরে খোরমা বেন জে খলকানে উ জুদা,
জীরে ছায়ায়ে খোফতাহ বীন ছায়ায়ে খোদা।
আমদ উ আঁজাও আজ দূরে ইস্তাদ,
মর ওমর্‌রা দীদ ও দর লরজাহ ফাতাদ।
হায়বাতে জে আঁ খোফতাহ আমদ বর রছুল,
ঞালতে খেশ করদ বর জানাশ নজুল।
মহর ও হায়বাত হাস্তে জেদ্দে হাম দিগার,
ইঁ দো জেদ্দেরা জমা দীদ আন্দর জেগার।

অর্থ: এক আরাবীর স্ত্রী ঐ কাসেদকে নও-আগন্তুক দেখিয়া বলিল, ঐ দেখ, খোরমা গাছের নিচে হজরত ওমর (রা:) একাকী তাশরীফ রাখিয়াছেন। এই খোদার ছায়া খোরমা গাছের ছায়ার নিচে শুইয়া রহিয়াছেন। কাসেদ ঐখানে গেল, এবং দূরে দাঁড়াইয়া রহিল। হজরত ওমর (রা:)-কে দেখিবামাত্র তাহার সমস্ত শরীরে কম্পন আরম্ভ হইল। ঐ ঘুমন্ত অবস্থায় দেখিয়া তাহার অন্তরে ভীতির সঞ্চার হইল এবং তাহার বাতেনে এক নূতন হালত উপস্থিত হইল। মহব্বত এবং ভীতি পরস্পরবিরুদ্ধ বস্তু। কেননা, মহব্বত চায় নৈকট্য লাভ, আর ভীতি চায় দূরত্ব। কিন্তু কাসেদ এই উভয় বিরুদ্ধবাদী বিষয় অন্তরে নিয়া বসিয়া রহিল।

গোফতে বা খোদ মান শাহানে রা দিদাম,
পেশে ছুলতানানে মেহর গোজিদাম।
আজ শাহানাম হায়বাত ও তরছে নাবুদ,
হায়বাতে ইঁ মরদে হুশামরা রেদবু।
রফতাম দর বেশায়ে শেরো ও পালংগ,
রুয়ে মান জে ইশানে নাগর দানিদ রংগ।
বছ শোদাস্তাম দর শোছাফে ও কারে জার।
হামচু শের আদম কে বাশদ কারে জার।
বাছে কে খোরদাম বছে জাদাম জখমে গেরা,
দেলে কওবী তর বুদাম আজ দিগারা।
বে ছেলাহ্‌ ইঁ মরদে খোফ্‌তাহ্‌ বর জমীন,
মান ব হাফতে আন্দাম লর জরানে চিস্ত ইঁ!
হায়বাতে হক আস্ত ইঁ আজ খলকে নীস্ত।
হায়বাতে ইঁ মরদে ছাহেবে দেলকে নীস্ত
হরকে তরছীদ আজ হকে ও তাকওয়া গোজীদ,
তরছাদ আজ ওয়ে জেনো এনছো হরকে দীদ।
আন্দার ইঁ ফেকরাত ব হুরমাতে দস্তে বস্ত,
বাদে এক ছায়াত ওমর আজ খাবে জুস্ত।

অর্থ:কাসেদে রোম আশ্চর্যান্বিত হইয়া নিজে নিজে বলিতে লাগিল, আমি অনেক বাদশাহ দেখিয়াছি এবং বহু উচ্চ মর্তবা’র শাহানশাহদের সম্মুখে যাইয়া উচ্চ দরজার সম্মান লাভ করিয়াছি, ইহা সত্বেও আমার অন্তরে বাদশাহদের তরফ হইতে কোনো সময় ভীতির সঞ্চার হয় নাই। কিন্তু এই ব্যক্তির ভয়ে আমার হুঁশ লোপ পাইয়া গিয়াছে। অনেক সময় বড় বড় বাঘ ও চিতা বাঘের বনে যাওয়ার ঘটনা ঘটিয়াছে। কিন্তু কোনো সময় বাঘের ভয়ে চেহারার রং পরিবর্তন হয় নাই। এইভাবে অনেক বড় বড় যুদ্ধে শরিক হইবার সুযোগ ঘটিয়াছে। কিন্তু এমনভাবে বীরত্বের পরিচয় দিয়াছি, যেমন শক্ত বিপদের সময় বাঘ থাকে। ঐ সমস্ত যুদ্ধে অনেক স্থানে জখম হইয়াছি, এবং অনেক জখম করিয়াছি। কিন্তু অন্যদের চাইতে অনেক শক্ত ছিলাম। এই তো আমার অন্তরের অবস্থা। কিন্তু এই ব্যক্তি মাত্র একাকী জমীনে শুইয়া রহিয়াছেন, আর আমার সমস্ত শরীর কাঁপিতেছে। ইহাতে বুঝা যায়, এই ভয় খোদার ভয়, মানুষের ভীতি নয়। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে এবং পরহেজগারী ইখ্‌তিয়ার করে, তাহাকে সমস্ত জ্বিন ও ইনসান এবং যে তাহাকে দেখে, ভয়েতে কম্পিত হইতে থাকে।  কাসেদ এইরূপ চিন্তা সহকারে আদবের সহিত হাত জোড় করিয়া কাছে দাঁড়াইয়া রহিল। এক ঘণ্টা পরে হজরত ওমর (রা:) নিদ্রা হইতে জাগরিত হইলেন।

করদে খেদমত মর ওমর রা ও ছালাম,
গোফতে পয়গম্বর ছালাম আঁগাহ্‌ কালাম।
পাছ আলাইকাশ গোফত ও উরাপেশে খানাদ,
আয়মানাশ করদ ও বাপেশে খোদ নেশানাদ।
হরকে তরছাদ মরুরা আয়মান কুনান্দ,
মরদে দেল তরছান্দাহ্‌ রা ছাকেন কুনান্দ।
লা তাখাফু হাস্তে নুজুলে খায়েফান,
হাস্তে দর খোর আজ বরায়ে খায়েফে আঁ।
আঁকে খওফাশ নিস্তে চুঁ গুই মতরছ,
দরছে চে দীহি নিস্তে উ মোহ্‌তাজে দরছ।

অর্থ: যখন হজরত ওমর (রা:) নিদ্রা হইতে জাগিলেন, কাসেদ সালাম করিল এবং শরিয়াতের বিধান এই যে, আগে সালাম, পরে কালাম। হজরত ওমর (রা:) তাহাকে সালামের উত্তর দিলেন এবং নিকটে ডাকিয়া নির্ভয়ে সম্মুখে বসিতে দিলেন। মাওলানা বলেন, যেভাবে তাঁহাকে ভয় করিয়াছিল, সেই কারণে তাহাকে নির্ভয় করিয়া সান্ত্বনা দিলেন। এই রকম যে ব্যক্তি ভীত হয়, তাহাকে নির্ভয় দিয়া সান্ত্বনা দিতে হয়। ভীত ব্যক্তির মেহমানদারী হইল, ভয় করিও না। ভীত ব্যক্তির জন্য ইহাই উপযোগী ব্যবহার। কেননা, যাহার হইতে ভয় না থাকে, তাহাকে কেমন করিয়া বলা যায় যে ভয় করিও না। ইহা শুধু বেহুদা বলিয়া মনে হইবে। তাহাকে তুমি কী পাঠ দিবে? তাহার তো কোনো পাঠের আবশ্যক করে না; বরং তাহাকে বলিতে পারা যায় যে তুমি আনন্দ করিও না। উদ্দেশ্য এই যে, যদি আখেরাতে নিরাপদ ও শান্তি লাভ করিতে চাও, তবে ইহ-কালে খোদার ভয় অন্তরে রাখ।

আঁ দেল আজ জা রফতাহ্‌ রা দেল শাদে করদ,
খাতেরে বীরানাশরা আবাদ করদ।
বাদে আজ আঁ গোফতাশ ছুখান হায়ে দকীক,
ওয়াজ ছেফাতে পাকে হক নেয়ামার রফিক।
ওয়াজ নাওয়াজে শাহায়ে হকে আবদালেরা,
তা বদানাদ উ মকামো ও হালে রা।

অর্থ: ঐ কাসেদ, যাহার প্রাণ ভয়েতে অশান্ত হইয়া পড়িয়াছিল, হযরত উমর (রা:) তাহাকে সান্ত্বনা দিলেন এবং তাহার অন্তরের বিশৃঙ্খল অবস্থাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া দিলেন। তারপর তাহার সাথে সূক্ষ্ম কথাবার্তা বলিলেন, এবং জাতে পাকের গুণাগুণ বর্ণনা করিলেন। অলিআল্লাহর প্রতি আল্লাহর যে সব দান প্রদত্ত থাকে ইহার সম্বন্ধে প্রকাশ করিলেন, যাহাতে কাসেদের অলিআল্লাহর হালত ও মোকামাত সম্বন্ধে জানা হইয়া যায়। অর্থাৎ, হজরত ওমর (রা:)-এর ফায়েজপ্রাপ্ত হইয়া ঐ কাসেদ অলিয়ে কামেল হইয়া গেল।

হালে চুঁ জালওয়াহ্‌ আস্ত জে আঁ জিবা উরুছ,
ও ইঁ মোকামে আঁ খেলহায়াতে আমদ বা উরুছ।
জালওয়াহ বীনাদ শাহ্‌ ও গায়েরেশাহ্‌ নীজ,
ওয়াক্তে খেলওয়াতে নীস্তে জুয্‌ শাহে আজিজ।
জালওয়াহ্‌ কারদাহ্‌ আমো ও খাছানেরা উরুছ,
খেলওয়াতে আন্দর শাহে বাশদ বা উরুছ।
হাস্তে বেছিয়ারা আহলে হালে আজ ছুফিয়াঁ,
নাদেরাস্ত আহলে মোকাম আন্দর মীয়াঁ।

অর্থ: মাওলানা এখানে মাকাম সম্বন্ধে বলিতেছেন, মাকাম ঐ গুপ্তগুণকে বলে, যাহা রিয়াজাত ও কসদ দ্বারা কামাই করা হয়, যেমন তাওয়াক্কুল, তাওয়াজ্জু ও সবর ইত্যাদি। এবং হালত উহাকে বলে, যে অবস্থা অন্তরে আপনা-আপনি বিনা ইচ্ছায় হাসেল হইয়া যায়। যেমন শওক, বেজদান ও ইসতেগরাক ইত্যাদি। যেমন বলা হয়, মোকামাত অর্জনকৃত অবস্থা ও দান। মোকাম স্থায়ী হালত, আর হালত অস্থায়ী, কিছুক্ষণ পর-ই দূর হইয়া যায়। মাকামাত ক্রিয়া জনসাধারণের কাছে প্রকাশ পায় না, ইহার সম্বন্ধে একমাত্র আল্লাহ্‌ তা’য়ালা-ই জানেন। কিন্তু হালত, ইহার বিপরীত; হালতের অবস্থা লোকের কাছে প্রকাশ পাইয়া যায়।

মাওলানা এই জন্য হালতকে বিবাহ মজলিসের সাজ-সজ্জার সহিত তুলনা করিয়াছেন এবং মাকামের তুলনা দুল্‌হানের খেলওয়াতের সহিত করিয়াছেন। সাজ-সজ্জা খোদ নওশাহ দেখিতে পারে এবং অন্য লোকেও দেখিতে পারে। কিন্তু খেলওয়াতের সময় শুধু নওশাহ্‌ ব্যতীত অন্য কেহ সাথে থাকে না। অতএব, সাজ-সজ্জার প্রকাশ যেমন সকলের জন্য হয়, তেমনিভাবে হালের প্রকাশ সকলের জন্য হইতে পারে। আর খেলওয়াতের মধ্যে যেমন শুধু নওশাহের জন্য মোয়ামেলাত হয়, এই রকমভাবে মাকামের ব্যবহার জনসাধারণ হইতে গুপ্ত থাকে। শুধু আল্লাহতায়ালার সহিতই মাকামের মোয়ামেলাত হইয়া থাকে। সুফীয়ানে কেরামদের মধ্যে অনেকেই হালতের মালিক হন। কিন্তু মাকামের মালিক খুব কম লোকেই হইয়া থাকে। যেমন সাজ-সজ্জার উপভোগকারী অনেকেই হইয়া থাকে। কিন্তু খেলওয়াতের মালিক শুধু এক ব্যক্তি-ই হয় এবং সে নওশাহ।  তাই মাওলানা বলেন, আহালে হালতকে কামেল মনে করিতে হইবে না;  আহালে মাকামকে তালাশ করিতে হইবে।

আজ মানাজেলে হায়ে জানাশ ইয়াদে দাদ,
ওয়াজ ছফরে হায়ে রওয়ানাশ ইয়াদে দাদ।
ওয়াজ জমানে কাজ জমানে খালি বদস্ত,
দর মোকামে কুদুছকা জালালি বদস্ত।
ওয়াজ হাওয়ায়ে কান্দর ওছী মোরগে রূহ,
পেশে আজইঁ দিদাস্ত পরওয়াজ ও ফতুহ্‌।
হর একে পরওয়াজাশ আজ আফাকে বেশ,
ওয়াজ উমেদো ও নোহমাতে মোস্তাফে পেশ।

অর্থ: হজরত ওমর (রা:) ঐ কাসেদের সম্মুখে রূহের মানজেল-সমূহ ও সফরের বৃত্তান্ত বয়ান করিয়া শুনাইলেন এবং যে সময় রূহ সৃষ্টি হয় নাই, সেই সময়ের ঘটনা উল্লেখ করিলেন। আল্লাহর স্বীয় পবিত্র স্থানে অবস্থা বর্ণনা করিয়া বুঝাইয়া দিলেন। মোট কথা রূহের সেফাত ও পাক জাতের সেফাতের রহস্য ও গুণাগুণ বর্ণনা করিয়া বুঝাইয়া দিলেন এবং দেখাইয়া দিলেন যে রূহ্‌ দেহের মধ্যে আসার পূর্বের ছি-মোরগ পাখীর ন্যায় উড়িয়া বেড়াইত। তখন সে স্বাধীন ও পাক ছিল। আসমান জমিনের চাইতেও অধিক আকাঙ্ক্ষা নিয়া উড়িয়া বেড়াইত। এই আশা ও আকাঙ্ক্ষা মহব্বত ও মারেফাতে ইলাহী, ইহা দিন দিন বৃদ্ধি পাইতেছিল।

চু, ওমর আগিয়ারে রূরা ইয়ারে ইয়াফত,
জানে উরা তালেবে আছরারে ইয়াফত।
শায়েখে কামেল বুদ ও তালেব মোস্তাহা,
মরদে চাবুক বুদ ও মারকাবে দরগাহে।
দীদে আঁ মুরশেদ কে উ ইরশাদ দাস্ত,
তোখমে পাক আন্দর জমীন পাকে কাস্ত।

অর্থ: হজরত ওমর (রা:)-কে ঐ অপরিচিত ব্যক্তি বন্ধুরূপে পাইলেন। তাহার প্রাণ প্রকৃত রহস্য অনুসন্ধানকারী হিসাবে পাইলেন। শায়েখে পুর্ণ কামেল ছিলেন, এবং তালেব আকাঙ্ক্ষাকারী ছিল। যেমন আরোহী বিজ্ঞ চাবুকধারী এবং সওয়ারী অতি সুচতুর। তবে সওয়ার হইতে যতটুকু দেরী হয়। মোরশেদে কামেল হজরত ওমর (রা:) দেখিলেন যে এরশাদে হাকিকাত গ্রহণ করার শক্তি তাহার মধ্যে অতি উত্তমভাবে আছে। এই জন্য অতি উত্তম জমিন মনে করিয়া কাসেদের কলবে মারেফাতের শিক্ষা ও মারেফাতের ফায়েজ হাসেল করার জন্য দুইটি বস্তুর আবশ্যক। প্রথমতঃ শায়েখে কামেল হওয়া চাই, দ্বিতীয়তঃ তালেবের অন্তঃকরণে গ্রহণ করার জন্য শক্তির সঞ্চয় হওয়া চাই। এখানে উভয় বস্তু-ই পুরাপুরিভাবে পাওয়া গিয়াছিল বলিয়া উত্তমভাবে ফায়েজ লাভ করিয়াছিল।

আমিরুল মোমেনীন হজরত ওমর (রা:)-এর নিকট কাসেদের প্রশ্ন করা

মরদে গোফতাশ কে আয় আমিরুল মোমেনীন,
জানে জে বালা চুঁ দর আমদ বর জমীন।
মোরগে বে আন্দাজাহ্‌ চুঁ শোদদার কাফাছ,
গোফতে হক বর জানে ফাছুঁ খানাদ ও কেছাছ।
বর আদমে হা কে আঁ নাদারাদ চশমো গোশ,
চুঁ ফাছুঁ খানাদ হামী আইয়াদ বজোশ।
আজ ফেছুঁ উ আদমেহা জুদে জুদ,
খোশ মোয়াল্লাক মী জানাদ ছুয়ে অজুদ।
বাজে বর মাওজুদে আফছুঁনে চু খানাদ,
জুদে উরা দর আদমে দো আছপে রানাদ।

অর্থ: ঐ কাসেদ হজরত ওমর (রা:)-এর নিকট জিজ্ঞাসা করিল, রূহ্‌ আলমে আরওয়াহ হইতে কীঢ রকমে জমিনে আসিল? এবং সীমাহীন বায়ুমণ্ডলে উড়ন্ত পাখী কীভাবে সীমাবদ্ধ দেহের মধ্যে আসিয়া আবদ্ধ হইল? হজরত ওমর (রা:) উত্তরে বলিলেন, আল্লাহতায়ালা রূহকে কেচ্ছা কাহিনী পড়িয়া শুনাইলেন। অর্থাৎ, রূহকে হুকুম করিলেন, তুমি যাইয়া আদমের দেহের মধ্যে আবদ্ধ হইয়া যাও। এই আবদ্ধ হওয়া রূহের ইচ্ছা সূত্রে নয়। ইহা খোদার হুকুমে বাধ্যতামূলকভাবে হইয়াছে। কেননা, রূহের সাথে আর পানি মাটির তৈরী দেহের সাথে রূহের মূলগত কোনো সামঞ্জস্য নাই। ইহা বিরুদ্ধভাবে আবদ্ধ হইয়াছে। না হওয়া বস্তু, অর্থাৎ, অবিদ্যমান বস্তু, যাহার কান ও চক্ষু নাই, যখন আল্লাহতায়ালা তাহাকে বায়ু-মন্ত্র শুনাইয়া দিলেন, তখন উত্তেজিত হইয়া তাড়াতাড়ি নাচিয়া দৌড়াইয়া সন্তুষ্টচিত্তে বিদ্যমান হইয়া যায়। শব্দ “কুন” দ্বারা অবিদ্যমান বস্তু বিদ্যমান হইয়া যায়। পরে ঐ আফসানা যেখানে পড়িবে, হঠাৎ বিদ্যমান বস্তু নাই হইয়া যাইবে। যেমন দুই ঘোড় সওয়ার অতি তাড়াতাড়ি দৌড়াইয়া চলিয়া যায়। এইরূপ অবস্থা সমস্ত বিদ্যমান বস্তুর জন্য একই প্রকারে হইয়া থাকে। কোনো কোনো জায়গায় বিশেষ বিশেষ অবস্থায় বিভিন্ন তাসার্‌রুফাত হইয়া থাকে।

গোফ্‌তে দর্‌ গোশে গোল ও খান্দানাশ্‌ করদ,
গোফতে বা ছংগে ও আকিকে কানাশ করদ।
গোফ্‌তে বা জেছ্‌মে আয়াতে তা জনশোদ উ,
গোফ্‌তে বা খুর্‌শীদ তা রোখ্‌শান শোদ উ।
বাজে দর গোশাশ দামাদ, নকতাহ্‌ মখুফ,
দররুখে খুরশীদ উফ্‌তাদ ছদ কুছুফ।
গোফ্‌তে পানি তাফে শোক্কার গাস্তে উ,
গোফ্‌তে বা আবে ও গওহার গাস্তে উ।
তা ব গোশে আবরে আঁ গুইয়া চে খানাদ,
কো চু মেশকে আজ দীদায়ে খোদ আশক রানাদ।
তা বগোশে খাকে হক চে খান্দাহাস্ত,
কো মোরাকেব গাস্ত ও খামুশ মান্দাহাস্ত।

অর্থ: আল্লাহতায়ালা ফুলের কানে আফসানা পড়িয়া ইহা প্রস্ফুটিত করিয়াছেন। এবং ঐ আফসানা পাথরকে বলিয়া মূন্যবান ধাতুতে পরিণত করিয়াছে। বে-জান দেহকে কিছু বলিয়া জানদার করিয়া দিয়াছেন। সূর্যকে হুকম দিয়া কিরণদাতা করিয়া দিয়াছেন। ঐ কথা দ্বারা বাঁশীর আওয়াজকে মধুপূর্ণ করিয়া দিয়াছেন। পানিকে বলিয়া মুক্তা তৈয়ার করিয়াছেন। মেঘের কর্ণে তিনি কী যেন পড়িয়া ইহাকে মেশ্‌কের ন্যায় অশ্রু বর্ষণকারী করিয়া দিয়াছেন। জমিনের কানে এমন কোনো কথা বলিয়া দিয়াছেন, যাহাতে সে দরবেশের ন্যায় চুপ করিয়া মোরাকেবা করিতেছে।

দর তারাদ্দুদ হরকে উ আশুফ্‌তাস্ত,
হক বগোশে উ মোয়াম্মা গোফ্‌তাস্ত।
তা কুনাদ মাহবুছাশ আন্দর দো গুমান,
আঁ কুনাম কে আঁ গোফ্‌ত ইয়া খোদ জেন্দে আঁ।
হামজে হক্কে তারজীহ ইয়াবদ এক তরফ্‌,
জে আঁ দো এক রা বর গোজীনাদ জে আঁ কানাফ্‌।
গার না খাহী দর তারাদ্দুদ হুশে জান,
কম ফাশার ইঁ পোম্বা আন্দর গোশে জান।
তা কুনী ফাহাম আঁ মোয়াম্মা হাশরা,
তা কুনী ইদরাকে রমজো কাশেরা।
পাছ মহল্লে ওহী গরদাদ গোশে জান,
ওহী চে বুদ গোফতান আদ হেচ্ছে নেহান।
গোশে জানো চশমে জান জুয ইঁ হেচ্ছে আস্ত,
গোশে আকল ও গোশে হেচ্ছে জেইঁ মোফলেছাস্ত।

অর্থ: যে ব্যক্তি কোনো সন্দেহে পড়িয়া যায়, মনে হয় যেন আল্লাহ্‌তায়ালা তাহার কানে কানে সন্দেহপূর্ণ বাক্য বলিয়া দিয়াছেন। অর্থাৎ, ঐ কাজ সম্বন্ধে হওয়া না হওয়া দুই দিক-ই সমান সমান অবস্থা তাহার অন্তরে ঢালিয়া দিয়াছেন। ইহাতে সে সন্দেহের মধ্যে পতিত হইয়াছে। যেমন ফারিস শব্দ “মোয়াম্মা” শ্রবণকারী অনেক সম্ভাবনার মধ্যে পতিত হইয়া পেরেশান হইয়া যায়। ইহার দরুণ ঐ ব্যক্তি দুই বুঝের মধ্যে আবদ্ধ হইয়া যায় যে এই রকম করিব, যেভাবে অমুকে বলিয়াছে, না ইহার বিরুদ্ধ করিব। ইহার পর যদি একদিকের সম্ভাবনা ঠিক হইয়া যায়, তবে ইহাও আল্লাহর তরফের মর্জি বলিয়া ধরিতে হইবে। এখন মাওলানা বলিতেছেন, যদি তোমার অন্তরকে সন্দেহের মধ্যে রাখিতে না চাও, তবে তোমার কানের তুলা, যাহা আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাহা কিছু আছে সব কিছু, তাহা অন্তরে স্থান দিও না। তবে তুমি হকতায়ালার রহস্য বুঝিতে আরম্ভ করিবে। আল্লাহর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব রহস্য সম্বন্ধে অবগত হইতে পারিবে। তোমার অন্তরের কান ওহীর স্থান হইতে লাগিবে। কেননা, ওহীর অর্থ কী? ওহীর অর্থ অন্তরের অনুভূতিশক্তি দ্বারা কালাম হইতে থাকা। বাতেনের চক্ষু ও কান জাহেরী অনুভূতি ছাড়া অন্য রকম। প্রকাশ্য কান ও অনুভূতি বাতেনী কালাম হইতে বহেরা (বধির) থাকে।

লকজে যবরাম ইশকেরা ছবর করদ,
ও আঁকে আশেক নিস্তে হাবছে যবরে করদ।
ইঁ মায়াইয়াত বা হকাস্ত ও যবরে নিস্ত,
দর দুদে ইঁ যবরে-যবরে আম্মা নিস্ত।
যবরে আম্মারা খোদ কামাহ্‌ নিস্ত।

অর্থ: মাওলানা বলেন, মাখলুকের এই বে-ইখতিয়ারী হালতের অবস্থাকে লফজে যবর দ্বারা ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। তিনি বলেন, এই বে-ইখতিয়ারী অবস্থা আমার ইশ্‌কের কাইফিয়াতকে অধৈর্য করিয়া দিয়াছে। এবং ইশ্‌ককে উত্তেজনায় পরিণত করিয়া দিয়াছে। কেননা, যবর দ্বারা অপারগ ও ক্লান্ত হইয়া মাহবুবে হাকিকীর পছন্দনীয় হইবার উপযোগী হইয়াছি। ইহা দ্বারা কাইফিয়াতের ইশ্‌কিয়ার উত্তেজনা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছে। আর যে ব্যক্তি সাহেবে ইশ্‌ক না, অর্থাৎ, যাহার মহব্বতে ইলাহীর ইশ্‌ক নাই, সে যবরের বাহানা ধরিয়া যবর দ্বারা আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে। এবং নিজের টেরা বাঁকা বুঝের দরুণ মনে করিয়াছে যে, যখন সব মাখলুক বে-ইখ্‌তিয়ার আছে, তখন আমিও পাপ কার্যসমূহের মধ্যে বে-ইখতিয়ার ও মযবুর আছি ইহা মনে করিয়া নিজের বিশ্বাস নষ্ট করিয়া ফেলিয়াছে। যে বে-ইখ্‌তিয়ারীর কথা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে (যবরিয়া নয়), ইহা আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ করাইয়া দেয়। এই প্রকারে নিজেকে আল্লাহ্‌র সাহচর্য আনয়ন করা এই বিশ্বাসকে যবর বলা যায় না। আল্লাহর সহিত এইরূপ বিশ্বাস এবং তাহার তাজল্লি প্রকাশ পাওয়া যেমন চন্দ্রের আলো প্রাপ্ত হওয়া; আরবের ন্যায় অন্ধকার নয়। আর যদি ইহাকে যবর বলিয়া ধরা যায়, তবে ইহা সর্বসাধারণের জন্য নয় এবং নফসে আম্মারার খোদ গরজি যবর না। যাহা দ্বারা সাধারণ লোকে এবং নফসে আম্মারা হীলা সাজী করিয়া খোদার বন্দেগী করা ত্যাগ করিয়া দেয়।

যবরেরা ইশা শেনাছানাদ আয় পেছার,
কে খোদা ব কোশাদ শানে দর দেলে নজর।
গায়েবো আয়েন্দাহ্‌ বর ইশা গাস্তে ফাস,
জেকরে মাজী পেশে ইশাঁ গাস্তে লাশ।
ইখতিয়ারো যবরে ইশাঁ দীগারাস্ত,
ফেতরেহা আন্দর ছেদফেহা গওহারাস্ত।
হাস্তে বেরু কেতরায়ে খোরদ ও বোজর্গ,
দর ছেদফে দুররেহায়ে খোরদাস্ত ও ছোতরগ।
তবায় নাফে আহুস্ত আঁ কওমেরা,
আজ বেরুনে খুন ওয়াজ দরুণে শানে মোশফেহা।
তু মগো ফে ইঁ নাফা বেরুঁ খুনে বুদ,
খোদ বুদ দর নাফে মেশকীন চুঁ শওয়াদ।
তু মগো কেইঁ মচ্ছে বুরুঁ বুদ মোহ্‌তাফা,
দরদেলে এবছীরে চুঁ গাস্তাস্ত জর।
ইখতিয়ার ও যবর দর তু বুদ খেয়াল,
চুঁ দর ইশা রফতে শোদ নূরে জালাল।
নানে চুঁ দর ছফরাস্ত আঁ বাশদ জামাদ,
দরতনে মরদাম শওয়াদ উ রূহে শাদ।
দরদেলে ছফরাহ্‌ না গরদাদ মোস্তাহীল,
মোস্তাহীলাশ জানে কুনাদ আজ ছলছবীল।

অর্থ: এখানে মাওলানা যাবরে মাহমুদের বর্ণনা দিতেছেন যে, এই যবর ঐ হাজারাতেরা জানেনা, যাহাদের অন্তর আল্লাহতায়ালা প্রশস্ত করিয়া দিয়াছেন। ঐ নজরে বাতেনের দরুন তাঁহারা অনেক গুপ্ত বস্তু ও ভবিষ্যৎ সস্বন্ধে জানেন এবং ক্ষণস্থায়ী বস্তু তলবের জন্য তাঁহাদের আপ্রাণ চেষ্টা থাকে। দুনিয়া এবং ইহার যাবতীয় বস্তুর কোনো মূল্য তাহাদের নিকট নাই। তাহাদের নিকট যবর ও ইখ্‌তিয়ার অন্য রকমে অর্থ করা হয়। ইহার উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি দৃষ্টান্ত মাওলানা পেশ করিয়াছেন, যেমন বৃষ্টির ফোটা বাহিরে ছোটবড় হয়। কিন্তু ঝিনুকের মধ্যে মুক্তায় পরিণত হয়। দ্বিতীয় উদাহরণ যেমন হরিণের নাভিদেশ কস্তুরীর স্থান, যদিও বাহ্যিক দৃষ্টিতে রক্ত দেখা যায়। নাভির স্থানে থাকিয়া কস্তুরীতে পরিণত হয়। তৃতীয়তঃ তামা বাহ্যিক অবস্থায় কম মূল্যের ধাতু। কিন্তু একছীরের মধ্যে যাইয়া স্বর্ণে পরিণত হয়। প্রকৃতপক্ষে ইহা যখন অস্বীকার করা যায় না, এইভাবে ইখতিয়ার এবং যবরকে বুঝিয়া লও। তোমার তো শুধু একটা খেয়াল, চাই শুদ্ধ হউক আর বাতেল হউক। কিন্তু তোমার ভিতরে স্বাদ গ্রহণের কোনো শক্তি নাই। যখন যবর ও ইখতিয়ার আরেফীনদের নিকট উপস্থিত হয়, তখন তাহাদের নিকট ইহা আল্লাহ্‌র নূর বলিয়া গ্রহণ করিয়া লয়। রূহের স্বাদের উপযোগী বলিয়া পছন্দ করে। উদাহরণ যেমন, রুটি দস্তরখানের উপর শুধু বস্তু হিসাবে থাকে। উহার মধ্যে কোনো জীবনীশক্তি থাকে না। মানুষের পেটে যাইয়া প্রাণ তাজা হওয়ার শক্তি বৃদ্ধি করে। রুটি হজম হইয়া উত্তম তাপ সৃষ্টি করে এবং মানুষের জীবনীশক্তির সাহায্য করে। দস্তরখানের উপর থাকা অবস্থায় তাহার অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় নাই। দেহের মধ্যে যে জীবনীশক্তি আছে, সেই শক্তির সাহায্যে ইহাকে পরিবর্তিত করিয়া জীবনীশক্তির সাহায্যকারী বানাইয়া লইয়াছে।

কুয়াতে জানাস্ত ইঁ রাস্তে খান,
তা চে বাশদ কুয়াতে আঁ জানে জান।
না নাস্ত কুয়াতে তন ওয়া লেকীন দর নেগার
তাকে কুয়াতে জান চে বাশদ আয় পেছার।
গোশতে পারাহ্‌ আদমী আজ জোরে জান
মী শেগাকাদ কোহেরা বিল বহরে ও কান।
জোরে জানে কোহে কুন শেক্কেল হাজার
জোরে জানে জানদর ইশাক্কাল কামার।
গার কোশাইয়াদ দেল ছারে আবনানে রাজ,
জান বছুয়ে আরশে ছাজাদ তুর কাত্তাজ।
দরজবানে গুইয়াজে আছরারে নেহাঁ,
আতেশে আফরুজাদ ব ছুজাদ ইঁ জাহাঁ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, রুটি হজম হইয়া জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করিয়া দেয়। কিন্তু জীবনীশক্তির মূল মগজ হইল রূহ । ইহার শক্তি বাড়াইবার কী তদবীর করা হয়? এইজন্য সাধারণ লোকের বিদ্যা ও জ্ঞান যখন আরেফীনদের হাতে যায়, তখন ঐ বিদ্যা ও আমল রূহের শক্তি বর্ধক হইয়া যায়। এইজন্য আরেফীনদের যবর ও ইখতিয়ার অন্য রকম বলা হইয়াছে। দেহ, ইহার খাদ্য রুটি বা অন্যান্য খাবার বস্তু। কিন্তু রূহের খাদ্য কী হইবে? ইহা বিদ্যা এবং মারেফাত। যখন উভয়ের খাদ্যে পার্থক্য আছে, আর খাদ্য দ্বারা শক্তি হয়, রূহ হায়ওয়ানীর প্রাণী নিজেই যোগাড় করিতে পারে। রূহ্‌ ইন্‌সানীর খাদ্য এলেম ও আমল, ইহা কামেল হইতে নাফেস শিক্ষা প্রাপ্ত হয়। মানবদেহ, যাহা কিছু গোস্তের সমষ্টি। রূহে হায়ওয়ানীর শক্তি দ্বারা পাহাড়, সাগর ও খনিজকে ফাঁড়িয়া চিড়িয়া খণ্ড বিখণ্ড করিয়া ফেলিতে পারে। যেমন শিরি ফরহাদের ঘটনা এবং শিল্পীরা ইহাদের মধ্যে কাজ করিয়া পাহাড় হইতে নহর বাহির করে। রাস্তা তৈয়ার করে। সাগর হইতে মুক্তা সঞ্চয় করিয়া লয়। খনি হইতে সোনা-রূপা বাহির করিয়া লয়। ইহা শুধু জীবিকা নির্বাহের জন্য এবং কুয়াতে হায়ওয়ানী বাড়াইবার জন্য করা হয়। কর্মকারের নেহাইর রূহানী শক্তি দেখ, পাথরকে টুকরা টুকরা করিয়া ফেলে। আর ইনসানে কামেলের রূহানী শক্তির প্রতি লক্ষ্য কর, চাঁদকে দ্বিখণ্ডে পরিণত করিয়া ফেলিয়াছে। ইহা নবী করিম (দ:)-এর মোজেজা। মোজেজার উদ্দেশ্য হইল, মানবের হেদায়েত, ইহার ক্রিয়ায় আমালের, এলেম-সমূহের পরিপূর্ণতা লাভ করা যায়। অতএব, মানব রূহের কার্য ও  ক্রিয়াকলাপ এলেম ও আমলের মধ্যে হইয়া থাকে মর্মে প্রমাণ পাওয়া গেল। যখন অন্যের এলেম ও আমলের মধ্যে এরূপ প্রক্রিয়া দেখা যায়, তখন নিজের এলেম ও আমলের মধ্যে অধিক পরিমাণে ইহার ক্রিয়া দেখা দিবে। এইজন্য মাওলানা বলিতেছেন যে মানব রূহের প্রক্রিয়া বর্ণনা উপযোগী নয়, বরং ইহা বাস্তব প্রমাণ। অতএব, যদি কাহারও কলবের মধ্যস্থিত রহস্যের দ্বার খুলিয়া দেওয়া হয়, তবে রূহ আরশে মোয়াল্লার দিকে ধাবিত হইতে থাকে এবং মুখের জবান দ্বারা যদি ইহা বর্ণনা করিতে থাকে, তবে গোমরাহীর আগুণে তৎক্ষণাৎ বিশ্ব জ্বালাইয়া পোড়াইয়া ফেলিবে। হজরত আদম (আ:) নিজের অপরাধকে নিজের দিকে নির্দেশ করিয়াছেন। যেমন রাব্বানা জালামনা, এবং ইবলিস নিজের গুণাহকে আল্লাহর দিকে সম্বন্ধ করিয়াছে; যেমন রাব্বি বেমা আগওয়াইতানি।

কেরদে হক ও কেরদে হরদো বা বীঁ;
কেরদে মারা হাস্তে দাঁ পয়দাস্ত ইঁ।
গর না বাশদ ফেলে খলকে আন্দর মীয়াঁ,
পাছ মগো কাছরা চেরা করদী চুনাঁ।
খলকে হক আফয়ালে মারা মাওজুদাস্ত,
ফেলে মা আছারে খলকে ইজা দাস্ত।
লেকে হাস্তে আঁ ফেলে মা মোখতারে মা,
জু জাযা গাহ্‌ নূরে মা গাহে নারে মা।

অর্থ: মাওলানা বলেন, খোদার কাজ ও আমাদের কাজ উভয়কেই দেখ, এবং আমাদের কাজ তো প্রকাশ্যেই দেখা যায়। যদি আমাদের কাজ প্রকাশ্যে দেখা না যাইত, তবে কাহাকেও এ রকম বলিত না, তুমি এ কাজ এরূপ কেন করিয়াছ? আল্লাহর কাজ, আমাদের কাজের শক্তিদাতা; এবং আমাদের কাজ, আমাদের কৃত হওয়ার দ্বারা কামাই করা কাজ। কাজ করার শক্তি আল্লাহর সৃষ্টি, কিন্তু ইহা করা বা না করা আমাদের ইচ্ছাধীন শক্তি। এই জন্যই ইহার প্রতিদান আমরা পাইয়া থাকি। কোনো সময় শান্তি পাওয়া যায়, আর কোনো সময় অগ্নির ন্যায় অশান্তি পাওয়া যায়।

নাতেকে ইয়া হরফে বীনাদ ইয়া গরজ,
কায়ে শাওয়াদ একদম মোহিতে দো গরজ।
গার মায়ানী রফত শোদ গাফেল জে হরফ,
পেশ ও পাছ একদম না বীনাদ হীচে তরফ।
আঁ জমানে কে পেশে বীনি আঁ জমান,
তু পাছে খোদ কে বা বীনি ইঁ বদাঁ।
চুঁ মোহিতে হর কো মায়ানী নিস্তে জান,
চুঁ বওয়াদ জানে খালেকে ইঁ হর দাওয়ান।ৎ
হক্কে মোহিত জুমলাহ আমদ আয় পেছার,
ও আন্দারাদ কারাশ আজ কারে দিগার।
গোফতে ইজদে জানে মারা মস্ত করদ,
চুঁ নাদানাদ আঁ কেরা খোদ হাস্তে করদ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, বাক্য উচ্চারণকারী যখন বাক্য বলে, হয়ত শুধু অক্ষর বা বাক্যের দিকে লক্ষ্য রাখে, অথবা অর্থের দিকে লক্ষ্য রাখে। কেননা, মন একই মুহূর্তে দুই দিকে লক্ষ্য রাখিতে পারে না। এইজন্য যখন তাহার শব্দের দিকে মনোনিবেশ থাকে, তখন অর্থের দিকে লক্ষ্য রাখিতে পারে না, এক মুহূর্তে দুই উদ্দেশ্য হাসেল করিতে পারে না। যদি অর্থের দিকে লক্ষ্য রাখে, তবে শব্দের দিক হইতে বে-খেয়াল হইয়া যায়। যেমন, একই সময় সম্মুখে এবং পিছনে দেখিতে পারে না। যখন মানব রূহ্‌ একই সময় শব্দ ও অর্থ অনুধাবন করিতে পারে না, তখন এই দুইয়ের সৃষ্টিকর্তা সে কেমন করিয়া হইবে। বিষয় সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞাত না হইয়া, ইহা বিদ্যমান করা সম্ভব না। সৃষ্টি করা ব্যাপক জ্ঞানের উপর নির্ভর করে। আর মানব রূহের ব্যাপক জ্ঞান নাই, উপরে প্রমাণ করা হইয়াছে। অতএব, বান্দা সৃষ্টিকর্তা হইতে পারে না। বরং আল্লাহতায়ালা ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী। তিনি এক কাজ করিবার সময় অন্য কাজ হইতে বে-খেয়াল হন না। সর্ব বিষয়ের জ্ঞান একই সময় তাঁহার মধ্যে বিদ্যমান থাকে এবং আছে। অতএব, সৃষ্টিকর্তা তিনি-ই হইবেন। তিনি যখন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে “কুন” শব্দ ব্যবহার করেন, তখন ঐ কুন শব্দেই আমাদিগকে পাগল করিয়া দিয়াছে। আমরা অনিচ্ছা সূত্রেই বিদ্যমান হইয়া গিয়াছি। তিনি যাহাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহার এই বিষয়ে জ্ঞান নাই।

গোফতে শয়তান কে বেমা আগ ওয়াইতানি,
করদে ফেলে খোদ নেহাঁ দেও দানী।
গোফতে আদম কে জালামনা নফছানা,
উ জে ফেলে হকে নাবুদ গাফেলে চু মা।
দরগুণাহ্‌ উ আজ আদাবে শেনহা নাশ করদ,
জে আঁ গুণাহ্‌ বর খোদ জাদান উ বর ব খোরাদ।
বাদে তওবা গোফতাশ আয় আদম না মান,
আফরিদাম দর তু ইঁ জুরমো মেহান।
নায়েকে তাকদীরো কাজায়ে মান বুদ আঁ,
চুঁ ব ওয়াক্তে ওজরে করদী আঁ নেহান।
গোফতে তরছীদাম আদবে না গোজাস্তাম,
গোফতে মান হাম পাছে আস্তা দাস্তাম।
হরকে আরাদ হুরমাতে উ হুরমাত বুরাদ,
হরকে আরাদ কান্দে নওজীনা খোরাদ।
তাইয়েবাতু আজ বহরে কে লিত্‌ তাইয়েবীন,
ইয়ারেরা খোশ কুন মর নাজানো বা বীনঁ।

অর্থ: ইবলিস শয়তান ’বেমা আগওয়াইতানী’ বলিয়া নিজের গোমরাহীকে আল্লাহর দিকে ফিরাইয়া দিল। এবং নিজের গোমরাহী কামাই গুপ্ত করিল। হজরত আদম (আ:) ’জালামনা আনফুসানা’ বলিয়া জুলুমকে নিজের নফসের দিকে ফিরাইয়া লইলেন। এ কথা নয় যে, আল্লাহতায়ালা ঐ ’জুলুম’ সম্বন্ধে কিছু জানেন না। যেমন, আমরা অনেক সময় গাফেল থাকি। আল্লাহ্‌ গাফেল ছিলেন না। কিন্তু আদম (আ:) ’গুণাহ্‌’ সম্বন্ধে আল্লাহর নিকট আদব রক্ষা করিয়াছেন, আল্লাহর সৃষ্টির ব্যাপার গুপ্ত রাখিয়াছেন। ‘গুণাহ্‌’ করাটা নিজের তরফ প্রকাশ করিয়াছেন বলিয়া ’গুণাহ্‌’ হইতে ক্ষমাপ্রাপ্ত হইয়াছেন। তাঁহাকে আরো সম্মানিত করা হইয়াছে। তওবা কবুল হওয়ায় আল্লাহতায়ালা হজরত আদম (আ:)-কে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে আদম! আমি কি এই ’গুণাহ্‌’ এবং ইহার মধ্যে পতিত হওয়ার সৃষ্টিকর্তা নহি? ইহা কি আমার হুকুমে হয় নাই? তবু তুমি ওজর খাহী করার সময় ইহা প্রকাশ কর নাই কেন? হজরত আদম (আ:) আরজ করিলেন, আমি সবই জ্ঞাত আছি। কিন্তু বেয়াদবীর ভয়েতে আমি আদব ত্যাগ করি নাই। আল্লাহর তরফ হইতে ইরশাদ হইল, দেখ, তোমার ঐ আদবের মরতবা কী রকম রক্ষা করিয়াছি! মাওলানা বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর দরবারের ইজ্জত রক্ষা করে, আল্লাহ তাহার ইজ্জত রক্ষা করেন এবং তাহাকে প্রিয় করিয়া নেন। যেমন আল্লাহ বলিয়াছেন, উত্তম লোকের জন্য উত্তম ব্যবস্থা। অতএব, আল্লাহ্‌কে খুশী রাখিলে, তাহাকে আল্লাহ খুশী করিবেন।

উদাহরণ

এক মেছাল আয় দেল পে ফরকে বইয়ার,
তা বদানী যবরে রা আজ ইখতিয়ার।
দস্তে কো লরজানে বুয়াদ আজ ইরতেয়াশ,
ও আঁ কে দস্তে রা তু লরজানিজে জাশ।
হরদো জাম্বাশ আফরিদাহ্‌ হক শে নাছ,
লেকে না তাওয়াঁ করদ ইঁ বা আঁ কেয়াছ।
জে আঁ পেশে মানে কে লরজানিদেশ,
চুঁ পেশে মানে নিস্তে মরদে মোরতায়াশ।
মোরতায়াশ রা কে পেশেমানে দীদাহ্‌,
হর চুনিঁ যবরে চে বর চছ পীদাহ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, হে দেল, যবর ও ইখতিয়ারের মধ্যে পার্থক্য দেখানোর জন্য একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া উচিত। তবেই একে অন্য থেকে পার্থক্য করা যাইবে। দৃষ্টান্ত এই যে, একখানা হাত, ধরিয়া লওয়া হউক, রায়াশা রোগে সর্বদা কাঁপিতেছে। অন্য হাতখানা, ধরিয়া লও, যেন তুমি নিজে নাড়াইতেছ, তবে উভয় হাত-ই নড়িতেছে। ইহাও খোদার হুকুমে হইতেছে, তথাপি সবদিক দিয়া একই রকম কম্প হইবে না। এক খানার কম্পের অবস্থা দেখিয়া অন্য খানার অবস্থা বুঝা যায়। উভয় হস্তদ্বয়ের কম্পনের মধ্যে পার্থক্য প্রকাশ্যে অনুমান করা যায়, ‍রায়াশার কম্পন গায়েরে ইখতিয়ারী। অর্থাৎ, অনিচ্ছাসূত্রে, আর অন্য খানার কম্পন ইচ্ছাসূত্রে হইয়া থাকে। এই ইচ্ছাসূত্রে নাড়াচাড়ার মধ্যে কোনো সময় ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়, আর অনিচ্ছাসূত্রে কম্পনের মধ্যে ত্রুটি পরিলক্ষিত হয় না। এই ত্রুটি নিজের দরুণ হয়, ইহা প্রত্যেকেই অনুমান করিতে পারে। অতএব, যবর আর ইখতিয়রীর পার্থক্য প্রকাশ্যেই বুঝা গেল। তথাপি মানুষ কেন যবর (যবরিয়্যা) মোজহাবের মত পোষণ করে?

বহছে আকলাস্ত ইঁচে আকল আঁ হীল গর,
তা জয়ীফে রাহ বুরাদ আঁ জা মাগার।
বহছে আকলি গার দূর ও মরজান বুদ,
আঁ দিগার বাশদ কে বহছে জানে বুদ।
বাহছে জানে আন্দর মাকামে দীগারাস্ত,
বাদায়ে জানেরা কেওয়ামে দীগারাস্ত।
আঁ জমানে কে বহছে আকলি ছাজ বুদ,
ইঁ ওমর বাবুল হুকমে হামরাজ বুদ।
চুঁ ওমর আজ আকলে আমদ ছুয়েজান,
বুল হুকমে বু জাহাল শোদ দরবহছে আঁ।
ছুয়ে হেচ্ছে ও ছুয়ে আকলে উ কামেলাস্ত,
গারচে খোদ নেছাবাতে বজানউ জাহেলাস্ত।
বহছে আকলোও হেচ্ছে আছর দাঁ ইয়া ছবাব,
বহছে জানি ইয়া আজব ইয়া বুল আজব।
জুয়ে জান আমদ নামানাদ আয় মোস্তাজা,
লাজেম ও মালজুম ওনাফী মোকতাজা।
জে আঁকে বীনাই কে নূরাশ বাজেগাস্ত,
আজ আছা ও আজ আছা কাশ ফারেগাস্ত।

অর্থ: মাওলানা বলেন, উপরে প্রমাণ করা হইয়াছে; ইহা শুধু আকলি দলিল দিয়া প্রমাণ করা হইয়াছে। এবং আকল শুধু হীলা ছাড়া আর কিছুই নয়। ইহা শুধু দাবী প্রমাণ করার জন্য ও বিরুদ্ধবাদীকে চুপ করানোর জন্য একপ্রকার তদবীর বাহির করা হয়। যদি এই তদবীর সত্য প্রমাণের জন্য করা হয়, তবে ইহা উত্তম। ইহা শুধু ঐ ব্যক্তির জন্য উপকারী, যাহার নফলি বিদ্যার কমি (ঘাটতি) থাকে। তবে ইহা দ্বারা কিছু উপকার লাভ করিতে পারে। যুক্তি তর্ক যদিও মুক্তার ন্যায় সৌন্দর্য ও আনন্দদায়ক, কিন্তু রূহানী বিদ্যা অন্য রকম। যুক্তি তর্ক দ্বারা শরিয়াতের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ হইলে, ইহা নিশ্চয় বাতেল মনে করিবে। রূহানী এলেমের তর্ক অন্য রকমের মরতবা রাখে। কেননা, রূহানী শরাব অন্য রকম শক্তি ও ধাতব প্রস্তুত করে। ইহা হইল আল্লাহর মহব্বত ও মারেফত বৃদ্ধি করে। ইহার কারণে ইলমে রূহানী হাসেল হয়। যে সময় যুক্তি তর্কের বিধান ছিল, ঐ সময় হুজুর (দ:)-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ছিল। সে সময় হজরত ওমর (রা:) আবু জাহেলের সাথী ছিলেন। যখন হজরত ওমর (রা:) এলেমে আকল হইতে এলমে রূহানীর মধ্যে আসিয়া পৌঁছিলেন, অর্থাৎ, মুসলমান হইলেন এবং এলমে রূহানী প্রকাশ পাইল, তখন আবু জাহেল জ্ঞানের বিদ্যা হজরত ওমরের (রা:) সমকক্ষ হইতে পারিল না। আবু জাহেল যদিও স্পর্শ ও জ্ঞানের বিদ্যার পারদর্শি ছিল, তথাপি হজরত ওমরের (রা:) রূহানী বিদ্যার সাথে জয়লাভ করিতে পারে নাই। সে বিষয়ে আবু জাহেল সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। স্পর্শ ও জ্ঞানের বিদ্যা দ্বারা শুধু বস্তুর কারণসমূহ অথবা বস্তু সম্বন্ধে জানা যায়; আর এলমে রূহানী দ্বারা বস্তুর মূল বিষয় উদঘাটন করা যায়। বিনা অসীলায় এলহাম দ্বারা বস্তুর মূল বিষয় অবগত হওয়া যায়। এই জন্য মাওলানা ইহাকে আশ্চর্যের চাইতেও আশ্চর্য বলিয়াছেন। যখন এলহাম দ্বারা রূহ আলোকিত হইয়া যায়, তখন বাহ্যিক কোনো অসীলার দরকার হয় না, বস্তু নিজে নিজেই রূহানী আলোর মধ্যে প্রকাশ পাইয়া যায় এবং অনুধাবনকারী খোদ বখোদ জানিয়া লইতে পারেন। তখন আর লাঠি আবশ্যক হয় না।

আল্লাহর কালাম (বাণী)-এর ব্যাখ্যা

বাংলা উচ্চারণ:

’ওয়া হুয়া মায়াকুম আইনা মা কুন্তুম’- এর ব্যাখ্যা:

বারে দীগার মা ব কেচ্চা আমদেম,
মা আজ আ বুরদানে খোদ কায়ে শোদাম।
গার ব জাহাল আইয়েম আঁ জেন্দানে উস্ত,
দর ব এলমে আইয়েম আঁ আইউয়ানে উস্ত।
গার ব খাবে আইয়েম মোস্তানু ওয়েম,
দর বা বেদারী বদস্তানে ওয়ায়েম।
ওয়ার বগরেম আবর পুর জেরকে ওয়ায়েম,
ওয়ার ব খান্দেম আঁ জমানে বরকে ওয়য়েম।
ওয়াব ব খশাম ও জংগে আকছে কাহরে উস্ত,
দর ব ছোলেহ ও ওজরে আকছে মহ্‌রে উস্ত।
মাকে আয়েম আন্দর জাহাঁ পিছে পেচ,
চু আলিফে উ খোদ চে দারাদ হীচে হীচ।
চুঁ উলফে গার তু মোজাররাদ মী শবী,
আন্দর ইঁ রাহ্‌ মরদে মোফরাদ মী শবী।
জেহেদ কুন তা তরফে গায়েরে হক কুনী,
দেল আজ ইঁ দুনিয়ায়ে ফানী বর কুনী।
ইঁ ছুখান রা নিস্তে পায়ানে আয় পেছার,
আজ রছুলে রুমেবর গো বা ওমর।

অর্থ: মাওলানা বলেন, পুনঃ আমি আমার কেচ্ছার দিকে যাইতেছি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমি আমার বিষয়বস্তু হইতে কোনো সময় বাহির হইয়া যাই না। আমার দাবী প্রমাণ করিতে যাইয়া প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়া থাকি। এখন খোদার সাহচর্যের বর্ণনা শেষ করিতে যাইয়া (মওলানা) বলিতেছেন যে, আমি যদি অজ্ঞতার অন্ধকারে আবদ্ধ থাকি, তবে ইহাও খোদার ইচ্ছা যে অজ্ঞতার কয়েদখানা হইতে বাহির হইতে পারি নাই। আর যদি আমি জ্ঞান হাসেলের মধ্যে পৌঁছিয়া যাইতে পারি, তবে ইহাও তাঁহার দান বলিয়া মনে করিতে হইবে। যদি আমি নিদ্রায় শুইয়া থাকি, তবে তাঁহার-ই বেহুশ করায় শুইয়া থাকি। আর যদি নিদ্রা হইতে জাগিয়া উঠি, তবে ইহাও তাঁহার কথায় হইয়া থাকে। আমি যদি কাঁদিতে আরম্ভ করি, তবে ইহাও তাঁহার অশ্রুপূর্ণ মেঘ মনে করিতে হইবে। যদি হাসি, তবে তাঁহার-ই বিজলী ধরিয়া নিতে হইবে। আর আমি যদি যুদ্ধ বিগ্রহে লাগিয়া যাই, তবে মনে করিতে হইবে তাঁহারই গজবের প্রতিচ্ছবি পতিত হইয়াছে। আমি যদি সন্ধি এবং ওজরের মধ্যে থাকি, তবে ইহা তাঁহার অনুগ্রহের দান জানিতে হইবে। যাহার দরুণ এই সোলেহ্‌ (সন্ধি) হইতেছে। মোট কথা, আমি এই পৃথিবীতে আলিফ্‌ অক্ষরের ন্যায় সোজা ও খালি আছি, ইহার নোকতা বা কোনো হরকত নাই, মাখরাজ খালি স্থান বায়ু। কোনো সাকীনের নিকট আসিলেই হজফ হইয়া যায়। এমনি নিস্তি নয়। এইভাবে আমরাও এক প্রকার দুর্বলতা সহকারে বিদ্যমান আছি। কোনো দিক দিয়াই পূর্ণ সবলভাবে বিদ্যমান না। এইভাবে আমাদের সাহচর্য প্রমাণ হয়। এই জন্য মাওলানা এলমে মারেফাত হাসেল করার জন্য উৎসাহ দিয়া বলিতেছেন, তুমি যদি আলিফের ন্যায় খালি হইয়া যাও, তবে মারেফাতের মধ্যে কামালাত হাসেল করিয়া উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হইয়া যাও। পরে মাওলানা মারেফাত হাসেল করার পদ্ধতি বাতলাইয়া দিতেছেন যে, আল্লাহ ব্যতীত সকল বাদ দিয়া এলমে মারেফাত হাসেল করার জন্য কষ্ট কর। গায়রে হক ত্যাগ কর, ধ্বংসশীল দুনিয়ার মহব্বত অন্তর হইতে মুছিয়া ফেল। রোমের কাসেদের ঘটনার প্রতি মনোনিবেশ কর। ঐ কেচ্ছার মর্মের কোনো শেষ নাই।

হজরত ওমর (রা:)-এর নিকট রোমের কাসেদের প্রশ্ন, এই পানি ও মাটির দেহে কী রূপে পবিত্র রূহ্‌ আসিয়া আবদ্ধ হইল?

আজ ওমর চুঁ আঁ রছুল ইঁরা শানিদ,
রুশ নিয়ে দর দেলাশ আমদ পেদীদ।
মহো শোদ পেশাশ ছুয়াল ওহাম জওয়াব,
গাস্তে ফারেগ আজ খাতা ও আজ ছওয়াব।
আছলেরা দর ইয়াফতে ব গোজাস্ত আজ ফরু,
বহরে হেকমাত করদ দর পোরছাশ রুজু।
বা ওমর গোফতে উচে হেকমাত বুদ ও ছের,
হাবছে আঁ ছাফী দর ইঁ জায়ে কেদার।
আবে ছাফী দর গেলে পেনহা শোদাহ্‌,
জানে বাকী বস্তাহ্‌ আবদানে শোদাহ্‌।
ফায়েদাহ্‌ ফরমাকে ইঁ হেকমাত চেবুদ,
মোরগে রা আন্দর কাফাছ করদান চে ছুদ।

অর্থ: হজরত ওমর (রা:)-এর নিকট রোমের কাসেদ শুনিল যে “কুন” হুকুম দ্বারা রূহ দেহের মধ্যে আবদ্ধ হইয়াছে; ইহা শুনিয়া তাহার কলবে এলমে হাকিকাতের নুর পয়দা হইল, যদ্বারা রূহ দেহের মধ্যে আবদ্ধ হইবার কারণ সম্বন্ধে প্রশ্নের উত্তর নিজে নিজে বুঝিতে সক্ষম হইল এবং সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সমাধা হইয়া গেল। ঐ সমস্ত বাতেল ও সহি খেয়াল সমূহের বিশেষ আলোচনা হইতে ফারেগ হইয়া নিশ্চিন্ত হইল। কেননা, মূল কারণসমূহ অনুধাবন করিতে পারিয়াছিল। কারণ সমূহের শাখা-প্রশাখার সম্বন্ধে প্রশ্ন করার কোনো আবশ্যকতা রহিল না। এখন সে রূহ দেহের সাথে সম্বন্ধ স্থাপনের হেকমাত সম্বন্ধে প্রশ্ন করায় মনোনিবেশ করিল, এবং হজরত ওমর (রা:)-এর নিকট প্রার্থনা করিল যে, ইহার মধ্যে কী রহস্য নিহিত ছিল? পবিত্র রূহ্‌কে অপরিষ্কার দেহের মধ্যে আবদ্ধ করিয়াছেন, যেমন স্বচ্ছ পানি অস্বচ্ছ পানিতে পরিণত হইয়া গিয়াছে। অর্থাৎ, স্থায়ী রূহ অস্থায়ী দেহের মধ্যে আবদ্ধ হওয়ার উপকারিতা সম্বন্ধে হজরত ওমর (রা:) এরশাদ করিলেন।

গোফতে তু বহছে শেগরাফী মী কুনী,
মায়ানীরা বন্দে হরফে মী কুনী।
হাবছে করদী মায়ানী আজাদেরা,
বন্দে হরফে করদায় তু বাদেরা।
আজ বরায়ে ফায়েদায়ে ইঁ করদাহ্‌,
তু কে খোদ আজ ফায়েদায়েদর পরদাহ।
আঁকে আজ ওয়ায়ে ফায়েদাহ্‌ জায়েদাহ্‌ শোদ,
চুঁনা বীনাদ আঁচে মারা দীদাহ শোদ।
ছদ হাজারানে ফায়েদাহাস্ত ওহর-একে,
ছদ হাজারানে পেশে আঁ এক আন্দকে।

অর্থ: হজরত ওমর (রা:) উত্তর করিলেন, তুমি অতি বড় কঠিন কথার ভাব বুঝিতে চেষ্টা করিতেছ। অতি সূক্ষ্ম রহস্য শব্দে ও বাক্যের মাধ্যমে বুঝিতে চেষ্টা করিতেছ। তুমি অফুরন্ত ও অবর্ণনীয় ভাবকে সীমাবদ্ধ করিয়া বুঝিবার জন্য উৎসাহী হইয়াছ, যেমন তুমি বায়ুকে অক্ষর ও শব্দের মধ্যে লইবার চেষ্টা করিতেছ। তুমি যে রহস্য অনুধাবনের চেষ্টা করিতেছ উহা অসীম, উহার কোনো শেষ নাই। শব্দ ও বাক্য সীমাবদ্ধ ও শেষ হইয়া যায় এইজন্য ভাষায় প্রকাশ করা যথেষ্ট নয় এবং তাহা সম্ভবও নহে। অতএব, তোমার অন্তর পবিত্র করার চেষ্টা কর, তবে যে পরিমাণ সাফাই হাসেল করিতে পারিবে, তত পরিমাণ উপকারিতা বুঝিতে পারিবে। তুমি যেহেতু মোমকেনুল অজুদ, তোমার জ্ঞান সীমাবদ্ধ; সীমাবদ্ধ জ্ঞান দ্বারা অসীমকে পুরোপুরি বুঝিতে পারা যায় না। জাতে পাক যে সমস্ত উপকারের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন, এবং যাহা আমাদের বোধগম্য হইতেছে, তুমি কি ইহা অনুধাবন করিতে পারিতেছ না? অসংখ্য উপকারের জন্য পয়দা করিয়াছেন, ইহার তুলনায় আমাদের বুঝ নগণ্য, তাই বাক্যে প্রকাশ করার মত কিছুই নাই।

আঁ দমে নোতকাত কে জুয ও জুযবে হাস্ত,
কায়েদাহ শোদ কুল কুল খালি চেরাস্ত।
আঁ দমে নোতকে কে জানে জানে হাস্ত,
চুঁ বুয়াদ খালি জে মায়ানী গোয়ে রাস্ত।
তু কে জুয বে কারে তু বা ফায়েদা হাস্ত,
পাছ চেরা দর তায়ানে কুল আরি তু দস্ত।
গোফতে রা গার ফায়েদাহ নাবুদ মগো,
ওয়ার বুয়াদ হাল ইতেরাজ ও শোকরে জু।
শোকরে ইজদানে তাওফে হর গরদানে বুদ,
নায়ে জেদাল ওয়ার ও তরশ করদান বুদ।
গার তরাশ রো বুদান আমদ শোকরেব বছ,
পাছ চুঁ ছেরকা শোকরে গুই নিস্তে কাছ।
ছেরকা রা গার রাহে ইয়াবাদ দর জেগার,
গো বরু ছার কাংগে বীন শোও আজ শোকার।
মায়ানী আন্দরে শেয়র জুয বা খবতে নীস্ত,
চুঁ ফালা ছংগাস্ত ও আন্দর জবতে নীস্ত।

অর্থ: তোমার কথা যদিও কালামের কাদিমের তুলনায় নগণ্য, তথাপি কিছু অর্থ আছে। রূহ্‌ সমূহের মালিকের কথার মূল্য এবং মায়ানী অনেক পরিমাণে বেশী। এখন তোমার প্রশ্ন দ্বারা যদি প্রকৃত রহস্য জানার মকসূদ থাকে, তবে আল্লাহর এবাদাত করিতে থাক। আল্লাহর শোকর আদায় করিলে, রূহের সাফায়ী অধিক পরিমাণে হাসেল হইবে। শোকর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য এমনভাবে করা দরকার; যেমন গলায় বেড়ি দেওয়া থাকে। তর্ক, বহস ও লড়াই করিলে কোনো ফায়দা নাই। যদি কোনো তর্ক বহসের কথা আসিয়া পড়ে, তখন শোকর কর এবং বহস কর। বাড়াবাড়ি করিও না, যদি মন ক্ষুণ্ন হওয়াকে শোকর ধরিয়া লওয়া হয়, তবে ছেবকার ন্যায় আর কোনো শোকর হইতে পারে না। সাধারণ লোকে তর্ক বহস করে, ইহা যদি অন্তরে বিশ্বাস করিতে চাও, তবে তাহাদিগকে বল, তাহারা সাহেবে রেজা ও তাসলীমদের সাথে মিশিয়া যায় এবং তাহাদের শিক্ষা ও আমল গ্রহণ করে। রহস্য বুঝিবার ন্যায় শক্তি তৈয়ার করে। উল্লেখিত বিষয় বহুত বিস্তারিত, বয়াতের মধ্যে প্রকাশ করা সম্ভব না। যেমন খুব ভারী পাথর নিক্ষেপ করার শক্তি নাই। কোথায় নিক্ষেপ করিব আর কোথায় পড়িবে জানা নাই। তাই ইহার বর্ণনা শেষ করিলাম।

যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে বসিতে চায়, সে যেন আহলে তাসাওয়াফের সহিত বসে, ইহার বর্ণনা

আঁ রছুলআজখোদ বশোদ জেঁ এই দোজাম,
নায়ে রেছালাত ইয়াদে মান্দাশ নায়ে পয়াম।
ওয়ালাহ্‌ আন্দর কুদরাতিল্লাহ শোদ,
আঁ রছুল ইঁজা রদীদ ও শাহ্‌ শোদ।
ছায়েলে চুঁ আমদ বদরিয়া মোহো গাস্ত,
মেঘে পেশে তেগে শামছি দোহো গাস্ত,
ছায়ালে চুঁ আমদ বদরিয়া বহরে গাস্ত,
দানা চুঁ আমদ ব মাজরায়া গাস্তে কাস্ত,
চুঁ তায়াল্লুক ইয়াফত নানে বা বুল বাশার,
নানে মুরদাহ্‌ জেন্দাহ্‌ গাস্ত ও বা খবর।
মোমো হিজাম চুঁ ফেদায় নারে শোদ,
জাতে জুলমানি উ আনওয়ারে শোদ।
ছংগে ছুরমা চুঁ কে শোদ দর দীদে গান,
গাস্তে বীনাই শোদ আঁ জা দীদাহ্‌ বান।

অর্থ: ঐ রুমের কাসেদ হজরত ওমর (রা:)-এর নিকট দু্ই-একটি কথা শুনিয়া নিজেকে হারাইয়া ফেলিল। দূতের কাজ বা খবর সম্বন্ধে তাহার কিছুই স্মরণ নাই। খোদার কুদরাত দেখিয়া পাগল হইয়া গেল। যদিও সে রাজদূত ছিল, এখন সে বাদশাহ হইয়া গেল। দুনিয়া হইতে অ-মুখাপেক্ষী হইয়া খোদার আরেফ হইয়া গেল। যেমন ঢল সাগরে আসিয়া সাগরে পরিণত হইয়া গেল, এইভাবে নাফেস কামেলের সোহবাতে আসিয়া কামেল হইয়া যায়। দ্বিতীয় উদাহরণ, যেমন মেঘ সূর্যের প্রখরতায় অন্ধকার বিদূরিত হইয়া আলোকিত হইয়া গেল। তৃতীয় উদাহরণ, যেমন পানির ঢল সাগরের পানির সাথে মিশিয়া সাগর হইয়া গেল। চতুর্থ মেসাল, যেমন বীজ ক্ষেতে পড়িয়া শস্যক্ষেত হইয়া গেল। পঞ্চম  দৃষ্টান্ত, যেমন রুটি মানুষের পেটে যাইয়া জীবিত হয় এবং খবরগিরি করিতে পারে। ষষ্ঠ উদাহরণ, যেমন মোমবাতি এবং শুকনা লাকড়ি, যখন আগুনে প্রজ্বলিত হয় তখন ইহার অন্ধকার বিদূরিত হইয়া আলোতে পরিণত হয়। কেননা, ইহার অণুগুলি অগ্নিতে পরিণত হইয়া যায়। সপ্তম উদাহরণ, যেমন পাথরের সুরমা, যখন চক্ষে যাইয়া পৌঁছে, তখন দৃষ্টিশক্তিতে পরিণত হইয়া দৃষ্টিশক্তির মালিক হইয়া বসে। অতএব, ইহা দ্বারা বুঝা গেল যে নাফেস কামেলের সোহবাতে কামেল হইয়া যায়।

আয় খনক আঁ মোরদাহ কাজ খোদ রেস্তাহ্‌ শোদ,
দর ওজুদে জেন্দাহ পেওস্তাহ শোদ।
ওয়ায়ে আঁ জেন্দাহ কে বা মোরদাহ নেশাস্ত,
মোরদাহ গাস্ত ও জেন্দেগী আজ ওয়ে বজুস্ত।
চুঁ তু দর কুরআনে হক ব গেরিখতী
বা রওয়ানে আম্বিয়া আমীখতি।
হাস্তে কুরআন হালে হায়ে আম্বিয়া,
মাহিয়ানে বহরে পাক কেবরিয়া।
ওয়ার ব খানি ওনা কুরআনে পেজীর,
আম্বিয়া ও আওয়ালিয়া রা দীদাহ গীর।
ওয়ার পেজী রাই চু বরখানি কাছাছ,
মোরগে জানাত তংগ আইয়াদ দর কাফাছ।
মোরগে কোআন্দার কাফাছ জেন্দানে আস্ত,
মী ব খাবীদ রোস্তানে আজ নাদানিস্ত।

অর্থ: এখানে মাওলানা কামেলের সোহবাত ইখতিয়ার করার জন্য উৎসাহ দিতেছেন – ঐ মুরদা দেল উত্তম, যে নিজ সত্তা হইতে মুক্তিলাভ করিয়া কোনো কামেলের সাথে মিশিয়া গিয়াছে। ঐ সমস্ত জীবিত অন্তঃকরণের জন্য বিশেষভাবে দুঃখিত, যাহাদের অন্তরে গ্রহণের শক্তি ছিল কিন্তু বদলোকের সাথে মিশিয়া খারাপ হইয়া গিয়াছে, অন্তঃকরণ মরিয়া গিয়াছে এবং জীবনকাল শেষ হইয়া গিয়াছে। যদি কামেল লোকের সোহবাত লাভ করার সুযোগ না পায়, তবে পবিত্র কুরআন ধরিয়া থাকিবে, অর্থাৎ, কোরআন অনুযায়ী চলিবে, তবে আম্বিয়া (আ:)-গণের সোহবাত লাভ হইবে। কেননা, পবিত্র কুরআন আম্বিয়া (আ:)-গণের হালাত সমূহ দ্বারা পরিপূর্ণ। যাহারা মহাসাগরের মাছ ছিলেন। যদি তুমি পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত-ই কর এবং ইহার এলেম অনুযায়ী আমল না কর, তবে মনে কর যে তুমি শুধু আম্বিয়া ও আওলিয়াগণকে দেখিয়া লইলে, সোহবাত হইতে উপকৃত হইলে না। তথাপি উপকার হইতে একবারে বঞ্চিত হইলে না। আর যদি তুমি অর্থ বুঝিবার মত উপযুক্ত হইতে পার, তবে তুমি যখন তাহাদের কেচ্ছা কাহিনী পড়িতে থাকিবে, তখন তুমি তাহাদের বরকতে ও ফায়েজের ক্রিয়ায় আল্লাহ ব্যতীত অন্য সব বস্তুর মহব্বত হইতে বাহির হইয়া আসিতে পারিবে। আল্লাহ্‌র মহব্বত অন্তরে বাড়িয়া যাইবে এবং তোমার রূহ্‌ দেহের খাঁচাকে অপ্রশস্ত মনে করিবে, মুক্তি পাইবার পথ তালাশ করিবে। তবেই তুমি কামেল লোকের সোহ্‌বাতের ন্যায় ফল পাইবে। যে রূহ্‌ পাখীর ন্যায় খাঁচায় আবদ্ধ আছে, এবং মুক্তি পাইবার চেষ্টা করে না, ইহার চাইতে বোকামি আর কিছুই হইতে পারে না।

রূহ্‌ হায়ে কাজ কাফাছে হা রোস্তান্দ,
আম্বিয়া ও রাহ্‌ বরে শায়েস্তাহ্‌ আন্দ।
আজ বেরুনে আওয়াজে শাঁ আইয়াদ বরীঁ,
কে রাহে রোস্তান তরা ইঁ নাস্তে ইঁ।
মা বদী রুস্তেম জেইঁ তংগী কাফাছ,
জুযকে ইঁ রাহে নীস্তে চারাহ ইঁ কাফাছ।
খেশেরা রঞ্জুরে ছাজাদ জারে জার,
তা তোরা রেরুন কুনান্দ আজ ইশতেহার।
কাস্তে হারে খলকে বন্দে মোহকামাস্ত,
দররাহে ইঁ আজ বন্দে আহাসফে কামস্ত।
এক হেকায়েত বেশনু আয় জীবা রফিক,
তা বদানী শরতে ইঁ বহরে আমীফ।
বেশনু আকনু দাস্তানে দর মেছাল,
তা শওবী ওয়াকেফে বর আছরারে মকাল

অর্থ: এখানে মাওলানা রূহ সম্বন্ধে বর্ণনা করিতেছেন, যে রূহ্‌ নিজে মুক্ত হইয়া গিয়াছে এবং অন্যকেও মুক্তি পাইবার পথ শিক্ষা দেয়, ইহাই প্রকৃত উপকার। যাহাদের রূহ্‌ খাঁচা হইতে মুক্তি পাইয়া গিয়াছে, তাঁহারা হইলেন আম্বিয়া (আ:) এবং হাদী (পথপ্রদর্শক) ব্যক্তিবৃন্দ (আউলিয়া কেরাম)। উচ্চ আসমান হইতে তাহাদের আওয়াজ আসে যে, ইহাই মুক্তির পথ, আমরাও আবদ্ধ খাঁচা হইতে এই পথে মুক্তি পাইয়াছি। এই পথের তদবীর ছাড়া আর কোনো তদবীর নাই। আর ঐ পথ হইল নিজেকে একেবারে দমাইয়া রাখা আর খোদার কাছে রাত্রদিন অনুনয়, বিনয় সহকারে প্রার্থনা করা। নিজেকে জনসাধারণের প্রশংসা হইতে বাহিরে রাখিবে। কেননা, জনসাধারণের মধ্যে প্রসিদ্ধ হওয়া খোদাকে পাওয়ার জন্য বিশেষ বাধাস্বরূপ মনে করিতে হইবে। ইহা ফায়েজে রসূল (দ:) হইতে নিরাশ করিয়া রাখে। খোদার রাস্তায় জনসাধারণের জন্য প্রসিদ্ধ হওয়া, লোহার জিঞ্জিরের মধ্যে আবদ্ধ হওয়ার চাইতে কম না। মাওলানা এক কেচ্ছার কথা উল্লেখ করিয়া বলিতেছেন যে, আমার বর্ণিত এই কেচ্ছা মনোযোগ সহকারে শুনিয়া লও, তবেই এই পথের শর্তসমূহ জানিতে পারিবে। এক কেচ্ছার মাধ্যমে ঘটনা জানিয়া লও, তবে আমার কথার রহস্য বুঝিতে পারিবে। এক সওদাগারের একটি পোষা তোতা ছিল। ঘটনাক্রমে সওদাগার ব্যবসার জন্য হিন্দুস্তানে রওয়ানার সময় তোতা হিন্দুস্তানের তোতাদের কাছে খবর পাঠানোর কেচ্ছা।

বুদ বাজারে গানে ও উরা তুতী,
দর কাফাছে মাহবুছ জীবা তুতী।
চুঁ কে বাজারে গান ছফর রা ছাজে করদ,
ছুয়ে হিন্দুস্তানে শোদান আগাজ করদ।
হর গোলমো হর কানিজাক রা জে জুদ,
গোফ্‌তে বহরে তু চে আরাম গুয়ে জুদ।
হর একে আজ ওয়ায়ে মুরাদে খাস্ত করদ,
জুমলারা ওয়াদাহ ব দাদে আঁ নেক মরদ।
গোফ্‌তে তুতী রা চে খাহী আর মগান,
কারে মত আজ খত্তে হিন্দুস্তান।

অর্থ: কোনো এক সওদাগর, তাহার একটি তোতা পাখী ছিল। ঐ তোতা সুন্দর চেহারায় খাঁচায় আবদ্ধ ছিল। ঘটনাক্রমে ঐ সওদাগর ব্যবসার জন্য হিন্দুস্তান রওয়ানা হইবার জোগাড় করিল। তখন মেহেরবানী করিয়া দান করিবার জন্য প্রত্যেক গোলাম ও দাসীর নিকট এক এক করিয়া জিজ্ঞাসা করিল যে, তাহাদের নিজেদের চাহিদা কী কী? প্রত্যেকেই নিজ চাহিদা মোতাবেক তাহার নিকট প্রকাশ করিল এবং সে প্রত্যেককে পূরণ করার ওয়াদা দিল। এইভাবে তোতার কাছেও জিজ্ঞাসা করিল যে তুমি কোন্ প্রকারের দান পছন্দ কর বল? উহা তোমার জন্য হিন্দুস্তান হইতে নিয়া আসিব।

গোফ্‌তাশ আঁ তুতী কে আঁ জা তুতীয়াঁ,
চুঁ বা বীনি কুন জে হালে মান বয়াঁ।
কে ফুলাঁ তুতী কে মোস্তাফে শুমাস্ত,
আজ কাজায়ে আছে মানে দর হাবছে মাস্ত।
বর শুমা করদ উ ছালামে ও দাদে খাস্ত,
ওয়াজ শুমা চারাহ রাহ ওয়া ইরশাদে খাস্ত।
গোফতে মী শাইয়াদ কে মান দর ইশতিয়াফ,
জানে দেহাম ইঁজা ব মীরাম দর ফেরাক।
ইঁ রওয়া বাশদ কে মান দর বন্দে ছখত,
গাহ শুমা বর ছবজাহ গাবে বর দরখত।
ইঁ চুনী বাশদ ওফায়ে দোছেতাঁ,
মান দর ইঁ হাবছ ও শুমা দর বুছে তাঁ।
ইয়াদে আরীদ আয় মেহানে জেইঁ মোরগে জার,
এক ছবুহী দরমীয়ানে মোরগে জান।
ইয়াদে আরীদ আজ মহব্বত হায়ে মা,
হক্কে মাজলেছ হাউ ছোহবাত হায়ে মা।
ইয়াদে ইয়ারানে উয়ারেবা মায়মুনে বুদ,
খাচ্ছা কানা লাইলা ওইঁ মজনুনে বুদ।

অর্থ: ঐ তোতা উত্তরে বলিল, তুমি যখন হিন্দুস্থানের তোতা পাখীগুলি দেখিবে, তখন তাহাদের নিকট আমার অবস্থা বর্ণনা করিবে যে অমুক তোতা তোমাদের সাথে মিলিতে ইচ্ছুক। সে আসমানী হুকুমে আমার অধীনে কয়েদ আছে। সে তোমাদের নিকট সালাম পাঠাইয়াছে এবং ইনসাফ কামনা করিয়াছে এবং তোমাদের কাছে তদবীর ও পরামর্শ চাহিয়া পাঠাইয়াছে, এবং এইরূপ বলিয়াছে যে ইহা তো উত্তম যে আমি মুখাপেক্ষী থাকিয়া আমার প্রাণ দিয়া দিব এবং এখানে একাকী মরিয়া যাইব। আমি শক্ত কয়েদখানায় আবদ্ধ আছি। তোমরা কোনো সময় সবুজ মাঠে গিয়া বসো, এবং কোনো সময় গাছের উপর বসো। বন্ধুদের বন্ধুত্বের পরিচয় কি এইরূপ? আমি এই কয়েদখানায় আবদ্ধ। আর তোমরা বাগানে ভ্রমণ কর। হে বোজর্গেরা! কোনো সময় হয়ত ভোরবেলা সবুজ বাগানে যাইয়া এই অসহায় বেচারা বন্ধুর স্মরণ করিও। কেননা, বন্ধুদের স্মরণ করা বন্ধুর জন্য মোবারক হইয়া থাকে। বিশেষ করিয়া যখন ইহাদের মধ্যে লায়লী-মজনুনের ন্যায় বন্ধুত্বের ভাব থাকে।

আয়ে হরিফানে বা আবাত মওজুনে খোদ,
মান কাদহে হামী খোরাম পুর খুনে খোদ।
এক কাদাহ মী নূশ কুন বর ইয়াদে মান,
গার হামী খাহী কে ব দিহী দাদে মান।
ইয়া ব ইয়াদে ইঁ কান্দাহ্‌ থাকে বীজ,
চুঁকে খোরদী জারায়া বর খাকে রীজ।
আয় আজব আঁ আহাদো ছওগান্দো কো,
ওয়াদেহায়ে আঁ লবে চুঁ কান্দ কো।

অর্থ: ইহাও তোতার কথা। তোতা বলে, হে তোতারা! যাহারা নিজেদের প্রিয় তোতার সাহায্যকারী, আমি রক্তপূর্ণ পেয়ালা পান করিতেছি। এক পেয়ালা শরাব আমার স্মরণে পান কর। অর্থাৎ, তোমাদের খুশীর সময় আমাকে স্মরণ কর। যদি আমাকে প্রতিদান দিতে চাও। অথবা আমার ন্যায় ধরাশায়িত দুর্বলকে স্মরণ করিয়া শরাব পান করার সময় দুই এক ফোটা জমিনের উপর ছিটাইয়া ফেলা উচিত। এই একরার ও কউল অতি আশ্চর্যজনক ছিল। যাহা এক সময় ধার্য হইয়াছিল, ঐ মিষ্টি বাক্য ও ওয়াদা যাহা মিশ্রির শিরার ন্যায় ছিল, তাহা কোথায় গেল?

গার ফেরাকে বান্দাহ্‌ আজ বন্দে গীস্ত,
চুঁ তু বাইয়াদ বদ কুনী পাছ ফরকে চীস্ত।
ইঁ বদী কে তু কুনী দর খশমো জংগ,
বা তরবে তোরা আজ ছেমায়ে বাংগে চংগ।
আয় জাফাযে তু জে দৌলাতে খুব তর,
ও ইন্‌তেকামে তুজে জানে মাহবুব তর।
নারে তু ইস্ত নূরাত চুঁ বুয়াদ,
মাতমে ইঁ খোদ তাফে ছুরাতে চুঁ বুয়াদ।
আজ হালাওয়াতে হা কে দারাদ হুরে তু,
ওয়াজ লাতাফাত কাছ না বাইয়াদ গুরে তু,
ফীল মেছালে জওরাতে আগার উরইয়ানে শওয়াদ,
আলেমার গেরইয়ানে বুদ খান্দাঁ শওয়াদ।
নালাম ও তরছাম কে বা আওয়ার কুনাদ,
ওয়াজ তারাহাম জওরে রা কমতর কুনাদ।

অর্থ: এখানে জুদাইর যাতনা প্রকাশ করিয়া তারপর ঐ অবস্থায় রাজী থাকিয়া মান্য করার সম্বন্ধে বলা হইতেছে, আমার অন্যায় ও অপরাধের জন্য যদি দূরে ফেলিয়া রাখ, আর তুমি যদি আমার প্রতি খারাপ ব্যবহার কর, তাহা হইলে প্রভু এবং দাসের মধ্যে কী পার্থক্য থাকিবে? বরং তাঁহার দয়ার ইচ্ছায় আমি যতই অন্যায় করিনা কেন, তিনি দয়া করিতে থাকিবেন, ইহা অতিরিক্ত ভাবের বশবর্তী হইয়া বলিতেছে। না হইলে অপরাধের শাস্তির পার্থক্য করা যায় না। ঐ প্রতিদানের শাস্তি দয়া করিয়া মনে হওয়া বিশেষ বলিয়া আরেফদের নিকট এই সম্বন্ধে বলা হইতেছে যে, তুমি রাগান্বিত হইয়া বান্দার উপর যে শাস্তি প্রদান করিতে থাক, ইহা তারের বাজনার সুরের চাইতেও মধুর। কেননা, মাহবুবের শাস্তির মধ্যে নিহিত মাধুর্য থাকে। যেমন হাদীসে উল্লেখ আছে, বালা (মসীবত) ও গম (পেরেশানি) দ্বারা গুণাহর কাফ্‌ফারা হইয়া থাকে। এবং সম্মানে উন্নতি লাভ করিতে থাকে। তাই বলিতেছেন যে, হে প্রিয়, তোমার জুলুম ও অত্যাচার আমার পক্ষে উত্তম সম্বল। কেননা, দুঃখ কষ্টের মধ্যে অন্তর অধিক পরিমাণে পরিষ্কার হয় এবং আল্লাহর ইবাদতে বেশী মনোযোগ দেওয়া হয়। তোমার প্রতিশোধ লওয়া আমার পক্ষে আমার জানের চাইতেও বেশী ভালোবাসি। তোমার শাস্তি ও জুদাইর মধ্যে এত স্বাদ হইলে, তোমার মিলনের মধ্যে কত স্বাদ ও শান্তি হইতে পারে, তাহা ধারণা করা যায় না। তোমার জুলুমের স্বাদ যদি এত মিষ্টিজনক হয়, তবে তোমার মেহেরবানীর স্বাদ কত মধুপূর্ণ হইবে, তাহা কেহ ধারণা করিতে পারে না। যদি ঘটনাক্রমে সেই মাধুর্য প্রকাশ পাইয়া যায় এবং আহলে আলম, অর্থাৎ, দুনিয়াবাসী জানিতে পারে, তবে যদি তাহারা ক্রন্দন অবস্থায় থাকে, হঠাৎ হাসির অবস্থায় পতিত হইবে। যদি তিনি আমার জন্য জুলুম করা পছন্দ করেন এবং আমার ক্রন্দন ভালোবাসেন, তবে সেই ভরসায় থাকিব, আমার পক্ষে শান্তি ও নেয়ামতের চাইতে জুলুম ও ক্রন্দনে অধিক শান্তি পাই।

আশেকাম বর কাহরে ওবর লুতকাশ ব জেদ্দে।
আয় আজবে মান আশেকে ইঁ হরদো জেদ্দে।
ইশকে মান বর মাছদারে ইঁ হরদো শোদ,
চুঁ নাবাশদ ইশকে কাজুয়ে নিস্তে বদ।
ওল্লাহে আর জে ইঁ খারে দর বুস্তানে শওয়াম,
হাম চু বুলবুল জে ইঁ ছবাব নালানে শওয়াম।
ইঁ আজব বুলবুল কে ব কোশাইয়াদ দেহান,
তা খোরাদ উ খারেরা বা গোলেস্তান।
ইঁ চে বুলবুল ইঁ নহাংগে আতেশাস্ত,
জুমলা নাখোশ হা জে ইশকে উরা খোশাস্ত।
আশেকে কুলাস্তও খোদ কুলাস্তে উ,
আশেকে খেশাস্ত ও ইশকে খেশে জু্।

অর্থ: আমি মাহবুবে হাকিকির গজব ও মেহেরবানী উভয় অবস্থার উপর অতিশয়রূপে আশেক আছি। আশ্চর্যের কথা এই যে, আমি ঐ দুই বিরুদ্ধবাদ বস্তুর উপর আসক্ত আছি। প্রকাশ্য হিসাবে দুই বিরুদ্ধ গুণের কথা উল্লেখ করিয়াছেন, না হইলে প্রকৃতপক্ষে একই জাতের মধ্যে দুই গুণ একত্রিত আছে। প্রকৃতপক্ষে আমার ইশক এই দুই গুণের অধিকারী মূল জাতের উপর পতিত এবং তাহার উপর হইবে না কেন? তিনি ব্যতীত চলাই তো যায় না। আল্লাহ্‌র কসম দিয়া বলিতেছি। যদি আমি এই গজবের মধ্য দিয়া ফুলের বাগানে চলিয়া যাইতে পারি, তবে বুলবুলের ন্যায় এই কারণে ক্রন্দন আরম্ভ করিয়া দিব। এই বুলবুল আশ্চর্য রকমের, যখন মুখ খুলিয়া কাঁটা এবং ফুলের বাগান সবই গিলিয়া ফেলিবে। অর্থাৎ, গজব ও মেহেরবানী সবই পছন্দ করিয়া লয়। এই বুলবুল অগ্নি স্ফূলিঙ্গের ন্যায় সকলই পছন্দ করিয়া লয়। কেননা, সে সমস্ত গুণের অধিকারী জাতে পাকের আসক্ত। বরং জাতে পাক এক দিক দিয়া তিনিই সব। এই দিক দিয়া তিনি নিজেই আশেক এবং নিজের ইশক অন্বেষণ করেন।

আল্লাহ্‌ প্রদত্ত আকল, পাখাবিশিষ্ট পাখীর ন্যায় গুণ বর্ণনা করা

কেচ্ছায়ে তুতী জানে জে নেছাইয়ানে বুদ,
কো কাছে কো মোহ্‌রমে মোরগানে বুদ।
কো একে মোরগে জয়ীফে বে গুণাহ্‌
ওয়ান্দরুনে উ ছোলাইমানে বা পেছাহ্‌।
চুঁব নালার জার বে শোকরো গেল্লাহ্‌,
উফতাদ আন্দর হাফ্‌তে গেরদুনে গলগালাহ্‌।

অর্থ: মাওলানা বলেন, আমাদের জান, যাহা তোতা পাখীর ন্যায়, ইহার কেচ্ছা ও অবস্থার বর্ণনা করা হইতেছে। যে তোতা পাখী ইশকে ইলাহীর মহব্বতের বাগানে মহব্বতের রহস্য পান করিয়া চুপ করিয়া রহিয়াছে, ঐরূপ ব্যক্তি কে হইবে? শুধু ঐ ব্যক্তি হইতে পারিবে, যে মহব্বতের মালিক হইয়াছে। এই রূপ লোক খুব কম পাওয়া যায়। এই রূপ বেগুণাহ্‌ দুর্বল রূহ কোথায় পাওয়া যাইবে এবং তাহার কী অবস্থা হইবে? যেমন সোলাইমান (আ:) তাঁহার গুণাবলী ও লষ্কর নিয়া ছিলেন। ঐ রূপ কামেল মানুষ যখন কান্নাকাটি করিতে আরম্ভ করেন, তখন মিলনের শান্তি প্রাপ্ত হইতে পারেন। কোনো প্রকার দুঃখ-কষ্ট ও যাতনা থাকে না, শুধু আল্লাহর মহব্বতের উত্তেজনায় ঐ সময় সাতও আসমানের ফেরেস্তাদের মধ্যে শোর ও গোল পড়িয়া যায়। আসমানবাসীরা হয়রান ও পেরেশান হইয়া যান।

হরদমাশ ছদ নামা ছদ পেকে আজ খোদা,
ইয়ারে বে জোশাস্ত লাব্বাইকা আজ খোদা।
জেল্লাতে উ বে জে তায়াতে নজদে হক,
পেশে কুফরাশ জুলমা ঈমানে হা খলক।
হরদমে উরা এক মেয়াবাজে খাছ,
বরছারে ফরকাশ নেহাদ ছদ তাজে খাছ।
ছুরা তাশ বর খাকো জান বর লা মাকান,
লা মাকানে ফউকো হাম ছালেকান।
লা মাকানে নায় কে দর ফাহাম আইয়াদাত,
হরদমে দরওয়ায়ে খেয়ালে জায়েদাত।
বাল মাকানে ও লা মাকানে দর হুকমে উ,
হামচু দর হুকমে বেহেস্তী চারে জু।
শরাহ ইঁ কোতাহ কুন ওয়া জীঁ রুখে বতাব,
দমে মজান ওয়াল্লাহু আলামু বিচ্ছওয়াব।
বাজে মী গরদামে আজইঁ আয় দোস্তাঁ,
ছুয়ে মোরগে ও তাজেরে হিন্দুস্তাঁ।

অর্থ: ঐ কামেল ব্যক্তির নিকট শত শত ইলহাম ও শত শত ফেরেস্তা আল্লাহর তরফ হইতে আসিতে থাকে। যদি তিনি একবার ইয়া রাব্বে বলেন, তবে আল্লাহর তরফ হইতে ষাটবার লাব্বাইকা উত্তর আসে। অর্থাৎ, তিনি একবার তাওয়াজ্জাহ করিলে আল্লাহ্‌তায়ালা বহুবার তাঁহার প্রতি মনোযোগ দেন। তাঁহার একটি ভুল আল্লাহর নিকট অন্যের শত শত ইবাদাত হইতে উত্তম। তাহার কুফরির সম্মুখে সমস্ত লোকের ঈমান হেয় প্রতিপন্ন হইয়া যায়। প্রত্যেক মুহূর্তে তাঁহার এক মে’রাজ ভ্রমণ হইয়া থাকে। তাঁহার মাথায় এক বিশেষ রকমের টুপি দেয়া হয়। তাঁহার দেহ জমিনে থাকে, কিন্তু রূহ লা-মাকানে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহর খাঁস্ স্থানে থাকে, যে স্থানে সকলের জন্য পাওয়া সম্ভব না। ঐ লা-মাকান এমন নয় যে তোমাদের বোধগম্য হইবে। তোমাদের খেয়ালে আসিবে, বরং অন্য রকমের লা-মাকান যাহা খোদা ব্যতীত কেহ অনুমান করিতে পারে না। যেমন বেহেস্তীদের জন্য চারিটি নহর হইবে। পানি, দুধ, শরাব ও মধূপূর্ণ হইবে। এ বিষয়ের বর্ণনা অনেক লম্বা; এইজন্য এখন সংক্ষেপ করিয়া শেষ করিলাম।

সওদাগরের হিন্দুস্তানী তোতার ঝাঁক দেখা ও নিজ তোতার খবর পৌঁছান সম্বন্ধে বর্ণনা

মরদে বাজারে গান পিজীরফ্‌ত ইঁ পয়াম,
কো রেছানাদ ছুয়ে জেনদে উ ছালাম।
চুঁ কে দর আকছায়ে হিন্দুস্তান রছীদ,
দর বয়াবানে তুতি চান্দে বদীদ।
মারকাবে ইস্তানীদ ও পাছ আওয়াজ দাদ।
আঁ ছালাম দাঁ আমানাতে বাজে দাদ।
তুতীয়ে জে আ তুতীয়ানে লরজীদ বছ,
উফতাদ ও জুদে ব গাছতাশ নফছ।
শোদ পেশে মাঁ খাজা আজ গোফতে খবর,
গোফতে রফতাম দর হালাকে জানুয়ার।
ইঁ মাগার খেশাস্ত বা আঁ তুতীক,
ইঁ মাগার দো জেছমে বুদ ও রূহে এক।
ইঁ চেরা করদাম চেরা দাদাম পয়াম,
ছুখতাম বেচারাহ রাজে ইঁ গোফতে খাম।

অর্থ: সওদাগর তোতার এই খবর পৌঁছাইয়া দিবার স্বীকার করিয়া লইল। ইহার স্বজাতি তোতাদের কাছে ইহার সালাম ও খবর পৌঁছাইয়া দিবে। যখন ঐ সওদাগর হিন্দুস্থান সীমান্তে পৌঁছিল, তখন জঙ্গলে গাছের উপর কয়েকটা তোতা দেখিতে পাইল। সওদাগর সওয়ারী থামাইয়া তোতাগুলিকে ডাকিয়া নিজ তোতার সালাম ও খবর পৌঁছাইয়া দিল। ঐ তোতার-ঝাকের মধ্য হইতে একটি তোতা থর থর করিয়া কাঁপিয়া পড়িয়া যাইয়া মরিয়া গেল। ঐ সওদাগর ঐ কেচ্ছা বলায় অত্যন্ত লজ্জিত হইল এবং মনে মনে বলিতে লাগিল, আমি অনর্থক একটি প্রাণীর মরণের কারণ হইলাম। এই তোতা বোধ হয় ঐ তোতার সাথে বিশেষ কোনো সম্বন্ধ সূত্রে আবদ্ধ ছিল। ইহা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয় যে এই দুইটি দেহ পরস্পর দুই কালেবে এক-জান ছিল। অর্থাৎ, আশেক ও মাশুক ছিল। আমি এমন কাজ কেন করিলাম? এই খবর কেন পৌঁছাইলাম? এই বেচারাকে এইরূপ বেহুদা কথা বলিয়া অনর্থক জ্বালাইয়া দিলাম।

ই জবান চুঁ ছংগো ফামে আহন দশাস্ত,
ও আঁচে ব জেহেদে আজ জবান চুঁ আতে শাস্ত।
ছংগো ও আহান রা মজান বরহাম গরাফ,
গাহ্‌ জেরুয়ে নকল ও গাহ্‌ আজরুয়ে লাফ।
জে আঁকে তারেকীস্ত ও হরছু পোম্বা জার,
দরমীয়ানে পোম্বা চুঁ বাশদ শরার।
জালেমে আঁ কওমে কে চশমানে দোখতান্দ,
জে আঁ ছুখান হা আলমেরা ছুখ তান্দ।
আলমেরা এক ছুখান বীরান কুনাদ,
রোবাহাঁ মোরদাহ রা শেরানে কুনাদ।

অর্থ: উপরে বিশেষ বর্ণনার ক্ষতি সম্বন্ধে উল্লেখ করা হইয়াছিল। সেই সূত্রে মাওলানা এখানে কালামের ক্ষতি সম্বন্ধে বলিতেছেন যে, এই জিহ্বা পাথরের ন্যায় এবং মুখ লোহার ন্যায়। যাহার আঘাতে আগুন সৃষ্টি হয় এবং জিহ্বা দ্বারা যাহা বাহির হয়, ইহা আগুনের মত ক্রিয়া করে। অর্থাৎ, কোনো কোনো বাক্য এমন ক্ষতিকারক হিসাবে বাহির হয়, যেমন আগুনে ক্ষতি করে। অতএব, পাথর এবং লোহাকে না বুঝিয়া চিন্তা না করিয়া ঘর্ষণ করিও না, চাই অনুকরণ হিসাবে হউক, আর নিজের তরফ থেকেই হউক। কোনো প্রকারেই না বুঝিয়া-চিনিয়া কথা বলা উচিত না। কেননা, জনসাধারণের অন্তঃকরণে অন্ধকার ছাইয়া রহিয়াছে, এইজন্য তাহাদের অন্তর বুঝিবার মত শক্তি রাখে না। দুর্বলতার মধ্যে যদি তাওহীদের রহস্য ছড়ান হয়, তবে উপকারের চাইতে অপকার-ই বেশী হইবে। উহারাই বড় জালেম ছিল, যাহারা চক্ষু বন্ধ করিয়া তাওহীদের মর্ম প্রকাশ করিয়া এক জমানার লোক খারাপ করিয়া ফেলিয়াছে। বড় জালেমের অর্থ বাতেল সূফী। কেননা, তাহাদের অনেক কথা দ্বারা লোক গোমরাহ হইয়া গিয়াছে। গণ্ডমূর্খ, যাহারা খেকশিয়ালের ন্যায় চুপচাপ পড়িয়া রহিয়াছিল, তাহারা বাঘের ন্যায় উত্তেজিত হইয়া পড়িয়াছে।

জানেহা দর আসলে খোদ ঈছা দমান্দ,
এক জমানে জখমান্দ ও দীগার মরহামান্দ।
গার হেজাবে আজ জানেহা বরখাস্তে,
গোফ্‌তে হর জানে মছীহ্‌ আছাস্তে।
গার ছুখান খাহী কে গুই চুশক্কর,
ছবরে কুন আজ হেরচে ও ইঁ হালুয়া মখোর।
ছবরে বাশদ মোশতাহায়ে জীরে কান,
হাস্তে হালুয়া আরজুয়ে কোদে কান।
হরকে ছবরে আওরাদ বর গেরদুনে শওয়াদ,
হরকে হালুয়া খোরাদ ওয়াপেছ তর রওয়াদ।

অর্থ: উপরে কোনো কোনো বাক্য ক্ষতিকারক বলিয়া প্রকাশ করা হইয়াছে, ইহা শুধু রূহের অস্থায়ী গুণের জন্য ক্ষতিকারক হয়। নতুবা রূহের জাতীয়গুণের মধ্যে কোনো অনিষ্টকারক দোষ নাই। প্রত্যেক রূহ-ই মূলত ভাবে পরিপূর্ণ বা কামেল এবং তাহার প্রত্যেক বাক্যই কামেল হইবে। মাওলানা বলেন, রূহ্‌সমূহ মূল ধাত হিসাবে ঈসা (আ:)-এর রূহের ন্যায়। অর্থাৎ, হজরত ঈসা (আ:)-এর শ্বাস কাফেরদের শরীরে লাগিলে, নেমক যেমন পানিতে গলিয়া যায়, সেই রকম কাফেররা আস্তে আস্তে গলিয়া পচিয়া যাইত। এই উভয় গুণ-ই রূহের পরিপূর্ণতার লক্ষণ। এই রকম রূহের সৃষ্টিগত মূলধাঁত হিসাবে যে বাক্য নির্গত হয়, ইহা কামালাতপূর্ণ হয়। উপযুক্ত ব্যক্তির ইহা দ্বারা উপকার হয় এবং খারাপ ব্যক্তির অপকার হয়। আর যদি কোনো প্রকার খাহেশাতে নফসানির দরুন বাক্য বলা হয়, তবে উহা দ্বারা ক্ষতি সাধন ছাড়া আর কিছুই হয় না। খাহেশাতে নফসানী যদি প্রত্যেক রূহ্‌ হইতে দূর হইয়া যায়, তবে প্রত্যেকের রূহ্‌ হজরত ঈসা (আ:)-এর রূহের ন্যায় হইবে। তোমার যদি ইচ্ছা থাকে যে তোমার বাক্য মিষ্টিপূর্ণ হইবে, তবে তুমি ধৈর্য ধারণ কর। লালসা হইতে ফিরিয়া থাক। কম খাও এবং কম বল, কু-রিপুগুলি দমন করিয়া রাখ। মোজাহেদা ও রিয়াজাত কর। তাহা হইলে অন্তরে সত্য রহস্য প্রকাশ পাইয়া যাইবে। তারপর যে বাক্য হইবে, উপকারী বাক্য হইবে। সবর করা আত্মার নিকট খুব শক্ত কাজ এবং তিক্ত বলিয়া মনে হয়। আর কু-রিপুর তাড়না মধুর ন্যায় মনে হয়; যেমন বালকের নিকট মিষ্টি খুব প্রিয় বস্তু। যে ব্যক্তি সবর ইখতিয়ার করিতে পারে, সে মরতবার দিক দিয়া অতি উচ্চস্থান লাভ করিতে পারে; আর যে ধৈর্য ধারণ করিতে পারেনা, খাহেশে নফসানীর দিকে ধাবিত হয়, সে ক্রমান্বয়ে অধঃপতনের দিকে যায়।

মসনবী শরীফ – (১০৯)
মূল: মাওলানা রুমী (রহ:)
অনুবাদক: এ, বি, এম, আবদুল মান্নান
মুমতাজুল মোহাদ্দেসীন, কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা

ফরিদ উদ্দিন আত্তার কুদ্দেসা সেররুহুর কউলের ব্যাখ্যা

তুমি নাকেসুল আকল, নিজের কু-রিপুর ইচ্ছানুযায়ী চল, তোমার রহস্যজনক কথা ব্যক্ত করা ক্ষতিকর। কামেল লোকের পক্ষে রহস্য ব্যক্ত করা অপকারী নহে।

ছাহেবে দেলরা না দারাদ আঁ জিয়াঁ,
গার খোরাগ উ জহরে বাতেল রা আইয়াঁ।
জাঁকে ছেহাত ইয়াফত ওয়াজে পরহেজ রাস্ত,
তালেবে মীছ্‌কীন মীয়ানে তাব দরুস্ত।
গোফতে পয়গাম্বর কে আয় তালেবে জারী,
হাঁ মকুন বা হীচে মতলুবে মরী।
গোফ্‌তে আহম্মদ গার মী খাহি জেলাল,
হায়েঁ মকুন বা হীচে মতলুবী জেদাল।

অর্থ: সাহেবে কামেল যদি জহরও পান করেন, তবে তাঁহার কোনো ক্ষতি হয় না। কেননা, তিনি সুস্থতা লাভ করিয়াছেন এবং পরহেজগারী হইতে মুক্তি পাইয়াছেন। কিন্তু শিক্ষার্থীর জন্য তাহা নহে। কারণ, সে এখন পর্যন্ত অন্তরের রোগসমূহ হইতে আরোগ্য লাভ করিতে পারে নাই। নবী করিম (দ:) ফরমাইয়াছেন যে, হে সাহসী শিক্ষার্থী! কোনো সময় নিজের কামেলের কাছে প্রশ্ন করিয়া তর্ক করিও না। তুমি যদি আছাড় খাওয়া হইতে রক্ষা পাইতে চাও, তবে কখনও শায়েখে কামেলের সাথে তর্ক করিবে না।

চুঁ না ছাব্বাহ্‌ নায়ে দরিয়ায়ী,
দরমী ফাগান খেশে আজ খোদরাইয়ী।
উজে কায়ারে বহরে গওহার আওরাদ,
আজ জীয়ানে হা ছুদে বরছারে আওরাদ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, তুমি যখন সাঁতারু নও এবং দরিয়ার বাসিন্দাও নও, তখন নিজের মতে নিজেকে সাগরে নিমজ্জিত করিও না। যে ব্যক্তি কামেল, তিনি সাগর হইতে মুক্তা কুড়াইয়া আনিতে পারেন এবং ক্ষতিকারক বস্তু হইতে ‍উপকারী বস্তু বাহির করিয়া দেখাইতে পারেন।

কামেলে গার খাকে গীরাদ জর শওয়াদ,
নাকেজে আর জর বুরাদ খাকাস্তার শওয়াদ।
দস্তে নাকেছ দস্তে শয়তানাস্ত ও দেও,
জাঁকে আন্দর দামে তালবীছাস্ত ও রেও।
চুঁ কবুল হক্কে বুদ আঁ মরদে রাস্ত,
দস্তে উ দর কারেহা দস্তে খোদাস্ত।
জাহেল আইয়াদ পেশে উ দানেশ শওয়াদ,
জাহেল শোদ আলেমে কে দর নাকেছে রওয়াদ।
হরচে গরিাদ ইল্লাতে ইল্লাত শওয়াদ,
কুফরো গীরাদ কামেলে মীল্লাহ শওয়াদ।
আয় মরে করদাহ পিয়াদাহ বা ছওয়াব,
ছার নাখাহী বুরাদ আকনু পায়ে দার।

অর্থ: কামেল লোকে যদি মাটি পছন্দ করিয়া লয়, তবে ইহা স্বর্ণে পরিণত হইয়া যায়। যেমন হজরত আম্মার (রা:) জবরদস্তির সময় কুফরি বাক্য উচ্চারণ করিয়াছিলেন। এইজন্য ইহা শরিয়াতের বিধানে পরিণত হইয়াছে। জরবদস্তির সময় ঐ রকম বাক্য উচ্চারণ জায়েজ আছে এবং নাকেস ব্যক্তি স্বর্ণ লইলেও ইহা মাটি হইয়া যায়। কেননা, সে শয়তানের ধোকায় পড়িয়া যায়। প্রকৃত কামেল যখন খোদার দরবারে স্বীকৃতি লাভ করেন, তখন তাহার সকল কাজে খোদার হাত আছে বলিয়া মনে করিতে হইবে। কেননা, তিনি আল্লাহর প্রতিনিধি। অতএব নাকেসের হাতে কোনো সময় বয়াত হইবে না। কেননা, সে নিজেই গোমরাহ, অন্যকে কেমন করিয়া পথ দেখাইবে? আর আল্লাহর প্রতিনিধি, তাঁহার হাতে বয়াত হওয়ার অর্থ আল্লাহর হাতে বয়াত হওয়া, কামেলের সম্মুখে গণ্ডমূর্খ আসিলেও আলেম হইয়া যায়। আর নাকেসের সম্মুখে আলেম আসা-যাওয়া করিলে আলেম শেষ পর্যন্ত জাহেল হইয়া যায়। কেননা, তাহার এলেমের মধ্যে ভুল পয়দা হইয়া যায়। অতএব, এলেম অনুযায়ী আমল করিতে পারে না। যাহার মধ্যে বিশ্বাস নষ্ট হওয়ার বা আমল নষ্ট হওয়ার কোনো কারণ থাকে, তবে সে যাহা-ই করিবে তাহা ক্ষতির কারণ হইবে। আর যদি কামেল ব্যক্তি এ কারণ অবলম্বন করে, তবে তাহা মোজহাবে পরিণত হইয়া যায়। এইজন্য মাওলানা শিক্ষার্থীদিগকে কামেলের সমকক্ষতা হইতে বিরত থাকিতে উপদেশ দিয়াছেন। যেমন পথচারী সওয়ারের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারে না। তাহা হইলে তাহার মাথা নিরাপদে রাখিতে পারে না। কামেলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিলে মহা বিপদে পড়িবার আশঙ্কা আছে, ঈমান নষ্ট হইয়া যাইবে; ফায়েজ হইতে বঞ্চিত হইবে; মানুষের নিকট ঘৃণিত হইবে ইত্যাদি।

যাদুকরদের হজরত মুসা (আ:)-কে তাজীম করা যে আপনি প্রথমে লাঠি জমিনের উপর রাখুন

ছাহেরানে দর আহাদে ফেরাউনে লায়নী,
চুঁ মরে করদান্দ বা মুছা জেকীন।
লেকে মুছারা মোকাদ্দাম দাস্তান্দ,
ছাহেরানে উরা মোকার্‌রাম দাস্তান্দ।
জে আঁকে গোফতান্দাশ কে ফরমানে আঁ তুস্ত,
গার তু মীখাহী আছা ব ফেগান নাখোস্ত।
গোফ্‌তে নায়ে আউয়াল শুমা আয় ছাহেরান,
আফগানীদ আঁ মকরে হারা দরমীয়ান।
ইঁ কদর তায়াজীমে দীনে শাঁরা খরীদ,
ওয়াজ মরে আঁ দস্তোওপা শাহানে বুরীদ।
ছাহেরানে চুঁ কদরে উ বশে নাখতান্দ,
দস্তোওপা দর জুরমে উ দর বাখতান্দ।

অর্থ: এখানে আহালে আল্লাহর সাথে আদব করার ফজিলত ও বেয়াদবী করার ক্ষতি সম্বন্ধে বলা হইয়াছে। ফেরাউন বাদশাহর সময় যখন যাদুকররা হজরত মুসা (আ:)-এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে আসিল, এই আসাটাই প্রথম বেয়াদবী ছিল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার এতটুকু আদব রক্ষা করিয়াছে যে মুসা (আ:)-কে সম্মান করিয়া বলিয়াছে, আদেশ আপনার ইচ্ছাধীন, যদি আপনি মঞ্জুর করেন, তবে আপনি-ই প্রথমে জমিনে লাঠি রাখেন। উত্তরে হজরত মূসা (আ:) বলিলেন, না, তোমরাই তোমাদের যাদু জমিনে রাখ। যাদুকররা যখন হজরত মূসা (আ:)-এর কদর বুঝিতে পারিল, তখন নিজেদের হাত পা অন্যায়ের প্রতিশোধস্বরূপ দান করিয়া দিল। অর্থাৎ, হাত পা কাটিয়া ফেলার যন্ত্রণা সহ্য করার মত তাহাদের ধৈর্য সৃষ্টি হইয়া গেল। আদব রক্ষার কারণে আল্লাহর তরফ হইতে ধৈর্য শক্তি প্রাপ্ত হইয়াছিল।

লোকমাও নকতাস্ত কামেলরা হালাল,
তু না কামেল মখোর মী বাশ লাল।
তু চু গুশী উ জবানে নায়ে জেনছে তু,
গোশে হারা হক ব ফরমুদ আনছে তু।
কোদকে আউয়াল চুঁ ব জাইয়াদ শীরে নূশ,
মুদ্দাতে খামুশ বুদ উ জুমলা গোশ।
মুদ্দাতে মী বাইয়াদাশ লবে দোখতান,
আজ ছুখান গোইয়ানে ছুখান আমুখতান।
ওয়ার নাদারাদ গোশেতায়ে তায়ে মী কুনাদ,
খেশেতন রা গংগে গীতি মী কুনাদ।
তা নাইয়া মুজাদ না গুইয়াদ ছদ একে,
ওয়ার বগুইয়াদ হাশবো গুইয়াদ বে শকে।
কাররা আছলি কাশ নাবুদ আনাজে নোশ,
লালে বাশদ কায়ে কুনাদ দর নুতকে জোশ।
জাঁকে আউয়াল ছামায়া বাইয়াদ নূতকেরা,
ছূয়ে মানতেক আজ রাহে ছামায়া আন্দর আ।
উদখুলুল আবইয়াতে মেন আবওয়াবেহা,
ওয়াতলুবুল আরজাকা মেন আছবাবেহা।

অর্থ: লোকমা দেওয়া ও সূক্ষ্ম কথা বলা কামেলের জন্য জায়েজ আছে। তুমি কামেল না, এইজন্য তুমি ইচ্ছামত খাইও না এবং কথা কম বল, সূক্ষ্ম কথার ধার ধারিও না। তুমি খনিজের ন্যায়, ইহার কথা বলা কাজ নয়। আর কামেল জিহ্বার ন্যায়, তাহার কাজ কথা বলা। অতএব, কামেল তোমার শ্রেণীর না। তোমাকে তাঁহার ন্যায় মনে করিও না। তোমার কাজ শোনা এবং চুপ করিয়া থাকা। কামেল হইতে উপকৃত হইতে থাক, তুমি একদিন কামেল হইয়া পড়িবে। যেমন দেখ, শিশু বাচ্চা দুধ পান করার মত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চুপ করিয়া থাকে, হাত পা ও কান তৈয়ার করিতে থাকে, এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাহাকে চুপ থাকিতে হয়, এবং বক্তা হইতে কথা বলা শিক্ষা করিতে হয়। তারপর সে কথা বলার শক্তি অর্জন করে। যদি কোনো শিশুর শ্রবণ শক্তি না হয়, তবে সে অর্থশূন্য শব্দ করিতে থাকে এবং জগতে গোংগা বলিয়া পরিচিত হয়। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, শোনা ব্যতীত কেহ কথা বলিতে পারে না। যখন পর্যন্ত কথা বলিতে না শিখে, কথা বলিতে পারে না; যদিও কিছু বলে তবে ইহা দ্বারা কিছু বুঝা যায় না; বেহুদা বলে। অতএব, জন্মগত বহেরা নিশ্চয়ই গোংগা হইবে, কথা বলার উৎসাহ পাইবে না। কেননা, কথা বলার জন্য প্রথম শোনার আবশ্যক আছে। বলিতে হইলে শোনার পথে আসিতে হইব। যেমন পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, ঘরসমূহের মধ্যে দরজা দিয়া যাইতে হইবে। এইভাবে প্রত্যেক বস্তু-ই ইহার আসবাব (কারণ/ওসীলা) দিয়া তালাশ করিতে হইবে। এইভাবে প্রত্যেক বস্তু-ই ইহার নিজ পদ্ধতি অনুযায়ী হাসেল করিতে হইবে। যদি কামালাত হাসেল করিতে চাও, তবে মান্যতা ও রিযাজাত অবলম্বন কর।

নূতফে কানে মাওকুফে রাহে ছামায়া নিস্ত,
জুয্‌কে নোতফে খালেকে বে তামায়া নিস্ত।
মোবদায়াস্ত ও তাবেয় ইস্তাদ নেহ,
মোছনাদে জুমলাহ ওয়ারা ইছনাদে নেহ।
বাকীয়ানে হাম দর হরফে হাম দর মাকাল,
তাবেয় উস্তাদো ও মোহতাজে মেছাল।

অর্থ: মাওলানা বলেন, এমন কথা, যাহা শোনার উপর নির্ভর করে না, ইহা শুধু আল্লাহ পাকের কালাম। ইহা কোনো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নয়, কাহারো মুখাপেক্ষী নয়। তিনি নিজেই সকল সৃষ্টি করিয়াছেন। কোনো উস্তাদের অধিনস্থ না। তিনি নিজেই সবের আশ্রয় স্থান। তাঁহার কোনো সাহায্যকারীর আবশ্যক করে না। বাকী সব কথায়, কার্য উস্তাদের প্রতি মুখাপেক্ষী এবং বাধ্যতা স্বীকার করিতে হয়। নমুনারও আবশ্যক আছে।

গার ছখান গার নিস্তী বেগানাহ্‌,
দেলকো আশেকে গীর ওজু বীরানাহ্‌।
জে আঁকে আদম জে আঁ এতাব আজ আশকরাস্ত,
আশক তর বাশদ দমে তুবা পোবোস্ত।
ভরগেরিয়া আদম আমদ বর জমীন,
তা বুদ গেরিয়ানো নালানো হাজীন।
আদম আজ ফেদাউস ও আজ বালায়ে হাফ্‌ত,
পায়ে মা চানে আজ বরায়ে ওজরে রফ্‌ত।
গারজে পোস্তে আদমী ও জে ছলবে উ,
দর তলবে মী বাশ হামদর তলবে উ।
জে আতেশে দেল জে আবে দীদাহ নকলে ছাজ,
বোস্তানে আজ আবর ও খুবশীদাস্তে তাজ।
তু চে দানী জওকে আবে আয় শীশা দেল,
জাঁকে হাম চুঁ খারেশীদি তু পা বগেল।
তু চে দানী জওফে আবে দীদে গান,
আশেকে নানী তু চুঁ না দীদে গান।

অর্থ: মাওলানা বলেন, আমি যে কথা উল্লেখ করিয়াছি, প্রত্যেক বস্তু ইহার পদ্ধতি দ্বারা হাসেল করিতে হয়; ইহা যদি বুঝিয়া থাক, তবে মারেফাত হাসেল করিতে হইলে রিয়াজাত অবলম্বন ও মান্য কর। তাই মওলানা পুনরায় উল্লেখ করিতেছেন যে, যদি উল্লেখিত কথার সারমর্ম বুঝিয়া থাক, তবে এক টুকরা ছেঁড়া কম্বল লও এবং দুঃখের সহিত কান্নাকাটি করিতে থাক। নির্জন স্থান তালাশ করিয়া সেখানে গিয়া নির্জনতা অবলম্বণ কর। কেননা, হজরত আদম (আ:) আল্লাহর গজব হইতে এই নালা জারি করিয়াই রক্ষা পাইয়াছেন। তোমার তওবা কবুল হওয়ার জন্য ইহাই অশ্রুসিক্তের সময়। রোণাজারি কী বস্তু? ইহা অনুভব করার জন্য হজরত আদম (আ:) আসমান হইতে জমীনে আসিয়াছিলেন। ইহা এমন শাস্তি ছিল, যেমন এক পায়ের উপর দাঁড়াইয়া শাস্তি ভোগ করা; শুধু তওবা ও ওজর খাহী করার জন্য তাশরীফ আনিয়াছিলেন। তাই মাওলানা বলেন, যদি তোমরা আদম সন্তান হইয়া থাক, তবে তোমরা আল্লাহ অন্বেষণকারী দলের অন্তর্ভুক্ত থাক। অন্তরের আগুন আল্লাহর মহব্বত ও চক্ষের অশ্রু দিয়া শুধু অনুকরণ কর। কেননা, বাগানের উর্বরাশক্তি মেঘ ও সূর্যের তাপ দিয়া সৃষ্টি হয়। তোমার অন্তরকেও তাজা করিতে আল্লাহর মহব্বত ও চক্ষের পানির দরকার আছে। কিন্তু তুমি নামমাত্র নরম অন্তঃকরণ বিশিষ্ট, তোমার অন্তর কান্নাকাটির স্বাদ বুঝিতে পারে না। তুমি শকুনের মত দুনিয়ার মহব্বত ও গায়েরুল্লাহর ভালবাসায় আসক্ত রহিয়াছ। তুমি দৃষ্টিমান চক্ষুর স্বাদ কী করিয়া বুঝিবে? তুমি তো অন্ধের ন্যায় রুটি গোস্তের জন্য পাগল হইয়া রহিয়াছ।

গার তু ইঁ আবনানো জেনানে খালি কুনি,
পুর জে গওহার হায়ে এজলালি কুনি।
তেফলে জানে আজ শেরে শয়তানে বাজ কুন,
বাদে আজাঁনাশ বা মালেকে আম্বাজ কুন।
তা তু তারীকে ও মলুলো ও তীরাহ,
দাঁ কে বা দেও লায়ীন হাম শীরাহ।
লোকমায়ে কো নূরে আফজুদ ও কামাল,
আঁ বুদ আওরদাহ আজ কছবে হালাল।
রওগনে কাইয়াদে চেরাগে মা কাশাদ,
আব খানাশ চুঁ চেরাগেরা কাশাদ।
এলমো হেকমাত জে আইয়াদ আজ কছবে হালাল,
ইশকো রেক্কাত জে আইয়াদ আজ কছবে হালাল।

অর্থ: মাওলানা বলেন, যদি তোমার পেটের পোষ্যদিগকে লালসা হইতে খালি করিতে পার, তবে তুমি খোদার নূর দেখিতে পাইবে। খোদার মহব্বতে অন্তর পরিপূর্ণ করিতে পারিবে। যদি তুমি তোমার শিশু রূহকে শয়তানরূপ বাঘ হইতে দূরে রাখিতে পার, তাহা হইলে রূহকে ফেরেস্তায় পরিণত করিতে পারিবে। যখন তোমার অন্তঃকরণ অন্ধকার দেখিতে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার দেল অশান্ত ও উচ্ছৃঙ্খল অবস্থায় থাকিবে এবং জানিয়া রাখিবে যে, শয়তানি কার্যকলাপে লিপ্ত আছ। মাওলানা হারাম কামাই ও হারাম খাদ্য খাইতে নিষেধ করিতে যাইয়া বলিতেছেন, খাদ্য দ্বারা আল্লাহর নূর ও কামালাত বৃদ্ধি পায়। ঐ খানা যাহা হালাল কামাই দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া যায়। হারাম লোকমা দ্বারা অন্তরের নূর ও আল্লাহর মহব্বত বিদূরিত হইয়া যায়। ইহার দৃষ্টান্ত দিয়া বলিতেছেন, যে তৈল চেরাগের মধ্যে যাইয়া চেরাগ নিভাইয়া ফেলে, ইহাকে পানি মনে করিতে হইবে। যাহা চেরাগের জন্য ক্ষতিকারক। এইভাবে যে খাদ্য দ্বারা আমাদের অন্তরের আলো দূর হইয়া যায়, উহা প্রকৃতপক্ষে খাদ্য নয়, বরং বিষতুল্য ক্ষতিকারক। উহা হইতে বাঁচিয়া থাকা আবশ্যক। হালাল কামাইয়ের নমুনা হইল, ইহা দ্বারা এলেম ও হেকমাত বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। অন্তঃকরণ কোমল হয়।

চুঁ জে লোকমা তু হাছাদ বীনি ও দাম,
জাহাল ও গাফলাত জে আইয়াদ আঁরা দাঁহারাম।
হীচে গন্দম কারে ও জু বর দেহাদ,
দীদায়ে আছপে কে কাররাহ খর দেহাদ।
লোকমা তোখ্‌মাস্ত ও বরাশ আন্দেশা হা,
লোকমা বহরো ও গওহারাশ অন্দেশাহা।
জে আইয়াদ আজ লোকমা হলাল আন্দর দেহাঁ,
মায়েলে খেদমাত আজমে রফতান আঁ জাহাঁ
জে আইয়াদ আজ লোকমা হলাল আয় মাহ্‌ হুজুর
দর দেলে পাক তু উ দর দীদাহ্‌ নূর।
ইঁ ছুখান পায়ানে নাদারাদ আয় কেয়া,
বহছে বাজারে গানো ও তুতী কুন বয়া।

অর্থ: মাওলানা বলেন, তুমি যখন দেখিবে তোমার খাদ্য দ্বারা তোমার মধ্যে হিংসা, ধোকাবাজী, জেহালতী ও গাফলাতী বৃদ্ধি পাইতেছে, তখন মনে করিবে ঐ খাদ্য হালাল না, বরং হারাম। ইহা কি কখনও হইতে পারে যে গম বপন করিলে ভূট্টা জন্মে? কোনো ঘোড়ীর পেটে গাধার বাচ্চা জন্মে না। এই রকম হারাম খাদ্য দ্বারা অন্তর পাক হইতে পারে না। যেমন দানা সেই রকম ফল পাওয়া যায়, যে রকম সাগর সেই রকম মুক্তা হয়। এই রকমভাবে যেমন খাদ্য তেমনি ধারণা জন্মে। হালাল খাদ্য দ্বারা খোদার ইবাদতের উৎসাহ বাড়ে এবং পরকালে যাইবার জন্য প্রস্তুত করে। হালাল খাদ্যে অন্তঃকরণ শান্ত হয় এবং আল্লাহর নূর দেখার শক্তি পয়দা হয়। এই কথার শেষ নাই। এই জন্য সওদাগার ও তোতার কেচ্ছা আরম্ভ করা উচিত।

সওদাগার হিন্দুস্তানে তোতাদের যে অবস্থা দেখিয়াছে, উহা নিজ তোতার কাছে বর্ণনা করা

করদ বাজারে গান তেজারাত রা তামাম,
বাজ আমদ ছুয়ে মনজেলে শাদে কাম।
হর গোলামেরা বইয়া ওয়ারাদ আরমেগান,
হর কানিজাকরা ব বখশীদ উ নেশান।
গোফ্‌তে তুতী আরমগানে বান্দাহ্‌ কো,
আঁচে গোফতী ওয়াঁ চে দীদে বাজে গো।
গোফ্‌তে নায়েমান খোদে পেশে মানাম আজাঁ,
দস্তে খোদ খায়ানে ও আংগাস্তানে গুজাঁ।
মান চেরা পয়গাম খামে আজ গুজাফ,
বুরদাম আজ বে দানেশী ওয়াজ নেশাফ্‌।
গোফ্‌তে আজ খাজাহ্‌ পেশে মানীজে চীস্ত,
চীস্তে আঁ কীঁ খশমো ও গমরা মোক্তাজীস্ত।
গোফ্‌ত গোফতাম আঁ শেকায়েত হায়ে তু।
বা গেরোহে তুতীয়াঁ হিম্মাত হায়ে তু।
আঁ একে তুতী জে দরদাত বুয়ে বুরাদ,
জহ্‌রাশ বদর দীদ ও লরজীদ ও ব মোরদ।
মান পেশে মানে গাস্তাম ইঁ গোফতান চে বুদ,
লেকে চুঁ গোফতাম পেশে মানী চে ছুদ।
নকতায়ে কানে জুস্ত নাগাহ্‌ আজ জবান,
হাম চু তীরে দাঁ কে জুস্তেআওয়াজে কামান।
ওয়া না গরদাদ আজ রাহে আঁ তীর আয় পেছার,
বন্দে বাইয়াদ করদে ছায়েলারা আজ ছাব।
চুঁ গোজাস্ত আজ ছার জাহানীরা গেরেফত,
গার জাহাঁ বীরান কুনাদ নাবুদ শেগাফ্‌ত।

অর্থ: ঐ সওদাগার তেজারাতের কাজ শেষ করিয়া নিজের দেশে খুশী হইয়া ফিরিয়া গেল। প্রত্যেক গোলামের জন্য তাহাদের ফরমায়েশ অনুযায়ী উপঢৌকন আনিয়া দিল এবং প্রত্যেক দাসীর জন্য তাহাদের নির্দিষ্ট ভাগ আনিয়া দিল। তোতা বলিল, আমার ইনয়াম কোথায়? তুমি যাহা বলিয়াছ, এবং যাহা দেখিয়াছ সবকিছু বর্ণনা কর। সওদাগর উত্তর করিল, আমি কিছু বলিনা, কারণ আমি ঐ বর্ণনা দ্বারা এখন পর্যন্ত লজ্জিত আছি যে আমি এমন খবর না বুঝিয়া ও চিন্তা না করিয়া অজ্ঞানের ন্যায় কেন পৌঁছাইয়া দিলাম? তোতা বলিল, লজ্জিত হইলে কেন? সে কী কথা! যাহা দ্বারা এত চিন্তিত ও লজ্জিত হইয়াছ। সওদাগার বলিল, আমি তোমার সমস্ত ঘটনা তোমার স্বজাতি তোতাদের কাছে খুলিয়া বলিয়াছিলাম। উহাদের মধ্য হইতে একটি তোতার তোমার জন্য ব্যথা লাগিল, তৎক্ষণাৎ কলিজা ফাটিয়া থর থর করিয়া কাঁপিয়া পড়িয়া মরিয়া গেল। তাহাতে আমি লজ্জিত হইয়া পড়িয়াছি যে, এই খবর বলার কী আবশ্যক ছিল? যখন বলিয়া ফেলিয়াছি, তখন আর লজ্জিত হইলে কী উপকার হইবে? কেননা, যে কথা মুখ হইতে বাহির হইয়া গিয়াছে, ইহার দৃষ্টান্ত এইরূপ মনে কর, যেমন, যদি তীর কামান হইতে বাহির হইয়া যায়, তবে ঐ তীর পথিমধ্য হইতে ফিরিয়া আসিবে না। তখন অনুভব করায় কোনো ফল লাভ হইবে না। হাঁ, যদি প্রথম হইতে ইহা বন্ধ করা যায়, তবে সহজ হয়। যেমন পানির ঢল, প্রথমেই বাধা দেওয়া দরকার, নতুবা বড় হইয়া আসিলে একেবারে ভূবন ডুবাইয়া দিবে, তখন আশ্চর্য হইবার কিছু থাকিবে না।

ফেলেরা দরগায়েবে আছরেহা জাদে নীস্ত,
দাঁ মাওয়ালীদাশ ব হুকমে খলকে নীস্ত।
বে শরীক জুমলা মাখলুকে খোদাস্ত,
আঁ মাওয়ালীদে আরচেনেছাবাতশানে বেমাস্ত।
জায়েদ পরানীদ তীরে ছুয়ে আমর,
আমর রা বগেরেফত তীরাশ হামচু নমর।
মুদ্দাদাতে ছালে হামী জে আইয়াদ দরদ,
দরদে হারা আফরিনাদ হক না মরদ।
জায়েদ রা মী আন্দাম আর মরদে আজ ও জাল,
দরদে হামী জায়েদ আঁ জা তা আজল।
জে আঁ মাওয়ালীদো ওজায়া চুঁ মরদে উ,
জায়েদ রা আজ আউয়াল ছবাব কাত্তালে উ।
আঁ ওয়াজায়া হারা বদু মানছুবে দার,
গারচে হাস্তে আঁ জুমলা ছানায়া কেরদেগার।
হাম চুনীঁ কাস্তো ওদম ও দামো জেমায়া,
আঁ মাওয়ালীদাস্ত হক রা মোস্তা তায়া।

অর্থ: মাওলানা বলেন, কাজ যদিও বান্দায় করে, কিন্তু ইহার ক্রিয়া আল্লাহর তরফ হইতে হয়। ঐ ক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া আর না হওয়া বান্দার হাতে কোনো শক্তি নাই। বান্দা জানে না যে এই কাজের ক্রিয়া কী হইবে? আল্লাহর তরফ হইতে যে ক্রিয়া কাজের মাধ্যমে হইয়া থাকে, ইহার সম্বন্ধ বান্দার দিকে করা হয়। যেমন জায়েদ আমরকে মারিয়া ফেলিয়াছে। ইহার অর্থ এই যে, জায়েদ শুধু তরবারি দ্বারা আঘাত করিয়াছিল, প্রকৃত মৃত্যু ঘটান উহা আল্লাহর কাজ। জায়েদ জান কবজ করে নাই। কিন্তু জায়েদ দ্বারা মৃত্যু হওয়ার কারণ হইয়াছে বলিয়া মৃত্যুর ক্রিয়া জায়েদের দিকে ফিরান হইয়াছে। যেমন মাওলানা উদাহরণ দিয়াছেন যে, জায়েদ আমরের প্রতি তীর নিক্ষেপ করিয়াছে এবং তীর যাইয়া আমরকে বাঘের ন্যায় পাকড়াইয়া লইয়াছে। ধরা যাক ঐ জখমের যন্ত্রণা এক বৎসর পর্যন্ত চলিতেছে এবং কষ্ট ভোগ করিতেছে। ইহাতে মনে করিতে হইবে ঐ যন্ত্রণা ও কষ্ট আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন। তীর নিক্ষেপকারী সৃষ্টি করেন নাই। ইহার প্রমাণ, যেমন জায়েদ তীর নিক্ষেপকারী, তীর নিক্ষেপ করার পর হঠাৎ কোনো ঘটনাক্রমে জায়েদ নিজেই মরিয়া গেল। কিন্তু তীর দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি জায়েদের মৃত্যুর পরও যন্ত্রণায় কষ্ট ভোগ করিতে থাকে। জায়েদের মৃত্যুর সাথে সাথে ঐ ব্যক্তির যন্ত্রণা ও কষ্ট দূর হইয়া যায় না। ইহাতে বুঝা যায়, জায়েদ প্রকৃতপক্ষে ঐ ব্যক্তির যন্ত্রণা সৃষ্টিকারী নয়। কেননা, যায়েদ যদি যন্ত্রণা সৃষ্টির কারণ হইত, তবে জায়েদের মৃত্যুর সাথে সাথে কারণ দূর হইয়া যাওয়ায় ইহার ক্রিয়া যন্ত্রণাও দূর হইয়া যাইত। কেননা, কাজের কর্তা না থাকিলে কাজ হইতে পারে না। ইহা স্বতঃসিদ্ধ বিধান। ইহাতে বুঝা গেল ঐ জায়েদ-ই যন্ত্রণা সৃষ্টির মালিক না। ঐ যন্ত্রণার কারণেই আমর মারা গেল। এখন জায়েদ আমরকে মারিয়াছে ইহা বলা হয় শুধু মরার কারণ সৃষ্টি করিয়াছে এই জন্য। প্রকৃত মারার কাজটি জায়েদ করে নাই, ইহা গায়েব থেকে করা হইয়াছে। এইজন্য বলা হইয়াছে প্রত্যেক কাজের অন্য প্রকার শক্তি নিহিত আছে। যাহা কাজ সম্পন্নকারী জানে না বা দেখে না। যেমন শস্যক্ষেত বুনান হয়, সকল রকম চেষ্টা তদবীর করা হয়, জাল বিস্তার করিয়া দেওয়া হয়। অর্থাৎ, যাহা কিছু করা হয় সবই আল্লার ইচ্ছায় করা হয়।

আওলিয়ারা হাস্তে কুদরাত এজালাহ,
তীরে জুস্তাহ বাজে আরান্দাশ জেরাহ্‌।
বস্তা দরহায়ে মাওয়ালীদে আজ ছবাব,
চুঁ পেশে মান শোদ ওয়ালে আজ দস্তেরব।
গোফতাহ্‌ না গোফতাহ্‌ কুনাদ আজ ফতেহ্‌ বাব,
তা আজ আঁ নায়ে সীকে ছুজাদ নায়ে কাবাব।
গারাত বোরহানে বাইয়াদ ও হুজ্জাত মাহা,
আজ নবে খান আয়াহ্‌ আও নুনছিহা।
আয়াতে আনছুকুন জেকরা বখাঁ,
‍কুদরাতে নেছইয়ান নেহাদান শানে বদাঁ।
আজ হামাহ্‌ দেলহা কে আঁ নকতাহ্‌ শনীদ,
আঁ ছুখান রা করদে মোহো ওনা পেদীদ।
চুঁ ব তাজকীর ওবা নেছইয়ান কাদেরান্দ,
বরহামা দেলহায়ে খলকানে কাহেরান্দ,
চুঁ বনেছইয়ান বস্তে উ রাহে নজর,
কারে না তাওয়াঁ কর দূরে বাশদ হুনার।
খুজতুমু ছিখরিয়া আহলেছ ছামু,
আজ নাবে খানেদ তা আনছুকুম।

অর্থ: উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, তীর কামান হইতে নিক্ষেপ করা হইয়া গেলে, উহা রদ করার ক্ষমতা থাকে না; এবং কথা মুখ হইতে বাহির হইয়া গেলে, ইহার ক্রিয়া বন্ধ রাখা যায় না। মাওলানা বলেন, কিন্তু অলি-আল্লাহদের নিকট তাহা রদ করার ক্ষমতা আছে। তাঁহারা আল্লাহর হুকুমে নিক্ষিপ্ত তীরকে বন্ধ করিয়া দিতে পারেন। অলি-আল্লাহ্‌রা খোদার নিকট হইতে নিক্ষিপ্ত তীরকে নেশানগাহ হইতে ফিরাইয়া দেওয়ার ক্ষমতা লাভ করিয়া থাকেন। যেমন, যখন অলি-আল্লাহ্‌রা নিজের কারণেই হউক বা অপর দ্বারা কৃত কারণে লজ্জিত হইবে মনে করেন, তখন তাঁহারা আল্লাহর কুদরাতের সাহায্যে ঐ কারণসমূহের ক্রিয়া বন্ধ করিয়া দেন। বলা কথাকে না বলার মত করিয়া দেন। যেমন শিকে আগুণ  জ্বলিবে না আর কাবাবও তৈয়ার হইবে না। যদি ইহার প্রমাণ তোমার দরকার হয়, তবে পবিত্র কুরআনের দুইটি আয়াত পাঠ করিয়া দেখ। একটি হইল, “নানছাহা”, অর্থাৎ, আল্লাহ বলেন, আমি ভুলাইয়া দেই। দ্বিতীয়টি হইল, “আনছুকুম জিকরি”, অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা ঠাট্টা বিদ্রূপকারী কাফেরদিগকে বলিবেন, তোমরা ঠাট্টা বিদ্রূপ এইরকমভাবে করিয়াছ যে, আমার স্মরণও ভুলাইয়া দিয়াছ। যখন আল্লাহতায়ালা ভুলাইয়া দেওয়ার মালিক, তখন মানুষের অন্তরে যাহা কিছু আসে, ভুলানের অসীলায় সব রদ করিয়া দিতে পারেন। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটাইতে চায়, তখন আল্লাহর অলি-আল্লাহর ইচ্ছায় উহা একেবারে ফিরাইয়া দিতে পারেন। তোমরা আরেফ লোকদিগকে ঠাট্টা ও বিদ্রুপের পাত্র করিয়াছিলে। অতএব, তোমাদিগকে আল্লাহতায়ালা ভুলাইয়া দিয়াছেন।

ছাহেবে দাহ বাদশাহ জেছমে হাস্ত,
ছাহেবে দেল শাহে দেল হায়ে শুমাস্ত।
ফরায়া দীদে আমল বে হীচে শক্‌,
পাছ নাবাশদ মরদমে ইল্লা মরদেমক।
মরদামাশ চুঁ মরদাম কে দীদান্দ খোরদ,
দর বোজর্গী মরদামক কাছরাহ্‌ না বোরদ।
মান তামাম ইঁরা নাইয়ারাম গোফতে জাঁ,
মানায়া মী আইয়াদ জে ছাহেবে মর কাজাঁ।
চুঁ ফরামুশী খলকো ইয়াদে শান,
বা ওয়ায়ে আস্ত উরা রছাদ ফর ইয়াদে শান।

অর্থা: মাওলানা এখানে অলি-আল্লাহদের মরতবা সম্বন্ধে বলিতেছেন যে, দুনিয়ার বাদশাহ তোমাদের দেহের মালিক এবং আরেফ লোক তোমাদের কলবের বাদশাহ। কেননা, উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আরেফ লোক কলবের উপর কার্যকলাপ করেন। আমল এলেমের শাখাস্বরূপ। অতএব, এলেম আমলের মূল উৎস। তাই মাওলানা এলেমের ফজিলাত বর্ণনা করিতে যাইয়া বলিতেছেন যে, মানুষ যদি কোনো কাজ করিতে চায়, তবে সে তখন পুতুলের ন্যায়; কারণ তাহাকে এলেম দ্বারা কাজ করিতে হয়। এই বাতেনী শক্তির নিকট নিজে পুতুলের ন্যায় হইয়া পড়ে। এই পুতুলের প্রকৃত বোজর্গির সম্বন্ধে কেহ ব্যাখা করে নাই, এইজন্য আমি পূর্ণ বর্ণনা করিতে পারি না। অতএব, যখন মাখলুকের স্মরণ ও স্মরণ না করা এই আহলে তাছাররাফদের সহিত যুক্ত, তখন তাহাদের জন্য প্রার্থনা করার দায়িত্ব আরেফদের উপর পৌঁছিয়াছে।

ছদ হাজারাণে নেক ও বদরাবিহি
মী কুনাদ হর শবে জে দেলহা শানে তিহি।
রোজে দেলহারা আজাঁ পুর মী কুনাদ,
আঁ ছদফেহারা পুর আজ দূর রে মী কুনাদ।
আঁ হামাহ্‌ আন্দেশায়ে পেশানে হা,
মী শেনাছাদ আজ হেদায়েত জানেহা।
পেশা ও ফরহংগে তু আইয়াদ বা তু,
তা দরে আছবাব বা কোশাইয়াদ বা তু।
পেশায়ে জরগর বা আহাংগর না শোদ,
খোয়ে ইঁ খোশ খো বা আঁ মুনকের না শোদ।
পেশাহা ও খলকো হা হাম চুঁ জাহিজ,
ছুয়ে খবমে আইয়ান্দ রোজে রস্তাখীজ।
পেশাহাও খলকোহা আজবাদে খাব,
ওয়াপেছ আইয়াদ হাম ব খচমে খোদে শেতাব।
ছুরাতে কাঁ বর নেহাদাতে গালেবাস্ত,
হাম বর আঁ তাছবীরে হাশরাত ওয়াজেবাস্ত।
পেশাহা ও আন্দেশাহা দর ওয়াক্তে ছুবাহ,
হামবদ আঁজা শোদকে বুদ আঁ হুছনো কুবাহ্‌।
চুঁ কবুতর হায়ে পেকে আজ শহরে হা,
ছুয়ে শহরে খেশ আরাদ বহরে হা।
হরচে বীনি ছুয়ে আছলে খোদ রাওয়াদ,
জুয বো ছুয়ে কুল্লে খোদ রাজেয় শওয়াদ।

অর্থ: এখানে মাওলানা আউলিয়াদের অন্য এক প্রকার আমলের কথা বর্ণনা করিতেছেন, হাজার হাজার ভাল মন্দ খেয়ালাত মানুষের অন্তর হইতে অলিরা নিজেদের হাজার কামালাতের রউশনি দ্বারা প্রত্যেক রাত্রে বাহির করিয়া দেন। পুনঃ দিনে ঐ সব খেয়াল দ্বারা অন্তর পরিপূর্ণ করিয়া দেন । ঝিনুককে মুক্তা দিয়া পরিপূর্ণ করিয়া দেন। এই সমস্ত কাজ তাঁহারা করিয়া থাকেন, তাঁহাদের কাজ ফেরেস্তাদের ন্যায়; ফেরেস্তারা এইসব কাজ করিয়া থাকেন। বর্তমান অবস্থায় যেমন আমল করিতেছেন, অতীতকেও কাশ্‌ফ দ্বারা হাসেল করিতে পারেন। তাহাদের কারণে তোমাদের পেশা, হুনারস ও দানাই জাগ্রত হওয়ার সময় ফিরিয়া পাও। উহা দ্বারা তোমাদের কামাই রোজগারের কাজ পূর্ণভাবে করিতে পার। স্বর্ণকারের পেশা লৌহকারের নিকট যায় না। উত্তম চরিত্র বদলোকের কাছে যায় না। যে রকম আসবাবপত্র সেই অনুযায়ী মালিকের কাছে যায়। এইভাবে সব পেশা, ইহার মালিকের কাছে যায়। তোমার দৃঢ় ধারণার বস্তু তুমিই পাইবে। খবর-বাহক কবুতর যেমন অন্য দেশসমূহ হইতে খবর লইয়া নিজ দেশে ফিরিয়া আসে, মানুষের ধারণা ও বিশ্বাস সেই রকম খবর-বাহক কবুতরের ন্যায় নিজের ধারণার স্থানে আসিয়া যায়। অতএব, তোমার ধারণা অনুযায়ী যে অবস্থা তোমার হইবে, সেই অবস্থায়ই হাশরের ময়দানে উঠিতে হইবে। প্রত্যেক শাখা প্রশাখা নিজের মূলের দিকে ফিরিয়া যায়।

সওদাগারের তোতা ঐ তোতার অবস্থা শুনিয়া মরিয়া যাওয়া এবং সওদাগার নিজ তোতার জন্য দুঃখিত হওয়া

চুঁ শনীদ আঁ মোরগে কাঁ তুতী চে করদ,
হাম র লরজীদ ও ফাতাদ ও গাস্তে ছরদ।
খাজা চুঁ দীদাশ ফাতাদাহ্‌ হাম চুনিঁ,
বর জাহিদো জাদ কুল্‌হারা বর জমীন।
চুঁ বদীঁ রংগো বদীঁ হালাশ বদীদ।
খাজা বর জুস্ত ও গেরিবান রা দরীদ।
গোফত আয় তুতী খুবে খেশ চুনীঁ,
হায় চে বুদাত ইঁ চেরা গাস্তী চুনীঁ।
আয় দেরেগা মোরগে খোশ আওয়াজে মান,
আয় দেরেগা হাম দম ও হামরাজে মান।
আয়ে দেরেগা মোরগে খোশ এলাহানে মান,
রূহে রূহো রওজায়ে রেজওয়ানে মান।
গার ছোলাইমান রা চুনীঁ মোরগে বুদে,
কে খোদ উ মশগুলে আঁ মোরগানে শোদে।
আয় দেরেগা মোরগে কারে জানে ইয়াফতাম,
জুদে রো আজরুয়ে আঁ বর তাফ্‌ তাম।

অর্থ: যখন সওদাগারের তোতা হিন্দুস্তানের তোতার ঘটনা শুনিল, তখনই সে থর-থর করিয়া কাঁপিয়া উঠিয়া পড়িয়া গেল এবং মরিয়া গেল। সওদাগার যখন ইহাকে পতিত দেখিল, ভীত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল এবং টুপী মাটিতে নিক্ষেপ করিয়া ফেলিল। সওদাগার যখন ইহাকে এই অবস্থায় দেখিল, তখন হতভম্ব হইয়া নিজের জামা ছিঁড়িয়া ফেলিল এবং বলিতে লাগিল, হে মিষ্ট-ভাষী তোতা! তুমি এ রকম হইলে কেন? হে সুমধুর গায়ক! হে আমার অন্তরের সাথী! হে আমার প্রাণের শান্তিদাতা এবং আমার খুশীর বাগান। যদি হজরত সোলাইমান (আ:)-এর এই রকম সুন্দর পাখী থাকিত, তবে তিনি আর কোনো পাখীর দিকে লক্ষ্য করিতেন না। হায় আফসোস! আমার প্রাণের পাখী পাইয়াছিলাম, কিন্তু এত শীঘ্রই ইহা আমা হইতে চলিয়া যাইবে, ধারণা করিতে পারি নাই।

আয় জবানে তু বছ জেয়ানী মর মরা,
চুঁ তুই গোয়া চে গুইয়াম তর তোরা।
আয় জবানে হাম আতেশো ও হাম খরমনি,
চান্দে ইঁ আতেশে দরইঁ খরমান জানি।
দর নেহানে জানে আজ তু আফগানে মী কুনাদ,
গার্‌চে হর্‌চে গুইয়াশ আঁ মী কুনাদ।
আয় জবানে হাম গঞ্জে বে পায়ানে তুই,
আয় জবানে হাম দরদে বে দরমানে তুই।
হামছফী রোও খোদায়য়ে মোরগানে তুই,
হাম আনিছে ওয়াহশাতে হিজরানে তুই।
হাম খফিরো রাহবরে ইয়ারানে তুই,
হাম বলিছো ও জুলমাতে কুফরানে তুই।
চান্দে আমা নাম মীদিহী আয় বে আমান,
আয় তু জাহে করদাহ বফীন মান কামান।
নফে বপিরানিদাহ্‌ মোর মারাহ,
দর চেরাগোহে ছেতাম কম কুনচেরা।
ইয়া জওয়াবে মা বদেহ্‌ ইয়া দাদে দেহ্‌,
ইয়া মর আজ আছবাবে শাদী ইয়াদে দেহ।
আয় দেরেগা নূরে জুলমাত ছুজে মান,
আয় দেরেগা ছুরাহ্‌ রোজে আফরোজে মান।
আয় দেরেগা মোরগে খোশ পরওয়াজে মান।
জে ইনতেহা পরিদাহ্‌ তা আগাজে মান।
আশেকে রঞ্জাস্ত নাদানে তা আবাদ,
খীজে লা উকছেমু বখাঁ তা ফী কাবাদ।
আজ কাবাদে ফারেগ শোদাম বা রুয়ে তু,
ওয়াজ জবাদে ছাফীয়ে বুদাম দর জুয়ে তু।

অর্থ: সওদাগারের জবানের দরুণ নিজেকে কষ্ট ভোগ করিতে হইতেছে। এইজন্য এখন জবানের নিন্দা করিতেছে যে, হে জিহ্বা! আমি তোমাকে কী বলিব? আমি তোমাকে কী বলিব? আমি তোমাকে যাহা কিছু বলিব, ইহা বলার যন্ত্র তুমি-ই। মন্দ বলিতে হইলে তোমার সাহায্য লইতে হইবে। এইজন্য অন্তর খুলিয়া তোমাকে মন্দ বলাও সম্ভব না। হে জিহ্বা! তুমি অগ্নিস্বরূপ, তোমার থেকে মন্দ জিনিস বাহির হয়। আবার তুমি উত্তম; কেননা, তুমি-ই নেক কালাম পাঠ করিয়া থাক। তুমি আর কতকাল মন্দ বাক্য উচ্চারণ করিয়া উত্তম বাক্যসমূহকে জ্বালাইয়া ছারখার করিয়া দিবে। আমার অন্তর তোমার হাত হইতে রেহাই পাইবার জন্য সর্বদা কাঁদিতেছে। যদিও ইহা সত্য যে, তুমি যে কথা বল, জান উহাই করে। হে জবান! তুমি অসীম ধনের ভাণ্ডার, অর্থাৎ, কালেমাতে তাওহীদের ভাণ্ডার ও অফুরন্ত যন্ত্রণার পাত্র, যেহেতু তোমার দ্বারা কুফরি বাক্য উচ্চারিত হয়। হে জবান, তুমি ধোকা দেওয়ার বুলি উচ্চারণ করিতে পার, অর্থাৎ, জানোয়ারের আওয়াজ দিয়া ফাঁদে আবদ্ধ করিয়া লইতে পার, এবং তুমি বিরহ ব্যথার সান্ত্বনা দিতে পার। অর্থাৎ, দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্য সান্ত্বনার বাক্য শুনাইতে পার। তুমি পথ প্রদর্শকও হইতে পার, এবং ইবলিস, জালেম ও কাফেরও হইতে পার। তুমি পথভ্রষ্টকারীও হইতে পার। হে আপদ, তোমা হইতে নিরাপদ হওয়া যায় না। তুমি আমার প্রতি হিংসার মূর্তি ধারণ করিয়াছ। তুমি আমাকে কবে মুক্তি দিবে? কখনও মুক্তি দিবে না। তুমি আমার প্রিয় পাখীকে মারিয়া ফেলিয়াছ। এখন তুমি আর জুলুম করিও না। হয় আমার নিন্দার উত্তর দাও, না হয় আমার প্রতি ইনসাফ কর। আমাকে সান্ত্বনার বাক্য শুনাও, যাহাতে আমি শান্তি পাই, আল্লাহকে স্মরণ করি। আল্লাহর স্মরণে মনের যাতনা, দুঃখ-কষ্ট দূর হইয়া যায়। আল্লাহর স্মরণে অন্তর হইতে আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু দূর হইয়া যায়। আফসোস, আমার পাখী, যে আমার দুঃখের সময় শান্তি দিত; হে আমার প্রাতঃকালের সান্ত্বনা দাতা, হে আমার জীবনের শান্তিদাতা, তুমি মরিয়া যাওয়ায় আমার জীবনের প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত অশান্তিতে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে। মানুষ অজ্ঞ, বেয়াকুফ; তাই জীবন ভর দুঃখ-কষ্টের প্রেমিক থাকে। অর্থাৎ, নানা প্রকার দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত থাকে। সাবধান হও, এবং লাউক্‌ছেমু হইতে কাবাদ পর্যন্ত, অর্থাৎ, প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত অন্তরের অন্তঃস্থল পর্যন্ত যাইয়া চিন্তা করিয়া দেখ, এই কথা সত্য কি-না? কিন্তু তোতা, তোমাকে পাইয়া সকলে দুঃখ-কষ্ট ভুলিয়া গিয়াছিল। তোমার সাহচর্যে সকলেই সুখী ছিল।

ইঁ দেরেগা বা খেয়ালে দীদান্ত,
ওয়াজ অজুদে নকদে খোদ বাবুরিদানাস্ত।
গায়রাতে হক বুদে ও বা হকে চারাহ্‌ নিস্ত,
কো দেলে কাজ হুক্‌মে হক ছদ পারাহ্‌ নিস্ত।
গায়রাতে আঁ বাশদ কে উ গায়বে হামাস্ত,
আঁকে আকজুঁ আজ বয়ানে দমদমাস্ত।
আয় দেরেগা আশকে মান দরিয়া বুদে,
তা নেছারে দেলবর জীবা শোদে।
তুতীয়ে মান মোরগে জীরাক ছারে মান,
তরজমানে ফেক্‌রাত ও আছরারে মান।
হরচে রোজে দাদ নাদাদ আমদাম,
উজে আউয়াল গোফ্‌তে তা বাদে আমদাম।অর্থ: উপরে সওদাগার শোকার্ত হইয়া কিছু বর্ণনা করিয়াছে, ইহার কোনো সারমর্ম নাই। এখানে তবিয়াতের ব্যতিক্রম জ্ঞানপূর্ণ কথা বলিতেছে যে, আমি যে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করিতেছি, ইহা শুধু দৃষ্টির খেয়াল। এই নগদ খেয়াল দ্বারা জীবন নষ্ট হইয়া যায়। এত পরিমাণ দুঃখিত হওয়া অনর্থক। দুঃখিত হওয়ার কারণও সাময়িক, পরিণাম খারাপ। এই তোতা পাখী আল্লাহর ইচ্ছায় মরিয়া গিয়াছে। আল্লাহতায়ালা ব্যতীত অন্য কাহারও জন্য মহব্বত থাকা আল্লাহ পছন্দ করেন না। আল্লাহর হুকুম ছাড়া অন্য কাহারও কোনো সাধ্য নাই। কোনো দেল এমন নাই যে, খোদার হুকুমের ক্রিয়া হয় না। গায়েরাতের অর্থ আল্লাহ ছাড়া সবই গায়েব। তিনি এমন যে, বর্ণনা এবং যে কোনো তদবীর চেষ্টার ঊর্ধ্বে। সমস্ত সৃষ্ট বস্তু গায়েরুল্লাহ। গায়েরুল্লাহর সহিত মহব্বত করা আল্লাহ পছন্দ করেন না। এইজন্য কোনো কোনো সময় গায়েরুল্লাহকে উঠাইয়া নেন। পুনঃ সওদাগার তবিয়াতের বশবর্তী হইয়া বলিতেছে, আফসোস, যদি আমার অশ্রু সাগরে পরিণত হয়, তবে ইহাও আমার প্রিয় তোতার জন্য উৎসর্গ হইয়া যাইত। আমার তোতা বিচক্ষণ জ্ঞানীর ন্যায় ছিল। আমার চিন্তা ও অন্তরের রহস্য সমূহ ইশারায় বুঝিয়া যাইত। ইহা এতদূর চালাক ছিল যে, আল্লাহর তরফ হইতে আমাকে যে রেজেক ও নেয়ামত দান করা হইত, ইহার জন্য আমি শুকুর আদায় না করিলে, তোতা নিজেই শুকুর আদায় করিতে থাকিত। আমারও শুকুর আদায় করার কথা মনে পড়িয়া যাইত।তুতীয়ে কে আইয়াদ জে ওহি আওয়াজে উ,
পেশে জে আগাজ ও জুদে আগাজে উ।
আন্দরুনে তুস্ত আঁয তুতী নেহাঁ,
আকছে উরা দীদাহ্‌ তু বর ইঁ ও আঁ।
মী বোরাদ শাদিয়াতে রা তু শাদ আজু।
মীপেজিরী জুলমেরাচু দাদ আজ।
আয়কে জানেরা বহরে তন মী ছুখ্‌তী,
ছুখ্‌তী জানেরা উ তন আফরুখতী।
ছুখ্‌তী মান ছুখতাহ্‌ খাহাদ কাছে,
তাজে মান আতেশে জানাদ আন্দর খাছে।
ছুখতাহ্‌ চুঁ কাবেলে আতেশে বুদ,
ছুখতাহ্‌ বোস্তানে কে আতেশে কাশ বুদ।
আয় দেরেগা আয় দেরেগা আয় দেরেগ,
কে আঁ চুনা মাহে নেহাঁ শোদ জীরে মেগ।
চুঁ জানাম দমে কে আতেশে দেল তেজ শোদ,
শেরে হেজরে আশুফ্‌তাহ্‌ ও খোঁরীজে শোদ।
আঁ কে উ হুশিয়ারে খোদ তন দস্তো ও মস্ত,
চুঁ বুদ চুঁ উ কাদাহ্‌ গীরাদ ব দস্ত।
শেরে মস্তে কাজ ছেফাতে বীরুঁ বুদ,
আজ বছীতে মোরগে জার আফছু বুদ।অর্থ: মাওলানা এখানে প্রকাশ্য তোতাকে বাতেনী তোতা, অর্থাৎ, রূহের সহিত তুলনা করিয়া বর্ণনা করিতেছেন যে, তোমাদের ভিতর এমন তোতা পাখী আছে, যে আল্লাহর এলহাম দ্বারা কথা বলে। তোমরা ইহার ক্রিয়াকলাপ দেহে এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গে অনুভব করিতেছ। এই ক্রিয়ার বিরুদ্ধ আচরণ তোমার স্থায়ী শান্তিকে নষ্ট করিতেছে । তুমি ইহার বিরুদ্ধ আচরণ করিয়া জুলুম করিতেছ এবং এই জুলুমকে ন্যায় আচরণ বলিয়া মনে করিতেছ। ওহে মানুষ, তোমরা দেহের শান্তির জন্য রূহকে জ্বালাইয়া ধ্বংস করিয়া দিয়াছ এবং দেহের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করিয়াছ। যদি ইহার বিপরীত করিতে, তবে ভাল হইত। যেমন আমি করিয়াছি। আমি রূহের জন্য দেহকে জ্বালাইয়া দিয়াছি। অতএব, যাহার দগ্ধ হইতে ইচ্ছা হয়, সে আমার নিকট হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিতে পার। আমার নিকট হইতে অগ্নি নিয়া শিক্ষার্থীর অন্তরে লাগাইয়া দাও। কেননা, প্রজ্বলিত আগুন-ই হইল প্রকৃত আগুন। ইহাই আল্লাহর দরবারে কবুল করাইয়া দিতে পারে। অতএব, তোমার এইরূপ আগুন লওয়া উচিত। যদি আগুন লইতে চাও, অর্থাৎ, তুমি যদি আল্লাহর ইশক লাভ করিতে চাও, তবে প্রকৃত আল্লাহর ইশক যাহার মধ্যে প্রস্ফুটিত দেখিতে পাও, তাঁহার নিকট হইতে শিক্ষা লাভ কর। তবে তুমি প্রকৃত আল্লাহর আশেক হইতে পারিবে। মাওলানা দুঃখ প্রকাশ করিয়া বলেন, হাজার হাজার আফসোস, এই প্রকার রূহ দেহরূপ আবরণের নিচে ঢাকা পড়িয়া গিয়াছে, অর্থাৎ, লোক আল্লাহর মহব্বত হইতে গাফেল হইয়া রহিয়াছে, তাহারা শুধু দেহ পূজার পিছনে লাগিয়া রহিয়াছে। রূহের মারেফাত হাসেল করে নাই। আমি কীভাবে কথাবার্তা বলিব ধারণা করিতে পারি না। কারণ আমি আমার মাহ্‌বুবে হাকিকী হইতে পৃথক হওয়ার কারণে উন্মাদ বাঘের ন্যায় রক্ত পিপাসু হইয়া পড়িয়াছি। আমার ইশকের আগুন খুব তেজের সহিত জ্বলিতেছে। ইশকের তেজে আমার কথা বলা বন্ধ হইয়া গিয়াছে। আর আমি কেমন করিয়া বর্ণনা করিতে পারিব? যেহেতু, আমি আমার সুস্থ ও হুঁশের অবস্থায়ও অর্ধেক মাস্ত থাকি, ইহার উপর যদি ইশকের শরাব পান করিতে পাই, অর্থাৎ, ইশকের কথা বর্ণনা করিতে হয়, তবে আমার অবস্থা কীরূপ ধারণ করে খেয়াল করিয়া দেখা উচিত।কাফিয়া আন্দেশাম ও দেলদারে মান,
গুইয়াদাম মান্দেশে জুয দীদারে মান।
খেশে নেলি আয় কাফিয়া আন্দেশে মান,
কাফিয়া দৌলাতে তুই দর পেশে মান।
হরফে চে বুদ তা তু আন্দেশী আজ আঁ,
ছওতে চে বুদ খারে দউয়ারে রজাঁ।
হরকো ছওতো গোফতেরা বরহাম জানাম,
তাকে বে ইঁ হরছে বাতু দাম জানাম।
আঁ দমে কাজ আদমাশ করদাম নেহাঁ,
বাতু গুইয়াম আয় তু আছরারে জাহাঁ।
আঁদমে রা কে না গোফ্‌তাম বা খলিল,
ও আঁদমেরা কে নাদানাদ জিব্‌রিল।
আঁদমে কাজওয়ায়ে মছীহা দমে নাজাদ,
হক জে গায়েরাত নীজ বে মাহাম নাজাদ।
মা চে বাশদ দর লোগাতে ইছবাতো নফী।
মান না আছবাতান মানম বেজাতো নফী।
মান কাছে দর না কাছে বদর ইয়াফতাম,
পাছ কাছে দর না কাছে দর ইয়াফতাম।অর্থ: এখানে মাওলানা ইশকের রহস্য বর্ণনা করার অপারগতা সম্বন্ধে অন্য কারণ বর্ণনা করিতেছেন। তিনি বলেন, আমি যখন খোদার মহব্বতের তাড়নায় অস্থির থাকি, তখন রহস্য বর্ণনা করার জন্য আমি ছন্দ তালাশ করি। সেই সময় আমার মাহবুবে হাকিকী বলেন, আমাকে আমার সাক্ষাৎ পাওয়া ব্যতীত অন্য কিছুর জন্য চিন্তা করা চাই না। আমার সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্যই চিন্তা করিতে থাক। অন্য সকল চিন্তা ত্যাগ কর। তুমি শান্তিতে বসিয়া থাক, আমার নিকট তুমি-ই ছন্দ। একত্বের ধারণায় মশ্‌গুল থাকাই উত্তম। অক্ষর ও শব্দ কিছুই না। ইহা শুধু আঙ্গুর ফলের বাগানের বেড়ার কাঁটার ন্যায়। ঐ বেড়া যেমন আঙ্গুর ফল পর্যন্ত না যাওয়ার জন্য দেওয়া হয়, সেই রকম ইশকের উত্তেজনার সময় শব্দ ও বাক্যের দিকে লক্ষ্য করিলে আসল উদ্দেশ্যে পৌঁছিতে বেড়াস্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়। এইজন্য আমি ঐ সময় শব্দ ও বাক্য এবং আলোচলা ত্যাগ করিয়া দেই। ইহাদের বিনা অসীলায় তোমার সাথে আলোচনা করিব। যে কথা আমি হজরত আদম (আ:)-এর নিকট গুপ্ত রাখিয়াছিলাম, ইহা তোমার কাছে বলিয়া দিলাম, আর যে কথা হজরত খলিল (আ:)-কে বলি নাই এবং যে কথা হজরত জিবরাঈলকে জানাই নাই, হজরত মসীহ্‌ (আ:) যাহা কখনো বলেন নাই; ইহা গুপ্ত রহস্য বিধায় আল্লাহতায়ালা বিনা নফী ইসবাতে আমাকেও জানান নাই। অর্থাৎ, আমার নিকট প্রকাশ করেন নাই। মোকামে ফানা সম্বন্ধে মাওলানা বলিতেছেন যে, আমি ব্যক্তি হওয়া ও না হওয়ার অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছি। এইজন্য আমার অবস্থিতি না-অবস্থানের মধ্যে ডুবাইয়া দিয়াছি।জুমলা শাহানে বুরদায়ে বুরদাহ্‌ খোদান্দ,
জুমলা খলকানে মোরদায়ে মোরদাহ্‌ খোদান্দ।
জুমলা শাহানে পোস্ত পোস্তে খেশরা।
জুমলা খলকানে মস্ত মস্তে খেশরা।
দেল বরাঁ বর বে দেলাঁ ফেতনা বজাঁ,
জুমলা মায়াশুকানে শেকার আশেকাঁ।
মী শওয়াদ ছাইয়াদে মোরগানেরা শেকার,
তা কুনাদ নাগাহ্‌ ইশাঁরা শেকার।
হরকে আশেক দীদাশ মায়াশুকে দাঁ,
কো বা নেছবাত হাস্তে হাম ইঁ ও হাম আঁ।
তেশ্‌ নেগানে গার আব জুইঁয়ান্দ আজ জাহাঁ,
আবে হাম জুইয়াদ ব আলেমে তেশনেগাঁ।
চুঁকে আশেক উস্ত তু খামুশ বাশ,
উচুঁ গোশাত মী কোশাদ তু গোশে বাশ।অর্থ: এখানে মাওলানা বলেন, ঐ রহস্যময় অমূল্য বিদ্যা শুধু আল্লাহতায়ালা মেহেরবানী করিয়া দান করিলে লাভ করা যায়; বান্দাকে ভালবাসিয়া তিনি দান করেন। এই সম্বন্ধে উদাহরণ দিয়া মাওলানা বলিতেছেন, নিয়ম ইহাই যে সকল বাদশাহ নিজের মাশুকের মাশুক; এইরূপ জনসাধারণও নিজের বন্ধুর বন্ধু হয়। সমস্ত মাশুক নিজের আশেকের অধীনস্থ হয়। যেমন শিকারী প্রথমে পাখীর জন্য পাগল হয়। পাখীর জন্য ঘর-বাড়ী ছাড়িয়া বনে জঙ্গলে উদাসীনভাবে ফিরিতে থাকে। তাহার পর ঐ পাখীকে নিজের ফাঁদে আবদ্ধ করে। অতএব, যাহাকে আশেক রূপে দেখ, উহাকে মাশুকও মনে করিতে হইবে। কেননা, তাহার মাশুক তাহাকে চায়। সে একদিক দিয়া আশেক অন্য দিক দিয়া মাশুক। যেমন তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিরা দুনিয়া ঘুরিয়া পানি তালাশ করে। পানিও সেইরূপ তৃষ্ণার্তকে অন্বেষণ করে। যেহেতু পানি পিপাসা নিবারণার্থে সৃষ্টি করা হইয়াছে, সেইজন্য সে পিপাসুকে চায়। এইভাবে আল্লাহতায়ালা যেমন বান্দাগণের মাহবুব; ঐ রকম আল্লাহতায়ালাও বান্দাগণকে ভালোবাসেন এবং নেয়ামত দান করেন। অতএব, যখন জানা হইল তিনি বান্দাহকে ভালোবাসেন, তখন তুমি তাঁহার জন্য চুপ করিয়া বসিয়া থাক। জুদাই ও দূরত্বের জন্য পেরেশান বা চিন্তিত হইও না, যখন তিনি তোমাকে তাঁহার সাথে ব্যবহার করার জন্য পথ-প্রদর্শক প্রেরণ করিয়াছেন, যেমন আম্বিয়া (আ:)-দিগকে প্রেরণ করিয়াছেন। তোমাকে তাঁহার নিকট প্রার্থনা করার মত আকাঙ্ক্ষা দান করিয়াছেন, অতএব তোমরা দিল ও কানকে সজাগ রাখিয়া তাঁহার ইবাদত করিতে থাক, তাহা হইলে তুমি তাঁহার রহমত পাইতে পার।বন্দেকুন চুঁ ছায়লে ছায়লানী কুনাদ,
ওয়ার না রেছওয়াই ও বীরানী কুনাদ।
মানচে গম দারাম কে বীরানী বুয়াদ,
জীরে বীরানে গঞ্জে ছুলতানী বুয়াদ।
গরকে হক খাহাদ কে বাশদ গরকেতর,
হামচু মওজে বহরে জান জীরো জবর।
জীরে দরিয়া খোশতর আইয়াদ ইয়া জবর।
তীরে উ দেলকাশ তর আইয়াদ ইয়া ছপর।
বছ জে বুনে ওয়াছ ওয়াছা বাশী দেলা,
গার তরবে রা বাজে দানী আজ বালা।
গার মুরাদাতে রা মজাকে শোকরাস্ত,
বে মুরাদী নায়ে মুরাদে দেল বরাস্ত।অর্থ: এই বয়াত সমূহ দ্বারা মনে হয় মাওলানা ফানার মোকামে আছেন, তাঁহার কাছে মাহবুবে হাকিকীর তরফ হইতে এলহাম আসে, এবং এলহামের মারফতে কথাবার্তা হইতেছে, এবং ফানাফিল্লাহ্‌র মধ্যে থাকিয়া আরো উন্নতির জন্য চেষ্টা ও তলব করিতেছেন। তাই তিনি বলেন, যখন ফানার হালতে তোমার অন্তরে আল্লাহর তাজাল্লি প্রকাশিত হইতে থাকে, তখন তুমি তাঁহাকে বিনা পর্দায় দেখিতে চাহিও না; কারণ মাখলুকের পক্ষে তাঁহাকে বিনা পর্দায় দেখা সম্ভব না। যদি তুমি দেখিতে চাও, তবে তুমি ধ্বংস হইয়া যাইবে; যেমন তুর পাহাড় জ্বলিয়া গিয়াছিল। অতএব, তুমি তাঁহাকে দেখিতে চাহিয়া লজ্জিত হইও না ও মরিয়া যাইও না। মরিয়া গেলে তোমার যে সম্বল “আমল” উহা বন্ধ হইয়া যাইবে। কিন্তু সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা অতিমাত্রায় বৃদ্ধি পাইয়াছে বলিয়া মওলানা বলিতেছেন যে, আমি যদি ধ্বংস হইয়া যাই, তবে আমার কোনো চিন্তার কারণ নাই, কেননা বীরাণীর মধ্যে গঞ্জে সুলতানী পাওয়া যায়। অর্থাৎ, আমি যদি মরিয়া যাই, হালাক হইয়া যাই, তাহাতে কোনো চিন্তার কারণ নাই। কারণ ঐ সময় বিনা পর্দায় আল্লাহর তাজাল্লী দেখিতে পারিব। যে ব্যক্তি খোদার ইশকে ডুবিয়া গিয়াছে, সে তো দর্শন-ই চাহিবে। যেমন সাগরের তুফান বা ঢেউ, ইহা উপরে বা নিচে উঠা নামার ভয় করে না। সেইরূপভাবে আশেকের প্রাণ যখন ফানাফিল্লাহর মধ্যে যায়, তখন মাহবুবের তীর বা ঢালকে সে ভয় করে না। সাগরের নিচু বা উচু ঢেউ, অর্থাৎ, মৃত্যু আর ঢাল অর্থ জীবিত রাখা উভেয়েই শান্তিপূর্ণ হইয়া থাকে। শিক্ষার জন্য মাওলানা বলিতেছেন যে, তোমার ভুল বুঝা হইবে, যদি তুমি মনে কর যে মাহবুবের তরফ হইতে শান্তি বা কষ্ট পাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। অতএব, ধ্বংস হইয়া যাওয়া আর বাকী থাকার মধ্যে পার্থক্য নাই, উভয় অবস্থা-ই আনন্দদায়ক। যদি তোমার উদ্দেশ্য থাকে খুশীর অবস্থা পাওয়া আর তিনি যদি তোমাকে ইচ্ছা করিয়া বালা দেন, তাহা হইলে তাঁহার ইচ্ছা তোমার ইচ্ছার চাইতে বেশী পছন্দনীয় এবং তাই বালাতেই সন্তুষ্ট থাক।হর ছেতারাশ খুন বাহায়ে ছদ হেলাল,
খুনে আলম রীখতান উরা হালাল।
মা বাহাউ খুনে বাহারা ইয়াফতাম,
জানেবে জান বাখতান বশেতাফ্‌তেম।
আয় হায়াতে আশে কানে দর মুরদেগী,
দেল নায়ারী জুযকে দর দেল বুরদেগী।অর্থ: মওলানা এখানে দর্শনের পরিবর্তে হালাকী পছন্দ করেন। তাই তিনি বলেন, মাহবুবের এক একটি তারকা, অর্থাৎ, মৃত্যুর পর যে তাজাল্লী দেখিতে পাইবে, ইহা শত হেলালের চাইতেও উত্তম। এইজন্য সমস্ত জাহান ধ্বংস করিয়া তাঁহাকে পাওয়া জায়েজ আছে। মাওলানা বলেন, আমি যে শব্দ বাহা এবং খুন বাহা লইয়াছি এইজন্য, যে প্রাণের মায়া ত্যাগ করিয়া দৌড়াইয়া যায়, ঐ তাজাল্লী দেখার জন্য, অর্থাৎ, মৃত্যুর পর যাহা কিছু পাওয়া যায়, উহাকে খুনের বিনিময় বলা হয় অথবা উত্তম দান বলা হয়। হে মানুষ, আশেকের জীবন-ই হইল মৃত্যু। তোমার মনের কাঙ্ক্ষিত বস্তু, যাহাকে স্থায়ী জীবন বলে, ইহা তোমার মৃত্যু ছাড়া পাইতে পার না। অতএব, ইহ-জগতের জীবন দান করিলে পরকালের জীবন পাইবে।মান দেলাশ জুস্তা বছদ নাজু দেলাল,
উ বাহানা করদাহ্‌ বা মান আজ মেলাল।
মানাশ জুস্তা বানাইয়াজ ও বে মেলাল,
উ বাহানা করদাহ্‌ আজ নাজু দেলাল।
গোফতাম আখের গরকে তুস্ত ইঁ আকল ও জান,
গোফ্‌তে রো রো বরমান ই আফ্‌ ছুঁ মখান।
মান না দানেম আচেঁ আন্দে শীদাহ্‌,
আয় দো দীদাহ্‌ দোস্তেরা চুঁ দীদাহ্‌।
আয় গেরাঁ জানে দীদাস্তী মরা,
জে আঁকে বছ আর জানে খরিদাস্তী মরা,
হর কেউ আর জানে খোরদ আর জানে দেহাদ,
গওহরে তেফলে ব করচে নানে দেহাদ।অর্থ: মাওলানা বলেন, আমি মাহ্‌বুব দর্শনের জন্য মাহ্‌বুবের সন্তুষ্টি কামনা করিয়া গৌরবের সহিত প্রার্থনা করিয়াছি। তিনি আমার প্রার্থনা অসন্তুষ্ট হইয়া অস্বীকার করিয়াছেন। তারপর নম্রতা সহকারে অনুনয় বিনয় করিয়া প্রার্থনা করিয়াছি, তাহাও ফখরের সাথে না-মঞ্জুর করিয়াছেন। সর্বশেষে তাঁহাকে বলিলাম, যে আপনার মহব্বতের মধ্যে ডুবিয়া রহিয়াছে, তাহাকে আপনি কেন নিরাশ করেন? তিনি উত্তর করিলেন, চল আমার কাছে এমন প্রার্থনা করিও না। এইরূপ বেহুদা কথা আর বলিও না, আমার এমন কি দেখিয়াছ যাহা দেখার মত? আমি ধারণা করিতে পারি না। তুমি কি ভাবিয়া রাখিয়াছ? হে দুই দর্শনকারী, তুমি মাহবুবকে কী মনে করিতেছ? এত সহজেই দেখিতে চাও? তোমার ফানাফিল্লাহে এখন পর্যন্ত মনে হইতেছে তুমি নিজেকে দেখিতেছ, তবে এক চক্ষু দিয়া আমাকে দেখিতেছ এবং অন্য চক্ষু দিয়া নিজেকে দেখিতেছ। ইহাই তো তোমার একটি ক্রুটি, ইহা সত্ত্বেও আমাকে দেখিতে চাও? হে কামেল, তুমি আমাকে মূল্যহীন মনে করিয়াছ। আর আমাকে বিনামূল্যে দেখিতে চাও। আমি তোমার কাছে বিনামূল্যে উপস্থিত আছি। তাই তুমি বিনামূল্যে দেখিতে চাও। যেমন শিশু বাচ্চারা এক টুকরা রুটির বিনিময়ে মুক্তা দান করিয়া দেয়। যেমন কথায় বলে, মালে মুফত দেলে বে-রহম, অর্থাৎ, যে মাল বিনামূল্যে লাভ করা যায়, ইহা সহজেই খরচ করিয়া ফেলে।
গরকে ইশ্কী শওকে গরকাস্ত আন্দরীঁ,
ইশ্কে হায়ে আউয়ালীন ও আখেরীন।
মোজমালাশ গোফতাম না করদাম জে আঁ বয়ান,
ওয়ার না হাম ইফ্‌হামে ছুজাদ হাম জবান।
মান চুলবে গুইরাম লবে দরিয়া বুদ,
মান চুলা গুইয়াম মুরাদ ইল্লা বুদ।
মান জে শিরিনী নেশী নাম রো তরাশ,
মান জে বেছিয়ারে গোফতারাম খামুশ।
তাকে শিরিনী মা আজ দো জাঁহা,
দরহে জাবে রো তরাশ বাশদ নেহাঁ।
তাকে দর হর গোশে না আইয়াদ ইঁ ছুঁখান,
এক হামী গুইয়াম জে ছদ ছেররে লাদুন।

অর্থ: মাওলানা এখানে তাঁহার ও তাঁহার মাহবুবের মধ্যে আলোচনার কথা প্রকাশ করিয়া শ্রোতাদিগকে উৎসাহিত করিতেছেন। এই সমস্ত আলাপ আলোচনা যাহা আমার মাহবুবের সাথে হইয়ছে, ইহা শুধু আমার ইশকে ইলাহীর কারণে হইয়াছে। অতএব, তোমরাও প্রত্যেকে প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত ইশকে ইলাহীর মধ্যে ডুবিয়া যাও; তবে এই নেয়ামত পাইতে পারিবে। আমার উল্লেখিত বর্ণনা দ্বারা কেহ যেন মনে না করে যে, মাকামে মোশাহেদা ও মোয়ায়েনা দ্বারা শুধু ইহাই লাভ হইয়াছে। কারণ, আমি অতি সংক্ষেপে নমুনা বর্ণনা করিয়াছি। তাহা না হইলে শ্রোতাদের জ্ঞান ও বর্ণনাকারীর জবান সব জ্বলিয়া পুড়িয়া ছাই হইয়া যাইত। কেননা, এই বস্তু অনুভব করা ও স্বাদ গ্রহণ করার জন্য জবান দিয়া বর্ণনা করা ও জ্ঞান দিয়া বুঝার মত নয়। প্রকাশ্যেই ইহা ধারণা করা যায় যে যাহা বহন করিতে সক্ষম না, ইহার ইচ্ছা করিতে গেলে, ধ্বংস ছাড়া কিছুই ভাবা যায় না। মাওলানা বলেন, ইহার ব্যাখ্যা আমি সংক্ষেপে বর্ণনার দিক দিয়া করিয়াছি ও আমলের দিক দিয়াও করিয়াছি। বর্ণনার দিক দিয়া এইরূপ করিয়াছি, যেমন লব শব্দ উচ্চারণ করি, তখন লবের অর্থ হইবে লবের সাগর। আর যখনই “লা” বলি তখন ইল্লা হইবে, অর্থাৎ, এমন ইশারায় কথা বলি যেমন কেহ যদি বলে লব, তবে লব দ্বারা লবের দরিয়া উদ্দেশ্য থাকে, কাহার কোনো পাত্তা চলে না এবং লা শব্দ নফির জন্য যাহার অর্থ সৃষ্ট বস্তু অসার, অস্তিত্বহীন, ধ্বংস হইয়া যাইবে। ইল্লা দ্বারা জাতে পাকের অস্তিত্ব প্রমাণ করা হয়, তাঁহার হওয়া স্থায়ী এবং আসল। অস্থায়ীর উদাহরণ দিয়া স্থায়ীর রহস্য বর্ণনা করি, ইহা হইল সংক্ষিপ্ত বর্ণনার উদাহরণ। আর সংক্ষিপ্ত আমলের উদাহরণ হইল, শিরনি বলিয়া চেহারা বিকৃতি করিয়া বসিয়া থাকি; দর্শকরা মনে করে যে তিক্ত পান করিয়াছে। অনেক বিষয় আমি চুপ করিয়া বসিয়া থাকি, লোকে মনে করে, সে এ বিষয় কিছু জানেনা। অর্থাৎ, আমার নিজের অবস্থা এমন করিয়া রাখি, যাহাতে লোকে আমাকে কোনো বিষয়ে পারদর্শি মনে না করে। এই সংক্ষিপ্তের উদ্দেশ্য আমার রহস্যের মাধুর্য অনুভব করা জ্বিন জাতি বা মানুষ জাতির কাছে প্রকাশ না পায়; পর্দার আড়ালে গুপ্ত থাকে; সকলের কানে যাইয়া না পৌঁছে। শত শত ভেদের মধ্যে দুই একটি প্রকাশ করিয়া থাকি।

জুমলা আলম জে আঁ গয়ুর আমদ কে হক্‌
বোরাদ দর গাইরাত বর ইঁ আলম ছবক।
উচুঁ জানাস্ত ও জাহাঁ চুঁ কালেবাদ,
কালেবাদ আজ জানে পেজিরাদ নেক ও বদ।
হরকে মেহরাবে নামাজাশ গাস্তে আইন,
ছুয়ে ঈমান রফতানাশ মীদাঁতু শীন।
হরকে শোদ মরশাহ রা ই জামাদার,
হাস্তে খোছরাণ বহরে শাহাশ আওতেজার।
হরকে বা ছুলতান শওয়াদ উ হাম নেশী,
বর দরাশ নেশাছতান বওয়াদ হায়ফোগবীন।
দস্তে বুছাশ চুঁ রছীদ আজ বাদশাহ,
গার গজীনাদ বুছে পা বাশদ গুণাহ্‌।
গারচে ছার বর পা নেহাদান খেদমতাস্ত,
পেশে আঁ খেদমাত খাতা ও জেল্লাতাস্ত।
শাহেরা গাইরাত বুয়াদ বর হর কে উ,
বু গজীনাদ বাদে আজ কে দীদেরো।
গাইরাতে হক বর মেছলে গন্দম বুদ,
কাহে খরমান গায়েরাতে মরদাম বুদ।
আছলে গায়েরাত হা বদানীদ আজ ইলাহ্‌,
ও আঁ খলকানে ফরায়া হক বে ইশতেবাহ্‌।

অর্থ: সমস্ত আলম আল্লাহর ব্যতিক্রম। কেননা, আল্লাহর সেফাত অতুলনীয়, কাহারো সেফাতের সহিত তুলনা হয় না। আল্লাহ অদ্বিতীয় ও অতুলনীয়। এই হিসাবে সমস্ত সৃষ্ট আলম আল্লাহর গুণের চাইতে অন্য প্রকারের গুণের অধিকারী। এই ফায়েজ প্রত্যেক বস্তুর মধ্যে দান করা হইয়াছে। তাই সব আল্লাহ হইতে ব্যতিক্রম রূপ ধারণ করিয়াছে। আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি আলমের তুলনায় রূহ স্বরূপ, এবং সৃষ্ট আলম দেহ রূপ মনে করিতে হইবে। দেহের মধ্যে যাহা কিছু গুণাগুণ দেখা যায়, চাই ভাল বা মন্দ হউক, সব-ই রূহের ক্রিয়ায় হইয়া থাকে। আল্লাহর সৃষ্টির দরুন সমস্ত সৃষ্ট বস্তু আল্লাহর ব্যতিক্রম রূপ ধারণ করিয়াছে, ইহার কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা যাইতেছে। প্রথম উদাহরণ, যেমন কোনো ব্যক্তি নামাজের মধ্যে আল্লাহকে কেবলা করে, অর্থাৎ, আল্লাহকে দেখে। তাহার পক্ষে আল্লাহর উপর ঈমান আনার প্রমাণাদি তালাশ করা বৃথা। কারণ, সে তো নিজেই স্বচক্ষে দেখিতেছে, প্রমাণ দর্শনের চাইতে দুর্বল। উচ্চস্তর হইতে নিচুস্তরে অবতরণ সাধারণতঃ ঘটে না।

দ্বিতীয় উদাহরণ: যে ব্যক্তি বাদশাহর লেবাস পোষাক তৈয়ারকারী হিসাবে খাস্ করিয়া নির্দিষ্ট হয়, তাহার পক্ষে কাপড়ের ব্যবসা করা ক্ষতিকর বলিয়া মনে করিতে হইবে।

তৃতীয় উদাহরণ: যে ব্যক্তি বাদশাহর দরবারে বাদশাহর সহিত বসার স্থান পায়, তাহার পক্ষে দরজায় বসা অত্যন্ত অপবাদ।

চতুর্থ দৃষ্টান্ত: যে ব্যক্তি বাদশাহর হাত চুম্বন করার উপযোগী হয় সে যদি পা চুম্বন করে, তবে শক্ত গুণাহের কাজ হয়। যদিও বাদশাহর পায়ের উপর মাথা রাখিয়া দেওয়া বড় খেদমত। কিন্ত হাত চুম্বনের অনুপাতে বড় গুণাহ এবং বেইজ্জাতের কথা। অতএব, যে ব্যক্তি জাতে পাকের প্রকৃত অবস্থা দেখিতে পায়, সে যদি প্রকৃত জাত বাদ দিয়া তাঁহার গুণাগুণের প্রতি নজর করে, তখন তিনি রাগান্বিত হন। আল্লাহতায়ালার গাইরাত, যেমন গন্দম আর মানুষের গাইরাত যেমন ইহার ভূষী, অর্থাৎ, খোশা; এখানে শুধু আসল আর নকলের দিক দিয়া উদাহরণ দেওয়া হইয়াছে। সব গাইরাতের মূল আল্লাহর তরফ হইতে মনে করিতে হইবে। মানুষের গাইরাত আল্লাহর গাইরাতের অধীন।

শরাহ্‌ ইঁ বোগজারাম ও গীরাম গেলাহ,
আজ জাফায়ে আঁনে গার দেহ দেলাহ্‌।
নালাম ইরা নালাহা খোশ আইয়াদাশ,
আজ দো আলম নালাহ ও গম বাইয়াদাশ।
চুঁ না নালাম তলখে আজ দাস্তানে উ,
চুঁ নীমে দর হলকায়ে মোস্তানে উ।
চুঁ না বাশাম হামচু শবে বে রোজে উ,
বে বেছালে রুয়ে রোজ আফরুজে উ।

অর্থ: এখানে মাওলানা পুনরায় মাওলার সাক্ষাতের প্রার্থনা করিতেছেন। তিনি বলেন, আমি গাইরাতের ব্যাখ্যা ত্যাগ করিয়া আমার প্রিয় মাহবুবের সাক্ষাৎ না দেওয়ার সম্বন্ধে পুনঃ বর্ণনা করিতে আরম্ভ করিলাম। আমার মাহবুবের কাছে ক্রন্দন করিয়া প্রার্থনা করা পছন্দ হয়, সেইজন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করিয়া ক্রন্দন করিতেছি। মানুষ এবং জ্বীন জাতি হইতে তিনি দুঃখ প্রকাশ করা ও ক্রন্দন করা ভালোবাসেন। তিনি ক্রন্দন ব্যতীত পছন্দ করিবেন কেন? আমি তাঁহার কারুকার্য ও খেলা দেখিয়া কেমন করিয়া না কাঁদিয়া পারি? আমি তাঁহাকে দেখিবার স্থানে পৌঁছিয়া বেহুশ হইয়া রহিয়াছি। যেহেতু তাঁহাকে দেখিতে পারিনা সেইজন্য কাঁদিতেছি, মাহবুবের আলোকিত চেহারার আলো যতক্ষণে আমার নসীবে না মিলিবে, ততক্ষণ আমি অন্ধকারে সাঁতরাইতে থাকিব।

না খোশে উ খোশ বুয়াদ বর জানে মান,
জানে ফেদায়ে ইয়ারে দেল রঞ্জানে মান।
আশেকাম বর রঞ্জে খেশো দরদে খেশ,
বহরে খোশ নুদীয়ে শাহে ফরদে খেশ।
খাকে গমরা ছুরমা ছারাম বহরে চশ্‌ম,
তাজে গওহর পুর শওয়াদ দো বহরে চশ্‌ম।
আশকে কাঁ আজ বহরে উ বারান্দ খল্‌ক,
গওহরাস্ত ও আশকে পেন্দারান্দ খল্‌ক।
মানজে জানে জানে শেকায়েত মী কুনাম,
মাননীমে শাকী রওয়াতে মী কুনাম।
দেল হামীঁ গুইয়াদ আজু রঞ্জীদাম,
ওয়াজ নেফাকে ছুস্ত মী খান্দাম।

অর্থ: মাহবুবের নিকট হইতে যে আদেশ আসিবে, যদিও ইহা আমার তবিয়াতের বিরুদ্ধ হয় অথবা অখুশীর কারণ হয়, তথাপি ইহা আমার প্রাণে শান্তিদায়ক হয়। আমার যে বন্ধু আমার প্রাণে কষ্ট দেয়, তাহার জন্য আমার আত্মা বিলাইয়া দেই এবং আমি আমার দুঃখ ও যাতনার জন্য সন্তুষ্ট হই, কারণ ইহার মধ্যে একমাত্র আমার প্রভুর-ই শুভ সংবাদ আছে। আমি আমার দুঃখের ধূলাকে চোখের সুরমা বানাইয়া লই। তাহা হইলে অশ্রুজলে আমার চক্ষু পূর্ণ হইয়া যাইবে, অশ্রুকে যে মুক্তা বলা হইয়াছে; ইহা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নহে। কারণ মানুষ আল্লাহর জন্য যে অশ্রু বর্ষণ করে, ইহা প্রকৃতপক্ষে মুক্তাস্বরূপ, যদিও মানুষে উহাকে অশ্রু মনে করে। আমি আমার মাহবুবে হাকিকীর শেকায়েত করিতেছি যে, আমার সাক্ষাত করার দরখাস্ত মঞ্জুর করেন না। ইহা আমার প্রকৃত শেকায়েত না, বরং শুধু ঘটনা বর্ণনা করা। আমার অন্তর বলে যে, মাহবুবে হাকিকী হইতে কষ্ট পাইতেছি। আমার অন্তরের সামান্য নেফাকীর জন্য হাসি আসে । কেননা, মনে মনে ভিতরে মাহবুবের সন্তুষ্টির উপর খুশী আছি। শুধু মুখে এইসব কথা বলিতেছি।

রাস্তী কুন আয় তু ফখরে রাস্তাঁ,
আয় তু ছদরো মান দরাত রা আস্তাঁ।
আস্তানো ছদরে দর মায়ানী কুজাস্ত,
মাওমান কো আঁ তরফ কাঁইয়ারে মাস্ত।
মরদো জন চুঁ এক শওয়াদ আঁ এক তুই,
চুঁকে একহা মহোশোদ আঁক তুই।
ইঁ মান ও মা বহরে আঁ বর ছাখতী,
তা তু বাখোদ নরদে খেদমাত বাখ্‌তী।
তা তু বামা ও তু এক জওহার শওবী,
আকেবাত মহ্‌জে চুনাঁ দেল বর শওবী।
ইঁ মান ও মা হা হামা একজা শওয়ান্দ,
আকেবাতে মোস্তাগ রাক জানানে শওয়ান্দ।

অর্থ: মাওলানা প্রার্থনা করেন যে, হে মাওলা! তুমি আমার সাথে সত্য ব্যবহার কর, তুমি-ই সত্যের ফখরকারী, তুমি অন্তর, আমি তোমার দরজার চৌকাঠ। অন্তর ও চৌকাঠের অর্থের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। অন্তর জাতে পাক তায়ালা কদিম, অর্থাৎ, স্থায়ী; আর আমরা অস্থায়ী। হে মাহবুবে পাক জাত, আপনার অস্তিত্ব আমাদের অস্তিত্ব হইতে পৃথক, আমার নিজের অস্তিত্ব রূহের ন্যায়। যেমন প্রত্যেক নর-নারীর মধ্যে পাওয়া যায়। আপনি সর্বত্র বিদ্যমান আছেন এবং যখন স্ত্রী-পুরুষ সব ধ্বংস হইয়া যাইবে তখন আপনি-ই একা থাকিবেন। আপনার সম্মুখে আমরা কিছুই না। আপনি আমাদিগকে সৃষ্টি করিয়া নিজের সহিত খেদমতের গুটি খেলা খেলিয়াছেন। একদিন এমন আসিবে যে, আপনি আপনার সৃষ্ট মাখলুকাতের সহিত এক হইয়া যাইবেন। শেষ পর্যন্ত একমাত্র আপনি-ই থাকিবেন। যেমন সৃষ্টির পূর্বে ছিলেন। সর্বশেষে আমরা সৃষ্ট বস্তুসমূহ সব এক হইয়া আপনার মধ্যে বিলীন হইয়া যাইব।

ইঁ হামা হাস্ত ও বইয়া আয় আমরে কুন,
আয় মোনাজ্জাহ্‌ আজ বয়ান ও আজ ছুখান।
চশমে জেছমানা তু আন্দ দীদে নীস্ত,
দর খেয়ালে আরাদ গম ও খান্দিদে নীস্ত।
দেল কে উ বস্তা গম ও খান্দিদে নীস্ত,
তু বগো কে লায়েকে ইঁ দীদে দীস্ত।
আঁ কে উ বস্তা গম ও খান্দাহ্‌ বুদ,
উ বদী দো আরিয়াত জেন্দা বুদ।
বাগে ছব্‌জ ইশ্কে কো বে মুন্তাহাস্ত,
জুয্‌ গম ও শাদী দরু বছ মেওয়া হাস্ত।
আশেকে জে ইঁ হর দো হালত বর তরাস্ত,
বে বাহার ও বেখাজানে ছবজো তরাস্ত।

অর্থ: আবার সাক্ষাতের প্রার্থনা করিয়া মাওলানা বলিতেছেন, হে আদেশ দাতা! এই সমস্ত কথা তো আছেই। আপনি আসেন, আপনার আলো বিস্তার করুন, আপনি কথা ও বর্ণনার বাহিরে। পরবর্তী বয়াতে মাওলানা কিছুটা সুস্থ অবস্থার দিকে বলিতেছেন যে, আপনাকে তো এই দেহের চক্ষু দিয়া দেখিতে পারে না এবং দুঃখ কষ্টে জর্জরিত চিত্ত ও আনন্দপূর্ণ চিত্তে দেখিবার বিধান নাই। হে প্রিয়! আপনি বলুন, যে অন্তঃকরণ দুঃখ কষ্ট ও হাসিযুক্ত হয়, সে কেমন করিয়া আপনাকে দেখার উপযুক্ত হইতে পারে? সে কখনও দেখার উপযুক্ত হইতে পারে না। অর্থাৎ, ইহকালের জীবনে এই চক্ষু ও মন দিয়া জাতে পাককে দেখিতে পারিবে না। এই পানি, মাটির দেহ, যাহার স্বাভাবিকভাবে সুখ বা দুঃখের অবস্থা আসিয়া পড়ে, এই সম্ভাবনা থাকাকালীন অবস্থায় পাক জাতের আলো দেখা সম্ভব না। মৃত্যুর পর পরকালে এই সম্ভাবনা দূর হইয়া যাইবে; তখন ভাগ্যে থাকিলে মোলাকাত হইতে পারিবে। ইশকে ইলাহীর বাগান সর্বদা তরুতাজা, সবুজ ও স্থায়ী। ইহার কোনো সীমা নাই এবং শেষও নাই। ইহার মধ্যে দুঃখ ও সুখ ছাড়া অন্যান্য নেয়ামতের সীমা নাই। ইহা সীমাবদ্ধ পাওয়া সম্ভব না। পরকালে অসীম ও স্থায়ী জীবনে পাইবার যোগ্য। তাই পরকালে নেক অদৃষ্ট হইলে পাওয়া যাইবে।

দে জাকাত রুয়ে খোদ আয় খুবরু,
শরেহ্‌ জানে শরাহ্‌ শরাহ্‌ বাজে গো।
কাজ কর শামা গামজাহ্‌ গাম্মা জাহ্‌,
বর দেলাম বনেহাদ দাগে তাজাহ।
মান হালালাশ করদাম আবু খুনাম বরীখ্‌ত,
মান হামী গোফতাম হালালে উ মী গেরীখ্‌ত।
চুঁ গেরী জানী জে নালাহ খাকিয়াঁ,
গমচে রিজী দরদেলে গম না কীয়াঁ।
ইঁকে হর ছুবাহে কে আজ মাশরেকে বাতাফ্‌ত,
হামচু চশমা মাশরেকাত দর জুশে ইয়াফ্‌ত।
চে বাহানা মীদিহী শায়দাতেরা,
আয় বাহানা শোকরে ইঁ লবে হাতেরা।
আয় জাহানে কোহরানা তু জানে নও,
আজতনে বে জানো দেল আফগানে শোনো।

অর্থ: উপরে মাওলানা নিজের স্বাভাবিক অবস্থায় জাতে পাকের সাক্ষাৎ অসম্ভব বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এখন আবার ফানাফিল্লাহর অবস্থায় মাওলার সাক্ষাতের জন্য আরজ করিতেছেন। তিনি বলেন, হে প্রিয় উজ্জ্বল দৃশ্য, তোমার চেহারার উজ্জ্বলতা প্রকাশ করিয়া দাও। আমার প্রাণ টুকরা টুকরা হইয়া যাওয়ার কিছু বর্ণনা দাও। তোমর সাক্ষাৎ কখন পাওয়া যাইবে? তোমার ইশকের আগুণ প্রজ্জ্বলিত হইয়া আমার অন্তরে দাগ কাটিয়া দিয়াছে। ইহাতে আমি অধিক আকাঙ্ক্ষা অনুভব করিতে পারিয়াছি। এই ব্যথায় ও দুঃখে আমার মন জর্জরিত হইয়া রহিয়াছে। এইজন্য আমি তোমার সাক্ষাৎ চাই। আমি আমার রক্ত দান করিতে বাধ্য, অর্থাৎ, মরিয়া যাইতে বাধ্য; তথাপি তোমার সাক্ষাৎ হইতে নিরাশ হইতে বাধ্য না। আমি সর্বদাই নিজেকে ধ্বংস করিয়া দিতে প্রস্তুত, তবু শুধু তুমি আমাকে ফিরাইয়া দিতেছ, আমা হইতে দূরে সরিয়া যাইতেছ? ব্যথিতদের অন্তরে কেন ব্যথা দিতেছ? হে প্রিয়, তোমাকে ভোরের উদিত সূর্যের ন্যায় উত্তপ্ত পাইতেছি। তোমার সৌন্দর্যের আলো কোনো সময় কমে না। তোমার উপর উৎসর্গকৃত প্রাণকে বাহানা করিয়া দেখা দিতে বিলম্ব করিতেছ কেন? তুমি এমন যে, তোমার কৃতজ্ঞতার শুভ সংবাদের মূল্য আদায় করা যায় না। হে প্রিয়, তুমি এ নশ্বর জগতের তুলনায় একটি তাজা প্রাণ, তোমার অবস্থানের দরুন এ জগত কায়েম আছে। তুমি এখন আছ, যেমন ছিলে, তাই তুমি নিত্য নূতন । যে প্রাণ তোমাকে হারাইয়া ফেলিয়াছে, সে শুধু চামড়া এবং হাড্ডি নিয়া বসিয়া রহিয়াছে। আমার সুর শুনিয়া রাখ, শুধু সাক্ষাৎ কামনা করি। আর কিছু চাই না।

শরেহ্‌ গুল বুগজার আজ বহরে খোদা,
শরেহ্‌ বুলবুল গোকে শোদ আজ গোলে জুদা।
বা খেয়ালো ওহাম না বুয়াদ হুশে মা,
আজ গম ও শাদী না বাশদ জুশে মা।
হালতে দীগার বুয়াদ কাঁ নাদেরাস্ত,
তু মশো মুনকেরে কে হক্‌ বছ কাদেরাস্ত।
তু কেয়াছ আজ হালতে ইনছান মকুন,
মন্‌জেল আন্দার জওরো দর ইহ্‌ছান মকুন।
জওরো ইহ্‌ছান রঞ্জো শাদী হাদেছাস্ত,
হাদেছানে মীরান্দ ও হক শানে ওয়ারে ছাস্ত।

অর্থ: মাওলানা অনেক আলাপ আলোচনা ও প্রার্থনা করার পর যখন পাক জাতের সাক্ষাৎ হইতে নিরাশ হইলেন, তখন ঐ সম্বন্ধে আলোচনা বন্ধ করিয়া দিয়া এখন আল্লাহর নাম নিয়া প্রেমিক বুলবুলের কেচ্ছা বলিতে আরম্ভ করিলেন। তিনি বলেন, এখন ঐ বুলবুলের ঘটনা বলিব, যে প্রেমাস্পদ হইতে পৃথক হইয়া পড়িয়াছে। অর্থাৎ, এখন প্রেমিকদের অবস্থা বর্ণনা করিব, যাহাতে শিক্ষার্থীর জন্য উপকার হয়। মাওলানা বলেন, আমাদের, অর্থাৎ, প্রেমিকদের অনুভূতি শক্তি, খেয়াল ও ধারণা হইতে উৎপত্তি হয় না। আমাদের উত্তেজনা দুঃখ সুখের প্রেরণায় হয় না। অর্থাৎ, আমাদের অনুভূতি শক্তি ও অবস্থা জনসাধারণের অনুভূতি ও অবস্থার ন্যায় নয়। কেননা, তাহাদের অনুভূতির অসীলা হইল স্পর্শশক্তি ও জ্ঞান; অথবা খবর। আমাদের অনুভূতিজ্ঞান জাতে পাক ও সেফাতে পাক তায়ালার সাথে সম্বন্ধ রাখে, যাহা বাতেনী শক্তি দ্বারা হাসেল হয়, ইহাকে কুয়াতে কুদুছিয়া বলা হয় এবং আকলকে আকলে আনী বলা হয়। ইহা অন্য এক অবস্থা, যাহা খুব কম পাওয়া যায়। ইহা তোমাদের হাসেল নাই বলিয়া ইহাকে অস্বীকার করিও না। যেহেতু আল্লাহতায়ালা অতি বড় শক্তিশালী। তিনি একজনকে দান করিবেন, অন্যে তাহা অনুভব করিতে পারিবে না। তোমরা আল্লহর প্রেমিককে মানুষের প্রেমিকের উপর কেয়াস করিও না। তাহারা মানুষকে দেখিয়া আসক্ত হয়, তাহাদের আন্তরিকতাই স্বাদ গ্রহণের কারণ এবং ব্যবহারই যন্ত্রণার অসীলা। কিন্তু আশেকে হাকিকীর অবস্থা অন্য রকম। তাহাদের দুঃখ ও শান্তিভোগ করার অসীলা হইল আকাঙ্ক্ষা। ইহা বাতেনী বস্তু। ইশকে হাকিকীকে ইশকে মাজাজীর সাথে তুলনা করা ভুলের কারণ বলিতে যাইয়া মাওলানা বলিতেছেন যে, মাহবুবে মাজাজীর অত্যাচার ও আন্তরিকতা এবং আশেকে মাজাজীর সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্ট হওয়া সমস্তই ক্ষণিকের জন্য, প্রত্যেকেই মরিয়া যাইবে। আল্লাহতায়ালাই তাহাদের অধিকার হিসাবে মালিক হইবেন। সমস্ত ধ্বংস হইয়া যাইবার পর তিনি থাকিবেন, তাঁহার ধ্বংস হওয়া অসম্ভব। মাহবুবে হাকিকী কাদীম, কাদীমের কেয়াস হাদেসের উপর করা অশুদ্ধ হয়। অতএব, মানুষে মানুষে পরস্পর মহব্বত হওয়া দুই হাদেসের মধ্যে মহব্বত প্রমাণ হয়। আর মানুষের জাতে পাকের সাথে মহব্বত হওয়া জাতে কাদীম ও হাদেসের মধ্যে প্রমাণ পাওয়া যায়। অতএব, ভিন্ন বস্তুর উপর কেয়াস করা ঠিক হয় না।

ছোবেহ্‌ শোদ আয় ছোবেহরা পোস্ত ও পানাহ,
ওজরে মাখদুমী হুচ্ছামদ্দিন বখাহ।
ওজরে খাহ আকলে কুলু ও জানে তুই,
জানে জানো তাবাশ মরজানে তুই।
তাফ্‌তে নূরে ছোবাহ্‌ মা আজ নূরে তু,
দর ছবোহী হামী মানছুরে তু।
দাদায়ে হক চুঁ চুনি দারাদ মরা,
বাদাহ্‌ কে বুয়াদ তা তরবে আরাদ মরা।
বাদাহ দর জোশাশ গাদায়ে জোশে মাস্ত,
ছরখে দর গেরদাশ আছীরে হুশে মাস্ত।
বাদাহ্‌ আজ মাস্ত শোদ নায়েমা আজু,
কালেবে আজ মা হাস্ত শোদ নায়ে মা আজু।
হামচু জাম্বুরেম ও কালেব হা চু মুম,
খানা খানা করদে কালেব রা চুমুম।
বছ দরাজাস্ত ইঁ হাদীছে আয় খাজাগো,
তা চে শোদ আহওয়ালে আঁ মরদে নকো।

অর্থ: মনে হয় মাওলানার এই রহস্য বর্ণনা করিতে করিতে ভোর হইয়া গিয়াছিল। এই জন্য তিনি হজরতে হকের দরবারে আরজ করিতেছেন যে, আয় মাহবুব! এখন ভোর হইয়াছে, মাখদুমী মাওলানা হুচ্ছামুদ্দিনের প্রার্থনা কবুল করিয়া লও। তুমি ঐ পূর্ণ জ্ঞানী ও কামেলের ওজর স্বীকার করিয়া লও। তুমি তাঁহার প্রাণের মালিক ও জ্ঞানের আলো দাতা। আমাদের অন্তরে তোমার নূরের অসীলায় আলো প্রস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে। তোমার নূরের কারণে আমাদের অন্তরে তোমার ইশকে আমাকে এইরূপ মস্ত করিয়া রাখিয়াছে; তখন ইহা প্রকাশ্যেই বুঝা যায় যে, শরাবের মস্তি ইহার তুলনায় কিছুই না। জাহেরী শরাবের উত্তেজনা আমাদের উত্তেজনার কাছে কিছুই না বলিয়া ঘুড়িয়া বেড়ায়। আমাদের উত্তেজনার নিকট জাহেরী শরাবের উত্তেজনা মুখাপেক্ষী; চতুর্দিকে চাকার ন্যায় ঘুড়িতে থাকে। অর্থাৎ, শরাবের উত্তেজনা আল্লাহর ইশকের উত্তেজনার তুলনায় নগণ্য বলিয়া মনে হয়। আমাদের স্বাদ গ্রহণের উত্তেজনা হইতে শরাবের উত্তেজনা দুর্বল। কেননা, উহা অস্থায়ী, আর আমাদের এই উত্তেজনা স্থায়ী। জাহেরী শরাব আমাদের  এই শরাবের জন্য পাগল হইয়া যায়। আমরা ইহার জন্য পাগল নহি। শরাবের মস্তী ও কালেবের অস্তিত্ব আমাদের জন্যই হইয়াছে, আমাদের অস্তিত্ব ইহাদের জন্য নহে। আমাদের রূহ্‌ ভ্রমরের ন্যায়, আর কালেব মূমের ন্যায়। রূহ্‌ কালেবের প্রত্যেক ঘর পরিপূর্ণ করিয়া রাখিয়াছে, যেমন ভ্রমর প্রত্যেক ঘরে ঘরে মূম পরিপূর্ণ করিয়া দেয়। মাওলানা বলেন, প্রেমের কেচ্ছা অতি বড়, ইহা ত্যাগ করিয়া এখন ঐ নেক্‌কার সওদাগরের অবস্থা বর্ণনা করিতে হয়।

খাজা আন্দর আবেশো দরদো চুনীঁ,
ছদা পোরাগান্দহ্‌ হামী গোফ্‌ত ইঁ চুনীঁ।
গাহতানা কোজ গাহে নাজো গাহে নাইয়াজে,
গাহে ছওদায়ে হাকিকাত গাহে মজাজ।
মরদে গরকা গাস্তাহ্‌ জানে মী কুনাদ,
দস্তেরা দর হর গেয়া হায়ে মী জানাদ।
তা কুদামাশ দাস্তে গীরাদ দর খতর,
দস্তো পায়ে মী জানাদ আজ বীমে ছার।

অর্থ: ঐ সওদাগর শোক তাপে ব্যথিত হইয়া শত সহস্র প্রকারের দুঃখ যাতনা প্রকাশ করিতে লাগিল। কোনো সময় বিচ্ছিন্ন ভাবের কথা বলিত, কোনো সময় গৌরবের কথা প্রকাশ করিত, আর কোনো সময় আক্ষেপ করিত। কোনো সময় মারেফাতের বর্ণনা দিত। কোনো কোনো সময় ইশকে মাজাজীর অবস্থা বর্ণনা করিত। সওদাগর শোকতপ্ত হইয়া নিজের প্রাণ ফাঁড়িয়া ফেলিতে চেষ্টা করিতেছিল, দূর্বাঘাসের উপর হাত মারিতেছিল, কেহ আসিয়া এই বিপদে তাহাকে সাহায্য করে, এই আশায় হাত পা চতুর্দিকে ছুঁড়িতেছিল।

দোস্তে দারাদ দোস্তেইঁ আশুফ্‌তেগী,
কোশেশ বেহুদা বে আজ খোফতেগী।
আঁকে উ শাহাস্ত উ বেকারে নীস্ত,
নালা আজ ওয়ায়ে তরফা কো বীমার নীস্ত।
বহরে ইঁ ফরমুদ রহমান আয় পেছার,
কুল্লু ইয়াওমেন হুয়া ফী শানেন আয় পেছার।
আন্দার ইঁ রাহ মী তরাশ ও মী খারাশ,
তা দমে আখের দমে ফারেগ মরাশ।
তা দমে আখের দমে আখের বুদ,
কে ইনায়েত বা তু ছাহেবে ছেররে বুদ।
হরকে মী কোশাদ আগার মরদো জনাস্ত,
গোশ ও চশমে শাহে জানে বর রউ জানাস্ত,
ইঁ ছুখান পায়ানে না দারাদ আয় আমু,
কেচ্ছায়ে তুতী ওখাজা বাজে গো।

অর্থ: এখানে মাওলানা হাকিকী প্রেমের আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করিতে যাইয়া বলিতেছেন, মাহবুবে হাকিকী এইরূপ প্রেমের তাড়না পছন্দ করেন। চেষ্টা তদবীর বিফল হইলেও বেকার থাকার চাইতে উত্তম। হাকিকী বাদশাহ্‌ আল্লাহ্‌তায়ালা, তিনি বেকার নাই। সুস্থ ও সালেম ব্যক্তির ক্রন্দন অতি আশ্চর্যের বিষয় বলিয়া মনে হয়। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌তায়ালার কোনো বিষয়ের আবশ্যক নাই। তথাপি তিনি বেকার থাকেন না, যেমন পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা উল্লেখ করিয়াছেন, আল্লাহ্‌তায়ালা সব সময়ই কোনো না কোনো কাজে আছেন। অতএব, তোমরা তলবের (অন্বেষণের) পথে থাকিয়া চেষ্টা করিতে থাক। তোমার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করিতে থাক। এক মুহূর্তেও বেকার থাকিও না। নিশ্চয়ই শেষ মুহূর্ত আছে, ইহার মধ্যে আল্লাহতায়ালা দান করিতে পারেন। তিনি তোমার সাথী হইয়া যাইবেন। যে ব্যক্তি চেষ্টা ও তদ্‌বীর করিতে থাকে, চাই সে পুরুষ হউক বা স্ত্রী হউক, তাহার প্রতি আল্লাহ্‌তায়ালার দৃষ্টি আছে। তিনি দেখিতেছেন ও শুনিতেছেন। তাহা হইলে সে কীরূপে ক্ষতিগ্রসস্ত হইবে? আল্লাহতায়ালা নিজেই বলিয়াছেন, আমি কোনো পুরুষ বা স্ত্রী লোকের আমল নষ্ট করিয়া দেই না। পুরুষের জন্য যাহা সে কামাই করিয়াছে এবং স্ত্রীলোকের জন্য যাহা সে অর্জন করিয়াছে।

মসনবী শরীফ – (১২২)
মূল: মাওলানা রুমী (রহ:)
অনুবাদক: এ, বি, এম, আবদুল মান্নান
মুমতাজুল মোহাদ্দেসীন, কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা

সওদাগর মৃত তোতাকে খাঁচা হইতে বাহির করিয়া নিক্ষেপ করিয়া ফেলা ও মৃত তোতার উড়িয়া যাওয়া

বাদে আজানাশ আজ কাফাছ বীরু ফাগান্দ,
তুতীকে পাররীদে তা শাখে বদন্দ।
তুতী মোরদাহ্‌ চুনাঁ পরওয়াজ করদ,
কা আফতাব আজ শরকে তুর্কী তাজ করদ।
খাজা হয়রান গাস্তে আন্দর কারে মোরগ,
বে খবর নাগাহ বদীদ আছরারে মোরগ।
রুয়ে বালা করদ ও গোফ্‌ত আয় আন্দালীব,
আজ বয়ানে হালে খোদ মানে দেহ নছীব।
উচে করদ আঁজা কেতু আমুখতী,
ছাখতী মকরে ওমারা ছুখতী।
চশমে মা আজ মকরে খোদ বর দোখ্‌তী,
ছুখ্‌তী মারা ও খোদ আফ্‌রুখতী,
গোফ্‌তে তুতী কে বা ফেলাম পন্দে দাদ,
কে রেহাকুন নোতকো আওয়াজ ও গোশাদ।
জাকে আওয়াজাত তোরা বন্দে কর্‌দ,
খেশেরা মোরদাহ্‌ পে ইঁ পন্দে করদ।
ইয়ানে আয় মাতরাব শোদাহ্‌ বা আম ও খাছ,
মোরদাহ্‌ শো চুঁ মানকে তা ইয়াবি খালাছ।

অর্থ: ইহার পর সওদাগর ঐ তোতাকে খাঁচা হইতে বাহির করিয়া বাহিরে নিক্ষেপ করিয়া ফেলিয়া দিল এবং তোতা উড়িয়া গিয়া কোনো এক উঁচু ডালে গিয়া বসিল। মৃত তোতা এমনভাবে উড়িয়া গেল, যেমন পূর্ব দিক হইতে সূর্যের রশ্মি উদিত হইল। সওদাগর এই ঘটনা দেখিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইল। অজ্ঞান অবস্থায় তোতার এই গুপ্ত রহস্যের ব্যাপার দেখিয়া সওদাগর মাথা তুলিয়া তোতাকে বলিল, তুমি আন্দালিবের ন্যায় অতি সুন্দর। ওহে, তোমার অবস্থার কথা বর্ণনা করিয়া আমাকে কিছু জানিতে দাও। আমারও কোনো উপকার হইতে পারে। ঐ হিন্দুস্তানী তোতারা কী কাজ করিয়াছিল, যাহা তুমি বুঝিতে পারিয়াছ এবং আমাকে ধোকা দিয়া জ্বালাইয়া দিলে। ফেরেবের পথ আমি কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। শুধু আমাকে জ্বালাইলে এবং নিজে মহা আনন্দে উড়িয়া গেলে। তোতা উত্তর করিল যে তাহারা আমাকে কার্যকরী উপদেশ পাঠাইয়াছিল যে, তুমি মিষ্টি সুরে সুন্দর বুলি এবং আনন্দ করা ছাড়িয়া দাও। কেননা, ঐ সুন্দর সুরেই তোমাকে আবদ্ধ রাখিয়াছে। এই নসীহতের উদ্দেশ্যে ঐ তোতাটি নিজেকে মৃতের ন্যায় বানাইয়াছিল। উদ্দেশ্য ছিল যে, তুমি বিশেষ বিশেষ লোকের এবং সাধারণ লোকেরও সম্মুখে তোমার সুমধুর গান গাহিয়া থাক। তাহা না করিয়া আমার মত মৃত হইও, তবে ঐ বন্দী দশা হইতে মুক্তি পাইবে।

দানা বাশী মোরগে গানাত বর চুনান্দ,
গুঞ্চা বাশী কোদে কানাত বর কানান্দ।
দানা পেন্‌হা কুন বে কুল্লি দামে শো,
গুঞ্চা পেন্‌হা কুন গেয়াহ বামে শো।
হরকে দাদে উ হুছনে খোদরা দরমজাদ,
ছদ কাজায়ে বদ ছুয়ে উ রো নেহাদ।
চশমাহাউ চশমাহাউ রেশকে হা,
বরছারাশ রীজাদ চু আব জে মশকে হা।
দুশ মনানে উরা আজ গাইরাত মী দরান্দ,
দোস্তানে হাম রোজে গারাশ মী বারান্দ।
আঁকে গাফেল বুদ আজ কাস্তে বাহার,
উ চে দানাদ কীমাতে ইঁ রোজেগার।

অর্থ: এখানে মাওলানা প্রসিদ্ধতা লাভ করার কুফল ও অপ্রসিদ্ধ থাকার সুফল সম্বন্ধে বর্ণনা করিতেছেন। তিনি বলেন, তুমি যদি দানার ন্যায় নগণ্য হইয়া যাও, তবে তোমাকে পাখীরা টোকাইয়া খাইবে। আর তুমি সবুজ বাগানে পরিণত হও, তবে তোমাকে বালকেরা ভাঙ্গিয়া নিয়া যাইবে। অর্থাৎ, বিপদ হইতে রেহাই নাই। এইজন্য তোমার দানা গুপ্তভাবে মাটির নীচে জালের ন্যায় রাখিয়া দাও; তারপর দেখো ইহার মধ্যে কীরূপ মূল্যবান পশু আসিয়া আবদ্ধ হইয়া যায়। এইরূপভাবে তুমি নিজেকে গুপ্ত রাখ, অর্থাৎ, নিজের গুণাবলী প্রকাশ করিও না, তবে দেখিবে তোমার কীরূপ সুফল লাভ হয়। আর বাগানকে ঢাকিয়া রাখ, এবং ঘাসের ন্যায় হইয়া যাও; তবে হেয় প্রতিপন্ন হইবে, কিন্তু বিপদ হইতে মুক্তি পাইবে। যে ব্যক্তি নিজের গুণাবলী প্রকাশ করিয়া প্রসিদ্ধ হইবে, হাজার হাজার বিপদ মুসীবত তাহার মাথায় আসিয়া পড়িবে। মানুষের কু-নজর, হিংসা এবং ক্রোধ তাহার উপর এমনভাবে থাকিবে, যেমন মশক হইতে পানি পড়িতে থাকে। শত্রুরা হিংসার বশবর্তী হইয়া তাহাকে হত্যা করিয়া ফেলে এবং বন্ধুরা অনর্থক সাক্ষাৎ করিয়া মেলামেশা করিয়া সময় নষ্ট করিয়া ধ্বংস করিয়া দেয়। যে ব্যক্তি সময় মত ক্ষেতের কাজ না করে, তবে সে রোজগারের মূল্য কেমন করিয়া বুঝিবে? এইজন্য সময় নষ্ট করিয়া দেয়।

দর পানাহ লুতফে হক বাইয়াদ গেরীখত,
কো হাজারানে লুতফে বর আরওয়াহে রীখত।
তা পানাহে ইয়াবী আঁ গাহ চে পানাহ্‌,
আ বো আতেশ মর তোরা গরদাদ ছিয়াহ্‌।
নূহ ও মুছা রানাদরিয়া ইয়ারে বাশদ,
নায়ে বর আদা শানে বর্কী কাহারে শোদ।
আতেশে ইবরাহী মারা নায়ে কেলায়া বুদ,
তা বর আওরাদ আজ দেলে নমরূদে দুদ।
কোহে ইয়াহ্‌ ইয়া রা নাছুয়ে খেশে খানাদ,
কাছে দানাশ রা বর জখমে ছংগে রানাদ।
গোফ্‌তে আয় ইয়াহিয়া বইয়া দর মান গেরীজ,
তা পানাহাত গরদাম আজ সামশীরে তেজ।

অর্থ: উপরে মাওলানা জনসাধারণের সাথে বন্ধুত্বের কুফলের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। এখানে বলেন, লোকের বন্ধুত্বের আশ্রয় ত্যাগ করিয়া আল্লাহর মেহেরবানীর আশ্রয় লওয়া উচিত। কেননা, তিনি হাজার হাজার রূহের উপর মেহেরবানী করিয়াছেন যে, তোমাকে আশ্রয় দান করেন এবং তাঁহার আশ্রয় এমনভাবে হয় যে, পানি ও আগুন পর্যন্ত তোমার রক্ষক হইবে। লক্ষ্য কর, হজরত নূহ (আ:) এবং হজরত মূসা (আ:)-এর জন্য পানি তাঁহাদের বন্ধু সাজিয়া আশ্রয় দিয়াছিল, এবং তাঁহাদের শত্রুদিগের জন্য গজবে পরিণত হইয়াছিল এবং শত্রুদিগকে ডুবাইয়া ধ্বংস করিয়া দিয়াছিল। হযরত ইব্রাহীম (আ:)-এর জন্য আগুন শান্তির আশ্রয়স্থান হইয়াছিল। যাহা দেখিয়া নমরূদের অন্তরে হিংসার উদ্রেক হইয়াছিল। আবার হজরত ইয়াহিয়া (আ:)-এর প্রতি লক্ষ্য কর। পাহাড় তাঁহাকে নিজের মধ্যে রাখিয়া  পানাহ দিয়াছিল। যে ব্যক্তি তাঁহাকে কষ্ট দিতে উদ্যত হইত, তাহাকে পাথর নিক্ষেপ করিয়া জখম  করিয়া ভাগাইয়া দিত।  ঐ পাহাড়ই হজরত ইয়াহিয়া (আ:)-এর কাছে আরজ করিয়াছিল যে, আপনি আমার নিকট চলিয়া আসেন, শত্রুদের তীক্ষ্ণ তরবারী হইতে আপনাকে রক্ষা করিব।

তোতা পাখী সওদাগরকে উপদেশ দিয়া বিদায় হওয়া ও উড়িয়া যাওয়া

এক দো পন্দাশ দাদে তুতী বে নেফাক,
বাদে আজ আঁ গোফতাশ ছালামুল ফেরাক।
আল বেদায়া আয় খাজা করদী মারহামাত,
করদী আজ আদম জে কয়েদ মোজলেমাত।
আল বেদায়া আয় খাজা রফতাম তা ওতন,
হাম শওবী আজাদ রোজে হামচু মান।
খাজা গোফতাশ ফী আমানিল্লাহে বরো,
মরমরা আকুন নামুদী রাহে নও।
ছুয়ে হিন্দুস্তানে আসলী রো নেহাদ,
বাদে শেদ্দাত আজ ফরাহ্‌ দেল গাস্তে শাদ।
খাজা বা খোদ গোফতেইঁ পন্দে মানাস্ত,
রাহে উ গীরাম কে ইঁ বাহ্‌ র উশনাস্ত।
জানে মান কমতর জে তুতী কায়ে বুয়াদ,
জানে চুনী বাইয়াদ কে নেকু পায়ে বুয়াদ।

অর্থ: ঐ তোতা সওগাদরকে দুই একটি নসীহত করিয়া সালাম দিয়া ডাকিয়া বলিল, হে খাজা! এখন বিদায় হই, আপনি আমার উপর অত্যন্ত মেহেরবানী করিয়াছেন। আমাকে আপনার অন্ধকারময় কয়েদখানা হইতে মুক্ত করিয়া দিয়াছেন। এখন আমি আমার নিজের বাসস্থানে যাইবার ইচ্ছা রাখি। খোদা করুন, আপনিও একদিন খোদার মেহেরবানীতে আজাদ হইয়া যাইবেন। সওদাগর উত্তরে বলিল, ফী আমানিল্লাহে, অর্থাৎ, খোদা তোমাকে হেফাজাতে রাখুন। তুমি আমাকে একটি নূতন পথ দেখাইলে। অর্থাৎ, দুনিয়ার মহব্বত ত্যাগ করা। তারপর তোতা নিজের বাসস্থান হিন্দুস্তানের দিকে রওয়ানা হইল। শক্ত মুসীবাতের কষ্ট ভোগ করার পর তাহার অন্তর আনন্দে ভরপুর হইয়া গেল। সওদাগর নিজের অন্তরে বলিতে লাগিল, ইহা আমার জন্য উপদেশস্বরূপ, আমিও ইহার তরীকা অবলম্বন করিব। ইহা অত্যন্ত পরিষ্কার পথ। ঐ পথ হইল মৃত্যুর পূর্বে মরা। অর্থাৎ, দুনিয়ার লোভ-লালসা ও হিংসা-দ্বেষত্যাগ করিয়া মোরদার ন্যায় হওয়া। তবেই মুক্তি পাওয়া যায়।

মানুষের নিকট সম্মান পাওয়া ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হওয়ার ক্ষতি সম্বন্ধে বর্ণনা

তন কাফাছে শেকলাস্ত ও জানে শোদ খারে জাঁ
আজ ফেরেবে দাখেলানে ও খারে জাঁ।
ইঁ নাশ গুইয়াদ মান শোম হামরাজে তু,
ওয়ানাশ গুইয়াদ নায়ে মানাম অম্বাজে তু।
ইঁ নাশ গুইয়াদ নীস্তে চুঁ তু দর ওজুদ,
দর কামালো ফজলো দর ইহছানো জুদ।
আঁ নাশ গুইয়াদ হরদো আলম আঁ তুস্ত,
জুমলা জানে হা মা তোফায়েলে জানে তুস্ত।
ইঁ নাশ গুইয়াদ গাহে আয়েশে ও খোবরামী,
আঁ নাশ গুইয়াদ গাহে নওশে ও হামদমী।
উচু বীনাদ খলকেরা ছার মস্তে খেশ,
আজ তাকব্বার মী রওয়াদ আজ দস্তে খেশ।
উ না দানাদ কে হাজারানে রা চু উ,
দে উ আফগান্দাস্ত আন্দার আবে জু।
লুতফু ছালুছ জাহাঁ খোশ লোকমা ইস্ত,
কম তারাশ খোর কো পুর আতেশ লোকমাইস্ত।
আতেশাশ পেনহা ও জওউ কাশ আশকার,
দুদে উ জাহের শওয়াদ পায়ানে কার।

অর্থ: মানব দেহ রূহের পক্ষে খাঁচার ন্যায়। এই কারণে দেহ রূহের পক্ষে কাঁটাস্বরূপ হইয়া দাঁড়ায়। অর্থাৎ, দেহের শান্তি রূহের মুক্তির পথে কাঁটার বেড়া হইয়া দাঁড়ায়। বন্ধু-বান্ধবদের আসা যাওয়ার কারণে তাহাদের তরফ হইতে ধোকা দেওয়া হইতে থাকে। তাহারা কেহ খোশামদ করে তাহাতে আশ্চর্যান্বিত হয়, ইহা আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথে বাধা হইয়া থাকে। যেমন মাওলানা বলেন, কেহ হয়ত বলে যে আমি আপনার অন্তরঙ্গ বন্ধু। অন্য কেহ বলে, না সাহেব, আমি আপনার সুখে-দুঃখে ভাগী আছি। অন্য একজনে বলে, আপনার ন্যায় কামালাত ও ফজিলত কাহারো নাই। আপনি দানে ও ইহ্‌সানে অদ্বিতীয়। উভয় জাহানেই হুজুরের রাজত্ব আছে। আমাদের প্রত্যেকের প্রাণই হুজুরের অসীলায় বাঁচিয়া আছে। অন্য আর একজনে বলে, আপনিতো এই জমানার শান্তি ও খুশী। কেহ বলে, আপনি এই জামানার শিরনি, অর্থাৎ, আপনার অসীলায় আমরা সুখে শান্তিতে আছি। সে ব্যক্তি তখন সবাইকে তাহার উপর আশেক দেখে এবং নিজে অহংকারে ফুলিয়া যায়। নিজেকে সমলাইয়া রাখিতে পারে না। সে জানে না যে, এই রকম হাজার হাজার শয়তানে তাহাকে ধোকা দিতে পারে। ইহাদের ধোকা ও চাটুকারিতা স্বাদযুক্ত লোকমা, ইহা কম খাও। ইহা অগ্নির ন্যায়, ইহার পরিণতি ধ্বংস হওয়া ছাড়া আর কিছুই না। এই লোকমায় অগ্নি নিহিত আছে, যদিও প্রকাশ্যে স্বাদযুক্ত বলিয়া মনে হয়। কিন্তু অবশেষে অগ্নি নির্গত হইয়া সব কিছু জ্বালাইয়া পোড়াইয়া ছাই করিয় দিবে।

তু মগো কাঁ মদেহরা মানকে খোররাম,
আজ তামায়া মী গুইয়াদ উ মানপে বোরাম।
মাদেহাত গার হেজু গুইয়াদ বর মালা,
রোজে হা ছুজে দৌলাত জে আঁ ছুজে হা।
গারচে দানী কুজে হেরমান গোফতে আঁ,
কা আঁ তমায়া কে দাস্তে আজ তু শোদ জিঁয়া।
আঁ আছর মী মান্দাত দর আন্দারুঁ,
দর মদেহ্‌ ইঁ হালতাত হাস্ত আজ মুঁ।
আঁ আছর হাম রোজে হা বাকী বুয়াদ,
মায়ায়ে কেব্‌রো খোদায়া জানে শওয়াদ।

অর্থ: মাওলানা বলেন, তুমি হয়ত বলিতে পার যে ঐরূপ তোষামদে আমি কখনও সন্তুষ্ট হই না। তবে আমার ক্ষতি হইবে কেন? ইহার উত্তর দিয়া মাওলানা বলিতেছেন যে, ঐ ব্যক্তি যদি অসন্তুষ্ট হইয়া তোমার বদনামী প্রচার করে, তবে অনেকদিন পর্যন্ত তোমার অন্তরে ইহার ক্রিয়া, অর্থাৎ, জ্বলন থাকিবে। যদিও তুমি ভাল করিয়া জান যে, তাহার উদ্দেশ্য সফল করিতে পারে নাই, সেই জন্য কুৎসা রটনা করিয়াছে। তথাপি তোমার অন্তরে উহার ক্রিয়া বিষের ন্যায় কাজ করিতে থাকিবে। এইরূপভাবে প্রশংসার ক্ষেত্রেও পরীক্ষা করিয়া দেখ। প্রশংসার তাসীর অনেকদিন পর্যন্ত অন্তরে বাকী থাকে। অহংকারী ও ধোকাবাজ হওয়ার ইহাই একমাত্র কারণ। অতএব, ইহা দ্বারা বুঝা গেল যে তুমি প্রশংসা পছন্দ করো না, একথা তোমার বুঝা ভুল।

নেক বনু মাইয়াদ চু শিরিনিস্ত মদাহ,
বদ নুমাইয়াদ জে আঁকে তলখ উফতাদ কাদাহ।
হামচু মাতবুখাস্ত ও হোব্বো কাঁরা খোরী,
তা বদীরে সুরাশ ও রঞ্জ আন্দরী।
ওয়ার খোরী হালুয়া বুদে জওকাশ দমী,
ইঁ আছর চুঁ আঁ নমী পাইয়াদ হামী।
চুঁ নমী পাইয়াদ নমী মানাদ নেহাঁ,
হর জেদ্দেরা তু বজেদ্দে আঁ বদাঁ।
চুঁ শোক্‌রে বাশদ নেহাঁ তাছিরে উ,
বাদে চান্দে দম্বল আরাদ নেশে জু।
ওয়ার হোব্বো মাতবুখে খোরদী আয় জরীফ,
আন্দারুঁ শোদ পাকে জে ইখলাতে কাছীফ।

অর্থ: প্রশংসা মনে আনন্দ দেয় বলিয়া ইহা পছন্দ হয়। কুৎসা তিক্ততা আনয়ন করে বলিয়া পছন্দ হয় না। যেমন তিক্ত ঔষধ পান করিলে ইহার ক্রিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া থাকে। আর যদি মিষ্টি খাওয়া হয়, তবে উহার ক্রিয়া বেশীক্ষণ থাকে না। মিষ্টির ক্রিয়া যদিও বেশী সময় পর্যন্ত বাহিরে প্রকাশ পায় না, কিন্তু উহার ক্রিয়া ভিতরে নিহিত থাকে। প্রত্যেক বস্তুকে ইহার বিপরীত বস্তু দ্বারা উত্তমরূপে বুঝা যায়। যখন মিষ্টির ক্রিয়া ভিতরে নিহিত থাকে, কিছু সময় পরে উহার ক্রিয়া প্রকাশ পাইতে থাকে। যদি তুমি তিক্ত ঔষধ পান কর, তবে ভিতরে যাইয়া পাকস্থলির গণ্ডগোল ও অসুবিধাসমূহ সব পাক করিয়া পরিষ্কার করিয়া দেয়। যদিও পান করার সময় তবিয়াতে কষ্ট অনুভব হইয়াছে। শেষফল উত্তম হইয়াছে। ঐ রকম বদনামী শুনা-ও। যদিও শুনার সময় ভাল লাগে না, কিন্তু ইহার দরুণ শেষ পর্যন্ত চরিত্র গঠন ও আত্মা পবিত্র হয়।

নফছ আজ বছ মদহেহা ফেরাউন শোদ,
কুন জলিরুন নফছে হো না লা তাছুদ।
তা তাওয়ানী বান্দাহ্‌ শো ছুলতান মবাশ,
জখমে কাশ চুঁ শুয়ে শো চুগান মবাশ।
ওয়ার না চু লুতফাত নামানাদ ওইঁ জামাল,
আজ তু আইয়াদ আঁ হরিফানেরা মালাল।
আঁ জামাতে কাত হামী দাদান্দ রেও,
চু বাবী নান্দাত বগুইয়ান্দাত কে দেও।
জুমল গুইয়ান্দাত চু বীনান্দাত বদর,
মুরদাহ্‌ আজ গোরে খোদ বর করদাহ্‌ ছার।
হামচু আমরদ কে খোদা নামাশ কুনান্দ,
তা বদাঁ ছালুছে দর দামাশ কুনান্দ।
চুঁ বা বদনামী বর আইয়াদ রেশে উ,
দউরা নংগ আইয়াদ আজ তাফতীশে উ।
দেউ ছুয়ে আদমী শোদ বহরে শর,
ছুয়ে তু না আইয়াদ কে আজ দেউয়ে বতর।
তাতু বুদী আদমী দউ আজ পায়াত,
মী দওবীদ ও মী চশানীদ উ মায়াত।
চুঁ শোদী দর খোয়ে দেউয়ে উস্তোয়ার,
মী গেরীজাদ আজ তু দেউয়ে না বেকার।
আঁকে আন্দার দামানাত আওবীখ্‌তান্দ,
চুঁ চুনী গাস্তি জেবে গেরীখ্‌ তান্দ।

অর্থ: নফস অনেক প্রশংসা শুনিতে শুনিতে ফেরাউন হইয়া গিয়াছে। তুমি নগণ্য হইয়া থাক। বড় হইও না, নেতা হইও না, তুমি খাদেম হও, মাখদুম হইও না। অর্থাৎ, সেবা কর, সেবা লইও না। অত্যাচার সহ্য কর, যেমন শকুনে অত্যাচার সহ্য করে। অত্যাচারকারী হইও না। তাহা না হইলে তোমার যখন সৌন্দর্য ও ধন-দৌলত না থাকিবে, তখন তোমার বন্ধুরা তোমার নিকট হইতে ভাগিয়া যাইবে। আর যাহারা তোমার খোশামদ করিয়া ধোকা দিত, তাহারা তোমাকে দেখিলে বলিবে যে, দেখ! শয়তান আসিয়াছে। আর যখন তোমাকে তোমার নিজের দরজার উপর খাড়া দেখিবে তখন বলিবে, মোরদার ন্যায় দেখায়, কবর হইতে বাহির হইয়া আসিয়াছে। যেমন বালকদের সাথে খোশামদ করিয়া কাজ করান হয়, সেই রকম তোমার সাথে করিয়াছে। তোমাকে প্রভু বলিত, তবে তাহদিগকে তোমার কাছে স্থান দিতে। এখন তোমার দুরবস্থা হইয়াছে, শয়তানেও তোমার কাছে যাইতে লজ্জা বোধ করে। শয়তান ত মানুষের কাছে ধোকা দিতে সর্বদাই যায়। কিন্তু তোমার ঐ অবস্থায় তোমাকে পটকাইতে পারিবে না বলিয়া তোমার কাছে যায় না। কেননা, শয়তানের চাইতেও অধিকতর খারাপ হইয়া গিয়াছে। যতদিন পর্যন্ত তুমি মানুষ ছিলে, তত দিন পর্যন্ত শয়তান তোমার পিছনে লাগা ছিল। তোমার কাছে আসা যাওয়া করিত এবং তোমাকে গাফ্‌লাতের শরাব পান করাইত। এখন যখন তুমি শয়তানী চরিত্র মকবুত হইয়া গিয়াছ, তোমার নিকট হইতে শয়তান-ও ভাগিয়া যাইতেছে। অতএব, দেখা যায়, কয়েক দিনের বোজর্গির পরিণাম ইহাই হইয়া থাকে।

মাশা আল্লাহু কানা ওয়ামালাম ইয়াশালাম ইয়াকুনের ব্যাখ্যা

ইঁ হামা গোফতেম লেকে আন্দর পছীচ,
বে ইনায়েতে খোদা হীচেম হীচ।
বে ইনায়েতে হক ও খাছানে হক,
গার মালাক বাশ চীয়াহাস্তাশ ওরক।

অর্থ: মাওলানা বলেন, যদিও আমি উপরে বহুত ওয়াজ নসীহাত করিয়াছি, কিন্তু কোনো কাজের মজবুত এরাদাহ করার মধ্যে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর মেহেরবানী না হইবে, ততক্ষণ উহা কিছুই না। খোদাতায়ালা এবং তাঁহার খাস রহমত ছাড়া তুমি যদি ফেরেস্তাও হও, তবুও উহার আমল বা ক্রিয়া লিখনির মধ্যেই থাকিয়া যাইবে। অর্থাৎ, কোনো ক্রিয়া হইবে না। উপরে উল্লেখিত বাক্যের অর্থ এই যে, যাহা আল্লাহ্‌তায়ালা চান, তাহাই হয; আর যাহা চান না, তাহা হয় না।

আয় খোদা আয় কাদেরে বেচুঁ ও চান্দ,
আজ তু পয়দা শোদ চুনী কছরে বলন্দ।
ওয়াকেফী বরহালে বীরু ও দরুঁ
বে কম ও বে বেশ ও বেচান্দি ও চুঁ।
আয় খোদা আয় ফজলে তু হাজতে রওয়া,
বা তু ইয়াদে হীচ কাছ না বুদ রওয়া।
ইঁ কদরা ইরশাদে তু বখ্‌শী দাহ্‌,
তা বদী বছ আয়বেহা পুশীদাহ্‌
কাতরাহ্‌ দানেশ কে বখশীদি জে পেশ,
মোত্তাছেল গরদাঁ বদরিয়া হায়ে খেশ।
কাতরায়ে এলমাস্ত আন্দর জানে মান,
ওয়ার হা নাশ আজ হাওয়া ওজে খাকেতন।
পেশে আজ ইঁ কাইঁ খাকে হা খাছ ফাশ কুনাদ,
পেশে আজ আঁ কে ইঁ বাদেহা নাশ ফাশ কুনাদ।

অর্থ: যখন উপরে প্রমাণ হইল যে আল্লাহর মেহেরবানী ও সাহায্য ছাড়া কিছুই হইতে পারে না, এইজন্য মাওলানা অস্থির হইয়া আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করিতেছেন, হে খোদা! হে মহা পরাক্রমশালী! তোমার কোনো পরিমাণ নাই, তোমার অবস্থার কোনো সীমা নাই। তুমি-ই এই বিশাল আসমান সৃষ্টি করিয়াছ, তুমি অন্তর বাহিরের সব খবর রাখ। তোমার মধ্যে কম বেশী নাই, তোমার মেহেরবানীতে মকসূদ পূর্ণ হয়, তুমি ব্যতীত কাহাকেও স্মরণ করি না। এই যে প্রার্থনা করিতেছি, ইহাও তোমার মেহেরবানীর দান। ইহার কারণে তুমি আমাদের অনেক দোষত্রুটি গুপ্ত করিয়া রাখিয়াছ। তাই তোমার নিকট প্রার্থনা করিতেছি যে, তুমি না চাহিতে আমাকে যে এক বিন্দু জ্ঞান দান করিয়াছ, ইহাকে তোমার জ্ঞানের সাগরের সাথে মিলাইয়া লও। যেমন তোমার জ্ঞান স্থায়ী এবং বাস্তব, সেই অনুযায়ী চলে। সেই রকম আমার এই রহস্য বর্ণনার মধ্যে যেন কোনো প্রকার ভুল না থাকে। আমার অন্তরে এক ফোটা এলেম আছে, ইহাকে নফস এবং দেহের কু-প্রেরণা হইতে মুক্ত রাখিও। মাটির দেহ যেন ইহাকে আকর্ষণ করিয়া নষ্ট করিয়া দিতে না পারে। অর্থাৎ, আমাকে খাহেশে নফসানী হইতে নিরাপদে রাখিও।

গারচে চুঁ নাশ ফাশ কুনাদ তু কাদেরী,
কাশ আজ ইশাঁ দাস্তানে ও আখেরী।
কাতরায়ে কো দর হাওয়া শোদ ইয়াকে রীখ্‌ত,
আজ খাজীনা কুদরাতে তু কায়ে গেরীখ্‌ত।
গার দর আইয়াদ দর আদম ইয়া ছদ আদম,
চুঁ বখানেশ উ কুনাদ আজ ছারে কদম।
ছদ হাজারানে জেদ্দো জেদ্দেরা মী কাশাদ,
বাজে শানে হুকমে তু বীরু মী কাশাদ।
আজ আদমে হা ছুয়ে হাস্তী হর জামান,
হাস্তে ইয়া রাব্বে, কারওয়ানে দর কারওয়ান।
খচ্ছা হর শব জুমলা আফকারো অকুল,
নীস্তে গরদাদ জুমলা দর বহরে নগুল।
বাজে ওয়াক্তে ছোবাহ চুঁ আল্লাহিয়ান,
বর জানান্দ আজ বহরে ছার চুঁ মাহিয়ান।
দর খাজানে বীঁ ছদ হাজারানে শাখ ও বরগ,
আজ হায়জামত রফতাহ্‌ দর দরিয়ায় মোরগ।
জাগে পশীদাহ ছিয়াহ্‌ চুঁ নওহা গার,
দর গোলেস্তানে নওহা করদাহ্‌ বর খাজার।
বাজে ফরমানে আইয়াদ আজ ছালারে দেহ,
মর আদমরা কাঁ চে খোরদী বাজে দেহ।
আচেঁ খোরদী ওয়া দেহ আয় মোরগে ছিয়াহ্‌,
আজ নাবাতো ওয়ার দো আজ বরগো গেয়াহ্‌।

অর্থ: মাওলানা খোদাকে বলেন, যদিও ইহার মাটি বা বায়ু আমার এই ফোটাকে শুকাইয়া ফেলে, তবে তোমার শক্তি আছে, তুমি ইহাদের নিকট হইতে ফিরাইয়া লইতে পার। কেননা, যে ফোটা বায়ুতে মিশিয়া যাইবে অথবা মাটিতে পড়িয়া যাইবে, উহা তোমার কুদরাতের ভাণ্ডার হইতে বাহিরে যাইবে না। যদি উহা শতবারও নাই হইয়া যায়, তথাপি তুমি তলব করিলে উহা স্ব-ইচ্ছায় হাজির হইয়া যাইবে। লাখো বিরুদ্ধবাদ বস্তু বিরুদ্ধকে ধ্বংস করিয়া দেয়; যেমন শীতের ঋতু বসন্তকে ও বসন্ত ঋতু শীতের ঋতুকে এবং দুঃখ সুখকে ও সুখ দুঃখকে। এই রকম অনেক আছে যাহা তোমার হুকুমে অবিদ্যমান হইতে বিদ্যমান হইয়া আসে। এই রকম তুমি সব বস্তুকে না হওয়ার মধ্য হইতে হওয়ার মধ্যে সব সময় আনিয়া থাক। প্রত্যেক রাত্রিতে সকল জ্ঞান ও চিন্তাসমূহ এক গভীর সাগরে যাইয়া পতিত হয়।  পুনরায় ভোরে আল্লাহওয়ালাদের ন্যায় ঐ ঘুমের সাগর হইতে মাছের ন্যায় মাথা তুলিয়া বাহির হইয়া আসে। অর্থাৎ, জাগ্রত হইলে পূর্বের ন্যায় হইয়া যায়। আবার শীতের ঋতুতে বাগানের গাছ-পালার ডালপালা ও পাতাসমূহ শুকাইয়া পড়িয়া যায় এবং সমস্ত গাছপালা কাকের ন্যায় কাল হইয়া যায়। শীত চলিয়া গেলে, বসন্তের আগমনে মালেকুল মূলকের তরফ হইতে আদেশ হয় যে, তোমরা যাহা কিছু গিলিয়া ফেলিয়াছিলে এখন সব বাহির করিয়া দাও। তাই সকল গাছপালা পূর্বের ন্যায় হইয়া যায়।

আয়বেরাদর আকলো একদম বা খোদ দার,
দমীদাম দর তু খাজানাস্ত ও বাহার।
আয়বেরাদর একদম আজ খোদ দূরে শো,
বা খোদ আও গরকে বহরে নুরে শো।
বাগে দেলরা ছব জোতর ও তাজা বী,
পুরজে গুন্‌চা ও ওয়ার দো ছারো ও ইয়া ছামী।
জে আব নিহি বরগে পেনহা গাস্তাহ্‌ শাখ,
জে আনিহি গোল নেহাঁ ছাহ্‌ রাও কাখ।

অর্থ: উপরে মাওলানা পৃথিবীর স্বাভাবিক গতিবিধি পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করিয়াছেন। এখন নফস সমূহের পরিবর্তন সম্বন্ধে বলিতেছেন যে, হে ভাই! অল্প সময়ের জন্য তোমার বুদ্ধি ঠিক করিয়া দেখ, তোমার নিজের অন্তরেই সব সময় শীতের ঋতু ও বসন্ত ঋতু বিদ্যমান। অর্থাৎ, খাহেশে নফসানীর অবস্থা এবং জজ্‌বাতে রব্বানীর অবস্থা। হে ভাই! কিছু সময়ের জন্য তুমি নিজ সত্তাকে ভুলিয়া যাও, এবং আল্লাহর মহব্বতে ডুবিয়া যাও, অন্তরের বাগিচা দেখ, কেমন সুন্দর সবুজ বর্ণ ও তাজা দেখা যায়। সমস্ত বাগান ফল-ফুলে পরিপূর্ণ দেখিতে পাইবে। ইহাতে সবুজ বর্ণ পাতা এত পরিমাণ ধরিয়াছে যে, ইহার ডাল দেখা যায় না এবং অসংখ্য ফুল ফুটিয়াছে, যাহার ঘ্রাণে সমস্ত বাগান সৌরভপূর্ণ হইয়া গিয়াছে।

ইঁ ছুখান হায় কে আজ আকলে কুলাস্ত,
বুয়ে আঁ গোলজারে ছারো ছুম্বুলাস্ত।
বুয়ে গোল দিদী ও কে আঁজা গোল নাবুদ,
জুশে মল দিদী কে আঁজা মাল নাবুদ
বু কালাও জাস্ত রাহ্‌ বর মর তোরা,
মী বুরাদ তা খুলদো কাওছার মর তোরা।
বুদে ওয়ায়ে চশমে বাশদ নূরে ছাজ,
শোদ জে বুয়ে দীদায়ে ইয়াকুবে বাজ।
বুয়ে বদ মর দীদাহ্‌ রা তারী কুনাদ,
বুয়ে ইউছুফ দীদাহ্‌ রা ইয়ারী কুনাদ।

অর্থ: উপরে মাওলানা অন্তরের বাগানকে মারেফাতের বাগান বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। অনেক লোকে মারেফাতকে অস্বীকার করিয়াছে। এইজন্য ইহার প্রমাণ দিয়া এখানে বলিতেছেন যে, মারেফাত সম্বন্ধে যেসব তথ্য ও প্রমাণাদি বর্ণনা করা হইয়াছে ইহা পরিপূর্ণ জ্ঞানের বর্ণনা। ইহা আমার ইলহাম দ্বারা মালুম হইয়াছে, ইহা বাতেনী বাগানের খুশবু। আমার অন্তরে আল্লাহর তরফ হইতে দান করা হইয়াছে। ফুল না থাকিলে ফুলের সুঘ্রাণ পাওয়া যায় না, শরাব না হইলে শরাবের মস্তী হয় না। অতএব ঘ্রাণ এমন বস্তু, যদ্বারা পথ প্রদর্শিত হইয়া জান্নাতে খোলদ ও কাওছার পর্যন্ত পৌঁছিতে পারা যায়। অতএব, তোমরা আরেফ ও কামেলদের কথা শুনিয়া আমল কর, তোমরাও কামেল হইয়া যাইতে পারিবে। সুগন্ধি এমন বস্তু, যাহা চক্ষের আলো ও শক্তি বৃদ্ধি করিয়া দেয়। যেমন এক সুগন্ধি দ্বারা হজরত ইয়াকুব (আ:)-এর চক্ষু খুলিয়া গিয়াছিল। এইভাবে কামেলীনদের কথা শুনিয়া মারেফাতের আলো তৈয়ার কর। বদ-ঘ্রাণ দ্বারা চক্ষু অন্ধ হইয়া যায়। অর্থাৎ, আহলে বাতেল ও বেদায়াতদের কথা শুনিলে অন্তর অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া পড়ে। হজরত ইউসূফ (আ:)-এর ঘ্রাণে চক্ষে আলো বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ, কামেল লোকের বাক্য পালনে অন্তরে আলো সৃষ্টি হয়।

তুকে ইউছুফ নিস্তী ইয়াকুব বাশ,
হাম চু উ বা গেরিয়া ও আশুব বাশ।
চুঁ তু শিরিন নিস্তী ফরহাদে বাশ,
চুঁ না লায়লি তু মজনুন গরদে কাশ।
বেশ্‌ নুইঁ পন্দে আজ হেকীমে গজনবী,
তা বাইয়াবী দর তনে কুহনা নওবী।
ইঁ রুবাই রা শুনো আজ জানো দেল,
তা বে কুল্লে বেরুঁ শওবী আজ আবোগেল।
পন্দে উরা আজদেলোজান গোশে কুন,
হুশে রা জানে ছাজ ও জানেরা হুশে কুন।
আঁ হেকীমে গজনবী শায়েখে কবীর,
গোফ্‌তাস্ত ইঁ পন্দে নেকু ইয়াদে গীর।

অর্থ: মাওলানা বলেন, যখন তুমি কামেলীনদের কথায় উপকৃত হইতে পার, তবে কামেলদের অনুসরণ কর। নিজের মধ্যে অভাব থাকা সত্ত্বেও কখনও কামেল বলিয়া দাবী করিও না। তাই তিনি বলিতেছেন যে, যখন তুমি ইউসূফ হইতে পার নাই, তখন তুমি ইয়াকুব (আ:)-এর ন্যায় আশেক হইয়া কান্নাকাটি করিতে থাক। যখন তুমি শিরিন নও, ফরহাদ হও। তুমি যেমন লায়লীর ন্যায় হইতে পার নাই, তবে মজনু হইয়া বনে বনে পাগলের ন্যায় ফিরিতে থাক। এখানে হেকীম গজনবী (রা:)-এর উপদেশ মনোযোগ সহকারে শুন। তাহা হইলে তোমার পুরাতন দেহে নূতন শক্তির সঞ্চার হইবে। নিম্নলিখিত রুবাইকে জান প্রাণ দিয়া শুন, তবে তোমার অন্তরের কু-রিপুর তাড়না হইতে মুক্তি পাইবে। উক্ত উপদেশ এই যে, তুমি যখন গোলাপের ন্যায় পূর্ণ সৌন্দর্য্য রাখ না, তখন বদের সাহচর্যে যাইও না। তুমি যদি বদের কাছে যাও, তবে তোমার জ্ঞানের আলো লোপ পাইয়া যাইবে।

পেশে ইউছুফ নাজাশ ও খুবী মকুন,
জুয্‌ নাইয়াজ ও আহ্‌ ইয়াকুবে মকুন।
মায়ানী মোরদান জে তুতী বুদ নাইয়াজ,
দর নাইয়া জো ফক্‌রো খোদরা মোরদাহ্‌ ছাজ।
তা দমে ঈছা তোরা জেন্দাহ্‌ কুনাদ,
হামচু খেশাত খুব ও ফখান্দাহ্‌ কুনাদ।
দর বাহার আঁ কায়ে শওয়াদ ছারে ছবজ ছংগ,
খাকে শো তা গোল বরুইয়াদ রংগে রংগ।
ছালেহা তু ছংগেবুদী দেল খারাশ,
আজ মুঁরা এক জমানে খাকে বাশ।
দর বয়ানে ইঁ শুনো এক দাস্তাঁ,
তা বদানী ইতেকাদে রাস্তাঁ।

অর্থ: হজরত ইউছুফ (আ:)-এর কামালাত ও সৌন্দর্য্যর সম্মুখে কেহ ফখর করিও না। হজরত ইয়াকুব (আ:)-এর ন্যায় মস্ত হইয়া আহাজারী করিতে থাক। উল্লিখিত তোতার কেচ্ছার উদ্দেশ্য ফখর ও নাইয়াজ। অতএব, ফখর ও অহংকার হইতে মরিয়া যাও, তবে কামেলের ফায়েজের বরকতে মারেফাতের আলো দ্বারা রূহ্‌কে তাজা করিতে পারিবে এবং তাহার নিজের ন্যায় তোমাকেও সৌন্দর্য দ্বারা পরিপূর্ণ করিয়া দিবেন। পাথরিয়া জমিন কোনো সময়ই বসন্ত ঋতুতে শস্যে সবুজ হয় না। তুমিও যদি অহংকারী হও আর অন্য কাহারও অনুসরণ না কর, তাহা হইলে কামেল লোকদের ফায়েজ হইতে মাহ্‌রুম থাকিবে। অতএব, পাথরের মত শক্ত হইও না, মাটির ন্যায় নরম হও, তবে নানা প্রকার রঙ্গের ফুল ও ফল জন্মিবে। নম্রতা ও সভ্যতা অবলম্বন কর। জীবন ভরিয়াই অত্যাচার করিয়াছ, পরীক্ষা করার ইচ্ছায় কয়েকদিন মাটি হইয়া দেখ।

(আল্লাহ হুয়াল মোস্তায়ান)

*সমাপ্ত*

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

অই

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s